Wednesday, November 13, 2019

রাতের মেজাজ


রাত যত গভীর হয়, কিছু মানুষের মেজাজ তত খোলতাই হয়। মাঝরাত পেরোলেই তাঁরা আরো চাঙ্গা হয়ে ওঠেন, তাঁদের ফাঁদা গল্পের ধার বেড়ে যায়, গলায় সুর এসে ঠেকে, ঠাট্টাগুলো পেরেকের ঠিক মাথায় এসে বসে; মোট কথা গভীর রাতের ছোঁয়াচ লাগলেই তাঁরা হঠাৎ মনে পড়া পদ্যের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন।

মনোময় মল্লিক তেমনই একজন। মেসের প্রতিটি রাত গড়িয়ে ভোর হওয়া আড্ডার মধ্যমণিও তিনি৷ চাকুরেদের মেস, কাজেই শনিবারের রাত ছাড়া এমন জমাটি রাতকাবার করা আড্ডা খুব বেশি বসে না। ট্যুয়েন্টি নাইন, দাবা; শুরুটা মাপা সুরে হলেও ক্রমশ এ জমায়েত রংবিরঙ্গি হয়ে ওঠে নির্ভেজাল আড্ডায়। রেলের ক্লার্ক মেহবুব আর উঠতি সাংবাদিক অখিলেশের সারাক্ষণ শুধু পলিটিকাল ডিবেট নিয়েই হদ্দ। প্রাইভেট ফার্মের চাকুরে দেবনাথ কথায় কথায় গান ধরেন, গলায় সুরও আছে বটে৷ সহদেব হালদার ক্রিকেট কোচিং করান কলকাতারই একটা ক্লাবে, খেলাধুলোর ব্যাপারে মতামত সকলেরই থাকে তবে সহদেবের টেবিল চাপড়ে বলা কথার ওপর সাধারণত কোনো তর্ক চলেনা। নির্মল হালদার আর অসীম মাইতি দু'জনেই একই ব্যাঙ্কে একই পদে বহাল; দু'জনেই শুধু খাইয়ে নন, ভালো খাবারদাবারের কন্যোসার, তাঁদের আলোচোনার সিংহভাগ জুড়ে শুধু খাবারদাবার আর খাওয়াদাওয়া। আর সবাইকে একই সূত্রে বেঁধে এইসব আড্ডার সুর রচনা করে থাকেন মনোময়।

মনোময় ছাড়া রাতের আড্ডা হল ঝালের আস্তরণ ছাড়া মেসের ঠাকুরের রান্নার মত; পাতে দেওয়া চলেনা। রাজনৈতিক তর্কাতর্কির গোলমাল কাটিয়ে টেনিদা-সম ডাম্বেল-মার্কা ফিচলেমো আড্ডাবাজদের দিকে ঠেলে দেন তিনি। শ্যামসঙ্গীত শুনে তাঁর চোখ ছলছলিয়ে ওঠে আর গজল শুনে তিনি ফেলে আসা প্রেমের স্মৃতিতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেন; গানের সুরের চেয়েও মধুময় হয়ে ওঠে তাঁর অন্তর থেকে বলে ওঠা 'বাহ্'। খেলাধুলোর প্রসঙ্গে তিনি খুব সহজে টেনে আনেন সাহিত্য; সহদেব হালদার আজহারউদ্দিন প্রসঙ্গে জোরালো কোনো মন্তব্য করলে তিনি অবলীলায় মতি নন্দী কোট করে আলোচনায় অন্য ডাইমেনশন জুড়ে দেন। খাবারদাবার নিয়ে রসালো আলোচনায় অবলীলায় সুকুমার রায়ের ছড়া বা জয় গোস্বামীর প্রেমের কবিতা মিশিয়ে দেওয়ার কলজে রাখেন মনোময়। মোদ্দা কথা হল রাতের এই মেসমাতানো-আড্ডাগুলোয় মনোময়ের উপস্থিতি হল শীতকালে দুপুরের রোদ খাওয়ানো লেপের ওমের মত। মনোময় না থাকলে আড্ডা রাত বারোটার-সাড়ে বারোটার বেশি গড়ায় না অথচ মনোময়পূর্ণ শনিবার রাত্রের কত আড্ডা ভেঙেছে ভোরের ফর্সা আকাশ দেখে।

দিনের বেলাগুলো অবশ্য মনোময় রীতিমতো ম্রিয়মাণ, গোটা সকালটা তার মুখে তেমন একটা বুলি ফোটেনা। বুলি ফোটানোর তেমন তাগিদও বোধ করেননা তিনি।

তাগিদটা আসে রাত বাড়লে। রাত যত গভীর হয় তত মানুষের সঙ্গলাভের জন্য উন্মুখ হয়ে পড়েন মনোময়। বিশেষত শনিবার রাত্রিগুলোয় এমন আড্ডার কোকেন রক্তে গ্রহণ না করতে পারলে মনোময়ের বুকের ভিতরটা টনটন করে ওঠে; মনে হয় বাক্সে রাখা মায়ের চিঠিটা খুনে ছুরি হয়ে বুকে এসে বসবে।

"খোকা,
বড় কষ্টে এ চিঠি লিখছি। কিন্তু বুক ফেটে গেলেও এ চিঠি আমায় লিখতেই হবে।
তোকে কাছে টেনে রাখা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। তোর বাবা বলে এদ্দিন নাকি তোকে আগলে রেখে আমি অন্যায়ই করেছি। কিন্তু মায়ের মন; অত সহজে স্বস্তি পাই কী করে? বুকে পাথর রেখে তোকে বিদেয় করতে হয়েছে খোকা, কিন্তু বিশ্বাস কর এ অসহ্য যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারিনা।
নিমু তান্ত্রিক খবর দিয়েছে তুই এখনও মায়া কাটিয়ে যেতে চাইছিস না। এ চিঠি আমি ওর মারফতই তোকে পাঠালাম, পোস্টঅফিসের সাধ্য কী এ চিঠি তোর কাছে পৌঁছে দেবে? বেঁচে থাকতে কোনোদিন তুই একটা মিছে কথাও বলিসনি, আজ তবে মানুষ সেজে অন্যদের ঠকানো কেন বাবা! আমি মা হয়ে জানি যে এতে কোনোমতেই তোর যন্ত্রণা কমছে না।

নিমু বলেছে যে যে কোনো শনিবার রাত্রে তুই ওর কাছে ফিরে এলেই ও তোর মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবে। আর নিজেকে ঠকাসনে, অন্য মানুষগুলোকেও এ'বার মুক্তি দে।

ইতি তোর মা"।

আমেরিকায় টিনটিন


সাধারণত টিনটিনের সে বইগুলোই বারবার পড়া হয় যে'গুলোতে ক্যাপ্টেন হ্যাডক আর প্রফেসর ক্যালকুলাসের জমজমাট উপস্থিতি রয়েছে৷ কাজেই বাদ পড়ে যায় শুরুর দিকের বইগুলো।
এ'বারে বেশ ডিসিপ্লিন নিয়েই শুরু করলাম 'টিনটিন ইন আমেরিকা' থেকে (ইন দ্য ল্যান্ড অফ সোভিয়েতসটাকে কিছুতেই যেন এই সিরিজের অংশ বলে মনে হয়না)। যেমনটা হয় আর কী; বরাতজোর আর দুঃসাহস মিশিয়ে জবরদস্ত টনিক। প্রতি দু'মাস অন্তর একবার করে পড়লেও 'আরিব্বাস' গোছের ব্যাপার মনে হবেই।
ভাবছি প্রতিটা বই পড়ে সেগুলোর নন-টিনটিন হাইলাইটগুলো (যা আমার মনে ধরেছে তা নোট করে রাখব)৷ এই বইতে যেমনঃ
১। তেলের খোঁজ আমেরিকান ব্যবসায়ীদের মাথা যে কী খতরনাক ভাবে ঘুরিয়ে দেয়, তার একটা absurd অথচ ট্র‍্যাজিক ছবি আঁকা আছে বইতে। তেলের খোঁজ পাওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যে তেল কোম্পানির লোকজন ছুটে এলো, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁদের অফিস বসে গেল, বিদেয় হল ওখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা আর পরের দিন দেখা গেল সেখানেই রয়েছে এক মস্ত শশব্যস্ত শহর। হাইক্লাস ডিলাগ্র‍্যান্ডি, ডীপ পুঁদিচ্চচেরি।
২। শার্লক হোমসের 'ডিডাকশন'-ক্ষমতা অনুকরণ করে কম গোয়েন্দাকাহিনী লেখা হয়নি৷ হয়ত সে সমস্ত গোয়েন্দাদের নিয়ে মস্করা করেই হার্জ সাহেব এক দুর্দান্ত হোটেল-গোয়েন্দার ছবি এঁকেছেন৷ ভদ্রলোকের ডিডাকশনগুলো যেমন ভুলভাল, তাঁর কনফিডেন্স-লেভেল ততটাই আকাশ ছোঁয়া। সে গোয়েন্দার গপ্প পড়ে দমফাটানো হাসির খপ্পরে পড়তে হল বটে, কিন্তু নিজেদের ফেসবুক কমেন্ট্রির সঙ্গে ভদ্রলোকের ডিডাকশন প্রসেসের খানিকটা মিল আছে দেখে কিছুটা লজ্জাও পেলাম।
৩। বইয়ে এসেছে মব-লিঞ্চিং প্রসঙ্গ৷ তৌবা। আর ইয়ে, রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা এবং অটোমোবাইল সেক্টরের ফাঁপরে পড়ার গল্প। তৌবা তৌবা। না না, অ্যার্জে মোটেও কাউকে খোঁটা দিয়ে কিছু লিখতে চাননি, আমাদের মনই কুচুটে হয়ে গেছে। কিন্তু এ'সব পড়ে ফিকফিকিয়ে হাসা যায়, ফিচফিচিয়ে সামান্য কাঁদলেও কারুর কিছু বলার নেই।

