Wednesday, July 1, 2020

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই?

- ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি?

- ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?

- এইচ দত্ত। ওহ, সরি। সরি। আসলে..।

- বাড়ির নম্বর কিছু আছে?

- বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন।

- গুলিয়েছেন।

- গুলিয়েছি?

- এক্কেবারে।

- আসলে গুগল ম্যাপ ধরে..।

- ম্যাপকানা হয়ে অলিগলিতে ঢুকলে ওই হয়। ঝাড়া আড়াইশো মিটার পিছিয়ে গিয়ে শনিমন্দির পড়বে। সে'টার বাঁদিকের গলিতে ঢুকে ডান হাতের চার নম্বর বাড়ি।

- থ্যাঙ্কিউ।

- ও মা! কড়াইয়ের মাছ পোড়া লাগল বোধ হয়...।

**

ঘাটে এসে গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করল নির্মলের। শেষ বিকেলের রোদ্দুর নরম হয়ে এসেছে। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে পছন্দসই একটা জায়গা দেখে জলে গোড়ালি ডুবিয়ে বসল সে। প্যান্টে শ্যাওলার দাগ বসে যাবে, যাক গে। আজ গায়ে বুকে বড় নিবিড় ভালোলাগা লেগে আছে। 

পকেট থেকে বাদামের প্যাকেটটা বের করে ডান হাতের মুঠোয় কয়েকটা নুনমাখানো বাদাম ঢেলে নিয়ে সামান্য গুনগুন শুরু করল নির্মল। 

বুকের ভিতরটা কেমন তিরতির করছিল, ওই ভালোলাগায়। সুমির সংসার; সে এক জমকালো ব্যাপার।
সুমির রান্নাঘরের কড়াইতে মাছ।
সুমির কোমরে গোঁজা শাড়ির আঁচল।
সুমির থুতনিতে ঘামের দানা।

দেখে প্রাণ ভরবে না কেন?  আর কেউ না জানুক, নির্মল তো জানে; তাঁর বুকে হিংসের একটা ফোঁটাও নেই৷ মাকালীর দিব্যি কেটে সে বলতে পারে। 

কী বিচ্ছিরি পাগলামি যে আজ হঠাৎ মাথায় চেপে বসল! যাক, সে পাগলামীর বশে এদ্দিন পর দেখা তো হল। ক্ষণিকের কথাবার্তা, এ দাড়িগোঁফে ঢাকা বাউণ্ডুলে চেহারা সুমি চিনতে পারবেনা; এ'টুকু ভরসা ছিল। নাহ্, সুমিকে কোনওভাবেই বিরক্ত করা চলবে না।

সুমি যে কী ভালো। কী ভালো। এই যে গায়ে মুখে লাগা শেষ বিকেলের আলো আর পা ভেজানো নদীর জলের মিঠে শিরশির; আর দু'টো মিলেমিশে এই যে মনঅবশ করা ভালোলাগা - সুমি তার চেয়েও ভালো। 

চারদিকে কতশত মনকেমন করা ভালো; সঞ্জীবের বইতে রাখা ভোরের শিউলি ভালো, জলপটিতে মায়ের হাতের ওমটুকু ভালো, খিদেপেটে গরম ভাতের গন্ধ ভালো ।  আর সে'সমস্ত ভালো মিশলে যে কান্না; সুমি সে'খানে।

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; নির্মলের অল্প হাসি পায়। 

**

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; যত্তসব!

সাজানো ঠিকানার অছিলায় দেখা করতে আসায় দোষ নেই, আর কড়াইতে মাছের মিথ্যেটুকুতেই যত পাপ? মোটেই না। সুমি জানে, পাপ নেই তাতে। 

এদ্দিন পর যে লুকিয়ে দেখা করতে আসে, তার সামনে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলা যায় নাকি? সুমি জানে, যায় না।

নির্মলের সাহস না থাক, এক ফোঁটা হিংসুটেপনাও কি থাকতে নেই? 

