Monday, August 24, 2020

জন্মদিন আর চাকরীর গল্প


- বায়োডেটাখানা তো মন্দ নয়।

- থ্যাঙ্ক ইউ।

- ফীডব্যাক নাম্বার ওয়ান। আপনার পশ্চারটা ঠিক নয়৷ ইয়ং ম্যান, ইউ আর স্লাউচিং। এ'রকম সিরিয়াস ইন্টারভিউয়ের সে'টা মোটেও বরদাস্ত করা যায়না। 

- ওই। সামান্য গা ম্যাজম্যাজ, তাই আর কী। যাকগে। বলুন।

- এই চাকরীর জন্য আমরা একজন চটপটে ক্যান্ডিডেট খুঁজছি। সামান্য ম্যাজম্যাজে গা এলিয়ে দেওয়া শখের প্রাণ গড়ের মাঠ মার্কা মানুষ দিয়ে আমাদের চলবে না।

- আপনার চোখ তো থার্মোমিটার নয়। ম্যাজম্যাজটাকে সামান্য বলে কোয়ালিফাই করাটা কি ঠিক হচ্ছে?

- এঁড়ে তর্কের টেন্ডেন্সি। ফীডব্যাক নাম্বার ট্যু।

- ও'টাকে আমি স্ট্রেন্থ বলেই জানি। বরাবর।

- আপনি কোনওদিন বোর্ডরুমে প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন?.

- আপনি কোনওদিন কফি হাউসে আড্ডা দিয়েছেন?

- এ'টা আমার প্রশ্নের উত্তর নয়।

- কর্পোরেটে আপনারা আদত উত্তর এড়িয়ে চলার জন্য পাওয়ারপয়েন্টে প্রেজেন্টেশন ব্যাবহার করেন।  ওই একই প্রয়োজনে আমি কবিতা লিখি। দু'একটা লেখায় সুরও দিয়েছি। শুনবেন নাকি? 

- তার চেয়ে বরং আপনার প্যাশনের ব্যাপারে শুনি৷ কী করতে ভালো লাগে আপনার?

- আপনি কি সত্যিই আমার ভালোলাগাগুলো জানতে চাইছেন? না আমার অধ্যবসায় নিয়ে কিছু বললে খুশি হবেন?

- যে কোনও বিষয়ে ভালোবাসা থাকলে অধ্যবসায় তৈরি হবেই।

- আপনার এ ধারণা ভুল। আমাদের ফুটবল কালচারের দিকেই দেখুন না৷ ভালোবাসা? ডেফিনিটলি আছে। অধ্যবসায়?  ডিবেটেবল।

- ভালোবাসাগুলোকে অধ্যবসায় দিয়ে গড়েপিটে নিতে না পারলে সে ভালোবাসার আদৌ কী দাম বলতে পারেন।

- দিব্যি আড়াই বছর প্রেম করলাম। কিন্তু স্টার্টিংয়ে সামান্য এগারোশো দেওয়া চাকরিটাও ম্যানেজ করতে পারলাম না। ওই, ভালোবাসার জন্য পার্কে যাওয়ার হুজুগটুকু ছিল অথচ চাকরীর জন্য পড়াশোনার করাটা যে সংসার স্থাপনের জন্য জরুরী অধ্যবসায়, সে'টাই গুলিয়ে ফেললাম। সে প্রেমিকা এখন আমাকে সাইডে রেখে বিয়েথা সেরে কসবায় সেটলড। 

- ট্র‍্যাজিক।

- যে'কোনও ব্যাপার ট্র‍্যাজেডির ফিল্টারে প্রেজেন্ট করলে লোকে খায়। এই যেমন এ ক্ষেত্রে আপনিও খেলেন। তাই না?

- সো ইউ আর নট অ্যাভার্স টু সেলিং ইওরসেল্ফ।

- আদৌ নয়। আফটার অল, আমি সন্ন্যাসী নই। তবে কী জানেন স্যার, ডিমান্ড কার্ভ আর সাপ্লাই কার্ভের ইন্টারসেকশনেই যে সমস্ত সত্যি লুকিয়ে আছে, এ কথাকে অমোঘ সত্য বলে মেনে নিতে মন সরে না।

- ডিমান্ড সাপ্লাইয়ের কদর করেন না বলছেন?

- কদর যে একদম করিনা তা নয়। নয়ত চাকরীর জন্য হন্যে না হয়ে একটা টিউশনি খুঁজতে বেরোতাম। তবে ওই, ও'টুকুই শেষ কথা হতে পারেনা।

- আপনি ছাত্র পড়ান? সাহিত্য নিশ্চয়ই?

- অঙ্ক। 

- আপনি তো কবিতার মানুষ। অঙ্কের হার্ড লজিক বরদাস্ত হয়?

- লজিক নিরেট নয়। হিমশীতল নয়। 

- কোরাপশন সম্বন্ধে আপনার কী মতামত? 

- কোরাপশনের জন্য শুধু লোভই যথেষ্ট নয়। তার জন্য ধক লাগে। 

- লোভ আর ধক,এ দু'টো আপনার মধ্যে কতটা পরিমাণে রয়েছে?

- লোভ সাড়ে ষোলো আনা। কিন্তু সাহসটা বেশ কম জানেন। আর ভীতুর লোভে কোরাপশন কতটা আছে জানিনা, শয়তানি রয়েছে ঢের। 

- আপনার বায়োডেটা বলছে আজ আপনার জন্মদিন।

- আপনি বায়োডেটা আর সার্টিফিকেটে বিশ্বাস করেন?

- করা উচিৎ নয় বলছেন?

- পলিটিশিয়ানদের বক্তৃতা।  আর ভদ্রলোকের বায়োডেটা৷ চোখ বুজে বিশ্বাস করলে ঠকবেন।

- তবু। নিরেট লজিক মেনে নিয়েই বলি; হ্যাপি বার্থডে মিস্টার কলকাতা। আর শুনুন। আপনাকে আমার ভালো লেগেছে৷ এ চাকরীটা আপনি পাচ্ছেন।

- ইমিডিয়েট জয়নিং?

- অফকোর্স।

- আসলে, আজ রাস্তায় বিশ্রী গরম ছিল। ফেউফেউ করে ঘোরাঘুরি করতে করতে দেখলাম চামড়া জ্বলে যাওয়ার উপক্রম। তাই এয়ার কন্ডিশনিংয়ে ঘণ্টাখানেক কাটানোর জন্য এই ইন্টারভিউ দিতে ঢুকে পড়লাম। হাতে বায়োডেটা থাকায় কোনও অসুবিধেও হলনা। এ চাকরী আমি নিতে পারব না। মাস দুয়েকের জন্য ঘুরতে বেরোব ভাবছি। 

- স্টার্টিংয়ে কিন্তু আমরা এগারোশোর চেয়ে বহুগুণ বেশি দেব।

- গুপ্ত প্রেসের পঞ্জিকা আর কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো, দু'টোই আমি নিয়মিত কনসাল্ট করি। আর দু'টোই বলছে যে ডিমান্ড কার্ভ আর সাপ্লাই কার্ভের ইন্টারসেকশনে পা দিলেই আমার কপালে বিশাল ফাঁড়া প্লাস বুর্জোয়া ক্যালামিটি। আজ আসি স্যার। 

- ওয়েল। ওকে। অ্যান্ড ওয়ান্স এগেন, মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে।

Sunday, August 23, 2020

রবিবারের হিসেবকিতেব


সকাল।

লুচি বেগুনভাজা মুখে দিয়ে শ্যামল মিত্রের গান, 
আর পাশাপাশি কয়েক পাতা শীর্ষেন্দু, অদ্ভুতুড়ে সিরিজ। 
জলখাবার শেষে জিলিপি চিবুতে চিবুতে নারায়ণ দেবনাথ।
আকাশের সিচুয়েশন যাই থাক, আদত রোদ্দুর জেনারেট করতে হবে মনের মধ্যে। এবং সে রোদ্দুর হতে হবে 'ও মন কখন শুরু কখন যে শেষ' মার্কা সুপার-মিঠে। 

***

প্রি-দুপুর।

রান্না চলাকালীন স্টিলের বাটিতে দু'পিস মাংস এক পিস আলু নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা। তখন আবার কানের ইয়ারফোনে মান্নাবাবুর 'ও আমার মন যমুনার' সুর ফ্লো করবে। স্নানের আগে মনটাকে একটু মাটন-মান্না রোম্যান্সে ম্যারিনেট না করলেই নয়।

***

দুপুর।

খেতে বসে তাড়া নেই। খাওয়া শেষে হাত ধোয়ার হুড়োহুড়ি নেই। আড্ডা আছে, এঁটো হাত শুকিয়ে যাওয়া আছে। নিজের রান্নার অ্যানালিসিস আর অন্যের রান্নার প্রশংসা আছে। আর আছে লাঞ্চ সেরে খাটে ফ্ল্যাট হয়ে হেমন্তবাবুর হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া। প্রো-টিপঃ ব্যাকগ্রাউন্ডে লো ভল্যুমে জীবনপুরের পথিক আর চোখের সামনে ক্যালভিন অ্যান্ড হবসের কমিক্স বই দিব্যি খাপেখাপ মিলে যায়। 

ভাতঘুম শব্দটায় তুলসীবাবু রয়েছেন,সিয়েস্টায় রয়েছেন ছবি বিশ্বাস। গান আর কমিক্সের মিশেলে কোনও রবিবার হয়ত চোখ ভার করে নেমে আসবেন তুলসীবাবু। আবার অন্য কোনও রবিবার দুপুরে ঘুমের আয়েশে থাকবেন ছবি বিশ্বাস। 

***

সন্ধ্যে।

রোব্বার সন্ধ্যেয় ছাতে মাদুর পেতে বসতে পারায় শুনেছি গঙ্গাস্নানের পুণ্য। মুড়িমাখা আর লেবু-চায়ের কম্বিনেশনকে খোলা আকাশের নীচে না আনতে পারলে নাকি সমস্ত মাটি।

সোমবারের ব্যস্ততা শুরুর আগে, এমন ছাতসন্ধ্যে বেশ টনিকের কাজ করে। পাশে আধো-মনখারাপ আর স্নেহ মিলিয়েমিশিয়ে কিশোরবাবু গাইবেন পাখিদের না ফেরার গান।

***

রাত।

ইলিশের রোয়াব যে থাকতেই হবে তার কোনও মানে নেই। ট্যাংরার গরম গরম ঝোলে বা মৌরলার ঝালেও এস্পারওস্পার সম্ভব। বিয়ের আগের প্রেম জমে নন্দন চত্বরে বা মিলেনিয়াম পার্কে; এ কথা নেহাৎ ফেলনা নয়৷ তবে বিয়ের পরে প্রেম খোলতাই হয় পোস্ট-ডিনার একসঙ্গে বাসন মাজায়। এর হাতে কড়াই, ওর হাতে সসপ্যান; কিচেন সিঙ্কের সামনে গা-ঘেঁষাঘেঁষি গল্পগুজব। 

হাতে ভিম-ভারের ফেনা, মুখে হাসি, সস্তা ঠাট্টা-তামাশা আর ব্লুটুথ স্পীকারে সাতপুরনো যত হিন্দি গান; এর সামনে উত্তমবাবুর মোটরবাইক আর সুচিত্রাদেবীর 'তুমি বলো' ফেল পড়তে বাধ্য৷

Saturday, August 22, 2020

আইডিয়ালিস্ট


- ঘুষ?

- অফারটাকে আপনি ঘুষ হিসেবে কেন দেখছেন মিস্টার সান্যাল। আমাদের জন্য আপনার যে'টুকু ইনকনভিনিয়েন্স হবে, এ'টা তার জন্য সামান্য একটা কম্পেনসেশন।

- দেখুন মিস্টার তালুকদার। আমি নিজের দায়িত্ব সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন। আর নিজের কাজটাকে ইনকনভিনিয়েন্স বলে আমি মোটেও মনে করিনা। আপনার ফার্মের ফাইলটা আমি দেখেছি৷ ইট উইল বি প্রসেসড ইন ডিউ কোর্স।

- ডিউ কোর্সে তো হবেই৷

- অফ কোর্স। তাছাড়া আপনাদের প্রপোজাল আমি নিজে রিভিউ করেছি৷ ইউ হ্যাভ প্রেসেন্টেড আ ভেরি কমপেলিং কেস। বড়সাহেবদের মনে ধরবে নিশ্চয়ই। কাজেই এই বিশেষ কম্পেনসেশনের চিন্তাটা বাদ দিতে পারেন।

-  মিস্টার সান্যাল৷ বড়সাহেবরা তো স্রেফ সই করবেন। ডিসিশন মেকিং তো আপনার লেভেলেই..।

- বড়সাহেবরা ভেন্ডর সিলেকশনের মত জরুরি প্রপোজালে অন্ধের মত সই করবেন, আপনার এমন ধারণা কিন্তু ভুল।

- আমরা ছাপোষা ভেন্ডর। কিন্তু আপনার গুরুত্বটা বুঝি মিস্টার সান্যাল৷ আমাদের প্রপোজালটা যে ইনফিরিয়র কোয়ালিটির নয়, সে'টা আপনি জানেন। আপনি স্পেশ্যালি রেকমেন্ড করে আমাদের ফাইলটা এগিয়ে দিলে সার্ভিসের দিক থেকে আপনাদের ফার্মের যে কোনও ক্ষতি হবে না সে আশ্বাস আমি দিতে পারি।

- আপনাদের প্রপোজাল নিশ্চয়ই ইনফিরিয়র কোয়ালিটির নয়৷ কিন্তু আমার দায়িত্ব শ্রেষ্ঠ প্রপোজালটা রেকমেন্ড করার।

- সে কাজটা সহজ করে দিতেই আমাদের এই সামান্য অফার।

- ঘুষ।

- শব্দটা কানে বড্ড ঠেকে মিস্টার সান্যাল৷ ইউ আর মাচ বিগার দ্যান সাচ চীপ ওয়ার্ডস।

- মাফ করবেন তালুকদারবাবু। এথিকস-এর ব্যাপারে আমি একটু একগুঁয়ে।

- আমি আপনাকে জোর করতে পারিনা। তবে, ব্যাপারটা যদি রিকনসিডার করতে পারেন..প্লীজ গিভ মি আ কল। 

**

- এতক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি, ফোন ধরছ না কেন?

- সরি মিলি। ওই তালুকদারকে মনে আছে? 

- ওই সেই ফর্সা টাকমাথা? ক্লাবে দেখা হয়েছিল গত মাসে? তোমাদের অফিসের সেই সাপ্লায়ার? ভারী গায়ে পড়া লোক কিন্তু। 

- অফিসের বড়বাবুদের গায়ে পড়ে ইম্প্রেস না করলে চলবে কেন। সে এসে গল্প জুড়েছিল, তাই আর ফোনটা ধরিনি। ঘুষ দিতে এসেছিল।

- সে কী! অফিসে এসে সামনাসামনি ঘুষ অফার করলে? কী দুঃসাহস। তা, তুমি কী বললে?

- এরা গভীর জলের মাছ। এদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়াটা বিপদজনক।  তবে পত্রপাঠ বিদেয় করেছি।

- আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ। 

- আইডিয়ালিস্ট ছেলেকে বিয়ে করেছ শুনে তোমার প্রমোটার বাবা একসময় বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন কিন্তু।

- আইডিয়ালিজম আর সাকসেসকে যে দিব্যি পাশাপাশি বসানো চলে, সে'টা তুমি প্রমাণ করে ছেড়েছ। বাবা তো আজকাল সর্বক্ষণ তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷  

- আজকের ডিনারটা ভুলে যাওনি তো?

- না রে বাবা না। সে'টা জিজ্ঞেস করতেই তো ফোন করেছিলাম। কখন পিক করছ? 

**

- হ্যালো হালদারবাবু।

- গুড ইভনিং সান্যাল সাহেব। 

- আমার জিনিসটা?

- ডায়মন্ড সেটটা আজ সকালে আমি নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছি। ওই, ম্যাডামের জন্য আপনি যে'টা পছন্দ করে দিয়েছিলেন। তা আপনারা যেখানে ডিনার করতে যাবেন, সে'খানেই ডাইরেক্টলি পাঠিয়ে দেব না হয়? 

- এই বুদ্ধি নিয়ে ব্যবসা চালান কী করে? বউয়ের সামনে এসে আপনার লোক সেই সেট হাতে ধরিয়ে দেবে? আমার মানইজ্জত ফ্র‍্যাকচার না করালেই নয়, তাই না?

- ওহ হো। সরি সান্যাল সাহেব। সরি। আমি বরং ও'টা এখুনি আপনার অফিসেই পাঠিয়ে দিচ্ছি৷ 

- আধঘণ্টার মধ্যে যেন চলে আসে। আর একটু ডিসক্রিটলি..।

- শ্যিওর। ইয়ে, সান্যালসাহেব৷ আমাদের ফাইলটা কি এগোল?

- এগোবে৷ তবে শুধু এই ডায়মন্ড সেটে চিঁড়ে ভিজবেনা হালদারবাবু।

- কিন্তু আমাদের তো তেমনই কথা হয়েছিল..।

- তালুকদার এসেছিল আজ অফিসে৷ ওদের ফার্মও কম্পিট করছে৷ 

- ওহ।

- কোয়ালিটির দিক থেকে, ওদের ফাইলটা কিন্তু নেহাৎ ফেলনা নয়।

- সান্যালসাহেব। তালুকদার যাই অফার করেছে আমি সে'টার ওপরে যাবই। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। শুধু আমাদের ফাইলটা যেন...।

- আধঘণ্টার মধ্যে যেন জিনিসটা আমার হাতে চলে আসে। তারপর ওয়াইফকে পিক করে ডিনারে যাওয়া। দেরী হলেই মুশকিল৷ আজকাল ট্র‍্যাফিকের যা অবস্থা..।

পুজো আসছে


- পুজো আসছে বিপিনদা। পুজো আসছে।

- পুজোর পাঁচটা দিন বাদ দিলে গোটা বছরই তো বাঙালির "পুজো আসছে পুজো আসছে" করে কেটে যায়।

- ধ্যাত। আপনি বড় রুখাসুখা। ওই ফাইলবোঝাই টেবিল ছেড়ে একটু বারান্দায় এসে দেখুন না। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হবে এই হল রিয়েল পুজোবার্ষিকী। 

- পুজো আসছে৷ করোনা থাকছে।

- তা বটে। তবু এমন আকাশ দেখলে..।

- এ'বছর জুমে প্যান্ডেল হপ করতে হবে।

- না। প্যান্ডেল হপার আমি নই।

- তবে কী? রেস্টুরেন্টে ঘণ্টা পাঁচেক লাইন দিয়ে পুজোসস্পেশাল বাসি বিরিয়ানি? 

