Friday, March 29, 2019

ভেক


- অত কী ভাবছেন?

- কে?

- আমি যেই হই, এই খাদের ধারে দাঁড়িয়ে অত চিন্তাভাবনায় কাজ কী দাদা। মাঝরাত্তিরে এসেছেন সুইসাইড পয়েন্টে। ঠিক যেমনভাবে প্রতি মাসে জনা তিনেক করে আসে। তবে এত ভাবনাচিন্তা করছেন মানে গোলমাল আছে। অর্থাৎ ইচ্ছে আছে কিন্তু কনফিডেন্স নেই।

- ফালতু জ্ঞান ঝাড়া বন্ধ করে কেটে পড়ুন। আমি সুইসাইড করি, এ'খানে বসে সাপলুডো খেলি বা ঘুড়ি ওড়াই; সে'টা একান্তই আমার পার্সোনাল ব্যাপার।

- ঝাঁপের পর আর পার্সোনাল বলে কিছু থাকে কি?

- আমি ঝাঁপ দি আর না দি; তা'তে আপনার কিছু বিগড়োবার কোনো কারণ নেই। এতরাত্রে আপনি এ'খানে কী করছেন?  নিশ্চয়ই সুইসাইড করতেই এসেছেন? তা'হলে বিনাবাক্যব্যয়ে এগিয়ে যান। ঝাঁপ দিন।

- গত পরশুই ওই ঝাঁপ দেওয়ার কাজটা আমি সেরে রেখেছি,  বুঝলেন?

- ইয়ার্কি করছেন?

- মড়া হতে পারি। হাড়বজ্জাত নই। এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে ফচকেমো করব না। ওহ আমার পরিচয়টা দিয়ে নিই। আমি আনন্দ পাল। ইন্স্যুরেন্স এজেন্ট; ছিলাম। কাজকর্ম ভালোই চলছিল, শুধু প্রেমটা ঝুলে যাওয়ায় এ কাজটা করে ফেলি। জাস্ট উত্তেজনার বশে ব্যাপারটা ঘটে গেছিল, জানেন।

- তো আপনি তা'হলে ভূত? আনন্দবাবু?

- আজ্ঞে। এমন দুম করে উদয় হলাম বলে কিছু মনে করবেন না প্লীজ। আচ্ছা আপনার নামটা?

- আমি উদয়ন সেন।

- সুইসাইডের জন্যই এসেছিলেন, তাই না?

- চাকরীটা এমন দুম করে...। বাড়িতে বাবা, মা, বৌ, দুই ছেলে; এ'দিকে বাজারে প্রচুর ধারদেনা। ভাবছিলাম, পালিয়ে যাওয়াটাই সুবিধের ব্যাপার হবে।

- তেমনটা ভেবেই আমিও এসেছিলাম। লাফও দিয়েছি, তবে মরে বড্ড আফশোস হচ্ছে উদয়নবাবু। ইনফ্যাক্ট নীচে যাদের সঙ্গে আলাপ হল, তাঁরা কেউই তেমন নিশ্চিন্দিতে নেই।

- নীচে...নীচে তেনাদের...মানে আপনাদের জমায়েত?

- সরগরম একেবারে।

- ঝাঁপ দিয়েও তা'হলে রেহাই নেই আনন্দবাবু?

- কাঁচকলা। যে তিমিরে সেই তিমিরেই।

***

উদয়ন সেন যখন সুইসাইড পয়েন্টের দুর্বিষহ অন্ধকার পেরিয়ে বড় রাস্তার ঘোলাটে আলোয় মিলিয়ে গেলেন তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন আনন্দ পাল। সুইসাইড পয়েন্টের ফাঁকা বেঞ্চিটায় গা এলিয়ে দিলেন। এখনও সে'দিনটার কথা মনে করে গা শিউরে ওঠে তার। এমনভাবেই শেষ মুহূর্তে নিজেকে খাদের ধার থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন তিনি, আজ থেকে বছরখানেক আগে। উদয়নবাবুর মতই সুইসাইড পয়েন্টের ঘোলাটে অন্ধকার ছেড়ে বড় রাস্তার আলোয় গিয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেই ফিরে আসতে পারা উদয়ন জানেন যে আত্মহত্যার মুখে মানুষকে একবার সামান্য হোঁচটের মুখে দাঁড় করালেই তার সিদ্ধান্ত সমূলে কেঁপে উঠবেই। এ'ভাবেই অন্তত শ'খানেক মানুষকে আত্মহত্যার চরম সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। সবাইকে আটকানো সম্ভব না হলেও কিছু মানুষকে রুখে দেওয়া যায়; আজ যে'ভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরানো গেল উদয়ন সেনকে। শুধু এ কাজের জন্য তাঁকে ভূত সাজতে হয়; যাক গে, সে'টুকু করাই যায়।