**

(পুনশ্চঃ হটস্টারে "আরিয়া" ওয়েবসিরিজটি দেখলাম। এ লেখার সঙ্গে অবশ্য সে সিরিজের কোনও যোগাযোগ নেই। তবে 'বড়ে অচ্ছে লগতে হ্যায়' গানটা মনের মধ্যে নতুন করে দাগ কেটে গেল। এই আর কী)

খুনখারাপি আর মামলেট


 - ব্রাদার, একটু অপেক্ষা করা যায় না?

- চোপ শালা। বন্দুকের ছ'টা গুলিই গেঁথে দেব মুণ্ডুতে..।

- অপচয় করবে কেন? একটা গুলিতে যদি খেলখতম করা যায়, তা'হলে বাকি পাঁচটা নষ্ট করার কোনও মানে হয়?

- এই! মাইরি! বলছি...।

- ভাতের দানা হোক কি বুলেট। অপচয় দেখলেই বুকে বড় বাজে।

- কপালে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে রেখেছি, তারপরেও এত ফটরফটর? আচ্ছা ত্যাঁদড় মাল মাইরি।

-  আমার বাপ, আমার অঙ্কের মাস্টার, আমার মায়া। সবার মুখেই আজীবন ওই এক কথা শুনেছি। আমি নাকি রাম-ত্যাঁদড়। তা ও'টাকে আমি কম্পলিমেন্ট হিসেবেই ট্রীট করি বুঝলে হে। কোনও কিছু একটু না বাজিয়ে আমি এক্সেপ্ট করতে পারিনি কোনওদিনই। 

- মায়া কে?

- আমার স্ত্রী। ওই যে..।

- কে? কে? কে ওখানে?

- আরে ধুর ধুর। এই কলজে নিয়ে মার্ডার করতে নেমেছ? লাশ নামানো কি অতই সস্তা? ও'দিকে কেউ নেই হে। ওই দেওয়ালের ছবিটা দ্যাখো। ওই যে। মায়ার ছবি। সে ফাঁকি দিয়ে সুট্ করে সরে পড়েছে অনেক আগে। মায়ার মত মেয়ে হয় না গো ব্রাদার। এই যে তুমি অসময়ে এলে, শুকনো মুখে তোমার সে কিছুতেই বসে থাকতে দিত না। ঘরে আর কিছু না থাকলে দু'টো ডিম অন্তত চট করে ভেজে দিত। আর কফি। আহা, মায়ার হাতের কফি ভায়া..প্রতি চুমুকে ইউরেকা। 

- ধুত্তোরি। তখন থেকে ভ্যাজরভ্যাজর। 

- তুমিই তো চান্স দিচ্ছ ব্রাদার। বন্দুক বাগিয়ে ঢুকেছ৷ সোজা ঠাই ঠাই চালিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। তা না করে যেই না ওই বাতেলা ঝাড়া শুরু করেছ তখনই বুঝেছি...স্কিলে খামতি আছে। তা এতক্ষণ যখন গালগল্প হলই, আর মিনিট দশেক দেবে নাকি? ব্রাদার?

- কোনও চালাকি নয় কিন্তু...খুব সাবধান।

- চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য ইয়ে হয়না। শোনোনি নাকি?

- দু'মিনিট দেব। তার বেশি নয়।

- পাঁচে রফা কর ভায়া। উইন উইন।

- আমি ঘড়ি দেখছি,  পাঁচ মিনিট পরেই কিন্তু..।

- ঢিশুম। জাস্ট ফাইভ মিনিটস।

- কী হবে পাঁচ মিনিটে?

- পেঁয়াজ কুচোতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। মামলেটের বদলে বরং পোচ করে আনি। আর ফ্লাস্কের কফি। 

- খাওয়ার শখ?

- আরে আমার জন্য না। ওই যে বললাম। মায়া নেই বলে তুমি শুকনো মুখে কেটে পড়বে। সে'টি হচ্ছে না। মায়ার খারাপ লাগবে। সে মরে গেছে বটে, কিন্তু উবে তো যায়নি। 

- দত্তবাবু। আমায় আর নার্ভাস করবেন না প্লীজ। আপনাকে খুন করাটা অত্যন্ত জরুরী।

- হাজরা পাঠিয়েছে? 

