Thursday, March 21, 2019

রঙচঙ


ঘোর কাটতে আধঘণ্টা মত  লাগল। তখনও অবশ্য চারপাশে চাপ চাপ অন্ধকার দেখছি। যদিও এখন বেলা দশটা, রোদ ঝলমলে দিন, তবু আমার খোলা জানালা ছাপিয়েও এই অন্ধকার। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ভাব, গা হাত পায়ে টনটন ব্যথা।

খানিকক্ষণ পর চোখের অন্ধকার কমে আসতে টের পেলাম আমি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে। মুখে বিশ্রী তেতো স্বাদ; রঙের। ওরা রীতিমত অত্যাচার করে গেছে যা মনে হচ্ছে। কপালে চোট লেগেছে; তবে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে না রঙ তা বোঝার উপায় নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘরের সমস্ত আসবাব ওলটপালট হয়ে পড়ে আছে। মেঝে দেওয়াল  সমস্ত রঙে কাদায় লেপটে আছে। বিশল্যকরণী মেডিকেল স্টোর থেকে পাওয়া বাংলা ক্যালেন্ডারের রবীন্দ্রনাথ ছিঁড়েখুঁড়ে মাটিতে লুটোপুটি। কাচের ফুলদানিটা চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে; পায়ে কাচ ইতিমধ্যেই না ঢুকে থাকলে বাঁচোয়া। কোনোরকমে উঠতে গিয়ে দেখলাম ডান হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা; নির্ঘাত খুব বিশ্রীভাবে গুঁতো লেগেছে। আর লাগবে নাই বা কেন?

যে'ভাবে জনা দশেক পেল্লায় আধগুণ্ডা মানুষজন ঘরের মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়লে রঙ মাখানোর অছিলায়। আজকের দিনে নাকি এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক ; এ'টাই রীতি।  কোনো মানে হয়? যাদের আমি আদৌ ভালো করে চিনি না, যাদের সঙ্গে গোটা বছর কোনো যোগাযোগ থাকে না; তারা ঘরে ঢুকে রঙ মাখানোর নামে অত্যাচার করবে আর এ'টাই নাকি রীতি। যত্তসব! ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে লম্বা চওড়া আর বিটকেল; সে আবার ঠণ্ডই খাওয়ানোর নাম করে বিশ্রী একটা কী জোর করে গিলিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত সে'টা চোলাই কারণ গলা বেয়ে বমি উঠে আসছে মনে হচ্ছে। মিনিট কুড়ির চেষ্টায় কোনো রকমে উঠে দাঁড়ানোর পর টের পেলাম গায়ের ফতুয়াটা ছিঁড়ে ফালাফালা অবস্থা।

কান্না পাচ্ছিল খুব। এ'টা তো রীতিমত অন্যায়, অথচ আমার কিছুই করার নেই। টেনেহিঁচড়ে কোনোক্রমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম; নিজেকে চেনা দায়। ক্যাটকেটে সবুজ, কটমটে লাল, কুটকুটে গেরুয়া আর আরো হাজার রকমের বিশ্রী বাঁদুরে রঙে আমার চেহারা ভূতের মত হয়ে গেছে। কপালে আর ঠোঁটে চোট; বাঁদুরে রঙের ওপর তাজা রক্তের স্পষ্ট দাগ।

বুকের ভিতরটা টনটন করে উঠল। জোর করে রঙ মাখাতে আসা লোকগুলোর বিশ্রী হুঙ্কার আমার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল;
"গণতন্ত্রবাবু, আজকের দিনে অমন একটু হয়। মাইন্ড করতে নেই। এ দিনটায় অন্তত আমরা পার্টিরা একটু ফুর্তি করব না আপনার সঙ্গে? তা কি হয়? এই একটাই তো দিন। বুরা না মানো গণতন্ত্রবাবু, ইলেকশন হ্যায়"।

Sunday, March 17, 2019

মুকুলবাবু আর প্লেন হাইজ্যাক


২৯ সি। আইল সীট, তাই ঘনঘন বাথরুম-মুখো হওয়াটা অস্বস্তিকর ঠেকলেও মানুষজনকে ডিঙিয়ে টপকে অসুবিধেয় ফেলতে হচ্ছে না; সে'টা একটা বাঁচোয়া। প্লেন কলকাতা থেকে টেকঅফ করেছে প্রায় সোয়া ঘণ্টা হতে চলল; ইতিমধ্যে বার তিনেক উঠতে হয়েছে। নখ চিবিয়ে চিবিয়ে আঙুলের ডগাগুলোর অবস্থাও রীতিমতো বিশ্রী।  পাশের সীটে এক তরুণী বারবার আমার দিকে বাঁকা চোখে দেখছে। কপালে যে'ভাবে ঘাম জমছে আর অপর্যাপ্ত লেগ-স্পেসে যে ভাবে বারবার ছটফট করে চলেছি, মেয়েটির কুঁচকে যাওয়া ভুরু জোড়াকে কিছুতেই দোষ দেওয়া যায় না।

**

- একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এজেন্টসাতাত্তরমশাই, হাইজ্যাকের প্ল্যানে আমি ঠিক কী ভাবে রয়েছি। আমায় বন্দুকটন্দুক কিছু দিচ্ছেন না। অবিশ্যি তুবড়িতেও আমার বুক কাঁপে, বন্দুকটন্দুক হাতে দিলেও কিছু করতে পারতাম না।

- মুকুলবাবু, আর কতবার বলব। আপনার কাজ শুধু ফ্লাইট নম্বর ইএল দু'শো বাইশে সময়মত বোর্ড করা। এ'টুকুর জন্যই আপনি এতগুলো টাকা পাচ্ছেন। এ'বার অকারণে মাথা ঘামানোটা বন্ধ করুন। হ্যাঁ, আপনার থেকে আমরা লুকোতে চাইনি যে আমাদের উদ্দেশ্য প্লেনটা হাইজ্যাক করা। তবে অপারেশনের ডিটেলস জেনে আপনার কোনো উপকার হবে না।

- কাজটা দেশ এবং সমাজবিরোধী। সে'টা আমি বুঝি এজেন্টসাতাত্তরদা। কিন্তু ছেলেটার অপারেশনের যা খরচ...বড্ড ফাঁপরে পড়েছি জানেন দাদা। মাস দেড়েক ধরে কোমায় পড়ে আছে অমন হিরের টুকরো ছেলে, আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার কথা। ব্রাইট, মিশুকে, নম্র। নিজের ছেলে বলে বলছি না স্যর, বড্ড ভালো ছেলে ও। ওর অমন নির্জীব দেহ আর কাঁচের মত চোখ দেখে বুক ভেঙেচুরে যায়; বার বার। বিশ্বাস করুন! নয়তো এই বিশ্রী ব্যাপারে কিছুতেই জড়াতাম না..।

- আপনি বড্ড বাজে চিন্তা করেন মুকুলবাবু। বড্ড। পিলু সুস্থ হয়ে উঠবে, আমার অন্তত তেমনটাই মনে হয়।

- ও মা, আপনি দেখছি খোকার ডাকনামটাও জেনে বসে আছেন!   আপনার হোমওয়ার্কে তারিফ না করে উপায় নেই মশাই। আসলে কী জানেন, প্রসেসটা পুরো জানলে একটু কনফিডেন্স পেতাম। আপনাদের এত রাখঢাক, আরে আমার সঙ্গে লুকোচুরি করে লাভটা কী। আমি তো আপনারই টীমে। আমিও তো টেররিস্ট। আমার  সঙ্গে এত কথাবার্তা, এত দহরমমহরম; তবু এদ্দিনেও আপনার মুখ দেখতে পেলাম না। একবার ঝেড়ে কাশুন দেখি, আমি তো আপনারই দলে, নাকি?স্যাটাস্যাট সাধারণ মানুষকে কচুকাটা করার প্ল্যানে ঢুকে পড়েছি, তা বেশ বুঝছি। তবে নিজেকে সঁপে যখন দিয়েইছি, আমাকে নিয়ে আপনার ইয়ের কোনো মানেই হয় না।

- বেশি ভাবনাচিন্তায় কাজ গুবলেট হয়। সময়মত বোর্ড করবেন। বোর্ডিং প্ল্যান আর প্লেন নিয়ে কারুর সঙ্গে আলাপ জমাতে যাবেন না যেন; নিজের মিসেসের সঙ্গেও খেজুর করতে যাবেন না। হিতে বিপরীত হবে। কেষ্টপুরের যে স্পট আপনাকে বলা আছে; সে'খান থেকে আমাদের লোক আপনাকে তুলে নেবে আগামী সতেরো তারিখ। ঠিক সকাল সাড়ে আটটায়।

- আরে মনে আছে। আর কতবার বলবেন। অন্য টার্মিনাল থেকে এ প্লেন ছাড়বে কারণ প্রচুর ভিভিআইপি প্যাসেঞ্জার রয়েছে। আর আমার কাজ চুপচাপ আমার সীটে গিয়ে বসে যাওয়া। ২৯সি।  ইনস্ট্রাকশন আপনা থেকেই আমার কাছে চলে আসবে। আর সময়মত প্লেনটা হাইজ্যাক...।

- করেক্ট।

- শুধু একটাই রিকুয়েস্ট এজেন্টসাতাত্তরদা! একটু কনসিডার করে দেখুন। প্লীজ। ওই সতেরো তারিখই খোকার অপারেশন; ওই দিন এই অলক্ষুণে ব্যাপারটা না ঘটালেই নয়? সে'দিনটা অন্তত খোকার মায়ের পাশে থাকব না? আমি মানত করেছি যে; প্রাণ দিয়ে হলেও খোকাকে বাঁচানোর সমস্ত চেষ্টা আমি করব। আর আমি যদি সে'দিন হাসপাতালেই না থাকি...খোকার মা নিজেকে সামাল দেবে কী করে? প্লীজ..।

- এ'সব প্ল্যান অত মামুলি কারণে পালটানো যায়না মুকুলবাবু। পিলুর মঙ্গল চাইলে সতেরো তারিখ সকালে প্ল্যান মত কাজ করবেন। ফ্লাইট আর সীট নাম্বার খেয়াল থাকে যেন, কেমন? আপনার টিকিট আমার লোকের কাছেই থাকবে।

**

ঘড়িতে এখন সোয়া এগারোটা; ফ্লাইট দিল্লী পৌঁছনোর কথা দুপুর পৌনে একটায়। অবশ্য অদ্দূরের কথা ভাবার সময় এখন নয়। মনে মনে সাইমন স্নুটস হুইস্কার্স আউড়ে খানিকটা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম বটে; কিন্তু ভাঙা হাড়ের যন্ত্রণা কি আর হোমিওপ্যাথিতে কমে? প্রতিটা সেকেন্ড দুর্বিষহ মনে হচ্ছিল।

ঠিক এগারোটা বাইশ নাগাদ ঘটল গোলমেলে ব্যাপারটা। সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে নিশ্চিতভাবেই আমি ছিটকে পড়তাম সোজা প্লেনের মেঝেতে। প্লেনের পিএ সিস্টেমে যে কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল তা চিনতে আমার অসুবিধে হওয়ার কথাই নয়;
এজেন্টসাতাত্তরবাবু। অবাক কাণ্ড, এজেন্টসাতাত্তর আর আমার যে কথাবার্তাটুকু হল; তা'তে আশেপাশের কোনো যাত্রীই বিচলিত বোধ করলেন না; পাত্তাও দিলেন না।

- গুড মর্নিং মুকুলবাবু! নার্ভাস লাগছে? সীটে বসেই জবাব দিতে পারেন; আমি দিব্যি শুনতে পাব।
- সে কী মশাই, আপনি ইতিমধ্যে পাইলটকে ঘায়েল করে প্লেনটা হাতিয়ে নিয়েছেন?
- নাহ্, এ প্লেনের পাইলট আমিই।
- আপনিই? এ প্লেন আপনারই হাতে উড়ছে? তা'হলে হাইজ্যাকের ব্যাপারটা?
- হাইজ্যাকটা আপনার হাতে।
- কেমন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আর হেঁয়ালি নেওয়া যাচ্ছেনা এজেন্টসাতাত্তরদা।
- খুলেই বলি। আমি কীসের এজেন্ট, তা ভেবে দেখেননি কোনোদিন?
- বিদেশী কোনো সংস্থার নিশ্চয়ই, তবে আপনার ক্যালকেশিয়ান বাংলার দরাজ প্রশংসা না করলে অন্যায় হয়।
- আমি এ দেশের নই। তবে কোনো দেশই আমার নয় মুকুলবাবু।
- কোনো দেশ..ইয়ে...আপনার নয়?
- আপনার চেনা কোনো দেশ আমার নয়। আমি এজেন্টসাতাত্তর, মৃত্যু উপত্যকার হয়ে আমার কাজ। কলকাতা শহর থেকে মড়াদের নিয়ে আমি এই এইএল দুশোবাইশ বা এক্সিট লাইফ দু'শো বাইশ ফ্লাইটে করে মৃত্যু উপত্যকায় দিয়ে আসি।
- দিল্লী যাওয়াটা ভাঁওতা? আমি মারা গেছি এজেন্টসাতাত্তরবাবু?
- আপনি দিব্যি জ্যান্ত একজন মানুষ মুকুলবাবু। কাজেই এ মড়াদের প্লেনে আপনাকে আনতে আপনাকে একটু ভাঁওতা দিতে হয়েছে।
- রেলের অফিসের ছাপোষা ক্লার্ক আমি। হিসেবের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছি না স্যার।
- এই প্লেনের ২৯সি বরাদ্দ ছিল পিলুর জন্য মুকুলবাবু!
- না! না!
- ওর অপারেশন এখন মধ্যগগনে। অপারেশন শেষে আমার ওকে নিয়ে কলকাতা ছাড়ার কথা। এ'দিকে সীট ফাঁকা রাখলে এ প্লেন ওড়ানো যায়না মুকুলবাবু। আপনার মানতের খবর আমি আগেই পেয়েছি। আপনি ভালোমানুষ, পিলুও আদর্শ ছেলে। আপনার মানত করা ঈশ্বর আছেন কিনা আমি জানিনা, কিন্তু আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছি। এ ফ্লাইটে আপনাকে ভাঁওতা দিয়ে আনা হয়েছে; আপনি চাইলেই এ ফ্লাইট হাইজ্যাক করে কলকাতায় ফেরত নিয়ে যেতে পারেন। বন্দুকের দরকার আপনার নেই, আপনার ইচ্ছেই যথেষ্ট। আপনি বাঁচবেন,ফিরে যাবেন কলকাতায়। আপনাকে নামিয়ে এ প্লেন ফের উড়বে।
- কিন্তু ২৯সি'র সীটটা কিছুতেই খালি থাকবে না, তাই না এজেন্টসাতাত্তর?
- আপনি বুদ্ধিমান মুকুলবাবু। সমস্তই বুঝছেন। এ'বার বলুন,। হাইজ্যাক করবেন?
- এজেন্টদাদা গো। জানেন, পিলুর বয়স যখন আড়াই কি তিন; তখন ওকে ওর বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে বলত মুকু মুকুজি। মুকুল মুকুজ্জ্যে উচ্চারণ করতে পারত না। আপনি বরং আমায় এখন থেকে মুকুবাবু বলেই ডাকবেন এজেন্টসাতাত্তরদা। আর শুনুন মশায়, আপনাদের এয়ার হস্টেসরা বেশ ঢিমেতালে চলে দেখছি। দশ মিনিট আগে কফি চেয়েছি, তার এখনও পাত্তা নেই। একটু ফায়ার করুন দেখি; লম্বা ফ্লাইটে কফিটা টফিটা সময়মত না পেলে কি চলে?

