Thursday, March 29, 2018

পিহু আর ঠগি

- আয়। এ'দিকে আয়।
- তুমি ভালো লোক?
- হ্যাঁ। বিলকুল।
- তোমার নাম?
- হরেন। হরেন জ্যেঠু।
- আমার নাম পিহু।
- পিহু।
- হ্যাঁ। পিহু।
- তা, তুমি জেলখানায় কেন?
- বাহ্, তুমি জান না?
- না। এত্তটুকুন বাচ্চা তুমি, জেলে এলে কেন?
- জানি না।
- বাহ্ বাহ্। জানো না। দিব্যি। তা তোমার বাড়িতে কে কে আছে?
- কেউ নেই।
- সে কী!
- ছিল। মরে গেছে।
- সর্বনাশ।
- রাজার পেয়াদারা পুড়িয়ে মেরেছে। সবাইকে। বাবা, মা, দাদা। আমার বুড়ি পিসিমা। সবাই। মরে গেছে।
- তুমি বাঁচলে কী করে?
- আমি বাইরে খেলতে গেছিলাম যে। বিরুমিনের সঙ্গে।
- বিরুমিন? তোমার বন্ধু?
- সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
- তা জেলে এলে কেন?
- আমি রাজপেয়াদাদের ধাওয়া করে গিয়ে ঢিল ছুঁড়েছিলাম।
- ওহ হো।
- মা জানলে কিন্তু খুব রাগ করত। কাউকে মারতে নেই যে। মা মরে গেছে, তাই বকবে না। তুমি জেলে এলে কেন হরেন জ্যেঠু? তুমিও পেয়াদাদের মেরেছিলে?
- না। আমি ঠগি। তাই জেলে রয়েছি।
- ঠগি মানে ডাকাত। আমার বাবা ছোটবেলায় ঠগি দেখেছিল। বাবা কত বলত, কত মজার গল্প। কতরকম দেশ, কতরকম মানুষ। বাবা মরে গেছে, তাই আর গল্প বলবে না।
- পিহু, রুটি খাবে?
- খাবো। খুব খিদে।
- খাও।
- আর তুমি কি খাবে?
- ও মা! আজ অমাবস্যা,  জানো না? অমাবস্যায় রুটি খেলে বাতের ব্যথা বাড়ে।
- তা'হলে আমি খাই?
- খাও।
- উফ, বড় খিদে। দু'দিন আমায় কিছু খেতে দেয়নি।
- পিউ, পেয়াদারা তোমার বাড়ি কেন পোড়ালো? জানো?
- বাবা গান গাইত। পাহাড়ি ভাষায়। আমরা কিনা পাহাড়ি। আর সমতলে পাহাড়ের গান গাওয়া বারণ। তাই রাজা রেগে এমন করেছেন।
- তুমি জানো? পাহাড়ি ভাষা? পাহাড়ি ভাষার গান?
- এ বাবা! না। আমি তো পাহাড় দেখিনি কোনদিন। দাদাও দেখেনি। বাবা পাহাড়ের গল্প করত। বলত পাহাড় দেখাবে একদিন, আমি আর দাদা বড় হলে। দাদার আর পাহাড় দেখা হল না, সে মরেই গেল।
- খাওয়ার সময় কাঁদে না পিহু। তুমি জানো, তোমাদের পাহাড় থেকে সৈন্য আসছে?
- সৈন্য? তারা যে মন্দ! ভয়ানক!
- না, পাহাড়ের সৈন্যরা দিব্যি ভালো। তারা তোমায় পাহাড়ে নিয়ে যাবে। পাহাড়ি ভাষা শেখাবে, আর শেখাবে পাহাড়ি গান।
- আসবে? পাহাড়ি সৈন্য? আমি বাবার মত পাহাড়ি গান গাইতে পারব?

****

- ক্যাপ্টেন হরেন!
- সে..সে...সেলাম! মহারাজ!
- মদ ডুবে থাকলেই তো পারো হে।
- ম...মহারাজ। এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প চালানো। বেয়াড়া জাতের খোকাখুকুদের এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্প। মদে ভেসে না গিয়ে উপায় নেই।
- ওদের সমূলে নিকেশ না করলে বিপদ হে হরেন। রক্তবীজের দল, বড় বিপদ। এ'সব কাজে বুলেট, গিলোটিন ব্যবহার করলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়, তা না তোমার যত অদ্ভুত টালবাহানা।
- আমার কাজ ঘুম পাড়ানোর আর রুটিতে বড় নিশ্চিন্দির ঘুম আসে। তাছাড়া, রুটিতে বিষ আর স্বপ্ন দুইই মেশানো বড় সহজ হে রাজাধিরাজ।

