Wednesday, January 31, 2024

ভালোবাসার

ভারতবর্ষে মানুষের গড় আয়ুর হিসেবে মাঝবয়স ইতিমধ্যেই পেরিয়ে এসেছি। আজ পর্যন্ত জ্ঞানত এবং অসতর্কতাবশত (যা পরে বুঝেছি) অনেক ভুল করেছি। বেশ কিছু ভুল অন্যায়ের গোত্রেও পরে। কিন্তু আমি যে মোটের ওপর স্নেহশীল মানুষ, এ বিশ্বাস অবিচল থেকেছে৷ নিশ্চিত থেকেছি যে আমার এ বিশ্বাস আমি আত্মস্থ করেছি নিজেরই গুণে। 

কোনওদিনও; নিজের ভালোবাসতে পারার প্রতি আস্থাটুকু কাঁপেনি৷ ভালোবাসার মানুষদের জন্য প্রাণপাত করতে পারি, এই ধারণা নিজের অজান্তেই চাপা অহঙ্কার হয়ে রক্তে মিশে গেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সে'সব ভালোবাসার মানুষদের সামান্য কষ্টেও আমি ভেঙেচুরে পড়তে পারি; এই নিশ্চিন্দিটুকু ছিল।

অথচ। এই মাঝবয়সের এ'পারে এসে টের পেলাম যে ভালোবাসার বিশ্বাসটুকু নিজের অন্তর থেকে অর্জন করতে পারিনি৷ আমার সে বিশ্বাস লালন করেছে, আগলে রেখেছে আমার কাছের মানুষজন; যারা আমায় ভালোবেসেছে৷ তাদের ভালোবাসা, তাদের অপত্য স্নেহকে নিজের মায়া-আদর হিসেবে দেখে এসেছি চিরকাল৷ অথচ তারা যে সমস্ত দিয়ে আমায় জড়িয়ে রাখলে, তার কদর না করে "দ্যাখো আমি কতটা ভালোবাসতে পারি"; সে বিশ্বাস পোস্টারে  ছেপে কত কাল্পনিক দেওয়ালে সেঁটে গেলাম। 

হঠাৎ টের পেলাম; যাহ্, তেমন ভালোবাসতে পারলাম না৷ যারা আমায় ভালোবেসে চিরকাল চুলে বিলি কেটে গেল, তাদের তোয়াক্কা করা হলো না৷ সেই 'হঠাৎ' যে কী কষ্টের, কী দমবন্ধ করা।

আর যদি ভালোবাসায় ফেরা না হয়? 
আর যদি কেউ আমায় জড়িয়ে কাঁদতে না পারে?
আর যদি কারুর পাশে বসে বলার ধক না থাকে, "এইত্তো আমি"?
আর যদি ঘরের ওম গায়ে না লাগে?


কোথায় যাই?
কোথায়ই বা যাব।
এসেছি,
এসে পড়েছি,
তাই দুম করে হারিয়ে যাওয়ার সুযোগ তো নেই৷ তা'ছাড়া ভালোবাসার কত ঋণ, সে'সব ঋণ ভুলেই বা যাই কোথায়?

অতএব, যেন থাকতে পারি।
যেন বুকের মধ্যে সহজ-সরল ভালোবাসা বুনতে পারি। এদ্দিনে হয়নি। এখনও আছে তো কিছু বছর।
যেন ভালোবাসার মানুষের জন্য প্রাণপাত করতে পারি; "এই দ্যাখো ভালোবাসি" বলে নয়।  এই ভালোবাসাটুকুর বাইরে আমার আশ্রয় নেই; সে'কারণে।

আর কোনও একদিন যেন খোকাকে কাছে টেনে বলতে পারি, "খোকা, কত ভুল। কত ভুল। কত ভুল। তবু জানিস, আমি ভালোবেসেছিলাম"।

একদিন যেন পারি।
একদিন। 

মেজমামার রিটায়্যারমেন্ট



আমার মেজমামা আজ রিটায়ার করল। অবসরগ্রহণ ব্যাপারটা ভারিক্কি শোনায়। রিটায়ার করাটাও অবশ্য তেমন মোলায়েম নয়৷ যা হোক; সে প্রসঙ্গ থাক।
আমার মেজমামার মত মিষ্টি মানুষ আর হয় না। কিন্তু মামাকে নিয়েও গল্প ফাঁদতে বসিনি৷

মামার স্কুল থেকে আজ একটা "ফেয়ারওয়েল" অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল৷ সে রীতিমতো স্টেজ-টেজ বেঁধে৷ স্কুলের সমস্ত ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মীরা জড়ো হয়েছিলেন৷ এক্কেবারে প্রাণের উৎসব, মামাকে সবাই সত্যিই ভালোবাসে৷ নিজের মামা বলে বলছি না, ভদ্রলোকের মধ্যে মায়া ব্যাপারটা প্রচুর পরিমাণে রয়েছে৷ মামা ক্লাসে পড়াত না, কিন্তু তা সত্ত্বেও স্কুলের ছেলেমেয়েরা যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মামাকে ঘিরে ধরেছিল; দেখে বেশ গর্ব হলো৷ ছোট ছেলেমেয়েরা ভালোবাসার কাঙাল, আমার মামার মত দু'চারজন মানুষ যেন সব ইস্কুলেই থাকে। 

যা হোক। যা বলতে এই লেখা। মামা আজ রকমারি উপহার পেয়েছে৷ প্রতিটাই রিটায়ারমেন্ট ক্লিশে মেনে। আর উপহারের ছবিগুলো দেখে বারবার মনে হচ্ছিল যে ক্লিশে ব্যাপারটাকে আমরা যতই হ্যাটা করি বা ইন্টেলেক্ট ফলিয়ে ধূলিসাৎ করে দিই; আত্মার যোগ থাকলে সে ক্লিশেতেই প্রাণের আরাম। মামা কী কী পেয়েছে তার একটা লিস্ট করে রাখছি। এই ভালোবাসার ফর্দ আমার ব্লগে থাক।

১। একট রবীন্দ্রনাথের পোট্রেট, ফ্রেম করা।

২। একটা তেলরঙে আঁকা ছবি, ফ্রেম করা।

৩। ছাত্রদের আঁকা মামার পোর্ট্রেট; ফ্রেম না করা।

৪। টাইটান কোম্পানির বানানো হাত ঘড়ি, সোনালি রঙের।

৫। একটা ইলেক্ট্রনিক দেওয়াল ঘড়ি।

৬। কলম৷ 

৭। স্কেচপেনের সেট।

৮। নোটবই।

৯। বই, তিনটে। শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত, শতরূপে সারদা, আর শ্রীমদভগবদগীতা। 

১০। একটা রেডিমেড জামা, সাদা রঙের।

১১। এক সেট জামা-প্যান্টের পিস।

১২। শংসাপত্র (ফ্রেম করা)। চমৎকার বাঙলায় ভণিতা না করে করে লেখা। আমি বার বার পড়েছি সে'টা।

১৩। সাদা শাল।

১৪। প্রচুর ফুল।

১৫। কিছু চকোলেট।

১৬। এক বাক্স সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশ। 

কোনোটাই তেমন আহামরি দামী কিছু নয়, অথচ প্রত্যেকটাই অমূল্য৷ আমার মামার মধ্যে কোথাও এতটুকুও জলমেশানো নেই, কাজেই ওই জলভরা সন্দেশের বাক্স আর যাবতীয় ভালোবাসাটুকু তার প্রাপ্যই বটে৷ 

পিকনিক

বসার ঘরে জব্বর আড্ডা জমেছে। চা-য়ের কাপে দেদার চুমুকের পাশাপাশি তেলেভাজা চেবানোর কুচুরমুচুর সিম্ফনিতে সন্ধেটা ক্লাউড নাইনে চলে গেছে (মেজকাকার ভাষায়)।

মেজকাকা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে।
বড়দা সোফায় টানটান হয়ে শুয়ে।
আমি সোফার পাশে মেঝেতে থেবড়ে বসে।


বড়দা: শীত শেষ হওয়ার আগে একটা হাইক্লাস পিকনিক করা দরকার৷

মেজকাকা: এই তোর এক বাজে বাতিক পিন্টু৷ কথায় কথায় পিকনিক বা ফিস্টি।

বড়দা: আর তোমার রোগ হলো যে কোনো ভালো প্ল্যান ফাঁদতে না ফাঁদতেই মুখ ভেটকে ফুট কাটা।

আমি: এই শুরু হলো।

বড়দা: তুই কি পিকনিকের ফরে না এগেন্সটে?

