Monday, April 23, 2018

রবি আর আলো

- মোমবাতিটা কোথায় রেখেছ পটাদা?
- ড্রয়ারে। পড়ার টেবিলের।
- নেই। ভালো করে মনে করো দেখি।
- তোমার সেই চার ব্যাটারির টর্চটা কী হল?
- ফেলে এসেছি। তাসের আড্ডায়।
- ভেবে কী হবে আর ভাই রবি। বাথরুমের রাস্তাটুকু মাপা। আর খানিক পরেই ভোর হল বলে। লোডশেডিংকে লাই দিয়ে মাথায় তুলতে নেই। শুয়ে পড়।
- আলোর সোর্স হাতের কাছে নেই ভাবলে বড় অস্বস্তি হয় পটাদা। ঘুম আসতে চায়না।
- মেসে নতুন তো, আর দু'চারমাসে আলোর বদ অভ্যাস কেটে যাবে।
- মোমবাতিটা নিশ্চয়ই কোথাও..।
- খুব ভয় লাগলে বোলো, সিগারেট ধরিয়ে নেব। লাইটার আমার বালিশের নীচেই আছে। লাইটারের ফস আর তারপর বেশ একদানা আলো বিউটি স্পটের মত ঘরের অন্ধকারে মিনিট তিনেক জ্বলবে। শুয়ে পড়ো, নতুন চাকরী; উঠতে দেরী হলে কেলেঙ্কারি হবে। সকালের বাথরুমের লাইন কেমন পড়ে তা তো দেখেইছ। আর চ্যাটার্জী মশাই একবার ঢুকলে হয়ে গেল। দশটার আগে শেয়ালদা পৌঁছতে পারবে না।
- তোমার এই মেসে অনেকদিন হল, তাই না?
- থার্ড ইয়ার থেকে। তারপর মাস্টার্স। তিন বছর চাকরী।  মেস ছেড়ে লম্বা ছুটিতে বের হলে বেশ হোমসিক ফীল করি।
- পটাদা, লাইটারটা দেবে একবার?
- আলোর জন্য? ভয়টয় পেলে নাকি হে?
- না। এমনি। আচ্ছা থাক।
- এই নাও, লাইটার।
- না না, থাক।
- রাখো রাখো।
- থ্যাঙ্ক ইউ। আমি বারান্দা থেকে আসছি। কেমন?
- গোপনে সিগারেট খেতে চাইছ? সে কী!
- না না। এমনি।
- মাঝরাতের বারান্দাটা দেখছি তোমার এক বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

**

- আমি ভাবলাম আজ আর আসবে না...।
- আরে ধুস, ব্রীজের আড্ডায় টর্চটা ফেলে এসেছি। এ'দিকে মোমবাতিগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। লাইটার দিয়ে ইন্টার গ্যালাক্টিক সিগনাল তৈরি করা কি চাট্টিখানি কথা?
- এই পাগলামি আর কদ্দিন রবি?
- যদ্দিন। তদ্দিন। ইলেয়া, এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছ কেন?
- আমাদের গ্রহে টেকনোলজি আছে তাই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছি। তোমায় শেখাতে পেরেছি আলোর ব্যবহারে সিগনাল ট্রান্সমিশন। তবুও, ব্যাপারটা আমার জন্য বেআইনি। আর, তাছাড়া...।
- সবই জানি, তবু...। ইলেয়া, প্লীজ।
- আমার আর তোমার সময় সম্পূর্ণ আলাদা। এক অন্য সময়ের আমার সঙ্গে এক অন্য সময়ের তোমার এই যোগাযোগ। প্রেম। ভালোবাসা। স্নেহ। সমস্তই আলোর যাত্রাপথের ভাঁওতা।
- কিন্তু ইলেয়া...।
- সময়ের একই বিন্দুতে দাঁড়ালে তোমার জগতে আমি মৃত। আমার জগতে তুমি সুদূর ভবিষ্যৎ।
- যোগাযোগ বন্ধ কোরো না ইলেয়া, প্লীজ।
- যোগাযোগ? এ'টা একধরনের প্ল্যানচেট রবি! প্ল্যানচেট।
- যেওনা। প্লীজ।
- যেতে যে আমায় হবেই। সে'টা বলতেই তোমায় ডাকা।

**

খানিক হলেও অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব হল পটা ওরফে পটলকুমার দত্তর। ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রলোকুইজমের আর্ট এ দেশে প্রায় মরতে বসেছে। নিয়ার-ভেন্ট্রলোকুইজমের মত পুতুলের ডামিকে কথা বলানো নয়, ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রোলোকুইজমে মনে হয় শব্দের উৎস দূরে কোথাও; পটলবাবুর নিজেরই নিজের পালটানো কণ্ঠস্বর দূর থেকে ভেসে আসছে ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। সত্যি কথা বলতে  পটলবাবুর মত ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রোলোকুইস্ট ভূভারতে আর দু'টো নেই। তবে এই শিল্পকে অবশ্য বাণিজ্যিক ভাবে কোনোদিনও ব্যবহার করতে চাননি তিনি, শুধু মেসের নতুন বান্দাদের গোপনে একটু হয়রান করেই সামান্য তৃপ্তি লাভ হয়।

তবে এই রবি ছোকরা একটু সহজেই ভেসে যাওয়ার উপক্রম করেছিল। কাজেই মানেমানে ইলেয়াকে বিদেয় দেওয়া ছাড়া পটল দত্তর আর কোনো উপায় ছিল না।

Saturday, April 21, 2018

কোজাগর

- বাবু।
- কিছু বলছিলে বাবা?
- কেন এসেছিস?
- মানে?
- বাড়ি ফিরলি কেন?
- উফ, একদিন মাত্র দেরী হয়েছে। তার জন্য এত চোপা করবে? রোজ দিব্যি ছ'টার মধ্যে ঢুকে যাই।
- কেন ফিরলি?
- কী হয়েছে তোমার?
- কেন? ফিরলি কেন?
- জেনে গেছ?
- তোর অফিসের সুপ্রিয় ফোন করেছিল। ওকে পুলিশ জানিয়েছে।
- বডিটা?
- ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এসে পৌঁছবে।
- ওহ।
- কেন এলি?
- কোজাগর। উপন্যাসটা খান পঞ্চাশেক পাতা বাকি ছিল। ওরা আসার আগেই...।
- আচ্ছা।

***
- বাবা?
- হুঁ? পড়া হল তোর?
- একটু বেশি সময় লাগল। কী ইচ্ছে হল, মাধুকরীটা নামিয়ে কয়েক পাতা পড়লাম। কী সুন্দর শব্দটা, তাই না বাবা?
- বটেই তো। তোর মায়ের খুব প্রিয় উপন্যাস ছিল।
- হুঁ। যাক গে, এ'বার আমায় যেতে হবে। ওই, কলিংবেল বাজছে। সুপ্রিয়দারা এসে গেছে, তোমার নাম ধরে হাঁকডাক শুরু হয়ে গেছে। তুমি দরজাটা খোলো। আমি আসি, কেমন?
- দরজা? দরজা খোলা হবে না যে। ওদের ভাঙতেই হবে। আমার বডিটা দোতলায়, টেলিফোনের ঘরেই পড়ে আছে। দরজা খুলবে কে?