- আজ্ঞে। সোয়া লাখ পাবো। টাকাটার বড্ড দরকার।

- এ জন্যেই হাজরার মত বিজনেস রাইভাল আমার দু'চোখের বিষ। আর খুন করাবি করা, আমাদের ব্যবসার লাইনে এ'সব একটু না করলে চলবে কী করে৷ কিন্তু তাই বলে আমায় খুন করার রেমুনারেশন সোয়া লাখ? তুমিই বলো ব্রাদার, আমি কি অতই মামুলি?

- আজ্ঞে?

- হাজরা কী ভেবেছে। শুধু বিজনেস টার্নওভারে মেপে নিমাই দত্তের তল পাবে? হাজরা জানে যে নারায়ণ দেবনাথের কমিস্কের ব্যাপারে আমার চেয়ে বড় এক্সপার্ট গোটা দেশে নেই? জানে ও? ও জানে যে যে সতেরোটা ডায়েরী বোঝাই হয়ে আছে আমার লেখা গান? সে গানে সুরও নিজে বসাই আমি? ও জানে? রোজ রাত্রে হারমোনিয়াম নিয়ে ছাতে উঠে আমি নিমাইসঙ্গীত গাই! ব্যবসার খাতিরে খুন করছিস কর, তাই বলে সোয়া লাখের বিনিময়ে আমায় নিকেশ করবে? আটকালচারড ব্রুট কোথাকার। 

- আজ্ঞে দত্তবাবু, আমি ছাপোষা খুনি। ও'সবের আমি কী বুঝি বলুন। 

- ও মা। নারায়ণ দেবনাথ না বুঝলে চলবে কেন?

- খুনটা আমায় করতেই হবে।

- তাই বলে দেড় লাখে? না না। সে অন্যায় বরদাস্ত করা যায় না ব্রাদার।

- পাঁচ মিনিট কিন্তু শেষ হতে চলল।

- যাহ্। একটু ম্যানেজ করো ভাই। ডিমটা ভেজে না দিলে মায়া কষ্ট পাবে। 

- আচ্ছা। ইয়ে, দত্তবাবু। আমি পেঁয়াজ কুচিয়ে দেব? মামলেটই হোক বরং। পোচের বদলে। নিজের জন্যেও না হয় একটা ভেজে নেবেন।

- এই অসময়ে? আমিও খাব একটা? কড়া ভাজা অমলেট? জিভটা যে সুড়সুড় করছে না তা নয়...কিন্তু অম্বলটম্বল হলে..।

- কিছু মনে করবেন না। খুনটা কিন্তু আমায় করতেই হবে দত্তবাবু।

- তাই তো। তা'হলে আর অম্বলের ভয় কীসের বলো ব্রাদার। আচ্ছা, হাঁসের ডিমের অমলেট চলবে? ফ্রিজে এখনও বেশ কয়েকটা আছে।

- তাই হোক। তা..রান্নাঘরটা কোন দিকে? 

- কিচেন এ'দিকে। কিন্তু তুমি গেস্ট হয়ে পেঁয়াজ কুচোবে?

- আমি সুপার ফাইন পেঁয়াজ কুচোতে পারি দত্তবাবু। আমার বৌ হাতে ধরে শিখিয়েছিল। মামলেটের জন্য একেবারে নিখুঁত।

- বটে? 

- আজ্ঞে। ইয়ে..তার নামও ছিল..মায়া।

- ছিল? ব্রাদার?

- সেও এখন ফটো। আমাদের শোওয়ার ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়ালে, তারামা হার্ডওয়্যার স্টোরের ক্যালেন্ডারটার পাশে ঝোলানল। রোজ ঘুমোনোর আগে খোকা সেই ফটোফ্রেমের দিকে তাকিয়ে আমার কাছে গল্প শুনবে। শুনবেই। ওর মায়ের গল্প। মায়ার গল্প। 

- অ।

- আসলে..টাকাটা আমার বড় দরকার দত্তবাবু। খোকার একটা অপারেশন না করালেই নয়। 

- অ। খোকার জন্য। এ সোয়া লাখ তো সোয়া লাখ নয় ভায়া। সোয়া'শো কোটির সমান। শোনো, এখন ডিম ভাজি। তারপর আর দেরী নয়। 

- আমায় ক্ষমা করতে পারবেন দত্তবাবু?