Sunday, March 25, 2018

কড়াই ও মুগুর

- আসুন। আসুন মিস্টার।
- ধুর ছাই। ম্যানেজারবাবু, হপ্তায় একবার করে আপনি অফিসে ডেকে পাঠান। অথচ ফেরত পাঠানোর কোনো কংক্রিট প্ল্যান আজও শুনলাম না।
- মরলে জন্মাতে হবে, চিরভূত কে কোথা কবে?
- ধ্যাত্তেরি। সেই কবে থেকে এক কথা। মরেছি বছর দশেক তো হল। আর কদ্দিন?
- দাঁড়ান। আপনার আত্মার জন্য সুইটেবল প্রোফাইল না পেলে বাজারে ছাড়ি কী করে বলুন তো। এই যেমন  গেল বার, পকেটমার আত্মা নেমে হল দারোগা। শেষে সে কয়েদীদের পকেট মারার চেষ্টা শুরু করলে, ভেবেছেন কাণ্ডটা?
- পৃথিবীতে তো টপাটপ মানুষ মরছে। হাজার রকমের প্রোফাইল,  টুয়েন্টি ফোর সেভেন নতুন ভ্যাকেন্সি তৈরি হচ্ছে। দশ বছরে আমার জন্য সুটেবল কিছু পেলেন না?
- ও মা! অত সহজ নাকি। ক্রস-ফাংশনাল ম্যাচিং আছে। ওয়েটিং লাইন আছে। দুম করে কিছু করে দিলেই হল? আরে মশাই গরম তেলের কড়াইয়ের কম্ফর্টে শুয়ে অনেকে বাতেলা ঝাড়তে পারে। কিন্তু আমার কাজের প্রেশার যদি বুঝতেন।
- দিনে তিন ঘণ্টা করে আমায় গরম তেলে ডীপ ফ্রাই করা হয়, সে'টা মামুলি ব্যাপার নাকি?
- অত ইম্পেশেন্ট হবেন না মিস্টার। ভূত হয়ে তেলের কড়াইতে যত চুবনি খাবেন, জন্মের পর আপনার হিউম্যান স্কিন তত গ্লো করবে, মিলিয়ে নেবেন।
- রিয়েলি?
- আলবাত।
- যা হোক, ম্যানেজারবাবু। একটু দেখুন না, প্লীজ। আর ভাল্লাগছে না।
- হবে হবে।
- একটু যদি এক্সপেডাইট করা যায়।
- আমার হাত পা বাঁধা।
- প্লীজ। এ'খানে ঘুষ চলে?
- কোনো রিসোর্স নেই। ঘুষ নিয়ে হবে কী?
- প্লীজ। কড়াইয়ে বড্ড বোর হচ্ছি। আর সহ্য হচ্ছে না।
- মুগুরপেটায় শিফট করিয়ে দেব? ইনস্টেড অফ কড়াই?
- সেই বাহান্ন তিপ্পান্ন কেস। প্লীজ ম্যানেজারবাবু। সহ্য হচ্ছে না আর। এ'বার জন্মাতে দিন।
- আরে হবে না। একটা এক্সেপশনাল রুট আছে বটে, তবে সে'টা পারবেন না আপনি।
- পারব না?
- ইম্পসিবল।
- খুব পারব। আমার খুব জেদ। প্লাস মনের জোর।
- হবে না মিস্টার।
- ম্যানেজারদাদা। মুখ ফস্কে একটা উপায়ের কথা বলে যখন ফেলেছেন তখন আর আপনার ছাড়ান নেই। পথ বাতলে দিন স্যার। ওই কড়াই ভর্তি গরম তেলে গলা ডুবিয়ে যতই জাকুজি-মস্তি ভাবি, বড় জ্বালা। স্যার, প্লীজ।
- আপনার জেদ যে আছে তা অনস্বীকার্য। মনের জোরও অসীম। কিন্তু এই দু'টো কোয়ালিটির জন্যেই চিন্তা হচ্ছে। রোলটা আপনি ম্যানেজ করতে পারবেন কি না...।
- আরে ধ্যের রে বাবা, বলছি তো। কড়াই মুগুরের দেশ থেকে বেরোতে চাই। কুকুর হয়ে জন্মালেও আপত্তি নেই।
- কুকুর? না, সে চান্স নেই। পশু মানে তো বিজনেস ক্লাস। আপনি মানুষের ভূত, আপনার কপালে স্লিপারের সাইড আপার।
- রোলটা কীসের?
- সরকারের চাটুকার খবরের কাগজের সম্পাদক। সরকার অমুককে ভালো বললে আপনি লিখবেন অমুক হল বিবেকানন্দ। সরকার তমুককে মন্দ বললে আপনি তমুককে বলবেন শুয়োরের বাচ্চা। নেতা যাই বলুক তা বেদ। অপোজিশন যাই বলুক তা বেদো। পারবেন মিস্টার?
- কড়াইয়ের তুলনায় মুগুরপিটুনিটা মন্দ নয় বলছেন ম্যানেজারবাবু? অন্তত বছর দশেক আরও চালিয়ে নেওয়া যাবে তো?

Friday, March 23, 2018

মুকাবলা

- গুরুদেব!
- আবার কী হল বাবা অর্জুন।
- এই দেখুন না গুরুদেব, একলব্যটা ফের বাড়াবাড়ি শুরু করেছে।
- ওই ব্যাটাচ্ছেলে লোয়ার ক্লাস ছেলেটা?
- আজ্ঞে। আমায় কী ইনসাল্টটাই না করলে।
- তোমার মত এলিটকে ইনসাল্ট করেছে?
- রীতিমত।
- কী'ভাবে? সমস্ত রিসোর্স তো আমি তোমার দিকেই ডাইভার্টেড রেখেছি। সে ব্যাটা ইনসাল্ট করার সুযোগ পায় কী করে?
- হস্তিনাপুর আপনাকে যে সিটিসি অফার করেছে, সে টাকা দিয়ে আমায় খান কুড়ি গেমিং কনসোল কিনে দিলে ল্যাঠা চুকে যেত।
- আহ চটছ কেন বাবু। খুলে বলই না! একলব্য তোমায় কীভাবে কাঠি করেছে?
- কাঠি? গদার গুঁতো মেরেছে পিছনে।
- আহ্। অর্জুন। ল্যাঙ্গুয়েজ সামলে। আমি গুরুজন।
- ধ্যাত্তেরি। গুরুজনে নিকুচি করেছি। একলব্যর বদমায়েসির চোটে আমার রয়্যাল এলিট শরীর ঘিনঘিন করছে।
- করেছেটা কী?
- চাকরবাকর মানুষ, লোহালক্কড় অস্ত্রটস্ত্র আমার চেয়ে না হয় একটু ভালো চালায়। তাই বলে আমার টিপ সামান্য এ'দিক ও'দিক হয়েছে বলে আমায় মিডল ফিঙ্গার দেখাবে?
- সর্বনাশ! বলো কী!
- কী অপমান। ছি ছি। আদিবাসীর পো কিনা রাজপুত্রকে মিডল ফিঙ্গার দেখায়?
- বেশ। ওকে শায়েস্তা আমি করব। অড নাম্বারের মিডল হয়, ইভেন নাম্বারে মিডল পাবে কোথায়? বাপের জন্মে আর কাউকে মিডল ফিঙ্গার দেখাতে যাতে সে না পারে, সে ব্যবস্থা আমি করে দেব।
- যাক। সে কথাই রইল। আর ইয়ে, রিপোর্টারদের বলে দেবেন আমার টিপ মিস করার গল্পটা একটু অন্যভাবে প্রেজেন্ট করতে। বিশেষত ওই বুড়ো রিপোর্টারটা একটু ঢ্যাঁটা, কী যেন নাম? ওই ব্যাস না কী যেন, ওর জার্নালে যেন আমার ব্যাপারে আজেবাজে কিছু না লেখা থাকে, কেমন? দেখে নেবেন, এখন আমি আসি। ডিডি মেট্রোতে সুপারহিট মুকাবলা শুরু হল বলে।