- পুজোয় রেস্টুরেন্টের খপ্পরে পড়িনা। বড়জোর স্টলের রোল। পুজোর আদত হইহইরইরই তো নিজেদের হেঁসেলে।

- করোনাই তো, এমন আর কী। পুজোর পাঁচদিনই বরং ভীড় ঠেলে মাছ মাংস মুর্গি কিনুন। গিলুন যতখুশি। কী আর হবে, প্রাণটাই না হয় যাবে। এ বাজারে প্রাণ ধরে রাখাও বড় জ্বালা।

- না না। কোভিডিয়ট আমি নই। তাছাড়া জানেনই তো। মাইনেতেও কোপ পড়েছে৷ এ'বেলা ও'বেলা চর্ব্যচোষ্য হয়ত ম্যানেজ হবে না।

- কিছুই যখন হবে না, তখন পুজো আসছে পুজো আসছে করে লাফানোর কী আছে?

- যদ্দিন মা বেঁচে ছিল, পুজোয় প্রতিবার বাড়ি ফিরতাম জানেন। প্রতিবার। অগস্ট পড়লেই ফেরার টিকিট কাটতাম। মা নেই, পৈতৃক বাড়িও বেচে সাফ। কাজেই সেই ফেরাটুকুও বাদ গেছে বেশ কয়েক বছর হল। কিন্তু এই হাই কোয়ালিটির পুজো-আসছে-মার্কা আকাশ দেখলে এখনও মনের মধ্যে "এ'বার বাড়ি ফেরা" মার্কা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাইরি বিপিনদা। জানি পুজোর দেরী আছে তবু..। আর এই প্যান্ডেমিকের বাজারে এই গন্ধটা যেন আরও জরুরী। বেশ বুকে বল পাচ্ছি কিন্তু।

- কবিতা লিখুন গুপ্তবাবু।  কবিতা৷ অফিসের খাজা সব ফাইলটাইল ঘেঁটে কী হবে। রবিনসন ইলেক্ট্রিকালসের ফাইলটা বড়সাহেব চাইলে বলে দেব, পুজো আসছে তো। গুপ্তবাবু ফাইল ক্লিয়ার না করে কবিতা লিখছিলেন। 

- কবিতার খোঁটা দিলেন বিপিনদা? তা দিন, ও আমার গায়ে লাগে না। আপনি যদি ভেবে থাকেন যে কবিতা শুধু খাতায় কলমে লেখা হয় তা'হলে সে ভাবনা পাল্টে ফেলুন। এই করোনায় রগড়ানো সময়ে পুজো-আসছে-মার্কা অকারণ ফুর্তি ইজ পোয়েট্রি ইনডীড। আর ক্রসওয়ার্ড পাজলে মুখ গুঁজে সময় নষ্ট না করলে আপনি ঠিক টের পেতেন যে রবিনসনের ফাইলটা ক্লীয়ার করে আধঘণ্টা আগেই আপনার টেবিলে রেখে এসেছি।

Thursday, August 20, 2020

ননীগোপালের খেল


১।

ল্যাম্পপোস্টে সাঁটা পোস্টারটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন ভবদুলাল মিত্র। ভরদুপুরে এমন দুম করে শশব্যস্ত ফুটপাথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ায় বিস্তর ধাক্কাধাক্কি সহ্য করতে হচ্ছিল তাকে। কিন্তু পোস্টারের ওপর থেকে কিছুতেই চোখ সরাতে পারছিলেন না তিনি। পোস্টারে একজন জাদুকরের মুখের স্কেচ৷ মুখটা গোলগাল, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, সরু শৌখিন গোঁফ আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি৷ মাথায় একটা প্রকাণ্ড পাগড়ি। ওই সাদামাটা ময়লা পোস্টারটা যেন উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে সেই জাদুকরের আলো আলো হাসিতে। 

আশেপাশের একটা মানুষও সে পোস্টারটার দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে না। অথচ সে জাদুকরের মায়াময় হাসির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে খানিকটা যেন বিহ্বল বোধ করছিলেন ভবদুলালবাবু। সামান্য মাথা ঝিমঝিমও শুরু হয়েছিল৷ হলুদ কাগজের ওপর কালো কালিতে ছাপানো সে পোস্টারটি অতি সাধারণ,  চোখে না পড়ার মতই। ঘোরটা কিছুক্ষণ কাটলে ভবদুলালবাবু ল্যাম্পপোস্টটার কাছে এগিয়ে গেলেন পোস্টারের লেখাটা পড়তে।

"জাদুসম্রাট ননীগোপাল হালদারের ইন্দ্রজাল"।
আগামী শো; বাইশে অগস্ট, ১৯৯২"।

১৯৯২। ১৯৯২। ১৯৯২। 

উনিশশো চুরানব্বই সালের ল্যাম্পপোস্টে এই পোস্টার কীভাবে এলো তা কিছুতেই ঠাহর করতে পারছিলেন না ভবদুলালবাবু। তাঁর চোখ ফের আটকা পড়লো জাদুকর ননীগোপালের হাসি হাসি মুখটায়৷ মুখটা তাঁর চেনা। ভবদুলালবাবুর পা'দুটো যেন অবশ হয়ে পড়েছিল। চারদিকে হঠাৎ একটা বিশ্রী হইহল্লা শুরু হল, কিন্তু সেই বিকট শব্দসমূহ মোহাচ্ছন্ন ভবদুলালবাবুর কানে আদৌ পৌঁছল না।

জাদুকর ননীগোপাল আর এই পোস্টার; সমস্তটাই ভবদুলালবাবুর চেনা। বড্ড চেনা।

২।

- তাই বলে এই সামান্য একটা ব্যাপারের জন্য আমার চাকরী গেল?

- ইয়েস। ফিনান্সে বলে দিয়েছি৷ নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে এখুনি বিদেয় হও।

- আমার অপরাধ আমি শখের ম্যাজিশিয়ান?

- মিত্র কেমিক্যালসের একজন সিনিয়র এক্সেকিউটিভ পাড়ায় পাড়ায় সস্তা ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াবে আর এমডি হয়ে সে'টা আমি বরদাস্ত করব ভেবেছ?

- কিন্তু অফিসের কাজে আমায় কোনওদিনও ফাঁকি দিতে দেখেছেন ভবদুলালবাবু?

- শোনো অরিন্দম, তুমি একটা দায়িত্ববান পদে ছিলে৷ অনেক আশা নিয়ে এ বছর আমি তোমায় প্রমোটও করেছিলাম, সঙ্গে মোটাটাকার ইনক্রিমেন্ট। হাইপ্রোফাইল ক্লায়েন্টদের সঙ্গে তোমার ডিল করার কথা৷ এ'দিকে গত রবিবার ভবানীপুরের মনোহরলাল সিঙ্ঘানিয়া তোমায় দেখেছে পাড়ার সস্তা অনুষ্ঠানে ম্যাজিক দেখাতে। তাও আবার জাদুসম্রাট ননীগোপাল নামে। সিঙ্ঘানিয়ার আর তোমায় সিরয়াসলি নেবে ভেবেছ? তোমার পাশাপাশি মিত্র কেমিক্যালসের রেপুটেশনও গোল্লায় যাবে। যাক গে। নাউ লীভ।

- আমার এই সামান্য শখের জন্য কোম্পানির সম্মানহানি ঘটবে ভবদুলালবাবু?

- ঘটেছে। সিঙ্ঘানিয়া বলেছে যে কোম্পানির সিনিয়র এক্সেকিউটিভ এমন ভাঁড়ের মত রঙ্গ-তামাশা করে বেড়ায়, সে কোম্পানির সঙ্গে সে কোনও ডীল করবে না৷ তুমি স্টেজে ডেকে মিসেস সিঙ্ঘানিয়ার কান থেকে কেউটে সাপ বের করেছ? ছিঃ! 

- কাজটা আপনি ঠিক করলেন না ভবদুলালবাবু। 

- ইউ স্কাউন্ড্রেল৷ তুমি আমায় থ্রেট দিচ্ছ?

- অরিন্দম দত্তের কলজের জোর নেই আপনাকে ধমক দেওয়ার। তবে জাদুসম্রাট ননীগোপালের আছে৷ 

- গেট আউট। আই সেড গেট আউট। নয়ত দারোয়ান ডেকে তোমায় গলাধাক্কা দেব..।

- যাচ্ছি। তবে এই পোস্টারটা রেখে গেলাম আপনার টেবিলে। দু'বছর বাইশে অগস্ট আমার একটা শো আছে। তদ্দিনে নিশ্চয়ই আপনার রাগ গলে জল হয়ে যাবে। আসতেই হবে কিন্তু স্যার। আজ আমি আসি।

অরিন্দম বেরিয়ে গেলে পোস্টারটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন ভবদুলাল৷  হলুদ কাগজের ওপর কালো কালি দিয়ে ছাপা সস্তা পোস্টারটা কেমন যেন টেনে ধরল তাঁকে। পোস্টারে আঁকা অরিন্দমের মুখ, অবশ্যই জাদুসম্রাট ননীগোপালের সাজে৷ হাড় জ্বালানো রাগ নিমেষে স্তিমিত হয়ে ভবদুলালবাবুকে বিহ্বল করে তুলল। মাথাটা যেম ঝিমঝিম করে উঠল৷ টেবিলে রাখা পোস্টার ভেদ করে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন একটা ব্যাস্ত ফুটপাথ। সে'খানে দিকভ্রান্ত অবস্থায় যে মানুষটা দাঁড়িয়ে তাঁকে চিনতে ভবদুলালবাবুর কোনও অসুবিধে হলনা।

অজ্ঞান হয়ে অফিসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার আগে ভবদুলালবাবু স্পষ্ট দেখতে পেলেন যে সেই ফুটপাথে দাঁড়ানো ভবদুলালের মাথার ওপর সপাটে এসে পড়ল হঠাৎ ভেঙে পড়া একটা ল্যাম্পপোস্ট। 

৩।

তেইশে অগস্ট উনিশশো বিরানব্বুইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকার তিন নম্বর পাতাটা দেখার জন্য কতদিন মুখিয়ে ছিল অরিন্দম। 

গতকাল ভরদুপুরে উত্তর কলকাতার রাস্তায় একটি ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে পড়ে শহরের শিল্পপতি  ভবদুলাল মিত্রের মাথায়। 

স্পটডেড।

"গিলি গিলি গে" বলে হেসে ফেলে অরিন্দম। দু'বছর খেটে এ ম্যাজিক তাকে বুনতে হয়েছে। ট্রেন বা তাজমহল গায়েব তো সে তুলনায় ছেলেখেলা।
 
আর যাই হোক, আদত জাদুকরের শ্রেষ্ঠ 'আইটেম'গুলোকে কিছুতেই জনসমক্ষে আনা চলেনা।

Wednesday, August 19, 2020

কলকাতা ও পাহাড়


- ফুলু রে।

- নভেলের গুরুতর জায়গায় রয়েছি। ডু নট ডিস্টার্ব। 

- তাই বলে বন্ধুর হাহাকারটা অনুভব করবিনা?

- বোচা, তুই আমার রুমমেট৷ এই মেস ছাড়া আমাদের আর কোনও যোগসূত্র নেই। যে মানুষ গল্পের বই পড়ার কনসেন্ট্রেশনে ব্যাঘাত ঘটায়, সে আর যাই হোক বন্ধু নয়।

- ও তোর মনের কথা নয় ফুলু৷ শোন না।

- উফ। কী হয়েছে?

- কদ্দিন ঘুরতে যাই না রে।

- প্রায়ই তো দেখি ঘুরতে বেরোচ্ছিস। ইলিয়ট পার্ক, মিলেনিয়াম পার্ক..।

- ধুর ধুর। সে'সব নয়৷ কদ্দিন পাহাড়ে যাইনা।

- ঘুরে এলেই পারিস।

- ছুটি পাচ্ছি কই? আর যা রেজাল্ট করেছি, ছুটি পেলেও বাবা ঘুরতে যাওয়ার টাকা দেবে ভেবেছিস? ধুস৷ কলকাতায় বসে বসে মনটন এক্কেবারে হেচড়ে গেছে। পাহাড়ের একটু হাওয়া যদি গায়ে লাগাতে পারতাম রে৷ মনমেজাজ চনমনে হয়ে উঠত।

- পাহাড়ের হাওয়া গায়ে লাগানোর জন্য পাহাড়ে যাওয়ার দরকারটা কী?

- হুম?

- তোর মত ট্র‍্যাভেলারের একটাই অসুবিধে৷ ট্রেনে-বাসে ধাক্কাধাক্কি,  ব্যাগ-সুটকেসের ওয়েটলিফটিং আর ট্র‍্যাভেল এজেন্টের ধাতানি  ছাড়া তোরা ভ্রমণের অভিজ্ঞতাটুকু স্পর্শ করতে পারিসনা।

- ট্রেনে বাস ব্যাগ সুটকেস ছাড়া পাহাড়ে ঘুরতে যাব?

- এক্সপ্লোর করার শর্টকাটগুলো জানলে স্কটসাহেবকে অমন ফাঁপরে পড়তে হত না।

- শর্টকাট? পাহাড়ে যাওয়ার?

- কাল প্রেম করতে রবীন্দ্রসদন যাবি বলছিলিস না? ফেরার পথে দু'বাক্স মোমো নিয়ে ফিরিস। আর অল্প রাম। তারপর মেসের ছাতে গিয়ে মাদুর পেতে গা এলিয়ে বসিস। কেমন? ল্যাপটপটা নিয়ে যাস। মিউট করে ইউটউবে হিমালয়ের কোনও হাইডেফিনিশন ভিডিও চালিয়ে দিস। পাশাপাশি কানে ইয়ারফোন গুঁজে কোমলগান্ধারের আকাশভরা শুনতে থাক। দু'বাক্স মোমো খেতে খেতে ওই গানটা লূপে শুনে যা। মোমো শেষ হলে গান পাল্টে অঞ্জন দত্তর দার্জিলিং প্লেলিস্ট চালিয়ে দে। আর তার সঙ্গে দু'পেগ রাম। পলিউশন বোঝাই কলকাতার বাতাসের অ-পাহাড় ব্যাপারটা শুধু অঞ্জনে কাটবে না, সামান্য ইনটক্সিকেশন ইজ নেসেসারি৷ ব্যাস, তারপর দেখিস তোর চারপাশ থেকে কলকাতার মেসের ছাত উবে গিয়ে পড়ে রইবে পাহাড়। স্মুদ অ্যান্ড ইজি৷ তোর পাহাড়ে যাওয়াও হল, আবার তোর বাবার টাকাও বাঁচল খানিকটা। টোটাল উইন উইন।

- ফুলু৷ তুই গল্পের বই পড়। আমি ঘুমোই৷ আর আমি তোকে ডিস্টার্ব করব না।

সুভাষবাবু ও রাধামোহন

- আ...আপনি এসেছেন? 

- কী চাই?

- আ..আ..আ..আপনি সত্যিই এসেছেন?

- হাতে সময় কম।

- নমস্কার স্যার। সরি..স্যালুট স্যার.। থুড়ি..লহ প্রণাম।

- এ'সব আবার কী রাধামোহন?

- আ..আপনি আমার নামও জানেন? 

- নাম না জেনে তোমার বাড়িতে আসব ভেবেছ?

- নেতাজী অমর রহে।

- প্ল্যানচেটে ডেকে বলছ অমর রহে? তোমার সেন্স অফ হিউমর তো বেশ সরেস।

- মাফ করবেন হে মহামানব। হে স্বাধীনতার ইয়ে..মানে কাণ্ডারী..।

- এ তো মহাজ্বালায় পড়া গেল৷ বলি ক্লাস সিক্সের এস্যে লেখা কতক্ষণ চালাবে? প্ল্যানচেটের মাধ্যমে আমায় ডাকতে চেয়েছিলে কেন?

- সুভাষবাবু৷ সরি..পরমপূজনীয় নেতাজী..আপনি ফিরেছেন জানলে গোটা বাঙলা..না না..গোটা ভারতবর্ষ আনন্দে উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠবে৷আমার আজ কী সৌভাগ্য... দু'হাজার কুড়ি সালে নেতাজি এসে পৌঁছলেন এই সামান্য অকাল্ট প্র‍্যাক্টিশনারের ড্রয়িংরুমে৷ আপনার সামনে আমি নতজানু স্যার।

- আত্মারা কখনও ফেরে না ভাই৷ ওই, মাঝেমধ্যে উঁকি দিয়ে যাই।

- আপনি মাঝেমধ্যে উঁকি দিলেই হবে৷ আপনার অনুপ্রেরণায় ভর দিয়ে আমরা সঘন গহন তমসা কাটিয়ে নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে যাব।

- এই সেরছে। কী কাটাবে? 

- ওই যে স্যার। সঘন গহন তমসা। কাটিয়ে দেব। প্রতিটি সাচ্চা বাঙালি যে এদ্দিন আপনারই অপেক্ষায় বসেছিল।

- রাধামোহন।  আমি ফিরিনি৷ তোমার প্ল্যানচেটে ধরা দিয়েছি মাত্র৷ এ'বার বলো দেখি, অমন হন্যে হয়ে আমার খোঁজ করছিলে কেন?