Thursday, March 14, 2019

নবার চাকরী

*এ'দিক*

প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা শালপাতার বাটিটার দিকে আনমনে চেয়েছিল নবা। পাতাটার গায়ে আলুর দম সাপটে খাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। আহা, জিভের ডগাটা টসটস করে উঠল যেন। সেই কাকভোরে দু'টুকরো পাউরুটি আর তিন গেলাস জল খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছল, এখন বিকেল সাড়ে চারটে। ট্রেন আসতে আরো সোয়া ঘণ্টা, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা ন'টা। খিদের জ্বালা নবা আগে বরদাস্ত করতে পারত না, কিন্তু দেড় বছর আগে সিমেন্ট কারখানার চাকরীটা যাওয়ার পর থেকে পেটের চাবুক টানটা কিছুটা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। একবেলা ভাত খেলে অন্য বেলা দিব্যি মুড়িমাখাতেই কাজ মিটে যায়। অবশ্য নবার বৌয়ের হাতে যে'কোনো মাখাই উপাদেয়। ন'পিসিমা মাসে অন্তত একবার তাদের বাড়ি ঘুরে যান স্রেফ বৌয়ের হাতের সাবুমাখা খেতে।

তবে আজ এই পাণ্ডুয়া স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে কেমন গা'গুলিয়ে উঠছিল যেন। মদনকাকার কথায় বেশ এক দলা আশা বুকের ভিতর পাকিয়ে তুলেছিল নবা; পাণ্ডুয়ার সুতোর মিলে সুপারভাইজরের চাকরী। মিলটা মদনকাকার ভায়রার; মদনকাকা নিজে সুপারিশ করেছিলেন। বৌয়ের সঙ্গে গতরাতে কত কথা হল; টিউবওয়েলটা সারাই না করালেই নয়, আগের সেভিংস অ্যাকাউন্টটা তো গোল্লায় গেছে; নতুন করে একটা খুলতে হবে, সাদার ওপর গোলাপ প্রিন্টের একটা বিছানার চাদর বৌ দেখেছিল গৌরহরি বস্ত্রালয়ে;মাস দুয়েকের মাথায় তেমন একটা কেনা গেলে বেশ হত। কিন্তু মদনকাকার ভায়রা যে আদৌ সুবিধের মানুষ নয় তা আজ টের পেলে নবা। মদনকাকাকে সে মোটেই তেমন তোয়াক্কা করে বলে মনে হল না, তাঁর সুপারিশকে সে পাত্তা দেবেনা সে'টাই স্বাভাবিক।

নবার যত মনখারাপ শুধু বৌয়ের কথা ভেবে। বেচারির বুক ফাটলেও মুখ ফোটেনা; তবে তাঁর কষ্ট দিব্যি আঁচ করতে পারে নবা। সে বড় আশা করেছিল; এ'বারে কিছু একটা হিল্লে হবেই। কিন্তু এ চাকরি পাওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। জানলে বৌয়ের মনটা হ্যারিকেনের কাচের মত ভেঙে চুরমার হবে। তখন নবার মনে পড়ল; বেশ কিছুদিন ধরে কিনব কিনব করেও হ্যারিকেনের নতুন কাচ কেনা হচ্ছে না।

যাই হোক, বৌয়ের আশাভরসা আজকেই কোতল করা চলবে না। তাকে নবা বলবে যে আশা আছে। অবশ্য নবা এও জানে যে বৌ তার মিছেকথাগুলো দিব্যি ধরতে পারে। আবার এ'টাও জানে যে তার মিথ্যে ধরে ফেলার ব্যাপারটা তার বৌ সহজে তাকে জানতে দেয়না। তবে সেই ভালো, তেমনটাই থাক না। সাতদিন অন্তত টিউবওয়েল সারানোর আলোচনা হবে, নতুন সেভিংস অ্যাকাউন্টের ফন্দি কষা যাবে আর আলোচনায় থাকবে গোলাপ ছাপের বিছানার চাদর।

*ও'দিক*

বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল মিনু।  একটা লাল পিঁপড়ে একটা চিনির দানা নিয়ে শশব্যস্ত। আহা রে, পিঁপড়ের ছটফট দেখে তার বরের কথাটা মনে এলো।  বরটা জানপ্রাণ লড়িয়েও একটা চাকরি জোটাতে পারছে না। মিনুর খুব কান্না পায়; অভাবে নয়, বরের ছটফটে। লোকটা বড় ভালো। বড্ড ভালো; গোটাদিন টইটই করে ঘুরে হন্যে হয়, এর ওর ফাইফরমাশ খাটে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। সাবুমাখা খাওয়ার অছিলায় ন'পিসিমা মাঝেমধ্যে চালটা ডালটা রেখে যান, তা'তে ক'দিন সোয়াস্তি থাকে বটে; কিন্তু সে'সব ফুরোতেও সময় লাগে না।

মিনু কান্না চেপে রাখতে পারে। শুধু নিজের কান্না চেপে রাখা নয়, দিব্যি নিজের বরটাকেও কথায় ভুলিয়ে রাখতে পারে। এই যেমন সে স্পষ্ট জানে যে মদনকাকা তার বরকে অকারণ হয়রান করছে; দু'চার দিন বেগার খাটানোর জন্য চাকরীর লোভ দেখাচ্ছে তাকে।  মিনু এও জানে যে আজ তার বর মিছে আশায় অকারণ পাণ্ডুয়া গেছে, সে সুতোর মিলের চাকরী তার জুটবে না। তবু কথাটা দড়াম করে বলতে মনে সরেনি মিনুর। গতকাল গোটারাত তারা দু'জনে একে অপরকে জাপটে কতশত গল্প করেছে; চাকরী পেলে কী কী খরচ করবে তার ফিরিস্তি। মিনু জানে যে তার বর আজ বাড়ি ফিরেও স্বীকার করবে না যে সুতোর মিলের চাকরী তার জোটেনি। আবার এ'টাও ঠিক যে তার বর মনে মনে জানবে যে মিনু সব টের পায়। সব। তবু মিনু বরকে জড়িয়ে গল্প ফেঁদে বসবে; টিউবওয়েল সারাইয়ের গল্প, নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার গল্প, গোলাপ ছাপানো বিছানার চাদরের গল্প; আরো কত কী ছাইপাঁশ আকাশকুসুম।

সংসারে চাল নেই, ডাল নেই; গল্পগুলো মরে গেলে মিনু আর মিনুর বর খাবেটা কী?

Saturday, March 2, 2019

প্রমোশন


এই গতকালের ব্যাপার। স্প্রেডশিটের দিকে চোখ রেখে আনমনে আন্দুলের কথা ভাবছিলাম। আন্দুল কেন? তেমন নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। স্কুলের বন্ধু নাড়ু একটা ফ্ল্যাট কিনেছে আন্দুলে, বহুদিন যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। আন্দুলের বদলে জর্জ অরওয়েল নিয়েও ভাবা যেত, ভাবা যেত খৈনি আর গঙ্গার ঘাট নিয়ে। মোদ্দা কথা এ মড়া স্প্রেডশিট থেকে মনকে লেভিটেট করে উঠিয়ে নেওয়াটাই জরুরী।

"তোমার তো পামিস্ট্রিতে বেশ ন্যাক আছে, তাই না নির্মল"?

টেবিলের ও'পাশ থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে সামান্য চমকে উঠতে হল। বসের প্রশ্ন। পার্সেন্টেজ আর প্রজেকশন বাদ দিয়ে পামিস্ট্রি? আন্দুলের আলুথালু ভাব থেকে মনটাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে টানটান হয়ে বসতে হলে।

"আগ্রহ। পড়াশোনা। দু'টোই। কিন্তু কী ব্যাপার স্যর? মার্কেট শেয়ারের ট্রেন্ড বুঝতে জ্যোতিষের অ্যাসিস্টেন্স নেওয়ার কথা ভাবছেন নাকি"?

"প্রমোশন এক্সপেক্ট করছি হে নির্মল। হেডঅফিস থেকে হিন্ট একটা এসেছে। রীতিমত পসিটিভ। তাই ভাবছিলাম তোমার জ্যোতিষবিদ্যের দৌড় একবার বাজিয়ে দেখি"।

"হেডঅফিস যখন বলেইছে..."।

" অলমোস্ট শ্যিওর। কালকেই সুখবরটা পাওয়া উচিৎ। তবু। চাপা টেনশন তো থাকবেই। আমার মুখ দেখে কিছু প্রজেক্ট করতে পারছ কি"?

"মুখ দেখে ভাগ্য বিচার? সে'সব বিজ্ঞাপনি বুজরুকিতে আমি নেই। আপনার রাশিটা কী স্যর? বাংলা মতে"?

" বলে রাখি; আমার এ'সবে আদৌ তেমন ফেথ নেই। জাস্ট একটা কিউরিওসিটি মাত্র। আমার রাশি...ইয়ে...মেষ.."।

"মেষ..? হুঁ। হুমমম"।  জ্যোতিষ আমার নেশা এবং অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্র; মগজ ও হৃদয় দুইই চট করে চনমনে হয়ে উঠল। চোখের সামনে গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল নক্সা ছড়িয়ে পড়ল নিমেষের মধ্যে।

" কী ব্যাপার নির্মল? জটিল ক্যালকুলেশন শুরু করলে মনে হচ্ছে"?

"জটিল বটে। তবে স্পষ্ট। প্ল্যানেটারি মুভমেন্ট যা দেখছি স্যর; ইয়ে..."।

" ইয়ে মানে কী"?

"হবে না। আপনার প্রমোশন এ'বারে কিছুতেই হবে না"।

" হোয়াট"?

"হেডঅফিস গাঁজা ছেলেভুলোনো খবর পাস করেছে। আপনার প্রমোশন হতে হলে বেস্পতির অর্বিট চেঞ্জ করতে হয়। সে'টা ইম্পসিবল"। গলার মধ্যে থেকে আত্মবিশ্বাস ও দিব্যদৃষ্টি মেশানো একতাল ইস্পাত উঠে এলো যেন৷

আর তখনই বসের মুখের অন্ধকার আর আচমকা শক্ত হওয়া চোয়ালে ঘরের তাপমাত্রা একধাক্কায় চার ডিগ্রী নেমে গেলো।

" যত্তসব ইডিয়টিক মাম্বোজাম্বো। প্ল্যানেটারি মোশনস না কাঁচকলা। আর তোমার আধঘণ্টাতেও রিপোর্ট শেষ হয়নি নির্মল? আর কতক্ষণ "?

***

আজ চারপাশটা কেমন ঘোলাটে ঠেকছে। হেডঅফিস থেকে খবর এসেছে, বসের প্রমোশনটা হয়নি। 'লাস্ট মোমেন্ট এমার্জেন্সি'র অজুহাতে আটকে গেছে। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই ভদ্রলোক আমার ওপর অকারণ খ্যাঁচম্যাচ করে চলেছেন।

এইমাত্র মনে পড়ল এ'বছর আমারও প্রমোশনটা হওয়ার কথা, খবর আসবে সামনের সপ্তাহে। মোটের ওপর নিশ্চিন্তই ছিলাম; সদ্য ধারণ করা গোমেদটা যে কাজ করবেই তা নিয়ে কোনো সন্দেহ গতকাল পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু আজ বসের মেজাজ দেখে নিজের জ্যোতিষবিদ্যের ওপর কনফিডেন্সটা বেশ নড়ে গেছে। বসকে চ্যাটাং সুরে কথা বলার প্রভাব সম্ভবত গ্রহ-নক্ষত্রকে বিশ্রীভাবে ভড়কে দিচ্ছে। এখন টেনশন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে।

ভাবছি আগামীকাল হাফছুটি নিয়ে আন্দুলে নাড়ুর ফ্ল্যাট থেকে একটু ঘুরে আসব। নাড়ু বরাবর বলে বেস্পতির মুভমেন্টের চেয়ে সিঙ্গল মল্টের কোয়ালিটি হৃদয়ে বেশি প্রভাব ফেলে; আজ আমার খুব নাড়ুকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে।

Thursday, February 28, 2019

চিলেকোঠা কনভেনশন


- তুই পারলি কী করে রে বিলু? তোর পিসির ছাদে রাখা বয়াম থেকে চালতার আচার চুরি করতে গিয়ে নন্তু ধরা পড়ল। তুইই পাকড়াও করলি। তা বেশ করেছিস, গীতায় বলেছে ছাদের আচার রক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুদের শায়েস্তা করা যেতেই পারে। নিজের পিসির আচার প্রটেক্ট করেছিস, আপত্তির কিছু নয়। সে অধিকার তোর আছে। কিন্তু তাই বলে যে'টুকু আচার নন্তু হাতে খাবলে নিয়েছিল, সে'টাও ওকে ফেরত দিতে বাধ্য করলি? আচার আক্রমণ করতে গিয়ে বন্দী হয়েছে, তাই বলে এমন ইনসাল্ট? আর তার চেয়েও বড় কথা..সে খবরটা তুই নন্তুর মেজকার কানে তুলতে গেলি রে?

- আমার কোনো উপায় ছিল না পুলুদা। পিসি এমন কড়া সুরে বললে...।

- শাট আপ! অক্টোবরে চিলেকোঠা কনভেনশনে স্পষ্ট বলা আছে আচার এবং আম চুরি অভিযানে কেউ বন্দী হলে তাকে অকুস্থল থেকে বের করে দেওয়া হবে ঠিকই কিন্তু তার হাত থেকে আচার বা আম কেড়ে নেওয়া কিছুতেই চলবে না। আর গার্জেনের কাছে কম্পলেইন তো নৈবচ। চিলেকোঠা কনভেনশনের কাগজে পাড়ার আরো চুয়ান্নটা ছেলের সঙ্গে তুই সই করিসনি? সেই চিলেকোঠা কনভেনশনের ডেক্লারেশনের প্রিয়াম্বেলে কি স্পষ্ট ভাবে লেখা ছিল না যে পাড়ার সীমানার মধ্যে কেউ সেই ডেক্লারেশনের বেয়াল্লিশটা ক্লজের খেলাপ করবে না? ক্লজ নম্বর তিনের সাবসেকশন ছয় বেমালুম ভুলে মেরে দিলি রে ব্যাটা কুইসলিং?

- মানছি ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু সে'টা পিসির চাপে বাধ্য হয়ে। তুমি আমার পিসিকে চেনো না পুলুদা! আমার বাবা অমন জাঁদরেল উকিল, কিন্তু পিসি একবার 'ভোম্বল' বলে ডাকলেই বাবা লেবুজল ভেজানো গলায় মিউমিউ করেন।

- চাপ সবারই থাকে চাঁদু। নন্তুর চাপ নেই? নন্তুর ওই মেগা-অসুর মার্কা মেজকার কাছে জ্যামিতি শেখে; রোজ এক ঘণ্টা করে। সেই এক এক ঘণ্টা এক একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মত। কিন্তু তাই বলে চিলেকোঠা কনভেনশনকে কাঁচকলা দেখাবে সে? আর আমি সে'টা হতে দেব ভেবেছিস? আমাকে কি সাধে কেউ কেউ ইউএন-দাদা বলে ডাকে রে? আমার দায়িত্বজ্ঞান নেই?

- তুমি ইউএন? ছাই! তুমি নিজের ধান্দায় থাকো, যে তোমায় তেল দেবে তুমি তারই দলে।  নন্তু নিশ্চয়ই তোমায় হাত করেছে।

- শাট আপ বিলু! শাট আপ! কনভেনশন ডকে তুলে আবার গলাবাজি? তুই জানিস কনভেনশনের অ্যানেক্সচার থেকে সতেরো নম্বর ক্লজ ইনভোক করে আমি তোকে আগামী এক মাসের জন্য পাড়ার ক্রিকেট টীম থেকে বের করে দিতে পারি? সে'সব স্যাংশন ঘাড়ে চাপলে তোর কী দশা হবে ভেবেছিস?

