Wednesday, July 17, 2024

শিকারি



ক্যাম্পের বাইরে স্টোভের ওপর ছোট্ট সসপ্যানে স্যুপ চাপানো হয়েছে৷ মিনিট পনেরোর মধ্যেই ডিনার রেডি হয়ে যাবে, সঙ্গে থাকবে শহর থেকে বয়ে আনা পাউরুটি৷ মন্টু মণ্ডল মন দিয়ে বসে জোনাকি গুনছিলেন৷ জঙ্গলি বাতাসে বেশ একটা মিঠে ভাব, গরমের অস্বস্তি একেবারেই নেই৷ খাবারদাবার সেরে তবেই তাঁবুর ভিতর ঢুকে লম্বা হবে, তেমনটাই ইচ্ছে৷

ঠিক সেই সময়ই আমি তাঁর সামনে ঝুপ করে নামলাম৷ আপনার ভাবছেন কোথা থেকে নামলাম৷ ভূতেরা এমনিই নামতে ওপরে, তেনাদের কোনো মাচা, ব্যালকনি বা গাছের ডালের দরকার হয় না৷ ঝুপ করে নেমে আসাটাই আমাদের বিশেষত্ব৷ বলাই বাহুল্য মন্টুবাবু আমার উপস্থিতি টের পাননি। জঙ্গলে এসে মানুষ জন্তুজানোয়ার, গাছপালা, পোকামাকড় নিয়ে এমন শশব্যস্ত হয়ে পড়ে যে ভূতটূত নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামায় না৷ ভদ্রলোক আদেখলার মত তখন থেকে জোনাকিদের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ এ'সব নেচারলাভারদের দেখলে গা-পিত্তি জ্বলে যায়। অবশ্য আমার গা না পিত্তি কোনোটাই আর নেই, আছে শুধু ঝুপ করে নেমে আসা।

আপনার হয়ত ভাবছেন মন্টু মণ্ডলকে আমি কী'ভাবে চিনি। তা'হলে বলি, আমি সমর, মন্টু মণ্ডলের বাড়িতে বছর সাতেক রান্না করেছি৷ ব্যাচেলর শৌখিন মানুষ; খেতেন কম, কিন্তু সমঝদার। তাঁর সঙ্গে গপ্প করে আর তাঁকে খাইয়ে দেদার সুখ৷ আমার রান্নার কদর করতেন আর আমায় বড় স্নেহ করতেন। সে স্নেহের সুযোগ নিয়ে নিয়মিত তার পকেট থেকে টাকাপয়সা সরিয়েছি৷ শেষের দিকে ভদ্রলোকের শখের অ্যান্টিক সংগ্রহ থেকে ছোটখাটো মালপত্তর তোলা শুরু করেছিলাম, ও ব্যাপারে আমার বিশেষ জ্ঞানগম্যি ছিল৷ মন্টু মণ্ডল লোক ভালো, তার ওপরে বেজায় পয়সাওলা৷ ছোটখাটো হাতসাফাই বছরের পর বছর চালিয়ে গেলাম কিন্তু সে'সব তার নজরে পড়লো কই৷ শেষে যখন মোগল আমলের নীলাটা সরালাম, তখন আর ভদ্রলোকের চোখের ঠুলির ওপর ভরসা করতে পারিনি৷ তা'ছাড়া ও জিনিস বেচে আমার পকেটে অন্তত সোয়া লাখ টাকা আসত,  মাস ছয়েক দিব্যি ফুর্তিতে কাটিয়ে দেওয়া যেত৷ তারপর দেখেশুনে আর এক পিস মন্টু মণ্ডল খুঁজে নিলেই হলো৷ 

কিন্তু কপালের ফের, মাঝরাত্তিরে মন্টুবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বড়জোর দু'দশ পা গেছি, একটা পেল্লায় ট্রাক এসে পিষে দিয়ে বেরিয়ে গেলো৷ সেই থেকে এ জঙ্গলে এসে আস্তানা গেঁড়েছি৷ দু'দিন ধরেই বাতাসে মন্টু মণ্ডলের গন্ধ পাচ্ছিলাম। সে গন্ধের টানে গতকাল থেকে হন্যে হয়ে ঘুরছি, কিছু একটা যেন আমায় টানছিল৷ এখন মন্টুবাবুকে দেখে বুঝছি এ টান কীসের৷ ভদ্রলোকের অনামিকার আঙটিতে উজ্জ্বল হয়ে বসে আছে সেই নীলাটা যে'টা নিয়ে আমি ফস্কে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম৷ ও'টার দিকে তাকিয়ে থেকেও তৃপ্তি৷ আহা৷ 

ভদ্রলোক এ'বার সসপ্যানের ঢাকনা সরাচ্ছেন, স্যুপ হয়ে এলো বোধ হয়। 

ও'দিকে মন্টুবাবু ততক্ষণে পরিতৃপ্ত। তার জঙ্গল অভিযান সফল হতে চলেছে৷ দু'দিনেও সাড়া না পেয়ে হতাশ হতে শুরু করেছিলেন। সমর তাঁকে চিরকাল বোকা ঠাউরে গেল। একশো-দুশো টাকা নিয়মিত সরিয়ে আর দু'একটা পুরনো অ্যান্টিক সরিয়ে সে ভেবে বসলে যে তার মালিক কানা। এ'দিকে মালিকের যত টাকাপয়সা আর জমিদারি সবই যে ভূত তৈরি করে আর ডার্ক ওয়েবে ভূত বেচে; সে'টা যদি মূর্খ সমর বুঝতো। আর রাঁধুনি ভূতের যা দর, এই একটি বেচেই বছর পাঁচেক নিশ্চিন্দি৷ তদ্দিনে নতুন রাঁধুনি ব্যাটা তৈরি হয়ে যাবে জবাইয়ের জন্য৷ 

মিষ্টি হেসে সসপ্যানের ঢাকনাটা সরালেন মন্টু মণ্ডল৷ পাতি লোক বা খেলো ভূত কী করে বুঝবে যে এই সসপ্যান আদতে ঘোস্ট ক্যাচার?

(ছবি: জেমিনাই)

লেখার ভূত



বারো বাই দশ ফুটের ঘর৷ আসবাবপত্র বলতে একটা দেওয়াল জোড়া কাঠের বুকশেল্ফ, তা'তে বইপত্র এমনভাবে ঠাসা যে বাড়তি আর একটা পত্রিকাও গুঁজে রাখা যাবে না বোধ হয়। একটা স্টাডি টেবিল, তা'র ওপরে আর এক প্রস্থ বইয়ের স্তুপ৷ সঙ্গে দু'চারটে ডায়েরি, একটা রাইটিং প্যাড আর একটা সস্তা কলমে ভর্তি বাহারে পেনস্ট্যান্ড। টেবিলের পাশেই একটা ভারিক্কি চেহারার চেয়ার৷ ঘরের অন্যদিকে ছোটখাটো একটা সোফা, তার সামনে লাগসই সেন্টার টেবিল৷ সেন্টারটেবিলের ওপরেও কিছু বই৷

বেশিরভাগ বইই পুরনো, সেই পুরনো বইয়ের দলা-পাকানো গন্ধটা নির্মল দাসের মন্দ লাগছিল না৷ নির্মলবাবুর বয়স সত্তর পেরিয়েছে, মাথার চুল আশি শতাংশ পাকা। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি নড়বড়ে হয়নি আদৌ৷ তিনি খেয়াল করেছেন যে ঘরের সমস্ত বইই ফিকশন, সত্তর শতাংশ ইংরেজি৷ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সেই সোফায় গিয়ে বসলেন নির্মল। 

মিনিট দশেকের মাথায় সুবিমলের ডাকে চিন্তার সুতো ছিঁড়লো নির্মলবাবুর।

"মিস্টার দাস"?

"নমস্কার সুবিমল", সোজা হয়ে বসলেন নির্মল৷ 

"ব্যস্ত হবেন না"৷ সেন্টার টেবিলের নীচেই একটা ছোট বসার টুল ফিট করা ছিল। সে'টা টেনে নিয়ে সোফার উলটো দিকে বসলেন সুবিমল।

"আপনি চা খেয়েছেন নির্মলবাবু"?

