Saturday, September 24, 2022

পাপাইদা আর বিশ্বাসঘাতক



সে'কদ্দিন আগের কথা।

সে'দিন পাপাইদা বসেছিল মেঝের ওপর পাতা মাদুরে। পাশবালিশে হেলান দিয়ে। দু'বছরের মাথায় উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর ওর রোয়াব খুব বেড়ে গেছিল। বকাবকি করার সময় ইয়াব্বড় সব ইংরেজি শব্দ আউড়াত। খবরের কাগজ ঘেঁটে পলিটিকাল নিউজ পড়ত। ওর মেজকার দামী জিলেটের রেজার চুরি করতে গিয়ে দু'বার গাঁট্টাও খেয়ে ফেলেছিল। ফুলটসে বোল্ড হওয়ার পর হাওয়ার ডিরেকশন আর টেনিসবলের 'টেকনিকাল গ্যাপ' নিয়ে গা-কাঁপানো লেকচার ঝাড়ত। মোটের ওপর, পাপাইদাকে একটু বাড়তি সমীহ করতে শুরু করেছিলাম। এই যেমন একদিন বাবার পকেট থেকে পড়ে যাওয়া পঞ্চাশ টাকার নোটটাকে খামোখা পকেটে ফেরত না দিয়ে সোজা চপের দোকানে গেলাম, কিন্তু পাপাইদার প্রতি প্রবল সমীহ ব্যাপারটা মাথায় রেখে আর ওকে বেগুনিতে ভাগ বসানোর জন্য ডাকলাম না।

যা হোক, সেই দুপুরে পাপাইদার চিলেকোঠার চেম্বারে না এসে উপায় ছিল না। আমি একটা বেতের মোড়ায় লেতকে বসেছিলাম। আড়াই মিনিট পাপাইদা চুপচাপ সিলিংয়ের তাকিয়েছিল, মাঝেমধ্যে বলছিল "কোয়াইট ইনক্রেডিবল"। খানিকক্ষণ পর পাশবালিশ সরিয়ে রেখে সোজা হয়ে বসল পাপাইদা। 

- ভুতো, আর ইউ শিওর?

- আমি নিজের চোখে দেখে এলাম।

- বিট্টা আর মৌ?

- তবে আর বলছি কী।

- পাশাপাশি? 

- একদম। 

- হয়ত টিউশনি যাচ্ছিল, ওদের সাবজেক্ট তো একই। 

- কাঁধে ব্যাগ ছিল না। আর...। 

- আর কী? খুলে বল্‌ ভুতো। 

- মৌদি শা...শাড়ি পরে...আর বিট্টাদা পাঞ্জাবি...।

- ও মাই গড।

- ইয়ে, পাপাইদা। শাড়ি আর পাঞ্জাবি। ম্যাচিং।

- ম্যাচিং? ডিড ইউ সে ম্যাচিং? হোলি কাউ! দিস ইজ ডিসগাস্টিং। বিট্টাটা না হয় ইরেস্পন্সিবল লোফার ছেলে একটা। মৌ কী করে এমন শেমলেস হতে পারল...।

- ইয়ে, বাবা কিন্তু বলে বিট্টাদার মত ছেলে হয়না। আইআইটিতে পড়ছে, ভদ্র, নম্র। দুর্দান্ত টেনিস খেলে...।

- প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড, তোর বাবা একটা সুপারগাম্বাট। সামান্য চাঁদা চাইতে গেলে তো হাজার রকমের টালবাহানা শুনতে হয়। কত জ্ঞান! উফ! পরীক্ষা সামনে এখন পুজো পুজো করে নাচলে হবে কেন। ইনফ্লেশনের বাজারে পুজোয় এত বাড়াবাড়ি ভালো না। এট সেটেরা। এট সেটেরা। সে কত রকমের ফিচলেমি। বিট্টার মত মেনিমুখো ছেলেরা যে সোসাইটির পক্ষে কতটা টক্সিক, সে'টা বোঝার মত ইন্টেলিজেন্স তোর বাবার নেই।   

- যাক গে, আমি জানিয়ে গেলাম। 

- পাড়ার একটা রেস্পন্সিবল রেসিডেন্ট হিসেবে এই মরাল ডিগ্রেডেশন আমায় রুখতে হবে।

- মরাল কী?

- সে'সব বোঝার বয়স তোর হয়নি। 

- বা রে, তুমিই না বলতে, তোমার স্বপ্ন মৌদিকে সাইকেলে বসিয়ে পুজোয় ঘোরার? বিট্টাদা তো শুধু পাশাপাশি হেঁটেইছে। 

- সবে মাধ্যমিক পাস দিয়েছিস। সব ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার করিস কোন সাহসে ভুতো?

- যাব্বাবা। ইনফর্মেশনটা দেওয়াই দেখছি ভুল হয়েছে। বেশ, আমি আসি। খবরটা যখন শেয়ার করা হয়েই গেছে...।

- এই ভুতো। কুড়িটা টাকা হবে রে?

- টাকা? টাকা আমার কাছে কই। 

- তোর হাতে কাঁচাটাকা এসেছে সে খবর আমি রাখিনা ভেবেছিস? পরশু তুই শ্যামলদার দোকানে গিয়ে ছ'পিস বেগুনী খাসনি? একা একা?

- ওই, না, মানে হয়েছিল কী...।

- শাটাপ! গোটা পাড়াটা ট্রেটারে ভরে গেল। 

- তুমি বেগুনীর খবরে কনসেন্ট্রেট করলে, এ'দিনে শাড়ি পাঞ্জাবি ম্যাচিং হয়ে গেল।

- এ মায়া প্রপঞ্চময়।

আচমকা বেগুনীর উল্লেখে সত্যিই কেমন হয়ে গেছিল পাপাইদা। খটখট করে ইংরেজি চাল দেওয়া বন্ধ হয়েছিল সে'দিন থেকেই।

সে'কতবছর আগেকার কথা। 

আজ সন্ধেবেলা পাপাইদার দিল্লীর ফ্ল্যাটবাড়িতে চ্যালা মাছ ভাজা খেতে খেতে খোশ গল্প জমেছিল। পাপাইদাই ভাজছিল আর রান্নাঘর থেকে মাঝেমধ্যে এসে প্লেটে ঢেলে যাচ্ছিল। মৌদি ওদের হিমাচল ঘুরে আসার ছবি দেখাচ্ছিল। পাপাইদার ছেলেটা মহাদুরন্ত এবং হাইলি ফচকে হয়েছে। ওর সঙ্গেও দিব্যি গল্পআড্ডা জমে যায়। পাপাইদার আমায় ট্রেটার বলার গল্প শুনে মৌদি বললে ছেলেবেলার সমস্ত মার্কামারা ট্রেটারদের প্রতি নাকি পাপাইদার মায়া অসীম। 

- কী'রকম মৌদি?পাপাইদা আর কোন ট্রেটারকে আগলে রেখেছে?

- কাল তো মহালয়া। সকাল সকাল চলে আয়। নিজের চোখে দেখতে পাবি। তুইও কিন্তু লাঞ্চ করে ফেরত যাস। বাড়ি থেকে এদ্দূরে মহালয়ার দিন একা থাকবি কেন।

- সে আসা যেতেই পারে। কিন্তু কালকেও কোনও ট্রেটার আসছে নাকি?

- বিট্টা।

- বিট্টাদা?

- সে দিল্লীতেই থাকে। এই সে'দিনই আমরা জানতে পারলাম। আইএনএ মার্কেটে বাজার করতে গিয়ে দেখা। পাপাইতো বিট্টাকে জড়িয়ে ধরে নেমন্তন্ন করে একাকার কাণ্ড। বিট্টা নিজেই হতবাক। উফ, তোর পাপাইদা পারেও বটে।

- পাপাইদা সত্যিই অদ্ভুত। আমার বাবাও ওর দু'চোখের বিষ ছিল। আজকাল মাসে একবার আমার বাবাকে ফোন করে খুব খাতির করে। বাবাও দেখি আজকাল পাপাইদা বলতে অজ্ঞান।

- তবে বিট্টাকে কিন্তু ঠিক সাদা মনে ডাকেনি তোর পাপাইদা।

- কী'রকম?

