Wednesday, December 7, 2016

পাসেং ও পিতা

মঠের ভাঙা দেওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধ। বয়সের হিসেব তাঁর দাড়ির কালোর মত হারিয়ে গেছে। হাড় জিরজিরে, চামড়া ঝুলে পড়েছে। উত্তুরে কনকন হাওয়ায় ধবধবে লম্বা চুল এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর গোটা মুখে। উজ্জ্বল সাদা আলখাল্লায় বৃদ্ধটি মেঘ কালো আকাশের গায়ে চকের দাগ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যেন।
কে বলবে এখন দুপুর, চারপাশ সবজে-অন্ধকারে থমথমে।

বৃদ্ধ শীতে কাঁপছিলেন একটানা। কিন্তু আকাশের কালো থেকে কিছুতেই চোখ সরতে চাইছিল না। একটা কান ফাটানো গুড়গুড় শব্দে মাটি কেঁপে উঠল। বৃদ্ধ কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ফের তাকালেন আকাশের দিকে। আবার কোনও দেওয়াল ধসে পড়ল বোধ হয়। বা মঠের কোনও ঘর।

"বাবা" ডাকে বৃদ্ধ এবারে ঘুরে তাকালেন। পাসেং। তাঁর আদরের পাসেং। উচ্ছ্বল যুবক পাসেং। উজ্জ্বল চক্ষু পাসেং। আড়াই মাস বয়েসের যে রুগ্ন শিশুকে মঠের দুয়ারে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন তিনি, তার সাথে এ অগ্নিপুত্রের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

- তুমি এসেছ? যাক্‌।
- আজ যে আসতেই হত বাবা।
- হ্যাঁ। আজ তো আসতেই হত।
- এ সমস্তই তো আপনার জানা ছিল, তাই না?
- সমস্ত। এমনকি এই আকাশের এমন রঙও আমার কাছে অচেনা নয়।
- এখনই সমস্ত শেষ?
- আর কয়েক মুহূর্ত। আর সামান্য একটা কাজ।
- আপনি বলেছিলেন আশা আছে।
- আশা খুঁজছ কেন পাসেং? বাঁচার লোভ? এ নোংরা পৃথিবী আঁকড়ে থাকার লিপ্সা?
- আমি লোভী নই বাবা। আপনি আমায় সে'ভাবে মানুষ করেননি।
- তবে?
- মিসুং।
- মিসুং। তোমার পুত্র। আহ্‌। বড় মায়া ওর চোখে।
- মিসুং তো কোনও দোষ করেনি বাবা।
- দোষ? এর আগে যত শিশু মারা গেছে আমাদের পাপে, তাদের কোনও দোষ ছিল পাসেং? কিন্তু তাদের মরতে হয়েছে।
- দৈব।
- দৈব? বটে।
- শিশুহত্যার দায় জমতে জমতে যেদিন উপচে পড়বে, সেদিন পৃথিবী নষ্ট হবে। আকাশে তিনি বসে গুনে চলেছেন। প্রতি নিয়ত। শিশুর রক্ত উপচে গড়িয়ে গেলে পৃথিবীকে ভেঙ্গেচুরে নতুন ভাবে গড়বেন তিনি। যেমন এর আগেও হয়েছে। হাজার হাজার বার।
- তাহলে এবারেই বা ব্যতিক্রম হবে কেন পাসেং?
- পৃথিবী ধ্বংসই যদি হয়, তাহলে কোথায় আমি আর কোথায় মিসুং। নিজের ছেলের বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য লড়ব না বাবা?
- তুমিও থাকবে না যদি পৃথিবী ধ্বংস হয়। আমি বাবা নই? আমার দুঃখ হবে না?
- পৃথিবীকে বাঁচান তাহলে। ঈশ্বরের পুত্র আপনি বাবা। ঈশ্বরের এ অন্যায় বরদাস্ত করবেন কেন?
- ঈশ্বর অন্যায় করেন না পাসেং। সে'টা মানুষের কাজ। তিনি শুধু মানুষের পাপের হিসেব রাখেন। শিশুহত্যার পাপ। সংখ্যা পূর্ণ হয়েছে, পাপের ঘড়া উপচে পড়তে আর মাত্র একটা শিশুহত্যা দরকার।
- বন্ধ করুন। পৃথিবীটাকে থাকতে দিন। এই হাওয়া, মাটি, পাহাড়; আমার মিসুংকে অকালে হারাতে দেবেন না বাবা।
- মিসুং আমার সাথে থাকে পাসেং। ওকে আমি তোমার চেয়ে কম ভালোবাসিনা। ওর অধ্যয়ন আমার সাথে, আমার সাথে ও আহারাদি গ্রহণ করে। আমরা দৈনিক একসাথে সূর্যোদয় দেখি। কিন্তু এ পৃথিবীর সময় শেষ। আমাদের চারদিকে পাহাড় ভেঙ্গে পড়া শুরু হয়ে গেছে পাসেং। নদীর জল আগুন রাঙা হয়ে ধোঁয়াময় হয়ে উঠছে। বাতাসে মিশছে বিষ। এ মঠ ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্য, তাই এর দেওয়াল ভেঙ্গে পড়া শেষ হয় সবার শেষে। পিছনের ধ্বংসাবশেষের দিকে তাকাও, তবে বুঝবে যে বিনাশকাল এসে পড়েছে। সবার শেষে ভেঙ্গে পড়বে মঠের মূল মন্দিরের ওই চুড়ো, আকাশ জ্বালানো এক বিদ্যুৎ শিখা এসে তাঁকে ধূলিসাৎ করবে। আর তার জন্য দরকার আর একটি শিশুর মৃত্যু। তারপর সমস্ত শেষ। সমস্ত কিছুর ধুলোয় মিশে যাওয়া। প্রতি পঞ্চাশ হাজার বছর অন্তর আমি এমন ভাবে একা হয়ে যাই পাসেং। বড় বেদনার সে একাকীত্ব। আবার ছেনি হাতুড়ি নিয়ে আমি মঠ গড়তে শুরু করব, আর ঈশ্বর ফের বসবেন পৃথিবীতে পাহাড়, নদী, বর্ষা তৈরি করতে। আবার নতুন করে মানুষ। আবার সভ্যতা। আবার অসভ্যতা। শিশুহত্যা। পাসেং। এ অমোঘ, এ অবিচল।
- এ ধ্বংস আটকানোর কোনও উপায় নেই?
- উপায়? আছে। নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সে উপায় তোমায় বলাটা আমার উচিৎ নয়। তবু। বলব। কারণ জানো? হাজার হাজার পৃথিবী পেরিয়ে এসেও পিতৃ-স্নেহ কোনোদিন অনুভূত হয়নি এর আগে। পাসেং। আমার খোকা তুমি, আদরের, স্নেহের।
- উপায় কী বাবা?
- মঠের সব ছেলেমেয়েরা চলে গেছে। রয়ে গেছে শুধু মিসুং। তোমার অপেক্ষায় রয়েছে সে।
- উপায় কী?
- দু'টো খুন।
- বাবা!
- দু'টো খুন পাসেং। তোমায় মিসুং আর আমাকে হত্যা করতে হবে। শিশু হত্যার পাপ উপচে পড়ার পর আমি বধযোগ্য হই যতক্ষণ না নতুন পৃথিবী গড়ে উঠছে। আর নতুন পৃথিবী গড়ে ওঠার আগে যদি আমায় খুন করা যায় তবে এ ভাঙ্গাচোরা পৃথিবী সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে না। সে'টাই নিয়ম। তুমি আর যে দু'চারজন বেঁচে থাকবে সেই বিষাক্ত পৃথিবীতে, সবাই মিলে ঠিক পারবে ঘুরে দাঁড়াতে। নিশ্চিত। মিসুং না থাকলেও তুমি থাকবে সে’খানে। সে পৃথিবীতে সুবাতাস ফিরে আসবে। নতুন পৃথিবী নির্মাণের প্রয়োজন পড়বে না। কিন্তু তার জন্য তোমায় আগে মিসুংকে খুন করতে হবে, তারপর আমায়।
- কী বলছেন বাবা!
- বাবা রে, তুই আমার চোখের মণি। মারা যাসনে পাসেং। বাঁচ। এ দুনিয়াটাকে বাঁচার একটা সুযোগ দে। বের কর ছুরিটা...আর আমাদের...।
- পিতৃস্নেহে অন্ধ হয়ে আপনি আমায় বলছেন আমার পুত্র আর পিতাকে খুন করতে?

