Tuesday, January 7, 2020

মামার বাড়ি


- এই দ্যাখ...।

- মামা...মামা গো..এ'টা?...মানে...মামা...!

- দো'তলা। দেড়হাজার স্কোয়্যারফুট নীচে, দেড়হাজার স্কোয়্যার ফুট ওপরে। মার্বেল ফ্লোরিং। দু'টো মডিউলার কিচেন। টোটাল চারটে বাথরুম, একটায় আবার নীল রঙের বাথটাব। দু'টো চমৎকার ব্যালকনি..।

- মামা...কিন্তু এ'টা তো...।

- সাউথ ওপেন রে। আহা, বড় ব্যালকনিতে বসলে চানাচুরের স্বাদ ডবল হয়ে যায়, মাদুরে পশমের ছোঁয়া পাওয়া যায়..।

- কিন্তু মামা, এ যে...।

- জানি। এত সস্তায় এমন দাঁও মারতে পারব ভাবিনি। 

- তুমি কিনে নিয়েছ? 

- নয়ত কী? শ্যামনগরের জমিটা বেচে দিলাম....।  

- তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে মামা?

- জিনিয়াসকে পাগল বলার বদ অভ্যাসটা সমাজ আর ত্যাগ করতে পারবে বলে মনে হয়না রে ভাগ্নে। 

- মামী জানে?

- মামী কি এমন ব্যালকনি মূল্য বুঝবে রে? নাহ্।  শ্যামনগরের জমিতে টমেটো চাষ করার বিটকেল স্বপ্ন নিয়েই সে মরল। ধেত্তেরি। 

- মামা গো...কিন্তু তাই বলে এই...।

- তবে বগলাকে ক্রেডিট না দিলে পাপ হবে৷ রাতে তান্ত্রিক হলে কী হবে, দিনেদুপুরে ওর মত করিতকর্মা রিয়েলএস্টেট এজেন্ট মেলা ভার।  খবরটা চোরাগোপ্তা সেই জোগাড় করে এনেছিল। ইনফ্যাক্ট,রাতারাতি শ্যামনগরের জমি বেচার ব্যবস্থাও সেই করে দিয়েছে।  একটু সস্তায় ছাড়তে হল বটে, তা যাকগে। নয়ত এই প্রাসাদটা হাতছাড়া হয়ে যেত রে।

- তোমার মাথায় পোকা পড়েছে না চোখে ঠুলি?

- শাট আপ। কলেজে গিয়ে তোর বড় চ্যাটাংচ্যাটাং কথা হয়েছে ভাগ্নে। খুব লায়েক হয়েছিস, তাই না? দু'পাতা ইংরেজি পড়ার কনফিডেন্সে মামাকে ইনসাল্ট করা? এমন হাইক্লাস বাড়ি আশপাশের পাঁচটা পাড়া ঘুরে একটাও পাবি রে ইডিয়ট? মানছি এখন আশেপাশে জঙ্গল রয়েছে। কিন্তু বগলা মিউনিসিপালিটির ফাইল ঘেঁটে গোপন খবর বের করে এনেছে। ওই দক্ষিণের দিকে যে জঙ্গল দেখছিস? ও'টা সাফ করে শপিং মল বসবে; চারতলা, সিনেমা হল সহ। উত্তরের দিকে আগাছা সাফ করে তৈরি হবে মাল্টিস্পেশ্যালিটি হসপিটাল। পূর্বে থাকবে চিল্ড্রেন্স পার্ক আর পশ্চিমে একটা পেল্লায় জলাশয় না বে অফ বেঙ্গল কিছু একটা বসাবে। আরে গোটা রাজারহাট এসে বসবে এখানে...।

- বগলার মত একজন ফোরটুয়েন্টির কথা বিশ্বাস করে শ্যামবাজারের জমি জলে দিলে মামা?

- তবে রে রাস্কেল?

- এ'টা দোতলা বাড়ি? চোখ কচলে দেখো দেখি।  এ'টা যে বগলার মগজধোলাই যন্ত্র, জঙ্গলের মধ্যে এনে লুকিয়ে রেখেছে। সে ব্যাটা তোমায় এ যন্ত্রের মধ্যে নিয়ে গেছিল বুঝি?

- তুই একটা আস্ত শয়তান। গুরুজনের সঙ্গে ওপরচালাকি? আমি তোর নামে মামলা করব, গুণ্ডা লাগাব তোর পিছনে।  এ'টা যন্ত্র? স্পষ্ট দেখতে পারছি দোতলা বাড়ি..।

- উফ মামা...। এটা বাড়ি?

- আলবাত বাড়ি। দোতলা প্রাসাদ। ওই যে, ওইদিকে দ্যাখ বাড়ির দেওয়ালের গায়ে মার্বেল ফলকে লেখা আছে বাড়ি নাম..।

- বাড়ির নাম...?

- ভালো করে দেখ। স্পষ্ট লেখা আছে; "ডেমোক্রেসি"।

Monday, January 6, 2020

পথের দাবী ও ভারতী

 ২০১৯ শেষ করেছি আর একটা রী-রীড দিয়ে। "পথের দাবী" ফের পড়ার মূল কারণ ছিল গোরার পাশাপাশি পথের দাবীর অপূর্ব আর সব্যসাচীকে যাচাই করে নেওয়া। তা দেখা গেল সনাতন ভারত সম্বন্ধে কিছু আলগা ধারণা ছাড়া অপূর্বের সঙ্গে গোরার বাস্তবিকই কোনো যোগাযোগ নেই। 

ইদানীং একটা বড় শিক্ষা আত্মস্থ করার চেষ্টা করছি; কন্টেম্পোরারি সামাজিক ফিল্টারে বসিয়ে ঐতিহাসিক চরিত্রদের বিচার করার দুরূহ কাজটা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই উচিৎ। কাজটা সহজ নয়, সবসময় সম্ভবও নয়; তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই৷ গোরা আর অপূর্বর মধ্যে বেশ কয়েক দশকের তফাৎ রয়েছে; সে অর্থে একই ছাঁচে ফেলে তাদের ধর্ম-বিশ্বাসের তুলনা চলে না। তাছাড়া চারিত্রিক দৃঢ়তায় গোরা পালঙ্ক হলে অপূর্ব হল ক্যাম্পখাট। অপূর্বর ধর্ম বিশ্বাস এবং আচারবিচারে নিষ্ঠা তলোয়ারহীন নিধিরামের হাতের ঢালের সঙ্গে তুলনীয় কিন্তু গোরার বিশ্বাসের আগুনে লোহা গলানো যায়। তবে গোরার সে বিশ্বাস যে নেহাৎ  অন্ধ এবং নিরেট নয় তা প্রমাণ করতে এক প্রকাণ্ড নভেল ফাঁদতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে।

 বরং গোরা আর সব্যসাচীর তুলনা করে চমৎকৃত হতে হয়৷ কোনো নির্দিষ্ট মতবাদের গণ্ডীর মধ্যে থেকে  ভারতবর্ষকে একটা 'কনক্রিট ডেফিনিশনে' বাঁধতে যাওয়া যে কী অদরকারী; তা এই দুজনের মগজ ঘেঁটে দেখলেই মালুম হয়। নওরোজির ভারত, ভগত সিংহের ভারত, রামমোহনের ভারত আর মোহনদাসের ভারত; কোনোটাই মিথ্যে নয় এবং প্রত্যেকটা ভারতকেই অল্পবিস্তর বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করাটা দরকারী। গোরার ভারতবর্ষ এবং সব্যসাচীর ভারতবর্ষ; দুটোর কোনোটাই হয়ত পুরোপুরি আমার ভারতবর্ষ নয় কিন্তু তাঁদের চোখ দিয়ে ভারতবর্ষের ইতিহাসের দিকে তাকাতে সমীহ-বোধ হয় বৈকি। বিশ্বাস, দেশাত্মবোধ ও মতবাদের দৃঢ়তায় দুজনেই ইস্পাতের ফলার মত ধারালো কিন্তু দুজনেই কিছুটা হলেও ভালোবাসার নরমকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁদের সেই ভালোবাসার স্বীকারোক্তির মূলে অবশ্য 'শেষের কবিতা' মার্কা প্রেম নেই। গোরার ক্ষেত্রে সে ভালোবাসার উৎস হল তাঁর প্রাণের বন্ধু বিনয়। সব্যসাচীর ক্ষেত্রে তাঁর সহকর্মী ও নিজের ছোটবোনটির মত প্রিয় ভারতী। 

