Wednesday, April 5, 2023

সুমনার বিয়ে

মেজদার বিয়ের দামী আদ্দির পাঞ্জাবিটা আজ ধার করতে হল। মেজদা অবশ্য না বলেছিল, একটা সেলফিশ জায়্যান্ট তৈরি হচ্ছে দিনদিন। মেজবৌদি ম্যানেজ করে দিয়েছে। ভেবে খারাপ লাগে যে অমন একজন ভালোমানুষের কপালে এমন বিটকেল একটা বর জুটেছে। যাকগে। এ'বারে মাংসের ঝোলের ছিটে না ফেলে পাঞ্জাবি ফেরত দিতে পারলেই ল্যাঠা চুকে যায়। সেজদির ড্রেসিংটেবিল থেকে আতরের শিশিটা সরাতে হয়েছে। জয়ন্তদার সেলুনে গিয়ে দাড়ি কাটিয়ে এসেছি। বাবার অফিসের ফেয়ারওয়েলে পাওয়া সাদা কাশ্মীরি শালটাও আলমারি থেকে নামিয়ে নিয়েছি। শীত তেমন নেই, তবে ও জিনিস কাঁধে ফেলতে পারলে, একটা ইয়ে, ওই যাকে বলে গ্র্যাভিটি আসবে আর কী।

আজকের দিনটা হেলাফেলার নয়। সুমনার বিয়ে! ও ভেবেছেটা কী! ও বিয়ে করেছে বলে আমি সতেরো মাস বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদব? সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে বসে ফলমূল খেয়ে নেটফ্লিক্স না দেখে দিন গুজরান করব? বলিহারি। ভারী তো বছর চারেকের প্রেম। আর ওর অত ঘ্যাম কীসের? মাত্র সাতবার প্রপোজ করার পরেই তো সুড়সুড় করে "হ্যাঁ" বলে দিয়েছিল। হুহ্‌! সুমনা! আরে অমন কত সুমনা আসবে যাবে। এইত্তো সে'দিন, অফিস-ফেরতা বাসের ভিড়ে একজন স্মার্ট মেয়ে আমার কাছে খুচরো চাইলে। ওই চাওয়ার স্টাইলেই আমি বুঝতে পেরেছি যে আমায় ওঁর ভালো লাগছে। মানে, ওই। স্পেশাল ভালো লাগা যে'টাকে বলে। কিন্তু ঢলে পড়াটা আমার ধাতে নেই, আমি পাত্তা দিইনি। খুচরো দেওয়ার পরেই একবার স্রেফ ভদ্রতাবসত ওর নাম আর মোবাইল নম্বর জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম। ও বলেনি, মেকি রাগ দেখিয়ে অন্য দিকে সরে গেছিল। কিন্তু আমি জানি ওর মন পড়েছিল আমার দিকেই। লাজুক হলে যা হয় আর কী। আর দু'তিনবার জিজ্ঞেস করলেই নির্ঘাত ফোন নম্বর দিয়ে দিত, বলা যায়না; দু'কলি গানও শুনিয়ে দিতে পারত হয়ত। কিন্তু ও'সব আমার পোষায় না। কাজেই সুমনা যদি ভেবে থাকে যে ও চলে যাওয়ায় আমার জীবন ফাঁকা হয়ে গেছে, তার উত্তরে একটা মিচকি (কিন্তু মারাত্মক ধারালো) হাসি ছুঁড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকবে না।

সুমনা ভেবেছিল, বিয়েতে দায়সারা একটা নেমন্তন্ন করে আমায় ইনসাল্ট করবে। বলে কিনা, "পারলে এসো"! আরে আমার নাম ভাস্কর বসু। দু'বছর শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম। রেলের অফিসের কনট্রাক্টরের হয়ে দাপটের সঙ্গে কাজ করছি। আমার দাদুর দাদু গোবরপুকুর গাঁয়ের তালুকদার ছিলেন। অমন জমকালো বিয়ের কার্ড ছাপালে, তার একটা আমায় দেওয়া যেত না? আর তা'ছাড়া, এ'টা কোনও বলার স্টাইল হলো,"পারলে এসো"! হুহ্‌! তা বলে সে যদি ভেবে থাকে, অমন দায়সারা ভাবে বললে আমি যাব না, সে'টা ভুল প্রমাণ করার দায়ও আমার। ও জানেনা আমার গ্রেপভাইন নেটওয়ার্ক কতটা মজবুত। ওর বিয়েতে যে রোগনজোশ আর বিরিয়ানি দু'টোই থাকছে, সে'খবর আমি পেয়েছি। কাজেই ওর "পারলে এসো"তে দমে না গিয়ে আমি যাব! ভালোই হবে, ওই ম্যাদামারা বরের পাশে আমায় দেখে ওর চোখ ঝলসে যাক। হাত কামড়াক। বুক হুহু করে উঠুক। চোখের জল আটকে রাখবে হয়ত। আহা, সামান্য একটা ভুলে; জমিদার বংশের সঙ্গে এমন সম্পর্ক কেটে গেল। সুমনার ওপর খানিকটা মায়াই হচ্ছে বটে। ভারি তো ইঞ্জিনিয়ার বর! ও'সব এলেবেলে ব্যাপার। সুমনার বর কি আমার মত কায়দা করে চাঁদা আদায় করতে পারবে? পারবে হাওড়ায় ঢোকা চলন্ত ট্রেনে সবার আগে উঠে পছন্দমত জানালা দখল করতে? সুমনার ফিউচার ভেবে সত্যিই খারাপ লাগছে।

