Saturday, December 30, 2017

সাঁতরাবাবুর বস

- বস!
- কী মুশকিল সাঁতরাবাবু।
- মুশকিল? সে কী! আমি তো কিছুই বলিনি এখনও।
- আপনার এই গলার টোন আমি চিনি।
- টোন?
- গদগদে। ধান্দাবাজ। কী চাই?
- ছুটি।
- সে কী! কোয়ার্টারের অবস্থা দেখেছেন? সমস্ত হিসেব ল্যাজেগোবরে। আগামী তিন মাস ছুটির আশা ভুলে যান।
- জরুরী। এমার্জেন্সি।
- কবে চাই?
- পয়লা।
- ফার্স্ট জানুয়ারি ছুটি চাইছেন? আপনি সোমবার অফিস ডুব দিতে চাইছেন?
- ক্রিটিকাল বস। ভেরি ক্রিটিকাল।
- অক্টোবর থেকে পইপই করে বলে আসছি কোয়ার্টারলি টার্গেটে মন দিন, ক্রিটিকাল। অথচ ডিসেম্বরে এসে সেই মুখ থুবড়ে পড়লেন। আপনার লজ্জা করছে না পয়লা জানুয়ারি ছুটি চাইতে?
- আমার বৌ বলেছিল "লজ্জা করে না বসের ফেউ হয়ে ঘুরতে"?
- আপনি জরু কা গুলাম!
- জরুরী কা গুলাম স্যার।ছুটিটা মাস্ট।
- বললাম তো হবে না।
- নিউটন আপেলকে যদি বলতেন "হবে না", তাহলে গ্র‍্যাভিটির কিছু এসে যেত?
- গ্র‍্যাভিটি আপনার বৌ?
- হেহ্। আর আমি আপেল। বৌ আমায় আপনার নিউটনি মাথায় টেনে হিঁচড়ে নামাবেই। পাত্তা না দিয়ে যাবেন কোথায়?
- কেসটা কী?
- নিউ ইউয়ার্স ইভে পার্টি। মদ! মোহ! উদ্দাম নৃত্য। হনি সিং। রাতভর। পরের দিন সকালে বমি বমি ভাব।
- অফিসে এসে বমি করবেন 'খন। ফার্স্ট জানুয়ারি পরের কোয়ার্টারের প্ল্যানিং শুরু করুন। মাস্ট।
- আপনার ধমককে পাত্তা দেওয়া বারণ! মিসেসের।
- পয়লা জানুয়ারি আপনি অফিসে আসছেন না?
- কলার ধরে টেনে আনলেও না।
- আমি আপনার বস।
- বস পেরেক। বৌ হামানদিস্তা।
- আই সী! ইন দ্যাট কেস, মঙ্গল বুধ বিস্যুদ লেট নাইট! সোমবারের ছুটি কম্পেন্সেট করতে।
- রাজী!
- ফাইনাল সেলস প্ল্যানিং আমার টেবিলে চাই, বাই ফ্রাইডে মর্নিং।
- ডান! প্রমিস বস। না পারলে আমার নামে জিরাফ পুষবেন।
- আপনার নামে বাড়িতে এক পিস বর পুষেই ঢের শিক্ষা হয়েছে। জিরাফে কাজ নেই।
- হে হে।
- আর মিস্টার সাঁতরা, অফিসে আমায় চোরাগোপ্তা ভাবে মিস গ্র‍্যাভিটি বলে আওয়াজ দেওয়া বন্ধ করুন, অফিস ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়।
- সরি।
- প্রডাক্ট পার্ফমেন্সে ফাইলটা নিয়ে আসুন।
- তুরন্ত। আজ ফেরার পথে হাফ কিলো পাটালি নিয়ে ফিরবে? প্লীজ? আমার হবে না। সুমন্ত টুয়েন্টি নাইন খেলতে ডেকেছে!
- মিস্টার অভিরূপ সাঁতরা!
- সরি বস। ফাইল নিয়ে আসছি। চটপট!

Saturday, December 23, 2017

দার্জলিঙের ৮



- তুমি দার্জিলিং যাওনি?
- না।
- তোমার বয়স বত্রিশ। তুমি বলছো তুমি দার্জিলিং যাওনি?
- না।
- রিয়েলি?
- রিয়েলি।
- বোঝ!
- এতে বোঝার আছেটা কী?
- দার্জিলিঙের এক্সপিরিয়েন্স নেই তোমার। এ যে বিয়েবাড়ির মেনুতে মাটনের না থাকা।
- মাইরি?
- নব্বইয়ের ইন্ডিয়ান ব্যাটিংলাইনআপে শচীনের না থাকা।
- আচ্ছা।
- শুক্তোয় বড়ি না থাকা।
- বুঝেছি রে বাবা।
- রগরগে চুমুতে জিভ না থাকা।
- উফফ! বেশ! অফিসের হলিডে হোম বুক করছি, কালই।
- কফি হাউসের আড্ডায় দাড়ি চুলকানি না থাকা।
- এ হপ্তার শেষেই চললাম। তৎকালে টিকিট।



- সোয়েটার?
- টিক। অবিশ্যি দার্জিলিঙে শুনেছি আজকাল তেমন ঠাণ্ডা পড়েনা।
- জ্যাকেট?
- ক্রস। দার্জিলিং উইন্টার বড় জোর রাঁচির চেয়ে দু'লেভেল উপরে।
- মাফলার?
- টিক। তবে দার্জিলিঙের ভয়ে নয়। কান ঢেকে রাখা ইজ আ গুড হ্যাবিট। দ্যাটস অল।
- বোরোলিন?
- ডাবল টিক। ফাটা ঠোঁট আনবিয়ারেবল।
- ফ্লাস্ক?
- বাড়াবাড়ি হচ্ছে।
- কফির জন্য পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকব?
- ব্যবস্থা হবে'খন।
- হিল স্টেশনে উষ্ণতা নিয়ে কম্প্রোমাইজ মানে কম্ফর্ট নিয়ে কম্প্রোমাইজ।
- চুমুর ব্যবস্থা করব নাকি?
- চুমুর সাবস্টিটিউট হয়। সঞ্জীব, পেঁয়াজ পোস্ত এট সেটেরা। কিন্তু উষ্ণতা জেনারেশনে এনিটাইম কফির আশ্বাসের কোনও বিকল্প নেই। ফ্লাস্ক থাকুক।
- প্যাকিং কম্পলিট। হটফ্লাস্ক নিতে হলে চানাচুরের প্যাকেট আর সোনপাপড়ির বাক্স বাদ যাবে।
- আনএক্সেপ্টেবল। তাহলে উপায়? উষ্ণতা ডকে?
- সাবস্টিটিউট আছে।
- এনিটাইম কফির সাবস্টিটিউট?
- দার্জিলিং স্পেসিফিক সাবস্টিটিউট। আছে।
- লেগ পুল?
- জেনুইন। মাইরি। আছে।
- কী?
- দার্জিলিঙে চুমুয়েবল কম্ফর্ট ও উষ্ণতার গ্যারেন্টি। প্লেলিস্ট ভরা দার্জিলিং দত্তের গান।
- বলছিস?
- ট্রেনে ওঠার আগের ডিনারে পোস্ত ঝিঙে। টেলিগ্রাফের তারে নাচুক ফিঙে।





- কাঞ্চনজঙ্ঘার এই ড্যাজলিং ভ্যিউয়ের জন্যেই আপনাদের পাঙখাবাড়ি রুটে ভায়া মকাইবাড়ি আনলাম।
- বাহ! দিব্যি!
- আর ডাইনে দেখুন। টি প্ল্যান্টেশনে মেয়েরা কাজ করছে। সব মিলে মোউস্ট পিকচারেস্ক। আর হাওয়ার পিউরিটি নিশ্চই টের পাচ্ছেন।
- দার্জিলিং আর কদ্দূর?
- আর তেত্রিশ কিলোমিটার মত। চায়ের ব্রেক হবে নাকি?
- জরুরী।
- এখানে চায়ের টেস্টও আলাদা। মোহময়। দু'কাপের কমে চলবে না। অর্গানিক ফাইন চা পাতার কয়েক প্যাকেট চাইলে নিয়েও নিতে পারেন।
- হোক।
- বেশ। নেক্সট স্টপ হাই ক্লাস চা আর টা।
- ইয়ে, আপনি আমায় ফ্রেশ ফ্রম প্ল্যান্টেশন খাস দার্জিলিং খাওয়ান, তার সাথে ফ্রেশ ক্যালক্যাটা'টা বরং আমিই প্রোভাইড করছি। সে টা'য়ের প্ল্যান্টশন আমার কাছেই রয়েছে। ওই সবজে সাইড ব্যাগটা, ওতেই টায়ের প্ল্যান্টেশন।
- ইয়ে, ফ্রেশ টা?
- হান্ড্রেড পারসেন্ট অর্গানিক ওভেন ফ্রেশ লেড়ো ফ্রম কলকাতা। ছয় প্যাকেট এনেছি। কোয়ালিটি লেড়ো ছাড়া চা চাপের হয়ে যায়। ও নিয়ে রিস্ক নেওয়া যায় না।