স্বীকার করে নিই যে পাঠক হিসেবে; গোরা উপন্যাসের বিনয় আর পথের দাবীর ভারতীকেই আমার সবচেয়ে 'ইন্ট্রিগিং' দুটি চরিত্র বলে মনে হয়েছে। দুজনেই সৎ কিন্তু কেউই অবিচল নন; তাঁরা ভালোবাসাকে মতাদর্শের শূলে চাপাতে সর্বদা ব্যগ্র হয়ে বসে নেই। গোরার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর উজ্জ্বল আইডিয়ালিজম বিনয়কে ইন্সপায়্যার করছে কিন্তু তাঁকে অন্ধ রোবট করে তুলছে না। ঠিক যেমন সব্যসাচীর মতাদর্শ ও আত্মত্যাগে মুগ্ধ হয়েও ভারতী তাঁর 'মেথড'কে প্রশ্ন করতে কসুর করছেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিনয় এবং ভারতী কখনোই নিজেদের নিরেট কনফিডেন্সে মুড়ে রাখছেন না। তাঁরা ভাঙছেন,  মুষড়ে পড়ছেন, তর্ক করছেন, অভিমান করছেন, জড়িয়ে ধরছেন, প্রয়োজনে ক্ষমাও চাইছেন কিন্তু কিছুতেই মানুষের ভালোবাসাকে অবজ্ঞা করছেন না। 

গোরা এবং সব্যসাচী সত্যিই নায়ক, তাঁদের সুপারহিরো বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু আমায় সবচেয়ে বেশি টেনেছে বিনয় এবং ভারতীর চরিত্র। এবং পুরনো বই "রী-রীড"-এর অভ্যাসটা না থাকলে, এ'দুজনকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারতাম কি?

Sunday, January 5, 2020

বিটকেল ছাত্রের দল

শিক্ষা এবং তারুণ্যর মিশেল বড় বিরক্তিকর। ইতিহাস নির্মমভাবে বারবার প্রমাণ করেছে যে ধান্দাবাজির স্বর্ণযুগে বারবার আলকাতরা হয়ে ঝরে পড়েছে এই আপদ ছাত্ররা। যুগে যুগে ধান্দাশ্রেষ্ঠদের অনাবিল স্বপ্নে রাক্ষসের মত ধেয়ে এসেছে এই বিটকেল ছাত্ররা। রাক্ষুসে এই ছাত্রছাত্রীগুলোর নখের ডগায় যুক্তির বিষ আর তাদের দাঁতে প্রশ্নের ধার ; এরা মেগা-ডেঞ্জারাস। অদরকারী মানুষজনের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে নির্ভীক ভাজা-মাছ-উল্টোতে-না-পারা ধান্দাবাবুরা দু'দণ্ড আয়েশ করবেন, রাক্ষসগুলোর জ্বালায় তারও কি ছাই উপায় আছে?

ছাত্ররা টপাটপ পাশ দেবে আর চটাপট চাকরীতে ঢুকবে; এই সামান্য ডিসিপ্লিনটুকু থাকলেই ল্যাঠা চুকেবুকে যেত। তা না, এরা প্রশ্ন করে। 

প্রশ্ন করে। 

আরে বাবা পিকনিক কর, ফেস্টে ব্রেকডান্স কর, ক্যান্টিনে গান  কর...কিন্তু প্রশ্ন করবি কেন? 

প্রশ্ন; কী বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপারটা। আর প্রশ্ন করছিস কর, তার আবার জবাবও দিতে হবে? মেধা আছে যখন; তা দিয়ে সওদাগরি অফিসে লেজার লিখলেই হয়, তাই বলে ধান্দাধর্মে ব্যাঘাত? 

ছাত্রদের এই বজ্জাত প্রশ্নগুলোকে জুতোর তলে না রাখতে পারলে ধান্দা-দুনিয়া অন্ধকার আর সে দমবন্ধ করা অন্ধকারে ধান্দা-প্রাণ ভালোমানুষদের অহেতুক হয়রানি৷ 

তবে এই রাক্ষুসে ছাত্রদের বিষাক্ত প্রশ্নের ঝরে যে আমরা বয়ে যাইনি, এ'টা ভাবতে ভালো লাগছে। আর গর্ব লাগছে এই ভেবে যে ইতিহাসের থেকে আমরা আদত শিক্ষাটুকু গ্রহণ করতে পেরেছি;

ধান্দাবাজির কাছে যদি প্রতিবাদের অধিকারটুকুকে নতিস্বীকার করানো না যায়, তাহলেই অকারণ খরচ বাড়ে।

বুক-ফাটা হুহু

এমন টনটনে 'বুক হুহু' না থাকলে সমস্ত গান আর কবিতাই মিথ্যে হয়ে যেত বোধ হয়। তবে শুধু প্রেমে হোঁচট খেলেই বুঝি বুকে এমন 'হুহু' সুরের সানাই বাজবে? নাহ্ তা নয়। 

বুকফাটা 'হুহু'র অন্যান্য কারণগুলোঃ

১। সাধের বিরিয়ানিতে কড়াইশুঁটি-সবুজের উঁকি। 

২। প্লেট আলো করা ফিশফ্রাইতে মেগা-কামড় বসিয়ে টের পাওয়া যে তাতে ভেটকির বদলে রয়েছে বাসা।

৩। শৌখিন এগরোলে টমেটো কুচি আবিষ্কার।

৪। রবিবারের বাতাসে পাশের বাড়ির লুচি ভাজার সুবাস আর নিজের জলখাবারে কর্নফ্লেক্সের বাটি। 

৫। ক্যাসুয়াল লীভ-সকালের সোফা-সাধনা বিগড়ে দেওয়া বসের ফোন। 

৬। "একবার বলো উত্তমকুমার"য়ের উত্তরে "ন্যাকা হনুমান কোথাকার" শোনা।

৭।  ট্রেনের টিকিট না পেয়ে পুরী প্ল্যান ক্যানসেল করে ব্যান্ডেলে পিকনিক করতে যাওয়া।

৮। মৌজ করে ক্রিকেট দেখতে বসার দু'মিনিটের মধ্যেই শচীনের আউট হওয়া  ('৯০ দশক স্পেশ্যাল)।

৯। নেমন্তন্ন-বাড়িতে খেতে বসে টের পাওয়া যে মাছ-মাংসের ভালো পিসগুলো পড়ছে পাশে বসা হাড়-জ্বালানো বন্ধুটির পাতে। 

১০। বিনে পয়সায় নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন পাওয়ার লোভে অচেনা নাম্বারে মিসড কল দিয়ে জানতে পারা যে এ'সবই আদতে পলিটিকাল কানমলা।