একটা প্রবল পরিতৃপ্তি অনুভব করছিলেন আনন্দ পাল।

***

রাস্তার আলোয় গায়ে এসে পড়তেই মিলিয়ে গেলেন উদয়ন সেন।  আর মিলিয়ে যেতেই তাঁর ছায়াছায়া আকৃতিটা ভাসতে ভাসতে নেমে গেল খাদের নীচে; খাদের মাথাতেই এ অঞ্চলের কুখ্যাত সুইসাইড পয়েন্ট। সে'খানে একটা কাঠের বেঞ্চি যার ওপর ছায়ার মত এলিয়ে বসে রয়েছে আনন্দ পাল। বেচারা আনন্দ আজও টের পায়না যে সে সত্যিই ভূত। সত্যিই সে আত্মহত্যা করতে পেরেছিল। খাদের নীচে যে'খানে ভূতের আড্ডা; সে'খানে আনন্দ পালের আত্মা কিছুতেই নেমে আসতে পারেনি। সে সেই বেঞ্চিতেই আটকে। অন্য ভূতেরা আনন্দকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করে কিন্তু উদয়নের মনটা বড্ড নরম৷ বারবার তিনি ওপরে উঠে আসেন আনন্দকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে কিন্তু মনের কথা বলার আগেই আনন্দ তাঁকে জ্যান্ত ঠাউরে সুইসাইড আটকাতে উদ্যত হয়। এবং তার জন্য সে'আবার ভূতের ভেক ধরার চেষ্টা করে। হাস্যকর অথচ হৃদয়বিদারক।

উদয়ন বার বার উঠে আসে আনন্দকে বোঝাতে যে এ ভেক কতটা অদরকারী,  উদয়ন চায় তাকে সসম্মানে নীচে নিয়ে যেতে। অথচ আজও সাহস করে আনন্দকে সত্যি কথাটা বলা হয় উঠল না।

Thursday, March 21, 2019

রঙচঙ


ঘোর কাটতে আধঘণ্টা মত  লাগল। তখনও অবশ্য চারপাশে চাপ চাপ অন্ধকার দেখছি। যদিও এখন বেলা দশটা, রোদ ঝলমলে দিন, তবু আমার খোলা জানালা ছাপিয়েও এই অন্ধকার। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ভাব, গা হাত পায়ে টনটন ব্যথা।

খানিকক্ষণ পর চোখের অন্ধকার কমে আসতে টের পেলাম আমি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে। মুখে বিশ্রী তেতো স্বাদ; রঙের। ওরা রীতিমত অত্যাচার করে গেছে যা মনে হচ্ছে। কপালে চোট লেগেছে; তবে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে না রঙ তা বোঝার উপায় নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘরের সমস্ত আসবাব ওলটপালট হয়ে পড়ে আছে। মেঝে দেওয়াল  সমস্ত রঙে কাদায় লেপটে আছে। বিশল্যকরণী মেডিকেল স্টোর থেকে পাওয়া বাংলা ক্যালেন্ডারের রবীন্দ্রনাথ ছিঁড়েখুঁড়ে মাটিতে লুটোপুটি। কাচের ফুলদানিটা চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে; পায়ে কাচ ইতিমধ্যেই না ঢুকে থাকলে বাঁচোয়া। কোনোরকমে উঠতে গিয়ে দেখলাম ডান হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা; নির্ঘাত খুব বিশ্রীভাবে গুঁতো লেগেছে। আর লাগবে নাই বা কেন?

