Friday, September 10, 2021

পুজোর ক্লিশে



- এই যে গুরুদেব।

- কী ব্যাপার চ্যালা..। মনটন খারাপ নাকি?

- আরে সাংঘাতিক মনখারাপ গুরু।

- ও'টা বোধ হয় থার্ড পেগের এফেক্ট।

- নেশার ঝিমঝিম যে লেগেছে সে'টা ডিনাই করছি না, তবে এ মনখারাপ মাতলামোর নয় গো।

- নতুন করে প্রেমেট্রেমে পড়োনি তো? মাঝবয়সে এসে অমন ছুকছুক একটু হতেই পারে।

- আরে না না। এ বয়সে নতুন করে প্রেমের চেয়ে ওই গৃহপালিত এক্সারসাইজগুলোই বেশি এন্টারটেনিং। এনগেজিং। এই যেমন ধরো গিন্নী লুচি বেলে চলেছে আর প্যারালালি আমি ভেজে চলেছি। পার্ফেক্ট রিদমে। সব ক'টা লুচি নিখুঁত, কোনও এ'দিক ও'দিক নেই। ওই নতুন প্রেমের 'ওগো-হ্যাঁগো-তোমায় ছাড়া দুনিয়া ব্ল্যাকহোল-গো'..ও'সব আর এই বয়সে সইবে কেন বলো গুরু। 

- তা'হলে চ্যালা, হোয়াই দ্য মনখারাপ?

- জীবনের ট্র‍্যাজেডিটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে গুরু। সে জন্যেই হাহাকার।

- কী'রকম?

- এই ধরো পুজো আসছে। ছেলেবেলার এক্সাইটমেন্টটা ট্রিগার করতে চাইছি কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। ভাবছি এন্তার খাওয়াদাওয়া করব। বিরিয়ানিতে সাঁতার কাটব, চপ-কাটলেটে ভেসে যাব। ভেবে যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি বুক শুকিয়ে যাচ্ছে রিয়েলিটির কথা ভেবে৷ আজকাল সল্টেড বাদাম চিবুলেও বুকজ্বালা। কোথায় বিরিয়ানি, কীসের কাটলেট। সেই ট্যালট্যালে চিকেন স্ট্যুতেই স্বস্তি। বড় জোর ট্যাংরামাছের পাতলা ঝোল। তারপর ধরো প্যান্ডেল প্যান্ডেল ঘুরে রাতকাবার করাটা একসময় মনে হত ঘ্যাম। এখন ভীড় ভাবলেই বুক কেঁপে উঠছে। পুজোসংখ্যা ডাইজেস্ট করতে না পেরে ক্যালভিন আর হবসের স্ট্রিপ পড়ে সময় কাটাচ্ছি৷ আচ্ছা গুরু, সবই কি ক্লিশে? এ'সব কি আর কোনওদিনই জেনুইনলি উপভোগ করতে পারব না? আর, দ্য বিগার ফিয়ার। ইরিট্রিভেবলি বুড়িয়ে গেলাম নাকি? গুরু? 

- ক্লিশে উড়িয়ে দেবে বিদগ্ধ মানুষজন। তোমার আমার সে দায় নেই হে চ্যালা। চেনা পরিচিত ভালোলাগাগুলোকে জড়িয়ে ধরব, বুক বাজিয়ে ডিফেন্ড করব। মনের সুখে সে'সব ক্লিশেকে আগলে রাখব। অত ভেবে অফিসের স্প্রেডশিট সাজিও, বৃষ্টি নামলে বেগুনী অন্বেষণ করাতেই আমাদের মুক্তি।

- তবে 'পুজো আসছে পুজো আসছে' করে লাফিয়ে উঠতে পারছি না কেন? কেউ কানের কাছে পুজো-পুজো ঘ্যানঘ্যান করলেই কান মুলে দিতে ইচ্ছে করছে কেন?

- সে'টা ক্লিশে ডিমোলিশন নয়। বরং ইয়ার্নিং ফর ইট। 

- গুরু, উচ্চমাধ্যমিকে ইংরেজিতে ঠেকেছিলাম। বাংলায় বলো। 

- ছেলেবেলায় পুজোটা তুমি মামাবাড়ি কাটাতে, তাই না?

- প্রতি বছর। উইদাউট ফেল। আহা। গুরু, সে কথা মনে পড়ায় 'পেটে মদ, বুকে হুহু, চোখ জল' সিচুয়েশন  হয়ে গেল। আর দাদু। আর দিদা। আর মামাবাড়ির পাড়ার সে আটপৌরে পুজো। আর সে মানুষগুলো।  আর সে পাত পেড়ে খিচুড়ি খাওয়া। আর দাদু। আর দিদা। আর সে অষ্টমীর সন্ধ্যের থিয়েটার। আর নবমীর জলসা। আর ইয়ে, দশমীর সিদ্ধি। আর দাদু। আর দিদা।  

- ওয়াটার ওয়াটার এভ্রিহোয়্যার নট আ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক। চারদিকে পুজো পুজো ভাব চ্যালা, অথচ তুমি তোমার পুজোয় ফিরতে পারছ না।

- দাদু দিদা সে পুজো বগলদাবা করে হাওয়া। 

- একটা কথা বলি চ্যালা? 

- নিশ্চয়ই গুরু।  

- তোমার দাদু দিদা তোমার ভালোবাসার পুজোর স্মৃতি তৈরি করে গেছেন, যে স্মৃতি নেড়েচেড়ে আজও তুমি চাঙ্গা হয়ে ওঠো। তাই না? তেমনই, নিজের বুড়োটেপনায় আটকে না থেকে, অন্য কচিকাঁচাদের হয়ে ভালোবাসার পুজো তৈরির দায়ও তো তোমার ওপর খানিকটা বর্তায়, তাই নয় কি?

- দায়? আছে, তাই না?

- আলবাত। আর সে'টা দায়ভার নয়। আমার ধারণা সে'টাও বেশ তৃপ্তির। 

- গুরু, পুজো সত্যিই চলে এলো৷ তাই না?

- একদম! একদম!

হুলো বনাম গুল্টে

- এই যে। হুলোদা, বড্ড লেগেছে নাকি গো?