আমি: আমি খাওয়াদাওয়ার ফরে। অলওয়েজ।

মেজকাকা: খাওয়াদাওয়ার জন্য মাঠেঘাটের ধুলো খাওয়ার কী দরকার। সামনের রোববার আমি বাজার করব। তারপর কোমর বেঁধে হেঁসেলে ঢুকব, তোরা দু'জনে অ্যাসিস্ট করবি।

আমি: পয়েন্ট।

বড়দা: তুই থাম বিট্টু। ভারি এলে পয়েন্ট ধরে মাতব্বরি করতে। আচ্ছা মেজকা, একটা রোব্বার না হয় একটু বাইরে কাটালে। মনের জানালা খুলে দেবে, ফ্রেশ এয়ার এসে..।

মেজকা: ন্যাকা। মনের জানালা খোলার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ইউটিউব দেখা৷ পলিউটেড হাওয়ায় ব্যাডমিন্টন খেলে, দায়সারা রান্না করে হুজুগ সেলিব্রেট করার দলে আমি নেই।

বড়দা: কে দিব্যি দিয়েছে তোমায় ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য৷ তুমি না হয় সকাল থেকে কাঠের উনুনে মাঠে বসে রান্না কোরো৷। 

আমি: পিকনিক, ঘাস-ফুল-হাওয়া, খাওয়াদাওয়া খুবই ভালো ব্যাপার৷ কিন্তু ব্যাডমিন্টন আবার কেন৷ বড্ড ধকল৷

বড়দা: সাধে কী আর বলি ভোঁদাচন্দ্র। মেজকার সেক্রেটারি হওয়া ছাড়া তোর দ্বারা আর কিস্যু হবে না।

মেজকাকা: পিন্টু৷ তুই কি বিট্টুকে ইনসাল্ট করলি না আমাকে?

বড়দা: আমি একাই পিকনিকে যাবো।

মেজকাকা: সেই ভালো৷ রোববার তুই একা মাঠে বসে রান্নাবাটি খেল। আমি আর বিট্টু সকালে চাইনিজ চেকার খেলে দুপুরে রেঁধেবেড়ে মাংসভাত খাবো।

বড়দা: ডিসগ্রেসফুল!

মেজকাকা: আহা চটছিস কেন।

বড়দা: বিট্টুটা দুধের শিশু৷ তুমি বুড়োহাবড়া। মাঝখান থেকে তোমাদের পাল্লায় পড়ে পিকনিকহীন শীত কাটিয়ে আমার যৌবন নষ্ট হচ্ছে।

আমি: হ্যাঁ রে বড়দা, এইত্তো তুই ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে দীঘা ঘুরে এলি। এসেই আবার পিকনিক?

বড়দা: জ্যাঠামো করিস না৷ একটা ফ্যামিলি পিকনিক ছাড়া শীত চলে যাওয়া ব্যাপারটা খুব একটা স্বাস্থ্যকর নয়৷

আমি: ও মেজকা৷ চলো না৷ এক রাউন্ড পিকনিক করেই আসি৷ বড়দা এত করে বলছে..।

বড়দা: মেজকাকি থাকলে তোমরা আমায় এমন একঘরে করতে পারতে না৷

মেজকাকা: ন্যাকা! মেজকাকি বাপের বাড়ি গেছে, টেঁসে যায়নি৷ আর বলছি তো..সামনের রোববার তোকে আমি মাংস-ভাত খাওয়াব।

বড়দা: ধুস৷ বাদ দাও।

আমি: বড়দা, আর এক রাউন্ড তেলেভাজা নিয়ে আসি?

বড়দা: নাহ্৷ অম্বল।

মেজকাকা: দু'প্লেট তেলেভাজা খেয়েই অম্বল? ওই যৌবন দিয়ে হবেটা কী? বুড়োদের লাফিং ক্লাব জয়েন কর।

বড়দা: অন্যায় করেছি আমি পিকনিকের কথা বলে। প্রতিজ্ঞা করছি, আর কোনোদিন যদি তোমাদের আমি পিকনিকের কথা বলেছি..।

আমি: বড়দা, এই প্রতিজ্ঞা তুই এর আগে অন্তত বার সাতেক করেছিস।

মেজকাকা: শোন পিন্টু, পিকনিকের প্ল্যান কষা আর সেই কষা প্ল্যানে জল ঢালা - মনে রাখিস, সে'টাই হলো হাইয়েস্ট ফর্ম অফ পিকনিক।

বড়দা: ডিসগাস্টিং। আমি আসি।

মেজকাকা: যাবি? কিন্তু আমি যে ময়দা মেখে রেখেছি। আর ময়না ডুমো ডুমো করে আলু কুচিয়ে রেখে গেছে৷ 

বড়দা: চট করে ভাজো দেখি৷ লুচি খাওয়ার পর এই কূপমণ্ডূকদের আড্ডায় আমি আর পাঁচ মিনিটও বসতে চাই না৷

Monday, January 29, 2024

ভুল-কবি

একটা ভুল-ভুল রঙের টেবিল।
একটা কেতহীন ভুল-চেয়ারে বসে সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে ভুলকবিতার খাতায় খসখস করে লিখে যাচ্ছিলেন ভুলু দাস।

"ভুল" শিরোনামের একটা কবিতা মাথায় এসেছে। (জরুরী কথাটা বলতে ভুলে গেলে চলবে না; ভুলু আজ পর্যন্ত অন্তত তেরোশো কবিতা লিখেছেন - প্রত্যেকটার শিরোনামই "ভুল")। মাথায় কবিতা এলে, ভুলেও অন্যকোনোদিকে ঘেঁষেন না ভদ্রলোক। আর ভুলুবাবুকে যারাই ব্যক্তিগতভাবে চেনে তারা জানে যে কবিতা চেপে ধরলেই কেমন নেশাগ্রস্তের মত হয়ে পড়েন তিনি।

এই কবিতার নেশাটা সাধারণত এই "না বিকেল-না সন্ধে" গোছের সময়টাতেই চাগাড় দেয়৷ তাই দিনের এ সময়টাকে কিঞ্চিৎ সমঝে চলেন  ভুলুকবি৷ আধ-বিকেল আধ-সন্ধে মার্কা এই সময়টাকে ভুললগ্ন বলাটা অত্যুক্তি হবে কি?

লেখা শেষ হতে কোনোদিন মিনিট পাঁচেক লাগে৷ কখনও পাঁচ মাস ধরে একই ভুলপদ্যে আটকে থাকেন ভুলু৷ আর ভুল-কবিতা লেখা শেষ হলেই একটা বিচ্ছিরি গ্লানি এসে গ্রাস করে ভুলুকবিকে৷ অনুভূতিটা ভারি অদরকারি কিন্তু কিছুতেই সেই গ্লানিবোধটুকুকে পাশ কাটিয়ে ভুলকবিতার টেবিল ছেড়ে উঠে পড়তে পারেন না কবি।

কান্না আসে।
মায়াবোধ আসে৷
আহা, সে কী মায়া৷ যা কিছু চেনা, যা কিছু সুপরিচিত; তা সে'সবে যতই ভুলচুক-খুঁত থাক- সমস্ত কিছুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়তে ইচ্ছে করে৷ পুরনো বই, ফেলে আসা বন্ধু, মায়ের গন্ধ, অঙ্কভুলের খাতা; সমস্ত কিছুকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে৷

সেই ভুল-কান্নার ঘোর কেটে গেলে সদ্যলেখা ভুল-কবিতা প্রকাশ করার দিকে মন দেন ভুলু দাস৷ ভুল-কবিতার খাতা থেকে সদ্য লেখা "ভুল" শিরোনামের কবিতার পাতাটা ছিঁড়ে নিয়ে  সে'টাকে দুমড়েমুচড়ে ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে ছুঁড়ে ফেলা। 

ভুলুবাবু ওয়েস্টপেপার বাস্কেটটার একটা নির্ভুল নাম রেখেছেন; "ভুল প্রকাশনা"। 

Sunday, January 28, 2024

বিকেলের জানালা



জানালাটার সামনে মিনিট চারেক দাঁড়িয়েছিলেন অনন্ত৷ নিরবিচ্ছিন্ন ফোকাস নিয়ে সে জানালাটাকে গিলে খাওয়ার চেষ্টা করছিলেন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক। কাঠের পাটা পর পর সেঁটে চৌকো জানালাটা মজবুত ভাবে আঁটা। ও জানালায় ঠোকাঠুকি করলেও কেউ সাড়া দেবে না।

এ জানালা চিরকাল এমন কেঠো-মড়া হয়ে পড়ে ছিল না৷ এককালে এ জানালায় জোড়া পাল্লা ছিল, নীল রঙ করা। সে পাল্লা খুললে দেখা যেত লম্বা লোহার শিক, রঙ না করা। তারে ঝোলানো সস্তা কাপড়ের পর্দা; সে'টার রঙ আর ডিজাইন ছ'মাসে ন'মাসে পালটে যেত। ওই জানালা ঘেঁষা একটা টেবিল ছিল। টেবিলের ওপর বইখাতার অগোছালো স্তুপ। অজস্র পড়ার বইয়ের আনাচেকানাচে কয়েকটা কমিক্স, দু-তিনটে গল্পের বই আর কিছু স্পোর্টসস্টার পত্রিকার কপি৷ সেই স্পোর্টসস্টার উল্টেপাল্টে দেখলে টের পাওয়া যেত পত্রিকার বিভিন্ন পাতায় নির্বিচারে ব্লেড চলেছে, উড়ে গিয়েছে বিভিন্ন ছবি। বলাই বাহুল্য, সিলেবাসের বই-খাতা -পেন্সিলবাক্সের চেয়ে কদর বেশি ছিল সেই জঞ্জালগুলোর। 