Wednesday, March 21, 2018

সোমালিয়া আর ঘটিদা

- পোয়েট্রি ছাড়া সমস্তই অন্ধকার, বুঝলি রে..।
- আমায় বলছ ঘটিদা?
- এ ঘরে মেসমালিকের বাপের ছবি আর তুই ছাড়া আর কে আছে রে গবেট বিশে?
- গত পরশু দুপুরে তুমি ওই ফ্রেমে বাঁধানো উমাপদ দত্তের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কত কিছু তো বললে। তাই ভাবলাম...।
- চুপ কর। যত বাজে কথা। ও'টা রিহার্স করছিলাম।
- রিহার্সাল? কলেজের নাটকে চান্স পেয়েছ বুঝি?
- ধুস। ও'সব পেটি লেভেলে আমি থাকিনা। নেহাত মৃণাল জ্যেঠু আর সিনেমা বানাচ্ছেন না। কোনো কমা জায়গায় স্টেজে নামতে চাওয়ার মত কাঙাল আমি নই।
- বিনুদা বলছিল তোমায় নাকি বাদ দিয়েছে...।
- বিনু বলেছে? হুক আর পুলে তফাৎ গুলিয়ে ফেলা ছেলের কথা তুই বিশ্বাস করলি? 
- তা মেসদাদুর ছবির সামনে কী রিহার্সাল করছিলে শুনি?
- সে সব বড় জটিল ব্যাপার। সামান্য ফার্স্ট ইয়ারের ছেলে হয়ে আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের সমস্যাগুলো গ্রাস্প করবি কী করে?
- বেশ বলতে হবে না।
- বড্ড অভিমান তোর। ইনসিস্ট করছিস যখন বলি। সোমাকে প্রপোজ করার ব্যাপারটা অনেকদিন ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। আমায় দেখলেই বেচারির চোখে এক ধরণের আকুতি বেশ কিছুদিন ধরেই ফুটে উঠছিল। মেয়ে তো, বড্ড নরম মন। ও'দের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। এই সে'দিন যখন ক্যান্টিনে দেখা হয়েছিল। জোর করে মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে নিজের চোখের যন্ত্রণা ঢাকার চেষ্টা করছিল। আপ্রাণ। অথচ ওর চোখ থেকে দানা দানা ভালোবাসা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আমার বুক ভারি করে তুলেছিল।
- কী ছড়িয়ে কী হচ্ছিল?
- ফার্স্ট ইয়ার রে বিশে। তোর কলজে এখনও পোয়েট্রির জন্য তৈরি হয়নি।
- অ। তা করেছিলে? প্রপোজ?
- আলবাত। গত পরশু। শেষ ক্লাসের পর। তিনতলার করিডরে তখন শেষ বিকেলের আলোছায়া। দিলাম উইটের তলোয়ারে এফোঁড়ওফোঁড় করে। মেয়েরা উইট পছন্দ করে, মনে রাখিস। উইটে ধার দিয়ে যা। ব্যস।
- সোমাদি কী বললে?
- মুখে কী আর স্বীকার করতে চায় রে? লজ্জায় হাবুডুবু খেয়ে এক কথা বলতে গিয়ে বলে ফেললে 'জুতো মারব'।
- সোমাদি তোমায় জুতো মারবে বলেছে?
- ধুর বোকা। সে কি আর মনের কথা? হবু ইয়ের সামনে আনন্দে লাফানোটা আদৌ গ্রেসফুল নয়।
- জুতো মারার ব্যাপারটা বোধ হয় গ্রেসফুল?
- আজ জুতো মারবে বলেছে, কাল সোনা বলে ডেকে কান মুলবে। মিলেনিয়াল প্রেম ভাই। ও তুই বুঝবি না, সেকেন্ড ইয়ারে এমন কত ব্রেন-ধাঁধানো ব্যাপার আছে। সোমা মুখে যাই বলুক, ওর চোখের কোণে চিকচিক করছিল ভালোবাসা। স্পষ্ট দেখেছি।
- ও। চোখ। আগে বলবে তো। তা, এরপর?
- ওই যে। পোয়েট্রি। কবিতা লিখব ক'দিন ধরে। এ হপ্তায় তাই কলেজ বন্ধ। 
- ও। বেশ। শুনিও। 
- সংকলনের একটা নামও ঠিক করে ফেলেছি। সোমালিয়া। ওয়ার্ডপ্লেটা নোটিস করেছিস?
- বিলক্ষণ।
- লিটল ম্যাগট্যাগ না, স্ট্রেট বই। নন্তুদার নতুন পাবলিশিং কোম্পানি একটা ব্রেকথ্রু খুঁজছিল। ভাবছি অবলাইজ করেই ফেলব।
- বেশ। তবে ইয়ে, ঘটিদা..। 
- কী?
- বলছিলাম, সোমাদি কিন্তু গ্রেস ব্যাপারটা সবার সঙ্গে ঠিক ইউনিফর্মলি এক্সেকিউট করতে পারছে না। শুনছি ফিজিক্সের নির্মলদার সঙ্গে সে নাকি টপাটপ রোল কাটলেট খেয়ে বেড়াচ্ছে। আজ দেলখোশা তো কাল বসন্ত কেবিন। গতকাল আবার দু'জনে ব্যান্ডেল চার্চ ঘুরতে গেছিল। 
- নির্মল? ছোহ্। ও'তো হ্যান্ডমেড পেপার। মেটাফরিকালি অফকোর্স। সোমা ওর সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে আমায় ইঙ্গিতের কলমে মেটাফরিকাল চিঠি পাঠাচ্ছে।
- মানে, তোমার জন্য গ্রেস আর চিকচিক। নির্মলদার জন্য কাটলেট আর ব্যান্ডেল?
- তোর ঘটে মালকড়ি আছে। যাক। চ', তোকে আজ অন্নপূর্ণা হোটেলে মটন টিকিয়া আর রুমালি রুটি খাওয়াবো।
- মাসের শেষে? টিকিয়া রুটি খাওয়াবে? লটারি পেয়েছ নাকি?
- লটারি নয়। তবে নির্মলের মানিব্যাগটা পেয়েছি। 
- কী?
- গতকাল ব্যাটা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল ব্যান্ডেল স্টেশন থেকে চার্চ যাওয়ার ডিরেকশন। বুঝিয়ে দিলাম। মানিব্যাগটা দৃষ্টিকটু ভাবে হিপপকেটে উঁচিয়ে ছিল। বোঝা লাঘব করে দিলাম। স্কিল। এ'সব করতেও মেডিটেশন দরকার। যাক গে। শুনেছি ব্যান্ডেলে বড় রেস্তোরাঁয় ঢুকে খেয়েদেয়ে টাকা দেওয়ার সময় বেশ অপদস্থ হয়েছে, সোমা না থাকলে ব্যাটাকে বাসন মাজতে হত। যা হোক, যারা চোখের চিকচিক চিনতে পারে না, তাদের অমন একটু ভুগতে হয় বৈকি। আর আহাম্মকের সাহস দ্যাখ, ওয়ালেটে সোমার ছবি রেখেছে? পারভার্ট। দেখব বাছাধনের কী হাল হয় যখন বাড়ির গার্জেনদের কাছে উড়ো চিঠিটা পৌঁছয়। সোমাকে কেন যে এত ডিস্টার্ব করে ছেলেটা..।
- উড়ো চিঠি? নির্মলদার গার্জেনদের? কে দেবে?
- বড় বাজে প্রশ্ন করিস তুই বিশে। টিকিয়া রুটি খাবি তো? চটপট জামাটা গলা। ফেরার পথে একবার আলোছায়া স্টুডিওয় ঢুঁ মারতে হবে। সোমার পাসপোর্ট সাইজ ছবিটা এনলার্জ করাতে দিয়েছিলাম। আজ ফ্রেম করাতে হবে। দেওয়ালে মেসমালিকের বাপের ছবিটা বড্ড বিরক্তিকর। চে আর সোমা ছাড়া এই রুমে কারুর ছবি থাকবে না। চলো কমরেড!

