Tuesday, February 19, 2019

কাশ্মীরি পরোটা

প্রবল দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। আর মাঝেমধ্যেই মাথার মধ্যে ভাবনাচিন্তা উঁকি দিচ্ছে, সে’ ব্যাপারটা মোটে অভিপ্রেত নয়। অফিস যাওয়া, বাড়ি ফেরা, খাওয়াদাওয়া, হ্যাহ্যা, নেটফ্লিক্স, সোফা, বই; এর বাইরে কোনো চিন্তা মগজে ঘোরাফেরা করলেই ভয় হয়; বখে যাচ্ছি না তো?

এই যেমন সকালে পরোটা আর আলুচচ্চড়ি চেবানোর সময় মোবাইলে দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম কাশ্মীরীদের বয়কট করার দাবীতে। কোথাও আবার তাদের ওপর আক্রমণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। এগুলো কি গুজব? হতে পারে; আজকাল অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সুপ্রিম কোর্ট বা মা মাথায় গাঁট্টা মেরে না বললে কোনো কিছুই মেনে নিতে মন সরে না। তবে এর সামান্য অংশও যদি সত্যি হয় তা’হলে ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে খুব গোলমেলে; অন্যায়ও বটে।

এতটুকু ভেবেই পরোটা চেবানো থামালাম। মাথায় একটা চিন্তা এসেছে; কাজেই টুক করে সে’টা সোশ্যাল মিডিয়াতে যদি না লিখি তবে সে চিন্তা ভূত হয়ে মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাবে।  সাতপাঁচ ভেবেই একটা হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপে লিখেছিলাম; খামোখা কাউকে পেটানো বা কেউ অমুক এলাকার মানুষ বলেই তাকে বয়কট করব – ব্যাপারটা নেহাত সরেস নয়। আমি বাঙালি বলেই কেউ যখন আমায় আলসে বলে তখন গায়ে একটু চিড়বিড় করে বইকি (ব্যক্তিগত লেভেলে আমি আলসে হতে পারি, তাই বলে ‘বাঙালি’ বলে খোঁটা দেবে? স্যাট করে সোফা থেকে দু’টো সঞ্জীবের লাইন ছুঁড়ে প্রতিবাদ করব না?)।

হোয়্যাটস্যাপে বন্ধুদের একটা গ্রুপে লিখে ফেললাম; “কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”।  
ট্যাং করে এক বন্ধুর উত্তর এলো;
“দেশের কথা ভাববি কেন রে? তোকে তো আগে সেকু ভাব দেখাতে হবে”।
দেশ, সেকু এ’সব প্রসঙ্গ এসে পড়ায় নড়েচড়ে বসতে হল। দেড়খানা পরোটা প্লেটেই পড়ে রইল; আমি হোয়্যাটস্যাপে মন দিলাম।
বললাম;
“দেশের আবার কী হল। কাশ্মীরিদের দেখলেই রেগে উঠতে হবে কেন”?
ফটাশ করে উত্তর এলো;
“তোকে তো গিয়ে জঙ্গিদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয় না! তুই এ’সব কথা বলতেই পারিস”।
মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেল; মিইয়ে গেল পরোটা, তিতকুটে হল চচ্চড়ি।
প্রমোশন ইনক্রিমেন্ট নিয়ে রগড়ে থাকা ধান্দাবাজ চাকুরে মানুষ। কাশ্মীরিদের ভালোমন্দ নিয়ে চিন্তা গেল গুবলেট হয়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে বললাম;
“আহ্‌, এতে সেনা আর দেশের কথা এলো কেন। দেশের আমি, দশের আমি। আমি তো দেশের পক্ষেই রে ভাই। শুধু বলছিলাম...”।
কিন্তু ততক্ষণে ঘুড়ি সুতো ছিঁড়ে গেছে উড়ে আর লাটাই লটকে ছাতে।
“তুই কী বলতে চেয়েছিস সে’টা আমি বুঝিনি ভাবছিস”?, হাড়হিম করা উত্তর।
“না না, ও মা”, মনে হল আক্রমণের চেয়ে কাকুতিমিনতিতে বেশি কাজ হবে, “বিশ্বাস কর ভাই আমি গোলমেলে কিচ্ছু বোঝাতে যাইনি”।
“তোদের মত লোকের জন্যই আজ দেশের এমন বিপদ। তোদের জন্যই আজ শত্রুরা লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠে কিতকিত খেলছে। তুই মনে মনে এ’টাই তো চাস, যে ভারতের মাথা খেয়ে পাকিস্তান চাঙ্গা হোক। সে’টা চাইলেই তো তুই নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল বলে প্রমাণ করতে পারবি”।
“সর্বনাশ! না না না ! আমি আদৌ তা বলিনি বা বলতে চাইনি”।
“তোকে তো শত্রুর আরডিএক্স হজম করতে হয় না। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে পা দোলাবি আর বড় বড় বাতেলা ঝাড়বি দেশের বিরুদ্ধে”।
“আরে আমি শুধু বলতে চেয়েছি...”।
“সব বুঝি। সব বুঝি। ছিঃ”।