Saturday, January 4, 2020

ব্লু লোটাস


এ'টা পোস্ট করার উদ্দেশ্য একটাই৷ গোটা টিনটিন সিরিজ যে ফের একবার মন দিয়ে পড়ব বলে ঠিক করেছিলাম, সে'টা ভুলিনি। বরং দেখলাম বাড়তি সময় নিয়ে টিনটিন পড়ার সুবিধে হল এই যে ইচ্ছেমত গুগল করে ছোট ছোট কনটেক্সগুলো নিয়ে নতুন ভাবে ভেবে দিব্যি মাথা চুলকোনো যায়। দুঃসাহসী টিনটিনের বুদ্ধির ঝিলিক ও আর থমসন-থম্পসনকে নিয়ে পাঠকের ফুর্তিটুকুই যে এই বইগুলোর শেষ কথা নয় তা মোটের ওপর সর্বজনবিদিত কিন্তু প্রতিবারই অত কনটেক্সচুয়াল জাবর না কেটে সুটসাট বই শেষ হয় যায়৷ কিন্তু এ'বার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; টিনটিন পড়ার সময় আর তাড়াহুড়ো নয়। 

'৩৩য়ে লীগ অফ নেশনস থেকে জাপানের হুট্ করে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মোটের ওপর অ্যাকিউরেটলি দেখানো হয়েছে '৩৬য়ে প্রকাশ হওয়া 'দ্য ব্লু লোটাস'য়ে। তবে মাঞ্চুরিয়া দখলে রাখার ব্যাপারটা অবশ্যই সোজাসুজি আলোচিত হয়নি। 

এই প্রসঙ্গ ধরে ইউপিআই-য়ের আর্কাইভ থেকে একটা বেশ মশলাদার নিউজরিপোর্ট পড়া গেলো।  তা থেকে সোজা কোট করি বরং;

"The stunned international conclave, representing almost every nation on earth, sat in silence while the delegation, led by the dapper Yosuke Matsuoka, clad in black, walked from the hall. The crowded galleries broke into mingled hisses and applause.

Japan's formal resignation from the league is expected to be filed later.

"We are not coming back," Matsuoka said simply as he left the hall.

The assembly's report, recommending that Japan withdraw her troops occupying Manchuria and restore the country to Chinese sovereignty, was adopted, 42 to 1, Japan voting against itpossible.".

Matsuoka, usually typifying the placid oriental diplomat, was nervous before he began his speech, and abandoned the text before he finished. He shouted from the rostrum:

"Japan will oppose any attempt at international control of Manchuria. It does not mean that we defy you, because Manchuria belongs to us by right.

"Read your history. We recovered Manchuria from Russia. We made it what it is today."

He referred to Russia, as well as China, as a cause for "deep and anxious concern" for Japan.

"We look into the gloom of the future and can see no certain gleam of light before us," Matsuoka declared.

He reiterated that Manchuria was a matter of life and death for Japan, and than no concession or compromise was possible."

(সম্পূর্ণ রিপোর্ট এই লিঙ্কেঃ https://www.upi.com/Archives/1933/02/24/Japan-stuns-world-withdraws-from-league/2231840119817/) 

"ম্যাটার অফ লাইফ অ্যান্ড ডেথ"; মাঞ্চুরিয়া। মাইরি। আর এই দামামা-বাজিতে নাভিশ্বাস উঠেছিল চীনের। জাপানিরা যে চীনে অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে; এ'ব্যাপারটা মোটের ওপর যাকে বলে ওই 'ওয়েল-ডকুমেন্টেড'। যা হোক, সেই অত্যাচারের একটা ছবি ব্লু লোটাসে আছে বটে।  
আর ওই টিনটিনের চ্যাংয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার পর তাদের কথোপকথনটুকু; চলতি ভাষায় আওয়াজ দিয়ে বলতে হয় "গোল্ড"। অথচ যেটুকু যা বুঝছি তা'তে অপরের সম্বন্ধে এমন টোটাল-অ্যান্টি-ধন-ধান্য-পুষ্প-ভরা সেন্টিমেন্ট পোষণ না করতে পারলে বোধ হয় নিজেদের দেশকে যথেষ্ট ভালোবাসা যায়না।

গোস্বামী


বহুদিন পর গোস্বামীবাবুর 'ডিবেট' শুনলাম কিছুক্ষণ। মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায়না।

প্যানেলিস্ট ১- আমার কথা..।

গোস্বামীবাবু - শেষ।

প্যানেলিস্ট ১- শেষ..।

গোস্বামীবাবু - আমিও তো বলছি, শেষ।

প্যানেলিস্ট ১- হয়নি।

গোস্বামীবাবু - কী হয়নি?

প্যানেলিস্ট ১- আমার..।

গোস্বামীবাবু - এত আমার আমার করছেন কেন? সেই তখন থেকে শুধু আমার আমার আমার..।

প্যানেলিস্ট ২ - আমার মনে হয়..।

গোস্বামীবাবু - আপনার মনে হয় না।

প্যানেলিস্ট ১ - আমার কথাটা..।

গোস্বামীবাবু - কী ভেবেছেনটা কী? সেই শুরু থেকে একটানা বকে চলেছেন...এবার চুপ করে আমার কাউন্টার কোশ্চেন শুনুন..।

প্যানেলিস্ট ১- আমি কী বলেছি যে আপনি কাউন্টার করবেন?

গোস্বামীবাবু - সে'টাই তো আপনাদের মত মানুষ চায়, আপনারা বলে যাবেন আর সাধারণ মানুষ মুখবুজে সব শুনবে। 

প্যানেলিস্ট ১- কিন্তু আমি যে..।

গোস্বামীবাবু -  সেই "আমি" "আমি" রোগ৷ দেশকে তো চিনলেন না, চিনতে চাইলেনও না। 

প্যানেলিস্ট ১৭ - আশ্বিনের শারদ প্রাতে...।

প্যানেলিস্ট ১ - কথাটা তো শুনুন..।

গোস্বামীবাবু - সাধারণ মানুষের বুকে পা রেখে আর কদ্দিন কথা শোনাবেন? আর কদ্দিন? আজ দেশের হয়ে আমি আপনাকে কথা শোনাবো..।

প্যানেলিস্ট ১ - তবু আমার কথাটা কাইন্ডলি যদি...।

প্যানেলিস্ট ৩২ - হাওড়া ময়দান হাওড়া ময়দান হাওড়া ময়দান...।

গোস্বামীবাবু - ভেবেছেনটা কী? আমি আপনাকে ভয় পাই? 

প্যানেলিস্ট ১ - কই না তো...।

গোস্বামীবাবু - না! না ছাড়া তো আর কিছু বলতে শিখলেন না। কিন্তু দেশের মানুষকে এমন না-না বলে চিরকাল নাকাল করতে হবে না। ওরা জানতে চায়...।

প্যানেলিস্ট ১ - আমিও বলতে চাই..।

গোস্বামীবাবু- থামুন। আমায় আপনি বোকা পেয়েছেন? 

প্যানেলিস্ট ৫৭ - ইয়ে, বকুলকথার সময় হয়ে এসেছে ভাই..।

পলিটিক্স

- দেশলাই?

- আছে। 

- সিগারেট?

- সোজা সিগারেট চাইলেই হত। 

- খারাপ দেখায়।  

- তাতেই বা কী। ফ্রি সিগারেট তো আর রিফিউজ করবেন না। 

- সিগারেটই চেয়েছি,এক গেলাস দুধ তো নয়। আপনার উপকারই করছি। 

- আপনি পলিটিক্সে আসুন না। 

- ইউ মীন, পার্লামেন্টে আসুন, তাই তো? পলিটিক্সে কে নেই বলুন।

চুপ

- অ্যাই প্রজা! চুপ করে বসে যে বড়?

