Tuesday, November 17, 2020

অনুরাগের লুডো



অনুরাগবাবু আমার অত্যন্ত প্রিয়৷ তার মূলে রয়েছে "বরফি"। লোকমুখে ও বিভিন্ন রিভিউয়ের মাধ্যমে জেনেছি যে বরফিতে ভুলভ্রান্তি ও গোলমাল যথেষ্ট রয়েছে৷ কিন্তু গাম্বাট সিনেমা দেখিয়ে হিসেবে আমি বেশ বুঝেছি যে নিজের ভালোলাগাগুলোকে বুক বাজিয়ে আঁকড়ে থাকাটাই কর্তব্য৷  বরফি কতবার দেখেছি তার ইয়ত্তা নেই৷ সিনেমার টেকনিকালিটি বুঝি না - শ্রুতিদেবীর ছলছলে চোখের পাশাপাশি বরফি আর ঝিলমিলের প্রতি তাঁর অপত্য স্নেহ, ও'তেই এস্পারওস্পার হয়েছি, বারবার। মোদ্দা কথা হল, সিনেমাটি যে আগাগোড়া প্রবল যত্ন আর ভালোবাসায় তৈরি - সে সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ থাকেনা। সে'খানেই অনুরাগবাবুর ভক্ত হয়ে পড়া৷ 
(আদতে হয়ত অনুরাগবাবু প্রবল অযত্ন আর অ-ভালোবাসায় বানিয়েছিলেন ছবিটা। তাতে আমার কী? আমার মনে হয়েছে 'বরফি'র ফ্রেমে ফ্রেমে রয়েছে স্নেহ, ভালোবাসা আর জ্বরে-জলপটি-মার্কা যত্ন৷ সেই মনে হওয়ার দামই তো লাখ টাকা)। 

যাকগে৷ এতটা পাঁয়তারা কষলাম এ'টা জানাতে যে "লুডো" দেখেছি৷ অনুরাগবাবুর সিনেমার ব্যাপারে আমার একটা বায়্যাস থাকবে, সে সম্ভাবনাও  উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷ কাজেই গোড়াতেই বলে দি যে সিনেমাটা আমার বড় ভালো লেগেছে। সুপারডিলাক্স মার্কা একটা জিগস-পাজলামো আছে। গতি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সুতোয় সুতোয় সিনেমার প্রতিটি কণার জড়িয়ে থাকা৷ তবে আমার ভালো লাগা সেই গতি আর থ্রিলে নয়।

লুডোর কয়েকটা সাদামাটা মুহূর্ত বড় অনাবিল হয়ে মনে গেঁথে গেছে৷ প্লট গপ্প ট্যুইস্ট ক্লাইম্যাক্স- সিনেমা মাত্রই এ'সব থিওরি কপচানো হবে৷ তার ভালো খারাপ থাকবে৷ কিন্তু কিছু কিছু অনস্ক্রিন মুহূর্ত অমূল্য - সে'সব মুহূর্তের কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়াটাই আমার সিনেমা দেখা৷ এই যেমন কালপুরুষ সিনেমায় একটা রেস্টুরেন্টে বসে বাবা আর ছেলে খাওয়াদাওয়ার দৃশ্য৷ আপাতদৃষ্টিতে নিরেট৷ ডায়লগেও মারকাটারি তেজ থাকার কথা নয়। রাহুল বসুর বাংলাও  নিখুঁত নয়৷ অথচ সেই সিন থেকে আজও বেরোনো হয়নি, এখনও সে দৃশ্য দেখলে বুকের মধ্যে ওলটপালট হবে৷ হবেই৷ আর সে'খানেই লুডো আমার চোখে অনবদ্য, এমন বেশ কিছু সিকুয়েন্সের জন্য৷ 

একটা ব্যাপার না বললেই নয়, আপাত ক্লিশেগুলো নিয়ে বড় চমৎকার গল্প বলেন অনুরাগবাবু (স্রেফ বরফি দেখে কথাটা বলা৷ এই অপর্যাপ্ত স্যাম্পেলে স্যুইপিং প্রশংসা করতে পারাটাই বোধ হয় আদত ভক্তি)৷ লুডোতেও সেই ব্যাপারটাও ঘটেছে৷ বাপের হাহাকার আর স্নেহ, বদখত মানুষের মনের নরম, আলগোছে পড়ে থাকা একনিষ্ঠ প্রেম - এমন সব প্রবল বলিউডি ক্লিশেগুলোর সরবতে প্যরামাউন্ট সুবাস মিশিয়ে মনভালো করা বেশ কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়েছে৷ উয়ো সব ফ্রেম মে ফির সে ওয়াপিস যায়েগা, আবার দেখব 'লুডো'৷ 

আর। সিনেমা জুড়ে যে'টা তুরুপের তাস - সে'টা হল সারল্য৷  প্রতিটি জটিল চরিত্রের সারল্যটুকুকে ছেঁকে তুলে তৈরি হয়েছে এই প্লট৷ 

তাছাড়া৷ ভালো সিনেমার একটা বড় সিগনেচার হল 'শো'-য়ের শেষে দর্শকদের মনে সিনেমার গানগুলোর প্রতি একটা আলাদা ভালোবাসা তৈরি করতে পারা, সুর, গায়কি, লিরক্সের বাইরে গিয়ে৷ আবাদ-বরবাদ আর হরদম-হমদম গানদুটো আমি আদৌ সিনেমা দেখার আগে শুনিনি৷ অথচ সিনেমাটা দেখার পর থেকে মনের মধ্যে এই দু'টো গানের সুর ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে চলেছে৷ আর সুরের সঙ্গে চলকে উঠছে সিনেমার এক একটা মুখ, প্রবল ভালোলাগা সহ৷ (আর ওই সাতপুরনো 'ও বেটাজি ও বাবুজি' গানটা এমনভাবে মাখনে-ছুরি লেভেলে ব্যবহৃত হয়েছে, উফ। বাপি লাহিড়ির ক্রেড জিঙ্গলটির ম্যাজিকও হার মানতে বাধ্য)

ক্রিটিসিজম? আলবাত আছে৷ বেশ কিছু জায়গার ডায়লগ শীর্ষেন্দু লিখলে যেন আরও ভালো হত৷ বেশ কিছু দৃশ্যের বর্ণনা সিনেমার বদলে সঞ্জীবে কলমে পড়তে পারলে আরও লাগসই হত যেন।

মনখারাপের দিন


- এই যে ভায়া, মনটন খারাপ নাকি?