- বিট্টাকে নেমন্তন্ন করেই কাপড়জামার দোকানে ছুটেছিল। সেই সন্ধেবেলাই। আমায় একটা নতুন শাড়ি কিনে দিল, আর নিজের জন্য কিনল ম্যাচিং পাঞ্জাবি। কাল বিট্টা এলে আমরা সে'টাই পরছি। 

- সত্যিই, পাপাইদার জবাব নেই।  

Thursday, September 22, 2022

রিল্যাক্সিং



- বুঝলে দত্ত, এ'বার পুজোটা ভাবছি টোটালি রিল্যাক্স করে কাটাব।

- আপনি তো লাকি চ্যাপ দাদা, টানা পাঁচদিন ছুটি? তা, এ'বারেও কি দার্জিলিং? নাকি কেরলটেরল কিছু।

- ঘোরাঘুরি যে কতটা ট্যাক্সিং...উফ। টিকিট বুক করো। প্যাকিং করো, আনপ্যাকিং করো, রিপ্যাকিং করো, রিআনপ্যাকিং করো। গাড়ি ভাড়া করো। সাইটসিয়িংয়ের ছক কষো। প্ল্যান এ, প্ল্যান ব, প্ল্যান সি। উফ, ভাবতেই পালসরেট বেড়ে যাচ্ছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। লেবুসরবত খেতে হবে এ'বার।

- ও, তা'হলে এ'বার পুজোয় মণ্ডপ সাফারি। হ্যাঁ, সেই ভালো। হাঙ্গামা কম। ঠাকুর দ্যাখা, খাওয়াদাওয়া; হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফুর্তি। 

- তুমি দুর্গাপুজো দেখেছ কোনোদিন দত্ত? হাবভাব দেখে তো মনে হয় তুমি বলিভিয়ার মানুষ। উইকিপিডিয়া পড়ে দুর্গাপুজোর কথা জেনেছ।

- সে কী!

- ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখতে কী পরিমাণ স্ট্যামিনা দরকার হয়,সে'টা তুমি জানো না? পায়ের মাসল এক্কেবারে লোহার মত হতে হবে। রেস্টুরেন্টে আড়াইঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য দরকার অ্যালুমিনিয়ামের কোমর। আর ঘাম, ধুলো, ইত্যাদি হজম করার ইনফাইনাইট ক্যাপাসিটি।  ঠাকুর দেখে রিল্যাক্স করা আর ঘামাচিতে বিটনুন মালিশ করা একই ব্যাপার।

- পুজোর পাঁচদিন ঘরের মধ্যে বসে? বিছানায় লম্বা হয় গোটা হপ্তা? শুধু খাওয়া শোওয়া আর বই?

- তুমি ব্যাচেলর মানুষ ভাই দত্ত। ব্যথা কী বুঝবে। গিন্নী আর আমার গোটা বছর অফিস, দৌড়ঝাঁপ হুড়মুড়; ও'টাই আমাদের ন্যাচরাল স্টেট অফ ইকুইলিব্রিয়াম। হুট করে পাঁচদিনের ছুটিতে বাড়ি বসে থাকতে গেলে বস্তাবস্তা কাজ এসে পড়বে ভাই। গিন্নী দেখবে বাথরুমের মেঝে রিপেয়ার করা দরকার, আমি দেখব বাড়ির দেওয়ালে এক পোচ রঙ না পড়লেই নয়। মোটকথা বাড়িতে থাকলেই কাজের বোঝা। আর সেই কাজের বোঝার জর্জরিত হয়ে দু'জনের খিটিরমিটির।

- আপনার মতলবটা কী বলুন তো? পুজোয় রিল্যাক্স করবেনটা কী'ভাবে?

- পুজোর পাঁচদিনই অফিস করছি ভাইটি। সক্কালসক্কাল হাজিরা। সন্ধেবেলা রিটার্ন। মাঝখানে ফাঁকা অফিসে আমি অ্যালেক্সান্ডার সেলকার্ক। নিজের ইচ্ছেমত প্যান্ট্রিতে গিয়ে কফি অমলেট বানাবো। ফাইল ক্লিয়ার করব। অফিসে লোক কম থাকবে, দিব্যি গান শুনতে শুনতে হেলেদুলে কাজকর্ম করা যাবে। এক্কেবারে স্পা ফর সোল, টানা পাঁচদিন।

- দাদা, আপনি সোশিওপ্যাথ।

- মন্দ লোকে কত কী রটায়, সে'সবে কান দিও না। কেমন?

Thursday, September 15, 2022

ডিয়ার বেহালা মেট্রো



আজ বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রান শুরু হয়েছে৷ এ'খবরটা কী ভাবে আত্মস্থ করব সে'টা বুঝে উঠতে পারছিনা৷ গত বেশ কিছু বছর ধরে মনের মধ্যে মেট্রো-পিলারগুলো সম্বন্ধে একটা শ্যামনগরের মেজোপিসেমশাই গোছের রেস্পেক্ট তৈরি হয়েছিল। গোটা সন্ধ্যে ড্রয়িংরুমের সোফা আলো করে বসে থাকা আর মাঝেমধ্যে ঝিমোনা ছাড়া ছাড়া সে পিসের তেমন কোনও কাজ নেই। তাঁর নিশ্চুপ উপস্থিতিটাই সে ড্রয়িং রুমের লক্ষ্মীশ্রী৷   

যা হোক, বেহালা মেট্রোপিলারের উপকারিতা সম্বন্ধে স্কুলের ছেলেমেয়েরা সবে এস্যে লিখতে শুরু করেছিল৷ বেহালায় যা ভীড়, সুট করে চাইলেই তো আর পিরামিড বানানো সম্ভব নয়৷ কাজেই একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যে আজ থেকে হাজার বছর পর যখন অদরকারি পিলারই বিশ্বজুড়ে ট্রেন্ড করবে, তখন সবাই "বেহালা স্টাইল অফ আর্কিটেকচার" নিয়ে দুর্বোধ্য সব বইটই লিখে ফেলবে৷ তারপর ধরুন মেট্রো ট্রেন চালানোর মত অদরকারী ব্যাপার নিয়ে বিশেষ মাথা না ঘামিয়ে দিব্যি সে মেট্রোলাইনের তলে তলে বাগান তৈরি হচ্ছিল, হাইলি কালচারাল মুর্তিটুর্তি বসছিল৷ ট্র‍্যাফিক জ্যামে গলদঘর্ম হতে হতে সে'সব ডিজাইনার পিলারদের দিকে তাকিয়ে থাকার যে মেডিটেটিভ এফেক্ট; সে'টা সত্যিই তুরীয়। তারপর ধরুন ওই দুর্গাপুজো কালীপুজো এলে সেই পিলারের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া টুনিবাল্বের চাদর; স্পেক্টাকুলার। এ'সবের মধ্যিখানে মেট্রোফেট্রো চালানোর যে কোনও দরকার থাকতে পারে, সে'টা আর মনেই ছিলনা৷ 

সবচেয়ে যে'টা বড় ব্যাপার, বাঙালির রিয়েলএস্টেট সেন্টিমেন্টের জন্য এ'টা একটা বড় ধাক্কা৷ কতগুলো প্রজন্ম "আজ ইনভেস্ট কর, কাল মেট্রো হবে, ইনভেস্টমেন্ট সতেরোশো গুণ হবে" বলে ঝালমুড়ি বা হজমোলা লজেন্সের মত ফ্ল্যাটবাড়ি বেচে গেল৷ কত হাজার মানুষকে সামান্য সুড়সুড়ি দিলেই মন্ত্রের মত শুনতে পাওয়া যাবে "পিপিএফে রাখা মানে তো পুওর রিটার্ন৷ তাই সব তুলে লাগিয়ে দিয়েছি বেহালা মেট্রো ঘেঁষা ফ্ল্যাটের ডাউন পেমেন্টে৷ এরপর ইএমআই৷ আজ থেকে বাহাত্তর বছর যখন মেট্রো চলবে, তখন ম্যানহ্যাটন লেভেলের দাম পাব"।

এই মেট্রো-হবে-হবে-হবে-হবে মার্কা ইমোশনাল ইকুলিব্রিয়াম; এর তুলনা হয়না৷ ওই, পুজো আসছে আসছেই ভালো৷ পুজো এসে পড়লেই সোজা জ্ঞান ফেরে ওই দশমীর সন্ধ্যের "যাহ শাল"য়৷ এই বেহালা মেট্রোর ট্রায়াল রানের মধ্যেও কেমন যেন সেই দশমীর সন্ধ্যের ফ্লেভার। 

ভালো ঠেকছে না, বুঝলেন৷ আজ বাদে কাল মেট্রো চালু হবে, পরশু রাস্তা চওড়া হবে, তরশু কেউ বলবে পার্কে চুমু খেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না৷ কিছুই বলা যাচ্ছেনা৷ যাকগে৷ একদিন জোকা টু পার্ক স্ট্রীটও জুড়ে যাবে, এই আশ্বাসটা চাগিয়ে এ'বার আর এক রাউন্ড ফ্ল্যাট বেচাকেনায় মন দেওয়া যাক৷ 