কানমলা

- ব্রাদার, জব ডান। 
- যাক। ক'টা খরচ হল?
- তিনটে। 
- সে কী! দু'টো মানুষের জন্য তিনটে। 
- একটা বুলেট মাথার ডান দিক ঘেঁষে বেরিয়ে গেল। ব্লিডিং যা হচ্ছিল তা'তে রিস্ক নেওয়াই যেত, তবে...। আইপিএলের ম্যাচ চলছিল। গেইল প্যাঁদাচ্ছিল। তাই আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হল না। দিলাম তিন নম্বর মাঠে নামিয়ে। 
- অপচয় হে জুনিয়র, অপচয়। নাইনটি থ্রীর দুর্ভিক্ষ দেখনি তো, তাই এত মেজাজ। গেইলের ব্যাটিং দেখতে গুলি নষ্ট। অথচ নাইনটি থ্রীতে আমরা মার্ডার টার্গেটের ইন্টারভিউ নিতাম, সে গুলির জন্য কোয়ালিফাই করছে কিনা দেখতে। নয়ত স্রেফ বাঁশ-পেটা করে কাজ সারতে হত। 
- ভয়ানক সময় তো। হিউমান রাইটস বলতে কিস্যু ছিল না ব্রাদার। 
- আর এখন আমরা গেইলের ব্যাটিং দেখতে খরচ করছি বাড়তি গুলি। 
- সরি ব্রাদার। 
- যাক গে, এক্সেল শিট আপডেট করে দাও। এ মাসের ট্যালি কত দাঁড়াল?
- বাহাত্তর জন। খরচ একাশি। 
- ওয়েস্ট। ওয়েস্ট। তা এ'টা কি গেইলের এ মাসের ন'নম্বর সেঞ্চুরি ছিল?
- তা কেন ব্রাদার। প্রেম করছি। তাড়া থাকে মাঝেমধ্যে। 
- ফের সেই নাইনটি থ্রির মন্বন্তরের গল্পই করি। তখন তুমি হামা দিচ্ছ। আমি তখন ওই আকালেও টপাটপ লাশ ফেলে বেড়াচ্ছি। রাঘববোয়ালের জন্য জমিয়ে রাখতে হয় বুলেট। তা একদিন আমার প্রেমিকা...। 
- তোমার প্রেমিকা ব্রাদার?
- কেন?
- তোমার দেখলে কেমন টেবিল চেয়ার মনে হয়। তোমার আবার প্রেম। 
- তখন দেখলে নার্ভাস হয়ে পড়তে জুনিয়র। সর্বক্ষণ বুকপকেটে রক্তের ছিটে। বুলেটের অভাবে সমস্ত সুপারিকিলার ছটফট করছে অথচ আমার পকেটে আধপেটা খাওয়া জোড়া পিস্তল। মাঝেমধ্যে নিজেকে আয়নার দেখে নিজেই ঢোক গিলতাম। 
- তা প্রেমিকার কেসটা কী হল?
- বারুইপুরে একটা পুরনো পেয়ারাবাগান কিনেছিলাম, লাশগুম করার একটা নতুন জায়গা দরকার ছিল। সে পেয়ারাবাগান প্রথমবার দেখতে গেলাম প্রেমিকাকে নিয়ে। প্রেমে কেমন লোকে মাথায় চড়ে বসে দেখো জুনিয়র, সে আমায় বলে কিনা বুলেটে ছুঁড়ে পেয়ারা পেড়ে দিতে? ওই বুলেট আকালের বাজারে? তবে প্রেমিকার কথা। ফেলতে পারিনি। পত্রপাঠ খরচ করেছিলাম একটা বুলেট। 
- একটা বুলেটে ক'টা পেয়ারা?
- জিরো। 
- সে কী! তুমি ক্র্যাকশট। এক বুলেটে পেয়ারা পাড়তে পারলে না?
- একটা বুলেট। জিরো পেয়ারা, একটা পেয়ার। 
- হুঁ? 
- প্রেমিকাকে দিয়েই সে লাশগুমস্থান পেয়ারাবাগানের উদ্বোধন করেছিলাম জুনিয়র। বললামই তো, দুর্ভিক্ষে মানুষ ক্যানিবালিজমের পর্যায় কী ভাবে নেমে আসে তা সে'বার বেশ টের পেয়েছিলাম। 
- আইব্বাস ব্রাদার। 
- তাই তো বলি জুনিয়র, রিসোর্স নষ্ট কোরো না। রিসোর্স নষ্ট কোরো না। তা সে বুলেট হোক বা প্রকৃতি। অনিষ্টকারীর কানমলা খেতে দেরী  হয় না। বুঝলে? 

Sunday, April 15, 2018

নব

- হ্যালো।
- হুঁ।
- বাবু!
- হুঁ।
- শুভ নববর্ষ।
- ন্যাকা।
- কেমন আছিস?
- বহুত খুব।
- পুরনো পাড়ায় যাস এখনও?
- নাহ্। সময় কই।
- ও। তা বটে। তুই কত ব্যস্ত।
- খুব ব্যস্ত। বড্ড দৌড়ঝাঁপ। হুড়মুড়।
- অফিসের খুব চাপ?
- ওই। তুই কেমন আছিস?
- দিব্যি। একটা নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। বেশ ইন্টারেস্টিং জানিস।
- বাহ্।
- আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?
- না।
- রাখি?
- রাখ।
- রাখব না।
- আচ্ছা।
- পাড়ায় ফিরিস না কেন?
- ওই যে। ব্যস্ত।
- ন্যাকা।
- ফোনটা রাখবি?
- ফিজিক্স টিউশনের পর রোজ বাদাম খাওয়াতাম তোকে। ঘাটের পাশে। দু'বছর ধরে। প্রতি শনি আর বুধ। মাঝেমধ্যে বোনাস হিসেবে বিপিনকাকার ঘটিগরম। নিজের টিউশনির টাকায়। ভুলে গেলি? নেমকহারাম! রাস্কেল!
- গাল পাড়তে ফোন করলি?
- বেশ করব। যাস না কেন? পাড়ায়?
- এমনি।
- ঘাটের আশপাশটা বড় দেখতে ইচ্ছে করে বাবু। কদ্দিন দেখিনা। তোর মনে পড়ে? ওই কচুবন আর গঙ্গামাটি মেশানো গন্ধ? মনে পড়ে তোকে প্রবাবিলিটি শিখিয়েছিলাম? এই রকমই, সংক্রান্তির বিকেলে।
- স্নব। তুই অঙ্ক স্নব।
- তাই কথা বলিস না আমার সঙ্গে?
- আমাদের কথা বলতে নেই।
- তোর মুণ্ডু।
- ফোন রাখবি এ'বার? আমি ব্যস্ত।
- বাজে কথা। পাড়ায় ফিরবি একদিন? ঘাটে যাবি বাবু? বলবি কতটা বদলে গেছে জায়গাটা? কচুবন আছে এখনও? বিপিনকাকা সাইকেলে ঘটিগরম নিয়ে ঘাটের পাশ দিয়ে যায়? তিন নম্বর সিঁড়িটা, যে'খানে আমরা বসতাম, সে'টা আগের মতই...।
- আমি এক কলিগের সঙ্গে আছি। খুব ব্যস্ত। রাখি?
- একদিন ঘাটে গিয়ে ফোন করবি আমায়? বাবু?
- না।
- তুই একটা ইডিয়ট! আস্ত গাধা!
- হোয়াট আর দ্য অডস?
- এ'রকম কেন করিস? কথা কেন বলিস না?
- কল্যিগ। অফিসের কাজ। রাখছি।
- আয়। সাবধানে থাকিস।
- হুঁ। শুভ। নববর্ষ।
- ন্যাকা। রাখ। দ্যাখ কল্যিগ কী বলছে। কাজ কর।

***

- কার ফোন ছিল গো?
- ভূতের।
- ঘাটে বসে আছ পা ছড়িয়ে, অথচ অফিসে আছ বললে। নির্জলা মিথ্যে।
- বিপিনকাকা, তুমি ঘটিগরমের ব্যাপারী,  ভূতের খবরে তোমার কাজ কী? আর এক ঠোঙা ঘটিগরম বানাও বরং। আর ইয়ে, প্রবাবিলিটির অঙ্ক জানো তুমি?