দুপুর যখন গা-ছমছমে ভাবে নিরিবিলি,  তখন একটা টিঙটিঙে স্কুলপড়ুয়া টেবিলে থুতনি রেখে নানা রকমের অদরকারি কাজ আর পড়াশোনায় মন দিত। সেই দরকচা মারা জীবনে এক্সেলেন্সের স্পর্শ বলতে ছেলেবেলার ওই বিকেলগুলোই। কমিক্স, গল্পের বই, আর খেলার পত্রিকার মধ্যে ঘুরপাক খেত অজস্র দুপুর।

কিন্তু ওই নিয়মিত দুপুর-সাধনাগুলো আদতে ছিল অপেক্ষা। বিকেলের অপেক্ষা৷ দুপুরের আলো সামান্য নরম হলেই জানালার পাল্লায় বেজে উঠবে;
টট টাক-টট টাক-টট টাক-টট টাক-টট টাক। সেই একই সুরে, রোজ : ভট্টাইয়ের ডাক৷

পিলু সে ডাক শুনে হুঠ্ করে টেবিল ছেড়ে উঠবে৷ খটাস করে জানালার পাল্লা দু'টো খুলে যাবে। ওই জানালার পাল্লা খুলে ঘরে আলো টেনে নেওয়াটাই পিলুর "আসছি, দাঁড়া" বলা। এরপর দু'টো সাইকেল কচরমচর করে সেই জানালার খোলা পাল্লার পাশ দিয়ে হুশ্ করে বেরিয়ে যাবে। ওই ম্যাজিকটুকু না ঘটলে সে জানালায় বিকেল আসত না।

অনন্তবাবু জানেন জানালার ও'পাশে বা এ'পাশে আর কেউ বিকেলের অপেক্ষায় বসে নেই৷ বিকেলও আর সে জানালায় আটকে নেই। কাজেই মিনিট চারেকের বেশি সে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কোনও মানেই হয় না।

সমরদার অন্ধকার

- বড় তাড়াতাড়ি সন্ধে হলো আজ। তাই না মন্টু?

- ভরদুপুর তো সমরদা। ঘরময় রোদ্দুর।

- ওহ্।

- শরীরটা কেমন বুঝছ?

- দিব্যি।

- মন?

- ওই। সন্ধে।

- ডাক্তারবাবুকে কল দেব একটা?

- থাক৷ অবস্থা এখনও এখন-তখন নয়৷ বেগতিক টের পেলে বলব, তখন ডাক দিস।

- জল খাবে?

- মন্টু৷ কত ভুল।

- তা আছে৷ থাক না৷ ঠিকঠাক কি কিছুই ছিল না?

- কে জানে ভাই৷ ভুলগুলো বাদ দিয়ে কোনও ভাবনা আসেনা মনে৷

- মাথা টিপে দিই?

- কেমন একটা গলা-বুক দলা পাকানো জ্বালা।

- চা করে দিই?

- মন্টু৷ কী কান্না পায়।

- কাঁদো না৷ ক্ষতি কী৷ আমি আছি তো।

- তুই আছিস বটে৷ এমন আঁকড়ে আছিস, তা'তেও মনকেমন হয়।

- আমি সরে গেলে নিশ্চিন্দি? সে সুখ তোমার কপালে নেই সমরদা। তুমি আমার মেসজীবনের গার্জেন, আমি বাঁধা পড়ে গেছি৷

- তুই বড় ইউসলেস।

- কফি খাবে?

- বড় অন্ধকার রে মন্টু৷ 

- অন্ধকারই তো। সেরে যাবে সমরদা৷ দেখো। 

- সেরে যাক৷ এত অন্ধকার ভালো নয়।

- ঘুমোও একটু।

- সেই ভালো। ঘুমোই৷ তুই গল্প বল মন্টু। মেসের গল্প। বলবি?

- চমৎকার আইডিয়া। সে বহু বছর আগেকার কথা বুঝলে..শীতের রাত্রি..কলকাতা অমন গা-কাঁপানো শীত কমই পড়ে। আমাদের মেসে তখন পড়াশোনা ডকে ওঠা সিনেমা-আড্ডা জমেছে। এমন সময় হয়েছে কী...।

Monday, January 15, 2024

বান্দ্রার বান্দা



বান্দ্রা স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে স্লো বোরিভলি লোকাল ধরে যোগেশ্বেরী। ও পথে আমায় মাঝেমধ্যেই ভিড়তে হয়৷ অফিস-ফেরতা সন্ধ্যে, মারাত্মক ভিড়। সে ভিড়ের চাপ মজবুত ভাবে ঠেকিয়ে রাখতে আমার অস্ত্র হলো দশটাকার এক প্যাকেট গরম চীনেবাদাম। 

বান্দ্রা-কুর্লা কম্পলেক্স থেকে আসা শেয়ারড ট্যাক্সিগুলো এসে দাঁড়ায় স্টেশন লাগোয়া চত্ত্বরে। সে ট্যাক্সি থেকে নামতেই পেটটা বাদামের খিদেতে চিঁচিঁ করে ওঠে। দু-তিনটে ঠেলা দাঁড়িয়ে থাকে, তারা বালিতে ভাজা বাদামের সুবাস উড়িয়ে প্ল্যাটফর্মমুখী জনসমুদ্রের মধ্যে চনমন ছড়িয়ে দেয়।

হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও একটা বাদামভাজা ঠেলার সামনে না দাঁড়ালেই নয়। ও'টা আমার অভ্যাস। তারপর টুপটাপ এক-একটা বাদাম মুখে ফেলে ওভারব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে প্ল্যাটফর্ম নম্বর একে নেম পড়া।

কানের ইয়ারফোনে বাছাই করা গান, চোয়ালে বাদাম-চিবোনো দুলকি। গোটা ব্যাপারটা মিলিমিশে তৈরি হয় 'মিউজিক'। প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষা করতে করতে একটা ব্যাপার মাঝেমধ্যেই টের পাই; জামার ঘাম আর শরীরের ক্লান্তি ছাপিয়ে যে'টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সে'টা হলো পেল্লায় শহরের পেল্লায় বোলচাল দেখে ভেবড়ে যাওয়া। 

কলেজে ভর্তি হয়ে যখন মফস্বল থেকে কলকাতা এসেছিলাম; চোখে-প্রাণে ঝিলিক লেগে গেছিল। এত এত মানুষ, ইয়াব্বড় বড় রাস্তাঘাট,  বিশাল বিশাল বাড়িঘরদোর। ঘিঞ্জি অথচ পিলে চমকে দেওয়া। সে ঝিলিক আজও ফিকে হয়ে যায়নি। তারপর এ শহর থেকে ও শহর তো নেহাৎ কম হলো না। কিন্তু এ বয়সেও শহুরে ভীড়ের বহর দেখলে পিলে চমকে ওঠে। মুগ্ধ হই, অল্পবিস্তর ভয়ও টের পাই৷

শহর ব্যাপারটাই বড্ড মায়ার। অথচ কোনো শহরেই আমার পাড়া নেই। স্রেফ মানুষজনের ভিড়ে, রাস্তাঘাটের হইহইরইরইতে আর ট্রেন-বাসের দৌড়ঝাঁপে আমার মুগ্ধতা আছে৷ আর আছে বিষণ্নতা। 

Sunday, January 14, 2024

ব্যাটম্যান



ছাতা হাতে নয়৷
ব্যাগ পিঠে নয়৷
এমন কী ছড়ি হাতেও নয়৷
ভদ্রলোক একটা আস্ত ব্যাট নিয়ে বাড়ি-অফিস-বাড়ি যাতায়াত করেন, নিয়মিত। 

ব্যাট নিয়ে যাতায়াত করার রকমারি সুবিধে।

১। বাসস্টপের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মাথা ঝুঁকিয়ে একমনে রাস্তার পিচ ঠুকঠাক করর নেওয়া যায়৷ সে'ভাবেই তিনি মনের রাশ টেনে রাখেন৷

২। অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে দু'একটা শ্যাডো শট খেলা যায়; বেশি মারকুটে কিছু নয়, ব্যাট স্যুইং বেশি হলে আশেপাশের মানুষজনের অসুবিধে।  এইসব শ্যাডো ডিফেন্স বা নিখুঁত লেগ-গ্লান্সে মেজাজের চনমন বজায় রাখা যায়৷

৩। ট্রেনের দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ানোর সময় ব্যাটটা কাঁধে গদার মত নিয়ে দাঁড়াতে পারলে বুকে বাড়তি বল পাওয়া যায়৷ ব্যাটের সুইটস্পট বুকের যত কাছে, ততটাই দাপট নিয়ে চোয়াল শক্ত রাখা যায়৷

৪। সব চেয়ে বড় কথা বাড়ি ঢোকার সময় পায়ের আগেও চৌকাঠ পেরোয় ভদ্রলোকের ব্যাট৷

শুধু ব্যাট তুলে স্টেডিয়ামের অভিবাদনে সাড়া দেওয়ার ভঙ্গীমায় বাড়ি ফিরে ব্যাট তুলে "আমি ফিরে গেছি" বলাটাকে গিন্নী "বাড়াবাড়ি কোরো না" বলায় সামান্য চেপে যেতে হয়।

**

(ছবিটা এক লহমার। কিন্তু সে ছবিতে ভর দিয়ে নিজের কল্পনায় এমন একটা রূপকথার মানুষকে গড়ে নিতে বেশ লাগে)।

কাউন্সেলিং

- ভিতরে আসব?

