Thursday, December 4, 2025

মদনমোহন


চৌকির ওপর বসে বাবু মোহনদাস অসীম তৃপ্তিসহ একশো টাকার নোটের একটা ঢাউস বান্ডিল গুনছিলেন। স্যাঙাৎ মদন মেঝেয় বসে লুডোর বোর্ড পেতে লাল-হলুদে নিজের হয়ে চাল দিয়ে নীল-সবুজের নিজেকে পর্যুদস্ত করতে ব্যস্ত। রাত এখন পৌনে ন'টা। অজ গাঁ, এখানের রাত ন'টা প্রায় রাত দেড়টার সমান। তায় আবার ভরা-ডিসেম্বর, টিনের চাল ফাঁকি দিয়ে কনকনে হাওয়া মোহনদাসের গায়ের শাল ভেদ করে যেন বরফকুচি ছড়িয়ে দিচ্ছে। নেহাত সস্তা টাকায় বিস্তর গরম, তাই এই অচেনা গাঁয়ের দাপুটে শীতকে বিশেষ পাত্তা দিচ্ছিলেন না মোহনদাস। মদনের অবশ্য শীত, টাকা, চোরাইমাল এ'সবে কিছু এসে যায় না। সে লুডো-সাধক, দু'ছক্কা তিন কী'ভাবে সাজালে মুক্তিলাভ হবে, এ ধরণের চিন্তাতেই তাঁর রাতভোর হয়ে যাবে।

হুগলির অন্যতম সেরা ওয়্যাগন-ব্রেকার মোহনদাসের লেজুড় হয়ে ঘুরে সুখেই আছে বর্ধমানের মদন সাহা। এই ভবঘুরে জীবনের জন্যই যেন তার জন্ম। মোহনদাস চাইলে সে চলতি মালগাড়ি থেকে অবলীলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ওজনদার বস্তা কাঁধে। মোহনদাস চাইলে সে নির্দ্বিধায় পুলিশের লাঠি বা অন্য মস্তানদের লাথি পিঠ পেতে নিয়ে ফাঁকতালে নিজের কাজ হাসিল করে বেরিয়ে যায়। মোহনদাস চাইলে সে আলুপোস্ত কি মেটেচচ্চড়ি রেঁধে দুনিয়া গুলজার করে দেয়। মোহনদাসের ঠিকভুল নিয়ে মাথা ঘামানোর বান্দা মদন নয়, সে লুডো-বাউল; তাঁর আনন্দ দিনের শেষে দু'তিন দান লুডো খেলতে খেলতে কিশোরকুমারের হিন্দি গান গুনগুন করায়।

- হ্যাঁ রে মদনা, বিড়ি দে দেখি।
- এই যে...।
- এ'বারের দাঁওটা বুঝলি, ভালোই মেরেছি।
- কেয়া বাত।
- ভাবছি তোকে এ'বারে একটা নতুন শার্ট কিনে দেবো। যে'ভাবে আজ জানের ওপর খেলে তুই...।
- একটা ভালো প্রিন্ট দেখে দিও বুঝলে। ফুলফুল হলে বেশ হয়।
- মদনা। এই যে আমার হয়ে ভূতের মত খাটিস, লুটের মাল ভাগ বসাতে ইচ্ছে হয় না? শয়ে পাঁচ কি দশ তুই চাইলেই আমি কিন্তু..।
- আমি বেতন নিয়ে খাটা মানুষ গো দাদা। চুরির কয়লায় ভাগ বসালে লুডোর চাল যাবে ভেস্তে। তুমি আমায় শয়ে পাঁচ গছালে আমার রান্না আলুপোস্তের অমৃতস্বাদ আর থাকবে ভেবেছ?
- মদনা রে। তুই বড়ই হারামি।
- তোমারই আশীর্বাদ গুরু।
- বড় শীতে পেয়েছে রে মদনা। আগুনটাগুন জ্বাল। আর টাকার থলেটা সরা মাইরি। যত আপদ।
- এখুনি..। দু'মিনিটে..।
- মদনা রে, একদান লুডো খেলবি আমায় নিয়ে?
- দাদা গো, এ জিনিস তোমার সইবে না।
- আমায় কুত্তা বলছিস?
- আগুনের ব্যবস্থা করি আগে। তুমি ততক্ষণ আর একটা বিড়ি ধরাও।

সংগ্রামী সাইকেল


শখের সাইকেলকে ক্যালরি ঝরানো যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাটা যে কী নিরেট নিষ্প্রাণ বেরসিক একটা ব্যাপার।

মনে রাখবেন:

- মনখারাপের ক্ষেত্রে সাইকেলের প্যাডেল ঠেলার কচরমচরটা চমৎকার টনিকের কাজ দেয়।

- ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে সাইকেলে নিয়ে বেরোনো মানে নিজের মনকে কষে মালিশ করা।

- আর সাইকেল চালানোর সময় গুনগুনিয়ে রফি ধরলে সতেরোটা কবিতা লেখার সমান পুণ্যলাভ হয়।

এর বাইরে ও ওপরে রয়েছে সংগ্রামী সাইকেল। মনখারাপ ম্যানেজে দেওয়ার শৌখিন সাইকেলের সঙ্গে তার তুলনা অদরকারি। তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস আছে, তারা জাতে কমরেড। গানে বৃষ্টিতে তাদের মুক্তি নেই, তাদের উত্তরণ দৈনন্দিন যুদ্ধে ও ঘামে।