- হুম?

- মনখারাপ?

- আমার আবার মনখারাপ৷ ইট পাথর সিমেন্ট বালি আলকাতরা ট্র‍্যাফিক লাইট দোকান বাড়ি প্রমোটার মেট্রোরেল ফ্লাইওভার রাস্তায় তৈরী কেঠো চীজ আমি..আমার আবার মন খারাপ।

- তা'তে কী?শহরদের স্নেহ থাকতে নেই? মনখারাপ থাকতে নেই?

- আমাদের কি আর ফুলফুল প্রিন্টেএ ওয়াড় পরানো নরম বালিশ আছে ভাই? যে'খানে মুখ গুঁজে স্বস্তি পাব? আছে কী? বলো?

- মেঘলা আকাশ চলবে? ভাই কলকাতা?

- আর রুমাল? বালিশে ডাইরেক্ট ফ্যাঁচফোঁচ করাটা আনহাইজেনিক।

- পুরনো ছবি আছে৷ দেব?

- দেবে?

- আর একবার জিজ্ঞেস করেই ফেলি না হয়৷ আজ মনখারাপ নাকি? ভাই কলকাতা?

- একটা টলটলে ভালোবাসা, জানো। টলটলে। আর ছলছলে মনকেমন৷ ছলছলে।

(১৫.১১.২০২০)

Sunday, November 15, 2020

মিত্র

- আপনি টিকটিকি মিট্টার নন?

- আর কতবার বলব? আমি ও নামে কাউনে চিনি না।

- ফেস সেম টু সেম৷ ভয়েস সেম টু সেম৷ ভেরি ফিশি মিস্টার মিট্টার। ভেরি ফিশি।

- কাল সন্ধ্যে থেকে বলে যাচ্ছি আমার নাম অপূর্ব। আমি আপনার ওই মিত্তির নই৷ আর আপনার সঙ্গে এর আগে আমার কখনও দেখা হয়নি।

- বেনারস আপনি ভিজিট করেননি?

- আমি সে'খানে থেকেছি ক'বছর৷ তাও অনেক ছেলেবেলায়।

- ওয়েব অফ লাইজ৷ উ বিজনেস হামার আছে মিস্টার মিট্টার৷ ইউ আর অ্যান অনেস্ট ম্যান৷ খামোখা ঝুট বলে রেপুটেশন নষ্ট করা কেন? হোয়াই? এখন বলবেন কাঠমাণ্ডুতে ভি হামাদের মোলাকাত হয়নি।

- কাঠমাণ্ডু? নেপালে? 

- আরে৷ ইউ আর ফলিং ফ্রম স্কাই।

- দেখুন, বিশ্বাস না হয় আমার বন্ধু পুলুর ঠিকানা দিচ্ছি৷ তার কাছে গিয়ে যাচাই করে আসুন।

- পুলু? আঙ্কিলের নয়া নিকনেম?

- আমায় ছেড়ে দিন। 

- ফর ওয়ান ফাইনাল টাইম৷ ইউ আর নট প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিট্টার?

- ছোটখাটো একটা চাকরী করি। ক্লার্কের৷ সে'টাও খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন৷ ও'সব গোয়েন্দাগিরিটিরি আমার ধাতে সইবে কেন? লেখালিখির একটা বাজে অভ্যাস আছে বটে কিন্তু..। যাক গে৷ মগনলালবাবু, আমায় ছেড়ে দিন।

- ছাড়তে পারি। অন ওয়ান কন্ডিশন। অর্জুনের সামনে দাঁড়াবে আপনার পুলু? সরবৎ পিবে? এন্টারটেন করবে? 

Friday, November 13, 2020

ভূতচতুর্দশীর বাজে গল্প।


- ভূতের গল্প?

- হ্যাঁ মামা। ভূতচতুর্দশীর রাতে একটা জমজমাট গা ছমছমে ভূতের গল্প না হলেই নয়।

- জমজমাট? গা ছমছমে?

- এগজ্যাক্টলি৷ 

- একবার হয়েছে কী, একটা স্কন্ধকাটা গিয়ে পড়েছে টুপির দোকানে..।

- যাহ্৷ এতে গা ছমছম কই?

- স্কন্ধকাটার সিচুয়েশনটা ভাব ভাগনে৷ চারদিকে হাজার হাজার টুপি..অথচ সে ব্যাটা ঠুঁটোজগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে৷ ঠিক যেন কেউ কাঁটাচামচ দিয়ে স্যুপ খেতে বসেছে। 

- আহা, এতে ট্র‍্যাজেডি আছে৷ কিন্তু গা ছমছম কই? 

- বেশ৷ বেশ৷ অন্য প্লট।

- ইরশাদ। ইরশাদ।

- একবার হয়েছে কী..একটা মেছোভূত গিয়ে পড়েছে এক ভিগানের বুফেতে৷ আর তারপর ব্রকোলি কালিয়ার গন্ধে গা গুলিয়ে সে মূর্ছা যায় আর কী...।

- মামা, তুমি গল্প বলার ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছ না। 

- কেন রে? সাফিশিয়েন্টলি গা ছমছমাচ্ছে না বুঝি?

- ধুর৷ ভিগান বুফেতে মেছোভূত৷ এ'টা ভূতের গপ্প না জ্যোমাটোর ট্যুইট?

- তুই বড় খুঁতখুঁতে ভাগনে।

- মামা, আর একটু তলিয়ে ভাবো।

- বেশ। শোন মনে দিয়ে৷ অ্যাটেনশন। কেমন?