- পুলুদা! পুলুদা গো। এ'বারের মত ম্যানেজ করে দাও প্লীজ। প্লীজ। সবে ব্যাট হাতে একটু ফর্মে এসেছি। ম্যানেজ দাও, প্লীজ।

- ম্যানেজ করব? বাহ্, সে'টাই করি আর কী; ম্যানেজ। আজ তুই এ'টা করলি, কাল কেউ চিলেকোঠা কনভেনশনের বাইশ নম্বর ক্লজ লঙ্ঘন করে অন্যের প্রেমিকাকে গোপন চিঠি দেবে। পরশু কেউ উনচল্লিশ নম্বর ক্লজকে পাশ কাটিয়ে পাশের পাড়ার ছেলেদের পিকনিকে চাঁদা দিয়ে মাংস ভাত খেতে যাবে হ্যাংলাচন্দ্র হয়ে। গোটা পাড়া গোল্লায় যাক আর এ'দিকে আমি বসে ম্যানেজ করি। তাই না?

- পুলুদা! গত ম্যাচেই হাফ সেঞ্চুরি করেছি, এমতাবস্থায় আমায় বাদ দেবে? তাও ওই নন্তুর জন্য? নন্তু যে তোমার নামে কেচ্ছা রটায় পুলুদা। সেদিনের ম্যাচে তুমি ক্যাচ ফেলার পর কী বলছিল জানো ব্যাটা নন্তু? বলে পুলুদার নাম ইউএন কেন? কারণ সে ইউজলেস নিনকমপুপ। আর তাই শুনে সবার সে কী অট্টহাসি। আমি শুধু মুখ গোমড়া করে এককোণে বসেছিলাম। মা কালী বলছি।

- চিলেকোঠা কনভেনশনের  বেয়াল্লিশ নম্বর ক্লজটা নন্তু ভুলে গেছে বোধ হয়। পুলু মল্লিকের কথাই শেষ কথা।  তোকে একটা চান্স আমি দেবো! কিন্তু একটা শর্তে। তোর পিসির চালতার আচার দু'শো গ্রাম আমার চাই। পারবি?

- খুব পারব।

- বেশ তা'হলে স্যাংশন মাফ। কিন্তু আচার ট্রান্সফার ঘটবে গোপনে। মিডিয়ায় বাইট দিয়ে ব্যাপারটা ছড়িয়ে ফেলো না যেন বিলুকুমার। যাক গে! আমি যাই এখন, নন্তুর মেজকার কাছে গোপনে নন্তুর বিড়ি খাওয়া নিয়ে একটা গুজব ট্রান্সফার করতে হবে।

Tuesday, February 26, 2019

যুদ্ধটুদ্ধ


কিছু বই শুরু করে ফাঁপরে পড়তে হয়। এই যেমন উইলিয়াম শিরার সাহেবের লেখা দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ থার্ড রাইখ; আ হিস্ট্রি অফ নাজি জার্মানি। এ মলাট থেকে ও মলাটের মধ্যে অর্ধেক রাশিয়া ঢুকে যায়; এমন সাইজ সে বইয়ের। বইয়ের এক-চতুর্থাংশই পড়া হয়েছে, কাজেই এ বই সম্বন্ধে বিশদভাবে লেখা মুশকিল। শিরার সাহেবের একটা গোলমেলে দিক হচ্ছে তিনি বেশ সোজাসুজি ভাবে হোমোসেক্সুয়ালিটির বিরুদ্ধে; তাঁর লেখায় সে বায়াসের আভাস মাঝেমধ্যে ফুটে উঠেছে। তবে বইয়ের গুরুত্ব অন্য জায়গায়, নাৎসি জার্মানীর শুরুর দিনগুলো থেকে  দুর্দান্ত ডিটেলে লেখা হয়েছে, কোট করা হয়েছে প্রচুর জরুরী দলিল দস্তাবেজ এবং কাগজপত্র। আগ্রহীদের জন্য এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

যতটুকু পড়েছি, তা'তে দু'টো ব্যাপার বেশ ইন্টারেস্টিং।

এক নম্বর।
যুদ্ধ থেকে যেনতেন প্রকারেণ গা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় অনেক দেশ এবং নেতা আরো ভয়াবহ বিপদ এবং খুনোখুনির অন্ধকার ডেকে এনেছেন। ভার্সেই চুক্তিকে হেলায় পাশ কাটিয়ে যখন নাৎসিবাহিনী রাইনল্যান্ডে ঢুকে পড়ে, তখন নাকি জার্মানি কিছুতেই পালটা আঘাত হজম করার পরিস্থিতিতে ছিল না। কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের ঝামেলা থেকে গা বাঁচাতে চুপটি করে বসে রইল ফ্রান্স। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিনও স্পীকটি নট। সে'ভাবেই বেদখল হল অস্ট্রিয়া। এরপর হিটলারের দুঃসাহস আরো মজবুত হল, নজর গিয়ে পড়ল চেকোস্লোভাকিয়ার ওপর। গায়ে পড়া ভালোমানুষির নেশায় চেম্বারলিন সাহেব উঠেপড়ে লাগলেন হিটলারকে তোয়াজ করে যুদ্ধ আটকাতে। প্রায় নিজেই মধ্যস্ততা করে অসহায় চেকোস্লোভাকিয়াকে হিটলারের শ্রীচরণে নিবেদন করলেন, ফের চুপ থাকলে ফ্রান্স। ইতিহাস বলছে তখনও যদি হিটলারকে সম্মুখসমরে আটকানো হত; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দিব্যি রুখে দেওয়া যেত। কাজেই  যুদ্ধের কথা শুনলেই কানে তুলো গুঁজতে হলে মুশকিল; চেম্বারলিন সাহেব তা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন।

দু'নম্বর।
যুদ্ধ ভয়াবহই। আত্মরক্ষার খাতিরে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে, তেমনই দেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন দেশের এবং দশের সমর্থন; নয়ত তারা প্রাণপণ লড়বেন কী'ভাবে? কিন্তু এই প্রয়োজনের খাতিরে যুদ্ধ ও তার সমর্থন যাতে যুদ্ধ-যুদ্ধ নেশার উদ্রেক না করে, সে ব্যাপারে সচেতন হওয়াও জরুরী।  সামরিক প্রয়োজন অতি সহজে সামরিক জিগিরে পরিণত হতে পারে; ইতিহাসে তার অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। সে জিগির যে কী খতরনাক হতে পারে তা টের পেয়েছিল জার্মানরা। প্রয়োজনের যুদ্ধ অচিরেই পরিণত হয়েছিল খুনে আগ্রাসী হুঙ্কারে।  প্রসঙ্গত,  মহাভারতে কৃষ্ণ বলেছেন প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেই হবে। কিন্তু যুদ্ধ যে ফুর্তি আর সেলিব্রেশনের ব্যাপার; তেমন কোনো হিন্ট তিনি সম্ভবত ড্রপ করেননি।

যা হোক, এ বইটা শেষ করা দরকার। যে গতিতে পড়ছি (শুনছি), মার্চের আগে শেষ করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।

Saturday, February 23, 2019

বটু গোয়েন্দার বিশ্বাসঘাতকতা


- কী ব্যাপার? আপনি জেল পর্যন্ত ছুটে এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে? এখন বোধ হয় কাটা ঘায়ে নুন ছড়াতে এসেছেন। তাই না বটুবাবু?

- না সামন্তবাবু।

- আমি আপনার সঙ্গে আর দেখা করতে চাইনা। আপনি আসুন।

- আমাদের আরো মিনিট পাঁচেক সময় আছে। থাকুন না, তারপর না হয়ে সেলে যাবেন। দু'টো কথা ছিল। দারোগাবাবুকে অনেক রিকুয়েস্ট করে আপনার সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে।

- আপনি একজন অপদার্থ বটু গোয়েন্দা! আপনি একটা কাগুজে বাঘ। আপনাকে ভরসা করে যে আমি কী ভুল করেছি...।

- আই অ্যাম সরি মিস্টার সামন্ত।

- সরি? সরি বলে কী হবে? দেখুন, এই যে। আমার হাতে হাতকড়া।  আমি নিজের ছেলের খুনের দায়ে জেলে এসেছি। নিজের অসহায় হুইলচেয়ারে আটক ছেলেটা চোখের সামনে  মরে গেল, ট্রাকটা ওকে পিষে দিল...আর সবাই ভাবল আমিই...। ছিঃ! জেলে পচতে কষ্ট নেই, কিন্তু এ ভার নিয়ে বাঁচব কী করে বটুবাবু? আর আমার দুরাশা দেখুন। আমি আপনার ওপর ভরসা করেছিলাম।

- আমি জানি যারা আপনাকে হুইলচেয়ারকে ট্রাকের সামনে ঠেলতে দেখেছিল তাঁরা ভুল বলছিল। আমি জানি সামন্তবাবু।

- থামুন! আপনার জানায় আমার লাভটা কী হল? প্রমাণ করতে পারলেন না। অথচ আপনি নাকি ধন্বন্তরি! আপনি একটা ভণ্ড বাতেলাবাজ শুধু।

- আমি সত্যিই দুঃখিত সামন্তবাবু। ঘটনার তিনজন সাক্ষী বলেছে যে তাঁরা দেখেছে যে আপনি আপনার ছেলের হুইলচেয়ার চলন্ত  ট্রাকের চাকার সামনে ঠেলে দিচ্ছেন। অথচ আপনি আদতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়ে রিফ্লেক্সে বাবলুর হুইলচেয়ার ধরতে গিয়ে তা হাত ফস্কে তা ঠেলে দেন, দূর থেকে দেখে যাই মনে হোক; তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।

- এ'টা আমি জানি। আর কেউ তা জানে না। তারা শুধু জানে আমি আমার পঙ্গু ছেলের দায়ভার থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া একজন জানোয়ার। আপনার কাজ ছিল সে'টা ভুল প্রমাণ করার। সে'দিন আমি রাস্তার শ্যাওলায় পিছলে গেছিলাম...। বার বার বলেছি।

- অথচ আপনার সে'দিন পরা জুতোর সোলে শ্যাওলার সামান্য দাগটুকুও নেই।

- আর কতবার বলব আমি জানিনা তা কেন নেই...। তাই তো আমি আপনাকে এনগেজ করেছিলাম বটুবাবু! আমি ভুল করেছিলাম...আমি বুঝিনি যে আপনি পারবে না!

- এ'টুকু অন্তত বুঝেছি যে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা পরিষ্কার করে সে জুতো ফের রাস্তায় ঘষে নেওয়া হয়েছিল। প্রমাণ এ'দিক ও'দিক করে আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে।

- মানে? হোয়াট ডু ইউ মীন? এ'সব এখন কী বলছেন?

- আপনার জুতো থেকে শ্যাওলার দাগ তুলে ফেলে রাস্তার পিচে ফের ঘষে নিয়েছেন কেউ। দুর্ঘটনা ঘটে বিনোদ দত্ত স্ট্রিটে; সেখানে সদ্য সারাইয়ের কাজ হয়েছে, সে রাস্তার বিটুমেন এখনও সামান্য তাজা। দুর্ঘটনার পর সেই স্পট থেকেই আপনি সোজা অ্যাম্বুলেন্সে করে আপনার বাড়ির বাঁধানো উঠোনে এসে নামেন। ফেরার পর থেকে আর সে জুতো পরেননি। অথচ আপনার জুতো সোলে শ্যাওলার দাগ তো নেই বরং বিনোদ দত্ত স্ট্রিটের তাজা বিটুমেনের ওপর বহু পুরনো বিটুমেনের ছোঁয়া। অর্থাৎ কেউ সাবধানে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা সাফ করে তা রাস্তায় ঘষে নিয়েছে, যাতে মনে হয় আপনি শ্যাওলায় পা ফেলেননি আদৌ।

- মাই গড বটুবাবু! এ'সব আপনি এখন কেন বলছেন? আপনি জানেন কে এমন করেছে? আমার এমন সর্বনাশ কে চাইতে পারে?

- সামন্তবাবু, বাবলুর রক্তাক্ত দেহটা আপনি তার মায়ের কোলে তুলে দিয়েছিলেন। বাবলুর রক্ত মাখা সে শাড়ি মিসেস সামন্ত যত্নে তুলে রেখেছেন। কিন্তু সে শাড়ি আপাতত কিছুদিন আমি নিজের হেপাজতে রেখেছি।

- আপনি কী পাগলের প্রলাপ বকছেন আমি কিছুই...।

- সে শাড়ির পরিষ্কার দিক দিয়েই দিয়েই মিসেস সামন্ত আপনার জুতোর সোল থেকে শ্যাওলা মুছেছেন। সে দাগ আমার নজরে পড়েছে, আর পুলিশ যাতে সে শাড়ি নিয়ে গবেষণা শুরু না করে তার জন্যই তা আমি সরিয়ে নিজের কাছে রেখেছি কিছুদিন। জুতোর তলার বিটুমেন আর ধুলো দিয়েও আমি প্রমাণ করে দিতে পারতাম মিসেস সামন্তর অপরাধ।

- মিনু! শেষ পর্যন্ত মিনু...।

- সরি সামন্তবাবু, মক্কেলের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে না পারা আমার কাছে যন্ত্রণার। কিন্তু বাবলুকে আপনি ট্রাকের তলে ঠেলে না দিলেও খুন আপনি করেছেন। আপনার শাস্তিটা দরকারি ছিল, অন্তত মিসেস সামন্ত তা'তে খানিকটা শান্তি পাবেন।

- এ'সব কী? কেন? মিনু এমন কেন করতে গেল?

- আমেরিকায় বারো বছর কাটিয়ে ফিরেছিলেন আপনি মিস্টার সামন্ত। সে'খানেই আপনি ভিড়ে যান অ্যান্টি-ভ্যাক্স ব্রিগেডে। মিসেস সামন্তর কাকুতিমিনতি সত্ত্বেও আপনি বাবলুকে পোলিওর টীকা নিতে দেননি। বাবলুর তো সে'দিন হুইলচেয়ারে থাকারই কথা নয় মিস্টার সামন্ত। তাকে ঠেলে ট্রাকের তলে আপনি পাঠাননি, কিন্তু বাবলুর খুনের দায় যে আপনাকে নিতেই হবে মিস্টার সামন্ত। আই অ্যাম সরি, কিন্তু এ'টা আমায় করতেই হত।

- বটুবাবু...প্লীজ...।

- আমি আজ আসি।

অস্ত্র


- মহারাজ!

- সঙের মত দাঁড়িয়ে না থেকে খবরটা বলো!

- ওদের অ্যান্টিডোট...।

- তা'তে কী? সে অ্যান্টিডোটে কী হয়েছে মন্ত্রী?

- আমাদের যন্তরমন্তর ঘরের জাদুর প্রভাব কাটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে তা'তে!

- বটে?

- আজ্ঞে!

- এ তোমার মনের ভুল নয়ত?

- হাজার হাজার শ্রমিক চাষি গরীব প্রজা জটলা পাকাচ্ছে মহারাজ। এক দু'দিনের মধ্যেই হয়ত কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে...। সেনাবাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ।  কাজেই...।

- বৈজ্ঞানিক কী বলছে?

- সে পালিয়েছে!