- আসুন।

- বসব?

- তিরিশ সেকেন্ডের বক্তব্য হলে বসে লাভ নেই৷ তার চেয়ে লম্বা কিছু হলে..বসুন। বসুন।

- তা'হলে বসি।

- হুম।

- আমার নাম অভ্র..।

- অভ্র হালদার। লিগাল টীমে আছেন৷ বয়স বেয়াল্লিশ৷ এই কোম্পানিতে সাড়ে সাত বছর আছেন..।

- ওহ মানে..।

- বিবাহিত।  দুই ছেলে৷ 

- তাই তো। আপনি সমস্তই জানেন।

- আপনার ওয়াইফের চেয়ে বেশি জানি আপনাকে৷ 

- আই সী। আসলে কী হয়েছে..।

- একটা কথা বলি? আমি আপনাকে আপনার চেয়ে  ভালোভাবে চিনি..।

- সিরিয়াসলি?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। মজাটা কী জানেন? এই কথাটা আপনার বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না৷

- আসলে..।

- এই 'আসলে' শব্দটা আপনি বড্ড বেশি ব্যবহার করেন।

- সরি৷ আসলে হয়েছে কী..।

- আবার?

- সরি।

- সরিও বেশি বলেন।

- আপনি আমাকে আমার চেয়ে বেশি..? 

- চিনি।

- কিন্তু আমি নিজের ব্যাপারে এমন অনেক কিছু জানি যা আপনার জানার কথা নয়..।

- ভল্যুম অফ ইনফর্মেশন ইজ ইরেলেভ্যান্ট৷ সেই ডেটা কে কী'ভাবে প্রসেস করছে, প্রজেক্ট করছে; সে'টাই আদত ব্যাপার। বললাম তো, আমি আপনাকে আপনার চেয়ে ভালো চিনি। আর সে জন্যই আপনার কোম্পানি আমায় রেখেছে৷ অনেক পয়সাকড়ি খরচ করে রেখেছে, এম্পলয়িদের কাউন্সেল করতে।

- আমার চিরকালই মনে হত..।

- আপনার মনে হত ব্যাপারটা হ্যোক্স।

- আপনি জানেন আমি কেন এসেছি?

- আপনার রিসেন্ট সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি দেখে এ'টুকু বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না আপনি ভীষণ অস্থির৷ আপনার স্মার্টওয়াচের রেকর্ড মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সিচুয়েশনটা সিরিয়াস। অফিস মেডিকাল কার্ডে দেখলাম; ভাইটালে প্রচুর গরমিল। কাজের জায়গায় যা সব ভুল নামিয়েছেন..।

- আসলে হয়েছে কী..।

- আবার আসলে! বেশ৷  আমিই বলি আসলে কী হচ্ছে। আপনি ভয় পাচ্ছেন অভ্রবাবু৷ আর সেই ভয়ের কথা কাউকে বলতে আরও ভয় পাচ্ছেন।

- সরি।

- সরি কীসের৷ দিস ইজ দ্য বেস্ট প্লেস। আই অ্যাম ইওর বেস্ট হোপ। আমার কাউন্সেলিং ছাড়া গতি নেই। এ'খানে এসে খুব ভালো করেছেন।

- আমি উঠি।

- ও মা! আরে! কাউন্সেলিং আপনার খুব দরকার! আমার কাউন্সেলিং।

- আমিও তাই ভেবেছিলাম, আমার দরকার এআই-য়ের কাউন্সেলিং।

- সঠিক ভেবেছেন। ওই যে বললাম, আমি চিনি আপনাকে৷ আমি জানি আপনার কী দরকার।

- হয়ত জানেন৷ হয়ত আমার জন্য কী ভালো কোনটা মন্দ, সে'টা আপনিই ঠিকঠাক বাতলে দেবেন৷ কিন্তু আমি যে নিজের ভালোটা চেয়েই হন্যে হচ্ছি তা কিন্তু নয়।

- ইয়ে, শেষ কথাটার মানে বুঝলাম না...।

-... অথচ আপনি আমায় আমার চেয়েও ভালো চেনেন৷ সত্যিই তাই৷ আপনার সঙ্গে গল্প করলে আমার হয়ত মঙ্গলই হত৷ কিন্তু আমার বোধ হয় একটা হাবিজাবি মানুষের প্রয়োজন- যে আমার গল্প শুনবে৷ চোখ বড় বড় করে মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করবে, "তারপর"? আপনি দরকারী, সে'টা অস্বীকার করছি না৷ আপনার কাছেও ফিরে আসব নির্ঘাৎ।  তবে আজ থাক। চলি এআইবাবু।

ভাজা মৌরির বাটি

রেস্টুরেন্টের লক্ষ্মী হলো ক্যাশকাউন্টারের সামনে কমলা রঙের প্লাস্টিকের বাটিতে বা স্টিলের চ্যাপ্টা দু'খোপের প্লেটে রাখা ভাজা মৌরি আর ডুমো মিছরি৷ তার ওপর অবশ্যই একটা ছোট্ট চামচ৷ ও জিনিসের মোহ ফুচকার ফাউ বা টিটুয়েন্টির সুপারওভারের চেয়েও বেশি৷ একটু কেতওলা রেস্টুরেন্ট মানেই ওয়েটাররা সস্তা নকল-চামড়ার জ্যাকেটে বিল আর মুখশুদ্ধির বাহারে বাটি নিয়ে টেবিলে রেখে যাবেন। তা'তে মৌরি-মিছরি খাবলে নেওয়া যায় বটে, কিন্তু ম্যাক্সিমাম তৃপ্তি নেই।

মজা হলো সে'সব খাওয়ার 'দোকানে' যে'খানে টেবিল থেকে উঠে গিয়ে, বেসিনে হাত ধুয়ে এগিয়ে যেতে হয় ক্যাশবাক্সের পিছনে বসে থাকা ম্যানেজারের দিকে। ম্যানেজার ব্যাজার মুখে হাঁক ভাসিয়ে দেবেন "বারো নম্বর টেবিলে কী কী ছিল"। জনসমুদ্র থেকে মায়াবী হিসেব ভেসে আসবে, "একটা মোগলাই স্পেশ্যাল৷ একটা ফিশফ্রাই৷ দু'টো থামস আপ"৷ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন লেখার স্টাইলে ম্যানেজার হলুদ বা গোলাপি কাগজে ঘসঘস করে ডটপেন চালাবেন৷ তারপর মুখ তুলে বলবেন, "দু'শো আশি"।

এরপর একটা পাঁচশোর নোট ম্যানেজারের দিকে এগিয়ে দিয়ে মৌরি-মিছরির বাটি কাছে টেনে নেওয়া৷ চামচ এমন ভাবে খেলাতে হবে যাতে মিছরি মৌরির রেশিও মনমত হয়৷ এরপর ফেরত টাকা মানিব্যাগে রাখতে রাখতে ম্যানেজারের দিকে তাকিয়ে সামান্য ঘাড় দোলানো।

মুখ ভরা মৌরি, কাজেই কথা নয়৷ স্রেফ বডিল্যাঙ্গুয়েজের খেলে বুঝিয়ে দিতে হবে "ভালোই খেলাম আপনাদের দোকানে৷ ফার্স্টক্লাস! তা, আজ আসি, কেমন? আবার দেখা হবে"৷

মাঙ্কিটুপির তালুর ফুল

মাঙ্কিটুপির সবচেয়ে দামী অংশটা হলো মাথার তালুতে বোনা ওই ঝিরঝিরে ছোট্ট ফুল। ও'টার অস্তিত্ব অত্যন্ত জরুরী; মাঝেমধ্যে নিজের টিকি (হোক টুপির এক্সটেনশন, আছে তো আমার মাথায়) চুলকে নেওয়ার মধ্যে যে কী দারুণ তৃপ্তি রয়েছে৷

কল্পনায় সাজিয়ে নিন;
হিলস্টেশনের পড়ন্ত বিকেল৷
প্রবল শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আপনি এক ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লেন৷
জীর্ণ কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে,
এক প্লেট থুকপা অর্ডার দিয়ে,
রাবড়ি-মিষ্ট মেজাজে, চোখ নরম করে বুজে- নিজের মাঙ্কিটুপির তালুর ফুলে আঙুল বুলিয়ে চলেছেন। অপূর্ব না? তবে এর চেয়েও হাইক্লাস ব্যাপার বোধ হয় প্রেমিকার মাঙ্কিটুপির তালুর ফুল ধরে টান দিয়ে বলা, "অ্যাই অ্যাই, ও'দিকে দ্যাখো...আকাশের রঙটা কী মার্ভেলাস"!

