Sunday, January 31, 2016

ঢিপঢিপ

গরম। চিটচিটে গরম। জানুয়ারি বখে গেছে একদম। বইমেলা ঘুরতে এখন আর হাফ সোয়েটার গায়ে চাপাতে হয় না; দুপুরের দিকে তো নয়ই। 

অনুপ একাই এসেছিল। বইমেলা একা ঘুরলেই স্বস্তি। এ তো আর পাঁপড় ভাজা নাগরদোলা চড়ার মেলা নয় যে হইহইরইরই করে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দেওয়া। এখানে প্রত্যেকের নিজস্ব গতিতে বিচরণ করাটা জরুরী। জরুরী। প্রেমিকা, বন্ধুবান্ধবে ছিটকে না গিয়ে মেলায় তাই একা আসে অনুপ। 

রবিবারে ভিড় হবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ একটু বাড়াবাড়ি রকমের ঠ্যালাঠেলি হয়েছে। মিত্র-ঘোষের স্টলও উপচে পড়ছে, দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়। স্বস্তিতে নতুন বই উলটে পাল্টে দেখারও জো  নেই। বিরক্তিটা লাগামছাড়া লেভেলের দিকে পৌঁছচ্ছিল; ঠিক তখনই 
মেয়েটার দিকে চোখ গেল অনুপের।  

আলগা শ্রী ছিল একটা মেয়েটার মুখে, আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমার প্রতি অনুপের একটা পুরনো দুর্বলতা রয়েইছে। তবে অনুপের নজর মেয়েটিতে আটকায়নি; আটকে ছিল মেয়েটার টিশার্টে। সাদা টিশার্ট, জিন্সের ওপর পরা। যেমন হয়। কিন্তু ব্যাপারটা ছিল টিশার্টের বুকে আকা স্কেচটাতে; স্কেচটা ছিল ঘনাদার। 

এই কম্বিনেশনটা বড় ভালো লাগায় চুবিয়ে দিল অনুপকে। যে মেয়ে ঘনাদাকে টিশার্টে নিয়ে ঘোরে, তাকে অবহেলা করা যায় না। যায় না। এমন মেয়ে হয়তো আরও আছে। কিন্তু অনুপ আগে দেখেনি। অনুপ অবশ্য অনেক কিছুই দেখেনি। আর এ আবিষ্কারটা অত্যন্ত ভালো। 

টিশার্টে ঘনাদা আরামকেদারায় বসেছিলেন। স্বাভাবিক। স্কেচটা বেশ ভালো হয়েছে। বেশ। মেজাজটা চলকে বেরোচ্ছে। এবং একটা কোটেশনও রয়েছে। কোটেশনটা কী সে'টা জানার আগ্রহ স্বাভাবিক ভাবেই তীব্র হল। একটু এগিয়ে ফোকাস করল অনুপ। অনেক চেষ্টা করে পড়তে পারলে; "এক মাত্র গান দিয়েই তোমায় এখন বাঁচানো যায়"। 
গান গল্পটা থেকে লাইন তুলে সামান্য পাল্টে নিয়ে কোটেশনটা তৈরি হয়েছে। টিশার্ট ডিজাইনারকে বাহবা না দিয়ে পারল না অনুপ। 

তক্ষুনি মেয়েটা  সপাটে তাকালে অনুপের দিকে। ছ্যাঁত করে উঠল অনুপের বুক। সর্বনাশ! সে যে ড্যাবড্যাবে করে মেয়েটার বুকের দিকে তাকিয়ে ছিল না, তাকিয়ে ছিল ঘনাদার দিকে সেটা কী করে বোঝাবে? 
কী সাঙ্ঘাতিক!  ক্যালামিটি। 

হুট করে অন্যদিকে ঘুরে গেল অনুপ। কিন্তু বুকের ঢিপঢিপ বেড়ে গেল। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, মেয়েটা কী ভাবলে। কী ভাবলে মেয়েটা? লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল অনুপের। একবার ভাবলে মেয়েটার কাছে গিয়ে ঘটনাটা বুঝিয়ে বলে আসে। তারপর ভাবলে তাতে চড় থাপ্পড় খাওয়ার চান্স বাড়বে বই কমবে না। 

মিনিট খানেক ঢিপঢিপ হজম করে হুড়মুড় করে স্টল থেকে বেরিয়ে এলে অনুপ। আর তখনই অনুপের পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে এলো মেয়েটি। এবং অনুপ কে হকচকিয়ে দিয়ে সে অনুপের দিকে ঘুরে মোবাইল বের করে মেলে ধরলে। 

ছবি নিচ্ছে - স্পষ্ট হয়ে গেলে অনুপের কাছে। মেয়েটা অনুপের দিকে ক্যামেরা তাক করে ধরেছে। অনুপের কলজে ঠাণ্ডা বরফ হয়ে গেল; ভয়ে। পাবলিক শেমিংয়ের এই সবে শুরু। এই ফোট এখন আপলোড হবে ফেসবুকে। মেয়েটাকে দেখে মনেই হয় যে ওর ফেসবুকে সবিশেষ রোয়াব। আজ রাত্রের মধ্যেই গোটা শহর জেনে যাবে যে অনুপ একটা পারভার্ট। ছিঃ। ছিঃ। ছিঃ। মরে যেতে ইচ্ছে করছিল অনুপের। ভয়ের চোটে গলা দিয়ে একটা "এক্সকিউজ মি"ও বের করতে পারলে না অনুপ। হাতের তালু ঘামে ভিজে যাচ্ছিল, গলা শুকনো কাঠ। 

ঠিক তক্ষুনি, মেয়েটার চোখে একটা মোলায়েম ঝিলিক খেলে গেল। আর মেয়েটির ঠোঁট; কুঁচকে একটা অদ্ভুত ব্যাপার তৈরি হল -পাউট। .অনুপের হাতের তালু তৎক্ষণাৎ শুকিয়ে গেল, গলা ভিজে গেল স্বস্তিতে।  মেয়েটি মোবাইলে রিয়ার ক্যামেরা অন করেনি, অনুপকে তাকও করেনি। ফ্রন্ট ক্যামেরায় নিজের সেলফি তুলছিল মাত্র। 

ঘনাদা টিশার্টে মেয়েটা দশে দশ পেয়েছিল, সেলফি পাউটে সাড়ে তিন নম্বর কেটে নিল অনুপ। সেখান থেকে সোজা রওনা দিলে দে'জের স্টলের দিকে; ও'টার পাশে বাথরুম রয়েছে।  

গান ও স্মৃতি - ২



কিছু গান ফ্রেমে বাঁধাই হয়ে থাকে কথায় নয়, সুরে নয়, এমনকি গায়কীতেও নয়। চলকে ওঠা মুহূর্তে আটকে থাকে কিছু গান; কাঁচা নীল রঙে আটক পড়া ছোট্ট সবুজ পোকাটা যেমন। তেমন।
তখন বোধ হয় ক্লাস ফাইভ। বা সিক্স। সহজে বলতে গেলে হাফপ্যান্টই তখন নিয়ম। মামাবাড়ি।
সন্ধ্যাবেলা। 
হাত পা ধুয়ে এসে বসেছি টিভির ঘরে। দাদু আনন্দবাজারের শব্দ-ছক কষছেন। দিদা ঘরে ঢুকলেন, হাতে স্টিলের ঢাউস বাটি। বাটি ভরা দুধ; তাতে মুড়ি আর আম। পাশেই ঠাকুরঘর থেকে ভেসে আসা ধূপের গন্ধ আর হিমসাগর মিলে মন ভারী করা ব্যাপার। টিভিতে তখন বাংলা সিনেমা। সাগরিকা। গানের সিকুয়েন্স। উত্তম অত্যন্ত কাঁচা ভাবে পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করে চলেছেন। পিয়ানোর ওপরে ফুলদানি; উত্তমের মুখে তার চেয়েও দৃষ্টিকটু ভাবে সাজানো হাসি।

“সেই রূপকথারই দেশে, যে রং আমি কুড়িয়ে পেলেম প্রাণে; সুর হয়ে তাই ঝরে আমার গানে
তাই খুশির সীমা নাই, বাতাসে সে তার মধুর ছোঁয়া পাই
জানি না আজ হৃদয় কোথায় হারাই বারে বারে 
সাত সাগরের পাড়ে আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে”।