পাহাড়ের দুই

১। 

- কেমন বুঝছ মামা?
- থ্রিলিং! চমৎকার! মনে হচ্ছে চট করে দু'লাইন কবিতা লিখে ফেলি।
- সেরেছে। দেখো, ভেসেটেসে যেও না।
- এখানেই যদি থেকে যেতে পারতাম রে...।
- রোব্বারে এ'খানে পাঁঠার দোকান পাবে বলে মনে হয়?
- সে'টা একটা ইয়ে বটে..কিন্তু তাই বলে..। বাদ দে..পোয়েটিক মুডে দিলি ঢেলে কেরোসিন। চ' ব্রেকফাস্টটা সেরে নিই।
- আজ জলখাবারে কী আছে জানো?
- লুচি? রিমোট জায়গায় বোধ হয় আলুরদম ডিমান্ড করাটা অনুচিত; তেমন ভাবে কষাতে পারবে না। ওই আলুভাজাতেই কাজ চালিয়ে নেব।
- লুচি? আলুভাজা?
- ভ্যাকেশন। ব্রেকফাস্ট। লুচি থাকবে না?
- হেহ্।
- লুচি নয়?
- ম্যাগি। সাবস্টিটিউট বলতে ছাতু।
- না রে, দিনদুয়েকের মধ্যে ফিরতে হবে দেখছি..।

২। 

- গাধাগুলোকে দেখে বড্ড হিংসে হচ্ছে রে।
- সে কী মামা!
- অবাক হওয়ার কী আছে। জীবনটা ওদেরও থোড়ে বড়িতে কাটছে, আমাদেরও। এ চক্র থেকে ওদেরও নিস্তার নেই নেই, আমাদেরও নেই। শুধু..।
- শুধু?
- শুধু এদের বাসে ট্রেনে ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে হদ্দ হতে হয়না। অটোর লাইন নেই। গড়িয়াহাটে দরদাম করে হদ্দ হওয়া নেই..।

জ্যানেট রিজভির লাদাখ


ট্র্যাভেলার হিসেবে আমি একশোয় তেরো পাবো কিনা সন্দেহ। ঘুরতে গিয়ে বাড়ির আরাম খুঁজি, জিনিস হারাই, নেটফ্লিক্স/প্রাইমে ডাউনলোড করা সিনেমা সিরিয়াল দেখি, বই পড়ি; মোদ্দা কথা ছুটির দিনে বাড়িতে বসে অন্য কিছু করি বলে তো মনে হয়না।
তবু বছরে কি দেড়-বছরে একবার; প্রায় হপ্তাখানেকের জন্য সপরিবারে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই আর কয়েক হাজার বেকায়দা ভাবে তোলা ফটোতে মোবাইল বোঝাই করে বাড়ি ফিরি। এই যেমন এ'বারে গেছিলাম লাদাখে। শ্বেতার তত্ত্বাবধানে পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার একটা বড় সুবিধে হল যে সে "হোম-স্টে"গুলো জোগাড় করে বেশ দেখেশুনে। রহিসি না থাক, সে'সব জায়গায় আরাম আর উষ্ণতার অভাব থাকেনা।
তা এ'বারের ঘোরাঘুরির একদম শেষের দিকে দিন দেড়েকের জন্য আমরা ছিলাম পশ্চিম লাদাখের হেমিস-শুকপাচান বলে একটা গ্রামে। সে'খানে উঠেছিলাম শেরিং তোন্ডুপ নামগ্যালের বাড়িতে (বাংলা বানানে লিখতে গিয়ে ফোনেটিক্সে গোল পাকালাম কিনা কে জানে)। ভদ্রলোকের বয়স সত্তর বাহাত্তর; মিষ্টভাষী এবং সদালাপী, মামার ভাষায় "ভারী মাই ডিয়ার মানুষ"। ভদ্রলোক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন, চাকরী থেকে অবসর নিলেও আশেপাশের মানুষকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নেওয়ার অভ্যাসটুকু ত্যাগ করেননি। সন্ধ্যে নাগাদ তাঁর ডাইনিং হলে বসিয়ে দিব্যি একটা ছোটখাটো লেকচার দিয়ে দিলেন লাদাখ অঞ্চলের ইতিহাস এবং সংস্কৃতির ব্যাপারে। ভদ্রলোক এই বয়সেও 'কিউরিওসিটি'তে ভরপুর; কলকাতা নিয়ে তার পালটা প্রশ্নও কম প্রশ্ন ছিল না। কিন্তু দেখা গেল ভদ্রলোক লাদাখ সম্বন্ধে যতটা জানেন, আমি বাংলা বা কলকাতা সম্বন্ধে তার সিকিভাগও জানিনা। গল্পগুজব শেষে ভদ্রলোক নিজের বইয়ের শেলফ থেকে আমায় একটা বই ধার দিলেন; লাদাখের ইতিহাসের ওপরই, পাতলা বই, একদিনের মধ্যে নিশ্চিন্তে পড়ে শেষ করে ফেলা যায়। লাদাখ (এবং ওই হেমিস শুকপাচান গ্রামটা) এতটাই সুন্দর যে আমার মত গাম্বাট মানুষও মাঝেমধ্যেই 'আহা কোথায় এসে পড়লাম' বলে গলে পড়ছি। তাছাড়া ঘোরার পথে বিভিন্ন গোম্পা দেখেটেখে স্বাভাবিক ভাবেই জায়গাটার ইতিহাস সম্বন্ধে একটু আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। কাজেই তোন্ডুপ সাহেবের দেওয়া বই সাগ্রহে গ্রহণ করে জোড়া-কম্বলের তলায় সেঁধোলাম। বইটা যথাসময়ে শেষ করতে পেরেছিলাম।
জ্যানেট রিজভির লেখা "লাদাখ, ক্রসরোডস অফ হাই এশিয়া" সম্বন্ধে দু'চারটে কথা:
১। আমি বইটার ১৯৮৯ এডিশন পড়েছি। প্রথম প্রকাশ সম্ভবত তিরাশিতে। কিন্তু বইটার মূলে যেহেতু রয়েছে লাদাখের ইতিহাস এবং কালচার; সেহেতু পুরনো এডিশন বলে তেমন একটা হোঁচট খেতে হয়নি। লেখিকার ভাষার সারল্য মনে ধরেছে; স্যাম্পল হিসেবে প্রথম আট দশ পাতা পড়ে সহজেই ঠিক করে নিলাম যে এ বই টানা পড়ে শেষ করতেই হবে।
২। লাদাখের ভূগোল, ইতিহাস, সংস্কৃতি; এ সমস্ত নিয়েই এই বই। প্রাইমার হিসেবে অতুলনীয় বলেই মনে হল। আজকাল গুগল সহজলভ্য ইনফরমেশনে ভরপুর; এ যুগে দাঁড়িয়ে ৩৫/৩৬ বছর আগে লেখা এমন বিষয়ের একটা বইকে "রেলেভ্যান্ট" আর "এনরিচিং" মনে হওয়াটাই একটা চমৎকার ব্যাপার।
৩। পাহাড়ে ঘেরা এই নিরিবিলি প্রান্তরে বসে রাজরাজড়ার ইতিহাস, পলিটিক্স, যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে পড়তে পড়তে গোটা ব্যাপারটা বেশ সাররিয়াল ঠেকে। তিব্বতের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে ডোগরাদের আক্রমণ থেকে পশমিনা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া; এ সমস্ত মিলে তিব্বতি রাজাদের (ও তাঁদের প্রজাদের) কম হ্যাপার সামলাতে হয়নি। সে ইতিহাস ক্ষেত্র বিশেষে জটিলও বটে। লেখিকা সেই আপাত-জটিল ইতিহাস খুব সহজ ভাবে আর স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করেছেন, বলেছেন কাশ্মীর বা বাল্টিস্তানের সঙ্গে লাদাখের যোগাযোগ ও বিচ্ছেদের কথাও।
৪। বইয়ের অন্যতম জরুরী অংশ হল তিব্বতের সঙ্গে লাদাখের যে আত্মার যোগ; সেটুকুর ইতিহাস আর বর্তমানকে তুলে ধরা। আর সেই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে লাদাখি বৌদ্ধধর্মের প্রসঙ্গ, তিব্বতের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ এবং সূক্ষ্ম অমিলগুলো। চমৎকার ভাবে আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন গোম্পা, তাদের ইতিহাস ও স্থাপত্য।
৫। আমার মতে এ বইয়ের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হল লাদাখের সাধারণ মানুষের জীবনধারা নিয়ে লেখা অধ্যায়গুলো। তাঁদের খাবারদাবার, কালচার, পোশাক, দৈনন্দিন জীবনের সারল্য, গ্রাসাচ্ছাদনের লড়াই এবং আধুনিকতার (ভালো ও মন্দ) প্রভাব; এই সমস্তই বড় চমৎকার ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
লাদাখের প্রত্যন্ত গ্রামে বসে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে এই বই পড়ার অভিজ্ঞতাটা সত্যিই অনন্য। বইটা লাদাখ সম্বন্ধে আমার আগ্রহ এতটা উস্কে দিয়েছিল যে ফেরার পথে লেহ্‌ শহরের একটা জমকালো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরেছিলাম লাদাখ সম্বন্ধে আরও ভালো কিছু বইয়ের খোঁজ করতে। লাদাখের ওপর সবচেয়ে ভালো বই কী আছে জিজ্ঞেস করাতে দোকানি-মশাই নির্দ্বিধায় জানালেন;
"সব সে পপুলার অউর সব সে অথেন্টিক বুক অন দিস এরিয়া; জ্যানেট রিজভি কা লাদাখ"।

