Tuesday, January 8, 2019

চুমু অ্যানোমালি

- হ্যালো হেডঅফিস!

- হ্যালো! কোন ইউনিট থেকে বলছেন? 

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি।  

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? হেডঅফিসে আপনার কল তো বড় একটা আসে না...। 

- অত নরম ভাবে থাপ্পড় কষিয়ে কী হবে স্যার। সোজাসুজি বলুন আমি অকাজের। 

- না না, ও মা! আমি তেমন ভাবে বলতে চাইনি ভাই...।

- চাইবেন নাই বা কেন বলুন। বত্রিশ বছরের জীবনে আমি এই প্রথম হেডঅফিসে কল করেছি। আমি ব্রেনের রোমান্টিক-চুমু রেজিস্ট্রেশন ইউনিট, কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা মাইনর চুমুও স্মৃতি হিসেবে ফাইল করতে পারিনি মগজ হেডঅফিসের মেমরি রেজিস্টারে। খুলি-স্পেস নষ্ট করে চলেছি কেবল। 

- মনখারাপ করতে নেই ভায়া। মনখারাপ করতে নেই। তা আজ কী মনে করে? চুমু রেজিস্টার করার আছে নাকি? চুমু-রেজিস্টারে প্রথম এন্ট্রি আজ হবে নাকি?

- ইয়ে, ব্যাপারটা গোলমেলে। 

- গোলমেলে?

- অ্যানোমালি রিপোর্ট করার আছে হেডঅফিস স্যার। 

- ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার। আপনি কি শিওর? চুমু নয়? অ্যানোমালি?  

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ঠোঁট এবং জিভ থেকে কোনও সিগনাল আসেনি। কিন্তু জানেন, আমার ইউনিট-মনিটরের সমস্ত গ্রাফ চুমুর মত লাফালাফি করেছে ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা। একদম জিভে জিভ চুমু লেভেলের এক্সট্রিম রিপ্‌লস দেখা গেছে গ্রাফে। অবিকল স্মুচ এফেক্টস। 

- অথচ জিভ ঠোঁট থেকে কোনও সিগনাল নেই ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? আপনি?

- জিরো। চুমু রিপলস মনিটরে অথচ জিভ ঠোঁট চুপচাপ। তা না হলে আর কাঁদুনি গাইছি কেন হেডঅফিসদাদা। 

- কী মুশকিল। চুমু সেন্টারের মনিটরে চুমু-রিপ্‌লস দেখা গেছে, কাজেই মেমরি রেজিস্টারে তো এন্ট্রি করতেই হবে। এ'দিকে ঠোঁট আর জিভ থেকে কোনও সিগনালই নেই! লে হালুয়া। এন্ট্রি করব কী ভাবে। 

- ভাবুন স্যার। কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার। এখন উপায়?

- দাঁড়ান। এরর্‌ লগ চেক করি। লাইনে থাকুন। 

- বেশ, দেখুন। 

- এই যে, পাওয়া গেছে। চুমু রেপ্লিকেটিং সিগন্যাল আপনি কোথা থেকে রিসিভ করেছেন সে'টা মালুম হয়েছে। যাক বাবা। 

- অ্যানোমালি আইডেন্টিফাই করা গেছে? মাইরি? 

- স্পষ্ট। আমাদের হিউম্যান ইউনিট আজ চুমু খায়নি তাই আপনি ঠোঁট বা জিভ থেকে কোনও সিগন্যাল পাননি। 

- তবে মনিটরে যত উত্তেজনা? স্মুচ সমান সিগন্যালস? 

- হিউম্যান ইউনিট পুরনো বইয়ের তাক সাফ করার সময় খুঁজে পেয়েছেন কলেজ জীবনের নোটের খাতা। আর সেই খাতার ভাঁজে রাখা ছিল... বারো তেরো বছর পুরনো এক জোড়া হলদেটে মিনিবাসের টিকিট আর আধ-ছেঁড়া এক জোড়া গানের অনুষ্ঠানের পাস; সুমনের গানের অনুষ্ঠানের। তো দশ বছর কলকাতার বাইরে থাকা হিউম্যান ইউনিট স্বাভাবিক ভাবেই কেঁপে ওঠেন সে পুরনো টিকিট আর পাসের কাগজ দেখে। ব্রেনের বিভিন্ন ইউনিটে এমার্জেন্সি সাইরেন ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর হিউম্যান ইউনিট খামচে ধরেন সে টিকিট-জোড়া। সেই খামচে ধরাই চুমুর সিগনাল হয়ে আপনার ইউনিটের মনিটরে গিয়ে হামলে পড়ে। 

- ওহ, তাই এই অ্যানোমালি। চুমু নয়। 

- বলেন কী! এ যে রীতিমত চুমু ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার! ঠোঁট আর জিভে এসে রোম্যান্স আটকে থাকবে তা কী হয়? হেডঅফিস মেমরির চুমু রেজিস্টারে আজই আপনার প্রথম এন্ট্রি হবে, কংগ্রাচুলেশনস!  