"আপনার হাউসহেল্প অফার করেছিল৷ কিন্তু চা-কফির পাট আমি অনেকদিন তুলে দিয়েছি, তাই..."।

" আপনি কি জানেন আপনাকে আমি কেন ডেকেছি"?

"সুমিত আপনার সেক্রেটারি ছিল৷ কাজেই সে সম্বন্ধে যদি কিছু.."।

"সুমিত আপনার ছেলে বলে বলছি না৷ ওর মত এফিশিয়েন্ট মানুষ আমি খুব কম দেখেছি৷ আর হি ওয়াজ লাইক মাই ওয়ার্কিং পার্টনার৷ আমি কোনোদিনই ওকে নিজের সেক্রেটারি হিসেবে দেখিনি। নির্মলবাবু, ওর এই অসময়ে মৃত্যুটা.."।

"একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি সুবিমল"?

" হ্যাঁ, প্লীজ। বলুন না"।

"আপনি নিজে লেখক৷ এতগুলো বেস্টসেলার আপনার। অথচ এই ঘরের এতগুলো বইয়ের মধ্যে আপনার লেখা কোনো বইই রাখা নেই৷ কেন"?

"এ'টা আমার ফর্ট্রেস অফ সলিচুড বলতে পারেন৷ চারদিকে আমার প্রিয় বই৷ নিজের লেখা বই আমি নিজে তেমন পড়িনা৷ সে'সব ওই  বইয়ের দোকানের সাজানো শোকেসে দেখতেই ভালো লাগে"।

"হিউমিলিটি"।

"আমি সত্যিই নগন্য"।

"কী প্রয়োজনে আপনি ডেকেছিলেন যেন"?

"নির্মলবাবু৷ এই চেকটা আপনাকে দেওয়ার ছিল"।

"আর কেন। সুমির শ্রাদ্ধের সময়ও তো..এর আগেই তো আপনি অনেক দিয়েছেন৷ আই অ্যাম ভেরি গ্রেটফুল"।

"ও'রকম ভাবে বলবেন না৷ কতটুকুই বা দিয়েছি। এ'টাও সামান্যই৷ সুমিত ডিজার্ভড মাচ মোর"।

"শুধু এই চেক দিতে আপনি আমায় ডেকেছিলেন সুবিমল"?

"নির্মলবাবু৷ হয়ত একটা ব্যাপার আপনি জানেন না..সে'টা.."।

"সুমিত আপনার হয়ে গোস্ট-রাইট করত। বইগুলো আপনার নামে ছাপা হলেও সে'লেখাগুলো আপনার নয়"।

" ওহ। সুমিত কথাগুলো আপনাকে বলেছে? আমরা কিন্তু রীতিমতো একটা কনফিডেনশিয়ালিটি এগ্রিমেন্ট সই করেছিলাম। সুমিত এ ব্যাপারটা যদি আপনাকে জানিয়ে থাকে তা'হলে সে'টা মারাত্মক একটা ভায়োলেশন.."।

"সুমিত আমায় জানায়নি৷ কিছু মনে করবেন না সুবিমল, সুমিত মারা যাওয়ার পর আপনি যখন আমার বাড়িতে এলেন। আপনার চোখেমুখে আমি আতঙ্ক দেখেছি; স্বজন হারানোর দু:খ নয়৷ আর সুমিত যেহেতু সেক্রেটারি হয়েও ওয়ার্ক ফ্রম হোম বেশি করত আর সে কাজটার সিংহভাগ জুড়েই লেখালিখি; খানিকটা আন্দাজ আমি করেই ছিলাম৷ আমি সুমিতের বাবা আর শিক্ষক; দুইই৷ সুমিত সাহিত্যটা আমার কাছেই শিখেছে৷ ওর লেখার স্টাইল আমার জানা৷ আর আপনার বেস্টসেলার গুলো সমস্তই আমার পড়া৷ সুবিমল, অঙ্কটা বুঝতে আমার খুব অসুবিধে হয়নি"।

সুবিমল খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলেন৷ বৃদ্ধ নির্মল অল্প সময়ের জন্য চোখ বুজলেন৷ সুমির চলে যাওয়াটা তাকে বড় ভেঙে দিয়ে গেছে৷ বাপ-ব্যাটার সংসার, সে'টাও টিকল না৷ 

"নির্মলবাবু। এ নিয়ে আপনি হইচই বাঁধিয়েও তেমন কিছু করতে পারবেন না৷ আর নিতান্তই যদি জলঘোলা করতে চান, ফল সুবিধের হবে না"।

"সুবিমল। সুমিতের কথার খেলাপ আমি করব না৷ এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তা'ছাড়া ভালো লিখে লেখক হওয়ার যুগ তো আর নেই৷ ফিনান্সিয়াল রিসোর্স, পিআর মাসল ইত্যাদি না থাকলে বেস্টসেলার বেরোবে কী করে। অতএব, আপনার সিক্রেট অক্ষত থাকবে, সে ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷ এর জন্য যদি কিছু সইসাবুদও করতে হয়..."।

"থ্যাঙ্কিউ নির্মলবাবু৷ আমার উকিল সামনের সপ্তাহে আপনার বাড়ি গিয়ে কাগজপত্রের ব্যাপারটা বুঝিয়ে আসবে৷ আর মাসে-মাসে এই চেক আপনার বাড়ি পৌঁছে যাবে। প্লীজ না বলবেন না"।

"হুম"।

"আর একটা বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলার ছিল৷ বলতে পারেন রিকুয়েস্ট"।

" বলুন"।

"আমার একটা নভেল প্রকাশককে আগামী হপ্তার মধ্যে দেওয়ার কথা৷ থ্রিলার। প্রকাশকের পীড়াপীড়িতেই ও জিনিসে হাত দেওয়া হয়েছিল৷ নয়ত আমি..মানে..সুমিত রোম্যান্টিক লেখাতেই স্বচ্ছন্দ ছিল। তবে থ্রিলার লেখার সুযোগ পেয়ে ও নিজেও বেশ এক্সাইটেড ছিল৷ আমার ধারণা লিখেও ফেলেছিল৷ হয়তো ওর বাড়ির কম্পিউটারে কোথাও...। কিন্তু আমায় মেল করার আগেই এই.."।

"ওর কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড আমার জানা আছে৷ ও লেখা আমি খুঁজে আপনাকে পাঠিয়ে দেব"।

সুবিমল বিহ্বল হয়ে নির্মল দাসের হাত টেনে ধরলেন৷ 

"আমি যে কী বলে আপনাকে.."।

বৃদ্ধ নির্মল এই হঠাৎ-আবেগকে তেমন পাত্তা দিলেন না৷ 

বেরোবার মুখে সুবিমল ঢিপ করে একবার নির্মলকে প্রণাম করে নিয়ে বললেন, "নির্মলবাবু, সুমিত সত্যিই প্রতিভাবান লেখক ছিল। ব্রিলিয়ান্ট। বাবা হিসেবে আপনার গর্ব হওয়া উচিৎ"।

ফ্যাকাসে মুখে খানিকক্ষণ সুবিমলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন নির্মল দাস৷ কী বলবেন তিনি? জানিয়ে দেবেন যে সুমির কোনোদিনই ক্ষমতা ছিল না পাতে দেওয়ার মত কিছু লেখার? মা-মরা ছেলের বিদঘুটে সব শখ আর দ্যাখনাইয়ের যোগান দিতে বৃদ্ধ পিতাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলের হয়ে নিজের লেখাকে বিক্রি করতে হয়েছিল এক বেস্টসেলার ব্যবসায়ীর কাছে? অবশ্য সে বিক্রির টাকার এক কানাকড়িও কোনোদিন চোখে দেখননি তিনি৷ সুমিটা দিন দিন বড্ড নির্মম আর অর্থ পিশাচ হয়ে উঠেছিল। সুমি মারা যাওয়ায় ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধ পিতা৷ কিন্তু বুকপকেটের পেল্লায় চেকটা তার ভিতরের লেখক সত্ত্বাটাকে খানিকটা হলেও স্বস্তি দিল৷

"আসি" বলে বেরিয়ে পড়লেন নির্মল।

(ছবি: মেটা)

Tuesday, July 16, 2024

দত্তবাবুর মুক্তি



- গুড মর্নিং।

- আরে আপনি, আসুন। আসুন।

- তৈরি হয়ে নিন মিস্টার দত্ত৷

- মানে?