ঠিক সেই সময়। ঠিক সেই সময়। পাশের বাড়ি থেকে স্বাতীদি এসেছিলে দিদার কাছে ছুঁচ চাইতে। ছুঁচ। ডেফিনিটলি মনে আছে। স্বাতীদি পাশের বাড়ির স্বপনমামার মেয়ে। দিল্লীতে থেকে পড়াশোনা করত। গ্র্যাজুয়েশন। সম্ভবত ইকনমিক্সে। বয়েসে কত বড়। কত ভালো। কী ভালো লাগার হাসি স্বাতীদির। স্বাতীদি সেদিন নীল স্কার্ট পরে এসেছিল। জ্বলজ্বল করছিল স্বাতীদি, হিমসাগর, ধূপের গন্ধের মিশেলের দেমাককে ঠাণ্ডা করে দিয়েছিল নিমেষে। বুকে ভুরভুর ভালো লাগা গন্ধ। সে মুহূর্তে মনে হয়েছিল দুধ মুড়িতে চিনি কম পড়েছে বোধ হয়। সে মুহূর্তে মনে হয়েছিল একটা পিয়ানোর বড় দরকার। 
“বাবু কত বড় হয়ে গেছিস”, বলে স্বাতীদি গাল টিপে দিয়েছিল। হিমসাগর, ভারতদর্শন ধূপে স্বাতীদির গন্ধ আছে। আজও।

“আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা”র সুরে স্বাতীদি আছে। আজও।
শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে একটা সঞ্জীবে মেজাজ আছে কী?

গান ও স্মৃতি - ১



কলেজ স্ট্রিটের শেষ ট্রামের ঘরঘর গায়ে মেখে রাত চুইয়ে নামছে মেসের সরু চৌকি বেয়ে। মাথার নিচে নরম হয়ে আসা পেট পাতলা বালিশ, মাথার পাশে ফিলিপ্সের ছোট রেডিও। রাতের মিশমিশে মিশে যাওয়া ভালো লাগা জানুয়ারির রাত জুড়ে। জানুয়ারিই হবে। বা ডিসেম্বর। কারণ লেপ ছিল। আর পেতলের পুরনো কলের মুণ্ডু ঘুরিয়ে টেনে আনা তিরতিরে জলের দাগের মত; রেডিও থেকে রিমঝিমে আদর হয়ে ভেসে এসে ছিলেন কবীর সুমন স্বয়ং।
চেনা গান সেদিন অচেনা হয়ে ভালোবাসা হয়েছিল, অথবা ধুলো ঝাড়া প্রিয় বই যেমন। প্রিয় বন্ধুর নাম লেখা লেবেল আঁটা স্কুলের নোটবই যেমন। 
লেপ আরও মখমলে মেজাজে চেপে ধরেছিল।

“বড় বেরঙিন আজকাল কাছাকাছি; কোন রং পাই না তাই;
দিতে পারি না কিছু”।

সুমন গানে নয়, স্মৃতিতে বিঁধেছিলেন। নোনতা অব্যক্ত রক্তে ভিজেছিল বালিশ। না দেওয়া’দের দল সেজেগুজে শাড়ি পরে দরজার সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছিল। ভূতগ্রস্ত আমি বিড়বিড়ে মন্ত্র পাঠ করেছিলাম
“এই মলিন আর এ ধূসর পথ চাওয়া
এ চাওয়ার রং নাও তুমি
না পাওয়ার রং নাও তুমি
আগামীর রং দাও তুমি”।

গানটা শামিয়ানা হয়ে দুনিয়া ঢেকে দিয়েছিল। রাত বাধ্য বেড়ালের মত লেজ নেড়ে খাটের তলে এসে বসেছিলে। সে বেড়ালের চোখের মত ভালোবাসার আঁচ। সুমন ধূসর নীলাভ তারার রং ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, কৈশোর একবারের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়েছিল। আমার কী না ঝাপসা, তাই সম্যক ঠাহর হয়নি।

Saturday, January 30, 2016

ফিস্টি আর মাথা ঝিমঝিম

পিকনিক বড় কপিবুক। সাজানো, গোছানো। যাত্রাপথে ডিম পাউরুটি কলার ব্রেকফাস্ট। বাগানবাড়ি বা গঙ্গার ধারের সবুজ। লাঞ্চের সাজানো মেনু। ব্যাডমিন্টন। হাউসি। অন্তাক্ষরী। স্টেপ আউট করলে আড়াল মাপা দু পেগ। শিশু বৃদ্ধ সম্বলিত মিহি নরম পরিবেশ।

-"পিকনিক রুহআফজা, বুঝলি?", মাটির ভাঁড়ে ব্লেন্ডার্স প্রাইড ঢালতে ঢালতে বোঝাচ্ছিলেন বাপ্পাদা, "আসলি চিজ হচ্ছে ফিস্টি"।

- "তফাৎ আবার কী?", দীপু বাপ্পাদার ভক্ত। দীপু ফিজিক্সে নব্বুই চায়না। বাপ্পাদার মত ইনস্যুইং করতে চায়। বাপ্পাদার মত টপাটপ ক্যুইজ জিততে চায়। বাপ্পাদার মত গল্প লিখতে চায়। দীপু বাপ্পাদা হতে চায়।

- "তফাৎ!  পিকনিক স্পটের শৌখিনতা নেই; ছাদের নিভৃতে মেজাজ ফারমেন্ট হয়। ফিস্টি বন্ধুদের চক্রব্যূহ বস, ন্যাকামির অর্জুনপুত্র এন্ট্রি নিয়েছে কী অনস্পট কচুকাটা। অন্তাক্ষরী নয় টুয়েন্টি নাইন। জানিস খেলতে?"

- " অল্প, কল-ব্রে'টা জানি"।

- "আজ শিখিয়ে দেব"।

- "শেখাবে?"।

- " আলবাত শেখাব। আমার একটা রেস্পন্সিবিলিটি আছে না। মিঠে, আজ ট্যুয়েন্টিনাইনে দীপু আমার পার্টনার"।

- "আমি তোমার পার্টনার?"

- "অফ কোর্স"।

-" আর শোন। ঝিরি পেঁয়াজ কাটতে পারিস?"।

- "অফ কোর্স। ঝোলের পেঁয়াজ, মামলেটের পেঁয়াজ।  পারি"।

- "সাবাস। ভাবছিলাম তোকে দিয়ে বাসন ধোয়াবো। নাহ থাক। তুই বরং আমায় মাটনে অ্যাসিস্ট করবি"।

- "আচ্ছা"। দীপু নিজের মধ্যে তোপসের গন্ধ পাচ্ছিল।

- " নেহ, ঢক করে খেয়ে নে দেখি"।

- " এ, এ'টা?"।

- "হ্যাঁ। এ'টা"।

- " না মানে, এটা আমি ঠিক..."।

- "আজ বাদে কাল উচ্চমাধ্যমিক দিবি, মদ চেখে না দেখলে চলবে কী করে?"।

- " না মানে..."।

- "রাতে বরং আমার সাথেই থাকবি। তোর বাড়িতে বলে দেব"।

- "না মানে..."।

- "ট্যুয়েন্টি নাইন আর মাটনে তুই পার্টনার দীপু"।

ঢকঢক করে শেষ করেছিল গেলাসটা দীপু। তারপর আরও দুই গেলাস। ঢকঢকে।

বাপ্পাদা জিজ্ঞেস করেছিল "কী রে দীপু, মিঠে একটা মাথা ঝিমঝিম টের পাচ্ছিস?"।

মিষ্টি মাথা ঝিমঝিম টের পায়নি দীপু। একটা বিকট গা-বমি ভাব, গা গুলিয়ে উঠেছিল ওর। বিশ্রী দম বন্ধ করা একটা অনুভুতি।

"মিষ্টি মাথা ঝিমঝিম করছে না বাপ্পাদা, বমি পাচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে", কোন রকমে বলেছিল দীপু।

"আসবে। মিষ্টি মাথা ঝিমঝিম আসবে দীপু। আসবে। ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধর", সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলেছিল বাপ্পাদা।

***

- কেমন লাগছে বাবু?
- মিঠে একটা মাথা ঝিমঝিম। মিঠে। ঝিমঝিম।মাথায়।
- ধ্যাত।
- মাইরি।
- চুমু। তাও গালে। এতে মাথা ঝিমঝিম?
- চুমুর জন্য মাথা ঝিমঝিম কী না জানি না। তবে বাপ্পাদা বলেছিল মিষ্টি মাথা ঝিমঝিম আসবে। ধৈর্য ধরতে।
- বাপ্পাদা বলেছিল? মানে? কবে? কী আবোলতাবোল বলছিস।
- ওর বাড়ির ছাদের ফিস্টিতে। দু'বছর আগে। তিন গেলাস হুইস্কি খাওয়ানোর পরে। বাপ্পাদা বলেছিল, মিঠে ঝিমঝিম আসবে। বাপ্পাদা ওয়াজ রাইট। এসেছে। বাপ্পাদা ক্যান নেভার বি ইনকরেক্ট।
- ক্লাস ইলেভেনে মদ খেয়েছিস বাবু?