থ্রিলিং


- কী রে!
- আরে সুশান্তদা যে..।
- কদ্দিন পর তোকে পাড়ায় দেখছি রে দীপু, ফিরলি কবে?
- আজ সকালেই।
- পুজোয় এলিনা এ'বারেও...।
- যথারীতি, ছুটিই পেলাম না।
- বাঙালিকে পুজোয় বাড়ি ফিরতে না দেওয়ার ব্যাপারটা কন্স্টিটিউশন অ্যালাউ করে?
- হেহ্।
- অবিশ্যি পুজোয় তোদের ব্যাচের কাউকেই দেখিনি এ'বার...সবাই আজকাল এক্কেবারে শশব্যস্ত..তাই না রে?
- তোমার খবর কী সুশান্তদা?
- আমি অঙ্কের টিউশনি করা মাস্টার। মাস্টারি করেই হেঁদিয়ে মরা ছাড়া আর গতি কী বল।
- মনে আছে সুশান্তদা, দামোদরের ও'দিকে যে'বার পিকনিক করতে গেছিলাম; মাংস রান্নার ফাঁকে তুমি প্রবাবিলিটি বুঝিয়েছিলে আমাদের?
- ব্যাপারটা যে তুই মনে রেখেছিস, সে'টাই বড় কথা। যাক, দেখা যখন হয়েই গেল; দু'পা এগোনো যাক। এখন রাত সাড়ে ন'টা, কাজেই রাজেনদার দোকান এখনও খোলা আছে। একটা করে রোল খাওয়া যাক বরং? নাকি মাংসের চপ?
- তোমার রোল। কিন্তু আমার রুটিনে কিন্তু হাফপ্লেট চাউমিনই পড়ে। ডিম দিয়ে। সঙ্গে এক্সট্রা লঙ্কাকুচি।
- তাই হবে।
- আর হ্যাঁ। একসময় তোমার ছাত্রদের কম রোল-চাউমিন খাওয়াওনি রাজেনদার স্টল থেকে। এখন আমরা কিছুটা হলেও লায়েক হয়েছি। আজ কিন্তু আমি খাওয়াব সুশান্তদা।
- বহুত খুব শাহজাদা দীপক, বহুত খুব।
***
সুশান্তদার এগরোল চেবানোর দৃশ্যটা দীপুর যে কী ভালো লাগছিল। লোকটা আগের চেয়ে অনেকটা বুড়িয়ে গেছে কিন্তু মেজাজটা আগের মতই দরাজ। নিজের হাফ প্লেট চাউমিন শেষ হতেই রাজেনকাকুকে খান চারেক মাংসের চপ ভাজতে বলে দিল দীপু।
বাতাসে মৃদু ঠাণ্ডার স্পর্শ এসে পড়েছে, সদ্য কড়াই থেকে তোলা মাংসের চপগুলো যখন রাজেনকাকু তাঁদের সামনে রেখে গেল তখন দীপু নিজের জিভের ডগার চনমনটা টের পেল। ছাতিমের গন্ধের সঙ্গে ওই রাজেনকাকুর স্পেশ্যাল মাংসের চপ ভাঙা ধোঁয়া মিলে তখন তার মাথার মধ্যে একটা ভালোলাগা রিমঝিমে ভাব।
সুশান্তদা ততক্ষণে সাহিত্য আর জ্যামিতির মেলবন্ধন নিয়ে কিছু একটা বলতে শুরু করেছিল; কিন্তু দীপু ব্যাপারটাকে ঠিক হৃদয়ঙ্গম করতে পারছিল না। যদিও সে সুশান্তদার কথাগুলো বেশ মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছিল, কথাগুলো শুনতেও খারাপ লাগছিল না। সুশান্তদার হাত নেড়ে, চোখ গোলগোল করে কথা বলার স্টাইলটাও পাল্টায়নি। দিব্যি লাগছিল দীপুর।
তবু সুশান্তদার কথার মাঝেই দীপুকে ফুট কাটতে হল।
- সুশান্তদা..।
- কী?
- একটা কথা বলার ছিল।
- বলে ফেল..। 
- তোমার কাছে পড়ার সময়..ইয়ে...মানে...মানে..আমি মাঝেমধ্যে তোমার মাসমাইনের টাকা থেকে তিরিশ বা চল্লিশ টাকা সরিয়ে নিতাম। তুমি কোনোদিন টাকা গুনে নিতেনা তাই...আমি, মন্টু, বিপুল, রণজিৎ; আমরা সবাই মাঝেমধ্যে টাকা সরাতাম...আর সেই সরানো টাকা গোটাটাই খরচ হত রাজেনকাকার রোল চাউমিনে।
- হা হা হা হা হা..।
সুশান্তদার অট্টহাসি বহুক্ষণ ধরে চলল। দীপুকেও সে হাসিতে যোগ দিতেই হল। বহুদিন ধরে এই খুচরো অপরাধবোধটা বয়ে বেড়াচ্ছিল সে; টিউশনির মাইনে থেকে টাকা সরানো তো এক ধরনের চুরিই। ছেলেবেলায় এ নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামালেও, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে মনের মধ্যে বেশ একটা খচখচ তৈরি হয়েছে। নেহাত সুশান্তদা নিপাট ভালোমানুষ, কিন্তু তাই বলে এমনভাবে তাঁকে ঠকানো? এত বছর পরেও সে অপরাধবোধটুকু উড়িয়ে দিতে পারেনি দীপু। কিন্তু আজ সুশান্তদার ওই প্রাণখোলা হাসির ঝাপটায় দীপুর বুকের ওপরে রাখা পাথরটা সরে গেল; সুশান্তদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেও হেসে উঠল।
আর তখনই ভেসে এলো রাজেনকাকার কণ্ঠস্বর। রাত তখন সোয়া দশ, দোকানের বেঞ্চি আর রাস্তা দু'টোই শুনশান।
- কী ব্যাপার রে দীপু, তখন থেকে দেখছি একাএকা বিড়বিড় করছিস, এখন আবার অকারণে হাসছিস। নেশাভাংটাং করেছিস নাকি?
- ধুস। না। জানো রাজেনকাকা, আচমকা বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করছি।
- নিশ্চিন্ত? কে জানে বাবা। তা, আর কিছু নিবি? এ'বার ঝাঁপ বন্ধ করব।
- না, কাজ হয়ে গেছে। আমিও উঠি। কত হল?
- হাফ ডিম চাউমিন, একটা ডবল এগরোল আর চারটে মাংসের চপ। সব মিলে একশো দশ।
- এই যে।
- বহুদিন পর পাড়ায় দেখলাম তোকে দীপু।
- ছুটিটুটি পাই কোথায় যে আসব। আচ্ছা রাজেনকাকা, তোমার সুশান্তদাকে মনে পড়ে?
- অঙ্ক মাস্টার? আহা, বড় ভালোমানুষ ছিল৷ সবই অদৃষ্ট। নইলে অমন জলজ্যান্ত লোকটা সাপের কামড়ে পট করে...। হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই সে...। ইশ্। গতবছর পর্যন্ত রোজ সন্ধেবেলা এই বেঞ্চিতে এসে গ্যাঁট হয়ে বসে কত গল্প করেছে। রোজ। আর নিয়ম করে রোজ ডবল এগরোল। রোজ।
- তোমার এগরোলের টান যে অসীম রাজেনকাকা।
হেঁয়ালিপূর্ণ কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর ব্যাপারে রাজেনকাকার কোনোদিনই আগ্রহ নেই। কাজেই দীপুর কাছে সে জানতে চাইল না যে "এগরোলের অসীম টান" ব্যাপারটা কী। অবশ্য জানতে চাইলেও দীপু তাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারত কিনা কে জানে।
রাজেনকাকার দোকান থেকে বেরিয়ে শুনশান অন্ধকার রাস্তায় এসে দাঁড়ালো দীপু। সুশান্তদার কাছে নিজের দোষ স্বীকার করতে পেরে সে সত্যিই নিশ্চিন্ত বোধ করছে আজ।
তাছাড়া; এর আগে নিশ্চয়ই কেউ কোনোদিনও এগরোলকে প্ল্যানচেটের মিডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করে উঠতে পারেনি! প্ল্যানচেটের দুনিয়ায় একটা যুগান্তকারী ঘটনা আজ ঘটেছে তারই হাত ধরে; 'থ্রিলিং' শব্দটা বার তিনেক আউড়ে নিল সে।

দু'টুকরো

১। 
Image may contain: sky, cloud and outdoor
পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরী দু'টো টানঃ
বহুবার পড়া কোনো বই ফের তাক থেকে নামিয়ে দু'পাতা পড়ার ইচ্ছে।
আর

শত ব্যস্ততার মধ্যেও আচমকা ছাতে থেকে ঘুরে আসার হুজুগ।

২। 

Image may contain: food

একটা শুধু ডিমরুটির ফটোর অ্যালবাম তৈরি করার বড় ইচ্ছে। ফেসবুক বা গুগলফটোজের 'না ছুঁই পানি' গোছের ফটো অ্যালবাম নয়; রীতিমতো চামড়ায় বাঁধানো অ্যালবাম যা বইয়ের তাকে রাখা থাকবে।

ডিমপাউরুটির সঙ্গে যে কত পরিচিত জায়গা, মুহূর্ত আর মানুষ জড়িয়ে আছে;
সেই অ্যালবামের স্মৃতিসুবাস শিউলিকে হার মানাবে।

Monday, November 11, 2019

রাজেশ খন্নাঃ দি ফেনোমেনন

Image may contain: 1 person, smiling, text
বলিউড বিষয়ক কোনো বই পড়তে হলে আমি সোজাসুজি দীপ্তকীর্তিদার লেখা বা ওঁর রেকমেন্ড করা বই/লেখা পড়ি আজকাল৷ ওঁর কথা শুনেই ইয়াসের উসমানের লেখা সঞ্জয় দত্তর জীবনীটা পড়ি, দিব্যি লেগেছিল৷ সদ্য শেষ করলাম উসমানেরই লেখা রাজেশ খান্নার বায়োগ্রাফি৷

বলিউডি তারকাদের বিষয়ে কিছু পড়ার ক্ষেত্রে একটা বড় অসুবিধে হচ্ছে যে মাঝেমধ্যে গসিপ আর ফ্যাক্ট গুলিয়ে ব্যাপারটা একটা প্রমাণ সাইজের চুটকি হয়ে দাঁড়ায়। কপাল ভালো যে উসমানের লেখায় চমৎকার 'ফ্লো' থাকলেও তা কখনই গসিপ কলমের মত মনে হয়না৷ এর একটা বড় কারণ হচ্ছে যে ভদ্রলোক প্রবল নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিটা ঘটনা এবং মন্তব্যের সোর্স কোট করে যান আর সে'টা করেন এমন মুন্সীয়ানার সঙ্গে যে পড়তে পড়তে হোঁচট খেতে হয়না; বরং কোন "সোর্সের" বিশ্বাসযোগ্যতা ঠিক কতটা সে'টা পাঠক হিসেবে নিজের বোধবুদ্ধি অনুযায়ী দিব্যি বিচার করে নেওয়া যায়৷ উসমানের রিসার্চে আলস্য নেই এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তার লজিক-বোধ এবং 'ইনফারেন্স'গুলোর সঙ্গে সহজেই একমত হওয়া যায়৷

এ'বার আসি এই বইয়ের প্রসঙ্গে৷

এক৷
রাজেশ খন্না; "দি ফেনোমেনন"৷ রাজেশ খন্নার ওপর যে কোনো বই তাঁর কেরিয়ারের এই দিকটাকে কতটা সার্থক ভাবে তুলে ধরছে তার ওপর সে বইয়ের গুরুত্ব অনেকটাই নির্ভরশীল৷ এ ক্ষেত্রে ইয়াসের উসমান চমৎকার ভাবে যতীন খন্নার " রাজেশ" হয়ে ওঠার থ্রিলিং গল্পটা বলেছেন৷