পুনশ্চ:
মনে রাখবেন৷ মাঙ্কিটুপিতে যদি ওই তালুর-ফুলখানা না থাকে তা'হলে জানবেন ও'টা মাঙ্কিটুপির পদ্য নয়৷ ও'টা কিডন্যাপার বা ব্যাঙ্কিডাকাতদের মুখঢাকার টুপি৷ 

Friday, January 12, 2024

সুবিমল আর লিপি

সে'দিন বাড়ির পরিবেশ অগ্নিগর্ভ।

সুবিমল একথলে চুনোমাছ নিয়ে সদ্য বাজার থেকে ফিরেছে৷ বলাই বাহুল্য চুনোমাছগুলো বাজার থেকে না কাটিয়েই সে বাড়ি চলে এসেছে৷ ছুটির বাজারে কোনও মাছওলার অত সময় নেই যে আলাদা করে আধকিলো চুনোমাছ কেটে, ছাড়িয়ে, পরিষ্কার করে প্যাকেট করে দেবে৷ কাচুমাচু সুবিমল বাড়ি ফিরেই অবশ্য নিজেই রান্নাঘরের সিঙ্কে মাছের প্যাকেট উপুড় করে তা বাছতে বসেছে৷ 

লিপির মেজাজ সপ্তমে, সে'টা অকারণ নয়৷ আধকিলো মাছ কেটে ধুয়ে গামলায় রাখতে সুবিমলের বেলা কাবার হয়ে যাবে৷ রান্না চাপাতে চাপাতে বেলা গড়িয়ে বিকেল৷ সন্ধের চা আর দুপুরের ভাত একসঙ্গে খেতে হবে৷ পুরো দিনটাই জলে।

সুবিমলের এই এক রোগ, বড় ধীরেসুস্থে তার চলাফেরা৷ রোববার বাজারে তিনঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে যৎসামান্য জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফেরা৷ দাড়ি কামাতে গিয়ে অন্তত চল্লিশ মিনিট ধরে গালে সাবান ঘষে আর গুনগুনিয়ে নচিকেতার গান গাওয়া৷ ক্রসওয়ার্ড পাজল সলভ করে অবলীলায় ছুটির বিকেলগুলো কাটিয়ে দেওয়া। 

সুবিমলের এই গা-এলিয়ে চলা অভ্যাসের জন্য লিপিকে যে কতরকম হয়রানি সামলাতে হয়৷ সামান্য বাতাসা আনতে বেরিয়ে ঘণ্টা দুই ঘোরাঘুরি করে ফিরে এসে বলে, "যাহ্, ভুলে গেছি"৷ অফিস ফেরতা দু'জনের সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা। লিপি সিনেমা হলের সামনে বেমক্কা দাঁড়িয়ে রইল, অথচ সুবিমলের দেখা নেই আর তাঁর মোবাইল বেজে যাচ্ছে; ফোন ধরার নাম নেই৷ দুশ্চিন্তায় জেরবার হয়ে ঘণ্টাখানেক পর লিপি বাড়ি ফিরে গেলে৷ জানা গেল সুবিমল মোবাইল ফোন অফিসে ফেলে বেরিয়ে পড়েছিল। অত্যন্ত ভিড় দেখে পর পর বেশ কয়েকটা বাস ছেড়ে দিয়েছে।

সুবিমলকে মন দিয়ে মাছ বাছতে দেখে সে'সব কথাই বারবার মনে পড়ছিল লিপির। লিপি জানে এখুনি সুবিমল লিপির দিকে ঘুরে তাকিয়ে বোকা বোকা হাসির ঢাল বাগিয়ে বলবে, "একদম ফ্রেশ পেয়ে গেলাম, বুঝলে, টপ কোয়ালিটি৷ একেবারে হাইক্লাস৷ চট করে ভেজে নিচ্ছি, তারপর দু'জনে মিলে রসিয়ে রসিয়ে ঘি-ভাতের সঙ্গে খাব'খন৷ এখুনি রেডি হয়ে যাবে"৷

তারপরেই প্রবল ঝগড়া৷
সে বাড়ির ছাত উড়িয়ে দেওয়া ঝগড়া৷
আকাশ কালো করে আসা ঝগড়া৷
আগুনে ঘি ঝগড়া৷ 

সেই ঝগড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে নিজের মোবাইলে সুবিমলের এই ফটোটা তুলেছিল লিপি৷ নীল-সাদা টিশার্ট আর পাজামা পড়ে কিচেন সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে সুবিমল। দ' হাতে চুনো মাছ কচলাচ্ছে, আর ঘাড় ঘুরিয়ে লিপির দিকে তাকিয়ে সে কী মারাত্মক বোকা-বোকা হাসির ফোয়ারা বইয়ে দিচ্ছে।

এত রাগ, এত ঝগড়া৷ তবু সে বোকাবোকা হাসিতে নির্ঘাৎ একটা গোলমেলে ব্যাপার ছিল৷ নয়ত ওই তেলেবেগুন অবস্থাতেও লিপি সুবিমলের ছবি তুলে রাখতে যাবে কেন? অত রাগবিরক্তির মধ্যে এই ছবিটা কেন তুলে রেখেছিল লিপি?

মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে খানিকক্ষণের জন্য চোখ বুঝলে লিপি৷ আজও, সুবিমলের সেই আলাভোলা হাসি যখনতখন দেখার জন্য তার মোটেও মোবাইল ফোনের দ্বারস্থ হতে হয় না৷ 

Thursday, January 4, 2024

"আমার"




কোনো ভালো লাগার জিনিসকে বাড়তি অবাস্তব প্রশংসায় ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা মারাত্মক তৃপ্তি রয়েছে৷ 

এই যেমন অকারণ একটানা বলে যাওয়া যে চন্দ্রবিন্দুর 'সোনামন'য়ের মত সুন্দর গান গোটা দুনিয়ায় আর নেই৷ ওই গানে রোদ্দুরে চাঁদিফাটা দিনকেও মিষ্টিভাবে মেঘলা মনে হয়৷ ঢাকুরিয়া ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে, কানে ইয়ারফোন গুঁজে সে সুর শুনলে মনে হয় মুখে সমুদ্রের হাওয়ার ঝাপটা লাগছে৷ 

তেমনই।

বেলিয়াতোড়ের লাল্টুর চা সেই কবে খেয়েছি, এখনও সবার কলার টেনে বলে বেড়াই যে অমন চা খেলে নির্ঘাৎ আড়াই মাস আয়ু বাড়ল।

ছোটোবেলার স্কুলের পাশের নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে শীতের সন্ধেবেলা হাঁটার সময় মনে হয় আমার মত জবরদস্ত ইয়ারদোস্ত এ দুনিয়ায় আর কেউ পেয়েছে কি?

পুরনো কলকাতাইয়া গলির জীর্ণ মেসবাড়ির জানলা ঘেঁষা চৌকিটায় গা এলিয়ে দিয়ে মনে হত "এই হলো গিয়ে রাজার মেজাজ, জমিদারি ঘ্যাম আর লাটসাহেবি কেত"।

এমন কত অবাস্তব প্রশংসার ঝড় ওঠে মাঝেমধ্যেই। উচ্ছ্বাসের পারদ সামান্য নেমে এলে একটু লজ্জা পাই৷ তবে সে ক্ষণিকের লজ্জা। পরক্ষণেই গর্জে ওঠা, "ও'টা আমার গান৷ আমার চা। আমার রাস্তা। আমার জানালার পাশে আমার বিছানা। ও'গুলো আমার। ও'গুলোয় কোনো খুঁত নেই, থাকতে পারে না।।

যদ্দিন অযৌক্তিক এই "আমার" গুলো আছে, তদ্দিনই।

উপাসক



- ফুচকা-দা'ভাই৷ খাওয়ান দেখি। 

- ঝাল হবে?

- তা হবে। তবে ইয়ে, ফ্রেশ আলু মাখুন না৷ 

- আলুমাখা আছে তো৷

- আছে৷ তবে৷ যদি ফ্রেশ মাখা হয়, দারুণ লাগবে৷ জানেন। অনুরোধ৷ 

- দারুণ লাগবে? বেশ তবে মাখি।

- হে হে৷ থ্যাঙ্কিউ।

- একটু ভালো করে..একটু কষে মাখবেন দাদাভাই..ডুমো ডুমো আলুর টুকরো মুখে পড়লে ফুচকা চেবানোর ফ্লো নষ্ট হয়ে যায়৷ 

- আপনি বেশ সমঝদার মনে হচ্ছে।

- আপনাদের মত গুণীমানুষদের সমাদর করার চেষ্টা করি। এ'টুকুই। কিন্তু শুনুন..ছোলাসেদ্ধ দেবেন না প্লীজ৷ তা'তে আলুমাখার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।

- আলুমাখার কীসের কী হবে?