দেখা হ্যায় পেহলি বার


এ ছবিটা ঢাকুরিয়ায় তোলা। অফিস-ঘেঁষা চায়ের দোকানে। দোকানি দাদাটির বড় গুণ ছিল যে তার মধ্যে ছিঁটেফোঁটাও তাড়াহুড়ো ছিলো না। ডিমটা ফাটাতেন ধীরেসুস্থে। পাউরুটি ফালি করতেন মিহিমেজাজে। অফিসটাইমের দৌড়ঝাঁপ অথবা খদ্দেরদের ব্যস্ততা তাকে স্পর্শ করতে পারতো না।

তেল সঠিক লেভেলে গরম না হলে চাটুতে ডিম পড়তো না। স্টোভের আঁচ গনগনে রাখতেন না ডিম ভাজার সময়, কড়া তাপে ডিমের সেনসিটিভিটি ম্যানেজ দেওয়া যায় না। পাউরুটির গায়ের ডিম নির্ভুল লালে পৌঁছনো পর্যন্ত তিনিও চাটুর দিকে দেখছেন আর্টিস্টের মেজাজে, আমিও চাটুর দিকে চেয়ে আছি ভক্তের চোখ নিয়ে। তারপর সে ডিমপাউরুটি তুলে নেওয়া হবে পরিষ্কার প্লেটে, ছড়িয়ে দেওয়া হবে সামান্য মশলা ও নুন। সামান্যই; সে'টাই হলো ব্যালেন্স।

সকাল-সকাল অমন ভালো ডিমপাউরুটি পাতে পেলে যাবতীয় দায় বুকপকেটে নিয়েও অনায়াসে বিশ্বজয় করা যায়।

যা কিছু আমার


এই যে আমার অফিস টেবিল দেখছেন..এই যে বিস্তীর্ণ প্রান্তর..এইখানে আমি চরে খাই।

ওই আমার পোষা কম্পিউটার, আমি বাঁ চোখ নাচালে সে মিউ দেয় আর ডান চোখ নাচালে হালুম। ওই গ্যালো খটরখটরিয়া কিবোর্ড, ওই হলো মিচকে মাউস। এই হলো গিয়ে বাহারে কলমদানি যার মধ্যে ওই দেখুন কুড়ি টাকা পিস মারাত্মক এফিশিয়েন্ট ডটপেন; চারখানা। চারে মিলে ওরা আমার পার্সোনাল গেরিলা বাহিনী। আর এই পাশে দেখুন, একটা পেটমোটা ডায়েরি, তা'তে হাবিজাবি কাজের।নোট লেখা। আর সে ডায়েরির ওপর উপুড় করে রাখা ওই যে পকেট-সাইজের স্পাইরাল নোটবই যা'তে টোকা আছে মনের খবর, ধোপার হিসেব এবং মাসকাবারির প্ল্যান।

এই শশব্যস্ত টাইমস স্কোয়্যার কোণার এক কণায় রয়েছে একটা নিঝুম দুপুরের নিরিবিলি ঠাকুরদালানের ছড়িয়ে বসা তাসের আড্ডা৷ বসের দাবী, সহকর্মীর খেজুর, ফাইলের ভিড়, এক্সেলের ফর্মুলার দাপটে আমার সে কণাটা হয়তো সহজে কারুর চোখে পড়ে না; কিন্তু সে'টা আছে জানেন৷ আছে বলেই ওই টেবিলেই মুক্তি, ওই টেবিলেই হঠাৎ গা এলিয়ে দেওয়ার দু'সেকেন্ড। ওই কুরুক্ষেত্র টেবিলেই হিমালয়, ওই টেবিলেই।

গান ও মানুষ


"গান ও মানুষ
রাস্তা ও ফুল
সন্ধে ও ফেরা"

এলোপাথাড়ি কয়েকটা শব্দ বলে একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেললে বড়দা।

"শরীর খারাপ লাগছে রে দাদা? একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেবো"?

"নেভার ফেল্ট বেটার। আমি চাইলে এখন সহস্র মাইল হেঁটে যেতে পারি। তা'ছাড়া সন্ধের এই নরম আলো-বাতাস বেশ গ্লুকোজের কাজ করছে"।

এ কথার পিঠে কথা চলে না।
বড়দাটা বরাবরই এ'রকম।
সবাই বলে খ্যাপা, আমি বলি খ্যাপাটে।
সবাই ওর বকবক থেকে পালিয়ে বাঁচে, আমি ওর কাছে পালিয়ে আসি। বরাবরই।

ও পারলেই আমায় লজেন্স কিনে দেয়, যেমনটা দিত তিরিশ বছর আগে নিজের বইপত্র কেনার টাকা থেকে। আজও দিয়েছে। ও ঠিক বুঝতে পারে না আমি দিব্যি একটা চাকরি সংসার ঠেলা বুড়োটে লোক। ও জানে আমি ওর ছোট। তাই ওর পাশে আমি এত নিশ্চিন্ত।

