Saturday, July 22, 2017

কলকাতার মেসিয়াহ্‌ - ৫


মেসবাড়ি থেকে কলেজ বাসে তিনটে স্টপেজ। সকাল এগারোটা থেকে ফার্স্ট ক্লাস। অরূপ অবশ্য হেঁটেই যায়।

হাঁটার জন্য কলকাতা অতি চমৎকার জায়গা। একটু আগেভাগে স্নান সেরে নিতে হয়। একটা বাথরুম, পনেরোটা মানুষ; একটু হুড়মুড় থাকেই। সব থেকে বেশি সময় লাগে অজয়দার, তবে অজয়দা কলেজটলেজ বিশেষ যায় না। সকলে বেরিয়ে গেলে তারপর স্নান সারে সে। অজয়দা বলে স্নান হল সাধনা; দুরাউন্ড সাবান, একটু টপ্পা আর দুদিনে একবার শ্যাম্পু না মিশলে স্নান জমে না। অরূপ একবার বোকার মত প্রশ্ন করে ফেলেছিল প্রতি স্নানে দুরাউন্ড সাবান? কিন্তু এই দুমাসে যে তোমায় একটাও নতুন সাবান আনতে দেখিনি। অজয়দা খুব চটে গেছিল গুরুজনকে সম্মান করতে পারিস না? ইডিয়ট! পালটা প্রশ্ন? মেসে অ্যানার্কি ঢোকাবার তাল করছিস”? রীতিমত ঘাবড়ে গেছিল অরূপ। অজয়দার টপ্পাপ্রীতি নিয়ে আর প্রশ্ন করা হয়ে ওঠেনি। অজয়দার রাগ অবশ্য বেশিক্ষণ টেকেনি কারণ ওর নিয়মিত জলখাবার হচ্ছে মেস লাগোয়া মন্টুদার দোকান থেকে আনা এক ভাঁড় চা, অরূপের বাড়ি থেকে নিয়মিত সাপ্লাই আসা মায়ের হাতে বানানো দুপিস গজা আর একটা গোল্ডফ্লেক। কাজেই অরূপের ওপর বেশিদিন রাগ করে থাকলে অজয়দাকে গজাNone হয়ে বসে থাকতে হবে। পাশের বেডের বল্টুদা ফিসফিসিয়ে বলেছিল অজয়দা বলে স্নান আর ধ্যান গোপনে করা উচিৎ। বল্টুদার বিশ্বাস আর দুচার বছর এগজ্যাম ড্রপ দিয়ে মেসে কাটিয়ে দিতে পারলেই অজয়দা পরমহংস হয়ে যাবে। তখন খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে অজয়দার জন্য এক পিস রাসমণি আর একটা বিবেকানন্দ খুঁজতে হবে।

যা হোক। শহরে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে অরূপের বড় ভালো লাগে। মেসবাড়ি সরু গলি ধরে কিছুটা এগোলেই হ্যারিসন রোড। রাস্তার এক ধার দিয়ে ঠাসা নিমন্ত্রণ-পত্র ছাপানোর দোকান। অন্তত সতেরোটা দোকান তো হবেই। হ্যারিসন রোডটা যেখানে গিয়ে কলেজ স্ট্রিট মোড়ে মিশছে তার ঠিক কিছুটা আগেই দেলখোশা। অরূপ যখন দেলখোশা পেরোয় তখন রেস্টুরেন্ট সবে খুলব খুলব করছে, সাফসাফাই চলছে পুরো দমে। দেলখোশা অরূপের বেশ পছন্দ হয়েছে, সমস্ত কিছু কেমন সাত-পুরনো। কাউন্টারে বসা ম্যানেজার থেকে শুরু করে, ওয়েটার থেকে আসবাব, মেঝে, দেওয়াল সমস্ত কিছু। পুরনো। অরূপের স্থির বিশ্বাস ওই পুরনো গন্ধটা সরিয়ে নিলেই দেলখোশার কাটলেটের অর্ধেক হয়ে যাবে।

দেলখোশা থেকেই গিজগিজ করছে বইয়ের দোকান। চারিদিকে বই। বেশির ভাগ অবশ্য পড়ার বই। কিন্তু এত বইয়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে দিব্যি লাগে অরূপের। অদ্ভুত ব্যাপার, মাঝেমধ্যে অরূপ হাঁক শুনতে পায় কোনও না কোনও দোকান থেকে এইযে ভাই, দিকে! সব রকমের গাইড বই আছে। অরূপ বিরক্ত হয়, তাকে দেখে কি খুব গাইড বই গিলে বমি করা ছেলে মনে হয়? মাঝেমধ্যে পরীক্ষায় যে অরূপ ধেড়িয়ে বসে না তা নয়, তবু গাইডবইয়ের সামনে নতজানু হয়নি কোনওদিন। ছোটমামা বলে নম্বরটম্বর সব বাতেলা। নম্বরের জন্য ল্যাজ গুটিয়ে নেওয়ার কোনও মানে হয় না।

অরূপের মূল আগ্রহ টিফিনের দোকানগুলো নিয়ে। ক্যালক্যাটা ইউনিভার্সিটির সামনে খান দুই। মেডিকাল কলেজের সামনে খান তিনেক। টোস্ট, বাটার টোস্ট, ডিম টোস্ট, বাপুজি কেক, মামলেট, পোচ, ঘুগনি পাউরুটি, চা, চার থেকে ছরকমের বিস্কুট; কত কী। এই সবকিছু মেলানো সুবাসের মণ্ডটা বুকে সেধোতেই মনে হয় আহ্‌, আজকের দিনটা দিব্যি যাবে। রোজ, রোজ এমনটাই মনে হয়। মেডিকাল কলেজের উল্টোদিকে সারি সারি ওষুধ আর মেডিকাল সরঞ্জামের দোকান। এখান থেকে রঙটা পালটে যেতে আরম্ভ করে। খানিক পর থেকে একের পর এক বাথরুম ফিটিংসের দোকান। এর ফাঁকেই অবশ্য অরূপ দেখে নিয়েছে একটা ভালো কনফেকশনারির দোকান। বৌবাজার মোড়ের ঠিক আগে একটা মন্দির। তার পাশ দিয়ে একটা গলি ঢুকে গেছে যেটা অজয়দার ভাষায় আমার টপ্পাবোধ আর এই গলির হালহকিকত; এই দুই নিয়ে বিশেষ খোঁজখবর করতে যেও না হে অরূপকুমার, সে সত্য ধারণ করার ক্ষমতা তোমার মত সিলেবাস ঘাঁটা বান্দার নেই

