Friday, July 15, 2016

ফেরত


ভরদুপুরের গন্ধটা মনে করার চেষ্টা করছিল দীপু। কাজটা সহজ তো নয়। এখন রাত। ছাদে পাতা মাদুরে বছরের এ'সময়টা দানা দানা শিরশির জমতে শুরু করে। বাতাসে ইতিউতি ভাসে পাশের বাড়ির মুসুরির ডালের ফোঁড়ন আর নিচ থেকে উড়ে আসা রিক্সার ক্যাঁচরম্যাচর  পোঁপাঁ।

এ সময়ে এ মাদুরে গা এলিয়ে মনের মধ্যে দুপুর টেনে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। তবু। দীপু চেষ্টা করছিল। ছোটমামার পাল্লায় পড়ে গত আড়াই মাস ধরে যোগব্যায়াম করছে দীপু। দিনে আধঘণ্টা করে। যোগার্জিত যাবতীয় কন্সেন্ট্রেশন মুঠো করে ধরে রাতের ছাদে দুপুর নামাতে চাইছিল দীপু।

রাতের ছাদের শীতমনস্কতা অনেকটা পাশ কাটিয়ে দিতে পেরেছিল সে। বিলুদের মেজানাইন ফ্লোরের ঘরটার রোদ্দুর পিঠ অনুভব টানতে চাইছিল দীপু।

আনন্দবাবু কেমিস্ট্রির মাস্টার হলেও, মিস্ট্রিতে তার মাস্টারি কম ছিলনা। তিনি বলেছিলেন "স্মৃতির বাজার! বুঝলে হে দীপুকুমার। বাপ মা বন্ধুরা সেখানে আনাজপাতির মত ঝুড়িতে ঝুড়িতে গিজগিজ করছে। এ মুহূর্ত হাঁকছে 'ইধর আইয়ে, ফ্রেশ হ্যায় সব কুছ"। তো ও মুহূর্ত স্মৃতির আনাজে জল ছিটিয়ে বলে "এদিকে আসেন কত্তা। দ্যাখেন! দ্যাখেন! টাটাকা কাকে বলে"। সে বাজারে। বুঝলে দীপুকুমার, সেই স্মৃতিবাজারে, সেরা বাজারের থলি হচ্ছে দুপুর"।

দীপু দুপুর টানছিলে। যোগবল অতি তাগড়াই জিনিস। এ রাতেও দুপুরে রোদের চিড়বিড় অনুভূত হতে শুরু হয়েছিল তার স্যান্ডো গেঞ্জি ভেদ করে।

ছাতের অবয়ব পালটে অন্যমনস্ক বারোয়ারী তলা ভেসে উঠছিল। দীপু ধুকপুক টের পাচ্ছিল। ছোটবেলা আর পরিপাটি শাড়ির কুচির অমিল চড়াত চড়াত করে ঝিলিক মারছিল গলা বুক দিয়ে। আজকের হঠাৎ দুপুর দিব্যি রাতের ছাদের প্ল্যাঞ্চেটে গোঁত্তা খাচ্ছিল।

বেমক্কা টেনে ধরা আঙুলের ডগায় অঙ্ক পরীক্ষার হলের বেয়াদপি সুবাস টের পাচ্ছিল দীপু।

"আমি এদ্দিন পর এলাম। এসেই দুপুর পালিয়ে দেখা করতে এলাম তোর সাথে। তুই খুশি হসনি বাবু?"।

দীপু অসহায় অর্জুনের মত নীল গোলাপি আঁচলের ফুরফুরের দিকে তাকিয়ে নতজানু বোধ করে।

হাওয়ায় তিরতির ভেসে যায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"

অর্জুন না দেওয়া চিঠির গাণ্ডীবে মুখ ঢাকে, তার বলা হয়ে ওঠে না যে "এদ্দিন পরে আসা"র গাছ-আকাশ-পাখি তার দেখতে নেই। দীপার্জুনের শ্যেনচক্ষুতে রয়ে যায় শুধু অব্যক্ত  "রিটার্ন টিকিট কবে? রিটার্ন টিকিট কবে?"।

বাতাসে ওদিক  গামছা নরমে ভেসে বেড়ায়
"তুই খুশি হসনি বাবু?"
"তুই খুশি হসনি বাবু?"।

