Friday, December 31, 2021

অভি, মানুদা আর নিউ ইয়ার



- অভি, লেট বাই থার্টি ফাইভ মিনিটস।

- সরি মানুদা৷ মাইরি, সরি৷ আসলে নিউইয়ারের মুখে লোকজনের এত হুজুগ৷ ট্র‍্যাফিকে ফেঁসে গিয়েই..।

- বাজে কথা না বাড়িয়ে আগে চা চাপিয়ে দে।

- আহ, তোমার বাড়িতে এলাম৷ কোথায় তুমিই স্টোভ জ্বালিয়ে..।

- গুরুজনের মুখে ওপর বেশি কথা বলতে নেই। 

- আচ্ছা, পাঁচ মিনিট দাও। একটু জিরিয়ে নিই। বাপ রে! বাসে সে যে কী ভিড়! 

- চায়ের সঙ্গে একজোড়া অমলেটও ভেজে আনিস, কেমন? ফ্রিজে আছে ডিম৷ 

- উফ, তোমার সেবা করতে এলাম নাকি?

- রাতের বিরিয়ানিটা আমিই খাওয়াব তো৷ অত তিতিবিরক্ত হচ্ছিস কেন।

- বলছিলাম, আর কেউ আসছে নাকি মানুদা?

- সে কী! আমার বাড়িতে আর আসবেটা কে৷ আত্মীয়স্বজন বলতেও তুই৷ বন্ধুবান্ধব বলতেও তুই৷ তুই কি নিউ ইয়ার্স ইভ পার্টি এক্সপেক্ট করে এসেছিস এ'খানে? তা'হলে পত্রপাঠ তোর ওই গদাই দত্তদের তাসের আড্ডায় চলে যা৷ চাই কী সে'খানে দু'দাগ দামী মদও জুটতে পারে৷ মাগনায়। 

- গদাই দত্তের আড্ডায় আজ সিঙ্গল মল্টের পাশাপাশি শুনেছি বিপুল সেনও থাকবে৷ স্টার অ্যাট্রাকশন! 

- থিয়েটার অভিনেতা বিপুল সেন?

- গতবছর তিনটে সিনেমাও রিলিজ করেছে ওর৷ তিনটেই সুপারহিট৷ 

- গদাই দত্ত আসর জমাতে জানে বটে৷  তা' সে'খানে তো তোর অবাধ যাতায়াত৷ সেই হাইক্লাস ফুর্তি ছেড়ে এই ব্যাচেলরের বিমর্ষ আস্তানায় কী করছিস রে অভি?

- অ্যানুয়াল হ্যাবিট৷ এ'বারেও ভাবলাম যাই৷ তোমায় চা-অমলেট খাইয়ে আর বিরিয়ানি প্রসাদ পেয়ে বছর শেষ করলে আগামী বছর ভালো কাটবে৷ 

- তা অবশ্য ঠিক৷

- চাকরীটা ভাবছি ছেড়ে দেব।

- আমায় দিয়ে রেসিগনেশন লেটার লেখাবি?

- ধুস৷ 

- তবে?

- আমি কিন্তু সিরিয়াস। 

- এ তো ভালো কথা। কদ্দিন আর ন'টা-ছ'টার ছকে আটকে থাকবি৷ তোর ট্যালেন্ট আছে৷ অধ্যাবসায় আছে৷ ভাবনা কী?

- এই এনকারেজমেন্টের জন্যই তোমার কাছে আসা৷ 

- চট করে চা'টা বানিয়ে আন৷ তারপর তোর চাকরী ছাড়ার প্ল্যান সবিস্তারে শোনা যাবে৷ 

**

- সত্যি অভি, তুই চা'টা বড্ড ভালো বানাস৷ দশে সাড়ে দশ।

- অমলেটটা কত স্কোর করেছে?

- দশে সোয়া সাত৷ পেঁয়াজটা যথেষ্ট মিহি করে কুচোসনি৷ সামান্য বেশি ভেজে ফেলেছিস৷ তাই সামান্য নম্বর কাটতে হল। 

- ডিউলি নোটেড।

- কবে ছাড়ছিস? চাকরী?

- ভাবছি সামনের হপ্তাতেই বসকে চিঠি ধরিয়ে দেব।  তারপর মুক্তি।

- মুক্তি! বাহ্!

- তুমিই বলো মানুদা৷ এই অজস্র ফাইল, খামোখা মিটিং, গাম্বাট সব টার্গেট; দিনের পর দিন, মাঝেমধ্যে মনে হয় জম্বি হয়ে পড়েছি৷

- জ্যান্ত লাশ হয়ে পড়ে থাকা মোটেও কাজের কথা নয়। 

- থ্যাঙ্ক ইউ৷ আমি জানতাম তুমি অন্তত বুঝবে।

- তা, রেসিগনেশনের পর?

- প্ল্যানটা এখনই ঠিক কষে রাখিনি৷ তবে লেখালিখি করেই আয়টায় করার চেষ্টা করব'খন৷ কিছুদিনের স্ট্রাগল৷ তবে ম্যানেজ ঠিক হয়ে যাবে। 

- এই তো চাই৷ রিস্ক না নিলে চলবে কেন? চিরকাল দুধেভাতে নেকুপুষু হয়ে পড়ে থাকলে শাইন করবি কী করে?

- মানুদা৷ তোমার কথা শুনে বুকে বল পাচ্ছি৷ সামনের বছরটা অন্তত অন্যরকম একটু..।

- এই দাঁড়া, বিরিয়ানিটা অর্ডার দিই।

**

- উফ্৷ বিরিয়ানিটা এক্কেবারে টপক্লাস ছিল মানুদা। দশে বারো।

- আর চাপটা?

- দশে নয়৷ আর একটু ঝাল দিতেই পারত।  

- কী ভাবলি? রেসিগনেশনটা নিয়ে?

- নামিয়েই দি৷ 

- নিশ্চয়ই নামাবি।

- সুমি একটু চিন্তিত৷ অবশ্য ওর আপত্তি নেই৷ তাছাড়া ওর চাকরীটাই তো আমার ভরসা।

- সুমি কনফিডেন্ট মেয়ে৷ তোকে ঠিক সামলে নেবে।

- মানুদা।

- বল।

- গদাই দত্তের তাসের আড্ডায় কেউ কোনওদিনও বিশ্বাস করবে না যে এই পনেরো বছরের চাকরীটা ঝুপ করে ছেড়ে দেওয়ার দম আমার আছে। যতবার বলেছি, উড়িয়ে দিয়েছে।

- দ্যাখ অভি, গদাই দত্তের আড্ডায় সিঙ্গল মল্ট থাকতে পারে৷ কিন্তু তোর মত ক্রিয়েটিভ মানুষকে চেনার ধক ওদের নেই৷

- ওদের আমি থোড়াই পাত্তা দি৷ তোমার ওপিনিওনটাই জানার দরকার ছিল। 

- তুই যাই করিস, শাইন করবি৷ এ আমি নিশ্চিত।

- আর এক কাপ চা বসাই মানুদা?

