Saturday, June 23, 2007

পিতা-কন্যা

এ'দিকে পিতা, ও'দিকে কন্যা


পিতা ক্লাসিকাল; নিয়ম-কানুন, মর্নিং ওয়াক, ক্যালকুলাস, সর্ষের-তেল স্নান, নিম-বেগুন, আর্নিকা, সতিনাথ ভাদুড়ী, ভীম সেন যোশী মেশানো প্রাচীন বাঁধুনি
কন্যা পোস্ট-মডার্নজিন্স, শুক্তো, হার্ড রক , সন্ধ্যা মুখার্জী, ডট কম , ফেমিনিজ্ম, ও শক্তি চাটুজ্যের সম্মিলিত লাবড়া।বারান্দায় শরতের আদুরে রোদের মত ছলছলে।
প্রাচীন অঙ্ক মেনেই; যেই কন্যা জীবনমুখী; অমনি পিতা রথের চাকা বসে যাওয়া সৈনিক। 
কন্যা প্রেমে হাবু-ডুবু, পিতা অক্সিজেনের নল-কাটা ডুবুরি।
তবুও: পিতার হালুম , কন্যার আধো-ম্যাও


পিতা : প্রেম করছ ?
কন্যা: ওই আর কী। 
পিতা: ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে ডজ করবে না...। 
কন্যা: হ্যাঁ প্রেম।
পিতা: শেম!
কন্যা: বাবা!
পিতা: বুচি!
কন্যা: আই অবজেক্ট।
পিতা: ওভাররুলড।
কন্যা: আগে শুনবে তো.... 
পিতা: কী শুনবো ? প্রেম-ট্রেম গুরুপাক ব্যাপার। আমি ভেটো করছি। যার ডিমাণ্ড কার্ভ আঁকতে গেলে এখনো হাত কাঁপে , সে করবে প্রেম ? পাগল না পার্লামেন্ট ?
কন্যা: তুমি আনরিসনেবল হচ্ছো।
পিতা: আন-রিসনেবল ? আমি আনরিসনেবল? প্রুফ দাও নয়তো স্টেটমেন্ট উইথড্র করো। রাইট নাউ!
কন্যা: আমার সব বুঝিয়ে বলার একটা সুযোগ তো পাওয়া উচিত?
পিতা: বাপের সঙ্গে ডেমোক্রেসি ফলাচ্ছো ? ঔক্কে! বোঝাবার সুযোগ দিলাম। তবে নেকু সেন্টিমেন্ট নয়, বেফালতু চিত্‍কার নয়, বিধানসভার ওয়াক-আউট নয়তর্কে যুক্তির ব্যবহার করবে, টু দি পয়েন্ট রিপার্টি দেবে; ভুলে যেয়ো না তুমি কোন বাড়ির মেয়ে। এবার বলো। হু ইস দিস হতচ্ছাড়া!
কন্যা: হতচ্ছাড়া? এটা কী ঠিক হলো বাবা ?
পিতা: হয়নি বুঝি ? বেশ, আই উইথড্র, বলে যাও।
কন্যা: ইয়ে বাবা, ছেলেটা কিন্তু বেশ ভালো...। 
পিতা: উফ! এই তোমার সাইন্টিফিক মাইন্ড ? না! এইটা আমার ফেইলিওর। শেম ওন মি!
কন্যা: আবার কী হলো ?
পিতা: কী হলো ? ক্যালমিটি! বিজ্ঞান আগে অবজার্ভ করে, তারপর কনক্লুসন টানে! ছেলেটা যে বেশ ভালো সেটা তুমি কনক্লুড করার কে ? তুমি ওর যাবতীয় কোয়ালিটি আমায় খোলতাই করে বলবে, আর আমি বুঝে নেবো ও কেমন ছেলে।
কন্যা: বেশ, ওর নাম চিত্রক খাসনবিস।
পিতা: এটা নাম না হাইড্রো-কার্বন ? রিজেক্ট!
কন্যা: টু মাচ! অসহ্য!
পিতা: আহ:, তর্ক করার সময় মেজাজ হারালেই ক্যালামিটি। আমি এখন তোমার প্রতিদ্বন্দী; আমি তোমায় উস্কে দিতে চাইবই,  তাই বলে তুমি ফাঁদে পা দেবে ? ভুলে যেও না তুমি আমার মেয়ে! কিপ ইয়োর কুল।
কন্যা: বেশ। ও আমার চেয়ে তিন বছরের বড়
পিতা: দাঁড়াও, তুমি কী একটা মানুষ কে বিচার করতে আগে তার বয়স দ্যাখো?
কন্যা: পয়েন্ট, তাহলে কী ভাবে বলবো বলো ?
পিতা: ভাবো। ভাবো। তোমার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আমায় কনভিন্স করা। নিজের ম্যাও নিজে সামলাও, আমার কাছে টিপস চাইলে চলবে কেনো ?
কন্যা: ধুর!
পিতা: ধৈর্য্য!পেশেন্স! বুক ভরে দুবার নিশ্বাস। গুড। এবার বলো, ক'বছরের আলাপ?
কন্যা: তিন মাস
পিতা: তিন মাস ? হোয়াট? জিরো পয়েন্ট ট্যু ফাইভ ইয়ার্স ? টু লেস, ক্যানসেল।
কন্যা: কী ক্যানসেল ?
পিতা:  এই হাইড্রোকার্বনটি, হি ইজ নট ওয়ার্থ ইউ।