কিচির মুখ স্বপ্নের মত নেমে এসেছিল। তবে আর গালে চুমু নয়। ডান কানে একটা বিশ্রী মোচড়ে দীপুর মাথার মিঠে ঝিমঝিম টুক করে গায়েব হয়ে গেছিল। ঠিক যেমন মিনিদির আমেরিকান বরের সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পরদিনই টুক করে উধাও হয়ে গেছিল বাপ্পাদা; তারপর থেকে আর কোন ফিস্টিতে যায়নি দীপু।

Friday, January 29, 2016

দীপক চ্যাটার্জীর বিকেল


বিকেলটা বড় হতে হতে কমলা হলুদে আকাশ ঢেকে ফেলেছিল। হাওয়ায় অল্প ধুলো,  ভিড়ের গন্ধ, মরা শীত আর মিঠে হইহইয়ের ঘুঙুর।

দীপক চ্যাটার্জীর একটা হাফ লিটারের জলের বোতলে চুমুক দিলেন। শীতটা চলেই গেল। বিকেল দানা বাঁধার সাথে সাথে মেলায় লোক বাড়ছে। বইয়ের বড় স্টলগুলোর ধারে কাছে ঘেঁষা মুশকিল হয়ে উঠছে। ঘড়ি দেখলেন দীপক, এই নিয়ে গত তিন মিনিটে অন্তত সতেরোবার। লিটল ম্যাগাজিনের ওদিকে একবার যাওয়া দরকার; কোন ছোট প্রকাশক অমূল্যদার একটা কবিতার বই ছেপেছে। কোন এক টেবিলের কোন এক কোণে সে বই রাখা; কেনা দরকার। কবিতার জন্য নয়, অমূল্য বসুর জন্য। বেনফিশে একবার যাওয়া কর্তব্য। সাতটা নাগাদ সুমনরা আসবে। তার আগে যেটুকু সময়। দীপকের অবশ্য মেলাটেলা ভালো লাগে না, উনি কলেজ স্ট্রিটের ভক্ত। কিন্তু যার ভালো লাগে সে এখনও এলো না। কুন্তলিকা বিরক্ত হয় দীপকের বইমেলার প্রতি অবজ্ঞায়। কুন্তলিকা সেন জোর দিয়ে বলে থাকেন বইমেলার স্নেহ যে আবিষ্কার করেনি সে হয় অলস বা নয়তো সে বইয়ের চরিত্র সম্যক বোঝে না। সে বলে; গাদাগাদা বই পড়লেই বইকে বেশি ভালোবাসা যায় না; যুক্তি দিয়ে সে বলে গান্ধারীর গায়ে কি যশোদার চেয়ে বেশি মা-মা গন্ধ? 

দীপক এ'সব শুনে হাসেন। কিছু বলেন না। কুন্তলিকার জন্যই তার আলস্য ভেঙে বইমেলায় আসা। প্রতি বছর। হলুদ শাড়ির  কুন্তলিকার মধ্যে অবিকল সঞ্জীবের "দশটি কিশোর উপন্যাস সমগ্র" উঁকি মারে - গায়ে ফুল ফুল ছোপ, নরম সঞ্জীবে আবদার জুড়ে থাকা সমস্তটা। মন ভার করা ভালোবাসা নামে ওর গা দিয়ে, ওর গায়ে মিশে যেতে ইচ্ছে করে প্রচ্ছেদে কিশোর মুখের স্কেচটির মত। বইটার শুরুতে সঞ্জীব লিখেছেন "আমার মা-কে"। দীপক জানেন হলুদ শাড়ি সবুজ ব্লাউজের কুন্তলিকাকে নিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে বসে বসে কুইকুই করা যায়। 

কুন্তলিকা সেন বড় হতে হতে দীপক চ্যাটার্জীর আকাশ ঢেকে ফেলেছিল। হাওয়ায় কুন্তলিকার হাসি, ওর ধমকের গন্ধ, মরা ছোটবেলা আর মিঠে ক্রীমের ঝিমঝিমে গন্ধ। 

দীপক চ্যাটার্জীর হাফ লিটারের জলের বোতলে আরেকটা চুমুক দিলেন। এবার ফোন করার সময়।

- এলি না?
- আসার কথা ছিল?
- ছিল না?
- তোর সামনে থাকলে কান মলতাম।
- আচ্ছা।
- তোর কান মলতাম।
- কেন?
- তুই বইমেলায় বই ছেড়ে হাভাতের মত আমার দিকে তাকাতিস বলে।
- ভারি যেন তোর দেখা পাই।
- আমার যেতে ইচ্ছে করছে।
- বাজে কথা।
- সবটাই তো বাজে কথা, না বাবু?
- একা এ মেলা আমার বাজে লাগে রে।
- ছোটবেলা থেকেই লাগত। 
- তোর তো ভালো লাগত!
- তা লাগত।
- তাহলে আয় না।
- কাল আসব।
- আসবি?
- মা কালী। বেগুনী খাওয়াবি?
- আর ফিশ ফ্রাই।
- আমি বইমেলায় ফিশ ফ্রাই খাই না। 
- বড় স্টলে ঢুকব না।
- বেশ। আর তুই হাভাতের মত তাকাবি না?
- তাকাবো না। মা কালী।
- বাবু। আমায় নিয়ে যা। এখুনি।
- সাতটায় সুমনরা আসবে। নয়তো যেতাম।
- যত বাজে কথা।
- আমার ভালো লাগে না কিচ্ছু। এ মেলা কেমন গুমোট।
- আমায় বইমেলায় চুমু খাবি বাবু?
- এবার কে হাভাতে?
- গালে। হালকা চুমু। হাওয়াও টের পাবে না এমন নরম।
- তুই আজকাল বড় অল্পে কেঁদে ফেলিস কিচি।
- তুই বড় মাতব্বর হয়েছিস দীপু। যা ভাগ।

বাজে কথা বড় হতে হতে ঝাপসা চোখ আর কাঁপা গলায় আকাশ ঢেকে ফেলে। বিকেল ছাপিয়ে সন্ধ্যা আসে। আসে কত বছরের ধুলোয় আবছা হয়ে আসা ছেলেবেলা, আসে কত হাজার কিলোমিটারের তফাৎ আর দু'টো গাম্বাট সংসারের ফারাক।

স্নেহ বড় হতে হতে আকাশ সঞ্জীবে ঢেকে ফেলে। একলা-থাকার দল আদরের সুরে আর বইমেলার ঢেউয়ে নরম হয়ে আসে। 

কুন্তলিকা সেন কোনদিন বইমেলায় আসবেন না। বইমেলা ছাড়বেন না দীপক চ্যাটার্জি। একা সঞ্জীব নিরিবিলিতে সমস্ত ব্যথার গল্প হাসির কালিতে নোটবইতে লিখে রাখবেন। সেটুকুই ভরসা।