আলস্য অতি শক্তিশালী।
প্রথম দার্জিলিং। সুড়সুড়িটা প্রবল হওয়া উচিৎ ছিল।
প্রথম সন্ধ্যের প্ল্যান সে'রকমই ছিল:
১. বিকেল বিকেল হোটেল পৌঁছেই ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি।
২. অতঃপর ম্যালের দিকে হাঁটাহাঁটি। টু সোক ইন দ্য মেজাজ। অল্প খাওয়াদাওয়া, পারলে কেভেন্টার্সে ঢুঁ।
৩. জোয়ি'জ পাব যে বিখ্যাত সে খবর নেওয়া আছে। সে'খানে যৎসামান্য হৃদয়-মালিশ।
৪. অতঃপর ফের এক রাউন্ড হন্টন।
৫. তারপর পছন্দসই রেস্তঁরা দেখে লাইট ডিনার।
৬. সবশেষে গোল্ডফ্লেক। নেশার টান আর নেই, তবে গোল্ডফ্লেকে একটা কাঁঠালি কলা গোছের ব্যাপার আছে।
ছয় গোলে জেতা সন্ধ্যে। নিখুঁত অঙ্ক।
কিন্তু ওই। নিঁখুতে জ্যামিতি। খুঁতেই আর্ট, মহাজাগতিক বিস্ময়।
স্কেল রেখে আঁকা প্ল্যান, সে'খানে গোবরজল স্প্রে করতে মায়া হচ্ছিল। কিন্তু হোটেলের গোছানো বিছানাটা এমন চুমু মাখিয়ে হাঁক দিলে...কুলুকুলু গলে গেলাম।
ঘুম যখন ভাঙলো তখন রাত সাড়ে নয়। শরীর জুড়ে অবসাদ, ক্লান্তির নয়; অপরাধ বোধের। একটা সন্ধ্যে গচ্চা গেল। ডিনারের ব্যবস্থা না করলেই নয়, অত রাত্রে হোটেলেও সুবিধে করা গেল না। অগত্যা হাঁটতে বেরোতেই হলো। ততক্ষণে শহরের এ'পাশটা নিঝুম।বাতসে শীতের কনকন দিব্যি রয়েছে।
যার কেউ নেই তার ভগবান আছে, আর যার উদ্যোগ নেই তার জন্য রয়েছে সৌরভ ছেত্রী। একটা মুদীর দোকান আর তার লাগোয়া ছোট্ট ঘরে তার সাইড বিজনেস; মোমো, ওয়াইওয়াই আর কফির।
যত্নের গুণে ফ্যান ভাত হয় বিরিয়ানির চেয়েও খোশবুদার আর মাদুর হয় ছয় ইঞ্চি ডুবে যাওয়া গদির চেয়েও তুলতুলে। জমজমাট ঠাণ্ডায়, পরিপাটি যত্নে, ঝকঝকে তকতকে প্লেটে; সৌরভ ছেত্রী যখন এক থালা ধোঁয়া ওঠা ওয়াইওয়াইয়ের নুডল পরিবেশন করলে; তখন মনে হচ্ছিল ছোকরাকে জড়িয়ে ধরি। সাথে চমৎকার ঘন দুধে তৈরি কফি। নিমেষে এক প্লেট নুডল খতম করে দ্বিতীয় প্লেটের অর্ডার করলাম। সৌরভ আসল কভার ড্রাইভ চালাচ্ছিলে অবিশ্যি একের পর এক নেপালি গান শুনিয়ে। ছেলেটার গলায় সুর আছে বটে।
দ্বিতীয় কফির কাপ হাতে সৌরভের সাথে গপ্প শুরু হল। কলকাতার গল্প। ছেলেটা কলকাতা আসেনি আগে, যাওয়ার খুব শখ। মিনিট পনেরোর মাথায় গুলিয়ে গেল কে ট্যুরিস্ট আর কে পাড়ার ছেলে। তৃতীয় কাপে ফিরে এলো দার্জিলিং আর গোল্ডফ্লেকের অফারে কিচেনের গ্যাস বন্ধ করে পাশে এসে বসলেন ছেত্রী।
দার্জিলিঙের গন্ধ কোন ফাঁকে নাক গলা বেয়ে বুকে এসে নামলো ঠিক টের পাওয়া গেল না। তবে এ'টুকু দিব্যি বোঝা গেল যে পুরুষদের কাছে নিজেকে সৌরভ ছেত্রী বলে পরিচয় দিলেও, অচেনা নারী মাত্রই সে নিজের আসল নামটা তুলে ধরে; "মেরা নাম শাহরুখ ছেত্রী"।
কেভেন্টার্স, জোয়ি'জ পাব সম্ভবত কালকেও ঝুলে থাকবে। শাহরুখ আগামীকালের জন্য স্পেশ্যাল মোমোর প্রতিশ্রুতি সাজিয়ে রেখেছে। এবং ওল্ড মঙ্কে সঙ্গী হতে যে তার বিশেষ আপত্তি নেই, সে'টা বোঝা গেল তার শেষের এক কাপ কফির দাম নিতে অস্বীকার করায়।


- কলকাতা থেকে?
- হ্যাঁ। আপনি?
- ওই। সাবআর্বানের। কত নম্বরে উঠেছেন?
- চারশো এক।
- ওহ। লাকি। সে'খান থেকে তো চমৎকার ভ্যিউ। কাঞ্চনজঙ্ঘা ফ্রম বেড। গতবার ওই রুমই পেয়েছিলাম তো।
- হ্যাঁ। তা ঠিক।
- সানরাইজ কেমন দেখলেন?
- ইয়ে...।
- রঙের খেলা...। চার্মিং বললে কম বলা হয়...তাই না?
- ইয়ে...।
- ইয়ে?
- মানে সানরাইজ দেখার খুবই ইচ্ছে ছিল, তবে...।
- তবে?
- জানালার পর্দা টানা ছিল কিনা, তাই সানরাইজটা ঠিক ভিজিবল হয়নি।
- পর্দা টেনে সানরাইজ দেখছিলেন?
- না মানে, পর্দা টানা না থাকলে ঘরে ভোর ভোর রোদ্দুর আসতে পারে, তা'তে ঘুমের মারাত্মক অসুবিধে।
- আই সী।
- আসি?
- আসুন।