- মায়ার কাছেই যাওয়া তো। আমার বরং একটা হিল্লে হয়ে গেল। একা একা রোজ নিমাইসঙ্গীত গাইতে বসে বুক ফেটে যায় ভায়া, সবটুকুই তো মায়ারই জন্য। কিন্তু তোমার খোকার গল্পগুলো শোনাটা জরুরী৷ আমি তোমায় বাড়তি টাকা দিতেই পারতাম, আমি তো আর ওই হাজরার মত চশমখোর নই৷ কিন্তু এ কাজে ফাঁকি দিলে হাজরা তোমার ছড়বে না হে।

- দত্তবাবু..। হাজরার দলের বাকি লোকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে। কাজ হলে লাশ আর প্রমাণ লোপাট করবে বলে। বিশ্বাস করুন আমি যদি খুন নাও করি ওরা আপনাকে..।

- কেঁদো না ভায়া। মাঝেমধ্যেই মায়াকে বলি, আসছি গো। তোমার কাছে আসছি। শুধু সাহসের অভাবে এদ্দিন..। যাক, এই ভালো। তোমার খোকার জন্য আমার হারমোনিয়ামটা দিয়ে গেলাম। বসার ঘরেই রাখা আছে। নিয়ে যেও। আর শোনো, খোকাকে ওর মায়ের গল্পে রেখো, কেমন? দেখো একদিন সে মস্ত বড় মানুষ হবে।

- দত্তবাবু...।

- আর দেরী নয়। পেঁয়াজ কুচোও ব্রাদার। ওমলেটের ব্যাপারটা কুইকলি সেরে ফেলা যাক। নয়ত তোমার স্যাঙাৎরা এসে রসভঙ্গ করবে।

Sunday, June 21, 2020

কচুরীয়


১। বারো কি বাহাত্তর বছর আগের ব্যাপার।

২। গল যোদ্ধা লেভেলের অদম্য বয়সের দু'জন মানুষ।

৩। ময়দান ঘেঁষা হাঁটাহাঁটি আর পার্ক স্ট্রীটের রেস্টুরেন্ট রোমাঞ্চ বাদ দিয়ে তারা দেখা করেছিল দক্ষিণেশ্বরে। 

৪। সে ডেট-য়ে তাদের টেনে নিয়ে গেছিল হিংয়ের কচুরী। 

৫। এটাসেটামিক্স গোছের কচুরী দাদার হাত থেকে ভক্তিভরে তারা গ্রহণ করেছিল কচুরীর প্লেট আর ডালের বাটি। 

৬। একজন অপরের ডালের বাটিতে নিজের কচুরীর টুকরোটি ডুবিয়ে নেওয়ায়র মনোমালিন্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল কল্পতরু কচুরীদাদার আশ্বাস; "ডাল যত চাইবে পাবে, চিন্তা কীসের গো"। 

৭। সে হিংয়ের কচুরীর সুবাসে "আবার কবে দেখা হবে" ছিল; পরের প্রতিটি 'আবার কবে দেখা হবে"তে সে সুবাস ঘুরে ফিরে এসেছে। 

৮। প্রেমে হাবুডুবুফিকেশনের জন্য কি উত্তম-সুচিত্রা মাখানো 'এই পথ যদি না শেষ হয়' গোছের সুর জরুরী?  আদৌ নয়৷ কোয়ালিটি হিংয়ের কচুরীর স্পর্শ পেলে "সকলই তোমারই ইচ্ছে'তেই এস্পারওস্পার সম্ভব। মাইরি, সম্ভব; সেই দু'জন মানুষ প্রসেসটা টের পেয়েছিল; ওই বারো কি বাহাত্তর বছর আগে।

Thursday, June 18, 2020

ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন

- ভিক্টোরিয়া?