কলেজে ঢোকার মুখে একটা টেলিফোন বুথ। অরূপ রোজ সকালে একটা ফোন করে মাকে। রোজ একই কথার সিরিজ। অরূপ খাবার খেয়েছে কিনা। জামাকাপড় সময়মত কাচছে কিনা। রোজ মশারি টাঙিয়ে শুচ্ছে কিনা। অরূপ মাঝেমধ্যে ভাবে জিজ্ঞেস করবে তাঁর নামে বাড়িতে কোনও চিঠি এসেছে কিনা। কিন্তু তার কোনও মানে হয় না।

স্নান, খাওয়া, শরীর, পড়াশুনোর খবর মাকে জানিয়ে ফোন নামিয়ে রাখে অরূপ। তারপর সোজা ক্লাসরুম।   

এই মেঘলা

- বৃষ্টি থামার কোনও চান্স দেখছি না ভাই। আকাশের যা অবস্থা মেঘ সহজে কাটবে বলে মনে হচ্ছে  না।

- তা'তে ম্যাদা মেরে যাওয়ার কী আছে ভায়া? দুপুরে খিচুড়ি।  সন্ধেবেলা বেগুনী। ইলিশ ভাজা রাতে। এঞ্জয়। এ'টাই তো সময়!

- আসলে হয়েছে কী...।

- আজি ঝরঝর মুখর বাদল দিনে, গুনগুন করে ওঠো। রোম্যান্স ভুললে চলবে?

- অসুবিধেটা হচ্ছে...।

- এই মেঘলা দিনে একলা...আহা! মেঘলা দিন ছাড়া এমন ক্লাসিক মেজাজ জেনারেট হবে কী করে? এত নেগেটিভ হলে চলে ভায়া? বি পসিটিভ! বর্ষাকে ভালো না বেসে থাকা যায়?

- গেঞ্জি জাঙিয়া ইমিডিয়েটলি না শুকোলে কিছুতেই পসিটিভ হওয়া যাচ্ছে না স্যার। ইন্সটাগ্রামে বৃষ্টি নিয়ে আহাউঁহু শুনলেই লাইকের পাশে কানমলার বোতাম আছে কিনা খুঁজে দেখছি।

মালিশের ছয়

সেলুনে মাথা মালিশ করানোর সময় যে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো মাথায় রাখা দরকার:

১. তেল ছাড়া মাথা মালিশ মিথ্যে।

২. নবরত্ন ছাড়া সব তেল মিথ্যে।

৩. মালিশদাদা মিউট মোডে মালিশ করবেন না। চ্যাঁচাবেন না। স্রেফ গুনগুনিয়ে কথা বলে যাবেন। মোদী, মমতা, ম্যানহোল, মার্কিন কন্সপিরেসি; সমস্তই থাকতে পারে। থাকবে না শুধু প্রশ্ন।

৪. এফএমের বিজ্ঞাপন মালিশ-নির্বাণ বিনষ্ট করে। দরকার হলো এম্পিথ্রিতে নাদিম-শ্রবণ। অথবা "কী উপহার সাজিয়ে দেব" লেভেলের সুর।

৫. মালিশ নরমে গরমের ব্যাপার। গুঁতোগাঁতা নয়, তুলতুল নয়। মালিশকরনেওলার অপ্টিমাম বোধ মালিশখানেওলার অপ্টিমাম বোধের সঙ্গে মিলেমিশ না গেলেই গোটা ব্যাপারটা থাবড়ানোতে নেমে আসবে।

৬. সেমিনারে অফিস রিভিউতে পকেটে রাখা ফোন বেজে উঠুক ক্ষতি নেই। কিন্তু সেলুন-মালিশের সময় ফোনটি স্যুইচড অফ মোডে ভাইটি। ম্যান্ডেটরি। সাইলেন্ট ফাইলেন্ট না। বন্ধ।

নিষ্পাপ মালিশ মুহূর্তগুলো, শুধু নিজের জন্যে রাখা থাক।

Thursday, July 20, 2017

দ্রোণ পর্ব

চারদিকে ধুন্ধুমার যুদ্ধ।

অবশ্য গোটাটাই এক তরফা। দ্রোণাচার্য পাণ্ডব সৈন্য দেখলেই বেগন স্প্রে ঝেড়ে আরশোলা মারার মেজাজে কুপিয়ে যাচ্ছেন।

নকুল ইতিমধ্যে মেট্রোজিলের খোঁজ শুরু করে দিয়েছিল। সহদেব "শিবিরে লাইটার ফেলে এসেছি, ক্যুইকলি নিয়ে আসছি" বলে সেই যে হাওয়া হয়েছে এখনও পাত্তা নেই। ভীম গদার ডাঁটি দিয়ে পিঠ চুলকে যাচ্ছিলেন। অর্জুন সিলেবাসের বাইরের কোশ্চেন পেপার দেখে কৃষ্ণের ওপর তম্বি শুরু করেছিলেন 'শুরুতেই সম্মানজনক এগজিটের ব্যবস্থা করেছিলাম, তা নয়। বাবু এলেন গীতাগিরি করতে। এ'বার হ্যাপা সামলাও'। যুধিষ্ঠির লুকিয়ে অ্যাডাল্ট জোকসের বই পড়ে নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করছিলেন।

কেষ্ট দেখলেন কিছু একটা না করলেই নয়।

পাণ্ডবদের ডেকে বললেন "আউট অফ বক্স সলিউশন ভাবো"।

নকুল দরাজ গলায় অফার দিলে "সহদেব খুব ভালো আউট অফ দ্য বক্স ভাবতে পারে। আমি বরং শিবিরে ফিরে যাই, যদি ওকে আউট অফ শিবির ভাবানো যায়"।

যুধিষ্ঠির বললেন "দুর্যোধনকে অনলাইন রামিতে চ্যালেঞ্জ করে দেখব"?