- মানে আপনার মুক্তি আসন্ন। আপনার সরকারের সঙ্গে আমাদের হাইকমান্ডের সমঝোতা হয়ে গেছে।

- ওহ্‌।

- এ'বার অন্তত আর অমন গোমড়া মুখে থাকবেন না।

- নাহ্‌৷ মানে ঠিক, বিশ্বাস হচ্ছে না...। গত সাতটা মাস এমন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কাটলো..। তবে এজেন্ট রস। আপনাকে ধন্যবাদ না জানালে চলবে না৷ এই অন্ধকারের মধ্যেও আপনি দিব্যি বন্ধুর মত পাশে ছিলেন।

- তৌবা তৌবা মিস্টার দত্ত৷ আপনাকে যে টেররিস্টের দল কিডন্যাপ করেছে, আমি তাদের কম্যান্ডার। আমায় বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিজেকে ছোটো করবেন না৷

- এজেন্ট রস। আমি কিন্তু আপনার মধ্যে একজন ভালোমানুষকে দেখেছি৷ এই ক'মাসে চাইলে আপনি আমার ওপর অকথ্য অত্যাচার করতে পারতেন। এ'সব না করে আপনি আমার সঙ্গে দু'বেলা গল্পগুজব করেছেন৷ দাবা খেলেছেন৷ আমার বউ-মেয়ের খবর পৌঁছে দিয়েছেন নিয়মিত। আর সবচেয়ে বড় কথা অন্য কেউ আমার ওপর তম্বি করতে এলে তাকে ঠেকিয়ে রেখেছেন।

- মিস্টার দত্ত। আপনাদের খাতার আমায় টেররিস্ট বলে দাগিয়ে দিয়েছেন বটে। হয়তো সে'টা নেহাৎ ভুলও নয়। তবে কী জানেন, যাই হই, পেটি মার্সিনারি তো নই। অসহায় বন্দীকে খুঁচিয়ে আনন্দ আমি কোনোদিনই পাইনি৷ আর আপনি তো গুণী মানুষ।

- আই মাস্ট সে, আপনার হাতের রান্নাও কিন্তু এ-ক্লাস৷ নয়ত আপনাদের ক্যাম্পের লপসি খেয়ে সাত মাস টানতে পারতাম না৷

- তৈরি হয়ে নিন৷ গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ মিনিট দশেকের মধ্যে রওনা হবো।

- এজেন্ট রস৷ এইবারে অন্তত আপনার আদত নামটা যদি..।

- ব্যাপারটা গোপন রাখায় আমার তেমন স্বার্থ নেই দত্তবাবু৷ তবে আমাদের সম্পর্ক এই সাত মাসেরই ছিল৷ এজেন্ট রস আর মিস্টার দত্তের বাইরে নিজেদের টেনেহিঁচড়ে এনে কী লাভ৷ নিন, ক্যুইক৷ এ'সব ব্যাপারে দেরী করলে চলবে না৷ আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি৷ রেডি হয়ে হাঁক পাড়লেই চলে আসবো।

- এজেন্ট রস। থ্যাঙ্কিউ৷

- হুঁ। আমি আসি..।

- আপনার গ্রামের নামটা ইউসজ্বেক, তাই না?

- নামটা বেশ গোলমেলে। আপনি মনে রেখেছেন, ভালো লাগলো।

- সে'দিন আপনি ঠিকই বলেছিলেন রস। এ যুগে দাঁড়িয়ে ও গাঁয়ের মেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না, এই অন্যায় বরদাস্ত করা যায় না৷ একটা কথা দিয়ে যাচ্ছি; এর বিহিত এ'বার আমরা করবই৷ ফিরে যাই একবার৷ কোনো ট্যাঁফোঁ শুনছি না৷ সরকারের থেকে এ জিনিস আমি আদায় করবই৷

- থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার দত্ত৷ আপনি মানুষটা বড় ভালো। মেয়েদের স্কুল একটা হলে, গাঁয়ের মানুষের সত্যিই মঙ্গল হবে৷

- আপনার সঙ্গে হয়ত আর কখনও দেখা হবে না৷ কিন্তু আগামী একবছরের মধ্যে আপনার ছোট্ট দুই মেয়ে স্কুলে যাবে৷ কথা দিলাম৷

- রেডি হয়ে নিন৷

- আপনার থেকে একটু এক্সাইটমেন্ট আশা করেছিলাম কিন্তু৷ প্রগ্রেসের দাবীতেই তো আপনারা লড়াইয়ে নেমেছেন, তাই না?

- মিস্টার দত্ত। আপনাদের কিছু বোমারু বিমান গতকাল আমাদের ও'দিকের অন্তত দশখানা গ্রামকে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে গেছে। হাইকম্যান্ড তারপরেই রণেভঙ্গ দেবে ঠিক করেছে৷ কেউ যদি বেঁচেই না থাকে, তবে প্রগ্রেস কাকে ছোঁবে।আর এই অসম লড়াই কহাতক টানা যায়৷ জানেন, আমাদের গাঁ-খানাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে৷ আমার বউ আর মেয়ে দু'টোও এ যাত্রা আর বাঁচল না।

- এজেন্ট রস!

- তবে কিছু বাচ্চা মেয়ে এখনও পুড়ে ছাই হয়ে যায়নি৷ পারলে সরকারবাহাদুরকে ধরেবেঁধে স্কুলটা বানাবেন৷ কেমন?

- আমি..আই অ্যাম সরি।

- এ'বারে মুক্তি মিস্টার দত্ত৷ কঙ্গ্রাচুলেশনস টু ইউ অ্যান্ড ইওর গভর্নমেন্ট৷

গুপ্তর দীঘাযাত্রা

- গুপ্ত, শনিবারে একটা জরুরী পার্ফর্ম্যান্স রিভিউ মিটিং রেখেছি। আর রোববার দুপুরে ক্লায়েন্টের সঙ্গে আইসব্রেকিং ইন্টার্যাকশন ফলোড বাই বিজনেস লাঞ্চ। বি প্রিপেয়ার্ড।

- সে কী স্যার, আমি যে প্ল্যান করে বসে আছি দীঘা যাব। দীঘার দীর্ঘ প্রিপারেশনও চলছে।

- দীঘা যাবে? কেন?

- সমুদ্র। মাছ ভাজা। সামান্য ইয়ে-পান। ওই একটু গানশোনা। একটু বই পড়া। প্লাস খানিকটা গড়িমসি।

- আরে, উইকেন্ড ওয়েস্টার্ন কনসেপ্ট; ওই সব করতে গিয়েই তোমরা বখে যাচ্ছ। এরচে' বরং পঞ্জিকা ধরে উপোষ করলে রক্ত পরিষ্কার হত, মনমেজাজ চাবুক হত।

- কিন্তু স্যার, ওয়ার্কলাইফ ব্যালেন্স বলেও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি...।

- ফের ওয়েস্টার্ন কনসেপ্ট। গীতায় আছে কি ওয়ার্কলাইফ ব্যালেন্স ফ্রেজটা?

