Tuesday, October 22, 2019

সহদেবের আশীর্বাদ

বৈঠকখানার ঢাউস মানুষ সমান জানালাটার শিকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সহদেব৷ ঘরের বাতি নেভানো ছিল, তা'বলে অবশ্য ঘরের মধ্যে আলোর অভাব ছিল না৷ জানালার ও'পাশে বড় রাস্তা, এমনিতেই কলকাতায় রোশনাই আর হৈচৈয়ের অভাব নেই আর এই পুজোর দিনগুলোয় তো শহরের সমস্ত রাস্তাঘাট আলো আর অজস্র শব্দের ঢেউয়ে ভেসে যায় যেন৷
বছরের এই সময়টাতেই বাড়ির সকলে ঘুরতে বেরোয়; কোনোবার পাহাড়, কোনোবার সমুদ্র, কখনও জঙ্গল৷ তাঁরা ফিরে এলে সে'সব জায়গার চোখ ধাঁধানো সমস্ত ছবি দেখেন সহদেব; মনের ভিতর থেকে আপনা হতেই বেরিয়ে আসে "বাহ্, জব্বর"! গৃহকর্তা সুব্রতবাবু সহদেবকে সবিশেষ স্নেহ করেন, তাঁদের সম্পর্কটা ঠিক বাবু আর পরিচারকের নয়; সে'টা সহদেবও বুঝতে পারে৷ তাঁদের সম্পর্কটা তো আজকের নয়; একসময় সুব্রতবাবুর মা একসঙ্গে দু'জনকে হর্লিক্স গুলে খাইয়েছেন, সুব্রতবাবুর বাবা কম চেষ্টা করেননি সহদেবকে লেখা পড়া শেখাতে৷ কিন্তু স্বভাবে চটপটে হলেও লেখাপড়ার ব্যাপারটায় কোনোদিনই ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারেননি সহদেব৷ সবার কি সব হয়? এই না হওয়াগুলো নিয়ে কোনো দু:খ পুষে রাখেননি তিনি৷
সুব্রতবাবু মাঝেমধ্যেই অবশ্য ইচ্ছে প্রকাশ করেন পুজোর ছুটিতে সহদেবকে বগলদাবা করে ঘুরতে বেরনোর৷ কিন্তু এত বড় বাড়ি এতদিনের জন্য ফাঁকা ফেলে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকির ব্যাপার৷ অবশ্য এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও এক রাতের বেশি কাটাতে সহদেবেরই কেমন অসোয়াস্তি লাগে৷ চোদ্দে বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর মনসাপুর গ্রাম ছেড়ে এ বাড়িতে এসে উঠেছিলেন, তারপর থেকে এ বাড়ির বাইরে দিন দুয়েকের বেশি কখনও কাটিয়েছেন বলে মনে পড়ে না৷ ছুটি কাটিয়ে ফিরে সুব্রতবাবুর নয় বছরের ছেলে টিপু চোখ বড় করে হাত পা নেড়ে তাঁকে ঘোরার গল্প করবে আর খুন্তি নাড়তে নাড়তে সহদেব সে'সব গল্প গিলবেন; সে'টাই বরং বেশি মজার৷
বাড়ি ফাঁকা থাকলে অবিশ্যি রান্নাবান্নার দিকেও বিশেষ মন থাকেনা সহদেবের৷ ভাতেভাত খেয়েই বেশির ভাগ দিন কেটে যায়৷ তার চেয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেই তাঁর ভালো লাগে৷ কত মানুষ, কত হাসি, কত আনন্দ৷ বাতাস ভারী হয়ে থাকে ভাজাভুজির গন্ধে৷ বাড়ি থেকে কয়কশো পা হেঁটেই খান দুয়েক পেল্লায় পুজো৷ দিনে একবার সে'খান থেকে ঘুরে আসেন সহদেব, এমন ভীড় তাঁর নেহাত মন্দ লাগে না৷ এত মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করছে, তাদের হাসি হৈহৈ, লাইন দিয়ে প্যান্ডেলে ঢোকা, তাদের মোবাইল ক্যামেরা খচরখচ, খাওয়ার দোকানের স্টলগুলোর সামনে জমাটি ভীড়; এ'সব কিছুই বড় ভালো লাগে সহদেবের৷ সহদেব মনে মনে ভাবে; আহা রে, এ'দের কতজনের মনের মধ্যে কত রকমের দু:খ; কারুর টাকার অভাব, কারুর সম্পর্ক ভেঙেছে, কারুর প্রিয়জনের বিষম অসুখ, কারুর ভাগ্যে অনবরত শনি ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু এই পুজোর যাবতীয় রোশনাই আর শব্দে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়তে কসুর করছে না৷
টিপুর একটা কথা সহদেবের কানে বড় মিঠে সুরে ঠেকে; পুজোর প্ল্যান৷ পুজোর মাস তিনেক আগে থেকেই ডাইনিং টেবিলের আড্ডায় তাদের জোরদার পুজোর প্ল্যান চলে, নিজের মতের দিকে ঝোল টানতে টিপু মাঝেমধ্যেই সহদেবের সমর্থন আদায় করতে চায়.." তাই না স'দেবকাকা"? অথবা "আমি ঠিক বলছি তাই না স'দেবকাকা? বলো না বাবা মাকে...এ'বার পুজোয় আমরা প্রতিদিন শুধু চাইনিজ খাব"৷ সহদেব বরাবর না হেসে সমর্থন জানান৷