যে'ভাবে জনা দশেক পেল্লায় আধগুণ্ডা মানুষজন ঘরের মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়লে রঙ মাখানোর অছিলায়। আজকের দিনে নাকি এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক ; এ'টাই রীতি।  কোনো মানে হয়? যাদের আমি আদৌ ভালো করে চিনি না, যাদের সঙ্গে গোটা বছর কোনো যোগাযোগ থাকে না; তারা ঘরে ঢুকে রঙ মাখানোর নামে অত্যাচার করবে আর এ'টাই নাকি রীতি। যত্তসব! ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে লম্বা চওড়া আর বিটকেল; সে আবার ঠণ্ডই খাওয়ানোর নাম করে বিশ্রী একটা কী জোর করে গিলিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত সে'টা চোলাই কারণ গলা বেয়ে বমি উঠে আসছে মনে হচ্ছে। মিনিট কুড়ির চেষ্টায় কোনো রকমে উঠে দাঁড়ানোর পর টের পেলাম গায়ের ফতুয়াটা ছিঁড়ে ফালাফালা অবস্থা।

কান্না পাচ্ছিল খুব। এ'টা তো রীতিমত অন্যায়, অথচ আমার কিছুই করার নেই। টেনেহিঁচড়ে কোনোক্রমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম; নিজেকে চেনা দায়। ক্যাটকেটে সবুজ, কটমটে লাল, কুটকুটে গেরুয়া আর আরো হাজার রকমের বিশ্রী বাঁদুরে রঙে আমার চেহারা ভূতের মত হয়ে গেছে। কপালে আর ঠোঁটে চোট; বাঁদুরে রঙের ওপর তাজা রক্তের স্পষ্ট দাগ।

বুকের ভিতরটা টনটন করে উঠল। জোর করে রঙ মাখাতে আসা লোকগুলোর বিশ্রী হুঙ্কার আমার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল;
"গণতন্ত্রবাবু, আজকের দিনে অমন একটু হয়। মাইন্ড করতে নেই। এ দিনটায় অন্তত আমরা পার্টিরা একটু ফুর্তি করব না আপনার সঙ্গে? তা কি হয়? এই একটাই তো দিন। বুরা না মানো গণতন্ত্রবাবু, ইলেকশন হ্যায়"।

Sunday, March 17, 2019

মুকুলবাবু আর প্লেন হাইজ্যাক


২৯ সি। আইল সীট, তাই ঘনঘন বাথরুম-মুখো হওয়াটা অস্বস্তিকর ঠেকলেও মানুষজনকে ডিঙিয়ে টপকে অসুবিধেয় ফেলতে হচ্ছে না; সে'টা একটা বাঁচোয়া। প্লেন কলকাতা থেকে টেকঅফ করেছে প্রায় সোয়া ঘণ্টা হতে চলল; ইতিমধ্যে বার তিনেক উঠতে হয়েছে। নখ চিবিয়ে চিবিয়ে আঙুলের ডগাগুলোর অবস্থাও রীতিমতো বিশ্রী।  পাশের সীটে এক তরুণী বারবার আমার দিকে বাঁকা চোখে দেখছে। কপালে যে'ভাবে ঘাম জমছে আর অপর্যাপ্ত লেগ-স্পেসে যে ভাবে বারবার ছটফট করে চলেছি, মেয়েটির কুঁচকে যাওয়া ভুরু জোড়াকে কিছুতেই দোষ দেওয়া যায় না।

**

- একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এজেন্টসাতাত্তরমশাই, হাইজ্যাকের প্ল্যানে আমি ঠিক কী ভাবে রয়েছি। আমায় বন্দুকটন্দুক কিছু দিচ্ছেন না। অবিশ্যি তুবড়িতেও আমার বুক কাঁপে, বন্দুকটন্দুক হাতে দিলেও কিছু করতে পারতাম না।

- মুকুলবাবু, আর কতবার বলব। আপনার কাজ শুধু ফ্লাইট নম্বর ইএল দু'শো বাইশে সময়মত বোর্ড করা। এ'টুকুর জন্যই আপনি এতগুলো টাকা পাচ্ছেন। এ'বার অকারণে মাথা ঘামানোটা বন্ধ করুন। হ্যাঁ, আপনার থেকে আমরা লুকোতে চাইনি যে আমাদের উদ্দেশ্য প্লেনটা হাইজ্যাক করা। তবে অপারেশনের ডিটেলস জেনে আপনার কোনো উপকার হবে না।

- কাজটা দেশ এবং সমাজবিরোধী। সে'টা আমি বুঝি এজেন্টসাতাত্তরদা। কিন্তু ছেলেটার অপারেশনের যা খরচ...বড্ড ফাঁপরে পড়েছি জানেন দাদা। মাস দেড়েক ধরে কোমায় পড়ে আছে অমন হিরের টুকরো ছেলে, আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার কথা। ব্রাইট, মিশুকে, নম্র। নিজের ছেলে বলে বলছি না স্যর, বড্ড ভালো ছেলে ও। ওর অমন নির্জীব দেহ আর কাঁচের মত চোখ দেখে বুক ভেঙেচুরে যায়; বার বার। বিশ্বাস করুন! নয়তো এই বিশ্রী ব্যাপারে কিছুতেই জড়াতাম না..।