- ভেবে দেখলে স্যার, রিভিউ মিটিং ব্যাপারটাও কিন্তু ঘোরতর ওয়েস্টার্ন ইয়ে। কী নিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছেন বলুন, আর কীই বা নিয়ে যাবেন। সবই যখন ফাঁকি, তখন কীসের রিভিউ, কীসের মিটিং।

- কর্মযোগ তো মিছে নয় ভাই গুপ্ত। সে কনসেপ্ট তো ঘোরতর দিশি।

- দিশি মত তো এ'টাও বলছে স্যার, কাজ করে যাও। ফলের আশা কোরো না। প্ল্যানিং মিটিং হলে তাও ভেবে দেখতাম, কর্মের ব্যাপারে মাথা ঘামানো স্বাস্থ্যকর। কিন্তু পার্ফর্ম্যান্স রিভিউ মানে তো ফলের গুণ-বিচার। সে যে ঘোরতর ভাবে ওয়েস্টার্ন ব্যাপার স্যার। আর ক্লায়েন্টকে বিজনেস লাঞ্চে না ডেকে বিজনেস উপোষ সাজেস্ট করুন। রক্ত পরিষ্কার হবে। রক্ত চুষে খেতে হলে তা ফিল্টার করে নেওয়াই ভালো।

- গুপ্ত। তুমি দীঘা যাও, বুঝলে। খামোখা কথা বাড়িয়ে কাজ নেই।

ডেডলাইন

একটা দু'মিনিটের কাজ। কোনও জটিলতা নেই। গোলমাল নেই। ফস করে সেরে ফেললেই হলো। অথচ হচ্ছিল না। "এই দু'মিনিটের কাজ তো। তা'ছাড়া ওই দু'মিনিটের সাবমিশন ডেডলাইন ধারেকাছে নেই, হাতে অঢেল সময়"।

এই মিটিং, সেই প্রেজেন্টেশন, অমুক মেমো, তমুক প্রপোজাল; কাজের মধ্যে রে-রে মেজাজ থাকতে হবে, টার্গেট ফেল হলেই গিলোটিন গোছের জৌলুস থাকতে হবে। তবেই না তৃপ্তি। অতএব সেই এলেবেলে দু'মিনিট দিনের পর দিন আড়ালেই পরে রইল।

কিছুদিন নির্বিবাদে কেটে যাওয়ার পর। আচমকা একদিন মাঝরাতের কাছাকাছি পৌঁছে, বাড়ির বিছানার নিশ্চিন্দিতে সে দু'মিনিটের দায়ের কথা মনে পড়লো। "নাহ্, আর ফেলে রাখলে চলবে না। আগামীকাল অফিস পোঁছেই..."। ডেডলাইনটা কবে যেন? মনের মধ্যে মৃদু সন্দেহ দেখা দিল। মোবাইলে ইনবক্স খুলে যাচাই করলাম, আজ মাঝরাত্তিরের আগে সাবমিশন না করলে দু'মিনিটবাবু ফুড়ুৎ করে উড়ে পালাবেন। ঘড়িতে দেখলাম ০০ঃ০০ঃ০০ হতে আর বড়জোর মিনিট পাঁচেক।

তড়াং করে বিছানা ছেড়ে প্রায় উড়ে পৌঁছে গেলাম পাশের ঘরে রাখা ল্যাপটপের কাছে। কর্পোরেট এক্সেলেন্সের নিয়ম মেনেই দেখলাম ল্যাপটপে চার্জ নেই। চার্জার রয়েছে অন্য ঘরে। দে ছুট। দে ওয়াপস ছুট। হাতে তখন মিনিট চার। এক মিনিট চার্জ না খেয়ে ল্যাপটপ মিউমিউ করবে না।

অবশেষে যখন ল্যাপটপ খুলে সাবমিশন হলো, তখন দেখলাম রাত বারোটা বাজতে সাত সেকেন্ড বাকি। ভেবে গর্ব হলো যে দু'মিনিটের সরল সিধে কাজেও কেমন রক্তারক্তি জৌলুস যোগ করেছি। এই না হলে প্রোডাক্টিভিটি। বাড়ির লোকজন জানলে কী'রকম আহার-নিদ্রা-পাশবালিশআরাম ত্যাগ করে কোম্পানির সমস্ত বোঝা কাঁধে নিয়ে আমার পথচলা। মাঝরাত্তিরেও আমার মুক্তি নেই।

পার্কিনসন্স ল যে কী নির্মম আর কী নির্ভুল।

পুরনো ট্রেনের টিকিট আর মুম্বইয়ের বৃষ্টি



অফিস ব্যাগের মধ্যে ছাতা৷
ছাতার পাশে দু'খোপের টিফিনবাক্স৷
টিফিনবাক্স ঘেঁষে অফিসের আইকার্ড৷
আইকার্ডের ফিতেয় জড়ানো মানিব্যাগ।
মানিব্যাগে একটা পাঁচশো টাকার নোট দু'টো দুশো, আর তিনচারটে দশ-কুড়ির৷ কিছু খুচরো পয়সা৷ খানকয়েক কার্ড; ডেবিট, ক্রেডিট, আধার ইত্যাদি৷ কোনো এক ফোঁকরে একটা সাতপুরনো ট্রেনের টিকিট৷ বিবর্ণ, ছাপা অক্ষরগুলো এখন আর পড়া যায় না৷

বছর কুড়ি আগে ও'টিকিট এক অন্য মানিব্যাগে ঠাঁই পেয়েছিল৷ তা'তে ছিল বড়জোর চল্লিশ টাকা৷ আর কলেজের আইকার্ড৷ অদরকারি নানারকমের খুচরো কাগজে ঠাসা৷ সেই মানিব্যাগ ছিল পিঠে ঝোলানো প্যারাশুট কাপড়ের ব্যাগে৷ সে ব্যাগের মধ্যে জলের বোতল, দু'টো বই, খাতা-কলম। আর ছাতা৷

আজকের মতই, সে'দিনও বৃষ্টি ছিল, তাই টিকিটের মানিব্যাগে আর মানিব্যাগের পিঠের ব্যাগে চালান হওয়া৷ আজকের মতই, সে'দিনও ব্যাগ থেকে ছাতা বেরিয়ে আসেনি৷ কারণ দু'টো। প্রথমত, ছাতা খুলতে হওয়া পরাজয়, এ'টা কে কবে মজ্জাগত দিয়ছিল কে জানে৷ দ্বিতীয়ত, ভেজা ছাতার ছেয়ে বিশ্রী বোঝা আর কিছু হয় না৷

এই ক’বছরে কত দরকারি কাগজ, ডেবিট কার্ড, টাকা, জরুরী কত কিছু অবলীলায় হারিয়ে গেল। অথচ কোনো অদ্ভুত মন্ত্রবলে সে রেলের টিকিট টিকে রইল৷ কত মানিব্যাগ পেরিয়েও সে টিকিটের বিবর্ণতা এখনও উজ্জ্বল।

অব্যবহারের ছাতার মতই ও টিকিট এখন বুকে ভরসা জোগানো মাদুলি৷

মহাবিপদ



মরে গিয়ে মহাবিপদে পড়েছি বুঝলেন। এর চেয়ে বেঁচেই ভালো ছিলাম। বড়জোর অফিসে বড়সাহেবের আর বাড়িতে বৌয়ের মুখচোপা শুনতে হত দিনে দু-তিনবার। এ'ছাড়া ছিল নানারকমের ভয়; ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম ফেল করা, সেলস টার্গেট ঝুলে যাওয়া, কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া; আরো কত কী। কিন্তু মরার পর থেকে দেখছি দুশ্চিন্তা হাজারগুণ বেড়ে গেছে। রক্ত নেই, রক্তচাপ বাড়ছে। হৃৎপিণ্ড নেই অথচ বুকের মধ্যে ধড়ফড়। মহামুশকিলে পড়েছি। এ'বার একটু খোলসা করে বলি।

গতকাল রাত সোয়া এগারোটা নাগাদ দু'পেগ হুইস্কিতে ভেসে আমাদের সাত তলার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে একটু দরদ দিয়ে গান ধরেছিলাম, "আমি যে জলসাঘরে"। দরদের ফোর্সটা একটু এ'দিক ও'দিক হয়ে গেল; কী'ভাবে যেন আমি ব্যালকনির রেলিং টপকে এক্কেবারে সোজা গিয়ে পড়লাম অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সুইমিং-পুলসাইডে। পুল-ভিউ ফ্ল্যাট কেনার এ'টা একটা বাড়তি সুবিধে, এই ধরণের দুর্ঘটনায় বেশ একটা সিনেম্যাটিক মাত্রা যোগ হয়।