- হোক।

***

- বাহ্৷ এই না হলে চা৷ চমৎকার বানিয়েছিস অভি।

- আরে, বারোটা বেজে দুই৷ হ্যাপি নিউ ইয়ার মানুদা।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার। 

- জানো,  চাকরীটা ছাড়তে একটু হলেও বুক কাঁপবে।

- স্বাভাবিক।

- আসলে..নিজের ক্রিয়েটিভ প্যাশনকে আদৌ পাত্তা না দেওয়াটা যে অন্যায় হচ্ছে..সেই অনুভূতিটা মাঝেমধ্যেই ট্রাবল দেয়।

- এই যে ছটফট তোর মধ্যে আছে। সে'টাই তোর প্যাশন অভি। 

- গদাই দত্তরা যাই বলুক৷ আমি ভীতু নই মানুদা৷ চাকরী ছাড়ার সাহস আমার আছে৷ 

- আলবাত আছে৷ কিন্তু তোর প্রমাণ করার কিছুই নেই৷ আর একটা কথা বলি অভি? একত্রিশ  ডিসেম্বর রাত্রে তুই এই বুড়োটার সঙ্গে আড্ডা জমাতে এসেছিস, সে'টাও কম দুঃসাহস নয়।

- আমি তো প্রতি বছরই শেষ দিনটা তোমার সঙ্গেই কাটাই মানুদা। 

- রাইট।

- প্রতি বছর চাকরী ছাড়ার প্ল্যানটাও বুক বাজিয়ে বলতে আসি। 

- আসিস।

- অথচ ছাড়া হয় না।

- একদিন ঠিক ছাড়বি। একদিন অন্য কিছু করবিই, দারুণভাবে৷ 

- ঠিক ছাড়ব একদিন না একদিন! শালা গদাই দত্ত আর তার দলবল যতই খোঁটা দিক। ও'দের ঠিক দেখিয়ে দেব।

- আলবাত!

**

- হ্যালো!

- হ্যালো, মানুদা৷ 

- বল সুমি।

- অভি আছে?

- ও তো এই বেরোল৷ ট্যাক্সি নিয়েছে৷ আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে।

- শুনেছ নিশ্চয়ই৷ প্রতিবারের মত এ'বারেও ওর নিউ ইয়ার রেজোলিউশন; চাকরী ছেড়ে লেখালিখি নিয়ে পড়ে থাকবে। 

- জানি। 

- তোমার কী মনে হয়, এ'বারে সত্যিই ছাড়বে?

- প্রতিবারের মত এ'বারেও অভি গদাই দত্তের আড্ডায় নিজের স্টেটাস আপগ্রেড করতে চেয়ে চাকরী ছাড়তে চাইছে রে সুমি। নিজের প্যাশনের টানটা হয়ত এখনও সে'ভাবে চাগাড় দেয়নি ওর মধ্যে৷ তুই তো জানিস, আমার কাছে সে ফিবছর আসে শুধু সে'টুকু নিজেকে মনে করাতে। আর হ্যাঁ, আমার কাজ ওকে মনে করানো গদাই দত্তদের জাজমেন্টাল জ্ঞান-টীকা-টিপ্পনিই শেষ কথা নয়, ওর মধ্যে সত্যিই সৎসাহস আছে৷ আর আছে হাইক্লাস চা বানানোর ক্ষমতা। তোর বরটা সত্যিই একটা ক্রিয়েটিভ জিনিয়াস।

- হে হে৷ তা বটে৷ পরের বছর আমিও কিন্তু যাব অভির সঙ্গে, তোমার ফ্ল্যাটে৷ বিরিয়ানি আমাকেও খাইও৷ 

-  জো হুকুম। হ্যাপি নিউ ইয়ার সুমি।

- হ্যাপি নিউ ইয়ার মানুদা৷ গুড নাইট৷

চাষবাস



জটিল কিছু যদি কেউ সহজ ভাষায় ফুসমন্তরে বুঝিয়ে দেন, তা'হলে তার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না৷ সে'দিক থেকে, য়ুভাল নোয়াহ্ হারারি সাহেবের প্রতি আমি বেশ খানিকটা ঋণী। আজ হঠাৎ ভদ্রলোকের কথা ফের মনে পড়ল কারণ ওঁর স্যাপিয়েনস বইটার মধ্যে যে চ্যাপ্টারটা আমার সবচেয়ে প্রিয়, সে'টা আজ আর একবার পড়লাম৷ বলে রাখা ভালো, 'এগ্রিকালচারাল রিভোলিউশন' নিয়ে লেখা ওই কয়েক পাতায় আমি মাঝেমধ্যেই ফেরত যাই। ঠিক যেমন ভাবে মাঝেমধ্যেই ঘুরেফিরে আগন্তুক সিনেমার সেই দৃশ্যটা দেখি যে'খানে মনমোহন মিত্র আর পৃথ্বীশ সেনগুপ্তর তর্কের চোটে অনীলা আর সুধীন্দ্রর ড্রয়িংরুম সরগরম হয়ে ওঠে৷

আগন্তুক যখন প্রথম দেখি, তখন আমি নেহাতই ছেলেমানুষ। তবে সে সংলাপ এতটাই তীক্ষ্ণ  যে সেই স্কুলবয়সেও মনমোহনের ভক্ত হয়ে উঠতে সময় লাগেনি। কিন্তু সে সংলাপ নিয়ে 'বলে কী রে ভাই' মার্কা বিস্ময় বোধ করেছি অনেক পরে। স্যাপিয়েনসের ওই চ্যাপ্টারটার মতই, ওই দৃশ্যটা বারবার দেখেও ক্লান্তি আসেনা। আমার মত বহু ছাপোষা মানুষ নিশ্চয়ই মনমোহনের বাগ্মিতায় বারবার মুগ্ধ হয়েছেন। ফেসবুক টাইমলাইন বা ইউটিউবে সে দৃশ্য মাঝেমধ্যেই চলেও আসে। সভ্যতা কী, টেকনোলজি কী, মানবাধিকার কী, স্বাধীনতা কী; এ'সব ভারিক্কি প্রশ্নকে প্রায় টেনিস বল লোফালুফির পর্যায় এনে আলোচনা করেছেন মনমোহন।  সারকাজম এড়াতে পারেননি, পৃথ্বীশের উস্কানিতে বারবার রেগেও উঠেছেন। কিন্তু মনমোহন নিশ্চিত ভাবেই দর্শকের ভাবনাচিন্তা এলোমেলো করে দিতে পেরেছেন৷ কিন্তু, পৃথ্বীশের জেদকে ঠিক ভাঙতে পারেননি মনমোহন। অবশ্য অমন একবগগা মানুষকে বাগে আনা সহজ নয়৷ সেই গাম্বাটপনার জন্যই তর্কটা জমে ওঠার আগেই সুতো ছিঁড়ে গেল।

