Saturday, September 24, 2022

পাপাইদা আর বিশ্বাসঘাতক



সে'কদ্দিন আগের কথা।

সে'দিন পাপাইদা বসেছিল মেঝের ওপর পাতা মাদুরে। পাশবালিশে হেলান দিয়ে। দু'বছরের মাথায় উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ওর রোয়াব খুব বেড়ে গেছিল। বকাবকি করার সময় ইয়াব্বড় সব ইংরেজি শব্দ আউড়াত। খবরের কাগজ ঘেঁটে পলিটিকাল নিউজ পড়ত। ওর মেজকার দামী জিলেটের রেজার চুরি করতে গিয়ে দু'বার গাঁট্টাও খেয়ে ফেলেছিল। ফুলটসে বোল্ড হওয়ার পর হাওয়ার ডিরেকশন আর টেনিসবলের 'টেকনিকাল গ্যাপ' নিয়ে গা-কাঁপানো লেকচার ঝাড়ত। মোটের ওপর, পাপাইদাকে একটু বাড়তি সমীহ করতে শুরু করেছিলাম। এই যেমন একদিন বাবার পকেট থেকে পড়ে যাওয়া পঞ্চাশ টাকার নোটটাকে খামোখা পকেটে ফেরত না দিয়ে সোজা চপের দোকানে গেলাম, কিন্তু পাপাইদার প্রতি প্রবল সমীহ ব্যাপারটা মাথায় রেখে আর ওকে বেগুনিতে ভাগ বসানোর জন্য ডাকলাম না।

যা হোক, সেই দুপুরে পাপাইদার চিলেকোঠার চেম্বারে না এসে উপায় ছিল না। আমি একটা বেতের মোড়ায় লেতকে বসেছিলাম। আড়াই মিনিট পাপাইদা চুপচাপ সিলিংয়ের তাকিয়েছিল, মাঝেমধ্যে বলছিল "কোয়াইট ইনক্রেডিবল"। খানিকক্ষণ পর পাশবালিশ সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল পাপাইদা। 

- ভুতো, আর ইউ শিওর?

- আমি নিজের চোখে দেখে এলাম।

- বিট্টা আর মৌ?

- তবে আর বলছি কী।

- পাশাপাশি? 

- একদম। 

- হয়ত টিউশনি যাচ্ছিল, ওদের সাবজেক্ট তো একই। 

- কাঁধে ব্যাগ ছিল না। আর...। 

- আর কী? খুলে বল্‌ ভুতো। 

- মৌদি শা...শাড়ি পরে...আর বিট্টাদা পাঞ্জাবি...।

- ও মাই গড।

- ইয়ে, পাপাইদা। শাড়ি আর পাঞ্জাবি। ম্যাচিং।

- ম্যাচিং? ডিড ইউ সে ম্যাচিং? হোলি কাউ! দিস ইজ ডিসগাস্টিং। বিট্টাটা না হয় ইরেস্পন্সিবল লোফার ছেলে একটা। মৌ কী করে এমন শেমলেস হতে পারল...।

- ইয়ে, বাবা কিন্তু বলে বিট্টাদার মত ছেলে হয়না। আইআইটিতে পড়ছে, ভদ্র, নম্র। দুর্দান্ত টেনিস খেলে...।

- প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড, তোর বাবা একটা সুপারগাম্বাট। সামান্য চাঁদা চাইতে গেলে তো হাজার রকমের টালবাহানা শুনতে হয়। কত জ্ঞান! উফ! পরীক্ষা সামনে এখন পুজো পুজো করে নাচলে হবে কেন। ইনফ্লেশনের বাজারে পুজোয় এত বাড়াবাড়ি ভালো না। এট সেটেরা। এট সেটেরা। সে কত রকমের ফিচলেমি। বিট্টার মত মেনিমুখো ছেলেরা যে সোসাইটির পক্ষে কতটা টক্সিক, সে'টা বোঝার মত ইন্টেলিজেন্স তোর বাবার নেই।   

- যাক গে, আমি জানিয়ে গেলাম। 

- পাড়ার একটা রেস্পন্সিবল রেসিডেন্ট হিসেবে এই মরাল ডিগ্রেডেশন আমায় রুখতে হবে।

- মরাল কী?