- টোটাল ফোকাস নিয়ে বসেছি।

- একবার হয়েছে কী..একটা শিব্রাম ভক্ত শাঁকচুন্নির মাথায় পানের ভূত চেপেছিল। হাজার রকম পদের মধ্যে থেকে সে শুধু শাক বেছে নিয়ে গাইত "আঁমি শাঁক চুঁনেছি, আমি শাঁক চুঁনেছি"।

- মামা, আজ বরং গল্পটা থাক।

- ভাগ্নে, গল্পটাকে ফ্লো তো করতে দে৷ থ্রিল আসবে৷ গা ছমছম আসবে৷ 

- হাউহাউ কান্না আসছে মামা। গল্প থাক।

- লাস্ট চান্স৷ লাস্ট।

- ভূতচতুর্দশীর কসম মামা৷ এ'বার কাঁপিয়ে দাও৷ 

- সে অনেকদিন আগের গল্প৷ বহুযুগ আগের, বুঝলি৷ এক ছিল ব্রহ্মদৈত্য আর এক ছিল মামদো৷ তাঁদের একই গাছের পাশাপাশি ডালে বাস।

- পাশাপাশি?  খতরনাক তো!

- তবে আর বলছি কী ভাগনে৷ টোটাল থ্রিল রয়েছে এ'খানে।

- তারপর কী হল মামা?

- সে ব্রহ্মদৈত্য আর মামদোর আবার গলায় গলায় দোস্তি।

- বলো কী৷  ব্রহ্মদৈত্য আর মামদোর দোস্তি? এ যে গল্পের গরু গাছে৷

- গাছ আর এমন কী ভাগ্নে৷ এরপরে পাহাড় বেয়ে উঠবে। আই প্রমিস৷ 

- তারপর মামা?

- ব্রহ্মদৈত্যর ছায়া-শরীরের চিতার গন্ধটা বড় ভালোবাসত মামদো।

- অহো৷ নাজুক মামা। নাজুক। 

- আর জনাব মামদোর আবছা-গায়ে লেপটে থাকা মাটির সুবাসটুকু শুঁকে বড় ফুর্তি পেত বাবু ব্রহ্মদৈত্য।

- কবিতা মামা৷ জাস্ট কবিতা হচ্ছে৷ জয় গোস্বামী কে বারো গোল দেওয়া কবিতা। 

- তারপর..।

- তারপর?

- তারপর একদিন হয়েছে কী..এক বেঁশোভূত এসে হাজির হল তাঁদের গাছে। 

- বেঁশো?

- মর্গ লাগোয়া বাঁশঝাড়ে তেনার বাস। তাই বেঁশো।

- সে ব্যাটা এলো কেন?

- ভোট চাইতে৷ 

- ভোট?

- ভোট৷ ভূতের দেশে ভোট আর বাতেলা নেই ভেবেছিস ভাগ্নে? সব আছে। মরেও মুক্তি নেই রে৷ মুক্তি নেই।

- ভারী মনখারাপ হল মামা৷ মরেও মুক্তি নেই। যাকগে। বেঁশো ভোট চাইতে এলো। তারপর?

- প্রথমে সে বেঁশো ব্যাটা ব্রহ্মদৈত্যকে প্রাইভেটে পাকড়াও করল। বেঁশো বলল, "ওই শালা মামদোর জাতে শয়তানি মিশে আছে, আমাদের নেতা হাতে ক্ষমতা পেলে ওদের চাবকে সিধে করবে৷ তাতে তোমারই ফায়দা৷ কাজেই আমাদের নেতাকে ভোট দাও"। 

- বেশ রিয়েলিস্ট হল এই জায়গাটা৷ এক্কেবারে আর্ট ফিল্ম। তা ব্রহ্মদৈত্য কী বললে?

- ব্রহ্মদৈত্য বেঁশোর কান মলে চ্যাংদোলা করে গাছ থেকে ছুঁড়ে ফেললে। 

- স্টানিং৷ আর্ট ফিল্ম টু রূপকথা৷ 

- এরপর বেঁশো ফের গাছে বেয়ে উঠলে প্রাইভেটে মামদোকে পাকড়াও করতে।  মামদোকে বেঁশো বললে "ওই শালা ব্রহ্মদৈত্যর জাতে শয়তানি মিশে আছে, আমাদের নেতা হাতে ক্ষমতা পেলে ওদের চাবকে সিধে করবে৷ তাতে তোমারই ফায়দা৷ কাজেই আমাদের নেতাকে ভোট দাও"।

- সে কী৷ বেঁশো আদতে কোন মতাদর্শে ভীড়ে আছে বলো তো মামা?

- বেঁশো মতাদর্শ বোঝে ভেবেছিস? সে বোঝে কমিশন। সে সাপের হয়েও সওয়াল করে আবার নেউলের হয়েও৷ 

- ওহ৷ ইউ মীন দ্য হাইয়েস্ট লেভেল অফ পলিটিক্স।

- এগজ্যাক্টলি। 

- তা মামদো কী করলে?

- মামদো? মামদো বেঁশোর কান মলে চ্যাংদোলা করে গাছ থেকে ছুঁড়ে ফেললে। তারপর মামদো আর ব্রহ্মদৈত্য মিলে সে যাকে বলে রোলিং অন গাছের ডাল উইথ লাফটার। চিতার গন্ধ আর মাটির সুবাস মিলে মাখামাখি।

- এই দ্যাখো মামা, গায়ে কাঁটা দিয়েছে। আর বুকে ধুকুরপুকুর।  টোটালি থ্রিলড।

- কী, বলেছিলাম না গল্পের গরু আর্ট ফিল্মের জাবর কাটায় আটকে না থেকে এভারেস্টে উঠবে?

- এক্কেবারে চাঁদে পাঠিয়েছ মামা। টু দ্য সী অফ ট্রাঙ্কুইলিটি।

- বেস্ট উইশেস অন ভূতচতুর্দশী ডিয়ার ভাগ্নে৷ 

- সেম টু ইউ মামা। সেম টু ইউ। 

***

 (বলাই বাহুল্য ছবিট পরশুরাম গল্পসমগ্র থেকে নেওয়া।  "যতীন্দ্রকুমার সেন বিচিত্রিত"।)

বিধুবাবুর কেল্লাফতে


- কে? কে?

- এসেছি ভায়া, এসেছি। 

- কে আপনি?

- পরিচয়টা তো বড় কথা নয়৷ এসেছি৷ এ'টাই বড় কথা৷ তাই না বিধুশেখর? 

- আইশ্লা! মার দিয়া কেল্লা! নামিয়েছি৷ আমি ভূত নামিয়েছি। প্ল্যানচেটের জোর আছে৷ আছে!