- আপনি বড্ড বাজে চিন্তা করেন মুকুলবাবু। বড্ড। পিলু সুস্থ হয়ে উঠবে, আমার অন্তত তেমনটাই মনে হয়।

- ও মা, আপনি দেখছি খোকার ডাকনামটাও জেনে বসে আছেন!   আপনার হোমওয়ার্কে তারিফ না করে উপায় নেই মশাই। আসলে কী জানেন, প্রসেসটা পুরো জানলে একটু কনফিডেন্স পেতাম। আপনাদের এত রাখঢাক, আরে আমার সঙ্গে লুকোচুরি করে লাভটা কী। আমি তো আপনারই টীমে। আমিও তো টেররিস্ট। আমার  সঙ্গে এত কথাবার্তা, এত দহরমমহরম; তবু এদ্দিনেও আপনার মুখ দেখতে পেলাম না। একবার ঝেড়ে কাশুন দেখি, আমি তো আপনারই দলে, নাকি?স্যাটাস্যাট সাধারণ মানুষকে কচুকাটা করার প্ল্যানে ঢুকে পড়েছি, তা বেশ বুঝছি। তবে নিজেকে সঁপে যখন দিয়েইছি, আমাকে নিয়ে আপনার ইয়ের কোনো মানেই হয় না।

- বেশি ভাবনাচিন্তায় কাজ গুবলেট হয়। সময়মত বোর্ড করবেন। বোর্ডিং প্ল্যান আর প্লেন নিয়ে কারুর সঙ্গে আলাপ জমাতে যাবেন না যেন; নিজের মিসেসের সঙ্গেও খেজুর করতে যাবেন না। হিতে বিপরীত হবে। কেষ্টপুরের যে স্পট আপনাকে বলা আছে; সে'খান থেকে আমাদের লোক আপনাকে তুলে নেবে আগামী সতেরো তারিখ। ঠিক সকাল সাড়ে আটটায়।

- আরে মনে আছে। আর কতবার বলবেন। অন্য টার্মিনাল থেকে এ প্লেন ছাড়বে কারণ প্রচুর ভিভিআইপি প্যাসেঞ্জার রয়েছে। আর আমার কাজ চুপচাপ আমার সীটে গিয়ে বসে যাওয়া। ২৯সি।  ইনস্ট্রাকশন আপনা থেকেই আমার কাছে চলে আসবে। আর সময়মত প্লেনটা হাইজ্যাক...।

- করেক্ট।

- শুধু একটাই রিকুয়েস্ট এজেন্টসাতাত্তরদা! একটু কনসিডার করে দেখুন। প্লীজ। ওই সতেরো তারিখই খোকার অপারেশন; ওই দিন এই অলক্ষুণে ব্যাপারটা না ঘটালেই নয়? সে'দিনটা অন্তত খোকার মায়ের পাশে থাকব না? আমি মানত করেছি যে; প্রাণ দিয়ে হলেও খোকাকে বাঁচানোর সমস্ত চেষ্টা আমি করব। আর আমি যদি সে'দিন হাসপাতালেই না থাকি...খোকার মা নিজেকে সামাল দেবে কী করে? প্লীজ..।

- এ'সব প্ল্যান অত মামুলি কারণে পালটানো যায়না মুকুলবাবু। পিলুর মঙ্গল চাইলে সতেরো তারিখ সকালে প্ল্যান মত কাজ করবেন। ফ্লাইট আর সীট নাম্বার খেয়াল থাকে যেন, কেমন? আপনার টিকিট আমার লোকের কাছেই থাকবে।

**

ঘড়িতে এখন সোয়া এগারোটা; ফ্লাইট দিল্লী পৌঁছনোর কথা দুপুর পৌনে একটায়। অবশ্য অদ্দূরের কথা ভাবার সময় এখন নয়। মনে মনে সাইমন স্নুটস হুইস্কার্স আউড়ে খানিকটা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম বটে; কিন্তু ভাঙা হাড়ের যন্ত্রণা কি আর হোমিওপ্যাথিতে কমে? প্রতিটা সেকেন্ড দুর্বিষহ মনে হচ্ছিল।