- সে'সব বোঝার বয়স তোর হয়নি। 

- বা রে, তুমিই না বলতে, তোমার স্বপ্ন মৌদিকে সাইকেলে বসিয়ে পুজোয় ঘোরার? বিট্টাদা তো শুধু পাশাপাশি হেঁটেইছে। 

- সবে মাধ্যমিক পাস দিয়েছিস। সব ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করিস কোন সাহসে ভুতো?

- যাব্বাবা। ইনফর্মেশনটা দেওয়াই দেখছি ভুল হয়েছে। বেশ, আমি আসি। খবরটা যখন শেয়ার করা হয়েই গেছে...।

- এই ভুতো। কুড়িটা টাকা হবে রে?

- টাকা? টাকা আমার কাছে কই। 

- তোর হাতে কাঁচাটাকা এসেছে সে খবর আমি রাখিনা ভেবেছিস? পরশু তুই শ্যামলদার দোকানে গিয়ে ছ'পিস বেগুনী খাসনি? একা একা?

- ওই, না, মানে হয়েছিল কী...।

- শাটাপ! গোটা পাড়াটা ট্রেটারে ভরে গেল। 

- তুমি বেগুনীর খবরে কনসেন্ট্রেট করলে, এ'দিনে শাড়ি পাঞ্জাবি ম্যাচিং হয়ে গেল।

- এ মায়া প্রপঞ্চময়।

আচমকা বেগুনীর উল্লেখে সত্যিই কেমন হয়ে গেছিল পাপাইদা। খটখট করে ইংরেজি চাল দেওয়া বন্ধ হয়েছিল সে'দিন থেকেই।

সে'কতবছর আগেকার কথা। 

আজ সন্ধেবেলা পাপাইদার দিল্লীর ফ্ল্যাটবাড়িতে চ্যালা মাছ ভাজা খেতে খেতে খোশ গল্প জমেছিল। পাপাইদাই ভাজছিল আর রান্নাঘর থেকে মাঝেমধ্যে এসে প্লেটে ঢেলে যাচ্ছিল। মৌদি ওদের হিমাচল ঘুরে আসার ছবি দেখাচ্ছিল। পাপাইদার ছেলেটা মহাদুরন্ত এবং হাইলি ফচকে হয়েছে। ওর সঙ্গেও দিব্যি গল্পআড্ডা জমে যায়। পাপাইদার আমায় ট্রেটার বলার গল্প শুনে মৌদি বললে ছেলেবেলার সমস্ত মার্কামারা ট্রেটারদের প্রতি নাকি পাপাইদার মায়া অসীম। 

- কী'রকম মৌদি?পাপাইদা আর কোন ট্রেটারকে আগলে রেখেছে?

- কাল তো মহালয়া। সকাল সকাল চলে আয়। নিজের চোখে দেখতে পাবি। তুইও কিন্তু লাঞ্চ করে ফেরত যাস। বাড়ি থেকে এদ্দূরে মহালয়ার দিন একা থাকবি কেন।

- সে আসা যেতেই পারে। কিন্তু কালকেও কোনও ট্রেটার আসছে নাকি?

- বিট্টা।

- বিট্টাদা?

- সে দিল্লীতেই থাকে। এই সে'দিনই আমরা জানতে পারলাম। আইএনএ মার্কেটে বাজার করতে গিয়ে দেখা। পাপাইতো বিট্টাকে জড়িয়ে ধরে নেমন্তন্ন করে একাকার কাণ্ড। বিট্টা নিজেই হতবাক। উফ, তোর পাপাইদা পারেও বটে।

- পাপাইদা সত্যিই অদ্ভুত। আমার বাবাও ওর দু'চোখের বিষ ছিল। আজকাল মাসে একবার আমার বাবাকে ফোন করে খুব খাতির করে। বাবাও দেখি আজকাল পাপাইদা বলতে অজ্ঞান।

- তবে বিট্টাকে কিন্তু ঠিক সাদা মনে ডাকেনি তোর পাপাইদা।

- কী'রকম?