- স্যার। আপনার অন্তর্ধানের ব্যাপারটা নিয়ে খচখচ কাটছিল না৷ অথচ ব্যাপারটা নিয়ে কেউই ঝেড়ে কাশছে না। তাই ভাবলাম এদ্দিনের প্যারানরমাল বিষয়ক পড়াশোনাটা কাজে লাগিয়ে যদি হর্সেস মাউথ থেকে কেসটা জানতে পারি। কী হয়েছিল বলুন দেখি স্যার? লেঙ্গিটেঙ্গির কেস ছিল নিশ্চয়ই কিছু? বাঙালিদের কপালেই যত ট্র‍্যাজেডি, তাই না স্যার?একটু খোলতাই করে বলুন না আদতে ঠিক কী হয়েছিল। সুযোগ পেয়েইছি যখন আসলি ব্যাপারটা না জেনে আপনাকে ছাড়ছি না কিন্তু।

- মেগাসিরিয়ালের আগামী এপিসোডে কী হবে মার্কা আগ্রহ নিয়ে ইতিহাস ঘাঁটতে নেই ভাই৷ ও প্রসঙ্গ বরং থাক৷ তা, আর কোনও প্রয়োজন আছে কী?

- আলবাত আছে স্যার৷  আপনাকে পাশে পেলেই আমরা আঁধার রজনীর তোয়াক্কা না করে দেশ বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমে পড়ব। শুধু আপনার সাপোর্টের অপেক্ষা৷ একটু গাইড করুন না, দেশের সেবাটেবা করি একটু।

- বটে? রাধামোহন? 

- হুকুম করে দেখুন না স্যার৷ আপনি চাইলেই লিটার লিটার রক্ত দিয়ে দেব। আপনি শুধু একবার বলে দেখুন৷ আপনার গাইডেন্স পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ব। রিয়েলি স্যার। আমরা আবার ধর্মে মহান হব, কর্মে মহান হব আর ওই নবদিনমণিও উদিবে। শুধু একটা চান্স দিন স্যার আমায়৷ একটা চান্স। আপনি বললেই লিটার লিটার রক্ত দিয়ে দেব৷ দেবই।

- দু'ফোঁটা রক্ত বরং হৈমবতীকে দিও।

- হৈমবতীটা কে নেতাজী?

- তোমার এই ঘরে একটা খুদে মশা ঘুরঘুর করছে৷ ভারী মিষ্টি মশাটি। খানিকক্ষণ আগেই নজরে পড়ল। আমি ওর নাম দিয়েছি হৈমবতী।  

- ইয়ে, ঠাট্টা করছেন স্যার?

- ঘাসের ওপর কাসুন্দি ছড়ালেই কি তা খাওয়ার যোগ্য হয়ে ওঠে ভাই? ঠাট্টা অতি মূল্যবান জিনিস, অপচয় করতে নেই। তোমার প্ল্যানচেটে সাড়া কেন দিলাম সে'টা বলি বরং। তুমি দেশের ও দশের সেবার করতে চাও, তাই না রাধামোহন? 

- ভারত আমার ভারতবর্ষ গুনগুন করতে করতে আমার চোখ ভিজে যায় স্যার। দেশের হয়ে সংগ্রাম করব৷ বিপ্লব করব।

- সে'সব হবে'খন৷ কিন্তু রাধামোহন, তোমার বাথরুমের নলটা অনেকক্ষণ খোলা রয়েছে। চৌবাচ্চা ভরে ভেসে যাচ্ছে অথচ নল জল ঢেলেই যাচ্ছে৷ তোমার বেসিনের কলও তুমি টাইট করে বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করোনা। আগে জলের অপচয় আটকাও, কেমন? রক্ত দিয়ে সঘন গহন তমসা কাটানোর ব্যাপারটা না হয় আমরা পরে দেখব'খন৷

Monday, August 17, 2020

কলকাতা কলকাতা মনকেমন

ফট করে কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরে এসে পড়ার মধ্যে যে প্রকাণ্ড মনখারাপ, তা ম্যানেজ করা সহজ নয়। মাঝেমধ্যেই বুকের মধ্যে হুহু; আহা, কবে যে আবার বাড়ি ফিরব।

কলকাতার রাস্তাঘাটের খানাখন্দগুলোর কথা মনে পড়লেও বুকভার হয়ে আসে। কলকাতার বাড়ি থেকে আধমাইল এগোতেই রাস্তার ঠিক মধ্যিখানে সে এক ইয়াব্বড় গর্ত। সে গর্ত প্রতিটি ইলেকশনের আগে ভরাট হয় আর প্রতি বর্ষায় সে ফিনিক্সের মত স্বমহিমায় ফিরে আসে। কলকাতা ছাড়ার পর সে গর্তকেও বড় আপন বলে বোধ হয়; আহা, দিব্যি কেমন মাঝেমধ্যেই সে গর্তে গাড়ি-বাইকের চাকা পড়ে গোটা গা ঝনঝন করে উঠত৷ কলকাতা ছেড়ে এসে মনে হয় সে গা-ঝনঝনই যেন আমার প্রাণায়াম ছিল। 

কলকাতায় থাকাকালীন বেহালার ট্র‍্যাফিক জ্যামকে কত কটুকথা বলেছি। অথচ আজ আফশোস হয়৷ সে জ্যাম যে আমায় ডারবান-পিচে দ্রাবিড়ের ধৈর্যের মত মজবুত করেছে সে'টা তখন বুঝিনি। সেই জ্যামে ঠায় বসে থেকে এফএমে রেডিওর কত সহস্র বিজ্ঞাপন যে মুখস্থ করেছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই জ্যামে আর বিজ্ঞাপনে একবার ফিরতে পারলে যেন সামান্য শান্তি পেতাম।

তবে। সামান্য যে'টুকু স্বস্তি, তা রয়েছে কলকাতার বন্ধুদের চ্যাট-সান্নিধ্যে। কিন্তু এ বন্ধুরাও অতিখতরনাক৷ এদের গলায় থাকে স্নেহ আর বুকে থাকে বিষ৷ রাজমা-রুটি চেবাচ্ছি শুনে টাইপ করে "আহা, উঁহু" কিন্তু পরক্ষণেই জানান দেয় "উত্তর দিতে দেরী হচ্ছে কারণ একহাতে ডাবল এগ চিকেন রোল তাই অন্যহাতে ধীরেসুস্থে টাইপ করতে হচ্ছে"। 

বাড়ির সামনের রাস্তার সেই গর্তটি আর যাই হোক এই বন্ধুগুলোর মত বিপজ্জনক নয়। 

**

- এত দেরী করে উত্তর দিচ্ছিস কেন রে ভজা?

- এই মাত্র হাতে একটা ডবল এগ-চিকেন রোল এলো। তাই একহাতে টাইপ করতে সামান্য অসুবিধে হচ্ছে বুঝলি।

- বেশ। রোল মন দিয়ে খা। তারপরেই চ্যাট হবে'খন। তার আগে শুধু একটা কথা ছিল।

- বলে ফেল ভাই। 

- বলতে পারিস, একটা আব্দার ছিল।

- আরে বন্ধুর কাছে আবার আব্দার কী রে। যা চাইবি৷ তুই শুধু বল একবার।

- না করতে পারবি না কিন্তু।

- তুই বলেই দেখ না রে। বালিগঞ্জে আজও আমাদের ফ্যামিলির একটা হোল্ড আছে ভাই। যা দরকার তুই শুধু বল।

- প্লীজ সেন্ড ন্যুডস।

- শালা হারামজাদা নচ্ছার। তোর পেটে পেটে এই? বলব বৌদিকে?

- দ্যাখ ভজা। আমি কবিতা লিখতে নাই পারি, কিন্তু স্বভাবের দিকে থেকে আই অ্যাম আ পোয়েট।

- তুই একটা রাস্কেল।

- পাতি ন্যুড চাওয়ার বান্দা আমি নই ভজা। নই। তুই কলকাতায় বসে রোলে কামড় দিচ্ছিস।  আমি এতদূরে বসে হাতে। পাতি ন্যুড চাওয়ার লোক আমি নই ভজা।

- অ-পাতি ন্যুডটা কী তবে?

- ওই রোলের গা থেকে কাগজের পরতটা সুপার-স্লো-মোশনে সরিয়ে...ডিম আর মুর্গিতে ঠাসা রোল করা পরোটার ছবিটা..কোনও রকম আবরণ ছাড়া...দিবি? লংডিস্ট্যান্সে নজর দিলে বোধ হয় পেটখারাপ হয়না। দে না রে ভাই। প্লীজ।

Sunday, August 16, 2020

বোচার প্রেম


- কী চাই?

- কই৷ কিছু না তো।

- অমন সাসপিশাস হাসি নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারী করছিস কেন বোচা?

- তা'তে তোর কী? আজেবাজে বইয়েই মাথা গুঁজে থাক৷ দুনিয়ার খবরে তোর কাজটা কী।

- স্ট্যাটিস্টিক্স আজেবাজে কিছু নয়।

- ওয়েদার দেখেছিস ফুলু? মেঘলা বিকেল, মিষ্টি হাওয়া। চারদিকে বাহারো ফুল বরসাও ব্যাপার আর তুই মেসে বসে ওইসব হাড়জ্বালানো বই পড়ছিস। পাপ হবে যে।

- কী বলতে এসেছিস বলে ফেল। 

- ফুলু৷ তুই দিনদিন কাঠকাঠ হয়ে পড়ছিস। 

- সামনের সেমিস্টারে আগের মত গোল্লা পেলে তোর বাবা তোকে পিটিয়ে তক্তা করবেন৷ মার্ক মাই ওয়ার্ডস।

- বাবার কথা ভেবে বড় খারাপ লাগে রে। ভদ্রলোক কোর্ট আর মক্কেল ছাড়া এ জীবনে কিছুই চিনলেন না৷ যদ্দিন বাড়িতে ছিলাম, বাবা প্রায়ই রাতের দিকে আমার কবিতার খাতা বাজেয়াপ্ত করে টপ টু বটম স্পেলচেক গ্রামারচেক করতেন? কবিতার খাতা জুড়ে লাল কালি দিয়ে গোল্লা গোল্লা দাগ। উফ। বিভৎস। সে ভয়েই তো কবিতা লেখা ছাড়লাম। নাহ্। বাবার ভয়ে এই মনোরম মেঘলা বিকেলে বই নিয়ে আটকে থাকলে আমিও তোর মত রুথলেস যন্ত্রে পরিণত হব। তার চেয়ে বাবার চাবকানি ভালো।

- কাজের কথাটা বলে ফেল।

- কাজের কথা আবার কী ফুলু? আমি কি শুধু মতলবের মানুষ? এমন সুন্দর বিকেল। ভাবলাম তোকে ঝন্টুদার ফিশকাটলেট খাইয়ে আনি। সিম্পল। চ'দেখি, বেরোই।

- নাহ্। এখন আমার বেরোনোর ইচ্ছে নেই।

- উম..আমিই না হয় নিয়ে আসি? কাটলেটের সঙ্গে কোল্ডড্রিঙ্কসও আনব নাকি? 

- নাহ্৷ সিম্পটম ভালো না। তোর কোনও জটিল মতলব আছে।

- তোর মনটাই জটিল।

- মতলব নেই যখন ভালো কথা৷ জানালাটা বন্ধ করে ছাতে চলে যা। মেঘলা বিকেলের মিষ্টি হাওয়া গায়ে মুখে লাগবে, সুস্থ বোধ করবি।

- মতলব আদৌ নেই। শুধু ওই..।

- শুনি। শুনি।

- উর্মির জন্য একটা কবিতা লিখেছি বুঝলি। 

- উর্মি?

- বটানি। সেকেন্ড ইয়ার। ওই যে রে। গত পরশুর নীল সালোয়ার। 

- ওই, যার সঙ্গে বাজে গল্প ফাঁদার চক্করে তুই যাদবপুরের বদলে বারাসাতের বাস ধরেছিলিস? 

- উর্মি বড় ভালো রে ফুলু। সেনসিটিভ অথচ শার্প। আর হাসলে ইচ্ছে হয় উনুনে রাখা চকোলেট বারের মত গলে পড়ি৷ মাইরি।

- আবার প্রেমে পড়বি বোচা?

- আবার মানে কী? আবার মানে কী? এ'বারেই আদত প্রেম।

- আগেরগুলো তবে..।

- আরে আগের ও'সব কমিক্স ছিল। এইবারে..এইবারে রীতিমতো নভেল।

- উফ বোচা। আবার মেসজুড়ে শুরু হবে অসহ্য ন্যাকাপনা। আবার নাকানিচোবানি খাবি। 

- না রে। নাকানিচোবানি নেই। ওই যে বললাম, এ আর কমিক্স নয়। উপন্যাস। উর্মিরও আমার প্রতি প্রবল ইয়ে আছে..।

- বটে? সে নিজে তোকে বলেছে?

- স্ট্যাটিস্টিক্সের বই পড়ে পড়ে তুই একটা আস্ত গবেট তৈরি হচ্ছিস ফুলু। মেয়েরা অমন ভাবে ডাইরেক্টলি বলে কখনও?

- বলে না?

- না। হাবেভাবে আকারে-ইঙ্গিতে ওরা কথা ভাসিয়ে দেবে। আমরা লুফে নেব।

- বটে?

- শুনে রাখ। উর্মি আমায় ভালোবাসে। 

- আর উর্মির সে ইঙ্গিত বোচাবাবু কীভাবে লুফে নিল?

- কাল রাত্রে, বুঝলি। উর্মি গোবিন্দার সিনেমা দেখতে দেখতে, বিরিয়ানি খেতে খেতে; আমায় ফোন করেছিল। ফোন করেছিল শুধু এ'টাই বলতে যে গোবিন্দার সিনেমা আর বিরিয়ানির কম্বিনেশন ওকে আমার কথা ভাবিয়েছে। ইন্টিমেসির লেভেলটা ভাবতে পারছিস?

- ইন্টিমেসি? তুই শিওর?

- গভীর। যাকে বলে, প্যাশনেট। 

- হবে হয়ত৷ তোর আদত মতলবটা বললি না এখনও।

- আহ। মতলব নয় ফুলু৷ সামান্য গাইডেন্স৷ শোন না, আমি উর্মির জন্য কয়েকটা কবিতা লিখেছি। 

- আমি তো জানতাম কাকুর স্পেলচেক গ্রামারচেকের তাড়নাতে তুই স্কুলে থাকতেই কবিতা লেখা ছেড়েছিস।

- উর্মির মত একটা গোবিন্দা-বিরিয়ানি লেভেলের ইন্সপিরেশনের অপেক্ষায় আটকে ছিলাম রে৷ কাল রাত থেকে সাতটা কবিতা লিখেছি৷ কবিতা জাস্ট ফ্লো করছে, আটকাতে পারছি না।

- সে তো ভালো কথা৷ 

- কিন্তু গ্রামারচেক আর স্পেলচেকের লাল দাগ ছাড়া কবিতাগুলোকে ঠিক সার্টিফাই করতে পারছি না৷ বানান ব্যাকরণের বাতিক তোর আছে। এই আমার নতুন কবিতার ডায়েরি আর এই রইল লাল কালির পেন। দেখে দে না ভাই। তোর চেক করা হয়ে গেলে না আমি মোবাইলে টাইপ করে উর্মিকে পাঠাব। দে না রে ভাই। 

- শুধু চেক করলে হবে না, লাল কালিতে দাগিয়েও দিতে হবে? রিয়েলি? 

- বাবার কন্ডিশনিং। ওই লাল কালিতে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় না দেখলে নিজের কবিতাকে কবিতা বলে মনে করতে পারিনা।

- দে দেখি। চেক করে দিই। অ্যাস রুথলেসলি পসিবল।

- ফুলু! তোর জবাব নেই। জোড়া কাটলেট, প্রমিস।

- একটা কথা বলব বোচা?

- হাজারটা বলবি।

- উর্মির জন্য কবিতা লিখছিস৷ সাবাশ। কিন্তু বাবার কথা ভেবে মনখারাপ হচ্ছে, সে'টা বোধ হয় কাকুকে ডাইরেক্টলি জানানো যায় না। তাই না?

Friday, August 14, 2020

পতাকা আর চীফগেস্ট


- এই যে। দত্তবাবু। কাল সোয়া সাতটার মধ্যে আসছেন কিন্তু। পৌনে আটটায় বড়সাহেব এসে পৌঁছবেন৷ ফ্ল্যাগ হয়েস্টিং আটটায়।

- ধুস। পনেরোই অগস্টটাও ছাই পড়ল শনিবারে।

- নিজের মধ্যে মশাই একটু দেশাত্মবোধক ইয়ে জেনারেট করুন না।

- দেখুন গাঙ্গুলিদা, দেশাত্মবোধ নিয়ে অকারণ খোঁটা দেবেন না। মনে রাখবেন, আ ম্যানস হোম ইজ হিস ক্যাসেল। রিয়েল পেট্রিয়ট হিসেবে কাল আমার উচিৎ নিজের বাড়ির ছাতে তেরঙ্গা উত্তলন করা। বুল্টি জনগণমন গাইবে, বুল্টির মা স্পীচ দেবে। অফিসে বড়সাহেবকে চীফগেস্ট করে তেল দেওয়াটা আর‍ যাই হোক পেট্রিয়টিজম নয়। 

- স্বাধীনতা দিবস সন্তোষীমার ব্রত উদযাপন নয় যে ঘরের কোণে বসে কাজ সারবেন। দশজনের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তেরঙ্গাকে সেলুট না করলে বুকের মধ্যে হুহুটা ফীল করবেন কী করে।

- পতাকার প্রতি রেস্পেক্ট তো ভালো কথা। কিন্তু আমাদের মূল দায়িত্ব তো বড়সাহেবের প্রতি নুয়ে পড়া।

- ও'টা নুয়ে পড়া নয় দত্তবাবু৷ ও'টা ডিসিপ্লিন।

- নেতারা, বড়বাবুরা; সবাই এই স্বপ্নই দেখেন। এলেবেলে আমজনতা বুটলিকিংকে ডিসিপ্লিন হিসেবে চিনবে, সে'টাই তাঁদের কাছে আইডিয়াল স্টেট। 

- উফ। আপনি বড্ড ঘ্যাঁতা। 

- ব্রুটাল অনেস্টিকেও দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ঘ্যাঁতামো বলেই মনে করেন।

- দত্তবাবু, কাল আপনি আসছেন তো? চীফগেস্টকে আপনিই এসকর্ট করে আনবেন৷ প্ল্যানিংয়ে সে'টাই আছে।

- না এসে আর উপায় কী বলুন।

- বুটলিক তা'হলে আপনাকেও করতে হয়।

- অর্ধেক মাইনে তো তাই করেই পাই গাঙ্গুলিদা।

- শুনুন। আপনার ওয়েল উইশার হিসেবে বলছি৷ অমন কাঠকাঠ কথা সব জায়গায় চলেনা। 

- যাকগে। আচ্ছা, গাঙ্গুলিদা। অফিসের অনুষ্ঠান তো ন'টার মধ্যে শেষ৷ তাই না?