Monday, March 19, 2018

হেস্


রুডল্ফ হেস্ নাজি পার্টির ডেপুটি ফুয়েরার পদে থাকাকালীন হিটলারের নজর এড়িয়ে একটা যুদ্ধবিমান নিয়ে জার্মানি থেকে স্কটল্যান্ড উড়ে গেছিলেন; একা। তখন যুদ্ধ তুঙ্গে, হিটলার লন্ডনে বোমাটোমা ফেলতে শুরু করেছেন। ফ্রান্স নাজিদের পকেটে। সোভিয়েত আক্রমণের  প্রস্তুতি চলছে। হেস্ বুঝেছিলেন যে জার্মানির পক্ষে দু'দিক সামাল দিয়ে বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া মুশকিল। ল্যান্ডিংয়ের সময়ে আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় জীবনে প্রথম প্যারাশুটে ঝাঁপ দিতে হয় তাঁকে। হেস্ ভেবেছিলেন চার্চিলের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বোঝাবেন জার্মানির সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য; ব্রিটেন নিজের এলাকা আর নিজের উপনিবেশগুলো নিয়ে সুখে থাকুক। জার্মানি নিজের এলাকাটুকু বুঝে নেবে। চার্চিল নরম হলে জার্মানির আখেরে মঙ্গল, হেস্ তেমনটাই আঁচ করেছিলেন।

পরের দিন হেস্-য়ের পাগলামোর খবর পেয়ে হিটলার রাগের চোটে আশাপাশের মানুষজনকে চিবিয়ে খাওয়ার উপক্রম করেছিলেন। গোয়েবল দেশময় রটিয়ে দিয়েছিলেন "ও পাগল! আপদ বিদেয় হয়েছে, ভালো হয়েছে"। এ'দিকে ব্রিটেনও ব্যাপারটাকে স্রেফ ফিচলেমো মনে করে উড়িয়ে দিল। হেস্ বন্দী হলেন। তাঁর চার্চিলের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে উবে যেতে বেশিদিন লাগল না।

এক চাষি হেস্-কে প্যারাশুটে নামতে দেখেছিলেন। পরমশত্রু নাজি পার্টির ডেপুটি ফুয়েরারকে চিনতেও পেরেছিলেন।
এবং সবচেয়ে বড় কথা ব্রিটিশ সৈন্য হেস্-কে পাকড়াও করার আগে তাঁকে এক কাপ চা অফার করেছিলেন সেই চাষি। 

এত পাঁয়তারার পিছনে মূল বক্তব্য একটাই; 
কোথাও অতিথি হয়ে গেছেন আর তারপর প্রবল চায়ের তেষ্টা পেয়েছে?
গৃহকর্তা/গৃহকর্ত্রী চা বাদে যাবতীয় ভুজুংভাজুং গছিয়ে চলেছেন অথচ চায়ের প্রসঙ্গই উঠছে না?

তাঁদের রুডল্ফ হেস্ আর বিলিতি চাষির গল্প শোনান।

Saturday, March 10, 2018

বিউলির বিশ্বাস

বিউলির চোখে ঘুম নেই। আজ তিন দিন ধরে দু'চোখের পাতা এক হয়নি। বালিশে মাথা ঠেকালে মাথার ভিতর চিড়বিড় করে উঠছে। অথচ শরীর মন অবশ করা ক্লান্তি তাকে গিলে খাচ্ছে যেন। শাশুড়ি মা অবশ্য মাঝেমধ্যেই গায়ে মাথায় হায় বুলিয়ে তাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু সে বেচারির নিজের দুঃখই বা কম কীসে? যে মায়ের জোয়ান ছেলে মাত্র তিন দিনের জ্বরে মরতে বসেছে, তাঁর বুকের ভিতরে কি রক্তগঙ্গা বয়ে চলছে না? বুড়ি বিউলিকে চোখে হারায়।

ক'মাসের মাত্র বিয়ে, তবু এরই মধ্যে নিজের স্বামীকে বেশ মায়া মায়া সুরে ভালোবেসেছে ফেলেছে বিউলি। জানালা বেয়ে চুইয়ে নামা জ্যোৎস্নায় হারুর চিবুক ভেসে যেতে দেখে বিউলি। মায়া হয়। বড় মায়া। বুক ধড়ফড়ানো মায়া।

এই মানুষটাকে এখন দিব্যি ছোঁয়া যায়। চাইলেই চুলে বিলি কেটে দেওয়া যায়। 'বুকে কষ্ট হচ্চে গো" বলে বুকে মাথা রাখা যায়। সে থাকবে না? বর না থাকলে বুক মুচড়ে মুচড়ে ওঠে; বাপের বাড়ির পাড়ার শিউলিপিসি অন্তত তাই বলতেন। হারু থাকবে না? সন্ধেবেলা মেলা থেকে ফেরার পথে অসভ্য সুরে 'অ্যাই বৌ, ইদিকে ঘেঁষে আয়' বলে চিমটি কাটবে না আর সে? বিউলির গলায় রামপ্রসাদী শুনে হারুর চোখ ছলছল হয়ে আসে, তখন বিউলির মনে হয় শীতের রাতে কেউ যেন তার গায়ে ভালোবাসাবাসির লেপ চাপিয়ে দিয়েছে।

এমন স্বামীটা আর থাকবে না? কবিরাজ মশাই অমন থাপ্পড়ের মত কথাগুলো বলতে পারলেন?