- শুয়ার৷ 

- আহ্৷ চটছ কেন৷ চটছ কেন৷ 

- দু'দুটো গুলি লেগেছে রে হারামজাদা।

- বাহ্ রে৷ গুলি যেন একা আমি চালিয়েছি? তুমি বুঝি আমার দিকে তাক করে ফুচকা ছুঁড়েছিলে? মাস্তানদের এ'দল ও'দলের মধ্যে এমন একটু ইন্টুপিন্টু না হলে কি চলে বলো হুলোদা? তবে দু'টো গুলির একটা তো তোমার দাবনায়৷ অন্যটা পেট ঘেঁষে বেরিয়েছে৷ চিন্তা নেই গো।

- দাঁত ক্যালাচ্ছিস কেন রে গুল্টে? হুলো গুণ্ডা ঘায়েল হয়ে পড়ে রয়েছে, মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে..সে'টা দেখে খুব ফুর্তি! তিলে তিলে কষ্ট না দিয়ে শেষ না করলে পয়সা উসুল হবে না, তাই না? 

- মাইরি বলছি হুলোদা৷ তুমি অন্য দলের হোঁতা হতে পারো, কিন্তু তোমায় দিনে একবার মনে মনে সেলাম না ঠুকলে আমার চলেনা৷ কী নিশানা তোমার হাতের পিস্তলে গুরু৷ আর কী র‍্যালা তোমার! বাজারে সবাই হুলো মাস্তানের নাম শুনলেই বমকে যায়৷ 

- আমার বডিতে গুলি ঠুসে দিয়ে এখন বলছিস আমায় সেলাম না ঠুকলে চলে না? 

- আরে গুলি ঠোকাটা লাইনের কাজ৷ ব্যবসা।  সেলামটা তো বুকভরা ভালোবাসা৷ 

- বাজে ভাট না বকে দে'না দু'টো গুলি আমার খুলিতে পুরে৷ বেঁচে যাই৷ বড্ড যন্ত্রণা রে৷ দে না আর দু'টো ঠুকে রে ভাই গুল্টে৷ 

- তোমায় ছ'মাস ধরে ফলো করছি জানো হুলোদা৷ তোমার লাশ ফেললে আড়াই লাখ পাওয়ার কথা৷ আড়াই লাখ গুরু৷ ক'দিনের নিশ্চিন্দি৷ তবে তুমি মাইরি গভীর জলের মাছ, তোমায় বাগে আনা যে কী চাপের৷ আমি বেশ বুঝেছি। 

- আমি জানি তুই পিছনে লেগেছিলিস৷ তক্কে তক্কে ছিলাম তোকে উড়িয়ে দেওয়ার৷ কিন্তু আজ সুযোগ পেয়েও গুলিটা কী'ভাবে যে ফস্কে গেল..৷ যাক  শালা, এ লাইনের এ'ছাড়া আর কী হবে৷ ভ্যানতারা না করে শেষ করে দে গুলটে৷ 

- আচ্ছা হুলোদা, তোমার ছেলের নাম বাপ্টু, তাই না?

- গুলটে! লাইনের লড়াই, লাইনেই রাখ৷ আমার লাশের সঙ্গে হিসেবকিতেব খতম। বাপটু একটা ছ'বছরের শিশু৷ ওর ক্ষতি করিস না গুলটে৷ তোর পায়ে পড়ি ভাই..।

- ও মা৷ না না৷ কী ফুলের মত মিষ্টি তোমার ছেলে হুলোদা৷ ও স্কুলের গেট থেকে বেরিয়েই তোমার দিকে ছুটে আসে৷ আমি আড়াল থেকে দেখি৷ তুমি ওর গালে সাপটে ইহামি খাও৷ আহ হুলোদা, বুক জুড়িয়ে যায় মাইরি৷ মা কালীর দিব্যি৷ 

- গুলটে৷ ভাই৷ তোর গায়ে মানুষের রক্ত থাকলে তুই বাপটুর ক্ষতি করবি না৷ শোন না ভাই, আমার বাড়ির মেঝের নীচে চার লাখ টাকা সমেত ব্রিফকেস আছে৷ তুই ওটাও নিয়ে নিস৷ আমার লাশ কুচিকুচি করে কুত্তাদের খাওয়াস৷ কিন্তু আমার ছেলেটার ক্ষতি করিস না, গুলটে আমি তোর পায়ে পড়ি৷ 

- না গুরু না৷ আমি মাস্তান৷ গুণ্ডা৷ হারামিও৷ কিন্ত, তুমি যা ভাবছ আমি তা নই হুলোদা৷ মা কসম৷ শোনো, আমি তোমার লাশ ফেলতে আসিনি৷ কাছের হাসপাতালে খবর দিয়েছি, এই দু'চার কদমের মধ্যেই আছে৷ লোকজন আসছে তোমায় নিয়ে যেতে৷ বাপটু বাপকে হারাবে, মন মানছিল না হুলোদা৷ 

- গুল্টে!

- মা কসম৷ ওই দেখো, বললাম না৷ ওই যে, অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ আসছে৷ লোকেশন বুঝিয়ে দেওয়া আছে৷ তোমার কাছে এলো বলে৷ তোমার কিছু হবে না হুলোদা৷ দেখে নিও। বাপ্টুর বাপের কিছু হবে না। আমি আসি।

- তুই যাচ্ছিস? তুই সত্যিই আমায় খতম করবি না ভাই?

- বাপটুর বাপের জান কোন মায়ের ব্যাটা হাতড়ে নেবে বলো৷ তুমি না থাকলে ওকে হামি কে খাবে গুরু? যাক গে, আসি আমি।  

- শোন গুল্টে, ক'দিন পর দেখা করিস, লুকিয়ে৷ তোর আড়াই লাখের ক্ষতি হবে না৷ কেমন?

- হুলোদা৷ আর দেখা তো হবে না৷ 

- দেখা হবে না?