- লেট মি সী। ফ্ল্যাগ হয়েস্টিং, জাতীয় সঙ্গীত, বড়সাহেবের স্পীচ। বাই দি ওয়ে, স্পীচটা আমি ড্রাফট করেছি, ট্যু থাজ্যান্ড থ্রি হান্ড্রেড ওয়ার্ডস। তারপরে অফিস কয়্যারের চারটে দেশাত্মবোধক গান। দু'টো ফেলিসিটেশন৷ মিষ্টির বাক্স ডিস্ট্রিবিউশন। হ্যাঁ, ন'টার মধ্যে শেষ। তারপর আপনি আপনার ক্যাসেলে গিয়ে পতাকা তুলুন, কামান দাগুন। ইউ আর ফ্রী। 

- ন'টা নাগাদ আমার সঙ্গে নতুনপাড়ায় যাবেন? 

- নতুনপাড়া? অফিসের পাশের ওই বস্তিতে?

- অনিল মাস্টার আমার সুপরিচিত। প্রতি পনেরোই অগস্ট নতুনপাড়ার কিছু চালচুলোহীন মানুষের জন্য রান্নাবান্না করেন। সামান্য ডাল, ভাজা, মাছের ঝোল৷ কিন্তু শ'তিনেক মানুষের জন্য রান্না, একটু অ্যাসিস্টেন্স পেলে ওর উপকার হয়। একটা পতাকা সে'খানেও পতপত করে ওড়ে কিন্তু। কথা দিচ্ছি গাঙ্গুলিদা, অফিসের ফ্ল্যাগহয়েস্টিং চেয়ে অনেক উঁচু লেভেলের হুহু জেনারেট হবে বুকের মধ্যে।

- আই উড হ্যাভ লাভড টু অ্যাকম্পানি ইউ৷ কিন্তু ইয়ে দত্তবাবু, বড়সাহেব স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সমস্ত কর্মীদের একটা ইমেল পাঠাতে চান। বেলার দিকেই যাবে সে'টা৷ একটু ইমোশনে সুড়সুড়ি দিয়ে আর কী। একটা খসড়া তৈরি করে রেখেছি। কালকের সকালের ইভেন্টের পর সেইটা ওঁকে দিয়ে চেক করিয়ে তারপর সবাইকে ইমেল করতে হবে। সে'টা যে বেশ সময় সাপেক্ষ।

- স্বাধীনতা দিবসের আগাম শুভেচ্ছা রইল গাঙ্গুলিদা। কাল কা ইভেন্ট মুবারক হো। এখন আসি। কাল ঠিক সাতটায় হাজির হচ্ছি বড়সাহেবকে বরণ করতে।

Thursday, August 13, 2020

অরূপ ঘোষালের শহর

- এক্সকিউজ মি।

- আপ মুঝে বুলা রহে হ্যায়?

- আরে হ্যাঁ রে বাবা। আপনাকেই বুলা রহে হ্যায়।

- আরে, আপনিও বাঙালি যে।

- নমস্কার। সঞ্জয় ঘোষ। 

- নমস্কার। আমি অরূপ ঘোষাল। কিন্তু দিল্লীর রাস্তার এই ভীড়ের মধ্যে আমায় বাঙালি বলে ঠাহর করলেন কী করে বলুন দেখি? আমার চেহারা বা পোশাকে তো আলাদা করে তেমন কিছু..।

- না না। চেহারা বা পোশাক নয়। তবে এই যে। এই যে ভাজাভুজিওলার ঠেলায় অমন লোভাতুর উঁকিঝুঁকি মারলেন এবং কয়েক সেকেন্ডের মাথায় উদাস হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর মেঘলা আকাশের দিকে চেয়ে একটা প্রকাণ্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। অর্থাৎ আপনার প্রাণ চপ তেলেভাজার জন্য আনচান করছে৷ কিন্তু এই বেসনে চোবানো পাউরুটি ভাজাকে ক্লাসিকাল তেলেভাজার মর্যাদা দিতে ঠিক মন সরছে না। বিড়বিড়ও করলেন খানিকটা। স্পষ্ট শুনতে পাইনি তবে লিপ-মুভমেন্ট ট্র‍্যাক করে মনে হল একটানা খানিকক্ষণ "ধুরশালা" বললেন।

- আপনিই বলুন না। এই ব্রেডপকোড়া দিয়ে কি ছাই বৃষ্টির বিকেলের জিভের সুড়সুড় মেটানো যায়? ব্যাটা পকোড়া-ভাজিয়ে আবার পুদিনার চাটনি মাখিয়ে সার্ভ করছে। টোটাল ডিসাস্টার।

- দিল্লী তা'হলে ঘুরতে আসেননি। পাকাপাকি ভাবে এসেছেন। আর সদ্য এসেছেন। বেশিদিন হয়নি।

- কলকাতা থেকে এই মাস দুয়েক হল এসেছি। ইয়ে, আপনি কি গোয়েন্দা নাকি মশাই? বুঝলেন কী করে?

- ঘুরতে বেরোলে বাঙালির আদেখলাপনার শেষ থাকে না। দিল্লী বেড়াতে এসে আপনি ব্রেডপকোড়াকে অমন রেগেমেগে উড়িয়ে দিতেন না। বরং 'যস্মিন দেশে যদাচার' বলে হাসিমুখে খেতেন এবং খাওয়ার আগে মোবাইলে ছবিও তুলতেন৷ কিন্তু আপনি নির্ঘাৎ দিল্লী এসেছেন বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে, পাকাপাকি ভাবে। কাজেই ইন্টেন্সলি 'বাংলা আমার জীবনানন্দ মোডে' রয়েছেন। ফুলুরিকে রিপ্লেস করতে গিয়ে যে আপনি যন্ত্রণাবোধ করবেন, সে'টাই স্বাভাবিক।

- আপনি কিন্তু ঘ্যাম লোক। আচ্ছা, আর একটা কথা বলুন। দিল্লী পাকাপাকি এসেছি, সে'টা কী'ভাবে ডিডিউস করেছেন বুঝলাম৷ কিন্তু আমি যে সদ্য এসেছি সে'টা কী ভাবে বুঝলেন?

- হেহ্। দাদাভাই, বছরখানেক যেতে দিন৷ এই রাস্তা-গলিঘুপচিগুলো নেভিগেট করতে আর গুগল ম্যাপের দরকার হবেনা। চেনা সবজিওলাকে দেখে হেসে মাথা নাড়বেন। যাতায়াতের পথের অদরকারী দোকানের দোকানিদের মুখগুলোও ক্রমশ মুখস্থ হয়ে আসবে৷ ছেলেমেয়ের ডাক্তার খুঁজে পাবেন৷ নিজের পেয়ারের পানের দোকান বেছে নেবেন। এক একটা শহরের বৃষ্টি এক এক রকমের মনখারাপ আর ভালোলাগা নিয়ে আসে; একসময় দিল্লীর বৃষ্টির হিসেবকিতেবও ঠাহর করতে পারবেন৷ আর যে কলকাতাটুকুকে আপনি বয়ে বেড়াচ্ছেন, সে'টুকু একসময় এই শহরেরই কোনও এক কোণে খুঁজে পাবেন। নতুন শহর একসময় সয়ে আসবেই। তখন দেখবেন। ব্রেডপকোড়াকে ভালোবাসতে না পারলেও, পরিচিতির স্নেহটাকে অগ্রাহ্য করতে পারবেন না৷ সেই স্নেহর বশেই হয়ত একদিন এক প্লেট ব্রেডপকোড়ার পাশে সামান্য পুদিনার চাটনিও চেয়ে নেবেন৷ স্নেহ অতি গোলমেলে জিনিস। বুঝলেন না। অতি গোলমেলে।

- হুম৷ আচ্ছা সঞ্জয়বাবু, খাবেন নাকি ব্রেডপকোড়া? সদ্য আলাপ হল, একটু চা আর ওই পকোড়া দিয়েই না হয়..। তবে, আমিই খাওয়াব কিন্তু..।

- ঝুলোঝুলিই যখন করছেন, তখন বলুন দেখি দু'প্লেট। আর হ্যাঁ, ওয়েলকাম টু দিল্লী। 

Wednesday, August 12, 2020

বাঘা তেঁতুল


**১**

- কী রে বাবু। দুপুর থেকে অমন গুম মেরে বসে আছিস। মনটন খারাপ বুঝি?

- ও কিছুনা।

- মাকে "কিছু না" বলে পাশ কাটালে হবে রে?

- যাও না মা। আমার অনেক পড়া বাকি আছে।

- শিঙাড়া মালপোয়ায় মনখারাপ সারিয়ে দিতে পারি বটে। কিন্তু তুই সেধে পড়তে বসছিস, এ ব্যামোর চিকিৎসা তো আমি জানিনা।

**২**

- কী রে! মাঠে এলিনা কেন কাল বিকেলে? আজকেই বা এমন ঘরের মধ্যে গুম মেরে বসে আছিস কেন?

- তুই যা তপু।

- যা বললেই যাওয়া যায় ভাই? চ'।  মান্তুদার বাড়িতে ক্যারম পিটিয়ে আসি।

- আমি যাবনা।

- জব্বর মনখারাপ দেখছি।  তবে চিন্তা নেই৷ সেরে যাবে। 

- যত বাজে কথা..।

- এই দ্যাখ। পুজোবার্ষিকী। হাতে চলে এসেছে৷ ভালো করে দ্যাখ। সুনীল, মতি, শীর্ষেন্দু, সঞ্জীব, সমরেশ। পেপারকাকা হাতে গরম দিয়ে গেল ভাই৷ তাই তোর কাছে ছুটে আসা।

**৩**

- আরে৷ অত ভাবার কী আছে৷ এই ইন্টারভিউতে হল না। পরেরটায় হবে। রিল্যাক্স। এতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই।

- ভেঙে পড়িনি বাবা৷ শুধু ওই..। 

- মনখারাপ। তাই তো?

- না না। ও কিছু নয়..।

- কিছু না হলেই ভালো। একটা ঝটিকা পুরীসফরের জন্য তৎকালে টিকিট কেটেছি। শুক্কুরবার রাতের ট্রেনে যাওয়া, সোমবার রাতের ট্রেনে ওয়াপিস। সমস্ত মনখারাপ আমরা বে অফ বেঙ্গলে ভাসিয়ে দিয়ে আসব৷ কেমন? 

**৪**

- কী ব্যাপার দাদুভাই৷ এখনও ঘুমোওনি?

- ঘুমোব দাদু। এই যাই৷ কিন্তু তুমিও তো না ঘুমিয়ে ছাতে এসে..।

- আমার ইনসমনিয়া৷ তোমার মনখারাপ।

- ও মা। আমার মনখারাপ..এ খবর তোমায় আবার কে দিল।

- তোমার দিদা বললে।

- দিদা?

- মাঝেমধ্যে গল্পগুজব করে। খবরাখবর দিয়ে যায়। তোমাদের দেখা দেয়না। কিন্তু আমার কানের মাথা না খেলে তার চলে না। যাক গে দাদুভাই, ছাতে আমার পাশে থাকো না কিছুক্ষণ। আজ আকাশ বেশ সাফ আছে, তোমায় কনস্টেলেশন চেনাই। মনখারাপের আইডিয়াল থেরাপি।

**৫**

- মনখারাপ?

- জ্বালিও না।

- উরিব্বাস। প্রচণ্ড মনখারাপ?

- যত বাজে কথা।

- বেশ কথা বলব না। চিঠি লিখি? সেই যেমন বিয়ের আগে লিখতাম?  কাঠখোট্টা মনখারাপ গলিয়ে জল করিয়ে দেওয়া সেই ঢলঢলে গদগদে চিঠি? লিখি?

**পুনশ্চ**

- বাবা, অমন চুপ করে বসে যে?

- ও কিছু না। এমনি।

- মনখারাপ। তাই না?

- তুই অফিস থেকে কখন ফিরলি খোকা?

- কথা ঘুরিয়ে লাভ নেই ইওর অনার। ধরা পড়ে গেছ।

- ধুস।

- এলাবোরেট করে না বললেও চলবে৷ তবে সিম্পটম যখন ধরে ফেলেছি, টোটকাও নিয়েই আসি। পুরনো ছবির অ্যালবাম আর দু'কাপ কফি; কামিং সুন অ্যাট আ ব্যালকনি নেয়ার ইউ।

ফেরতবাবার দরবারে


- কী চাই।

- আজ্ঞে আপনার আশীর্বাদ চাই ফেরতবাবা। আপনার আশীর্বাদ।

- ও'সব ফাঁপা আওয়াজ দিয়ে লাভ নেই৷ আশীর্বাদ! ন্যাকাপনা। ধান্দা ছাড়া ফেরতবাবার দরবারে কেউ আসে না। 

- না না। ভক্তিটা কিন্তু জেনুইন।

- বটে? বেশ৷ তুমি আশীর্বাদ চাইলে৷ আমি মা তারার নাম করে আশীর্বাদ দিলাম৷ এ'বারে তা'হলে কেটে পড়।

- অমন করে বলবেন না বাবা। বড় আশা নিয়ে এসেছি৷ হারানো জিনিস খুঁজে পেতে হালিশহর থেকে হরিয়ানার তাবড় বাবুরা ছুটে আসে আপনার কাছে। আমি অবিশ্যি এ পাড়াতেই থাকি। নাম সুকুমার দত্ত। পাতি প্রাইভেট ফার্মের ক্লার্ক বাবা। কিন্তু সাহস করে আপনার কাছে চলেই এলাম।

- অঢেল ন্যাকপনা, তার ওপর বিনয়। তুমি তো হীরের টুকরো খদ্দের হে।

- খদ্দের বলবেন না ফেরতবাবা৷ খদ্দের বলবেন না। আপনি এত বড় তান্ত্রিক। আমি তো ভক্ত।

- তন্ত্রসাধনা করি বটে৷ সেই তন্ত্রের জোরেই লোকের হারানো জিনিসের হদিস পাই। কিন্তু তা বলে আমি আলাভোলা সাধক নই। আদ্যোপান্ত ব্যবসায়ী। আর আবারও বলি৷ খুলি বাগিয়ে, জটা মাথায়, গায়ে ছাই মেখে বসে আছি বলেই পরমসাধক বলে আমার ঠ্যাং জড়িয়ে ধরতে হবে, অমন হাতুড়ে তান্ত্রিক আমি নই। তুমি ফেলবে কড়ি আর আমি আমার তন্ত্রবলে তোমার হারানো জিনিসের খোঁজ বলে দেব। 

- আপনি মহাপুরুষ। 

- প্রতিটা হারানো জিনিস প্রতি একশো কুড়িটাকা ফিজ। তা সে বাড়ির দলিলই হোক বা নস্যির কৌটো। 

- সত্যিই...এত ভক্তের সমাগম আপনার দরবারে ফেরতবাবা।

- বাজে গপ্প ফেঁদে শেষে ডিসকাউন্ট চেয়ে বসবে ভেবেছ? সে গুড়ে বালি। 

- ও মা। আমি অ্যাডভান্স ডিপোজিট করে এসেছি তো। 

- কাজের কথায় এসো বাছাধন। বলি কী হারিয়েছে?

- আজ্ঞে, এক জোড়া কানের দুল। অনেকটা সোনা দিয়ে গড়ানো। রীতিমতো ওজন আছে। বিবাহবার্ষিকীতে বউকে..সারপ্রাইজ দেব ভেবেছিলাম..।

- বটে। কবে কেনা?

- আজ্ঞে গত হপ্তায়। কিনে সে'টাকে বইয়ের আলমারির এক কোণে লুকিয়ে রেখেছিলাম আর কী। কিন্তু গতকাল সকালে উঠেই..।

- উঁ।

- কী ভাবছেন ফেরতবাবা? অমন চোখ বুজে..। এ'টাই কি আপনার প্রসেস?

- শোনো ভাই সুকুমার। এই যে তোমার একশো কুড়ি টাকা। রিটার্ন। রাখো।

- সে কী বাবা। অপরাধ নিলেন নাকি?

- না না। কিন্তু এ দুলের খবর আমি পাচ্ছি না।

- কিন্তু আপনার কাছে তো কোনও কিছুই...। বদ পলিটিকাল নেতারা নাকি আপনার কাছে এসে নিজেদের বিবেকের খোঁজ পেয়ে যায়। আর এই সামান্য দুলটা..।

- তুমি তো ভারি বেআক্কেলে মানুষ হে। তান্ত্রিকের মুখে মুখে তক্ক? দেব নাকি শাঁকচুন্নি লেলিয়ে?

**

- এ'টা কী হলো গুরু?

- কীসে কী।

- ওই যে। সুকুমার দত্তর কেনা দুলের খোঁজ তুমি পাওনি, এমনটা তো হতে পারে না।

- তুই চ্যালা। গুরুর সব ব্যাপারে নাক গলিয়ে তোর দরকারটা কী?

- আমি ফেরতবাবার ইন্টার্ন। চ্যালা বলে হ্যাটা করো কেন।

- অত কথায় তোর কাজ কী।

- বলো না। সুকুমার দত্তকে ওর সেই সোনার দুলের খোঁজ দিলে না কেন? তুমি সত্যিই ও দুলের খবর পাওনি?

- হরিপদ কাঠের মিস্ত্রি। কী একটা কাজে দু'দিন আগে সে সুকুমার ব্যাটার ড্রয়িং রুমে গেছিল। সুযোগ পেয়ে বইয়ের তাক থেকে দুলের বাক্সটা সেইই সরালে..।

- চুরি? তুমি এত বড় কথাটা চেপে গেলে গুরু?