মনে রাখবেন, হবে-হবে ব্যাপারটাই ভালো৷ হয়ে গেলেই সব শেষ।

Friday, September 2, 2022

আমার খাবারদাবার



আমি (এবং আমরা অনেকে) খাবারদাবার নিয়েই লিখি এত লিখি কেন? কারণ আমি (এবং সম্ভবত আমরা অনেকে) লিখিয়ে নই। যা নিয়ে গালগল্প করি, যে ভাষায় হে-হে-হো-হো গুলতানি চালাই; সে'গুলো টুকেবুকে রাখা ছাড়া আমার গতি নেই। আর আমার বেশির ভাগ চিন্তাভাবনা-গপ্প জুড়েই খাওয়াদাওয়া। অথচ আমি আর যাই হোক, খাদ্য-বিশারদ নই। খাওয়ার ইতিহাস সম্বন্ধে আগ্রহ থাকলেও আমি আদৌ তেমন ওয়াকিবহাল নই। সবচেয়ে বড় কথা, আমার খাওয়াদাওয়ার রুটিন শুধু সাদামাটা নয়, রীতিমত একঘেয়ে। আমার ভালোবাসার ঘ্যানঘ্যান শুধুমাত্র ওই পাঁচ-সাতটা পদের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। এই বিরিয়ানি নিয়ে আহ্লাদ আর ওই রোল নিয়ে লম্ফঝম্প, এই ইলিশের দাম নিয়ে হাহাকার আর  মাংস কষা নিয়ে রোমান্স। আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল; যা কিছু একবার ভালো লেগেছে, সে গণ্ডীর বাইরে আর পা রাখতে ইচ্ছে করে না। চাইনিজ দোকানে গেলে ওই চাউমিন আর চিলি চিকেনের বাইরে ভাবতে পারিনা। ঘ্যামস্য-ঘ্যাম জায়গার মোমো ম্যাটম্যাটে লাগে, এ'দিকে মনের মধ্যে শুধু ওই অল্পবয়সের রবীন্দ্রসদন মেট্রোর কাছে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের প্লেট-বাটিতে মোমো আর জোলো স্যুপের কথা ভেবে হাহাকার। সাহেবি-শখে কেনা কনভেকশন ওভেন-ফোভেন জলে পড়ে আছে; আমার শুধু ফিরে ফিরে যাওয়া ওই কড়াইয়ে কষানো মুর্গিতে বা সর্ষের তেলেভাজা ডিমের মামলেটে। ইউটিউব ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া দুরন্ত সব হাইওয়ের দোকান খুঁজে হানা দিচ্ছি। কয়েকশো মাইল পাড়ি দিয়ে সে'খানে পৌঁছে খুঁজছি কি? রুটি, ডিম-তরকা আর বিটনুন-চাটমশলা ছড়ানো কাঁচা পেঁয়াজের স্যালাড। ইয়ালম্বা দুরন্ত তন্দুরি মেনু; অথচ আমার দৌড় ওই রুমালি রুটির পাশে চিকেন তন্দুরি। নতুন কিছু, রুটিনের বাইরে কিছু, এক্সটিক কিছু; ভালো কি লাগে না? আলবাত লাগে। তবে যে ভালো লাগায় ধৈর্য বড় কম।

সেই একঘেয়ে খাবারদাবার নিয়ে এত মারাত্মক গদগদ হয়ে দিস্তে দিস্তে বাজে লেখা জমানোর কী মানে?বলি। ও লেখা তো খাবারদাবার নিয়ে আদৌ লেখা নয়। ও'গুলো হচ্ছে সুখদুঃখের ফর্দ। ধরুন কলেজের প্রথম দিন। কলকাতা শহরে সেই প্রথম একা; বৌবাজার থেকে হিন্দু হস্টেল হেঁটে যাওয়ার পথে, মেডিকাল কলেজের উলটো দিকে দাঁড়িয়ে একটা ডিমপাউরুটি কিনে খেয়েছিলাম। একা। মফস্বলের ছেলে সেই প্রথম কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে নিজের পকেট থেকে বের করা বাবার টাকায় সেই মহার্ঘ ডিমরুটি কিনে খেয়েছিল। কলকাতা শহরে নেওয়া ওটাই সম্ভবত আমার প্রথম 'ডিসিশন'। তখন সঙ্গে মোবাইল থাকত না, থাকলে জবরদস্ত ছবি তুলে রাখতাম। তখন ব্লগফ্লগও ছিল না। থাকলে সে ডিম-রুটি নিয়ে অন্তত হাজার শব্দ লিখে রাখতাম (যে'ভাবে ন্যাংচাদা কাঁচকলাকে নিয়ে পদ্যটদ্য করেছিল আর কী)। লেখায় ডিমরুটি থাকত বটে, কিন্তু তার আড়ালে থাকত আমার কলকাতাকে চেনার বুক-ঢিপঢিপ, সদ্য বাড়ি ছেড়ে আসার মনখারাপ আর হঠাৎ লায়েক হয়ে ওঠার এক মারকাটারি অনুভূতি। এমন ভাবেই; কত বিরিয়ানি-বিষয়ক লাফালাফি আদতে শুধুই পুরনো আড্ডা-বন্ধু ফেলে আসার মনকেমন। কত চাউমিনের স্টল নিয়ে লেখা থিসিস আদতে শুধুই ছোটবেলার স্মৃতি ঠিকঠাক ভাবে সাজিয়ে লিখতে না পারার অক্ষমতা। কত মাংসকষার সুবাস আদতে শুধুই গতানুগতিক সংসার আঁকড়ে পড়ে থাকার তৃপ্তিটুকুর ব্যাখ্যা।

আর, এই যেমন আজ।
অফিসের মন কষাকষি। প্রবল বিরক্তি। "সব গ্যালো বুঝি" মধ্যবিত্ত দুশ্চিন্তার গ্রাফে আচমকা স্পাইক। আচমকা কলার টেনে ধরা প্রবল ক্লান্তি। সুট করে মনে হয়, "ধ্যাচ্ছাই, কোনও কিছুই কিছু নয়। সব গাঁজা"। শরীর নয়ডায় পড়ে অথচ মন হিমালয়ে গিয়ে লেতকে পড়ে। এমন সময় দেখা গেল ডিনার টেবিলে দুপুরের ডাল, মাইক্রোওয়েভে গরম করা। ঢিপি করা পছন্দসই চালের গরম ভাত, পাশে একজোড়া ভালোমানুষ টাইপের বেগুনভাজা। আর সদ্য চাটু থেকে নামানো; সর্ষের তেলে ভাজা; জোড়া ডিমের একটা সুরসিক পাত-আলো-করা নরম মামলেট।  ব্যাস, হিমালয় ত্যাগ করে মনে ছুট্টে ফেরত এলো বডিতে; তুলসী চক্কোত্তির কণ্ঠস্বর বেজে উঠল বুকের ভিতর - "আরে হল হল, আর কত। এইত্তো আমি। এসেছি তো। এ'বারে দেখো, সব সামাল দেওয়া যাবে'খন। কেমন? কই গো, এ'বার গামছা আর সর্ষের তেলের বাটিটা দাও দেখি। দু'মগ জল ঢেলে আসি"। কাজেই মামলেট-ভাতের ছবি-গল্প খাওয়ার গল্প তো নয়, ও গল্প একান্তই আমার। সে গল্প লেখায় ফেলনা হলেও, আমার জন্য অমূল্য। ব্লগের খাবারদাবার নিয়ে যত লেখা; অতটুকুই আমার আড়াল থেকে মুচকি হাসা বায়োগ্রাফি। বাকি সমস্তই দ্য গ্রেট বাতেলা এক্সারসাইজ।

Tuesday, August 23, 2022

অর্ক আর সুমন



স্কুল থেকে ফিরেই দুদ্দাড় করে স্নান, হুশহাশ করে ঝোল-ভাত সাফ করা। এর পর অর্ক গিয়ে বসে ছাতের ঘরে। এ'টাই তার দুপুর-সাম্রাজ্য। আর তার সাম্রাজ্যে সবচেয়ে দামী জিনিস হল একটা ফিলিপ্সের পুরনো টেপরেকর্ডার।  মেজদা এক জন্মদিনে উপহার পেয়েছিল, কলকাতার কলেজে পড়তে যাওয়ার আগে অর্ককে উইল করে দিয়ে গেছে। 

তা'তে প্রচুর হিন্দি গান শোনে অর্ক। প্রচুর। কুমার শানু, উদিত নারায়ণ, অলকা ইয়াগ্নিক আর সাধনা সরগম; তার খুব পছন্দ। ফুলকাকার ধারণা অত লারেলাপ্পা হিন্দি গান শুনে অর্ক বখে যাবে। বাবার ধারণা ফুলকাকা বড্ড বেশ চালবাজ, সে'টাই বাঁচোয়া। 

বাবা বলে "যে গান পছন্দ সে গানই শুনবি। গানও যদি অন্যের মতে শুনতে হয়, তা'হলে আর বেঁচে থেকে হবেটা কী"।



**



- এক্সকিউজ মী। এই যে আপনি..আপনাকে কি আমি চিনি?



- আরে, মিস্টার চ্যাটার্জী৷ হোয়াট আ প্লেজ্যান্ট সারপ্রাইজ। আমি আপনারই অপেক্ষায় বসেছিলাম তো৷ 

আমিই দুলাল।

- এই অঞ্চলে আমি এর আগে আসিনি৷ একটা জরুরী কাজে আচমকাই এ'দিকে..। এই চায়ের দোকানও আগে দেখিনি৷ আচমকাই চলে এলাম। আমি জানতাম না এই বেঞ্চিতে আপনি বসে থাকবেন৷ নেহাত আপনার মুখটা একটু চেনা ঠেকল..