Friday, April 13, 2018

সুইসাইড নোট



নীল বিষের বড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথায় কেমন ঝিম ধরে গেছিল।
কী ভীষণ মায়া। কেমন ছায়াময় ভালো লাগা।

তবু। যেতেই হবে। নিজেকে খতম না করতে পারলে এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে না। হতে পারে না। মারা যযাওয়ার আগে পিতা পইপই করে বলেছিলেন সে ভয়ঙ্কর জিনিসপাতি না ঘাঁটতে। এত্তটুকুন দানা, সে'টুকু বুকপকেটে রেখে জীবন কাটিয়ে চলে যাওয়া। পড়ে থাকত অন্তত অন্ধকার আর সেই দানাটা।

কিন্তু ওই। একা থাকতে থাকতে বেয়াকুবের মত কাজটা করে ফেলেছিলেন তিনি। বুকপকেট থেকে দানাটা বের করে দু'আঙুলে চাপ দিতেই ঘটে গেছিল বিস্ফোরণ। সে এক চোখ ধাঁধানো মুহূর্ত।

প্রথম আলো দেখেছিলেন তিনি,
সে যে কী আনন্দ।

সেই প্রথম আলো দেখেছিলেন তিনি,
চোখ ধাঁধানো,
মনপ্রাণ ভাসিয়ে নেওয়া;

আলো।
পদার্থ।

তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল আগামী;
প্রাণ, সুর, কথা, গান, কবিতা, ভোট, ট্যাক্স।
সমস্তটাই।
ক্রমশ চোখের সামনে আগামীর সিস্টেম গড়ে উঠিতে শুরু করল।

একবার মনে হল পিতা খামোখাই ভয় পাইয়েছিলেন। মন চনমন করে উঠেছিল। প্রাণের ফুরফুর, সুরের ঝরঝরানি, কথার কলকল, গানের ঝিরিঝিরি, কবিতার টুংটাং,  ভোটের ঠুকুরঠুক আর ট্যাক্সের ধুপুরধাপুড় মিলে সে এক মনোগ্রাহী সিস্টেম।

কিন্তু সে আনন্দ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। দিব্য দৃষ্টিতে তিনি টের পেলেন এ ভালোমানুষি সিস্টেমের মূল অভিপ্রায় আসলে কী।

সমস্ত বোঝার পর পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না তাঁর। সমস্ত আলো আর সমস্ত পদার্থ মিলে যে ভালোমানুষি সিস্টেমের মায়াজাল; তার একটাই লক্ষ্য;
সেই খুকির লাশ। খুকির ছিন্নভিন্ন দেহ। তার থেঁতলে যাওয়া মাথা। তার গা মাথা থেকে চুইয়ে পড়া রক্তে মিশে যাওয়া  যত গান, কবিতা, ভোট আর ট্যাক্সের ময়লা

শিউরে উঠেছিলেন তিনি। ককিয়ে উঠেছিলেন।

সৃষ্টির গোড়াতেই অসহায় ঈশ্বর নিজের মুখে পুরেছিলেন সেই নীল বিষের পুরিয়া। অন্যহাতের মুঠোর ধরা ছিল আগামীর দিকে ভাসিয়ে দেওয়ার চিরকুট ;

"আমায় ক্ষমা করিস না খুকি।
আমিই খুনি"।

Wednesday, April 11, 2018

বালিশের ওয়াড়

বালিশের ওয়াড় হবে আবছা গোলাপি, তা'তে লাল সুতোর ডিজাইন।
ধবধবে সাদা বিছানার চাদর।
গায়ে দেওয়ার সাদা কালো চেক ভাগলপুরী চাদর।
বাটিক প্রিন্টের ওয়াড় দেওয়া পুষ্ট পাশবালিশ।
খাটের মাথার কাছে টেবিল। সেই টেবিলে কাঁচের গেলাস ভরা জল, কাঠের কোস্টারে ঢাকা। পাশে পুরনো কাচের স্কোয়্যাশ বোতলে জল।
জলের বোতলের পাশে এক শিশি মিষ্টি আমলকি।
আর বালিশের পাশে পকেট রেডিওতে নজরুল। 

আর বুকের ওপর সঞ্জীব।
মাথার ভিতর সদ্য পড়া 'রাবণবধ'।
হাতের নাগালে বেডস্যুইচ।

ভেবেটেবে

অনেক ভেবেটেবে দেখলাম।

ভালোলাগা গানের শেষের ফুড়ুৎ করে বেরোনো 'আহা',
হুড়মুড়ের মধ্যিখানে ফোনের ও'পাশে মায়ের 'খেয়েছিস?',
পুজো আসছের মন ফুরফুরে 'এইব্বারে জমবে',
জমাটি শীতের রাতে মনপসন্দ বইয়ের শেষে পাতায় পৌঁছনো 'আইব্বাস',
পুরী যাওয়ার ওয়েটলিস্ট টিকিট কনফার্ম হওয়ার 'ইউরেকা',
হাজারবার প্ল্যান করেও জমানো চিঠি ছিঁড়ে কুচিকুচি না করতে পারার 'ধ্যাত্তেরি',
ছোটবেলার ইয়ারদোস্তের গায়ে পড়া 'আরে বল না বে কী হয়েছে',

এ'গুলো কিছুতেই যাওয়ার নয়।

অতএব,
'সিটিসি'র পায়ে দড়ি পরিয়ে 'ছোটিসি আশা'র বাঁশের খুঁটিতে বাঁধতে পারলেই নিশ্চিন্দি।

(ইয়ে, 'বাঁশ'য়ের খুঁটির রেফারেন্স দিলাম কেন কে জানে)।

জ্ঞান দেব?

- জ্ঞান দেব?
- না।
- দিই?
- না।
- প্লীজ।
- আহ্। দাদা! বললাম তো। এখন না।
- প্লীজ। দু'একটা ভালো ভালো কথা। টুকটাক জেনারেল নলেজ। মাপা ইমোশন। হালকা হিউমর। আর এ সব কিছুর আড়ালে কিছু মেজর লার্নিং।
- এখান থেকে যাবি এ'বার?
- এত ইম্পেশেন্ট হচ্ছিস কেন বল তো? জ্ঞানে এত অনীহা কেন?
- আমাকেই কলার টেনে জ্ঞান দিতে হবে কেন?
- ওয়াইফাই চলছে না। ডেটা প্যাক শেষ। উপায় নেই ভাই। একটু শোন। পছন্দ না হলে 'লাইক' বলে উঠে যাস, কিছু মনে করব না। কেমন?