এর বেশ কিছু বছর পর। যখন পিতার সঙ্গী ইজি-চেয়ারটুকু আর কন্যার সঙ্গী সেই হাইড্রোকার্বনটি।
বৃদ্ধ পিতার চশমার কোনে স্মৃতি চিক চিক করে ওঠে, কন্যার বিয়ের দিনটি। লোকজন-সানাই-ব্যস্ততা-ছুটোছুটি আর সব কিছুর মাঝে কনে সেজে সেই ক্লাস সেভেন জ্যামিতিতে ফেল করা বুচি। যাওয়ার সময় যখন বুচির চোখ জলে টলটল, পিতার শান্ত হাতে কন্যার গাল টিপে ধরেছিলেন:
“ ইকোনোমাইজ ইওর টিয়ার্স বুচি, ভুলে যেওনা তুমি আমার মেয়ে”। 

Tuesday, June 19, 2007

রিটায়ারমেন্ট


অনুপবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। পাশে তখন সহকর্মীরা একে একে স্যালুট জানিয়ে চলেছে।  এই গতকাল পর্যন্ত যারা পিছন পিছন কাঠি হাতে ঘুর ঘুর করেছে তাঁদের গলা আজ বুজে আসছে। 


কেউ বুঝল না। কেউ চিনল না। অনুপবাবুর বুক হুহু করে ওঠে। সদ্য পাওয়া শালটা খামচে ধরে নিজেকে সামলে নেন তিনি। গাড়ি নাকি এক ড্রাইভারের হাতে থাকলে সুস্থ থাকে, অথচ আজ মনে হচ্ছে বহু হাত ঘোরা হয়ে গেছে। অফিস গসিপ, বসের খিচিরমিচির, সম্পর্কগুলোর থেকে মিউচুয়াল মাখন দেওয়ানেওয়া; আচমকা অফিসের দেওয়াল ঘড়িতে বিকেল পাঁচটার ঘণ্টা শুনে বড় মন কেমন হয়ে গেল। 


প্রভিডেন্ড ফান্ড ব্যাপারটায় যে কত ধানে কত চাল সে'টা এবার ঠাহর হবে। সকাল বেলা বাস ট্রামের ভিড়ে হদ্দ হতে হবে না সে'টা ভেবে কিছুদিন বেশ চনমনে লাগছিল বটে। কিন্তু চোখের সামনে হঠাৎ হাজার হাজার রোববার দেখতে পেয়ে কেমন অস্বস্তি শুরু হল। ডিমিনিশিং মার্জিনাল ইউটিলিটি এমন ভাবে কলার টেনে ধরলে যে বুকের মধ্যে হঠাৎ একটা বিশ্রী হাঁসফাঁস শুরু হল। ওদিকে তখন হিউম্যান রিসোর্সের শেখরবাবু "শেখরবাবুকে ছাড়া আমাদের অফিস অন্ধকার" বলে একটা মায়া জড়ানো আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছেন। অনুপবাবুর কিছুতেই মনে করতে চাইলেন না যে গত সপ্তাহেই শেখরবাবু তাঁকে "হাড় জ্বালানো বুড়ো" বলেছিলেন। 