- তোমার বন্দুকের নিশানাকে কি এমনি এমনি সেলাম ঠুকি গুরু? আমি পাঁচটা গুলি ছুঁড়লাম৷ তিনটে নষ্ট, একটা বেজায়গায়, অন্যটা ছুঁয়ে হাওয়া৷ কিন্তু হুলোদা, তুমি যে ওই একটামাত্র ফায়্যার করলে, সে'টা ফস্কেছে ভেবেছ? না গুরু৷ সোজা আমার দু'চোখের মধ্যিখানে৷ ওই ও'দিকে ভালো করে দেখো, আমার লাশ দেখতে পাবে৷ দেখতে পাচ্ছ গুরু? ওই যে, দেখতে পেয়েছ তো! যাক!

- গু..গুল্টে।

- আমার ছেলের বয়স সাড়ে পাঁচ৷ ডাকনাম পিকলু৷ হুলোদা! এক্কেবারে চলে যাওয়ার আগে তোমার কাছে এলাম একটা আবদার নিয়ে দাদা৷ তুমি সুস্থ হয়ে উঠলে, ওই যে আড়াই লাখ টাকার কথা বললে, সে'টা পিকলুর মায়ের কাছে পৌঁছে দেবে? দিলে মা-ব্যাটার ক'টা দিনের জন্য একটা হিল্লে হবে৷ দেবে তো? আমি জানি তুমি দেবে৷ তুমি নিজে বাপ হয়ে এ'টুকু না করে থাকতে পারবে না৷ আসি গুরু, বাপটুকে আমার হয়ে একটা এক্সট্রা হামি খেও পরের বার৷

Tuesday, September 7, 2021

ক্রিকেট, পৃথিবী, ভালোবাসা



"কতটা পেরোলে পরে পথিক বলা যায়"৷ গানের কথাগুলো লেখার সময় সুমন একটা লাইন ফস্ করে লিখে ফেলার পর নির্ঘাৎ কেটে দিয়েছিলেন, " কতটা ক্রিকেট বুঝলে তবে ক্রিকেট রসিক বলা যায়"? অন্যান্য সব জটিল ও বেয়াড়া প্রশ্নদের মত, এরও কোনও সদুত্তর জোটানো সম্ভব নয়৷ সদুত্তর দেওয়া কেন সম্ভব নয়? সে পোয়েট্রি দু'জন মানুষের নিজেদের জীবন ও মৃত্যু দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন৷

একজন বিলিতি সাহেব হ্যারি থম্পসন৷ অন্য জন শ্রীলঙ্কার ডাব্লু জি করুণাসেনা৷ তাঁদের মধ্যে প্রচুর অমিল৷ একজন রক্তে মাংসে বেঁচেবর্তে ছিলেন, অন্যজন নেহাতই এক টুকরো কল্পনা৷ একজনের জন্য আনন্দধারা বহিছে ভুবনে, অন্যজন কপাল-দিয়ে-পেরেক-ঠোকা বিটকেল মেজাজের মানুষ৷ একজন শখ-শৌখিনতায় ভরপুর, অন্যজন ধ্যাত্তেরিকাঁচকলায় দিন গুজরান করা বান্দা৷ একজনের সেন্স অফ হিউমরে পালকের সুড়সুড়, অন্যজনের সেন্স অফ হিউমরে বিছুটি আর চিমটির খুনে কম্বিনেশন; কিন্তু দুইই অব্যর্থ৷

দু'জনের যোগাযোগ শুধু একটাই বিন্দুতে; ক্রিকেটের প্রতি অদম্য ভালোবাসায়৷

হ্যারি একটা ক্রিকেট দল তৈরি করেছিলেন৷ ক্যাপ্টেন স্কট একাদশ৷ সে দলের যাত্রা শুরু এমন একদল ক্রিকেটারদের নিয়ে যাদের বেশিরভাগের ক্রিকেট দৌড় বোধ হয় আমার সঙ্গে তুলনীয়৷ তারা প্রচুর খেলত আর স্বাভাবিক কারণেই এন্তার হারত৷ অথচ সেই অজস্র গোহারানেও হ্যারির ক্রিকেটপ্রেম দমে যায়নি৷ বরং ক্যাপ্টেন স্কট একাদশ প্রতিটা মহাদেশ সফর করেছে ক্রিকেট খেলতে৷ আর সেই সফর নিয়েই হ্যারি থম্পসনের লেখা 'পেঙ্গুইনস স্টপড প্লে'৷ বইটা ধীরেসুস্থে পড়তে হয়েছে, কারণ প্রতি প্যারাগ্রাফে খ্যাকখ্যাক করে হাসলে পড়ার স্পীড কমবেই৷ ব্রিটিশ হিউমর হোমিওপ্যাথির বড়ির মত সুমিষ্ট কিন্তু কাজের বেলায় অ্যান্টিবায়োটিকের ঠাকুর্দা; তার প্রমাণ এই বই৷ জীবণের শেষ দিন পর্যন্ত হ্যারি ক্রিকেট নিমজ্জিত ছিলেন; দুর্দান্ত খেলে নয়, খেলার প্রতি ডিসিপ্লিনে নয়, এমন কি ক্ষুরধার ক্রিকেট বিশ্লেষক হিসেবেও নয়৷ হ্যারির ক্রিকেটে থাকা স্রেফ ভালোবাসায়৷ নিপাট ভালোবাসায়৷ 'পেঙ্গুইনস স্টপড প্লে' নেহাতই সেই ভালোবাসার গল্প৷