দার্জিলিং -৬


কেভেন্টার্স।
কাঞ্চনজঙ্ঘার গার্নিশংয়ে সস্যেজ হ্যামের জবাব নেই।
ফুরফুরে আলিস্যিতে শিব্রামের পাতা উল্টোতে উল্টোতে কফি আর চিকেন ললিপপের জবাব নেই।
কিন্তু। ওই। সমস্তটাই তো আর জবাবে থাকে না।
"কোথাও যাওয়ার নেই"য়ে যে সুর।
"কিচ্ছু করার নেই"য়ে যে ছ্যাঁত।
সেই সুর আর ছ্যাঁত আপনাকে কেভেন্টার্স দেবে না।
সেই সুর আর ছ্যাঁত দেবেন কমল।
কেভেন্টার্স না হয় ফুলটসের মত আপনার দিকে লোপ্পা হয়ে ঝুলে আসবে। ম্যালে হাঁটতে বেরিয়ে টুক করে ঢুঁ দিলেন কেভেন্টার্সের ছাতে। কমলবাবুর জাদু টের পেতে হলে সামান্য বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে আপনাকে।
প্রথমত, রঙ্গিত ভ্যালি রোপওয়ের টিকিট কাউন্টারের সামনে পৌঁছে জানতে হবে যে টিকিট কাউন্টার সে'দিনের মত বন্ধ হয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, রোপওয়ে নেই বলেই আপনি টুক করে অকুস্থল থেকে তখনই সরে পড়বেন না।
তৃতীয়ত, রোপওয়ে ফস্কে যাওয়ার দুঃখে জমে থাকা খিদেটাকে চাড় দিয়ে উঠতে হবে।
এই ত্র‍্যহস্পর্শে আপনার চোখের কুয়াশা কেটে যাবে এবং আপনার গোচরে আসবে কমলবাবুর একটা টেবিল আর দু'টো স্টোভ সমৃদ্ধ আস্তানা।
"কোথাও যাওয়ার নেই"য়ে যে সুর।
"কিচ্ছু করার নেই"য়ে যে ছ্যাঁত।
এই দুইয়ে নতজানু হয়ে আপনি দুই হাত পেতে নেবেন পেঁয়াজির প্লেট। আপনার সামনে ফেটিয়ে ভাজা, নরম আঁচে, সযত্নে। সস্নেহে লাল, ওমে মুচমুচে; সত্যিই কামড়ে আদর। কাঞ্চনজঙ্ঘা এক অমোঘ মুহূর্তের জন্য আবছা হয়ে আসবে স্বাদের মেঘে।
তবে কমলবাবুর স্পর্শ সে'টুকুতেই নয়। তাঁর পেঁয়াজী মোমো ছাড়িয়ে রয়েছে গল্প। সে গল্প ছুঁতে আপনাকে চলে যেতে হবে এক প্লেট ভাজা ভাজা স্বাদের ম্যাগিতে। মন রাখা দরকার, আপনার আর কোথাও যাওয়ার নেই, আর কিস্যু করার নেই। সে'খান থেকে আপনাকে একা হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবেন কমল।
গল্পে। কমল গিটারে বড় হওয়া মানুষ। আমার বেসুরো গুনগুনে তাঁর পেঁয়াজি ভাজার তাল কেটে যাচ্ছিল বারবার।
"গানা হ্যায় দাদা। মিউজিক। পেয়ার সে গাইয়ে! হড়বড়ি কিউ?", নিতান্তই অপারগ হয়ে বলতে হল কমলবাবুকে।এক গাল হাসি, মুচমুচে। তারপর গল্প। তাঁর পেঁয়াজি ভাজার দুপুরগুলো আর রিনরিনে গিটারের রাতগুলোর। তিনি সহাস্যে জানালেন যে কোনওদিকেই সঙ্গীতের কমতি নেই।
এ শহরে এ'দিক ও'দিক আনাচেকানাচে কী সহজ অবহেলায় গান চাপা দেওয়া আছে। কমলবাবুর পেঁয়াজি বা সৌরভ ছেত্রীর কফির আবডালে কত নিরিবিলি সুর; বুক চাপড়ানি নেই, ইয়ে দেখো উয়ো দেখো নেই। গানের প্রতি আনুগত্য আছে, স্নেহ আছে, পিঠে হাত রাখা উষ্ণতা আছে।
তিন নম্বর প্লেটের পেঁয়াজিতেও মার্জিনাল ইউটিলিটি ডিমিনিশ করেনি। কমলবাবু হাসিমুখে আর পাঁচটা 'কাস্টোমার' সামাল দিতে দিতে জানালেন;
"একলা থেকেও একা থাকা মানুষের সাজে না। যে একবার সঙ্গীত চিনেছে, তাঁকে একা রাখা নামুমকিন। গানা অগর গয়া তো ফির আপকো চলে যানা হ্যায়, কেয়া সমঝে দাদা"?

৭ 


অন্ধকার।
নিঝুম। নিকষ। বাতাসে কনকন। হাফ সোয়েটার আর গায়ে জড়ানো শাল ফুঁড়ে সে কনকন গায়ে পিঠে অনবরত খোঁচা মেরে যায়।
মনোময়বাবুর বড় প্রিয় বেঞ্চি এ'টা। কদ্দিনের পুরনো, কদ্দিনের চেনা। বেঞ্চির সামনে খাদ, তার ও'পাশে শহরতলির মিটিমিটি বাতিগুলো। শহরের নাম হয়, ল্যান্ডমার্কদের ল্যাটিচিউড লঙ্গিচিউড থাকে। আশ্রয়ের পোস্টাল অ্যাড্রেস হয় না। এ বেঞ্চিটা কতকটা তাই। শহরের কোণে পড়ে থাকা এ অঞ্চলের একটা নাম অবশ্যই আছে, সে নামে কেমন ঘাস মাখানো পাহাড়ি গন্ধ। তবে সে নাম বামুনপাড়া বা ময়মনসিংহ হলেও কিছু এসে যেতো না মনোময়বাবুর। মোদ্দা কথা হলো এই খাদ ঘেঁষা বেঞ্চিটা দিব্যি নিরিবিলিতে রয়েছে, সেই কবে থেকে। এই বেঞ্চিতে রাত নামে, বেঞ্চির কাঠে কুয়াশা ও ঠাণ্ডা জমাট হয়ে বসে। রাত্রের দিকে বেঞ্চিটায় কোনও প্রাচীন পেল্লায় গাছের ছায়াময় আত্মার বাস টের পান মনোময়বাবু।
মনোময়বাবু ট্র‍্যাভেলার নন। ক্লার্ক। ডিভোর্সি। বাজাজ স্কুটারিস্ট। মুড়িপ্রিয়। মালদার বাইরে পা রাখার কথা হলেই তাঁর হাত-পা কাঁপে। কিন্তু। এই বেঞ্চির টান মাঝেমাঝেই তাঁকে তাঁর নিয়মের মধ্যে থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনে। মোহগ্রস্তের মত ট্রেন বাস ঠেলে এসে ওঠেন এ শহরে। আস্তানা বলতে তামাংবাবুর হোমস্টে। সস্তা, ছিমছাম।
মনোময়বাবু ট্যুরিস্ট নন। সাইট সীয়িংয়ের ইচ্ছে, ধৈর্য বা পয়সা; কোনওটাই তার থাকেনা। তামাং গিন্নীর 'ফুলকা' আর সবজি তিন বেলা খেয়ে দিন তিনেক গুজরান করেন তিনি। দিনের বেলাটা কাটিয়ে দেন ঘরের চৌকিতে। শুয়ে বসে। বেরোতে মন সরে না। ঝুপ করে নামা পাহাড়ি অন্ধকারের আবডাল কে ব্যবহার করে, টুপ করে একটা টিফিন বাক্সে রুটি সবজি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
খাদ ঘেঁষে এসে দাঁড়ান। এ জায়গাটা মূল শহরের আওতার বাইরে আর এতই বেমক্কা যে এ বেঞ্চিতে কাউকে তেমন দেখা যায়না। রাত সাড়ে সাতটার পর সমস্তই শুনশান। দিনের বেলা এ জায়গাটাই কেমন ভূতুড়ে ঠেকে মনোময়বাবুর, বেঞ্চিটাকে মনে হয় অচেনা।
এ জায়গাটা রাতে খোলস ছেড়ে বের হয়, তা দিব্যি টের পান মনোময় সাহা। রাতের নিরেট কালো চারদিক আর শীতের ঠকঠকে মিশে যান তিনি। ঝাপসা হয়ে আসে খাদের ওপারের পাহাড়ের গায়ের টুপটাপ বাতিগুলো।
দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে মনোময় আঁচ করতে পারেন কতকিছু। প্রতিটা আলোর নিচে এক একটা বাড়ি।
সংসার।
গেরস্থালী।
বৌ, বর, বাপ, মা, খোকা, খুকি মিলে একেকটা রুবিক কিউব। তারই মধ্যে বাপ ও খোকা। এবং তাদের গল্প।
বাপেরা খোকাদের অঙ্ক শেখায়?
বইয়ে মলাট দিয়ে দেয়?
গল্প শোনায়? আগডুম বাগডুম?
হাঁটতে বেরোয় হাত ধরে?
বাপেরা খোকাদের মাসে একবার সেলুনে নিয়ে যায়? সপাট বাটি ছাঁট?
রাতে পাহাড়ে দম বন্ধ হয়ে আসে মনোময়বাবুর। ঝাপসা। চিনচিনে।
মাধুরী খোকাকে কি কোনওদিন বলেছে যে তার বাবার কষ্ট হয়? দূরে থাকতে কী কষ্ট। বাপ রে বাপ। খোকা। বেবিপাউডার, বেবীফুড, হসপিটালের গন্ধ মাখা খোকা। তুলতুল করে বড় হয়ে ওঠা খোকা। খোকা। আইনে আইনে দূরে থাকা একটা ছোট্ট টিমটিমে আলোর জ্বলজ্বল ; খোকা। সে আলো ছুঁতে না পারার যে কী যন্ত্রনা। বাপ। বাপের বুকের ভিতরের দগদগটা।
"মা, মা গো", নিজের অজান্তেই মাঝেমাঝে অস্ফুটে ককিয়ে ওঠেন মনোময়বাবু।
খোকা কি জানে পাহাড়ের রাতকালো স্লেটে বসানো প্রতিটা আলোর বিন্দুতে মনোময়বাবু দেখতে পান একটা খাট?
সে খাটের বিছানার সাদা চাদরে লাল কমলা ফুলফুল প্রিন্ট।
সে'খাটের মাথার দিকে জানালা, জানালা ঘেঁষে দুই বাপ ব্যাটা। নীল ওয়াড়ের পাশবালিশ কোলে বাপ গল্প করছে নেপোলিয়নের, মাচ্চুপিচুর, রোমের, টিনটিনের আরও কত কী! ছেলের চোখে ঝিলিক, চোয়াল আলতো ঝুলে।
ঝাপসা। চিনচিনে।
রাতের অন্ধকারে বেঞ্চিটাকে মাঝেমধ্যে "বাবু" বলে ডেকে ফেলেন ভদ্রলোক। "কেউ না বুঝুক, তুই তো বুঝিস"।
ভোরের আলোর সাথে ঝাপসা কেটে যায়। চিনচিন সংযত হয়। তামাংবাবুর আস্তানার দিকে গুটিসুটি ফিরে যান মনোময় সাহা। কে যে কোথায় আশ্রয় কুড়িয়ে পায়।