- আলবাত আছে। তোমার কনসেন্ট্রেশনের জোরেই তো এলাম।

- বেয়াল্লিশ বছর ধরে চেষ্টা করছি, জানেন৷ বেয়াল্লিশটা বছর৷  শর্টসার্কিট বিধু,  ভূতপাগল বিধু, প্ল্যানচেট পাগলা- এমন কতশত বদনাম বয়ে বেড়াচ্ছি৷ পাড়ার লোক পাত্তা দেয় না, আত্মীয়স্বজন এড়িয়ে চলে৷ তবু, তবু আমি হাল ছাড়িনি৷ 

- সাবাশ ব্রাদার!

- হিয়ার ইজ মাই সাকসেস৷ ভূত! আপনি!

- চা'টা অফার করবে না হে? বিধুশেখর?

- চা? 

- ভূতেরা চা খায়না বটে৷ তবে এই যে তোমার সোফায় এসে বসলাম, এ'টুকু সৌজন্য আমি আশা করতেই পারি৷ তুমি অফার করবে, আমি রিফিউজ করব।

- চা খাবেন স্যার?

- নো, থ্যাঙ্কস।

- ইয়ে, আপনার নামটা? জানতে না পেরে কেমন খচখচ করছে৷ আপনাকে ঠিক দেখতেও পারছি না যে৷ কেমন আবছা আবছা সমস্তটা৷ 

- দেখবেটা কী করে! এখনও পুরোপুরি তৈরি হতে পারিনি তো৷ এখনও ওয়ার্ক ইন প্রগ্রেস।

- ঠিক ইয়ে, ধরতে পারলাম না স্যার..। পুরোপুরি তৈরি হননি মানে?

- মানে, যে ব্যাটা মরে আমি..সে পুরোপুরি মরেনি।

- মা..মানে?

- অর্ধেকটা মরেছে৷ কাজেই আমিও অর্ধেক ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি৷ কিন্তু দুঃখের কথা কী আর বলব ভাই, সে জন্য অন্য ভূতেরা আমায় অত্যন্ত হেয় করে৷ আমায় নিয়ে ঠাট্টা করে৷ তেনাদের লেগপুলিংয়ে এ কী বিষ৷ উফ! এত রাগ হয় ভাই বিধু..।

- আমার না কেমন যেন মনে হচ্ছে..।

- আধমরা মানুষ ভাই তুমি৷ সংসার, সমাজ, ভালোবাসা, স্নেহ সমস্তই ত্যাগ করেছ এই ভূত ধরার তাড়নায়৷ তোমার আবার মন, তায় আবার মনে হওয়া।

- ভালো হচ্ছে না বলে দিচ্ছি..ভালো হচ্ছে না।

- আমি যে হাফভূত হয়ে হেনস্থা হচ্ছি? সে'বেলা? সে'টা বুঝি খুব ভালো হচ্ছে? নাহ্৷ এর বিহিত না করলেই নয়৷ একটু এ'দিকে এসো দেখি বাবা বিধুশেখর।

**

তিরিশ বছর ধরে পুলিশে চাকরী করছেন অবনী দারোগা। অথচ গলায় দড়ি দেওয়ার বদলে কেউ নিজে নিজের গলা টিপে আত্মহত্যা করেছে,  এমন বিদঘুটে কেস এর আগে কখনও দেখেননি৷ অথচ বিধুশেখর মল্লিকের গলায় আঙুলের দাগ মিলিয়ে দেখলে সন্দেহের কোনও অবকাশই থাকে না৷ 

Thursday, November 12, 2020

নিউনর্মালে লোকালে


আমার দুই মামা চাকরীর পাশাপাশি যে'টা করে সে'টা হল ডেলি প্যাসেঞ্জারি৷ ছোটমামা মাঝেমধ্যেই বলে যে তাঁর চাকরীর একভাগ অফিস আর তিনভাগ ডেলিপ্যাসেঞ্জারি৷  সারা বছর লোকাল ট্রেনের ভীড় সামাল দিয়ে কলকাতা পৌঁছে তাদের 'অফিস-করা'৷ লোকাল ট্রেনের চলাচল মফস্বলের মানুষজনের জন্য ধানচাষের মতই জরুরী, কলকাতার চাকরী ধরে রাখতে এই লোকাল ট্রেনের ডেলিপ্যাসেঞ্জারিই অজস্র সংসারের ভরসা। মাসের পর মাস সেই ট্রেন চলাচল বন্ধ আবার ও'দিকে ঠুনকো প্রাইভেট ফার্মের চাকরী। করোনার দুর্বিপাকে পড়ে বেশ কিছু দিন প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে কেটেছে৷ 

বিশ্রী একটা ধুকপুক নিয়ে ফের শুরু হয়েছে লোকাল ট্রেনের যাওয়া-আসা৷ খানিকটা স্বস্তি এসেছে, যাতায়াতের একটা সুরাহা হল, চাকরীটা হয়ত টিকিয়ে রাখা যাবে৷ কিন্তু তার পাশাপাশি রয়েছে প্রবল শঙ্কা- মুণ্ডু গেলে খাবোটা কী? 

নিয়মিত কলকাতা যাতায়াতের সহজতম পথটা যেমন চালু হল, তেমনই এর পাশাপাশি বহুগুণ বেড়ে গেল ট্রেনের ভীড় এবং অসতর্কতায় কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার দুর্বিষহ ভয়৷ 
এই অসহায় পরিস্থিতিটা বুঝিয়ে বলাটা নেহাৎ সহজ নয়৷
 
আমি শুধু জানি যে দু'জন সাধাসিধে সরল মানুষ সংসারের জন্য বুক চিতিয়ে লড়ছেন৷ তাঁরা সতর্ক, কিন্তু চোয়াল শক্ত না রেখে উপায় নেই। বেলা বোসকে চাকরীটা পাওয়ার খবর দেওয়ার গানটা আমাদের বড় প্রিয়৷ কিন্তু সে সাধের চাকরীটা ধরে না রাখতে পারলে আটপৌরে সংসারের লাল-নীলটা আর রইবে না৷ অতএব, নিয়মিত যুদ্ধযাত্রা।