ব্যাপারটা যা দাঁড়ালো; জলসাঘরের মেজাজ আর হুইস্কি মিলে কিঞ্চিৎ বাড়াবাড়ি। যা হোক, এমন রক্তারক্তি একটা ব্যাপার ঘটে গেল; থানা-পুলিশ তো হবেই। ইন্সপেক্টর গুপ্তর মনের মধ্যে একটা অদম্য গোয়েন্দা বাস করে। বললে বিশ্বাস করবেন না, আমি ওর মগজের মধ্যে ঢুকে দেখে এসেছি; সে'খানে আগাথা ক্রিস্টি আর আর্থার কনান ডয়েলের মাদুর পেতে পাশাপাশি বসে গল্পগাছায় ব্যস্ত। অতএব পেশায় ইন্সপেক্টর আর শখে গোয়েন্দা গুপ্তবাবু যে একটা সাদামাটা ব্যাপারকে সহজেই গুলিয়ে দেবেন, সে'টাই স্বাভাবিক।

মিনিট দশেক পায়চারী করে ইন্সপেক্টর গুপ্ত ঘোষণা করলে, "এ'টা যে দুর্ঘটনা সে'টা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না৷ আত্মহত্যা হতে পারে। এমন কী, খুনও হতে পারে"। আমার শ্যালক অমিয় সে'দিন সন্ধ্যে থেকে আমাদের সঙ্গেই ছিল, আমার গ্যাঁটের টাকায় কেনা হুইস্কি যতটা পেরেছে গিলেছে। বলাই বাহুল্য অমিয় ছোকরাটি হাড়বজ্জাত। কথায় কথায় বড় বড় বাতেলা এ'দিকে কাজের বেলায় লবডঙ্কা। ফিউশন রেস্টুরেন্ট চালানোর নাম করে বাপ-ঠাকুর্দার জমানো টাকাগুলো জলে দেওয়াটাই ওর প্যাশন। ইন্সপেক্টর গুপ্ত যেই বলেছে, "খুন", অমনি সে দুলে-দুলে সায় দিলে, "মার্ডার। মাই গড! জামাইবাবুর এলেম আছি মাইরি দিদি, মার্ডার হয়ে গেল? বিগ ব্রাদার দীনবন্ধু আইচ, তোমার এলেম আছে। আমাদের ফ্যামিলির জামাইদের মধ্যে ডাক্তার আছে, রঞ্জি খেলা ক্রিকেটার আছে, কিন্তু মার্ডার হওয়া কেউ এদ্দিন ছিল না৷ হোয়াট আ ডে। উই শুড অল বি প্রাউড"!

ও'দিকে আমার বৌ নীলা আপ্রাণ চেষ্টা করছিল একটু কান্নাকাটি করার। কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছিল না। একটু সিনেমা-সিরিয়াল না দেখলে ওর চোখের জল ঠিক ফ্লো করতে চায় না। কিন্তু খুনের সন্দেহ যে একট অস্বস্তিকর ব্যাপার সে'টা বুঝতে তার অসুবিধে হয়নি৷ খুন শুনেই মোবাইল থেকে মুখ তুলে হাউহাউ শব্দে ইন্সপেক্টর গুপ্তর দিকে তেড়ে গেলো, "কী বলছেন ইন্সপেক্টরবাবু। আমার স্বামী অমন দেবতুল্য মানুষ। তার কি কোনো শত্রু থাকতে পারে? তাছাড়া ঘরে এ সময় ছিলটা কে। আমি, আর অমিয়। আর আমাদের মেয়ে বুল্টি গেছে ওর মেজপিসির বাড়ি। এর মধ্যে কে খুন করবে ওকে"? বরাবরই দেখেছি, নীলার কথার মধ্যে একটা ধারালো ব্যাপার আছে। ইন্সপেক্টর গুপ্ত একটু থতমত খেলেন৷

" ইয়ে মানে", দু'পা পিছিয়ে গিয়ে বলতে শুরু করলেন গুপ্তবাবু, "রেলিঙটা তো যথেষ্ট উঁচু, ও'টা আলোগোছে মনের ভুলে ডিঙিয়ে যাওয়াটা ঠিক.."। শুনে মনে হলো ইন্সপেক্টর গুপ্ত হুইস্কি রস থেকে বঞ্চিত৷ নয়ত মাতালের উটকো ব্যাপার ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতা সম্বন্ধে অকারণ সন্দেহ প্রকাশ করতেন না৷ ফের আমতাআমতা করে বলা শুরু করলেন, "তবে আপনারা বলছেন যখন..নিশ্চয়ই তাই হবে৷ দুর্ঘটনা.."। গুপ্তদারোগার মনের ভিতর পাতা মাদুরের ওপর তখন আগাথাদিদি আর আর্থারদাদা হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছেন৷

নীলা আর একরাউন্ড অশ্রুহীন হাউহাউ দিয়ে ইন্সপেক্টরের পিলে চমকে দিয়ে বললে, "এমন সোনার সংসার। আমার দীনু অকারণ সুইসাইড করতে যাবে কেন"?

ইন্সপেক্টর গুপ্ত পত্রপাঠ বিষম খেয়ে জানিয়ে দিলেন "আপনার দীনুবাবুর পোস্টমর্টেম একটা হবে..তবে বোঝাই যাচ্ছে স্পষ্ট দুর্ঘটনা"। দুর্ঘটনার আশ্বাস নিয়ে নীলা মোবাইলে স্ক্রিনে নিশ্চিন্তে ফেরত গেল৷ অমিয় টলতে টলতে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে, ভাজাভুজি কিছু পড়ে আছে কিনা দেখতে।

এ'দিকে আমার শুরু হলো দুশ্চিন্তা৷ এত খাটুনি সব জলে না যায়৷ আমার দু'পেগ আর অমিয়র চার পেগের মাথায় মাতলমির অজুহাতে শালার গায়ে গিয়ে ঢলে পড়েছিলাম, সে আমায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়৷ অমিয়র নখগুলো জঙলি৷ আমি নিশ্চিত আমার ঘাড়ে অমন অদ্ভুতভাবে তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট আর টাটকা নখের দাগ পাওয়া যাওয়ার ব্যাপারটা পুলিশকে ভাবাবে৷ আড়ালে অমিয়র ফোন হাতড়ে কিছু গর্হিত ইন্টারনেট সার্চও করে রেখেছি, "ক্যান আ পার্সন সার্ভাইভ আফটার ফলিং ফ্রম দ্য ইলেভেন্থ ফ্লোর"৷ ইন্সপেক্টর গুপ্ত কি অমিয়র ফোন বাজেয়াপ্ত করবে না? পুলিশ কি আমার ঘাড়ে অমিয়র ধাক্কা দেওয়া আঙুলের ছাপ বা নখের দাগ খুঁজে পাবে না?
মারাত্মক টেনশন হচ্ছে৷ মারাত্মক৷ অমিয় হয়ত পুরোপুরি ফাঁসবে না, কিন্তু একবারের জন্যও সামান্যতম সন্দেহ ওর ওপর এসে পড়লেই আমার শ্বশুরমশাই ওর পিছনে ক্যাঁক করে একটা কমল মিত্র অন স্টেরয়েড সুলভ লাথি কষাবেন৷ অন্তত বাপ-ঠাকুর্দার রেস্টুরেন্টের ব্যবসাটা নিশ্চিতভাবেই অমিয়র হাতছাড়া হবে গবেটত্বর জন্য৷ আর সে ব্যবসা নিশ্চয়ই নীলা পাবে৷ ওর পাওয়া উচিৎ। নীলা সত্যিই পারবে ও ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে৷ ও অমিয়র মত অকালকুষ্মাণ্ড নয়।