করুণাসেনা আবার সুমিষ্ট হিউমরের ধার ধারেন না৷ তাঁর অস্ত্র এফোঁড়ওফোঁড় করা সারকাজম৷ ভদ্রলোক ক্রিকেটের ফিল্টার দিয়ে জীবনকে চিনেছেন, ক্রিকেট নিয়ে বেমক্কা বেহিসেবি আলগা কথাবার্তা তাঁর ঘোর না-পসন্দ৷ ক্রিকেট তাঁর কাছে একমাত্র পবিত্র সত্য৷ তিনে নিজে সেঞ্চুরি বা ফাইফার হাঁকানো খেলোয়াড় নন, বরং একজন ধারালো ক্রিকেট জার্নালিস্ট এবং ক্রিকেট সত্যের একনিষ্ঠ উপাসক৷ যুক্তি, লজিক বা হিসেবের অবমাননা দেখলেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবেন৷ দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো সমস্ত ঘটনাপ্রবাহকে তিনি ক্রিকেটের স্কেলে মেপে তাদের গুরুত্ব নির্ধারণ করেন৷ তবে হ্যারির মতই, তাঁরও ক্রিকেটে থাকা স্রেফ ভালোবাসার জোরে৷ শেষ বয়সে এসে তিনি খোঁজ শুরু করেছিলেন শ্রীলঙ্কার হারিয়ে যাওয়া জিনিয়াস;
ক্রিকেটার প্রদীপ ম্যাথিউ সম্বন্ধে৷ সে এক রুদ্ধশ্বাস কাহিনী৷ অবিশ্যি করুণাসেনা বা প্রদীপ, দু'জনেই শেহান করুণাতিলকের কল্পনা মাত্র, তাদের ঠাঁই স্রেফ 'চায়নাম্যান - দ্য লেজেন্ড অফ প্রদীপ ম্যাথিউ' বইটিতে৷ কিন্তু এ বইকে গড়পড়তা ফিকশন হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। শ্রীলঙ্কা সম্বন্ধে এমন ধারালো সোশ্যাল কমেন্ট্রি যে খুব বেশি নেই তা বলাই বাহুল্য৷ এ বইয়ের মূলে রয়েছে শ্রীলঙ্কা আর সে'খানকার মানুষ৷ ক'দিন আগেই পড়েছিলাম 'দিস ডিভাইডেড আইল্যান্ড'; নন-ফিকশন। শ্রীলঙ্কাকে বুঝতে সেই নন-ফিকশনের পাশাপাশি এই অ-ফিকশনিও ফিকশনখানাও না পড়লেই নয়৷ আর হ্যাঁ, এ বই পড়তে গিয়েও খানিক পরপরই হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়তে হবে৷ আর বাড়তি পাওনাঃ পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা দুর্দান্ত সব স্পোর্টস ট্রিভিয়া। এই বই হল 'ক্রিকেট রীডিং'য়ের টেস্টম্যাচ, ধৈর্য ধরে, রসিয়ে, হেলেদুলে এ বই ধরে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ হুড়মুড় করে গিলে খাওয়ার কেতাব এ'টা নয়৷

আর দু'জন ক্রিকেট রসিকের কথা বলে শেষ করি৷ ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা আর ভাষার হিউমরে যারা থম্পসন৷ আবার নিখাদ স্ট্যাটিস্টিক্যাল ও ঐতিহাসিক সততা এবং চুলচেরা বিশ্লেষণের ব্যাপারে যারা করুণাসেনার দিকে। অভিষেক মুখার্জী আর অরুণাভ সেনগুপ্ত৷ কিছুদিন আগে এদের দু'জনের লেখা "শচীন অ্যান্ড আজহার অ্যাট কেপটাউন" প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৯৭ সাল, ভারত দক্ষিণ আফ্রিকা কেপটাউন টেস্ট৷ সাউথ আফ্রিকা প্রথমে ব্যাট করে কয়েক হাজার রান করেছিল বোধ হয়৷ জবাবে ভারত নব্বুইয়ের দশককে সেলাম জানিয়ে আটান্ন রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে 'মানিব্যাগ খোয়ানো গোবেচারা মানুষটির ধর্মতলায় খাবি খাওয়ার' স্টাইলে ছটফট করছিল৷ সে'খান থেকে শচীন আর আজহারউদ্দিন একটা বেহিসেবী পার্টনারশিপ গড়ে বসেন৷ শেষরক্ষা হয়নি, কিন্তু রূপকথা তৈরি করা গেছিল৷ সেই পার্টনারশিপকে ভিত্তি করা লেখা এই বই অবশ্য স্রেফ রূপকথার গালগল্প নয়; বরং ভারত দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এবং, 'চায়নাম্যান' বইটার মতই, এ বই একটা জরুরী সোশ্যাল কমেন্ট্রিও বটে৷ তবে এ বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হল লেখার স্টাইল৷ দু'জন ক্রিকেট ভালোবাসিয়ের নির্ভেজাল ইতিহাস-নির্ভর আড্ডা দুই মলাটের মধ্যে তরতরিয়ে এগিয়েছে৷ শচীন আজহারের মাখনে-ছুরি পার্টনারশিপের মতই অরুণাভ আর অভিষেকের লেখা এস্পারওস্পার করেছে৷

ক্রিকেট-রসিক হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করেছিলাম৷ সেই সূত্রেই এই তিনটে বইয়ের কথা লিখে রাখা৷ কিন্তু ক্রিকেট ভালোবাসিয়ে হিসেবে আমার স্থান কোথায়? হ্যারি থম্পসন বড় কোনও ক্রিকেটার নন তবু একটানা একটা হেরো দল নিয়ে খেলে গেছেন স্রেফ নির্লজ্জ ভালোবাসায়। করুণাসেনার মত কিছু মানুষ হাজার হোঁচট খেয়েও ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরে থেকেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, গলির ক্রিকেট ম্যাচে জোর করে আম্পায়্যারিং করে নিজের ক্রিকেট-প্যাশন ফলিয়েছেন; সে'সবও তো ওই নির্লজ্জ ভালোবাসায়৷

খেলায় এলেম নেই, পরিসংখ্যান গুলে খাওয়া হয়নি, গেম-সেন্স ভোঁতা৷ তবু৷ নির্লজ্জ ভালোবাসার গুণ অসীম৷ ক্রিকেট রসিক হয়ে উঠতে না পারি, ক্রিকেট ভালোবাসিয়েদের দুনিয়ায়; থম্পসন করুণাসেনাদের পায়ের কাছে সামান্য জায়গা আমাদের জুটবেই৷ আর এ কথাটা মাথা উঁচু করে বলার জন্য আজকের এই 'ওভালে-কামাল' দিনটা বড়ই ভালো৷