আমরা অনেকে বাজারঘাট বা 'শপিং'য়ের জন্য বের হচ্ছি, কেউই তো আর থেমে নেই৷ জুবুথুবু হয়ে মাসের পর মাস বসে থাক সহজও নয়৷ তবে এরই মাঝে আমাদের মাস্কটাও আলগা হয়ে আসছে৷ 'ও হলে হবে'র ভাইরাস করোনাকে টেক্কা দিচ্ছে৷ অথচ ও'দিকে, কত মানুষ বেরোচ্ছেন সংসার যুদ্ধে কোনওক্রমে টিকে থাকতে। 

যুদ্ধ মাত্রই সিয়াচেনের বরফ বা কুরুক্ষেত্রর ব্যূহ  নয় - সেই যুদ্ধগুলোর প্রতি সেলাম ঠুকতে আমাদের মাস্কগুলো থাক। 

Wednesday, November 11, 2020

এখন অবসন্ন যারা


- ও নিতাইদা, টুয়েন্টি নাইন হবে নাকি? ভজা আর রতন রেডি৷ 

- না রে মধু। এই সবে অফিস থেকে ফিরলাম। বড় ক্লান্ত৷ ভাবছি সাততাড়াতাড়ি ডিনারটা সেরে লম্বা হব। 

- আজ মেসে নতুন রাঁধুনি এসেছে৷ তার হাতে ডাল আর ঝোলের নাকি একদর। 

- অমিয়বাবুর কাছে এ'বার একটা প্রটেস্ট না জানালেই নয়। মাস গেলে এতগুলো টাকা দিই আমরা। অথচ আজ ছ'মাস হল একটা ভালো রাঁধুনি জোগাড় করতে পারছেন না উনি? 

- মাথা গরম করে আর কী হবে গো নিতাইদা।

- সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মেসে ফিরে যদি তৃপ্তি করে ভাত মাছেরঝোলটুকুও না খেতে পারি, মেজাজ ঠিক থাকবে কী করে। ধুরছাই। 

- বড় ক্লান্ত তুমি। তাই না নিতাইদা?

- কাজের যা চাপ রে মধু। আর ভাল্লাগেনা। 

- তোমার মেজাজটা ঠিক..উঁহু৷ শুধু কাজের চাপ তো নয়। মনখারাপ নিতাইদা? বাড়ির জন্য?

- কদ্দিন বাড়ি যাইনা বল দেখি। কদ্দিন। 

- খোকা কত বড় হল?

- এই পৌষে ছয়ে পড়বে।

- ফোনে কথা হয় তো ওর সঙ্গে রোজ৷ তাই না?

- খোকার গায়ের মিষ্টি গন্ধ কী আর ফোনে পাওয়া যায় রে মধু। তাছাড়া কদ্দিন তোর বৌদির পাশে বসে তার সঙ্গে প্রাণ খুলে গপ্প হয়না৷ আমার ভাই সামনের মাসে পার্ট টু পরীক্ষা দেবে, সে ব্যাটা কেমন প্রিপেয়ার করছে, সে'খবরটুকু পর্যন্ত রাখতে পারিনা। 

- নিতাইদা, একটা শ্যামাসঙ্গীত শুনবে?

- সে কী রে। ভজা রতনকে বসিয়ে রেখে এসেছিস তো টুয়েন্টি নাইনের জন্য৷ অনিন্দ্য ফিরেছে কিনা দেখ, ট্যুয়েন্টি নাইনের পার্টনার পেয়ে যাবি।

- গলার সুর না থাকে, বুকে দরদটুকু তো আছে৷ টুয়েন্টি নাইন হবে'খন৷ শ্যামাসঙ্গীতটা ধরি?

- ধরবি? বহুত অচ্ছা।

- জ্যেঠু বলতেন আমার গলার টেক্সচারে কোথাও যেন সামান্য পান্নালাল মিশে আছে।

- নাহ্৷ এই ভালো। তোর গানই ভালো। মেসের ওই বিস্বাদ ভাত খেয়ে তো আর  দিনগত পাপক্ষয়ের ক্লান্তি মিটবে না। শ্যামাসঙ্গীতে যদি একটা হিল্লে হয়।

**

'আমার মায়ের পায়ের জবা হয়ে ওঠনা ফুটে মন" ধরলে মধু। মেসের জানালা দিয়ে ভেসে আসা উত্তর কলকাতার গলি কাঁপানো শোরগোল ভিজে নরম হয়ে পড়ল মধুর দরাজ কণ্ঠস্বরে। 

আর বিছানায় ও'পাশ ফিরে শুলেন নিতাই কর্মকার৷ বাড়ির জন্য মনকেমনে একজন দামড়া কেরানী মানুষের চোখ ভিজে যাওয়াটা সামান্য লজ্জার বলে মনে হয় তাঁর। মনভারটা এতক্ষণ দিব্যি চেপেচুপে রেখেছিলেন, কিন্তু ব্যাটাচ্ছেলে মধুর শ্যামাসঙ্গীতে সমস্ত হিসেব গোলমাল হয়ে গেল। বড় একা লাগে নিতাইবাবুর, বড্ড একা লাগে। 

ও'দিকে মধু জানে ভজা আর রতন দাবা খেলতে ব্যস্ত, তারা মোটেও ট্যুয়েন্টি নাইনে সন্ধ্যে নষ্ট করতে উৎসুক নয়। টুয়েন্টি নাইন নিমন্ত্রণের অছিলায় শুধু অবসন্ন নিতাইদার পাশে এসে কিছুক্ষণ থাকা৷ আহা, বাড়িঘরদোর পরিবার ছেড়ে মানুষটা এতদূরে পড়ে আছে৷ আজ সন্ধেবেলা নিতাইদাকে দেখেই মনে হয়েছে আজ যেন সে একটু বেশিই অবসন্ন, আজ যেন নিতাইদার একটু বাড়তি মনখারাপ। এই মনখারাপের গুমোটে নিতাইদা যে একা আটকে নেই,  এ কথাটা তো আর গায়ে পড়ে বলা যায়না৷ কিন্তু গায়ে পড়ে শ্যামাসঙ্গীত দিব্যি গাওয়া যায়৷  

Tuesday, November 10, 2020

ফেরা

- এই যে ভায়া৷ এই যে।

- রবিদা? আপনি?

- আমি ট্রেন ধরতে আসিনি। 

- আমায় ধরতে এসেছেন?