"ছোট, পরের ম্যাচে তোকে তিন নম্বরে নামাবো। নন্তুদের থোঁতামুখ ভোঁতা করে দিস"।
উত্তর না দিয়ে বড়দার ডান হাতটা শক্ত করে ধরলাম। রাস্তা পেরোতে হবে।
"রাস্তা পেরোনোর ভয় তোর এখনও গেল না রে ছোট"।
"তুই থাকতে আমার বাড়তি সাহসের দরকারটা কী"?
"শোন, নন্তুর স্লোয়ারটা কিন্তু বড্ড ডেঞ্জারাস"।
"কিছু খাবি দাদা"?
"খিদে পেয়েছে বাবু? চল মিলনদার চপ খাওয়াই আজ তোকে। চল তারপর তোকে বাঁটুল কিনে দিই। চল তারপর মেঘপিসের বাড়ি গিয়ে স্পোর্টস্টার নিয়ে আসি। চল.."।

মেজদাকে নিয়ে একটা কেএফসিতে ঢুকে পড়লাম।
"মিলনদার মত মুর্গির চপ আর কেউ বানাতে পারে কি ছোট? বল....বুকে হাত রেখে বল..সত্যিই পারে কি"?

বড়দাকে খাইয়ে দেওয়ার সময় মনে হয়ে মনের ভিতরটা কেউ গান আর সাবান দিয়ে ধুইয়ে দিচ্ছে। বড়দার মত আর কেউ ভালোবাসতে পারে কি? বুক হাত রেখে বলতে পারি, কেউ না। আমায় ওর মত ভালোবাসতে কেউ পারে না।

কাঁচালঙ্কায় কেল্লাফতে


কাঁচালঙ্কা এমন একটা ভালো ব্যাপার যে বুঝেসুঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে হাইক্লাস কেল্লাফতে হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই যেমন ইন্সট্যান্ট নুডলস; তা সে ব্যাপারটা আজকাল মোটের ওপর কমই খাই। কিন্তু যখন খাই, তখন কাঁচালঙ্কার দরাজ ব্যবহারটা খুবই প্রয়োজনীয় বোধ হয়।

আজকাল আবার নতুন স্ট্র্যাটেজি ধরেছি। এক প্যাকেট ম্যাগি খাই ডবল মশলা (টেস্টমেকার) দিয়ে। অতএব পরের প্যাকেটটা খাই মশলা ছাড়া (চাউমিন স্টাইলে)। তা ডবল টেস্টমেকার দিয়ে সিঙ্গল ম্যাগির ক্ষেত্রে কয়েকটা ব্যাপার আমায় মাথায় রাখতে হয়ঃ

প্রথমত, সেদ্ধ ব্যাপারটা বেশির দিকে যাওয়ার থেকে কমের দিকে থাকা ভালো। আর জল অতি সামান্য, সুতোগুলো অতি সামান্য নরম করে নেওয়ার জন্য যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়েও সামান্য কম।

দ্বিতীয়ত, মাখনের পরিমিত ব্যবহার। তাল তাল নয়, প্লীজ। পরিমিত মানে কতটা? বলাই বাহুল্য আমার হিসেব আপনার হিসেবের সঙ্গে মিলবে না।

তৃতীয়ত, ওই। কড়াই থেকে তুলে নেওয়ার আগে ম্যাগিতে ফেলে দেওয়া খান চারেক পেট চিরে দেওয়া কাঁচালঙ্কা। কুচিকুচির চেয়ে দেখেছি ম্যাগির মধ্যে এই পেট চেরা গোটা লঙ্কারা বেশি এফেক্টিভ।

এই ব্যাপারগুলো দোকানের কেনা ম্যাগিতে কিছুতেই পাওয়া যায় না। চীজটীজ ক্যাপসিকাম-ট্যাপসিকাম হাজাররকম জিনিস গুঁজে দেওয়াই যায়, কিন্তু ইনস্ট্যান্ট নুডসল ব্যাপারটাই হচ্ছে সহজ অঙ্কে এগিয়ে যাওয়ার খেল। কোনো রকমের বাড়াবাড়ি সে'খানে চলবেনা। অতএব পাহাড়ে গেলেও, ম্যাগির দোকান নয়; ম্যাগির প্যাকেট হাতে স্টোভ খুঁজে হন্যে হতে হয়।