কবিরাজমশাই অবশ্য বলেছেন শহরে থেকে বড় ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসতে পারলে কিছু একটা হলেও হতে পারে। কিন্তু সে ডাক্তারের খরচ কম নয়। বিউলিদের টাকা নেই।

একটু ভুল হল। বিউলির কাছে একটা গিনি আছে, জমিদার বাড়ির সই এলোকেশীর তাকে বিয়ের সময় দিয়েছিল। আর বিউলি গিনিটা লুকিয়ে রেখেছিল নিজের পুঁটুলির গোপন কোণে। হারুও জানতে পারেনি সে গিনির কথা।  সে গিনি ভাঙিয়ে কবিরাজমশাইয়ের কথামত শহুরে ডাক্তারের ব্যবস্থা করাই যায়। কিন্তু গতকাল থেকে বিউলির মনের ভিতর হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করেই চলেছে। বাপের বাড়ির গাঁয়ের বুড়োশিবঠাকুরের কথা মনে করে সে যখনই কোনও পয়সা মানত করে জলে ভাসিয়েছে, তখনই তার মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে। বিউলির দাদা নিমকি সে'বার দিন দুয়েকের জন্য জঙ্গলে হারিয়ে গেছিল, মায়ের লক্ষ্মীর ঝাঁপি থেকে এক পয়সা চুরি করে দাদার নামে মানত দিয়ে সে পয়সা নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছিল বিউলি; পরের দিনই ফেরত এসেছিল দাদা।  কিছুতেই মেজদির বিয়ে ঠিক হচ্ছিল না, বাবার পুরনো দেরাজ থেকে একটা গোটা টাকা চুরি করে নদীতে ভাসাতেই কাটোয়ার পাত্রপক্ষ মত দিয়েছিল। এমনও আরো বেশ কয়েকবার এইভাবে টাকাপয়সা বুড়োশিবের নাম মানত করায় কাজ হয়েছিল। এই মানতগুলোর কথা অবশ্য কাউকে সে কখনও বলেনি।

কাজেই গোটা একটা গিনি জলে ভাসালে কি বুড়োশিব তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দেবে না?  অচেনা ডাক্তারের জন্য অন্ধের মত খরচ না করে বুড়োশিবের ভরসা করাই কি উচিৎ হবে না? এক বুক আকুতি নিয়ে ঘাটের দিকে ছুটল বিউলি।

***

"আপনি আমার থেরাপিস্ট যখন আপনাকে খুলে বলতেই পারি। মাঝেমাঝে মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখি। সে বড় অদ্ভুত স্বপ্ন। এক নদী কালচে নীল জলে মেয়েটা ডুবে যাচ্ছে। বড় মায়া মেয়েটার চোখে।
মেয়েটার ঠোঁটে অল্প কাঁপুনি।
মুখ ফ্যাকাসে কিন্তু তাতে ভালোবাসা জমাট বেঁধে আছে। মেয়েটা আমার নাম ধরে হাতছানি দিয়ে ডাকে
'আমায় ডুবতে দিওনি শঙ্করবাবু, তোমায় পয়সা দেব'।

এক বুক জলে নেমে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরি আমি। স্বপ্নেই।
আহ, বড় মায়া।

গতকালও স্বপ্নে সে'ভাবেই এসেছিল সে;
'আমায় ডুবতে দিওনি শঙ্করবাবু, তোমায় একটা গিনি দেব'। কিন্তু আমি জলে নামার আগেই অ্যালার্ম ঘড়িটা বিশ্রী ভাবে বেজে উঠল। ভোরের স্বপ্ন আর কী। কিন্তু সেই থেকে নাকে শুধু শ্মশানের গন্ধ আসছে ডাক্তার। আমি কি পাগল হয়ে গেলাম ডাক্তার"?

Tuesday, March 6, 2018

মূর্তিভাঙার গল্প


- নমস্কার খাসনবীসবাবু। 

- আরে দত্ত? হঠাৎ আমার অফিসে? পথ ভুল করে নাকি?

- আপনার অফিস? হে হে। 

- আরও অন্তত দু'দিন। পরশু সন্ধেবেলা গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফা দেব। তদ্দিন এ অফিস আমারই। তারপরের দিন থেকে না হয় এ'টাকে নিজের অফিস করে নিও। 

- হে হে হে। তবে, মার্জিনটার জন্য খারাপ লাগছে খাসনবীসবাবু। এদ্দিনের নেতা আপনি। এদ্দিনের পার্টি। এ'ভাবে গোহারান হেরে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। মাইরি বলছি, আপনার দুঃখে নিজের এমন ল্যান্ডস্লাইড ভিক্ট্রি নিয়েও ঠিক আহ্লাদ করতে পারছি না। 

- দুঃখের আর এ কী দেখলে হে দত্ত। দু'বছর যেতে দাও। তারপর দেখো মিডিয়া আর পাবলিক কী খতরনাক চিজ। সে যাক গে, তা এই হেরো অপোজিশনের কাছে কী মনে করে? গোলমেলে ফাইলটাইল সব জ্বালিয়ে দিয়েছি ভায়া। কিস্যু পাবে না। 

- কী যে বলেন খাসনবীসবাবু। আপনি খাস হতে পারেন, আমি নভিস হতে পারি; তবে ঘটে এ'টুকু বুদ্ধি আছে। সে'সব ফাইলটাইল নিয়ে আপনার কোনও চিন্তা নেই। র‍্যালিট্যালিতে একটু চমকাতে হয়, তাই বলে কি ও'সব নিয়ে পড়ে থাকলে আমার চলবে? ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি এসেছিলাম অন্য একটা রিকুয়েস্ট নিয়ে। 

- রিকুয়েস্ট? 

- অনুরোধ। 

- বাংলা তর্জমার জন্য আমার তোমায় দরকার পড়বে না দত্ত। দরকারটা কী?

- বলছিলাম যে দু'দিনের মধ্যে রাজধানীর কোনও একটা ব্যস্ত মোড়ে আপনার একটা মূর্তি না বসালেই নয় যে।  

- আমার মূর্তি? 

- গ্র্যান্ড হবে খাসনবীসবাবু। আমি কথা দিচ্ছি। পনেরো ফুটের মূর্তি। জায়ান্ট। আর আপনার ক্যারিস্মার সঙ্গে খাপেখাপে। সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে। এ'বার শুধু আপনি হ্যাঁ বললেই...। 

- আমি ইলেকশনে হেরেছি। আমার দল সাফ হয়ে গেছে ভাই দত্ত। আমার আবার মূর্তি কেন? 

- কী করব স্যার। পার্টির ছেলেরা ইলেকশনের জন্য মুখে রক্ত তুলে খাটল ছ'মাস। ইলেকশন জেতার পর শুধু মদ মাংস খাইয়ে তো আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। ও'দের যথেষ্ট উজ্জীবিত না করতে পারলে যে আমি ভেসে যাব খাসনবীসবাবু। আপনি এদ্দিনের পিএম। আমার মত ইয়ং চ্যাপের ফিউচার নিয়ে একবারও ভাববেন না? 

- মূর্তিভাঙাটা লোকে আজকাল বেশ খাচ্ছে, তাই না?

- আলবাত। রক্ত টগবগ। টিআরপিতে বিস্ফোরণ। 

- ভ্যানডালিসম একটু আছে বটে...। 

- এই আপনাদের এক রোগ। কথায় কথায় পাথর-ছোঁড়া-ইংরেজি। আর ছেলেছোকরারা পিকনিকে গিয়ে মাংস না কষিয়ে কি উচ্ছে-সেদ্ধ বসাবে? আর আমার ফুট সোলজাররা ভোটে জিতিয়ে দু'চার পিস মূর্তি না উপড়ে কি শ্যামাসঙ্গীত গাইবে?