“ছিঃ”খানা হোয়াটস্যাপ থেকে উঠে এসে বুকে অ্যাসিডিটি হয়ে ঝরে পড়ল। বলতে ইচ্ছে হল “আমি শুধু বলেছি যে কাশ্মীরিদের গণ-বয়কট বা মারধোর করা অনুচিত”। এ’টার মধ্যে দিও কোনো হাতিঘোড়া চিন্তা পাচার করতে চাইনি, বন্ধুটিকে এ’টাও বলা হল না যে “হাতের কাছে কাশ্মীরি পেলে তুইও অকারণ তাঁর গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে যাবি না কারণ তুই উন্মাদ নোস”।
তবে প্লেটে যেহেতু দেড়খানা পরোটা আর পেটে সামান্য খিদে তখনও অবশিষ্ট ছিল, তাই আর কমনসেন্স নিয়ে বেশি ফেরেব্বাজি না করাটাই সমীচীন মনে হল। মিষ্টি করে বললাম;
“থাক না ভাই এ’সব কাশ্মীর দেশ আর আরডিএক্স। তার চেয়ে বরং চ’ একদিন একটু অলিপাবে ঘুরে আসি। কদ্দিন ভালো করে আড্ডা দেওয়া হয় না। কী বলিস”?
অমনি সে বন্ধুর রাগ গলে জল আর ক্ষোভ ফুড়ুৎ করে হাওয়া।
আমাদের প্লেটে পরোটা, উইকেন্ডে মদ আর মেজাজে ‘এনটাইটেলমেন্ট’ যদ্দিন আছে;  কোনো চিন্তা নেই।  

Monday, February 18, 2019

ভবিষ্যতের ভূতের তান্ত্রিক



- কী ব্যাপার বলুন তো দাদা, বাসে উঠে থেকে দেখছি আপনি আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছেন।

- দেখুন মশাই, দৃষ্টিতে যে কাম নেই, সে'টা আশা করি বুঝতে পারছেন।

- তাই বলে জানা নেই, আলাপ নেই; অমন বিশ্রী ভাবে তাকিয়ে থাকবেন?

- কচু দেখে শুয়োর থমকে দাঁড়াবে না?

- কী? কী বললেন? আমি কচু?

- ওহ, মন্দ লাগল? বেশ,  হিরের ঝিলিক দেখে জহুরির ড্যাবড্যাবে চাউনিটা স্বাভাবিক।

- আপনার মতলবটা কী বলুন দেখি?

- বলছি, তার আগে নিজের পরিচয় দিই। আমি অঘোর দাসমুন্সি।

- আমার নাম..।

- আপনার নামে আমার তেমন দরকার নেই।

- আজ্ঞে?

- আপনার নাম তো এই নশ্বর দেহ আর এই জাগতিক পরিচিতির।  ও দিয়ে কী হবে। বরং আপনার আত্মারামটিকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। ভেরি ইম্প্রেসড। আপনার আত্মার মধ্যে জেনুইন কোয়ালিটি আছে।

- বাপ থেকে বস আজ পর্যন্ত কেউ একবারও বললে না আমার মধ্যে কোয়ালিটি আছে। আর আপনি দেখছি এক্কেবারে আত্মায় ঢুকে পড়লেন। আপনি কি তান্ত্রিকটান্ত্রিক নাকি?

- করেক্ট। উনচল্লিশ বছর ধরে সাধনা করছি। আর জমানোর  শখ অবশ্য গত বাইশ বছরের। নেপালের জঙ্গলে এক কাপালিকের চ্যালা হয়ে তিন বছর ছিলাম। তাঁর আশীর্বাদেই যে'টুকু যা রপ্ত করতে পেরেছি।

- শখ?

- ওই, হবি আর কী। স্টাম্প বা দেশলাই বাক্স  জমানোর মত।

- কী জমানোর শখ? আপনার?

- ওই যে। আপনার মত স্যাম্পেল। রেফারেন্স সহ ডায়েরিতে টুকে রাখি।

- ঝেড়ে কাশুন, আর একটা স্টপেজ পর টালিগঞ্জ, আমি শেখানেই নামব।

- আমার শখ হচ্ছে জ্যান্ত মানুষের আত্মার কোয়ালিটি চেক করে ভবিষ্যতের ভূত চিহ্নিত করা এবং তাঁদের উত্তরণকে ট্র‍্যাক করা।

- এক্সকিউজ মি?

- জার্নাল রেখেছি মশাই। নাইনটি সেভেনে প্রথম ভবিষ্যতের ভূত আইডেন্টিফাই করেছিলাম মেচেদা লোকালে। সে ভদ্রলোক ভূতে কনভার্ট হয়েছিলেন দু'হাজার সাতে। বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরির ডর্মিটরিতে আছেন।

- ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ডর্মিটরি?

- ভূতের অফ কোর্স। সে খোঁজ পেতে আমায় কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি।

- আপনি গাঁজা দিচ্ছেন?

- কোয়ালিটি কল্কে পকেটে রাখি, তবে তা নেহাতই সাধনার স্বার্থে। ইন্টক্সিকেশন নিয়ে আদেখলামো আমার নেই।

- তা আমি যে কোয়ালিটি ভূত হতে চলেছি সে'টা কী করে বুঝলেন স্যার?