তাই দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলাম। আর আপনি বলছেন আপনি আমার অপেক্ষায় বসেছিলেন?দুলাল নামে কাউকে কখনই আমি...।

- বহু বছর ধরে মাই লর্ড। বহু বছর ধরে আমি আপনার অপেক্ষায় বসে।

- কী'সব আজেবাজে কথা!

- বাজে কথাই যদি হবে, তা'হলে আপনার আমায় চেনা-চেনা ঠেকল কেন মিস্টার চ্যাটার্জী?যাক গে, খামোখা সময় নষ্ট কেন। যে কারণে এসেছেন, সে ব্যবস্থা করা যাক।

- এক মিনিট। আমি কী কারণে এসেছি? এ'সব হেঁয়ালির কী মানে দুলালবাবু?

- আপনি কি সত্যিই বুঝতে পারছেন না?

মিস্টার চ্যাটার্জী একটা পেল্লায় ঢোক গিললেন। বুকের ঢিপঢিপটা বেশ অস্বস্তিকর পর্যায় পৌঁছে গেছে। 



**



বাবার কাছ থেকে মাসে দু'টো ক্যাসেট কেনার টাকা পাওয়া যায়৷ তা দিয়ে বিভিন্ন হিন্দি সিনেমার ক্যাসেট খুঁজেপেতে নিয়ে আসে অর্ক৷ কিন্তু এই অদ্ভুত লোকটার অদ্ভুতুড়ে বাংলা গানগুলো কী'ভাবে যেন ভালো লাগতে শুরু করেছে তার। এক ক্লাসমেটের বাড়িতে গিয়ে ওঁর গান প্রথম শুনেছিল, তারপর থেকে খানিকটা নেশার মত হয়ে গেছে। কাজেই গত মাসের 'ক্যাসেট-বখশিশ' দিয়ে ওই দাড়িওলারই দু'দুটো ক্যাসেট কিনেছে সে। "তোমাকে চাই" আর "ইচ্ছে হল"। আপাতত অবশ্য "ইচ্ছে হল" অ্যালবামটাই অর্কর বেশি প্রিয়। 

আর এই ক্যাসেটে একটা গান অর্ক বার বার রিওয়াইন্ড করে শোনে; "বয়স আমার মুখের রেখায়..."।
গানটা যতবার শোনে, অর্কর মনের মধ্যে আশেপাশের বয়স্ক মানুষগুলো সম্বন্ধে একটা আলাদা রকমের মনকেমন তৈরি হয়। একটা কেমন ব্যথা মেশানো স্নেহ; সে ঠিক বোঝাতে পারে না। ওই ব্যথা, স্নেহ, মায়া, ভালোবাসা মিলে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা। গানটার সুর যেমন, কথাগুলোও তেমনি সুন্দর। বাবার দূরসম্পর্কের মামা, কথায় কথায় ছড়া কাটা বিনোদদাদুর কথা মনে পড়ে, আসানসোলের দাদু-দিদার কথা মনে পড়ে, জামশেদপুরের অঙ্ক-পাগল বিমলজ্যেঠু,  এমন কি বাড়ির পাশের  মুদিখানায় বসে থাকা খিটখিটে জয়ন্ত জ্যেঠুর কথা ভেবেও মনটা সামান্য খারাপ হয়ে আসে। ওই বয়সে গিয়ে সবাই কি অল্প-বিস্তর একা হয়ে পড়ে? কে জানে। গত সাতদিন ধরে দুপুরবেলা নিয়মিত এই গানটা অন্তত বার তিনেক করে শুনছে অর্ক। 

**


চায়ের দোকানে বেঞ্চির ওপরই একটা ক্যানভাসের ব্যাগ রাখা ছিল। সেই ব্যাগটা তুলে নিয়ে বেশ একটা মাতব্বরে হাসি ছুঁড়ে দিলেন দুলালবাবু। মিস্টার চ্যাটার্জীর অস্বস্তি বেড়েই যাচ্ছিল। কিন্তু কিছুতেই সরে পড়তে ইচ্ছে করছিল না। আর কী আশ্চর্য, দোকানের অন্যান্য মানুষজন তাঁদের পাত্তাও দিচ্ছে না।

অন্তত আড়াই মিনিট সে ব্যাগ হাতড়ে দুলালবাবু ঘোষণা করলেন, "পেয়েছি মিস্টার চ্যাটার্জী, পেয়েছি"। 

**

সুমনের এই গানটা শুনতে শুনতে প্রতিবার বুকের মধ্যে একটা মোচড় টের পায় অর্ক। আজকেও পাচ্ছিল। আচমকা সামনের দেওয়ালে ঝোলানো আয়নাটার দিকে বুক ছ্যাঁত করে উঠল। 

**

ব্যাগ হাতড়ে একটা সস্তা দাড়ি কামানোর আয়না টেনে বের করলেন দুলালবাবু। 

- কই মিস্টার চ্যাটার্জী, এ'টার জন্যই তো এসেছিলেন। নাকি!

- এ'সব কী পাগলামো হচ্ছে দুলালবাবু?

- পাগলামো দেখেও তো পালিয়ে যাচ্ছেন না মিস্টার চ্যাটার্জী। দেখুন না, এ'টার জন্যই তো আপনি ছুটে এসেছেন। তাই না?

- এই আয়না? 

- দেখুন না।

- দেখার কী আছে! বিচ্ছিরি একটা আয়না। আর তা'তে আমি আর আপনি।

- সত্যিই তো। দেখার কী আছে। শুনুন। শুনুন। আয়নায় শুনুন।

- শুনব? আয়নায় শুনব?

- শুনুন না। মন দিয়ে।

মিস্টার চ্যাটার্জীর বুকের ভিতরে যেন কেউ ইটপাটকেল ছোঁড়াছুড়ি করছে।  গলা শুকিয়ে আসছে। স্পষ্ট হয়ে আসছে সব কিছু। খানিকটা কান্নাও পাচ্ছে তার। আর নিজেকে বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। বৃদ্ধ চ্যাটার্জী দিব্যি টের পাচ্ছিলেন যে আয়না থেকে ভেসে আসছে গান, "বয়স আমার, মুখের রেখায়..."। 

**
অর্ক হতবাক হয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে। সে নিজেকে দেখতে পারছে না। আয়না থেকে তার ঘরটাও হাওয়া। আয়নায় তখন দু'জন মানুষ দাঁড়িয়ে। দু'টোই অচেনা মুখ। একজনের উসকোখুসকো চেহারা, গালভরা হাসি। সে যেন অর্কর দিকে তাকিয়েই হাত নাড়ছে। আর তার পাশে একজন বয়স্ক মানুষ, নির্ঘাত বছর ষাটেক বয়স। এর মুখটা আবার অচেনা হয়েও চেনা। ভীষণ চেনা। সেই বুড়োটে আধ-চেনা মানুষটার চোখ ছলছল, যেন এই মাত্র কেঁদে ভাসাবেন। 

ও'দিকে ফিলিপ্স টেপ রেকর্ডারে সুমন অক্লান্ত ভাবে গেয়ে চলেছেন;
"গলার কাছে পাল তুলেছে আজগুবি এক স্মৃতির খেয়া
বয়স হওয়া মানেই বোধহয়; স্মৃতির সঙ্গে আড্ডা দেওয়া,
কে বলে হে আড্ডা নাকি কম বয়সের কথকতা
বয়স হলেই বরং জমে আড্ডা এবং নীরবতা"!

কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপরই আয়না থেকে সেই দু'জন বিটকেল মানুষ হারিয়ে গেল। কাঁপা হাতে অর্ক টেপ রেকর্ডারের 'স্টপ' বোতামটা টিপল।

**

কয়েক মুহূর্তেই আয়না থেকে সুমনের সেই গান হারিয়ে গেল। ততক্ষণে সমস্তই জলের মত সহজ। ডুকরে কেঁদে উঠে দুলালবাবুকে জড়িয়ে ধরলেন অর্ক চ্যাটার্জী।

দুলালবাবু আয়না সরিয়ে রেখে শুধলেন, "এই বয়সে গিয়ে সবাই কি অল্প-বিস্তর একা হয়ে পড়ে মিস্টার চ্যাটার্জী"?