আজ এই পোস্ট লিখতে বসা একটাই কারণে। আগন্তুকের সেই দৃশ্য যদি আমার মত অন্য কারুরও অসম্পূর্ণ ঠেকে, তাদের জন্য হারারির লেখা ওই কয়েকপাতা বেশ জরুরী। মানুষের চাষবাস কী ভাবে শুরু হল, সে গল্প হারারি বলেছেন যে'খানে, সেই অধ্যায়ের নাম; "হিস্ট্রিজ বিগেস্ট ফ্রড"। বনেজঙ্গলে শিকার করে, ফলমূল খেয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষ আচমকা একসময় চাষবাস শুরু করলে। সে'খান থেকে গড়ে উঠল বসতি। মানব সভ্যতা তরতরিয়ে এগোতে লাগল। পৃথ্বীশ নিশ্চয়ই যে'টাকে বলতেন; 'অভাবনীয় প্রগ্রেস'। কিন্তু সেই প্রগ্রেস যে কতটা গোলমেলে, সে'টাই বুঝিয়েছেন হারারি সাহেব; বরফ-মার্কা সব যুক্তি সাজিয়ে। গোটা মানব সভ্যতার মূলেই যে 'আশায় মরে চাষা'র ট্র‍্যাজেডি, তাই ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছেন হারারি।

চাষবাসের ফলে মানুষের খাটনি বাড়ল।
খাবারের পরিমাণ বাড়লেও পুষ্টি কমল, কারণ এর আগে মানুষ রকমারি ফল, সবজি, মাংস খেয়ে বেড়াত। অথচ কৃষিকাজ শুরু করার পর পাতে পড়তে লাগল কাঁড়িকাঁড়ি ভাত বা আটা।
শিকার করা বা গাছ থেকে ফল পাড়ার চেয়ে চাষবাসে অনেক বেশি খাটুনি। কাজেই জ্বালাযন্ত্রণা বাড়তে শুরু করল।
একদিকে।খাবার উৎপাদন যেমন বাড়ল, খেতখামারে কাজের জন্য বাড়তি লোকজনেরও দরকার পড়ল।
শিশুরা এর আগে স্রেফ মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এখন 'আধুনিক' খিচুড়িটিচুড়ি পাতে পড়তে শুরু করল। ফলে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বাড়তে লাগল, কমল ইমিউনিটি। শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেল। সামগ্রিক রোগভোগও বাড়ল। 
দু'এক রকম ফলনের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা বহুগুণ বেড়ে গেল, ফলে অতিবৃষ্টি খরা এইসব নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তায় বাড়ল বহুগুণ।  
এরপর এলো আর এক গেরো। বাড়তি উৎপাদন সামলে রাখার দায় বাড়লো যাতে ভবিষ্যতে ফলন কম হলেও পেটে দানাপানি পড়ে। এরপর এলো একের ভরাগোলা দেখে অন্যের চোখ টাটানোর পালা। শুরু হলো চুরি। এলো যুদ্ধ। বসলো ট্যাক্স। শেষে সেই চিরপরিচিত ট্রাজেডি; কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনির ওপর ট্যাক্স বসিয়ে সিংহাসনে বসলেন রাজা, তৈরি হল শহর,  গড়ে উঠল সেনাবাহিনী, এলো রাজনীতি,  এলো যুদ্ধ। 

মোদ্দা কথা হল চাষবাস শুরু করার পর থেকেই হোমো স্যাপিয়েনদের রসেবশে থাকার দিন খতম। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই বোধ হয় সুখে থাকতে ভূতে কিলোনোর শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ।  

আর এ'খানেই একটা সামান্য খটকা। আগন্তুক সিনেমার সেই মারকাটারি তর্কের দৃশ্যে মনমোহন বন্যসভ্যতার পক্ষে সওয়াল করে বলছেন জংলি মানুষের 'এগ্রিকালচার, পটারি, উইভি''ও সমীহের দাবী রাখে। কিন্তু ওই এগ্রিকালচার থেকেই যে মানুষের পতনের শুরু। অবশ্যই সে পতনের মধ্যে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ উঠে এসেছেন। সে'টা নিশ্চয়ই হেলাফেলার ব্যাপার নয়। 

মনমোহনের আর্তনাদ মনে আছে? যে'খানে উনি প্রায় চিৎকার করে ঘোড়েলশ্রেষ্ঠ পৃথ্বীশকে বলছেন, "আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আমি নিজে জংলি নই! এ'টা আমার পরম আক্ষেপের বিষয় যে আমি জংলি নই।...কিন্তু উপায় কী বলুন। ঘর ছাড়ার অনেক আগেই আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে শেকসপিয়ার, বঙ্কিম, মাইকেল, মার্ক্স, ফ্রয়েড, রবীন্দ্রনাথ.."।

" মজ্জায় রবীন্দ্রনাথ ঢুকে গেছে" - আমার মত এলেবেলে মানুষকে যদি এই আক্ষেপের মূলে পৌঁছতে হয়, তবে হারারি সাহেবের এই চমৎকার বইটা বোধ হয় অত্যন্ত জরুরী।