**

পাসেংয়ের নিথর দেহটা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল, ওর বুকে বসানো ছুরিটার দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলেন বৃদ্ধ।
বাবা। বাবার পাঁজর যে কতটা যন্ত্রণা বহন করতে পারে তা আঁচ করতে পারছিলেন। মনে হচ্ছিল বুকের মাংস আগুনে কাটছে, গোটা গায়ে কেউ বিঁধিয়ে দিচ্ছে বিষ মাখানো ছুঁচের ডগা। বৃদ্ধের সাদা আলখাল্লা রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। চোখের জল মুছে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।


মুঠো শক্ত করলেন তিনি।
অস্ফুটে বলে উঠলেন "আমিও ঈশ্বরের বরপুত্র। যার দুনিয়ায় পিতাদের এত যন্ত্রণা, তাঁর নিয়মে নিজের আত্মাকে কোটি কোটি বছর ধরে যন্ত্রণাবিদ্ধ করার কী মানে? সন্তানের দুঃখে পাসেং আত্মহত্যা করল, আহ সে যে কী যন্ত্রণা। সে যন্ত্রণার আগুন ঈশ্বরকে স্পর্শ করবে না, তা কী করে মানা যায়?"
জোব্বার ফোঁদলে রাখা ছেনি হাতুড়ি বের করে খাদে ছুঁড়ে ফেলে খোকার বুক বসানো ছুরিটা বের করে নিলেন বৃদ্ধ।


"খোকা ক্ষমা করিস। মিসুং, ক্ষমা করিস। কিন্তু এ পৃথিবীকে রেখে যেতে হবে। সমস্ত পিতার জন্য যন্ত্রণা রেখে যেতে হবে। হবেই। আর আমার পিতাও যে যন্ত্রণার বাইরে থাকবেন না।", বিড়বিড় শেষ হলে মিসুংয়ের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন বৃদ্ধ।

**

পৃথিবীর ভাংচুরের শব্দ বেশ আসছিল। খাতা কলম নিয়ে আরামকেদারায় সবে গা এলিয়ে দিয়েছিলেন ঈশ্বর। কত হিসেব কষতে হবে, কত অঙ্ক। কিন্তু আচমকা ভাংচুরের শব্দ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর তখনই একটা বিকট যন্ত্রণা বুকে বিঁধল, মনে হল যেন বুকের মাংস আগুনে কাটছে, যেন গোটা গায়ে কেউ বিঁধিয়ে দিচ্ছে বিষ মাখানো ছুঁচের ডগা।

"খোকা ঠিক আছে তো? বোধিসত্ত্বের কোনও ক্ষতি হয়নি তো?", ককিয়ে উঠলেন ঈশ্বর।

Monday, December 5, 2016

মোহনবাবুর সারপ্রাইজ

- কইসন হো?
- বঢিয়া। ডিনার মা মাটনবা রহিস।
- তবিয়ৎবা?
- তন্দরুস্ত। পাশবালিশ জড়াইস।
- দিলওয়া?
...
- খুশ। হাত মে কিতাব। ঘনাদা সসুরা বকরবকর করত হো।
- উঁহু। কুছ তো গড়বড়াইস। ম্যাদামারা কাহে গইল বা?
- সোমবার আ গইল।
- কিচেন মে রেকাবিমা ক্ষীরকদম ভইল।
- কা বাত করত হো। ক্ষীরকদম তো হম কব কা খা গইল হো।
- দু'গো ছুপাইকে রখতলা। তহর লগি সারপ্রাইজ।
- সজনী, হমৌ তু কা সরপ্রাইজ রখত।
- কা?
মোহনবাবুর ঘুম ভাঙলো পাশের বাড়ির মেনি বুকিকুমারির ছটরফটরের শব্দে। অ্যাডাল্ট স্বপ্নটা মাঝপথে সুতো কাটা ঘুড়ির মত লেতকে পড়ায় মনটা হু হু করে উঠলো। দলা পাকিয়ে রাখা খিদেটাও ওয়াপিস এলো। ব্যাচেলর সংসারে মাঝরাত্তিরের খিদে বলতে লেড়োর বয়াম। তবে বিস্কুটে কামড় দিয়েই মোহনবাবু বুঝলেন যে স্বপ্নের প্রভাবে মুখের সোমবারি তিতকুটে বিস্বাদভাবটা বিলকুল গায়েব।
অনেক চেষ্টা করেও সেই মুখাবয়ব মনে এলো না মোহনবাবুর। সে, যে দু'টো ক্ষীরকদম সরিয়ে রেখেছিল আদুরে সারপ্রাইজ দেবে বলে। মনে মনে মোহনবাবু তার নাম দিলেন রাই। পরনের শাড়ির রঙ সাদা হলুদ মেশানো ছিল কি?