ঠিক এগারোটা বাইশ নাগাদ ঘটল গোলমেলে ব্যাপারটা। সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে নিশ্চিতভাবেই আমি ছিটকে পড়তাম সোজা প্লেনের মেঝেতে। প্লেনের পিএ সিস্টেমে যে কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল তা চিনতে আমার অসুবিধে হওয়ার কথাই নয়;
এজেন্টসাতাত্তরবাবু। অবাক কাণ্ড, এজেন্টসাতাত্তর আর আমার যে কথাবার্তাটুকু হল; তা'তে আশেপাশের কোনো যাত্রীই বিচলিত বোধ করলেন না; পাত্তাও দিলেন না।

- গুড মর্নিং মুকুলবাবু! নার্ভাস লাগছে? সীটে বসেই জবাব দিতে পারেন; আমি দিব্যি শুনতে পাব।
- সে কী মশাই, আপনি ইতিমধ্যে পাইলটকে ঘায়েল করে প্লেনটা হাতিয়ে নিয়েছেন?
- নাহ্, এ প্লেনের পাইলট আমিই।
- আপনিই? এ প্লেন আপনারই হাতে উড়ছে? তা'হলে হাইজ্যাকের ব্যাপারটা?
- হাইজ্যাকটা আপনার হাতে।
- কেমন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আর হেঁয়ালি নেওয়া যাচ্ছেনা এজেন্টসাতাত্তরদা।
- খুলেই বলি। আমি কীসের এজেন্ট, তা ভেবে দেখেননি কোনোদিন?
- বিদেশী কোনো সংস্থার নিশ্চয়ই, তবে আপনার ক্যালকেশিয়ান বাংলার দরাজ প্রশংসা না করলে অন্যায় হয়।
- আমি এ দেশের নই। তবে কোনো দেশই আমার নয় মুকুলবাবু।
- কোনো দেশ..ইয়ে...আপনার নয়?
- আপনার চেনা কোনো দেশ আমার নয়। আমি এজেন্টসাতাত্তর, মৃত্যু উপত্যকার হয়ে আমার কাজ। কলকাতা শহর থেকে মড়াদের নিয়ে আমি এই এইএল দুশোবাইশ বা এক্সিট লাইফ দু'শো বাইশ ফ্লাইটে করে মৃত্যু উপত্যকায় দিয়ে আসি।
- দিল্লী যাওয়াটা ভাঁওতা? আমি মারা গেছি এজেন্টসাতাত্তরবাবু?
- আপনি দিব্যি জ্যান্ত একজন মানুষ মুকুলবাবু। কাজেই এ মড়াদের প্লেনে আপনাকে আনতে আপনাকে একটু ভাঁওতা দিতে হয়েছে।
- রেলের অফিসের ছাপোষা ক্লার্ক আমি। হিসেবের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছি না স্যার।
- এই প্লেনের ২৯সি বরাদ্দ ছিল পিলুর জন্য মুকুলবাবু!
- না! না!
- ওর অপারেশন এখন মধ্যগগনে। অপারেশন শেষে আমার ওকে নিয়ে কলকাতা ছাড়ার কথা। এ'দিকে সীট ফাঁকা রাখলে এ প্লেন ওড়ানো যায়না মুকুলবাবু। আপনার মানতের খবর আমি আগেই পেয়েছি। আপনি ভালোমানুষ, পিলুও আদর্শ ছেলে। আপনার মানত করা ঈশ্বর আছেন কিনা আমি জানিনা, কিন্তু আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছি। এ ফ্লাইটে আপনাকে ভাঁওতা দিয়ে আনা হয়েছে; আপনি চাইলেই এ ফ্লাইট হাইজ্যাক করে কলকাতায় ফেরত নিয়ে যেতে পারেন। বন্দুকের দরকার আপনার নেই, আপনার ইচ্ছেই যথেষ্ট। আপনি বাঁচবেন,ফিরে যাবেন কলকাতায়। আপনাকে নামিয়ে এ প্লেন ফের উড়বে।
- কিন্তু ২৯সি'র সীটটা কিছুতেই খালি থাকবে না, তাই না এজেন্টসাতাত্তর?
- আপনি বুদ্ধিমান মুকুলবাবু। সমস্তই বুঝছেন। এ'বার বলুন,। হাইজ্যাক করবেন?
- এজেন্টদাদা গো। জানেন, পিলুর বয়স যখন আড়াই কি তিন; তখন ওকে ওর বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে বলত মুকু মুকুজি। মুকুল মুকুজ্জ্যে উচ্চারণ করতে পারত না। আপনি বরং আমায় এখন থেকে মুকুবাবু বলেই ডাকবেন এজেন্টসাতাত্তরদা। আর শুনুন মশায়, আপনাদের এয়ার হস্টেসরা বেশ ঢিমেতালে চলে দেখছি। দশ মিনিট আগে কফি চেয়েছি, তার এখনও পাত্তা নেই। একটু ফায়ার করুন দেখি; লম্বা ফ্লাইটে কফিটা টফিটা সময়মত না পেলে কি চলে?