- আজ্ঞে, দুপুরবেলা কিনা। ভাতটাত খেয়ে একটু জিরোচ্ছিলাম মন্ত্রিমশাই!

- মহারাজ দেশের জন্য দশের জন্য খেটে মরছেন আর তুই সিডিশাস কাজকর্ম করছিস?

- আমি? ও মা! কই,কিছুই করিনি তো! আমি তো চুপটি করে বসে!

- আজ মহারাজের প্রশংসা না করে চুপটি বসে। কাল আড়ালে নিন্দে করবি, পরশু রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে গলা ফাটাবি। আমি কিছু বুঝি না ভেবেছিস? শালা ট্রেটার!

রাজনৈতিক তর্ক

কলকাতার শীতের মতই রাজনৈতিক তর্কে যুক্তির পরিমাণ আশঙ্কাজনক ভাবে কমে এসেছে। অন্যদের সমালোচনা করে কূলকিনারা পাইনা বটে, তবে কালেভদ্রে নিজের স্বীকারোক্তিটুকু টেবিলের ওপরে সাজিয়ে দেওয়াটা উচিৎ বৈকি। (অবশ্য সমস্ত উচিৎ কাজ করতে চাইলেও সমূহ বিপদ, কিন্তু সে আলোচনা অন্যদিন)।

ফেসবুক থেকে টুইটার; নিজের টাইমলাইন মোটের ওপর যে'ভাবে সাজিয়ে নিয়েছি তা'তে এক জবরদস্ত ইকো-চেম্বার তৈরি হয়েছে। আমি বলি "ওহে শোনো, অমুকচন্দ্র আসলে একটি মূর্তিমান শয়তান"। অমনি চতুর্দিক থেকে ইকো ফিরে আসে 'বঢিয়া বোলিয়াছেন', 'এমন করে সোজা কথা সহজ ভাষায় বলতে পারার জন্য অভিবাদন', 'ঘ্যাম বলেছিস' ইত্যাদি। এ'দিকে আমার 'কাস্টোমাইজড' টাইমলাইনও তখন অমুকচন্দ্রের যাবতীয় শয়তানিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ; সে'সব পড়ে আমারও বারবার মন হচ্ছে 'বঢিয়া', 'সাবাশ', 'ঘ্যাম' ইত্যাদি। অমুকচন্দ্রের শয়তানি সম্বন্ধে কেউ সামান্যতম সন্দেহ প্রকাশ করলেও মনে মনে সে ভিন্নমতাবলম্বীর টুঁটি টিপে ধরছি।  পলিটিকাল ডিসকোর্সে অবশ্য এমন 'ইকো চেম্বার' ব্যাপারটা আধুনিক ফেনোমেনা নয় বলেই আমার ধারণা, তবে সোশ্যাল মিডিয়া যে ব্যাপারটাকে 'ম্যাগনিফাই' করেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

তবে এই ইকো-চেম্বারের পরিসরে বাস করেও, যাবতীয় তর্কবিতর্ক হইহট্টগোলের মধ্যে থেকেও; কয়েকটা ব্যাপারে বোধহয় নিশ্চিন্তে ফোকাস করা যায়; 

১। মতামত (ওপিনিওন) এ'দিক ও'দিক দৌড়ঝাঁপ করতেই পারে কিন্তু 'ঘটনা এবং পরিসংখ্যান'; এই ব্যাপারটা অমোঘ এবং নিশ্চল। সে'খানে 'গ্রে এরিয়া'র সুযোগ নেই। ইকো-চেম্বার থেকে ওপিনিওন গ্রহণ করার প্রসেস নিশ্চয়ই নিন্দনীয় নয়। হারারি সাহেব জোরালো সুরে বলেছেন; 'গসিপ' ও 'দলবাজি' ছিল বলেই আজ হোমোস্যাপিয়েনরা   গোরিলাদের মত জংলি-জীবনে আটকে না থেকে রিট্যুইট-মার্কা আধুনিক হতে পেরেছে। কাজেই ওপিনিওন গ্রহণ ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয় কিন্তু ইকো-চেম্বার থেকে 'অব্জেক্টিভ' খবরের বদলে গোঁজামিল ডেটা জোগাড় করলেই সমূহ বিপদ। এবং সেই বিপদকে তেমন পাত্তা না দিয়ে আমরা রীতিমতো খতরো কি খিলাড়ি হয়ে পড়ছি। আর খতরো কি খিলাড়ি হয়ে আমাদের ইতিহাস-জ্ঞান অত্যন্ত সরেস হয়ে উঠছে। ক্লাবের আড্ডায় কানাইদা বলেছে হরিহর সামন্তর দাদু রবীন্দ্রনাথের মানিব্যাগ চুরি করেছিলেন অতএব গোটা পাড়া জানল সামন্তরা দাড়ি-বিরোধী জোচ্চোরের বংশ। এদিকে সামন্য খোঁজখবর করলেই জানা যেত যে হরিহর সামন্তর দাদুর মৃত্যু ঘটে রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগে এবং জোয়ান বয়স থেকে মরার দিন পর্যন্ত পর্যন্ত  লম্বা দাড়িয়ে দুলিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন তিনি। হতে পারে সামন্তরা দিনে সুদখোর ও রাতে সিঁদকাটিয়ে; সত্যিই তাঁরা আদর্শ জোচ্চোর এবং পাড়ার ইকো-চেম্বারের ওপিনিওন নেহাত ফেলনা নয়। কিন্তু সঠিক কারণ না টেনে স্রেফ হরিহরের দাদু দাড়ি-বিরোধী বলে সামন্তদের জোচ্চোর বলাটা বিশ্রী এবং বিষাক্ত। ইকোচেম্বারে ওপিনিওনের ভীড় ঠেলে ডেটা তুলে আনা চাট্টিখানি কথা নয়, তুলে আনায় রগরগে মজাও নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে খেটে তর্ক করলে ব্যাপারটা মন্দ দাঁড়ায় না।

২। আমার ধারণা দলমত নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক নেতা যেটা চান সে'টা হল তাদের সমর্থকদের হোয়াটাবাউটারি এক্সপার্টে পরিণত করা। মোটের ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে বলতে পারি এ কথা; পলিটিকাল ফ্যানডমের সেল্ফ-অ্যাকচুয়ালাইজেশন রয়েছে ওই একটি ব্যাপারেই। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা নিজেদের হোয়াটাবাউটারিতে সঁপে দেবেন সে'টা স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ সমর্থক হয়ে সে'টা শুরু করলেই নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় যাকে বলে "চিত্তির"। 

তমুক নেতার সমর্থক - "অমুক নেতা চোর"।
অমুক নেতার সমর্থক - "তমুক নেতা ডাকাত"।

তমুকের ডাকাতির আশ্বাসে অমুকের চুরিজোচ্চুরি পাপের ভার লাঘব হয় যায় না। কিন্তু সমর্থকদের এই লাগামছাড়া গুঁতোগুঁতি গোছের তর্ক বোধ হয় অমুকনেতা এবং তমুকনেতা দু'জনের জন্যই সুবিধেজনক। এ'টুকু হাসিলের জন্যেই তাদের যাবতীয় সভা, মিটিং, মিছিল ও বাতেলা। 

"অমুক চোর কিনা" এ প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে যদি দু'দিকের সমর্থকই শুধু অমুককে নিয়েই আলোচনা করেন; তা'হলে বাস্তবিকই অমুকনেতা ও তমুকনেতা দু'জনেই ফাঁপরে পড়বেন। কারণ হোয়াটাবাউটারি বাদ গেলেই ওপিনিওন ফিকে হয়ে  মজবুত হবে 'অবজেক্টিভ ইনফর্মেশন'। আর সমর্থকরা অব্জেক্টিভ হলে যে নেতাদের দুশ্চিন্তা বাড়বে তা বলাই বাহুল্য। 

উপরোক্ত দু'টো কথা পেরিয়ে এ'বার একটা জরুরী (এবং ব্যক্তিগত)  'ওপিনিওন-বায়াস' প্রসঙ্গে আসি। এই 'বায়াস'গুলো সম্ভবত ফেলনা নয়, নয়ত মতাদর্শগত লড়াইগুলো মরে যাবে। কিন্তু মতাদর্শগুলোকে অযৌক্তিক বিষোদগারের বাইরে টেনে এনে ভ্যালিডেট করা যাবে কী ভাবে? 