- মার্কেট পালটে যাচ্ছে হে দত্ত। ট্রেন্ড বুঝতে হবে। যাক গে। বেশ। তাই হবে। আমার মূর্তি কাল বসুক। দু'দিন পর ভেঙেটেঙে দিও'খন। 

- আপনি মাই ডিয়ার লোক খাসনবীসবাবু। টিভি চ্যানেলে দেওয়া খিস্তিগুলো গায়ে মাখবেন না প্লীজ। বাজারের হাল তো দেখছেন, একটু আগুন না ঝরালে জনগণ পিঠ চুলকে দেবে কেন? 

- বেশ বেশ। কিন্তু শোনো হে দত্ত। সামনেই মিউনিসিপালিটির ইলেকশন আসছে। ও'টা আমার চাই কিন্তু। ছেলেটা বড্ড আইডল হয়ে বসে আছে। ওর একটা হিল্লে করতে হবে। 

- সে দায়িত্ব আমার। ও নিয়ে আপনি কিচ্ছু ভাববেন খাসনবীসবাবু। দরকার পড়লে মিউনিসিপালিটির অফিসের সামনে আমি আমার একটা মূর্তি বসিয়ে দেব ইলেকশনের আগে। ইলেকশন জিতে এলে খোকার সুবিধে হবে মৌজ করতে। কেমন?  

Sunday, March 4, 2018

বালিশবাবুর অফিসে - ৬



- এ যে দেখছি অনেক জল!
- অনেক বালিশবাবু! অনেক।
- কতটা? 
- সে কি আর মাপার উপায় আছে?
- যা মাপা যায় না তাকেই বুঝি 'অনেক' বলে মিস্টার মুখার্জী?
- বাবা ডাক থাকতে আবার মিস্টার মুখার্জী কেন?
- গোটা বালিশেন্দ্র থাকতে আবার বালিশ কেন?
- এ'সব কোনও প্রশ্ন হল?
- এ'সব কোনও উত্তর হল?
- ধুত।
- কতটা?
- কী কতটা?
- আমাদের সামনের এই বিশাল চৌবাচ্চাটায় কতটা জল? আন্দাজ? কয়েক লাখ ফীডিং বোতল ভরে ফেলা যাবে? 
- চৌবাচ্চা? এ'টা বে অফ বেঙ্গল বালিশেন্দ্রবাবু। সমুদ্র!
- চৌবাচ্চার তুলনায় সমুদ্রে কতটা বেশি জল থাকে বাবাবাবু?
- সমুদ্র যদি মাইনের পাওয়ার দিন সন্ধেবেলায় কলজের সাইজ হয়, তা'হলে চৌবাচ্চা হচ্ছে মান্থএন্ডের হঠাৎ ক্রেডিট কার্ডের বিল দেখা কলজে।
- উপমা দেওয়ার ক্ষমতা তুলি চালানোর মত সুক্ষ বাবাবাবু, আপনার দৌড় পেরেকে হাতুড়ি চালানো পর্যন্ত। 
- মোদ্দা কথা হল সমুদ্রে ইনফাইনাইট পরিমাণে জল আছে। চৌবাচ্চায় কয়েক লিটার।
- যা যা আপনি বা আপনারা মাপতে পারেন না, সে'টাই ইনফাইনাইট?
- মাপা সম্ভব নয়। 
- সম্ভাবনার লিমিট আপনি?
- মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
- ইনফিনিটি তা'হলে মানুষের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। কচ্ছপ হলে কী হয় কিছুই বলা যাচ্ছে না।
- ধ্যাত্তেরি। 
- তবে বাবাবাবু, এই যে পায়ে জল খেলে যাচ্ছে, এই ব্যাপারটা অতি মনোরম।
- জানি। জলের ছপছপ, বালির সুড়সুড়। বাই দি বাই বালিশবাবু, এই জলের ছপাৎছপকে বলে ঢেউ। 
- ঢেউ। তা সমুদ্র দিনে কতগুলো ঢেউ জেনারেট করে?
- আমি জানি না। অবশ্য কচ্ছপেরা জানতে পারে।
- সারকাজম? বাবাবাবু?
- মনে কেমন করে না? বালিশবাবু? ঢেউ, বালি, আকাশ...সব মিলে?
- ডাইপার বাইরে থেকে ভিজে গেছে মাইরি। আপনার এই ঢেউয়ের ছপাতে। রোম্যান্টিক আয়রনি।
- রোম্যান্টিক? আয়রনি? এ'সব কোথায় শিখলেন?
- আপনার বন্ধু মিস্টার সেনকে এই দু'টো শব্দ ব্যবহার করতে শুনেছি বহুবার। বিশেষ করে যখন ভদ্রলোক ইন্টেলেক্ট ঝাড়তে গিয়ে ছড়িয়ে ফেলেন। আরও আছে। বুর্জোয়া, বার্গ্ম্যান, পোস্টমডার্ন, এলিটিস্ট..।
- ঝাড়তে গিয়ে ছড়িয়ে? আপনার ভাষার হয়েছেটা কি?
- আমার ভাষা। বালির ঢিপির মত। আপনাদের ইনফ্লুয়েন্সের ঢেউ এসে অবিরাম হিট করে যাচ্ছে। অগুনতি।
- থেবড়ে বসবেন? বালিতে লেপ্টে?
- বালি আর ডাইপার খুব আনইজি কম্বিনেশন স্যার। আমি বরং আপনার কোলে...।
- বেশ।
- ইনফিনিটির সামনে এলে মন তিরতির করে কাঁপে? এম্পিরিকাল হিসেবকিতেব কি তাই বলছে? মনকেমন? বাবাবাবু?
- ডাইপার ভিজেছে? ভিতর থেকে? বালিশবাবু?