দুই৷ " দ্য এনিগমা"৷ রাজেশ খন্নার মত রীল আর রিয়েল গুলিয়ে ফেলতে বোধ খুব বেশি মানুষ পারেননি৷ আর অন্ধের হাতি চেনার মত বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে রাজেশকে দেখেছেন, সেই "দেখা" গুলোকে রিকনসাইল করতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়; তবে উসমান জবরদস্ত চেষ্টা করেছেন৷ সঞ্জীববাবুর একটা রম্যরচনায় পড়েছিলাম প্রত্যেক মানুষ ভাবে "আমায় কেউ চিনল না, কেউ বুঝল না"৷ রাজেশ খন্নার ক্ষেত্রে এই হাহাকারটা যতটা সুগভীর , ততটাই যন্ত্রণার৷ এই হাহাকারকে যতটা সম্ভব মেলোড্রামা এড়িয়ে তুলে ধরতে পেরেছেন উসমান৷

তিন৷ আগাসির বায়োগ্রাফিতে একটা চমৎকার ব্যাপার তুলে ধরা হয়েছে৷ যে 'এক নম্বর র‍্যাঙ্ক'কে জীবনের ধ্রুবতারা বলে মনে হয়েছিল আন্দ্রের, সে'খানে পৌঁছে আচমকা বড় অসহায় আর একা হয়ে পড়েছিলেন তিনি৷ তাঁর আত্মজীবনীর একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সেই অসহায়তার গল্প৷ সেই অসহায় আগাসি বারবার অন্ধকারের মুখোমুখি হয়েছেন কিন্তু হারিয়ে যাননি৷ সে'দিন থেকে রাজেশ খন্নার কেরিয়ার কার্ভ বোধ হয় সম্পূর্ণ উলটো খাতে গড়িয়েছে৷ সাফল্য দড়াম করে এসেছে রাজেশের জীবনে আর সে সাফল্য এমন এভারেস্ট গোছের যে তা ছিল রাজেশেরও কল্পনাতীত; কারণ সেই স্তরে এর আগে কেউ কোনোদিনও পৌঁছতে পারেনি৷ এবং সেই সাফল্য ভাসিয়ে নিয়েছিল ভদ্রলোককে, সে ভেসে যাওয়া এতটাই নিদারুণ যে আর ফিরতে পারেননি তিনি৷ কিন্তু ভেসে যাওয়াটুকুই রাজেশের জীবনের শেষ কথা নয়; এ'টুকু স্বস্তির রেশ পাঠকের মনে রেখে যেতে পেরেছেন লেখক।

চার৷ যে কোনো বায়োগ্রাফিতে "অ্যানেকডোট কোয়ালিটি" খুব জরুরী৷ এ বই সে'দিক থেকে হতাশ করেনা৷ রাজেশবাবুর জীবনের যাবতীয় সম্পর্ক আর তাঁর একাকিত্ব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই জীবনীতে৷ রাজেশ খন্নার জীবনের বিভিন্ন সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে সিনেমা বিষয়ক খুব চমৎকার কিছু ট্রিভিয়া রয়েছে এ বইতে৷ কী ভাবে একটা ইন্ডিয়ান আইডল মার্কা ট্যালেন্ট হান্ট রাজেশের জীবন পালটে দিয়েছিল? শুটিং শুরুর আগেই আরাধনা ভেস্তে যেতে বসেছিল কী ভাবে? বাওয়ার্চি ছবির শুটিংয়ের সময় জয়া ভাদুড়ি রাজেশবাবুর প্রতি বিরক্ত বোধ করেছিলেন কেন? নমকহারাম সিনেমার ক্লাইম্যাক্স কীভাবে পাল্টাতে হয়েছিল রাজেশ খন্নার জেদের বশে আর তা কী ভাবে 'ব্যাকফায়্যার' করেছিল? অঞ্জু মহেন্দ্রু কেন সোবার্সকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন? বিভিন্ন ছোটছোট ঘটনা মিলিয়ে মিশিয়ে দিব্যি দাঁড় করানো হয়েছে এই বায়োগ্রাফি যা যে কোনো বলি-ফ্যানের উপাদেয় মনে হতে বাধ্য।

পাঁচ। বল্কির নির্দেশনায় একটা বিজ্ঞাপন তৈরী করে হ্যাভেলস, তাদের ফ্যানের জন্য; বিজ্ঞাপনটা খানিকটা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। সে'টাই রাজেশবাবুর শেষ শুটিং। বইয়ের প্রায় শেষের দিকে এসে সেই বিজ্ঞাপন শুটিংয়ের ঘটনাটা বিশদভাবে বলা আছে। বইয়ের এই অংশটা পড়ে আমি ইউটিউবে বিজ্ঞাপনটা বার কয়েক দেখি আর ব্যক্তিগত ভাবে বলি; আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছে।

রাজেশ ভক্তরা চট করে এ বই পড়ে ফেলতেই পারেন।

আনএথিকাল

পুজোর আদত ক'টা দিন পাণ্ডববর্জিত এলাকায় কাটিয়ে সবে এসে পৌঁছেছি দিল্লীতে।
পাড়ার পুজো মণ্ডপে থেবড়ে বসার শখ অপূর্ণ থাকল বলে দেবীদর্শন করব না, তা কি হয়? মনস্থ করলাম এ'খানেই এ প্যান্ডেল সে প্যান্ডেল ঘুরে প্যারামাউন্টের ডাব-সরবতের স্বাদ গড়িয়াহাটের বরফলেবুজলে মেটাব।

সবে পুজো দেখতে বেরোব এমন সময় শ্বশুরমশাই গদগদ সুরে জানতে চাইলেন;
"ডিনারটা তো বাড়ি ফিরেই সারবে নাকি"?

এমন আনএথিকাল প্রশ্ন শুনে থমকে গেলাম। মুখের মধ্যে একটা বিশ্রী তিতকুটে স্বাদ ছড়িয়ে পড়ল। এই বয়সের একজন নিপাট ভালোমানুষ পুজোয় ঘুরতে বেরোনোর কন্সেপ্ট সম্বন্ধে অবহিত নন?
ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরে ডিনার করব?
এরপর কি আলুপোস্ত দিয়ে পাউরুটি খাব?
প্যারামাউন্টে গিয়ে মশলা দোসার খোঁজ করব?
বর্ষা কেটে গেলে আনন্দমেলা পুজোসংখ্যা পড়ব?
লর্ডসের ব্যালকনিতে জোব্বা পরা সৌরভকে দেখে বাহবা দেব?

Tuesday, October 22, 2019

সহদেবের আশীর্বাদ

বৈঠকখানার ঢাউস মানুষ সমান জানালাটার শিকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সহদেব৷ ঘরের বাতি নেভানো ছিল, তা'বলে অবশ্য ঘরের মধ্যে আলোর অভাব ছিল না৷ জানালার ও'পাশে বড় রাস্তা, এমনিতেই কলকাতায় রোশনাই আর হৈচৈয়ের অভাব নেই আর এই পুজোর দিনগুলোয় তো শহরের সমস্ত রাস্তাঘাট আলো আর অজস্র শব্দের ঢেউয়ে ভেসে যায় যেন৷
বছরের এই সময়টাতেই বাড়ির সকলে ঘুরতে বেরোয়; কোনোবার পাহাড়, কোনোবার সমুদ্র, কখনও জঙ্গল৷ তাঁরা ফিরে এলে সে'সব জায়গার চোখ ধাঁধানো সমস্ত ছবি দেখেন সহদেব; মনের ভিতর থেকে আপনা হতেই বেরিয়ে আসে "বাহ্, জব্বর"! গৃহকর্তা সুব্রতবাবু সহদেবকে সবিশেষ স্নেহ করেন, তাঁদের সম্পর্কটা ঠিক বাবু আর পরিচারকের নয়; সে'টা সহদেবও বুঝতে পারে৷ তাঁদের সম্পর্কটা তো আজকের নয়; একসময় সুব্রতবাবুর মা একসঙ্গে দু'জনকে হর্লিক্স গুলে খাইয়েছেন, সুব্রতবাবুর বাবা কম চেষ্টা করেননি সহদেবকে লেখা পড়া শেখাতে৷ কিন্তু স্বভাবে চটপটে হলেও লেখাপড়ার ব্যাপারটায় কোনোদিনই ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারেননি সহদেব৷ সবার কি সব হয়? এই না হওয়াগুলো নিয়ে কোনো দু:খ পুষে রাখেননি তিনি৷
সুব্রতবাবু মাঝেমধ্যেই অবশ্য ইচ্ছে প্রকাশ করেন পুজোর ছুটিতে সহদেবকে বগলদাবা করে ঘুরতে বেরনোর৷ কিন্তু এত বড় বাড়ি এতদিনের জন্য ফাঁকা ফেলে যাওয়াটা বেশ ঝুঁকির ব্যাপার৷ অবশ্য এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও এক রাতের বেশি কাটাতে সহদেবেরই কেমন অসোয়াস্তি লাগে৷ চোদ্দে বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর মনসাপুর গ্রাম ছেড়ে এ বাড়িতে এসে উঠেছিলেন, তারপর থেকে এ বাড়ির বাইরে দিন দুয়েকের বেশি কখনও কাটিয়েছেন বলে মনে পড়ে না৷ ছুটি কাটিয়ে ফিরে সুব্রতবাবুর নয় বছরের ছেলে টিপু চোখ বড় করে হাত পা নেড়ে তাঁকে ঘোরার গল্প করবে আর খুন্তি নাড়তে নাড়তে সহদেব সে'সব গল্প গিলবেন; সে'টাই বরং বেশি মজার৷
বাড়ি ফাঁকা থাকলে অবিশ্যি রান্নাবান্নার দিকেও বিশেষ মন থাকেনা সহদেবের৷ ভাতেভাত খেয়েই বেশির ভাগ দিন কেটে যায়৷ তার চেয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেই তাঁর ভালো লাগে৷ কত মানুষ, কত হাসি, কত আনন্দ৷ বাতাস ভারী হয়ে থাকে ভাজাভুজির গন্ধে৷ বাড়ি থেকে কয়কশো পা হেঁটেই খান দুয়েক পেল্লায় পুজো৷ দিনে একবার সে'খান থেকে ঘুরে আসেন সহদেব, এমন ভীড় তাঁর নেহাত মন্দ লাগে না৷ এত মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করছে, তাদের হাসি হৈহৈ, লাইন দিয়ে প্যান্ডেলে ঢোকা, তাদের মোবাইল ক্যামেরা খচরখচ, খাওয়ার দোকানের স্টলগুলোর সামনে জমাটি ভীড়; এ'সব কিছুই বড় ভালো লাগে সহদেবের৷ সহদেব মনে মনে ভাবে; আহা রে, এ'দের কতজনের মনের মধ্যে কত রকমের দু:খ; কারুর টাকার অভাব, কারুর সম্পর্ক ভেঙেছে, কারুর প্রিয়জনের বিষম অসুখ, কারুর ভাগ্যে অনবরত শনি ঘুরপাক খাচ্ছে; কিন্তু এই পুজোর যাবতীয় রোশনাই আর শব্দে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়তে কসুর করছে না৷
টিপুর একটা কথা সহদেবের কানে বড় মিঠে সুরে ঠেকে; পুজোর প্ল্যান৷ পুজোর মাস তিনেক আগে থেকেই ডাইনিং টেবিলের আড্ডায় তাদের জোরদার পুজোর প্ল্যান চলে, নিজের মতের দিকে ঝোল টানতে টিপু মাঝেমধ্যেই সহদেবের সমর্থন আদায় করতে চায়.." তাই না স'দেবকাকা"? অথবা "আমি ঠিক বলছি তাই না স'দেবকাকা? বলো না বাবা মাকে...এ'বার পুজোয় আমরা প্রতিদিন শুধু চাইনিজ খাব"৷ সহদেব বরাবর না হেসে সমর্থন জানান৷