অনেক কিছু ভেবে রেখেছিলেন অনুপবাবু। 

রিটায়ারমেন্টের পর গোপালপুরে একটা মাই ডিয়ার ছাদওলা বাড়ি কিনবেন। সেই ছাদে বেতের চেয়ার টেবিল। টেবিলের ওপর ধবধবে চায়ের কাপ প্লেট। একটা বাটিতে অল্প ঝাল চানাচুর। বিকেলের ফুরফুরে হাওয়া, সমুদ্রের কানে আরাম দেওয়া গর্জন আর পাশে গিন্নীর গুনগুনে নজরুল। 

এই ভাবে টুপটাপ কেটে যাবে। তারপর চুপচাপ বেরিয়ে যাওয়া, তখন মুখে বুদ্ধের হাসি। 


কিন্তু সব মোটামুটি গুবলেটে এসে ঠেকেছে। 

কলকাতার ভিড়ের বাইরে গেলেই বাড়তি অক্সিজেনের ঠেলায় বুকে কষ্ট হয়।
গড়িয়াহাটের ভিড়ে হপ্তায় একবার চুবনি না খেলে গিন্নীর অম্বলের হোমিওপ্যাথিক ওষুধ হজম হয় না। 


গোপালপুর নিয়ে দু'চারটে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেই শেখরবাবু কাঁদো কাঁদো গলায় ডাকলেন;
"এইবার আমি অনুরোধ করব আমাদের সবার প্রিয় দাদা আর একজন বড় মাপের মানুষ; অনুপদাকে দু'টো চারটে কথা বলতে"। 

হঠাৎ একটা ফিক হাসি এসে অনুপবাবুর মুখের তেতো ভাবটা উড়িয়ে দিল। 

তিনি বলতে শুরু করলেন; 

"হিউম্যান রিসোর্সের শেখরের খিস্তি, ডাক্তারের কানমলা আর কলকাতার ক্যাঁচরম্যাঁচরে থিতু হয়ে গেছিলাম। তিনটে পিলারের একটা আজ ধসে গেল শেখরের কান্নায়। তবু, বাকি দু'টো নিয়ে আশা করি বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারব"। 

জনশ্রুতি এই যে প্লাস্টিক হাসির আড়ালে "ঢ্যামনা" ডাক চেপে রাখাটা শেখর সমাদ্দার দিব্যি রপ্ত করেছেন। সে কারণেই মাত্র বেয়াল্লিশ বছর বয়সেই এত বড় কোম্পানিতে হিউম্যান রিসোর্সের হোতা হতে পেরেছেন। অনুপবাবুর বক্তব্য শেষ হতে বিসলারি ভেজানো রুমালে নিজের চোখ মুছলেন তিনি।  

Friday, June 15, 2007

শহরে বৃষ্টি

প্রবল গরম ধুয়ে মুছে সাফ করে দেওয়া বৃষ্টি। 
মিনিবাসের ঠাসাঠাসি সব মাথায় "ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে" লেভেল বৃষ্টি। 
বাতাসে ডাব-সরবতি ফ্লেভার এনে দেওয়া বৃষ্টি। 
খিচুড়ি মামলেটের ক্লিশেতে মন দোলানোর বৃষ্টি। 
ইলিশের কার্পেটে মাছের বাজার মুড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বয়ে আনা বৃষ্টি। 