ফিস্টি




পিকনিক ব্যাপারটা মন্দ নয়৷ তবে শীতের রাতে ছাতের ফিস্টি অনেক বেশি সুবিধেজনক মনে হত। ভোরবেলা কাগজের বাক্স থেকে ডিমসেদ্ধ আর মাখন-পাউরুটি বের করার চেয়ে ঢের ভালো হলো সন্ধ্যেবেলা এক ঠোঙা মুড়ি-বেগুনি হাতে বন্ধুর বাড়ির ছাতে উঠে যাওয়া৷ তাছাড়া পিকনিকের জন্য বাড়তি প্ল্যানিংয়ের দরকার৷ কোথায় যাওয়া হবে, কী'ভাবে যাওয়া হবে, কতজন যাবে। বাজারের ফর্দ তৈরি, বাজার করা, বাসনপত্র ভাড়া করা। ব্যাডমিন্টনের র‍্যাকেট, ক্রিকেট ব্যাট সমেত বিভিন্ন রকম খেলার সরঞ্জাম জোগাড় করা৷ বড়দের জন্য হাউজি খেলার ব্যবস্থা, ছোকরাদের লারেলাপ্পা হিন্দি গান চালানোর জন্য স্পীকার৷ আর সর্বোপরি পিকনিক স্পট বুক করা৷ হাজারো হ্যাপা৷ চড়ুইভাতি নিয়ে রচনা-টচনা লিখতে দিব্যি লাগলেও, কিন্তু আদত ব্যাপারটা সামাল দিতে মাথার ঘাম পায়ে না ফেললেই নয়৷  

পাড়ার ফিস্টিতে বরং সে'সব জটিল ছক কষা নেই৷ দুপুরের খামোখা হুজুগে রাতের জম্পেশ ফিস্টি নেমে যায়৷ বিকেলে খেলার মাঠ থেকে কেউ সোজা গেল মুর্গি কিনতে৷ কেউ গেল আলু, পেঁয়াজ, টমেটো গোছের খুচরো জিনিসপত্র জোগাড় করতে৷ ফাঁকিবাজ বন্ধুটি স্রেফ ট্যুয়েন্টি নাইনের তাস জোগাড় করেই খালাস৷ যার বাড়ির ছাতে পিকনিক, বাসনপত্র-রান্নার গ্যাসের দায়িত্ব তার৷ বিনিময়ে বাসন মাজা বা রান্নার হ্যাপা তার কপালে নেই। 

ফিস্টির মেনুতে গুরুপাক অচল; সাদামাটা সমস্ত পদ। আলুভাজা (শুধু শুধু খাওয়ার জন্য, স্টার্টার), মুর্গির টানটান ঝোল, গরম ভাত, টমেটোর চাটনি, রসগোল্লা আর গোল্ডফ্লেক। সে সামান্য রান্নাটুকু শেষ হতে রাত বারোটা বাজবেই৷ সে'টাই ট্র‍্যাডিশন। কারণ বাজে গল্প৷ গল্প ভালো এবং গভীর হলে যে ফিস্টিটাই মাটি। রান্না শুরু হওয়ার আগেই কয়েক রাউন্ড চা চাপানো হবে। 'লিকার' চা না হলে ফিস্টির গালগল্প জমবে কী করে? ফিস্টির প্রাণই তো হল মুর্গি ধুতে ধুতে আর পেঁয়াজ কুচোতে কুচোতে বারোয়ারী গল্প। 

রান্নার ক্যাপ্টেন চেয়ার আলো করে উনুনের সামনে বসে টীম পরিচালনা করবে।
জ্ঞানরত্ন খোকা দু'কোয়া রসুন ছাড়িয়ে নোবেলজয়ী হাসি হেসে, রিচি-বেনোর ঠাকুর্দা লেভেলের আত্মবিশ্বাস সমেত ক্রিকেট নিয়ে জ্ঞান দেবে।
আচমকা কোনও র‍্যান্ডম জ্যেঠিমা ছাতে উঠে এসে রান্নাবান্না নিয়ে দু'টো ভারিক্কি টিপস দিয়ে যাবেন।
টুয়েন্টি নাইনের আসর থেকে ইতিউতি দু'এক টুকরো ভাঙা প্রেমের মনোগ্রাহী গল্প উড়ে আসবে৷
আর, মুর্গি কড়াইয়ে পড়লেই কেউ না কেউ গান ধরবে। তার আচমকা বেসুরো আক্রমণে দমে না গিয়ে আরও জনা কয়েক সুর মেলাবে, তেমনটাই নিয়ম। 

আর,
বছর সতেরো বাদে, ডিসেম্বর রাত্রির বিটকেল প্রান্তে, কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে বেরসিক কেউ ফোন করে জানতে চাইবে, "ভাই, আজ অন্তত দিব্যি কেট বল! সে'বার তপাদাদার ছাতের ফিস্টিতে আমার ভাগের লেগপিসটা তুই মেরে দিসনি? এদ্দিন পর তো অন্তত স্বীকার কর রে রাস্কেল"!