লোভ


- আসি?
- বেরোবে দাদা?
- হ্যাঁ, এ'বারে বেরোলেই হয় আর কী।
- এসো তবে..।
- অবশ্য তাড়াহুড়ো তেমন ছিলো না..।
- নাহ্। রাত হচ্ছে। অদ্দূর যাবে..।
- তাও ঠিক। আসি, বুঝলি?
- হুম।
- কফিটা একটু মন দিয়ে বানাতে পারতিস।
- আসলে হয়েছে কী..। এ'বারে যে কফিটা এনেছিলাম..।
- কফি ঠিকই দিয়েছিলিস। দুধ-চিনির ব্যালেন্সটাও ঠিকই ছিল। মন দিয়ে করার ব্যাপারটাতেই ফস্কে গেল ব্যাপারটা। পরের বার কিন্তু কোনো এক্সকিউজ শুনছি না।
- পরেরবার কেন? আর দশ মিনিট বোসো। আমি চট করে এক কাপ..।
- নাহ্। মন বেরিয়ে বাসস্টপ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। শরীরটা এ'বার ঠেলেঠুলে এগিয়ে না নিলেই নয়।
- বলছিলাম কী, রাত যখন হয়েই গেলো। আজকের রাতটা থেকেই যাও না হয়। কফিতে মন গেল না, ভাতেভাতটা মন দিয়েই হবে। তারপর দু'জনে মিলে রাতভর তাস পেটানো যাবে।
- আর তো বসার উপায় নেই রে ভাই। শোন, সাবধানে থাকিস। ভালো গান শুনিস। ভালো ভালো গল্পের বই পড়িস। কেমন?
- ধুস, এখন মনে হচ্ছে..।
- আসি ব্রাদার..।
- না। শোনো। তোমায় বসতেই হবে। হাইক্লাস বিয়েবাড়ি মার্কা কফি না খাইয়ে তোমায় ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না..।
- এই যে কফির জন্য পিছু ডাকলি, তা'তেই হবে।
- ধুরছাই।
- আমি কি কফির জন্য এসেছিলাম ভেবেছিলিস? ধুস। গপ্প আড্ডা? এক সময় সে'সব তো কম হয়নি। পিছুডাকের লোভেই এসেছিলাম। আদায় করে নিয়েছি।
- আরে..।
- আসি। কেমন? আলভিদা। অন্য কোনোদিন, অন্য কোনো সীনে..। তদ্দিনের জন্য..বিদায় কমরেড।
- এসো।

হোটেল


কোন শব্দ কেমন ভাবে মনের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকবে সে'টা বলা ভারি মুশকিল। একই শব্দ বানান বা উচ্চারণের তফাতে মনের আলমারির আলাদা আলাদা খোপে গিয়ে বিড়ালছানার মত বসে থাকে।

এই যেমন 'রেস্টুরেন্ট'। রেস্টুরেন্ট শুনলেই মনে হয় চমৎকার একটা সন্ধেয়, দিব্যি একটা সাত-পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে; দেওয়ালে ঝোলানো মেনুবোর্ডের দিকে প্রেমে টইটম্বুর হয়ে দেখছি আর ঠাহর করার চেষ্টা করছি পেটের চুঁইচুঁই খিদেটা মোগলাইমুখী না কাটলেটমুখী। রেস্টুরেন্টের ওয়েটাররা বাহারে গল্পের ধার ধারেন না, সাত নম্বর টেবিলের চাউমিন আর চার নম্বরের ফিশফ্রাই; এ'সব নির্মম কেঠো ইকুয়েশন ব্যালেন্স করে চলাটাই তাদের ধর্ম। রেস্টুরেন্টের দেওয়ালে ক্যালেন্ডার, টেবিলের সানমাইকায় ঝোলের ছোপ, চারপাশে সুতৃপ্ত কলরব আর হঠাৎ কানে আসা সুতীব্র টেবিল চাপড়ানি।

রেস্তোরাঁ শুনলেই আবার চারপাশের আলো আপনা থেকেই নিস্তেজ হয়ে আসে। গায়ে মুখে এসির হাওয়া এসে লাগে। চীনামাটির প্লেটে স্বল্প পরিমাণের বাহারে খাবার, মিষ্টি সুরে ওয়েটার-বাবুদের সঙ্গে সুমিষ্ট বাক্যালাপ। রেস্তোরাঁর মেনুকার্ডের পাতা ওলটাতে হয় আঙুলের নরম ছোঁয়ায়, খাবারের অর্ধেক স্বাদ জোটে পাতের বাইরের 'অ্যাম্বিয়েন্স' থেকে। সে'খানকার নরম গদিওলা চেয়ারে বসেই জবাব দিতে হয় তেষ্টার জল 'রেগুলার' হবে না 'মিনারেল'। সে আবহে হইহইয়ের স্থান নেই, সে'খানে প্রয়োজন পালিশ দেওয়া ফিসফিসের। রেস্তোরাঁয় হুড়মুড় করে খেতে শুরু করলে সমস্তটাই মাটি, সে'খানে খেল জমাতে পারেন শুধু কন্যোসাররা।

আর একটা রোম্যান্টিক শব্দ আছে। "হোটেল"। অভিধান যাই বলুক, আশি-নব্বুই দশকের অঙ্ক মেনে বলি; 'হোটেল' কথাটা শুনলেই নাকে এসে ঠেকবে শালপাতা বা সস্তা স্টিলের থালার ওপর বেড়ে দেওয়া গরম ভাতের সুবাস। জোলো মুসুরির ডাল, নরম আলুভাজা, পাঁচমেশালি সবজির পাশাপাশি রুই মাছ বা দু'পিস মুর্গির মাংস-সহ একটা বাটি ঝোল। হোটেলের দুনিয়ায় আবার বাস-স্ট্যান্ড বা রেলস্টেশন সংলগ্ন হোটেলগুলোর কদর সবিশেষভাবে বেশি। বাঙালিরাও হোটেলে গিয়ে থালা নয়, থালির খোঁজ করে থাকেন; ভেজ, মুর্গির, মাছের, মাংসের, ইত্যাদি। সে'খানে খাবারদাবারের স্বাদে কেজো মানুষের ব্যস্ততা মিলেমিশে যে সিম্ফনি তৈরি হয় তা অতুলনীয়। রাত্রিবাসের হোটেল তো সম্পূর্ণ এক অন্য প্রাণী।