- তার ব্যবস্থা আমি করব। তার চামড়া তুলে গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে ভাজাভাজা না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কিন্তু তার আগে বজ্জাত প্রজাগুলোর একটা ব্যবস্থা করতেই হয়।

- যন্তরমন্তর ঘরই যখন বিকল তখন আর উপায় কী!

- থামো! যত ন্যাকাচন্দ্রের দল জুটেছে মন্ত্রীসভায়। প্রজাদের ওপর আদত অস্ত্র প্রয়োগ করার সময় এসেছে।

- আজ্ঞে?

- নেকু সেজে থেকো না। আদত অস্ত্র। যার কাছে যন্তরমন্তর ফিকে।

- আদত অস্ত্র!

- বুঝেছ তা'হলে।

- মহারাজ! এ যে যন্তরমন্তরের চেয়েও পাশবিক।  মহারাজ, একটিবার ভেবে দেখুন...।

- তুমি চাও আমি তোমায় কোতল করি?

- মাফ করুন রাজন, কিন্তু..।

- কোনো কিন্তু নেই...কালেই দেশের সমস্ত ঘরে টেলিভিশনে পৌঁছে দাও, পৌঁছে দাও আমাদের নিউজচ্যানেল; আমাদের আদত অস্ত্র!

Tuesday, February 19, 2019

কাশ্মীরি পরোটা

প্রবল দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। আর মাঝেমধ্যেই মাথার মধ্যে ভাবনাচিন্তা উঁকি দিচ্ছে, সে’ ব্যাপারটা মোটে অভিপ্রেত নয়। অফিস যাওয়া, বাড়ি ফেরা, খাওয়াদাওয়া, হ্যাহ্যা, নেটফ্লিক্স, সোফা, বই; এর বাইরে কোনো চিন্তা মগজে ঘোরাফেরা করলেই ভয় হয়; বখে যাচ্ছি না তো?

এই যেমন সকালে পরোটা আর আলুচচ্চড়ি চেবানোর সময় মোবাইলে দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম কাশ্মীরীদের বয়কট করার দাবীতে। কোথাও আবার তাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এগুলো কি গুজব? হতে পারে; আজকাল অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সুপ্রিম কোর্ট বা মা মাথায় গাঁট্টা মেরে না বললে কোনো কিছুই মেনে নিতে মন সরে না। তবে এর সামান্য অংশও যদি সত্যি হয় তা’হলে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে খুব গোলমেলে; অন্যায়ও বটে।

এতটুকু ভেবেই পরোটা চেবানো থামালাম। মাথায় একটা চিন্তা এসেছে; কাজেই টুক করে সে’টা সোশ্যাল মিডিয়াতে যদি না লিখি তবে সে চিন্তা ভূত হয়ে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবে।  সাতপাঁচ ভেবেই একটা হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপে লিখেছিলাম; খামোখা কাউকে পেটানো বা কেউ অমুক এলাকার মানুষ বলেই তাকে বয়কট করব – ব্যাপারটা নেহাত সরেস নয়। আমি বাঙালি বলেই কেউ যখন আমায় আলসে বলে তখন গায়ে একটু চিড়বিড় করে বইকি (ব্যক্তিগত লেভেলে আমি আলসে হতে পারি, তাই বলে ‘বাঙালি’ বলে খোঁটা দেবে? স্যাট করে সোফা থেকে দু’টো সঞ্জীবের লাইন ছুঁড়ে প্রতিবাদ করব না?)।

হোয়্যাটস্যাপে বন্ধুদের একটা গ্রুপে লিখে ফেললাম; “কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”।  
ট্যাং করে এক বন্ধুর উত্তর এলো;
“দেশের কথা ভাববি কেন রে? তোকে তো আগে সেকু ভাব দেখাতে হবে”।
দেশ, সেকু এ’সব প্রসঙ্গ এসে পড়ায় নড়েচড়ে বসতে হল। দেড়খানা পরোটা প্লেটেই পড়ে রইল; আমি হোয়্যাটস্যাপে মন দিলাম।
বললাম;
“দেশের আবার কী হল। কাশ্মীরিদের দেখলেই রেগে উঠতে হবে কেন”?
ফটাশ করে উত্তর এলো;
“তোকে তো গিয়ে জঙ্গিদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয় না! তুই এ’সব কথা বলতেই পারিস”।
মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেল; মিইয়ে গেল পরোটা, তিতকুটে হল চচ্চড়ি।
প্রমোশন ইনক্রিমেন্ট নিয়ে রগড়ে থাকা ধান্দাবাজ চাকুরে মানুষ। কাশ্মীরিদের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তা গেল গুবলেট হয়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে বললাম;
“আহ্‌, এতে সেনা আর দেশের কথা এলো কেন। দেশের আমি, দশের আমি। আমি তো দেশের পক্ষেই রে ভাই। শুধু বলছিলাম...”।
কিন্তু ততক্ষণে ঘুড়ি সুতো ছিঁড়ে গেছে উড়ে আর লাটাই লটকে ছাতে।
“তুই কী বলতে চেয়েছিস সে’টা আমি বুঝিনি ভাবছিস”?, হাড়হিম করা উত্তর।
“না না, ও মা”, মনে হল আক্রমণের চেয়ে কাকুতিমিনতিতে বেশি কাজ হবে, “বিশ্বাস কর ভাই আমি গোলমেলে কিচ্ছু বোঝাতে যাইনি”।
“তোদের মত লোকের জন্যই আজ দেশের এমন বিপদ। তোদের জন্যই আজ শত্রুরা লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে কিতকিত খেলছে। তুই মনে মনে এ’টাই তো চাস, যে ভারতের মাথা খেয়ে পাকিস্তান চাঙ্গা হোক। সে’টা চাইলেই তো তুই নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল বলে প্রমাণ করতে পারবি”।
“সর্বনাশ! না না না ! আমি আদৌ তা বলিনি বা বলতে চাইনি”।
“তোকে তো শত্রুর আরডিএক্স হজম করতে হয় না। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে পা দোলাবি আর বড় বড় বাতেলা ঝাড়বি দেশের বিরুদ্ধে”।
“আরে আমি শুধু বলতে চেয়েছি...”।
“সব বুঝি। সব বুঝি। ছিঃ”।

“ছিঃ”খানা হোয়াটস্যাপ থেকে উঠে এসে বুকে অ্যাসিডিটি হয়ে ঝরে পড়ল। বলতে ইচ্ছে হল “আমি শুধু বলেছি যে কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”। এ’টার মধ্যে দিও কোনো হাতিঘোড়া চিন্তা পাচার করতে চাইনি, বন্ধুটিকে এ’টাও বলা হল না যে “হাতের কাছে কাশ্মীরি পেলে তুইও অকারণ তাঁর গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে যাবি না কারণ তুই উন্মাদ নোস”।
তবে প্লেটে যেহেতু দেড়খানা পরোটা আর পেটে সামান্য খিদে তখনও অবশিষ্ট ছিল, তাই আর কমনসেন্স নিয়ে বেশি ফেরেব্বাজি না করাটাই সমীচীন মনে হল। মিষ্টি করে বললাম;
“থাক না ভাই এ’সব কাশ্মীর দেশ আর আরডিএক্স। তার চেয়ে বরং চ’ একদিন একটু অলিপাবে ঘুরে আসি। কদ্দিন ভালো করে আড্ডা দেওয়া হয় না। কী বলিস”?
অমনি সে বন্ধুর রাগ গলে জল আর ক্ষোভ ফুড়ুৎ করে হাওয়া।
আমাদের প্লেটে পরোটা, উইকেন্ডে মদ আর মেজাজে ‘এনটাইটেলমেন্ট’ যদ্দিন আছে;  কোনো চিন্তা নেই।  

Monday, February 18, 2019

ভবিষ্যতের ভূতের তান্ত্রিক



- কী ব্যাপার বলুন তো দাদা, বাসে উঠে থেকে দেখছি আপনি আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন।

- দেখুন মশাই, দৃষ্টিতে যে কাম নেই, সে'টা আশা করি বুঝতে পারছেন।

- তাই বলে জানা নেই, আলাপ নেই; অমন বিশ্রী ভাবে তাকিয়ে থাকবেন?

- কচু দেখে শুয়োর থমকে দাঁড়াবে না?

- কী? কী বললেন? আমি কচু?

- ওহ, মন্দ লাগল? বেশ,  হিরের ঝিলিক দেখে জহুরির ড্যাবড্যাবে চাউনিটা স্বাভাবিক।

- আপনার মতলবটা কী বলুন দেখি?

- বলছি, তার আগে নিজের পরিচয় দিই। আমি অঘোর দাসমুন্সি।

- আমার নাম..।

- আপনার নামে আমার তেমন দরকার নেই।

- আজ্ঞে?

- আপনার নাম তো এই নশ্বর দেহ আর এই জাগতিক পরিচিতির।  ও দিয়ে কী হবে। বরং আপনার আত্মারামটিকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। ভেরি ইম্প্রেসড। আপনার আত্মার মধ্যে জেনুইন কোয়ালিটি আছে।

- বাপ থেকে বস আজ পর্যন্ত কেউ একবারও বললে না আমার মধ্যে কোয়ালিটি আছে। আর আপনি দেখছি এক্কেবারে আত্মায় ঢুকে পড়লেন। আপনি কি তান্ত্রিকটান্ত্রিক নাকি?

- করেক্ট। উনচল্লিশ বছর ধরে সাধনা করছি। আর জমানোর  শখ অবশ্য গত বাইশ বছরের। নেপালের জঙ্গলে এক কাপালিকের চ্যালা হয়ে তিন বছর ছিলাম। তাঁর আশীর্বাদেই যে'টুকু যা রপ্ত করতে পেরেছি।

- শখ?

- ওই, হবি আর কী। স্টাম্প বা দেশলাই বাক্স  জমানোর মত।

- কী জমানোর শখ? আপনার?

- ওই যে। আপনার মত স্যাম্পেল। রেফারেন্স সহ ডায়েরিতে টুকে রাখি।

- ঝেড়ে কাশুন, আর একটা স্টপেজ পর টালিগঞ্জ, আমি শেখানেই নামব।

- আমার শখ হচ্ছে জ্যান্ত মানুষের আত্মার কোয়ালিটি চেক করে ভবিষ্যতের ভূত চিহ্নিত করা এবং তাঁদের উত্তরণকে ট্র‍্যাক করা।

- এক্সকিউজ মি?

- জার্নাল রেখেছি মশাই। নাইনটি সেভেনে প্রথম ভবিষ্যতের ভূত আইডেন্টিফাই করেছিলাম মেচেদা লোকালে। সে ভদ্রলোক ভূতে কনভার্ট হয়েছিলেন দু'হাজার সাতে। বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডর্মিটরিতে আছেন।

- ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ডর্মিটরি?

- ভূতের অফ কোর্স। সে খোঁজ পেতে আমায় কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।

- আপনি গাঁজা দিচ্ছেন?

- কোয়ালিটি কল্কে পকেটে রাখি, তবে তা নেহাতই সাধনার স্বার্থে। ইন্টক্সিকেশন নিয়ে আদেখলামো আমার নেই।

- তা আমি যে কোয়ালিটি ভূত হতে চলেছি সে'টা কী করে বুঝলেন স্যার?

- আত্মা ভেঙেচুরে নরম না হয়ে এলে কোয়ালিটি ভূত জেনারেট করা মুশকিল। টানটান ত্যাঁদড় প্রতিবাদী আত্মাকে ভূতে কনভার্ট করা চাট্টিখানি কথা নয়। মৃত্যুর পরেই ত্যাঁদড় তেঁনারা ছটফট করেন মুক্তির জন্য, ফসকে বেরিয়েও পড়েন। কিন্তু মাখনের মত ভূত বনে যান আপনাদের মত ন্যাতপেতে আত্মা।

- ন্যাতপেতে?

- ওই। বাপ টু বস টু নেতা; চোখ বুজে সক্কলকে 'ইয়েস স্যার, আজ্ঞে স্যার' ফায়্যার করে করে যে আত্মা পান্তা ভাতের দলা বনে গিয়েছে। ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনকে যে আত্মা ডেমোক্রেসির বইয়ে বুকমার্কের মত ঢুকিয়ে রেখে সেই বইকে কিলো দরে বেচে দিয়েছে। স্পষ্ট দেখতে পারছি সে সব গুণই আপনার আত্মার রয়েছে। 

- যত্তসব বাজে বাতেলা। সরুন দেখি, এ'বার আমি নামবো।

- চিন্তা নেই মশাই, ইতিমধ্যে যথেষ্টই নেমে পড়েছেন। আপনার রেফারেন্স টুকে রাখলাম। ভবিষ্যতে ভূতের ডর্মিটরিতেই দেখা করতে আসব, কেমন?

Friday, February 15, 2019

শেষ চিঠি


হাসান সাহেব,

এই আমায় শেষ চিঠি। চমকে উঠলেন? বাবুর্চি ইকবালকে আপনি আপনার ছেলের যাত্রাপথের সঙ্গী করে পাঠালেন তাঁর দেখভালের জন্য; হামদা শহরে এক হপ্তার কাটিয়ে, আপনার নয়নের মণি সরফরাজকে নিয়ে আমার ফিরে আসার কথা। অথচ এখন এই শেষ চিঠির বিশ্রী নাটক..কোনো মানে হয়?

হাসানসাহেব, মিথ্যেটুকু এইবেলা সাফ করে নেওয়াই ভালো। আমার হাতে সময় বড্ড কম; কাজেই বাহারে ভাষায় আটকে থাকলে হবে না। আমার আদত নাম ইকবাল নয়, আমি আরিফ আনসারি। আমার আদিবাড়িও নেয়ামতপুরে নয়, আমার কাগজপত্রগুলো ভুঁয়ো ছিল। হ্যাঁ, আমি আপনাদের ঠকিয়ে এই বাবুর্চির চাকরীটা নিয়েছিলাম; গত দু'বছর ধরে আপনার বিশ্বাস অর্জন করেছি প্রাণপণে খেটে।

লোকঠকানোর মত বিশ্রী পাপ আর হয়না, কিন্তু বিশ্বাস করুন; এ ছাড়া কোনো পথ আর আমার সামনে খোলা ছিল না। আপনাদের পাগলামোর জন্য আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, জানেন হাসান সাহেব? আপনি আর আপনার ছেলে সরফরাজ, আপনারা যে কত গরীব মানুষের সর্বনাশ করেছেন তাদের মাথায় ধর্মের নামে পাগলানো পুরে দিয়ে,  তার ইয়ত্তা নেই। গোটা দেশ ধ্বংস না করলে আপনাদের শান্তি নেই। আপনাদের জঙ্গি সংগঠন ফুলেফেঁপে উঠছে আর বিপ্লবের ঝুটো জিগির তুলে মুনাফা লুঠছে আপনার ও আপনার পুত্রের মত কিছু ঘৃণ্য ব্যবসায়ী। 

আপনার প্ল্যান করা জঙ্গিহানায় আজ থেকে তিন বছর আগে  সেনাবাহিনীর বেয়াল্লিশজন সৈন্য মারা যায়; হামদা শহরে। সেই বেয়াল্লিশজনের মধ্যে একজন ছিল আমার আসিফ। তখন ওর বয়স মাত্র বাইশ, জানেন হাসানসাহেব? বাইশ। ঠিক আপনার ছেলে সরফরাজের বয়সী। জন্মের সময় মা হারানো অভাগাটাকে বড় কষ্টে মানুষ করেছিলাম হাসানসাহেব। বড় আদরে, সৎপথে। কত স্বপ্নকে কত সহজে আপনারা খুন করেছিলেন সে'দিন। কত সহজে।

আমার সরকারের হাত পা বাঁধা থাকতে পারে, বদলা নিতে হলে তাঁদের হাজারগণ্ডা জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু এ বুড়ো বাপের যে অত দায়ভার নেই; আমি স্রেফ প্রতিহিংসার জন্যে এ বাড়িতে এসেছিলাম হাসানসাহেব। আমার গলার তাবিজে লুকিয়ে এনেছিলাম অব্যর্থ বিষ। আপনাকে মারা অত্যন্ত সহজ ছিল, কিন্তু টপ করে মেরে ফেললে ঠিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা যেত না। আমি সরফরাজকে মারতে চেয়েছিলাম, মারতে চেয়েছিলাম হামদা শহরেই; যে'খানে আমার আসিফের দেহটাকে আপনাদের উন্মাদ জঙ্গিরা টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল।

অবশেষে সুযোগ এলো। আজ খুব সহজেই পোলাওতে মিশিয়ে ফেললাম সে বিষ। সরফরাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফেরার কথা। ফিরেই ডিনারে বসবে, পোলাওটা তারই ফরমায়েশে রেঁধেছি।

তবে ছোট একটা গোলমাল ঘটেছে। সরফরাজের তিন বছরের মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ছে গো হাসানসাহেব। তারও মা নেই, আমার আসিফের মতই অভাগী সে। দিনে অন্তত দশবার ইকবাল চাচার কাছে গল্প না শুনলে মুন্নির চলে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার মুখ।  আর কী জানেন,  আমার আসিফ যেমন সরফরাজের মত খুনি নয়, আসিফের বাপই বা সরফরাজের বাপের মত ইতর হতে যাবে কেন?