- বিট্টাকে নেমন্তন্ন করেই কাপড়জামার দোকানে ছুটেছিল। সেই সন্ধেবেলাই। আমায় একটা নতুন শাড়ি কিনে দিল, আর নিজের জন্য কিনল ম্যাচিং পাঞ্জাবি। কাল বিট্টা এলে আমরা সে'টাই পরছি। 

- সত্যিই, পাপাইদার জবাব নেই।  

Thursday, September 22, 2022

রিল্যাক্সিং



- বুঝলে দত্ত, এ'বার পুজোটা ভাবছি টোটালি রিল্যাক্স করে কাটাব।

- আপনি তো লাকি চ্যাপ দাদা, টানা পাঁচদিন ছুটি? তা, এ'বারেও কি দার্জিলিং? নাকি কেরলটেরল কিছু।

- ঘোরাঘুরি যে কতটা ট্যাক্সিং...উফ। টিকিট বুক করো। প্যাকিং করো, আনপ্যাকিং করো, রিপ্যাকিং করো, রিআনপ্যাকিং করো। গাড়ি ভাড়া করো। সাইটসিয়িংয়ের ছক কষো। প্ল্যান এ, প্ল্যান ব, প্ল্যান সি। উফ, ভাবতেই পালসরেট বেড়ে যাচ্ছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। লেবুসরবত খেতে হবে এ'বার।

- ও, তা'হলে এ'বার পুজোয় মণ্ডপ সাফারি। হ্যাঁ, সেই ভালো। হাঙ্গামা কম। ঠাকুর দ্যাখা, খাওয়াদাওয়া; হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফুর্তি। 

- তুমি দুর্গাপুজো দেখেছ কোনোদিন দত্ত? হাবভাব দেখে তো মনে হয় তুমি বলিভিয়ার মানুষ। উইকিপিডিয়া পড়ে দুর্গাপুজোর কথা জেনেছ।

- সে কী!

- ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে কী পরিমাণ স্ট্যামিনা দরকার হয়,সে'টা তুমি জানো না? পায়ের মাসল এক্কেবারে লোহার মত হতে হবে। রেস্টুরেন্টে আড়াইঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য দরকার অ্যালুমিনিয়ামের কোমর। আর ঘাম, ধুলো, ইত্যাদি হজম করার ইনফাইনাইট ক্যাপাসিটি।  ঠাকুর দেখে রিল্যাক্স করা আর ঘামাচিতে বিটনুন মালিশ করা একই ব্যাপার।

- পুজোর পাঁচদিন ঘরের মধ্যে বসে? বিছানায় লম্বা হয় গোটা হপ্তা? শুধু খাওয়া শোওয়া আর বই?

- তুমি ব্যাচেলর মানুষ ভাই দত্ত। ব্যথা কী বুঝবে। গিন্নী আর আমার গোটা বছর অফিস, দৌড়ঝাঁপ হুড়মুড়; ও'টাই আমাদের ন্যাচরাল স্টেট অফ ইকুইলিব্রিয়াম। হুট করে পাঁচদিনের ছুটিতে বাড়ি বসে থাকতে গেলে বস্তাবস্তা কাজ এসে পড়বে ভাই। গিন্নী দেখবে বাথরুমের মেঝে রিপেয়ার করা দরকার, আমি দেখব বাড়ির দেওয়ালে এক পোচ রঙ না পড়লেই নয়। মোটকথা বাড়িতে থাকলেই কাজের বোঝা। আর সেই কাজের বোঝার জর্জরিত হয়ে দু'জনের খিটিরমিটির।

- আপনার মতলবটা কী বলুন তো? পুজোয় রিল্যাক্স করবেনটা কী'ভাবে?

- পুজোর পাঁচদিনই অফিস করছি ভাইটি। সক্কালসক্কাল হাজিরা। সন্ধেবেলা রিটার্ন। মাঝখানে ফাঁকা অফিসে আমি অ্যালেক্সান্ডার সেলকার্ক। নিজের ইচ্ছেমত প্যান্ট্রিতে গিয়ে কফি অমলেট বানাবো। ফাইল ক্লিয়ার করব। অফিসে লোক কম থাকবে, দিব্যি গান শুনতে শুনতে হেলেদুলে কাজকর্ম করা যাবে। এক্কেবারে স্পা ফর সোল, টানা পাঁচদিন।

- দাদা, আপনি সোশিওপ্যাথ।

- মন্দ লোকে কত কী রটায়, সে'সবে কান দিও না। কেমন?