Thursday, July 14, 2016

সেল্‌স

**প্রথমত**

- হ্যালো টিএসএম নম্বর ওয়ান!
- হ্যালো বস্‌। ইয়ে, কতবার বলেছি আমায় টিএসএম বলে না ডাকতে?  প্রেসিডেন্ট বলুন। সক্কলে আমায় প্রেসিডেন্ট বলে ডাকে।
- উফ। এই ডেসিগনেশন ডেসিগনেশন করেই গেলে তোমরা। বলি এদিকে সেল্‌স ফিগার তো অল ডাউন সাউথ!
- না মানে ইয়ে..., বস...মানে...ইয়ে...। 
- ইয়ে মানে কী হে? ইয়ে মানে কী? স্টকের অবস্থা দেখা আছে? গোডাউন ভরাট, এক ইঞ্চি জায়গা নেই। সেল্‌স ফিগার প্রতি মাসে ওয়ান ওয়ে বাঞ্জি জাম্প দিচ্ছে। 
- না মানে ইয়ে...।
- বোঝ! আবার ইয়ে!।  শোন। ইনভেন্টরি কস্ট কোথায় গিয়ে ঠেকছে কোন আইডিয়া আছে?
- ইয়ে...।
- আর একবার ইয়ে বললে কোতল করব! 
- ইয়ে...সরি। 
- মনে দিয়ে শোন টিএসএম ওয়ান...। 
- প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট বলে ডাকুন না। 
- ধেত্তেরি ছাই। প্রেসিডেন্ট! মনে দিয়ে শোন। হাজার হাজার বোমায় ঘুণ, জং, ধুলো পড়ছে। বোমা ফ্যাক্টরিতে স্টকলস আমি বরদাস্ত করবো না। নেক্সট কোয়ার্টারের মধ্যে সেল্‌স ফিগার ইম্প্রুভ না করলে...চাকরী নট্‌ করতে হেসিটেট করব না কিন্তু। ডিয়ার প্রেসিডেন্ট...। মনে থাকে যেন!  
- অমন কথায় কথায় থ্রেট কেন স্যার! 
- থ্রেটের এ আর কী দেখলে! ব্যাটাচ্ছেলে প্রেসিডেন্ট, বলি নতুন মার্কেটগুলোয় ডেমোক্রেসি ছড়িয়ে দেওয়ায় দিকে তোমার মন নেই কেন? কতলোক হাহাকার করছে চাদ্দিকে; থোড়া ডেমোক্রেসি লাও, দো বুঁদ ডেমোক্রেসি লাও! ডেমোক্রেসির এত ডিম্যান্ড, তবুও আমার বোমা ফ্যাক্টরি স্টক তুমি ক্লিয়ার করতে পারছ না প্রেসিডেন্ট? 
- এই কোয়ার্টারে আপনাকে ডিজ্যাপয়েন্ট করছি না স্যার। একটু সবুর করুন না। পাইপলাইনে ডেমোক্রেসি গিজগিজ করছে। মার্কেট ইজ অল সেট। 
- বলছো?
- কমিট করছি। স্টক লস ফস নিয়ে ভাবা বন্ধ করুন তো। ক্যাচলাইন তো আছেই; ফেলো বোমা, মাখো ডেমোক্রেসি। 

**দ্বিতীয়ত**

- হ্যালো টিএসএম নম্বর টু!
- হ্যালো বস্‌। ইয়ে, কতবার বলেছি আমায় টিএসএম বলে না ডাকতে?  গুরু। সক্কলে আমায় গুরু বলে ডাকে।
- এই এক রোগ! গাধা কে গাধা বলা যাবে না! আর ধেত্তেরি! বলি আমার বন্দুক কোম্পানি যে লাটে উঠতে চললো! গত দুই কোয়ার্টারের সেল্‌স অ্যাট অল টাইম লো! গুদামঘর উপচে পড়ছে। বন্দুকে জং, কার্তুজের খোলে আরশোলা জমছে। বলি ধর্ম-টর্মর এত অবাধ মার্কেট, চাদ্দিকে এত হাহাকার কয়েক লিটার ধর্মের জন্য! অথচ এই তামাম মার্কেট থাকতেও আমার বন্দুক কারখানায় স্টক লস! গুরু, এ আমি বরদাস্ত করব না। কিছুতেই না। 
- এই কোয়ার্টারে আপনাকে ডিজ্যাপয়েন্ট করছি না স্যার। একটু সবুর করুন না। পাইপলাইনে ধর্ম উথলে উঠছে। মার্কেট ইজ অল সেট। 