রাস্তায় উপচে পড়া মানুষের ভিড় দেখে "পুজোর প্ল্যান" কথাটা মাঝেমধ্যে মনের মধ্যে আউড়ে থাকেন সহদেব৷ এই সমস্ত মানুষের "পুজোর প্ল্যান" আছে৷ সহদেব নিজে ভক্ত মানুষ, সকালে ঠাকুরকে প্রসাদ না দিয়ে নিজে জলস্পর্শ করেন না৷ কিন্তু এই জানালার শিকে মাথা রাখতে রাখতে সহদেবের মাঝেমধ্যে মনে হয় 'পুজোর প্ল্যান' ব্যাপারটা বোধ হয় ভক্তির চেয়ে কম গুরুতর নয়৷

রাস্তার ভিড়ে খুড়কুটোর মত ভাসতে থাকা প্রতিটি মানুষের পুজোর প্ল্যান আছে, সমস্ত জ্বালা যন্ত্রণা পেরিয়েও কত মানুষ পুজোর প্ল্যান কষার ধক রাখেন৷ সংসারহীন সহদেবের চোখ স্নেহে ছলছল আসে, "আহা রে, দু'চারদিন বই তো নয়"৷

এক সপ্তমীর দিন বিকেলে মা মারা গেছিলেন, তখন অবিশ্যি সহদেব বেশ ছোট, বয়স বছর পাঁচ হবে৷ দু:খের চেয়েও বুকে বেশি বেজেছিল ভয়; কীসের ভয় তা সে বয়সে ঠিক ঠাহর করতে পারেননি৷ সাদা চাদরে মোড়া মায়ের সে চেহারা আজও তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাঝেমধ্যে, আর বুকের মধ্যে ভেসে ওঠে সেই অজানা ভয়ের গন্ধ৷ সেই পুজোর বাকিদিনগুলো সহদেব বাবার গায়ের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে রেখে কাটিয়েছিলেন৷
বাবা৷ বাবার স্মৃতি বরং সহদেবের মনে অনেকটা স্পষ্ট৷ বাবার ময়লা ফতুয়া, গায়ের সেই মাটি মাখানো গন্ধ, সেই সশব্দ আকাশ কাঁপানো হাসি; সে সবকিছুর মধ্যেই ফেলে আসা মনসাপুর মেশানো৷ যদিও তখন সহদেব " পুজোর প্ল্যান" কথাটা ঠিক শেখেননি, তবে পুজোর চারদিন বাবার হাত ধরে শালিকগঞ্জের মেলায় ঘোরাটা প্রায় নিয়মের পর্যায় পড়ত৷

বাবা৷ সহদেবের সমস্ত আগডুম বাগডুম গল্প মন দিয়ে শোনা বাবা৷ সহদেবের প্রিয় কচুর শাক রান্না করে এক থালা ভাত মেখে দেওয়া বাবা৷ সহদেবকে ঘুড়ি ওড়াতে শেখানো বাবা৷ মায়ের মত বাবা৷ সেই বাবাও মাত্র আড়াই দিনের জ্বরে চলে গেছিলেন পুজোর মধ্যে, অষ্টমীর রাত্রে৷ জ্বলন্ত চিতার মধ্যে থেকেও বাবার গায়ের মেটো গন্ধ এসে সহদেবের বুকে মিশেছিল, বহুদূর থেকে ভেসে আসছিল নবমীর সকালের ঢাকের শব্দ। সহদেবের দিব্যি মনে আছে৷

এই ঢাকের শব্দের ছ্যাঁকার জন্যেই নিজের জন্য কোনোদিনই কোনো 'পুজোর প্ল্যান' ভেবে উঠতে পারেননা সহদেব। শুধু এই ফাঁকা বাড়ির ঢাউস জানালার শিকে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে থাকেন রাস্তার দিকে। শালিকগঞ্জের মেলার ভীড়ের স্মৃতি চলকে ওঠে; পাঁপড়ভাজা আর চপের সুবাস, নাগোরদোলার ক্যাঁচরক্যাঁচর শব্দ বুকের মধ্যে তাজা হয়ে ওঠে।
হঠাৎ রাস্তার মাইকে হিন্দীর সিনেমার গান থেমে ঢাকের শব্দ বেজে ওঠে। জানালার শিকটাকে খামচে ধরেন সহদেব। রাস্তার মানুষগুলোর জন্য মনকেমন করে; কত না পাওয়া, কত যন্ত্রণা, কত ছটফট পুজোর প্ল্যানের মলমে শান্ত করে মানুষ বেরিয়ে পড়ে। ভীড়ে হেঁটে হদ্দ হয়, খাওয়াদাওয়ার ছক কষে, নিজের খোকাখুকুর হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে চলে; প্রবল ক্লান্তিতেও দমে যায়না।

হঠাৎ টিপুবাবুর জন্য মনকেমন করে ওঠে সহদেবের, জানালা ছেড়ে ফোনের কাছে এসে নম্বর ডায়াল করে। টিপুবাবু তার ফোন পেলে বড্ড খুশি হয়। সহদেব মনেপ্রাণে ঠাকুরকে ডাকেন, ঢাকের বাদ্যি যেন টিপুবাবুর কানে কোনোদিনও গরম লোহার টুকরো হয়ে না ঢোকে।

ফোন সেরে ফের জানালার সামনে এসে দাঁড়ান সহদেব, ভীড়ের প্রত্যেকটা অজানা মানুষকে আশীর্বাদ করতে ইচ্ছে হয়; "কারুর পুজোর প্ল্যান যেন কোনোদিনও ফুরিয়ে না যায়, কোনোদিনও না"।
আজও ছ্যাঁতছ্যাঁতে ঢাকের শব্দের সঙ্গে বাবার গায়ের মেঠো সুবাস বাতাসে মিশে সহদেবকে অবশ করে ফেলে। জানালার শিকে ফের মাথা রেখে চোখ বোজেন সহদেব।

পথের পাঁচালী


পথের পাঁচালীকে গো-টু-বই হিসেবে এতদিন কেন ব্যবহার করিনি কে জানে। এক বন্ধু (সম্ভবত উজান) বলেছিল বুক-ক্রিকেটের মত র‍্যান্ডম পাতা উলটে যে কোনো প্যারা পড়ে ফেললেও আরাম হয়। বিভূতিবাবুর ভাষায় বৃষ্টির গল্প পড়লে খটখটে আকাশে নিচেও গায়ে জলের ছিঁটে এসে লাগে। অমন গদ্য একবার পড়া শুরু করলে আমার মত কাব্য-গাম্বাট মানুষও কবিতা আত্মস্থ করার সাহস পায়। প্লটে চালাকি চলে, কিন্তু অনুভূতি প্রকাশে চালাকি ফলালে তা হয় মাতব্বরির দিকে গড়িয়ে যায় নয়ত ন্যাকাপনায় এসে থামে। সংবেদনশীলতা, স্নেহ আর স্মার্টনেসে; "পথের পাঁচালী" অনন্য। বার বার পড়েও এক ঘেয়ে ঠেক না, অপুদের জন্য মন কেমন এতটুকুও হ্রাস পায় না।
বহুদিন পর এ বইয়ে ফেরত গেলাম। শেষ পড়েছিলাম ছেলেবেলায়; তখন অপুর দৃষ্টির বাইরে গিয়ে কোনো কিছু মাপতে পারার কথা নয়। পয়সা থাকলে অপু দিদির জন্য একটা রবারের বাঁদর কিনে দিত; এই সামান্য হাহাকার যে কী প্রবল ভালো লাগা আর মনখারাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে সময়৷ আর রথের মেলার নাম করে বাপের থেকে পয়সা নিয়ে দুর্গা তা দিয়েছিল অপুকে; জিলিপি খাওয়ার জন্য। অমন মায়ের মত দিদির কথা ভেবেও যে কী ভালো লাগে, মনকেমন করে। বইয়ের কিছু কিছু পাতা সে বয়সে যে কতবার করে
পড়েছি।

এ বয়সে ফের সে বই পড়তে বসে আলাদা করে নজরে পড়ল সর্বজয়ার কান্না, হাসি, বকুনি, আশঙ্কা আর স্নেহ। বাপ-মা হওয়ার পর এ বই পড়লে অন্য পার্স্পেক্টিভ গোচর হবে সে'টাই স্বাভাবিক। ভর সন্ধেবেলা নিজের ছেলেমেয়ের নামে শাপশাপান্ত শুনে সর্বজয়ার বুক হিম হয়ে যাওয়া আর সেই দমবন্ধ করা কষ্টটুকু এ'বারে যেন আলাদা করে দাগা দিয়ে গেল। সর্বজয়া বিশেষ লেখাপড়া করেননি, গ্রামবাংলার সারল্যে ভরপুর ; কিন্তু আধুনিক অবিশ্বাস আর শহুরে ধান্দাবাজির ডিপো হয়েও আমার মনেও সে কু-ডাক ডেকেছিল বৈকি; "এই ভর সন্ধেবেলা অমন শিশুদের নামে অমন কথা কেউ বলে? সে কুকথা যদি তাদের গায়ে লাগে"; আমারও মনে হয়েছিল। নিজের খোকার মুখ মনে পড়েছিল।
এ'বারের পড়া এখনও শেষ হয়নি। তবে পুজোর আগেই দুর্গা চলে গেলো। বছরের এই সময়ে এসে এ বই পড়াটা বেশ দলাপাকানো একটা ব্যাপার বটে।