যিস কা কোই নহি


যার অঙ্কে লেটার নেই, তার কপালে মাঝরাত্তিরে গঙ্গার ধারে বসে  প্রবাবিলিটির মজা বুঝিয়ে দেওয়ার একজন দাদা গোছের মাস্টার থাকুক।

যার ব্যাঙ্ক বোঝাই টাকা নেই, তার অন্তত একটা মেডিকাল ইন্স্যুরেন্স থাকুক।

যার যুক্তিতে ধার নেই, তার মনে মধ্যে গজলের ঘুরঘুর থাকুক।

যার গল্প নেই, তার ভূতের ভয় থাকুক।

যার পিঠে চাপড় দেওয়া "কুছ পরোয়া নহি" বন্ধু নেই, তার জন্য নিরিবিলি ছাতের  কোণার নিশ্চিন্দিটুকু থাকুক।

যার কাছে "তুমি চিঠি লেখনা কেন?"র উত্তর নেই, তার বুকের মধ্যে পাহাড়িসান্যাল গোছের বোরোলিন গন্ধ থাকুক।

যার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, তার জন্য মেঘলা সন্ধ্যের ভিড় মিনিবাসে জানালা রাখা থাকুক।

যার কবিতা লেখার ক্ষমতা নেই, তার আচমকা মনখারাপে অচেনা ছোট স্টেশনে নেমে চা-ওলার খোঁজ করতে পারার দুঃসাহস থাকুক।

যার 'মা কই মা কই' মনখারাপ ভাগ করে নেওয়ার কেউ নেই, তার বালিশে সাদা ওয়াড়ে সেলাই করা নীল ফুল থাকুক। আর থাক শিয়রের কাছের জানালা বেয়ে আসা চুল ওড়ানো হাওয়া।

যার কেউ নেই, তার সঞ্জীব থাকুক।

অন্য রাত


সে এক অন্য রাত। সাজানো গোছানো। আয়েশে রাঙানো। মখমলের মত আদুরে।

চারিদিকে বালির ঢেউ। মধ্যিখানে মুক্তোর মালার মত সাজানো আলোর কিছু বিন্দু। বালির ওপর বেমানান শৌখিনতায় পাতা তোষক তাকিয়া, সে'খানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শহুরে 'রিল্যক্সেশন'। অল্প আরাম ছড়ানো বাতাসের ফরফর মুখে। হিসেব করে খুলে রাখা পাঞ্জাবির বোতাম। সমস্তই মাপা পেগের মত নিখুঁত; ওয়েল অ্যাকাউন্টেড।

তবে ওই। 'পড়তে বস্'য়ের চাবুক ধমকে কেঁপে উঠতে উঠতে বড় হয়ে ওঠা কলজের ফুর্তি ধারণ করার ক্ষমতা কম। এ'খানে আকাশ নিষ্পাপ, বড্ড বেশি তারা। দাদু তারা তৈরি হওয়ার গল্প বলতেন। অঙ্ক ভালোবাসার গল্প বলতেন। অনেক দূরের তারার গা থেকে ঠিকরে পড়া আলোর, হাজার বছর পর আমায় গায়ে নেমে আসার গল্প বলে; গায়ে কাঁটা এনে দিতেন।

আকাশ চিরে সুর ভেসে আসে। অচেনা ভাষার খোলস ছিঁড়েখুঁড়ে বেরিয়ে আসে রাজস্থানি মাটি-মাখানো সুরের দরদ। গান। দাদু আর আমি একসঙ্গে সুমন শুনতে শুরু করেছিলাম। দুই ভাই, দুই ছাত্রের মত।
'এই লাইনটা মন দিয়ে শুনেছ দাদু'?
'ভাই, এই গানটা আর একবার রিওয়াইন্ড করো। নয়ত উপায় নেই'। 

গানের চেয়ে বড় গার্জেন হয় না। সব 'এই চললাম, কেমন?"য়ের কানমলা ফিরে আসে। সমস্ত 'না থাকা' জ্যান্ত হয়ে হাতের তালুতে আঁকিবুঁকি কাটে।

ভরা আকাশের নিচে এক ভাই একলা পড়ে। তার গান বোঝায় বিস্তর ফাঁকফোকর, তার অঙ্কে ভয়, তার পকেট ভর্তি লোক ঠকানো চালবাজি।

কিন্তু তার গানের প্রতি অসহায় ভালোবাসাটুকু আছে।
আর আছে দাদুর না-থাকাটুকু।

রোগনজোশ


আলজওয়াহরের মটন রোগনজোশ তাড়াহুড়োর মাথায় খেলে বোধ হয় মজাটাই মাটি। খানিক কাবাবটাবাব খেয়ে পেট আর জিভ তৈরি করে তবে রোগনজোশের বাটিটা টেনে নেওয়া উচিৎ। রুমালি রুটি সহযোগে, অবশ্যই।

কোমর বেঁধে ঝাল খাওয়াতে আমার কোনও আপত্তি নেই, তবে গাঁকগাঁক ঝালই যে মাংস রান্নার  শেষ কথা নয়, তা আলজওয়াহর জানে।

সেই রোগনজোশের নিখুঁত ভাবে কষানো, মাপা ঝাল দেওয়া ঝোল আর তা'তে অল্প টক হালকা মিষ্টি মিশেল। আহা, সেই তুলতুলে মাংসের টুকরো; রুটি-মাংসের দলা মেঘের মত জিভের ওপর চলা ফেরা করবে। হিংস্র মেজাজে গজগজ করতে করতে চেবানো এ ক্ষেত্রে পাপ। এ রোগনজোশে একটাই পলিসি: ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া।

একসময় মনখারাপ বাসা বাঁধবে। যন্ত্রণা নয়, বুকে টনটন নয়; বরং খুব ভালো কিছুর মধ্যিখানে যেমনটা হয়। পুরনোর গানের খাতার শেষ পাতায় রেনল্ডস ডটপেনে আঁকা আলপনার মত। শরীর মন এলিয়ে পড়বে; ভালোবাসায়।

খাওয়া শেষে মৌরি মিছরিতে মেজাজ নষ্ট অবান্তর। পোস্ট-রোগনজোশ মুখশুদ্ধি একটাই; নজরুল;
'পূর্ণ চাঁদের এমন তিথি; ফুল-বিলাসী, কই অতিথি..."।

(রোগনজোশের বাটি আসার পর পকেটে রাখা মোবাইলের কথা মনে ছিল না, ছবি তোলা তো দূরের কথা। এমনই তার সুবাস)।

আংটি চ্যাটুজ্যের ভাই


টেকনিকালিটি না বোঝায় যে কী স্বস্তি। সিনেমার মাঝেমধ্যেই আহাউঁহু করে নড়েচড়ে বসা যায়। ক্রিটিসিজমের ভারি স্কুলব্যাগ পিঠে থাকে না, তুলনামূলক আলোচনার জ্যামিতির বাক্স হাতে হাবুডুবু খেতে হয় না। সে ভারি মজার।

'এই সিনেমাটা জব্বর'। 'ওই সিনেমাটা তেমন জমেনি'। আমার প্রাইমারি স্প্রেক্ট্রাম অফ সিনেমা।