স্বাদ শুধু জিভের ডগায় মুহূর্তের তড়াক্ নয়।
স্বাদ স্রেফ "ডেলিশাস্ মশাই" বলে বাঘা কামড়ে হামলে পড়া নয়।
স্বাদ গদা নয়, তুলি।
লেদারের সোফাসেট নয়, নরম তোশকের খাট হল স্বাদ। যে খাটের মাথার দিকে জানালা, জানালার ও'পাশে ছোট্ট একটা পার্ক যেখানে বিকেল হলেই খোকাখুকুরা মনের আনন্দে দোল খায়। ছোট্ট স্বাদের দানা জিভ ছুঁয়ে ক্রমশ স্নোবল হয়ে মনে ছড়িয়ে পড়বে, তেমনই একটা ফেনোমেনা হচ্ছে আস্বাদন।
স্বাদে সহজে ভেসে যেতে নেই, আর একবার ভেসে গেলে ভালোবাসায় রাখঢাক রাখতে নেই।
এ লেখার কারণ; আমি ভেসেছি। ঝুমঝুম ভালো লাগা সুর বুকের ভিতর জমা হয়েছে। লোভ নয়, একরকমের আঙুলে আঙুল স্নেহ সেই ভাসিয়ে নেওয়া স্বাদে।
কুঙ্গা রেস্তোরাঁ, দার্জিলিং।
তার চিকেন চীজ মোমো।
নরম তুলতুলে, আদরে সাঁতলানো মুর্গিকুচিতে ঠাসা আর চীজের প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ। চীজের কোয়ালিটি ও সুবাস ভিভিএসলক্ষ্মনীয়।
ব্যাপার মোমো বলে নয়। চীজ চিকেন মোমো সর্বত্র ছড়াছড়ি। ব্যাপার হল এ মোমোর মখমলে স্পর্শে যা জিভে মনে রয়ে যায় বহুক্ষণ।
রবি ঘোষের "সো খাইন্ড অফ ইউ"র মত মসৃণ।
উত্তমের হাসির মত ভুবনবিজয়ী খুশবু।
প্রতি কামড়ের চীজ চলকানো উচ্ছ্বাসে সুপ্রিয়ার ঠোঁট কাঁপুনি।
ফাইভস্টারের চকোলেটের ট্যাগলাইন "যো খায়ে খো যায়ে" সবিশেষ ভাবে লাগসই।
কামড় দিয়ে চোখ বুজুন, দেখবেন চারপাশটা ভালোবাসায় লাল, আদরে নীল, চুমুতে আগুন, সোহাগে সবুজ। টের পাবেন, আপ্লুত আর আলোড়িত; এ দুই শব্দের কম্বিনেশন ঠিক কেমন।
আর। এ মোমো প্লেট দুই শেষ করার পর কিছুতেই অন্য কোনও মুখশুদ্ধি চলবে না। এ স্বাদের মসলিনে সামান্য খোঁচাখুঁচিও বরদাস্ত করা চলে না।

রামশঙ্কর পাকড়াশির ডায়েরি - ২

২৩ ডিসেম্বর, ২০১৭, 
রাত বারোটা বেজে বাইশ মিনিট। 
কলকাতা। 
............

আজকের দিনটা বেশ চমৎকার ছিল। মূলত দু'টো কারণে। 

প্রথমত, আজ অল্প হলেও বাতাসে শীত শীত ভাব ছিল। কাটোয়া নিবাসী খুড়তুতো ভাই কমলেশের থেকে বছর দুই আগে একটা চমৎকার নীল রঙের হাফ জ্যাকেট ধার নিয়ে ফেরত দেওয়া হয়নি।  ফেরত  না দেওয়ার একটা কারণ অবশ্য আছে; ওর থ্যাবড়ানো নাকের সঙ্গে অমন স্মার্ট জ্যাকেট কিছুতেই মানায় না। এ'দিকে আমার এস্থেটিক সেন্স চিরকালই বড্ড টনটনে। গত বছর শীত পড়ার ঠিক আগে কমলেশ একবার আমার বাসায় এসে ফোন করেছিল। বুঝেছিলাম ব্যাটার কুমতলব আছে; সামান্য একটা হাফ জ্যাকেটের লোভে বাড়ি পর্যন্ত হানা দিয়েছে। আমি বলে দিয়েছিলাম আমি অফিসের ট্যুরে শহরের বাইরে, ফেরার ঠিক নেই। সে'দিন অফিস থেকে বাড়ি না ফিরে সোজা চলে গেছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি। জ্যাকেটটাও অপাত্রে ফেরত দিতে হল না, আবার বন্ধুর বাড়িতে ডিনারটা মন্দ হয়নি। নিখরচায় মাংস ভাতে নাকি আয়ুর্বৃদ্ধি ঘটে। কলকাতায় আবার শীতটীত তেমন পড়ে না, কিছুতেই এদ্দিন সুযোগ পাচ্ছিলাম না জ্যাকেটটা পরার। আজ পরেছিলাম। পারচেজ সেকশনের দীপ্তি এসেছিল একটা ফাইল প্রসেসিংয়ের ব্যাপারে।  ওর চাউনিটা আজ অন্যরকম ছিল। অল্প মাখোমাখো, কিছুটা দীর্ঘশ্বাস। অবশ্য সে'টা জ্যাকেটের জন্য না আমার একপেশে মন কেমন করা হাসিটার জন্য জানি না। দীপ্তির বরকে কয়েক মাস আগে একদিন অফিসের পর দেখেছিলাম, বেশ একটা হামবড়া ভাব। বড় চাকরি করে বলে সকলের মাথা কিনে রেখেছে যেন। অমন চাকরী আমি চাইলেই গণ্ডায় গণ্ডায় পেতে পারতাম। নেহাত  গ্রহ নক্ষত্রের অ্যালাইনমেন্ট ঠিকঠাক ছিল না তাই। যাক গে। আমার ধারণা দীপ্তির বর আমার চেয়ে হাইটে অন্তত হাফ ইঞ্চি ছোট, আমার পাশে দাঁড়ালে সামান্য ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগবে, সে'টাই স্বাভাবিক। দীপ্তি আমায় পছন্দ করে, আমি বুঝতে পারি। সামান্য মায়া আছে বটে তবে আমি দীপ্তিকে পাত্তা দিই না। কবে অকারণ কফিটফির পিছনে খরচ হয়ে যাবে, কী দরকার। 