স্মৃতি ও স্বাদ



স্বাদবোধ, সঙ্গীতপ্রেম, সাহিত্যপ্রীতি।
এ'সবকিছুই যদি স্প্রেডশিট আর আইনকানুন মেনে হত তা'হলে তো জীবনের প্রতিটি কণাই পিরিওডিক টেবিলের মত অমোঘ হয়ে রইত। অতি সাধারণকে 'এইটা আমার' বলে আঁকড়ে ধরার দুঃসাহস মানুষের আছে বলেই আমাদের ভালোবাসা এখনও অ্যালগোরিদমে বাঁধা পড়েনি৷।
স্বাদ প্রসঙ্গেই বলি৷
এক্সাইড ব্র্যান্ড আর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মোমোর এক নিবিড় যোগাযোগ; সে'টা আজও দিব্যি টের পাই৷ প্যাভলভের কুকুর ঘণ্টার টুংটাং শুনলেই সুস্বাদু মাংসের কথা ভেবে লালা ঝরাতো৷ আর আজকাল কোথাও ভালো মোমো চাখা মাত্রই আমার মনের মধ্যে ভেসে ওঠে কলেজ-বয়সের এক্সাইড-রবীন্দ্রসদন মোড়ের ছবি৷ সবুজ বা লাল প্লাস্টিকের প্লেটে মোমো আর কন্ট্রাস্টিং লাল বা সবুজ প্লাস্টিকের বাটিতে সাদা জলজলে স্যুপ৷ আমার প্রথম মোমো খাওয়া সে'খানেই৷ সে মোমোর আদত স্বাদ তেমন মনে নেই, মনে থাকার কথাও নেই। কিন্তু ওই; সুখস্মৃতি তো আর মিলিটারি নিয়মে কুচকাওয়াজ করে চলাফেরা করে না। জুলাই মাসের খতরনাক গরম আর ফুটপাথের প্রবল ঠেলাঠেলি উপেক্ষা করে হুসহাস করে আগুন গরম স্যুপ খাচ্ছি আর কলজে কাঁপানো ঝাল লঙ্কার সসে মোমোয় মাখিয়ে মুখে চালান করছি; এই হাই-ভোল্টেজ স্মৃতিতে সহজে মরচে পড়বে না৷
আবার ধরা যাক গ্রেভি চাউ৷ ২০০১ বা ২০০২, বড়বাজারের সরস্বতী (সম্ভবত) নামের এক রেস্তোরাঁয় আমি প্রথম গ্রেভি চাউমিন চেখেছিলাম। আমি ঝোলে-ভাতে চিরকাল মানুষ৷ হয়ত সে সূত্রেই ঝোল মাখানো চাউমিনের সঙ্গে অতি সহজেই যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল৷ বলাই বাহুল্য, সেই রেস্টুরেন্ট ঠিক আদর্শ চাইনিজ নয়৷ অর্থাৎ সেখানে পোলাও, দোসা, ফ্রায়েড রাইস সবই ছিল। তবে সাদাটে ঝোল ঝোল ব্যাপারের মধ্যে চাউমিন, সেই অনাবিল অভিজ্ঞতা তার আগে কখনও হয়নি৷ এরপর যখন কলেজে ভর্তি হয়ে কলেজস্ট্রিট লাগোয়া মেসবাড়িতে গিয়ে উঠলাম, তখন পকেটে বাড়তি দু'পয়সা জমলে সূর্য সেন স্ট্রিটের বীণা রেস্টুরেন্টে গিয়ে গ্রেভি চাউ অর্ডার করতাম৷ অতি সাধারণ রেস্টুরেন্ট, কিন্তু সে সময় সে'টাই 'লাক্সারি'র পর্যায় পড়ত৷ সেই চাউয়ের গ্রেভি বিভিন্ন সসে পরিপূর্ণ, কটকটে ঝাল৷ তবে সে স্বাদের সঙ্গে সে'সময়ের ভালোবাসা মিশে আছে৷ মেসবাড়িতে থাকার সময় আর এক সহজ 'চাইনিজ' গন্তব্য ছিল খোকনদার কেয়ার অফ ফুটপাত চাউমিন স্টল। খোকনদা গ্রেভি চাউ বানাবে কী করে, কেতাবি গ্রেভি নুডলস সম্বন্ধে হয়ত ওর কোনও ধারণাই ছিল না৷ কিন্তু চাইলেই হাফ-প্লেট চাউমিনের ওপর এক হাতা চিলি চিকেনের লালচে ঝোল ছড়িয়ে দিত৷ সে' স্বাদও অনন্য। স্বাভাবিক কারণেই, মেসের জনতার জন্য খোকনদা ছিলেন পরমাত্মীয়৷ "আর একটু গ্রেভি দেব নাকি ভাই, চিলিটা একদম টাটকা নামিয়েছি", খোকনদার এই দরাজ 'অফারে'র স্মৃতিই আমার জন্ম-জন্মান্তরের চায়নাটাউন৷

কী অত বিচার করা

আমার মোবাইলে মান্না দে 'ও আমার মন যমুনার' গাইছেন৷
আমার হাতের কাছে আধবাক্স উত্তম-হাসি পাওয়ারের হাইক্লাস মাইসোর-পাক৷
খাটের পাশেই এক বোতল জল, যে'টা আধঘণ্টা আগে ফ্রিজ থেকে বের করা হয়েছে আর এখন ঘেমেনেয়ে নিখুঁত টেম্পারেচারে রয়েছে৷
নাকের কাছে খোকার গন্ধ আর বুকের কাছে পাশবালিশ৷
মাথার কাছে আধখোলা একটা জমজমাট বই, শেষের দিকে৷ দুম করে শেষ না হয়ে যায়, তাই ধীরেসুস্থে শেষের পাতাগুলোয় এগোতে হচ্ছে।
কাল সকালের অ্যালার্ম দেওয়ার নেই৷
এত ভ্যানতারা না কষে সোজাই বলে দিতে পারতাম;
আমিই সুপারম্যান৷