Sunday, July 10, 2016

অর্ডার

- মাটন কষা আর কাজু কিসমিস পোলাও।
- সাথে আর কিছু স্যার?
- সাথে?
- আজ্ঞে?
- ইয়ে। সাথে। মানে। আর এক বাটি।
- এক বাটি কী স্যার?
- মাটন। অবভিয়াসলি।
- তার আগে স্টার্টারে কিছু?
- স্টার্টার?
- ইয়ে স্যার...। তন্দুর বা...।
- বাটি। ওয়ান মোর। আগে এক বাটি দিয়ে যান। পরে এক প্লেট পোলাও আর তার সাথে দু'বাটি।
- ও। আচ্ছা। অর্ডারটা একবার রিপিট করছি স্যার। তিন বাটি মাটন। এক প্লেট পোলাও। 
- এক বাটি আগে। পরের দু'বাটি অ্যালং উইথ পোলাও।
-  আর ইয়ে...ডেজার্টে স্যার...আমাদের এখানের হট গুলাবজামুন বেশ পপুলার। কিংবা টুটিফুটি, জলেবি উইথ রাবড়ি...।
- হেহ্‌।
- স্যার? নো ডেজার্ট।
- হেহ্‌।
- সেখানেও বাটি? 
- ওয়াটের সাহেব। বাটি ছাড়া। সমস্তই। ডেসার্ট। 
- শুরুতে এক বাটি। পোলাওয়ের সাথে দুই। শেষ পাতে এক। রাইট স্যার?
- ইউ ক্যান নেভার গো রঙ। ক্যুইক ক্যুইক। প্লিজ। 

স্পেশ্যাল স্কিল্‌স

- আইয়ে। 
- আমি?
- জী! সাহাব বুলায়ে হ্যায়।
- আপনি শিওর? আমাকেই ডেকেছেন?
- আপ হি অনির্বাণ মিত্রা, নহি?
- হ্যাঁ, আমিই। কিন্তু...। কিন্তু আমার ইন্টারভিউটা খুবই খারাপ হয়েছিল। আমার সেকেন্ড রাউন্ডে চান্স পাওয়ারই কথা নয়...। 
- অন্দর যাকে বোল দিজিয়ে। ওহি বাত।
- আমাকেই ডাকা হয়েছে তো?
- আইয়ে। 

**
- অনির্বাণ...। 
- আজ্ঞে মিত্র। মিট্টার লেখা, ইংরেজিতে। 
- আপনি জানেন আপনাকে কেন ডেকেছি?
- না। জানি না। ইন ফ্যাক্ট আর্দালিবাবুকেও তাই বলছিলাম। আমার সেকেন্ড রাউন্ডে চান্স পাওয়ারই কথা নয়।
- এ'টা সেকেন্ড রাউন্ড অফ ইন্টারভিউ নয় অনির্বাণবাবু। 
- তবে?
- চা না কফি?
- আজ্ঞে?
- চা না কফি? না কোল্ড ড্রিঙ্কস?
- চা। 
- দুধ, চিনি? 
- সমস্ত চলে। এবারে বলুন। চাকরী দেবেন না, কিন্তু তবু আমায় সকাল থেকে বসিয়ে রেখে দুপুরে আবার ডাকার মানেটা কী?
- সেকেন্ড রাউন্ড ইন্টারভিউ নেব না বলেছি। চাকরী দেব না কে বলেছে?
- মানে?
- মানে দিজ জব ইজ ইওর্স। 
- মাইন? আমার? হাউ?
- আপনি বায়োডাটাতে স্পেশ্যাল স্কিল্‌সে লিখেছেন...আপনার ডানা আছে। আপনি প্রয়োজনে উড়তে পারেন।
- ট্রু। কিন্তু এই কাজে...। 
- ট্রু হোক না হোক। আপনি এই কাজের জন্য টোটালি সুইটেব্‌ল।
- হুম?
- উড়তে পারাটা বলিউড গসিপ রিপোর্টারদের জন্য একটা ফেনোমেনাল কোয়ালিটি অনির্বাণ। অবিশ্যি উড়ন্ত কেউ এই ফ্র্যাটারনিটিতে কখনও আগে জয়েন করেনি। তবে উড়তে পারা ডেফিনিটলি ভালো জিনিস। উড়লে ভালো কিছু হবে বলেই মনে হয়। 
- ওহ্‌। রিয়েলি? তবে...।
- তবে কী? অনির্বাণবাবু? এই নিন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। ওয়েলকাম টু  আনন্দকল্লোল ম্যাগাজিন। 
- না মানে...এ'টা যদি সত্যি না হয়? আমার ডানা দেখতে চাইবেন না? আমি উড়ি কিনা, টেস্ট করে দেখবেন না?
- অনির্বাণ মিত্তির। শুনুন। ডানা থাকলে আপনি উড়বেন, বঢিয়া বাত। ড্রোন হয়ে গসিপ জোগাড় করে আনবেন। আর আপনার ডানা না থাকলে? আপনি উড়তে না পারলে? অউর ভি বঢিয়া। ট্রুথ ফ্লাইজ, বাট সাকসেস্‌ ফ্লাইজ হাইয়ার। নিজের বায়োডেটায় এত বড় বোমা ফাটাতে পেরেছেন, সে গাঁজা ঝাড়ার সাহসের জন্যেই এ চাকরী আপনারই। এই কাজে এই তো চাই। এ ফলস বোমার দাম এ ক্ষেত্রে হাজার খানা ডানার চেয়েও বেশি মিত্তিরবাবু। আসুন, এই অফার লেটারটা অ্যাকনোলেজ করে দিন এবার।  