- হরিপদ সে'দিন রাতের বেলা সোহাগ করে সে দুল নিজের বউকে পরিয়েও দিল রে। 

- তা বলে চুরির মাল? তুমি বরদাস্ত করলে?

- চুরিট অপরাধ বটে। তবে ঘুষ দেওয়াটাও কম অন্যায় নয়।

- ঘুষ?

- ওই কানের দুল ছাড়াও সুকুমার দত্তর আরও একটা জিনিস হারিয়েছে রে চ্যালা। স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তা দেখেই তো ওর ফিজটা সোজা ফেরত দিয়ে দিলাম।

- সুকুমার দত্ত আর কী হারিয়েছে? দেখলে যখন তার খোঁজ দিলেনা কেন গুরু?

- সুকুমার আর তার স্ত্রী; নিজেদের মধ্যের ভালোবাসাটুকু তারা বেমালুম হারিয়ে ফেলেছে। বিশ্বাস কর, স্পষ্ট দেখলাম। পড়ে আছে শুধু উপহার চালাচালি আর দেখনাই। আর এ'সব উপহার নয় রে চ্যালা, স্রেফ ঘুষ। হরিপদ অন্যায় করেছে। তবে তন্ত্রমতে তাকে ক্ষমা করে দিলাম। সুকুমার না হয় অন্য ঘুষ খুঁজে নেবে'খন৷ আর দুলজোড়া পেয়ে হরিপদর বউয়ের হরিপদকে জাপটে ধরা আনন্দটুকু? লাখ টাকার রে চ্যালা। লাখটাকার।

Monday, August 10, 2020

আদেখলাপনা


*

বুকের মধ্যের ধুকপুকটা বড় বিশ্রী ঠেকছিল সৌভিকের।  এমনিতে সমুদ্রের হাওয়ার ঝাপটা মুখে লাগলে ভালোই লাগে ওর, কিন্তু আজ অস্বস্তি হচ্ছিল। এক ধরণের উদ্ভট ভয়। উফ, নিজেকে সত্যিই বদ্ধ পাগল বলে মনে হচ্ছিল। এর'ম উঠল বাই তো কটক যাই-য়ের কোনও মানে হয়? পুরী অবশ্য কটক থেকে তেমন দূরে নয়। কিন্তু তাই বলে ব্যাঙ্গালোর থেকে সড়ক পথে এমন দুম করে ছুটে আসার কোনও মানেই হয়না।

*

- সমীরণ রে। চল না ভাই। গোয়া যাই।

- এই আদেখলামোগুলো না করলেই নয় রে? 

- মোটেও আদেখলামো নয়। কত মানুষ গোয়া যাচ্ছে। আর আমরা প্ল্যান করলেই দোষ?

- দ্যাখ সৌভিক, দু'টো ডবল এগরোলের অর্ডার ক্যান্সেল করে একটা সিঙ্গল এগরোল চাইতে হল। সেই একটা এগরোল নিয়ে দু'জনের কামড়াকামড়ি করছি কারণ দু'জনের পকেটের সমস্ত খুচরো পয়সা জুড়ে ওই একটা এগরোলই কেনা গেছে। কাজেই বেফালতু গোয়া গোয়া শুনলে গা জ্বলে যায়।

- সিড, আকাশ, সমীর। ওরা কেমন দিব্যি ঘুরে এলো রে। আহা।

- বটেই তো। দিব্যি ইয়াব্বড় গাড়িতে উঠে ইয়াব্বড়বড় বাতেলা ঝাড়তে ঝাড়তে বাবুরা গোয়া গেল। আর সে সিনেমা দেখে কুপোকাত শ্রীসৌভিক দত্তও স্বপ্ন দেখছেন গোয়া গিয়ে ফুর্তি করার। শোন, ও'সব বাদ দে। ক্লাস ইলেভেনে আমরা দু'জনে যা রেজাল্ট বাগাচ্ছি, বরাতে গোয়া গিয়ে রোলের দোকান দেওয়া ছাড়া আর কোনও গতি নেই হয়ত।

*

হোটেলে গোল্ডেন সানরাইজের সামনে যখন সৌভিক দাঁড়ালো তখন রাত এগারোটা।  অগস্ট রাতেরর সমুদ্রের হাওয়া গায়ে লাগলে অল্প শিরশির করা উচিৎ । অথচ সৌভিক ঘামছিল। চল্লিশের আগেই বাড়তি কোলেস্টেরলের বোঝা বয়ে বেড়ালে যা হয় আর কী। আর তার ওপর এই অহেতুক হুজুগ। ধুস।

সৌভিক এ'বার অত্যন্ত বিরক্ত বোধ করলে। নিজের ওপর রাগ হল বেশ। এই ছেলেমানুষির কোনও মানে হয়? সমীরণকে এ'সব জানানোও যাবেনা, সে এক লজ্জার ব্যাপার হবে।

*

- আচ্ছা, বেশ। গোয়া না হোক। অন্তত পুরী তো যাওয়াই যায়।

- চ'না সৌভিক। তার চেয়ে বোলপুর ঘুরে আসি। সকালে যাব। বিকেলে ফেরত।

- ধেত্তেরি৷ সমীরণ। শোন। পুরীই যাব। প্ল্যানটা তো করি।

- ধুর ধুর। আমাদের ওই প্ল্যানই হবে৷ তারপর লবডঙ্কা। বাপের পয়সায় প্ল্যান করলে যা হয় আর কী।

- বাপের পয়সায় কেন। নিজেদের গ্যাঁটের পয়সা খরচ করে যাব। আরে একদিন না একদিন তো দু'জনেই চাকরী পাব নাকি।

- কবে রাম উইল বিকাম রাজা, তবে উই উইল গো টু পুরী ফর খাজা।

- আরে উঠল বাই কটক যাই তো নয়৷ শোন, আমরা নির্ঘাৎ যাব। শুধু আমি আর তুই। কালই তো যাচ্ছি না। না হয় যেতে দেরী হবে। কিন্তু যাবই।

- নাহ্। কী সিনেমাই দেখলাম রে, তোর মাথাটাই গেল বিগড়ে। আর ও'সব রহিসি ইয়ারদোস্তি সিনেমায় দেখতে ভালো।

- তা কেন? আমার মধ্যে কি সামান্য সিড আর সমীর মেশানো ইয়ে নেই? এ'দিকে তুইও দিব্যি আকাশের মত ফক্কর। 

- তোর মাথাটা গেছে। 

- বেশ৷ তবে শোন৷ আজ কত তারিখ? দশই অগস্ট দু'হাজার এক। তাই তো? দু'হাজার দশের অগস্টের মধ্যে..না। একটু তাড়াতাড়ি হয়ে গেল। শোন। দু'হাজার কুড়ির দশই অগস্টের মধ্যে আমি আর তুই সমুদ্রের ধারে একসঙ্গে ফুর্তি করতে যাবই। 

- বাহ্। বেশ কম্ফর্টেবল টার্গেট নিয়েছিস।

- আমরা দু'জনে সমুদ্রের ধারের ভেজা বালিতে লেপ্টে বসে গল্প করবই।  ওই পুরীই সই। দু'হাজার কুড়ির দশই অগস্টের মধ্যে। তার আগেই হয়ে যাবে হয়ত। 

- উনিশ দিনে যা হওয়ার নয়। তা উনিশ বছরেও হবে না।

- হবেই।

- আচ্ছা সৌভিক, এ'টা দু'হাজার এক। তুই নিশ্চিত দু'হাজার কুড়িতে  আমাদের যোগাযোগ থাকবে?

- আলবাত। শোন, আমরা পুরী গেলে হোটেল গোল্ডেন সানরাইজে থাকব। চমৎকার পোজিশন। রাইট অন দ্য বীচ। গত বছর অফিসের কী একটা কনফারেন্সের জন্য মেজোমামা গিয়ে ছিল দিন দুয়েক। এলাহি ব্যাপাস্যাপার নাকি।

- পুরীর কম্প্রোমাইজটাই তা হলে রইল? গোয়ার সেই কেল্লায় বসে জাহাজ দেখা হাহুতাশ বাদ দিলি? প্ল্যান করবিই যখন, গণ্ডার মারা ভাণ্ডার লোটা লেভেল হলেই ভালো নয় কি?

- রোম্যান্টিক ইয়েকে খোঁচা দিবি রে সমীরণ? 

- তোর মধ্যে যে'টা আছে সে'টা হল আদেখলাপনা। রোম্যান্স নয়। যত্তসব। 

*

করোনার ঝাপটায় পুরীর সমস্ত হোটেলই বন্ধ। গোল্ডেন সানরাইজও তাই৷ বছর কুড়ি আগের সে এলাহি হোটেলের ভাগ্য যে এখন বেশ পড়তির দিকে তা অবশ্য সে হোটেল বাড়ির জীর্ণ চেহারা দেখলেই মালুম হয়। 

নিজেকে ঠাস ঠাস করে চড়াতে ইচ্ছে হচ্ছিল সৌভিকের৷ এ পাগলামোর কোনও মানে হয়? করোনার মত বিদঘুটে একটা ব্যাপারে তোয়াক্কা না করে দেড় হাজার মাইল ড্রাইভ করে আসা? বউ রেগে আগুন। আর এমন পাগলামো দেখলে রাগবে নাই বা কেন? 

দু'হাজার কুড়ির দশই অগস্ট পুরীর গোল্ডেন সানরাইজ হোটেলের সামনে আসতে হবেই আর এলে সমীরণের সঙ্গে দেখা হবেই। কেন যে এই অযৌক্তিক পাগলামো চেপে ধরল। সমীরণের সঙ্গে আজ বছর পাঁচেক কোনও যোগাযোগ নেই৷ অবিশ্যি ফোন নাম্বার অজানা নয়, কথা বলে নেওয়াই যেত৷ কিন্তু তবু এই পাগলামো। সমীরণ ঠিকই বলত, তার মধ্যে সত্যিই  প্রচুর পরিমাণে আদেখলাপনা জমে রয়েছে। ছিঃ ছিঃ।

লজ্জার ব্যাপার।

সমীরণকে ফোন করে এই লজ্জার কথাটা জানানো ঠিক হবে কি? বহুদিন যোগাযোগ নেই। আজ এদ্দিন পর এই পাগলামোর খবরটা জানিয়ে ফোন করলে সে ব্যাটা নিশ্চয়ই বিশ্রীভাবে হাসবে৷ আদেখলা বলে লেগপুল করতেও ছাড়বেনা। সমীরণের হাসি রীতিমতো হাড় জ্বালানো, ভেবেই শিউরে উঠক সৌভিক।

*
- হ্যা..হ্যালো!

- কী রে ইডিয়ট!

- স...স..সমীরণ!

- তোতলাচ্ছিস কেন? নাকি নাম্বারটাও ডিলিট করেছিস? তাই অমন হাতড়ে কথা বলতে হচ্ছে..।

- আমি..আমি না তোকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম..মা কালীর দিব্যি। মাইরি।

- দশই অগস্ট। টুয়েন্টি টুয়েন্টি। ফোন করার ইচ্ছেটা অস্বাভাবিক নয়। তবে তোর ওই ইচ্ছে পর্যন্তই দৌড়। ফোনটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই করলাম।

- লজ্জার মাথা খেয়েই বলি রে সমীরণ। আমার দৌড় শুধু ইচ্ছে পর্যন্ত নয়৷ জানিস, আমি বাঙ্গালোর থেকে ড্রাইভ করে পুরী ছুটে এসেছি? উন্মাদের মত মনে হচ্ছিল তুইও সারপ্রাইজ দিতে এ'খানে এসে হাজির হবি৷ দশই অগস্ট দু'হাজার কুড়ি বলে কথা। সেই, কথা মত পুরীর গোল্ডেন সানরাইজ হোটেলে...আমি ভাবলাম।

- সৌভিক।

- আমি একটা আস্ত ইডিয়ট।

- নাহ্। তুই ইডিয়ট নোস। তুই রোম্যান্টিক। 

- বাহ্। শুধরে গেছিস তুই। আমি ভাবলাম ফের আদেখলামোর খোঁটা দিবি।

- আদেখলাপনা? বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সে'টা বরং আমার বেড়েছে৷ তোকে আজ কেন ফোন করলাম জানিস সৌভিক?

- কেন?

- কেন জানি মনে হলো তোর আদেখলাপনা তোকে পুরীতে বেঁধে না রেখে গোয়ায় টেনে আনবে। আজ গোটাদিন গোয়ার এই কেল্লার আশেপাশে কাটালাম। ওই যে রে, সেই দিল চাহতা হ্যায় ফোর্ট। একাই এসেছি, এ'বাজারে ট্যুরিস্টও নেই৷ পাগলের মত মনে হচ্ছিল, যদি দুম করে তোর দেখা পেয়ে যাই।

- ফাইনাল স্কোরবোর্ড। আদেখলাপনা ওয়ান, রোম্যান্স জিরো।

- হেহ্।

Sunday, August 9, 2020

টাক আর কলপ


- এই যে।

- উঁ।

- আরে ও মশাই।

- কী..কী?

- চোখটা খুলুন না একবার। আরে ও মশাই। আর কত ঘুমোবেন। 

- কে? কে? এই! কে রে ব্যাটা তুই?

 -আমি বরং তুমি করেই বলি। আর তোমায় বরংনাম ধরেই ডাকি, কেমন? শোনো বাবা নিধু, গুরুজনদের তুইতোকারি করতে নেই। 

- এই বিদঘুটে সাজপোশাক পরে ঘোরাঘুরি করার মানেটা কী? আর আমি তো দোকানের দাওয়ায় বসে ঝিমোচ্ছিলাম। এ'টা আবার কোথায়? ঘুটঘুটে অন্ধকার। জঙ্গল। কে রে ব্যাটা তুই? আমায় গুমখুন করার ধান্দা করছিস নাকি?  সাবধান! জমিদার মশাইয়ের যে বাজারসরকার..ওই যে জীবন মল্লিক। সেই জীবন মল্লিকের প্রতিবেশী নিমাই সর্দারের সঙ্গে আমার পিসেমশাইয়ের খুব দহরম। রাতের মধ্যে যদি আমি গাঁয়ে না ফিরি তা'হলে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটবে।

- আরে ধুর রে বাবা। আমি ভালোমানুষের পো৷ কপালফেরে মরে স্বর্গে না গিয়ে ভূত হয়ে ঘুরছি৷ তা বলে আমি গুমখুন করতে যাব কোন দুঃখে?

- ভূ..ভূ...ধেৎ। বহুরূপীর আবার বাতেলা কত।

- মাইরি ভাই নিধু। আমি এক্কেবারে গোটা একখানা ভূত।

- ধেৎ।

- গা ছুঁয়ে বলব?

- থাক থাক। অত মাখামাখিতে কাজ নেই। এ'বার কাজের কথা বলে ফেলো দেখি। বৌ রাতে লুচি ভাজবে। ভেবেই ভিতরটা আনচান করছে। আমার কিন্তু বাজে গল্পের সময় নেই। তা তুমি ভূতই হও আর ডাকাতই হও।

- না না। তোমায় আর আটকে রাখব না ভাই। যা নেওয়ার ছিল তা নিয়ে নিয়েছি।

- এই দ্যাখো। ট্যাঁক থেক পয়সা সরালে নাকি! আচ্ছা জোচ্চোর তো হে তুমি।

- আরে না না। ভূতের আবার পয়সায় কী কাজ৷ আর নিজের জন্য তো আমি কিছুই নিই না। কার কীসে উপকার হয়, সে ভেবেই..।

- ওরে আমার দাতাকর্ণ এলেন হে। এই দ্যাখো, ভালোয় ভালোয় বলে দাও কী সরিয়েছ।

- যা সরিয়েছি তা তোমার কোনও কাজেই লাগবে না নিধু৷ টেকো মানুষের দেরাজ থেকে কলপের শিশি সরানোয় পাপ নেই। 

- এই যে। ভূত বাবাজী। বাড়াবাড়ি ভালো নয়। সিধে ভাবে বলো দেখি কী হাতালে? 

- তোমার গান। 

- ক..কী? 

- গান। অমন মিঠে সুর তোমার গলায়৷ যে শুনবে তাঁর প্রাণ জুড়োবেই, সে স্তব্ধ হয়ে শুনবেই। অথচ মুদীর দোকান তদারকি করতে করতেই ক্ষয়ে গেলে তুমি নিধু। আগে তাও নাইতে গিয়ে গুনগুন করতে। বছরখানেক হল তাও গিয়েছে৷ তোমার গলায় ও গান ফেলে রাখা অন্যায়। দোকানের হিসেবের খাতার বাইরে পা দেওয়ার সাহস তোমার নেই। আর সে সাহসটুকু না থাকলে যে সব মাটি ভাই।

- তুমি কে গো খুড়ো? মনটা বড় হেঁচড়ে দিলে যে। 

- আমি সত্যিই ভূত হে নিধু। আর যে সে ভূত নই৷ রীতিমত ভূতের রাজা। আর আমার কাজই হলো অব্যবহারের জিনিসকে কাজের কাজের জায়গায় রেখে আসা। তোমার সুর আছে অথচ শখ নেই, সাহস নেই। আবার এই মাত্র একজনের খোঁজ পেলাম যে কিনা গানের শখ আর সাহসের গুঁতোয় গাঁছাড়া হয়েছে অথচ গলায় একবিন্দু সুর নেই। ভাবছি, তোমার সুর আমি তাকেই দেব..।

- অ। হুম।

- মনখারাপ? নিধু?

- সামান্য। তবে কী ভূতখুড়ো, ওই যা বললেন আপনি। আমার মাথাভর্তি টাক, কলপের শিশিতে আমার কাজ কী। এই বরং ভালো। 

- বাহ্ বাহ্ নিধু। তোমার সুর আর তোমার রইল না বটে৷ কিন্তু এমন দরাজ মনটুকু হাতানোর ক্ষমতা যে আমারও নেই। আজ আসি বরং। আর একটা কথা বাবা নিধু, এমন কাউকে চেনো যে চমৎকার ঢোল বাজাতে জানে অথচ বহুদিন ঢোল ছুঁয়েও দেখেনি? চেনো এমন কাউকে?

Saturday, August 8, 2020

আলাপ


- কম্পলেক্সে নতুন মনে হচ্ছে?