রিপোর্টনগরী



- সান্যাল, ক্যুইক৷ একটা ছোট রিপোর্ট চাই৷ অন দ্য মার্কেট প্রস্পেক্টস অফ আওয়ার নিউ প্রডাক্ট৷
- ওকে স্যর৷ ইয়ে, কত ছোট রিপোর্ট?
- নট মোর দ্যান আ পেজ৷ এক পাতার বেশি কেউ আজকাল পড়তে পারে না৷ হাফ পাতা হলে আরও ভালো।
- বেশ বেশ৷ তা কবে চাই?
- কবে কী৷ আজই৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে৷
- বেশ৷ তা, প্রডাক্ট সম্বন্ধে কিছু ইনপুট যদি পাওয়া যেত স্যর..।
- অফকোর্স। এই ফাইলে সব আছে।
- এই ফাইলে?
- এই ফাইলে।
- এই ফাইলে অন্তত পাঁচশো পাতা রয়েছে তো।
- ছ'শো এগারো৷
- আধ পাতা লেখার জন্য ছ'শো পাতার ইনপুট? আধ ঘণ্টায়?
- কুড়ি মিনিটে হলে ভালো হয়।
- কিন্তু..।
- ব্রাইট ইয়ং চ্যাপদের মুখে কিন্তু শব্দটা বড্ড বেমানান সান্যাল।
- কিন্তু স্যর..।
- ক্যুইক৷ ক্যুইক। গেট গোয়িং৷ জানো তো সাইমন সাইনেক কী বলেছেন?
- কর্পোরেট কোটেশনে মোটিভেশন সইবে না স্যর৷ আমি রিপোর্টটা বানিয়ে আনছি।
- বাহ্। সাইমন সাইনেকের নামে বেশ কালীর মানতের স্ট্রেন্থ আছে দেখছি। কেমন হাতে গরম মোটিভেশন পেলে বলো..।
**
- সান্যাল, রিপোর্ট তো দিব্যি হয়েছে৷ কিন্তু এইসব প্রজেকশন আর নম্বর তো গুল। রিপোর্টে এত গুল দেওয়া কি ঠিক হল?
- গুল?
- ডাহা গুল৷ এক্কেবারে নির্জলা গুল। টেনিদাকেও লজ্জায় ফেললে দেখছি৷ এই সব নম্বরগুলো পেলে কোথা থেকে?
- কেন? আপনার দেওয়া ওইসব ইনপুট থেকে।
- আমার দেওয়া ইনপুট?
- ওই যে৷ ছ'শো পাতার ফাইল৷
- ও'তে এইসব সংখ্যা দেওয়া আছে?
- আলবাত৷ পেজ তিনশো বাইশ রেফার করে দেখুন..।
- সর্বনাশ! ওই ফাইলে এইসব নম্বর রয়েছে?
- আপনি জানতেন না?
- তোমায় কী বলেছিলাম সান্যাল? আজকাল মানুষের হাতে অত বাজে সময় নেই যে একপাতার বেশি পড়বে৷ আমি কি বোকা যে ওই ছ'শো পাতা পড়ে দেখব? আর তোমাকেও বলিহারি, এই ফাইল পুরো পড়তে গেলে?
- ও মা, আপনি তো ইনপুট হিসেবে দিলেন, কয়েক পাতা পড়ে দেখব না?
- তুমিও চাইলে আমিও দিলাম৷ প্রটোকল৷ স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্র্যাক্টিস৷ কিন্তু দিলাম বলেই পড়তে হবে? তোমার লাজলজ্জা নেই ভাই সান্যাল? এই অ্যাটিচিউড নিয়ে তোমার কেরিয়ার এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে ভেবেছ?

সামান্য

স্টেজ ১ঃ
"অল্প ভাত, হাফ বাটি৷ অল্প ঝোল৷ অল্প তরকারি৷ ফিটনেসের দিখে নজর রেখেছি, বুঝলে তো"৷

স্টেজ ২ঃ
"খাওয়াদাওয়ার আধঘণ্টা পর সামান্য মিষ্টি কিছু হলে যেন ভালোই হয়৷ মানে, জরুরী নয়৷ তবে ওই যৎসামান্য হলে ক্ষতি কী৷ তা, সামান্য বোর্বোন বিস্কুট হলেই চলবে৷ এক পিস৷ তার বেশি নয়"।

স্টেজ ৩ঃ
" গল্প করতে করতে যা হয় আর কী৷ কোন ফাঁকে যে খান পাঁচেক ক্রিমবিস্কুট উড়ে গেল৷ আসলে এই জন্যেই এক পিস মিষ্টি থাকলেই ভালো, নয়ত ডজন ডজন বিস্কুট গিলেও তৃপ্তি পাওয়া যাবে না৷ বুদ্ধি করে মেপে খেতে হবে৷ এক পিস সন্দেশ, তা'তেই হবে৷ নয়ত বোর্বোন ক্যালামিটি ঘটে যাবে"।

স্টেজ ৪ঃ
"জোম্যাটোয় সন্দেশ দিচ্ছে৷ আর কী চাই৷ এক্কেবারে অল্প আনানো হোক৷ এক্কেবারে অল্প৷ পারলে আধখানা ভেঙে খাব'খন৷ তবে অর্ধেক কোনও রসের মিষ্টিও চেখে দেখা যেতেই পারে৷ ওই, পরিপূর্ণ তৃপ্তির জন্য যে'টুকু দরকার"৷

স্টেজ ৫ঃ
" না, না, না! কিছুতেই না৷ তিনটে সন্দেশ আর চারটে রসগোল্লা? তাও আবার অতগুলো ক্রিম বিস্কুটের পরে? জাস্ট ক্রিমিনাল৷ ক্রিমিনাল! আর একটাও নয়৷ একটাও নয়"।

স্টেজ ৬ঃ
"মুখটা কেমন বিস্বাদ ঠেকছে৷ বলছিলাম, স্টকে তালমিছরি আছে কি"?