এই সমস্তকিছুই অবশ্য মেন্টাল কন্সট্রাক্ট। আমার মনের হোটেল আর আপনার মনের হোটেলে হয়ত বিস্তর ফারাক। আমার রেস্টুরেন্ট আর আপনার রেস্তোরাঁ হয়ত একই সুরে বাঁধা। মোদ্দা কথা হলো, দেলখোশা রেস্টুরেন্ট কেন রেস্টুরেন্ট, মোকাম্বো রেস্টুরেন্ট কেন রেস্তোরাঁ আর জয় মা তারা রেস্টুরেন্ট কেন হোটেল; সে জটিল অঙ্ক মনই জানেন।

মিনিবাস ও মনুদা

আজ বছর সাতেক পর মনুদার সঙ্গে দেখা অফিস-ফেরতা মিনিবাসে। এককালে দু'জনে সহকর্মী ছিলাম। আচমকাই চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কেন ছেড়েছিলেন? সে প্রশ্নের উত্তর আদায় করারও বিশেষ সুযোগ দেননি। এইচআরের শশাঙ্ক বলেছিল "পার্সোনাল রীজনস"; আরে, জীবনের সব রীজনই যে পার্সোনাল। যা হোক, মনুদার চেহারা বিস্তর পাল্টেছে তা নয়। সেই একই হাসিখুশি গোলগাল চেহারা, মুখে সামান্যতম বয়সের ছাপও যোগ হয়নি। শুধু ফিটফাট শার্ট ট্রাউজারের বদলে টিশার্ট আর ঢলা প্যান্ট। আমি দাঁড়িয়েছিলাম ভিড়ে, দু'হাত দূরের সীট থেকে মনুদাই হাত নেড়ে ডাকলেন। আমি সামান্য এগিয়ে পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালাম।

- কেমন আছ দিবাকর?
- দিব্যি! আপনি?
- চমৎকার। তোমার কাঁধের ব্যাগ আর বাসের রুটে মালুম হচ্ছে যে আমাদের সেই ম্যাঙ্গো লেনের অফিসেই আছো।
- এ'ছাড়া আর গতি দেখি না। আপনার কী ব্যাপার বলুন দেখি মনুদা, এক্কেবারে ভ্যানিশ হয়ে গেলেন...।
- ফেয়ারওয়েলটা আদায় করা হয়নি বটে তোমাদের থেকে। বেশ নিজের ব্যাপারে দু'চারটে ভালো ভালো কথা শোনা যেত।
- আপনি এখন আছেন কোথায়?
- বৈদ্যবাটি।
- বৈদ্যবাটি! আপনার সেই রাজারহাটের পেল্লায় ফ্ল্যাট?
- চাকরীর সঙ্গে সঙ্গে সে'টাকেও বিদেয় করে দিলাম।
- সন্ন্যাসটন্ন্যাস নিয়েছেন নাকি?
- বৈদ্যবাটি জল-হাওয়া মন্দ নয় তবে সে'টাকে হিমালয় ভাবাটা বাড়াবাড়ি। তা অফিসের বাকি সবাই কেমন আছে? ফিনান্সের গুপ্তর বিয়েথা হলো?
- নাহ্‌। গুপ্তদা এ'বারে হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
- তা'তেই মঙ্গল।
- একদিন অফিসে আসুন না। পুরনো মানুষদের সঙ্গে খানিকক্ষণ আড্ডা দিলে মন্দ লাগবে না।
- সময়-সুযোগ পেলে একদিন আসবো'খন।
- তা, হঠাৎ বৈদ্যবাটি কেন? আপনার বাড়ি তো শুনেছিলাম মুর্শিদাবাদের দিকে।
- কার বাড়ি যে কোনদিকে ভায়া, তা ঠাহর করা বড় মুশকিল। তবে সন্ন্যাসের ব্যাপারটা পুরোটা মিথ্যে নয়।
- সে'খানে আখড়াটাখড়া কিছু খুলেছেন নাকি? আমি তো ভাবতাম আপনি এথেইস্ট।
- আসলে সুমির ক্যান্সারটা এমন অ্যাগ্রেসিভ স্টেজে ধরা পড়লো। বাড়ি-ঘরদোর বেচে দিয়েও মাস ছয়েকের বেশি টানা গেলো না। ঝোঁকের বশে মার্কিন প্রদেশেও গেছিলাম। লাভের লাভ কিছু হলো না। যা ছিলো সব দিয়ে তাঁকে ধরে রাখতে পারলাম না। বৈদ্যবাটিতে সুমির বাপের ভিটে ফাঁকা পড়েছিলো। তাই...।
- ওহ, আমরা কেউই অফিসে এত কিছু জানতেই পারলাম না...।
- জানলে বিচলিত হতে। কাজের কাজ কিন্তু কোনো কিছুই করা সম্ভব হতো না।
- হয়তো। তবু, এত সব কিছু চেপেচুপে রাখার কী দরকার ছিলো মনুদা।
- চেপেচুপে রাখলাম এদ্দিন। অথচ মানুষ কী বিচিত্র দ্যাখো, আজ সামান্য মিনিবাসের দেখায় গড়গড় করে কত কথা বেরিয়ে এলো