দ্বিতীয়ত, আজ অনিন্দ্য অফিসে আসেনি। অত্যন্ত গবেট ছোকরা। গাধার মত অকারণ কাজ করে যাবে। অথচ জেনারেল নলেজের প্রশ্ন করলেই চিত্তির। জেনারেল নলেজ; যেমন ক্রিকেট, পলিটিক্স, আলু পোস্তর ভ্যারিয়েশন, বড়সাহেবের সেক্রেটারির মায়াময় স্কার্ট; এইসব। আর জেনারেল নলেজ বাড়বে কী করে? অফিসে যত মনোগ্রাহী আড্ডাই হোক, সে থাকবে ফাইলে মুখ গুঁজে। যেন আর দু'টো ফাইল পাস করতে পারলেই বাবু নোবেল পাবেন। একা হাতে গোটা অফিসের ওয়ার্ক কালচারে গোলমাল পাকাচ্ছে ছোকরা। সেদিন ইস্ট বেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে জমজমাট আড্ডার মধ্যে ফস করে বলে বসল আমি নাকি গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল নিয়ে বহুদিন ধরে বসে আছি। কী ইনসাল্ট! সে'দিনের ছোকরা বলে কিনা আমি ফাইলের ওপর বসে আছি? হপ্তা দুই ফাইল আমার টেবিলে ছিল বটে (ডিসেম্বরে কেমন হাত পা জড়িয়ে আসে, ছুটোছুটি করে কাজ করতে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে)! তাই বলে অমন ভাবে মুখের ওপর বলবে? আমার কিছু একটা করতেই হত। অন্যায় যে সহে আর জ্ঞান যে হজম করে; ঘৃণাটৃণা যেন তাঁরে কিছু একটা করে টাইপ কথা আছে না? আমিও বলে দিলাম; গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল আমার টেবিলে আসেইনি। রাস্কেল অনিন্দ্য বলে কিনা সে নিজের হাতে আমার টেবিলে পৌঁছে দিয়ে গেছে। সাহস ভাবুন! আমি হলফ  করে বলায় অবশ্য সে মিইয়ে গেল। আজ সে আসেনি দেখে আমার গোপন দেরাজ থেকে সেই গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল বের করে পিওন উমাপ্রসাদকে দিয়ে অনিন্দ্যর টেবিলে পাচার করে দিয়েছি। বড়সাহেবের কানেও তুলে দিয়েছি কথাটা;  গুপ্তা অ্যান্ড গুপ্তার ফাইল নিয়ে অনিন্দ্য হপ্তার পর হপ্তা বসে আছে। দু'দিন পর অফিসে এসে অনিন্দ্যর পিলে চমকাবে। আসলে প্রতিবাদ জিনিসটা আমার মজ্জায়। আর প্রতিবাদ করতে হলে কিছু খরচটরচ করতে হয়; উমাপ্রসাদকে এক প্যাকেট মার্লবোরো খাওয়াতে হবে। তবে ভাগ্য ভালো গত সেপ্টেম্বরে মুকুল দত্তের পার্টি থেকে খান দুই বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট সরিয়েছিলাম। আমি অবিশ্যি সিগারেট খাই না, তবে কখন কী প্রয়োজন হয়। আমার কুষ্ঠীতে লেখা আছে, আমার দূরদৃষ্টি নাকি অনেকের ঈর্ষার কারণ হবে। 

সত্যিই শীত এলো বোধ হয় শহরে। বেশ চনমনে বোধ করছি। 

Thursday, December 21, 2017

রামশঙ্কর পাকড়াশির ডায়েরি - ১

২১ ডিসেম্বর, ২০১৭, 
রাত বারোটা বেজে দশ মিনিট। 
কলকাতা। 
............

আমার নাম রামশঙ্কর পাকড়াশি। নামের ওজন শুনেই ধরে ফেলা উচিৎ যে নামটা বানানো। অবশ্য সবাই যে চট করে ধরে ফেলতে পারবে তা নয়। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি; যে কোনও বিষয় আমি তুড়ি মেরে বুঝে ফেলি অথচ আমার আশেপাশের মানুষজন মাথা ঠুকে ঠুকে হন্যে হয়েও সে বিষয়টা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেন না। যা হোক, দুনিয়াটা হাফ গবেট আর ফুল গবেটে ভর্তি, সে নিয়ে দুঃখ করে বিশেষ লাভ নেই। 

আর এই বেহেড দুনিয়ায় রামশঙ্কর পাকড়াশি হয়ে জন্মানো যে কী বিশ্রী ব্যাপার! নামটা বানানো কিন্তু এক্সিস্টেনশিয়াল ফ্রাস্ট্রেশনটা জেনুইন। যা হোক, এক গবেট ব্লগারকে শেষ পর্যন্ত বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করাতে পেরেছি, সে কথা দিয়েছে যে তার ব্লগে আমার রোজনামচা বেনামে (বেনাম বললাম বটে, তবে রামশঙ্কর পাকড়াশি নামটা আমার দিব্যি পছন্দ হয়েছে) প্রকাশ করবে। উপকারটা অবশ্য তারই, তাঁর দরকচা মারা ব্লগের লজ্জা খানিকটা হলেও ঢেকে যাবে আমার কলমের আঁচড়ে। 

যাক গে। সে'সব কথা থাক। 

আমার পরিচয় প্রসঙ্গে বলি; শের শাহর রাজ্য পরিচালনা সম্বন্ধে কিছু কথা কি দু'লাইনে বলা সম্ভব? ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং টেকনিক কি খান দুই ট্যুইট লিখে বোঝানো সম্ভব। তেমনই আমার পরিচয়ও স্যাট্‌ করে দু'চার কথায় ঠাহর করতে পারবেন না। 

বিশ্বাস করুন। পারবেন না। এই যদি আমি বলি আমার বয়স একচল্লিশ, পেশায় সরকারি অফিসের ক্লার্ক, বিয়েথা করিনি আর নেশায় সিগারেটিস্ট; তাহলে কি আমার চরিত্রের ব্যাপ্তিটুকু কোনও ভাবে ধরতে পারবেন? গড়পড়তা মানুষ হলে পারবেন না। তবে আমার বিশ্বাস আমার মূল্য ভবিষ্যতের নোবেল লরিয়েটরা অন্তত ধরতে পারবে। 

ভাবছেন ঠাট্টা করছি? আমার কথাবার্তা শুনে বাবাও তাই ভাবতেন। কী আর করা যাবে বলুন, আমাদের সমাজে যে'টা সবার চেয়ে বড় সমস্যা; পাইকারি মায়োপিয়া। আমার মা অবশ্য বিদুষী ছিলেন; তিনি চিরকাল জানতেন আমি ব্রিলিয়ান্ট। টপাটপ অঙ্কে ফেল করেও মায়ের কনফিডেন্সকে দমিয়ে দিতে পারিনি; মা বুঝতেন যে অঙ্কটঙ্ককে আমি চাইলেই পোষা কুকুরের মত বিস্কুট ছুঁড়ে ল্যাজে খেলাতে পারি। কিন্তু আমায় বাঁধবে এমন দম স্কুল সিলেবাসের কী করে থাকবে? সমগ্র জগত-সংসারের সেই ক্ষমতা নেই। 

অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? সরকারি অফিসের গ্রেড ফোর ক্লার্ক মানেই সে ব্রিলিয়ান্ট নয় ভেবেছেন? পাঁচটা মেয়ে আমার প্রেম সঠিক ভাবে ধারণ করতে পারেনি, মানছি। কিন্তু ক্ষতিটা কাদের হল? নিউটনের মাথায় আপেল ঝরে না পড়লে ক্ষতি নিউটনের হত না আপেলের? উপমাটা ধরতে না পারলে বুঝবেন যে আপনিও গবেট আর সেমিগবেট স্পেকট্রামের মধ্যে কোথাও আছেন। যা হোক, মন খারাপ করবেন না ভাইটি, আফটার অল আপনি মেজরিটির দলে রয়েছেন।    