Sunday, July 3, 2016

মাসাজ

নবরত্ন তেল দিয়ে পাড়ার সেলুনে মাথা মাসাজ করাচ্ছিলেন দত্তবাবু।
বিধুর হাতের তালু আর আঙুলে তালবোধ আছে, মাথা থেকে আরাম উপচে ঘাড় বেয়ে নেমে আসে।

প্রত্যেক শনিবার সন্ধ্যের রুটিন।

দত্তবাবুর শুধু মনে হয় বিধুর বডি আর দুই হাতের সঙ্গে মাথাটাও যদি আসতো এ পোড়ো সেলুনে, তবে বেশ হতো।

ওদিকে বিধুর আবার ঘোর আফসোস,  দত্তবাবু শুধু নিজের ঘাড় মাথা নিয়েই দুলতে দুলতে হাজির হন ফি শনিবার। বডি আনলে কী এমন ক্ষতি হত? মালিশ করতে করতে ঘাড় থেকে দিব্যি পিঠে নেমে আসা যেতো।

**

নিমতলা বাজারের স্টাইলিশ জেন্টস সেলুনের মালিক বিধু দত্ত রেলে এমন ভাবে কাটা পড়েছিলেন যে মুণ্ডু উড়ে পড়েছিল দেড়শো মিটার দূরে। ফলে সে মুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যায়নি, চিতায় চড়েছিল মুণ্ডুলেস ধড়।

**

শেষ কাস্টোমারের খেউরি করে মাথা মালিশ করছিলেন বিধু দত্ত, তখনই বুকটা হুহু করে উঠলো।
"আহা, কেউ আমায় যদি এমন নবরত্ন তেল দিয়ে মালিশ করে দিত হপ্তায় একবার। এমনটাই। যত্ন করে"।
বুকের হুহু তাড়িয়ে মালিশে মন দিলেন বিধু দত্ত। আজ সকালে আবার তাড়াহুড়োয় বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় টর্চটা ফেলে এসেছেন তিনি, ফেরার সময় অন্ধকার রেলগেট পেরোতে বড় ঝকমারি।

Saturday, July 2, 2016

মাসকাবারি

- হ্যালো।
- কী ব্যাপার? কল করেছো কেন?
- নিপা! আ স্মল হেল্প!
- আমি রাখছি।
- না, প্লীজ! এক্স ওয়াইফ হয়ে এতটুকু হেল্প করবে না?
- সদ্য এক্স হাজব্যান্ড হয়ে তোমার এত সাহস হয় কোথা থেকে?
- মাইরি। এসেনশিয়াল।
- কী ব্যাপার?
- বলছিলাম। ইয়ে। মানে মাসকাবারির গতমাসের ফর্দটা জেরক্স করিয়ে রেখেছিলাম। জানতাম এ মাসে দরকার হবে, সব আইটেম কোয়ান্টিটিতে ডিভাইডেড বাই টু করে নিলেই হলো। কিন্তু গতকাল পিক পকেট হয়ে সমস্ত প্ল্যান গড়বড় হয়ে গেলো বুঝলে!
- বাই!
- প্লিজ কেটো না।
- লিস্ট হারিয়েছো! তো আমি কী করবো?
- বেসিকগুলো বলে দাও। প্লীজ।
- শাট আপ। আমি এখনও অফিসে। কোয়ার্টারলি রিভিউ। ফোন রাখো।
- মাইরি। আমি ভেসে যাবো।
- বাঁচব। তুমি ভেসে গেলে।
- ক'কিলো চিনি? আড়াই? বারো? বাইশ?
- বাহাত্তর।
- হাতি কাদায় লটপট করছে বলে হ্যাটা করবে?
- দিন দিন হাতিই হচ্ছ!
- আর অরিন্দম কী? নীল তিমি?
- সে অন্তত মাসের জন্য বাইশ কিলো চিনি বয়ে বাড়ি আসবে না!
- বেশ করব বাইশ কিলো নেবো। আমি বত্রিশ নেবো।
- নাও। তোমার মহুয়াকে এক স্যুইমিং পুল চিনি গুলে সাঁতার কাটিও।
- আমার পুল, আমার চিনি। মহুয়া তানিয়া যাকে পাবো তাকে চুবনি খাওয়াবো। তারা কেউ অন্তত অরিন্দমের মত ফাঁপা কলসি নয়।
- ইডিয়ট!

