Friday, September 23, 2016

মেজদার রাগ

বিকেল থেকে মেজদাকে নিয়ে হইহইরইরই কাণ্ড।

কী ব্যাপার?  মেজদার রাগ কমছে না।
কেন রাগ? ব্যাপারটা সে'খানেই। রাগের কারণ কেউ জানে না, মেজদাও না।

মোদ্দা কথাটা হল মেজদার রাগ কিছুতেই কমছে না। ওর চোখমুখ আগুনে লাল, মাথার চুল এতটাই উষ্কখুষ্ক যে হাজার চিরুনির র‍্যাফ নামিয়েও বাগে আনা যাবে না। মেজদা শুধু দরদর করে ঘেমে চলেছে আর হুড়মুড় করে পায়াচারী করে চলেছে। কণ্ঠস্বর মেজাজের উত্তাপে জড়ানো, কাঁপা কাঁপা।

বাবার হোমিওপ্যাথি, বড়দাদুর নার্ভের ওষুধ, মায়ের তৈরি লেবু সরবত, বড়দার আবৃত্তি, এমনি তুনুপিসির মাথায় বরফ ঘষার আইডিয়াতেও সে ভীমরাগ বশে এলো না। বরং মেজদার পায়চারীর স্পীড উত্তরোত্তর বেড়েই চলল। ওদিকে প্রেশার বোধ হয় সিলিং ছাড়িয়ে ছাদে গিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।

মেজদার অজানা ওজনদার রাগের খবর পাড়াময় হতে সময় লাগেনি, ঘনঘন ওকে দেখতে লোক আসছে। বাবলামামা পরের বার ইলেকশনে দাঁড়াবে, সে এসে খোঁজখবর নিয়ে গেলো। তিন্নি কলেজে ওঠার পর থেকেই খুব উড়ে বেড়াচ্ছে, সে এসেছিলো মেজদার লাগামহীন রাগে চোবানো মুখের পাশে পাউট করা মুখ রেখে ছবি তুলবে বলে। আরও কতজন। সবাই চোখ কপালে তুলে মেজদাকে দেখে যাচ্ছে, আর যে যার মত টোটকা উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অঘোর কাকা নিজের সেলুন বন্ধ করে এসে মেজদাকে দেখে একটা স্পেশ্যাল মাদুলি দিয়ে গেলো।

কিন্তু কোনও কিছুতেই কিছু নয়। মেজদা নিজের রাগের কড়াইতে ক্রমশ ভাজা ভাজা হয়ে পড়ছিল। ভাবগতিক দেখে বাবা হাসপাতাল আর আনন্দবাজারের অফিসে ফোন করে খবর দিয়ে রাখল। ব্যাপারটা কোনদিকে গড়াবে কিছুই বলা যাচ্ছিল না।

তবে অ্যাম্বুলেন্স বা সাংবাদিক আসার আগে ইউরেকা ঘটালো ছোটকা। "দেখি শেষ চেষ্টা করে" বলে হঠ করে মেজদার হাত থেকে মোবাইল ফোনটা কেড়ে নিয়ে মেজদাকে ফেসবুক আর ট্যুইটার থেকে লগ-আউট করিয়ে দিল।

কাজ হলে মন্ত্রের মত। মেজদার মুখে গন্ধরাজের সুবাস মাখানো হাসিটা ফিরে এলো, সে জানালে তার আচমকা খুব ছানার জিলিপি খেতে ইচ্ছে করছে।

খুব সম্ভবত "আনন্দবাজারের ফিফ্থ পেজটা মিস হলো" বলে বাবা সামান্য চুকচুক শব্দ করেছিলেন।