Monday, December 27, 2021

শ্যামল ডিলান তুকতাক



- এই যে৷
- আরে, তুমি? কী আশ্চর্য!
- চলে এলাম, ইচ্ছে হল৷ অবাক হওয়ার কী আছে!
- বসো।
- বসি, কেমন?
- একশো বার৷
- থ্যাঙ্ক ইউ।
- এই বেঞ্চটা বড় মায়ার৷ তাই না?
- যা শীত৷ বাপ রে৷ হাড় কনকনের মধ্যে মায়াটায়া টের পাচ্ছি কই৷
- হেহ্৷
- অনি কেমন আছে?
- দিব্যি৷ শখের প্রাণ৷ আজকাল হঠাৎ বাগানের শখ চেপেছে৷ হপ্তায় দু'দিন অফিস কামাই করছে পেয়ারের গাছেদের দেখভাল করতে৷ চাকরী বেশিদিন টিকলে হয়৷
- লোকটা খ্যাপাটেই রয়ে গেল৷
- আর নিপা?
- গোটা দিন ক্লাসে ছাত্র পড়ানো৷ সন্ধের পর নিজের পড়াশোনা, রিসার্চ৷
- ও'ও কিন্তু কম খ্যাপাটে নয়৷
- খ্যাপাটে না হলে ওই শীতের রাত্রে এই পাহাড়-পাড়ার এই বেঞ্চিতে বসে আর এক খ্যাপার সঙ্গে কেউ গল্প জোড়ে?
- তাই তো। আচ্ছা, নিপা এখন কী করছে বলো তো?
- মাইক্রোওয়েভে খাবার গরম করছে৷ কানে ইয়ারফোন। চোখ বোজা৷ আর তোমার অনি? সে কোথায়?
- শাল জড়িয়ে ছাতে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ৷ ওল্ড মঙ্কের ঝিমঝিম। আর যথারীতি কানে ইয়ারফোন৷ চোখ বোজা৷
- আহ্। অফ কোর্স৷ তাই তো আমাদের দেখা হল৷
- বেঞ্চিটা সত্যিই মায়ার।
- ব্যাপারটা দিব্যি।
- আর খানিকটা ভূতুড়ে৷
- হেহ্ হেহ্।
**
- তা'হলে ছুটি শেষ!
- শেষ৷
- কাল থেকে ফের শহর৷ দৌড়ঝাঁপ৷ আমার সেই চাকরী৷ তোমার সেই কলেজ৷ ধুত্তোর।
- সত্যিই।
- নিপা, বিয়েটা কবে করছি আমরা?
- অনিবাবু যবে সিরিয়াসলি প্রপোজ করবেন, অমনি৷
- বাহ্৷ এখন বুঝি সিরিয়াস নই?
- কাঁচকলা।
- দু'দিন সময় দাও৷ সিরিয়াস প্রপোজাল দেখবে কাকে বলে।
- আচ্ছা, অনি! যদি আমারা দূরে সরে যাই?
- তুমি বড় পেসিমিস্ট নিপা।
- সে দুশ্চিন্তা কখনও তোমার হয় না?
- দাঁড়াও৷ জন্মজন্মান্তরের একটা সলিউশন তৈরি করে যাই৷ তোমার ইয়ারফোনে একটা গান পজ্ করা আছে৷ তাই না? যে'টা এ'খানে হেঁটে আসার সময় শুনছিলে? আমায় দেখে যে'টা থামালে?
- ডিলান।
- তোমায় দূর থেকে দেখে আমিও কান থেকে ইয়ারফোন সরালাম। আমি শ্যামল মিত্তিরে আটকে ছিলাম৷ এ'বার আমায় তোমার ফোন-ইয়ারফোন দাও, আমি ডিলানের গানটা শুনে শেষ করি৷ তুমি আমার শ্যামল সামাল দাও।
- তা'তে কী হবে?
- হাইক্লাস তুকতাক নিপা। তুমি আর আমি যদি ফস্কেই যাই, কোনওদিন যদি সে দুর্ঘটনা ঘটেই যায়..। এই দু'টো গান আমাদের হয়ে মাঝেমধ্যেই এই কার্শিয়াংয়ের বেঞ্চিতে এসে বসবে। নোটস এক্সচেঞ্জ করে সরে পড়বে।
- তুমি একটা অখাদ্য।
- কলকাতায় ফিরে একটা সুপারসিরিয়াস প্রপোজাল দিয়ে তোমায় জাস্ট ঘাবড়ে দেব৷ তখন আর অখাদ্য মনে হবে না!
- দাও দেখি তোমার শ্যামল মিত্র৷ আর এই নাও, ডিলান৷

লংঅফ থেকে লাদাখ



- কী রে, বসে পড়লি কেন..চ'! ওঠ! ক্যুইক!
- কোথায়?
- এরপর এখনও তিনটে স্পট দেখা বাকি আছে৷ সব কভার করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে যে..।
- উঠতেই হবে?
- বাহ্ রে৷ মাপা হিসেব এ'দিক ও'দিক হয়ে গেলে যে ক্যালামিটি৷
- সাইট সিয়িং যে অফিস করার থেকেও ট্যাক্সিং হয়ে যাচ্ছে রে৷ আর্লি মর্নিং, ডেডলাইন, ডিসিপ্লিন৷
- আহ, বোঝার চেষ্টা কর। ফ্যান্টাস্টিক সব জায়গা দেখতে হবে তো। আলো পড়ে গেলেই ঘোরাঘুরি মাটি৷
- প্লীজ, ডাকওয়ার্থ ল্যুইস লাগিয়ে দু'একটা জায়গা ড্রপ কর৷ ব্যাগে কাপ নুডলস আছে৷ ফ্লাস্কে গরম জল৷ টী ব্যাগসও আছে৷ আজ লাঞ্চ আর টী ক্লাসিকাল হিসেবে ক্রিকেট মাঠেই হোক না৷
- কিন্তু লাদাখ ঘুরতে এসেছি...এত সব এক্সোটিক জায়গা..বাদ দেব?
- গ্রাউন্ড কন্ডিশন দেখেছিস? এর চেয়ে বেশি এক্সোটিক ক্রিকেট সেটিং সহজে পাবি?
- উম..পাব না৷ তাই না?
- মাইনাস টেম্পারেচার, চারদিকে পাহাড়, হাইক্লাস অ্যাকশন৷ সোয়েটার জ্যাকেটের ওপর শাল জড়িয়ে, মাঙ্কিটুপি চাপিয়ে পাশে এসে বস।
- বসে যাব?
- আলবাত বসে যাবি।
- সা..সাইট সিয়িং?
- এর চেয়ে উচ্চমার্গের সাইট সিয়িং আর কী হবে বল৷ ইডেনে এমন মেজাজ পাবি?
- একটা স্পেয়ার কম্বল এনেছিলাম গাড়িতে৷ মাদুরের মত পেতে নেব? মানে যদি জাঁকিয়ে বসতেই হয়..। ফিরে গিয়ে লন্ড্রিতে পাঠালেই হবে।
- ব্রাভো৷

ল্যাদ ও লাদাখ



লেপের তলে শুয়ে, ঢাউস জানালার বাইরে; পাহাড়ে দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকাটা অতি স্বাস্থ্যকর একটা ব্যাপার৷ দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে নির্ঘাৎ আমায় বয়স আড়াই মিনিট কমেছে৷ খাদের দিকে তাকিয়ে বুক ঢিপঢিপ নেই, কয়েক কোটি ছবি তুলে মোবাইল বোঝাই করা নেই৷ শুধু তাকিয়ে থাকা৷ আর অঙ্ক স্যারের ভাষায়; "গোটা সিচুয়েশনটাকে অ্যাবজর্ব করা", বাট ফ্রম দ্য সেফটি অফ নরম বিছানা আর সাদা ওয়াড়ে মোড়া জবরদস্ত লেপ।
আর যদি বিছানার পাশের টেবিলের ওপর রাখা প্লেট থেকে আলুভাজা তুলে চিবুতে চিবুতে সে পাহাড় উপভোগ করা যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা৷ ইয়ে, আলুভাজা হলেই ভালো, গাম্বাট ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মধ্যে ঠিক পোয়েট্রি নেই৷
আর তারপর৷ যদি কানে স্টিফেন ফ্রাইয়ের কণ্ঠে উডহাউসের ভাষায় খতরনাক জীভসের গল্প শোনা যায়, তবে সেই গোটা আমেজটাকে আরও খানিকটা লেভিটেট করিয়ে দেওয়া যায়।