- আত্মা ভেঙেচুরে নরম না হয়ে এলে কোয়ালিটি ভূত জেনারেট করা মুশকিল। টানটান ত্যাঁদড় প্রতিবাদী আত্মাকে ভূতে কনভার্ট করা চাট্টিখানি কথা নয়। মৃত্যুর পরেই ত্যাঁদড় তেঁনারা ছটফট করেন মুক্তির জন্য, ফসকে বেরিয়েও পড়েন। কিন্তু মাখনের মত ভূত বনে যান আপনাদের মত ন্যাতপেতে আত্মা।

- ন্যাতপেতে?

- ওই। বাপ টু বস টু নেতা; চোখ বুজে সক্কলকে 'ইয়েস স্যার, আজ্ঞে স্যার' ফায়্যার করে করে যে আত্মা পান্তা ভাতের দলা বনে গিয়েছে। ফ্রীডম অফ এক্সপ্রেশনকে যে আত্মা ডেমোক্রেসির বইয়ে বুকমার্কের মত ঢুকিয়ে রেখে সেই বইকে কিলো দরে বেচে দিয়েছে। স্পষ্ট দেখতে পারছি সে সব গুণই আপনার আত্মার রয়েছে। 

- যত্তসব বাজে বাতেলা। সরুন দেখি, এ'বার আমি নামবো।

- চিন্তা নেই মশাই, ইতিমধ্যে যথেষ্টই নেমে পড়েছেন। আপনার রেফারেন্স টুকে রাখলাম। ভবিষ্যতে ভূতের ডর্মিটরিতেই দেখা করতে আসব, কেমন?

Friday, February 15, 2019

শেষ চিঠি


হাসান সাহেব,

এই আমায় শেষ চিঠি। চমকে উঠলেন? বাবুর্চি ইকবালকে আপনি আপনার ছেলের যাত্রাপথের সঙ্গী করে পাঠালেন তাঁর দেখভালের জন্য; হামদা শহরে এক হপ্তার কাটিয়ে, আপনার নয়নের মণি সরফরাজকে নিয়ে আমার ফিরে আসার কথা। অথচ এখন এই শেষ চিঠির বিশ্রী নাটক..কোনো মানে হয়?

হাসানসাহেব, মিথ্যেটুকু এইবেলা সাফ করে নেওয়াই ভালো। আমার হাতে সময় বড্ড কম; কাজেই বাহারে ভাষায় আটকে থাকলে হবে না। আমার আদত নাম ইকবাল নয়, আমি আরিফ আনসারি। আমার আদিবাড়িও নেয়ামতপুরে নয়, আমার কাগজপত্রগুলো ভুঁয়ো ছিল। হ্যাঁ, আমি আপনাদের ঠকিয়ে এই বাবুর্চির চাকরীটা নিয়েছিলাম; গত দু'বছর ধরে আপনার বিশ্বাস অর্জন করেছি প্রাণপণে খেটে।

লোকঠকানোর মত বিশ্রী পাপ আর হয়না, কিন্তু বিশ্বাস করুন; এ ছাড়া কোনো পথ আর আমার সামনে খোলা ছিল না। আপনাদের পাগলামোর জন্য আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, জানেন হাসান সাহেব? আপনি আর আপনার ছেলে সরফরাজ, আপনারা যে কত গরীব মানুষের সর্বনাশ করেছেন তাদের মাথায় ধর্মের নামে পাগলানো পুরে দিয়ে,  তার ইয়ত্তা নেই। গোটা দেশ ধ্বংস না করলে আপনাদের শান্তি নেই। আপনাদের জঙ্গি সংগঠন ফুলেফেঁপে উঠছে আর বিপ্লবের ঝুটো জিগির তুলে মুনাফা লুঠছে আপনার ও আপনার পুত্রের মত কিছু ঘৃণ্য ব্যবসায়ী। 

আপনার প্ল্যান করা জঙ্গিহানায় আজ থেকে তিন বছর আগে  সেনাবাহিনীর বেয়াল্লিশজন সৈন্য মারা যায়; হামদা শহরে। সেই বেয়াল্লিশজনের মধ্যে একজন ছিল আমার আসিফ। তখন ওর বয়স মাত্র বাইশ, জানেন হাসানসাহেব? বাইশ। ঠিক আপনার ছেলে সরফরাজের বয়সী। জন্মের সময় মা হারানো অভাগাটাকে বড় কষ্টে মানুষ করেছিলাম হাসানসাহেব। বড় আদরে, সৎপথে। কত স্বপ্নকে কত সহজে আপনারা খুন করেছিলেন সে'দিন। কত সহজে।

আমার সরকারের হাত পা বাঁধা থাকতে পারে, বদলা নিতে হলে তাঁদের হাজারগণ্ডা জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু এ বুড়ো বাপের যে অত দায়ভার নেই; আমি স্রেফ প্রতিহিংসার জন্যে এ বাড়িতে এসেছিলাম হাসানসাহেব। আমার গলার তাবিজে লুকিয়ে এনেছিলাম অব্যর্থ বিষ। আপনাকে মারা অত্যন্ত সহজ ছিল, কিন্তু টপ করে মেরে ফেললে ঠিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা যেত না। আমি সরফরাজকে মারতে চেয়েছিলাম, মারতে চেয়েছিলাম হামদা শহরেই; যে'খানে আমার আসিফের দেহটাকে আপনাদের উন্মাদ জঙ্গিরা টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল।