মিনিট দশেক পর মনুদা নেমে যাওয়ার সীটটা আমি দখল করলাম। ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া হয়েছে। কথাবার্তা হবে হয়তো। ক্যান্সারের খরচপত্রের খবর আমার অজানা নয়, তবে মনুদার মুখে সে খরচের বহরটা শুনে আবারও বুক কেঁপে উঠলো। মনুদার মনে নেই হয়তো, আমার স্ত্রীর নামও সুমি। আমার সুমির যাতে কলকাতা না ছাড়তে হয় সে ব্যবস্থাটা আমার করে রাখতেই হবে। হিসেব কষে দেখেছি আজ গোটা দুপুর; মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স যা আছে তা'তে কোনো চিকিৎসাই সুবিধেমত হওয়ার নয়। বরং যতটা পারা যায় চেপেচুপে যাওয়াই ভালো। সব যখন মাস চারেক পর স্পষ্ট হবে, তখন সুমি চাইলেও আমাদের টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট বেচে আর ফিক্সড ডিপোজিটগুলো ভেঙে আমায় চিকিৎসার দিকে ঠেলে দিয়ে কোন লাভ করতে পারবে না। কিন্তু এ খবর এখনই ফলাও হলে কী হবে কিছু বলা যাচ্ছে না। বড়জোর বছর খানেক বাড়তি থাকার জন্য বুবলুর ফিউচারটা ভাসিয়ে দিলে চলবে না কিছুতেই। বাস থেকে নেমে কাঁধের ব্যাগ থেকে বায়োপসি রিপোর্টটা ফোলিও থেকে বের করে ছিঁড়েখুঁড়ে একটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে একটা পেল্লায় ক্যাডবেরির প্যাকেট কিনলাম। মা-ছেলে দু'জনের স্যুইট-টুথই যে কী মারাত্মক ধারালো! সামনের সপ্তাহে একবার বৈদ্যবাটি যাওয়ার প্ল্যান করতে হবে। কাউকে অন্তত মন খুলে সমস্ত কথা না জানালেই নয়।

রাধামাধবের ইচ্ছে


সন্ন্যাস নিয়ে পাহাড়ে এসেছেন সন্তোষবাবু। সন্তোষবাবু নিজের আলসেমির ধাতটা নিজেই অগ্রাহ্য করতে পারেন না; সে দোষেই নিজের বছর কুড়ি পুরনো চাকরিটা খোয়াতে বসেছিলেন। আলসেমি ব্যাপারটা বিয়েথা-ঘরসংসারের ক্ষেত্রেও খুব একটা কাজে লাগেনি, গিন্নী ইহলোক ত্যাগ করে একপ্রকার প্রাণে বেঁচেছেন বলা চলে। নিঃসন্তান সন্তোষবাবু টের পাচ্ছিলেন যে চাকরী গেলে বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে দিন গুজরান করতে হবে। তার চেয়ে একটা আলাভোলা মেসবাড়িতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারলে সুবিধে হয়। ভদ্রেশ্বরে শালার বাড়িতে একটা অদরকারী নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে শালার এক প্রতিবেশীর মুখে শুনেছিলেন উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ের গায়ে অজস্র ছোটখাটো মঠটঠ আছে যে'খানে গেরুয়াধারীরা নিশ্চিন্তে শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছে। সে প্রতিবেশী অবশ্য সাধনার কথা বলেছিলেন, ওই শুয়ে-বসে দিন কাটানোর ব্যাপারটা নিজের মনে সাজিয়ে নিয়েছিলেন সন্তোষবাবু। অফিসের বড়বাবুর ধমক-টমকের চোটে যখন কাজকর্মে মন দেওয়ার প্রশ্ন এলো, তখনই সন্তোষবাবু ঠিক করলেন "এ মায়া প্রপঞ্চময়, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এ'বার সন্ন্যাস নিলেই মুক্তি"।

পাহাড়ের বুকে এক গ্রাম সুখাবিলি। বিশ-তিরিশ-ঘর মানুষের বাস, সে গাঁয়ের এক কোণে একদল সাধক তাঁবু বেঁধে পড়ে আছেন বেশ কিছুদিন হলো। ব্যবস্থাপনার দিক থেকে ব্যাপারটাকে আদৌ মঠ বলা চলে না। কিন্তু সন্তোষবাবু দিব্যি বুঝেছেন যে গায়ে গেরুয়া ফতুয়া চাপালেই বিভিন্ন মঠে-ফঠে জাঁকিয়ে বসা সম্ভব নয়। সর্বত্রই বিশ্রী পলিটিক্স। কিন্তু এই তাঁবু খাটিয়ে পড়ে থাকা সন্ন্যাসীদের তেমন হেলদোল নেই, তাদের পাশে এসে দিব্যি মাস-দুয়েক রয়ে গেলেন সন্তোষবাবু। এরা এখানে আর কদ্দিন পড়ে থাকবে সে'টা জানা নেই, এদের কেউই বিশেষ গপ্পিয়েও নয়। একটা তাঁবুর এক কোণে তাঁর স্থান হয়েছে, সে'খানে নিজের হোল্ডঅল বিছিয়ে বেশ একটা আরামদায়ক আস্তানা বানিয়ে নিয়েছেন ভদ্রলোক। এদের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এরা কেউই ধর্মকর্মের গপ্প নিয়ে গায়ে পড়ে না। কোথা হতে আসা হয়েছে, কী মতলব; এ'সব হাবিজাবি কথা বলেও বিশেষ বিব্রত করে না। সবচেয়ে বড় কথা চাকরী যাওয়ার ভয়টা গেছে, রোজ রোজ গাম্বাটসব ফাইলটাইলও ঘাঁটতে হচ্ছে না।। আত্মীয়স্বজনের হ্যাপাটা নেই, সে'টা একটা বাড়তি পাওনা; কেউ বাড়িতে এলেই সেই ওভেনে সসপ্যান বসানোর খাটনি, উফ।