এ'বারের পুরী

১।

ভিড় মিনিবাসের হঠাৎ জানালা পাওয়ার যে শিউলি সুবাস,
ঘাটের নিরিবিলিতে আঙুলে আঙুল আড্ডার শেষে টিউশনি পড়তে গিয়ে ফতুয়ার বুক পকেটে পড়ে পাওয়া দু'টো খোসা ছাড়ানো বাদামের যে স্বাদ,
কপালে ঠেকে থাকা রিভলভারের ইস্পাত শীতল নল আচমকা সরে যাওয়ার যে স্বস্তি,
ঘি, তেল, শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধর গা বেয়ে ওঠা মুসুরির ডালের ঢেউয়ে যে ওম,
কয়েক হাজার অফিসের বকলসি ফোন-কলেরর ফাঁকে টুক করে সেঁধিয়ে যাওয়া "শালা বেঁচে আছিস না ফোটফ্রেমে দোল খাচ্ছিস" মার্কা ক্রিংক্রিংক্রিংয়ের যে আশ্বাস,
সাতপুরনো সঞ্জীব উপন্যাস সমগ্রের মধ্যে পোস্ট না করা গোপন প্রাগৈতিহাসিক পোস্টপকার্ডের যে হাড়হিম করা উঁকি, 
ছোটবেলার পড়ার ফাঁকে বাবার অফিস ফেরতা স্কুটারি ঘর্ঘর শুনতে পাওয়ার যে লজেন্স-নিমকি মার্কা উচ্ছ্বাস;

সেই সমস্ত "আরিব্বাস"য়ের টুকরো মিলেমিশে পুরী এক্সপ্রেসের সাইড আপারে টিকিট কনফার্ম হয়। অমনি পাতি মানুষের কলজের কয়েক টুকরো ফানুষ হয়ে উড়ে যায়, সে উড়ে যাওয়াগুলো প্রেমিকাদের ছাড়া কারুর চোখে পড়তে নেই।

২। 

নিজেকে কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ মনে করলেই মন্টুবাবুর যাবতীয় মনভার লাঘব হয়ে যায়। পরিবারের যে কোন থেকে সার্ভিস রিকুয়েস্ট এলেই "আপকা কল হামারে লিয়ে মহত্ত্বপপূর্ণ হ্যায়" মোডে চলে যান ভদ্রলোক। কোনও গণ্ডগোল পাকালেই মন্টুবাবুর গলায় নেমে আসে "আপ কি অসুবিধা কে লিয়ে হম সমা চাহতে হ্যায়"য়ের গন্ধরাজ লেবু মার্কা সুবাস। আর অভিমান জমলেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি, তার চারপাশে তখন "হমারে কাস্টমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ কিসি দুসরে কল মে ব্যস্ত হ্যায়। কৃপয়া লাইন পে বনে রহে ইয়া কুছ দের মে দোবারা কল কিজিয়ে" গোছের অদৃশ্য খোলস।

গোটা বছরের কাস্টোমার সার্ভিসিং শেষে এক তিতিবিরক্ত মন্টুবাবু প্রতি ডিসেম্বরে একবার পুরী আসেন। 

একা। এক হপ্তা থাকার জন্য টিকিট কেটে। ওই ক'দিন কাস্টোমার সার্ভিসের অফিস বন্ধ। ওই ক'দিন মন্টুবাবু শুধু নিজের জন্য বরাদ্দ রাখেন। দিনের বেলা প্রচুর হাঁটেন সমুদ্রের ধার দিয়ে, একা! বুকে আরাম জমা হয়। মন্টুবাবু বলেন ডিটক্স। সমুদ্রে স্নানটান অবশ্য করেন না, "আফটার অল বে অফ বেঙ্গল তো আর বাথরুমের চৌবাচ্চা নয়"।

বিকেলের দিকে স্বর্গদ্বারের বীচে এসে বসেন। ঢেউয়ের মত সব ট্যুরিস্ট এসে সমুদ্র ভিজিয়ে চলে যায়, মন্টুবাবু তৃপ্ত হয়ে দেখেন। আচমকা মন্টুবাবু দেখতে পান এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ পাজামা গুটিয়ে ঢেউয়ে লপড়ঝপড় করে চলেছে। তাঁর এক হাতে এক জোড়া সাদা নীল হাওয়াই চটি, অন্য হাতে আর এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভের নীল শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরা। নীল শাড়ির কোলে খুকি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের খিলখিল হাসি। তিন কাস্টোমার এক্সেকিউটিভ মিলে স্বর্গদ্বার আলো করে রেখেছে। নীল শাড়ি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের একটানা গুনগুন; "তোমাদের দু'জনেরই সর্দির ধাত, ফেরত চলো। চলো বলছি", সাদা পাজামার "আর দশটা মিনিট। 

ঠিক এমনটাই প্রতিবার চোখে পড়ে। প্রতিবার। পুরী আসার দিন দুয়েকের মাথায়। প্রতিবার মনভার মুছে গিয়ে মনকেমন এসে পড়ে। চোখে চিকচিক, মনে চিনচিন।

"বাড়ির সবাইকে কদ্দিন দেখি না"। 
প্রতিবার সাত দিনের প্ল্যান দু'দিনের মাথায় জেনারেল টিকিটে হাওড়া ফেরায় খতম হয়।

খোকা ও বই



- খোকা, এই হল বই।
*খোকার বই হাতে নেওয়া*
- বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর দু'টি নেই।
*খোকার বইয়ে প্রথম কামড়*
- না না, কামড় নয়। বই আর বন্ধুদের কামড়াতে নেই খোকা।
*খোকার মলাট চেবানোর চেষ্টা*
- মনে রেখো। ইউ উইল বি নোন বাই দ্য কোম্পানি ইউ কীপ অ্যান্ড দ্য বুকস ইউ চিউ। থুড়ি। রীড।
*খক খক হাসিতে খোকার মাথা নাড়া আর আরও দাপুটে কামড়*
- আহ্‌। কী হচ্ছে কী। তুমি দেখছি বইয়ের অযোগ্য। যাও, হাওয়াই চটি নিয়ে খেলো গে।
*খোকার মলাট চেটে বিরক্তি-লাভ*
- খেতে ভালো লাগেনি বুঝি? শরদিন্দুতে বিশেষ স্বাদ নেই? শীর্ষেন্দু চলবে?
*দাপটের সঙ্গে আধ-চেবানো বই ছুঁড়ে মেঝেতে ফেললে খোকা*
- সর্বনাশ! সরস্বতী কে ইনসাল্ট! অঙ্কে ফেল রুখবে কে এ'বার?
*বইয়ের ওপর খোকার ডান পায়ের পাতার মচরমচ*
- মনে রেখো। তোমার ফ্যামিলি সরস্বতী বিশ্বাসী কম্যুনিস্ট।
* খোকার দ্বিতীয় পা মুখ থুবড়ে পড়া বইয়ের পিঠে*
- গোস্তাখি! ব্যাটাচ্ছেলে এই বয়স থেকে সহবতের মাথায় লাথি মারতে শিখেছে? বাপের চোখ রাঙানিকে কাঁচকলা?
* পাশের ঘরের টিভি থেকে ভেসে আসা ফুর্তি মার্কা হিন্দি গান, খোকার কোমর দুলুনি*
- আইকনোক্লাস্ট? শরদিন্দুর ঘাড়ে চেপে ব্রেকআপ সং? পিঠের চামড়া তুলে নেব!
*খোকা নাচের তালে তালে বইয়ের চামড়া তুলতে শুরু করলে*
- আই অর্ডার ইউ টু স্টপ দ্য অ্যাসল্ট! নাউ! এখুনি! তুরন্ত!
*খোকার কোমর দুলুনির গতি বৃদ্ধি, বইয়ের মলাট ততক্ষণে এস্পারওস্পার*
- তবে রে? ব্যাটাচ্ছেলে তুই বই ভালবাসবি না তোর বাপ বই ভালবাসবে! আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন। নেমে আয় রাস্কেল বই থেকে।
*বইয়ের ওপর থেকে বলিউডি বিট-বিদ্ধ খোকাকে জোর করে ওঠানোর চেষ্টা, খোকার তীব্র তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ*
- খবরদার যেন আর কোনোদিন না দেখি বইকে ইনসাল্ট করতে।
*খোকার হাউমাউ চিৎকারে বাড়ির কেঁপে ওঠা, টিভির শীতল আশ্রয় ছেড়ে ঠাকুমার দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠে আসা*
- কী হয়েছে! তুই দাদুভাইকে ধমক দিচ্ছিস কেন? অমন ইডিয়টের মত চেল্লাছিসই বা কেন?- আরে দেখ না। ভাবছিলাম ছেলেটার মধ্যে একটু বই প্রেম কাল্টিভেট করব। - এই কালচার কালচার করে আজকাল তোর ঘাস খাওয়ার অবস্থা হয়েছে। কাজের কাজ সব বন্ধ করে শুধু বাতেলা। - মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ মা। আজকালকার প্যারেন্টিং পলিসি এ'টাই। আর খোকা কী লেভেলের বেয়াদপ হয়েছে দেখেছ? বইকে গ্রেসফুলি একসেপ্ট করার বদলে মাটিতে ফেলে তার ওপর ধেই ধেই করে নাচছে!- বইগুলো নিয়ে শেলফ বোঝাই করে তো হোয়্যাটস্যাপ ফরওয়ার্ড পড়ে দিন কাটাস। তার চেয়ে বই মেঝেতে ফেলে তার ওপর দাঁড়িয়ে নাচা বরং অনেক বেশি প্রো-কালচার।
*খেক্‌ খেক্‌ শব্দসহ খোকার বিশ্রী হাসি*