**

ও'দিকে বুকিকুমারির মালকিন সন্ধ্যে থেকে বড্ড বিরক্ত। বলা নেই কওয়া নেই বাক্স থেকে দু'দু'টো ক্ষীরকদম গায়েব। বুকিকুমারি আজকাল চুরি করে মিষ্টি খাওয়াও ধরল নাকি? এদিকে বদ বিড়ালিটাকে একটু চোপা করবেন, সে সুযোগও নেই। সে গোটাদিন শুধু পাশের বাড়িতেই পড়ে থাকে আজকাল।

Saturday, December 3, 2016

এক ও অন্য

এক

ট্যাক্সি চলে যেতে ঘরে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন বিমল।
প্রত্যেকবার এমনই হয়।

ট্যাক্সিতে দেহকে বসিয়ে এই ওয়ান বিএইচকের কলকাতাটুকুতে এসে বসে হাঁফ ছাড়েন তিনি।

অন্য

মৃণাল ভৌমিকের জ্বলে ছাই হওয়া দেহটাকে অ্যাশট্রেতে ছুঁড়ে ফেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন গোল্ডফ্লেকবাবু।

মনের খচখচটা অবশ্য সম্পূর্ণ কেটে গেল সোফা থেকে ভেসে আসা মিস ক্লোরমিন্টের উড়ন্ত চুমুতে।

কিছুই কিছু নয়

- কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত।
- আমায় কিছু বললেন স্যার? দস্তুরের ফাইলে প্রচুর ফাঁকফোকর, খুব কনসেন্ট্রেট করতে হচ্ছে।
- দস্তুর?
- নতুন কনসাইনমেন্ট যারা পাঠিয়েছে।
- নতুন কনসাইনমেন্ট?
- যে'টা বম্বে থেকে এলো?  ডি এন দস্তুর! বান্দ্রার বান্দা।
- ওহ। সেই দস্তুর। তুমি দেখছি দস্তুরমত নিরেট।
- কেন স্যার?
- ফাইলে মুখ গুঁজে দিন কাবার করলে হবে দত্ত?
- বিজনেস আপনার স্যার, আমি তো কর্মচারী।
- বিজনেস। মুনাফা। ব্যালেন্স সিট। এ'টুকুই চিনলে দত্ত। কিন্তু কোনও কিছুই কিছু নয়।
- স্যার, স্যাড?
- দুঃখ ছাড়া কোনও লাস্টিং ইম্প্রেশন আছে দত্ত?
- ফিলসফি, ওহ। আমার আবার গত হপ্তায় যে রুট ক্যানালটা করিয়েছি সে'টা ঠিক খাপে খাপ হয়নি। একটা কনকন রয়ে গেছে।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ নিয়েই নষ্ট হয়ে গেলে দত্ত।
- গ্রাউন্ড লেভেল দুঃখ?
- দাঁতের ব্যথা। ট্রেনে ভীড়। মাইনে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান। ছেলের পরীক্ষার নম্বর। বৌয়ের থাইরয়েড। ধুর।
- ও। এ দুঃখ দুঃখ নয়?
- বাংলা কি মাল নয়? তাই বলে স্কচ চিনবে না  তা কী।করে হয় দত্ত?
- স্কচ লেভেলের দুঃখ?
- বেহালা বাজাতে পারো?
- না।
- পাথরে ছেনি হাতুরি ঠুকে নারী দেহ রূপে গুণে রসে ফুটিয়ে তুলতে পারবে?
- না।
- টপাটপ হাইকু লিখে প্রেম নিবেদন করতে পারবে?
- আমার স্টাইল ছিল অন্য। কাউকে পছন্দ হলেই বলতাম 'দুপুরের শোয়ের দু'টো টিকিট কেটে ফেলেছি'।
- ঘরের দুধ ছেঁকে রাবড়ি বানাতে জানো?
- না।
- এত না পারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ, দুঃখে ভেসে যেতে ইচ্ছে হয় না? দত্ত?
- বেহালা হাইকু এ'সব আপনি পারেন?
- আদৌ না। তবে আমার মধ্যে না পারার দুঃখ আছে। যে দুঃখ সাজানো বাগানের মত আমার অন্তর সুগন্ধে ভরে রাখে। তোমার মত নির্লিপ্ত নই, অন্তরে মৃত নই।
- আমার অন্তরের ডেডবডি আপনার বাগানের মাটি ফার্টিলাইজ করছে স্যার। দস্তুরের এ ফাইল সন্ধ্যের মধ্যে ক্লীয়ার না হলে আপনার বাগানে আলকাতরা বৃষ্টি হবে।  তখন সত্যিই বেহালা শিখে ফুটপাথে বসে বাজিয়ে টু পাইস কামাতে হবে।
- দত্ত, তুমি একটা প্লাস্টিকের টুকরো। আমি মাটির মানুষ। তুমি আমায় অনবরত কন্টামিনেট করে চলেছ।
- যা হোক। এ'বার এই ফাইলটায় একটা সাইন করে দিন। অমনি দস্তুরের পকেট থেকে কড়কড়ে আশি হাজার টাকা আপনার ট্যাঁকে ঝরে পড়বে। ভুল সাপ্লাইয়ের ইনডেমনিটি।
- আশি হাজারের উইন্ডফল? বলো কী দত্ত? চলো নরওয়ে ঘুরে আসি। মুড়ি চানাচুর চিবুতে চিবুতে অরোরা বোরিয়ালিস।
- ডিসেম্বরে শিউরি যান না কলকাতার চেয়ে শীত বেশি বলে। আর আশি হাজারে নরওয়ে? সাইকেলে যাবেন? তার চেয়ে আমায় ক্রিসমাস বোনাস হিসেবে ট্রান্সফার করে দিন।
- সামান্য ক্লোরোফিল তোমার মধ্যে রয়ে গেছে দত্ত। ইজি মানির সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে তোমায় কোরাপ্ট করতে মন সরছে না। অগত্যা নিজের নামেই ফিক্স করে রাখব। টাকা জলে দেওয়ার জন্য ফিক্স করাই সেরা উপায়। একবার ফিক্স করলে তা আর ভাঙা যায় না। লোভ। মায়া। ভাঙবে পঞ্চভূতে, লুটবে অন্যে। থাম্ব রুল অফ ফিক্স ডিপোজিটস।
- স্যার। মাইরি। আপনার ইয়ে আছে বটে।
- ইয়ে? কোনও কিছুই কিছু নয় হে দত্ত। কোনও কিছুই কিছু নয়।