Thursday, March 14, 2019

নবার চাকরী

*এ'দিক*

প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা শালপাতার বাটিটার দিকে আনমনে চেয়েছিল নবা। পাতাটার গায়ে আলুর দম সাপটে খাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। আহা, জিভের ডগাটা টসটস করে উঠল যেন। সেই কাকভোরে দু'টুকরো পাউরুটি আর তিন গেলাস জল খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছল, এখন বিকেল সাড়ে চারটে। ট্রেন আসতে আরো সোয়া ঘণ্টা, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা ন'টা। খিদের জ্বালা নবা আগে বরদাস্ত করতে পারত না, কিন্তু দেড় বছর আগে সিমেন্ট কারখানার চাকরীটা যাওয়ার পর থেকে পেটের চাবুক টানটা কিছুটা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। একবেলা ভাত খেলে অন্য বেলা দিব্যি মুড়িমাখাতেই কাজ মিটে যায়। অবশ্য নবার বৌয়ের হাতে যে'কোনো মাখাই উপাদেয়। ন'পিসিমা মাসে অন্তত একবার তাদের বাড়ি ঘুরে যান স্রেফ বৌয়ের হাতের সাবুমাখা খেতে।

তবে আজ এই পাণ্ডুয়া স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে কেমন গা'গুলিয়ে উঠছিল যেন। মদনকাকার কথায় বেশ এক দলা আশা বুকের ভিতর পাকিয়ে তুলেছিল নবা; পাণ্ডুয়ার সুতোর মিলে সুপারভাইজরের চাকরী। মিলটা মদনকাকার ভায়রার; মদনকাকা নিজে সুপারিশ করেছিলেন। বৌয়ের সঙ্গে গতরাতে কত কথা হল; টিউবওয়েলটা সারাই না করালেই নয়, আগের সেভিংস অ্যাকাউন্টটা তো গোল্লায় গেছে; নতুন করে একটা খুলতে হবে, সাদার ওপর গোলাপ প্রিন্টের একটা বিছানার চাদর বৌ দেখেছিল গৌরহরি বস্ত্রালয়ে;মাস দুয়েকের মাথায় তেমন একটা কেনা গেলে বেশ হত। কিন্তু মদনকাকার ভায়রা যে আদৌ সুবিধের মানুষ নয় তা আজ টের পেলে নবা। মদনকাকাকে সে মোটেই তেমন তোয়াক্কা করে বলে মনে হল না, তাঁর সুপারিশকে সে পাত্তা দেবেনা সে'টাই স্বাভাবিক।

নবার যত মনখারাপ শুধু বৌয়ের কথা ভেবে। বেচারির বুক ফাটলেও মুখ ফোটেনা; তবে তাঁর কষ্ট দিব্যি আঁচ করতে পারে নবা। সে বড় আশা করেছিল; এ'বারে কিছু একটা হিল্লে হবেই। কিন্তু এ চাকরি পাওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। জানলে বৌয়ের মনটা হ্যারিকেনের কাচের মত ভেঙে চুরমার হবে। তখন নবার মনে পড়ল; বেশ কিছুদিন ধরে কিনব কিনব করেও হ্যারিকেনের নতুন কাচ কেনা হচ্ছে না।

যাই হোক, বৌয়ের আশাভরসা আজকেই কোতল করা চলবে না। তাকে নবা বলবে যে আশা আছে। অবশ্য নবা এও জানে যে বৌ তার মিছেকথাগুলো দিব্যি ধরতে পারে। আবার এ'টাও জানে যে তার মিথ্যে ধরে ফেলার ব্যাপারটা তার বৌ সহজে তাকে জানতে দেয়না। তবে সেই ভালো, তেমনটাই থাক না। সাতদিন অন্তত টিউবওয়েল সারানোর আলোচনা হবে, নতুন সেভিংস অ্যাকাউন্টের ফন্দি কষা যাবে আর আলোচনায় থাকবে গোলাপ ছাপের বিছানার চাদর।