- তুমি তো আর চোর-ডাকাত নও৷ তোমার মাথার ওপর তেমন কোনও ইনামও নেই যে পাকড়াও করে দু'টো বাড়তি টাকা পিপিএফে রাখতে পারব৷ 

- তবু। আপনার কাছে হাজার তিরিশেক টাকা ধার রয়ে গেছে। এখুনি চাইলে কিন্ত দিতেও পারব না। তবে, টাকাটা মেরে দেব না৷ কোনও না কোনও ভাবে ঠিক..। তা সে আমি যে'খানেই থাকি।

- ইয়ং জেনারেশনের এ এক মস্ত বড় অসুবিধে হে৷ গিভ অ্যান্ড টেক ছাড়া কিছুই দেখতে পাওনা। আমি ধান্দাবাজ হতে পারি, তবে চশমখোর নই। 

- ছি ছি রবিদা৷ বাবা মারা  যাওয়ার পর এমন অথৈ জলে পড়েছিলাম৷ চাকরীটাও ছাই এমন সময়..। রবিদা, আপনি সে'সময় পাশে এসে না দাঁড়ালে..৷ 

- তা, এমন ভরদুপুরে..পাততাড়ি গুটিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আমার এজেন্ট খবর দিলে তুমি আন্ডারগ্রাউন্ড হওয়ার তাল করছ৷ 

- মুঙ্গেরে একটা চাকরীর সম্ভাবনা আছে৷ বিশুর মামা সে'খানে কন্ট্রাক্টরি করছেন৷ উনিই ডাকলেন তাই..।

- তা, তোমার তো ছাত্র পড়ানোয় বেশ রেপুটেশন তৈরী হয়েছে আজকাল৷ আর বেঙ্গলে তো আজকাল টিউশনিই হল ইন্ডাস্ট্রি৷   আচমকা সে'সব ছেড়ে মুঙ্গেরে আবার কেন।

- রবিদা৷ আমি সত্যিই আপনার কাছে কৃতজ্ঞ৷ কিন্তু সিদ্ধান্তটা একান্তই ব্যক্তিগত৷ এ পাড়ায় আমার আর মন টিকবে না।

- তা অবিশ্যি ঠিক৷ ছেলেছোকরাদের আজকাল প্রাইভেসি নিয়ে হাজার রকমের টালবাহানা শুনি৷ গুরুজনদের সদুপদেশও দিব্যি প্রাইভেসির অছিলায় পাশ কাটিয়ে দেওয়া যায়৷ যাক গে৷ সোয়া চারটের এক্সপ্রেসটা ধরছ কি?

- হ্যাঁ।

- রাত পৌনে আটটায় আর একটা মেল ট্রেন আছে৷ ওই ও'দিকেরই।

- কী ব্যাপার বলুন তো?

- একটি বারের জন্য যে তোমার পাড়ায় ফিরতে হবে ভায়া।

- কিন্তু কেন?

- তোমার বাড়ির দলিলটা আমার কাছে রয়ে গেছিল৷ সে'টা ফেরত দিতে চাই৷ কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মে তো সে'টা দেওয়া সম্ভব নয়৷ কিছু সইসাবুদেরও ব্যাপার রয়েছে৷ তোমায় একটি বারের জন্য আমার অফিসে আসতেই হবে।

- সে কী৷ পুরো টাকাটা এখনও শোধ দেওয়া হয়নি৷ বন্ধক রাখা দলিল ফেরত দেবেনই বা কেন? 

- তিরিশ হাজার তো মাত্র বাকি৷ ও নিয়ে তুমি ভেবো না৷  শুধু দলিলটা নিয়ে আমায় মুক্তি দাও।

- রবিদা আমি কিছুই বুঝছি না৷ শুনুন, বাকি তিরিশ হাজারটাকা ফেরত দিয়েই আমি ও দলিল ফেরত নেব৷ কেমন? 

- সে'টি হওয়ার নয় ভায়া৷ ও দলিল তোমায় আজই নিতে হবে৷ বিপদে তোমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি, তুমি নিজের মুখেই স্বীকার করলে৷ করলে তো?

- নিশ্চয়ই৷ 

- তা'হলে তুমি আমার জন্য এ'টুকু করবে না? ও দলিল আমার থেকে নিয়ে তুমি আমায় মুক্তি দাও ভায়া।

- আমায় দয়া করে ব্যাপারটা খুলে বলবেন?

- আমাদের বাড়ির নারায়ণ কিডন্যাপ হয়েছে ভাই৷ 

- মানে আপনাদের ওই নারায়ণ শিলা? ঠাকুরঘর থেকে নারায়ণ শিলা চুরি হয়েছে?

- র‍্যানসম ডিমান্ড করে চিঠিও এসেছে৷ পুলিশ কিছুতেই নারায়ণ শিলা চুরি যাওয়ার কেস নিতে চাইছে না। এ'দিকে নারায়ণ না ফিরে পেলে নির্মূল হয়ে যাব ভাই৷ 

- র‍্যানসম?

- ওই৷ তোমার দলিল তোমায় ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত নাকি নারায়ণ ফেরত আসবেন না৷ 

- সর্বনাশ। আপনি বিশ্বাস করুন রবিদা আমি কিন্তু এ ব্যাপারে কিছুই..।

- আমি বিশ্বাস করতেই চাই ভায়া৷ কিন্তু নারায়ণের অভাবে ঘর যে আমার অন্ধকার। ও দলিল ফেরত নিয়ে তুমি আমায় মুক্তি দাও..।

- কিন্তু এ'টা তো অন্যায়। এক্সটর্শন।

- তুমি নিজের মানুষ ভাই৷ লুকোছাপার আর কী আছে৷ সুদের ব্যাপারে একটু চোরাগোপ্তা গুঁতো মারাটা আমার বিজনেস৷ তোমার ধারের টাকাটা সত্যিই অনেকদিন হল শোধ হয়ে গিয়েছে৷ সুদটা আমি একটু চড়াই রেখেছিলাম, সে'দিক থেকে দেখতে গেলে তোমার বিপদ থেকে একটু মুনাফা কামিয়ে ফেলেছিলাম৷ সে'টাও তো এক্সটর্শন৷ কে জানে, নারায়ণ রেগে ফায়্যার হয়ে নিজেই গায়েব হয়ে ওই মুক্তিপণের চিঠি পাঠিয়েছেন কিনা৷ তিরিশ হাজার বাকি কী হে, পাওনাগণ্ডা ইতিমধ্যেই কড়ায়গণ্ডায় উশুল হয়ে গিয়েছে৷ এ'বার ওই দলিলটা ফেরত নিয়ে আমায় রক্ষে কর ভায়া৷ না বললে কিছুতেই শুনছি না৷ ওই দ্যাখো, দু'জন পালোয়ান নিয়ে এসেছি৷ তুমি নরম কথায় ফিরতে রাজী না হলে আমি তোমায় চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাব৷ কিন্তু ও দলিল আমি আর রাখব না৷ 

**

- এত রাত্রে ফোন করার কী মানে?