সিলেকশন

- আমি অরূপ দত্ত।
- আমি সুনীল গাভাস্কার।
- আজ্ঞে?
- আপনার নাম জেনে আমাদের কী হবে?
- ও। সরি। আসলে ইন্টারভিউয়ের জন্য এসেছি তো..।
- কী ভাবলেন। আপনার নাম উত্তমকুমার বা হরিদেবপুর হলেই আপনাকে চাকরীতে বহাল করা হত?
- সরি।
- দেখুন। এপলজেটিক মানুষজনকে দিয়ে এ কাজ হবে না।
- ওহ, না না। ঠিক সরি বলতে চাইনি..। আসলে..।
- ফের আমতা আমতা। আবার দু'নম্বর কাটা গেল।
- কত নম্বরের পরীক্ষা?
- বাহাত্তর।
- বাহাত্তর?
- অপছন্দ?
- না না। বাহাত্তর বেশ তো। তা, কত নম্বরে পাশ?
- সাতানব্বই।
- বাহাত্তরে সাতানব্বই পেতে হবে?
- গেল বছর একজন দু'শো বাইশ স্কোর করেছিল।
- ওহ।
- নার্ভাস লাগছে?
- অল্প।
- ফের নম্বর কাটা গেল।
- আর কাটবেন না প্লীজ।
- যে কাজের জন্য আবেদন করেছেন, সে'টা সম্বন্ধে পড়াশোনা করে এসেছেন?
- অবশ্যই। হপ্তাখানেক ধরে নিয়ম করে বিভিন্ন বই জার্নাল ঘেঁটে।
- আপনার দ্বারা হবে না, বুঝলেন। আপনি আসুন।
- এ কী স্যার! পড়াশোনা করে ভুল করেছি?
- বাদ দিন। আপনার স্ট্যাটিসটিকসে আগ্রহ আছে?
- থাকা উচিৎ কি?
- উম। হিসেব কষে পালটা প্রশ্নের বাতিক আছে দেখছি৷ ফের নম্বর কাটা গেল।
- কিন্তু শুনুন...।
- ইতিহাসে আগ্রহ আছে?
- আছে। নেই। আছে। মানে..নেই। মানে...।
- উফ! আপনি মশাই ডোবাবেন। মনের মধ্যে লজিক সাজাতে চেষ্টা করছেন দেখি। এহ্। আপনি যান মশাই। অকারণ সময় নষ্ট করে কী লাভ। নেক্সট ক্যান্ডিডেট প্লীজ।
- স্যার। চাকরীটা আমার বড় দরকার৷ বড্ড দরকার। আর একটা চান্স দিন।
- দেব?
- প্লীজ।
- একটা গুল মারুন।
- গ..গুল?
- কষিয়ে।
-মারাদোনা আমার মেসোমশাই।
- প্রমাণ কী?
- প্রমাণ? ইয়ে, মানে..। এ'টা গুল ছিল তো।
- ও মা। এই আপনার মিথ্যের দম? একটা বাড়তি প্রশ্নেই কুপোকাত?
- কিন্তু প্রমাণ যে সত্যিই নেই।
- প্রমাণে কী হয় অরূপ দত্ত?
- মানে, দুম করে একটা ক্লেম করে বসলাম। প্রমাণ না থাকলে কেমন দেখাবে না?
- ধুর। ও'সব নেকু বুদ্ধি নিয়ে এ চাকরী আপনার জুটবে ভেবেছেন? আপনি জানেন কলকাতার মনুমেন্ট দেখে সম্রাট অশোক 'তোফা' বলেছিলেন?
- হে হে হে হে।
- এমনভাবে হেসে আপনি কাকে ইনসাল্ট করছেন? কলকাতাকে? মনুমেন্টকে? সম্রাট অশোককে? উড়িষ্যাকে? বৌদ্ধ ধর্মকে?
- যাহ্। কী সব বলছেন?
- জুতিয়ে মুখ ভেঙে দেব শালা।
- মানে..।
- হারামজাদা!
- শুনুন..এমন অকারণ..।
- এখুনি সরি বল্ নয়ত জুতিয়ে কলকাতা থেকে বের করে দেব।
- সরি।
- গুড।
- এ'বার আমি আসি।
- কী! প্রমাণ করার দরকার পড়ল? মনুমেন্ট আর সম্রাট অশোকের গুল প্রমাণ করার দরকার পড়ল কি?
- না মানে..।
- কোনও রাজনৈতিক দলের সোশ্যাল মিডিয়া সৈনিক হওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার না। এ চাকরী সবার জন্য নয়৷ কেমন? আসুন৷ নেক্সট ক্যান্ডিডেট প্লীজ।