**

- আজ ডিনারে কী?
- চিনির পোলাও, চিনি কষা আর চিনির স্যুফলে।
- শোনো। একটা লিস্ট হোয়াটস্যাপ করেছি। কালকে নিয়ে নিও।
- পেয়েছি। থ্যাঙ্ক ইউ।
- কোয়ান্টিটিগুলো ডিভাইডেড বাই টু না করলেও চলবে।
- হুঁ।
- রাখি?
- যেমন রাখবে, তেমনটাই রহেগা।
- গুড নাইট।
- সেই।

Monday, June 27, 2016

জাগ্রত

মানিব্যাগে টাকার হিসেব কখনও গড়বড় হয়না অনুপমের। পকেটের ভাঁড়ারে আটআনার হেরফেরও তার নজর এড়িয়ে যেতে পারে না।  অতিমাত্রায় হিসেবী বলে তার সামান্য বদনামও রয়েছে। অনুপম অবশ্য গায়ে মাখে না। এ যুগে হিসেবী না হলে পদে পদে ঠকতে হবে। আর ঠকার মধ্যে আর যাই হোক, বুদ্ধিমত্তা নেই।

কিন্তু আজ সামান্য গড়বড় দেখা দেওয়ায় মেজাজটা গেল বিগড়ে। বাসের ভাড়া মেটানোর পর মানিব্যাগে থাকা উচিৎ ছিলো একটা পাঁচশো টাকার নোট, তিনটে একশো টাকার নোট, দু'টো পঞ্চাশ টাকার নোট, একটা কুড়ি টাকার নোট আর আটটা দশ টাকার নোট। সাথে তেরো টাকার খুচরো কয়েন। সাকুল্যে থাকার কথা এক হাজার তেরো টাকা। কিন্তু রয়েছে এক হাজার সতেরো টাকা। অর্থাৎ দু'টো দু'টাকার কয়েন বাড়তি। বোঝো!

চার টাকা এলো কোথা থেকে? কথা চার টাকা নিয়ে নয়। কথা বেশি কম নিয়েও নয়। কথা হচ্ছে, এ'ভাবে হিসবে গড়বড় হবে কেন? নিজেকে চড় মারতে ইচ্ছে হচ্ছিল অনুপমের। আজ চার টাকা বেশি রয়েছে, কাল চারশো টাকা কম থাকবে অথচ সে টেরটিও পাবে না।

ডিনারের পর পড়ার টেবিলে লেটার প্যাড, ডটপেন আর ছোট ক্যালকুলেটর টেনে নিয়ে বসলে সে। এই গড়বড়ের শেষ দেখে ছাড়তে হবেই।

**

বিরক্তির সাথে যখন লেটার প্যাড আর কলম ছুঁড়ে ফেললে অনুপম তখন রাত পৌনে দু'টো। সিগারেট ধরাতেও ইচ্ছে হলো না, বিরক্তির স্বাদটা মুখে একটানা গোঁত্তা খেয়ে চলেছে। চার টাকা! এলো কোথা থেকে?
বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলো অনুপম। উপায়ন্তর না দেখে মানতই করে বসলো মনে মনে ,
"মা কালী, এ হেঁয়ালি কাটিয়ে দাও। আগামী কালই চার টাকা অফিসের পাশের মন্দিরের প্রণামীর বাক্সে ফেলে আসবো। লাঞ্চের সময়। মাইরি। বাঁচিয়ে দাও মা। এ সাসপেন্স না কাটলে ব্লাড শুগার বেড়ে যাবে। মা! মা গো!"।