বিশ্বকর্মা


বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটায় অন্তত কলকাতা হতাশ করেনি। বাড়ি টু অফিস আর অফিস টু বাড়ি; যাতায়াতের মধ্যে যতগুলো প্যান্ডেল পেরিয়েছি, প্রত্যেকটাই ছিল নব্বুই দশকের রঙিন গানে ভরপুর।

সবচেয়ে বড় কথা নেদু নেদু আলতো-মেজাজের শিউলি-রোম্যান্টিক গানগুলো নয়; কানে বারবার এসে ঠেকেছে 'জেহের হ্যায় কি পেয়ার হ্যায় তেরা চুম্মা'র মত মরমি সুর।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা পুজো কমিটিগুলোর প্রতি; তাদের মধ্যে বেশিরভাগই লাউডস্পীকার ভাড়া করেছেন জনগণের কানের পর্দায় পেরেক ঠুকতে চেয়ে। স্পীকারের শব্দ যত খ্যানখ্যানে তত তার মোহময় আবেদন।

একটা মনকেমনের ঢেউ বুকের মধ্যে অনুভব করেছিলাম দুপুর দেড়টা নাগাদ যখন অফিসের অনতিদূরের একটা প্যান্ডেল থেকে ভেসে এসেছিল "উফ কেয়া রাত আয়ি হ্যায়, মহব্বত রংগ লাই হ্যায়..ডম ডম ডুবা ডুবা ডুবা ডম ডম ডুবা ডুবা"। সে সুরের কী চমৎকার বাঁধুনি, কণ্ঠের সে কী মখমলে আশ্বাস। সেই গানের মায়াজালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়তে পড়তে এক্সেলশিটে একের পর এক ভুল করা আরম্ভ করলাম; তবে ঘাবড়ে যাইনি। ম্যাথেমেটিক্স হাতড়ে খোদ আইনস্টাইনই যখন তেমন কিছু করে উঠতে পারলেন না, আমি কোথাকার কে।

বিকেলের দিকে কোনো পেছন-ভেসুভিয়াস আলিমুদ্দিন-জ্যেঠু মার্কা কেউ স্যট করে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজিয়ে বসেছিল; আর যায় কোথায়, গোটা অঞ্চলের মেজাজ চটকে চ'। তবে কপাল ভালো, সে ভীমরতি সিপিএমের ডাকা বনধের মতই মিনিট দশেকের বেশি চলেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কালচারকাকুদের কাতুকুতু দিয়ে 'মস্ত মস্ত' পরিবর্তন ধেয়ে এসে লাউডস্পীকার ও চপের কড়াই ফাটিয়ে আকাশ বাতাস জয় করেছে। আমার ধারনা; 'ইয়ে দিল তেরি আঁখো মে ডুবা'র বিশল্যকরণী সুর-স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়নি কাছের হাসপাতালটাও।

বিশ্বকর্মা জিন্দাবাদ। জয় হাতুড়ি। আসছে বছর ডবল হোক।

Wednesday, September 18, 2019

মানিব্যাগ


কী গোলমালেই না পড়া গেল। তিন দিন ধরে চলেছে ব্যাপারটা। প্রথম দেড় দিন বেশ ভালোই লাগছিল সমস্ত কিছু; এমন জবরদস্ত উইন্ডফল, তা'তে প্রাণে যে ফুর্তির হাওয়া খেলে যাবে তা'তে আর আশ্চর্যের কী। 

খুলেই বলি, কেমন?

তিনদিন আগে অফিস যাওয়ার পথে বাসের ভাড়া দেওয়ার জন্য মানিব্যাগ বের করেছিলাম; একটা দশটাকার নোট বের করতে গিয়ে স্পষ্ট দেখেছিলাম মানিব্যাগে জ্বলজ্বল করছে তিনটে পাঁচশো টাকার নোট, চারটে একশো টাকা, দশ কুড়ি পঞ্চাশ টাকার কয়েকটা নোট আর কিছু খুচরো পয়সা। সব মিলে ওই হাজার দুয়েকের বেশিই হবে। তারপর গোটা দিন জুড়ে নগদ খরচাপাতি নেহাত কম হয়নি। অফিস ক্যান্টিনে লাঞ্চের জন্য কিছু খরচ হল, গুপ্তবাবুর ফেয়ারওয়েলের জন্য একটা মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হল (গুপ্তবাবু অত্যন্ত খিটখিটে, বদমেজাজি এবং পরশ্রীকাতর একজন সহকর্মী, পলিটিকাল করেক্টনেসকে উড়িয়ে দেওয়ার কলজে থাকলে ফেয়ারওয়েলটা ঠিক এড়িয়ে যেতাম), অফিসের পিওন বিশু কী একটা বিশেষ প্রয়োজনে শ'পাঁচেক টাকা ধার চেয়েছিল; আপত্তি করিনি। এ বাদেও সিগারেট বাবদ কিছু খুচরো খরচ মিলে গোটা দিনে হাজার বারোশো টাকা মত নিশ্চিত ভাবেই খরচ হয়েছিল।
অথচ বাড়ি ফেরার সময় বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি মানিব্যাগে ওই সকালের মতই দু'হাজার টাকা মত পড়ে আছে। এ'দিকে গোটা দিন আমি এটিএম-মুখো হইনি বা কেউ কোনও পাওনা টাকাও দিয়ে যায়নি। 

প্রবল অস্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরে হাত পা ধোয়ার আগেই ড্রয়িং রুমের টেবিলে মানিব্যাগ উপুড় করে সমস্ত টাকা গুনলাম; তেইশশো এগারো টাকা। মানিব্যাগের সমস্ত টাকাপয়সা তিন নম্বর বারের জন্য গুনে ব্যাপারটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেছিলাম। তবে খটকাটা এতই বিশ্রী যে তা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলা সহজ ছিল না। আর তারপর থেকে যখন আদত ব্যাপারটা ঠাহর করতে শুরু করলাম; হাত পা পেটে সেঁধিয়ে যাওয়ার জোগাড় হল।  

গত এক হপ্তা ধরে খোকাকে নিয়ে গিন্নী রয়েছে পাণ্ডুয়ায় তার বাপের বাড়িতে। আরও দিন দশেক পর তাঁদের ফেরার কথা। একার জন্য ভাত চাপাতে তেমন গা করল না। বাড়ির কাছেই মিন্টুর রুটি তড়কার দোকান; তাঁকে ফোন করে বললাম হাফ প্লেট ডিম তড়কা আর চারটে রুটি পাঠিয়ে দিতে। মন্টুর দোকানের ছেলেটা আধ ঘণ্টার মাথায় রুটি তড়কা নিয়ে হাজির, জানালে ষাট টাকা দিতে হবে। আমি মানিব্যাগ থেকে ষাট টাকা বের করে তাঁকে বিদেয় করেই আগে রাতের খাওয়াটা সেরে নিলাম। মিন্টু বড় চমৎকার বানায় এই তড়কাটা, জিভে পড়লে মনের মধ্যে জড়ো হওয়া যাবতীয় অন্ধকার সাফ হয়ে যায় যেন। প্রবল পরিতৃপ্তির সঙ্গে ডিনার সেরে একটা হালকা মেজাজের গল্পের বই নিয়ে খাটে এসে গা এলিয়ে দিয়েছিলাম। খানিকক্ষণ পর কী খেয়াল হল বিছানা থেকে উঠে গিয়ে মানিব্যাগটা নিয়ে এসে ফের টাকাগুলো বের করে গুনলাম।  রুটি তড়কার জন্য ষাট টাকা খরচ করা সত্ত্বেও পড়ে রয়েছে সেই তেইশশো এগারো টাকা। 

অস্বস্তি কাটাতে মিনিট কুড়ি ঘরের মধ্যেই পায়চারি করে কাটালাম। মাথা ঠাণ্ডা করতে নিজের জন্য একটু তালমিছরির সরবত তৈরি করলাম; সেই সরবত আড়াই গেলাস খেয়ে একটু আশ্বস্ত বোধ করেছিলাম বোধ হয়। আর যাই হোক, টাকা তো গায়েব হচ্ছে না; বরং উলটোটা। টাকা কমছে না। এ'তো শুভ সংবাদ। 

শুতে যাওয়ার আগে একটা উদ্ভট খেয়ালের পাল্লায় পড়ে একটা সামান্য অন্যায় করে ফেলেছিলাম সে'দিন, মানিব্যাগ থেকে একটা দশটাকার নোট বের করে তা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে তা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সোজা বালিশের তল থেকে বের করলাম মানিব্যাগটা। দশটাকার নোটটা কাল রাত্রে নিজের হাতে ছিঁড়েছি; কাজেই মানিব্যাগে এখন নিশ্চিত ভাবেই তেইশশো এক টাকা পড়ে থাকার কথা। কিন্তু চারবার গুনেও মানিব্যাগের রাখা টাকার যোগফল গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেই তেইশশো এগারোতে। কী বিশ্রী ব্যাপার রে বাবা। টাকার অপচয় নিশ্চিতভাবে মন্দ, কিন্তু তাই বলে এই বিদঘুটে ব্যাপারস্যাপার বরদাস্ত করা যায় না। 

তারপর থেকে পরপর দু'দিন আমি অফিস যাইনি। দু'দিন ধরে আমি মানিব্যাগ থেকে বিস্তর খরচাপাতি করে চলেছি; দরকারি অদরকারি বিভিন্ন রকমের খরচ। গড়িয়াহাটের ফুটপাথে চীনেমাটির বাসন থেকে মুদীর দোকানের চালা-আটা; যা পেরেছি কিনেছি। কিন্তু মানিব্যাগ কিছুতেই নিজেকে হালকা হতে দেয়নি। উলটো চেষ্টাও করেছি বৈকি।  এটিএম থেকে বার তিনেক টাকা তুলে মানিব্যাগে রেখেছি কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই অবস্থা যে কে সেই; কিছুতেই টাকার যোগফল তেইশশো এগারো থেকে নড়ে না। 