অর্জুন বললেন "বাক্সটা দেখছি না কেন ভাই কেষ্টা'?

ভীম বললেন "মেনহিরটা কাজের সময় খুঁজে পাই না কেন বলো তো"?

অগত্যা কেষ্টকেই সলিউশন বাতলে দিতে হল। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির মিথ্যে বললেই দ্রোণ পিলে চমকে গোল বাঁধাবেন। সেই সুযোগেই কাজ সেরে ফেলতে হবে। যুধিষ্ঠির অল্প আপত্তি জানাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তারপর মনে হল আইডিয়ালিজমের চেয়ে রাজসিংহাসনে রেভিনিউ বেশি। অতএব রাজী হয়ে গেলেন।

কেষ্ট যুধিষ্ঠিরের কানে কানে মিথ্যে বলার প্ল্যান এ আর প্ল্যান বি বুঝিয়ে দিলেন।

যথারীতি দ্রোণকে দেখেই যুধিষ্ঠির প্ল্যান এ ফায়ার করে।বললেন "অশ্বত্থামা হত, বিপ বিপ"। শুনে দ্রোণ বললেন "স্যাড, ভেরি স্যাড। তাহলে এসো তোমাদের ডাবল প্যাঁদানি দিই"।

ভয়ে আমসি হয়ে পড়েছিলেন যুধিষ্ঠির, কোনওক্রমে প্ল্যান বি মনে করে চালিয়ে দিলেন তিনি
"আই হ্যাভ রেড অল দ্য অফার ডকুমেন্টস কেয়ারফুলি বিফোর ইনভেস্টিং"।

ধর্মরাজের মুখে এমন ডাহা মিথ্যে শুনে পর্যুদস্ত বোধ করলেন দ্রোণ। নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। চুপিসারে কাজ সেরে ফেললেন ধৃষ্টদ্যুম্ন।

অমনি চার পাঁচটা স্মাইলি দিয়ে ব্যসদেবকে হোয়্যাটস্যাপ করলেন ধর্মরাজ "স্যার, প্ল্যান বি'র রেফারেন্সটা মূল স্ক্রিপ্ট থেকে বাদ দেওয়াই ভালো, কেমন"?

Tuesday, July 18, 2017

কুন্তলা ও বাবা

- তুমিই অজয়?

- আজ্ঞে অজয় নয়। অরুণাভ।

- অরুণাভই হও বা অমল পালেকর। কোনও লাভ আছে কি?

- লাভ?

- প্রফিটের কথা বলেছি। নেদু হয়ো না।

- না মানে...।

- না মানে না। নো মীনস নো।

- কাকু, মানে স্যার...ইয়ে...বলিছিলাম যে মান্তু আর আমি...।

- মান্তু? বাড়ির বাইরের বেয়াড়া কেউ ওই নামে কেন ডাকবে? কুন্তলা বলো। মিস কুন্তলা চ্যাটার্জিও বলতে পারো।

- ওই কুন্তলা। মানে, ওর সঙ্গে...।

- জানি। যে তুমি ওর পিছনে ঘুরঘুর করছ। তা'তে ও একটু নরমও হয়েছে। কিন্তু আমার মত নেই।

- মানে...কাকু...স্যার...ইয়ে...ঘুরঘুর করছি আমরা দু'জনেই। মিউচুয়ালি।

- বেশ। কাল থেকে আর মিউচুয়ালি ঘুরঘুর করবে না।

- না মানে...। মাইনর রিকুয়েস্ট...একটা অ্যাপ্রুভাল অন্তত যদি দিতেন। আফটার অল আপনি কুন্তলার বাপ...আই মীন বাবা। তবে আপনার ওপিনিয়নের কোনও দাম নেই, সে'টা বোঝেন তো?

- কুন্তলার আশেপাশে যদি ফের ঘুরঘুর করতে দেখেছি তা'হলে পুলিশ ডাকব।

- কী ব্যাপার অমৃতেন্দু! কাল ওয়ার্নিং দিলাম, সে'টা ভ্রুক্ষেপ না করে তোমরা দু'জনে আজ পার্কের বেঞ্চিতে বসে সুডোকু সলভ করছিলে?

- আপনি সে'টাও দেখেছেন?

- আবার পালটা প্রশ্ন?

- সরি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি ফেরেব্বাজ নই।

- তোমার আইকিউ কম।

- আদৌ নয়।

- যাদের আইকিউ কম তারা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না যে তাদের আইকিউ কম। থাম্ব রুল।

- কুন্তলার আইকিউ হাই।

- কুন্তলার আইকিউ ধুয়ে জল খাবে?

- মানে, কম পড়লে। ও ম্যানেজ দেবে।

- কুন্তলা কি তোমার ম্যানেজার? ফিউডাল মাইন্ডসেট তো হে তোমার। আর খবরদার যেন কুন্তলার আশেপাশে না দেখি।

- নইলে পুলিশ ডাকবেন?

- দত্ত দারোগার আমার ক্লাসমেট সে'টা জানো?

- এ কী? তুমি ছাদে থেবড়ে বসে কেন?

- আপনি এখানেও?

- আমি খুব ফ্লেক্সিবল। ভূত হওয়ার এ'টাই সুবিধে।

- আপনার তো খুশি হওয়া উচিৎ।  পুলিশ ডাকার দরকার পড়ল না। কুন্তলা আর আমার মুখ দেখবে না।

- একটা চড়ে চোয়াল ভেঙে দেব রাস্কেল। আমার মেয়ের নামে উল্টোপাল্টা কথা? সে তোমায় ভালোবাসে, সে কিনা তোমার মুখ দেখবে না? আর আমি কি সাধে তোমার পিছনে ঘুরঘুর করি? আমার মেয়ে তোমায় পছন্দ করেছে। তোমায় নিস্তার দিই কী করে? তোমাদের মধ্যে একটু ঝগড়া হয়েছে, হতেই পারে। তাই বলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ? হাতের মোয়া নাকি? মেয়েটা সকাল থেকে কেঁদে চলেছে। তুমি না গেলে ওকে সামলাবে কে?