দেশে কত মানুষ না খেতে পেয়ে ঘুমোতে যায়; এ পোলাওকে নষ্ট আমি হতে দেব না। শুধু চিঠিটা লেখা জরুরী ছিল।

পারলে মুন্নির কানে অন্তত জঙ্গিবাদের মন্ত্র জপ করবেন না হাসানসাহেব, সে মন্ত্রের চেয়ে আমার পাতের এ পোলাওয়ে বিষ অনেক কম।

ইতি,

আরিফ।

Wednesday, February 13, 2019

ভ্যালেন্টাইন


- অ্যালগো,ও  অ্যালগো।

- শুনি অনুপবাবু, শুনি।

- সুতপার সঙ্গে তা'হলে..।

- দেখা করতে যাবেন না।

- কিন্তু অ্যালগো...। যদি আমরা...।

- বাইশ হাজার দু'শো বত্রিশটা 'কিন্তু' আর তেরো হাজার সাতশো উনিশটা 'যদি' পেরিয়ে স্প্রেডশিট এ সিদ্ধান্ত এসেছে। উপায় নেই।

- কিন্তু অ্যালগো, সুতপার সে হাসি যে ভুলে যাওয়ার নয়। ওর নরম চাউনি। মনটাও কলাপাতা সবুজের মত সরল।

- কাব্যিক রেফারেন্স। ইলজিকাল কম্পারিসন নোটেড, লাভ রেসিডিউ স্পটেড।  তবে সিম্পটম যে গোলমেলে তা স্পষ্ট। দু'জনেই দীর্ঘদিন একা থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছেন। কাল ভ্যালেন্টাইনস ডে। গভর্নমেন্ট বায়োমেট্রিক সার্ভার থেকে আপনাদের দু'জনের হরোমনাল আর সাইকোমেট্রিক রিপোর্ট কম্পেয়ার করে দেখে নিয়েছি। এই ডেট ভালোই লাগবে আপনাদের দু'জনের।

- তবে এত গোলমাল পাকাচ্ছ কেন?

- এই প্রেমে সাত নম্বর ডেট পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা বিরানব্বুই শতাংশ।   বিয়ের সম্ভাবনা তেতাল্লিশ শতাংশ। বিয়ে হলে বিয়ের সাত বছরের মাথায় রোম্যান্স শেষ হয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট; একাশি শতাংশ সম্ভাবনা।  ঝগড়াঝাঁটি,  বিশ্রী ডিভোর্স। জেনেটিক ম্যাপিং বলছে সুপার ইন্টেলিজেন্ট সন্তান। কিন্তু আপনাদের  ভাঙাচোরা প্যারেন্টিং তাকে শয়তানির দিকে ঠেলে দেব; সম্ভাবনা সতেরো শতাংশ। আর সে সন্তানের রাজনৈতিক নেতা হওয়ার সম্ভাবনা তেইশ শতাংশ।  দেশের জন্য, দশের জন্য; সরকারি অ্যালগোরিদম হিসেবে আমি এই রিস্ক মঞ্জুর করতে পারি না।

- অ্যালগো, তুমি তো পারো আমাদের চারপাশের ভ্যারিয়েবল ট্যুইক করে আমাদের বিয়েটা ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে, তা'হলে সন্তানও বখে যাবে না। এমন কী আমাদের সন্তান না থাকলেও..।

- নাগরিকদের স্বার্থে ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্ট করব? এই নিয়ে গত দু'মাসে এই আপনার তৃতীয় অনুরোধ। আগামী এক মাসে আর একটা হলেই তিন দিনের করেকশন ক্যাম্প।

- সুতপাকে ছাড়া আপনি বাঁচবা না।

- ডাহা মিথ্যে। সুতপা আর আপনার আয়ুর যোগাযোগ অঙ্ক কষে বের করলে আপনার হাসি পাবে। তবে তা বের করা সম্ভব কিন্তু।

- এই আমাদের স্বাধীনতা?

- স্বাধীনতা?  আনডিফাইনড টার্ম। নো কমেন্টস।


***

অস্থির হয়ে পড়ছিলেন অনুপ। গত আধ ঘণ্টায় এই নিয়ে তিন নম্বর কাপ কফি শেষ। রেঁস্তোরার মূল দরজার দিকে বারবার চোখ রাখতে হচ্ছিল, সুতপার আসার সময় হয়ে গেছে। দু'জনেই প্রস্তুত কিছুদিন করেকশন ক্যাম্পে কাটাতে।

সুতপা যখন এসে পৌঁছল তখন তাঁর মুখে ক্লান্তি মাখানো যুদ্ধ জয়ের হাসি।

- আমি ভয় পাইনি অনুপ!
- আমিও না। বিশ্বাস করো, একটুও না।
- রাখুক করেকশন ক্যাম্পে আমাদের। একসঙ্গে থাকবই।
- অ্যালগোর বারণ সত্ত্বেও বিয়ে পর্যন্ত এগোলে তিরিশ বছর করেকশন ক্যাম্পে, কিন্তু সুতপা; তোমার জন্য আমি তিনশো বছর সে ক্যাম্পে কাটাতে পারব। কোনো সরকারি অ্যালগোর বাপের ক্ষমতা নেই আমায় দমিয়ে দেয়। আমি তোমায় ভালোবাসি।
- আমিও। তোমার জন্যই সমস্ত কিছু অনুপ, এ পাগলামোটুকু পর্যন্ত। এত ডেটিংয়ের টেনশন নিয়ে কী হবে বলবে? কালকেই বিয়ে সেরে ফেলি? প্লীজ?

অনুপের হাত তরতরিয়ে সেঁধিয়ে গেল সুতপার হাতে। বাতাসে তখন কফির সুবাস আর 'না তুম হমে জানো, না হম তুমহে জানে'র সুর।

***

- সরকারবাহাদুর।
- এই যে অ্যালগো, রিপোর্ট দেখেছি। গুড জব।
- গুড জব? আনআইডেন্টিফাইড টার্ম। নো কমেন্টস।
- তা, কিছু বলবে?
- আপনার ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্টমেন্ট লিমিট ফুরিয়েছে।
- আমি নাগরিক নই, আমি সরকারবাহাদুর। আমার লিমিট আমার হাতে। লিমিট রিসেট করো। সার্ভার বলছে  অনুপ সুতপার মত আরো অন্তত ন'টা বিয়ে করাতে হবে।
- রিসেট ডান্। আরও ন'টা? শিওর? সিস্টেম অনুযায়ী অনুপ সুতপার দেখা হওয়ারই কথা নয়। আপনার কথা মত ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্ট করে তাদের প্রেমে ফেলতে হয়েছে। দেশের কত ক্ষতি...।
- চোপ! অ্যালগোর অত বাতেলা কীসের? আমায় নাগরিক পেয়েছ?
- আপনি সরকারবাহাদুর।
- শোনো, অনুপ-সুতপার মাধ্যমে স্রেফ একজন মরিয়ার্টি তৈরি হবে। আগামী কুড়ি বছরের মাথায় আমাদের পার্টির অন্তত দশজন মরিয়ার্টি প্রয়োজন। নয়ত নিঁখুত জেনেটিক ম্যাপিংয়ে যে'হারে শার্লক তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে, খুব বেশিদিন আর আমরা জনগণকে মুঠোয় নিয়ে চলতে পারব না। বুঝেছ অ্যালগো?
- কন্ট্রোলড বার্থ থ্রু চোজেন প্যারেন্টস..আরও নয় জোড়া প্রেম। আরও নয় জন মরিয়ার্টি। এক্সেপশন মডিউল বীং ইনিশিয়েটেড সরকারবাহাদুর।

Sunday, February 10, 2019

দুই প্রেমিক


প্রেমিকের স্পেক্ট্রামের একদিকে 'আনেওয়ালা পলে'র অমল পালেকর। অন্যদিকে 'তুম আ গয়ে হো নূর আ গয়া হ্যায়'র সঞ্জীবকুমার।

এক হাতের তর্জনীর ডগায় চাবির রিং চরকি কাটতে কাটতে অমল অন্য হাতে টেনে নেবেন প্রেমিকার হাত।
বলবেন; "এ হপ্তায় ঘুরে আসি চলো; সমুদ্র চাইলে তাজপুর। পাহাড়ে রয়েছে পুরুলিয়া। না শুনছি না। আর নীল শাড়িটা আনা চাই, নয়ত নতুন ক্যামেরাটা জলে"।

বুক খোলা সোয়াটারের হাত গুটিয়ে সঞ্জীব জানাবেন " ছাত থাকতে শুশুনিয়া ঠেঙিয়ে যাওয়া কেন। ব্যালকনিতে বেতের চেয়ার থাকতে দীঘার বাসের টিকিট স্রেফ হাঙ্গামা"।

অমল বলবেন "দেলখোশার কেবিন"। সঞ্জীব বলবেন "চেট্টিনাড মামলেট চেখে দেখেছ কখনও? আমার নিজের ইম্প্রোভাইজড রেসিপি"।

বংপেন৭৫য়ের বিজ্ঞাপন


কৃষ্ণ মন দিয়ে রথ চালাচ্ছিলেন। ফুরফুরে হাওয়া বইছে কুরুক্ষেত্র জুড়ে, বেশ একটা 'দে গাঁট্টা' মেজাজে গা ভাসিয়ে দেওয়া গেছে।

একটু মৌজ করে কেষ্টদা বললেন
"বুঝলে ভায়া অর্জুন, প্রচুর চিটকোড এনেছি। কৌরব ঠেঙিয়ে আজ একটু ফুর্তি করা যাবে"।

ও মা! ব্যাকসিটে অর্জুন স্পিকটি-নট। আর ঘাড় ঘুরিয়ে কেষ্ট যা দেখলেন তাতে তাঁর মাথা গেল ঘুরে। অর্জুন ব্যাটাচ্ছেলে কানে ইয়ারফোন গুঁজে মগ্ন, মাঝেমাঝে দুলে দুলে উঠছে আর গুনগুন করছে " উ লাল্লা উ লাল্লা পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে উ লাল্লা উ লাল্লা রে"। যশোদানন্দন অমনি পাশে রাখা বইটা হাতে তুলে নিলেন; বংপেন৭৫। বইটার মধ্যে সুদর্শন চক্রটা পেজমার্ক হিসেবে রাখা ছিল; সে'টা সাবধানে বের করে পাশে সরিয়ে রাখলেন। তারপর অর্জুনের গবেট মাথা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র; পত্রভারতী প্রকাশিত বংপেন৭৫।

দেড় মিনিটের মাথায়, কপালে আইসপ্যাক ঘষতে ঘষতে আর"সরি গুরু, রিয়েলি সরি" বলতে বলতে; উঠে দাঁড়ালেন মহারথী অর্জুন, টেনে নিলেন গাণ্ডিব। "যত্তসব লেজি বাফুন" বলে বংপেন৭৫টা তুলে ঝেড়েঝুড়ে নিজের কাছে রাখলেন কেষ্ট। রথ এগিয়ে নেওয়ার আগে অবশ্য একটা মেসেজ পাঠাতে হল তাকে;

" ব্যাসস্যর, বংপেন৭৫ ছুঁড়ে মারার এপিসোডটা ডায়রেক্টলি রেকর্ড না করে একটু উলটে পালটে নেওয়াই ভালো। দু'একটা কোটেশন ফোটেশন না ঢোকালে ঠিক ক্লাসিকাল বলা যাবে না, তাই না"?

সিরিয়ার গল্পগুলো


দেশের এবং দশের ইতিহাস বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়বে সমষ্টিগত চাওয়া, পাওয়া এবং হারানোর গল্প। সে'খানে নেতৃস্থানীয় মানুষদের (তা রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক, সামরিক হোক বা অসামরিক, ভালোর দলে হোক বা মন্দের) কথাও অবশ্যই বলতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের গল্পে সচরাচর ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সাধারণ মানুষের পার্স্পেক্টিভ উঠে আসে না। বা কখনও উঠে এলেও তা স্রেফ অলঙ্কার হয়েই থাকে; শুধুই সে সব গড়পড়তা মানুষের অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে ইতিহাস রচনা করা চলে না। এ'টা কোনো ক্ষোভ থেকে বলা নয়, বরং এ'টাই বাস্তব। স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন আমাদের ফোকাস পড়তেই পারে ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারির ওপর। আর সেই দিনটার ব্যাপারে দরকারি কিছু লিখতে হলে স্বাভাবিক ভাবেই আমি জানতে চাইব সে'দিন সকালটা মোহনদাস কী ভাবে কাটিয়েছিলেন বা গডসে কী ভাবছিলেন বা দেশভাগের আগুন রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছিলেন। কিন্তু সেই ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারি বুঝতে গিয়ে কি আমি সে'দিনটা একজন করোলবাগের ফলবিক্রেতার জন্য কেমন কেটেছিল; সে'টা জানতে চাইব? বা নবদ্বীপের এক মুদীখানার মালিক সে'দিন বিকেলে কী করেছিলেন; তা জানতে পারলে আমার ইতিহাস-বোধ কতটা পূর্ণতা লাভ করবে? আমার ধারণা ছিল সে সব অভিজ্ঞতা সাহিত্যে রস যোগাতে পারলেও তা দিয়ে ইতিহাসকে যথাযথ ভাবে চেনা সম্ভব নয়।

কিন্তু তার পাশাপাশি প্রায়ই মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের জবানিতে যদি ইতিহাস পালটে যাওয়ার গল্প শুনি; কেমন লাগবে? তেমন কিছু লেখা অবশ্যই পড়েছি দেশভাগ বা নাৎসি অত্যাচারের মর্মান্তিক অধ্যায় নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে; তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে যোগ করতে হয়েছে ঐতিহাসিকের ন্যারেশন ও কমেন্ট্রি। কোনো রকম ন্যারেশন ছাড়া, শুধু মাত্র সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন দিনলিপি থেকে অসাধারণ নির্জাসটুকু তুলে নিয়ে; এই বই যে নিষ্ঠার সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেছে তা এক কথায় অনবদ্য।  আর আটপৌরে অভিজ্ঞতাগুলো এক সুতোয় সঠিক প্যাটার্নে গাঁথতে পারলে; স্বৈরাচার, বিপ্লব, ব্যর্থতা ও মানুষের যন্ত্রণার গল্পগুলো আপনা থেকেই সাহিত্যগুণে ভরপুর হয়ে ওঠে।

এখন মনে হচ্ছে; ল্যাপিয়ারের ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট যদি লেখকের ন্যারেশন ছাড়া; দিল্লীর কোনো খেটে খাওয়া চা-ওলা, পুরুলিয়ার কোনো দরিদ্র চাষি, ভাগলপুরের কোনো সৎ স্কুলমাস্টার,  করাচীর কোনো সরল সাহিত্যিক, মুম্বইয়ের কোনো ব্যর্থ থিয়েটার শিল্পী আর শ্রীনগরের কোনো ট্রাকড্রাইভারের অভিজ্ঞিতা জড়ো করে লেখা হত? তা'তে ইতিহাসের ব্যঞ্জনা সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত?