**

ভোর চারটের সময় বাথরুমের যাওয়ার জন্য উঠেই এক ঝটকায় অনুপমের মাথার জট কেটে গেলো। আজ ক্যান্টিনে লাঞ্চ শেষে কী খেয়াল হলো একটা বাড়তি রসগোল্লা কিনে খেয়েছিলেন। পাঁচ টাকার।  কিন্তু ক্যাশে বিল করানোর সময় সে'টা বাদ গেছে।

প্রবলেম সল্ভ হয়েও হলো না। চার টাকার এক্সেস্‌ থেকে এক টাকার ডেফিসিট। মা তারা ফার্মেসির ক্যালেন্ডারের মা কালীর দিকে তাকিয়ে এক রাশ বিরক্তি ছুঁড়ে দিলে অনুপম।

**

তেঁতুলতলা কালীবাড়িতে অন্তত তিরিশ বছর ধরে পুরোহিতগিরি করছেন বিশ্বনাথবাবু। কিন্তু এমন বিদঘুটে কাণ্ড তিনি বাপের জন্মে দেখেননি। ভোরবেলা এসে মন্দিরে ঢুকতেই দেখেন প্রণামী বাক্সের তালা ভাঙা! অথচ সেখান থেকে টাকা পয়সা বিশেষ সরেছে বলে মনে হলো না। শুধু নজরে এলো একটা চিরকুট

"পুরোহিতমশাই,
মা কে জানাবেন এগ্রিমেন্ট মত এক টাকা নিয়ে গেলাম।  ডেফিসিট কম্পেনসেটেড। বুঝতেই পারছেন টাকাটা ইম্পরট্যান্ট নয়, ইম্পরট্যান্ট হলো ব্যাল্যান্স। আপনি বেশি চিন্তা করবেন না। মা জানেন। 
ইতি, জাগ্রত ভক্ত"।

বাবুর ফোন

- ঘুমোলি?
- না।
- ঘুমোবি না?
- ঘুম আসছে না। তুই ঘুমোসনি কেন?
- এই। ফোন রেখেই শোব।
- বাবু!
- হুঁ।
- আমার কিছু হয়ে গেলে?
- কী হবে?
- খুব খারাপ কিছু একটা। আমি কী না একা! খোকার কী হবে?
- তোর কিছু হচ্ছে না আপাতত।
- যদি হয়?
- খোকা আমার কাছে থাকবে।
- বাহ্‌ রে। তুই কত ব্যস্ত।
- খোকা আর আমি কাজ ভাগ করে নেব'খন।
- গান শোনাবি? খোকাকে? আমি না থাকলে?
- বন্ধু তুমকো ইয়ে গানা সুনায়েগা বিকেলবেলা।
- ঘুরতে নিয়ে যাবি? শনিবার বিকেলে? রোব্বার সকালে? খোকা খুব ঘুরতে ভালোবাসে। ।
- রোব্বারে ভিক্টোরিয়ায় লুচি আলুর দম। পুজোর ছুটিতে দার্জিলিং, গরমের ছুটিতে নৈনিতাল। কভি কভি পুরী। মন খারাপে খড়দার গঙ্গা।
- খোকা অঙ্কে কম নম্বর পেলে?
- দু'জনে প্যারামাউন্টে গিয়ে দু'পেগ ডাব শরবতে দুঃখ ভুলবো।
- খোকার জ্বর হলে ওর বায়নার শেষ থাকে না। 
- জলপট্টি আর পান্নালাল। ক্রসিনের বাপ।
- খোকার কাজু কিশমিশ পোলাও বড় প্রিয়।
- খোকা বেলা দে থেকে পড়বে। পোলাও রেসিপি। লাউড্‌লি। আমি স্যান্ডো গেঞ্জি পাজামায় রান্নাঘর দাপিয়ে বেড়াবো।
- বড় চিন্তা রে আমার। খোকার জন্য। সে আমায় ছাড়া ঘুমোতেই চায় না।
- তোর শাড়ি দিয়ে কাঁথায় মলাট দেবো। সে কাঁথা টেনে খোকা আমি ঘুমিয়ে কাদা হবো।
- বাবু।
- হুঁ।
- তুই বড় ভালো। খোকা তোর মত হবে?
- যাস না। তুই গেলে আমরা যদি বখে যাই?