- আপনি বুঝতে পারছেন না কাকু...আই মীন..স্যার। ওর সঙ্গে ঝগড়ায় এমনিতেই মনমরা হয়ে ছিলাম। আজ ভোরের দিকে অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তা ক্রস করতে গিয়েই...মিটে গেল...। ট্রাক। এক্কেবারে পেস্ট। আমার বডিট তেমাথার মোড়ে পড়ে এখনও। মর্গের গাড়িটা এলো বলে। তাই বলছিলাম...।

- নিনকম্পুপ। মাথা মোটা বাইসন কোথাকার। শুরুতেই বুঝেছিলাম তুমি একটা লো আইকিউ আহাম্মক। মানছি মান্তুর সঙ্গে তোমার আলাপ মাত্র মাস দুয়েকের কিন্তু...। আমায় ভূত হিসেবে দিব্যি চিনে ফেলছ অথচ মান্তুমাকে এখনও চিনতে পারো নি? আরে বাবাজীবন, আমরা দু'জনেই ছিলাম সেই আগুনে! যাক গে। আজ সকালে দেখলাম পঞ্জিকার হিসেবে সামনের হপ্তায় ভালো দিন আছে বিয়ের। আমি ভাবলাম শুভস্য শীঘ্রম। দিলাম তোমায় ট্রাকের নীচে ঠেলে। ওয়েলকাম টু দ্য ফ্যামিলি সান!

Monday, July 17, 2017

দেওয়ার হিসেব

- ওয়েলকাম টু আফটার লাইফ।
- ধন্যবাদ, আপনিই কি...?
- আমিই। ইয়েস।
- হাউ এক্সাইটিং।
- এক্সাইটমেন্ট পরে, আগে একটা প্রশ্ন ছিল।
- কী প্রশ্ন?
- যা'র উত্তর সবাইকে দিতে হয় এ'দিকে এসে।
- প্রশ্নটা কী?
- আপনি ও'দিকে থাকতে কী কী দিয়ে এসেছেন?
- কী কী দিয়ে এসেছি?
- হ্যাঁ। বা বলা ভালো কতটা দিয়ে আসতে পেরেছেন?
- উম্ । লেট মি সী। লিস্টটা বেশ লম্বা। নব্বুই বছরে তো কম দিয়ে আসিনি..এই যেমন ধরুন..।
- জ্ঞান ছাড়া কী কী দিয়ে এসেছেন সে'গুলো বলবেন।
- কী ছাড়া?
- জ্ঞান। জ্ঞান বাদে আর কী কী দিয়ে আসতে পেরেছেন। সেই লিস্ট।
- অ।
- কই। বলুন।
- বলছিলাম যে, ইয়ে, আপনাদের এখানে টয়লেটটটা কোথায় আছে বলতে পারেন?

Sunday, July 16, 2017

রোব্বার

রবিবার বিকেল নাগাদ অল্প জ্বরজ্বর বোধ করেন অনিল মুন্সী। চোখের সামনে গল্পের বইয়ের তাকটা আবছা হতে শুরু করে। সন্ধেবেলা কফির স্বাদ পানসে হয়ে যায়। মনের মধ্যে থেকে ম্যা হু ঝুম ঝুম ঝুমরুর গুনগুন মিলিয়ে গিয়ে অমুক কোটেশন’ ‘তমুক ফাইলভাসতে শুরু করে।
অল্প অম্বল বুকের কাছে ভাসতে থাকে। এমপিথ্রিতে নির্মলা মিশ্রের এমন একটা ঝিনুকশুনে মনে হয় বড়বাবু শুধচ্ছেন স্টেটমেন্টগুলো তৈরি হয়নি এখনও”?
রবিবার সন্ধে হলেই ভাজাপোড়া খাওয়ার ইচ্ছেটা বিলকুল গায়েব হয়ে যায়। ইচ্ছে করে শুধু ছাতুর সরবত খেতে, তাও পেঁয়াজ লঙ্কা কুচি ছাড়া। জোর করে বিট্টুর থেকে ধার করে চাচা চৌধুরীর কমিক্স পড়ার চেষ্টা করেও লাভ হয় না, ক্রমশ মনে হয় গ্র্যাভিটি বেড়ে চলেছে। বিপুল জ্যেঠুর শ্রাদ্ধে একটা পকেট গীতা পেয়েছিলেন বছর তিনেক আগে। রবিবার রাত এলেই সেই পকেট গীতা উলটেপালটে দেখে সময় কাটান অনিলবাবু। 