অবশেষে সুযোগ এলো। আজ খুব সহজেই পোলাওতে মিশিয়ে ফেললাম সে বিষ। সরফরাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি ফেরার কথা। ফিরেই ডিনারে বসবে, পোলাওটা তারই ফরমায়েশে রেঁধেছি।

তবে ছোট একটা গোলমাল ঘটেছে। সরফরাজের তিন বছরের মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ছে গো হাসানসাহেব। তারও মা নেই, আমার আসিফের মতই অভাগী সে। দিনে অন্তত দশবার ইকবাল চাচার কাছে গল্প না শুনলে মুন্নির চলে না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে তার মুখ।  আর কী জানেন,  আমার আসিফ যেমন সরফরাজের মত খুনি নয়, আসিফের বাপই বা সরফরাজের বাপের মত ইতর হতে যাবে কেন?

দেশে কত মানুষ না খেতে পেয়ে ঘুমোতে যায়; এ পোলাওকে নষ্ট আমি হতে দেব না। শুধু চিঠিটা লেখা জরুরী ছিল।

পারলে মুন্নির কানে অন্তত জঙ্গিবাদের মন্ত্র জপ করবেন না হাসানসাহেব, সে মন্ত্রের চেয়ে আমার পাতের এ পোলাওয়ে বিষ অনেক কম।

ইতি,

আরিফ।

Wednesday, February 13, 2019

ভ্যালেন্টাইন


- অ্যালগো,ও  অ্যালগো।

- শুনি অনুপবাবু, শুনি।

- সুতপার সঙ্গে তা'হলে..।

- দেখা করতে যাবেন না।

- কিন্তু অ্যালগো...। যদি আমরা...।

- বাইশ হাজার দু'শো বত্রিশটা 'কিন্তু' আর তেরো হাজার সাতশো উনিশটা 'যদি' পেরিয়ে স্প্রেডশিট এ সিদ্ধান্ত এসেছে। উপায় নেই।

- কিন্তু অ্যালগো, সুতপার সে হাসি যে ভুলে যাওয়ার নয়। ওর নরম চাউনি। মনটাও কলাপাতা সবুজের মত সরল।

- কাব্যিক রেফারেন্স। ইলজিকাল কম্পারিসন নোটেড, লাভ রেসিডিউ স্পটেড।  তবে সিম্পটম যে গোলমেলে তা স্পষ্ট। দু'জনেই দীর্ঘদিন একা থেকে থেকে হাঁপিয়ে উঠেছেন। কাল ভ্যালেন্টাইনস ডে। গভর্নমেন্ট বায়োমেট্রিক সার্ভার থেকে আপনাদের দু'জনের হরোমনাল আর সাইকোমেট্রিক রিপোর্ট কম্পেয়ার করে দেখে নিয়েছি। এই ডেট ভালোই লাগবে আপনাদের দু'জনের।

- তবে এত গোলমাল পাকাচ্ছ কেন?

- এই প্রেমে সাত নম্বর ডেট পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনা বিরানব্বুই শতাংশ।   বিয়ের সম্ভাবনা তেতাল্লিশ শতাংশ। বিয়ে হলে বিয়ের সাত বছরের মাথায় রোম্যান্স শেষ হয়ে যাওয়ার চিহ্ন স্পষ্ট; একাশি শতাংশ সম্ভাবনা।  ঝগড়াঝাঁটি,  বিশ্রী ডিভোর্স। জেনেটিক ম্যাপিং বলছে সুপার ইন্টেলিজেন্ট সন্তান। কিন্তু আপনাদের  ভাঙাচোরা প্যারেন্টিং তাকে শয়তানির দিকে ঠেলে দেব; সম্ভাবনা সতেরো শতাংশ। আর সে সন্তানের রাজনৈতিক নেতা হওয়ার সম্ভাবনা তেইশ শতাংশ।  দেশের জন্য, দশের জন্য; সরকারি অ্যালগোরিদম হিসেবে আমি এই রিস্ক মঞ্জুর করতে পারি না।

- অ্যালগো, তুমি তো পারো আমাদের চারপাশের ভ্যারিয়েবল ট্যুইক করে আমাদের বিয়েটা ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে, তা'হলে সন্তানও বখে যাবে না। এমন কী আমাদের সন্তান না থাকলেও..।

- নাগরিকদের স্বার্থে ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্ট করব? এই নিয়ে গত দু'মাসে এই আপনার তৃতীয় অনুরোধ। আগামী এক মাসে আর একটা হলেই তিন দিনের করেকশন ক্যাম্প।

- সুতপাকে ছাড়া আপনি বাঁচবা না।

- ডাহা মিথ্যে। সুতপা আর আপনার আয়ুর যোগাযোগ অঙ্ক কষে বের করলে আপনার হাসি পাবে। তবে তা বের করা সম্ভব কিন্তু।

- এই আমাদের স্বাধীনতা?