-  হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ইন্সপিরেশন, দাপুটে প্রফেসর আর সান্যাল বাড়ির বৌ আজকাল হাতসাফাই শুরু করেছে। 

- এ'সব বাজে কথার কী মানে?

- শুধু হাতসাফাই নয়৷ রীতিমতো মুক্তিপণ চেয়ে হুমকি।

- ফোন রাখ দীপু৷ 

- ছিঃ। শেষ পর্যন্ত নিজের ভাশুরের ঠাকুরঘর থেকে চুরি করতে গেলি?

- ফোন রাখ৷ তোর মাথা গেছে৷ আমি সুস্থ আছি।

- আমি দলিলটা ফেরত পাওয়ার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই রবি সান্যালের নারায়ণ শিলা ফেরত এসেছে৷ ভোজবাজি৷ তাই না?

- দীপু, পাড়া ছাড়িস না।

- তুই কী ভেবেছিস, আমি কৃতজ্ঞ থাকব? তুই আমার হয়ে গুণ্ডামি করেছিস বলে? আর কেউ না জানুক, আমিও জানব না ভেবেছিলিস?

- আমি ভেবেছিলাম কাকীমার স্মৃতিটুকুকে অত সহজে তুই ভাসিয়ে দিবি না৷ 

- মা আর নেই৷ 

- মা নেই তাই সব মিথ্যে? বাউণ্ডুলে হয়ে সমস্ত ভাসিয়ে দিবি?

- তোর কী?

- তোর কান টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি৷ খুব লায়েক হয়েছিস না? সব ভুলে ফ্যা ফ্যা করে দুনিয়া চষে বেড়াবি? বাপ-মায়ের সমস্ত স্মৃতি ভাসিয়ে দিয়ে ড্যাংড্যাং করে নেচে বেড়াবি?

- মানুষগুলোই তো নেই, স্মৃতির নামে ওই পুরনো আধভাঙা বাড়ি আগলে রেখে করবই বা কী?

- আমিও নেই, না রে দীপু?

- নেই৷ তোর থাকতেও নেই।  

- পাড়ায় ফের বাবু৷ তোর বাড়ি, তোর শহর৷ তোর সমস্তকিছু৷ ফের।

- ও বাড়িতে আর ফেরা হবে না রে। ও পাড়াতেও না।

- তুই সত্যিই আর ফিরবি না?

- তুই কান ধরে টানলেও না। যাক গে, আমার একটা কাজ করবি?

- আমি? আমি করব? তোর কাজ?

- মা নেই৷ গার্জেন বলতে স্রেফ তুই। তাই, তোকেই বলি৷ তিরিশ হাজার টাকা কোনওক্রমে জোগাড় করেছি৷ তবে রবিদা ও টাকা আর নেবে বলে মনে হয়না। তুই তো অনেক এনজিওর সঙ্গে কাজ করিস, টাকাটার একটা হিল্লে করে দে দেখি৷ লোকের উপকারে লাগুক৷ বাবার নামে নেওয়া ধার, শোধ না করা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না৷ 

- যাস না।

- হেহ্৷ এ ঘ্যানঘ্যানের দায় শুধু আমার৷ 

- যাস না বাবু৷ আমি মন্দ নই৷ 

- তুই মন্দ হলে যে সমস্ত মাটি৷ কভি নহি৷ তুই অ্যান্টি-মন্দ। তুই ভালো-য়েস্ট৷ 

- যাস না।

- আসি৷ টাকার ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি জানাস৷ টাকাটার হিল্লে হলে এই যন্ত্রণার মোবাইল ফোনটা ত্যাগ করব। মুঙ্গেরে শ্রমিক তদারকির কাজ, মোবাইল ছাড়াও দিব্যি চলে যায়৷ 

- আচ্ছা৷ আয়। 

- জানিস, তোর সঙ্গে কথা হলেই বড় মায়ের কথা মনে পড়ে৷ মা তোকে বড় ভালোবাসত।

- আমি ভালো মা হব, কেমন বাবু?

- একশো বার হবি৷ দি বেস্ট। 

- যাস না বাবু।

- ইয়ে, টাকার ব্যাপারটা ভাবছি এই মুঙ্গেরেই মিটিয়ে নেব৷ গরীব অসহার মানুষ তো এ'খানেও কম নেই৷ কারুর উপকারে ঠিক লেগে যাবে৷ তুই ও নিয়ে আর ভাবিস না।

- আয় বাবু।

- আসি৷

Saturday, November 7, 2020

দড়ি


- ও দাদা..দাদা গো৷ ও দাদা।

- কী চাই?

- ওই দড়িটা..একটু ধরব?

- সে কী৷ ভূতের মুখে রামনাম যে৷ তা, তোমার এই দড়িতে কাজ কী? তুমি তো বিপক্ষ শিবির৷ উলটে তোমার তো উচিৎ  আমাদের পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া। 

- বিপক্ষে? তা বটে। পিঠের চামড়া তুলে নেওয়া? সে'ও হবে'খন৷ তবু৷ তার আগে৷ দাদা গো, একটু ধরে দেখব? দড়িটা?