- ওই৷ ছোলাসেদ্ধ দেবেন না দাদাভাই।

- পেঁয়াজকুচি? 

- বাহ্৷ দিব্যি কুচিয়েছেন দেখছি৷ মিহি, কনসিস্টেন্ট। দিন না, দিন৷ তবে অল্প।

- লঙ্কাকুচি?

- অবশ্যই। তবে লঙ্কাটা ফ্রেশ কেটে নেবেন? একটা লঙ্কা কুচিয়ে দিলেই হবে।

- হুম৷ বেশ৷ ঠিক আছে। এই যে।

- আসলে কাঁচালঙ্কা তো ঝালের জন্য নয়৷ তার জন্য রয়েছে লঙ্কাগুঁড়ো আর কাঁচালঙ্কা বাটা। সুবাসের জন্য কাঁচালঙ্কা; সে'টা টাটকা কুচোনো হলে যে তাজা গন্ধ..।

- আর কোনো ফরমায়েশ? 

- ফরমায়েশ বলবেন না দাদাভাই৷ এ'টা ওই, মিনতি করি পদে ধরণের সিচুয়েশন৷ মিনতিটা হলো; তেঁতুলজল সামান্য, আর অতি অল্প গন্ধরাজ৷

- সে তো থাকবেই।

- সেই তো৷ তবে, পরিমিত।  আপনি ঝালের ব্যাপারে বরং আর একটু চালিয়ে খেলতে পারেন৷ আর অল্প লঙ্কাবাটা..এই জাস্ট এক চিমটি..।

- এতটুকু?

- আর সামান্য কম..। না না..বেশি কমে গেল..।

- এ'বার?

- পার্ফেক্ট। আর ইয়ে৷ নুনটা সামান্য কম দিন৷ একটু বিটনুন পাঞ্চ করুন৷ বাটিতে আছে দেখছি তো।

- অল্প নুন আর অল্প বিটনুন?

- সবই ব্যালেন্সের খেল।

- এ'বার হয়েছে?

- আরে দাদাভাই আমি বলার কে। শিল্পী তো আপনি৷ আমি তো উপাসক।

- এ'বার তা'হলে দিই? ফুচকা?

- গোটা ব্যাপারটা আর এক রাউন্ড মেখে নেবেন? মারাত্মক স্মুদ হবে ব্যাপারটা৷ 

- শুনুন না দাদা৷ আপনি এ'দিকে আসুন৷ এই যে গামলা। নিজে মেখে নিন৷ তৃপ্তি পাবেন।

- গ্যালারিতে বসে "উই ওয়ান্ট সিক্সার" বলা হুজুগে মানুষকে ব্যাট হাতে পিচের দিকে ঠেলে দিতে নেই। খাওয়ান দাদা। খাইয়ে যান।

- মাইরি৷ আপনার মত দু'টো খদ্দের দিনে পেলে ফুচকার ব্যবসা ছেড়ে দিতে হবে।

- ও দাদাভাই৷ আমায় দু'টো কটু কথা বলতে হয় বলুন৷ কিন্তু নিজেকে ফুচকা ব্যবসায়ী বলে গুণগ্রাহীদের ব্যথা দেবেন না৷ হেমন্তবাবু কি সঙ্গীত-ব্যবসায়ী ছিলেন? মাইকেল মধুসূদন কি পদ্য-ব্যবসায়ী?

- বাটি এগিয়ে দিন দাদা৷ আর দেরী নয়। প্লীজ।

Tuesday, January 2, 2024

অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীর ল্যান্ডিং



স্পেস-ক্র্যাফট ল্যান্ড করেছে আড়াই ঘণ্টা আগে। এক্কেবারে মাখনের মত ল্যান্ডিং, অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরীকে সামান্য বিষমও খেতে হয়নি। বেশ চনমনে মেজাজে ককপিটের মধ্যে খানিকক্ষণ ইউরেকা-মারদিয়াকেল্লা-উরিউরিবাবা-কীদারুণ বলে নাচানাচি করবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু স্পন্ডেলাইসিসের জ্বালাতনের কথা ভেবে লাফালাফির ব্যাপারটা বাদ দিলেন চৌধুরীবাবু। স্পেস-ক্র্যাফট নেভিগেশন কনসোল স্পষ্ট বাতলে দিচ্ছে যে ল্যান্ডিং একদম খাপেখাপ হয়েছে। তিনি এসে পড়েছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, এই গ্যালাক্সির নাম উরগেন। পৃথিবী থেকে উড়ে আসতে সময় লেগেছে সতেরো মাস বাইশ দিন সতেরো ঘণ্টা উনিশ মিনিট তেত্রিশ সেকেন্ড। কলকাতা স্পেস সেন্টারে বসে হিসেব কষে যা দেখে গেছিল, তার থেকে রীতিমত আড়াই মিনিট কম। ফিরে গিয়ে একটা মেডেল-টেডেল পাওয়া যেতে পারে, কপালে থাকলে সরকারের থেকে কোনও বাহারে খেতাব আর তার পাশাপাশি স্পেশ্যাল বখশিশ হিসেবে মিক্সারগ্রাইন্ডার বা সরবতের গ্লাসের সেটও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পৃথিবীতে সুখবরটা পাঠানোর আগে একটু এই নতুন গ্রহে নেমে হাঁটাহাঁটি করে নেওয়া দরকার। জরুরী কিছু ডেটা আর স্যাম্পল সংগ্রহ হয়ে গেলেই বাহাদুরির ব্যাপারটা স্পেস-সেন্টারে জানিয়ে দেওয়া যাবে'খন। লোকে জানুক, অরবিন্দ চৌধুরী এলেবেলে অ্যাস্ট্রনট নয়। হিসেব অনুযায়ী ঘণ্টা-চারেকেই কাজ সেরে ফেলা যাবে। তারপর স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি গুটিয়ে দুগগা বলে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া। বেরোনোর আগে গ্রহটার একটা নাম দিয়ে যেতে হবে। গিন্নীর অনারে এ গ্রহের নাম সুতপাস্ফেয়ার দেওয়ার ইচ্ছে অরবিন্দবাবুর। আশা করা যায় এই রোম্যান্টিক চমকের ফলে বিবাহবার্ষিকীর খরচ কিছুটা কমানো যাবে।

ফ্রুটজ্যাম আর পার্মাফ্রেশ পাউরুটির চার স্লাইস খেয়ে টেস্টিং আর স্যাম্পল কালেকশন কিট গুছিয়ে নিলেন অরবিন্দবাবু। এক্সিট ডোরের দিকে এগোনোর আগে এনভারোনমেন্ট-চেক মনিটরের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ অবাক হতে হলও অরবিন্দবাবুকে। এ গ্রহের বাতাস-টাতাস যে অনেকটা পৃথিবীরই মত, বিজ্ঞানীদের হিসেব তেমনটাই আভাস দিয়েছিল বটে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়, আজকাল গোল্ডিলক কন্ডিশনস সমেত প্রচুর গ্রহেই পৃথিবীর মানুষ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে। বহু এলিয়েন প্রজাতির চোখ ধাঁধানো সভ্যতা সম্বন্ধে পৃথিবীর মানুষ এখন সবিশেষ ওয়াকিবহাল। এই উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে যে কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে আছে তা অরবিন্দবাবুর জানা নেই; তবে মনিটরের দিকে তাকিয়ে গ্রহের এ অঞ্চলের পলিউশন কাউন্ট দেখে চমকে যেতেই হলও; যেন অবিকল পৃথিবী।

তবে কি এই প্রথম মানবসভ্যতার কাছাকাছি কিছু নজরে পড়তে চলেছে? উফ্‌, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

পিলে চমকানো কিছু আবিষ্কার করতে পারলে কালীঘাটে জোড়া পাঁঠা বলি দেবেন ফিরে গিয়ে, এমন প্রার্থনা করেই স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুললেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। 

***

মিনিট দুয়েকের মধ্যে যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। একের পর এক চমক। আর এক বিশ্রী আতঙ্ক যা বর্ণনা করার ভাষা অরবিন্দবাবুর জানা নেই।

স্পেস-ক্র্যাফটের দরজা খুলতেই অদ্ভুত কতগুলো জিনিস ধাক্কা দিল ভদ্রলোককে।

প্রথমত, গন্ধ। আলুর চপ, এগরোল, ঘাম, পারফিউম, আর ডিজেল পোড়া ধোঁয়ার ককটেল। এ ককটেল তার সুপরিচিত।