লেহ্‌ ও ফুর্তি



পাহাড়ের গায়ে লেহ্৷ চোখধাঁধানো চারপাশ৷ ঘ্যাম সব পাহাড়, দিল্লীকে টেক্কা দেওয়া শীত৷ টুরিস্টরা এ'সব জায়গায় এসেই কবিতা লিখতে শুরু করবেন৷ নেহাত লিখতে না পারলে কফিহাউস-মুগ্ধ একটা হাবভাব নিজের মুখে ফুটিয়ে তুলবেন, সে'টাই অন্তত কপিবুক রেস্পন্স৷ এমন শহরে ঘুরতে এসে তাই প্রাণে ফুর্তি বাড়বেই৷ তাই লেহ্ এয়ারপোর্ট থেকেই চনমনে মনমেজাজ৷
কিন্তু কী ক্যালামিটি! এ'খানে অলটিচিউড সিকনেসের ভয় আছে৷ প্রথম দিন থেকেই বেশি লম্ফঝম্প করলে নাকি বিস্তর গোলমালের সম্ভাবনা৷ শ্বেতা জানালে প্রথম দিন নাকি কোনও সাইটসিয়িং নয়, শুধুই নির্ভেজাল বিশ্রাম৷
অতএব...ফুর্তি ডবল হল।
এরপর আর এক কেস-জন্ডিস ব্যাপার। দেখলাম ফোনে সিগন্যাল নেই৷ আমার সার্ভিস প্রোভাইডার এ'খানে এখনও সুবিধে করে উঠতে পারেনি কী মুশকিল৷ ম্যানুয়ালি খুঁজেও সিগন্যাল জুটল না৷ বুঝলাম, ভরসা বলতে স্রেফ হোটেলের ওয়াফাই৷ কোনও জরুরী কল আসবে না৷ রাতবিরেতে কেউ ফোন করে কাজকর্মের কথা ঝালিতে নিতে পারবে না৷ এমন ম্যাদামারা জীবনের কোনও মানে হয়?
অতএব..ফুর্তি চারগুণ হল৷
এয়ারপোর্টে থেকে দর্জেবাবুর গাড়িতে চেপে সোজা হোটেল৷ একটা দেওয়াল জোড়া জানলার ও'পাশের ভ্যিউ অতি চমৎকার। কিন্তু এখানে আবার এক অন্য সমস্যা৷ ঘরের মধ্যেও বাতাসে এমন কনকনে শীত যে রুমের মধ্যে পায়চারি করতে গিয়েও রাম-কাঁপুনি৷ কী মুশকিল৷ কাজেই গোটাদিন কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই৷ বিস্তর শখসমেত ঘুরতে এসে শেষে কম্বলবন্দী হয়ে দিন কাটাতে হবে? স্রেফ বই পড়ে, নেটফ্লিক্স দেখে, রুমসার্ভিস মেনুকার্ড ঘেঁটে খাবারদাবার অর্ডার করে, আর চমৎকার কফিতে চুমুক দিয়ে দিনটা ফুরিয়ে যাবে? ভাবিইনি এমনটা৷
অতএব, স্পীকিং অ্যাজ আ লেহ্-ম্যান, ফুর্তি এখন ষোলোগুণ।