- মতলবটা কী বলো তো ভায়া? তোমার ভাবগতিক তো সুবিধের ঠেকছে না।

- দড়িটা বড়..বড় ভালো৷ ধরি না একটু। একটু ছুঁয়ে দেখব।

- বেশ৷ ধরো। তবে ধান্দাবাজি ফলালে ভালো হবে না।

- আমার কলজেতে জোর নেই৷ ধান্দাবাজি ছাড়া আমার গতিও নেই৷  তবে দড়িটা একটু ছুঁয়ে না দেখলেই নয়। মনটা বড় হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করছে গো দাদা 

- বেশ৷ এই ধরো৷ হাত লাগাও ভায়া।

- এই৷ এই যে৷ আহ্৷ ছুঁয়ে এক্কেবারে ঝিলিক লাগছে যে হাতে৷ 

- জোরসে ধরো না হে৷ জোরসে৷ লজ্জা কীসের।

- লজ্জার কিছুই নেই৷ তাই না? 

- কিছুমাত্র না৷ এই তো চাই।

- শুধু কলজেটা বুঝলে দাদা..কলজেটা একটু কেঁপে কেঁপে উঠছে..। 

- কলজেই তো৷ শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেই হবে'খন৷ খামচে ধরো দেখি দড়িখানা৷ 

- ধরি৷ জোর লাগিয়ে৷ কী বলো?

- একদম।

- ইয়ে দাদা..টেনে দেখব?

- দড়িতে টান? সে'টা কলজেতে সইবে? ভায়া?

- টেনেই দেখিনা...ইয়ে৷ দাদা? হবে নাকি? খানখান?

- সাহস করে এগিয়ে এসেছ৷ হবে না কেন?

- যদি না হয়?

- আজ না হোক৷ কাল হবে৷ দড়িটা তো মিথ্যে নয়৷ ছুঁয়ে দেখলে তো। 

- তাই তো৷ খানখান হলে ভালো, না হলেও ভেসে তো যাচ্ছিনে৷ দড়ির টানে আমার হেঁইয়োটুকু অন্তত লেগে থাকবে৷ তাই বা কম কীসের৷ 

- এসো ভায়া৷

- বাঁচালে গো দাদা৷ বাঁচালে৷ 

Thursday, November 5, 2020

ব্যস্ত নাকি?

"ব্যস্ত নাকি"?

অফিস-পরিসরে এই প্রশ্নটা অত্যন্ত বিপদজনক। মামুলি দায়সারা উত্তর দিয়ে এ'সব প্রশ্ন পাশ কাটাতে গিয়ে বহু রথী-মহারথী ধরাশায়ী হয়েছেন৷ মনে রাখবেন, এই প্রশ্ন যাঁরা করেন তাঁরা উত্তর নয়, সুযোগসন্ধানে ব্যস্ত। 

হয়ত সত্যিই আপনি কোনও জরুরী কাজে ব্যস্ত। সাদা মনে কাদা নেই তাই টপাৎ করে বলে দিলেন "হ্যাঁ দাদা, ব্যস্ত আছি বটে। শ্বাস ফেলবার সময় নেই মাইরি"। আবারও বলি, প্রশ্নকর্তাটি আপনার ব্যস্ততা বুঝতে চেয়ে প্রশ্ন আদৌ করেননি৷ তিনি আপনার সহকর্মী,  পাড়ার বন্ধু নয় যে আপনি ব্যস্ত না থাকলে আপনাকে জোর করে নিয়ে গিয়ে স্টেশন রোডের ধারের মহেশদার চাইনিজ স্টল থেকে মোমো খাওয়াবে। আপনি কাজে ব্যস্ত না মনে মনে টুয়েন্টিনাইনের স্ট্র‍্যাটেজি সাজাতে ব্যস্ত, তা জেনে আপনার সহকর্মীর কোনও লাভ নেই৷ প্রশ্নটা নেহাতই প্রি-কাঁঠালভাঙা-মাথায়-হাতবুলোনো। কোনও দরকারেই আপনার কথা তাঁর মনে পড়েছে। কাজেই আপনি ব্যস্ত আছেন, সে'টা শুনলে ওঁর হাড় জ্বলবে৷ আর তিনি যদি 'ওপরওলা' হন, তা'হলে সেই হাড় জ্বলা গন্ধ আপনার নাকেও এসে ঠেকবে। তিনি মুখে হয়ত বলবেন " ওহ, আই সী" কিন্তু মনে মনে ভাববেন "কী এমন আমার ব্যস্তবাগীশ খাসনবিশ এলেন হে। খালি বাতেলা। ইনএফিশিয়েন্ট নিনকমপুপ"। আর তারপর আপনার ব্যস্ততার লেবুজলে কেরোসিন ঢেলে নিজের কাজের হ্যারিকেনটি আপনার হাতে ধরিয়ে নির্দ্বিধায় কেটে পড়বেন। ওই যে, আপনার ব্যস্ততায় কারুর কিছু এসে যায় না।

আর হ্যাঁ। যদি আপনি ভুলক্রমে ভালোমানুষির পালক-বোলানো সুরে বলে ফেলেন " না, না! ব্যস্ত আর কী৷ বলুন না৷ হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ" - জানবেন আপনি আপনি ফাইভস্টার চকোলেট ভেবে মৌমাছির চাকে কামড় দিয়েছেন। প্রশ্নকর্তা সেই সুযোগে কাজ, অকাজ যত আছে সব আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে খানিকক্ষণ দেখনাই বাজে গপ্প ফাঁদবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি মনে মনে আপনার সম্বন্ধে ভাববেন "একটা ইউজলেস ইডিয়ট। কাজকম্ম নেই, সবসময় ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে"। জানবেন, ভালোমানুষদের নিয়ে বড়জোর সঞ্জীবের গল্প-উপন্যাস হতে পারে, অফিসের পেল্লায় সব কাজে তারা অচল। 

অতএব?

অফিসের " ব্যস্ত নাকি" মার্কা প্রশ্নের কি আদর্শ উত্তর নেই?

আছে। তবে মাছ ধরবেন উইদাউট টাচিং দ্য ওয়াটার। 

"ব্যস্ত? ওই আর কী"।

"ইকনমিকে রিভাইটালাইজ করতে গেলে তো আমাদের সবাইকেই সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে হবে। তাই না"?

"আর বলবেন না..ব্যস্ততাটাই তো এখন নর্ম"।

অর্থাৎ বাজে প্রশ্নের মোকাবিলা বাজে উত্তরের মাধ্যমেই হওয়া উচিৎ।  তবেই অফিসের সম্পর্কগুলো সুন্দর ও মজবুত হয়৷