ভূমিকাটা একটু লম্বা হল। আমি আবার কীবোর্ডে লিখি না; ধবধবে সাদা ফুলস্কেপ কাগজ আর ফাউন্টেন পেন (আমি ঠিক করেছি নিজের ডায়েরিকে সাহিত্য গুণে ঠকাব না) । একটানা লিখলে আবার আমার কবজি আর আঙুল টনটনে করে ওঠে; একিলিস হীল আর কী। কেউ তো আর নিখুঁত হতে পারে না। ব্র্যাডম্যানেরও টেকনিকে ফাঁক ছিল, রবীন্দ্রনাথেরও দাড়ি কামানোর বাক্স ছিল। এই কবজির টনটন আর আঙুলের চিনচিনের জন্যই সাহিত্যের পরীক্ষাগুলোয় নম্বরটম্বরগুলো একটু কম পেতাম। অবিশ্যি তাই বলে মাঝেমধ্যে আমায় ফেল করানোটা বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর সে'টা আমার নয় , সিস্টেমের ব্যর্থতা ছিল। সম্ভবত ক্লাস নাইনে; "হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন" নিয়ে একটা প্যারা লিখেছিলাম মনে আছে, ভাবলে আজও চোখে জল আসে। পরীক্ষার খাতাতেও টুপটুপ করে জল গড়িয়ে পড়েছিল। মধুবাবুর প্যাথোস থেকে "বিবিধ রতন" তুলে বিবিধ ভারতীর গানের অনুষ্ঠান নিয়ে দু'চার কথা লিখেছিলাম। তুলে ধরেছিলাম সঞ্চালকের ন্যাকামির প্রাবল্য। আর তারই পাশাপাশি দুঃসাহসিক ভাবে রতনের সঙ্গে শুয়োরের কচু চেনার ন্যাক্‌ নিয়ে চমৎকার একটা ট্যুইস্ট খাটিয়ে এম্পিরিকাল ডেটা চেয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম। ফলে যা হওয়ার তাই হল। তেমন লেখা আর তেমন প্রশ্ন হজম করার ক্ষমতা আমাদের সিস্টেমেরই নেই, আমাদের বাংলার টিচার অমলবাবু তো নস্যি। 

যা হোক। ব্রিলিয়ান্স গোবর নয় যে হাতে এক তাল নিয়ে ফ্যাটাস করে দেওয়ালে ছুঁড়ে মারব। আজ এ'টুকুই থাক। 

মাঝেমধ্যে লিখব'খন। ক'দিন ধরেই মনে হচ্ছিল; এই অপার ব্রিলিয়ান্সের বোঝা আর কদ্দিন বইব। 

দেখি, ডায়েরির মাধ্যমে কতটুকু বিলিয়ে দিতে পারি। 

Saturday, December 16, 2017

মৃদুলবাবু ও মশা

*আজ রাত্রে*

শোওয়ার ঘরের মশারির বাইরে একটা মশা ঘুর ঘুর করছে অনেকক্ষণ থেকে। নতুন ফ্ল্যাটে প্রায় বছর খানেক হতে চলল, মশার উপদ্রব এই প্রথম।
মৃদুলবাবু অবশ্য মশারির ভিতরেই।

মঁমঁমঁমঁ গোছের একটা গা শিরশিরানি শব্দ।  আর পাঁচটা মশার প্যানপ্যানানির মত বিরক্তিকর শব্দ নয়, বরং খানিকটা যান্ত্রিক এবং অস্বস্তিকর।

ঘণ্টাখানেক ধরে চলছে এই মঁমঁমঁমঁ। রাত পৌনে একটা বাজতে চলল। এ'বার একটা হেস্তনেস্ত না করলেই নয়।

মশারির আবডাল ছেড়ে বেরিয়ে এসে ঘরের আলো জ্বাললেন মৃদুলবাবু।

অদ্ভুত। গোটা ঘর জরীপ করেও মশা নজরে পড়ল না, অথচ মঁমঁমঁমঁ শব্দটা কিছুতেই থামছিল না।
গেলাস দুয়েক জল খেয়ে ফের মশারির মধ্যে ফেরত এসে লম্বা হলেন তিনি।

তখনও একটানা মঁমঁমঁমঁ।

মৃদুলবাবুর অস্বস্তিটা চড়চড় করে বাড়তে থাকল। আচমকা টের পেলেন ডান কনুইতে সামান্য জ্বালা। হাত দিয়ে টের পেলেন ফুলে গেছে। কামড়েছে ব্যাটাচ্ছেলে রাস্কেল।

মশাটাকে আরও খান দুই গাল পাড়তে যাবেন কিন্তু তখনই মঁমঁমঁমঁ শব্দটা গেল থেমে। আর বালিশের পাশে রাখা মোবাইল টুং শব্দে বেজে উঠল।

স্ক্রিন অন করে মৃদুলবাবু দেখলেন ব্যাঙ্কের এসএমএস।

**

*বছরখানেক আগে*

- মিস্টার মৃদুল, এই রইল আপনার হাউস লোনের অ্যাপ্রুভাল।
- থ্যাঙ্ক ইউ। আপনাদের ব্যাঙ্কের ইএমআই স্কীম কিন্তু বেশ সস্তা। লোভনীয়।
- মানুষের জন্যই আমাদের ব্যবসা। আগে মানুষ, মুনাফা পরে। আর ইএমাআইয়ের প্রসঙ্গে বলি, মাঝেমধ্যে পেমেন্ট পুরোপুরি করতে না পারলেও চাপ নেবেন না।
- নেব না? হাউজিং লোনের মাসের ইএমআই না পেলে আপনারা বাড়ি থেকে বের করে দেবেন না?
- নেভার।
- গুণ্ডা লেলিয়ে দেবেন না?
- তউবা তউবা। আমাদের অনেক সহজ টেকনিক আছে। ইএমআই উশুলও হবে, অথচ আপনি টেরটি পাবেন না।
- মাইরি? পেনলেস ইএমআই আদায়? টোটালি যন্ত্রণাহীন?
- অলমোস্ট পেনলেস।
- কী'রকম?
- আরে সে'সব পাতি টেকনিকাল ব্যাপার। তবে বললাম তো স্যার, আপনি প্রায় টেরই পাবেন না। দেখছেন না, অল্পদিনেই আমাদের কাস্টোমার বেস কতটা বেড় গেছে!
- আপনারা অনবদ্য।
- আপনারাই আমাদের ভাতরুটি স্যার।
- তা এমন জনদরদী ব্যাঙ্ক আপনাদের,  এমন বিটকেল নাম কেন? ড্রাকুলা ব্যাঙ্ক, এ'টা কোনও নাম হল?

Tuesday, December 12, 2017

সৈনিক ও পোস্টমাস্টার



চারিদিকে বিস্তর গোলাগুলি,  বোমারু বিমান দমাদম তাল ঠুকে যাচ্ছিল শহর জুড়ে। মাঝেমধ্যেই হাড়-হিম করা সব চিৎকার। বেশির ভাগই আর্তনাদ; ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা আর বিলাপ। এ'ছাড়া কিছু আস্ফালনও বাতাসে বারুদের গন্ধের সঙ্গে ঘুরঘুর করছিল;
"দুশমনের মুণ্ডু চাই, হারামজাদাদের রক্ত চাই"। 

এত সব কিছু মাঝে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এই আধ চেনা শহরের ঠিক মধ্যিখানে একটা ভাঙাচোরা প্রাসাদের এক কোণে বসে চিঠি লিখছিলেন কম্যান্ডার নেদু। 

ডিয়ার গিন্নী, 

খতরনাক যুদ্ধ চলছে। এ পক্ষ ইট ছুঁড়ছে তো অপর পক্ষ সোজা পাটকেল তাক করছে খুলিতে। রে রে রে রে ব্যাপার। 

খানিক আগেই মড়মড় করে পাশের বাড়িটা ধ্বসে পড়ল। ও'টা হাসপাতাল ছিল এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত। কিছুদিন ধরে অবিশ্যি বাড়িটা বেওয়ারিশ পড়েছিল। মড়াদের হাসপাতাল না গেলেও চলে। এই আমি যে'খানে বসে এখন তোমায় চিঠি লিখছি; সে'টা কিছুদিন আগেও লাইব্রেরি ছিল। আমি শিশু সাহিত্যের শেলফের সামনে একটা টুল টেনে বসেছি। বইঠই বেশির ভাগই জ্বলে ছাই, শেলফের মাথায় টাঙানো বিভাগের নামগুলো রয়ে গেছে কোনও ক্রমে।  সেই একই কথা, মড়াদের দেশে লাইব্রেরি রাখা মানে সিগারেটকে চাটনিতে ডুবিয়ে খাওয়া। 

যা হোক, যে কথা বলতে তোমায় চিঠি লেখা। এই চিঠি হাতে পেয়ে একটা গান গাইবে? প্লীজ? মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত সুর খেলে বেড়াবে হাওয়ায়। গাইবে? প্লীজ?