এই বই পেরেছে। চমৎকার ভাবেই পেরেছে। এবং এমন ভাবে তুলে ধরেছে যে মনে হয়েছে সিরিয়া দেশটা বোধ হয় খুব দূরে নয়; সে মানুষগুলোও বোধ অনতিদূরেই জটলা বেঁধে বসে; তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের শিউরে ওঠাটা শীতের ছাতে খালি গায়ে হেঁটে আসার মতই রীতিমত স্বাভাবিক। মা, ছেলে, মেয়ে, বাবা, শিক্ষক, ছাত্র, চাকুরে, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ; কত মানুষকে নিজেদের ঘর এবং সর্বস্ব ভাসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তাঁরা সিরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন স্রেফ বেঁচে থাকার দুঃসাহসী স্বপ্ন নিয়ে; আর তাঁদের অভিজ্ঞতা পর পর সাজিয়ে লেখিকা বলেছেন আসাদ এবং তাঁর বাথপার্টির অত্যাচার, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ,  বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমস্ত হারানো মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের গল্প।

বইয়ে লেখা ঘটনাগুলো এখানে লেখার মনে হয়না। মানুষ নিজের যন্ত্রণা নিজে যে কোনো সাহিত্যিকের থেকে ভালো ভাবে বলতে পারবেন সে'টাই স্বাভাবিক আর সেই অভিজ্ঞতার থেকে প্যাটার্ন খুঁজে ইতিহাস চিনে নিতে পারার মধ্যেই বোধ হয় সার্থকতা।  আমাদের স্কুলের ইতিহাস বইগুলো যদি এমন হত কী ভালোই না লাগত পড়তে।

দু'টো ব্যাপার নিয়ে এ বই বেশ ভাবিয়েছে।

এক, কথায় কথায় অমুক রাজনৈতিক দল আইসিসের মত বা অমুক নেতা অবিকল হিটলার বা আমাদের স্বাধীনতা বলে কিস্যু নেই; এমন কথা বলার আগে বত্রিশ বার ভেবে নেওয়া উচিৎ। সিরিয়া বা সুদান বা হলোকস্টের রোষে পড়া মানুষগুলো যে পরিমাণে স্বৈরাচার ও অত্যাচার সহ্য করেছে/ করে চলেছেন; তার তুলনায় আমরা রীতিমত স্বর্গে বাস করছি। ফস্ করে নিজেদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা টেনে বসাটা সেই মানুষদের জীবন সংগ্রামের প্রতি অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়।

দুই, যারা সরকারে রয়েছেন, ক্ষমতা যাদের হাতে; তাঁদের চাঁচাছোলা নিন্দে করে যেতেই হবে। একটানা, অক্লান্তভাবে।  তাঁদের ব্যাপারে গদগদ হয়ে পড়ার কোনো মানেই হয়না। আমাজনের কাস্টোমার কেয়ারের থেকে নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা যতটা ক্ষুরধার,  তার কয়েক হাজারগুণ বেশি খুঁতখুঁতে হতে হবে নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী,  এমপি ও এমএলএ-দের ব্যাপারে। নিজেদের কোনো এক নেতায় বা মতবাদে (বা তার বিরোধিতায়)চোখ বুজে সঁপে দেওয়া মানেই দেশকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করা।

ইন অর্ডার টু লিভ


পৃথিবীটা সত্যিই ছোট।

কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম সুদানের লোপেজ লোমংয়ের দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের কথা। অকথ্য অত্যাচারের কবল থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন; গিয়ে পড়েছিলেন কিনিয়ার উদ্বাস্তু শিবিরের ভয়াবহ অভাব ও চরম অব্যবস্থায়। তবে সমস্ত বাধাবিঘ্ন জয় করে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন লোপেজ; নতুন দেশ খুঁজে পেয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সে'খানে নিজেকে নতুন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন।তিনি। লোপেজের জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়  ২০০৮য়ের চীন অলিম্পিক; যে'খানে আমেরিকার পতাকাবাহক ছিলেন তিনি। আর ঠিক সেই অলিম্পিকের সময়ই চীনের সরকার সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল সে দেশের নারী-ব্যবসা রুখতে। যে ব্যবসার মূলে ছিল উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু মেয়েরা, যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বাঁচতে। সে মেয়েদের তখন ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমির অবস্থা; হয় কুচক্রে পেষাই হওয়া আর নয়তো চীনে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে উত্তর কোরিয়ায় ফেরত যাওয়া যা নিশ্চিত মৃত্যুর সামিল। সেই সব দুর্ভাগা মেয়েদের একজন য়েওনমি পার্ক। যে অলিম্পিক লোপেজের জীবনে এনে দিয়েছিল আলোর স্পর্শ, সে সময়টার অন্ধকারেই হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল য়েওনমির।

য়েওনমির জন্ম ১৯৯৩ সালে, আমার চেয়ে কত ছোট। অথচ  যে বয়সে আমি সঠিক ভাবে গুলতানিও আয়ত্ত করতে পারেনি; সে বয়সে সে দেখেছে কী ভাবে তাকে বাঁচাতে তার মা নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ধর্ষকদের হাতে। ২০০৮য়ে আমি চাকরী পেয়েছি; বিহারের ছোট্ট শহরে যেতে হবে বলে বেশ গাঁইগুঁই করছি।  আর ঠিক সেই সময় পনেরো বছরের য়েওনমি শিখেছে নিজেকে বারবার বিক্রি করে কী'ভাবে নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়। য়েওনমি একা নয়, সবচেয়ে বড় কথা; উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা বেশিরভাগ মানুষের কপাল য়েওনমির চেয়েও বহুগুণ মন্দ।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর প্রতিবেদন পড়েছি আগে, কিন্তু এ বইয়ে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সে'সবের তুলনা চলেনা। প্রোপাগান্ডার চশমা চোখে জন্মানো যে ঠিক কতটা দুর্বিষহ,  তা এ বই না পড়লে বোধ হয় কল্পনা করাও অসম্ভব।  আর 'আমার দেশই সেরা'; এই মহামন্ত্র বোধ হয় এলএসডির মত গোলমেলে। উত্তর কোরিয়ায় ছেলেমেয়েরা যোগ বিয়োগ শেখে রামের দু'টো আপেলের সঙ্গে শ্যামের তিনটে আপেল জুড়ে নয়। তারা শেখে যদি আজ তুমি তিনজন 'আমেরিকান বাস্টার্ড' কোতল কর আর আগামীকাল চারজন; তা'হলে ক'জন নিকেশ হল? ঈশ্বরে অবিশ্বাস ছাপিয়ে তারা তৈরি করেছেন সুপার-ঈশ্বর যিনি অবলীলায় হাজারে হাজারে বই লিখে ফেলেন বা যার অঙ্গুলি হেলনে আকাশের মেঘ সাফ হয়ে যায়। সেই সুপার-ঈশ্বরের প্রতি অভিবাদনে উচ্ছাসের পরিমাণ যদি সামান্যও কম হয়, তো সোজা কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। ঘরে ঘরে সরকারি রেডিও যা বন্ধ করা যাবে না, আর সে রেডিওতে একটাই চ্যানেল; ঈশ্বরপুত্রের। যৌথখামারের খুড়োর কলের আড়ালে ভেঙেচুরে যাওয়া পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম। গোটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ঘুষ, কালোবাজারের ওপর। 

হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা, কিন্তু ডাক্তাররা মাইনেটাইনে তেমন পাননা; তাঁদের ঘুষ না দিলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। শিক্ষক, পুলিশ; ঘুষ ছাড়া কোথাও দু'পা এগোনোর  উপায় নেই। আর ডায়ে বাঁয়ে সামান্য ভুলচুক হলেই অজস্র চোখ কান রয়েছে 'পার্টি অফিসে' খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এবং যে কোনো ভেঙেচুরে পড়া দেশের মানুষের মূল যন্ত্রণার নাম খিদে। খুনে তরবারির মত ঠাণ্ডা নিরেট খিদে। সে খিদের তাড়না থেকে বাঁচতে য়েওনমিরা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।

এই বইয়ের তিনটে মূলভাগ। প্রথম, উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশায় য়েওনমির বড় হয়ে ওঠা। দ্বিতীয়,  চীনে য়েওনমির সংগ্রাম এবং ছিন্নভিন্ন হওয়া। তৃতীয়,  চীন থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছনো; মুক্তি ও আলো। আর য়েওনমির বইতে একটা জিনিস স্পষ্ট; অসহনীয় উদ্বাস্তু জীবনেও নীলকণ্ঠ হওয়ার দায় কাঁধে নিতে হয় নারীদেরই।

আশ্চর্য প্রদীপ


বিপিন সান্যাল একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে মৌরির কণা বের করার চেষ্টা করছিলেন। চোখ বুজে, গা এলিয়ে; যতটা মন দিয়ে করা সম্ভব আর কী। মানকরের মত ছোট্ট শহর হলে যা হয় আর কী; দুপুরের সময়টা দোকানে খদ্দেরদের আসা-যাওয়া তেমন থাকে না, ক্যাশকাউন্টারে বসে একটু গা এলিয়ে নেওয়ার এ'টাই প্রশস্ত সময়। দাঁত খোঁচানোয় বিঘ্ন ঘটল 'আপনিই বিপিনবাবু? এই সান্যাল মেটাল ট্রেডার্সের মালিক?" ডাকে।

জলদগম্ভীর পুরুষকণ্ঠ। নাম ধরে ডেকেছে কাজেই খদ্দের সম্ভবত নয়। বিপিনবাবু চোখ মেলতে দেখলেন গেরুয়া আলখাল্লা পরা একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক, দাড়িগোঁফে মুখ ঢাকা। সন্ন্যাসী গোছের কেউ, তবে ভিখিরি নিশ্চয়ই নয়; বাঁ হাতের কবজিতে যে ঘড়ি তার ব্যান্ড দেখে মনে হয় বেশ দামী।

- আপনিই বিপিনবাবু?

- আমিই। কী ব্যাপার?

- আজ্ঞে আমার নাম স্বরূপানন্দ।আমি জসিডি থেকে আসছি।

- জসিডি থেকে এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে?

- আজ্ঞে হ্যাঁ। বসতে পারি?

- বসুন। তা, আমার এই লোহালক্কড়ের দোকানে কী মনে করে স্বরূপানন্দজী?

- হ্যাঁ, সোজা সে ব্যাপারটা নিয়েই বলি। গত পরশু জসিডি থেকে এক ট্রাক লোহালক্কড়  আপনার কাছে এসে পৌঁছয়।

- লোহালক্কড় বলতে স্ক্র‍্যাপ। ও'টাই আমার ব্যবসা। ঝাড়খণ্ডে আমার এজেন্ট দীনদয়াল, সেই ও'সব সংগ্রহ করে পাঠিয়েছে।

- জানি। খুলে বলি, সেই সব লোহার মধ্যে একটা পেতলের প্রদীপ এসে পড়েছে।

- গতকাল মালপত্তর ঝাড়াইবাছাইয়ের সময় পেতলের কিছু জিনিসপাতি পাওয়া গেছে বটে, একটা প্রদীপও ছিল হয়ত। কিন্তু সে ভাঙাচোরা পুরনো সব মাল। তার জন্য আপনি অদ্দূর থেকে..।

- ও প্রদীপ আমার দরকার। খুব জরুরী। আমি উপযুক্ত দাম দিতেও রাজী আছি...।

- আমার গুদামের এক কোণে পড়ে আছে হয়ত..কিন্তু ফালতু জিনিস মশাই। তাছাড়া ছোটেলালটাকে দেখছি না কাল বিকেল থেকে। সে না থাকলে গুদামে কিছু খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- ছোটেলাল?

- ওই, আমার ফাইফরমাশ খাটে। আর গুদাম সামলায়। ছোকরা কাজেকর্মে ভালো, শুধু একটু নেশাভাং করে। অবিশ্যি ভালো বাউল গানও গায়, শুনলে আপনার মনপ্রাণ ভরে যাবেই। কপাল বুঝলেন, কপালের ফের। নইলে কি আর শিল্পী মানুষকে লোহার স্ক্র‍্যাপের গুদামে কাজ করে দিন কাটাতে হয়? যাক গে,  কাল বিকেল থেকে যে কোথায় গায়েব হল। আর সে না থাকলে ওই ছোট্ট প্রদীপ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- আমি বোধ হয় জানি ছোটেলাল কোথায়। চলুন আপনার গোডাউনে। সময় নষ্ট করা যাবে না।

- আমার দোকান। আমার দোকানের গুদাম। আপনি বলার কে?

- দোকানঘর আর গুদাম থাকবে বটে, কিন্তু দোকানের মালপত্র আর লোকজন, সবই গায়েব হয়ে যাবে বিপিনবাবু। সময় নষ্ট করবেন না। ছোটেলালের ভরসা না করে আমায় নিয়ে চলুন, এখুনি।

- অ্যাই আপনি কি ভণ্ড সাধু নাকি? কী ভেবেছেনটা কী? আমার দোকানে এসে আমায় বিঁধবেন?  ছোটেলাল না ফিরলে গুদাম খোলা হবে না।

- আমার ধারণা ছোটেলাল আর ফিরবে না। প্রদীপ একবার কাউকে গিলে ফেললে আর তার নিস্তার নেই। মানুষ জিনিসপত্র জন্তুজানোয়ার; কিছুতেই সে প্রদীপের অরুচি নেই। পারলে গোটা দুনিয়াটাই...। একমাত্র আমিই পারি তাকে আটকাতে...।

***

স্বরূপানন্দকে নিয়ে গুদামে পৌঁছে বিপিনবাবুর ভির্মি খাওয়ার যোগাড় হল, গোটা গুদামঘর ফাঁকা। এক কণা লোহাও কোথাও নেই। শুধু এক কোণে পড়ে আছে পুরনো তোবড়ানো প্রদীপখানা; তার গায়ে বাহারী নক্সা। আর প্রদীপের কাছেই যে কালো সুতোয় ঝোলানো মাদুলিটা পড়ে আছে, সে'টা যে ছোটেলালেরই তা বিলক্ষণ জানেন বিপিনবাবু। বিপিনবাবুকে দূরে দাঁড় করিয়ে প্রদীপের দিকে হেঁটে গেলেন স্বরূপানন্দ।

**

- কী ব্যাপার ভায়া আলাদীন,  আজ এত সকাল সকাল তলব?