আল্ট্রা-জব্বর আর ইনফ্রা-জমেনি মার্কা ব্যতিক্রমের লিস্টও অবশ্যই আছে। সেই আলট্রা লিস্টে যোগ হল 'পলাতক'।

অনুপকুমার। মৌচাক-গোছের চ্যাঁচামেচি রোলে নষ্ট হওয়া অনুপবাবু যখন এ'খানে বুক বাজিয়ে বলেন 'আমি আংটি চাটুজ্যের ভাই', তখন তাঁর দেমাকে টেকা দায়। আবার উড়ে এসে জুড়ে বসার জাদুতে তিনি ম্যান্ড্রেক। কাছে টেনে নেওয়ায় যেমন তিনি ওস্তাদ, তেমনি পাশ কাটিয়ে দুম করে বেরিয়ে যাওয়াতে তিনি নোবেল লেভেলের কিছু পাওয়ার দাবী রাখেন। অথচ তিনি বাউল নন; রীতিমত জড়িয়েটড়িয়ে থাকেন, কষ্ট পোষেন। আবার অন্যদিকে তিনি তাঁর আনন্দের ঝুলি থেকে টপাটপ বেড়াল বের করে উঠোন ভর্তি নার্ভাস পায়রাদের মধ্যে ছেড়ে চলেছেন। এমন তরতর করে মনকাড়া উপন্যাসের গতিতে সিনেমার চরিত্রকে বেড়ে উঠতে সচরাচর দেখা যায় না।

বসন্তের তথাগত হতে না পারার যাবতীয় উপাদান নিয়ে এই সিনেমা। বসন্তের ফিরে আসার গল্প আর ফিরতে না পারার গল্প মিলেমিশে যে সৌন্দর্য, তার তুলনা শুধু টলটলে দু'চোখের সন্ধ্যা রায়।

টেকনিকাল ভাষায় যাকে বলে 'মোস্ট জব্বর সিনেমা'।

ধনক


কতবার মনে হয়েছে শৈলেনবাবুর লেখা নিয়ে সিনেমা তৈরি হলে কেমন হত। সারল্য, রূপকথা আর গতির ও'রকম মিশেল লেখা থেকে সিনেমায় তুলে আনা কি আদৌ সম্ভব? সিনেমার ঘণ্টা দুয়েকের পরিসরে ওই গল্পগুলোকে একই রকম প্রাণবন্ত রাখা যাবে?

সমস্ত চিন্তা দূর করে দিলেন নাগেশ কুকনুর। ওই, আমার সিনেমার টেকনিকাল দিকগুলোর ব্যাপারে তেমন কোনও ধারণাই নেই। কিন্তু সিনেমা ভালো লাগার ব্যাপারে স্পষ্ট বেঞ্চমার্ক আছে (নিজের 'ভালো লাগা', আইএমডিবি রটেনটোম্যাটোর রেটিং নয়, ক্রিটিকাল রিভিউ পড়ে মাথা নাড়া নয়)।  ভালো লাগা সিনেমা শেষ হলেই মনে হবে দিব্যি একটা গল্পের বই শেষ হল।

এই যেমন 'ধনক' দেখে মনে হল। শৈলেন লেভেল গল্পবলা, মনখারাপে মনভালোতে মেশানো প্লট। আর অবিকল সেই সব ফ্রেম যা শৈলেনের গল্প পড়তে পড়তে মনের মধ্যে ভেসে ওঠা উচিৎ। ইউটোপিয়ান অথচ কী ভীষণ স্মার্ট; আগাগোড়া। অমন একটা দিদি আর ও'রকম একটা ভাই; শৈলেনবাবু দেখলে বড় খুশি হতেন। আর এ'দিকে নাগেশ কুকনুরকে শৈলেন পড়ানোর দায়িত্ব যদি কেউ নিত।

তাছাড়া এই সিনেমার গান! ওই গানগুলো বাদ দিলে গল্পটা পুরো বলাই হত না। আর আছে বলিউড। ভাষার তফাৎ আর গিজগিজে বিটিকেল জিনিসপাতি থাকা সত্ত্বেও বলিউড যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে; তা স্বপ্নের মত মেলে ধরা হয়েছে।

( শৈলেনকে আমরা তেমন পাত্তাটাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম না। বাংলা ভাষাটা টিকে থাকলে অন্য কোনো প্রজন্ম দেবে হয়ত। একটা ব্যাপার সদ্য জেনেছি, শৈলেন ঘোষের উপন্যাসগুলোর সংকলন অবশেষে বেরিয়েছ। সম্ভবত পারুল প্রকাশনী, চার খণ্ডে)।

মেমোরিস ইন মার্চ


মিসেস মিশ্র আর অর্ণব।

ওদের আবারও দেখা হবে। মাস তিনেকের মধ্যেই,  সম্ভবত দিল্লীতে।

মিসেস মিশ্র অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখা মাছের খবর নেবেন।

অর্ণব ব্যস্ত হয়ে ঘুরে দেখবে মিসেস মিশ্রর বাড়ি, খবর নেবে কলকাতা থেকে বয়ে আনা বইগুলো কোথায় রাখা হয়েছে।

আবার ওরা নিজেদের তফাৎগুলো হাতড়ে মরবেন আর শেষ 'তা বেশ, এই ভালো' বলে থামবেন। 'এম্প্যাথি' ব্যাপারটা সেই সব মাতব্বরদের জন্য নয় যারা কথায় কথায় "আমি ঠিক" বলে অন্যের গলা টিপে ধরেন (সে মাতব্বর ঈশ্বরের মত নির্ভুল হলেও নয়)।

দু'জনে পুরনো অ্যালবাম উল্টেপাল্টে দেখবেন; পাশাপাশি বসে। মিসেস মিশ্রর আপত্তি অবশ্যই থাকবে না অর্ণবের বানানো কফিতে। আর অর্ণব? তিনি হো-হো হেসে সোফা থেকে কুশন-বুকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়বেন; থেরাপিস্ট দেখানোর উপদেশ শুনে।

রাতের দিকে মিসেস মিশ্র টের পাবেন অর্ণবের এই সময় দিল্লী আসার কারণ। তাঁর মতই, অর্ণবও প্রিয় মানুষদের জন্মদিন গুলিয়ে ফেলেন না।

মিসেস মিশ্রর জন্মদিনের ডিনার বাইরেই সারার প্ল্যান হবে; অর্ণবের ট্রীট। ওদের সঙ্গে বেরোবে সিড।

খোকার ভুল


বড় হওয়ার প্রসেসে একটা জব্বর 'বাগ' রয়েছে। মাঝেমধ্যেই মনে হয় 'অ্যাই যে, এইবারে বেশ দাঁড়িয়ে গেছি। দেওয়াল ঘড়ির ব্যাটারি পাল্টাবো। চালানি কাতলা চিনে ফেলে নাক সিঁটকবো। খোকাটি পেয়ে শুকনো বাঁধাকপি গছিয়ে দেবে, তেমন বান্দা আর কেউ থাকবে না চারপাশে'। তখন মনে হয় বুড়োদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলি; 'আরে আমি থাকতে তোমার সাতপাঁচ ভাবার আছেটা কী'?