ওই। গোলাগুলির শব্দ এগিয়ে আসছে। এখন চিঠি পোস্ট না করলেই নয়। 

ইতি 
শ্রী শ্রী হাসব্যান্ডবিহারী নেদুগুপ্ত। 

মোটা কাগজের খয়েরী খামে যত্ন করে ঠিকানা লিখলেন নেদু কম্যান্ডার ( আহা, নিজের বাড়ির ঠিকানা লেখা খামের দিকে তাকিয়ে থাকলেও বুকে আরাম লাগে। আহা)।

পোস্টবাক্স হাতের কাছেই ছিল। বুকপকেটের ডাকবাক্সে চিঠি ফেললেন কম্যান্ডার নেদু। 

***

ফুরফুরিয়ে উড়ছিলেন নেদুকুমার! বাতাসে বারুদের সুবাস বিলকুল হাপিশ। মেঘলা আকাশ, ভেজা ভেজা হাওয়া আর তা'তে কামিনী ফুলের আনচান করা সুবাস।  

নেদুগুপ্তের টের পেতে সময় লাগলনো যে আর তিনি কম্যান্ডার নন। মিনিট খানেক হল তার চাকরী পাল্টেছে। 

চারদিকে বড় ভালো লাগা। পোস্টম্যান নেদু গুপ্ত বুঝলেন পোস্টবাক্স ক্লীয়ারেন্সের সময় এসেছে। নেদু বুকপকেটের পোস্ট বাক্স খুলে উঁকি মারলেন; একটাই চিঠি। 
আহা, সে চিঠিতে বুলেটের ছোপ! 
আহাম্মকের দল! যাক গে,চিঠি সামান্য ঝলসেছে বটে, তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। 

***

- মিসেস গিন্নীগুপ্ত বাড়ি আছেন?
- কে? পোস্টমাস্টার নাকি?
- তবে আর বলছি কী! চিঠি আছে!
- কার চিঠি?
- বর গুপ্তের! 
- ও মা! তুমি! আচ্ছা মানুষ তো! অমন দুম করে কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে যুদ্ধে যায়? 
- যাহ্‌! তুমি কম খালিফা নও! অমন দুম করে কেউ দু'দিনে জ্বরে সরে পড়ে? 
- সরে না পড়লে চিঠি দিতে আসতে কাকে? 

"খিক খিক" শব্দের বিশ্রী হাসিতে গড়িয়ে পড়তে ভালোবাসেন পোস্টমাস্টার নেদুগুপ্ত। 
মেঘলা দুপুরে কামিনী ফুলের সুবাসের মত গীন্নিগুপ্তের সুর খেলছিল হাওয়ায়।

Friday, December 8, 2017

যুক্তি তর্ক গল্প

“আকাশ কী বিশ্রী রকম নীল দেখেছ”? পকেট থেকে পিতলের ছোট্ট ডিবেটা বের করে এক চিমটি মশলা জোয়ান মুখে ফেলে বলল পার্থ।

লাঞ্চের পর অফিসের নিচে নেমে খানিকক্ষণ আড্ডা দেওয়াটা প্রায় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। অজিত আর দেবনাথের সঙ্গে আড্ডাটাও এই সময় জমে ভালো। দেবনাথ পার্থর মতই পারচেজ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে, অজিত রয়েছে  ফাইনান্সে। খেলাধুলো, সাহিত্য,রাজনীতি, সিনেমা থেকে অফিস-গসিপ; আড্ডা থেকে কিছুই বাদ থাকে না। তবে যা দিনকাল পড়েছে কোনও আড্ডা-তর্কই তো বেশি দিন চলে না। সে দিক থেকে দেখতে গেলে ওদের তিনজনের এই দুপুরের আড্ডার বয়স প্রায় এক বছর হতে চলেছে। দিনের এই সময়টুকু বেশ প্রিয় ছিল পার্থর। সবচেয়ে বড় কথা ওদের তিনজনের মধ্যে গল্প বেশ জমেও ভালো, বেশির ভাগ ব্যাপারেই ওদের মতামত অদ্ভুত ভাবে মিলে যায়।  মিনিট পনেরো গল্প করে একটা সিগারেট ধরায় তিন জনে, তার দশ মিনিটের মাথায় যে যার কাজে ফেরত যায়।

আজকেও যথারীতি দুপুর দেড়টা নাগাদ অফিসের ক্যান্টিনে খেয়েদেয়ে তিনজনে মিলে নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু আগামীকাল থেকে অজিত আর থাকবে না, তিনজনের আড্ডার আজই শেষ দিন। ভাবতেই পার্থর মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। অজিতের মত ফুরফুরে মেজাজের মানুষ বড় একটা দেখা যায় না। কাজেকর্মেও একই রকম চটপটে। তাছাড়া সিনেমা আর সাহিত্যের ব্যাপারেও ভদ্রলোকের জ্ঞানগম্যি নেহাত কম নয়। সবই ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ যে আজ কী হল।

মহাকাব্য নিয়ে কথা উঠেছিল। এ কথা সে কথা হতে হতে মহায়ণ প্রসঙ্গ উঠেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই পার্থ আর দেবনাথ মহায়ণ নিয়ে নিজেদের ভালো লাগার কথা বলছিল। আজ থেকে শ’খানেক বছর আগে যখন অন্ধকার যুগ চলছিল, তখন  মহায়ণের মত মহাকাব্যকেও লোকে হ্যাঠা করত। সে যুগের হাতে গোনা যে কয়েকজন মহায়ণের গুণগ্রাহী ছিল, তাঁদেরও এই অপূর্ব সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধ মহাকাব্যের রসাস্বাদন করতে হত গোপনে। অথচ আজকে সেই মহায়ণ বিশ্ব-দরবারে সমাদৃত, সে কাব্যের অংশ বিশেষ আজ জাতীয় সঙ্গীত, এ নিয়ে দেশের প্রত্যেক মানুষেরই গর্বিত হওয়া উচিত; পার্থ আর দেবনাথের ভাবনাও আর পাঁচটা প্রগতিশীল ভারতীয়র মতই তেমনটাই মনে করত। কিন্তু আজকের চমৎকার আড্ডাটা নষ্ট হল অজিত বেমক্কা উলটো কথা বলায়।

“মহায়ণ অত্যন্ত সস্তা আর নিম্নমানের”। অজিতের এই কথাটা শুনে পার্থ আর দেবনাথ দু’জনেরই মাথা ঘুরে গেছিল।

“তুমি কি পাগল হয়ে গেছ”? দেবনাথ আর পার্থ দু’জনে মিলে অজিতকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সে ব্যাটার জেদ কম নয়। বার বার বলে গেল মহায়ণ নাকি কাব্য-গুণে অত্যন্ত নিম্নমানের। তর্ক শুরু হল, এ’দিকে হাতে সময় কম ছিল।

তার ফলে যা হওয়ার হল। দেবনাথ রাস্তা থেকে একটা আঁধলা ইট ছুঁড়ে মারল অজিতের মাথা লক্ষ্য করে। অজিত একটা ঘা খেয়েই পালাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পার্থ ওকে বাধ্য হয়ে জাপটে ধরে ফেলল। ব্যাটাচ্ছেলের একে গায়ের জোর নেই তার ওপর নিজে একজন হয়ে দু’জনের সঙ্গে তর্ক জুড়েছে। ওকে মাটিতে ফেলে ওর পেটে দমাদম লাথি মারা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। অবশ্য এমন তর্ক কফি হাউসে হলে আজকাল খুব সুবিধে। সে’খানে টেবিলে টেবিলে আজকাল অ্যাসিডের বয়াম আর  অজস্র পেরেকওলা লাঠি রাখা আছে। দুর্বল তর্কবাজের হাড়গোড় ভেঙে, নাড়িভুঁড়ি বের করে দেওয়ার আর বহুরকমের সরঞ্জাম রয়েছে সে’খানে। এমন কী তর্কবাজকে পুরোপুরি নিকেশ করতে ইলেকট্রিক স্লো বার্নিং চুল্লিরও ব্যবস্থাও চালু হয়েছে গতবছর থেকে। সরকারের আমজনতার তর্ক-তৃপ্তির খাতিরে এমন অনেক প্রগতিশীল ব্যবস্থা চালু করেছে ইদানীং; ভাগ্যিস। শোনা যাচ্ছে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অ্যাসিডের বয়াম আর পেরেক-লাঠি প্রত্যেক পাড়ার প্রত্যেক রোয়াকে রাখার প্রপোজাল আসছে পরের পঞ্চবার্ষিকী যোজনায়।  পাড়ায় পাড়ায় তর্ক-নিকেশ চুল্লির ব্যবস্থা এখনই করা যাচ্ছে না জমির অভাবে।