- জিনি, আমার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে লোহা জোগাড় করতে পারবে? শ্বশুরমশাইয়ের একটা মূর্তি বানাবো, কিন্তু এ দেশে লোহার যে বড় অভাব। এ'দিকে তাঁকে প্রজারা লৌহপুরুষ বলে সেলাম করত কিনা, তাই জেসমিনের বড় ইচ্ছে।

- জেসমিন বৌদিকে বলো আমি লোহা জোগাড় করে মূর্তি বানিয়ে এনে দিচ্ছি, চটপট। আর কোনো হুকুম?

- হুকুম না, তবে আমার বড় শখ হে জিনি...।

- আপনার শখ? আদেশ করুন।

- আমার বড় ইচ্ছে, নতুন দেশের নতুন ভাষার নতুন ধরনের সুরের গান শুনব। বড় ইচ্ছে।

- বেশ। তেমন একজন গায়ক এনে হাজির করছি। আপনার প্রাসাদেই সে থাকবে আর আপনার ইচ্ছেমত গান শোনাবে, অন্য দেশের অন্য ভাষার অন্য সময়ের গান। কেমন?

- বাহ্! আচ্ছা ভাই জিনি, যখন যা চাই, যাকে চাই; তা তুমি ও প্রদীপের মধ্যে থেকে বের করে আনো কী করে?

- ও'সব গোপন কথায় কাজ কী ভাই আলাদীন? তুমি একটু অপেক্ষা করো, আমি চট করে লোহা আর গায়ক নিয়ে আসি।


Saturday, February 9, 2019

নিউজ চ্যানেল



- খোকা! স্যাট স্যাট করে টিভির সামনে এসে না পড়লেই নয়?

- আহ! টিভি না পেরিয়ে ফ্রিজ পর্যন্ত পৌঁছব কী করে? আর ফ্রিজেই তো ছানার জিলিপির বাক্স।

- ছানার জিলিপি? দেশ গোল্লায় যাচ্ছে আর উনি ছানার জিলিপির জন্য আমার কনসেন্ট্রেশনে ফিনাইল ঢালছেন।

- দেখছ তো নিউজ চ্যানেল, তার আবার কনসেন্ট্রেশন কীসে।

- দেশের পলিটিকাল ক্রাইসিস সম্বন্ধে খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করিস?

- ক্রাইসিস? ও তোমার এই খবরের চ্যানেলগুলোর বাড়াবাড়ি।

- বাড়াবাড়ি? বটে? অ্যাডাম স্মিথ সামান্য দু'পাতা উলটে দেখলে বুঝতিস। দেশের পলিটিকাল হিস্ট্রি একটু দরদ দিয়ে পড়লে টের পেতিস যে কী ভোলাটাইল সিচুয়েশনে আমরা বাস করছি। য়ুরোপের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলেই জানতে পারবি যে...।

- মাইরি বাবা। দেখছ তো নিউজচ্যানেলের গাঁজা চিৎকার চ্যাঁচামেচি, এ'দিকে কোট করবে মার্ক্স স্মিথ অরবিন্দ। এক পিস জিলিপি খাবে?

- একটা গোটা জেনারেশন নেরোর মত জিলিপির বেহালা হাতে সং সেজে দাঁড়িয়ে আছে। তোদের দেখে খুব চিন্তা হয় রে খোকা।

- দু'টো জিলিপিই পড়ে আছে বোধ হয়।

- ফের জিলিপি? এ'দিকে দেশের মধ্যে ক্রাইসিস...ফের যদি টিভির সামনে এসেছিস...।

- এর চেয়ে সিরিয়াল দেখো বাবা, কানে ও মনে পলিউশন কমবে।

- পলিটিকাল ডিবেট শোনা মানে মনকে পলিউট করা?

- আলবাত! এ'গুলো ডিবেট কই, এ তো ইটপাটকেল ছুঁড়ছে।

- শোন, এ'সব টিভি ডিবেটের দুধে জল মিশবেই...আমাদের কাজ হচ্ছে জল সাইড করে দুধটুকু সাবাড় করা।

- জল বাদ দিয়ে দুধ?

- ইয়েস।  আর তার জন্য লাগে অ্যাওয়ারনেস, দরকার পড়াশোনা। শুধু নেটফ্লিক্স নেটফ্লিক্স করে বাঁদুরর লাফ লাফালে কাঁচকলা হবে।

- বটে? তা গত দু'ঘণ্টা ধরে যে দ্রাবিড়ের কনসেন্ট্রেশনে এ'সব নিউজ চ্যানেলের ডিবেট শুনলে, তা'তে তুমি জল বাদ দিয়ে কোন জ্ঞান গ্রিপ করেছ? কী'ভাবে এনরিচড হয়েছ?

- রীতিমতো এনরিচড হয়েছি।

- রিয়েলি?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

- বেশ, বলো তা'হলে এই চিৎকার আর গোলমাল থেকে তুমি কী জ্ঞানলাভ করেছ।

- তোকে বলতে যাব কেন?

- বলবে নাই বা কেন?

- শোন তবে, এতক্ষণে কী বুঝেছি।

- বলো। শুনি। কী বুঝেছ।

- আমি বুঝেছি যে শেষ ছানার জিলিপির জোড়াটা আমার বড্ড দরকার। একটা প্লেটে করে দিয়ে যাবি বাবু? আর রিমোটটা দিয়ে যা বুঝলি, দেখি কোনো ভালো সিনেমাটিনেমা চলছে কিনা।

ধারালো প্রপোজাল


প্রপোজ করতেই হলে ধারালো তরবারি হয়ে ফালাফালা করে দিতে হবে। এস্পারওস্পার চাই, নেকু হ্যাঁগোওগোভালোবাসিগো দিয়ে বেশিদিন কাজ চলবে না।

বাঙালির প্রপোজাগুলো টেম্পলেটগুলো আপগ্রেড করে রাখা দরকার।

১৷
আউট- তোমাকেই ভালোবাসি।
ইন - ভীড় মিনিবাসে তোমার জন্য জানলা ছেড়ে দেব।

২।
আউট - তোমায় ছাড়া বাঁচবা না।
ইন - তুমি না থাকলে যে আমায় বিউলির ডালে রসগোল্লা চুবিয়ে খেতে হবে!

৩।
আউট - যা তোমারে দিয়েছিনু তা তোমারই দান।
ইন - এক প্লেটে পাঁচটা ফিশফিঙ্গার দেখছি, আমি দু'টো তুমি তিনটে। না বললে হবে না।

৪।
আউট - ভালোবাসা মানে আর্চিস গ্যালারি।
ইন - রোজ মশারি আমি টাঙাবো, প্রমিস।

৫।
আউট - তুমি আমার চিরদিনের..।
ইন- দু'জনের ফোনেই দেখছি টাইপ সি চার্জার। সুবিধে হল কিন্তু...।

৬।
আউট - এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই পাওয়া...।
ইন - ও মা! আপনার গাদার পিস ভালো লাগে? আমি আবার পেটি ভক্ত। কম্বোটা কতটা খাপেখাপ সে'টা ভেবে দেখেছেন কি?

৭।
আউট - আমায় বিয়ে করবে?
ইন - যা বুঝছি, দু'জনের একটা আমাজন প্রাইম অ্যাকাউন্টেই চলে যাওয়া উচিৎ।

৮।
আউট - এসো এসো আমার ঘরে এসো, বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে।
ইন - বাবা মা মালদায় মেজোপিসির বাড়ি গেছে, বুঝলে। এ'দিকে মিনুদি ছুটিতে। বাড়ি শুনশান।

৯।
আউট - এই পথ যদি না শেষ হয়।
ইন - ভিডিও চ্যাটে বড্ড ডেটা খায় গো।  নেহাত আমার দিনে তিন জিবি করে ডেটা, তাই বাঁচোয়া। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, তোমার প্ল্যানটাও আপগ্রেড করে দিই?

১০।
আউট - পারব না হতে আমি রোমিও, তাই দুপুর বেলাতে ঘুমিও।
ইন - ফাইনাল স্কোরলাইন; ল্যাদ ১ আর তুমি ০।

Thursday, February 7, 2019

সকল দেশের সেরা


- হ্যান্ডস আপ!

- কাটা গেছে স্যর, দু'টোই। তবু কল্পনায় দু'হাত তুলে ধরলাম..ফায়্যার করবেন না প্লীজ। পেটে বড্ড খিদে, এত খিদে নিয়ে ফস করে মরে গেলে যদি অম্বল হয়?

- বাজে ঠাট্টা একদম নয়! একদম নয়। নেতার হুকুম, বাজে ঠাট্টা শুনলেই ঢিশকাঁও!

- সৈনিকদাদা, বন্দুক আপনার হাতে। আমার হাত জোড়াই বরং গায়েব। আমি ঠাট্টা করি কোন মুখে?

- তা এত রাত্রে কাঁটাতারের তল দিয়ে সটকাবার তাল  করেছ ব্যাটাচ্ছেলে? তোমার তো সাহস কম নয়!

- কাঁটাতারের তল দিয়ে...ও মা! আমি কি পাগল না আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয় নেতার ফর্সা নাকের ডগায় বসা বেয়াদপ মশা? আমি কাঁটাতার পেরোব? আমি কি জানিনা যে ও'পারে শত্রুদেশ?

- বাজে কথা বলবে না! বাজে কথা বলবে না! পেরোতে না চাইলে এই অসময়ে কাঁটাতারের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিলে কেন?

- আজ্ঞে সৈনিকদাদা, থুতু ফেলতে এসেছিলাম। কাঁটাতারের ও'পারে। হারামজাদাদের দেশের মাটিতে থুতু ছিটিয়েও শান্তি। তাই না?

- চোপ! ধরা পড়লে সবাই ও'সব বড় বড় কথা বলে।

- না গো না, আমাদের নেতামশাই কত ভালোবাসা দিয়ে এই দেশ গড়েছেন। আমাদের এ স্বপ্নের দেশে কত দেশাত্মবোধক গান, কত দেশ গড়ার বই, আমাদের সেনা কত মজবুত, আমাদের রক্ত বিপ্লবে টইটম্বুর! আর ওই হারামজাদাদের দেশে দিনে তিনবেলা থালাভরা ভাতখাওয়ার আদেখলাপনা, হাসপাতালে ওষুধ ডাক্তারের ন্যাকামো আর কলকারখানায় ব্যস্ততার শয়তানি।

- তিনবেলা ভাত খায়? ও'দেশের লোক?

- বখে গেছে গো সৈনিকদাদা, ও দেশে এক্কেবারে বখে গেছে। শয়াতানের ছেলেদের আবার অনেক নেতা, অরাজকতা এমন পর্যায় গেছে যে সে ব্যাটাবেটিদের ভোট দিয়ে নেতা বাছতে হয়।

- এই তুমি শত্রুদেশের নিন্দে করছ না প্রশংসা?

- তৌবা তৌবা, ওই জানোয়ারদের দেশের প্রশংসা করব আমি? আরে আমাদের এই শ্রেষ্ঠ দেশ ভুলে আমি ওই নরকের প্রশংসা করব? আমি কি উন্মাদ না আমাদের আদরের নেতার পায়ের ফোস্কা? এমন অপবাদ দেওয়ার আগে আমার কপালে গুলি করলে না কেন সৈনিক? নেহাত গোপনে বিদেশি খবরের কাগজ পড়ে ফেলেছিলাম তাই মহান নেতার অনুপ্রেরণায় তার সাগরেদরা আমার হাত দু'টো টুক করে কেটে ফেলেছিল; নয়ত আমি নিজের হাতে আপনার বন্দুক কেড়ে নিজের মাথায় ঠুকে দিতাম।

- বাজে কথা বন্ধ করে বলো দেখি, তুমি একা এসেছ না সঙ্গে ছেলেমেয়েবৌ আছে?

- ছেলেমেয়েবৌ? ছিল বটে। কিন্তু নেতার দেখানো বিপ্লবের পথে তাঁরা শহিদ হয়েছে সৈনিকদাদা।

- শত্রুসেনা তাঁদের কোতল করেছে?

- তেমনটাই হতে যাচ্ছিল কিন্তু শত্রু সৈন্যের হাতে পড়ার আগেই টপাটপ তারা মরে গেল হে। খিদে জিনিসটা যে এত গোলমেলে সে'টা টের পাইনি। তবে নেতা বলেছেন খিদে আর রক্ত ছাড়া বিপ্লব হয়না। নেতার জয় হোক, এ দেশের জয় হোক।

- তুমি তা'হলে শত্রুসেনার কাছে আশ্রয়ভিক্ষা করতে আসনি?

- কতবার বলব সৈনিকদাদা! না! শত্রুশিবিরে গিয়ে একবাটি ভাত খেয়ে প্রাণ আইঢাই করে মরি আর কী! আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম এ কাঁটাতার কতটা মজবুত।  আর ও দেশের মাটি তাক করে থুতু ফেলতে।

- বেশ, প্রাণে না মেরে তোমার দুই ঠ্যাঙে দুটো গুলি ঠুকে ছেড়ে দিচ্ছি। নেতা বলেছেন; উদারচেতা হতে হবে।

- আমাদের ভালোবাসার নেতা অমর রয়ে। আমাদের দেশের ওপর যেন আন্তর্জাতিক ইতর সমাজের চোখ না পড়ে।

বাপনের ওয়েক-আপ কল

- উঠে পড়ো বাপনবাবু। ক্যুইক। আর শুয়ে থাকা চলবে না।

- দাদু, টূ আর্লি। আর একটু পরে উঠব।

- নো বাপন। অন্তত আজকের দিনটা তোমায় সময় মত উঠতেই হবে...। কাম অন।

- ওহ, আজ সাতই ফেব্রুয়ারি।

- হ্যাপি বার্থডে দাদুসোনা।

- থ্যাঙ্কিউ। কিন্তু দাদু, এ বয়সে কি আর জন্মদিন নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি চলে?

- বয়স আবার কী? ইউ আর মাই নাতি, আমার কাছে তুমি সবসময় এই এত্তটুকুনই থাকবে। কাজেই ওয়ান্স এগেইন, জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। নাও, চটপট করে উঠে পড়ো দেখি।

- আর একটু শুয়ে থাকি দাদু? প্লীজ?

- না! একদম নয়। আগে যাও গিয়ে তোমার মা'কে প্রণাম করে এসো।

- মা প্রত্যেকবার বড্ড ইমোশনাল হয়ে বড়ে। আমার জন্মদিন না নোবেল পেয়েছি বোঝা দায়।

- শী ইজ ইওর মাদার। তোমার জন্মদিনে সে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়বে; সে'টাই স্বাভাবিক। বরং তোমায় বলি; মিলেনিয়ালদের মত কূল হতে গিয়ে কোল্ড হয়ে পড়ো না বাপনবাবু! নাও গেট আপ। ক্যুইক, ক্যুইক।

- যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি! উফ!

***

- কী হল দীপা! এমন ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলে! দুঃস্বপ্ন?

- না, দুঃস্বপ্ন কেন হবে! রাত সোয়া বারোটা হয়ে গেছে। সাতই ফেব্রুয়ারি পড়ে গেছে।

- বাপনের জন্মদিন..।

- ও এসেছিল গো, গত পাঁচ বছর ধরে যেমন আসছে। ঠিক এই দিনে ঠিক এই সময়...। আমায় প্রণাম করতে..।  আমার পায়ের পাতায় ওর হাতের ছোঁয়া টের পেয়েছি..।

- তোমার স্বপ্ন দীপা, বাপন কী ভাবে আসবে?

- এসেছিল! স্বপ্নে নয়। বিশ্বাস করো, প্লীজ! বাপনের আমায় জড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর আমি জড়িয়ে ধরতে গেলেই মিলিয়ে যায়...প্রতিবারের মত..।

- স্বপ্ন!

- স্বপ্ন নয় গো! বিশ্বাস করো!