- ফাইভ-এ-তে এসেছি। গতকালই।

- ওয়েলকাম। আমি সত্যব্রত ধর, ফাইভ-বি। 

- ওহ। তা'হলে তো আমার ইমিডিয়েট নেবার। আমি অমিতাভ সেন। তা আসুন না একদিন। দুই বাঙালির আলাপ কি চা আর টা ছাড়া জমে নাকি।

- কেন? দিব্যি জমে।

- না মানে..।

- অমিতাভবাবু। পাশের ফ্ল্যাটে নতুন কেউ এলেই আমি আলাপ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ি। কেন জানেন?

- মানুষ তো সামাজিক ইয়ে। আলাপের ইচ্ছেটা তো অস্বাভাবিক নয়। যে কোনও বিপদেআপদে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের আগে তো পাড়াপড়শিরাই ছুটে আসবে। 

- এই মিসকনসেপশনটাই বড় ভাবায় আমায় জানেন। সে জন্যই আমি নতুন প্রতিবেশীদের লবিতে পাকড়াও করি।। শুনুন, ও'সব সামাজিক ইয়েটিয়ে পুরোপুরি ব্লাফ। মানুষ অত্যন্ত ধান্দাবাজ। আর প্রতিবেশীর সঙ্গে বেশি গা-মাখামাখি মোটে ভালো কথা নয়।

- আমি ঠিক..।

-  এই যে চা আর টা খেতেখেতে আলাপ, এ'সব বড় ভাবায় আমায়।

- ভাবায়? কেন বলুন তো?

- সেই তো আপনার বাড়ির সোফায় বসে চা পকোড়া খেতে খেতে আপনাকেই মনে মনে কঞ্জুস বা বাতেলাবাজ বা অন্যকিছু বলে হ্যাটা করব। আপনিও আমার প্লেটে পকোড়া ঢালতে ঢালতে মনে মনে বলবেন শালা আপদ। 

- ও মা। তা কেন?

- ঠিক তাই৷ চা পকোড়া খেতেখেতে গল্পগুজব যেটুকু যা জমবে তা আদৌ কোনও কোয়ালিটি গল্প নয়,  পুরোটাই সস্তা গুজবের ভিত্তিতে পরনিন্দা। অথবা তার চেয়েও ক্ষতিকারক জিনিস এসে পড়বে আড্ডায়; পলিটিক্স। 

- আপনি কিন্তু মশাই বেশ বিটার।

- সে'টাই বেটার। সুইট হলে আজ চাইতেন চিনি আর পরশু চা-পাতা। না না, আমায় চশমখোর ভাববেন না। চা চিনি ডিম দেওয়ানেওয়াতে আমার অসুবিধে নেই৷ আমার চিন্তা ওই ছিচকে ট্র‍্যান্সক্যাশনগুলোর জন্য যে  প্রাণান্তকর খেজুরে আলাপটুকু সহ্য করতে হয় তা নিয়ে। চার চামচ মিল্কপাউডার নিতে এসে চোদ্দ মিনটের বাজে গল্প। উফ। তবে হ্যাঁ, ওই খেজুরে আলাপ বাদ দিয়ে মনের মতন বই আদানপ্রদান করতে চাইলে এনকারেজ করতে পারি। 

- আমি আসি সত্যব্রতবাবু।

- ও মশাই। চটলেন নাকি? আহা, ভ্যাক্সিনে খোঁচা আছে কিন্তু লংরানে উপকারি। পাশের ফ্ল্যাটে নতুন কেউ এলেই আমি তাকেতাকে থাকি কখন লবিতে তাকে পাকড়াও করব। এক্সপেক্টেশনগুলো গোড়াতেই ক্যালিব্রেট না করলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। 

- বেশ। চায়ের নেমন্তন্ন করে আপনাকে বিব্রত করব না। এখন আসি।

- হেহ্। যাক, আর কোনও কনফিউশন রইল না। ইয়ে, আমি কিন্তু ব্যাড নেবার নই মশাই।  আপনার ফ্ল্যাটে আগুন লাগলে আমি অবশ্যই দমকলে খবর দেব। আর আমার ফ্ল্যাটে আগুন লাগলে আপনি দমকলে খবর দেবেন। ব্যাস, প্রতিবেশীর দায়িত্ব শেষ। টোটাল উইন উইন,তাই না?

Friday, August 7, 2020

রবিবাবুর সমস্যা


- এই যে দাদা, দেশলাই আছে?

- নাহ্।

- আপনার বুঝি সে বদঅভ্যাস নেই?

- বিড়ির? নাহ্। নেই।

- একমিনিট৷ আপনার মুখটা কেমন যেন চেনাচেনা লাগছে..কোথায় দেখেছি বলুন তো?

- বইয়ে। বায়োস্কোপে। দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারে। 

- আরিব্বাস। রবিবাবু যে!

- ছদ্মবেশেও এসেও যে ধরা পড়ে যাব সে'টা ভাবিনি।

- ছদ্মবেশ ধারণ করতে গিয়ে সাধারণত সবাই নকল দাড়ি চাপায়৷ আর আপনাকে অরিজিনাল দাড়ি কামাতে হল। সত্যিই, আপনার ইকুইটির কতটা জুড়ে যে দাড়ি..।

- বললাম তো। দেশলাই নেই। তা সত্ত্বেও আপনি বকবক চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন বলুন তো?

- আসল আগুন তো আপনিই মশাই, দেশলাই তো সে তুলনায় ভিজে জনসন বাডস।

- যতসব থার্ড ক্লাস উপমা।

- তা বেশ তো। নোবেল তো আর আমি পাইনি৷ আপনিই দু'একটা হাইক্লাস জিনিস ছাড়ুন না।

- সে উপায় কী আর আছে ভাই৷ আমি যার স্বপ্নে আছি, তার পাতি ভাঙাচোরা ভাষার বাইরে গিয়ে তো কথা বলতে পারব না৷ ইন্টেলেকচুয়ালিও তার ঘোলাটে ব্রেনের লেভেলেই থাকতে হবে। কাজেই আমায় ঘাঁটানো বন্ধ করুন।

- ও, আই সী। আপনি তো আড্ডা দিতে পছন্দ করেন না।

- রাবিশ। সুকুমারের ব্যাটা কী এক ফালতু থিওরি সবার মাথায় ঢুকিয়ে গেল। তবে হ্যাঁ, এখন মনটন ভালো নেই। তাই গপ্পগুজবে মন দিতে পারছিনা।

- ও মা। আপনার আবার দুঃখ কীসের৷ দিব্যি অন্যের স্বপ্নে এসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দুনিয়াদারির চিন্তা নেই, লেখালিখির হ্যাপা নেই৷ একটু গা এলিয়ে ফুর্তি করুন দেখি। এ ব্যাটার কখন ঘুম ভেঙে যাবে আর অমনি স্বপ্নের আমি আর আপনি হাওয়া। রিল্যাক্স। তাস খেলবেন? একসেট আছে পকেটে। হবে নাকি একহাত? রংমেলান্তি? 

- না ভায়া। বললাম যে। মনভার। চারদিকে কেমন ফাঁকাফাঁকা ভাব। 

- ও। বুঝেছি। এখানকার হাওয়ার স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। তা'তেই যত গোল।

- ঠিক তাই। স্পষ্ট বুঝছি এ গন্ধ মনখারাপের। অথচ আমি এ মনখারাপের তল পাচ্ছিনে ভাই। 

- তাই বুঝি অমন গোমড়া হয়ে বসে?

- গোমড়া হব না ভায়া? যে মানুষের স্বপ্নের মধ্যে সেঁধিয়েছি, তাঁর ভাষা, ভাবনা সবই অত্যন্ত পানসে। অথচ তার সরল মনখারাপকে কিছুতেই স্পষ্টভাবে ঠাহর করতে পারছিনা। এ যে ক্যালামিটি। আমার গান, কবিতা, গল্পে প্রতিটি বাঙালি আজও নাকি নিজের মনখারাপের উপশম খুঁজে পায়। আর আমি এ স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপটুকু অ্যানালাইজ করে উঠতে পারছি না?

- মেধা। সংবেদনশীলতা। ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা। এ'সব বিষয়ে আপনার নখের যোগ্য এ দুনিয়ায় আর কেউ আছে কি গুরুদেব?

- তুমিও ন্যাকাপনা শুরু করলে ভাই?

- নয়ত যে ক্রিটিসিজমটা হুট করে আপনার গায়ে এসে লাগত। 

- ক্রিটিসিজম?

- এ মনখারাপ আধুনিক। শুধু মেধা, সংবেদনশীলতা আর ভালোবাসা দিয়ে এর তল পাবেন না স্যার। রিল্যাক্স।

- ভারী চ্যাটাংচ্যাটাং কথা তো তোমার। কে হে তুমি? আর তুমি কি জানো এই স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপের আদত কারণটুকু?

- আজ্ঞে, যে ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্নে আমরা আড্ডা দিচ্ছি, আমায় সে প্রচণ্ড ভক্তি করে। আপনি তার হিরো, আপনাকে এ শোকেসে আটকে রাখে। আর আমি তার ইয়ারদোস্ত, আমায় সে বালিশের পাশে রেখে ঘুমোয়। আমার নাম টেনি। আর হ্যাঁ, আমি চিনি এই মনখারাপকে। কিন্তু ওই যে বললাম, ইন্টেলিজেন্স আর সেনসিটিভিটি দিয়ে এ দুঃখ মাপতে পারবেন না রবিবাবু। এ মনখারাপ বুঝতে দরকার গুলবাজের কলজে। সে'টা আপনার নেই, আমার আছে।

- এ মনখারাপ কীসের ভাই টেনি?

- স্বপ্নদেখিয়ে ভদ্রলোকের ওয়াইফাই ডাউন আর মোবাইলেও সিগনাল নেই। কাজেই ট্যুইটারের তর্ক আর ফেসবুকের ঝগড়া দু'টোই আপাতত থেমে রয়েছে৷ হাজার খানেক অমিত-লাবণ্য  মিলেও এ মনখারাপ ট্যাকেল করতে পারবে না স্যার। কাজেই আপনি চাপ নেবেন না। কেমন?

Thursday, August 6, 2020

ভজা মাস্তানের মনকেমন

- ভজাদা, ও ভজাদা। চুক্কুস করে এক চুমুক হোক না।

- নাহ্। আজ ও'সব গিলতে মন চাইছে না রে মন্টু।

- আজ এত বড় একটা কাজ হাসিল হল৷ আর তুমি মাইরি নিরামিষ থাকবে?

- কাজ হাসিল? তাই বটে।

- ভজাদা, কেসটা কী বলবে?

- নাহ্। তোদের মোচ্ছব চলুক। আমি বরং ছাতে যাই।

- ও, ভজাদা। কী হলো গো। বলো না। ভজাদা গো। বলো না,  বলো।

- কাজটা ভালো হলো রে মন্টে?

- ওই, ক্লাবঘর তৈরির ব্যাপারটা?

- ওই কাজটাই তো আমরা হাসিল করলাম। তার জন্যেই তো কানু দত্ত আমাদের জন্য ঢালাও মদ-মাংসের ব্যবস্থা করে দিল। তাই না? কিন্তু কাজটা কি আদৌ ভালো হল?

- আমরা লোচ্চা লোফার মাস্তান মানুষ৷ কানুদার মত হাড়বজ্জাত নেতাদের হয়ে একে মারি তাকে ঠুকি, তোলা আদায় করি৷ আমাদের কি কাজের ভালো মন্দ নিয়ে ভাবলে চলে ভজাদা? তুমিই তো বলতে, আমাদের কাজ দিনে  ক্যালানো আর রাতে কেলিয়ে পড়া, সাতপাঁচ ভাবার দায়িত্ব আমাদের নয়।

- হ্যাঁ। আমরা গুণ্ডা, নচ্ছার। আমাদের না হয় সাতপাঁচ ভাবতে নেই। ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি দেখে আমরা খ্যাঁক করে হাসবো, সে'টাই হওয়া উচিৎ৷ কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু গুলিয়ে গেল রে মন্টু।

- গুলিয়ে গেল? কী করে ভজাদা?

- টোটাল ঘেঁটে ঘ। হারুর ওই একচিলতে ভাঙাচোরা টিনের বাড়ি। সে'টুকুতে সাত সাতটা মানুষ ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকত। হারুকে এমনিতেও পাড়ার কেউ পাত্তা দিত না। নীচু জাত বলে কথা। ওই পাতি লোকটার উপর চড়াও হলাম আমরা। খেদিয়ে দিলাম৷ আর ওর সেই টিনের বাড়িটুকু গুঁড়িয়ে দিয়ে কানু দত্ত পাড়ার ছেলেদের জন্য ক্লাবঘর বানিয়ে দিলো। 

- বেশি ভাবছ গুরু। এমনিতেও, ও জমি আদৌ হারুর নাকি?

- নয়, না?

- কানু দত্তর কাছে ও জমির কাগজ আছে৷ আমি অবিশ্যি চোখে দেখিনি। তবে শুনেছি আছে।

- হবে হয়ত। আমার কানে শুধু বাজছে ও বাড়ি ভাঙার সময় হারুর বউ আর দুই মেয়ের কান্না। 

- আজ পর্যন্ত তো অনেক বস্তিই আমরা ভেঙেছি গুরু৷ চোখের জল কি সে'খানে পড়েনি?

- তুই ভাবছিস আজ হঠাৎ এই ভজামাস্তান হারুর বউ মেয়ের কান্না নিয়ে ভাবতে বসল কেন? 

- ঠিক তাই ভজাদা। আমি ঠিক সে'টা ভেবেই ভেবড়ে যাচ্ছি। কেসটা কী?

- না না৷ আমি জাত গুণ্ডা, ওদের কান্না পাত্তা দেওয়ার মত নেকু আমি নই। কিন্তু শুধু একটা ব্যাপার আজ আমায় একটু ঘাবড়ে দিল রে মন্টে।

- কী ব্যাপার ভজাদা?

- চিরকাল জেনে এসেছি আমাদের গুণ্ডামিকে আর কানু নেতার নষ্টামিকে ভদ্রলোকেরা ঘেন্না করে। আমাদের ভয় পায় এ'টা ঠিক, এমন কী কানুদাকে সে ভদ্রলোকেরা ভোটও দেয়। কিন্তু মনেপ্রাণে ঘেন্না করে, কানুদাকে, আমাদেরও। অথচ এই হারুর টিনের বাড়িটা গুঁড়িয়ে বড় ক্লাবঘর তোলার ব্যাপারটাকে দেখলাম পাড়া ভদ্রজনেরাও প্রাণ খুলে বাহবা দিচ্ছে৷ যারা এদ্দিন আমাদের দেখলেই সরে পড়ত, আজ দেখলাম তারাই জড়িয়ে ধরছে। পাড়ার যে সুশীল মানুষজন কানু দত্তকে জোচ্চর বলত, তারাই দেখলাম আজ কানুকে মালা পড়িয়ে নতুন ক্লাবঘরে বরণ করে নিল।  

- ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি তোমায় ব্যথা দিচ্ছে ভজাদা?

- তাই হবে হয়ত।

- আমি আর কী জানি বলো। তবে শুনেছি হারুর ওই টিনের ঘরটার জন্য পাড়ার কালচার নষ্ট হচ্ছিল। দেখতেও বিচ্ছিরি। তার তুলনায় এই নতুন ক্লাবঘর টোটাল ঝিনচ্যাক। তাছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যে হবে, ক্যারম কম্পিটিশন হবে; প্রচণ্ড কালচার কালচার একটা ব্যাপার হবে ভজাদা।

- তাই হবে হয়ত৷ জানিস মন্টু, কাল রাতের দিকে হারুদের দেখলাম। স্টেশন রোডের কাছের ওই শনিমন্দিরের চাতালে শুয়ে। হারুটাকে দেখে যা মনে হল গাঁজা টেনে উল্টে পড়ে। আর হারুর ছোট ছেলেটার বোধ হয় জ্বর। রবীন্দ্রনাথফাথে ওদের কিস্যু হবে না। ছোটোলোক তো৷  বিদেয় হয়েছে আপদ গেছে। আমি ছাতে যাই রে মন্টে।

- চলো, গুরু। আমিও ছাতেই যাই৷ দাঁড়াও, আগে মাদুরটা নিয়ে আসি গিয়ে। মদ মাংস না হয় আজ থাক।

Wednesday, August 5, 2020

দত্তবাবুর রিপোর্ট


- এ'টা কী দত্ত?

- কেন স্যার?এ'বারের মান্থএন্ড রিপোর্ট। 

- মান্থএন্ড রিপোর্ট দিয়ে আমার লাইফ এন্ড করার তাল করছ ভাই দত্ত?

- ক..কেন স্যার?

- রিপোর্টটা সাবমিট করার আগে নিজে পড়ে দেখেছ?

- অবশ্যই। তিন তিনবার।

- পড়ে কী মনে হল? 

- নিজের বানানো রিপোর্ট সম্বন্ধে নিজে আর কী বলব বলুন স্যার। ওই, হিউমিলিটিতে আটকে যাই।

- তবু, কষ্টেসৃষ্টে বিনয় চেপে কিছু বলো।

- তা, এক কথায় চমৎকার। ক্যালিব্রি ফন্টটা আমার খুব প্রিয়, আর এই রিপোর্টে মানিয়েওছে ভালো৷ এরপর লাইন স্পেসিং বাড়িয়ে দেওয়ায় হলো কী; রিপোর্টটা সুদিং টু দ্যি আইজ হওয়ার পাশাপাশি আড়াই পাতার বদলে গিয়ে দাঁড়ালো সাড়ে পাঁচ পাতায়। অল্প কথা লম্বা প্রিন্ট আউটে প্রকাশ করতে পারায় যে কী অপরিসীম তৃপ্তি স্যার।

- বিনয় সত্যিই তোমায় বেঁধে রাখতে পারেনি বিনয়।

- পুরো সাড়ে পাঁচ পাতাই জাস্টিফাইড। বুলেটে সাজানো। জারগনগুলো বোল্ডে দেওয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামারলিতে ফেলে ভাষাটুকু হাইক্লাস লেভেলে ঝালিয়ে নিয়েছি স্যার। আহা, এ রিপোর্ট পড়েও আরাম।

- রিপোর্টে ক্যালিব্রি, স্পেসিং, গ্রামারলি, বুলেট সবই তো আছে হে দত্ত৷ কিন্তু জুলাই মাসের হিসেবের বদলে জুনের ফিরিস্তি দিয়েছ যে।

- ওহ। জু..জুনের হিসেবই রয়ে গেছে কি? আসলে কপি পেস্ট এ'দিক ও'দিক করতে গিয়ে ওই মাইনর ইয়েটা...ইয়েটা..হয়ে গেছে বোধ হয়।

- মাইনর ইয়ে?