দিকে তখন ব্যালকনিতে হুড়মুড়িয়ে পায়চারি করে চলেছেন বিশ্বনাথ মল্লিক। একের পর এক সিগারেট নিকেশ হয়ে ফিল্টারগুলো জমা হচ্ছে ব্যালকনিতে রাখা আধমরা পাতাবাহার গাছের টবে। কাল সান্যালেরই একদিন কী তাঁরই একদিন।
সেদিনের ছোকরা তাঁকে বিজনেস শেখাবে? আগামীকালের অকশনেই বোঝা যাবে কত ধানে কত চাল। অনিল মুন্সীর থেকে গতবছরের স্টেটমেন্টগুলো ভালো করে বুঝে নিয়েই কাল ছুটতে হবে অকশনে।
রবিবার দিনটা একটা নষ্টের দিন। কত কাজ করে ফেলা যেত সকাল থেকে। কত হিসেবেকিতেব সেরে ফেলা যেত। তা নয়, কথায় কথায় মানুষের ছুটি চাই। ছুটি মানেই অকাজ। হপ্তায় সাত সাতটা দিন অথচ মানুষ স্রেফ ছদিন টাকা কামিয়ে সন্তুষ্ট। কী জঘন্য অপচয়। রবিবারের অযৌক্তিক ছুটির জন্যেই সান্যালের ব্যাটার মুখে ঝামা ঘষতে একদিন দেরী হয়ে গেল। ইশ, ভাবলেই গা চিড়বিড় করে উঠছে। এখন সবে রাত দশটা, আরও অন্তত দশ ঘণ্টার আগে অফিস যাওয়া যাবে না।
খাবারে স্বাদ নেই, বিছানার নরম গদি যেন ঘামাচির কারখানা। উফ, কখন যে সকাল ছটার অ্যালার্মটা বাজবে। কখন যে সুখলাল গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করে গেটের সামনে এসে হর্ন বাজাবে।
তারপর সান্যালেরই একদিন কী তাঁরই একদিন।
দিকে তখন সুখলাল বাড়ির ছোট্ট বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে। বস্তিতে লোডশেডিং,ঘরের ভিতর অসহ্য গুমোট ভাব। বারান্দায় মশারি টাঙিয়ে শুলে সামান্য স্বস্তি। ছোট মেয়েটাকে নিয়ে তাই বাইরে এসে শুয়েছে সুখলাল।
রবিবারটা বড় ভালো লাগে সুখলালের। বউয়ের সঙ্গে বসে ঠোঙা বানানো যায় গোটাদিন, দুজনে বানালে ডবল ঠোঙা; ডবল টাকা। ছেলেমেয়ে দুটো আশেপাশে ঘুরঘুর করে। দুপুরে এক সঙ্গে খাওয়া। বিকেলে ঠোঙার বস্তা কাঁধে বউকে যেতে হয় না বনিয়ার কাছে, সে নিজেই নিয়ে যায়। এটা শুধু রবিবারই হয়।
এত ভালো কাটে সপ্তাহের এই দিনটা। গোটাদিন পুষ্পা পাশে থাকে। খবরের কাগজ, আঠা আর বউয়ের মাথায় দেওয়া নারকোল তেল মেশানো সুবাস সুখলালকে ঘিরে থাকে। তবে ড্রাইভারির কাজে পয়সা বেশি। দুজনে মিলে গোটা মাস জুড়ে ঠোঙা বানালেও ড্রাইভারির মত টাকা নেই।
রবিবার শেষ হলেই মনে হয় পুষ্পা যেন আবার এক হপ্তা দূরে চলে গেল, পাশের রেললাইন থেকে মালগাড়ির ঝুপুরঝুপুর বুকের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই আবার মনে পড়ে মল্লিকবাবুর দেওয়া বাড়তি মাইনে। পুজোর বখশিশ। বছরে তিন সেট জামা প্যান্ট। বিপদের সময় দেওয়া ধারের টাকা। ছেলেমেয়েগুলোর স্কুল। পুষ্পার সোনার কানের দুলের শখ।
রোববারের মড়া ঘুম হয়ে নেমে আসে সুখলালের চোখে।   

Saturday, July 15, 2017

স্মাইল জেনারেটর

মামুলি সব জিনিসকে নামের তুকতাকে দুরন্ত করে উপহার দেওয়াটা বুবাইয়ের ছোটমামার একটা পুরনো অভ্যাস। মামার ভাষায় ‘একটু ক্লাস মিশিয়ে দিতে পারলেই, কিপটেমোতেও ঝলক আনা সম্ভব’।
ব্যালকনিতে ছোট্ট দু’টো সাদা টব রাখা আছে। দু’টোতেই নয়নতারা। মামা গত জন্মদিনে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন “এই নে, এক জোড়া স্মাইল জেনারেটর দিলাম, যখনই মেজাজে কিছু গড়বড় মনে হবে, এ’দের কাছে এসে সাবমিট করবি”। পয়লা বৈশাখে দিয়েছিলেন কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে পঞ্চাশ টাকায় কেনা পুজোবার্ষিকী আনন্দমেলা; “এই নে। তখনও পুজো সংখ্যা জ্যান্ত ছিল। কই মাছের মত বঁটির নীচেও ল্যাটরপ্যাটর করার দম ছিল। অন্ধ্রের চালানি কেরোসিন মাখানো চীজ তো রইলই। আগে এ’টা পড়ে দ্যাখ”। গত পুজোর সময় দিয়েছিলেন ডাংগুলি যে’টা বাবা কোনও দিন বুবাইকে ব্যবহার করতে দেয়নি চোট লাগার ভয়ে। বাবা বলেন “মন্টুটা একটা ওয়ার্থলেস, অন্তত একটা চাকরী যদি মন দিয়ে করতে পারত”। মন্টু ছোটমামার ডাকনাম, বুবাইয়ের ডাকনাম যেমন বুবাই। ছোটমামা বাবাকে আড়ালে ট্রিগোনোমেট্রি বলে ডাকেন।
ছোটমামা অনেক চাকরী ধরেছেন ছেড়েছেন। বাবার জোগাড় করে দেওয়া দু’টো চাকরী সহ। একটা বাবার উকিল সমাদ্দারবাবুর অফিসে হিসেব দেখার। অন্যটা বাবার এক ক্লায়েন্টের ফ্যাক্টরিতে লেজারবাবুর কাজ। প্রথমটায় মামা তিন মাস টিকে ছিল, পরেরটায় তিন দিন। দ্বিতীয় চাকরীটা ছাড়ার পর মামা যখন বাড়িতে এসেছিলেন তখন বাবা মামাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন “রাস্কেল ছোকরা, ব্যাড ইনফ্লুয়েন্স অন বুবাই” বলে। দিন চারেক পর অবশ্য নিজে গিয়ে ডেকে এনেছিলেন ছোটমামাকে, কারণ মামা বাবার তাসের আড্ডার পার্টনার।
“তোর বাবা মানুষটা মন্দ না, নেহাত নিয়ম মেনে মেনে লোকটা নুন তেল ঝাল ছাড়া মাখা আলুসেদ্ধর মত হয়ে গেছে, তাই বলে তো কাউকে ডিসমিস করে দেওয়া যায় না”, মন্টুমামা এ কথাও বলেছেন কতবার।
ছোটমামার দেওয়া নয়নতারার গাছ দু’টো সত্যি বেশ মন ভালো করা, রোজ ফুলে ঢাকা থাকে। রোজ বিকেলে বুবাই এসে ওদের গায়ে অল্প জল ছিটিয়ে যায়।