- শুয়ে পড়ো, প্লীজ।

Sunday, February 3, 2019

বইমেলায় গুমখুন


- দত্তবাবু, কলকাতা বইমেলার স্টল সংখ্যা তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচে আপনাকে স্বাগত জানাই।

- স্টল নাম্বার কত?

- তিনশো চোদ্দ দশমিক এক পাঁচ।

- জব্বর গোলমাল পাকিয়েছে দেখছি গিল্ড! ডেসিমালে স্টল নম্বর!

- আপনি বইয়ের জন্য এসেছেন না স্টল নম্বরের জন্য?

- দাঁড়ান দাঁড়ান, তিনশো চোদ্দ থেকে বেরিয়ে তিনশো পনেরো নম্বর স্টলে ঢুকতে যাবো। তিনশো চোদ্দ থেকে বেরোতেই সামান্য হোঁচট খেলাম, আর তারপরেই এই...।

- স্টলে এসে পড়লেন, স্বাভাবিক।  তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরোর মাঝখানে ঢুকতে হলে হোঁচট খেতেই হবে।

- ভোজবাজি দেখছি।

- এ'বারে বইগুলো একটু নেড়েচেড়ে দেখুন দত্তবাবু। এসেই যখন পড়েছেন..।

- আপনাদের এ'টা কোন পাবলিকেশন?

- গুমখুন প্রকাশনী।

- সর্বনাশ! এ'টা কোনো নাম হল?

- বইয়ের স্টলের নম্বর আর প্রকাশনার নামগুলোই সব নয় দত্তবাবু, বইয়ের জন্য বইমেলায় আসা। বই দেখুন।

- এক মিনিট, আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?

- আপনিও আমায় চেনেন। অমনোযোগী না হলে দিব্যি চিনতে পারতেন।

- কে আপনি?

- কত টালবাহানা আপনার মশাই। স্টলের নম্বর নাপসন্দ। প্রকাশনার নাম শুনে বিরক্তি। স্টলে বসে থাকা মানুষকে নিয়ে খুঁতখুঁত। বইমেলায় এসে বই ছাড়া সব নিয়েই আপনার আদেখলাপনা রয়েছে দেখছি। বইগুলো মন দিয়ে দেখুন নয়ত...।

- ও কী!  রিভলভার! আপনি উন্মাদ দেখছি।

- সামনের বইগুলো উল্টেপাল্টে দেখুন। নয়ত ট্রিগার সামলে চলার লোক আমি নই...। রোববার বিকেলে বইমেলায় আকচার খুন হচ্ছে, আপনি টের না পেলেও হচ্ছে। আজ আপনি হবেন।

- প্লীজ, এই পাগলামো বন্ধ করুন। বন্দুক নামান। আমি বই দেখছি।

- গুডবয়। ক্যুইক।

- এ কী! এ তো গুমখুন প্রকাশনীর বই নয়; এ'টা যে আনন্দর বই। সুনীলের নভেল। আর.. আরে...এ যে ছোটমামার উপহার দেওয়া বইটাই..ওই কপিটাই...বছর বারো আগে আমার জন্মদিনে..আর এ'টা নারায়ণ সান্যাল, দে'জের বই। আমার বন্ধু শ্যামলের দেওয়া, "চট করে পড়ে ফেল দেখি' বলে সই করেছে। এই যে বুদ্ধদেব গুহর প্রেমের গল্প; সর্বনাশ। মিতুলের দেওয়া। তখনও আমাদের সম্পর্ক ভাঙেনি। এই যে গোলাপি কালিতে ও দু'কলম লিখে দিয়েছিল...। কিন্তু এই বইগুলো এ'খানে কী ভাবে?

- এ'রকম বহু বই এখানে যাচ্ছে। আপনার না পড়া সমস্ত বই। আপনার হারানো যত বই, অযত্ন ফেলে রাখা কত বই। স্নেহের মানুষদের থেকে উপহার পাওয়া না পড়া বই। সে'সব জড়ো করেই এই স্টল। সংগ্রহটা চমৎকার দত্তবাবু।

- বই না পড়ে ফেলে রাখা মানে গুমখুন?

- না, অত কাব্যিক এ নাম নয়। গুমখুন আপনি আজ হবেন, সে জন্যই আপনাকে এ'খানে টেনে আনা। সে জন্যেই এই প্রকাশনী।  তার আগে ভালো করে ভেবে বলুন দেখি দত্তবাবু; আমায় এখনও চিনতে পারছেন না?

- আপনার মুখটা দিব্যি চেনা ঠেকছে...।

- নিজের মুখ চেনা ঠেকবে সে'টাই স্বাভাবিক।

- আপনি আর আমি.. আমি আর আপনি...?

- এক। কিন্তু এক নই!  আমি পাঠক। বইয়ের এ মলাট থেকে ও মলাট ঘুরে বেড়ানো পথিক। আপনার মত ঘরকুনো কনসিউমারিস্ট বই কিনিয়ের সঙ্গে আমার তুলনা চলে না। এই গুমখুন স্টলে বহু বছর নষ্ট হয়েছে। আর নয়, এ'বারে আমার মুক্তি আর তার জন্য আপনাকে খুন হতেই হবে...।

- ও কী! রিভলভার নীচে নামান...ও কী! থামুন!

- গুডবাই বইখুনি দত্তবাবু!

*দ্রুম দ্রুম দ্রুম*

চোখে মুখে জলের ঝাপটা পড়তে জ্ঞান ফিরল দত্তবাবুর। বইমেলায় তিনশো চোদ্দ নম্বর স্টলের বাইরে হোঁচট খেয়ে পড়ে কিছুক্ষণের জন্য চারপাশে অন্ধকার দেখেছিলেন তিনি। দৃষ্টির ঝাপসা কেটে যাওয়ার পর দেখলেন তাকে ঘিরে ছোটখাটো একটা জটলা। আশাপাশে লোকজনকে ধন্যবাদ দিয়ে দ্রুত মেলা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন ভদ্রলোক।

তিনশো চোদ্দ আর তিনশো পনেরো নম্বর স্টলের মাঝে যে লাশটা সবার অগোচরে পড়ে রইলো, তার প্রতি বিন্দু মাত্র অনুকম্পা অনুভব করতে পারলেন না তিনি৷ বইমেলা থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি না ধরা পর্যন্ত স্বস্তি নেই; বাড়ির বইয়ের আলমারিটা ততক্ষণে নিশির মত ডাকতে শুরু করেছে।

Saturday, January 26, 2019

লস্ট বয় অফ সুদান


এ বই ছাব্বিশে জানুয়ারি পড়া শেষ হল, সে'টা একটা উপরি পাওনা।

১৯৯০। দক্ষিণ সুদানের এক প্রত্যন্ত গ্রাম; কিমটং।  বিজলিবাতি বা গাড়িঘোড়া বা স্কুল সে গ্রামে ছিল না; শুধু এ'টুকু বললে সে গাঁয়ের অন্ধকার সঠিকভাবে বোঝানো সম্ভব নয়। আসলে আমি কোনো কিছু বললেই সে পৃথিবীর যন্ত্রণাগুলো যথাযথ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব না। তার জন্য লোপেজের আত্মজীবনী 'রানিং ফর মাই লাইফ' পড়া ছাড়া গতি নেই।

ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে তখন সুদান তছনছ; লোপেপে (ভালো নাম; লোপেজ লোমং)  নামে ছ'বছরের এক শিশু কিমটং গ্রামের গীর্জা থেকে অপহৃত হয়। লোপেপে একা নয়, প্রতিদিন বহুসংখ্যক শিশুদের তুলে নিয়ে যেত যুযুধান সেনারা। যে পাশবিক পরিস্থিতিতে সেই অপহৃত শিশু ও কিশোরদের রাখা হত, তা'তে অনেকেই মারা যেত অত্যাচার ও অনাহার সহ্য করতে না পেরে। যাদের মধ্যে বেঁচে থাকার দুঃসাহস ও অমানবিক তাগদ থাকত; তাদের জোর করে ভর্তি করা হত সৈন্য হিসেবে। উইকিপিডিয়ায় 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' সার্চ করলে সে বিষয়ে কিছুটা জানা যায়। বাপ-মায়ের কোল থেকে এক প্রকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল লোপেপেকে। তখন সে দুধের শিশু, বন্দী অবস্থার অকথ্য অত্যাচার সহ্য করে তার বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কিন্তু বরাত জোরে সে পালিয়ে বাঁচে।

লোপেপে সীমানা পেরিয়ে এসে পৌঁছয় কেনিয়ার কাকুমা রিফিউজি শিবিরে। সে'খানে দশ বছর কাটায় লোপেপে। এই দশ বছরের যে বর্ণনা বইতে রেখেছেন লোপেজ লোমং, তা পড়ে শিউরে উঠতে হয়।  যুদ্ধবিধ্বস্ত আফ্রিকার যে ভয়াবহ ছবি তুলে ধরেছেন লোপেপে, তা যে কোনো পাঠককে বাধ্য করবে খাবারের প্রতিটি কণাকে বা সাধারণ প্যারাসেটামলের মত ওষুধকে অন্য মাত্রার সমীহ করতে। কেনিয়ার সেই শরণার্থী শিবিরে লোপেপেদের দিনে একবারের বেশি খাওয়া জুটত না, তাও আধপেটা। রিফিউজি, তাই শিবিরের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার অনুমতিও ছিল না তাঁদের। হপ্তায় একদিন তাঁরা দিনে দ্বিতীয় বারের জন্য খেতে পারত; কারণ সে'দিন শিবির সংলগ্ন ময়লার স্তুপে কাকুমার অন্য প্রান্ত থেকে উচ্ছিষ্ট,ফেলে দেওয়া বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার এনে ফেলা হত। সেই ময়লার স্তুপেও চলত কাড়াকাড়ি, হাতাহাতি।  আর পাশাপাশি ছিল মৃত্যু; লোকজনের মরে যাওয়াটা প্রায় এলেবেলে পর্যায়ের একটা ব্যাপার ছিল। বইয়ের প্রথম অংশ লোপেপের সেই সংগ্রামের; অবশ্য সে সময় বেঁচে থাকা ব্যাপারটাই লোপেপের কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত ছিল। সে ধরেই নিয়েছিল বাপ মায়ের দেখা আর সে পাবে না। আর তার সমস্ত যন্ত্রণার মলম বলতে ছিল তিনটে ব্যাপার; ঈশ্বরে আস্থা, দৌড় আর ফুটবল।

বইয়ের পরের অধ্যায় লোপেপের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ছুটে যাওয়া নিয়ে। লোপেপে প্রথম অলিম্পিকের কথা শোনে পনেরো বছর বয়সে, প্রথম পাউরুটি চেখে দেখার সুযোগ পায় তারও পরে; যখন ভাগ্যের দুরন্ত মোচড়ে সে আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পায়। আমার খানিকটা মনে আছে প্রথমবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সময় লালমোহনের উচ্ছ্বাস। লোপেজ 'লোপেপে' লোমং; ষোলো বছর বয়সে বহু কাঞ্চনজঙ্ঘা উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে শুরু করে যখন সে প্রথম জানতে পারে পেট ভরে যাওয়া বলে একটা ব্যাপার থাকে, বাথরুম বলে একটা ব্যাপার আছে, আছে পরিষ্কার কাপরজামা পরার একটা নিশ্চিন্দি। লোপেপের চোখ দিয়ে চারপাশের সাধারণ জিনিসগুলো দেখতে শুরু করলে তাজ্জব বনে যেতে হয়। গত দু'দিন ধরে চানাচুরের একটা দানা প্লেটের বাইরে পড়লে লজ্জা হচ্ছে।এই লজ্জাটা শৌখিন এবং সাময়িক, সে'টাও স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

বইয়ের বাকি অংশ জুড়ে 'ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা' আর ফেলে আসা মাটির টান। লোপেপের লেখায় একটা সরল প্রশ্ন বার বার উঠে এসেছে; জন্মসূত্রে পাওয়া পদবীর মতই, জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্বের প্রতি আনুগত্যই দেশাত্মবোধের শেষ কথা হতে যাবে কেন? লোপেপের জীবন ও বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ ভাবে পালটে যায় এক আমেরিকান দম্পতির স্নেহে; আমেরিকায়। লোপেপেও আমেরিকাকে ভালোবাসতে কসুর করেনি; আমেরিকাকে ততটাই আপন করে নিয়েছে যতটা একজন সাতপুরুষ পুরনো মার্কিনীর পক্ষে সম্ভব। লোপেপে যেমন আমেরিকার ছত্রছায়ায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে, হয়ে উঠেছে সে দেশের অন্যতম সেরা ট্র‍্যাক অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলিট এবং বেজিং অলিম্পিকে মার্কিন পতাকাবাহক; আমেরিকাও ততটাই সমৃদ্ধ হয়েছে লোপেজ লোমংয়ের মত সুনাগরিক পেয়ে। নিজের পিতৃপরিচয়ের মতই, জন্মভূমি বেছে জন্ম নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিজের পছন্দসই দেশ বেছে নেওয়ার পথটা সরল নয় কেন? লোপেজ পেরেছেন, বেশিরভাগ 'লস্ট বয়েজ অফ সুদান' পারেনি।

লোপেজ নিজের ফেলে আসা জগতকে মনে রেখেছেন, স্মৃতি আগলে রেখেছেন; বার বার ফিরে গেছেন। দেখেছেন যুদ্ধ থামলেও সে'খানকার অবিশ্বাস্য অন্ধকার ফিকে হয়নি এতটুকু। সে'খানে আজও সামান্য পেনিসিলিনের অভাবে শয়ে শয়ে শিশু মারা যাচ্ছে, আজও স্কুল নেই। আশা নেই, স্বপ্নও নেই। নিজের জন্মভূমিতে সেই আশা ও স্বপ্ন পৌঁছে দেওয়ার ইচ্ছের কথা লিখেছেন লোপেজ, আর লিখেছেন আমেরিকার প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা। লোপেজের মত কিছু নিবেদিতপ্রাণ নাগরিক পেলে যে'কোনো দেশে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে যাবেই। এ বই পড়ে মনে হয়, একদিন সমস্ত দেশের ইমিগ্রেশন পলিসি ঢেলে সাজানো হবে। একটা ফুটবল টীমের স্কাউটরা যে'ভাবে গোটা দুনিয়া চষে বেড়াতে পারে ভালো খেলোয়ার 'রিক্রুট' করতে, একটা দেশ আদর্শ নাগরিকদের খোঁজ করবে না কেন?

সবশেষে দু'টো কথা বলা দরকার।

এক, লোপেজের ঈশ্বর-বিশ্বাস। পাঠক নিজে ঈশ্বর-অবিশ্বাসী হতেই পারেন, কিন্তু লোপেজের ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করা অসম্ভব।  মাঝেমধ্যে মনে হবে লোপেজ যেন দাদার কীর্তির কেদার আর ঈশ্বর হলেন ভোম্বলদা; মাঝেমধ্যে ফাঁপরে ফেললেও, উতরে তিনিই দেবেন।

দুই, অলিম্পিকে মেডেল জেতা হয়নি লোপেজের। তবে হেরে যাওয়া রেসের শেষে গেয়েছিলেন আমেরিকার জাতীয় সঙ্গীত, তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিলেন খেলা দেখতে আসা প্রচুর মার্কিনী দর্শক। এই অভিজ্ঞতার কথাটা লোপেজের ভাষায় পড়া দরকার। (প্রসঙ্গত, আজ দেখলাম দীপা কর্মকারের বই বেরিয়েছে, দেখা যাক)।

'হেরে যাওয়া রেস' বললাম কি? লোপেপে হেরে যাওয়ার বান্দাই নন।