বিয়ের পর এতগুলো বছরে নীলার মেজাজটা ভারি তিতকুটে হয়ে গেছে৷ বাইরে থেকে সবাই দেখে ভাববে কী'রকম জাঁদরেল স্নেহহীন নিরেট মানুষ৷ আমি জানি নীলা এমনটা ছিল না চিরকাল, আমিই ওকে যথেষ্ট ভালো রাখতে পারিনি। মিইয়ে যেতে যেতে কেঠো হয়ে গেছে একসময়৷ ওর পরিবারের পুরুষরা ওকে তেমন পাত্তা দেয়নি কোনওদিন, বিয়ের পর আমিই বা কদর করলাম কই৷ ডাক্তার সান্যাল যে'দিন রিপোর্ট দেখে আমায় জানালেন যে আমার হাতে আর বড়জোর মাসচারেক, তখনই ঠিক করেছিলাম নীলার জন্য কিছু করার শেষ চেষ্টা একটা করতে হবে৷ আশা করি ডাক্তার সান্যাল রিপোর্টটা গোপন রাখার কথাটা ভুলবেন না।

এই মুহূর্তে ইন্সপেক্টর গুপ্ত নিজের কাজে ব্যস্ত৷
বেয়াদপ অমিয় রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পা ছড়িয়ে বেগুনি চিবুচ্ছে।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে নীলা একমনে মোবাইলের স্ক্রিন দেখে যাচ্ছে৷ ওর মনের মধ্যে একটু ঢুঁ মেরে দেখলাম; সে'খানে একটা নিরিবিলি বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে নীলা; কলেজে পড়া নীলা৷ সে বারান্দায় ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ ইচ্ছা হল ওকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু আমি তো ইচ্ছে-অনিচ্ছে পেরিয়ে বহুদূর চলে এসেছি৷ আচমকা সেই তরুণী নীলা ঘুরে তাকালো৷ ও নির্ঘাৎ আমায় দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু আমি দেখলাম ওর দু'চোখ ঝাপসা৷

একটা শেষ চেষ্টা করে দেখলাম নীলার হয়ে৷ ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াচ্ছে সে'টা না জানা পর্যন্ত আমার দুশ্চিন্তা কাটবে না।

ছোটর সঙ্গীত

- মেজদা৷

- আবার কী হলো..।

- সব কথায় অত খেইমেই করে উত্তর দাও কেন?

- রাত্রি কত হলো সে'খেয়াল আছে? ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাস না৷ যা ভাগ।

- রাত গভীর হয়নি৷ তবে জমাট বেঁধেছে।

- এই সেরেছে৷ কাব্য ফাঁদতে এলি নাকি?

- তা ঠিক না৷ তবে গান পেয়েছে। শোনো।

- তোকে আমি ত্যাজ্যভ্রাতা করব।

- মাইরি। একটু হেমন্ত, দু'কলি মান্না৷ শুনিয়েই চলে যাব৷ পেলে তো আর চেপেচুপে রাখা যায় না।

- রাত পেরোলেই সোমবার ছোট৷ আমার অফিস, তোর কলেজ। প্লীজ।

- বেশ তো৷ এ গান শুনলে বুকে বল পাবে।

- গান না শুনিয়ে ছাড়বি না?

- তোমার মন না ভরিয়ে ছাড়ব না৷ হারমোনিয়ামটা এ'খানেই পাতি?

- আবার হারমোনিয়াম কেন৷ খালি গলাতেই তো বেশ।

- অমন দায়সারা ভাবে মিউজিক হয় না মেজদা।

- তাও ভালো আমায় তবলা বাজাতে বলিসনি।

- বলব কী করে বলো, বড়দাকে সাধ করে একটু তাল ঠুকতে বললাম৷ কান মুলে তবলা বাজেয়াপ্ত করে রেখে দিলে৷ কী ডেঞ্জারাস৷ বাবা ঠিকই বলে, বড়দা মামাদের ধাত পেয়েছি৷ রসকসহীন। ভাগ্যিস তাও সময়মত হারমোনিয়ামটা তুলে পালিয়ে আসতে পেরেছি৷ নাও, আমি মাদুর পাতছি৷ বিছানা থেকে নীচে নেমে এসো।

- হ্যাঁ রে, এই যে বাবার ধাত পেয়েছিস৷ গানের আসরটা বাবার কানের কাছে গিয়েই বসা না৷

- আরে বাবার পাশে তো মাও শুয়ে আছে। মা তো ডেফিনিটলি বাবার ধাত পায়নি৷

- শোন, আগে একটা রফি হোক বরং। হিন্দি।

- বহুত খুব। নেমে এসো।

- ছোটো৷ মনখারাপ?

- সঙ্গীত৷ সঙ্গীত আমার মনের ওপর ভর করেছে৷ এর কোনো খারাপ ভালো হয় না৷

- ছোটো৷ সুতপা তোকে রিজেক্ট করেছে?

- মেজদা। তোমার কপালে আজ সতীনাথ নাচছে। আর আড়াইশো গ্রাম মানবেন্দ্র৷ ধরি?

- ধর৷

ক্যাসিওয় নিবেদন



হাতঘড়ির ব্যাপারে আমার তেমন শখ-আহ্লাদ নেই। স্মৃতি কিছু আছে। ক্লাস এইট নাগাদ মা একটা টাইমেক্স ঘড়ি কিনে দিয়েছিল। তখন শুধু পরীক্ষার সময় ঘড়ি পরে যেতাম। কালচে সবুজ ব্যান্ড, ম্যাটম্যাটে হলদেটে ডায়াল। ডায়ালের একটা ছোট্ট খোপে তারিখ দেখা যায় - শুধু ১ থেকে ৩১য়ের মধ্যে একটা সংখ্যা; মাস বা বছর নয়। ও'টা যে আমার কী প্রিয় ছিল, পরীক্ষায় লিখতে লিখতে কতবার অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছি বাঁ হাতের কব্জির দিকে। সেকেন্ডের কাঁটা বারোরা ঘর পেরোলেই মিনিটের কাঁটায় যে সামান্য ঝাঁকুনি , সে'টা দেখে ভারি তৃপ্তি-বোধ হত। মাঝেমধ্যেই হাত থেকে খুলে রুমাল দিয়ে পুছে নিতাম। কলেজে যাওয়ার আগে উপহার পেয়েছিলাম একটা স্টিল ব্যান্ডের টাইটান ঘড়ি। ও'টায় বেশ একটা ভারিক্কি চাল ছিল। কবজিতে সে'টা আঁটসাঁট করে বাঁধা থাকতো না, সে'টাই সে স্টিল ব্যান্ডের ঘ্যাম। বছর পাঁচেক সে'টা নিয়েই দিব্যি কেটে গেছিল। এরপর বেটারহাফ একটা জবরদস্ত বিদেশী ঘড়ি দিয়েছিল, যে'টার বয়স এখন আমাদের বিয়ের থেকে মাস কয়েক বেশি। প্রমাণ সাইজের সাদা ডায়াল, সেকেন্ডের কাঁটা লাল, চামড়ার ব্যান্ড। সে ঘড়ি আমার সবচেয়ে শৌখিন সম্পত্তিগুলোর মধ্যে একটা। আজও ও'টা হাতে পরলে মনে হয় মনের মধ্যে একটু বাড়তি পালিশ যোগ হলো। ও ঘড়ি হাতে দিয়ে কোথাও দেরীতে ঢুকলে মনে হয় লজ্জায় মাথা কাটা গেল, সে ঘড়িই যেন আমায় ধমকে দেবে। অমন মখমলে জিনিস হাতে নিয়ে ব্যাকরণ ভুল করাও হয়ত ঠিক নয়, এমন তার রোয়াব। দেড়-দশক পরেও সে ঘড়ি দেমাক নিয়েই চলছে।

মাঝে বছর ছয়েক ঢুকে গেলাম ফিটনেস ট্র্যাকারে। ভালো-মন্দ নিয়ে বলার আমি কেউ নই। তবে ও জিনিসে আমার কিঞ্চিৎ উপকার হয়েছে বটে। দশ হাজার স্টেপ নিচ্ছি কিনা, যথেষ্ট ঘুমচ্ছি কিনা, হার্ট-রেট কেমন চলছে; এ'সব কতটা জরুরী কে তা বিশেষজ্ঞরাই বলবেন। তবে নিয়মিত ডেটার দিকে তাকানোয় যে'টা হয়, সচেতনতা খানিকটা হলেও বাড়ে। এ ক'বছরে হাঁটার ব্যাপারে একটা ডিসিপ্লিন আয়ত্ত করা গেছে। তা আমার ফিটনেস ট্র্যাকার সম্প্রতি খারাপ হয়ে গেল। অনেক চেষ্টা করেও সে'টাকে সারানো সম্ভব হলো না।