রাস্তায় উপচে পড়া মানুষের ভিড় দেখে "পুজোর প্ল্যান" কথাটা মাঝেমধ্যে মনের মধ্যে আউড়ে থাকেন সহদেব৷ এই সমস্ত মানুষের "পুজোর প্ল্যান" আছে৷ সহদেব নিজে ভক্ত মানুষ, সকালে ঠাকুরকে প্রসাদ না দিয়ে নিজে জলস্পর্শ করেন না৷ কিন্তু এই জানালার শিকে মাথা রাখতে রাখতে সহদেবের মাঝেমধ্যে মনে হয় 'পুজোর প্ল্যান' ব্যাপারটা বোধ হয় ভক্তির চেয়ে কম গুরুতর নয়৷

রাস্তার ভিড়ে খুড়কুটোর মত ভাসতে থাকা প্রতিটি মানুষের পুজোর প্ল্যান আছে, সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা পেরিয়েও কত মানুষ পুজোর প্ল্যান কষার ধক রাখেন৷ সংসারহীন সহদেবের চোখ স্নেহে ছলছল আসে, "আহা রে, দু'চারদিন বই তো নয়"৷

এক সপ্তমীর দিন বিকেলে মা মারা গেছিলেন, তখন অবিশ্যি সহদেব বেশ ছোট, বয়স বছর পাঁচ হবে৷ দু:খের চেয়েও বুকে বেশি বেজেছিল ভয়; কীসের ভয় তা সে বয়সে ঠিক ঠাহর করতে পারেননি৷ সাদা চাদরে মোড়া মায়ের সে চেহারা আজও তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঝেমধ্যে, আর বুকের মধ্যে ভেসে ওঠে সেই অজানা ভয়ের গন্ধ৷ সেই পুজোর বাকিদিনগুলো সহদেব বাবার গায়ের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে রেখে কাটিয়েছিলেন৷
বাবা৷ বাবার স্মৃতি বরং সহদেবের মনে অনেকটা স্পষ্ট৷ বাবার ময়লা ফতুয়া, গায়ের সেই মাটি মাখানো গন্ধ, সেই সশব্দ আকাশ কাঁপানো হাসি; সে সবকিছুর মধ্যেই ফেলে আসা মনসাপুর মেশানো৷ যদিও তখন সহদেব " পুজোর প্ল্যান" কথাটা ঠিক শেখেননি, তবে পুজোর চারদিন বাবার হাত ধরে শালিকগঞ্জের মেলায় ঘোরাটা প্রায় নিয়মের পর্যায় পড়ত৷

বাবা৷ সহদেবের সমস্ত আগডুম বাগডুম গল্প মন দিয়ে শোনা বাবা৷ সহদেবের প্রিয় কচুর শাক রান্না করে এক থালা ভাত মেখে দেওয়া বাবা৷ সহদেবকে ঘুড়ি ওড়াতে শেখানো বাবা৷ মায়ের মত বাবা৷ সেই বাবাও মাত্র আড়াই দিনের জ্বরে চলে গেছিলেন পুজোর মধ্যে, অষ্টমীর রাত্রে৷ জ্বলন্ত চিতার মধ্যে থেকেও বাবার গায়ের মেটো গন্ধ এসে সহদেবের বুকে মিশেছিল, বহুদূর থেকে ভেসে আসছিল নবমীর সকালের ঢাকের শব্দ। সহদেবের দিব্যি মনে আছে৷