আজ চার নম্বর দিন। আমি এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েছি যে গিন্নীকেও ফোনে ব্যাপারটা জানাতে পারিনি। আর বলবই বা কী; ফোনে এমন সব কথা বললে হয়ত আমাকেই সে ছিটগ্রস্ত ভাববে। তার চেয়ে বরং সে ফিরে এলেই সব খুলে বলা যাবে'খন। অফিসের বড়সাহেব বার তিনেক ফোন করেছিলেন, কিন্তু কল রিসিভ করার সাহস হয়নি। মনটা বড্ড অস্থির হয়ে আছে, কা'কে যে কী বলতে কী বলে ফেলব; মাথার মধ্যে একটানা ঘুরপাক খাচ্ছে তেইশশো এগারো।

কিছুক্ষণ আগে একটা মরিয়া চেষ্টা করেছিলাম। বাড়ি থেকে মিনিট কুড়ির হাঁটাপথে গঙ্গার ঘাট, সন্ধেবেলা সে'খানে গিয়ে পকেটের মানিব্যাগটা সোজা ছুঁড়ে ফেলেছিলাম নদীতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আমি আগেভাগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলাম যেন। ঘাট থেকে সবে বাড়ি ফিরে এসেছি, অমনি টের পেলাম আমার ট্রাউজারের পকেট যেন আচমকা ভারী হয়ে পড়ল। হাত দিতেই টের পেলাম কোনও বিশ্রী জাদুবলে সে ভূতুড়ে মানিব্যাগ আমার পকেটেই ফেরত এসেছে। এ'বারে আর পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করার চেষ্টাও করলাম না, কারণ আমি জানি তা'তে ঠিক তেইশশো এগারো টাকা পড়ে আছে। 

আমি বুঝতে পারছিলাম যে যেকোনো মুহূর্তে আমার নার্ভাস ব্রেকডাউন হতে পারে। এ পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। এই তেইশশো এগারো সংখ্যাটা যেন আমায় গিলে খেতে চাইছে...আমার চোখের সামনে দুই, তিন, এক, এক মেশানো সংখ্যাগুলো নেচে বেড়াতে লাগলো। ঘরের প্রতিটা দেওয়ালে যেন গিজগিজ করছে দুই তিন এক এক লেখায়। চোখ বুজলেও সেই তেইশশো এগারো থেকে রেহাই নেই। বন্ধ চোখের নীলচে অন্ধকারে বেশ কিছু টাকার নোট আর কয়েন ভেসে যাচ্ছে যেন; আমি জানি তাঁদের যোগফল হল তেইশশো এগারো। 

অসাড় হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়েছিলাম, জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের মুখে সদ্য ওঠা গ্যাঁজলাটুকুও টের পেয়েছিলাম বোধ হয়।  

***

- এই যে...এই যে আমি...এখন কেমন বোধ করছ গো?

- মিনু...তুমি...তুমি এসেছ? তুমি আর খোকা ফিরে এসেছ?

- আহ বেশি নড়াচড়া কোরো না। ডাক্তার বলেছেন আরও অন্তত এক হপ্তা বেডরেস্ট। 

- কিন্তু তোমরা পাণ্ডুয়া থেকে কবে ফিরলে...।

- তিন দিন আগেই ফিরেছি। পাশের বাড়ির মনোজ ঠাকুরপো সময় থাকতে দরজা ভেঙে ঘরে না ঢুকলে...হয় তো আজ...।  সেই আমায় খবর দিয়েছিল। 

- আমায় শনিতে ধরেছিল গো মিনু...। তেইশশো এগারোর শনি...। আমার মানিব্যাগের তেইশশো এগারো টাকা কিছুতেই বাড়েও না আর কমেও না...সে এমন অবস্থা আমি চারদিকে দেখতে শুরু করলাম তেইশশো এগারো...ও কী, তুমি অমন করে কাঁদছ কেন?

- তুমি আমায় ক্ষমা করো গো। আমার জন্যেই আজ তোমার এই দশা...। 

- সে কী! তুমি নিজেকে দায়ী করছ কেন...। আহা...। 

- স্বীকার যে আমায় করতেই হবে। তোমার শেফালীকে মনে আছে তো? ওই যে আমার ছেলেবেলার বন্ধু...পাণ্ডুয়াতেই থাকে...। 

- ওই যার বর দিনে রেলের চাকরী করে আর রাতে তন্ত্রসাধনা? সেই বিপিন মল্লিক?

- সেই বিপিনদাই তো যত গোলমালের কারণ। আমি শুধু বলার মধ্যে বলেছিলাম আমার মনে বড় অভিমান জমে আছে কারণ আমার বর আমাদের বিবাহবার্ষিকী প্রতিবার ভুলে যায়...।

- কী? আমি...?

- প্রতিবার ভুলে যাও। বিপিনদা আমার দুঃখ শুনে বললে 'তুমি শেফালীর প্রাণের বন্ধু, আমার শ্যালিকা-স্থানীয়া। তোমার অভিমান যদি নাই ঘোচাতে পারি তবে আমার তন্ত্রসাধনার মুখে আগুন'। কিন্তু তাঁকে বিশ্বাস করে আমি কী ভুলটাই না করেছিলাম গো...। 

- বলি ব্যাপারটা কী! একটু খোলসা করে বলবে কী? 

- বিপিনদা বড় মুখ করে বললে, "মিনু, তুমি আমায় বলো দেখি তোমাদের বিবাহবার্ষিকীটা ঠিক কবে। আর তার সঙ্গে এমন একটা জিনিসের কথা বলো যে'টার ব্যাপারে তোমার বরের টনটনে হিসেব জ্ঞান"। আমার সাদা মনে কাদা নেই, বিপিনদার আশ্বাসে গলে গিয়ে বলে দিলাম আমাদের বিবাহবার্ষিকী তেইশে নভেম্বর আর সেই তারিখ তোমার কোনোদিন মনে থাকে না। তা নিয়ে যে আমার মনের মধ্যে কত আঁকুপাঁকু হয় গো। আর বিপিনদাকে এও জানিয়ে দিলাম যে মানিব্যাগে রাখা টাকার ব্যাপারে তোমার হিসেবে কোনোদিন ভুলচুক হয় না। বিপিনদাও কী সব ছকটক কষে জানালো "তেইশে নভেম্বর তো? তেইশ এগারো? এই শেফালীকে ছুঁয়ে আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমার বর নিজের নাম ভুললেও ওই তেইশে নভেম্বর ব্যাপারটা ভুলবে না, শুধু একটা হালকা বাণ মারবো; তাতেই কেল্লা ফতে"। তখন কি ছাই আমি জানতাম যে একটা সামান্য কাজ করতে গিয়ে তোমায় এমন ভোগান্তির মুখে পড়তে হবে? জানলে বিশ্বাস করো আমি কিছুতেই বিপিনদাকে এমন কাজ করতে দিতাম না...বিশ্বাস করো...। 

Monday, September 2, 2019

মার্কেট শেয়ার আর নব জারগন



- ও দত্তদা! 

- কী হল?

- এ মাসের মার্কেট শেয়ার...। 

- কত পার্সেন্ট রাইজ?

- মাইনাস আড়াই পার্সেন্ট! ইয়ার অন ইয়ার। 

- বলো কী হে সান্যাল! মাইনাস?

- এই দেখুন না। এক্সেলে কেমন লাল রঙটা জ্বলজ্বল করছে। 

- তাই বলে মাইনাস?

- মাইনাস!

- এ'টা মার্কেট শেয়ার না দেশের ইকনমি হে। 

- গলাটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে। 

- কাল রিভিউ। গলাটাই থাকবে না তো গলার শুকনো হওয়া। 

- এ'বার কী হবে দত্তদা?

- এক্সেলে জলটল মিশিয়ে দেখো দেখি। 

- যা মেশানোর মিশিয়ে দিয়েছি। না মেশালে মাইনাস সাড়ে চারে যেত। 

- উফ! ধনেপ্রাণে মারবে দেখছি। মাইনাসের খেল দেখলে বড়সাহেব আস্ত রাখবে ভেবেছ? 

- চামড়াটামড়া গুটিয়ে নেবেনা তা ঠিক। তবে ভদ্রলোকের মুখের যা ভাষা দত্তদা, চামড়া গুটিয়ে নিলে যন্ত্রণা কম হত। 

- যোগবিয়োগটা একটু মিলেও নাও হে সান্যাল। মাইনাসটা কি অকাট্য?

- কাল সূর্য পশ্চিমে উঠতে পারে। গভর্নমেন্ট অপোজিশনকে জড়িয়ে "বেশ করেছিস নিন্দে করেছিস" বলতে পারে। কিন্তু এ মার্কেট শেয়ার পজিটিভে যাওয়ার নয়। 

- কী কুক্ষণে যে এথেইস্ট হয়েছিলাম ভাই সান্যাল। একটু যে মানতটানত করে মনটাকে শান্ত করব সে উপায়ও নেই। 

- আমার বডিতে ছ'টা আংটি, চারটে মাদুলি আর একটা স্পেশ্যাল তাবিজ দত্তদা। কিন্তু এই কোয়ার্টারলি ইনসেন্টিভ ছাড়া কিছুতেই কনফিডেন্স পাইনা, এ'সব মাদুলি মানত স্রেফ ডিভাইন ছলাকলা। 

- আর ভাই ইনসেন্টিভ। তোমার আমার পিছনে ইন্সেন্স স্টিক গুঁজে কাল দিলে দিনের বেলার রিভিউ মিটিংয়ে সন্ধে-আহ্নিক করবেন বড়সাহেব। 

- উহ্‌, শুনেই কেমন...। 

- হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে তো? স্বাভাবিক। তবে, শেষ চেষ্টা একটা করতেই হবে। 

- বললাম তো দত্তদা। সমস্ত রকম টেকনিক ফলালো হয়ে গেছে। যাবতীয় ব্যাক ক্যালকুলেশন করে দেখে নিয়েছি। মার্কেট শেয়ার মাইনাসেই থাকবে। 

- আহ্‌। রিভিউ মিটিংয়ে মার্কেট শেয়ারটাই শেষ কথা নয় সান্যাল। 

- নয়?

- পাওয়ার-পয়েন্টে কতগুলো স্লাইড আছে আপাতত?