যা হোক, পার্থ আর দেবনাথের কাছে তর্কজয়ের জন্য সে’সব আধুনিক সুযোগ সুবিধে না থাকায়, হাতের কাছের জিনিসপত্র নিয়ে কাজ সারতে হল। ফুটপাথে অজিতের মাথা ঠুকতে ঠুকতে যখন অজিতের মাথা থেকে ঘিলু রক্ত সব বেরিয়ে আসছে তখন পার্থর খেয়াল হল লাঞ্চের সময় প্রায় শেষ। তর্ক এখুনি শেষ না করলে সিগারেট খাওয়ার সময় থাকবে না। সে’বার বাস ভাড়া নিয়ে গণ্ডগোল হওয়ার পর থেকে এক শিশি পেট্রোল নিয়েই ঘোরে পার্থ, সে’টাই অজিতের গায়ে ছড়িয়ে দিল সে। দেবনাথ ইঙ্গিত বুঝতে তৎক্ষণাৎ নিজের জ্বলন্ত লাইটারটাই ছুঁড়ে ফেলল অজিতের গায়ে। অমনি দাউদাউ করে তর্ক ফুরিয়ে গেল।

জোয়ান চিবুতে চিবুতে পকেট থেকে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট বার করেই জিভ কাটল পার্থ। এই যাহ! দেবনাথ নিজের লাইটারটা নষ্ট করে ফেলল এ’দিকে পার্থ নিজের লাইটারটা অফিসের ড্রয়ারে ফেলে এসেছে। অগত্যা সিগারেট না খেয়েই দু’জনকে অফিসে ফিরতে হল। অজিতের ডিপার্টমেন্টে একটা মেমো পাঠিয়ে খবরটা জানিয়ে দিতে হবে। পার্থ আর দেবনাথ যখন অফিসের সদর দরজার সামনে তখন আকাশের নীল অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে অজিত-পোড়ানো ধোঁয়ায়।


Wednesday, December 6, 2017

অঙ্কের ছ্যাঁত, ছ্যাঁতের অঙ্ক



১। 

মান্তুদা জবাব দিয়ে দিয়েছে। ফাইনালে অঙ্ক পরীক্ষায় ভদ্রস্থ নম্বরের আশা প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু যদি কোনও ক্রমে পাশটা করা যায়। কোনও ক্রমে চল্লিশ।

বেশ কিছুদিন ধরে দীপুকে মান্তুদা একা পড়াচ্ছেন। মান্তুদার মতে দীপুর অঙ্ক-ভয়কে ম্যান টু ম্যান মার্কিং না করলে ক্যালামিটি এড়ানো অসম্ভব। গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন রাত্রে মান্তুদার বারান্দায় এসে পড়ে থেকেছে দীপু। প্রবাবিলিটি পারমুটেশন অমুক তমুক পড়ানো শেষ হলে মান্তুদা নিজের পকেট রেডিওতে গান শোনাতেন। সাত-পুরনো হিন্দী গান। রোজ।  

"তোর মনে টার্বুলেন্স চলছে। এতগুলো কনসেপ্ট একসঙ্গে মাথায় ঘুরপাক খেয়ে ঘোল পাকাচ্ছে। সেডিমেন্ট জমতে না দিলে মুশকিল। মিউজিক কে ইউটিলাইজ করতে শেখ। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে, সে খবর রাখিস তো"? 

ডিসেম্বরের রাত বারান্দাকে জাপটে ধরত। দীপুর হাফ সোয়েটার ছাপিয়ে গা শিরশির।  মান্তুদার টেবিলে তাল দেওয়া। দীপুর বুকে " আর হল না" গোছের ছ্যাঁত ছ্যাঁত। 

বারান্দা পেরিয়ে মান্তুদার বাবার নিজের হাতে চাষ করা গোলাপ বাগান। সে বাগানের ও'পাশে গোলাপের সুবাসকে জুতোপেটা করা সারের ঢিপি। তার ও'পাশে সরু গলি। গলির ও'পাশে নীল রঙের দোতলা বাড়ি। 

সেই দোতলার ব্যালকনিতে আবছায়ার সঙ্গে মিশে যেত মান্তুদার রেডিওর "রাহ্‌ হে পড়ে হ্যায় হম কব সে আপ কি কসম, দেখিয়ে তো কম সে কম, বোলিয়ে না বোলিয়ে, হম হ্যায় রাহি পেয়ার কে হম সে কুছ না বোলিয়ে"। 

আবছায়ায় গান আর বাতাসের গুঁড়ো গুঁড়ো শীত মিলে মিশে সে বারান্দায় তৈরি হত নীল রঙের শালের পায়চারি। নীল শাল জানে রাস্তার ও'দিকের বারান্দায় অঙ্ক কাহিল কলজের থেবড়ে বসে থাকা। নীল শাল অঙ্কে তুখোড়, মায়ায় নিখুঁত। 

বুকের ছ্যাঁত নরম হয়ে আসত। দুপুরের জমানো রোদ আর অল্প ন্যাপথালিন মেশানো লেপের সুবাস, ঠাকুমার ছ্যাঁচা পানের স্বাদ আর মায়ের হাতে মাখা আলুসেদ্ধ; সমস্ত মিলে মনের অসোয়াস্তি কমে আসত। দীপুর বুকের ভিতরের যাবতীয় "হল না" ভাব উবে যেত।  
ব্যালকনির গুনগুন আর রেডিওর মিনমিন বাতাসে মিশে অন্য ছ্যাঁত তৈরি হত 
"দিল পে আসরা কিয়ে, হম তো বস ইউ হি জিয়ে, 
এক কদম পে হস লিয়ে, এক কদম পে রোল লিয়ে"।  


২।

"দীপক, ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া এই কোয়ার্টারের মার্কেট শেয়ার কতটা নেমেছে"?

"ইয়েস স্যর? আমায় কিছু বললেন"?

"হোয়াটস রং উইথ ইউ? তোমার মার্কেট শেয়ার প্লাঞ্জ করছে আর তুমি ক্লুলেস হয়ে বসে রয়েছ"? 

দীপকের কানে বুকে দমাদম আছাড় খেতে থাকে উৎকট সব অর্থহীন শব্দ; মার্কেটশেয়ার, রেস্পন্সিবিলিটি, টার্গেটস, ফোকাস...আরও কত কী। শহরের ঠুঁটো ডিসেম্বরে মান্তুদার রেডিও খাপ খেত না কিছুতেই। বুকে ছ্যাঁত জমতে শুরু করে, স্পষ্ট টের পায় দীপক।  

ছ্যাঁতছ্যাঁতের মেঘ ক্রমশ ডাগর হয়ে বুক ভারি করে ফেলে। দীপুর আঙুলগুলো তিরতির করে কাঁপতে থাকে। নোটেশনেও অঙ্ক থাকে।  মান্তুদার ফতুয়ার পকেট থেকে বেরোনো নীল কালো রেডিওটার কথা মনে পড়ে দীপুর। বারান্দার ও'পাশে গোলাপ বাগান, তার ও'পাশে রাস্তা, রাস্তার ও'দিকে দোতলা বাড়ি। ব্যালকনি। 

"দর্দ ভি হমে কবুল, চ্যেন ভি হমে কবুল 
হমনে হর তরহ কে ফুল হার মে পিরো লিয়ে"। 

দীপু বুকের মধ্যে অঙ্ক পরীক্ষা মার্কা "হল না"র জাপ্টে ধরা টের পায়। "আর হল না"গুলো  আর উবে যেতে পারে না। 

নীল শালের "বাবু দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে" মার্কা অপ্রয়োজনীয় স্প্যাম এসএমএস ডিলিটি করে, মার্কেট শেয়ারের জরুরী স্প্রেডশিটে চোখ রাখেন দীপক চ্যাটার্জী।  ইয়ারফোনে ছ্যাঁত-রেগুলেটর:

"ধুপ থি নসীব মে, ধুপ মে লিয়া হ্যায় দম, 
চাঁদনী মিলি তো হম, চাঁদনী মে সো লিয়ে"।