জগা মল্লিকের শাস্তি



- ব্রাদার৷ ও ব্রাদার। শুনছেন? জ্ঞান ফিরেছে?
- উঁ..।
- গা হাত পায়ে খুব ব্যথা নাকি? ব্রাদার? এহ্, আমার স্যাঙ্গাৎগুলো আপনাকে একটু বেশিই মারধোর করেছে। গোমুখ্যু ছেলেপিলে তো, মডারেশন ব্যাপারটা বোঝে না৷ তবে ভাববেন না৷ আমি ওদের খুব এক চোট ধমক দিয়েছি৷
- আমায় এ'ভাবে এদ্দিন আটকে রাখার মানে কী।
- এদ্দিন আবার কী৷ মাস তিনেকের বেশি তো হয়নি৷ বাড়ি ফিরে গুগুল ঘেঁটে দেখবেন শ্যামলবাবু৷ আপনার আগে বহু মানুষ মাসের পর মাস বন্দী থেকেছেন৷
- কী চান আপনারা৷ সে'টা তো এদ্দিনেও..।
- বলিনি৷ কারণ র্যানসম ট্যানসম নিয়ে আমরা মাথা ঘামাইনা৷ আমরা পেটি ক্রিমিনাল নই শ্যামলদা৷ কিছু মাইন্ড করবেন না, বাবুটাবু আমার পোষায় না৷ শ্যামলদাই ভালো৷ তাই তো?
- আপনারা টেররিস্ট?
- আমরা ভোট চাইলে আমাদের টেররিস্ট বলতেন না৷ তাই না?
- আপনি..আপনি কে?
- ওহ, আমার নাম জানা নেই বলে আলাপচারিতায় অসুবিধে হচ্ছে৷ তাই না ব্রাদার? বেশ৷ ধরুন আমার নাম জগা মল্লিক।
- কী চাই?
- আপনাকে মুক্তি দিতে চাই শ্যামলদা৷ মুক্তি৷
- এ'সব বাজে কথার কী মানে?
- বটেই তো৷ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কথা বলছি না৷ আপনার মত সিভিলাইজড মানুষের কানে সে'সব বাজেই ঠেকবে৷
- এদ্দিন তো আমার সঙ্গে কথা বলেননি৷ আজ হঠাৎ..।
- ওই যে বললাম৷ আজ আপনার মুক্তি৷ আপনাকে আমরা ছেড়ে দিতে চাই৷ এই ভজা, শ্যামলদার হাতের বাঁধনটা খুলে দে বাপ৷ তবে পা আর কোমরটা আপাতত বাঁধাই থাক।
- আপনার মতলবটা কী?
- আপনি আমলা মানুষ৷ ইন্টেলিজেন্স তালেবর। সো কলড টেররিজমের বিরুদ্ধে নিবেদিত প্রাণ৷ আপনাকে রগড়ে দেওয়াটাই উদ্দেশ্য ছিল৷ তবে আমরা ঠিক করেছি আপনাকে ছেড়ে দেব৷ আফটার অল আপনার বৌ-মেয়ে নির্দোষ৷ আপনার অপেক্ষায় তারা নাওয়াখাওয়া ভুলে বসে আছে৷ দে ডিজার্ভ পীস৷
- বলে যান৷
- একটা ছোট্ট কাজ আপনাকে করতে হবে৷ মানে কাজটা এতই এলেবেলে যে বলতেও লজ্জা লাগছে৷ কিন্তু কী করি বলুন৷ আমারও ওপরওলা আছে৷ এই নিন৷ এই রিমোটটা ধরুন।
- এ'টা...এ'টা কী..।
- আরে! সাধারণ রিমোট৷ আপনাকে শুধু ওই বোতামটা টিপতে হবে৷ কাজটা নেহাতই পাতি৷ আমরাও সেরে ফেলতেই পারি৷ কিন্তু আমরা চাইছি এই পুণ্যটা আপনার কপালেই থাক৷ নিন, বোতামটা টিপুন৷ তারপর ভজা আপনার বাকি বাঁধনগুলো খুলে, মাছের ঝোল ভাত-চাটনি-সন্দেশ খাইয়ে, আপনাকে ট্যাক্সি করে বাড়ি দিয়ে আসবে৷
- এই বোতামটা টিপলে কী হবে?
- এ'সব ছেলেমানুষি প্রশ্ন আপনাকে মানায়? দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী শ্যামল দত্তর মুখে এমন নেকু প্রশ্ন মানায়?
- কী হবে?
- হাজার খানেক লোক সমেত কোনও ট্রেনে উড়ে যাবে হয়ত৷ অথবা ধরুন জমজমাট একটা গোটা বাজার ফুশ্ করে গায়েব৷ বলা যায় না, হাওড়া ব্রিজটাই হয়ত উবে যাবে৷ পসিবিলিটিস আর এন্ডলেস৷ তবে সে'সব ভেবে আপনার কাজ নেই৷ আসুন৷ বোতামটা টিপুন৷ অ্যান্ড দেন, মুক্তি৷ প্রমিস৷
**
মেয়ের মুখ বারবার মনে পড়ে৷ বুক ফেটে যায় শ্যামল দত্তের৷ কাছেই একটা টুলের ওপর রাখা রিমোটটা মাঝেমধ্যেই নেড়েচেড়ে দেখেন৷ হাত বোলান সে রিমোটের প্লাস্টিকে৷ কাঁপা কাঁপা আঙুলে হালকা স্পর্শ করেন লাল বোতামটা৷ আর তারপর সাবধানে সেই টুলের ওপর রেখে দেন৷
এ'ভাবেই কতদিন কেটে গেল৷ প্রতি মুহূর্তে মুক্তির হাতছানি; সে হাতছানি যে কী যন্ত্রণার৷ খুকির মুখ তাকে টানে, আবার খুকির মুখটাই মনে করিয়ে দেয় আর পাঁচটা খুকির প্রাণ তাঁর হাতের মুঠোয়৷ মাসখানেক পর সমস্ত বাঁধনই খুলে দিয়েছিল জগা মল্লিকের স্যাঙাৎরা৷ বন্দী হলেও হাঁটাচলা আটকে থাকেনি৷ শুধু সেই রিমোটটার দিকে তাকিয়ে প্রতি মুহূর্তে অজস্রবার ছিন্নভিন্ন হতেন শ্যামল৷
**
- ব্রাদার।
- জ..জগা..জগা মল্লিক?
- নামটা সাজানো নয় স্যার৷ এত বছর পরেও আপনি মনে রেখেছেন, থ্যাঙ্কিউ।
- আমি যার আস্তানায় বন্দী, তার নাম ভোলাটা গোস্তাখি।
- কেমন বোধ করছেন?
- এ'বারে সত্যিই মুক্তি হে জগা।
- ডাক্তার আজ আপনাকে দেখে গেলেন। ঘুমিয়েছিলেন আপনি।
- ডাক্তারির আওতায় আর কি আছি হে? এ'বার মুক্তি৷ দিন কয়েক, বড়জোর৷ তোমার রিমোটের বোতাম আর টিপতে হল না৷ এই বাঁচোয়া।
- তেরোটা বছর এইভাবে থেকে গেলেন৷ অথচ রিমোটের বোতামটা টিপলেই আপনি বেরিয়ে যেতে পারতেন৷
- আমায় খুন করতেই পারতে৷ তবে আমায় দিয়ে অকারণ মানুষ খুন করাতে পারবে না৷ কিছুতেই না৷ তা, ক'জন মারা যেত আমি এ বোতাম টিপলে?
- একজন।
- হুম?
- আমাদের দল আমায় বিশ্বাসঘাতক ভেবেছিল। আমার শাস্তিবিধান কী ছিল জানেন? আমার বন্দী..অর্থাৎ আপনার হাতে নিজের মেয়ের খুন হতে দেখা৷ আমার মেয়ে গত তেরো বছর একটা লকেট পরে রয়েছে৷ যে'টা সঙ্গে সঙ্গে তারও উড়ে যাওয়ার কথা, আপনি এই রিমোটের বোতাম টিপলে।
- জগা..!
- নিজের খুকির থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখে আমার খুকিকে আপনি বাঁচিয়ে রেখেছেন শ্যামলদা৷ এ পাপ থেকে আমার মুক্তি নেই জানি৷ শুধু পারলে বিশ্বাস করবেন..আপনার খুকিকে আমি ভেসে যেতে দিইনি৷ আড়াল থেকে হলেও তাকে আগলে রেখেছি৷ আগলে রাখবও৷ আর বিশ্বাস করুন, গত তেরো বছরের প্রতিটি মুহুর্ত, আমি আপনার চেয়েও বহুগুণ বেশি যন্ত্রণায় কাটিয়েছি৷
- আই ট্রাস্ট ইউ ব্রাদার৷