Thursday, January 28, 2016

অনুভব দাসগুপ্তর স্বপ্ন

- ডাক্তারবাবু, একটা ছোট ব্যাপার। 
- হ্যাঁ বলুন। 
- না বলছিলাম। আপনার সেক্রেটারি স্লিপে আমার নাম লিখেছে অনুভব দাসগুপ্ত। 
- আপনি তো অনুভব দাসগুপ্তই অনুভববাবু। 
- না মানে, একটা স্পেস আছে। দাস আর গুপ্তের মাঝে। দাস স্পেস গুপ্ত আর দাসগুপ্ত টেকনিক্যালি ঠিক এক বলা যায় না...। 
- আচ্ছা পিয়াকে বলে দেব পরের বার ঠিক করে লিখতে। 
- না মানে। এবারে ঠিক করা যায় না?
- এটা তো মিনিংলেস্‌ একটা স্লিপ...। এইত্তো। আপনি চলে গেলে এটা ফেলে দেওয়া হবে। 
- তবু। ডাস্টবিনে সামান্য ভুল পড়ে থাকার চেয়ে না হয় ঠিক কিছু পড়ে থাকবে। 
- অ। এই যে। এই নিন স্লিপ। ঠিক করে নিন। 
-  কেটে ঠিক করব?
- অবভিয়াসলি। 
- বলছিলাম ডাক্তারবাবু, আপনার পেনটা কি কালো কালির? 
- কেন?
- না মানে, আমার পেনটা নীল। আর আপনার সেক্রেটারি কালো কালিতে এই স্লিপে লিখেছিলেন। 
- এই যে কালো পেন। 
- থ্যাংকস। এই নিন। স্লিপটা ঠিক করে দিয়েছি। 
- আর ইউ অ্যাট ইজ্‌ নাউ মিস্টার দাস স্পেস গুপ্তা?
- ইজ্‌? ইজেই তো নেই। সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা। 
- রাইট। ঠিক। বেশ। বলুন তাহলে। শুরু থেকে বলুন। অসুবিধেটা কী, কেন আপনি ট্রাব্‌লড হচ্ছেন। মন খুলে বলুন। উই হ্যাভ অল দ্য টাইম দাসগুপ্তবাবু। 
- আসলে ব্যাপারটা একটু জটিল। 
- সেটা আমায় ঠিক করতে দিন। 
- আচ্ছা বেশ। 
- বলুন। 
- শুরু থেকে বলব?
- শুরু থেকে। 
- শুরুটা গত পরশু সকাল থেকে। 
- পরশু সকাল?
- হ্যাঁ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই। 
- কীরকম প্রবলেম ফিল করতে পারলেন ?
- ফিল করতে পারলাম মানে। ঘুম ভাঙল বটে। কিন্তু আড়মোড়া ভাঙার সময় স্পষ্ট মনে হল ঘুমটা ভাঙেনি। 
- ঘুম ভাঙার পর মনে হল ঘুম ভাঙেনি?
- এগজ্যাক্টলি। 
- কেন এটা মনে হল? 
- বেড শিটটা দেখে প্রথম সন্দেহ হল। 
- কীরকম?
- লখনৌ থেকে চিকন কাজের বেডশিট কিনেছিলাম এইট নাইনে। শৌখিন চাদর কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারিনি। নষ্ট হয়ে গেছিল। কিন্তু পরশু উঠে দেখলাম সেই চাদর পাতা, যেন দু'দিন আগে কেনা। চেকনাইটাই আলাদা। 
- ইন্টারেস্টিং। 
- তারপর ধরুন খানিক পরেই সুতপা চা নিয়ে এলো। 
- সুতপা?
- আমার মিসেস্‌। ইয়ে, এক্স মিসেস্‌। নাইনটি ওয়ানে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্স দেয়। 
- ডিভোর্স দেওয়া বৌ আপনার ঘুম ভাঙার পর চা নিয়ে ঘরে ঢুকলে?
- এগজ্যাক্টলি। এমন ভাবে যেন কিস্যুটি হয়নি। 
- এক্সট্রিমলি ইন্টারেস্টিং। উনি চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন এমন ভাবে যেন আপনাদের সেপারেশন হয়নি। যেন আপনারা এক সাথেই আছেন, তাই তো?
- কারেক্ট।  
- তারপর?
- বাপ্পা। 
- বাপ্পা? সে'টা কে?
- একটা বারো বছরের ছেলে। 
- আপনার ছেলে?
- সে তো সে ক্লেমই করছে। সুতপাও অবভিয়াসলি তাল দিচ্ছে। 
- কিন্তু আপনার ধারণা সে আপনার ছেলে নয়। তাই তো?
- সুতপার সাথে সেপারেশনের আগে আমাদের কোন ইস্যুই হয়নি। তো পরশু থেকে সেই উড়ে এসে জুড়ে বসা চিজ আমায় কন্সট্যান্ট বলে চলেছে 'বাবা বইমেলা নিয়ে চলো, বইমেলা নিয়ে চলো'। বুঝুন ঠ্যালা। 
- সাঙ্ঘাতিক। তা, স্বপ্নের সিম্পটম আর কী কী দেখছেন?  
- মা। 
- আপনার?
- অবভিয়াসলি। 
- তা উনি কী...। 
- দিব্যি আমার সামনে ঘুরঘুর করছে। পাটিসাপটা অফার করছে। অথচ নাইনটি ফোরে নিজের হাতে নিমতলায় পুড়িয়ে এসেছি মাকে। 
- ওহ্‌। টেরিব্‌ল ব্যাপার। 
- টেরিব্‌ল বলে টেরিব্‌ল ডাক্তারবাবু? মায়ের স্নেহটেহ এক জিনিষ। কিন্তু ভূত ইজ ভূত। ডিফারেন্ট লেভেলের ব্যাপার তো। 
- ঘটনা। তা, আর কোন সিম্পটম?
- আছে। 
- যেমন?
- কলকাতা। 
- কলকাতা?
- মা মারা যাওয়ার পরের বছরই তো আমি কটিহারে চলে গেলাম। তখন থেকে তো সেখানেই। এক কামরার ভাড়া বাড়ি আর এক দেহাতি চাকর। দ্যাট ইজ অল। অথচ দেখুন। ঘুম ভেঙ্গে উঠলাম কলকাতায়। আপনার চেম্বারে এলাম, সেটা আমহার্স্ট স্ট্রিটে। 
- সাঙ্ঘাতিক। আর কোনও সিম্পটম আছে?
- পিয়া। আপনি। 
- সে কী। কী রকম?
- পিয়া, মানে আপনার সেক্রেটারির চেহারা অবিকল মিতার মত। 
- মিতাটা আবার কে?
- আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমার একটু ব্যথা ছিল। ম্যাটেরিয়ালাইজ করেনি। 
- আচ্ছা। তাহলে আপনি বলছেন নতুন আলাপের চেহারাগুলোও আপনার চেনা চেহারা ধার করে তৈরি হচ্ছে। 
- ক্লিয়ারলি। 
- আর আমায় কার মত দেখতে লাগছে?
- আপনার মুখটাও স্বাভাবিক ভাবেই বেশ চেনা লাগছে। তবে ঠিক ধরতে পারছি না বুঝলেন। পাড়াতেই কোথাও দেখেছি। সে মনে পড়ে যাবে। তবে অত্যন্ত চেনা চেহারা।  
- হুম। তাহলে গোটাটাই যখন স্বপ্ন, তখন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এলেন কেন দাসগুপ্তবাবু?
- দু'দিন অপেক্ষা করলাম স্বপ্ন ভাঙার। কিস্যুতে কিস্যু হল না। মায়ের শুচিবাইয়ের বাতিকে জান কয়লা করে দিচ্ছে। সুতপার হাজার বাই। আর বাপ্পা নামের ইম্পস্টারটাকে গতকাল বইমেলা নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি। 
- কিন্তু আমিও যদি আপনার স্বপ্নে থাকি, তাহলে আপনার কী উপকার আমি করতে পারব মিস্টার দাসগুপ্ত?
- না মানে। সব কিছু সত্ত্বেও যদি ব্যামো আমারই হয়ে থাকে? ওয়ান পার্সেন্ট চান্স। তবু। তাই ভাবলাম...আর কী।  

***ছ'মাস পরে***

- নমস্কার মিস্টার দাসগুপ্ত।
- নমস্কার প্রেসিডেন্ট স্যার। বড় বিড়ম্বনা হয়ে যাচ্ছে। আমায় এমন আটকে রাখার মানে কী?
- মানেটা সহজ। ভীষণ সহজ। একটা গোটা দুনিয়া আপনার স্বপ্নে গড়ে উঠেছে। সে দুনিয়ায় অর্থনীতি, বিজ্ঞান সমস্তই আছে। আমার মত রাষ্ট্রনেতারা আছে। কিন্তু আপনার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে দুনিয়াটা ভেসে যাবে। আমরা কেউই থাকব না। শহর, গ্রাম, জিডিপি সমস্ত মিথ্যে হয়ে যাবে। 
- তাই বলে আমায় বেঁধে রাখা?
- আপনার স্বপ্নকে ভাঙতে না দেওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। চলি...।
- প্রেসিডেন্ট সাহেব...! 