- এই এ বছরের প্রডাক্ট ওয়াইজ সেলস আর করেস্পন্ডিং মার্কেট শেয়ার নিয়ে তিনটে স্লাইড। প্রস্পেক্টস নিয়ে দু'টো। সামনের কোয়ার্টের প্রজেকশন নিয়ে তিনটে। ইস্যুস অ্যান্ড সলিউশনস; এ নিয়ে আর দু'টো। আর আগে পিছে খান দুই দেখনাই স্লাইড নিয়ে...এই ধরুন ডজন খানেক। 

- মিনিমাম সত্তরটা স্লাইড চাই। 

- সেভেনটি?

- ইংরেজিতে বললে বেশি মজবুত লাগে?

- কিন্তু সত্তরটা স্লাইড...। 

- নোট করো। ক্যুইক সান্যাল ক্যুইক। বড়সাহেবের সামনে যদি মুখ থুবড়ে না পড়তে হয়...। 

- বলে যান। লিখে নিচ্ছি। 

- প্রথম দিকে কয়েকটা স্লাইড; আমাদের টীম নিয়ে। 

- টীম? টীম বলতে তো আপনার সঙ্গে আমি...। 

- আর আমার সঙ্গে তুমি। কর্পোরেটে ওয়ান ম্যান কমিটি হয় হে, দু'জন থাকলে তো পলিটব্যুরো ফর্ম করা যাবে। প্রথমে আমাদের টীমের সলিউশন ওরিয়েন্টেড ফোকাস নিয়ে দু'চার স্লাইড দাও। 

- স...সলিউশন...। 

- ওরিয়েন্টেড ফোকাস। 

- সে'টা কী রকম?

- গুগল থাকতে আমায় কাঠি করা কেন হে সান্যাল। ও কিছু একটা চালিয়ে দিও। এরপর আসবে আমাদের বেস্ট প্র্যাক্টিসেস ভিস-আ-ভি আমাদের কম্পিটিটরদের প্র্যাক্টিসেস...।

- মানে যাদের মার্কেট শেয়ার আমাদের চেয়ে ভালো...। 

- খবরদার যদি শুরুতেই মার্কেট শেয়ার নিয়ে ধেইধেই নেত্য শুরু করেছ সান্যাল। তা'হলে বসের আগে আমি তোমার চামড়া গুটিয়ে নিয়ে মাদুর করে পাতব। 

- সরি। সরি। আপনি বলে যান। আমি শুধু লিখে যাচ্ছি। 

- এরপর দেখাবে আমরা কী'ভাবে ক্রমাগত রিসোর্স অপটিমাইজ করার দিকে মন দিচ্ছি। 

- রিসোর্স অপটিমাইজ...মাইরি আমাদের মাসের চা বিস্কুটের খরচ যদি দেখেন সে'টুকুতেই আড়াই পার্সেন্ট মার্কেট শেয়ার উঠে আসবে বোধ হয়। 

- তুমি বড় বাড়তি কথা বলো সান্যাল। 

- সরি দত্তদা। রিসোর্স অপটিমাইজেশন। ওউক্কে। নেক্সট?

- কোথাও একটু লিভারেজ কথাটা ঢুকিয়ে দিও দেখি। 

- লিভারেজ? ডান। 

- ওহ হ্যাঁ...এর সঙ্গে অবশ্যই জুড়বে থিঙ্কিং আউট অফ দ্য বক্স। 

- উদাহরণ যদি দু'একটা বলে দেন...। 

- আহ্‌, ও একটা সাজিয়ে গুছিয়ে বলে দিও না। যদি নেহাত অসুবিধে হয় স্যাটাস্যাট বিল গেটস বা ওয়ারেন বুফের কোট গুঁজে দিও। লোকে টপ করে বাজে প্রশ্ন করবে না। এই গেল আমাদের টীমের অ্যানালিসিস। 

- খান তিরিশেক স্লাইড এখানেই মেরে দেওয়া গেছে বোধ হয়। 

- গুড। এইতো। এরপর আসবে মার্কেট অ্যানালিসিস। 

- মার্কেট? অ্যানালিসিস? সার্ভে টার্ভে কিছু করতে হবে? কিন্তু সময় এত কম...। 

- তোমার ঘটে কি ঝাল ছাড়া আলু-কাবলি ভরা আছে? সান্যাল? লিখে দাও ফান্ডামেন্টালস আর সাউন্ড। 

- সাউন্ড?

- কানে কেমন ঠেকছে, তাই না? তুমি বরং রোবাস্ট লেখো। শব্দটা খুব চলছে আজকাল। 

- রোবাস্ট মার্কেট ফান্ডামেন্টালস। বেশ। তারপর দত্তদা?

- উম...একটা স্যোট অ্যানালিসিস দিয়ে দাও। 

- কার স্যোট?

- সে একটা কিছুর দিয়ে দিও। মোট কথা একটা গ্রিড এলে পিপিটিতে একটু পাঞ্চ আসবে। 

- স্যোট।  তারপর? ইমপ্যাক্ট স্টাডি বলে কিছু একটা দিয়ে দেব? খান তিনেক স্লাইড খসে যাবে তা'তে। 

- দেবে? ইচ্ছে হয়েছে যখন দাও। বাড়াবাড়িতে তো ক্ষতি নেই কোনও। এরপর বরং একটু "রিচিং আউট" মার্কা কিছু লেখো। আমরা কী ভাবে এগিয়ে এসেছি...। 

- আমরা এগিয়ে এসেছি? কার দিকে? চ্যানেল পার্টনারদের দিকে? না কাস্টোমারদের দিকে?

- বড় এঁচোড়ে পাকা তুমি। ধ্যাত্তেরি। দাও না যা হোক একটা কিছু। পালটা প্রশ্ন শুনলে গা জ্বলে যায়। ওহহো। রীচিং আউট প্রসঙ্গে মনে হল। "গিভিং আওয়ার হান্ড্রেড পার্সেন্ট" মার্কা এক্সপ্রেশন দরকার একটু এখানে। 

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট? সিকলীভ নিয়ে সে'দিন আমি আপনি ডার্বি দেখতে গেলাম...। 

- বেশ। গিভিং হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন পার্সেন্ট করে দাও। 

- যেয়াজ্ঞে। আশা করি এতক্ষণে খান পঞ্চাশেক স্লাইডে চলে এসেছি...। 

- বাহ্‌, চমৎকার। ভেরি গুড। এরপর একটু লটরপটর করে নেগেটিভ মার্কেট শেয়ারের ব্যাপারটা মাইল্ডলি মাঠে নামাতে হবে। 

- চামড়া গুটিয়ে যাওয়ার ফেজ। 

- কিন্তু তাঁর আগে থাকবে বোনাস খান পাঁচেক স্লাইড মার্কেটের প্যারাডাইম শিফট নিয়ে। পারলে চেঞ্জ লীডারশিপ নিয়ে একটা ইউটিউব ভিডিও চালিয়ে দিতে পারো। 

- মার্কেটের প্যারাডাইম শিফট?

- কী ভাবে খেলার নিয়মটাই যাচ্ছে পালটে। 

- কোন নিয়ম?

- জিডিপি ক্যালকুলেট করার নিয়ম পালটে যাচ্ছে সান্যাল! টেস্ট ক্রিকেটে ইঞ্জুরির পর সাবস্টিটিউট নামছে মাঠে। আর তুমি খেলার নিয়ম পালটে যাওয়া শুনে কেঁপে উঠছ?

- কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে দত্তদা। 

- প্রিসাইসলি। 

- হুঁ?

- তার মানে আমাদের পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন সঠিক দিকেই আছে। 

- গুলিয়ে যাচ্ছে বলে?

- এই প্যারাডাইম শিফট নিয়ে খান পাঁচেক স্লাইড ঝেরে দিয়ে সুট করে হালকা চালে রিভিউ রুমে বোমা ফেলে দাও, মার্কেট শেয়ারে মাইনাসে। ততক্ষণে সবাই ছেড়ে দে মা লাঞ্চে গিয়ে বাঁচি। আমাদের প্রেজেন্টেশনের স্লট লাঞ্চের ঠিক আগে। খুব পজিটিভ সাইন। 

- একটু কনফিডেন্স পাচ্ছি বটে। 

- গুড। ভেরি গুড। আর শোনো, প্রেজেন্টেশনের সময় বাঙালদের মত 'চেঞ্জ' বলবে না কেমন? চেঞ্জের বদলে বলবে ডেল্টা। 'ডিটেইলস' বলবে না; বলবে গ্র্যানিউলারিটি। 'অ্যানালিসিস' কথাটা তো হেঁজিপেঁজি সবাই ব্যবহার করে আজকাল; তুমি তার বদলে বলবে 'পীলিং দ্য অনিয়ন'। কী বলবে?

- পীলিং দ্য অনিয়ন!

- সাবাস! আর কেউ বেআক্কেলে কিছু দড়াম করে জিজ্ঞেস করলে ঘাবড়ে যাবে না, ফট করে রাম-শ্যাম-যদু-মদু গোছের একটা জবাব দিয়েই বলবে; যে'টা বলেছি সে'টা 'ডায়রেকশনালি করেক্ট'। 

- ডা...ডায়রেকশনালি করেক্ট?

- করেক্ট, তবে ডায়রেকশনালি। আর চুরি, ডাকাতি, মার্কেট শেয়ার লস; যাই বলো না কেন - শেষে প্রমাণ করে দেখিয়ে দেবে যে যা হয়েছে সে'টাই হচ্ছে আদত উইন-উইন। 

- মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে দত্তদা। 

- আর ফাইনালি। মনে রেখো সান্যাল; অমুক করা হয়নি, তমুক করতে পারেনি; এই ধরনের কথা ভুলেও মুখে এনো না। 

- কোনও কাজ না করে থাকলে...স্বীকার করব না যে করা হয়নি?

- নো স্যার। বলবে; উই হ্যাভ লেফট দ্যাট ওপেন।

- দত্তদা! মার্কেট শেয়ারটেয়ার তো মায়া। আপনার মত এমন ডাইনামিক লীডারের ছত্রছায়ায় আছি, চারদিকে সব কিছুই সুপার-পজিটিভ। 

- এক্সেলেন্ট সান্যাল। এক্সেলেন্ট। এ'বার চট করে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনটা একটু খেলিয়ে নাও দেখি। আমি বরং দু'কাপ কফি নিয়ে আসি। সঙ্গে ডিম টোস্ট চলবে?