Thursday, September 15, 2022

ডিয়ার বেহালা মেট্রো



আজ বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে৷ এ'খবরটা কী ভাবে আত্মস্থ করব সে'টা বুঝে উঠতে পারছিনা৷ গত বেশ কিছু বছর ধরে মনের মধ্যে মেট্রো-পিলারগুলো সম্বন্ধে একটা শ্যামনগরের মেজোপিসেমশাই গোছের রেস্পেক্ট তৈরি হয়েছিল। গোটা সন্ধ্যে ড্রয়িংরুমের সোফা আলো করে বসে থাকা আর মাঝেমধ্যে ঝিমোনা ছাড়া ছাড়া সে পিসের তেমন কোনও কাজ নেই। তাঁর নিশ্চুপ উপস্থিতিটাই সে ড্রয়িং রুমের লক্ষ্মীশ্রী৷   

যা হোক, বেহালা মেট্রোপিলারের উপকারিতা সম্বন্ধে স্কুলের ছেলেমেয়েরা সবে এস্যে লিখতে শুরু করেছিল৷ বেহালায় যা ভীড়, সুট করে চাইলেই তো আর পিরামিড বানানো সম্ভব নয়৷ কাজেই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে আজ থেকে হাজার বছর পর যখন অদরকারি পিলারই বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ড করবে, তখন সবাই "বেহালা স্টাইল অফ আর্কিটেকচার" নিয়ে দুর্বোধ্য সব বইটই লিখে ফেলবে৷ তারপর ধরুন মেট্রো ট্রেন চালানোর মত অদরকারী ব্যাপার নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে দিব্যি সে মেট্রোলাইনের তলে তলে বাগান তৈরি হচ্ছিল, হাইলি কালচারাল মুর্তিটুর্তি বসছিল৷ ট্র‍্যাফিক জ্যামে গলদঘর্ম হতে হতে সে'সব ডিজাইনার পিলারদের দিকে তাকিয়ে থাকার যে মেডিটেটিভ এফেক্ট; সে'টা সত্যিই তুরীয়। তারপর ধরুন ওই দুর্গাপুজো কালীপুজো এলে সেই পিলারের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া টুনিবাল্বের চাদর; স্পেক্টাকুলার। এ'সবের মধ্যিখানে মেট্রোফেট্রো চালানোর যে কোনও দরকার থাকতে পারে, সে'টা আর মনেই ছিলনা৷ 

সবচেয়ে যে'টা বড় ব্যাপার, বাঙালির রিয়েলএস্টেট সেন্টিমেন্টের জন্য এ'টা একটা বড় ধাক্কা৷ কতগুলো প্রজন্ম "আজ ইনভেস্ট কর, কাল মেট্রো হবে, ইনভেস্টমেন্ট সতেরোশো গুণ হবে" বলে ঝালমুড়ি বা হজমোলা লজেন্সের মত ফ্ল্যাটবাড়ি বেচে গেল৷ কত হাজার মানুষকে সামান্য সুড়সুড়ি দিলেই মন্ত্রের মত শুনতে পাওয়া যাবে "পিপিএফে রাখা মানে তো পুওর রিটার্ন৷ তাই সব তুলে লাগিয়ে দিয়েছি বেহালা মেট্রো ঘেঁষা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টে৷ এরপর ইএমআই৷ আজ থেকে বাহাত্তর বছর যখন মেট্রো চলবে, তখন ম্যানহ্যাটন লেভেলের দাম পাব"।

এই মেট্রো-হবে-হবে-হবে-হবে মার্কা ইমোশনাল ইকুলিব্রিয়াম; এর তুলনা হয়না৷ ওই, পুজো আসছে আসছেই ভালো৷ পুজো এসে পড়লেই সোজা জ্ঞান ফেরে ওই দশমীর সন্ধ্যের "যাহ শাল"য়৷ এই বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রানের মধ্যেও কেমন যেন সেই দশমীর সন্ধ্যের ফ্লেভার। 