এ'খানে সবই দিব্যি ছিমছাম। সকালে নিজের মত ঘুম থেকে ওঠো। নিজের মত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াও। সন্ধে নাগাদ এরা সকলে মিলে খানিকক্ষণ হরিনাম জপে, সে আড্ডায় বসতেও দিব্যি লাগে সন্তোষবাবুর। তিনি যে আছেন, একটা জলজ্যান্ত আধবুড়ো মানুষ, সে'টা কারুর নজরেই পড়ে না যেন। এই তো চাই। এদের হোতা হলে রমাকান্ত, উত্তরপ্রদেশের বলিয়া জেলায় স্কুল মাস্টারি করতে, সন্তোষবাবুর সমবয়সী বোধ হয়। এখন পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে সাধনা করে। তাকে অবশ্য সবাই বলে গুরুজি। রমাকান্তর সঙ্গে মাঝেমধ্যে গল্পগুজব হয় বটে, ওই রাতের দিকে। ভক্তি-শ্রদ্ধার প্রসঙ্গ তোলে না রমাকান্ত, সে বলে পাহাড় জঙ্গলের গল্প। কোথায় কোন ঝর্নার জল মারাত্মক মিষ্টি, কোন পয়েন্ট থেকে সানরাইজ দেখলে মন-ভালো হয়ে যাবেই, ইত্যাদি। সন্তোষবাবুর কলকাতার গল্পও মন দিয়ে শোনে সে, তবে শহুরে জীবন প্রসঙ্গে টীকাটিপ্পনী কাটেনি কোনোদিন।

সন্তোষবাবুর কিঞ্চিৎ সমস্যা এদের সমবেত ফলাহার আর একটানা সেদ্ধ-ভাত খাওয়ায়। তা'ছাড়া কাঠ জোগাড় করে রান্না করার ব্যাপারটা চাকরীর হ্যাপা সামলানোর চেয়েও কঠিন। তিরিশ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট পাহাড়ি টাউনের বাজার থেকে স্টোভ, হাড়ি, চাটু, খুন্তি, ইত্যাদি নিয়ে এসেছেন। কেরোসিন, তেল-মশলা, চাল-সবজি গাঁয়েই পাওয়া যায়। নিজে গিয়েও বাজারঘাট করতে হয় না, গাঁয়ের মধুরেন্দ্র নামের এক ছোকরা সামান্য কমিশনের বদলে এ'সব সাপ্লাই দেয় তাঁকে। এমন কী মাঝেমধ্যে রান্নাবান্নাও করে দেয়। রমাকান্ত আশ্বাস দিয়েছে গেরুয়া-গায়ে দিনে দু'চারটে ডিম ভেজে খাওয়া যেতেই পারে। এমন কি হপ্তায় একবার দেশি মুর্গির পাতলা ঝোলেও মহাভারত অশুদ্ধ হওয়ার নয়। শুধু ডিম-মুর্গি পাতে সকলের পাশে বসে খাওয়াটা এড়িয়ে চলেন সন্তোষবাবু। এ'খানের শাকসবজি টাটকা, ডিম মানেই লালচে-হলুদ কুসুমওলা দিশি, আর গাঁয়ের হাওয়া-বাতাস আর ঝর্নার জল খাওয়া মুর্গিদের গায়ের মাংসে যে কী স্বাদ। এ তৃপ্তিও তো গভীর সাধনারই অঙ্গ।

মাঝে হঠাৎ হপ্তা-দুয়েকের জন্য রমাকান্ত গায়েব হয়ে গেলো। বাকিরা কেউই তাঁর খবর দিতে পারে না। অবশ্য তা'তে যে সন্তোষবাবুর বিস্তর সমস্যা হয়েছে তা নয়, তবে রমাকান্ত ছাড়া কারুর সঙ্গে তেমন গল্প জমে না তাঁর। একটু গল্প-আড্ডা না হলে সাধনায় বেশ ব্যাঘাত ঘটে। রমাকান্ত গায়েব হওয়ার দিন সতেরো পরে একদিন দুপুরে ডিমের মামলেট আর মুসুরির ডাল দিয়ে মাখা ভাত দিয়ে জবরদস্ত লাঞ্চ সেরে হোল্ডঅলের ওপর শুয়ে পুরনো আনন্দলোক পড়ছিলেন সন্তোষবাবু। এমন সময় পাশে এসে বসলে রমাকান্ত।