Sunday, August 21, 2022

আলভারেজের ধনরত্ন



ঘুম ভাঙার পর আলভারেজ থ৷ এ কী৷ দিব্যি তাঁবুর মধ্যে ক্যাম্বিসের খাটে লম্বা হয়েছিল৷ অথচ ঘুম ভেঙে দেখছে সে একটা বিশাল বাওবাব গাছের তলায় শুয়ে৷ হাত-পা বাঁধা।

আর তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আলাভোলা মুখের জনা পাঁচেক জংলি লোক৷ আলভারেজ বুঝলে এরা বুস্ত্ববা উপজাতির লোক, এ অঞ্চলে এদের সাংঘাতিক দৌরাত্ম্য। এদের বড় একটা কেউ দেখেনি কারণ তানজানিয়ার জঙ্গলের এই দুর্গম অঞ্চলে বড় কেউ তেমন সুবিধে করতে পারেনা৷ গতকাল রাত্রেই আলভারেজ ভাবছিল যে এ পোড়া জায়গায় হীরে খুঁজে হন্য হয়ে লাভ নেই; এ অঞ্চলের একেকটা মশাও এক্কেবারে পান্তুয়ার সাইজের। এ'খান থেকে সময়মত কেটে পড়াই মঙ্গলজনক। আলভারেজ ভেবেছিল আজই বেলার দিকে হীরের লোভ ত্যাগ করে কলকাতায় এসে বিরিয়ানির দোকান দেবে৷ বেশ কয়েকজন ইন্ডিয়ান তাঁকে বলেছে কলকাতায় বিরিয়ানির দোকান দেওয়া মানেই নাকি 'গোল্ডডাস্ট'৷

কিন্তু তার মধ্যে এই ঝামেলা৷ বুস্ত্ববাদের মধ্যে নেতাগোছের একজন এগিয়ে এসে ভাঙা হিন্দিতে কিছু বললে৷ আলভারেজ অবাক হলে না, এই গভীর জঙ্গলে আর কিছু না থাক; বলিউডি এফএম চ্যানেলের রমরমা খুব৷ আলভারেজ নিজেও কাজ চালানোর মত হিন্দি শিখে নিয়েছে৷

- তোমার সাহস তো কম নয় সাহেব৷ আমাদের অঞ্চলে এসে তাঁবু ফেলেছ?

- সরি সর্দার৷ আমি ঠিক ঠাহর করতে পারিনি৷

- এ অঞ্চলে বাইরের মানুষের উৎপাত আমরা সহ্য করব না৷ নো বহিরাগত৷

- সরি।

- তোমায় ভাবছি কচুকাটা করে সিংহকে খাইয়ে দেব৷

- এ'বারের মত ছেড়ে দিন স্যার৷ পরের বার না হয়..।

- ছাড়ব কেন? কীসের জন্য?

- ক্যাশ দেব? পেটিএম নিলে আরও কিছু না হয়..।

- ও'সব মায়ায় আমরা আটকে নেই সাহেব৷

- আমার একটা ব্যাকপ্যাক ছিল টেন্টে৷ সে'টা কেউ এনেছে কি? ও'টার মধ্যে একটা দারুণ ব্যাপার আছে৷

সে ব্যাকপ্যাক এক জংলি ছোকরার পিঠেই ছিল৷ তার মধ্যে থেকে বাঁটুল দ্য গ্রেট সমগ্র বেরিয়ে আসায় মানুষগুলোর হাবভাব পালটে গেল৷ সর্দার মানুষটা বেশ খানিকক্ষণ সে বই উলটে পালটে দেখলে, তাঁর কাঁধের ওপর বাকিরা হুমড়ি খেয়ে পড়লে। পড়া তাদের সাধ্যের বাইরে, কিন্তু ছবিতে বাঁটলোর কাণ্ডকারখানা দেখে তারা এক্কেবারে মুগ্ধ৷ সর্দার নিজে এগিয়ে এসে আমার বাঁধন খুলে দিলে।

- সাহেব, তোমাদের এই দেবতার নাম কী?

- বাঁটুল দ্যি গ্রেট।

- বাহ্, বেশ জাঁক তো৷ যাক, তোমার জান মকুব৷ তবে তোমার দেবতা আমাদের সঙ্গে থাকবে৷

- জো হুকুম সর্দার।

- আর এই দেবতা বইয়ের জন্য তোমায় আমরা একটা উপহারও দেব।

- দেবে কিছু? দাও। এমনিতে হাতটান চলছে খানিকটা। জঙ্গলে থাকো তোমরা সর্দার, ইনফ্লেশনের হ্যাপা তো আর পোহাতে হয় না।

- তুমি তো এ অঞ্চলে হীরে খুঁজতে এসেছিলে, তাই না?

- সবই তো জানো সর্দার।

- তোমার খালি হাতে ফেরাব না৷ তবে ওই ব্যাগভর্তি পাতি পাথর নিয়ে ফিরে কী করবে? তোমায় এমন জিনিস দেব যে তোমার চোখ টেরিয়ে যাবে৷

- কী জিনিস সাহেব?

***

সর্দার তাঁর দলবল নিয়ে চলে যাওয়ার পর স্তব্ধ হয়ে সেই বাওবাব গাছটার গায়ে হেলান দিয়ে আধঘণ্টা বসে রইলে আলভারেজ৷ সত্যিই তার চোখ গেছে টেরিয়ে৷ মাথা গেছে ঘুরে৷ গলা গেছে শুকিয়ে। বুকের মধ্যে দুমদুম-দমাস। অনেক দামী পাথর সে দেখেছে এ জীবনে৷ কিন্তু আজ এই বুস্ত্ববা সর্দার যে এ জিনিস দিয়ে যাবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি৷

আর হীরের খোঁজে হন্যে হওয়া নয়৷

আফ্রিকার সেই নির্দয় জঙ্গলের এক কোণে বসে আলভারেজ নিজের রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং শুরু করলে। তার কাঁপা দু'হাত তখন আগলে রেখেছে সেই সাতরাজার ধন; সিনেমা থিয়েটারে বিক্রি হওয়া পেল্লায় একটাব পপকর্ন। 

চপ ও মেসোমশাই



বছর আষ্টেক আগে৷ কোথায় একটা যাওয়ার পথে হুগলীর কাছে হাইওয়ে ঘেঁষা একটা জায়গায় গাড়ি থামানো হয়েছিল৷ রুখাশুখা খটখটে দুপুর৷ সে'জায়গায় দোকানপাট বড় একটা যে ছিল তাও নয়৷ কিন্তু খিদে এতটাই প্রবল ছিল যে ভাতের হোটেল খুঁজে বের করার ধৈর্য ছিলনা৷ পাশাপাশি দু'চারটে গুমটি গোছের দোকান দেখেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম৷

গুমটিগুলোর মধ্যে যে'টাকে সবচেয়ে 'রিসোর্সফুল' মনে হয়েছিল, সে'টার দিকেই এগিয়ে গেলাম৷ কাছে গিয়ে দেখলাম সাংঘাতিক অলরাউন্ডার দোকান৷ চা-বিস্কুট, সিগারেট-বিড়ি, চপ-ঘুগনি, মুড়ি-পাউরুটি; সব মিলে এই অসময়ে এই বেজায়গায় বেশ সুব্যবস্থাই বলতে হবে৷ দোকানি মেসোমশাই একটা ঘটংঘটং শব্দ করে চলতে থাকা টেবিলফ্যানের দিকে পিঠে করে ঝিমুচ্ছিলেন৷ "ফ্রেশ চপ" ভাজা হবে কিনা জানতে চাওয়ায় তার মেডিটেশনে ব্যাঘাত ঘটল৷ তবে ঘুমের চেয়ে খদ্দের জরুরী। অতএব এক ঝটকায় চোখ থেকে ঘুমঘুম ভাব উড়িয়ে জানান দিলেন যে বেসনটেসন গুলে ফের চপ ভাজার ব্যবস্থা করতে সেই বিকেল৷ তবে আশ্বাস দিলেন যে স্টকের আলুরচপ মিয়ানো হলেও স্বাদে যে টপক্লাস।

খিদে পেটে অত বাছবিচার করলে চলে না৷ আর আমার এবং আমার বন্ধুর পেটের মধ্যে চলতে থাকা ছুঁচোর কীর্তনগান বোধহয় মেসোমশাইয়ের কানে পৌঁছেছিল। আমরা শুধু চপের আব্দারই করেছিলাম, উনি আমাদের একটা দরাজ সলিউশন অফার করলেন৷

"ঠাণ্ডা আলুর চপ নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি"। আমরা বাক্যব্যয় না করে দোকানের বেঞ্চিতে বসলাম৷ ঝিমিয়ে থাকা মানুষটা আচমকা সাংঘাতিক তৎপর হয়ে উঠলেন৷ একটা টিনের ড্রাম থেকে শালিমারের পুরনো ছোট কৌটোয় খানিকটা মুড়ি তুলে; তা'তে পেঁয়াজ, ছোলা, লঙ্কাকুচি দিয়ে; কয়েকটা ঠাণ্ডা আলুরচপ টুকরো করে তা'তে মিশিয়ে- কড়াইতে অল্প সর্ষের তেলে ফেলে সুট করে ভেজে নিলেন৷ তারপর স্টিলের প্লেটে ঢিপি সাজিয়ে আমাদের হাতে দিলেন৷ চুঁইচুঁই খিদের সঙ্গে ম্যাজিক-মেসোমশাইয়ের আন্তরিকতা মিশে যে কী দারুণ স্বাদের সৃষ্টি হয়েছিল৷ নিমেষে প্রথম প্লেট সাফ করে আমরা দ্বিতীয় প্লেট নিয়েছিলাম৷ দ্বিতীয় প্লেট উড়িয়ে দেওয়ার আগেই মেসোমশাই প্লাস্টিকের কাপে লেবুচা এগিয়ে দিলেন৷ না চাইতেই। মুড়ি-ভরা পেটে সে চায়ের কাপে এক চুমুক দিতেই মেজাজে জেল্লা ফিরে এলো। ভদ্রলোকের সঙ্গে আরও মিনিট দশেক গল্পগুজব করে আমরা এগিয়েছিলাম৷ আমার ধারণা সে'দিন ঝোল-ভাতের থালা পেলেও সেই স্পেশ্যাল মুড়িভাজা লেভেলের তৃপ্তি জোটাতে পারতাম না৷