যা হোক। একপ্রকার বাধ্য হয়েই ওর বিয়েতে আজ আসতে হল। সুমনা বোধ হয় এখনও সাজগোজ করছে। বরযাত্রী আসতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরী। আমি একটু আগেভাগেই চলে এসেছি। যাতে সুমনা না ভাবে যে আমি আসতে দ্বিধা করছি। সবে দু'চার রাউন্ড ফুচকা, তিন প্লেট চিকেন পকোড়া আর পাঁচ কাপ কফি খেয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি। এমন সময় সুমনার বাবার হাঁকে পিলে চমকে গেল। ভদ্রলোকের গলার স্বর দিয়ে তাঁবুর কাপড় ইস্তিরি করা সম্ভব বোধ হয়। 

"এই যে বাবা, ভাস্কর! পাড়ার ছেলে তোমরা, তোমাদের সাহায্য ছাড়া বিয়েবাড়ি উতরোবে কী করে। আমার তো এই একটিই মেয়ে। তাই তোমাদেরকেই বলতে হবে"। 

"কী ব্যাপার কাকু"?, সাবধানে জিজ্ঞেস করতে হল।

"একশোটা চেয়ার এসেছে। বরযাত্রীর জন্য। ওই ভ্যানে করে এসেছে। সে'গুলোকে ছাতে তুলে পাততে হবে। বরযাত্রীদের সে'খানেই বসানো হচ্ছে কিনা"। 

"তা ওই ভ্যানওলাকে বলে কয়ে যদি..."। 

"আর বলো কেন! ব্যাটা বলে ছাতে তুলতে বাড়তি পয়সা লাগবে। তা, তোমাদের মত ব্রাইট ছেলেপিলে থাকতে আবার বাড়তি খরচ করার কী দরকার বলো"। 

আমি যে ব্রাইট সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ কোনোকালেই আমার ছিলনা। এত বড় একটা সত্যি কথা স্বীকার করে নেওয়ার সৎ-সাহস ক'জনের থাকে। এই সুমনাই তো আমার পার্সোনালিটির ধারে জাস্ট কচুকাটা হয়ে গেল। কিন্তু মুখে স্বীকার করলে না। কাজেই সুমনার বাবা যখন অমন দরাজ গলায় স্বীকার করে নিলেন যে আমি ব্রাইট, চেয়ার ছাতে তোলার কাজটাকে না বলা গেলনা। সমস্যা হল, ভীষণ ব্রাইট হওয়া সত্ত্বেও দেখলাম একশো চেয়ারকে চারতলার ছাতে তোলার কাজটা ঠিক মামুলি নয়। দু'চারটে কচি-ছেলে ছোকরাকে বললাম একটু হাত লাগাতে, কিন্তু তারা বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দিল না। অবক্ষয় আর কী। তা'ছাড়া, তারা হয়ত তেমন ব্রাইট নয়। যাকগে, মোটের ওপর বার পঁচিশ ওঠা নামা করতে হল। তার ফাঁকে চেয়ারের খোঁচায় মেজদার সাধের পাঞ্জাবিতে একটা ফুটো হয়ে গেল। একদিক থেকে বেশ হয়েছে। এ পাঞ্জাবি মেজদার গায়ে মানায় না। ওর সেই পার্সোনালিটিই নেই।

চেয়ারটেয়ারের ব্যাপারটা মিটে যাওয়ার পর দেখলাম হাঁফ ধরে গেছে। ঠ্যাং টনটন করছে। এ'বারে গিয়ে বিরিয়ানি-রোগনজোশের ব্যাপারটা সেরে নিতেই হয়। বরযাত্রী ঢুকে পড়লেই ভিড়-টিড় বেড়ে যাবে হয়ত। ছাত তখনও ফাঁকা। কিন্তু আচমকা মনে হল পা দু'টো লোহার মত ভারী। নাহ্‌, ওই বরযাত্রীদের চেয়ারেই খানিকক্ষণ না বসলেই নয়। একদু'জন ছাত সাজানোর কাজে ব্যস্ত ছিল, তাদের একজনের কাছে জল চাইলাম। পাত্তা দিলেনা। ওরা জানে না যে এককালে আমি শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম। জানলে ঝুঁকে সেলাম করত। যাকগে। হামবড়ামোর অভ্যাস আমার কোনোকালেই ছিল না। এমন সময় কাঁধে একটা টোকা পড়ায় চমকে উঠলাম।