ঠিক তখুনি দুম করে একটা 'ভুল' ঢুকে পড়বে; আর সমস্ত গুবলেট, গোটা ইকুইলিব্রিয়াম জলে। পায়ের তলার মাটি ঝুরঝুরে হয়ে পড়বে, চেনা মানুষগুলোর গা থেকে পাওয়া যাবে অন্য গ্যালাক্সির গন্ধ। কিছু হাত নরম 'আছি তো'র সুরে পিঠে নেমে আসে, কিন্তু তবু ধুকপুকানি বাড়তে থাকে। সমস্ত মাটি করে ফেলার অপরাধবোধ গলা টিপে ধরে।

তখন এই দামড়ামোর খোলস ছেড়ে বেরোনো জন্য যে কী প্রাণান্তকর আইঢাই। আর এই দুর্বিষহ বয়স আর পাপ ঝেড়ে ফেলার একটাই জায়গা আছে বোধ হয়; মা-বাবা। ভুল স্বীকারের এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয় আর নেই। কাঁধে বাপের হাতের মত সৎসাহস আর হয় না।

র‍্যান্ডি পশ্ বলেছিলে সরি বলার তিনটে ভাগ আছে;
- দুঃখপ্রকাশ।
- দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।
- দোষগুলো শুধরে নেওয়ার জন্য সমস্ত কিছু করতে চাওয়া।

স্মিথের 'সরি' সে অর্থে 'কপিবুক'। আর সবচেয়ে বড় কথা;  স্মিথ ভেঙে পড়েছিলেন বুড়ো বাপের জন্য; লজ্জায়, দুঃখে, অনুশোচনায়। খোকার পাশে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা; যদ্দিন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তদ্দিন ঈশ্বরেরও ক্ষমতা নেই খোকার শৈশব কেড়ে নেওয়ার।

তবু। কোথাও কারুর হত মনে হবে গিমিক, সাজানো। জানি না। তবে আত্মসমর্পণের অন্ধকারে খোকার পাশে আলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা, আমার বাবা-বিশ্বাসী চোখে সে'টুকুই আশ্বাস।
শাস্তিটুকু থাক, আর শাস্তির ও'পাশে থাকুক ভালোবাসায় মজবুত খোকা।

ফিরে আসুন স্টিভ। ফর ইওর ওল্ড ম্যান। আমরা অপেক্ষায়।

অনশন

- দত্ত, এসো। এসো।
- কী ব্যাপার স্যর? এত জরুরী তলব?
- রাজনীতি হে দত্ত। তিষ্ঠোবার উপায় আছে? সারাক্ষণ মাথায় স্ট্র‍্যাটেজি কিলবিল করছে। যাক গে। চটপট কাজে লেগে পড়ো।
- কাজ? কীসের কাজ?
- বাহ্! আজ বাদে কাল অনশনে বসব। কত আয়োজন করতে হবে।
- অনশন?
- অনশন।
- কেন?
- তোমায় ডেকেছি কি আমার মুখ দেখতে? কীসের জন্য অনশন করব তার একটা যুতসই কারণ খুঁজে বের করো দেখি। অপোনেন্টরা ভেবড়ে যাবে এমন একটা কিছু। আর যে'টা মিডিয়া আর পাবলিক খাবে। প্রতিবাদি। সত্যাগ্রহী গোছের। চটপট একটা মোটিভ খুঁজে বের করো। আগামীকাল আমি অনশনে বসছি। ক্যুইক দত্ত। ক্যুইক। হাতে সময় খুব কম। আজ সন্ধের মধ্যে মিডিয়াকে বাইট দিতে হবে।
- আমরণ?
- ব্রেকফাস্ট ডিনার লাঞ্চ টিফিন বাদ দিলে জীবনটাই তো আমরণ অনশন। তবে এ'ক্ষেত্রে আমরণ না। টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স।
- ও, আচ্ছা।
- আমার সঙ্গে পার্টির ছেলেছোকরারাও উপোস করবে।
- উপোস?
- আহ্, অনশন। ওদের জন্য পরের দিন দুপুরে মাংস ভাতের ফীস্টি অর্গানাইজ করতে হবে। আর পার হেড হাফ বোতল ব্লেন্ডার্স প্রাইড। নোট করে নাও। তুরন্ত।
- ভেন্যু?
- অনশনের জন্য একটাই তো জায়গা ভাই। গান্ধী মূর্তির পাদদেশ। সে'টা নড়চড় হওয়ার উপায় নেই।
- সে'খানে আবার আগামীকাল ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প আছে।
- ও আমি পুলিশকে বলে দেব। পারমিশন উইথড্র করে নেবে। তুমি ওখানেই শামিয়ানা খাটাও। লাউডস্পিকার চাই। কারার ওই লৌহকপাট। মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় গোছের গান বাজবে। পরের দিন ফিস্টিতে অবশ্য তাম্মা তাম্মা চাই। ছেলেদের মনোবল নুয়ে পড়লে চলবে না।!
- আজ্ঞে। নোটেড।
- আরো চাই। ফেস্টুন। ব্যানার। শহরজুড়ে প্রতিবাদি পোস্টার।
- পার্টি ফান্ডের একটু টানটান অবস্থা। সামনেই আবার ইলেকশন।
- সিংঘানিয়ার কারাখানার লাইসেন্স হয়ে গেছে না?
- আজ্ঞে। গতকাল পার্টি অফিসে মিষ্টির বাক্স নিয়ে ঘুরে গেল।
- ন্যাকা, কোটি কোটি ব্ল্যাক টু হোয়াইট করবে আর আমাদের বেলায় এক বাক্স ক্ষীরকদম? ওকে বলে দাও। আমার অনশন স্পন্সর করবে। ইয়ে, আমিই বলে দেব'খন। পুরনো হিসেবেও কিছু একটা বাকি আছে; ঝালিয়ে নিতে হবে।
- বেশ। চিন্তা নেই স্যর, হয়ে যাবে। দত্ত থাকতে আপনার কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু ইয়ে, স্যর। কালকেই অনশনটা করতে হবে কেন?
- গিন্নী পঞ্জিকা দেখে নিজে রেকমেন্ড করেছে। নির্জলা উপোস করতে হবে। কালকেই। সন্তোষী মা না শেতলা কিছু একটা ব্যাপার আছে। গেরস্তের মঙ্গল অমঙ্গল বলে কথা। রিফিউজ করি কী করে বলো দত্ত। তাই ভাবলাম রিলিজিয়াস উপোসটাকে যদি অপ্টিমাইজ করে রিভোলিউশনারি অনশনে কনভার্ট করা যায়।
- নোশনাল অনশন। দিব্যি। তা পরশুর ব্লেন্ডার্স প্রাইডে আপনি থাকছেন কি?
- নাহ্ দত্ত। আমার জন্য সুইট লাইম সোডা। অনলি। তবে তাম্মা তাম্মা থেকে আমায় আবার বঞ্চিত কোরো না, কেমন?