বংপেন, ওয়ারেন হেস্টিংস এবং গুপ্তধন



প্রকাশকের অফিস থেকে ফোন।

- তন্ময়?
- বলুন।
- একটা জরুরী ব্যাপার!
- বংপেন ৭৫য়ের এই এডিশন শেষ?
- হে হে হে। রিল্যাক্স৷
- বংপেন আরও ৭৫য়ের এই এডিশন খতম?
- মুড়ি চপ নিয়ে বসেছি ভাই, অমন হাসিও না প্লীজ৷
- তা'হলে ওই জরুরী ব্যাপারটা..।
- বলছি৷ ব্যাপারটা ইয়ে..একটু কনফিডেনশিয়াল..।
- ও।
- গুপ্তধনের ব্যাপারে ইন্টারেস্ট আছে?
- ইয়ে, কীসের ব্যাপারে?
- গুপ্তধন৷ বাক্স বাক্স হীরে, বস্তা বস্তা স্বর্ণমুদ্রা..।
- হ্যাঁ মানে, সে তো বেশ রহিসি ব্যাপার৷
- ওয়াল্টার হ্যামন্ডের গুপ্তধন সম্বন্ধে কোনও দিন কিছু শুনেছ?
- ওয়াল্টার হ্যামন্ড? ওই নামটাই আমি শুনিনি৷
- স্বাভাবিক৷ কারণ তার নাম মুছে দেওয়া হয়েছে ইতিহাস থেকে৷ স্বয়ং হেস্টিংস তাকে মুছে সাফ করে দিয়েছেন৷
- হে..হেস্টিংস?
- ওয়ারেন হেস্টিংস৷ গভর্নর জেনারেল। এই ওয়াল্টার সাহেব হেস্টিংসের পার্সোনাল সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছে বছর তিনেক৷ ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের মানুষ৷ ভারী করিতকর্মা৷ অবশ্য, সরকারি দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখলে সে নাম আর দেখতে পাওয়া যাবে না।
- হেস্টিংস৷ হ্যামন্ড৷ গুপ্তধন৷ কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে৷
- স্বাভাবিক৷ সহজে বুঝিয়ে দিই৷ এই ওয়াল্টার হ্যামন্ড সাহেব গুপ্তধনের হদিস পেয়েছিলেন। জগৎ শেঠের পরিবারের কেউ সে গুপ্তধন কোনও গোলমেলে জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলেন৷ ওয়াল্টার খুড়ো কী'ভাবে সে সম্পত্তির হদিস পেয়েছিলেন, সে'টা অবিশ্যি কেউ জানে না৷ কিন্তু সে'সব কথা তিনি হেঁয়ালি বেঁধে নিজের ডায়েরীতে লিখে গেছিলেন৷
- বটে৷
- ওয়াল্টার সাহেবের ডায়েরী হেস্টিংসের হাতে পড়ে৷ আর তারপর যা হয়৷ লোভে অন্ধ হয়ে ওয়াল্টার সাহেবকে সরিয়ে ফেললেন হেস্টিংস৷ ভাবলেন সমস্ত সোনাদানা নিজেই হজম করবেন। এমন কি সমস্ত সরকারি দলিল থেকেও ওয়াল্টার সাহেবের নাম উড়িয়ে দেওয়া হল৷ পাছে সেই গুপ্তধনের খবর ছড়িয়ে পড়ে৷ বহুদিন বন্দী রেখে শেষে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল ওয়াল্টারকে৷
- সে'সব আপনি জানলেন কোথা থেকে?
- কোতল হওয়ার আগে পর্যন্ত আধো-অন্ধকার কুঠুরিতে বসে অনেক হিজিবিজি লেখালিখি করে গেছেন ওয়াল্টার সাহেব৷ হেস্টিংসের বাপ-মা তুলে খিস্তি করেছেন এন্তার৷ নতুন করে গুপ্তধনের সংকেতও লিখে রেখে গেছেন৷ লিখেছেন নেটিভদের সম্বন্ধে তার অনেক মতামত৷ ভাবতে পারো যে ভদ্রলোক সে'সময় বসে প্রেডিক্ট করে গেছিলেন যে নেটিভরা একদিন ক্রিকেটের মাঠে সাহেবদের নাকে দড়ি দেবে?
- আরিব্বাস৷
- আর একটা ব্যাপার বলে গেছেন সাহেব তার দ্বিতীয় সেই ডায়েরিতে৷ তিনি নাকি নিশ্চিত যে হেস্টিংসের চোদ্দপুরুষের ক্ষমতা নেই সে গুপ্তধনের হেঁয়ালি ভেদ করার৷ ধুরন্ধর নেটিভরাই পারবে সে হেঁয়ালিতে দাঁত ফোঁটাতে৷
- সে ব্যাপারটা আপনি জানলেন কী করে?
- কারণ..কারণ সে ডায়েরি আমাদের অফিসে আছে৷
- অ্যাঁ?
- হ্যাঁ! অবশ্য ব্যাপারটা মাপা সিক্রেট৷ গুপ্তধন উদ্ধারের সম্ভাবনাটা যেহেতু উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না..।
- সে তো বুঝলাম..কিন্তু হঠাৎ এ'সব কথা আমায় জানাচ্ছেন কেন..।
- বাধ্য হয়ে৷
- মানে?
- ওই ডায়েরিটা আমরা কয়েক কপি ছাপিয়েছিলাম৷ নিজেদের টীমের মধ্যে বিলি করব বলে৷ সবাই মিলে মগজ খাটিয়ে যদি ওয়াল্টার সাহেবের ধনসম্পত্তির খোঁজ পাওয়া যায়৷ ব্যাপারটা যেহেতু সেনসিটিভ তাই একটু গোপনীয়তা মেন্টেন করতেই হয়েছে৷ বংপেন ৭৫ আর বংপেন আরও ৭৫য়ের কয়েকটা বাড়িতে জ্যাকেট ছাপাখানায় পড়েছিল। কাজেই ওয়াল্টার সাহেবের ডায়েরিটা বইয়ের আকারে খানকুড়ি কপি ছেপে আমরা ওই বংপেনের মোড়কেই মুড়ে রেখেছিলাম৷ টপ সিক্রেট কোড আর কী৷
- ওহ, কিন্তু আমি তা'হলে..।
- একটা মাইনর সমস্যায় পড়া গেছে৷
- কীরকম?
- ইয়ে, ওই কয়েকদিন পর ওয়াল্টার সাহেবের ডায়েরি ছাপা বইগুলো তাক থেকে নামিয়ে বিলি করতে গিয়ে আকাশ থেকে পড়লাম৷ তাকে যেগুলো পড়ে রয়েছে সেগুলো বংপেনের মধ্যে বংপেনের লেখা৷ কী বিরক্তিকর! এ'দিকে ওই কুড়ি কপি ওয়াল্টার হ্যামন্ডের ডায়েরী বংপেনের জ্যাকেটে বাজারে চালান হয়ে গেছে৷ আমাদের শোরুমে রাখা তোমার বইগুলোতেই সে দুর্লভ ডায়েরির কপিগুলো নেই৷ ও'গুলো এখন খোলা বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷
- মাই গুডনেস!
- ক্যালামেটি ভাই৷ একেই বলে ক্রাইসিস। তা বলছিলাম, কেউ কি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে? বংপেন ৭৫ বা বংপেন আরও ৭৫ কিনে তোমার লেখার বদলে কোনও হিজিবিজি ডায়েরি পেয়েছে বলে অভিযোগ করে?
- এখনও তেমন কোনও খবর পাইনি৷
- একটু চোখ কান খোলা রেখো ভায়া৷ গুপ্তধন বলে কথা৷ রিসেন্টলি যারা কিনছে তাদের মধ্যেই হয়ত কেউ..।
- বুঝেছি৷ কোনও খবর পেলেই আমি জানাব। কেমন?
***
ইদানিং যদি কেউ 'বংপেন ৭৫' অথবা 'বংপেন আরও ৭৫' কিনেছেন? বা কেনার প্ল্যান করছেন? আর সে বই হাতে পেয়ে পাতা উলটে যদি বংপেনের গল্পের বদলে ওয়াল্টার সাহেবের ডায়েরি আর গুপ্তধনের হদিস খুঁজে পান, আমায় প্লীজ ইনবক্সে জানাবেন৷ আমি ওয়াল্টার সাহেবের ডায়েরির কপি সংগ্রহ করে আপনার হাতে আদত বংপেন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব৷
আর, বই দু'টো কেনার লিঙ্ক কমেন্টে দেওয়া রইল৷ ইয়ে, মানে বুঝতেই পারছেন৷ ব্যাপারটা একটু সিরিয়াস।