সঞ্জীববাবুর বিয়ে

- এ বিয়ে হবে না।
- কী বলছেন বাবা?
- তুমি বুঝছো না। আমার মেয়ের সাথে তোমার বিয়ে হতে পারে না। কাজেই তোমার মুখে এই বাবা ডাকটা শুনলেই মনে হচ্ছে তোমার দু'চোখে  কাসুন্দি ছিটিয়ে দিই।
- কিন্তু আমি যে...।
- শর্মিষ্ঠাকে ভালোবাসো। ও'ও তোমাকে ভালোবাসে। জানি।
- কাজেই দুনিয়ার...।
- কোন শক্তিই তোমাদের আলাদা করতে পারবেন না। কপুর হলেও না। জানি।
- আমি অব্রাহ্মণ বলে আপনি এমন হাবভাব দেখাচ্ছেন?
- আমরা অমন আহাম্মক নই।
- সরকারি চাকরী করি না বলে?
- ধুর ধুর। চাকরী ইজ চাকরী।
- তবে?  ফিনান্সিয়াল ব্যাকগ্রাউন্ড উইক ভেবেছেন?
- তুমি এত বদ? তুমি এইসব ভাবো?
- তবে বিয়ে হবে না কেন?
- কারণ আমরা এখানকার নই বলে।
- বাবা...।
- শাট আপ। রাস্কেল।
- কাকু... আমরাও এখানকার নই। মানে, আমার দাদু বরিশালের।
- না না, বুঝছো না। আমরা এখানকার নই। আমরা এলিয়েন। আমরা হোমোস্যাপিয়েন নই। আমরা মম্ভলুক।
- হে হে হে।
- ওরে কে আছিস এক বাটি কাসুন্দি আন।
- না মানে...আমি সে'ভাবে হাসতে চাইনি।
- শর্মিষ্ঠার জন্মের সাড়ে সাত বছর আগে আমরা এখানে চলে আসি।
- হে হে হে।
- হারামজাদা।
- সরি...কিন্তু বাবা...।
- তস্য হারামজাদা।
- কিন্তু কাকু,  এ যে গল্প কথা।
- গল্প? মুভিরুকা গ্রহের মম্ভলুক প্রজাতির ট্র‍্যাডিশন জানো? বিয়ের পত মম্ভলুকি বৌ মম্ভলুকি পুরুষের দু'হাত খেয়ে ফেলে।
- আজ্ঞে?
- দু'টো হাত। চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। সে'টাই কালচার। আইনও বটেন। প্রাচীন সময়ে এনেস্থিসিয়া ছাড়া ঘটত ব্যাপারটা। আজকাল এনেস্থিসিয়া ব্যবহার করে হয়। কিন্তু বিয়ে হয়েছে কী বর জগন্নাথ। আর সে'টা না মানলে..।
- না মানলে?
- না মানলে হাত কাটা যাবে না। শুধু সে গ্রহের সরকার বাহাদুর সেই বর আর বৌয়ের মাথা দু'টো কচাত করে নামিয়ে দেবেন।
- ওহ। হে...হে...।
- কী! হাসি শুকিয়ে আসছে? হেহে। সাধে কি আমি আর শর্মিষ্ঠার মা বিয়ের আগে পালিয়ে এসেছি?
- এ'সব গল্প...।
- হাত দু'টো পৃথিবীতে এসেও বাঁচানো গেল না চাঁদু।
- আরে...এই তো। আপনার এক হাতে চায়ের কাপ আর অন্য হাত আপনার গালে।
- আর্টিফিশিয়াল। সায়েন্সের কামাল। তবে ক্যারম খেলতে পারি না। আঙুলের ছাপ দিতে পারি না। ভাত মাখতে পারি না। কাতুকুতু দিতে পারি না।
- কি...কিন্তু হাত গেল কেন?
- মম্ভলুক ইন্সটিঙ্কট যাবে কোথায়? শর্মিষ্ঠার মা এড়িয়ে থাকতে পারেনি। শর্মিষ্ঠাও পারবে না।
- ও মানে..।
- বিয়ে। সম্ভব নয়।
- কী সব বাজে কথা যে বললেন..।
- কাসুন্দির বাটিটা কেউ দিয়ে গেলি না রে!
- কাসুন্দি অ্যাসিড যা কিছু দিন। হাতের কোপ্তা বানান। এ বিয়ে আমি করবই।
- বেসিক্যালি তুমি আমার কথাগুলো বিশ্বাস করছ না।
- এ'টা কোন বিশ্বাস করার গল্প হলো?
- যে আমার গল্প চোখ বড়বড় করে শোনে না, বিশ্বাস করে না, তার মত আনইমাজিনেটিভ ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দেব?
- কী মুশকিল।