অ্যাপয়েন্টমেন্ট

- অমল। তাই তো?
- আজ্ঞে না। সুবিমল।
- সুবিমল? সে কী!
- সত্যিই সুবিমল।
- রিয়েলি? আপনার নামটা অমল ছিল না?
- নিজের নাম স্যর। অমলই যদি হবে তা'হলে খামোখা সুবিমল বলব কেন।
- তা ঠিক। যাকগে। তা অমলবাবু, আমার কাছে কী মনে করে?
- সুবিমল। সু বিমল।
- কে সুবিমল?
- আমি।
- তাই তো বললাম।
- না, আপনি অমল বললেন।
- ওহ। তা সুবিমলবাবু। আমার কাছে কী মনে করে?
- না মানে...।
- না মানে নো। ইংরেজিতে।
- তা নয়...।
- নিশ্চয়ই তাই।
- আসলে আমায় আপনি ডেকেছেন।
- আমি? আপনি কি প্লাম্বার? অমলবাবু?
- সুবিমল। আমি সুবিমল।
- আপনি কি প্লাম্বার? আমার বেসিনটা লীক করছে তাই...।
- না না..।
- না মানে? আমার বাথরুমের বেসিন, আমি জানব না?
- তা নয়।
- তাই। আমার বাথরুমের মেঝে ভিজে যাচ্ছে। এ'দিকে।আমি মোজা পরে বাথরুমে যাই। ক্যালামিটি।
- মৈত্রবাবু। আমি অমল নই, সুবিমল। আর আমি প্লাম্বারও নই। আমায় আপনি ডেকেছেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে তবে এসেছি।
- আমি ডেকেছি?
- কবিতা লেখা শেখাতে। মাইনে ভালোই অফার করেছেন। ভুলে গেছেন? একদম?
- ওহ ওহো। সুবিমলবাবু। এইবারে মনে পড়েছে। কবিতার টিউশনি। বটেই তো। বটেই তো। তা এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। আপনি শিক্ষক, আমি ছাত্র। প্লীজ, বসুন।
- ধন্যবাদ। ঘণ্টায় হাজার টাকার ব্যাপারটা। ভুলবেন না প্লীজ।
- চেক চলবে? মাসের শেষে ঘণ্টা হিসেব করে। নাকি অ্যাডভান্স মাস্ট?
- না, মাসের শেষে দিলেই হবে।
- গুড। শুরু করুন তা'হলে।

**

কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথের পুরনো বইয়ের আস্তানায় কত রকমের বিচিত্র বই দেখতে পাওয়া যায়। খোঁজার চোখ থাকা চাই। এই যেমন গত শনিবার। পুরনো বইয়ের ঢিপির মধ্যিখানে সাতপুরনো বাঁধাইয়ের ইংরেজি বইটা চোখে পড়েছিল; 'প্ল্যানচেট ফর ব্রিঙ্গিং ব্যাক দ্য ডেড এলিমেন্টস ফ্রম ইনসাইড ইওর সোল'। লেখক বাঙালি আর লেখকের নামটা তাঁর নিজের নামের বেশ কাছাকাছি ; অমল মৈত্র।

লোভে পড়ে বইটা ঝুপ করে কিনে ফেলেছিলেন মানিতলার সুবিমল মৈত্র।

Friday, April 6, 2018

লুঠ

- কোনো ত্যান্ডাইম্যান্ডাই নয়। এই যে রিভলভারটা আপনার কপালে ঠেকানো, এ'তে চারটে গুলি আছে। দু'টো কাল খরচ হয়ে গেছে। এক মাল বটুয়া দিতে দু'সেকেন্ড দেরী করে ফেলেছিল। কাজেই, বেশি চালাকি নয়।
- কম চালাকি কী ব্যাপার?
- দেব নাকি? ঠুকে?
- নিজে ভুল বলবে তারপর আবার মেজাজ। বেশি চালাকি নয়; এ আবার কেমন কথা। অপটিমাম চালাকি মাপার কোনো উপায় আছে নাকি? কোনো চালাকি নয়; সে'টা বরং বলতে পারতেন। আকাট গাধামো তাও চেষ্টা করলে ডিফাইন করা যায়।
- মানিব্যাগ দেখি। চটপট।
- আসুন। এই যে।
- আর কী আছে?
- বলছি। তার আগে মানিব্যাগের ফয়সালা হয়ে যাক।
- মানে?
- বাইশ'শো আছে। আমায় তিরিশ টাকা দেবেন প্লীজ? ফেরাটা রিক্সায় হলে একটু সুবিধে। রাহাজানির পর হেঁটে বাড়ি ফেরা যে কী ট্যাক্সিং। সে'বার জসিডিতে এ'রকম একটা সিচুয়েশনে পড়েছিলাম। সে'টা অবশ্য ঠিক ডাকাতি নয়, পকেটমারি। কাজেই মিষ্টি হেসে রিক্সার ভাড়া চাওয়ার স্কোপ পাইনি।
- এই নিন, পঞ্চাশ। যত বাজে কথা। এ'বার আর যা আছে...।
- এই সেরেছে। পঞ্চাশের ভাঙানি দেবে ভেবেছেন অত সহজে? ব্যাটাদের কথায় কথায় তর্কের অভ্যাস।
- এই যে। তিনটে দশটাকার নোট। শান্তি?
- এ মা! আপনি নিজের মানিব্যাগ বের করে আমায় খুচরো দিলেন? বড্ড মাইডিয়ার তো। এই লাইনে পোষাচ্ছে?
- দেব খুলি উড়িয়ে?
- খুচরো দিয়ে খুলি উড়িয়ে কী লাভ বলুন। জুতো মেরে গোদানের চেয়েও লোয়ার লেভেলের কথা বলে ফেললেন তো।
- উফফফফ!
- আহ্। পেশেন্স। যাক গে, মানিব্যাগ ছাড়া রয়েছে হাতঘড়ি। বিয়েতে শ্বশুরমশাই গিফট করেছিলেন। ভিন্টেজ এইচএমটি।
- খুলবেন না মালাইচাকিতে গুলি করব?
- আদেখলার ঘটি হল, জল খেতে খেতে প্রাণ গেল। একটা পিস্তল যোগাড় করে কী তম্বি।  যাকগে, এই রইল ঘড়ি। ওহহো। এক মিনিট, ঘড়িটা পাঁচমিনিট স্লো চলছে। ঠিক করে দিই।
- চোপ! কিচ্ছু করতে হবে না। দেখি ঘড়ি। আমার হাতে দিন।
- বাস ট্রেন মিস হলে আবার আমায় বাপান্ত করবেন না যেন। ও, শুনুন। মানিব্যাগে আমার বৌয়ের দু'টো পাসপোর্ট সাইজ ফটো আছে। কাইন্ডলি বের করে দিন।
- আচ্ছা ভোগান্তি হল মাইরি। এই। এই যে। আপনার বৌয়ের পাসপোর্ট সাইজ ছবি। এ'টা আদেখলাপনা নয়?
- আমি তো আর আমার বৌকে আপনার কপালে ঠেকিয়ে আপনার মানিব্যাগ চেয়ে বসিনি। আমার আদেখলাপনায় গাজোয়ারি নেই।
- ছবি দেখে মনে হল বৌদির শুগার আছে।
- পরস্ত্রীর চোখের কোলের দাগ অমন মন দিয়ে দেখতে নেই।
- আহ, আমি মোটেও সে ভাবে দেখিনি।
- আই সী। তা বলছিলাম যে; একটা আংটি আছে। অল্প সোনা, বড্ড বেশি খাদ। চাই?
- থাক বরং।
- ক্যাশেই সুবিধে, তাই না?
- তা তো বটেই। ঠিক আছে। ঘড়িটাও ফেরত নিন। কত আর পেতাম ও'টা বেচে।
- এহ্, এ'বার আমার খারাপ লাগছে। আমি ওই ভাবে বলিনি। ঘড়িটা রাখুন না।
- ধ্যার! বলছি ফেরত নিতে। নিন রাখুন।
- মোস্ট কাইন্ড অফ ইউ।
- ইয়ে, শুনুন। মেজাজ নড়ে গেল। ধুত। এই নিন আপনার মানিব্যাগ। যত্তসব আপদ।
- ছিঃছিঃ! প্রফেশনাল কম্প্রোমাইজ করাটা বাড়াবাড়ি। মানিব্যাগটা অন্তত রাখুন না প্লীজ। নয়ত আমি মরমে মরে থাকব।
- দেব? ট্রিগার টেনে?
- বলেছি না। আদেখলার ঘটি। যাক গে। থ্যাঙ্কিউ ফর দ্য মানিব্যাগ। আর সাবধানে যাবেন, কেমন? দিনকাল ভালো নয়।