প্ল্যাটফর্ম আর টিকিট কাউণ্টার



- সাহেব, কফি চলবে নাকি?
- কফি?
- এখন তো সবে পৌনে বারোটা। যা খবর তা'তে ট্রেন অন্তত দেড় ঘণ্টা লেট। ভোর হয়ে যাবে আসতে। গাঁওদেহাতের শীতের রাত। তাই বলছিলাম..।
- টিকিট কাউন্টারের লোকটা ছাড়া আর কেউ আছে নাকি আশপাশে? চায়ের দোকান দেখলেন নাকি কোনও অজয়বাবু?
- হেহ্। কী যে বলেন সাহেব। স্টেশন আসার পথে তো দেখলেন, মাইল পাঁচেকের মধ্যে কোনও গেরস্থালী নেই।
- তা'হলে কফি..?
- এই যে।
- ওহ্। আপনার ফ্লাস্ক!
- দিল্লী থেকে এদ্দূরে ইন্সপেকশনে এসেছেন সাহেব। সরকার বাহাদুরের রিপ্রেজেনটেটিভ বলে কথা৷ যদিও আমি নেহাতই কপালজোরে আপনার লেজুড় হয়ে জুটে গেলাম। তবু, আপনার সামান্য যত্নটত্ন তো ফেলো-বাঙালি হিসেবে আমায় করতেই হবে, কী বলুন! আসুন, এই যে এক কাপ। ব্ল্যাক। তবে চিনি আলাদা করে চাইলে পাবেন।
- নাহ্। ব্ল্যাক ইজ গুড।
- দেহাতের শীতে কেমন কামড় দেখেছেন?
- মারাত্মক। যাক গে৷ কাল বিকেলের আগে পাটনা পৌঁছনো যাবে বলে তো মনে হচ্ছে না৷
- তাই তো মনে হচ্ছে৷
- বাহ্৷ কফিটা দিব্যি অজয়বাবু৷ থ্যাঙ্কিউ।
- সাহেবের ভালো লেগেছে৷ আমি তাতেই তৃপ্ত।
- আচ্ছা! টিকিট কাউন্টারের লোকটা যেন কেমন, তাই না?
- হ্যাঁ। হাবাগোবা।
- শুধু তাও নয়৷ চাউনিটাও কেমন যেন৷ অবশ্য এই শীতের রাতে প্ল্যাটফর্মে উটকো প্যাসেঞ্জার এসে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাবে, এটা বোধ হয় সে আশা করেনি। কিন্তু কী অদ্ভুত, আমাদের এত হাঁকডাক শুনেক টুশব্দটি করল না! যাক গে, আপনার সিগারেট চলে নাকি?
- নাহ্ সাহেব। বছর সাতেক হল স্মোকিং ছেড়েছি। আপনি খান।
- না থাক। পরেই ধরাবো না হয়।
- আপনার সুটকেসে একটা কম্বল আছে না? পারলে জড়িয়ে এই বেঞ্চির ওপরেই লম্বা হয়ে পড়ুন৷
- এ হাড়কাঁপানো শীতে দু'চোখের পাতা এক করতে পারব বলে মনে হয় না৷ তার ওপর এই কড়া কফি। তবে চেষ্টা করতে পারি।
- বেশ৷ কফিটা শেষ করে আপনি বেঞ্চিতে কম্বল পাতার জোগাড়যন্ত্র করুন। আমি বরং কাউন্টারের লোকটাকে আর একবার জ্বালিয়ে আসি৷ ট্রেনের নতুন কোনও খবর হল কিনা জানা দরকার। অবশ্য, যদি রেস্পন্ড করে৷ অদ্ভুত ক্যারেক্টার একটা।
- এত অল্প সময়ের পরিচয়ে আপনি যে'ভাবে আমায় সাহায্য করছেন অজয়বাবু..আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ৷ মাঝরাস্তায় আচমকা গাড়িটা ব্রেকডাউন হওয়ায় যেন অথৈজলে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে দেখা হল তাই..।
- এ'সব বলে আবার লজ্জা দেওয়া কেন সাহেব৷ আমি সামান্য কেরানী মানুষ, আপনার জন্য এ'টুকু করতে পারছি, সে'টা তো আমারই গুড ফরচুন। নিন, রাজশয্যা পেতে ফেলুন। আমি ঘুরে আসি।
**
- এই যে! এই য্যো! শুনছেন?
- ক..কউন..।
- এইত্তো৷ তা বলছি পাটনা যাওয়ার ট্রেনের আর কোনও খবর এসেছে? আরও লেট করছে কী?
- কউনসা টিরেন?
- আপনি তো বাংলা জানেন সাহেব৷ খামোখা হিন্দী বলা কেন। কাউন্টারে যতই কম্বলমুড়ি দিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকুন, আমি আপনাকে চিনি।
- আ..আমি..ত..তাই তো। আমি বাংলা জানি।
- আলবাত জানেন৷ অবশ্য, আপনি ভুলেও যান৷ তবে ক্ষতি নেই৷ আমি আছি তো মনে করিতে দেওয়ার জন্য৷
- আ..আপনি..আপনি..আপনি তো..।
- আমি অজয়৷ আপনার বহুবছরের সঙ্গী। একমাত্র বন্ধু৷
- বন্ধু? আমি..আমি আপনার বন্ধু নই৷ আমি বন্দী। আমার...আমার মনে পড়েছে..।
- কী মনে পড়েছে সাহেব?
- ইন্সপেকশন সেরে পাটনা ফিরছিলাম৷ গাড়ি বিগড়ে যায়৷ তারপরই আপনি আচমকা উদয় হন৷ ট্রেনে পাটনা যাওয়া যাবে বলে এই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসেন৷ তারপর...তারপর..।
- আপনাকে কফি খাওয়াই৷ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে শুতে বলি৷ আর তারপর আপনি স্রেফ হারিয়ে যান৷ মাঝেমধ্যে আপনার ঘুম ভাঙে। আপনি জেগে ওঠেন এই টিকিটকাউন্টারের একছত্র অধিপতি হিসেবে৷ থ্রিলিং না?
- আমি..আমি..আমি বেরোতে চাই।
- ও মা। আমি তো নিজের ম্যাজিকে বছরের পর বছর সুখে বাস করছি৷ দিব্যি ঝাড়াহাতপা। এই প্ল্যাটফর্ম কারুর চোখেও পড়েনা, কেউ আমাদের জ্বালাতেও আসে না৷ শুধু সেই পাটনার ট্রেনের অপেক্ষা৷ যে অপেক্ষা শেষ হবে এমন আশঙ্কাও নেই। সে ট্রেনও আবার দেড়ঘণ্টা লেটের হিসেবে আটকে, ওই বছর কুড়ি ধরে৷ এমন দুর্দান্ত জায়গা থেকে আপনাকে বেরোতে দিলে চলবে কেন? যাক গে৷ জানেন, মাঝেমধ্যে; কুড়ি বছর আগের আপনার ইন্সপেক্টরসাহেব অবতারটি আপনার বর্তমান টিকিট কাউন্টারে বসা গ্রাম্য চেহারা আর চাউনি দেখে অবাক হয়ে পড়ে? আপনাকে সে বিস্তর ডাকাডাকিও করে, কিন্তু আপনি সাড়া দিতে পারেন না৷ ঠিক যেমন কুড়ি বছর আগেও সাড়া দিতে পারেননি! ম্যাজিক! ও কী, ঝিমিয়ে পড়ছেন যে ফের..ও মশাই..।
- ট্রেন..ট্রে...টিরেন দেড় ঘণ্টা লেট ছে..।
- বেশ৷ আপনি ঘুমোন৷ আমি বছর কুড়ি পুরনো আপনিকে আমার এই জাদু ফ্লাস্কের কফি খাইয়ে আসি'খন।

পুরনো লেখা