***

- কী গো! অমন ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেঙ্গে উঠলে কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?
- হ্যাঁ মানে...। 
- এত ঘামছ কেন! উরিব্বাবা! কী অবস্থা। কী স্বপ্ন দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম...স্বপ্নে দেখলাম...। 
- কী দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম আমি ডাক্তারের কাছে গেছি। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। 
- নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট হয়ে তুমি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেছ?
- অন্য নয়। অন্য নয়। আমি নিজে নিজেরই কাছে পেশেন্ট হয়ে গেছি। 
- কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড। কেন গেছিলে...?
- এ কী! এ কী সুতপা!
- কী হল? কী হয়েছে?
- সুতপা! এই চিকনের বেডশিটটা আবার কোত্থেকে এলো? এটা তো নষ্ট হয়ে গেছিল অনেক বছর আগেই! এটা এখানে এলো কী করে?
- তোমার হয়েছেটা কী বল তো? গত হপ্তাতেই তুমি লখনৌ থেকে এই চাদর কিনে নিয়ে এলে! কী যে বলছ। যাক ভোর হয়েছে। আমি বরং তোমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি। আর শোন, আগামীকাল কিন্তু তোমায় বাপ্পাকে একবার বইমেলা থেকে ঘুরিয়ে আনতেই হবে। ছেলেটা বড্ড আবদার করছে। কেমন?  

...ভূত তো নয়

এত ওপর থেকে বাইনোকুলারে চোখ রেখেও কেঁপে উঠতে হয়।

ওই যে। এক্কেবারে নিচে। দৈত্যটা একটা মাদুর পেতে শুয়ে। এতটা নিচে যে তাকাতেই পেটের ভিতরটা কেমন গুলিয়ে আসে। কিন্তু উপায় নেই। দৈত্যটার কাছে পৌঁছতেই হবে।

এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে মনটাকে গুছিয়ে নিলাম। ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া গতি নেই। সাবধানে নামতে হবে দৈত্যটার পাশে। এমন ভাবে নামতে হবে যাতে খুব একটা চোট না লাগে। এত উপর থেকে ঝাঁপানো, চাট্টিখানি কথা?

এমনটা তো নয় যে আমার পিঠে প্যারাশুট বাঁধা, ঝাঁপ দেবো আর টপাৎ করে তা খুলে যাবে আমি পালকের মত ভাসতে ভাসতে নেমে আসব। এ এক্কেবারে ডাইরেক্ট ঝাঁপ, শোঁশোঁ করে নেমে আসা আর তারপর দুম ধপাৎ।
কিন্তু উপায় নেই। নেই উপায়।

জয় মা বলে দিলাম ঝাঁপ।

আহহ। ছড়েছে অল্পবিস্তর। পিঠে কিছুটা মোচড়। তবে আহামরি নয়। টিকে যাব। সোজা গিয়ে ঠেলা দিলাম দৈত্যটাকে।

- "ভায়া শুনছেন?", নরম করে ডাকলাম।
- "আ...আ...", অমন দশাসই চেহারা নিয়ে কেউ অমন করে ঘাবড়ে যাবে ভাবিনি।
- "আ আ কী করছেন"।
- "বই...বই..."।
- "আহ! বইই তো। ভূত তো নয়", অভয় দিতেই হল।
- "বই কথা..কথা বলছে..."।
- "বই বই আবার কী? আমার একটা নাম আছে তো। শিব্রাম সমগ্র। শিবসম বলেও ডাকতে পারেন। যে জন্য
এত ঝামেলা করে আসা। বলি গত বই মেলায় দিব্যি আমায় নিয়ে বাড়ি এসে সেই যে ওপরের তাকে চালান করলেন, তারপর তো একবারের জন্যও উলটে দেখলেন না। আমার আত্মায় যে জং ধরছে। ভিতরটা শুকিয়ে আসছে। আবার আর এক পিস বই মেলা এসে গেছে। আরও দেখনাই কেতা মেরে বেওয়ারিশ কেতাব খরিদ করে তাক বোঝাই করবেন আর পড়বেন না, সে'টি হচ্ছে না। হয় আমায় পড়ুন, নয়তো ছাড়ছি না। ও মশাই, অজ্ঞান হলেন নাকি? ও মশাই?

চশমার খোঁজ

চশমাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড় মুশকিল হল। পড়ার টেবিল থেকে বাথরুমের তাক থেকে মাথার উপর, খুঁজতে কসুর করিনি। কিন্তু কোথাও নেই। ভুলুকে জিজ্ঞেস করলাম যদি সে চশমা কমোডের ভিতরে রেখে এসে থাকে, সে বোধ হয় ল্যাজ নেড়ে জানালে তেমন কিছু ঘটেনি।

শ্রীতমার মোবাইলে ফোন করলাম। খেইমেই করে উঠলে। বারো বছর আগে দূরে গেছে বলে এখনকার চশমার খবর রাখবে না? এ কি মনুপ্রণীত বিধান? মহামুশকিল।

সিগারেট জ্বালবার চেষ্টা করলাম। বুঝলাম চশমা চোখে না থাকলে সিগারেটের স্বাদ পালটে যায় আর ফিল্টারের মাথায় দেশলাই লাগানোর কোনও মানে হয় না।

চশমা আর কোথায় থাকতে পারে? কী মনে হওয়ায় চট করে একটু ফ্রীজের ভিতর হাতড়ে দেখে এলাম। নেই। আর ফ্রীজে মেয়োনিজের বদলে ময়শ্চারাইজিং ক্রীম রয়েছে। সেটা এক প্রকার অনভিপ্রেত ভাবে জানলাম। জিভের তো চশমা লাগে না।ফিরে এসে ড্রেসিংটেবিল থেকে ময়শ্চারাইজিং ক্রীমের ডিবেটা তুলে আবর্জনার বাক্সে ফেলে দিলাম। চিন্তা বাড়ছে। 

এখনও বিকেলের মরা আলো রয়েছে। অবশ্য ভেবে দেখলে টিউবলাইটও রয়েছে। কীসের ভাবনা? আলো কম বলেই হয়তো নজরে পড়ছে না। লাফ দিয়ে উঠে টিউবলাইটের স্যুইচ দিলাম। বনবনে ফ্যানে ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করল। ফিরে গিয়ে স্যুইচ বন্ধ করলাম। টিভিটা বন্ধ হয়ে গিয়ে একপ্রকার নিশ্চিন্দি। শুধু খুন রাহাজানি আর স্ক্যান্ড্যাল।

মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে। দিনটা রিওয়াইন্ড করতে হবে। চশমাটা গেল কোথায়? দয়াল চলে আসায় সুবিধে হল। দয়ালকে বললাম চট করে এক কাপ লিকার চশমা বানিয়ে আনতে আর চা খুঁজে দেখতে। দয়ালটা আবার দিনদিন বখে যাচ্ছে বা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে বা দু'টোই। সে ইশারায় যা জানালে তার মানে হয় যে আমার চশমার নেশা বা চোখে চা কোনটাই নেই। এসবই নাকী আমার মনগড়া। বোঝ। লে হালুয়া। দয়াল "ঘরের যা অবস্থা করে রেখেছ, সাফ না করলেই নয়" বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিলে কিন্তু খপাৎ করে তার আঁচল কামড়ে হ্যাঁচকা টানে নিজের কাছে ডাকলাম।