**

সঞ্জীববাবুর বড় দুঃখ গো।
ক্যারম খেলতে পারেন না।
কাতুকুতু দিতে পারেন না।
ঝোল দিয়ে ভালো করে ভাত মাখতে পারেন না।

আর এই অদ্ভুত রোগে সেই যে ধরেছে, আর ছাড়ার নাম নেই; যে কোন আষাঢ়ে গল্প সহজেই বিশ্বাস করে নেওয়ার রোগ। এমন বিশ্বাসী মন নিয়ে আর যাই হোক পৃথিবীতে বাস করা চলে না।

Saturday, September 17, 2016

দুই বোন

ভোর তুলতুল করছে হাওয়ায়। খুব ধারালো কান পারে সে মিঠে হাওয়ার মৃদু ফরফরের আমেজ গলায় বুকে জড়িয়ে নিতে। আলতো ভেজা ঘাসের আরামে ডুবে যায় দু'জোড়া গোড়ালি।

শ্যাওলা পাঁচিলের আবডালে সবুজ এক ফালি হাসির জংলা জমি। পেল্লায় বাড়িটার পিছনে এ'দিকটায় কেউ বড় একটা আসে না।
শুধু ভোর আলো করা খিলখিল নিয়ে এদিকটায় এসে দাঁড়ায় দিদা আর দিদার আঁচল চিবুনো খুকি।

খুকি নতুন পুজোর নতুন জামা ভালোবাসে না। "ক'টা জামা হল" বলে গাল টিপুনি খুকিকে বিরক্ত করে। খুকি ভিড়ে হাঁপায়, খুকি বেলুনে আদর চিনলে না আজও।
খুকি চেনে দিদার গন্ধমাখা শিউলির ঝাঁকড়া গাছখানা।

তালপাতাইয়া হাত জোড়ার হুল্লোড়ে সে গাছ ঝাঁকিয়ে লুটিপুটি হয় খুকি। খুকি আর দিদার গা মাথা জুড়ে ঝরে পড়ে শিউলির ইলশেগুঁড়ি। সবুজে সবুজের মাঝে দুই বোন, গা মাথা শিউলি সুবাসে ভেজা।

ভোর রোদে উবে যায়।
উবে যায় পুজো। আবছা হয়ে আসে শরৎ।

দিদার আঁচল না চিবুলে শিউলি গন্ধ চিনতে পারে না খুকি। সে না চেনার যে ছুরি কুপিয়ে মারে পুজোর ভোরগুলো।

খুকি আই-আর-সি-টি-সিতে পুজো পালানো টিকিট খুঁজে বেড়ান।

আলাদীন

অচেনা কিছু দেখলেই তা ঘষে দেখা আলাদীনের পুরনো অভ্যেস।
গঙ্গার ধারের বেঞ্চে পড়ে থাকা বেওয়ারিশ স্টিলের টিফিন বাটিটা দেখেই সজোরে ঘষে দিলেন আলাদীন। বলা যায় না, কী ঘষলে কী মুনাফা হয়ে যায়।

খানিকক্ষণ ঘষতেই হল কী; টিফিনবাক্সের ঢাকনাটা আলগা হয়ে গেল। অমনি টিফিনবাক্স থেকে উড়ে এলো প্রেমসুবাস। সে সৌরভে মনপ্রাণ মেতে ওঠে।
আলু পোস্ত। নির্ঘাত কোনও পাকা রাঁধুনির হাতের।

শেষ বিকেলের রোদের ঝিলিক গঙ্গার বুক থেকে ছিটকে এসে পড়লো আলাদীনের হাসিতে। পকেট থেকে আশ্চর্য প্রদীপটা বের করে সোজা ছুঁড়লেন নদীতে।