ভালো ঠেকছে না, বুঝলেন৷ আজ বাদে কাল মেট্রো চালু হবে, পরশু রাস্তা চওড়া হবে, তরশু কেউ বলবে পার্কে চুমু খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না৷ কিছুই বলা যাচ্ছেনা৷ যাকগে৷ একদিন জোকা টু পার্ক স্ট্রীটও জুড়ে যাবে, এই আশ্বাসটা চাগিয়ে এ'বার আর এক রাউন্ড ফ্ল্যাট বেচাকেনায় মন দেওয়া যাক৷ 

মনে রাখবেন, হবে-হবে ব্যাপারটাই ভালো৷ হয়ে গেলেই সব শেষ।

Friday, September 2, 2022

আমার খাবারদাবার



আমি (এবং আমরা অনেকে) খাবারদাবার নিয়েই লিখি এত লিখি কেন? কারণ আমি (এবং সম্ভবত আমরা অনেকে) লিখিয়ে নই। যা নিয়ে গালগল্প করি, যে ভাষায় হে-হে-হো-হো গুলতানি চালাই; সে'গুলো টুকেবুকে রাখা ছাড়া আমার গতি নেই। আর আমার বেশির ভাগ চিন্তাভাবনা-গপ্প জুড়েই খাওয়াদাওয়া। অথচ আমি আর যাই হোক, খাদ্য-বিশারদ নই। খাওয়ার ইতিহাস সম্বন্ধে আগ্রহ থাকলেও আমি আদৌ তেমন ওয়াকিবহাল নই। সবচেয়ে বড় কথা, আমার খাওয়াদাওয়ার রুটিন শুধু সাদামাটা নয়, রীতিমত একঘেয়ে। আমার ভালোবাসার ঘ্যানঘ্যান শুধুমাত্র ওই পাঁচ-সাতটা পদের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। এই বিরিয়ানি নিয়ে আহ্লাদ আর ওই রোল নিয়ে লম্ফঝম্প, এই ইলিশের দাম নিয়ে হাহাকার আর  মাংস কষা নিয়ে রোমান্স। আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল; যা কিছু একবার ভালো লেগেছে, সে গণ্ডীর বাইরে আর পা রাখতে ইচ্ছে করে না। চাইনিজ দোকানে গেলে ওই চাউমিন আর চিলি চিকেনের বাইরে ভাবতে পারিনা। ঘ্যামস্য-ঘ্যাম জায়গার মোমো ম্যাটম্যাটে লাগে, এ'দিকে মনের মধ্যে শুধু ওই অল্পবয়সের রবীন্দ্রসদন মেট্রোর কাছে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের প্লেট-বাটিতে মোমো আর জোলো স্যুপের কথা ভেবে হাহাকার। সাহেবি-শখে কেনা কনভেকশন ওভেন-ফোভেন জলে পড়ে আছে; আমার শুধু ফিরে ফিরে যাওয়া ওই কড়াইয়ে কষানো মুর্গিতে বা সর্ষের তেলেভাজা ডিমের মামলেটে। ইউটিউব ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া দুরন্ত সব হাইওয়ের দোকান খুঁজে হানা দিচ্ছি। কয়েকশো মাইল পাড়ি দিয়ে সে'খানে পৌঁছে খুঁজছি কি? রুটি, ডিম-তরকা আর বিটনুন-চাটমশলা ছড়ানো কাঁচা পেঁয়াজের স্যালাড। ইয়ালম্বা দুরন্ত তন্দুরি মেনু; অথচ আমার দৌড় ওই রুমালি রুটির পাশে চিকেন তন্দুরি। নতুন কিছু, রুটিনের বাইরে কিছু, এক্সটিক কিছু; ভালো কি লাগে না? আলবাত লাগে। তবে যে ভালো লাগায় ধৈর্য বড় কম।