Thursday, January 3, 2019

কাহারবা নয়


রাতের বাতাসে বেশ ডিসেম্বরের ছ্যাতছ্যাত। গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে রেডিও শুনছিলাম, মনে বেশ বৈঠকি আমেজ। টকমিষ্টি চানাচুরের কয়েক পেগ মুখে পড়তেই মান্নাবাবুর গলাটা কানে আরো মিষ্টি হয়ে ঠেকল বোধ হয়।

সমস্তই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল; দুম করে 'কাহারবা নয় দাদরা' গেল মাঝপথে থেমে। রেডিও থামেনি, বিজ্ঞাপন বিরতিও নয়৷ মান্নাবাবু গান থামিয়ে দুম করে জিজ্ঞেস করলেন;.

- কী ব্যাপার? মতিগতি ঠিক আছে?

- ইয়ে, আমায় বলছেন? (আমি তো থ)

- আর কাকে বলব শশীবাবু? বলি হচ্ছে না যে। আসর ঝুলে যাচ্ছে।

- আজ্ঞে আমি আপনার তবলচি শশী নই৷ আমি তো স্রেফ শ্রোতা, তাও রেডিওর বাইরে বসে। ওই কাহারবা দাদরার ইস্যুটা আপনি আপনার তবলচিকে কনভে করুন, কেমন?

- চোপ। যত ভুল কি তবলায়? গান শোনার ব্যাপার কি এতটাই এলেবেলে? হচ্ছে না আপনার দ্বারা, এমন বিশ্রীভাবে গান শুনছেন যে মনে হচ্ছে রেডিও থেকে বেরিয়ে এসে কান মুলে দিই।

- সর্বনাশ! আমি কী করলাম? মন দিয়েই শুনছিলাম যে। ওই যে 'গোলাপজল দাও ছিটিয়ে,  গোলাপফুলের পাপড়ি ছড়াও'...বড্ড দরদ দিয়ে ধরেছেন স্যার...আহা। খামোখা থামতে গেলেন..।

- খামোখা? বটে? এ'দিকে আপনি যে ভুল তালে চানাচুর চিবোচ্ছিলেন, সে বেলা? 

- আজ্ঞে?

- গানের তাল একদিকে, আর আপনার চানাচুর চেবানোর মচমচ যে অন্য পানে বইছে। দুনিয়াকে রসাতলে পাঠাতে আপনার মত দু'চারজন বেপরোয়া চানাচুর-চিবিয়েই যথেষ্ট। 

- তালে তালে চানাচুর চেবাবো?

- চানাচুর তৈরিই হয়েছে গানের তালে তালে চেবানোর জন্য। তাতেই গানের মুক্তি, চানাচুরের উত্তরণ। 

- আর আমি বেসুরে চানাচুর চিবিয়ে গান মাটি করছি?

- আলবাত।  সুরের ওঠা নামা অনুভব করুন, মনপ্রাণ দিয়ে। আর চানাচুরের প্রতিটি কণা সেই অনুভবে এসে মিশবে। তা না পারলে বাড়ির ওই চার ডিবে চানাচুর গঙ্গায় ভাসিয়ে আসুন। অসুরের হাতে ইয়ারবাড আর বেসুরোর মুখে চানাচুর বেমানান।

***

আমার বার বার মনে হয় যে 'কাহারবা নয় দাদরা' শুনতে শুনতে আমি হয়ত আড়াই সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তবে এই চানাচুর চেবানোর সুর-তাল-লয় যে ধরে ফেলেছি, তা কি মান্নাবাবুর ধমক ছাড়া হত? সুগায়কের সহশিল্পীদের মধ্যে একজন চানাচুর-চিবিয়ে-শ্রোতার গুরুত্ব অপরিসীম, তা আজ বেশ বুঝেছি। আর বেহালা শিখতে না পারার আফসোসটা কেটে গেছে, স্পষ্ট বুঝছি যে এ দুনিয়ায় বেহালাবাদকের চেয়ে গুণী চানাচুর-চিবিয়ের সংখ্যাটা অনেক কম।

Wednesday, January 2, 2019

ডক্টর মেওসজুস্কের কারখানা

- সরি, সরি মিস্টার মজুমদার। আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আসলে অ্যাসেম্বলি লাইনের একটা গণ্ডগোলে  ঘণ্টাখানেক প্রডাকশন বন্ধ ছিল, আর প্রডাকশন বন্ধ থাকলে যে কী সমস্যা। এত ডিমান্ড চারদিকে...। তা আমার আর্দালি ভুভজু আপনাকে কফি দিয়েছে তো?