তারপর টিফিন বাক্সটা বগলদাবা করে শিস্ দিতে দিতে ঘাট ছেড়ে বেরিয়ে এলেন আলাদীন।

কর্মা

- হচ্ছে না বিশ্বদা।
- হচ্ছে না? কেন রে?
- জাস্ট হচ্ছে না।
- আরে ধুত্তোর ছাই। কী হচ্ছে না?
- যুগ পাল্টাচ্ছে। মান্ধাতার আমলে পড়ে থাকলে হবে?
- হাতের হাতুড়ির কথা বলছিস?
- এগজ্যাক্টলি। হাজার বছর আগে বিশ্বকর্মার হাতে হাতুড়ি মানাতো। এখন নতুন জমানা।
- হাতে কীবোর্ড নেব? ড্রিল মেশিন?
- মডার্ন হলেই হবে না। পোস্ট মডার্ন হতে হবে।
- পো...পোস্ট মডার্ন?
- ইয়েস স্যার।
- কীবোর্ড ড্রিল মেশিনের চেয়েও এগিয়ে?
- আলবাত।
- সে'টা কী?
- কড়াই আর খুন্তি। সাথে বেসনের ঠোঙা থাকলেও ক্ষতি নেই।
- ধ্যের।

Friday, September 16, 2016

টু ব্রেক ইট আপ

- নাহ। মুশকিলে পড়া গেলো।
- ব্রেক আপ ইজ আ গুড থিং। বিশেষত মেয়েটাকে যখন তোর আর ভালো লাগছে না।
- কিন্তু, শুধু ব্রেক আপ করতে চাইছি বললে তো আর হয় না। জাস্টিফাই করতে হবে।
- জাস্টিফাই?
- একটা যুতসই কারণ না হলে...বলব কী করে?
- তোর ওকে আর ভালো লাগছে না। মিটে গেল।
- রিলেশনশিপ ডিপ্লোমেসি তুই বুঝবি না রে। ব্রেক আপ এমন হতে হবে যে'খানে সাপ উইল ডাই আবার হাতের লাঠির পালিশও নষ্ট হবে না। এবং সব চেয়ে বড় কথা; ব্রেক আপের কারণ স্যানিটাইজড হতে হবে।
- স্যানিটাইজড কারণ?
- সেক্সিস্ট হলে চলবে না। প্যাট্রিয়ার্কির গন্ধ থাকলে চলবে না। রেসিস্ট হওয়া যাবে না। এটসেটেরা।
- তুই কি তেমন কোন কারণে...?
- আমি কী ভাবছি তাতে কী এসে গেলো। তার কানে যাতে কন্ট্রোভারসাল না ঠেকে।
- ও।
- হুঁ।
- একটা সাজেশন আছে।
- সাজেশন?
- একটা ইস্যু তুলতে হবে। তা'তে ব্রেক আপ আপনা থেকেই হওয়া উচিৎ।
- যে ইস্যুতে মিউচুয়াল ব্রেক আপ?
- গ্যারেন্টেড!
- বল ভাই। আমিনিয়ায় নিয়ে যাব তোকে।
- শোন। ওকে জিজ্ঞেস কর ঘটক না সত্যজিৎ। উত্তরে যাই বলুক, তুই উলটো দিকে দাঁড়িয়ে পড়। হপ্তা কাটার আগেই রিলেশনশিপ গিলোটিনে।
- ব্রিলিয়ান্ট। তবে একটা ডাউট।
- কীসে?
- সে যদি বলে যে সে দু'দিকেই ডিসিন্টারেস্টেড?
- একজন ঘটকে-সত্যজিতে সামগ্রিক ভাবে নিঃস্পৃহ। তার সাথে আদৌ প্রেম করা উচিৎ?  ব্রেক আপের জন্য এর চেয়ে বড় আল্ট্রা-স্যানিটাইজড কারণ আর জুটবে ভেবেছিস?

