Friday, February 21, 2020

মায়ের ভাষা

- বিনোদ, তোর মাথাটা গেছে!

- সে কী...।

- তোর খামখেয়ালিপনা এ'বার পাগলামোর পর্যায় চলে যাচ্ছে। তোর এই অসভ্যতাগুলো আমি সেক্রেটারি হিসেবে সহ্য করতে পারি। কিন্তু বন্ধু হিসেবে তোকে সাবধান করে দেওয়াটা আমার কর্তব্য৷ 

- তুই কি আমার কাছে শুধুই একজন সেক্রেটারি রে বিশে?

- তা নই বলেই মেগাস্টার বিনোদ দত্তর সামনে বুক ঠুকে কথাগুলো বলতে পারছি। কিন্তু বিনোদ, শুনে রাখ। পাবলিক তোর এই পাগলামো বেশি দিন বরদাস্ত করবে না।

- চা খাবি?

- কথা ঘোরাস না। সিংঘানিয়া চটে বোম হয়ে আছে। আর ওকে দোষ দিই বা কী করে বল্! ওর চ্যানেলে এত বড় একটা ইভেন্টের লাইভ টেলিকাস্ট, এদ্দিনের পাবলিসিটি যেটার ফোকাসে ছিলিস তুই৷ সেটা এইভাবে গুবলেট পাকিয়ে দেওয়া; চ্যানেলের মালিক হিসেবে সিংঘানিয়া তোকে স্যু কেন করবে না বলতে পারিস?

- মাতৃভাষার ভালোবাসা; বিনোদ ও বিনোদন। বেশ গালভরা একটা নাম রেখেছিল বটে সিংঘানিয়ার চ্যানেল। কী বলিস বিশে?

- তোর গা চিড়বিড়ানো হাসিটা এ'বার বন্ধ কর। সিংঘানিয়ার প্রডাকশন কোম্পানি ছাড়া ইন্ডাস্ট্রি অন্ধকার। ওঁর টিভি চ্যানেলের লাইভ অনুষ্ঠানে অমন চ্যাংড়ামি করে তুই কত বড় অন্যায় করেছিস জানিস?

- চ্যাংড়ামো? আমি চ্যাংড়ামো করেছি?

- করিসনি? সঞ্চালক একের পর এক প্রশ্ন করে গেল আর তুই বোবা-কালা হয়ে বসে রইলি৷ হাজার প্রশ্নেও টুঁ শব্দটি করলি না। লাইভ শোতে টেলিভিশনের সামনে বসা কয়েক কোটি লোক হাসালি! দু'ঘণ্টার অনুষ্ঠান আধঘন্টার মধ্যে মুলতুবি করতে হল। স্পনসররা ফায়্যার, সিংঘানিয়ার অন্তত সাত কোটি টাকা জলে গেল৷ তোর অফিসে আজ ইটপাটকেল ছোঁড়া হয়েছে৷ আর আগামীকালের কাগজগুলোর হেডলাইনের কথা ভেবেই শিউরে উঠতে হচ্ছে। 

- তুই ওভাররিয়্যাক্ট করছিস বিশে। আমি বরং চা বানাই।

- অসহ্য। জাস্ট অসহ্য।

- অমন অস্থির হচ্ছিস কেন বল তো?

- হব না? তুই স্টার হতে পারিস, আমি তো একজন পাতি সেক্রেটারি।  মিডিয়ার কলগুলো আমার কাছে আসছে, তোর কাছে নয়। কাল সিংঘানিয়ার অফিসে গিয়ে আমাকেই গড়াগড়ি খেতে হবে। নিজের মাথায় ছাতা ধরা লোকগুলোকে এ'ভাবে ঠেলে দিসনা বিনোদ। 

- শান্ত হ। সিংঘানিয়ার কাছে আমি নিজে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসব, কেমন?

- এমন পাগলামির কারণটা আমায় বলবি? সঞ্চালকের কোনো প্রশ্নের উত্তর দিলি না কেন?

- কারণটা শুনবি? সত্যিই শুনতে চাস?

- অন্তত আমায় না বলে তোর ছাড় নেই।

- আসলে, স্টুডিওর চেয়ারে বসতেই; হঠাৎ এই অনুষ্ঠানের নামটা মনের মধ্যে কেমন যেন একটা দোলা দিয়ে গেল। মাতৃভাষার ভালোবাসা। তাই হঠাৎ ইচ্ছেটা মাথাচাড়া দিল বুঝলি, ভাবলাম আমার মাতৃভাষাতেই না হয় কথা বলি।

- এই সেই চন্দ্রবিন্দুর চ। ইয়ার্কি হচ্ছে? মাতৃভাষায় কথা বলতে চেয়ে লাইভ টেলিকাস্টে তুই চুপ করে বসে রইলি? 

- জানিস বিশে, স্টুডিওর ওই আলোর ঝলমলে হঠাৎ খুব মায়ের কথা মনে পড়ল৷ আমার মা। মা যে কী ভালো খেত তা কোনোদিনই জানতে পারিনি; শুধু জানতাম মাছের ভালো টুকরোগুলো পরিবারের সকলের পাতে দিয়ে যে কাঁটাল্যাজা পড়ে থাকবে, তা দিয়েই মা ভাত মেখে খাবে। মায়ের পাতে কোনোদিন ভাত কম হত না, বাড়ির সবাইকে খাইয়ে আধমুঠো ভাত পড়ে থাকলে মায়ের খিদেও আধমুঠোয় এসে দাঁড়াত। হাঁড়িতে ভাত না থাকলে মায়ের খিদেও পেত না। দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী ঠাকুরদাকে মা ভক্তি করত, সেই ঠাকুরদা জোর গলায় জানান দিতেন মেয়েমানুষের কণ্ঠস্বর উঁচুতে উঠলে গেরস্তের অকল্যাণ, মায়ের গলা শোনাই যেত না প্রায়।   আমার জন্মের বছর দুই আগে আমার এক দিদি জন্মেছিল। ঠাকুমা খুব চেয়েছিলেন নাতি হবে, নাতনির মুখ দেখে মনের দুঃখে মাকে বলেছিলেন; "পোড়ামুখী, পরের বার যেন চাঁদপানা  খোকার মুখ দেখতে পাই"৷ আমার ধারণা মা সেদিনও চুপটি করেছিল। ঠাকুমার সেই দীর্ঘশ্বাসের বোঝা বয়ে আমার সেই দিদিটি বেশি বেঁচে থাকতে পারেনি৷ জানিস বিশে, আমি জানি না মায়ের প্রিয় রং কী, মা পাহাড় বেশি ভালোবাসে না সমুদ্র!৷ মায়ের নিশ্চুপ পেরিয়ে মায়ের খবর নেওয়াই হয়নি কোনোদিন। তাই স্টুডিওতে বসে গ্লোসাইনে "মাতৃভাষার ভালোবাসা" দেখে মায়ের জন্য যে কী ভীষণ মনকেমন করে উঠল...। তাই সেখানে যতক্ষণ ছিলাম আমি আমার মায়ের ভাষা আঁকড়ে পড়ে রইলাম৷ আমায় মায়ের ভাষা। 

- পৃথিবীতে যতজন বাংলায় কথা বলে,  তার চেয়ে অনেক বেশি মা-মেয়ে বোধ হয় তোর মায়ের ভাষাতেই কথা বলে। 

- হেহ্। 

- চা খাবি রে বিনু?

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...