সুমনা। নির্ঘাত ওই কোণের ছাতের ঘরে ছিল এতক্ষণ। সাজগোজ অর্ধেক হয়েছে। মুখে একগাদা স্নোপাউডার লেপা আছে, তবে তা সত্ত্বেও মোটের ওপর মন্দ লাগছিল না। একটু পালিশ-টালিশ করে নিলে আমার পাশে মানিয়েই যেত বোধ হয়। সামান্য উনিশ-বিশ হলেও আমি অ্যাডজাস্ট করে নিতাম। যাকগে, সবার কপালে তো সব জোটেনা; সুমনা না হয় সব কিছু নাই পেলো।

দেখলাম সুমনার একহাতে একটা স্প্রাইটের দু'লিটারের বোতল, তার মধ্যে নির্ঘাত ও'টা কোল্ডড্রিঙ্কস নয়। জল। সে'টা এগিয়ে দিয়ে বললে, 

"নাও"। 

"উইশ ইউ অল দ্য ভেরি বেস্ট", জলের বোতলটা নিয়ে সাহেবি উচ্চারণে বললাম। 

"তুমি এমন গাধা কেন"? এই সুমনার এক রোগ। স্মার্ট ইংরেজি কথার উত্তরে ভেতো বাংলায় গাম্বাটের মত কথা বলবে। গা জ্বলে গেল ফস করে। 

"তোমার চোখে ঠুলি আছে সুমনা। তবে তোমার বাবা আমায় চিনেছেন। আমি যে কতটা ব্রাইট..."। 

"লোক না হাসালে চলছিল না"?

"লোক হাসানো? এখসখিউজ ম্যি"?

"শোনো। বিয়ের ক'দিন পর একবার আমাদের বাড়িতে আসবে? আমি আর সোম খুব খুশি হব"।

"সোম? ওহ। সোমেশ্বর। ওউখখে। শ্যুওর"।

"আমি ঠিকানা পাঠিয়ে দেব"।

"থ্যাঙ্খস"।

"এখন তুমি বাড়ি চলে যেও। কেমন? আমার বাবাকে তো চেনো। নয়ত গোটা রাত ধরে কিছু না কিছু বেগার খাটাবে"।

"বিয়েবাড়ির কাজকর্ম। খুব রিলায়েবল কেউ না হলে তো আর তার ওপর দায়িত্ব দেওয়া যায় না"।

"ভাস্কর। আজ এসো। আমি নিজের হাতে রেঁধে তোমায় রোগনজোশ আর বিরিয়ানি খাওয়াব। আর সঙ্গে ভেটকির ফিশফ্রাই। বোনাস। কিন্তু প্লীজ আর বাবার পাল্লায় পড়ো না আজ"। 

"ফিশফ্রাই ব্যাপারটাকে আমি খুব রেস্পেক্ট করি"।

"জানি তো"।

"অফ কৌর্স। ওউখখে দেন"। 

"খুব মন খারাপ ভাস্কর"?

"তা...তাই মনে হচ্ছে নাকি? আসলে আচমকা ফিশফ্রাই ভেবে মেডিটেট করছিলাম। তবে দেখো, নেমন্তন্ন করে আবার ভেটকির বদলে বাসা খাইও না। আফটার অল, আমি শিবতলা সেভেন স্টার ক্লাবের শীতলাপুজো কমিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ছিলাম বছর দুই"।

"মনে থাকবে। এ'বার আমার খোঁজ পড়ার আগে আমি কাটি"। 

"আমিও। আসি"। 

"আর শোনো। তোমার কাঁধের ওপর অমন সুন্দর যে শালটা ছিল। ওই দ্যাখো, ও'দিকে ও'টা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ধুলো-কাদায় একাকার কাণ্ড। ও'টা নিয়ে যেতে ভুলো না"। 

সুমনা চলে গেল। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সুমনার নতুন সংসার, পালিশ করা সেগুন কাঠের ডাইনিং টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো বিভিন্ন পদের কথা ভাবার চেষ্টা করলাম। মাংস কষা, পোলাও, বিরিয়ানি, রাধাবল্লভী ইত্যাদি। সঙ্গে এক ট্রে ফিশফ্রাই। আহা। জেনুইন ভেটকি বোধ হয়। সুমনা মাছ ভালো চেনে। কিন্তু কিছুতেই সেই কল্পনায় নিজেকে দেখতে পেলাম না। তাজ্জব ব্যাপার।

যা হোক। চোখে জল এলো; সম্ভবত বাবার অমন সাধের কাশ্মীরি শালটার কাদামাখা অবস্থা দেখে। সিঁড়ির নীচেই সুমনার বাবা দাঁড়িয়ে কাজকর্ম তদারকি করছিলেন। পাইপ বেয়ে উলটো দিক দিয়ে নেমে সরে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হল।