Thursday, September 15, 2016

রাইটার্স ব্লক

দিবাকর ক্রমাগত খারাপ লিখে চলেছিলেন।
সিগারেট বাড়ছিল।
বাড়ছিল প্রকাশকের বিরক্তি।

কিন্তু চেনা অস্বস্তি আর রাগ ছাপিয়ে দিবাকর রাত চিনতে শুরু করেছিলেন। স্তুপাকার ছেঁড়া কাগজে বিছানা ভার হয়ে যেত শেষের রাতে। ভোরের আগের সে অন্ধকারের ওজনই আলাদা, সে অন্ধকারকে আকাশ সহজে ধরে রাখতে পারে না। চুইয়ে নামে কালো, আকাশ থেকে জানালার শিক বেয়ে বিছানা বালিশে মিশে একাকার হয়ে যায়।

খারাপ লেখা দিবাকরকে রাতের টনটনে  দিকটায় টেনে নিয়ে  যেতে শুরু করেছিল।


**

সুতপার চিন্তা বাড়তে থাকে। চোখের সামনে দিবাকর ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। দিবাকর অফিস যাওয়া বন্ধ করেছে আজ মাস চারেক হলো। দিনরাত হিজিবিজি লিখে চলেছে, পাতা ছিঁড়ে খাট মেঝেময় ছড়িয়ে চলেছে।  

রাতে ঘুম নেই।

জিজ্ঞেস করলেই শুধু একটাই কথা;
"পাবলিশারের তাগাদা আসছে। এবারে আমি একটা জুতসই উপন্যাস না দিলে ওদের কাটতি থাকবে ভেবেছো গো"?

**

আসলে দিবাকর বুঝতে পারে একটানা লিখে যাওয়াটাই তার জন্য এক মাত্র থেরাপি। আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে সুতপার প্রবলেমটা টের পাওয়া যায়। অনেক কিছু গুলিয়ে যায় ওর। ওর মনে থাকে না যে দিবাকর একজন লেখক। সুতপার মনে থাকে না যে ও সুইসাইড করেছে বছর দুয়েক আগেই। সে ভুলে যায় যে সে দিবাকরের জ্যান্ত বৌ নয়। দিবাকর মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। যে নেই তার মুখের ওপর তুমি নেই বলার মত খারাপ কাজ হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ভূতকে তো আর সাইকিলোজিকাল থেরাপিতে পাঠানো যায় না।

** 

"কে বলেছে তোমায় যে ভূতের মনোবিদ হয় না"?
মনোজিতের কথায় একটু ভরসা পেল দিবাকর। মনোজিতের সাথে আলাপটা নতুন। কিন্তু ভদ্রলোক এত অল্প সময়ে এত কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে; ভাবতেই বড় ভালো লাগে দিবাকরের। অমায়িক,  সপ্রতিভ। 

"আছে? তুমি ঠিক জানো মনোজিত"?

"না জানলে আর বলছি কেন? সামনের সপ্তাহে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করি। কেমন"?

"বাঁচালে ভাই। আসলে সুতপা মেয়েটা এত ভালো...ওকে এমন ভাবে সাফার করতে দেখলে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে"।

"চিন্তা কোরো না। সে হয়ে যাবে। তোমার লেখালিখির খবর বলো বরং"।

"ওই। ব্লকটা কাটতে চাইছে না। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাব্লিশাররা যে ভাবে চাপ দিচ্ছে, একটা কিছু না দাঁড় করাতে পারলেই নয়"। 

**

" দিবাকরকে কেমন দেখলে এবার মনোজিত"?

"ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে, ওর সেই ধারণাগুলো আমার হাজার কাউন্সেলিঙেও কাটছে নানা, বরং বদ্ধমূল হচ্ছে। তোমায় শক্ত হতে হবে সুতপা। তোমার সাপোর্টের ওপর সমস্তটা নির্ভর করছে"।

"আমার সাপোর্ট? মনোবিদ তো তুমি"।

"ইউ আর দ্য কী"।

"আমরাই ওর এ অবস্থার জন্য দায়ী। বিশেষত আমি"।

"নিজেকে অকারণে দোষ দিচ্ছ"।

"অকারণে? আমি দিবাকরের স্ত্রী, তাও তোমায় ভালোবেসেছি"।

" ভালোবাসা সিনেমার ডেফিনিশনে লিনিয়ার নয় সুতপা। আমিও ভালোবেসেছি তোমায়। কিন্তু দিবাকরের কথা ভেবে আমরা এক পাও এগোইনি কোনওদিন। ওর জানতে পারাটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট"।

"হি লাভড মি মনোজিত। পাগলের মত। আর ওই জানতে পারাটাই ব্রোক হিম। তুমি জানো সে জন্যেই দিবাকর আজ..."।