প্রথমত, মতাদর্শের পক্ষে দাঁড়ানো মানে সেই মতের পক্ষে 'ফ্যাক্ট'কে দুমড়েমুচড়ে দেওয়া নয় বা ইনফর্মেশন যাচাই না করা নয়। লম্বা দাড়ি ও রবীন্দ্রনাথের পক্ষ নিতে গিয়ে হরিহরের সামন্তর দাদুর ঘাড়ে মিথ্যে দোষ চাপিয়ে দেওয়াটা চাপের; আর তার দোষ লম্বা দাড়ি বা রবীন্দ্রনাথের নয়, দোষ রয়েছে তর্কবাগীশের যুক্তিবোধে।

দ্বিতীয়ত, মতাদর্শ 'কন্সিস্টেন্ট' না হলে নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় যাকে বলে 'আইইকস'। অমুকচন্দ্র নেতার ঘামাচিতে নাইসিল দেব আর তমুকচন্দ্র নেতার ঘামাচিতে বিছুটি; তা'তে সেই হোয়াটাবাউটারি ফিরে আসতে বাধ্য।

তৃতীয়ত, সম্পদ আর ক্ষমতা যার হাতে; তার জবাবদিহির দায় অবশ্যই বেশি। এটা অবশ্যই অকাট্য সত্য নয়, নিতান্তই একটা মতামত (ওপিনিওন')।  কিন্তু ওই; ইতিহাস সম্ভবত এম্পিরিকাল থাপ্পড় কষিয়ে প্রমাণ করে দেয় যে এই জবাবদিহির নিয়মে গোলমাল মোটেই অভিপ্রেত নয়। চোখাচোখা প্রশ্নগুলোর বেশিরভাগই যে সরকার বাহাদুরকে তাক করে ছুঁড়তে হবে (কেন্দ্রীয় সরকার / রাজ্যসরকার; যার জোর যত বেশি, তার দায়ভারও ততটাই) , সে'টাই স্বাভবিক। এর অন্যথা হলেই নারায়ণ দেবনাথিও ভাষায় ব্যাপারটা যাকে বলে "ইররক....গেলুম রে"।

শিফট

এগরোলের আস্বাদনের প্রসেস নিতান্ত সরল নয়; চিবিয়ে খাওয়াটুকু তো সে প্রসেসের আইসবার্গের মুণ্ডু মাত্র। খামচে ধরে ইয়াব্বড় কামড় বসালাম; তেমন মনোভাব নিয়ে হীরক রাজের মূর্তি বানানো চলে, চরণদাসের গান বাঁধা যায়না।

এগরোলের স্বাদ স্পর্শ করতে হলে এগরোল দাদার চাটুর ও'পাশে ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সদ্য বেলে নেওয়া পরোটা যখন চাটুর তেলে বসবে তখন এক মৃদু আরামদায়ক কাঁপুনি ঝর্ণার জলের মত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসবে। সেই কাঁপুনির সুরকে চিনতে না পারলে এগরোল মিথ্যে।  চাটুর তেলের ওপর সে পরোটা নেচে বেড়াবে আর তার বুকে  থইথই করবে ডিম। সেই পরোটা ভাজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভীরু প্রেমিক কখন যে অঙ্কভুলের ভয় কাটিয়ে শ্যামল মিত্রের সুর আঁকড়ে ধরবে; তা সে নিজেও টের পাবে না।

সম্বিৎ ফিরবে চাটু থেকে পরোটা নামানোর 'থ্যাপ' শব্দে। আরামদায়ক কাঁপুনি কেটে গিয়ে তখন বুকের মধ্যে মৃদু আনচান; মনে ঘোরাঘুরি করবে ওল্ড মঙ্কের সুবাস আর ময়দানে শীতের বিকেল মেশানো বেপরোয়া স্নেহ। পেঁয়াজকুচি, নুন, লেবু মিলেমিশে পূর্ণ হবে আয়োজন; সুমনের সস্নেহ ফিসফিস মনের ছাতে মাদুর পেতে বলবে "হে আমার আগুন, তুমি এ'বার ওঠো জ্বলে"।

এগরোল আস্বাদনের মূলে তো এই সাধনাটুকুই। চিবিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটুকু তো স্রেফ নজরুলের গানের খাতা মলাট দেওয়া; তার বেশি কিছু নয়।

কমজিউমার

এগরোলের আস্বাদনের প্রসেস নিতান্ত সরল নয়; চিবিয়ে খাওয়াটুকু তো সে প্রসেসের আইসবার্গের মুণ্ডু মাত্র। খামচে ধরে ইয়াব্বড় কামড় বসালাম; তেমন মনোভাব নিয়ে হীরক রাজের মূর্তি বানানো চলে, চরণদাসের গান বাঁধা যায়না।

এগরোলের স্বাদ স্পর্শ করতে হলে এগরোল দাদার চাটুর ও'পাশে ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সদ্য বেলে নেওয়া পরোটা যখন চাটুর তেলে বসবে তখন এক মৃদু আরামদায়ক কাঁপুনি ঝর্ণার জলের মত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসবে। সেই কাঁপুনির সুরকে চিনতে না পারলে এগরোল মিথ্যে।  চাটুর তেলের ওপর সে পরোটা নেচে বেড়াবে আর তার বুকে  থইথই করবে ডিম। সেই পরোটা ভাজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভীরু প্রেমিক কখন যে অঙ্কভুলের ভয় কাটিয়ে শ্যামল মিত্রের সুর আঁকড়ে ধরবে; তা সে নিজেও টের পাবে না।

সম্বিৎ ফিরবে চাটু থেকে পরোটা নামানোর 'থ্যাপ' শব্দে। আরামদায়ক কাঁপুনি কেটে গিয়ে তখন বুকের মধ্যে মৃদু আনচান; মনে ঘোরাঘুরি করবে ওল্ড মঙ্কের সুবাস আর ময়দানে শীতের বিকেল মেশানো বেপরোয়া স্নেহ। পেঁয়াজকুচি, নুন, লেবু মিলেমিশে পূর্ণ হবে আয়োজন; সুমনের সস্নেহ ফিসফিস মনের ছাতে মাদুর পেতে বলবে "হে আমার আগুন, তুমি এ'বার ওঠো জ্বলে"।

এগরোল আস্বাদনের মূলে তো এই সাধনাটুকুই। চিবিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটুকু তো স্রেফ নজরুলের গানের খাতা মলাট দেওয়া; তার বেশি কিছু নয়।

এগরোলিও

এগরোলের আস্বাদনের প্রসেস নিতান্ত সরল নয়; চিবিয়ে খাওয়াটুকু তো সে প্রসেসের আইসবার্গের মুণ্ডু মাত্র। খামচে ধরে ইয়াব্বড় কামড় বসালাম; তেমন মনোভাব নিয়ে হীরক রাজের মূর্তি বানানো চলে, চরণদাসের গান বাঁধা যায়না।