ছোটমামা শহর ছেড়েছেন চার মাস মত হয়েছে, দুম করে শেষে সুরাটের একটা মিলে চাকরী নিলেন। “প্রেম করাটা ট্যাক্সিং হয়ে গেল রে বুবাই”।
বাবা ব্রীজ ছেড়েছেন তিন মাস। ব্যালকনিতে বেতের চেয়ার আর টেবিল পেতেছেন, নয়নতারা ঘেঁষে; ঝাড়ে দেড় ঘণ্টা পেশেন্স খেলেন রোজ বিকেলে।
ছোটমামার বিয়েতে অবশ্য খুব মজা হয়েছিল। বিয়ে হয়েছিল মামাদের দেশের বাড়ি বাঁকুড়ায়। বাবা আর বুবাই গিয়ে দিন দশেক ছিল। এত লম্বা ছুটি বাবা কতদিন যে নেয়নি। কলকাতা থেকে বাবা ব্যালকনিত থেকে নয়নতারার একটা টব বয়ে নিয়ে গেছিল। টবের গায়ে একটা চিরকুট।
চিরকুটে বাবা যত্ন করে লিখেছিল;
“ভায়া ওয়ার্থলেস,
ভালো থেকো, বৌটিকে ভালো রেখো। মেয়েটা বড় ভালো, তোমায় মানুষ করার চেষ্টা করেছে। তোমার দিদি যাওয়ার আগে বলে গেছিল ওর হাতের বালাজোড়া তোমার বৌকে দিতে। সে সুদিন যে আদৌ আসবে সে’টা ভাবিনি। যা হোক, আমার আর বুবাইয়ের তরফ থেকেও কিছু দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।
বাপ ব্যাটার জন্য একটা স্মাইল জেনারেটরেই যথেষ্ট। এ’টা রইলো তোমার জন্য। 
ইতি
ট্রিগোনোমেট্রি চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়”।

Friday, July 14, 2017

বালিশবাবুর অফিসে - ৫

- এ কী! আপনি?
- কেন? আপনার ডাক না এলে আপনার অফিসে আসা বারণ নাকি বালিশবাবু?
- মতলবটা কী বলে ফেলুন। 
- মতলব আবার কী ভাষা!
- ধান্দা! কী ধান্দায় এসেছেন শুনি? 
- ঈশ! মতলব। ধান্দা। প্রয়োজন বলতে পারেন না? 
- ঝেড়ে কাশুন। আমার অনেক কাজ।
- অনেক কাজ?
- আপনার মিসেসের...।
- ইউ মীন আপনার মায়ের...।
- বাহান্ন তিপ্পান্ন। দ্যাট ইজ ওকে। দিন দুই হয়ে গেল আপনার মিসেসের ড্রেসিংটেবিলটা তছনছ করা হয়নি। কুইক। বলে ফেলুন যা বলার।
- তা'তে মনে পড়ল, টিভির রিমোটটা কোথায় আছে আপনি জানেন?
- টিভি আমি চালাই?
- না তা নয়। এমনি র‍্যান্ডমলি জিজ্ঞেস করে নিলাম।
- এ'টা জিজ্ঞেস করতেই অফিস পর্যন্ত ছুটে এসেছেন?
- নাহ্। একটা জরুরী কথা ছিল।
- টিভির চেয়েও বেশি জরুরী? ব্যাপার কী ?
- বলছিলাম যে...। এই যে আপনার ভাষা...।
- ভুলে যাচ্ছেন যে অফিসের বাইরে আমি কথা বলতে পারি না। তত থথ বব ভভ করে শর্টহহ্যান্ডে কথা বলতে হয়। অবিশ্যি আপনার মিসেসের কমিউনিকেট করতে কোনও অসুবিধে হয় না।
- আই মীন...আপনি মূলত যে ভাষাতে কথা বলতে শিখবেন বা লিখবেন; সে'টা হল বাংলা।
- পর্তুগীজ হলেও তো কিছু এসে যেত না। সেরিল্যাকটুকু চেয়ে নিতে পারলেই তো ল্যাঠা চুকে যাওয়ার কথা।
- ইয়ে, সেরিল্যাক চাওয়ার বাইরেও ভাষার দরকার আছে...।
- পটির পর ইয়ে সাফ করার জন্য কাউকে ডাকতে, তাই তো? হ্যাঁ। নোটেড। এর বাইরে ভাষাফাষা দিয়ে কী হবে। ও চিন্তা করবেন না। বাংলা, জুলু; যা কিছু দিয়ে চালিয়ে নেব।
- হোয়াট ননসেন্স। বাংলা না শিখে যাবেন কোথায়?
- আপনি বাংলা শিখেই বা কোথায় গেছেন স্যার? সেই তো 'এ'টা তুই ভালো নিভিয়েছিস' বা "তোমার কথার আন্দাজটা খুব সুন্দর' ঝেড়ে দিন গুজরান করছেন।
- ইয়ে, সেজন্যেই এ'বারে আপনার কাছে আসা আপনি এ'বার আবোলতাবোল জিবেরিশ বন্ধ করে নিজের মনের কথা বাংলায় বলতে শুরু করবেন। সে বয়স আপনার হয়ে গেছে। এক বছর দু'মাস! অলমোস্ট দেয়ার। কাজেই কী কোয়ালিটির বাংলা পিক করছেন সে’টা খুব জরুরী।
- মনের কথা বাংলায়?
- ঠিক। মনের মধ্যে হয়ত আপনি বলে চলেছেন 'হুসবাএ ফস্ক্রহ থথত্থথ'। সে'টাই বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় "আমার খুব হিসু পেয়েছে"।
- হলো না। অনুবাদ করলে দাঁড়াবে আমার বহুত জোরসে হিসু লেগেছে।
- বহুত জোরসে লেগেছে? শুনুন বালিশবাবু, ব্যাপারটা সিরিয়াস।  হিসু হয়ে গেলে বলতে হবে হিসু করে ফেলেছি।
- হিসু করে চুকেছি।
- চুকেছি?ধ্যাত্তোর। শুনুন। আপনাকে ওয়ার্ন করে দেওয়ার জন্য এই অসময়ে ছুটে আসা।
- কীসের ওয়ার্নিং?
- এই যে বাংলাটা আপনাকে মন দিয়ে শিখতে হবে।
- ঠিক আছে। মন লাগিয়ে শিখব। আর একবার আচ্ছা সে শিখে গেলে কোনও চিন্তা নেই...।
- আচ্ছা সে? মন লাগিয়ে?
- হুঁ।
- জল আছে বালিশবাবু?
- কেন? শরীর মস্ত্ নেই?
- মস্ত্? তা ঠিক নেই। মস্ত চিন্তা মাথায়।
- ইয়ে মিস্টার মুখর্জি...।
- কী? কিছু বলবেন?
-  বাজারের খবর আপনার বানানবোধে নাকি ফলিডল মেশানো আছে?
-  সে দুই একটা হয়ত...।
- সে দু'একটায় যে'দিন শুধার আনবেন, সে'দিন না হয় আমি বাংলা নিয়ে আমার দায়িত্ব নেভাব? জিনকে সম্মান করা মানুষের উন্নতির আধার।
- কানে বাংলার নামে কী সব ঢুকলো বালিশবাবু...।
- জ্ঞান কিছু টাইম বাদে দেবেন। এখন আসুন। স্টার প্লাসে মাসির সিরিয়ালে নতুন সীজনের শুরুয়াদ হবে। আমিও দেখি। এ’বার সোফাঘুম থেকে একটু উঠুন। উত্তরের জানালার কার্নিশে টিভির রিমোট পড়ে আছে। সে'টা চটপট নিয়ে আসুন দেখি।