- ওই। বাহান্নর বদলে তিপ্পান্ন। তবে, লকডাউনের মরসুম।  সেলস,মার্কেট শেয়ার সবই ওই জুনে ডকে আর জুলাইয়ে গোল্লায়। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না স্যার।

- আর এই রিপোর্ট তুমি সোজা বড়সাহেবকেও পাঠিয়ে দিলে? দত্ত?

- তা'তে কী স্যার? বড়সাহেব রিপোর্ট পড়বেন ভেবেছেন? তার হাতে কি এতই বাজে সময়? 

- বড়সাহেব রিপোর্ট পড়বেন না?

- বড়সাহেবরা রিপোর্টে চোখ বুলোবেন। ফন্টে তৃপ্ত হবেন, বুলেটে ঘায়েল। প্রথম প্যারার ভারিক্কি ইংরেজি পড়ে মাথা দোলাবেন, শেষ পাতার শেষ লাইনের অপটিমিজমে স্মিত হাসবেন। যে কোম্পানির বড়সাহেবরা এর বাইরে গিয়ে রিপোর্ট মন দিয়ে পড়া শুরু করেছেন, জানবেন সে কোম্পানির অবস্থা মোটে সুবিধের নয়।

- বটে? অতি-ব্যুরোক্রেসিই তবে আদত এফিশিয়েন্সি?

- এর উত্তর সোজাসুজি দেওয়াটা ঠিক হবে না স্যার।

- কেন দত্ত? হঠাৎ এই বাড়তি বিনয়?

- অভয় দিলে দু'টো কথা বলি। স্যার।

- বলে ফেলো হে ফন্টসম্রাট বুলেটরাজা, বলে ফেলো।

- সিনিয়র হয়ে আপনি আমার রিপোর্ট  এত খুঁটিয়ে পড়ছেন৷ নট আ ভেরি গুড সাইন স্যার। এরপর অফিসের আনাচেকানাচে গুজুরগুজুরফুসুরফুসুর শুরু হবে যে আপনার হাতে অঢেল সময়। গরীবের কথা বাসি হতে দেবেন না প্লীজ। জানবেন, অফিসের সিনিয়ররা সর্বক্ষণ শশব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি না করলে যে সমূহ ক্ষতি। 

- ভাগ্যিস তুমি ছিলে দত্ত। ভাগ্যিস তুমি ছিলে।

- আমি নগন্য ক্লার্ক স্যার। আপনারা রেখেছেন তাই আছি। না রাখলে বেমক্কা ভেসে যাওয়া। এ'টুকুই তো।

Tuesday, August 4, 2020

আসলি ওস্তাদ


- মুক্তিপণের টাকাটা পাওয়া গেল না মিস্টার শাসমল।

- বলেছিলাম তো নাটুবাবু। ব্যবসার যা অবস্থা, ব্যাঙ্কে অত টাকা থাকারও কথা নয়।

- কালোটাকাও কিছু নেই বলছেন?

- সে'খানেই কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন আপনি। আমার পরিবারের কাউকে সরিয়ে ফেলে আমার কাছে র‍্যানসম ডিমান্ড করলে আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করলেও করতে পারতাম। আমার কালো টাকার হদিস তো অন্য কারুর জানার কথা নয়। 

- কাজটা যে কাঁচা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে তার মাশুল আপনাকেই গুনতে হবে।

- খুন করে লাশ পুঁতে ফেলবেন? ইয়ে, ইন দ্যাট কেস আই উড প্রেফার সায়নাইড ওভার বুলেট। তবে বন্দুক আপনার, মুলুক আপনার। তাই ডিসিশনও আপনার। আমি শুধুই রিকুয়েস্ট করতে পারি।

- খুন না করে উপায় কী বলুন।  যে লাইনে যা দস্তুর৷ মুক্তিপণ না পেয়েও যদি আপনাকে জ্যান্ত ফিরিয়ে দিই, নাটুগুণ্ডার ইজ্জৎ থাকবে ভেবেছেন? আর কোনও ব্যবসায়ী ভয়টয় পাবে? দরদাম করে মুক্তিপণ কমানোরও উপায় নেই, আমার ব্র‍্যান্ড ইকুইটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কী আর বলব মিস্টার শাসমল, কিডন্যাপিংয়ের জগতটায় আজকাল বড্ড কাটথ্রোট কম্পিটিশন। 

- কাটথ্রোট? হেহ্। ভারী চমৎকার বললেন কিন্তু।

- তবে আপনার জন্য সায়নাইডের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বুলেট হজম করতে হবেনা।

- ভেরি কাইন্ড অফ ইউ নাটুবাবু। তবে ইয়ে..।

- বলুন না, নিশ্চিন্তে বলুন। খুন, কিডন্যাপিংটা আমার ব্যবসা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ইমোশনে খামতি নেই। 

- সায়নাইডটা সার্ভ করবেন কী করে?

- ওই যে, একটা পুরিয়া। তা'তেই থাকবে ওই বিষ। সরবিট্রেটের মত মুখে পুরতেই..ফিনিশ।

- মুখে যদি পুরতেই হয় নাটুবাবু, তা'হলে আর সরবিট্রেট কেন। একটা ক্ষীরকদমে যদি..।

- বেশ তা'হলে পুরিয়াটা ক্ষীরকদমে পুরে..।

- আর তার সঙ্গে..।

- চাহিদা বেড়ে চলছে কিন্তু।

- বেশি নয় কিন্তু..মাইনর একটা ব্যাপার।

- বেশ। শুনি।

- ক্ষীরকদকম মুখে পোরার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে কিশোরকুমারের ওই গানটা..ওই যে..ফুলো কী রং সে। ওইটা চালিয়ে দেবেন প্লীজ। প্লীজ।

***

- আর তারপর শাসমলদা?

- তারপর আবার কী। নাটুগুণ্ডা এনে দিলে ক্ষীরকদম। তার মধ্যে মিশিয়ে দিলে ইয়াব্বড় সায়নাইডের বড়ি। আর একটা ব্লুটুথ স্পীকারে চালিয়ে দিলে কিশোরবাবুর ওই গান; ফুলো কী রং সে, দিল কী কলম সে, লা লাললা লা লা লা। 

- আর আপনি সেই সায়নাইড মেশানো ক্ষীরকদম খেলেন?

- চারপিস ভায়া। চারপিস। নাটুর তো চক্ষু চড়কগাছ।

- সায়নাইড মেশানো ক্ষীরকদম?  চারপিস? তবু মরলেন না?

- পাঁচনম্বর চাইতেই তো নাটুগুণ্ডা আমার পা জড়িয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলে। বললে; "ওস্তাদ, ক্ষমা করো। তোমায় চিনতে পারিনি"। তারপর যত্ন করে নিজের মারুতি ভ্যানে চাপিয়ে নাটু আমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল। ইনফ্যাক্ট সে'দিন থেকে সে নিয়মিত আমার বাজার করে দিয়ে যায়।

- নাটুগুণ্ডা আপনার বাজার করে? 

- নয়তো আর তোমায় বলবো কেন বলো। বাজার করে শুধু তাই নয়। সন্ধ্যেবেলা বৃষ্টি পড়লেই নাটু হাজির হবে এক ঠোঙা চপ আর দু'বাক্স ক্ষীরকদম নিয়ে। কত বলি আরে এ'সবের দরকার নেই রে নাটু৷ কিন্তু কে শোনে কার কথা। শাসমল ওস্তাদ বলতে নাটু এক্কেবারে অজ্ঞান৷ সে পাগলা বলে কী জানো? "আপনার থেকে যদি কেউ টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে গড়িমসি করে ওস্তাদ, তবে তার চামড়া তুলে গায়ে বিছুটি ঘষব"। বড় বেয়াড়া মেজাজ আমার নাটুর।

- আহ শাসমলদা, আমায় আবার নাটুর ভয় দেখানোর কী দরকার। আপনার ধারের টাকা সুদ সমেত সময়ের আগেই পেয়ে যাবেন। কথার নড়চড় হবে না।

- এই দ্যাখো কাণ্ড। তুমি কি ভাবলে আমি থ্রেট করছি? না হে। আমি পাতি ব্যবসায়ী। মাসে একবার তারাপীঠ যাই হে।  তোমার দরকারে না হয় দু'পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছি, তা নিয়ে তো আর আমার ঘুম নষ্ট হচ্ছে না। ওই, নাটুই শুধু মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নেয়, কোথাও টাকা বাকি পড়ল কিনা। এই আর কী। ও'সব টাকাপয়সার মায়া আমার নেই হে। নেই।

- ইয়ে, শাসমলদা। অতগুলো সায়নাইড ক্ষীরকদম আপনি হজম করলেন কী করে?

- গোপন কথাটা বলেই দিই। শোনো হে, প্রাণে কিশোরকণ্ঠ গ্রহন করতে পারলে সায়নাইড বিকল হয়ে যায় যে।

- কী?

- ওই যে। নাটুর ব্লুটুথ স্পীকারে কিশোরের 'ফুলো কী রং সে' শুনতে শুনতে ক্ষীরকদমে কামড় দিচ্ছিলাম! ব্যাস, গুরুর কণ্ঠ কান বেয়ে প্রাণে নামতেই জিভের সায়নাইড বাবাজী হয়ে গেল গ্লুকোজের গুঁড়ো। বুঝলে হে,আসলি ওস্তাদ একজনই; কিশোর!

- এ তো রীতিমতো গুল!

- আমি গুলবাজ? আমার থেকে এতগুলো টাকা ধার নিয়ে আমায় গুলবাজ বলা? আমি নরম মানুষ, আমি না হয় চেপে যাব। কিন্তু নাটু এ'সব গুলতানি সহ্য করেনা কিন্তু দিবাকর।

- চটবেন না শাসমলদা। চটবেন না।

- টাকা ফেরত দেওয়ায় গড়িমসি আর কিশোরে সন্দেহ, মোটে ভালো কথা নয়। কেমন?

Monday, August 3, 2020

প্ল্যানপ্ল্যানানি


- গত পুজোয় আমরা হিমাচল যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম৷ তাই না বউ?

- তাই তো। ট্রেনে দিল্লী। দিল্লী থেকে বাসে চেপে শিমলা।

- আর তারপর একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে দু'হপ্তার ভ্রমণ। শিমলা, মানালি, রোটাং, কাজা, চিতকুল। আহা।

- তোমার ফ্যাক্টরির হইহইরইরই নেই৷ আমার স্কুলের গোলমাল নেই৷ অ্যাই, ওয়েলিংটন থেকে দু'টো জ্যাকেট এনেছিলে তুমি, মনে আছে? কত ভাবলাম হিমাচলের কনকনে শীতে ওই জ্যাকেট দু'টো কাজে লাগবে৷ 

- সে জ্যাকেট-জোড়ার কথা মনে থাকবে না আবার? বেশ ভালো দরে বাগিয়েছিলাম কিন্তু। আর টপ কোয়ালিটি।

- স্পিতি নদীর ধারে বসে ডিমসেদ্ধ আর ম্যাগি খাবো ভেবেছিলাম। তাই না গো বর?

- আর কাজা নামের ওই গ্রামটায় দিন-তিনেক গা এলিয়ে কাটিয়ে দেওয়া? সকালে হাঁটাহাঁটি? দুপুরে আমার গান শোনা আর তোমার বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকা?

- আর সন্ধ্যেবেলা জমিয়ে গল্প আর তাস। তাই না গো?

- টাকাপয়সার সামান্য ইয়ের জন্য হিমাচল যাওয়া হল না বটে। কিন্তু যাই বলো, অমন জব্বর প্ল্যান ছকেও আরাম।

- বটেই তো৷ কেন, তার আগের পুজোয় সেই যে আন্দামান যাব ভাবলাম? সে'টা মনে নেই?

- মনে নেই আবার। সে তো গ্র‍্যান্ড প্ল্যান ছিল। তাই না গো বউ? প্লেনে পোর্ট ব্লেয়ার৷ সাতদিন লাটিয়ে জাহাজের ঘ্যামে ওয়াপিস কলকাতা।

- উফ। ভাবলেই থ্রিল। গায়ে কাঁটা।

- ট্র‍্যাভেল ম্যাগাজিনের সেই ছবিগুলো এখনও চোখে ভাসে জানো। আন্দামানের সেই নীল সমুদ্দুর...। আহা। দীঘার সমুদ্র সে নীলের কাছে পাতি চৌবাচ্চা।

- রাধানগর বীচ, হ্যাভলক, ভাইপার, নীল...।

- আহা। পোয়েট্রি। পোয়েট্রি। রাতের পর রাত আমরা গুগল ঘেঁটেছি। তাই না গো?

- রাতের পর রাত। আহা। সত্যিই। 

- সে'টাও তো গেল ভেস্তে। মাঝেমধ্যে মনে হয় বছরে একটা করে যদি লটারি পাওয়া যেত..।

- বছরে একটা বঙ্গলক্ষ্মী বাম্পার? বরকুমার, তা'হলে তার আগের পুজোয় লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যেত না গো। 

- আর তার আগের পুজোর রাজস্থান ট্রিপটাও...বানচাল হত না।

- আর তার আগের পুজোয়? তাত আগের পুজোয় কোথায় যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল করেছি আমরা?

- নাহ্। সে'পুজোর প্ল্যান ভোগে যায়নি গো৷ তখন তো আমাদের নন্দনে দেখা হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যেয়।  অথবা মিলেনিয়াম পার্ক৷ 

- ও হ্যাঁ। সে বছর তো সদ্য আলাপ। আর চটজলদি হুজুগে পুজোয় বিয়ের প্ল্যান।

- ভাগ্যিস রেজিস্ট্রি বিয়েতে ট্রেনের টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের খরচটুকু ছিলনা। সেই পুজোর প্ল্যানটা তাই ভেসে যায়নি। কী বলো?

- হেহ্। এ'বার পুজোয় অবিশ্যি প্ল্যান ছকেও লাভ নেই। করোনা সে'সমস্ত ভাসিয়ে নিয়েছে।

- করোনা না থাকলেও যেতে পারতাম কই? একজোড়া সেল্ফিশ জায়্যান্টের মত দেশভ্রমণে বেরোলে, তোমার মায়ের ট্রিটমেন্ট আমার বোনের কোর্সফীর খরচ কে দিত?

- উম। তা ঠিক। কাজেই পুজোর ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যানটুকু অন্তত না করার কোনও মানেই হয়না। তাই না গো?

- শাবাশ ওয়াটসন! শাবাশ!

Sunday, August 2, 2020

সুবিনয় দাসগুপ্তর বন্ধু


- অতনু গাঙ্গুলি। রাইট?

- হ্যাঁ।

- বায়োডেটা তো বেশ ইম্প্রেসিভ।

- থ্যাঙ্ক ইউ।

- টেল মি সামথিং আবাউট ইওরসেল্ফ।

- মিস্টার দাসগুপ্ত, আমি ঠিক চাকরীর জন্য আসিনি।

- এক্সকিউজ মি?

- মাফ করবেন। আপনার সঙ্গে একটা জরুরী দরকার ছিল। কিন্তু কিছুতেই আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছিলাম না। আর আপনার ওই পেল্লায় বাড়িতে ঢোকার কথা তো ভাবতেই পারিনা। তাই বাধ্য হয়ে চাকরীর এই দরখাস্তটা করে বসলাম। ডাকও চলে এলো। এই রোলের জন্য ক্যান্ডিডেটদের যে আপনি নিজে বাছাই করেন, সে খবরটা আমি পেয়েছিলাম। 

- যে কোনও টম-ডিক-হ্যারির সঙ্গে দেখা করার জন্য অ্যালকেমিক্যালস ইন্ডাস্ট্রিজের এম-ডি বসে নেই।

- আমি সত্যিই দুঃখিত কিন্তু..।

- লুক হিয়ার গাঙ্গুলি, আমার সময়ের দাম আছে। এই অসভ্যতাটা না করলেই পারতে।

- ব্যাপারটা সত্যিই জরুরী..। প্লীজ।

- ইউ হ্যাভ ট্যু মিনিটস।

- আমার বাবা অমল গাঙ্গুলি। লোকনাথপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে আপনার সহপাঠী ছিলেন।

- অমল..অমল..।

- আপনার হয়ত মনে নেই, তাই না?

- না নেই। আর শুনে রাখো,  যদি ভাবো পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে আমার থেকে কোনও ফেভার আদায় করবে, তা'হলে সে'গুড়ে বালি। এ'সব ধান্দাবাজি আমার সঙ্গে চলবে না।

- ধান্দাবাজি ঠিক নয়। শুধু এ'টা দেওয়ার ছিল।

- হোয়াট ইজ দিস? এই প্যাকেটে কী আছে?

- অরণ্যদেব সমগ্র। খণ্ড দুই। আর খণ্ড তিন।

- হোয়াট ননসেন্স। এই রাবিশ নিয়ে আমার অফিসে আসার কী মানে!

- বাবা বারবার বলে গেছিলেন এই পুরনো বই দু'টো যেন আপনার কাছে পৌঁছে দিই। 

- অমল..? বলে গেছে মানে?

- বাবা গতমাসে মারা গেছেন।

- অ। আই সী৷ আই অ্যাম সরি। 

- আমি এখন আসি।

- অমল এই সাতপুরনো বইদু'টো আমায় দিতে বলে গেছে? আমায়?