*ও'দিক*

বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল মিনু।  একটা লাল পিঁপড়ে একটা চিনির দানা নিয়ে শশব্যস্ত। আহা রে, পিঁপড়ের ছটফট দেখে তার বরের কথাটা মনে এলো।  বরটা জানপ্রাণ লড়িয়েও একটা চাকরি জোটাতে পারছে না। মিনুর খুব কান্না পায়; অভাবে নয়, বরের ছটফটে। লোকটা বড় ভালো। বড্ড ভালো; গোটাদিন টইটই করে ঘুরে হন্যে হয়, এর ওর ফাইফরমাশ খাটে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। সাবুমাখা খাওয়ার অছিলায় ন'পিসিমা মাঝেমধ্যে চালটা ডালটা রেখে যান, তা'তে ক'দিন সোয়াস্তি থাকে বটে; কিন্তু সে'সব ফুরোতেও সময় লাগে না।

মিনু কান্না চেপে রাখতে পারে। শুধু নিজের কান্না চেপে রাখা নয়, দিব্যি নিজের বরটাকেও কথায় ভুলিয়ে রাখতে পারে। এই যেমন সে স্পষ্ট জানে যে মদনকাকা তার বরকে অকারণ হয়রান করছে; দু'চার দিন বেগার খাটানোর জন্য চাকরীর লোভ দেখাচ্ছে তাকে।  মিনু এও জানে যে আজ তার বর মিছে আশায় অকারণ পাণ্ডুয়া গেছে, সে সুতোর মিলের চাকরী তার জুটবে না। তবু কথাটা দড়াম করে বলতে মনে সরেনি মিনুর। গতকাল গোটারাত তারা দু'জনে একে অপরকে জাপটে কতশত গল্প করেছে; চাকরী পেলে কী কী খরচ করবে তার ফিরিস্তি। মিনু জানে যে তার বর আজ বাড়ি ফিরেও স্বীকার করবে না যে সুতোর মিলের চাকরী তার জোটেনি। আবার এ'টাও ঠিক যে তার বর মনে মনে জানবে যে মিনু সব টের পায়। সব। তবু মিনু বরকে জড়িয়ে গল্প ফেঁদে বসবে; টিউবওয়েল সারাইয়ের গল্প, নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার গল্প, গোলাপ ছাপানো বিছানার চাদরের গল্প; আরো কত কী ছাইপাঁশ আকাশকুসুম।

সংসারে চাল নেই, ডাল নেই; গল্পগুলো মরে গেলে মিনু আর মিনুর বর খাবেটা কী?

Saturday, March 2, 2019

প্রমোশন


এই গতকালের ব্যাপার। স্প্রেডশিটের দিকে চোখ রেখে আনমনে আন্দুলের কথা ভাবছিলাম। আন্দুল কেন? তেমন নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। স্কুলের বন্ধু নাড়ু একটা ফ্ল্যাট কিনেছে আন্দুলে, বহুদিন যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। আন্দুলের বদলে জর্জ অরওয়েল নিয়েও ভাবা যেত, ভাবা যেত খৈনি আর গঙ্গার ঘাট নিয়ে। মোদ্দা কথা এ মড়া স্প্রেডশিট থেকে মনকে লেভিটেট করে উঠিয়ে নেওয়াটাই জরুরী।

"তোমার তো পামিস্ট্রিতে বেশ ন্যাক আছে, তাই না নির্মল"?

টেবিলের ও'পাশ থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে সামান্য চমকে উঠতে হল। বসের প্রশ্ন। পার্সেন্টেজ আর প্রজেকশন বাদ দিয়ে পামিস্ট্রি? আন্দুলের আলুথালু ভাব থেকে মনটাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে টানটান হয়ে বসতে হলে।

"আগ্রহ। পড়াশোনা। দু'টোই। কিন্তু কী ব্যাপার স্যর? মার্কেট শেয়ারের ট্রেন্ড বুঝতে জ্যোতিষের অ্যাসিস্টেন্স নেওয়ার কথা ভাবছেন নাকি"?