পার্পল রোজ অফ কায়রো- ২.০

সিনেমাটা দিব্যি চলছিল। টানটান প্লট। রোম্যান্টিক।

প্রেম অনুরাগ যখন তুঙ্গে, তখন। লাস্যময়ী নায়িকা খাট আলো করে শুয়ে, অনতিদূরে দাঁড়িয়ে প্রেম-বিহ্বল চুমুন্মাদ নায়ক, তাঁর দাঁতে চেপে ধরা একটা আগুন রাঙা গোলাপ। নেশা ধরানো চোখে যখন নায়িকা নায়ককে খাটে আসতে বললেন, তখন সিনেমা হলের প্রত্যেকটা সীটে হুহু। হু হু। হু হু। এই বুঝি প্রেমের ঢেউয়ে সমস্তই ভেসে যায়।

এই বুঝি। এই বুঝি।

কিন্তু কী বিপত্তি। নায়ক খাটের কাছে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। বসলেন না। তাঁর মুখ সামান্য বিচলিত।

"কই গো, খাটে এসে বসো", নায়িকা বাধ্য হয়ে ডাইরেক্ট অ্যাকশনে নামলেন।

নায়ক তবু গোঁয়ারতুমি ফলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন; তাঁর মুখ থেকে গোলাপ গেছে খসে, কপালে ঘাম।

"কই গো! পাশে বসবে না নাকি"?, নায়িকার মেজাজের পারদ চড়ছে। গোটা হল জুড়ে বিরক্তি দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছে।

অগত্যা নায়ক বলেই ফেললেন "বসতে চাইলেই কি বসার উপায় আছে গো? কোনও ব্যাটাচ্ছেলে দর্শকাসনে বসে সেই তখন থেকে গুনগুনিয়ে জনগণ মন অধিনায়ক গেয়ে চলেছে। বসব কী করে মাইরি?"।

ডেন্সিটি

- হাই।
- হ্যালো।
- কদ্দিন?
- হুঁ?
- কদ্দিন ধরে হসপিটালাইজড?
- তিন হপ্তা।
- ক্যাডবেরি খাবেন?
- মুখে জ্বালা। গলাতেও।
- ওহ্। অ্যাডভান্সড।
- রীতিমত। আপনারও তো..।
- এখানে তো সবাই অন সেম বোট। অ্যাডভান্সড।
- সবাই অন টাইটানিক বলুন।
- হেহ্। আইসবার্গ।
- আইসকোল্ড।
- আমি মুকুল চ্যাটার্জি। সাউথ ক্যালক্যাটা।
- অভিনব মাইতি, নর্থ বেঙ্গল।
- ফ্যামিলি?
- বৌ, ছেলে। ক্লাস ফাইভে।
- সেম পিঞ্চ। শুধু আমারটা থ্রী'তে।
- ক্যাডবেরি দিন। এক কামড়।
- গলায় জ্বালা?
- ক্যাডবেরির অফার রিফিউজ করাটা বেশি ক্যাডাভেরাস।
- এই যে।
- থ্যাঙ্কস।
- কদ্দিন বলছে?
- ছ'মাস। মিনিমাম।
- নট ব্যাড। তবে আমি বেটার প্লেসড। এক বছর টেনে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
- জেলাস।
- আরও আছে কিন্তু । ক্যাডবেরি।
- গুড। আপনি আসার আগে এই বেডে যে ভদ্রলোক ছিলেন, তিনি গতকাল গেলেন।
- রিলিজ?
- না। আইসবার্গ।
- আউচ।
- আমার কপালে আজ ক্যাডবেরি লেখা। খণ্ডাবে কে?
- হেহ্।
- ওয়েলকাম টু দ্য ল্যান্ড অফ নো হোপ মিস্টার সাউথ ক্যালক্যাটা।
- আশাহীন। অথচ বেশ নিশ্চিন্দি লাগছে। ওই ফোর্থ ইনিংসে তিনশো বাহাত্তর চেজ করতে নেমে বিরাশিতে আট উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দশ নম্বর ব্যাটসম্যানের স্টেট অফ মাইন্ড। ক্রস ব্যাটে হুব্বা চালালে কেউ খিস্তি করার নেই।
- চালাবেন? ক্রস ব্যাটে?
- ক্রস ব্যাট? কী ভাবে?
- ক্যাডবেরির ঋণ। চাট্টিখানি কথা নয়। পে ব্যাক পছন্দ হয় কিনা দেখুন। এই যে।
- গোল্ডফ্লেকের বাক্স?
- ডক্টরড্ গোল্ডফ্লেক।
- হাউ?
- মালানা ক্রীম।
- গাঁ...গাঁজা?
- ইউ আর ওয়েলকাম।
- আমি কোনওদিন গাঁজা টাচ করিনি..।
- আহ রে, প্রিটি মিস ব্রাউন। টেস্টে দশ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেছেন এর আগে?
- না মানে ডাক্তার...।
- ভি'তে খেলতে বলবে, আপনি চালাবেন ক্রস ব্যাটে।
- ওহ, তাই তো।
- তবে এ'টা আনুষঙ্গ মাত্র।
- আসলি চিজ কী? হেরোইন টেরোইন রেখেছেন নাকি?
- এ'টা আমার বালিশের তলায় থাকে। টুয়েন্টি ফোর সেভেন। ফার্স্ট কেমোর পর থেকেই।
- সুকুমার সমগ্র?
- কম্বিনেশনটা মারাত্মক। ডেনসিটি ম্যাক্সিমাইজ করতে অত্যন্ত জরুরী।
- ডেনসিটি?
- মাস অফ লাইফ ইকুয়াল টু ভল্যুম অফ লাইফ ইনটু ডেন্সিটি অফ লাইফ। ভল্যুম অফ লাইফে কোনও ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করতে পারবেন কি?
- তাই তো। হাতে রইলো ডেন্সিটি।
- আশি বছর বেঁচে যে মাস অর্জন করতেন, সে'টুকু কম্পেন্সেট করতে হবে স্যার। ডাক্তার ভিজিটে আসবে আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। তারপরেই আমরা মানে...ইয়ে...ডাবল শেয়ারিং রুমে এ'টাই সুবিধে।
- আইসবার্গের মুখে কেরোসিন।
- এই হলো কথার মত কত। এবারে আর এক প্যাকেট ক্যাডবেরি বার করুন দেখি।