সে মহাভোজের বছর পাঁচেক পর ফের সে রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় সে দোকানের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন শেষ-বিকেলে; শাস্ত্রে সে'টাকে বলে চপলগ্ন। কড়াইভর্তি তেলে আলুর চপ আর ফুলুরি ভেসে বেড়াচ্ছে আর এক বছর কুড়ি-বাইশের চটপটে ছোকরা ঝাঁঝরি দিয়ে তাদের খেলিয়ে খেলিয়ে তোলবার তাল করছে। দোকানের আসবাবে তেমন কোনও রদবদল হয়নি৷ শুধু ঘটঘটানো টেবিল ফ্যানটা হাওয়া, বদলে একটা ছোট মিনিমিনে সিলিং ফ্যান ঝুলেছে৷ আর একদিকের দেওয়ালে একটা তেলচিটে মালা ঝোলানো ছবিতে ম্যাজিক-মেসোমশাই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে।

কড়াই থেকে তুলে আনা আগুন আলুর চপে কামড় বসিয়েও সেই পুরনো অমৃতস্বাদ পাওয়া গেলনা৷ সে দোষ অবশ্য চপের নয়৷ অন্য যে কোনও জায়গায় ও চপ পেলে দশে সাড় নয় দেওয়া যেত নিশ্চিন্তে৷

স্যামপ্লিং



এই সাইজের স্টিলের প্লেট সাধারণত আড়ালে-আবডালে পড়ে থাকে৷ শৌখিন খাবারদাবার পরিবেশনের সময় এদের কদর বড় কম। তেমন কিন্তু এ'গুলো অবহেলার বস্তু নয় মোটেও৷ এ'দের মূলত দু'টো কাজ৷

এক, ব্যাকএন্ড৷ এ'গেলাস ও'পাত্রের টেম্পোরারি ঢাকনি হিসেবে৷

দুই, ফ্রন্ট এন্ড, আইকনিক ভূমিকা; স্যাম্পলিং প্লেট৷ রোব্বারের মাংসের ঝোলের কড়াই থেকে তুলে নেওয়া একটা সরেস পিস আর সামান্য ঝোল; সঙ্গে হাফ-হাতা পোলাও৷ স্যাম্পলিং চলে স্নানের আগে৷ স্নানের সময় গড়িয়ে যায়৷ নুন বেশি, ঝাল কম; এ'সব অভাব-অভিযোগের করেকশন চলে৷ অতএব প্লেট রিফিল হয়৷ রান্না নিখুঁত হলে রিফিলের গতি বেড়ে যায়৷ ফুচকা খাওয়ার স্ট্রাকচার আর ডিসিপ্লিন দিয়েই মাংস-পোলাও 'স্যাম্পলিং'। গুরুজনরা বলেছেন "সে'টাই হল Soul of Robbar"।

এরপর সে প্লেট চেটেপুটে সাফ করে, তেলতেলে আঙুল চাটতে চাটতে নিজের প্রিয় গামছার খোঁজে বারান্দায় ছুটে যাওয়া৷ লাঞ্চে দেরী করলে চলবে কেন?

আমার জানলা দিয়ে যায় না দেখা



- কী বুঝছ ভায়া৷

- অ..অদ্ভুত৷

- ভূতের মুখে অদ্ভুত শব্দটা কেমন লাগে যেন।

- বেঁচে থাকতেও আমি ভূতে বিশ্বাস করতাম বটে৷ কাজেই ফস্ করে মরে গিয়েও যখন দেখলাম পুরোপুরি হাপিস হয়ে যাইনি, তখন চমকে যাইনি৷ কিন্তু এই সারপ্রাইজটা তখনও এক্সপেক্ট করিনি অমলদা।

- আরে আমারও তো মরার পর সে' অবস্থাই হয়েছিল ভাই বিনোদ৷ ভূত হয়ে দেদার ঘুরব, টেনশন-ফেনশন থাকবে না ভেবে দিব্যি ছিলাম৷ ইচ্ছে ছিল মাঝেমধ্যে এর ওর পিলে চমকে দেওয়ার৷ অথচ দেখ কত হ্যাপা৷ এর চেয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা কম৷

- অনেক কম। এমন জানলে নিজের শরীরটার অনেক যত্ন নিতাম৷ হাবিজাবি খেতাম কম৷ নিয়মিত যোগব্যায়াম করতাম৷

- কিন্তু এ পাপ থেকে তো মুক্তি পেতে না৷ কয়েক বছর এ'দিক ও'দিক হত৷

- ব্যাপারটা এখনও কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকছে অমলদা৷ সত্যিই কি তাই?

- নতুন ভূতদের পুরনো ভূতরা গাইড করে দেয়৷ তোমাকেও ভালো মনে আমি বুঝিয়েপড়িয়ে নিচ্ছি৷ ঠকাব কেন বলো৷

- ছিঃ ছিঃ, আমি তা বলতে চাইনি৷ কিন্তু মানুষ মারা যাওয়ার পর তাদের ভূত টাইম ট্র্যাভেল করে জন্মের সময়ে ফিরে যায়, এমনটা কেমন যেন...কেমন যেন..।

- বিদঘুটে৷ তাই না?

- তাই তো।

- জন্ম থেকে মৃত্যু লূপে দেখে যেতে হবে৷ হাজার হাজার বছর ধরে৷ যদ্দিন না ডিভাইন সাইকেল ভেঙে গিয়ে মুক্তি পাচ্ছ৷ আমি সতেরো বার নিজের লাইফ রিওয়াইন্ড করে দেখে ফেললাম ভাই৷ এমন ভূতদেরও চিনি যারা বাহান্ন হাজারবার দেখেছে৷ আবার কেউ নাকি দু'তিনবার দেখেই মায়া কাটিয়ে হাওয়া হয়ে যায়৷ তারা অবিশ্যি মহাপ্রাণ৷

- মায়া?

- মায়া নয়? নিজের জীবনের প্রতি মুহূর্ত বারবার দেখতে পাওয়া৷ নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা, চোট-আঘাত-প্রেম-ভালোবাসা, দুঃখ, হতাশা, যন্ত্রণা, স্নেহ৷

- অমলদা, আমার জীবন বেশ বোরিং ছিল কিন্তু৷ প্রাইভেট ফার্মের ক্লার্ক৷ গতে বাঁধা সব কিছু৷ শেষবয়সে রোগেভোগে যাচ্ছেতাই একটা ব্যাপার..।

- সেই ফেলে আসা রুটিনের মায়া এ'বারে টের পাবে৷ এ সিনেমা বার বার দেখেও সাধ মিটবে না৷ সবচেয়ে বড় কথা, এ সিনেমার নায়ক তুমি নিজেই৷ যা কিছু বোরিং মনে হয়েছে বেঁচে থাকতে, এখন দেখবে সে'গুলো কী দুরন্ত৷ যত দুঃখ বয়ে বেরিয়েছ, সে'গুলোকে এখন বারবার পোষা বেড়ালের মত আদর করতে ইচ্ছে করবে৷ দূর থেকে নিজের হতাশার মুহূর্তগুলোকে দেখে মনে হবে, "উফ, বাঁচার মত বেঁচে নিয়েছি বটে"৷ এ এক অদ্ভুত ম্যাজিক ভাই বিনোদ।

- মিস্টিরিয়াস৷ কিছুই তো ছাই বুঝছি না৷ আচ্ছা, এই মাঝরাত্তিরে আমরা এই জানালাটার সামনে এসে দোল খাচ্ছি কেন? আমি কই?

- এ'টা হাসপাতালের জানালা বিনোদ৷ জানালার ও'পাশে তোমার মা শুয়ে৷ পাশে তোমার বাবা৷ ডাক্তাররাও আছেন৷ নার্সের কোলে তুমি৷

- ও'টাই...আমার মা? বাবা? ওরা আছে? ওদের দেখতে পাব? উফ অমলদা..।

- মায়া৷ মায়া৷ মনে রেখো, দেখা ছাড়া তোমার আর কোনও ভূমিকা নেই৷ আর যে'দিন দেখার ইচ্ছেটুকু যাবে, সে'দিন মুক্তি৷

***

ডাক্তার যখন খোকাকে সুতপার কোলে দিল, এক মুহূর্তের জন্য সুতপার মনে হলে রাতের জানালার বাইরে যেন কেউ আছে৷ তবে অন্যমনস্ক ভাবটা এক ধাক্কায় কেটে গেল, খোকা চিলচিৎকার জুড়েছে৷ 

Sunday, July 24, 2022

জনসেবা



প্রিয় সুমি,

হাসপাতাল থেকে লিখছি। মন ভার৷ জিভ বিস্বাদ৷ গা-হাত-পা ব্যথা৷ যা হোক, নিজের দুঃখকে কোনওদিনই তেমন বড় করে দেখিনি, আজও দেখব না৷ মানুষের ভালো করতে চেয়ে এ বন্ধুর পথ আমি নিজেই বেছে নিয়েছি, সামান্য দু'একটা চোরকাঁটা বা সেফটিপিনের খোঁচায় দমে গেলে চলবে কেন?