তক্ষুনি মাথায় এলো; দয়াল তো পাজামা আর ফতুয়া পরা মানুষ। তাঁতের আঁচল এলো কোথা থেকে?
শ্রীতমার কোঁচকানো ভুরু সহসা নরম হয়ে এলো।
"এমন ছটফট কর কেন বুড়ো? কত চিন্তা আমার তোমায় নিয়ে", শ্রীতমার গলায় শিউলির কারখানা আছে। আমার পার্সোনাল থিওরি।

আর একটা বিশেষ ব্যাপার আছে শ্রীতমার কণ্ঠস্বর আর ওর গায়ের গন্ধে। চোখের ঘোলাটে ভাবটা কেটে গেল বিলকুল। রোজ যেমন যায়। মনের শ্যাওলাও ডেটলে ফিনাইলে সাফ হয়ে যায়। দয়ালের বারো বছর আগের চলে যাওয়া স্পষ্ট মনে পড়ে। বড় ভালোবাসার মানুষ ছিল, কোলেপিঠে বড় তো ওই করেছে। শ্রীতমাকেও বড় আদরের সাথে সামাল দিয়ে রাখত। বারো বছর আগে ওর বেমক্কা চলে যাওয়া; উফ। ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, চোখ চিকচিক করে, বুক চিনচিন করে।

চট করে একবার দয়ালের ছবির সামনে গিয়ে কুঁইকুঁই করে স্বীকার করে এলাম যে চশমা হারানোর অভ্যাস আদতে তার, আমার নয়। আর লেজ নাড়ার ডিপার্টমেন্টটা আমার। এবং আমি থাকতে তার ছবির ফ্রেমের নাম ভুলু হবে কেন? সে ছবির ফ্রেমকে ভুলু বলে ডেকেছি বলে লেজ নেড়ে, ঘেউ সুরে একটা অথেনটিক "সরি"ও বলে ফেললাম।

মই বেলা



- বইমেলা ইজ দ্য ফাইনেস্ট টাইম অফ দ্য ইয়ার।
- অবশ্যই। অবশ্যই। বইমেলার মেজাজটাই আলাদা। পড়ন্ত বিকেলে নাক-মন জুড়ে নতুন বই মেশানো গন্ধ। জমজমাট আড্ডা আর ফিশফ্রাই। স্বর্গ এখানেই। এখানেই। এখানেই।
- না না। সে'জন্য বলছি না।
- তবে? বইমেলায় প্রেম? হ্যাঁ সেটাও একটা...।
- না বস। সে'সবের জন্য না।
- ওহ। লিট্‌ল ম্যাগাজিন। কবিতা নিয়ে আড্ডা।
- না না। সেস'ব ব্যাপার নয়।
- দেন হাউ ইজ বইমেলা দ্য ফাইনেস্ট টাইম অফ দ্য ইয়ার?
- কারণ এই সময়টা কলেজ স্ট্রিটের বেফালতু ভিড়টা একটু কমে। রিয়েল প্লেজ্যান্ট অ্যাফেয়ার।

মদন মিহির

বিড়িটা নিভিয়ে পকেটে রাখলেন মদন। আরও দু'টান দেওয়া যাবে। তবে এখন সময় নেই।
মিহির দত্ত পান চিবুতে চিবুতে বেরোলেন এইমাত্র; রাতের খাওয়ার শেষে হাঁটতে বেরোনোর অভ্যেস তার পুরোনো।
আজ এক মুহূর্তের জন্যেও চোখের আড়াল করা যাবে না মিহিরবাবুকে। মধু মল্লিক লেন পেরিয়ে সর্দার স্ট্রিটের অন্য প্রান্তে বিনোদের পানের দোকান। সেখান থেকে একটা গোল্ডফ্লেক নিয়ে বিনোদের সাথে সামান্য গুলতানি চলে তার। তারপর হেঁটে ফেরা। মদনের মুখস্ত।
বিনোদের দোকান থেকে বেরিয়ে ধিমে গতিতে ফিরতি হাঁটা শুরু করেন মিহির দত্ত। রোজকার মত। পিছু পিছু মদন, বেড়ালের মত।
মিহিরবাবু অনুভব করতে পারেন; সময় হয়ে এসেছে। সে এসেছে। নাড়ির টান। যাবে কোথায়?
**
সুমিতার চিন্তা কমে না। স্বামী মিহিরবাবুকে যমের মত ভয় পান তিনি, তাকে প্রশ্নটা করা যায় না। আবার অন্য কাউকে শুধোলেও কী না কী ভেবে বসবে। অথচ সুমিতা নিশ্চিত। একদম নিশ্চিত। মিহিরবাবু গোপনে মন্ত্রপূত বিড়ি খান। আগেই সন্দেহ হত, কিন্তু এখন নিশ্চিত। গোল্ডফ্লেক সিগারেট খাওয়া মিহিরবাবুর বহুদিনের অভ্যেস। অথচ প্রত্যেক ছ'সাত হপ্তা অন্তর তার পকেট থেকে আধ খাওয়া বিড়ির টুকরো আবিষ্কার করেন সুমিতা। গত ছয় সাত বছর ধরে এমনটাই চলছে। আর এ বিড়ি যে মন্ত্রপূত তা বেশ জানেন সুমিতা, এ বিড়ি যেদিন ফোঁকেন সেদিন থেকেই মিহিরবাবুর বারো চোদ্দ বছর পুরোনো বাতের ব্যথাটা গায়েব হয়ে যায়। কিছু হপ্তা পর অবিশ্যি সে ব্যথা ফেরতও আসে, থাকে আরও কিছু হপ্তা। তবে মন্ত্রপূত বিড়ি হয়তো সহজে মেলে না, তাই আবার কিছুদিন সে ব্যথা সহ্যও করতে হয় মিহিরবাবুকে।
সুমিতা এ'সব আন্দাজ করেন মাত্র। তবে মিহিরবাবুকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস তার নেই। যা বিটকেল মেজাজ।
**
তখন থেকে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। ব্যাটা হাঁটতে বেরোতে আজ এত দেরি করছে কেন? যত্তসব। এদিকে বাতের ব্যথাটা না থাকলে নিজের নামটাও গুলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ব্যাটা বসতে পেয়ে এখন শুতে চায়। একরাশ বিরক্তি গোল্ডফ্লেকের ধুঁয়োর উড়িয়ে দিলেন মিহির দত্ত।

Tuesday, January 26, 2016

শিঙ্গাড়া পায়েস

রাতের গঙ্গার একটা থমথমে ভূতভূত ব্যাপার আছে। স্ট্র্যান্ড ঘাটে অন্ধকার স্তূপ হয়ে পড়ে আছে। রাস্তার বাতিগুলো নিভে গেছে। 

রাস্তা, ফুটপাথ, ঘাটের বেঞ্চিগুলো কালোয় মিশে গেছে। গঙ্গার রং ম্যাটম্যাটে কালো। খান তিনেক নৌকা ঘাটে লাগানো, তার একটার বুকে হ্যারিকেন; অন্ধকারের মেজাজে সামান্য আবছা হলুদ মিশিয়ে দিচ্ছে। 

ঠাণ্ডায় কামড় রয়েছে। জানুয়ারির রাত বলে কথা। সোয়েটারের ওপরের কান মাথা মোড়ানো শাল। অন্ধকার হাতড়ে একটা বেঞ্চি খুঁজে বসলে অর্ধেন্দু। শিশিরে ভেজা বেঞ্চির কাঠ। ছ্যাঁত লাগে। একটা সিগারেট ধরিয়ে মিহি সুরে গান ধরতে হল। 

" দিন ঢল যায়ে হায়, রাত না যায়ে; তু তো না আয়ে তেরি ইয়াদ সতায়ে"।

দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে যাবে এমন সময় কাঁধে হাতের চাপ টের পেলে অর্ধেন্দু। পৃথা এসেছে। 

- এত দেরী হল? 
- কোথায় দেরী! দেড়টায় আসার কথা ছিল তো। এখন সবে একটা তেত্রিশ।
- বস।
- হাত ধরে টানাটানি করবি না। 
- কবে করেছি?
- আজ যদি করিস?
- আজ কেন করব?
-  এত রাত। আমি একা মেয়ে। 
- ধুস। বস। 
- এনেছিস?
- ইয়ে লো। তুই এনেছিস?
- ইয়ে লো।