Friday, December 2, 2016

অনির্বাণের অসুবিধে

দেখুন। লাইফ ইস আনফেয়ার। এই স্টেটমেন্টটা ভীষণ অপ্টিমিস্ট। জীবন তার চেয়েও বহুগুণ মন্দ কিছু একটা। মন্দ বলতে এগরোলে আপেল সেদ্ধ পুরে দেওয়ার মত গণ্ডগোলে। নির্মম।
 
চারিদিকে কোথাও ভালো কিছু নেই। গভর্নমেন্ট ধান্দাবাজ, অপোজিশন ধান্দাবাজি করার চান্স না পেয়ে বিপদজনক ভাবে খুনে। ও'দিকে নর্থ পোল গলে গলে বেহালায় নেমে আসছে। ধর্ম বিশ্বাসে মারছে, ডেমোক্রেসি কোরাপশানে ঝোলাচ্ছে আর কমিউনিজম ছেনি হাতুড়ি দিয়ে ক্যানভাসে ঠোকাঠুকি করে যাচ্ছে। সোশ্যালিজম ক্যাপিটালিজম অমুকিজম তমুকিজম; যে কোনও ইজময়ের কনসেপ্ট মানেই ' কিউপিডের পৈতে ' গোছের ভাঁওতা।
 
এই ছাব্বিশ বছর বয়সে এ'টা নিশ্চিত বুঝেছি। সব নষ্ট। চারদিকের যা কিছু সমস্তই একটা দলা পাকিয়ে আসা মিথ্যে। কাদার স্প্রেড মাখানো স্যান্ডুইচ। 

ওহ। আমি অনির্বাণ। অনির্বাণ মিত্র। আর শুনুন, গেলাস ওই হাফ ফুল হাফ এম্পটি সব বাজে কথা। এ হল এক গেলাস বিষ মেশানো সরবত; মিন্ট ফ্লেভার। মিন্ট অবশ্য আমার অত্যন্ত প্রিয়।
 
তবে মিন্ট ফ্লেভারের আলোচনা এখন থাক। জিন্দেগী যে কী মন খারাপ করা একটা ব্যাপার, সে'টা নিয়ে বলছিলাম।  যেমন ধরুন এই যে এখন। আমি চমৎকার এই কফি শপে বসে। ঝকঝকে, অল্প আলো। আশপাশে সুখী  মানুষজন আর তাদের স্টেরিলাইজ করা গল্পের ফিসফাস। এই ছিমছাম পরিবেশে আমার টেবিলেই যত যন্ত্রণা। চেয়েছিলাম এস্‌প্রেসো, দিয়ে গেল আইরিশ কফি। ক্লাস সেভেনে বাবার কাছে কুকুরছানা চেয়েছিলাম, বাবা ক্যারম কিনে দিয়েছিল। সেই থেকে আমি কোনও কিছু রিফিউজ করি না। আইরিশ কফিই সই। তবে এর চেয়েও খারাপ ব্যাপার হল সুমনার আসার সময় হয়ে গেছে। আর তার চেয়েও বুক ফাটা ব্যাপার হলো এই যে ওকে বলতে হবে "দিস ইজ নট ওয়ার্কিং আউট"।
 
সুমনা। সুমনা চ্যাটার্জি।
একমাত্র এই একজনকে দেখেই মনে হয়েছিল বসন্ত মানেই কলকাতার ঘামাচি নয়। সুমনার চোখে একটা ধার আছে। ব্লেড-গোছের ধার না। মুচমুচে দামী ভিজিটিং কার্ডে দিয়ে চামড়ায় যেমন আঁচর কাটা যায়, কিছুটা তেমন। সুমনা অফিসে জয়েন করেছিল হিউম্যান রিসোর্স টিমে। হিউম্যান রিসোর্সের মানুষদের ঠিক সুমনার মত হওয়া উচিৎ। ও আমায় "চাকরী নট" বললেও মনে হবে আমার মগজের ঘিলু আনন্দ স্নান সেরে হয়ে টপটপ করে সুগন্ধি মোমের মত গলে হৃদয়ের পাত্রে জমা হচ্ছে। সুমনা ছুটি কাটা যাওয়ার মেল দিলেও মনে হবে সে মেলের প্রিন্ট নিয়ে শেষের কবিতার পকেট এডিশনে মলাট দিই।
সুমনা। সাজে, পোশাকে, হাসিতে, গালের টোলে, লিপস্টিকের রঙে, "ওহ রিয়েলি" বলা সাজানো আগ্রহে পরিপূর্ণ। টলমল। ভরাট অথচ বাড়তি নয়। আলাপী কিন্তু ঢলে পড়া নয়।
সুমনাকে দেখলেই মনে হয় চট করে গিটার ক্লাসে ভর্তি হই। মনে হয় নভেম্বর পড়লেই লিপ বাম ব্যবহার করব। বারোটা কিউবিকেলের ও'পাশে সুমনা বসে। তবু সে বসে আছে; এই জানাটুকুতেই গালিবের বাস।
 