- ভিক্টোরিয়া। স্বপ্নে একেবারে জ্বলজ্বল করছিল।

- একে করোনায় গৃহবন্দী মনমেজাজ খারাপ। সবই বুঝি। কিন্তু তাই বলে স্বপ্নেও ক্লীশে ঘষবে গো?

- দ্যাখো বউ, হতে পারে ক্লীশে। তবু স্বপ্নটি জেনুইন৷

- জেনুইন?

- ছোটবেলার সুবাস নাকে এলো৷ এক্কেবারে মনকাড়া অ্যাফেয়ার।

- স্বপ্নে? সুবাস?

- তবে আর বলছি কেন। সে সুবাস রীতিমতো নাকের ভিতর সুড়সুড় করে গেল।

- তা সেই সুবাসের নেচারটা ঠিক কীরকম?

- ওই যে। বাগানের বেঞ্চিতে বসে  স্টিলের টিফিন বাক্স খুলে লুচি আলুভাজা বের করার যে মনমাতানো গন্ধ? সেইটা।

- হবে না।

- ও মা। কী হবে না?

- এ'সব স্বপ্নের বাহার আমি বুঝি না ভেবেছ? রাতে চিকেন স্টু আর ভাত। গিলতে হয় গেলো, নয়ত ভিক্টোরিয়ার বেঞ্চিতে গিয়ে ছেলেবেলার কথা মনে করে বাতাস পকোড়া খাওগে।

- অমন কড়া সুরে বলতে নেই বউ৷ আলু আমি ভাজব। ময়দাও আমিই মাখব৷ তুমি শুধু বেলে দিও। গতজন্মে কী ভয়ানক পাপই না করে এসেছি; আমার হাতে বেলা লুচি কিছুতেই ছাই ফুলতে চায় না। সে এক ট্র‍্যাভেস্টি। 

- উফফ। যত্তসব। একে লকডাউন তার ওপর যত আজেবাজে নেকু স্বপ্ন। প্রাণ ওষ্ঠাগত। 

- শোনো বউ, রিয়েল এস্টেট যে'ভাবে ক্র‍্যাশ করছে তা'তে  চার হাজার টাকা পার স্কোয়্যার ফিট দরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের এক চিলতে বারান্দা বিক্রি হলে আশ্চর্য হব না। আর সে সু্যোগ এলেই পিএফ ভেঙে তোমার জন্য ভিক্টোরিয়ার আড়াইশো স্কোয়্যার ফিট বারান্দা কিনে নেব। প্রতি রোব্বার বিকেলে আমরা সে'খানে বসে মুড়িমাখা খেতে খেতে তাস খেলব। 

- শোনো..তুমি ময়দা মাখো গিয়ে। আমি বেলে দেব।

- অহো বউ, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ভিক্টোরিয়া।

গর্বোদ্ধত

কলকাতা ও বাংলা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। আমাদের সংস্কৃতি,  আমাদের ঐতিহ্য ইত্যাদি। আবার আমাদের খবরের চ্যানেলগুলোকে চীনের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে শহরের চায়না টাউনে ছুটে যেতে হয় সে'খানকার চীনে রেস্তোরাঁর মালিকদের প্রশ্ন করতে;
"চীনের আক্রমণ সম্বন্ধে আপনারা কী ভাবছেন"?

আমাদেরই সহনাগরিকরা যে বিদেশী আক্রমণ বরদাস্ত করছেন না; সে'টাও খবর। সে খবর আমরা কনজিউম করি। সে আশ্বাস টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে ভেসে না এলে আমরা স্বস্তি পাইনা। 

আমাদের গর্বের শেষ নেই।

Wednesday, June 17, 2020

যুদ্ধযাত্রা


- সরাইখানায় নতুন বলে মালুম হচ্ছে?

- হুঁ।

- আমার নাম কার্লোস। বসি এ'খানে?