মুচুর মুচুর খানিকক্ষণ খাওয়াদাওয়া চলল। অর্ধেন্দু হাপুস হুপুস করে গুড়ের পায়েস খেলে। পৃথা খেলে নিউ মোদক স্যুইট্‌সের ফুলকপির শিঙ্গাড়া। 

- এত রাত্রে শিঙাড়া খেলি। অ্যাসিড করবে। 
- থাম। জ্ঞান দিস না। 
- কাল আবার তোর ভোরে ওঠা। দই চিড়ে ফিড়ে খেতে হবে।
- তোর বাবার কী?
- নিউ মোদকের শিঙ্গাড়ায় কী এমন চিজ আছে?
- টালিগঞ্জে কোথাও পাব বল?
- বাবু। 
- হুঁ। 
- ওপারে জগদ্দল। 
- তো? 
- জগদ্দলে জুট মিল। 
- তো?
- তুই না গ্র্যাজুয়েট? চাকরী জুটিয়ে নিতে পারবি না?
- তারপর?
- সেখানের দেহাতি বস্তিতে আমরা থাকব। 
- তারপর?
- সব কথায় তারপর আনিস কেন। অখাদ্য তুই। 
- মিল বন্ধ আছে না?
- সব কথায় লজিক আনিস কেন?
- লজিক আনব না?
- আনবি না। ঐ নৌকাটাকে কুড়িটা টাকা দিলে আমাদের ওপারে ছেড়ে আসবে। 
- এত রাত্রে গঙ্গা পেরোব রে?
- সাধে বলি ন্যাকা ভূত। এত রাত্রে ঘাটের ধারে আসতে ভয় লাগল না। সেই ফটোকগোরা থেকে দুমদাম চলে এলি। সে বেলা ভয় লাগল না?
- ওপারে গিয়ে করবটা কী?
- ওই যে। তুই জুট মিলে চাকরী নিবি। দেহাতি পাড়ায় একটা টিনের চালার ঘর নেব আমরা। 
- আমি হ্যাঁ বললে যেন তুই আমার সাথে পালাতিস? তুই পিএইচ ডি। আমি গ্র্যাজুয়েশন প্লাস টিউশানি থেকে টু পাইস। 
- তুই অখাদ্য। তোর যেন কোনদিন মেয়ে না জোটে। 
- যাস না রে।
- ধরে রাখ। ওপারে চ। জুট মিলে চাকরী নে। 
- যাস না। 
- ওপারে চ। 
- ধুস। 
- তুই একটা অখাদ্য। বললাম না হাত ধরবি না। এক চড় মারব। 
- হুঁ। 
- বাবু। তুই কাঁদছিস? এই তুই বীরপুরুষ!
- সরি। 
- অখাদ্য। 
- হুঁ। 
- এবারে যেতে হবে।
- যাবি?
- হুঁ। 
- শোন। আমি কিন্তু তোর হাত ধরতে পারি। 
- নাহ! পারিস না। 
- পারি। 
- জোর করলে থাপ্পড় খাবি বাবু। 
- ইন ফ্যাক্ট। তুই থাপ্পড়ও মারতে পারবি। 
- কী সব বলছিস বাবু। 
- ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাব। পা না পাওয়ার গভীরে যেতে দেরী লাগবে না। কিন্তু বুকের ভিতরটা ফেটে অজ্ঞান হওয়ার আগে নিচে তোর সঙ্গে ধাক্কা লাগবে। এই, তখন সোয়া দু'টো হবে!  ততক্ষণে তুই অবিশ্যি এক্কেবারে কাদা। 
- বাবু!
- লজিক। ডিডাকশন। কত কিছু মিলিয়ে দেয়। তাই না?
- চুমু খাবি বাবু? 
- খইয়ের স্বাদ মেয়ানো লাগলে? 

Monday, January 25, 2016

সায়ামিজ ট্যুইন

- কাল ফিজিক্স প্র‍্যাক্টিক্যাল। বেসিকস ঝালিয়ে নেওয়া দরকার। এই বেলা।
- অবশ্যই। তবে কিচি ফোন করেনি। ফোন ধরেনি। 
- সামন্তবাবু রাগ পুষে রেখেছেন। ইন্টার স্কুল সেমিফাইনালে তোমার অকারণ লাল কার্ড দেখাটা উনি মাফ করেননি। কোচ হিসেবে সেটা স্বাভাবিক। আর ফিজিক্সের মাস্টার হিসেবে কাল তোমায় রগড়াবেন সেটাও স্বাভাবিক। পড়তে বসো চাঁদু।
- হ্যাঁ। সামন্তবাবু কাল অন ফায়ার থাকবেন। এ বেলা পড়তে বসাটা দরকারি। কিন্তু কিচি চিরকুটও পেয়েছি কিনা বোঝা যাচ্ছে না।
- ফিজিক্সে ধ্যারালে সামন্তবাবু আর কিচি দু'জনে চাবকাবে। ফিগারেটিভলি।
- অতিশয় চিন্তার ব্যাপার। এই বেলা বই খোলা উচিত। কিন্তু কিচি গতকাল বিকেলে কাটকাট উত্তর দিয়েছে।
- ফাইন্যালে নম্বর যোগ হবে বস। আর ফিজিক্সে ফোঁটা ফোঁটা নম্বর সোনা গলানো জল।
- হ্যাঁ। ক্রিটিকাল। ক্রিটিকাল। ঝপাৎ করে নোটগুলো রিভাইজ করা দরকার। কিন্তু কিচিদের ল্যান্ডলাইনেও শুধু কাকু ফোন ধরছেন। যদিও কিচি জানে এ সময় একমাত্র কল করনেওলা বান্দা কে।
- ফিজিক্স। বস। ফিজিক্স।
- অফ কোর্স। কিন্তু। বস। কিচি ফোন ধরছে না। নতুন অঙ্কের মাস্টার রেখেছে কিচির মা।
- সো?
- সো কিছু না। মানে ইঞ্জিনিয়ারিং থার্ড ইয়ার। পড়ার কত চাপ। তার অঙ্ক টিউশন পড়িয়ে কাজ কী?
- ছিঃ।
- না মানে....।
- ছিঃ ছিঃ।
- না মানে...।
- রাইট ব্রেন। তুমি একটা শুয়ার।
- তেমন ভাবে বলতে চাইনি...।
- যা বলার বলে ফেলেছ। হারামি!
- এ কী ভাষা ভাই লেফট ব্রেন!
- থামো! ভাষা শিখিও না। পেটে লাথি মেরে ফুটবল ম্যাচে রেড কার্ড দেখা কার জন্যে? তুমি ভাষা নিয়ে জ্ঞান ঝেড়ো না।
- ভাইটি। প্লীজ।
- কিচির অঙ্কের মাস্টার টেনে কথা?
- তা নয়।
- আলবাত তাই। সায়ামিজ ট্যুইন না হলে তোমার পেটে লাথি মেরে এখন লাল কার্ড দেখতাম।
- কাল ফিজিক্স লেফট ব্রেন। কাল ফিজিক্স।
- কথা ঘোরানো? কিচি ফোন ধরছে না।
- ইউ গেট দ্য পয়েন্ট।
- আই গেট দ্য পয়েন্ট।

দমাস করে ফিজিক্সের নোটের খাতা বন্ধ করে হুড়মুড় করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লে দীপু। কিচির বাবা বোধ হয় এককালে ফিজিক্স টিউশন পড়াতেন।

সুর

জানালা খুলতেই হুহু বেগে হাড়কাঁপানো দমকা হাওয়া এসে নড়িয়ে দিল সুলেমানকে।

সর্দি লাগলে কুছ পরোয়া নেই। কিন্তু এমন কনকনে হাওয়ার ঝাপটাই আজ মন কেমন করে দিচ্ছে। কাঁপাচ্ছে কাঁপাক। খালি গা, তার ওপর বাতাসে আলতো বরফ কুচি উড়ছে। ভেবে নাও সুলেমানের কেমনটি লাগছে। তবু সুলেমান জানালা বন্ধ করলে না। এ দুনিয়ার বরফ বাওয়া হাওয়া; এমন মন ভাসানো হাওয়া আর তো জুটবে না। কাল ফাঁসি।

কোমরে আর পায়ের লোহার শিকল কনকনে ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। কুছ পরোয়া নহি। হাওয়াটুকু আসুক।