যাক গে। যা বলতে কলম ধরলাম।আজকাল আর অসহায় মানুষদের কথা কেউ মন দিয়ে ভাবে না৷ কত সহায়সম্বলহীন মানুষ যে সহমর্মিতার অভাবে দুর্ভাগ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে তার ইয়ত্তা নেই৷

এই আমার কথাই ধরো৷ সাধারণ মানুষের জন্য তো কম করলাম না এ'কবছরে৷ এ'পাড়ায় টিউবওয়েল চাই, ও'পাড়ায় ডিসপেনসারিতে ভালো ডাক্তার চাই, অমুক অঞ্চলে রাস্তার মেরামতি দরকার, তমুক অঞ্চলে তেলেভাজার দোকান বসানো দরকার৷ নেতা মানুষের কাজ কি কম সুমি? অথচ দেখ, এত কিছু করিয়ে দেওয়াটা কেউ দেখল না৷

এরা দেখে শুধু কে আমায় জোর করে সামান্য কমিশন গছিয়েছে, কে ভালোবেসে ক্ষীরকদমের বাক্সে পুরে তোমার জন্য চোদ্দ ভরির হার দিয়েছে৷ চারদিকে নেগেটিভ মাইন্ডসেট৷ ওরে বাবা টিউবওয়েল সাপ্লায়ার আমার বাড়ির চারতলার ঘরের মেঝে মোজায়েক করে দিয়েছে কি দেয়নি; তা জেনে পাবলিকের কী লাভ? আরে টিউবওয়েল তো জায়গা মত বসেছে, নাকি! ঠিক আছে, সাত মাসের মধ্যে বার পাঁচেক সে টিউবওয়েল খারাপ হয়েছে বটে, কিন্তু তার ফলে টিউবওয়েল রিপেয়ার করনেওলা কন্ট্র‍্যাক্টর যে বাড়তি ব্যবসা পেল, তা'তে তো আখেরে ইকনমিরই উপকার; তাই নয় কি? লোকে সে'সব অ্যাপ্রিশয়েট করবে না, গণ্ডমূর্খের দল যত৷ শুধু খুঁত ধরবে। টিউবওয়েল সাপ্লাইয়ের কন্ট্র‍্যাক্টর আর টিউবওয়েল রিপেয়ার করার কন্ট্র‍্যাক্টর, তারা ভালোবেসে আমায় ছোটখাটো সামান্য কী'সব বাড়ি, গাড়ি দিয়েছে; তা'তে লোকের গাত্রদাহের শেষ নেই৷ কী জেলাসি ভাবতে পারো? এ জন্যেই বাঙালির আজ এই দুর্দশা। 

একটু মনপ্রাণ দিয়ে জনতা-জনার্দনের সেবা করব, সে'উপায় আর রইল না৷ অকারণ অদরকারী ব্যাপারস্যাপার নিয়ে টানাটানা করে, আমার পিছনে খামোখা টিকটিকি লাগিয়ে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার করল৷ আরে ঠিক আছে, জেরা করবি কর। সে ব্যাপারটায় একটা আলগা রোম্যান্স আছে বইকি। তা'বলে  স্যাট গ্রেপ্তার করার কী আছে? বাধ্য হয়ে বুকের ব্যথার রেফারেন্সটা দিতে হল৷

যাকগে, পার্টি ব্যাপারটা সামলে দেবে। আমায় নিয়ে তুমি ভেবোনা, ডাক্তার বলে গেছে আমার বুক চিনচিনটা সারাতে একমাত্র পথ্য হলো মাটনকষা আর বাসন্তী পোলাও৷ হাসপাতালে ক'দিন সে'সবই চলবে। সঙ্গে নেটফ্লিক্স।  জামিনের ব্যবস্থাটা হয়ে গেলেই  আবার ওই স্ট্যু আর ম্যানিফেস্টোতে ফিরে যাব'খন৷ আফটার অল ওয়েলথ ইজ হেলথ। 

তুমি সাবধানে থেকো। জনতার স্বার্থে, দেশের স্বার্থে; আমি শিগগিরই ফিরে আসছি৷ 

জয় হে। জয় হে। জয় হে।

ইতি,

সুমির আমি।

আড়াইশো গ্রাম দুঃখ



দু-আড়াই'শো গ্রাম দুঃখ পকেটে নিয়ে দিব্যি ঘুরছিলাম৷ আশেপাশে শোরগোল শুনলেই পকেট খামচে ধরছি৷ নিরিবিলি পেলেই পকেট থেকে সেই ড্যালাটা বের করে পোষা খরগোশের মত হাত বুলোচ্ছি৷ টো-টো করে দিব্যি কাটছিল।

হঠাৎ কী খেয়াল হলো, গিয়ে পৌঁছলাম রেলস্টেশনে।
তারপর ফের কী হল, দেখলাম একটা ট্রেন হেলতেদুলতে এসে দাঁড়ালে। ফাঁকা কামরা দেখে টুপ করে উঠে বসলাম ট্রেনের জানালার পাশে৷ ফুরফুরে হাওয়ায় চোখ লেগে এলো।

ওই হল গিয়ে কাল!

ভদ্দরলোকের তুলতুলে ব্যথা-ব্যথা আমেজের ঘুম; ভগবানের সহ্য হবে কেন?

ওই। তারপর যা হয় আর কী৷

কোন এক ব্যাটা বেআক্কালে বেয়াদপ রাস্কেল,
আমার পকেট মেরে 
অমন বাইশ ক্যারাটের দুঃখ সাফ করে,
"এতেও-ভেসে-যাব-না-ভাইটি" ব্র‍্যান্ডের সল্টেড বাদাম রেখে সরে পড়েছে৷

এক্কেবারে রাহাজানি, আর কী৷ ধেত্তেরি৷

ফান্ড



সকালের ঝকঝকে নীল আকাশ, ফুরফুরে শরতের হাওয়া। একটা জরাজীর্ণ চারতলা স্কুলবাড়ি। ছেলেপিলের দল নেই, বোঝাই যায় ছুটির দিন। তা বলে হইচইয়ের অভাব নেই। অন্তত জনা চল্লিশ লোক মিলে স্কুলবাড়ি আর তার সামনের মাঠটাকে সরগরম করে রেখেছে। চার-পাঁচজন মিলে মাঠের পশ্চিম কোণে স্টেজ বাঁধছে।  আর সাত-আটজন বাবু-গোছের লোকজন তাদের "হ্যান করো, ত্যান করো, জলদি জলদি করো" বলে তাড়া লাগিয়ে চলেছে। বাবুরা অবশ্য ভুলেও কাজে হাত লাগাচ্ছে না, পাছে কাজ সময়মত শেষ হয়ে যায়। একটা ঢাউস ফ্লেক্স ব্যানার টানাটানি করে দু'জন লোক হন্যে হচ্ছে, আর একজন মাতব্বর কন্ট্রাক্টর গোছের লোক তাদের ওপর তম্বি করে চলেছে। জনা-দশেক লোক স্টেজের সামনে ভাড়া করা প্লাস্টিকের চেয়ার সাজাতে ব্যস্ত। আর যথারীতি অন্য আর এক বাবুদের দল বিভিন্ন জরুরী ইন্সট্রাকশন দিয়ে ক্রমাগত তাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়ে চলেছে।

কিন্তু এই সমস্ত গোলমালকে বিন্দু মাত্র পাত্তা না দিয়ে এক বছর তিরিশের যুবক স্কুলের স্যাঁতস্যাঁতে বারান্দায় একটা ক্লাসরুম থেকে বের করে আনা নিচু বেঞ্চের ওপর বসে একটা মচমচে টেবিলের ওপর ঝুঁকে কিছু কাগজপত্তর মনোযোগ দিয়ে দেখছে। ওঁর নাম অনুপ চ্যাটার্জী, পরনে চেক ফুলশার্ট, কালো প্যান্ট, ঝাঁচকচকে পালিশ মারা কালো জুতো। অনুপের পাশে দাঁড়িয়ে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক; উসকোখুসকো চুল, ময়লা হাফশার্টের পকেটে আধ-ঝোলা সস্তা সানগ্লাস, ঢলা প্যান্ট - যে'টাকে পাজামা বলে চালালেও আপত্তি করা উচিৎ নয়। হিসেব কষতে কষতে হঠাৎ সামান্য বিষম খেলেন সেই ধোপদুরস্ত যুবকটি। কাগজ থেকে মুখ তুলে সেই দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলেন;

- সামন্তবাবু,তিনশো চেয়ার দিয়েছেন কেন? আড়াইশোটা বলা ছিল!