সব মিলে মাখনের ঢিপির মধ্যে দিয়ে মখমলে ছুরির ডগা বেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিল বটে, শুধু ঠোক্কর খেল উত্তর কলকাতার হাঁটু জলে। কলেজ স্ট্রীট টু হ্যারিসন রোড, সর্বত্র নাকানিচোবানি। কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতে দাঁড়ানো উচিৎ না ভাসা উচিৎ সে'টা নিয়ে ভেবে মিনিট দুই থুতনি চুলকানো যেতেই পারে।  তবে ইয়ে, আমাদের ক্ষমতা আছে হাঁটুজলের ঘায়ে নস্টালজিয়ার বোরলিন লাগানোর। 

ইনফ্রাস্ট্রাকচার করে বেশি লাফালাফি করলে রোম্যান্সে চোনা পড়তে পারে। অন্তত তেমনটাই বলেছেন দিল্লী প্রবাসি বান্ধবি। কফি হাউস  থেকে কাটলেটি মেজাজ নিয়ে বেশ মৌজ করে বেরিয়েছিলেন। আমি ভাবলাম লম্বা স্কার্ট রাস্তার জলে ছপরছপর করলেই মুডের ফুরফুর চুপসে যাবে। 

কিন্তু ওই। নস্টালজিয়ার বোরোলিন। 
ভাসা ভাসা চোখ নিয়ে তিনি জানালেন; "আমার বড় ইচ্ছে এমন জলজমা রাস্তার ধারে একটা পুরনো বাড়িতে সংসার পাতব। এমন হাউসবোট পেলে এই কলেজস্ট্রীটই আমার ভূস্বর্গ হয়ে থাকবে"। 

স্বল্প আলাপে "অসহ্য ন্যাকামো" কথাটা দুম করে বলা যায় না বোধ হয়। 

Sunday, June 10, 2007

মিস্ড কল









মিস্‌ড কলকে অনেকে বেশ মর্সকোডের মত ব্যবহার করছেন। অবশ্য টকটাইম কিনতে গেলে যে ভাবে পকেট টকে যাচ্ছে, তা'তে এই দুরন্ত ইনোভেশনে নিজেদের সঁপে না দিয়ে কোনও উপায় নেই।

বিশেষত পড়ুয়া প্রেমিক প্রেমিকারা মিস্‌ড কলকে অন্য পর্যায় নিয়ে যেতে পেরেছেন।
সমস্ত কল কোডেড।
ভর দুপুরে হাফ-বার বেজে থেকে গেল। প্রেমিকা নির্ঘাত খটমট মেজাজে। 
বার চারেক বাজল। প্রেমিক নিশ্চয়ই ভর দুপুরে পার্কের বেঞ্চে অপেক্ষা করে করে হদ্দ হয়ে পড়েছে।
রাতের বেলা মিস্‌ড কলে বালিশের তলায় রাখা ফোন একবার ভাইব্রেট করে চুপসে গেল। প্রেমিকার মন কেমন।
মিনিবাসের ভিড়ে নকিয়া টিউন টুপ করে বেজেই স্পীকটি নট। সেও ফুলবাগান পৌঁছল বলে।

প্রত্যেক জোড়ার আলাদা আলাদা ম্যানুয়াল।
রাত দু'টোর সময় যে মিস্‌ড কল আদতে এনকোডেড গোপন চুমু, ভরদুপুরে সেই মিস্‌ড কলই বিকেলের হাঁটতে যাওয়ার প্রপোজাল।

মাঝেমধ্যে গোলমাল পাকিয়ে যায় বটে। এই যেমন সে'দিন। মান্তুদা বড় রাস্তার মোড়ে চিতপটাং হয়ে শুয়ে। বুকে মাঝে মধ্যেই নীল মোবাইলটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। নীলাদির দুদ্দাড় মিস্‌ড কল, ওর টিউশন শেষ হয়ে গেছে। এ'বার ঘাটের দিকে দেখা হওয়ার কথা।

এ'দিকে বেরসিক ট্রাকটা অমন দুম করে এসে না পড়লে মান্তুদার পক্ষীরাজ হারকিউলিস সাইকেল এতক্ষণে ঘাটের পাশের নিমগাছটায় হেলান দেওয়ানো থাকত। নির্ঘাত। 

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...