হাওয়া। মায়ের গন্ধ মাখা হাওয়া। বাবার নিজের হাতে ভুট্টা ফলানো আদরে চষা রুক্ষ মাটি ছোঁয়া হাওয়া। রাবেয়ার নীল স্কার্ফে আঙুল বোলানো হাওয়া। কদ্দিন এই অন্ধকার ঘরে আটকে সুলেমান। কতদিন। কতদিন। সেই আট বছর বয়স থেকে। "রাজরানী কী বাজে সুরে গান গায় গো" বলে ফেলেছিলে সে। সে কথা শুনেছিলেন বিদূষক। বিদূষক জানান মন্ত্রীকে। মন্ত্রী জানান মহামন্ত্রীকে। মহামন্ত্রী রাজার কানে দেন সে খবর। রাজা পেয়াদা তলব করে ফাটকে পোরেন আট বছরের সুলেমানকে।

"হারামজাদা বলে কী না রানীর গলায় সুর নেই!", কান থেকে তুলোর টুকরো বার করতে করতে বলেন রাজা, "বেওকুফ! কুত্তার অউলাদ! ওকে এমন জায়গায় আটক কর যেখানে কোন মানুষের কণ্ঠস্বর যেন ওর কানে না পৌঁছয়। ও ব্যাটার কান অভিশপ্ত"।

মা কী কান্নাটাই না কাঁদলেন। বাবা পেয়াদার হাতে পায়ে ধরতে গিয়ে মারধোর খেয়ে হাড়গোড় ভাঙলেন। সে কথা ভেবে আজ কিছুটা হাসি পায় পঁচিশ বছরের সুলেমানের। আর হয় অনেকটা কষ্ট। আহা! মায়ের হাতের রুটি আর কলাই সেদ্ধর কী সোয়াদ গো! আজও মনে আছে। আজও।

***
- সুলেমান।
- আজ্ঞে।
- ফরিস্তার ফরমান এসেছে তোমার জন্য।
- ফরিস্তা?
- আমাদের রাজা। দয়ার সাগর। করুণাময় পরমেশ্বর। তিনি তোমার গুস্তাখি মাফ করতে রাজী হয়েছেন। পিতা মাতার কাছে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।
- কী বলছেন কোতয়াল সাহেব? সত্যি? ফাঁসি হবে না।
- হবে না। যদি...।
- যদি?
- যদি তুমি স্বীকার কর যে রানীমার কণ্ঠে দেবতার বাস। তার গাওয়া গানই বেহেস্তের সঙ্গীত।
- সতেরো বছরের শব্দহীনতায় কান তো আরও পেকেছে কোতোয়াল সাহেব। নষ্ট হয়নি। আর মৃত্যুর মধ্যে রোজ বাস করেছি। তাহলে বাজে গান কে বাজে গান বলতে আজ আটকাবে কেন?
- তোমায় কুড়ুলের সাত কোপে খুন করে নদীতে ভাসানো হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

***

সুলেমানের সাত নম্বর আর শেষ আর্তনাদটা কানে ভেসে আসতেই নড়েচড়ে বসলেন ঈশ্বর।

"এ কী শুনলাম আমি? এ কী হল! এ কী হল! এত দিন যা জেনেছি সব মিথ্যে। ভুল।
মানুষের পো কী না আমায় সুর শিখিয়ে গেল? যন্ত্রণাছাড়া সুর বাঁধা যাবে না, এমনটা তো আগে ভেবে দেখিনি। নাহ, সঙ্গীতবোধ কে নতুন করে আয়ত্ত করে তারপর দুনিয়াদারির সঙ্গে তাকে বাঁধতে হবে দেখছি"।

ঈশ্বরের চোখে তখন বেহেস্ত ভাসানো অশ্রু আর কণ্ঠে সুলেমানের পুঁতে দেওয়া সরগম।

Sunday, January 24, 2016

অনেকদিন পর

- ওই তারাটা কী?
- নীলচে ওইটে?
- হুঁ।
- ওটা তারা নয়। গ্রহ।
- ওহ। ওটাকে তারা ভেবে গান লিখে ফেললাম গো দাদা।
- পছন্দ?
- কী?
- গ্রহটা পছন্দ? যাবি?
- যাওয়া যায়?
- প্রাণ আছে তো সেখানে।
- তাই নাকি?
- তুই বড় ভুলো বোধি। কতবার তুই ঘুরে এসেছিস ওখান থেকে।
- ওহ। তাই বুঝি এই টানটা অনুভব হচ্ছে?
- একদম। যাবি আবার ওখানে?
- কাল গোটা রাত ও'দিকে তাকিয়েই কেটে গেল। ইচ্ছে হচ্ছে। পাঠিয়ে দাও।
- যদি বিরক্তি আসে?
- আসুক। ক'দিন তবু বেঁচে আসি।
- বেশ। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। তা হ্যাঁ রে বোধি, গানটা কী লিখলি বললি না...?
- গেয়ে শোনাই?
- হোক।
- সারারাত জ্বলেছে নিবিড়....।

-জয়েনিং ডে'তে রেসিগনেশন? আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড ইয়ংম্যান?

-ফোন ধরে যে বেলা নয়; বেলার মা দাঁড়িয়ে ছিলেন চুপচাপ, সেটা ঠাহর করতে পারিনি।

- মানে?

- মানে বুঝে কাজ নেই স্যার। এক কপি রিসিভ করে দিয়ে দিন। আজ রাতের ট্রেনে দেওঘর যাচ্ছি। পার্মানেন্টলি।

খুকুর ভয়

- এই যে আমি ভূত, আমায় ভয় লাগে না?
- ভয় কেন লাগবে?
- আমি ভূত বলে।
- তাতে আমার কী?
- তুমি বাচ্চা। তোমার ভূতে ভয় করবে। নিয়ম।
- সে কী? 
- তাই তো। ভয় করছে না?
- এ কী কথা খুকু। তোমার আপব্রিঙ্গিং এমন বেকায়দা হচ্ছে কেন? বাপ মা তোমায় ভূতের কথা বলেনি কিছু?
- বলে তো। রোজ বলে। 
- তবু ভয় পাচ্ছ না? এত খ্যাকখোকখুক করছি, তাও ভয়ে আসছে না? 
- না। ভূতেরা তো ভালো। তাঁদের ভয় কীসের? 
- ভূতেরা ভালো? কোন রূপকথার গপ্প শোনায় তোমায় বাবা মা?
- ওই যে তাকের ওপর বই। ওই বই থেকে বাবা মা ভূতের গল্প পড়ে শোনায়। আমি কী না ছোট। আমি কী না পড়তে শিখিনি এখনও। তাই বাবা মা বই থেকে পড়ে। 
- ওই বইতে ভূত আছে?
- আছে তো। কত ভূত। 
- বেশ। তাহলে তোমায় বলেই দিই। আমি ভূত নই। আমি চোর। চুরি করতে এসেছি তোমাদের বাড়িতে। তোমার বাবা-মা টের পায়নি। কিন্তু তোমার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছি। 
- ও। তবে তুমি ভূত না? চোর?
- হ্যাঁ। তবে? আমি চোর। কী! এবার ভয় করছে তো? হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে?
- বা রে। ভয়ের কী আছে। চোরেরা তো ভালো। মজার। 
- চোরেরা ভালো? মজার?
- খুব মজার। আর চোরেদের মত ভালো লোক হয় না। 
- এই তোমার বাপ মা শিখিয়েছে?
- হ্যাঁ, গল্প বলে। 
- আর সে গল্প কোথা থেকে জানলে তারা?
- ওই যে। ওই যে বইটা দেখালাম। ওখান থেকেই। 
- যাচ্চলে। 

ঝোলায় শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সমগ্রটা ফেলে, খুকুকে ফ্লাইং কিস্‌ ছুঁড়ে, পাইপ বেয়ে চম্পট দিলেন মিন্টু চন্দ্র দাস। 

প্ল্যানপ্ল্যানানি

- গত পুজোয় আমরা হিমাচল যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম৷ তাই না বউ? - তাই তো। ট্রেনে দিল্লী। দিল্লী থেকে বাসে চেপে শিমলা। - আর তারপর একটা...