সুমনা। ওকে দেখে মনে হয়েছিল সমস্তটাই একটা উন্মাদ প্রজাতির লম্ফঝম্প নয়। সিমেট্রি আছে জীবনে, পুরোটাই বেওয়ারিশ নয়।
 
সে’টুকুই ঠিক ছিল। একটা প্রবল নিশ্চিন্দি। অখাদ্য কাজ করেও, লো আই কিউ টিম মেম্বার্সদের হজম করেও অফিস আসাটা ভালো লাগতে শুরু করেছিল। কোথা থেকে, কী ভাবে, কেমন করে, কী সাঙ্ঘাতিক নিয়তির বাগাডুলি স্ট্রোকে যে এমনটা হয়ে গেল সে’টা বলা দায়।  আমার আর সুমনার প্রেম। আমাদের প্রেমে পড়া একদমই উচিৎ হয়নি। না। মানে। সুমনার আমার প্রেমে পড়া একদমই উচিৎ হয়নি। সুমনা ঋত্বিক ঘটক হয়ে ‘মেজবৌ’ ডাইরেক্ট করতে মাঠে নেমে পড়েছিল। ভুলটা ওর। আমার ভেসে যাওয়াটা যুক্তিযুক্তই ছিল।
 
সুমনা বলে কথা। আর। যেমন হয়। রোমহর্ষক ভাবে যেমনটা হওয়া উচিৎ। তেমনটাই হয়েছিল। সুমনার ফাঁকা ফ্ল্যাটে। ওল্ড মঙ্ক আর কাবাবের পর।
 
মানে। ভাবুন। সুমনা আমায় আদর করতে শুরু করেছিল। সুমনা, আমায়। আদর করতে শুরু করেছিল। সোফা। ভীষণ নরম সোফা। সুমনার এলোমেলো চুল। পারফিউম। ঘরের ম্যাটম্যাটে লালচে আলো। ওই যে চুমুটা। ঠিক যেন আমি অ্যাস্ট্র্যাল প্রজেকশনে নিজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের দেখছি, দেখছি আমরা চুমু খাচ্ছি। একটা পরমাণু বিস্ফোরণ আর আমি ওপেনহাইমারের কেত নিয়ে ফিসফিস করে বলছি “নাউ আই অ্যাম বিকাম ডেথ, দ্য ডেস্ট্রয়ার অফ ওয়ার্ল্ডস”।
 
সুমনা ইনিয়েবিনিয়ে টপের বোতামগুলো খোলার সময় মনে হচ্ছিল নদী হয়ে যাই। পৃথিবী পরিবেশ অর্থনীতি; এ সমস্ত কিছুর প্রতিই ইতিউতি ভালো লাগা রাখা যায় বলে মনে হচ্ছিল। টপ সরে যেতেই সেই দুর্বার আভাসটা ভেসে এসেছিল। সমস্ত বাঁক খাঁজ ছাপিয়ে উঁকি মারছিল সেই উল্কি। ব্রেসিয়ারে অবশ্য বেশিরভাগটাই ঢাকা থাকায় বোঝা যাচ্ছিল না।  অসংলগ্ন জাপটাজাপটি আর আদরে খসে পড়া ব্রায়ের হুকে আর সুমনার আবরণহীনতায় তোলপাড় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তখনই স্পষ্ট হল সুমনার বুকের বাঁদিকের ট্যাটুটা চে গুয়েভারার। ফের অ্যাস্ট্রাল প্রজেকশন, তবে এবার আমি একা নই।
 
-   চে? আপনি চে?
-   তাতে কী?
-   তাতে কী মানে? এ’সব কী!
-   আপনার নাম কী?
-   অনির্বাণ! আর আপনার নাম চে না হয়ে হওয়া উচিৎ ছিল বাঁশ।
-   প্রবলেমটা কী আপনার অনির্বাণ? আর আপনার বডি পড়ে আছে সোফায় ওই মেয়েটার কোলে, এ’দিকে আপনি এসে আমার সাথে গল্প করছেন?
-   শখ করে এসেছি ভেবেছেন?
-   তাহলে এসেছেন কেন?
-   সুমনার বুকে...।
-   আপনার গার্লফ্রেন্ড?
-   হ্যাঁ, তো?
-   গার্লফ্রেন্ডের বুক নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চাইছেন কেন?
-   মাইরি। ওর বুকে আপনার ট্যাটু।
-   ওহ। তো?
-   বুকে মানে, কাব্যিক সেন্সে বুকে নয়। হৃদয় টিদয় নয়। বুকে। লেফ্‌ট ব্রেস্টে আপনি।
-   আমি স্টাইল স্টেটমেন্ট। আইকন অফ রিভোলিউশন।
-   তাতে কী? আপনি ফুল নন, মাছ নন, চাঁদ নন, কবিতার লাইন নন; মোদ্দা কথা আপনি ট্যাটু হিসেবে ব্রেস্ট-ফ্রেন্ডলি নন। 
-   এ কী! কেন?
-   দাড়ি। আমার এখন এক মনে সুমনাকে আদর করার কথা। অথচ আমি দেখছি দাড়ি। চোখের সামনে কনস্ট্যান্ট দাড়ি দেখলে আমি আদরে মন দিতে পারব না।
-   বাট দ্যাট ইজ সিলি।
-   সিলি? হে ভগবান! ওহ সরি, আপনি বোধ হয় এথেয়িস্ট।
-   আমি জানি না। আমি আপনার ফিগমেন্ট অফ ইম্যাজিনেশন।
-   রাইট। কিন্তু ওই ট্যাটুটা রিয়ালিটি। ওর বুকে হাত দিলেই আপনার গাল ফুলে উঠছে। ম্যাগোহ্‌।  
-   এহ্‌।
-   আচ্ছা, এমন ব্রা আছে যার বাঁ দিকের কাপ না খুলে ডান দিকেরটা খোলা যায়? মানে, চাইলেও ডান দিকেরটা খোলা যাবে না! পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড গোছের কিছু হবে...।
-   আপনার প্রবলেম কি আমার দাড়ি নিয়ে? আমি ক্লীন শেভেন হলে সমস্যা হত না?
-   না না না। দাড়ি না থাকলে আপনি এত টিশার্টিও হতেন না।
-   আমার ছবি লোকে ট্যাটু করায় দাড়ির জন্য? রিভোলিউশনের জন্য নয়?
-   আরে ধুর মশাই, সুমনা হিউম্যান রিসোর্সে কাজ করে। রিভোলিউশন বলতে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বোঝে।
-   যাহ্‌ শালা।
-   সরি টু হার্ট ইওর ফিলিংস গুয়েভারাবাবু। কিন্তু দিজ ইজ বিগার ট্রাবল। আমার বডি ওখানে সুমনাকে ইম্প্রেস করার চেষ্টা করছে অথচ আমি আমার নিজের মন হয়ে নিজের বডিকে ফেলে সোফা থেকে দশ হাত দূরে এসে আপনার সাথে গল্প করছি।
-   আই নো। আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
-   উফফ! দুনিয়াটা এত অখাদ্য কেন বলতে পারেন? সুমনাকে আদর করা বৈপ্লবিক ব্যাপার হওয়া উচিৎ ছিল আমার জীবনে। মাঝখান থেকে...ধুস।
 