এগরোলের স্বাদ স্পর্শ করতে হলে এগরোল দাদার চাটুর ও'পাশে ভীরু প্রেমিকের মত দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সদ্য বেলে নেওয়া পরোটা যখন চাটুর তেলে বসবে তখন এক মৃদু আরামদায়ক কাঁপুনি ঝর্ণার জলের মত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে আসবে। সেই কাঁপুনির সুরকে চিনতে না পারলে এগরোল মিথ্যে।  চাটুর তেলের ওপর সে পরোটা নেচে বেড়াবে আর তার বুকে  থইথই করবে ডিম। সেই পরোটা ভাজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে ভীরু প্রেমিক কখন যে অঙ্কভুলের ভয় কাটিয়ে শ্যামল মিত্রের সুর আঁকড়ে ধরবে; তা সে নিজেও টের পাবে না।

সম্বিৎ ফিরবে চাটু থেকে পরোটা নামানোর 'থ্যাপ' শব্দে। আরামদায়ক কাঁপুনি কেটে গিয়ে তখন বুকের মধ্যে মৃদু আনচান; মনে ঘোরাঘুরি করবে ওল্ড মঙ্কের সুবাস আর ময়দানে শীতের বিকেল মেশানো বেপরোয়া স্নেহ। পেঁয়াজকুচি, নুন, লেবু মিলেমিশে পূর্ণ হবে আয়োজন; সুমনের সস্নেহ ফিসফিস মনের ছাতে মাদুর পেতে বলবে "হে আমার আগুন, তুমি এ'বার ওঠো জ্বলে"।

এগরোল আস্বাদনের মূলে তো এই সাধনাটুকুই। চিবিয়ে খাওয়ার ব্যাপারটুকু তো স্রেফ নজরুলের গানের খাতা মলাট দেওয়া; তার বেশি কিছু নয়।

৩১শে ডিসেম্বর


-  এই যে মিস্টার মুকর্জি। 

- আরে আপনি...। 

- অবাক হচ্ছেন? বিদেয় করতে পারলে বাঁচেন? 

- ও মা। না না। বসুন। ইয়ে, চা খাবেন?

- চিনি ছাড়া। 

- শ্যিওর। তবে ফ্লাস্কের কিন্তু। 

- চলবে। 

-  এই যে ।

- থ্যাঙ্ক ইউ মিস্টার মুকর্জি।

- কেমন লাগছে?

- চলে যেতে কেমন লাগছে? 

- রিফ্রেজ করি। এতদিন ছিলেন, কেমন লাগল। 

- ইউ হ্যাভ লেট মি ডাউন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

- সরি। 

- কিন্তু সেগুলোই শেষ কথা নয় মুকর্জি।  ইউ হ্যাভ অলসো সারপ্রাইজড মি অ্যাট টাইমস। ইন আ গুড ওয়ে। 

- তাহলে আপনাকে আগাগোড়া হতাশ করিনি বলছেন?

- আমায় আপনি হতাশ করবেন মিস্টার মুকর্জি? ছাপোষা চাকুরে, ইন্টারেস্ট রেট কমে যাওয়ায় কেঁপে ওঠা মানুষ আমায় হতাশ করবে? যাক গে, আমার কথা বাদ দিন। আমি আজ আছি কাল নেই। ফর আ চেঞ্জ আপনার কথা শুনি। কেমন দেখলেন? আমায়?

- ইউ হ্যাভ লেট মি ডাউন । কিছু কিছু ক্ষেত্রে। 

- হেহ হেহ। 

- তবে আগাগোড়াই হতাশ করেননি। 

- আমার আবার ওই হতাশাগুলো জানার দিকেই বেশি ইন্টারেস্ট। কারণ ওতেই গল্প জমে ভালো। 

- বটে?

- ডেফিনিটলি। কই বলুন, হতাশাগুলোর ব্যাপারে ঝেড়ে কাশুন। 

- কত কিছু পড়া হল না। 

- এসব ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলে আর কদ্দিন চালাবেন মিস্টার মুকর্জি। এ'সব পলিটিকাল উত্তর ট্যুইটারে মানায়। ওসব আদত হতাশা নয়। 

- আমার হতাশা আপনি সঠিক বুঝবেন? 

- পাঁয়তারাগুলো বুঝি। যথেষ্ট বই পড়া হল না, জিমে যাওয়া হল না, নতুন ভাষা শেখা হল না, নতুন কোথাও ঘুরে আসা হল না...। ধুর মশাই। ওসব হল ফেসবুকের হতাশা। 

- ইউ ক্যান বি রুড। 

- দ্যাট ইজ মাই জব মিস্টার মুকর্জি। 

- বেশ...ইন দ্যাট কেস...আপনিই বলুন না; আমি আপনাকে ঠিক কী কী ভাবে আপনাকে হতাশ করেছি।  

- কোদালকে কোদাল বললে কোদাল মালিকের গায়ে ফোস্কা পড়ে মুকর্জি। 

- বলেই ফেলুন। কতক্ষণ আর আছেন বলুন। তার আগে আসুন, আর এক কাপ চা। 

- থ্যাঙ্ক ইউ। 

- আমি আপনাক ঠিক কী কী ভাবে হতাশ করেছি?

- আজেবাজে টার্গেট নিয়েই পড়ে রইলেন মুকর্জি। ভালোবাসার কথা প্রাণ খুলে বললেন না, অভিমানগুলো স্পষ্ট ভাবে জানালেন না, ভুলগুলো স্বীকার করার সৎসাহস জড়ো করতে পারলেন না। মাঝেমধ্যেই ভাবেন  নিজের ইগোর মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখবেন না। কিন্তু সেই ভাবনাতেই আটকে থাকলেন। আরও কতগুলো দিন কেটে গেল। ণ্ঠে করেননি। না না, গা বাঁচিয়ে গর্তে লুকিয়েছিলেন তা বলব না। নিজেকে পলিটিকল সান্ত্বনা দিতে কসুর করেননি। কিন্তু ভয়গুলোকে আগলে রেখেছে। আপ্রাণ। ভবিষ্যতের ভয়, সমাজের ভয়, চাকরীর ভয়...। সে'সব ভয়ের ফর্দ করতে বসলে আমার সময় ফুরিয়ে যাবে মিস্টার মুকর্জি। কিন্তু মোদ্দা কথা হল, নিয়মিত হেঁটে সামান্য মেদ ঝরানো বা এসআইপিতে দু'পয়সা রেখে নিজের ভালোমন্দ মেপে পার পাবেন ভেবেছেন? লৌকিকতা, সামাজিকতা আর আখেরের ভয় আপনার থেকে প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নিয়েছে মিস্টার মুকর্জি, এর চেয়ে বড় হতাশা আর কী হবে? সেই হতাশাটুকু তাও না হয় পাশ কাটিয়ে যেতে পারতাম...প্রতিবাদ ইজ নট রামশ্যামযদুমদু'জ কাপ অফ টী। আপনাকে নিয়ে আমার গ্রেটেস্ট ডিস্যাপয়েন্ট কোথায় জানেন মিস্টার মুকর্জি? 

- বলে ফেলুন। রোডরোলারটা চালিয়েই দিন। 

- আজেবাজে টার্গেট নিয়েই পড়ে রইলেন মুকর্জি। ভালোবাসার কথা প্রাণ খুলে বললেন না, অভিমানগুলো স্পষ্ট ভাবে জানালেন না, ভুলগুলো স্বীকার করার সৎসাহস জড়ো করতে পারলেন না। মাঝেমধ্যেই ভাবেন, কিন্তু শেষে ওই নিজের ইগোর মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখেন। নিজের ভাবনাতেই আটকে থাকলেন মুকর্জি। আরও কতগুলো দিন কেটে গেল, নষ্ট হল।  

- বটে। 

- এতশত হতাশা মিস্টার মুকর্জি, অথচ আপনার যত চিন্তা যথেষ্ট বই পড়া হল না বলে। 

- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

- শুট। 

- আপনি বললেন, আমি আগাগোড়া আপনাকে হতাশ করিনি। কিন্তু  আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে...। 

- করেননি। আগাগোড়া হতাশ করেননি মিস্টার মুকর্জি। 

- কেন?
 