এ পাশে

ভাবনার এ পাশে দাঁড়িয়েছিলেন অনন্ত।

স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন অন্যপাশে জুটের কারখানার ধোঁয়া। অনর্গল, এই রাতেও।

ভাবনার বুক ছুঁয়ে মিঠে হাওয়াটুকু অবশ্য আসে, ভালো লাগে অনন্তর। ঘাটের বেঞ্চিটায় গা এলিয়ে বসে সে। রাতের এ সময়টা সামান্য শীত বোধ হয়।

দূরে ভাবনার বুকে একটা নৌকা স্থির হয়ে আছে, তার বুকে হ্যারিকেনের বিন্দুটা মায়াবী দানার মত জ্বলজ্বল।করে চলেছে। ভাবনার নিঃশব্দ অথচ স্পষ্ট বয়ে চলায় গান খুঁজে পায় অনন্ত;

আবছায়া ভালো লাগার গান।
ক্রমশ আকাশ একটু নীচে নেমে আসে। ক্রমশ আদুরর সমস্ত কিছু। বুক পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে অনন্ত।

আচমকা ঘোর কেটে যায় বেমানান স্টীমারের হুইসেলে।

- ঘুমোসনি, না?
- হেহ্।
- জানতুম।

Monday, July 10, 2017

যাইয়ো না

দিদা মাঝে মধ্যে গাইত;

"বাপ রে নিমাই আমার
যাইয়ো না যাইয়ো না
বৈরাগী না হইয়ো নিমাই
বিবাগী না হইয়ো..."।

পরের কথাগুলো দিব্যি ভুলে গেছি। শুরুটা মোটামুটি এ'রকমই ছিল। বড় আর্তি ছিল সেই সুরে। সামান্য ছমছম। শুনলেই মনে হত নিমাই অত একগুঁয়ে না হলেই ভালো হত; অত করে কেউ বলছে যখন, থেকে গেলেই হয়। দু'চার দিন পর না হয় সময় সুযোগ বুঝে আবার বিবাগী হওয়ার ইচ্ছেটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। তদ্দিন একটু কাজকর্ম বাজারঘাট করে কাটালে কী এমন ক্ষতি! আহা রে। গানের শুরুতে "বাপরে"টা এমন ককিয়ে বলত দিদা যেন প'য়ের নীচে বাহাত্তর খানা হসন্ত বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই ডাক অগ্রাহ্য করে ছাতে যাওয়াটাও অন্যায়।

সন্ধ্যে দিয়ে আসার পর বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে দিদা বসে গুনগুন করে যেত। আমি মেঝেতে বসে; দাদুর দেওয়া কোনও গল্পের বই সামনে মেলা, পাশে দুধমুড়ির বাটি। মধুমামা দুধ দিতে আসত রোজ দুপুরে, একটা সুবিশাল অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে স্টিলের ছোট কাপে মেপে মেপে দশ কাপ দুধ। মধুমামার থেকে দুধ নিতে যে কী ভালো লাগত। সেই দুধের মোটা হলদে সর দু'চামচ জুটতো বিকেলে, শুধু শুধু। আর সরের বাকিটুকু মিশে থাকতে বিকেলের দুধমুড়িতে।

দিদার গুনগুনের সঙ্গে মিশে যেত রাস্তা থেকে ভেসে আসা সাইকেল বেলের টুংটাং,  আইসক্রিমওলার "এইস্কিরিম" হাঁক বা রিক্সাওলার প্যাডেলের মচরমচর।
দিদার গায়ে লেপ্টে পরা ছাপার শাড়ির মত নরম ছিল সে সব মফস্বলি সন্ধে। দিদার গায়ের সুবাস লেগে আছে সে'সব স্মৃতিতে।

পুজোবার্ষিকীর ওপর হুমড়ে পড়ার ভালোবাসাটুকু দিদা নিয়ে চলে গেছে।

Sunday, July 9, 2017

বালিশবাবুর অফিসে - ৪

- কী ব্যাপার বালিশেন্দ্রবাবু? এদ্দিন পর এ শর্মাকে হঠাৎ অফিসে ডাকার প্রয়োজন পড়ল কেন?