- আসলে এত বড় ইভেন্ট। পঞ্চাশটা চেয়ার এক্সট্রা লাগতেই পারে।

- কাজের কন্ট্রাক্ট নিয়েছেন। কথামত জিনিস সাপ্লাই করবেন, সরে পড়বেন। মাথা খাটিয়ে পঞ্চাশটা বেশি চেয়ার দিতে কে বলেছে?

- আসলে আমি ভাবলাম...।

- সাপ্লাই করাটা আপনার কাজ। ভাবার কাজটা আমার। বিল থেকে পঞ্চাশটা চেয়ারের টাকা বাদ যাবে।

- না মানে, ব্যাপারটা ভেবে দেখুন....।

- খাবারের প্যাকেটগুলো কতক্ষণে আসবে?

- এই, আধঘণ্টার মধ্যেই চলে আসবে। আমার ম্যানেজার কমল নিজে হালদারপাড়ার দোকান থেকে ম্যাটাডোরে করে তুলে আনছে। এই খানিকক্ষণ আগেই ফোনে কথা হয়েছে।

- দেখবেন, বাড়তি শ'খানেক প্যাকেট আনিয়ে বসবেন না নিজের মাথা খাটিয়ে।

- আজ্ঞে না। ওই, এগজ্যাক্ট নাম্বারই আসছে।

- স্টেজ বাঁধা, ব্যানার, ফেস্টুন, ভিআইপি আপ্যায়ন, মাইক, জেনারেটর, পাবলিকের জন্য খাবারের প্যাকেট, ভলেন্টিয়ার, মানপত্র, উত্তরীয়...উঁ...প্লাস এইগুলো...উম...।

- হিসেবে কোনও ভুল নেই স্যার।

- যাকগে, শুনুন। বড়সাহেব আর একঘণ্টার মধ্যে এসে পৌঁছচ্ছেন। ওঁর সঙ্গে আর জনাচারেক সিনিয়র অফিসার আসবেন। কাজেই মিনিমাম খানচারেক গাড়ি থাকবে। সে'গুলোর পার্কিং আর ড্রাইভারদের খাওয়াদাওয়া নিয়ে যেন আমায় ভাবতে না হয়...। আর তাছাড়া কলকাতা থেকে কুড়িজন মত রিপোর্টার আসবেন। তাদের যত্নআত্তির ব্যাপারটা আমিই দেখব। কিন্তু আপনি নিজে থাকবেন আমাকে অ্যাসিস্ট করতে।

- আরে সে'সবের জন্য তো আমরা আছি...।

- ভালোই তো কামাচ্ছেন এই ইভেন্টটা থেকে।

- শুধু তো ইনকামের জন্য নয় স্যার। আপনাদের কোম্পানি আমাদের গাঁয়ের স্কুলে এতগুলো টাকা দেবেন। সে টাকা দিয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য নতুন বেঞ্চি টেবিল ব্ল্যাকবোর্ড কেনা হবে। কত বড় উপকার বলুন।

- সে গাঁয়ের মানুষ হয়ে নিজের কন্ট্র্যাক্টরির টাকা থেকে বাড়তি কিছু ডিসকাউন্ট দিতে পারতেন তো।

- হে হে হে স্যার। আমরা সাধারণ ব্যবসায়ী। আপনাদের মত বড় কোম্পানি কর্পোরেট সোশ্যাল কাজকর্ম সারতে গ্রামে-গঞ্জে আসছেন। এতে তো আমাদের রুরাল ইকনমিরও ফায়দা, বলুন।

- বাব্বাহ্, গপ্প তো ভালোই জানেন। কিন্তু বলে রাখলাম, পঞ্চাশটা এক্সেস চেয়ারের টাকা আপনার বিল থেকে কেটে নেব।

- বেশ তো। বেশ তো।

- হ্যাঁ, আড়াই লাখটাকার বিল হাঁকছেন। সে'খান থেকে হাজারখানেক এলো কী গেলো তা নিয়ে আপনার ভাবার কথা নয়। শুনুন, আমি একটা সিগারেট খেয়ে আসছি। আপনি ততক্ষণে আমাদের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থাটা সেরে ফেলুন দেখি। লোকজন এসে পড়ার আগে সে ব্যাপারটা মিটে যাক।

**

স্কুলের পাশেই কেষ্টবাড়ি ঝিল। জায়গাটা নিরিবিলি, মনোরম। সে ঝিলের এককোণে বাঁধানো কয়েকটা সিঁড়ি। সে সিঁড়িতে বসে সিগারেটটা ধরালে অনুপ চ্যাটার্জী। ভারী মিঠে হাওয়া বইছে, চোখেমুখে সে হাওয়া লাগায় চোখ লেগে আসে। কাল রাত্রে যে লজে রাত কাটাতে হয়েছে সে'খানে মশার কামড়ের চোটে অর্ধেক রাত পায়চারী করে কাটাতে হয়েছে। ঝিমুনিটা ভাঙল একটা মিহি কণ্ঠস্বরে; "আপনিই কলকাতার হিউউইট কোম্পানির সিনিয়র অফিসার"?

অনুপ ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন এক বছর পঞ্চাশের লোক, পরনে হাফ পাঞ্জাবী আর পাজামা। সৌম্য চেহারা, মুখে স্মিত হাসি। উঠে দাঁড়ালেন অনুপ।

- আমিই হিউউইট কোম্পানির সিনিয়র অফিসার, অনুপ চ্যাটার্জী। আপনাকে তো ঠিক...।

- নমস্কার। আমি সমর মণ্ডল। দীননাথ ঠাকুর জুনিয়র হাই, যে'খানে আপনারা কিছু অনুদান দিতে সম্মত হয়েছেন, ও'খানে আমি অঙ্ক শেখাই।

- নমস্কার। বলুন।

- আমি জানি এমন দুম করে কিছু বলে বসাটা সমীচীন নয়। তবে আপনি ইয়ং কর্পোরেট লীডার। হয়ত ফর্ম্যালিটির তেমন প্রয়োজন নেই।

- বলুন না।

- আপনারা স্কুলে একলাখ টাকা দিচ্ছেন বেঞ্চি-ডেস্ক এই'সব কেনার জন্য। তা'তে আমাদের অনেক উপকার হবে। শুধু...।

- শুধু?

- আমাদের একটা লাইব্রেরী আছে, জানেন। রিসোর্সফুল নয়। সামান্য কয়েকটা বই। বেশিরভাগই ডোনেটেড। বেশিরভাগই পুরনো এডিশনের টেক্সটবুক। লাইব্রেরী নামেই আর কী। ছেলেপিলেরা বড় একটা ঘেঁষে না ও'দিকে। অবশ্য, যাবেই বা কেন। ওদের অ্যাট্রাক্ট করার মত ভালো কোনও গল্পের বইটই তো নেই। রঙিন এনসাইক্লোপিডিয়া গোছের কিছু বই হলেও না হয়...।

- ওহ আই সী।

- মিস্টার চ্যাটার্জী, আমরা কয়েকজন মিলে মাঝেমধ্যে চেষ্টা করি বটে এ বই সে বই জোগাড় করে আনার। কিন্তু তাতে আর কতটা হয় বলুন। আপনাদের তরফ থেকে যদি লাইব্রেরির জন্য একটা কর্পোরেট ডোনেশন পাওয়া যেত...।

- বেশ তো। একটা অ্যাপ্লিকেশন যদি স্কুলের থেকে দেওয়া হয়, তা'হলে আমাদের পরের বছরের বাজেট থেকে কিছু করা যায় কিনা, সে'টা না হয় আমরা কনসিডার করে দেখব...।

- না না, লাইব্রেরীর জন্য লাখটাকার দরকার নেই। হাজার কুড়ি হলেই অনেক জরুরী বই  আমরা কিনে ফেলতে পারি...।

- টাকার পরিমাণ যাই হোক, রিলিজ করার প্রসেসটা তো একই। তাছাড়া এই ধরণের কাজে গোটা টাকাটাই আসে আমাদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটির ফান্ড থেকে। সে'টা তো লিমিটেড।

- চ্যাটার্জীবাবু, একটু দেখুন না। এই যে এক গাঁ মানুষকে শিঙাড়া, মিষ্টি, কেক খাওয়াচ্ছেন; তার বদলে যদি...। বা এই যে অনুষ্ঠান করছেন, তার এত খাইখরচ...স্পেশ্যাল গেস্ট, মিডিয়া...। সে'সব থেকেই যদি সামান্য কিছু সরিয়ে...।

- সেই খরচ পি-আর ফান্ড থেকে আসে। সে ব্যাপারটা আলাদা।

- আজ্ঞে?

- সে খরচ আলাদা। কোম্পানি একটা স্কুলকে অনুদান দিচ্ছে, সে'টার পাবলিসিটি করতে হবে না?

- ওহ, তাই তো।

- মণ্ডলবাবু। আমি আসি। অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। আর, পারলে একটা অ্যাপ্লিকেশন দিন না কলকাতায় এসে। আপনাদের লাইব্রেরী ফান্ডের জন্য। আমি রেকমেন্ড করে দেব'খন।