- ওই। ভয়। যে ভয়ের জন্যে হতাশা, সেই ভয়ের সবটুকুই অন্ধকারের নয় মিস্টার মুকার্জি। নিজের জন্য যেটুকু ভয় পুষে রেখেছেন, আসছে বছরের রিজোলিউশনে সেসবের ভার খানিকটা অন্তত কমানোর চেষ্টা করবেন না হয়। কেমন? কিন্তু মিস্টার মুকর্জি, যে  ভয়টুকু অন্যদের নিয়ে; খোকার দুধেভাতে  থাকা না থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা, ভালোবাসার মানুষের আওড়ানো হা থেকে হাওড়া বুঝে নিতে না পারার আশঙ্কা, ছোটোবেলার স্মৃতি আর দাদুদিদার সুবাস ফিকে হতে না দেওয়ার এলোপাথাড়ি চেষ্টা, বন্ধুদের দূরে যাওয়ার ভয়ে অকারণে কেঁপে ওঠা; এই ভয়গুলো যদ্দিন রয়েছে মিস্টার মুকর্জি, আপনাকে নিয়ে আগাগোড়া হতাশ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 

- কোনও মানুষকে নিয়েই আগাগোড়া হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই বোধ হয়। যাক গে, আর এক কাপ চা চলবে নাকি?

- ফ্লাস্কের চা দিয়ে আতিথেয়তা আর কদ্দিন মিস্টার মুকর্জি। নতুন বছরে বরং ভালো কোয়ালিটির চা অ্যাপ্রিশিয়েট করতে শিখুন। কেমন?

- এটা কি ওই পলিটিকিকালি গা বাঁচানো রিজোলিউশন নয়?

- অমন দু'একটা না থাকলে কি চলে মিস্টার মুকর্জি? যাক গে, এবার আমায় যেতে হবে। সময় নেই। 

- ওহ হ্যাঁ। আসুন। আর ইয়ে, থ্যাঙ্ক ইউ, মিস্টার টু-থাউজ্যান্ড-নাইনটিন। আপনি যদ্দিন ছিলেন অন্ধকার কম ছিল না, তবে গোটাটাই হতাশায় মোড়া নয়। 

- মিস্টার টুয়েন্টি টুয়েন্টি এলেন বলে, তাঁকে আর ফ্লাস্কের চা না দিয়ে ফ্রেশ দার্জিলিং অফার করবেন। কেমন? চলি। ভালো থাকুন মিস্টার মুকর্জি। 

- গুডবাই মিস্টার টু-থাউজ্যান্ড-নাইনটিন। থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভ্রিথিং।

Friday, January 3, 2020

সংখ্যালঘুর দলে


প্রতিবাদ মঞ্চের সামনে তাপসবাবু যখন হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামছেন তখন বেলা প্রায় এগারোটা। আজও পৌঁছতে দেরী হয়ে গেল। অবশ্য রাস্তাঘাটে আজকাল যা জ্যাম; পাংচুয়াল হওয়ার কি আর উপায় আছে? আর যত নষ্টের গোড়া ওই রিকশা, ভ্যান, অটো আর সাইকেলওলারা; গোটা রাস্তা জুড়ে তো ওই ইতরগুলোরই রাজত্ব। ভদ্রলোকের উপায় কী যে দামী গাড়ির গা বাঁচিয়ে দুকিলোমিটার নিশ্চিন্তে এগোবে। 

সাধারণত শহরের রাস্তায় কিছুক্ষণ কাটানো মানেই তাপসবাবুর মেজাজ এক্কেবারে সপ্তমে থাকবে; থেকে থেকেই শহরের ভিড়ের দিকে তাকিয়েডিসগাস্টিংবলে ওঠাটা তাঁর বহুদিনের অভ্যাস। কিন্তু জ্যামে হদ্দ হয়েও আজ কিন্তু তাপসবাবুর মেজাজ মোটেও খিঁচড়ে নেই, বরং ড্রাইভার সুদীপকে গাড়ি পার্ক করতে বলে তাঁর ট্রেডমার্ক মিচকি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বললেনএকশোটা টাকা দিলাম, লাঞ্চটা ভদ্র জায়গায় সেরে নিস আজ, কেমন”?   

তাপসবাবু প্রতিবাদ মঞ্চের দিকে যেতেই হুড়মুড় করে এগিয়ে এলো সুরেশ পাল। সুরেশের বয়স চল্লিশের নীচে। উঠতি বড়লোক, তাই চাল বেশি। তাঁর সঙ্গে হামেশাই ঘুরছে একজন সেক্রেটারি আর একজন বাটলার।

আসুন তাপসবাবু, আসুন। আগেই একটা গুডনিউজ দিই, প্রতিবাদ মঞ্চে বসে গতকাল অনেকের একটু গরম লেগেছিল। আজ তাই বাড়তি এসির ব্যবস্থা করিয়েছি। তবে তাতে আবার কনকনে ঠাণ্ডার একটা পসিবিলিটি রয়েছে বটে। তাই সব আন্দোলনকারীর জন্যে কমপ্লিমেন্টারি পশমিনা শাল রাখানোর ব্যবস্থাও করেছি”; গড়গড় করে বলে গেল সুরেশ। 

গুড”, অল্প কথায় সারলেন তাপসবাবু। এসব ছেলেছোকরার সঙ্গে বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করার মানে হয়না। আজকের স্পীচে তিনি যে জবরদস্ত খবরটা সবাইকে জানাবেন তাতে সমস্ত কমরেড যে আত্মহারা হয়ে পড়বেই ব্যাপারে তাঁর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। নিজের ব্যারিটোনকে উস্কে দিয়ে আজ সকালে ঘণ্টা দুয়েক নিজের ফার্ম হাউসে বসে বক্তৃতাটা রিহার্সও করেছেন তিনি। 

মঞ্চে উঠে তাপসবাবু টের পেলেন যে মঞ্চে উপবিষ্ট কমরেড আর মঞ্চের সামনের প্রতিবাদী জনতা সবাই অধীর আগ্রহে বসে রয়েছেন তার কথা শোনার জন্য। কয়েক হাজার ট্রাকের মালিক সিঙ্ঘানিয়াবাবু গদগদ হেসে একটা প্ল্যাটিনামের হার পরিয়ে তাপসবাবুকে মঞ্চে অভ্যর্থনা করলেন। এসব সস্তা ব্যাপারস্যাপার তাপসবাবু যে খুব একটা পছন্দ করেন তা নয় কিন্তু প্রতিবাদী নেতা হলে এই সামান্য দেখনাইগুলতে আপত্তি করলে চলে না।

সভা সঞ্চালনা করছিলেন প্লাস্টিক টাইকুন বিপিন সেন। তাপসবাবু মঞ্চে বসলে তাঁর কানের কাছে সামান্য ঝুঁকে বিপিন সেন বললেনদেরী না করে তাহলে আপনাকে ডেকে নিই? সবাই কিন্তু আপনার কথা শুনবে বলেই বসে আছে। গুড নিউজের একটা এক্সপেকটেশন তো আছেই, মিডিয়া থেকে অনেকে এসেছে।