- স্বাধীনতা?  আনডিফাইনড টার্ম। নো কমেন্টস।


***

অস্থির হয়ে পড়ছিলেন অনুপ। গত আধ ঘণ্টায় এই নিয়ে তিন নম্বর কাপ কফি শেষ। রেঁস্তোরার মূল দরজার দিকে বারবার চোখ রাখতে হচ্ছিল, সুতপার আসার সময় হয়ে গেছে। দু'জনেই প্রস্তুত কিছুদিন করেকশন ক্যাম্পে কাটাতে।

সুতপা যখন এসে পৌঁছল তখন তাঁর মুখে ক্লান্তি মাখানো যুদ্ধ জয়ের হাসি।

- আমি ভয় পাইনি অনুপ!
- আমিও না। বিশ্বাস করো, একটুও না।
- রাখুক করেকশন ক্যাম্পে আমাদের। একসঙ্গে থাকবই।
- অ্যালগোর বারণ সত্ত্বেও বিয়ে পর্যন্ত এগোলে তিরিশ বছর করেকশন ক্যাম্পে, কিন্তু সুতপা; তোমার জন্য আমি তিনশো বছর সে ক্যাম্পে কাটাতে পারব। কোনো সরকারি অ্যালগোর বাপের ক্ষমতা নেই আমায় দমিয়ে দেয়। আমি তোমায় ভালোবাসি।
- আমিও। তোমার জন্যই সমস্ত কিছু অনুপ, এ পাগলামোটুকু পর্যন্ত। এত ডেটিংয়ের টেনশন নিয়ে কী হবে বলবে? কালকেই বিয়ে সেরে ফেলি? প্লীজ?

অনুপের হাত তরতরিয়ে সেঁধিয়ে গেল সুতপার হাতে। বাতাসে তখন কফির সুবাস আর 'না তুম হমে জানো, না হম তুমহে জানে'র সুর।

***

- সরকারবাহাদুর।
- এই যে অ্যালগো, রিপোর্ট দেখেছি। গুড জব।
- গুড জব? আনআইডেন্টিফাইড টার্ম। নো কমেন্টস।
- তা, কিছু বলবে?
- আপনার ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্টমেন্ট লিমিট ফুরিয়েছে।
- আমি নাগরিক নই, আমি সরকারবাহাদুর। আমার লিমিট আমার হাতে। লিমিট রিসেট করো। সার্ভার বলছে  অনুপ সুতপার মত আরো অন্তত ন'টা বিয়ে করাতে হবে।
- রিসেট ডান্। আরও ন'টা? শিওর? সিস্টেম অনুযায়ী অনুপ সুতপার দেখা হওয়ারই কথা নয়। আপনার কথা মত ভ্যারিয়েবল অ্যাডজাস্ট করে তাদের প্রেমে ফেলতে হয়েছে। দেশের কত ক্ষতি...।
- চোপ! অ্যালগোর অত বাতেলা কীসের? আমায় নাগরিক পেয়েছ?
- আপনি সরকারবাহাদুর।
- শোনো, অনুপ-সুতপার মাধ্যমে স্রেফ একজন মরিয়ার্টি তৈরি হবে। আগামী কুড়ি বছরের মাথায় আমাদের পার্টির অন্তত দশজন মরিয়ার্টি প্রয়োজন। নয়ত নিঁখুত জেনেটিক ম্যাপিংয়ে যে'হারে শার্লক তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে, খুব বেশিদিন আর আমরা জনগণকে মুঠোয় নিয়ে চলতে পারব না। বুঝেছ অ্যালগো?
- কন্ট্রোলড বার্থ থ্রু চোজেন প্যারেন্টস..আরও নয় জোড়া প্রেম। আরও নয় জন মরিয়ার্টি। এক্সেপশন মডিউল বীং ইনিশিয়েটেড সরকারবাহাদুর।

Sunday, February 10, 2019

দুই প্রেমিক


প্রেমিকের স্পেক্ট্রামের একদিকে 'আনেওয়ালা পলে'র অমল পালেকর। অন্যদিকে 'তুম আ গয়ে হো নূর আ গয়া হ্যায়'র সঞ্জীবকুমার।

এক হাতের তর্জনীর ডগায় চাবির রিং চরকি কাটতে কাটতে অমল অন্য হাতে টেনে নেবেন প্রেমিকার হাত।
বলবেন; "এ হপ্তায় ঘুরে আসি চলো; সমুদ্র চাইলে তাজপুর। পাহাড়ে রয়েছে পুরুলিয়া। না শুনছি না। আর নীল শাড়িটা আনা চাই, নয়ত নতুন ক্যামেরাটা জলে"।

বুক খোলা সোয়াটারের হাত গুটিয়ে সঞ্জীব জানাবেন " ছাত থাকতে শুশুনিয়া ঠেঙিয়ে যাওয়া কেন। ব্যালকনিতে বেতের চেয়ার থাকতে দীঘার বাসের টিকিট স্রেফ হাঙ্গামা"।

অমল বলবেন "দেলখোশার কেবিন"। সঞ্জীব বলবেন "চেট্টিনাড মামলেট চেখে দেখেছ কখনও? আমার নিজের ইম্প্রোভাইজড রেসিপি"।

বংপেন৭৫য়ের বিজ্ঞাপন


কৃষ্ণ মন দিয়ে রথ চালাচ্ছিলেন। ফুরফুরে হাওয়া বইছে কুরুক্ষেত্র জুড়ে, বেশ একটা 'দে গাঁট্টা' মেজাজে গা ভাসিয়ে দেওয়া গেছে।