এই ঢাকের শব্দের ছ্যাঁকার জন্যেই নিজের জন্য কোনোদিনই কোনো 'পুজোর প্ল্যান' ভেবে উঠতে পারেননা সহদেব। শুধু এই ফাঁকা বাড়ির ঢাউস জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে থাকেন রাস্তার দিকে। শালিকগঞ্জের মেলার ভীড়ের স্মৃতি চলকে ওঠে; পাঁপড়ভাজা আর চপের সুবাস, নাগোরদোলার ক্যাঁচরক্যাঁচর শব্দ বুকের মধ্যে তাজা হয়ে ওঠে।
হঠাৎ রাস্তার মাইকে হিন্দীর সিনেমার গান থেমে ঢাকের শব্দ বেজে ওঠে। জানালার শিকটাকে খামচে ধরেন সহদেব। রাস্তার মানুষগুলোর জন্য মনকেমন করে; কত না পাওয়া, কত যন্ত্রণা, কত ছটফট পুজোর প্ল্যানের মলমে শান্ত করে মানুষ বেরিয়ে পড়ে। ভীড়ে হেঁটে হদ্দ হয়, খাওয়াদাওয়ার ছক কষে, নিজের খোকাখুকুর হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলে; প্রবল ক্লান্তিতেও দমে যায়না।

হঠাৎ টিপুবাবুর জন্য মনকেমন করে ওঠে সহদেবের, জানালা ছেড়ে ফোনের কাছে এসে নম্বর ডায়াল করে। টিপুবাবু তার ফোন পেলে বড্ড খুশি হয়। সহদেব মনেপ্রাণে ঠাকুরকে ডাকেন, ঢাকের বাদ্যি যেন টিপুবাবুর কানে কোনোদিনও গরম লোহার টুকরো হয়ে না ঢোকে।

ফোন সেরে ফের জানালার সামনে এসে দাঁড়ান সহদেব, ভীড়ের প্রত্যেকটা অজানা মানুষকে আশীর্বাদ করতে ইচ্ছে হয়; "কারুর পুজোর প্ল্যান যেন কোনোদিনও ফুরিয়ে না যায়, কোনোদিনও না"।
আজও ছ্যাঁতছ্যাঁতে ঢাকের শব্দের সঙ্গে বাবার গায়ের মেঠো সুবাস বাতাসে মিশে সহদেবকে অবশ করে ফেলে। জানালার শিকে ফের মাথা রেখে চোখ বোজেন সহদেব।

পথের পাঁচালী


পথের পাঁচালীকে গো-টু-বই হিসেবে এতদিন কেন ব্যবহার করিনি কে জানে। এক বন্ধু (সম্ভবত উজান) বলেছিল বুক-ক্রিকেটের মত র‍্যান্ডম পাতা উলটে যে কোনো প্যারা পড়ে ফেললেও আরাম হয়। বিভূতিবাবুর ভাষায় বৃষ্টির গল্প পড়লে খটখটে আকাশে নিচেও গায়ে জলের ছিঁটে এসে লাগে। অমন গদ্য একবার পড়া শুরু করলে আমার মত কাব্য-গাম্বাট মানুষও কবিতা আত্মস্থ করার সাহস পায়। প্লটে চালাকি চলে, কিন্তু অনুভূতি প্রকাশে চালাকি ফলালে তা হয় মাতব্বরির দিকে গড়িয়ে যায় নয়ত ন্যাকাপনায় এসে থামে। সংবেদনশীলতা, স্নেহ আর স্মার্টনেসে; "পথের পাঁচালী" অনন্য। বার বার পড়েও এক ঘেয়ে ঠেক না, অপুদের জন্য মন কেমন এতটুকুও হ্রাস পায় না।
বহুদিন পর এ বইয়ে ফেরত গেলাম। শেষ পড়েছিলাম ছেলেবেলায়; তখন অপুর দৃষ্টির বাইরে গিয়ে কোনো কিছু মাপতে পারার কথা নয়। পয়সা থাকলে অপু দিদির জন্য একটা রবারের বাঁদর কিনে দিত; এই সামান্য হাহাকার যে কী প্রবল ভালো লাগা আর মনখারাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে সময়৷ আর রথের মেলার নাম করে বাপের থেকে পয়সা নিয়ে দুর্গা তা দিয়েছিল অপুকে; জিলিপি খাওয়ার জন্য। অমন মায়ের মত দিদির কথা ভেবেও যে কী ভালো লাগে, মনকেমন করে। বইয়ের কিছু কিছু পাতা সে বয়সে যে কতবার করে
পড়েছি।