- দু'কাপ শেষ করে ফেলেছি। আমি তো ভাবলাম আজ আর আপনার সঙ্গে দেখাই হবে না।

- না না, সে কী বলছেন। আপনি কলকাতার থেকে এসেছেন, আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ভারতবর্ষে আমাদের সাপ্লাই যাবে।

- আগ্রহ নিয়েই এসেছি, তবে কী জানেন ডক্টর মেওসজুস্ক, ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না ঠিক। যদিও অনেকেই আপনার এই কারখানার প্রশংসা করেছেন। আর যে জিনিস যদি জেনুইন হয় তা'হলে আর পাঁচটা জায়গার মত ভারতবর্ষেও এর চাহিদা তুঙ্গে থাকবে। কিন্তু..তবু কোথাও যেন একটা..।

- খটকা...তাই তো?  স্বাভাবিক। সরকারের হাজাররকম ত্যান্ডাইম্যান্ডাই আর অবিশ্বাস। কাজেই কালোবাজার ছাড়া এ জিনিস বাজারে ছাড়া গেল না। আর সে কারণে মাস-অ্যাওয়ারনেসের জন্য কিছুই করতেও পারলাম না। রিয়েলি স্যাড।

- তাই বলে ডক্টর মেওসজুস্ক, ভূতের কারখানা? সত্যি সম্ভব?

- রীতিমত সম্ভব। আর তার প্রমাণ এ'বারে আপনি হাতেনাতে নিয়ে যাবেন। এতদিনের এত রূপকথা, এত হাড়হিম করা গল্প; এ'বার সমস্তই রিয়ালিটি মিস্টার মজুমদার। আপনাকে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি দেওয়ার জন্য এমনি এমনি ডাকিনি, রীতিমত স্যাম্পেল দিয়ে ফেরত পাঠাবো।

- কিন্তু ব্যাপারটা হয় কী করে? আত্মাটাত্মার ব্যাপার তো শুনেছি..।

- বুজরুকি। পুরোপুরি বুজরুকি, বুঝলেন। আত্মাটাত্মা বলে কিছুই হয় না মশাই। সবই দেহ। আর ডিএনএ।   পুরো ফর্মুলাটা আপনাকে বলে দেওয়া যাবে না। সে'টা আমার নিজের পেটে লাথি মারা হবে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই বায়োটেকনোলজি আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কামাল। কারুর ডিএনএ সংগ্রহ করে,তার চারিত্রিক প্রোফাইল তৈরি করে একটা স্পেসিফিক অ্যালগোরিদমে ক্লোন করা৷ ক্লোন, কিন্তু অশরীরিরূপে।  ব্যাস, ভূত রেডি।

- জেনুইন ভূত?

- জেনুইন। এক ধরণের অমরত্ব বলতে পারেন। সে ভূত অবশ্যই চিপ আর ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে'সোলার ব্যাটারি দিনের বেলা আপনা থেকে চার্জ সংগ্রহ করে। তাদের বিনাশ নেই। এই ফ্যাক্টরিতে আমি একের পর এক অবিনশ্বর আত্মা তৈরি করে চলেছি মিস্টার মজুমদার। কড়ি ফেলে তেল মাখতে পারলে আর কাউকে এ দুনিয়া থেকে বিদেয় নিতে হবে না, অন্তত তাদের আত্মাটুকু থেকে যাবেই৷ তাদের ভূত তাদের অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করবে, বদলা নেবে, ভালোবাসবে, ভয় দেখাবে।

- থ্রিলিং। থ্রিলিং। কিন্তু কে জানে ডক্টর মেওসজুস্ক, তবু ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। আসলে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি নেওয়া তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়...হাতেনাতে ডেমোন্সট্রেশন না দেখলে...।

- প্রমাণ?

- প্রমাণ, আছে?

- আমার আর্দালি ভুভজু কেমন ভেসে ভেসে কফি দিয়ে গেল, সে'টা বোধ হয় খেয়াল করেননি,  তাই না?

- না মানে খবরের কাগজ পড়ছিলাম হয়ত, তাই ও কফি দেওয়ার সময় ঠিক...। তবে মুখটা দেখেছিলাম...সাদাটে ছিল বটে..কিন্তু...।

- এক মিনিট, এই দেরাজটা খুলে দেখাই..।

- এ'টা কী?

- এ'টা সুবিশাল ডিপফ্রিজ৷ দেখুন। ভিতরে অজস্র মমি। ডেডবডি না দেখলে ভূতকে ভূত বলে মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। ওই ডানদিকের বডিটা দেখুন...।

- ভু..ভু..।

- ও'ই আদত ভুভজু। ওর ভূতই আপনাকে কফি দিয়ে গেছে। এই কারখানায় তৈরি ভূত। আমার কারখানার সমস্ত কর্মচারীর দেহই এ'খানে আছে। মানুষ পোষার অনেক হ্যাপা, খরচও বেশি। কস্ট-কাটিংয়ের যুগ, বুঝতেই পারছেন।

- আর ভু..ভুভজুর পাশের... ও...ও..।

- আজ্ঞে হ্যাঁ মজুমদারবাবু, ও'টা আপনারই দেহ৷ প্রথম কফির কাপ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেছিলাম, আর পরের কাপে বিষ ছিল। স্যাম্পেল নিয়ে না ফিরলে আপনি ভূত বিক্রি করবেন কী করে বলুন তো?