"ও'টা একটা দুর্ঘটনা ছিল সুতপা"।

**

জ্বরে দিবাকরের কপাল পুড়ে যাচ্ছিল, গোঙাচ্ছিল সে। যন্ত্রণায়। জলপট্টির শেষে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সুতপা। 

**

দিবাকরের অবাক লাগে। রাতের অন্ধকার উপচে ঘরের ভিতরটা কেমন নরম হয়ে এসেছে। আবেশে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কথার জড়িয়ে যাওয়াটায় রাত, লেখা আর স্নেহ খুঁজে পেলে সে।

কপালে সুতপার হাত কী ভালোই যে লাগছিল। ছোটবেলার বিকেল যেমন। শুধু সুতপার আঙুলগুলো বরফ শীতল। ও তো বেঁচে নেই, তাই অমনটা।

সুতপার জন্য বড় কষ্ট হয় দিবাকরের; আহা, মেয়েটা বড় ভালো। ভোর রাতের আবছায়ার মত স্নেহ। সুতপার এটুকু থাকাই বা কম কী?

উপন্যাস নয়, দিবাকর জানে যে এ রাইটার্স ব্লক কাটবে কবিতায়। তবে দিবাকর এও জানে যে কোনও লেখকই বাজারের চাহিদার হিসেবের ওপরে নয়। 

Monday, September 12, 2016

বারণ

একদিন হয়েছে কী, ফাইনডাইনিঙবাবু রাস্তায় হাওয়া খেতে বেরিয়েছেন। মাথায় হ্যাট। গায়ে কোট। হাতে চুরুট আর পকেটে ন্যাপথলিন।

ও মা।
হাওয়া খাবেন কী? গাছের একটা পাতাও নড়ছেন না। চারদিকে থমথম।
আধ-মাইল হেঁটে জিভ বেরিয়ে এলো বাবুর।
কোটের ভিতরে গেঞ্জি ভিজে গামছা। বাবু বিচলিত।


বাবুরা বিচলিত হয়ে থাকেন, কিন্তু তাই বলে মচকাতে পারেন না। বাবু পকেট থেকে বার করলেন ইয়েলোপেজেস হাই সোসাইটি পকেট এডিশন। তা'তে দিব্যি লেখা আছে যে গঙ্গার ঘাটে এ’সময় প্রচুর পরিমাণে হাওয়ার মিঠে ফুরফুর।


ব্যাস। অমনি বাবু জুড়ীগাড়ি হেঁকে চলে এলেন গঙ্গার ধারে।
ওমা।
হাওয়া খাবেন কী? ঘাটে ঢোকার মুখে কৌপীন পরে প্যাকাটি মার্কা চেহারার বেয়ারা দাঁড়িয়ে।


- রুকো বাবু! আপনার ঘাটে যাওয়া বারণ!
- বারণ করার তুই কে রে নেংটি?
- বারণ।
- আইনে আছে? আইন দেখা।
- আইন আবার কী? বলছি তো। আপনার ঘাটে যাওয়া বারণ!
- জানিস আমি কে? আমি ফাইনডাইনিঙবাবু।
- বারণ।
- আমি মামলা করব।
- বারণ।
- আমি দারোগা লাগাবো।
- বারণ।
- আর্‌রে ধ্যের। যেতে দিবি না কেন?
- আপনার জাঙ্গিয়ায় ফুটো আছে।
- মিথ্যে কথা।
- বারণ। কোট, চুরুট আর জাঙ্গিয়ায় ফুটো নিয়ে গঙ্গার ঘাটে যাওয়া বারণ।
- প্রমাণ কর হারামজাদা। যে আমার জাঙ্গিয়ায় ফুটো।
- প্যান্টালুন খুলে নেব?
- আমি সরকার বাহাদুরকে বলে গঙ্গার ঘাট সমেত তোকে হাজতে পুরব।
- বারণ। ফাইনভদ্রতার চৌহদ্দিতে জাঙ্গিয়াফুটো-ফাইনডাইনিঙবাবুদের ঢোকা বারণ। বারণ।