তাপসবাবু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। 

বন্ধুরা”, বিপিন সেনের কণ্ঠে তখন উত্তেজনা, “আপনারা সবাই জানেন যে আমাদের এতদিনের আন্দোলন আজ সাফল্যের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে। সরকারবাহাদুর টের পেয়েছেন যে আমরা সংখ্যালঘু হলেও আমাদের আর দমিয়ে রাখা যাবে না। গতকাল রাষ্ট্রপ্রধান মহাশয় আমাদের প্রিয় নেতা তাপস মিত্রকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন আমাদের দাবীগুলোর ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য। আমাদের দাবীগুলো সরকারবাহাদুর অগ্রাহ্য করতে পারেনি, কৃতিত্ব প্রতিটি সংগ্রামী যোদ্ধার। এখন আমি তাপসবাবুকে অনুরোধ করব এই ব্যাপারে বিস্তারিত ভাবে বলার জন্য 

চোখ থেকে সোনার ফ্রেমের চশমাটা খুলে একটা দামী সানগ্লাস পরে মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে গেলেন তাপস মিত্র। জনতার হুল্লোড় শান্ত হওয়ার জন্য মিনিটখানেক অপেক্ষা করতে হল তাপসবাবুকে, মাইকের সামনে তাঁকে দেখতে সবাই বেশ উত্তেজিত। তাপসবাবু জানেন যে সবাই একটা বড় খবর আশা করছে। 

বন্ধুরা, আপনাদের সকলকে জানাই আমার সংগ্রামী সেলাম।  এই আন্দোলনের পথ ছিল কাঁটায় পরিপূর্ণ, কিন্তু শত আঘাতেও আপনারা থমকে দাঁড়াননি, পিছিয়ে পড়েননি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বেনিয়মের বিরুদ্ধে আপনার এগিয়ে চলেছেন। সংখ্যালঘুদের এই সফল সংগ্রাম গোটা বিশ্বের সামনে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে; সে জন্য আপনাদের সকলকে জানাই সংগ্রামী অভিনন্দন। 

যুগে যুগে আমরা দেখেছি কী ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের পায়ের তলে পেষাই হয়েছে নিরীহ সংখ্যালঘুর দল। দেশে দেশে আমরা দেখেছি যে কী ভাবে বিভিন্ন সরকার ভোটের লোভে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের তোষণ করে চলেছেন। আর ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখব যে সংখ্যালঘুর দল কী ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠদের চোখ রাঙানিতে বারবার পর্যুদস্ত হয়েছে।

এই মঞ্চ সংখ্যালঘুদের মঞ্চ। আমরা সংখ্যালঘুরা এই মঞ্চ থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছি আমাদের বিরুদ্ধে হওয়া যাবতীয় অত্যাচারের। আমাদের দাবী নিয়ে আমরা হামলে পড়েছি সরকারের বিরুদ্ধে। আমরা রাস্তায় নেমেছি, ধর্না আর নো-কার্ব ডায়েট অনশনে কাটিয়েছি দিনের পর দিন। বন্ধুরা, অবশেষে চাকা ঘুরছে। চাকা ঘুরছে। সংখ্যাগুরুদের ছড়ি ঘোরানোর দিন এবার শেষ হতে চলেছে। 

আর শুধু সংখ্যালঘু বললেই তো আমাদের দুর্দশা স্পষ্ট ভাবে বোঝানো যায় না। আমরা তো দেশে যাকে বলেএনডেঞ্জার্ড স্পেসি দেশের জনসংখ্যার শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক শতাংশ আমরা; অর্থাৎ যারাইয়েধনী। কিন্তু ধনী হওয়া কি পাপ বন্ধুরা? মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মানো কি এত বড় অন্যায়? দেশের খবরের কাগজ থেকে সাহিত্য; যত গলা শুকোনো সবই শুধু গরীবগুর্বোদের নিয়ে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই আমরা রুখে দাঁড়িয়েছি। এই আন্দোলনে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হয়নি। এই দেখুন রোদে বেরিয়ে বেরিয়ে আমার রং বেশি কিছুটা পুড়ে গেছে, স্টিল টাইকুন জয়সয়ালবাবুর ওজন মাসে দুশো গ্রাম কমে গেছে, এক্সপোর্টার বিধু সান্যাল গতকালের প্রতিবাদ সভায় এসে এত ধুলোময়লা হজম করেছেন যে আজই তাঁকে ইউরোপ ছুটতে হয়েছে তিন মাসের ভ্যাকেশনে। এমন কত গোলমাল আমাদের সইতে হয়েছে। কী অন্যায় দেখুন; দেশের চল্লিশভাগ মানুষ চাষা, অথচ ওই ভীড়ের মধ্যে শখানেক লোক আত্মহত্যা করলেই দেশ জুড়ে সে কী মড়াকান্না। এদিকে আন্দোলনে নেমে সংখ্যালঘু ধনী মানুষের পিঠে ঘামাচি হচ্ছে, তা নিয়ে জন সাংবাদিক লেখালিখি করেছেন

তবে সেসব কিছু এবার পাল্টাতে চলেছে। গতকাল আমায় রাষ্ট্রনেতা মহাশয় কথা দিয়েছেন যে মাইনরিটিস প্রটেকশন অ্যাক্ট ফর সুপার-ওয়েলদি অনলি পার্লামেন্টের আগামী অধিবেশনেই পাশ করানো হবে। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে দেশে ধনীদের সংখ্যা এতটাই কমে এসেছে যে স্পেশাল প্রটেকশন না পেলে আমাদের টেকা দায়। এই আইন প্রণয়ন হলে আমাদের থেকে ট্যাক্স আদায় করে অকারণ জ্বালাতন করা বন্ধ হবে; সুপার ওয়েলদি হলে নো ট্যাক্স। তাছাড়া আমাদের বিভিন্ন কলকারখানা বা দোকানে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আগাছারা চাকরী করে তাদের হরতাল করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা রেগে গেলে দুচারজন গরীব আগাছাকেইয়েসাফটাফ করে দিতে পারি; মাইনরিটি প্রটেকশন আর কী। টাইগার রিজার্ভে বাঘ মানুষকে মেরে খেতেই পারে, কিন্তু তা বলে মানুষ তো আর পাল্টা কামড় দেবে না; আফটার অল বাঘ হল সংখ্যালঘু; আমাদের মত

আচমকা একটা কান ফাটানো দড়াম শব্দের চোটে  তাপসবাবুকে তাঁর বক্তৃতা কিছুক্ষণের জন্য থামাতে হল।  দর্শকাসন থেকে উঠতি বড়লোক সুরেশে চেঁচিয়ে আশ্বস্ত করলে। নিজের হাতের বন্দুক মাথার ওপর নাচিয়ে সুরেশ পাল সহাস্যে জানালেন;
বক্তৃতা চালিয়ে যান তাপসবাবু। বেশ চনমনে বোধ করছি আপনার স্পীচ শুনে। আমার এই বাটলারটার গা থেকে বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছিল, গরীব হলে যায় হয় আর কী। দিলাম একটু আগাছা সাফ করে 

সুরেশের চেয়ারের সামনে পড়ে থাকা বাটলারটির লাশের দিকে তাকিয়ে মিচকি হাসলেন তাপসবাবু। মনে মনে ভাবলেননাহ্‌, সুরেশ ছোকরার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল 

ফের একবার বক্তৃতা সুরু করার আগে তাপসবাবু বলে উঠলেন; “লঙ লিভ রিভোলিউশন, সংখ্যালঘুর অধিকার যেন কোনওদিনও কেউ কেড়ে নিতে না পারে 

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...