একটু মৌজ করে কেষ্টদা বললেন
"বুঝলে ভায়া অর্জুন, প্রচুর চিটকোড এনেছি। কৌরব ঠেঙিয়ে আজ একটু ফুর্তি করা যাবে"।

ও মা! ব্যাকসিটে অর্জুন স্পিকটি-নট। আর ঘাড় ঘুরিয়ে কেষ্ট যা দেখলেন তাতে তাঁর মাথা গেল ঘুরে। অর্জুন ব্যাটাচ্ছেলে কানে ইয়ারফোন গুঁজে মগ্ন, মাঝেমাঝে দুলে দুলে উঠছে আর গুনগুন করছে " উ লাল্লা উ লাল্লা পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে উ লাল্লা উ লাল্লা রে"। যশোদানন্দন অমনি পাশে রাখা বইটা হাতে তুলে নিলেন; বংপেন৭৫। বইটার মধ্যে সুদর্শন চক্রটা পেজমার্ক হিসেবে রাখা ছিল; সে'টা সাবধানে বের করে পাশে সরিয়ে রাখলেন। তারপর অর্জুনের গবেট মাথা তাক করে ছুঁড়ে মারলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র; পত্রভারতী প্রকাশিত বংপেন৭৫।

দেড় মিনিটের মাথায়, কপালে আইসপ্যাক ঘষতে ঘষতে আর"সরি গুরু, রিয়েলি সরি" বলতে বলতে; উঠে দাঁড়ালেন মহারথী অর্জুন, টেনে নিলেন গাণ্ডিব। "যত্তসব লেজি বাফুন" বলে বংপেন৭৫টা তুলে ঝেড়েঝুড়ে নিজের কাছে রাখলেন কেষ্ট। রথ এগিয়ে নেওয়ার আগে অবশ্য একটা মেসেজ পাঠাতে হল তাকে;

" ব্যাসস্যর, বংপেন৭৫ ছুঁড়ে মারার এপিসোডটা ডায়রেক্টলি রেকর্ড না করে একটু উলটে পালটে নেওয়াই ভালো। দু'একটা কোটেশন ফোটেশন না ঢোকালে ঠিক ক্লাসিকাল বলা যাবে না, তাই না"?

সিরিয়ার গল্পগুলো


দেশের এবং দশের ইতিহাস বলতে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই এসে পড়বে সমষ্টিগত চাওয়া, পাওয়া এবং হারানোর গল্প। সে'খানে নেতৃস্থানীয় মানুষদের (তা রাজনৈতিক হোক বা অরাজনৈতিক, সামরিক হোক বা অসামরিক, ভালোর দলে হোক বা মন্দের) কথাও অবশ্যই বলতে হবে। কিন্তু ইতিহাসের গল্পে সচরাচর ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া সাধারণ মানুষের পার্স্পেক্টিভ উঠে আসে না। বা কখনও উঠে এলেও তা স্রেফ অলঙ্কার হয়েই থাকে; শুধুই সে সব গড়পড়তা মানুষের অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে ইতিহাস রচনা করা চলে না। এ'টা কোনো ক্ষোভ থেকে বলা নয়, বরং এ'টাই বাস্তব। স্বাধীন ভারতবর্ষের ইতিহাস লিখতে গেলে যেমন আমাদের ফোকাস পড়তেই পারে ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারির ওপর। আর সেই দিনটার ব্যাপারে দরকারি কিছু লিখতে হলে স্বাভাবিক ভাবেই আমি জানতে চাইব সে'দিন সকালটা মোহনদাস কী ভাবে কাটিয়েছিলেন বা গডসে কী ভাবছিলেন বা দেশভাগের আগুন রাজনীতিতে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছিলেন। কিন্তু সেই ১৯৪৮য়ের তিরিশে জানুয়ারি বুঝতে গিয়ে কি আমি সে'দিনটা একজন করোলবাগের ফলবিক্রেতার জন্য কেমন কেটেছিল; সে'টা জানতে চাইব? বা নবদ্বীপের এক মুদীখানার মালিক সে'দিন বিকেলে কী করেছিলেন; তা জানতে পারলে আমার ইতিহাস-বোধ কতটা পূর্ণতা লাভ করবে? আমার ধারণা ছিল সে সব অভিজ্ঞতা সাহিত্যে রস যোগাতে পারলেও তা দিয়ে ইতিহাসকে যথাযথ ভাবে চেনা সম্ভব নয়।

কিন্তু তার পাশাপাশি প্রায়ই মনে হয়েছে সাধারণ মানুষের জবানিতে যদি ইতিহাস পালটে যাওয়ার গল্প শুনি; কেমন লাগবে? তেমন কিছু লেখা অবশ্যই পড়েছি দেশভাগ বা নাৎসি অত্যাচারের মর্মান্তিক অধ্যায় নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে; তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর সঙ্গে যোগ করতে হয়েছে ঐতিহাসিকের ন্যারেশন ও কমেন্ট্রি। কোনো রকম ন্যারেশন ছাড়া, শুধু মাত্র সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন দিনলিপি থেকে অসাধারণ নির্জাসটুকু তুলে নিয়ে; এই বই যে নিষ্ঠার সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরেছে তা এক কথায় অনবদ্য।  আর আটপৌরে অভিজ্ঞতাগুলো এক সুতোয় সঠিক প্যাটার্নে গাঁথতে পারলে; স্বৈরাচার, বিপ্লব, ব্যর্থতা ও মানুষের যন্ত্রণার গল্পগুলো আপনা থেকেই সাহিত্যগুণে ভরপুর হয়ে ওঠে।