- মৃতুশয্যাতেও কথাটা বারবার বলে গেছেন। আর পোস্টে পাঠাতে বারণ করেছিলেন তাই..। উনি চেয়েছিলেন যেন আপনার হাতেই তুলে দিই।

- অ।

- আমি আসি। নমস্কার।

**

অতনু,

অমলকে চিরকালই আমার আলাভোলা ইডিয়ট মনে হত৷ স্কুল ছাড়ার পর তাই আপ্রাণ চেষ্টা করেছি অমন রাস্টিক ইডিয়টের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে। 

যাকগে।

তিনটে পুরনো বই ফেরত পাঠালাম। অরণ্যদেব সমগ্র এক, দুই ও তিন। 

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় অমলের বাবা ওর জন্মদিনে বই তিনটের সমগ্র উপহার দিয়েছিলেন ওকে। বিদেশে ছাপা এই ইংরেজি কমিক্সের বইগুলোর জেল্লাই আলাদা ছিল। আমাদের গড়পড়তা ইন্দ্রজাল কমিক্স সে তুলনায় বেশ সাদামাটা। গোটা স্কুলের ছেলেপিলে হামলে পড়েছিল যে'দিন অমল বই তিনটে নিয়ে স্কুলে এসেছিল।

আমার খুব হিংসে হয়েছিল। হিংসে আর ছেলেমানুষির মিশেল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর৷ অমলের ব্যাগ থেকে সংগ্রহের এক নম্বর খণ্ডটা আমি সরিয়ে ফেলি৷ অমল কোনওদিন সন্দেহ করেনি। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমার এই নিরেট বোকা ক্লাসমেটটি আমার কুকর্মটি ধরতেই পারেনি৷ কিন্তু সে'দিন অফিসে তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বুঝলাম যে অমলের কোনওদিন সন্দেহ হয়নি কারণ সে আগাগোড়াই জানত বইটা কে সরিয়েছে।অথচ, একদিনের জন্যেও অমল আমায় বুঝতে দেয়নি যে ব্যাপারটা সে জানে। 

অমলের মত বন্ধু আর একটিও দেখলাম না। আর আমি নিজে ধান্দাবাজ,  জীবনটা ধান্দাবাজদের সান্নিধ্যেই কাটিয়ে দিলাম। 

অমল চিরকালই প্রাণ দিয়ে বই ভালোবাসত৷ রক্ত-মাংসের বন্ধুদের মত বই কোনওদিন লোক ঠকায়না৷  প্রথম ও তৃতীয় খণ্ডের সঙ্গে দ্বিতীয় খণ্ডের বিচ্ছেদটা ওকে ওই অল্পবয়সেও বড় দাগা দিত৷ মরার আগে সেই বিচ্ছেদ ঘোচানোর ব্যবস্থাটা সে করে গেল। 

আমার অপরাধটা ক্ষমার যোগ্য মনে হলে একদিন বাড়িতে এসো, ইন্টারভিউয়ের দরখাস্ত ছাড়াই। 
কেমন?

ইতি,

সুবিনয় দাসগুপ্ত।

হরনাথের কাণ্ড


- উফ৷ হাড় জ্বালিয়ে খেলে দেখছি হরনাথ।

- রাগ করলেন কত্তা?

- রাগ করব না? মাসে দশবার তোমার আপিসে এসে হাজিরা দিতে হবে? ওঝা হয়ে কি মাথা কিনে ফেলেছ নাকি?

- আজ্ঞে। চাইলেই বা আপনার মাথা কিনতে পারছি কোথায় বলুন।

- অ। আমি স্কন্ধকাটা বলে এ'বার আমায় বডিশেম করবে?

- কত্তা।  একটু বসুন না৷ ওই যে, ঘরের কোণে টাটকা আঁশ জমিয়ে রেখেছি। আতিথিয়েতায় কোনও খামতি পাবেন না। এই  আমি কথা দিলাম।

- রুই না কাতলা?

- কত্তার যে কাতলা পছন্দ, তা কি আর জানিনা?

- চালানি না লোকাল মাছের আঁশ?

- আজ্ঞে, বাজারে কিপটে বলে আমার একটা বদনাম আছে বটে। তবে আপনার মত হাইক্লাস আত্মাকে ডাকার আগে ও'সব টুপাইস নিয়ে ভাবিনা।  কাছারিপাড়ার পুকুর থেকে তোলা, মাইরি কত্তা। 

- উম। গন্ধটায় টান আছে বটে।

- কত্তা। একটা জরুরী কথা বলার ছিল।

- তুমি যে পয়লা নম্বরের ধান্দাবাজ তা আমি জানি। বলেই ফেলো।
 
- বলছিলাম যে, গিন্নীমার অবস্থা তেমন সুবিধের দেখছিনা। 

- সে এখনও তোমার কাছে আসে? আমি পইপই করে বারণ করা সত্ত্বেও? 

- আজ্ঞে, অমন মাথাগরম করবেন না প্লীজ।

- মাথাই নেই ছাই তায় মাথাগরম। ফের যদি স্কন্ধকাটাকে মাথার খোঁটা দিয়েছ হরনাথ...।

- চটবেন না কত্তা। চটবেন না।

- তা, কী বললে গিন্নী?

- ওই। প্রত্যেকবার যা বলেন। আপনার ভুল ভাঙাতে পেরেছি কিনা জানতে চাইলেন।

- কী আশ্চর্য। মরে ভূত হয়েও এমন পাগলামোর কোনও মানে হয় হরনাথ? আজ সাত বছর হল আমরা দু'জনে এক সঙ্গে মোটরদুর্ঘটনায় নিকেশ হলাম। সাত বছর৷ আমার তো মাথাটাই ভেঙেচুরে এক্কেবারে...৷ সে যাকগে। কিন্তু সাতবছর পরেও গিন্নী এখনও ভাববে আমরা দু'জনেই বেঁচে আছি? কোনও মানে হয়? কী বিশ্রী গোঁয়ার্তুমি।

- আজ্ঞে, আমি নিজেও তো তার বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা কম করিনি। মাসে অন্তত চারবার আমি নিজে গিন্নীমার সঙ্গে দেখা করি মনের ডাক্তার সেজে। তাঁকে আশ্বাস দিই যে আমি আপনার চিকিৎসা করছি। বারবার গিন্নীমাকে বলি যে একদিন আমি কত্তাকে ঠিক বোঝাব যে তিনি বেঁচে আছেন৷ অথচ তলে তলে আমার চেষ্টা হল কোনও ভাবে যদি গিন্নীমাকে বোঝানোর..যে আদতে তিনিও বেঁচে নেই।

- মন বড় খারাপ হয়ে যায় হে হরনাথ৷ গিন্নী এখনও সে বাড়ির মায়াও ত্যাগ করতে পারল না। তবে, ও'সব ঘুরপথে আর হবে না৷ 

- মানে? কত্তা? 

- এ'বার সোজাসুজি নিজের পরিচয়টা তোমার গিন্নীমাকে দাও। ওকে বলো সে আদতে একটা আস্ত ভূত আর তুমি আদতে ওঝা..।

- ঘুরপথে হবে না, তাই না কত্তা? 

- নাহ্। সোজাসুজিই বলতে হবে।

- সোজাসুজি যদি আপনাকে দু'টো কথা বলি কত্তা? যদি বলি যে আমি সত্যিই মনের ডাক্তার? আর আপনাদের মৃত্যু হয়নি? সত্যিই আপনি বেঁচে আছেন? আমি একটানা আপনার মনের ব্যামো সারানোর চেষ্টা করে চলেছি দিনের পর দিন?

**

- আজ ওকে দেখেছ ডাক্তার?

- দেখলাম গিন্নীমা।

- কেমন বুঝলে?

- ওই৷ একই বুলি। উনি নাকি স্কন্ধকাটা৷ আপনিও নাকি ছ'বছর ধরে ভূত হয়ে এই বাড়ির মধ্যে বসে।

- হর ডাক্তার৷ আমার বুক ফেটে যায় গো৷ লোকটা গোটাদিন পাগলের মত ঘুরে বেড়ায়৷ আর এক তুমি ছাড়া কিছুতেই কারুর সঙ্গে কথা বলে না। আর আমার সঙ্গে কখনও দেখা হলে এমন হাবভাব করে যে আমারই ভয়ে বুক কাঁপে।

- গিন্নীমা। আমার সঙ্গে উনি কথা বলেন কারণ ওঁর ধারণা আমি ওঝা। ওঁর আশা আমি সত্যিই আপনাকে একদিন বোঝাতে পারব যে আপনিও আদতে মৃত। 

- কুড়িটি বছর ওর সঙ্গে সংসার করেছি৷ ও যে কী বিশ্রী রকমের গোঁয়ারগোবিন্দ তা আমি বেশি জানি।  নরম কথায় তো অনেক চেষ্টা করলে ডাক্তার৷ এ'বার না হয় ওঁকে সোজাসুজি মুখের ওপর বলেই দাও না সত্যিটা৷ বলে দাও না যে তুমি আদতে মনের ডাক্তার।

- সোজাসুজি বলে দেব? মুখের ওপর?

- আর উপায় নেউ ডাক্তার। উপায় নেই।

- সোজাসুজিই যদি আপনাকে বলি গিন্নীমা? 

- আমায়? আমায় কী বলবে?

- যদি বলি, আমি সত্যিই একজন ওঝা? সে জন্যেই আমি আপনার সামনে নিয়মিত হাজির হতে পারি? যদি বলি, কত্তার চিন্তা অমূলক নয়?

আড্ডার আমরা

- বাবা?

- কেমন আছিস রে সুমি?

- তুমি..এ'খানে..।

- এ'খানে আমার থাকার কথা নয়। এ'টা তোদের জামশেদপুরের শোওয়ার ঘর। জানি। আমার থাকার কথা পাটনায়। অথচ আমি এ'খানে আছি৷ কী'ভাবে যে এলাম।

- বাবা। তুমি দিব্যি আমার কথা শুনতেও পাচ্ছ।

- শুনতেও পাওয়ার কথা নয়৷ তাও জানি। বছর পাঁচেক হল আমি কানে কিছুই কিন্তু শুনতে পাইনা। টোটালি ড্যেফ৷ অথচ আজ তোর কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পারছি। ম্যাজিক।

- আমি বোধ হয়..বোধ হয়..স্বপ্ন দেখছি। 

- হতে পারে৷ তোর স্বপ্ন। হতেও পারে। কিন্তু..।

- কিন্তু? কিন্তু কী বাবা?

- এ'টা আমার স্বপ্নও হতে পারে তো। তাই না?

- যারই স্বপ্ন হোক,এদ্দিন পর দেখা হচ্ছে; এ'টাই বড় কথা৷ কদ্দিন তোমায় এত কাছ থেকে দেখিনি। 

- তা ঠিক।

- বাবা, তোমার আর মায়ের জন্য আমার খুব মনকেমন করে।

- স্বাভাবিক।  বুড়ো বাপ-মায়ের জন্য মনকেমন করবে।সে'টাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ রে, সুমন কেমন আছে?

- ভালো। আমরা দু'জনে এ'বার পুজোয় উত্তরাখণ্ডের দিকে যাব ভেবেছিলাম। এই ভাইরাসের ঠেলায় সে'সব গোল্লায় গেল। সে নিয়ে যে সুমনের কী মনখারাপ।

- ভাইরাসের ঠেলাই বটে।

- মা কেমন আছে বাবা?

- আছে৷ মনমরা হয়ে থাকে গোটাদিন। যা বলে কিছুই তো ছাই শুনতে পাইনা।

- আমি মাঝেমধ্যে এমন ব্যস্ত থাকি বাবা, মায়ের কল এলেও রিসিভ করা হয়ে ওঠেনা৷ আর দিনের শেষে এত ক্লান্তি...তাই হয়ত রোজ কথা বলে ওঠা হয়না..কিন্তু বাবা..।

- আমরা কি তা বুঝিনা রে সুমি? তা নিয়ে তুই ভাবিসনা সুমি৷

- বাবা, আমায় পাটনা নিয়ে যাবে?

- যাবি সুমি? সুমনকে নিয়ে? জানি ওরও অফিসের ব্যস্ততা কম নয়..।

- বাবা, আমার বড় মনখারাপ। 

- সুমি। তুই এত ক্লান্ত কেন রে?

- আমায় পাটনা নিয়ে যাবে? বাবা? মা ঘি দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখবে।  তুমি বেসুরো গলায় টপ্পা গাইবে। 

- এত মনখারাপ কেন সুমি?

- বাড়ি নিয়ে যাবে বাবা? আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে?

- স্বপ্নটা যে ছাই কার। আমার না তোর..।

- আচ্ছা বাবা, শোনো। এ'টা যারই স্বপ্ন হোক। সে আগামীকাল অন্যজনকে ইমেল করে গুছিয়ে এই স্বপ্নের গল্প বলবে। 

- তোর এত মনখারাপ? সুমি?

- আলুসেদ্ধ আর টপ্পায় সেরে যাবে। 

- সুমি। আমারও মনখারাপ৷ খুব৷ তুই নেই, বাড়িটাকে বেসুরো টপ্পার মতই মনে হয়।

- বাড়ি ফিরব বাবা। পুজোয়৷ কেমন?

- পিতৃমনখারাপের শেষ। সুমিপক্ষের শুরু।

***

অবাক লাগে অনুপমার৷

এতগুলো বছর কেটে গেল অথচ আজও সুমি আর সুমির বাবার মনখারাপের কথা ভেবেই দিন কেটে যায়। নিজের মনকেমনগুলো ফিকে হতে হতে আজ এমন অবস্থা সে নিজের স্বপ্নেও সে'গুলো ধরা পড়েনা। 

নিজের স্বপ্নেও নিজের ঠাঁই নেই, এ কথা ভেবে হেসে ফেললেন অনুপমা।

সুমি আর বাবা


- বাবা?

- কেমন আছিস রে সুমি?

- তুমি..এ'খানে..।

- এ'খানে আমার থাকার কথা নয়। এ'টা তোদের জামশেদপুরের শোওয়ার ঘর। জানি। আমার থাকার কথা পাটনায়। অথচ আমি এ'খানে আছি৷ কী'ভাবে যে এলাম।

- বাবা। তুমি দিব্যি আমার কথা শুনতেও পাচ্ছ।

- শুনতেও পাওয়ার কথা নয়৷ তাও জানি। বছর পাঁচেক হল আমি কানে কিছুই কিন্তু শুনতে পাইনা। টোটালি ড্যেফ৷ অথচ আজ তোর কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পারছি। ম্যাজিক।

- আমি বোধ হয়..বোধ হয়..স্বপ্ন দেখছি। 

- হতে পারে৷ তোর স্বপ্ন। হতেও পারে। কিন্তু..।

- কিন্তু? কিন্তু কী বাবা?

- এ'টা আমার স্বপ্নও হতে পারে তো। তাই না?

- যারই স্বপ্ন হোক,এদ্দিন পর দেখা হচ্ছে; এ'টাই বড় কথা৷ কদ্দিন তোমায় এত কাছ থেকে দেখিনি। 

- তা ঠিক।

- বাবা, তোমার আর মায়ের জন্য আমার খুব মনকেমন করে।

- স্বাভাবিক।  বুড়ো বাপ-মায়ের জন্য মনকেমন করবে।সে'টাই স্বাভাবিক। হ্যাঁ রে, সুমন কেমন আছে?

- ভালো। আমরা দু'জনে এ'বার পুজোয় উত্তরাখণ্ডের দিকে যাব ভেবেছিলাম। এই ভাইরাসের ঠেলায় সে'সব গোল্লায় গেল। সে নিয়ে যে সুমনের কী মনখারাপ।

- ভাইরাসের ঠেলাই বটে।

- মা কেমন আছে বাবা?

- আছে৷ মনমরা হয়ে থাকে গোটাদিন। যা বলে কিছুই তো ছাই শুনতে পাইনা।

- আমি মাঝেমধ্যে এমন ব্যস্ত থাকি বাবা, মায়ের কল এলেও রিসিভ করা হয়ে ওঠেনা৷ আর দিনের শেষে এত ক্লান্তি...তাই হয়ত রোজ কথা বলে ওঠা হয়না..কিন্তু বাবা..।

- আমরা কি তা বুঝিনা রে সুমি? তা নিয়ে তুই ভাবিসনা সুমি৷

- বাবা, আমায় পাটনা নিয়ে যাবে?

- যাবি সুমি? সুমনকে নিয়ে? জানি ওরও অফিসের ব্যস্ততা কম নয়..।

- বাবা, আমার বড় মনখারাপ। 

- সুমি। তুই এত ক্লান্ত কেন রে?

- আমায় পাটনা নিয়ে যাবে? বাবা? মা ঘি দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখবে।  তুমি বেসুরো গলায় টপ্পা গাইবে। 

- এত মনখারাপ কেন সুমি?

- বাড়ি নিয়ে যাবে বাবা? আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে?

- স্বপ্নটা যে ছাই কার। আমার না তোর..।

- আচ্ছা বাবা, শোনো। এ'টা যারই স্বপ্ন হোক। সে আগামীকাল অন্যজনকে ইমেল করে গুছিয়ে এই স্বপ্নের গল্প বলবে। 

- তোর এত মনখারাপ? সুমি?

- আলুসেদ্ধ আর টপ্পায় সেরে যাবে। 

- সুমি। আমারও মনখারাপ৷ খুব৷ তুই নেই, বাড়িটাকে বেসুরো টপ্পার মতই মনে হয়।

- বাড়ি ফিরব বাবা। পুজোয়৷ কেমন?

- পিতৃমনখারাপের শেষ। সুমিপক্ষের শুরু।

***

অবাক লাগে অনুপমার৷

এতগুলো বছর কেটে গেল অথচ আজও সুমি আর সুমির বাবার মনখারাপের কথা ভেবেই দিন কেটে যায়। নিজের মনকেমনগুলো ফিকে হতে হতে আজ এমন অবস্থা সে নিজের স্বপ্নেও সে'গুলো ধরা পড়েনা। 

নিজের স্বপ্নেও নিজের ঠাঁই নেই, এ কথা ভেবে হেসে ফেললেন অনুপমা।

অনুরাগের লুডো

অনুরাগবাবু আমার অত্যন্ত প্রিয়৷ তার মূলে রয়েছে "বরফি"। লোকমুখে ও বিভিন্ন রিভিউয়ের মাধ্যমে জেনেছি যে বরফিতে ভুলভ্রান্তি ...