সেই থেকে সুমনার সাথে প্রত্যেক অন্তরঙ্গ মুহূর্তে সেই একই ঘটনা। দাড়িয়াল এসে আমায় সুমনার থেকে দূরে টেনে নিয়ে গল্প করবে। জীবনটাই বোগাস। ননসেন্স। সেক্সকে ভয় পেতে শুরু করেছি। এ যেন প্রত্যেকবার বিরিয়ানির বাক্স খুলেই দেখা এক মুঠো মুলোকুচি ছড়ানো রয়েছে। উফফ!
 
**
 
এক্সেলেন্ট। ফাটাফাটি। সুমনা আসছে না। এবং সে’টা জানলাম চারটে কফির পরে। এসএমএসে।
 
“অনি, সরি। আজ আসছি না। কালকের সিনেমার প্ল্যানও ক্যান্সেল। আসলে আমার বারবার শুধু মনে হচ্ছে তুমি আমার সাথে ইন্টিমেট হতে চাও না। আমার বারবার মনে হয় তোমার মন অন্য কোথাও পড়ে থাকে। আই ক্যান নট লিভ উইথ দ্যাট”।
 
-   কার এসএমএস ভায়া?
-   যে আসছে না তাঁর।
-   উহ, সরি।
-   সরি আবার কী! কিন্তু একটা কথা বলুন চেবাবু, আজকাল আপনি কি সুমনা না থাকলেও উদয় হবেন সামনে?
-   আই থিঙ্ক সো।
-   কফি খাবেন?
-   আমি আপনার কল্পনা। কফি খাই না।
-   আমি কেন এলাম জানেন অনির্বাণ?
-   কেন?
-   পাশের টেবিলের মেয়েটার পার্স পড়ে যাওয়ায় ও সে’টা তুলতে ঝুঁকেছিল। আপনি ও’ভাবে না তাকালেই পারতেন।
-   ডিসগাস্টিং। আপনি।
-   আনফরচুনেটলি। আপনি না চেয়েও চে কে পাবেন, যখনই আপনি...।
-   ডিসগাস্টিং টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। আমার জীবন...।
-   বরবাদ। আর এক কাপ খাবেন নাকি উঠবেন এখন?

http://www.bongpen.net/2016/12/blog-post.html

Saturday, November 26, 2016

বলরামবাবুর শখ

নিউ ক্যালক্যাটা হার্ডওয়্যারের দোকানটা থেকে উত্তরের দিকে মিনিট পাঁচেক হাঁটলে একটা সরু গলি বাঁ দিক থেকে রাস্তায় এসে মেশে। গলিটার মুখেই একটা ল্যাম্পপোস্ট। শীত আর নিস্তব্ধতা মিলে ল্যাম্পপোস্টের বাতিটার নিভু নিভু আবেশে একটা ছন্দ এনে দিয়েছিল।

সে'খানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন বলরাম দত্ত। হাতঘড়িতে তখন রাত পৌনে বারোটা। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই একটা রিক্সা এসে থামল তাঁর সামনে।
রিকশাচালকের নরম সুরের"উঠে পড়ুন"য়ে ভর দিয়ে রিক্সায় উঠে বসলেন তিনি।

নার্ভাসনেস, শীত আর রাত মিলে যে রিনরিন বলরামবাবু গা জুড়ে অনুভব করতে পারছিলেন, সে'টা স্তিমিত হতে মিনিট সাতেক সময় লাগল। রিক্সা ততক্ষণ অবশ্য থেমে থাকেনি। গলার শুকনো কাঠ ভাবটা কেটে যেতেই, হাওয়ার বরফ শীতলতায় মোচর দিতে কথা শুরু করলেন বলরামবাবু নিজেই।

- আপনিই তবে...?
- আজ্ঞে।
- আমরা কোথায় যাচ্ছি?
- ইলিশ জলের কত ফুট নিচে ডিম পাড়ে জানেন?
- না। কেন?
- আমরা কোথায় যাচ্ছি জেনে কী করবেন? আপনার কাজ হওয়া নিয়ে কথা।


**

পাড়ার এত কাছে এত নিরিবিলি জংলা আছে, সে'টা বলরামবাবুর জানা ছিল না। রিক্সা থেকে যখন নামলেন তখন রাত পৌনে একটা। মেঘলা আকাশ, তবুও অন্ধকার নিকষ নয়। আকাশে একটা ফ্যাকাসে ভাব। গায়ের শালটা আরও ভালো ভাবে জড়িয়ে নিলেন বলরামবাবু। আশেপাশে প্রচুর তাল গাছ। জায়গাটায় একটা মায়া মেশানো ছমছম রয়েছে। ফের বলরামবাবুই কথা শুরু করলেন;