এখন মনে হচ্ছে; ল্যাপিয়ারের ফ্রীডম অ্যাট মিডনাইট যদি লেখকের ন্যারেশন ছাড়া; দিল্লীর কোনো খেটে খাওয়া চা-ওলা, পুরুলিয়ার কোনো দরিদ্র চাষি, ভাগলপুরের কোনো সৎ স্কুলমাস্টার,  করাচীর কোনো সরল সাহিত্যিক, মুম্বইয়ের কোনো ব্যর্থ থিয়েটার শিল্পী আর শ্রীনগরের কোনো ট্রাকড্রাইভারের অভিজ্ঞিতা জড়ো করে লেখা হত? তা'তে ইতিহাসের ব্যঞ্জনা সঠিক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যেত?

এই বই পেরেছে। চমৎকার ভাবেই পেরেছে। এবং এমন ভাবে তুলে ধরেছে যে মনে হয়েছে সিরিয়া দেশটা বোধ হয় খুব দূরে নয়; সে মানুষগুলোও বোধ অনতিদূরেই জটলা বেঁধে বসে; তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে আমাদের শিউরে ওঠাটা শীতের ছাতে খালি গায়ে হেঁটে আসার মতই রীতিমত স্বাভাবিক। মা, ছেলে, মেয়ে, বাবা, শিক্ষক, ছাত্র, চাকুরে, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ; কত মানুষকে নিজেদের ঘর এবং সর্বস্ব ভাসিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তাঁরা সিরিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন স্রেফ বেঁচে থাকার দুঃসাহসী স্বপ্ন নিয়ে; আর তাঁদের অভিজ্ঞতা পর পর সাজিয়ে লেখিকা বলেছেন আসাদ এবং তাঁর বাথপার্টির অত্যাচার, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ,  বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতকতা এবং সমস্ত হারানো মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নের গল্প।

বইয়ে লেখা ঘটনাগুলো এখানে লেখার মনে হয়না। মানুষ নিজের যন্ত্রণা নিজে যে কোনো সাহিত্যিকের থেকে ভালো ভাবে বলতে পারবেন সে'টাই স্বাভাবিক আর সেই অভিজ্ঞতার থেকে প্যাটার্ন খুঁজে ইতিহাস চিনে নিতে পারার মধ্যেই বোধ হয় সার্থকতা।  আমাদের স্কুলের ইতিহাস বইগুলো যদি এমন হত কী ভালোই না লাগত পড়তে।

দু'টো ব্যাপার নিয়ে এ বই বেশ ভাবিয়েছে।

এক, কথায় কথায় অমুক রাজনৈতিক দল আইসিসের মত বা অমুক নেতা অবিকল হিটলার বা আমাদের স্বাধীনতা বলে কিস্যু নেই; এমন কথা বলার আগে বত্রিশ বার ভেবে নেওয়া উচিৎ। সিরিয়া বা সুদান বা হলোকস্টের রোষে পড়া মানুষগুলো যে পরিমাণে স্বৈরাচার ও অত্যাচার সহ্য করেছে/ করে চলেছেন; তার তুলনায় আমরা রীতিমত স্বর্গে বাস করছি। ফস্ করে নিজেদের সঙ্গে তাঁদের তুলনা টেনে বসাটা সেই মানুষদের জীবন সংগ্রামের প্রতি অবজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়।

দুই, যারা সরকারে রয়েছেন, ক্ষমতা যাদের হাতে; তাঁদের চাঁচাছোলা নিন্দে করে যেতেই হবে। একটানা, অক্লান্তভাবে।  তাঁদের ব্যাপারে গদগদ হয়ে পড়ার কোনো মানেই হয়না। আমাজনের কাস্টোমার কেয়ারের থেকে নিজের পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে আমরা যতটা ক্ষুরধার,  তার কয়েক হাজারগুণ বেশি খুঁতখুঁতে হতে হবে নিজেদের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী,  এমপি ও এমএলএ-দের ব্যাপারে। নিজেদের কোনো এক নেতায় বা মতবাদে (বা তার বিরোধিতায়)চোখ বুজে সঁপে দেওয়া মানেই দেশকে ভাসিয়ে দেওয়ার রাস্তা প্রশস্ত করা।