সেই একঘেয়ে খাবারদাবার নিয়ে এত মারাত্মক গদগদ হয়ে দিস্তে দিস্তে বাজে লেখা জমানোর কী মানে?বলি। ও লেখা তো খাবারদাবার নিয়ে আদৌ লেখা নয়। ও'গুলো হচ্ছে সুখদুঃখের ফর্দ। ধরুন কলেজের প্রথম দিন। কলকাতা শহরে সেই প্রথম একা; বৌবাজার থেকে হিন্দু হস্টেল হেঁটে যাওয়ার পথে, মেডিকাল কলেজের উলটো দিকে দাঁড়িয়ে একটা ডিমপাউরুটি কিনে খেয়েছিলাম। একা। মফস্বলের ছেলে সেই প্রথম কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে নিজের পকেট থেকে বের করা বাবার টাকায় সেই মহার্ঘ ডিমরুটি কিনে খেয়েছিল। কলকাতা শহরে নেওয়া ওটাই সম্ভবত আমার প্রথম 'ডিসিশন'। তখন সঙ্গে মোবাইল থাকত না, থাকলে জবরদস্ত ছবি তুলে রাখতাম। তখন ব্লগফ্লগও ছিল না। থাকলে সে ডিম-রুটি নিয়ে অন্তত হাজার শব্দ লিখে রাখতাম (যে'ভাবে ন্যাংচাদা কাঁচকলাকে নিয়ে পদ্যটদ্য করেছিল আর কী)। লেখায় ডিমরুটি থাকত বটে, কিন্তু তার আড়ালে থাকত আমার কলকাতাকে চেনার বুক-ঢিপঢিপ, সদ্য বাড়ি ছেড়ে আসার মনখারাপ আর হঠাৎ লায়েক হয়ে ওঠার এক মারকাটারি অনুভূতি। এমন ভাবেই; কত বিরিয়ানি-বিষয়ক লাফালাফি আদতে শুধুই পুরনো আড্ডা-বন্ধু ফেলে আসার মনকেমন। কত চাউমিনের স্টল নিয়ে লেখা থিসিস আদতে শুধুই ছোটবেলার স্মৃতি ঠিকঠাক ভাবে সাজিয়ে লিখতে না পারার অক্ষমতা। কত মাংসকষার সুবাস আদতে শুধুই গতানুগতিক সংসার আঁকড়ে পড়ে থাকার তৃপ্তিটুকুর ব্যাখ্যা।

আর, এই যেমন আজ।
অফিসের মন কষাকষি। প্রবল বিরক্তি। "সব গ্যালো বুঝি" মধ্যবিত্ত দুশ্চিন্তার গ্রাফে আচমকা স্পাইক। আচমকা কলার টেনে ধরা প্রবল ক্লান্তি। সুট করে মনে হয়, "ধ্যাচ্ছাই, কোনও কিছুই কিছু নয়। সব গাঁজা"। শরীর নয়ডায় পড়ে অথচ মন হিমালয়ে গিয়ে লেতকে পড়ে। এমন সময় দেখা গেল ডিনার টেবিলে দুপুরের ডাল, মাইক্রোওয়েভে গরম করা। ঢিপি করা পছন্দসই চালের গরম ভাত, পাশে একজোড়া ভালোমানুষ টাইপের বেগুনভাজা। আর সদ্য চাটু থেকে নামানো; সর্ষের তেলে ভাজা; জোড়া ডিমের একটা সুরসিক পাত-আলো-করা নরম মামলেট।  ব্যাস, হিমালয় ত্যাগ করে মনে ছুট্টে ফেরত এলো বডিতে; তুলসী চক্কোত্তির কণ্ঠস্বর বেজে উঠল বুকের ভিতর - "আরে হল হল, আর কত। এইত্তো আমি। এসেছি তো। এ'বারে দেখো, সব সামাল দেওয়া যাবে'খন। কেমন? কই গো, এ'বার গামছা আর সর্ষের তেলের বাটিটা দাও দেখি। দু'মগ জল ঢেলে আসি"। কাজেই মামলেট-ভাতের ছবি-গল্প খাওয়ার গল্প তো নয়, ও গল্প একান্তই আমার। সে গল্প লেখায় ফেলনা হলেও, আমার জন্য অমূল্য। ব্লগের খাবারদাবার নিয়ে যত লেখা; অতটুকুই আমার আড়াল থেকে মুচকি হাসা বায়োগ্রাফি। বাকি সমস্তই দ্য গ্রেট বাতেলা এক্সারসাইজ।