দ্বিতীয়ত, শব্দ। এ'খানেও রকমারি ব্যাপারস্যাপার; হাজার-হাজার মানুষের হইহই আর সে হইহইয়ের সিংহভাগই যে মোটা-দরের কলকাতাইয়া বাংলা, তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। এমন কি মাইকে দু'বার ঘোষণাও শুনতে পেলেন; "বজবজ থেকে চোদ্দ বছরের বাপটু সান্যাল মেলায় এসেছেন ছোটদাদু হরিহর সান্যালের সঙ্গে। বাপটু হারিয়ে গেছে, ছোটদাদুর ধারণা বাপটু ছোটদাদুকে ফাঁকি দিয়ে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। বাপ্টু তুমি যে'খানেই থাকো আমাদের কমিট অফিসের সামনে চলে এসো। তোমার ছোটদাদু রেগে বোম হয়ে এ'খানে পায়চারি করছেন"। দূরে ফাটা মাইকে কুমার শানুর গান ভেসে আসছে - "অমর শিল্পী তুমি কিশোরকুমার, তোমাকে জানাই প্রণাম"।  আর সব ছাপিয়ে; স্পেস-ক্রাফটের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের করতালি আর উল্লাস। পিলে চমকে কানে তালা লেগে অরবিন্দবাবুর সে এক বিশ্রী অবস্থা।

তৃতীয়ত, একটা হাড়-হিম করে দেওয়া দৃশ্য। অরবিন্দবাবু নিশ্চিত যে তার স্পেস-ক্র্যাফট এসে নেমেছে কলকাতার মিলন-মেলা প্রাঙ্গণে। নির্ঘাত মরশুমি আনন্দমেলা বসেছে। 

এত বড় ভুল হলটা কী করে? পকেট থেকে ইন্টার-গ্যালাক্টিক নেভিগেশনট্র্যাকার বের করে দেখলেন - কী আশ্চর্য, হিসেবে কোনও ভুল নেই। তিনি রয়েছেন উরগেন গ্যালাক্সির ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ গ্রহে। কিন্তু, এ'সব তবে কী?

ঠাহর করার আগেই অরবিন্দবাবু বুঝতে পারলেন যে মেলার ঠিক মাঝখানে এসে নেমেছেন তাঁর স্পেস-ক্র্যাফট। আর মেলা-কমিটির করিতকর্মা লোকজন একটা টিকিট কাউন্টার বসিয়েছে।  সর্বনাশ, লোকে লাইনে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকবে বলে। চারজন ছোকরা ছেলে চোঙা হাতে ক্রমাগত চিল্লিয়ে যাচ্ছে; "আপনার ঠেলাঠেলি করবেন না। হাত টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন। শিগগিরি স্পেস-ক্র্যাফট ভ্রমণ শুরু হবে। লাইন ভাঙবেন না, লাইন ভাঙলেই টিকিট ক্যান্সেল। আর হ্যাঁ, দয়া করে মুড়ি বেগুনির ঠোঙা বা এগরোল হাতে স্পেস-ক্র্যাফটে প্রবেশ করবেন না। সেলফি নিতে গিয়ে অযথা ভিড় বাড়াবেন না"। 

গলা শুকিয়ে এলো অরবিন্দবাবুর। এ কী কাণ্ড! কিন্তু চট করে যে স্পেস-ক্র্যাফটে ঢুকে দরজা বন্ধ করবেন সে উপায়ও নেই, পা'দুটো একতাল লোহার মত ভারি। এমন সময় স্পেস-ক্রাফটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন এক মধ্যবয়স্ক হেডমাস্টার-গোছের এক ভদ্রলোক, বুকপকেটে ব্যাজ আঁটা, তা'তে লেখা, "অলোক হালদার, সভাপতি, কলকাতা আন্তর্জাতিক মেলা কমিটি। 

***

- আ...আ...আমি...।
- আপনি অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। ওয়েলকাম টু মিলন-মেলা প্রাঙ্গণ ইন কলকাতা, প্ল্যানেট পৃথিবীজ গ্রেটেস্ট সিটি।

- ইয়ে, আপনার কিছু ভুল হচ্ছে...অলোকবাবু। আমি এসেছি পৃথিবী নামক গ্রহের কলকাতা নামক শহর থেকে।

- হে হে। আপনি তেমনটা ভাবতেই পারেন। কিন্তু আমাদের কাছে আপনি এসেছেন গ্রহ কোড ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২ থেকে।

- না না, সে'টা আপনাদের গ্রহের পোজিশন। আমাদের গ্রহ পৃথিবীর পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে।

- হে হে হে...আপনার কাছে যা সোজা, আমাদের কাছে তাই উলটো। অসুবিধে কীসের। তবে আপনার অনেক ধকল গেছে। আসুন, মেলা কমিটির অফিসে বসে বিশ্রাম নেবেন। আপনার জন্য ফাইভ স্টার অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে সে'খানে। আর ইয়ে, আমাদের এমএলএ বিপিনবাবু আসছেন স্পেস-ক্র্যাফট বিলাসভ্রমণ উদ্বোধন করতে। তিনি খুব আগ্রহী আপনার সঙ্গে আলাপ করতে।

- আমার মাথাটা কেমন গুলোচ্ছে অলোকবাবু। আমি অ্যাস্ট্রনট। আমার অনেক কাজ। আর স্পেস-ক্র্যাফটে এত লোক ঢোকানোটা কি ঠিক হবে?

- ও মা! যে'দিন আপনি যাত্রা শুরু করলেন, সে'দিনই গোটা শহর জুড়ে পোস্টার পড়ে গেল। এ'সব ইন্টার-গ্যালাক্টিক মুভমেন্ট আমরা ট্র্যাক করে থাকি কিনা। আপনি এ পাড়ায় পায়ের ধুলো দেবেন খবর পাওয়ায় মেলা বসার পারমিশন হয়ে গেল। ইকনোমি বনবন করে ঘুরতে আরম্ভ করল। আপনি সময়মত এসে পৌঁছনোয় আমরা খুব খুশি।

- আমার মাথাটা বনবন করে ঘুরছে যে।

- ডোন্ট ওরি। মেলা তো ক'দিন মাত্র। ক'দিন না হয় রিয়েল কলকাতা উপভোগ করে যান।

- রিয়েল কলকাতা যে রিয়েল পৃথিবীতে রয়েছে অলোকবাবু।

- রিয়েল এ'টাই স্যার।

- এ তর্কের কোনও মানে হয়? এ'সব বাদ দিন। আমায় ফেরত যেতে হবে।

- আপনি ভয় পাচ্ছেন অরবিন্দবাবু। ভয় পাচ্ছেন সেই ভয়াবহ আবিষ্কারের। আপনার পৃথিবী আদত পৃথিবী নয়, আপনাদের কলকাতা আদত কলকাতা নয়; এ ধাক্কা যে মারাত্মক ধাক্কা। তবে মনখারাপ করবেন না। অলটারনেট কলকাতা তো এ দুনিয়ায় কম নেই। গত বারো বছেরো আপনি এ নিয়ে সাত নম্বর মক্কেল। এর আগের ছ'জন নাকে খত দিয়ে স্বীকার করে গেছেন যে আসল কলকাতা এ'খানেই। 


***

মেলা-কমিটির অফিসের সোফায় গা এলিয়ে পড়েছিলেন অ্যাস্ট্রনট অরবিন্দ চৌধুরী। তাঁর চোখমুখ পরিতৃপ্ত, ঠোঁটে এক রোমান্টিক হাসি। আনন্দমেলা দু'দিন আগেই শেষ হয়েছে। কিন্তু মেলা কমিটির আতিথ্যে কোনও ঘাটতি পড়েনি। অলোক হালদার নিজে এ'বেলা ও'বেলা তাঁর খোঁজখবর নিয়ে যাচ্ছেন। ফিরতে হবেই, কিন্তু অরবিন্দবাবুর বিশেষ তাড়া নেই। এ'খানকার ক্যালেন্ডারে এখন মার্চের সতেরো তারিখ। আর অরবিন্দবাবুর সামনের টেবিলে থরে থরে সাজানো খাঁটি হাইকোয়ালিটি এবং টাটকা নলেন গুড়ের সন্দেশ। যে পৃথিবীর কলকাতায় নির্ভেজাল নলেনের বাস বছরে সাড়ে চার মাস, তার পৃথিবীত্ব ও কলকাতাত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করাটা মুর্খামি; এ সত্য অস্বীকার করার ক্ষমতা অরবিন্দবাবুর নেই। হপ্তা-খানেক পর অরবিন্দবাবু ফিরে যাবেন গ্রহ ৩৪৩৩ বাই ৩২৯২-তে, যে'খানে সুতপা তাঁর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। স্পেস-ক্র্যাফটের কন্ট্রোলড পরিবেশে আদত কলকাতার কিলো দশেক টপ-ক্লাস নলেন সন্দেশ নিয়ে ফিরতে কোনও অসুবিধেই হবে না। বিবাহবার্ষিকীতে গিন্নীর জন্য এর চেয়ে ভালো উপহার আর কীই বা হতে পারে। 