- বসুন।

- সময় কম। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যালার্ম বাজবে, আমায় বেরোতে হবে।

- ব্যাপারটা সিরিয়াস।

- আপনার বয়স এক বছর। আপনার সিরিয়াসনেসের ম্যাক্সিমাম লেভেল হচ্ছে মেঝে না চেটে হামাগুড়ি দেওয়া। আমি, অন দ্যা আদারহ্যান্ড, একটা সংসার বয়ে বেড়াচ্ছি। সামনে পুজোর কেনাকাটি। কতটা প্রেশারে আছি জানেন?

- এই আপনি। আপনার প্রেশার বলতে মনে পড়ে পুজোর বাজার। গ্লোবাল ওয়ার্মিং নয়, ইকনমির ঝাড় খাওয়া নয়, পরমাণু বোমার স্টকপাইলিং নয়, আপনার চিন্তা আপনাকে পুজোর বাজার ম্যানেজ করতে হবে। পিতা কতটা অদূরদর্শী হলে পুজোর চাপ নিয়ে হন্যে হতে পারেন কিন্তু নিজের ছেলের জন্য একটা থার্ডক্লাস গ্রহ রেখে যেতে কোনও হেসিটেশন নেই।

- থামুন, কে বলেছে আমি সচেতন নই? পরিবেশ রক্ষা নিয়ে আমি ক্লাস নাইনে এস্যে লিখেছিলাম।

- কিন্তু ধেড়ে বয়সে এসে গুলিয়ে ফেলেছেন।

- কে বলেছে গুলিয়ে ফেলেছি?

- দেখুন, মাইরি বলছি।  মুখ খোলাবেন না।

- এ অফিসের বাইরে মুখ খুললে তো আবোলতাবোল ছাড়া কিছু বেরোয় না। যা বলার বলে ফেলুন।

- প্লাস্টিক ছড়ানোই ধরুন না। যে'ভাবে আপনি চারদিকে প্লাস্টিক ছড়িয়ে যাচ্ছেন তা'তে আর যাই হোক পরিবেশ নিয়ে জ্ঞান ঝাড়া আপনাকে মানায় না। বিশেষত এরপর যখন সরকার কোরাপ্ট বিরোধী নুইসেন্স বলে গালভরা গপ্প ঝাড়েন তখন আমার দুঃখ হয় এই ভেবে যে বাবার রেজিস্ট্রশন লাইফলং ভ্যালিড।

- আমি দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে প্লাস্টিক ছড়িয়েছি? যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা? একটা এগজ্যাম্পেল শুনলে নিজের নাম পালটে দেব।

- বেশ, গত শনিবার গড়িয়াহাট বাজারের সামনে চা খেয়ে প্লাস্টিকের কাপটা দিব্যি বেওয়ারিশ  ছড়িয়ে দিলেন। অথচ দু'পা এগোলেই ডাস্টবিন ছিল। তারপর গত সপ্তাহে হাওড়া স্টেশনে...।

- আমার তাড়া আছে। কী কাজ তাড়াতাড়ি বলুন।

- বেশ। তা যে কথা বলার জন্য আপনাকে ডাকা, বুঝলেন কুবলাইবাবু...।

- কুবলাইবাবু? কুবলাই কে?

- ওহ। নাম পালটে দেওয়ার কথাটা তাহলে সিরিয়াসলি বলেন নি।

- আমি আসি।

- আরে বসুন বসুন। মাইল্ড ঠাট্টা করছিলাম। উ সারকাজমে বিষ নাই।

- সারকাজম? মাইরি? তেরো মাস বয়সে।

- লেটস জাস্ট সে, আমার বাপের ভাগ্যি যে আমি সারকাজম বোধটা বাপের থেকে পাইনি। সে যাক গে, যা বলার জন্য ডাকা...।

- হ্যাঁ, বলে ফেলুন।

- বলছিলাম যে, ইয়ে, আপনারা কি উন্মাদ?

- আমরা?

- আপনি। আপনার মিসেস...। বুড়ো বুড়িগুলো।

- মা বলুন। আপনার মিসেস আবার কী। আর বুড়োবুড়ি? দাদান, দিম্মা...।

- ওই হলো। আপনার ডেটায় বড় অস্বস্তি কুবলাইবাবু। যাক গে। উত্তর দিন।

- আমরা উন্মাদ কেন হতে যাব? আপনি উন্মাদ। আপনার চোদ্দ গুষ্টি উন্মাদ।

- সে সন্দেহ আমারও হচ্ছে।

- এ প্রশ্নে করার মানে?

- আমার খেলনাগুলো নিয়ে আপনারা এমন পাগলামি করেন কেন?

- কী পাগলামি করা হয়েছে?

- নিত্যনতুন খেলনা আসছে, হরেক রকম সাইজের। হরেক রকম আকারের। কী আনন্দ হয়। কিন্তু সেগুলো আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই খেলনাগুলো ফেলে দেওয়ার কোনও মানে হয়?

- খেলনা ফেলে দেওয়া হয়?

- আনার সঙ্গে সঙ্গেই। অমন দুরন্ত সব কাগজের আর কার্ডবোর্ড বাক্সের খেলনাগুলো ফেলে দিয়ে খেলনাগুলোর ভিতরে রাখা বিপজ্জনক সব প্লাস্টিক টিন লোহালক্কড়ের জঞ্জালগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখা হয়। সে বিশ্রী জঞ্জালগুলো আবার থেকে থেকে নড়েচড়ে ওঠে, ভয়ানক সব আওয়াজ করে। এ'রকম বদ্ধ পাগলামোর জন্য আপনাদের শোকজ করছি। আপনাদের উত্তর ট্রিপ্লিকেটে আমার অফিসে জমা দেবেন আগামী সাত দিনের মধ্যে আর আর সে উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে  আমি কড়া পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব!

( সে যাত্রা অ্যালার্মের আচমকা ঝনঝনানিতে রক্ষা পেয়েছিলেন শ্রী শ্রী কুবলাই মুখোপাধ্যায়)