সঞ্জীবে


যার অঙ্কে লেটার নেই, তার কপালে মাঝরাত্তিরে গঙ্গার ধারে বসে প্রবাবিলিটির মজা বুঝিয়ে দেওয়ার একজন দাদা গোছের মাস্টার থাকুক।
যার ব্যাঙ্ক বোঝাই টাকা নেই, তার অন্তত একটা মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স থাকুক।
যার যুক্তিতে ধার নেই, তার মনে মধ্যে গজলের ঘুরঘুর থাকুক।
যার গল্প নেই, তার ভূতের ভয় থাকুক।
যার পিঠে চাপড় দেওয়া "কুছ পরোয়া নহি" বন্ধু নেই, তার জন্য নিরিবিলি ছাতের কোণার নিশ্চিন্দিটুকু থাকুক।
যার কাছে "তুমি চিঠি লেখনা কেন?"র উত্তর নেই, তার বুকের মধ্যে পাহাড়িসান্যাল গোছের বোরোলিন গন্ধ থাকুক।
যার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, তার জন্য মেঘলা সন্ধ্যের ভিড় মিনিবাসে জানালা রাখা থাকুক।
যার কবিতা লেখার ক্ষমতা নেই, তার আচমকা মনখারাপে অচেনা ছোট স্টেশনে নেমে চা-ওলার খোঁজ করতে পারার দুঃসাহস থাকুক।
যার 'মা কই মা কই' মনখারাপ ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই, তার বালিশে সাদা ওয়াড়ে সেলাই করা নীল ফুল থাকুক। আর থাক শিয়রের কাছের জানালা বেয়ে আসা চুল ওড়ানো হাওয়া।
যার কেউ নেই, তার সঞ্জীব থাকুক।

Saturday, March 3, 2018

চিঠি ও পদ্য

গত তিনদিনে এই নিয়ে বাহাত্তর নম্বর চিঠি এলো। উড়ো। এ'তেও বক্তব্য মোটামুটি একই রকম।
অবশ্য বক্তব্য না বলে হুমকি বলা ভালো।

বিয়ে না করলে সে মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করবে। কিন্তু কী মুশকিল। সে যে নিজের নাম ঠিকানা কিছুই লেখেনি। অবশ্য তাঁর পরিচয় কিছুটা হলেও আঁচ করেছেন মনোহর। নিজে থেকে তাঁর একটা নাম দেওয়া হয়ে গেছে ভাবতে একটু লজ্জাই লাগে মনোহরের; সুলিয়া। খামে অল্প গন্ধরাজের সুবাস। আর চিঠির ভাষায় এই যে সামান্য অনুযোগ মেশানো হুমকি, তা'তে মায়া আরও তরতর করে বেড়ে চলে।

পরিচয় পেলে বিয়েটা সেরে ফেলতে খুব আপত্তি করতেন না মনোহর। সুলিয়াকে নিয়ে সে'সবই সাতপাঁচ ভাবছিলেন  তিনি। ভেবে ভেবে উপায়ন্তর না দেখে নীল ডায়েরীটা টেনে নিয়ে বাহাত্তর নম্বর পদ্যটা লিখে ফেললেন মনোহর।

আর তখনই চড়ুইপাখির ডানঝাপটানো সুরে জানালা বেয়ে তিয়াত্তর নম্বর চিঠিটা এলো।

***

- চিঠি?
- তাই তো বলে ডাক্তারবাবু।
- আপনি দেখেছেন সে চিঠি?
- চিঠি না হাতি।
- আরে! কী মুশকিল। এই যে বললেন আপনার দাদার চিঠি পাওয়া বাতিক হয়েছে?
- বাতিক না। ব্যামো। আর আদতে কিস্যু আসে না। সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা ডাক্তারবাবু।
- নার্ভটার্ভ ফেল করেছে নাকি?
- আশ্চর্য নয়, নতুন কবিদের অমন একটু হতেই পারে। এ'বার দু'দাগ ওষুধ দিন দেখি।

***

দুপুরবেলা গন্ধরাজ গাছটায় হেলান দিয়ে একটু ঝিমটি না দিলে টুসুর চলে না। দিন তিনেক হল; সে'খানে শুয়ে সে রোজ ঝিমঝিমে স্বপ্ন দেখছে। সে'সব স্বপ্নে বাবার পছন্দের ব্যাঙ্ক চাকুরে পাত্রটি তার পিছনে ঘুরঘুর করে না। বরং তার চোখের সামনে নতুন নতুন পদ্যরা নেচে বেড়ায়। সব পদ্যর একই বিদঘুটে শিরোনাম; "অ্যাই সুলিয়া"!