- আমি আন্দ্রে।

- বয়সে তো তুমি আমার খুড়োর বয়সী গো। তা, একটু না হয় আবদার নিয়েই বলি। এক গেলাস বিয়ার খাওয়াও না।

- বেশ তো..।

- বাঁচালে কার্লোস খুড়ো৷ গলা এক্কেবারে শুকিয়ে কাঠ। এই যে ভায়া, দু'টো বিয়ার এই টেবিলে।

- একটাই বলো না হয়।

- ও মা। তুমি খাবে না নাকি? 

- নাহ্।

- তা'হলে তাই হোক। তবে দু'টো বিয়ার আসছে যখন আসুক না। আমি না হয় দু'টোই...। কিন্তু ইয়ে খুড়ো...তাই বলে আমার পানপাত্রটি খালি হওয়ার আগে কেটে পড়ো না যেন। সন্ধ্যের মেজাজটি তা'তে নষ্ট হবে। 

- বেশ।

- খুড়ো, তুমি বড় অল্প কথার মানুষ দেখছি। 

- তুমি একাই তো দিব্যি আড্ডা জমিয়েছ। আমার আর বেশি কথায় কাজ কী বলো।

- শোনো খুড়ো, চুপ করে বসে থাকলে কিন্তু কিছু হবেনা। এ'বার গর্জে না উঠলেই নয়।

- গর্জন?

- গর্জন। এক্কেবারে হালুম। দেশের ঘাড়ে যুদ্ধ এসে পড়েছে আর আমরা মিউমিউ করব; এ'টা তো মেনে নেওয়া যায়না খুড়ো। 

- তা তো বটেই।

- যাক, বিয়ার এসেছে। 

- গলা শুকিয়ে গেছে বলছিলে। চুমুক দাও।

- চিয়ার্স। আহ্। বুঝলে খুড়ো, এ'বার কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

- ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? কাদের ওপর?

- ও মা! হাড়হারামি দেশ সিলডাভিয়া আমাদের আক্রমণ করে বসল। এ'বার আমাদের প্রত্যেককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পড়তে হবেই। কুত্তার বাচ্চা সিলিডাভিয়ানদের দেখলেই কচুকাটা করতে হবে।

- দেশের হয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে পারে, এমন নাগরিকই তো  দরকার।

- দেশের ওপর এমন আক্রমণ হচ্ছে ভাবলেই চোখ ভিজে আসে গো খুড়ো। এই আমার চোখের দিকে চেয়ে দ্যাখো! দ্যাখো। বুঝছ দুঃখটা?

- আহা আন্দ্রে। সত্যিই কেঁদে ফেলবে নাকি?

- কাঁদব না কেন খুড়ো? কেঁদে ভাসাব না কেন? দেশের ওপর এমন অন্যায় আঘাত হানার আগে শুয়োরের বাচ্চা সিলডাভিয়ানগুলো আমায় গুলি করে মেরে ফেললো না কেন।

- গুলি? খেতে চাইছ?

- মরতে ভয় পাই ভেবেছ খুড়ো? দেশের জন্য অমন কয়েক হাজার গুলি খাওয়ার যন্ত্রণা আমি হেসে হজম করতে পারব। 

- বাহ্।

- বুঝলে খুড়ো। দেশের চেয়ে বড় কিছু হয়না। কবিরা কি সাধে বলেছেন যে দেশ আদতে যে নিজের মায়েরই মত। তার ওপর এমন অশ্লীল আক্রমণ..আমি সন্তান হয়ে মেনে নেব কী করে?.

- হ্যাঁ। যুদ্ধের অবস্থা বেশ ভয়াবহ।

- কিন্তু তুমি দেখো খুড়ো, আমরা জিতবই। প্রয়োজনে আমার এই লাঠিটা নিয়ে সীমানায় গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেব। সিলডাভিয়ানদের তলোয়ারের ঘায়ে প্রাণ দিতে হলে দেব। দেশের জন্য দেব।

- দেবে বৈকি।

- জানো আমি কী চাই খুড়ো?

- কী চাও আন্দ্রে?

- আমি চাই আমাদের সৈন্যরা সীমান্তে আটক না।থেকে সিলডাভিয়ায় ঢুকে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিক। তা'হলেই হারামজাদারা বুঝুবে কত ধানে কত চাল..।

- ও'দের বোঝানো দরকার,তাই না?