- আরে এই যে ভাইটি, কোথায় ছিলেন এদ্দিন?
- আপনি কেমন আছেন সন্তোষজী, এ'দিকে কোনো অসুবিধে হয়নি তো?
- না না। মধুরেন্দ্র থাকতে আর চিন্তা কী বলুন। তা'ছাড়া এ'দিকের জলে যে কী আছে মশাই। অম্বলের ওষুধ তো শেষ কবে খেয়েছি মনেই পড়ছে না। অ্যাপেটাইটও ড্রাস্টিকালি ইম্প্রুভ করেছে। সন্ন্যাসী হলে মেটাবোলিজমে এত প্রগ্রেস হবে জানলে এর আগে কবেই...।
- বহুত বঢিয়া।
- কই বললেন না তো, আপনি গেছিলেন কই? আমি তো চিন্তায় ছিলাম আপনি বুঝি নতুন কোনো মঠেফঠে...।
- আমি পওয়নপুরে গেছিলাম সন্তোষজী।
- সেই আপনার গ্রাম? বলিয়ায়?
- সে গ্রাম আমার কতটা তা বলতে পারি না। তবে হ্যাঁ, সে'খানেই গেছিলাম।
- সে কী। রিটার্ন অফ সন্ন্যাসী?
- রিটার্ন কিনা তাও বলতে পারিনে।
- একটু খোলতাই করে বলুন না মশাই।
- মঞ্জু অসুস্থ ছিলে বড়। তাই...।
- মঞ্জু?
- আমার গত-জন্মের স্ত্রী।
- গ...গত?
- সে গাঁয়ের জীবনটা এখন তেমনই ঠেকে।
- তা, আপনার ছেলেপিলে...।
- সবাই আছে। তিন ছেলে, এক মেয়ে। তাদের ঘরসংসার। ভরা বাড়ি।
- তবুও...।
- পোস্টকার্ড এসেছিল ক'দিন আগেই। এ গাঁয়ের স্কুলের অ্যাড্রেসে। সেখানকার মাস্টার আমায় চেনে। খবর পেলাম মঞ্জু শেষ-শয্যায়।
- ওহ...।
- মনে হলো। এই সুযোগে যদি মঞ্জুর একটু সেবা করে উঠতে না পারি, রাধামাধব আমার সেবা গ্রহণ করবেন না। কেন এ কথা মনে হলো বলতে পারি না। তবে ওই, মনই তো। মনের ঠেলাতেই চলে গেলাম। একটানা তাঁর পাশে বসে রইলাম। তাঁকে নিজের হাতে রোজ খাওয়ালাম, পরিষ্কার করলাম। ওষুধ খাওয়ালাম নিয়মিত। ডাক্তারবদ্যির সঙ্গে আলাপআলোচনা। ছেলেমেয়েদের সম্পত্তির হিসেব বুঝিয়ে টুঝিয়ে দিলাম, মঞ্জুর পাশে বসেই হলো সে'সব। মঞ্জু রুই মাছ বড় পছন্দ করে। বাজারে গিয়ে সে মাছ নিয়ে এলাম একদিন জানেন। নিজের হাতে রান্না করলাম, বাড়তি রসুন দিয়ে - ঠিক যেমনটি মঞ্জুর পছন্দ ছিলো। সে'অবশ্য এক-দুই গ্রাসের বেশি খেতে পারলে না। খাওয়ার অবস্থাতেই সে ছিলে না।
- তা মঞ্জুদেবী এখন...।
- গত শনিবার সে চলে গেলে। রাধামাধবের ইচ্ছে, তিনিই কাছে টেনে নিলেন।
- আপনি গাঁয়ে আর দু'দিন থাকলে পারতেন ভাই রমাকান্ত...।
- গেলবার গাঁ ছেড়ে এসেছিলাম সন্তোষজী। কিন্তু এ'বারে মনে হচ্ছে সে গ্রাম, সে বাড়িকে মাদুলি করে গলায় ঝুলিয়ে বেরিয়েছি। রাধামাধবের যা ইচ্ছে, তা'তেই আমার মুক্তি।

সে রাত্রে ডাল-আলুভাজা বিস্বাদ ঠেকলো সন্তোষবাবুর জিভে। দু'টো কলা আর সামান্য দুধ দিয়ে ভাত মেখে খেয়ে শুয়ে পড়লেন।

তাঁর এক হপ্তা পর কলকাতা ফিরলেন। অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেল খেটে কাজ করতে চাইলে তাঁর চাকরীটা আপাতত বহাল থাকবে। কোথায় কী যে সামান্য পালটে গেলো। শত ব্যস্ততার মধ্যে, ফাইলে-কাগজপত্রের ভিড়ে মাঝেমধ্যেই রমাকান্ত আর মঞ্জুদেবীর ছায়া দেখতে পান সন্তোষবাবু। নাকে আসে অতিরিক্ত রসুনের ঝাঁজওলা রুই মাছের দেহাতি ঝোলের গন্ধ। আমিষটা এ'বার ছেড়েই দিলেন ভদ্রলোক, ছাড়তে পারলেন না গেরুয়া ফতুয়াগুলো। গড়িয়াহাট থেকে এক ডজন কিনে ফেলতেই হলো। এ নিয়ে বেশি গবেষণা করতে চান না ভদ্রলোক, তা'তে খাটনি বাড়ে। "সবই রাধামাধবের ইচ্ছে" বলে কাটিয়ে দেওয়াটাই সহজ বলে বোধ হয় তাঁর।