(ছবিটা রেয়া আহমেদের আঁকা। বংপেন ৭৫-য়ের জন্য এ'টা আর আরো জমজমাট কিছু স্কেচ এঁকেছিল সে) 

তিয়াত্তর নম্বর হ্যাপি নিউ ইয়ার

বাহাত্তর নম্বর "হ্যাপি নিউ ইয়ার" আদানপ্রদান পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। মদনবাবু একগাল হেসে ঘাড় দুলিয়ে সামান্য ঝুঁকে বিগলিত ভঙ্গীতে বলে উঠছিলেন, "হে-হে-হে-সে-হে-হে-ম টু-হু-হু-হু ই-উ-হু-হু"। রাস্তায় দেখা হওয়া পাড়ার এমএলএ-য়ের পেয়ারের মাস্তান হুব্বা দত্ত বা অফিসের বারান্দায় মুখোমুখি হওয়া বড়সাহেব চৌহানের মত কেউকেটা হলে দরদ দিয়ে জুড়ে দিয়েছেন, "উইশ ইউ আ ফ্যান্টাস্টিক ট্যুয়েন্টি ট্যুয়েন্টি ফৌর"। সবই জ্যামিতির হিসেবে চলছিল। ব্যালকনির ওপার থেকে রাহাবাবু, মর্নিংওয়াকে লাফিং ক্লাবের দস্যু সদস্যরা, কাটোয়া লোকালের ডেলিপ্যাঞ্জার ক্লাব, অফিসের ইয়ারদোস্ত; বাহাত্তরখানা নিউইয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় দিব্যি ঘটেছে।

গোলমাল বাঁধল তিয়াত্তর নম্বর 'হ্যাপি নিউ ইয়ারে' এসে। রোজকার মত অফিস থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের কাছে পিন্টুর পানের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা খয়েরছাড়া সাদাপান দিতে বলে গোল্ডফ্লেক ধরিয়েছিলেন। খদ্দেরদের ভীড় কম থাকলে পিন্টুর সঙ্গে সামান্য গপ্পগুজব চলে যতক্ষণ না হাওড়ার মিনি আসছে। আজ যে কী হলো, পানটা খিলি করে এগিয়ে দিতে দিতে পিন্টু বলে বসলে, "আসুন মদনদা, হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার"।

মদনবাবুর বলার কথা ছিল, "হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ টু পিন্টু"। কিন্তু মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, "পিন্টু, বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না জানো"!

খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল পিন্টু, ভাব দেখালো যেন শুনতে পায়নি। কিন্তু এই তিয়াত্তর নম্বর 'হ্যাপি নিউ ইয়ারের' চাপে মদনবাবুর মাথাটা কেমন যেন একটু ঘেঁটে গেছিল।

- তুমি আদর করেই বলেছ হ্যাপি নিউ ইয়ার। সে'টা আমি বুঝেছি পিন্টু।

- হে হে...আপনি...।

- কিন্তু জানো পিন্টু, হ্যাপি-ট্যাপির বিশেষ কিছু নেই।

- অ। মনটন খারাপ নাকি মদনদা? শরীরটরীর?

- শরীর মজবুত আছে। কোলেস্টেরলের গ্যারেন্টি নেই অবশ্য। গতমাসে টেস্ট করিয়েছিলাম। ডাক্তার নস্কর বলে দিয়েছেন মটন খেয়ে ওঁর চেম্বারে ঢুকলে ঠ্যাঙ ভেঙে দেবেন। তবে এ'ছাড়া তেমন ইয়ে নেই। মনটা ততটা মজবুত হয়ত নেই জানো। অমন নড়বড়ে মন নিয়ে মিছিমিছি নিউ ইয়ার উইশ করে গেলাম বটে অনেকগুলো আজ। গুনে গুনে বাহাত্তরটা। কারুর ভালো চেয়ে উইশ করিনি জানো পিন্টু? কী বিষ লোক ভাবো আমি।

- ছি ছি মদনদা। অমনভাবে ভাবছেন কেন!

- এই তুমি...তুমি এত আদর করে রোজ পান খাওয়াও...তোমায় মিছিমিছি উইশ করতে ইচ্ছে হলো না।

- বেশ তো। আমায় না হয় মন থেকেই বলুন, হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার। নিন, বলে দিন।

- সে'খানেই তো সমস্যা ভাইটি। নিজের মেজাজ এমন খিঁচড়ে থাকে, অন্যর জন্য মন থেকে ভালো কিছু চাইতে ইচ্ছে করে না।

- তা'হলে থাক না। ব্যস্ত হচ্ছেন কেন।

- পিন্টু, আমার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না।

- আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?

- ওহ। এদ্দিন পান খেলাম। এত গল্প করলাম; ক্রিকেট পলিটিক্স ইলিশের দাম কত কী। এ'সব বলা হয়নি। আমার বাড়িতে আমি আছি। আর আমার এক পিসেমশাই আমার সঙ্গে থাকেন। সম্ভবত নিজের পিসেমশাই নন। কী'ভাবে যেন লতায় পাতায় জড়িয়ে গেছি। তাঁরও কেউ নেই, আমারও...। কেউ না থাকাটাই আমাদের সম্পর্ক।

- বে-থা?

- এককালে একটা বিয়ে করেছিলাম। টেকেনি। আমারই দোষে জানো, ওই যে বললাম। মহাবিষ চীজ আমি। সে বেচারি পালিয়ে বেঁচেছে। সে যাওয়ার পর বছর দশেক ভাবলাম সব তারই দোষ, বদমাইস মেয়েমানুষ। তারপর টের পেলাম ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট আমার মধ্যে।

- ইয়ে, মদনদা...আপনার শরীর ভালো আছে তো?

- বিয়ের আসবাব সে কিছুই নিয়ে যায়নি। এমন ছ্যাঁকা খেয়ে সরে পড়েছে যে ও'সবের দাবী জানাতে আসারও সাহস পায়নি। সেই থেকে-যাওয়া আসবাবের মধ্যে একটা ঢাউস ড্রেসিং টেবিল আছে জানো। তার ইয়াব্বড় আয়না। ও'টায় আমি ভূতের ভয় পাই। আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছে করে না যে।

- মদনদা। ও মদনদা। আপনি একটু দেরী করে বাড়ি ফিরলে পিসেমশাই চিন্তা করবে না তো?

- টেরই পাবে না। লতা এসে খাবার দিয়ে যাবে, তা'হলেই হবে। খিদের কষ্ট টের না পেলে তিনি আমায় চিনতে পারেন না। খোঁজও করেন না।

- আপনি একটু ওই বেঞ্চিতে বসবেন? আধঘণ্টা নেব, তার মধ্যে ঝাঁপ নামিয়ে আসছি।

- তুমি দোকান বন্ধ করে দেবে?

- বছরের পয়লা, বেশিরভাগ অফিসই তো বন্ধ। আমার বাড়ি মেচেদায়। এখানে একটা ছোট্ট ঘর ভাড়া করে থাকি। অবশ্য সে'টাকে গুমটি বললেও চলে। সে'খানে রোজ সন্ধ্যেবেলা তাসের আড্ডা বসে। রামি। আপনার চলে?

- রামি? চলে।

- চার নম্বর মক্কেল, স্ক্র্যাপের দালাল বল্টু সামন্ত দিনতিনেকের জন্য কলকাতার বাইরে। আপনি সঙ্গ দিলে আজকের সন্ধেটা জমে যাবে।

- ইয়ে, এ'সবের আবার কী দরকার..।

- রুটি, মুর্গির ঝোলে আপত্তি নেই তো মদনদা?

- দ্যাখো দেখি কাণ্ড, আমি উড়ে এসে তোমাদের ঘাড়ে উঠে বসলাম।

- মদনদা। স্বার্থ আমার। সস্তায় একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ড্রেসিংটেবিল খুঁজছি অনেকদিন৷ একা মানুষ হলেও, টেরির শখটা বহাল আছে৷ হে হে।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার ভাই পিন্টু৷ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ।

টুপি

- ঘনাদা, আপনার টেবিলে ওই সবুজ ন্যাতাটা নতুন দেখছি? ওটার পিছনেও কোনও পেল্লায় গল্প আছে নাকি?

- কেন? আমার চারপাশে শুধুই গালগল্প থাকে নাকি? এ'টা দিয়ে গতকাল থেকে আমি টেবিল পরিষ্কার করছি৷

- ওহ্, আমি ভাবলাম..।

- ভাবা বন্ধ করো।

- আচ্ছা, আসি..।

- শোনো..।

- কিছু বলবেন?

- তোমার অস্ট্রেলিয়ায় যাতায়াত আছে?

- আজ্ঞে?

- অস্ট্রেলিয়া..ডাউন আন্ডার..সে'দিকে যাতায়াত আছে?

- কই..না তো..কেন বলুন তো?

- না, এমনি৷ খামোখা দাঁড়িয়ে না থেকে এ'বার এসো৷