***

মনোহর বুঝলে আজ আর ডাকাতির চেষ্টা করে লাভ নেই। তাই সোজা গিয়ে বসল শেষ শান্তিপুর লোকালটায়। আজ বড় মনকেমন, আজ বড় মনভালো।

কদ্দিন পর মিনুর দেখা পেল। কদ্দিন পর। মিনু কি তাকে মনে রেখেছে? নিশ্চয়ই রেখেছে। ঘাটের ধারে বাদাম ভাজা খাওয়া আর সিনেমার গল্প করা কি অত সহজে ভোলার? তবে মিনুর বাবা বিচক্ষণ, ভাগ্যিস মনোহরের হাতে তুলে দিয়ে মেয়েটাকে ভাসিয়ে দেননি।

মিনুর বর বড় ভালো, মাটির মানুষ; ওকে খুব ভালোবাসে।
কিন্তু মিনু নিজের শরীরের এত অযত্ন করে কেন? এই বয়সে হাই-শুগার, এ'টা কোনো কাজের কথা নাকি?

Wednesday, April 4, 2018

ইভোলিউশন

- খিস্তির ইভোলিউশনে গতি নেই রে। 
- নেই বলছ?
- কচু আছে। সেই মান্ধাতা আমলের চার অক্ষরে আটকে রইল জেনারেশনের পর জেনারেশন। আমার বাপ জ্যাঠার মুখখারাপ আর আমার মুখখারাপে কোনো স্কেল চেঞ্জ হল না। 
- চার অক্ষর আউটডেটেড বলছ?
- আউটডেটেড নয়? একশো এমবিপিএস ব্রডব্যান্ডের যুগে ইনল্যান্ড লেটারের জন্য পোস্ট অফিসে লাইন দেব? 
- অলটারনেট খিস্তি ভেবেছ? আপগ্রেডেড?
- মুশকিল কী জানিস, আমার মোবাইলে জিও সিম থেকে কী হবে যদি বাকি সবার ট্যাঁকে নকিয়ার স্টোনএজের ফোন থাকে। মিউচুয়াল এক্সচেঞ্জ না হলে সমস্ত ইনোভেশন জলে।
- তবু। দু'এক পিস শুনি। চার অক্ষরের বদলে কী বলে তৃপ্তি পাবে?
- বেহালামেট্রো। 
- কী?
- আজকাল কাউকে বোকাইয়ে বললে সে ভাবে মাই ডিয়ার সুরে কথা বলা হচ্ছে। ইম্প্যাক্ট ঝুলে গেছে। কিন্তু তাকেই বলে দেখ 'তুই বেহালামেট্রো, তোর গুষ্টি বেহালামেট্রো'। তার গা থেকে চামড়া খুবলে উঠে না এলে আমি এক বছর খিস্তি দেওয়া ছেড়ে দেব।
- নেক্সট অপশন?
- রোলেসস্। 
- রোলেসস্?
- রোলেসস্। ঢ্যামনা বলার চেয়ে অনেক বেশি ধারালো। 
- বুঝলাম।
- বুঝিসনি। না বুঝে রোলেসসাচ্ছিস। 
- এই আবার শুরু হল তোমার বেহালামেট্রোমো।
- দেখেছিস? শুনেই কেমন ফ্লপিড্রাইভ জ্বলে যায় না? 

Tuesday, April 3, 2018

সময় মত

- ভাই বিনু।
- কী ব্যাপার?
- একটা বড় গোলমাল হয়ে গেছে ভাই।
- চোখের কোণে কালি। ফ্যাকাসে মুখ। ব্যাপারটা সিরিয়াস মনে হচ্ছে।
- সিরিয়াস তো বটেই। আর একটু ভেবড়ে দেওয়াও বটে। কাল গোটা রাত ঘুমোইনি। গায়ে অল্প টেম্পারেচারও আছে মনে হচ্ছে ভাই। থার্মোমিটারটা নেহাত ভেঙে গেছে তাই ভেরিফাই করতে পারিনি।
- সামনে পার্ট ওয়ানের এগজ্যাম। দেখো তপু, গোলমাল পাকিও না। এ'বার ড্রপ দিলে তোমার বাবা তোমায় একটা গরুর কাছে একদলা গোবরের দামে বেচে দেবেন বলেছিলেন। মনে নেই? গত মাসে যখন মেসে এসেছিলেন?
- একদিকে বাবার হুমকির ভয়ে, অন্যদিকে এই ক্যালামিটি। মাঝেমধ্যে ভয় হয়, পাছে কবিতা লিখতে না শুরু করি।
- হয়েছেটা কী? খুলে বলো দেখি।
- সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড।
- কী'রকম?
- গতকাল আমি একটা চিঠি পেয়েছি।
- চিঠি?
- ইনল্যান্ড লেটার। আসানসোলে আমাদের পাড়া থেকেই।
- হুমকি?
- তা অবিশ্যি নয়।
- লিখেছে কে?
- লিপি।
- লিপি?
- পাশের বাড়ির মেয়ে। একই বয়সী। বন্ধু। একই টিউশনি।
- চিঠিতে কী লিখেছে?
- লিখেছে, আমাদের প্রেম এ'বার শেষ হওয়া দরকার।
- ব্রেক আপ?
- ব্রেক আপ। ইনল্যান্ড লেটারে।
- প্রেম ভাঙার ব্যথা, আহা তোমার জন্য যে আমার বুকই ফেটে যাচ্ছে।
- ব্যথা, বুক ফাটা ব্যথা। তবে, ইয়ে। ব্যাপারটা ঠিক বুঝছ না ভাই। আমি তো জানতামই না আমি প্রেম করছিলাম। লিপি ব্রেক আপের খবর জানাতে মালুম হল যে আমি প্রেম করছিলাম।
- সাংঘাতিক!
- প্রেম করার সময় প্রেম করছি জানাটা যে কী জরুরী ভাই। প্রেম ভাঙার দুঃখ ফীল করব কী, প্রেম করার সময় প্রেম বুঝতে না পারার দুঃখে হাত কামড়ে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
- আহা।
- সময় মত প্রেম করছি জানলে সময় মত শেষের কবিতা পড়তে পারতাম। উদাস হয়ে শ্যামল মিত্রের গান গাইতে পারতাম। বন্ধুদের কাছে 'প্রেমিকা ডেকেছে, আজ খেলতে যেতে পারব না' বলে ল্যাজ নাড়তে পারতাম। এখন সব জলে।
- শ্রোডিঙ্গারের প্রেম ভায়া, বুক চাপড়ে আর লাভ নেই। প্যারাসেটামল দেব নাকি একটা?