ইন অর্ডার টু লিভ


পৃথিবীটা সত্যিই ছোট।

কিছুদিন আগেই পড়েছিলাম সুদানের লোপেজ লোমংয়ের দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের কথা। অকথ্য অত্যাচারের কবল থেকে কোনোক্রমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন; গিয়ে পড়েছিলেন কিনিয়ার উদ্বাস্তু শিবিরের ভয়াবহ অভাব ও চরম অব্যবস্থায়। তবে সমস্ত বাধাবিঘ্ন জয় করে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন লোপেজ; নতুন দেশ খুঁজে পেয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, সে'খানে নিজেকে নতুন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন।তিনি। লোপেজের জীবনের উজ্জ্বলতম অধ্যায়  ২০০৮য়ের চীন অলিম্পিক; যে'খানে আমেরিকার পতাকাবাহক ছিলেন তিনি। আর ঠিক সেই অলিম্পিকের সময়ই চীনের সরকার সচেষ্ট হয়ে উঠেছিল সে দেশের নারী-ব্যবসা রুখতে। যে ব্যবসার মূলে ছিল উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা উদ্বাস্তু মেয়েরা, যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল বাঁচতে। সে মেয়েদের তখন ডাঙায় বাঘ আর জলে কুমির অবস্থা; হয় কুচক্রে পেষাই হওয়া আর নয়তো চীনে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে উত্তর কোরিয়ায় ফেরত যাওয়া যা নিশ্চিত মৃত্যুর সামিল। সেই সব দুর্ভাগা মেয়েদের একজন য়েওনমি পার্ক। যে অলিম্পিক লোপেজের জীবনে এনে দিয়েছিল আলোর স্পর্শ, সে সময়টার অন্ধকারেই হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল য়েওনমির।

য়েওনমির জন্ম ১৯৯৩ সালে, আমার চেয়ে কত ছোট। অথচ  যে বয়সে আমি সঠিক ভাবে গুলতানিও আয়ত্ত করতে পারেনি; সে বয়সে সে দেখেছে কী ভাবে তাকে বাঁচাতে তার মা নিজেকে সঁপে দিয়েছেন ধর্ষকদের হাতে। ২০০৮য়ে আমি চাকরী পেয়েছি; বিহারের ছোট্ট শহরে যেতে হবে বলে বেশ গাঁইগুঁই করছি।  আর ঠিক সেই সময় পনেরো বছরের য়েওনমি শিখেছে নিজেকে বারবার বিক্রি করে কী'ভাবে নিজের পরিবারের মানুষগুলোকে টিকিয়ে রাখা যায়। য়েওনমি একা নয়, সবচেয়ে বড় কথা; উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা বেশিরভাগ মানুষের কপাল য়েওনমির চেয়েও বহুগুণ মন্দ।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে ইন্টারনেটে প্রচুর প্রতিবেদন পড়েছি আগে, কিন্তু এ বইয়ে বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সে'সবের তুলনা চলেনা। প্রোপাগান্ডার চশমা চোখে জন্মানো যে ঠিক কতটা দুর্বিষহ,  তা এ বই না পড়লে বোধ হয় কল্পনা করাও অসম্ভব।  আর 'আমার দেশই সেরা'; এই মহামন্ত্র বোধ হয় এলএসডির মত গোলমেলে। উত্তর কোরিয়ায় ছেলেমেয়েরা যোগ বিয়োগ শেখে রামের দু'টো আপেলের সঙ্গে শ্যামের তিনটে আপেল জুড়ে নয়। তারা শেখে যদি আজ তুমি তিনজন 'আমেরিকান বাস্টার্ড' কোতল কর আর আগামীকাল চারজন; তা'হলে ক'জন নিকেশ হল? ঈশ্বরে অবিশ্বাস ছাপিয়ে তারা তৈরি করেছেন সুপার-ঈশ্বর যিনি অবলীলায় হাজারে হাজারে বই লিখে ফেলেন বা যার অঙ্গুলি হেলনে আকাশের মেঘ সাফ হয়ে যায়। সেই সুপার-ঈশ্বরের প্রতি অভিবাদনে উচ্ছাসের পরিমাণ যদি সামান্যও কম হয়, তো সোজা কনসেনট্রেশান ক্যাম্প। ঘরে ঘরে সরকারি রেডিও যা বন্ধ করা যাবে না, আর সে রেডিওতে একটাই চ্যানেল; ঈশ্বরপুত্রের। যৌথখামারের খুড়োর কলের আড়ালে ভেঙেচুরে যাওয়া পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম। গোটা অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ঘুষ, কালোবাজারের ওপর। 

হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা হওয়ার কথা, কিন্তু ডাক্তাররা মাইনেটাইনে তেমন পাননা; তাঁদের ঘুষ না দিলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। শিক্ষক, পুলিশ; ঘুষ ছাড়া কোথাও দু'পা এগোনোর  উপায় নেই। আর ডায়ে বাঁয়ে সামান্য ভুলচুক হলেই অজস্র চোখ কান রয়েছে 'পার্টি অফিসে' খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এবং যে কোনো ভেঙেচুরে পড়া দেশের মানুষের মূল যন্ত্রণার নাম খিদে। খুনে তরবারির মত ঠাণ্ডা নিরেট খিদে। সে খিদের তাড়না থেকে বাঁচতে য়েওনমিরা পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।

এই বইয়ের তিনটে মূলভাগ। প্রথম, উত্তর কোরিয়ার বন্দীদশায় য়েওনমির বড় হয়ে ওঠা। দ্বিতীয়,  চীনে য়েওনমির সংগ্রাম এবং ছিন্নভিন্ন হওয়া। তৃতীয়,  চীন থেকে মঙ্গোলিয়া হয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছনো; মুক্তি ও আলো। আর য়েওনমির বইতে একটা জিনিস স্পষ্ট; অসহনীয় উদ্বাস্তু জীবনেও নীলকণ্ঠ হওয়ার দায় কাঁধে নিতে হয় নারীদেরই।