এ বয়সে ফের সে বই পড়তে বসে আলাদা করে নজরে পড়ল সর্বজয়ার কান্না, হাসি, বকুনি, আশঙ্কা আর স্নেহ। বাপ-মা হওয়ার পর এ বই পড়লে অন্য পার্স্পেক্টিভ গোচর হবে সে'টাই স্বাভাবিক। ভর সন্ধেবেলা নিজের ছেলেমেয়ের নামে শাপশাপান্ত শুনে সর্বজয়ার বুক হিম হয়ে যাওয়া আর সেই দমবন্ধ করা কষ্টটুকু এ'বারে যেন আলাদা করে দাগা দিয়ে গেল। সর্বজয়া বিশেষ লেখাপড়া করেননি, গ্রামবাংলার সারল্যে ভরপুর ; কিন্তু আধুনিক অবিশ্বাস আর শহুরে ধান্দাবাজির ডিপো হয়েও আমার মনেও সে কু-ডাক ডেকেছিল বৈকি; "এই ভর সন্ধেবেলা অমন শিশুদের নামে অমন কথা কেউ বলে? সে কুকথা যদি তাদের গায়ে লাগে"; আমারও মনে হয়েছিল। নিজের খোকার মুখ মনে পড়েছিল।
এ'বারের পড়া এখনও শেষ হয়নি। তবে পুজোর আগেই দুর্গা চলে গেলো। বছরের এই সময়ে এসে এ বই পড়াটা বেশ দলাপাকানো একটা ব্যাপার বটে।

বিশ্বকর্মা


বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটায় অন্তত কলকাতা হতাশ করেনি। বাড়ি টু অফিস আর অফিস টু বাড়ি; যাতায়াতের মধ্যে যতগুলো প্যান্ডেল পেরিয়েছি, প্রত্যেকটাই ছিল নব্বুই দশকের রঙিন গানে ভরপুর।

সবচেয়ে বড় কথা নেদু নেদু আলতো-মেজাজের শিউলি-রোম্যান্টিক গানগুলো নয়; কানে বারবার এসে ঠেকেছে 'জেহের হ্যায় কি পেয়ার হ্যায় তেরা চুম্মা'র মত মরমি সুর।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা পুজো কমিটিগুলোর প্রতি; তাদের মধ্যে বেশিরভাগই লাউডস্পীকার ভাড়া করেছেন জনগণের কানের পর্দায় পেরেক ঠুকতে চেয়ে। স্পীকারের শব্দ যত খ্যানখ্যানে তত তার মোহময় আবেদন।

একটা মনকেমনের ঢেউ বুকের মধ্যে অনুভব করেছিলাম দুপুর দেড়টা নাগাদ যখন অফিসের অনতিদূরের একটা প্যান্ডেল থেকে ভেসে এসেছিল "উফ কেয়া রাত আয়ি হ্যায়, মহব্বত রংগ লাই হ্যায়..ডম ডম ডুবা ডুবা ডুবা ডম ডম ডুবা ডুবা"। সে সুরের কী চমৎকার বাঁধুনি, কণ্ঠের সে কী মখমলে আশ্বাস। সেই গানের মায়াজালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়তে পড়তে এক্সেলশিটে একের পর এক ভুল করা আরম্ভ করলাম; তবে ঘাবড়ে যাইনি। ম্যাথেমেটিক্স হাতড়ে খোদ আইনস্টাইনই যখন তেমন কিছু করে উঠতে পারলেন না, আমি কোথাকার কে।

বিকেলের দিকে কোনো পেছন-ভেসুভিয়াস আলিমুদ্দিন-জ্যেঠু মার্কা কেউ স্যট করে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজিয়ে বসেছিল; আর যায় কোথায়, গোটা অঞ্চলের মেজাজ চটকে চ'। তবে কপাল ভালো, সে ভীমরতি সিপিএমের ডাকা বনধের মতই মিনিট দশেকের বেশি চলেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কালচারকাকুদের কাতুকুতু দিয়ে 'মস্ত মস্ত' পরিবর্তন ধেয়ে এসে লাউডস্পীকার ও চপের কড়াই ফাটিয়ে আকাশ বাতাস জয় করেছে। আমার ধারনা; 'ইয়ে দিল তেরি আঁখো মে ডুবা'র বিশল্যকরণী সুর-স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়নি কাছের হাসপাতালটাও।

বিশ্বকর্মা জিন্দাবাদ। জয় হাতুড়ি। আসছে বছর ডবল হোক।