- আলবাত দরকার। আর এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিৎ রাজামশাইয়ের কাছে আবেদন করা যাতে সিলডাভিয়াকে এইবেলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

- যুদ্ধ তো সিলডাভিয়াও করবে।

- আমরা কি যুদ্ধকে ডরাই ভেবেছ খুড়ো? আমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে...টগবগ করে!

- যাবে? যুদ্ধে?

- আমায় কিছু বললে নাকি খুড়ো? বড় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম...ঠিক শুনতে পাইনি।

- যুদ্ধে যাবে?

- যুদ্ধে? সীমান্তে?

- কাল সকালেই আমায় সীমান্তের দিকে যেতে হবে। সে'খানকার সেনাছাউনিতে একটা জরুরী কাজ আছে। তোমার মত জোয়ান ছোকরাকে সহজেই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে নেবে কিন্তু আন্দ্রে। যাবে আমার সঙ্গে?

- ইয়ে, যাওয়ার তো বড় ইচ্ছে। বড় ইচ্ছে। কিন্তু..।

- কিন্তু?

- আমার একটা মুদীর দোকান আছে হে খুড়ো৷ দেশের জন্য যতই বুক ফেটে যাক; দোকানটা বন্ধ রাখা একদমই উচিৎ হবে না। তাছাড়া সবাই ড্যাংড্যাং করে যুদ্ধ করতে গেলেই তো হবে না, অর্থনীতির ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে।

- এই অসময়ে, তোমার মত গুণী মানুষরা যদি সীমানায় গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় আন্দ্রে...তবেই তো দেশের ও দশের সাহস বাড়বে।

- বটেই তো বটেই তো। তবে ইয়ে খুড়ো, আমার না আবার ছোটবেলা থেকেই একটু সর্দির ধাত আছে৷ খোলা হাওয়া বুকে লাগলেই কফ বসে সে এক একাকার কাণ্ড৷ তাছাড়া মা আচার শুকোতে দিচ্ছে রোজ দুপুরে, সেই আচারের পাত্রগুলো বিকেলবেলার দিকে ঘরে ঢোকানোর দায়িত্বও আমার। বাড়িছাড়া হলে মা যা বকুনি দেবে না খুড়ো...এক্কেবারে খতরনাক মহিলা।

- বেশ।

- তা খুড়ো, সেনাছাউনিতে আবার তোমার কী কাজ?

- আমার একমাত্র পুত্র আলেকজান্ডার। সে গতকাল আমাদের সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যায়। খোকার দেহটাকে নিয়ে বাড়ি ফেরা দরকার, তার মা পথ চেয়ে বসে রয়েছে যে।

Tuesday, June 16, 2020

সারকাজমে বঙ্কিম


- বুঝলে দাদা, বড় মুশকিলে পড়েছি।

- মুশকিল? সিরিয়াস কিছু?

- রীতিমতো। 

- কী'রকম?

- আমি সারকাজমে বঙ্কিম; এ ধারণা নিয়ে এতদিন দিব্যি সুখে ছিলাম।

- এই কনফিডেন্সিটাই তো চাই ভায়া। এ'টাই তো চাই।

- কিন্তু কনফিডেন্সটায় সামান্য খোঁচা লাগল যে।

-  সে কী! কনফিডেন্সে খোঁচা? হাউ?

-  এইত্তো। গতকাল ভোরের দিকের স্বপ্নে খোশমেজাজে অন্যের নিন্দেমন্দ করছিলাম। এমন সময় স্বপ্নের ফ্লো নষ্ট করে বঙ্কিমবাবু এসে বলললেন; আমার সারকাজম বাকি কীবোর্ডের মাধ্যমে অনবরত ইটপাটকেল ছোঁড়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

- এ'কথা বঙ্কিম বললে?

- নিজের কানে শুনেছি। আর মাইন্ড ইউ, স্বপ্নটা কিন্তু ভোরের..।

- বঙ্কিমটা একটা ইডিয়ট।

- আস্ত ইডিয়ট, তাই না? তাই হবে। ঠিক বলেছ৷

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...