"প্রমোশন এক্সপেক্ট করছি হে নির্মল। হেডঅফিস থেকে হিন্ট একটা এসেছে। রীতিমত পসিটিভ। তাই ভাবছিলাম তোমার জ্যোতিষবিদ্যের দৌড় একবার বাজিয়ে দেখি"।

"হেডঅফিস যখন বলেইছে..."।

" অলমোস্ট শ্যিওর। কালকেই সুখবরটা পাওয়া উচিৎ। তবু। চাপা টেনশন তো থাকবেই। আমার মুখ দেখে কিছু প্রজেক্ট করতে পারছ কি"?

"মুখ দেখে ভাগ্য বিচার? সে'সব বিজ্ঞাপনি বুজরুকিতে আমি নেই। আপনার রাশিটা কী স্যর? বাংলা মতে"?

" বলে রাখি; আমার এ'সবে আদৌ তেমন ফেথ নেই। জাস্ট একটা কিউরিওসিটি মাত্র। আমার রাশি...ইয়ে...মেষ.."।

"মেষ..? হুঁ। হুমমম"।  জ্যোতিষ আমার নেশা এবং অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্র; মগজ ও হৃদয় দুইই চট করে চনমনে হয়ে উঠল। চোখের সামনে গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল নক্সা ছড়িয়ে পড়ল নিমেষের মধ্যে।

" কী ব্যাপার নির্মল? জটিল ক্যালকুলেশন শুরু করলে মনে হচ্ছে"?

"জটিল বটে। তবে স্পষ্ট। প্ল্যানেটারি মুভমেন্ট যা দেখছি স্যর; ইয়ে..."।

" ইয়ে মানে কী"?

"হবে না। আপনার প্রমোশন এ'বারে কিছুতেই হবে না"।

" হোয়াট"?

"হেডঅফিস গাঁজা ছেলেভুলোনো খবর পাস করেছে। আপনার প্রমোশন হতে হলে বেস্পতির অর্বিট চেঞ্জ করতে হয়। সে'টা ইম্পসিবল"। গলার মধ্যে থেকে আত্মবিশ্বাস ও দিব্যদৃষ্টি মেশানো একতাল ইস্পাত উঠে এলো যেন৷

আর তখনই বসের মুখের অন্ধকার আর আচমকা শক্ত হওয়া চোয়ালে ঘরের তাপমাত্রা একধাক্কায় চার ডিগ্রী নেমে গেলো।

" যত্তসব ইডিয়টিক মাম্বোজাম্বো। প্ল্যানেটারি মোশনস না কাঁচকলা। আর তোমার আধঘণ্টাতেও রিপোর্ট শেষ হয়নি নির্মল? আর কতক্ষণ "?

***

আজ চারপাশটা কেমন ঘোলাটে ঠেকছে। হেডঅফিস থেকে খবর এসেছে, বসের প্রমোশনটা হয়নি। 'লাস্ট মোমেন্ট এমার্জেন্সি'র অজুহাতে আটকে গেছে। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই ভদ্রলোক আমার ওপর অকারণ খ্যাঁচম্যাচ করে চলেছেন।

এইমাত্র মনে পড়ল এ'বছর আমারও প্রমোশনটা হওয়ার কথা, খবর আসবে সামনের সপ্তাহে। মোটের ওপর নিশ্চিন্তই ছিলাম; সদ্য ধারণ করা গোমেদটা যে কাজ করবেই তা নিয়ে কোনো সন্দেহ গতকাল পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু আজ বসের মেজাজ দেখে নিজের জ্যোতিষবিদ্যের ওপর কনফিডেন্সটা বেশ নড়ে গেছে। বসকে চ্যাটাং সুরে কথা বলার প্রভাব সম্ভবত গ্রহ-নক্ষত্রকে বিশ্রীভাবে ভড়কে দিচ্ছে। এখন টেনশন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে।

ভাবছি আগামীকাল হাফছুটি নিয়ে আন্দুলে নাড়ুর ফ্ল্যাট থেকে একটু ঘুরে আসব। নাড়ু বরাবর বলে বেস্পতির মুভমেন্টের চেয়ে সিঙ্গল মল্টের কোয়ালিটি হৃদয়ে বেশি প্রভাব ফেলে; আজ আমার খুব নাড়ুকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে।

ধপাস

সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। বহুক্ষণ পর আমার পড়া একটা প্রবল 'ধপ...