- শুনছেন?
- হুঁ।
- রিক্সাটা এখানে দাঁড় করালেন কেন ভাই?
- এখানেই। কাজ হবে।
- এখানে, মানে... ।
- কেন? পছন্দ হল না? অনেক যন্ত্রপাতি দেখবেন আশা করেছিলেন?
- না মানে...ভেবেছিলাম পুজোঅর্চনার ব্যবস্থা থাকবে। বা অন্তত একটা সুসজ্জিত ল্যাবরেটরি।
- রিক্সাওলার ল্যাবরেটরি?হাসালেন।
- এ'টা আপনার বিনয়।
- প্রথম কন্ডিশন। আমার নাম ধরে ডাকা বারণ। তা'তে আমার কাজে অসুবিধে হয়।
- ওহ, ডাকব না?
- রিক্সাদা বলে ডাকতে পারেন।
- ওহ, সেই যে গতকাল রাত্রে আপনার সাথে আলাপ! সেই থেকে দু'চোখের পাতা এক করতে পারছি না।
- কেন?
- আপনার মত তন্ত্র-সাধকের সাথে আলাপ হওয়াটা...।
- তন্ত্র-সাধক! হুহ্‌। যদি তেমনটাই হতাম, তাহলে তো এদ্দিনে রিক্সা ঠেলে হন্যে হতে হয়? এই আপনিই একমাত্র আমার ক্ষমতায় বিশ্বাস রেখে ভেলকি দেখতে চাইলেন। নয়তো সচরাচর কেউ রাজী হয় না।
- আপনার কথাগুলো সব বুঝলাম না। তবে আপনাদের ভাবনা যে উচ্চমার্গের হতেই হবে, এবং তা সাধারণের বোধগম্য হবেই বা কেন! আচ্ছা, রিক্সা চালানোটা জাস্ট জনগণের চোখে ধুলো দেওয়া, তাই তো? এই রিক্সা হচ্ছে আপনার হিমালয়। ঠিক বুঝেছি তো?
- এই রিক্সা। এই রিক্সা আমার জেলখানা বলরামবাবু। সে কথা থাক। যে কথা দিয়ে আপনাকে এদ্দূর ধরে আনা। সে ভেলকিটা আপনাকে দেখিয়ে দিয়ে হবে।
- থ্রিলিং। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে স্যার, আই মীন, রিক্সাদা। সত্যিই আমায় ভূত হওয়ার অভিজ্ঞতা টের পাওয়াবেন? উফ! দারুণ!
- ব্যাপারটা তেমন দারুণ নয় বলরামবাবু। যন্ত্রণারও বটে। ভাবুন। মানুষ মরে ভূত হয়। কিন্তু আপনি ভূত হতে চলেছেন মরার ব্যাপারটা উহ্য রেখে।
- যন্ত্রণা? ফিজিক্যাল পেন?
- শরীর বেচারি আর কতটুকুই বা ব্যথা ধারণ করতে পারে। আপনি প্রস্তুত?
- কোন যাগযজ্ঞের দরকার হবে না? কোনও হিংটিংছট? আর ইয়ে, ওই ব্যাপারটা মনে আছে তো?
- কোন ব্যাপার?
- ভূতের অভিজ্ঞতা হয়ে গেলেই ফের মানুষ হয়ে যেতে হবে কিন্তু আমাকে। এই দিন দুয়েকের মামলা। তারপরেই স্কুল খুলছে। আমি ইংলিশের ক্লাস নিই, গোবর্ধন মেমোরিয়াল হাইস্কুলে। কামাই করার একদম উপায় নেই, বুঝলেন?
- আপনার স্কুল কামাই হবে না বলরামবাবু। পাঁচুর যেমন রিক্সা চালানো বন্ধ হয়নি।
- পাঁ...পাঁচু কে?
- পাঁচু? রিক্সাওলা। ভূত হয়ে কেমন লাগে, সে'টা জানার লোভ ওরও হয়েছিল জানেন। এই, এতগুলো তালগাছের যে কোনও একটাতেই পাঁচুকে পাবেন। খুঁজে নেবেন কেমন? আমার আদত নাম গোকুল চ্যাটার্জী। ক্লাস নাইনে এক তান্ত্রিকের চ্যালা হয়ে ঘর ও দেশ ছাড়ি। বেয়াল্লিশ বছর বয়সে তিব্বতে গিয়ে এক লামার থেকে শিখে এসেছিলাম এ ব্যাপার। বিশ বছর কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছিল। মুশকিল হচ্ছে একবার কোনও দেহ ছাড়লে, তাতে আর ওয়াপিস যাওয়া যায় না। দেহগুলো নষ্ট হয়। আমারটাও সে'ভাবেই গেছিল।
- আ...আপনার সে'ভাবে... কী গেছিল?
- দেহটা। পাঁচু আমার ফ্যামিলি-রিক্সাওলা ছিল। ভূত হওয়ার লোভে গিনিপিগ হতে আপত্তি করেনি। তবে তখনও ভাবিনি যে ওকে ওর দেহ ফেরত দিতে পারব না। কিন্তু কাহাতক ভালো লাগে বলুন তো রিক্সা টানতে? কাজেই এদ্দিন পর যখন কেউ ভূত হতে রাজী হলো, তাও আবার সে যখন ইংরেজির মাস্টার, লোভ সামলাতে পারলাম না। আপনাদের তো সুখের চাকরী মশাই!
- আপনি যে কী বলছেন...আমি কিছুই...।

***

কোন কিছু ঠাহর করার আগেই বলরামবাবু টের পেলেন তিনি পতপত করে হাওয়ায় উড়ছেন। প্লাস্টিকের প্যাকেটের মত রাতের হিম মাখানো আবছা আলোয় ভেসে চলেছেন কনকনে হাওয়ায়। ভাসতে ভাসতে একটা তালগাছের মাথায় চলে এসেছিলেন প্রায়। নিজের যেন কোনও ওজনই নেই। গলায় স্বরও নেই। অসীম, অমোঘ নিশ্চিন্দি। অথচ এক বিকট কাঁপুনি নির্ভার দেহ জুড়ে। অবশ্য পরক্ষণেই টের পেলেন , দেহ-টেহ কিস্যু নেই। তিনি ভাসছেন এক রাশ বেপরোয়া হাওয়ার মত। এক পশলা মন কেমন করা গন্ধের মত। বুকে ছ্যাঁত ধরানো এক মুঠো নীলচে আলোর মত।

অত ওপর থেকেও বলরামবাবু স্পষ্ট দেখতে পারছিলেন পাঁচু রিক্সাওলার নিথর দেহ মাটিতে চিৎপাত হয়ে পড়ে। আর অবিকল তাঁর চেহারার মত কেউ রিক্সা চালিয়ে রওনা দিয়েছে শহরের রাস্তা ধরে।