এরপর কী শখ উদয় হলো, একটা নতুন ঘড়ি কিনে বসলাম। একটা ডিজিটাল ঘড়ি, ফিটনেস ট্র্যাকার নয়। আচমকা মনে হলো হাঁটার অভ্যাসটা যখন দাঁড়িয়ে গেছে, তখন আর ফিটনেস ঘড়ির খুড়োর কলের কী দরকার (হয়ত এই ধারণাটা ক'দিন পরেই পালটে যাবে, কে জানে)। আরও মনে হলো, আমি কোনোদিন ডিজিটাল ঘড়ি পরিনি। সেই ছেলেবেলায় যেমন দেখতাম, পাড়ার দাদাদের হাতে; ক্যাসিওর ডিজিটাল ঘড়ি। তা'তে অ্যালার্ম দেওয়া যায়, অন্ধকারে একটা সুইচ টিপে ডায়ালে আলো ফেলা যায়। আর ও জিনিসের এমনই চাল যেন তা পরে অবলীলায় স্পেসশিপে ঢুকে পায়চারি করা যায়। নিজের হাতের টাইমেক্স ঘড়িকে কতবার বিবর্ণ মনে হয়েছে সে'সব ডিজিটাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে। যা হোক, সে শখ এইবারে পূরণ করাই যায়।

আমি কিনলাম ক্যাসিওর এফ-নাইনটি ওয়ান ডাব্লু। হাজার টাকা মত খরচ হলো। ১৯৮৯ সালে এ ঘড়ি প্রথম বাজারে ছেড়েছিল ক্যাসিও, আর এ জিনিস এখনও হট কচুরির মতই বিক্রি হচ্ছে। খোদ আমেরিকার ওয়ালমার্টে এ ঘড়ি নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে, বাজারে আসার পঁয়ত্রিশ বছর পরেও। একসময় ওবামা এই ঘড়ি হাতে দিয়েছেন। আবার ইয়ে, একসময় ওসামাও এই ঘড়ি হাতে দিয়েছেন; এ ঘড়ির ব্যাপ্তি এতটাই। গত ছ'বছরে স্মার্টঘড়ি চার্জ করার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছিল। ক্যাসিওর এই ঘড়ির ব্যাটারি নাকি বছর সাতেক চলবে। এ ব্যাপারটা ভেবে আমি মাঝেমধ্যেই হেসে উঠছি। নিজের হাসি তো নিজে সবসময় দেখা যায় না, তবে আমার ধারণা এ হাসি যথেষ্ট স্মিত। এ হাসি দেখলে বুদ্ধ আমায় পিঠ চাপড়ে দিতেন নির্ঘাত। সবচেয়ে বড় কথা, স্মার্টঘড়িতে হাজার ধরণের 'ফেসিলিটি' আছে, কিন্তু তা সবসময় চেখে দেখা হত না। অথচ এই ঘড়ির জটিল অ্যালার্ম দেওয়ার পদ্ধতিতে সড়গড় হয়ে মনে হচ্ছে কেল্লাফতে করে ফেলেছি। মাঝেমধ্যেই অ্যালার্ম সেট করছি। একটু পরে মিটিং আছে। লাগাও অ্যালার্ম। একটু পরে নেটফ্লিক্স দেখব। লাগাও অ্যালার্ম। একটু পরে ও'পাশ ফিরে শোব। লাগাও অ্যালার্ম। কিছুই ভালো লাগছে না, লাগাও অ্যালার্ম। মেজাজটা ফুরফুরে, লাগাও অ্যালার্ম। আর এ অ্যালার্ম বাজার সুমধুর পিকপিক, আহা, সঙ্গীত। আর সর্বোপরি প্রতি ঘণ্টায় একটা করে সুমিষ্ট পিক্‌, উফ্‌। কানে-প্রাণে যেন এক টুকরো স্নেহ হয়ে ঝরে পড়ে।

তা'ছাড়া এ ঘড়ি সত্যিই পালকের মত হালকা, হাতে তারকেশ্বরের সুতো বাঁধলেও তার ওজন এর চেয়ে বেশি মনে হবে। বৃষ্টিতে ভিজলে বা ঘড়ি হাতে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে পড়লেও চিন্তা নেই। বাঘা ঘড়ি অথচ কোনও বাড়তি ঘ্যাম নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ঘড়ির একটা বোতাম টিপলে একটা ফিকে হলুদ আলো জ্বলে ওঠে। সে আলো এতটাই ফিকে যে তা'তে ঘড়ির ছোট্ট স্ক্রিনের একটা কোণাও স্পষ্ট ভাবে জ্বলে ওঠে না। তবে যতবার সেই আলো জ্বালি (দিনে চোদ্দবার জ্বেলে দেখি), ততবার মনে হয়ে ছেলেবেলার পাড়ায় ফিরে গিয়ে চৌকস পাড়াতুতো-দাদাদের ডেকে দেখাই, "এই দ্যাখো দাদারা, তোমাদের মতই ডিজিটাল ঘড়ি আমার হাতে! এই দ্যাখো আলো জ্বেলেছি। এই দ্যাখো অ্যালার্ম দিয়েছি। দ্যাখো দ্যাখো"।

মোটের ওপর, এ ঘড়ির সংস্পর্শে এসে ক'দিন বড়ই তৃপ্তিতে রয়েছি।

জ্বর



আধঘণ্টার ওপর হতে চললো, অথচ বৃষ্টি ধরার কোনো নাম নেই৷ বিপ্লব বেশ ফাঁপরে পড়ে গেছে৷ রামতনু মিত্র লেনের একটা বাড়ির জানালার মাথায় নুয়ে থাকা অ্যাসবেস্টসের নীচে দাঁড়িয়ে একটানা৷ সেলসের কাজে এ অঞ্চলে এসেছিল, এখন এই মুষলধার বৃষ্টিতে আটকে গেছে৷ অবশ্য সে ব্যাচেলর মানুষ, বাড়ি ফেরার যে সবিশেষ তাড়া আছে তা নয়। তা'ছাড়া সদ্য জ্বর সেরে উঠেছে৷ এখন আর কাকভিজে হয়ে কাজ নেই৷

জানালাটা বন্ধ, নীলরঙচটা কাঠের পাল্লা আর লোহার শিক; দু'টোরই জরাজীর্ণ অবস্থা৷ ঝমঝমে বৃষ্টি সত্ত্বেও জানালার ও'পাশ থেকে নানারকম কথাবার্তা ভেসে আসছিল৷ এক মা তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে পড়াশোনা বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন৷ ইংরেজি ডিকটেশন শুনে মনে হলো ক্লাস থ্রি কি ফোর হবে৷ মেয়েটি চটপটে, মা তাকে ধরে ধরে আদর করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন৷ বেশ লাগছিল বিপ্লবের৷

ইংরেজির পর এলো অঙ্ক৷ বৃষ্টি তখন তুঙ্গে৷ পাটিগণিত। বৃষ্টিতে সময় নষ্টের ব্যাপারে বিপ্লবের খুঁতখুঁত ততক্ষণে কমে এসেছে৷ মা-মেয়েটির তালে তাল মিলিয়ে মনে মনে যোগ-বিয়োগে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে৷ আচমকা এক পুরুষকণ্ঠ এসে ছন্দে সামান্য বিঘ্ন ঘটালো৷
"মিউ, পড়তে বসেছিস বাবু? অঙ্ক করছিস? ভেরি গুড৷ সোনামেয়ে"।

বৃষ্টির ছাঁটে জামার ডান দিকটা ততক্ষণে ভিজতে শুরু করছে৷ কিন্তু বিপ্লব সবিশেষ পাত্তা দিলে না৷ বেশ লাগছে কিন্তু৷ বাচ্চা মেয়েটার ডাকনাম তা'হলে মিউ। কী সুন্দর৷ কী মিষ্টি৷ এখন নিশ্চয়ই বাপ-মা-মেয়ে মিলে আড্ডা বসবে। অঙ্কের পাশাপাশি থাকবে বাবা-মায়ের চা, মিউয়ের বোর্নভিটা৷ বাবা কি বাড়ি ফেরার পথে নিমকি-টিমকি কিছু নিয়ে এসেছেন? তবে তো আসর জমজমাট।

হুট করেই কল্পনার সুতোটা ছিঁড়ে গেল৷ বিপ্লব আচমকা শুনতে পেলে মা যেন একটু ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলছেন, "মিউ, তুমি পাশের ঘরে যাও৷ যাও বলছি৷ যাও! না একটু পড়ে নয়! এখুনি যাও। বড্ড বেশি কথা বলো তুমি। বললাম না এখুনি যাও"! মায়ের গলার হঠাৎ-দাপটে বিপ্লব নিজেই যেন কিছুটা সঙ্কুচিত হয়ে পড়লো। অস্পষ্ট মৃদু স্বরে কিছু একটা বলতে চাইছিল হয়ত মিউ, তারপর তার কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গেল৷ ঢোক গিললো বিপ্লব।

মহিলার কণ্ঠস্বর থেকে আদুর মা সরে গিয়ে কেমন একটুকরো ইস্পাত এসে ঠেকলো৷
"কতবার তোমায় বলেছি, ভরসন্ধ্যেবেলা বাড়িতে না আসতে। মিউ ঘুমোনোর আগে কেন আসো তুমি? তুমি জানো না এতে ওর কত ক্ষতি.."!

আচমকা সে পুরুষ কণ্ঠ ছোবলের মত এসে পড়লো বিপ্লবের কানে৷ " শাটাপ! হরির লুটের মত টাকা দিচ্ছি কি মাগনায়? আমার যখন খুশি আসব! সাতসকালে আসব, ভরদুপুরে আসব৷ তোর মত মেয়েমানুষের মুখচোপা আমি শুনব কেন"?

শিলাবৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে৷ কতদিন পর বিপ্লব শিলাবৃষ্টি দেখল৷ শেষ দেখেছিল পাণ্ডুয়ার বাড়িতে। মাধ্যমিক দেওয়ার পর এক দুপুরবেলায়, মা তখনও বেঁচে৷ দু'হাত ভরে শিল কুড়িয়ে ছাত থেকে নেমে এসেছিল মা, ভিজে সপসপে, একমুখ হাসি। 'দ্যাখ বাবু দ্যাখ, বরফকুচি', মায়ের হাত থেকে একটা টুকরো তুলে নিয়ে কী আনন্দই না পেয়েছিল বিপ্লব৷

বিপ্লবের জ্বরের ভয় ততক্ষণে উবে গেছে৷ একছুটে বৃষ্টি মাথায় বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল সে।

বই পড়া ক্রিকেট দেখা



অরিন্দমদার সঙ্গে কথা হচ্ছিল বই পড়া আর ক্রিকেট দেখা নিয়ে৷ সুবিধের ব্যাপার হলো, আমাদের দু'জনেরই সাহিত্যজ্ঞান আর ক্রিকেটবুদ্ধিতে আদৌ তেমন গভীরতা নেই; যে'টা আছে সে'টা হলো মুগ্ধতা। এই দু'টো ব্যাপারেই মজে যেতে পারলে যে কী প্রবল আনন্দ অনুভব করা যায়; সে'টা নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল৷ ঘরে ভাজা ভালো শিঙাড়ার ওই একটা গুণ; আড্ডিয়েরা যতই খেলো হোক না কেন, আড্ডা অতি সহজেই ধারালো হয়ে ওঠে৷

আড্ডা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে, সেই আহ্লাদ গিয়ে গড়িয়ে পড়ল ক্রিকেট বিষয়ক বইয়ে। তারপর কী'ভাবে যেন মতি নন্দী হয়ে শান্তিপ্রিয় বন্দোপাধ্যায়ে নেমে ছেলেবেলায় পড়া গল্পের বইয়ে এসে পড়লো। আমরা বলছিলাম যে একবার বই পড়া বা ক্রিকেট দেখায় ডুব দিতে পারাটা যোগব্যায়ামের মত৷ অরিন্দমদা আমার ভাগের একটা শিঙাড়া খানিকটা ভেঙে নিয়ে একটা জরুরী কথা বললে, "ক্রিকেট বা বই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বুঝলি তো। আদত ব্যাপারটা হলো ডুব দিতে পারায়৷ যে কোনো বিষয়ে এক মিনিটের জন্যও ডুব যেতে বলে যে'টা দরকার সে'টা হলো সেল্ফ-ডিসিপ্লিন৷ কোনো কিছুকে দরদ দিয়ে কদর করতে হলে এই সেল্ফ-ডিসিপ্লিন অত্যন্ত জরুরী। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া ডিসিপ্লিনে হাড় জ্বলে যায়, কিন্তু নিজের ভালো লাগাকে ডিসিপ্লিনে বেঁধে ফেলায় যে তৃপ্তি, তা তুলনাহীন"। এরপর বেহিসেবের শিঙাড়াটা পুরোটাই সাফ করে অরিন্দমদা যোগ করলে, "আরো একটা ব্যাপার আছে জানিস। রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্টের পরোয়া করলে সেই প্রোভার্বিয়াল ডুব দেওয়া যায় না৷ ইন ফ্যাক্ট, এ বই পড়ে কী হবে, ও ম্যাচ দেখে কী হবে; অত অঙ্ক করে বসলে সারাক্ষণ মনের মধ্যে খচখচ চলে। কিন্তু হাভাতের মত গা ভাসিয়ে দিতে পারাটাই হচ্ছে আদত থেরাপি"।

ম্যাটিলডার বাস রোল্ড ডাহলের কল্পনায়, কিন্তু ভদ্রলোকের লেখার গুণেই ম্যাটিলডা মেয়েটি জীবন্ত; প্রাণোচ্ছল। ছোট্ট ম্যাটিলডার জীবন না-পাওয়ায় ভরপুর অথচ সে'সব না-পাওয়া ছাপিয়ে ম্যাটিলডা আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে ডিকেন্সে৷ ম্যাটিলিডা জিনিয়াস বা সুপারগার্ল; বইয়ের মূল কথা সে'টা নয়। দু:খে জেরবার না হয়ে পুঁচকে একটা মেয়ে ডিকেন্সে ডুব দিয়ে আনন্দ খুঁজে নিচ্ছে; আসল রূপকথা রয়েছে সেইখানে। অরিন্দমদার কথা শুনে মনে হলো অতটুকু মেয়ে ইয়াব্বড় সব বই পড়তে পারছে; সে'টা অবাক কাণ্ড বটে কিন্তু ম্যাজিক নয়৷ ম্যাজিক হলো ম্যাটিলডা এই যে মিসেস হ্যাভিশ্যাম, এস্টেলা আর পিপের জগতে হারিয়ে গিয়ে আনন্দ পাচ্ছে, সেই ব্যাপারটায়। আবার আহমেদনগর কেল্লায় বন্দী থেকে নেহেরু যতটুকু লেখালিখি করেছেন, সে'গুলো পড়েও স্পষ্ট যে ম্যাটিলডার মতই ভদ্রলোক পড়াশোনার ডিসিপ্লিনে ডুব দিয়ে নিজেকে মজবুত করছেন। সেই পড়া এবং লেখা কতটা ভালো এবং কতটা মন্দ হলো, সে হিসেবে না গিয়ে প্রসেসে গা ভাসাচ্ছেন।

আমি বা অরিন্দমদা ম্যাটিলডা বা জহরলালের নখের যোগ্য নই, তবে সামান্য গা-ভাসানোর সুযোগ আমাদেরও আছে, সে আনন্দ কম কীসে। সে আনন্দেই সে'দিন সেকেন্ড রাউন্ড শিঙাড়া ভাজতে গেছিলাম হয়ত।