Wednesday, October 6, 2021

মহামেস



কলেজ স্ট্রিট সংলগ্ন মেসবাড়িতে চার বছর কেটেছে৷ তখন অল্প বয়স, মনে ক্লোরোফিলের পরিমাণ বিতিকিচ্ছিরি ভাবে বেশি৷ আমাদের মেসে একটা মহালয়া-ট্র্যাডিশন ছিল, যা আর পাঁচটা ট্র্যাডিশনের মতই অদরকারী অথচ হাইক্লাস হুজুগ আর খামোখা লাফালাফিতে পরিপূর্ণ৷ মেসবাড়িতে কাকভোরে ঘুম থেকে ওঠার ব্যাপারটা একটা ক্রাইমের পর্যায় পড়ত, তবে মহালয়ার দিনটা অন্যরকম৷ রেডিওয় মহিষাসুরমর্দিনী শুরু হওয়ার আগেই আমারা ছেলেপিলেরা রেডিও আর চানাচুরের বয়াম হাতে ছাতে উঠে যেতাম৷ বীরেনবাবুর কণ্ঠ, হ্যারিসন রোড ধরে ছুটে চলা ভোরের ট্রামের ঘর্ঘর, আর ইয়ারবন্ধুদের চানাচুর চেবানোর মুচুরমুচুর মিলেমিশে সিম্ফনি তৈরি হত। সকলের চোখেই ঘুম লেগে থাকত, কিন্তু হুজুগ বড় বাই৷
রেডিওর মহালয়া শেষ হওয়ার পরেই আমরা বেরিয়ে পড়তাম দল বেঁধে৷ বছরে ওই একটি বারই হয়ত আমাদের গায়ে ভোরের কলকাতার হাওয়া লাগত৷ কলেজ স্ট্রিট থেকে হাঁটা শুরু করে সোজা হাওড়া ব্রিজ৷ সে'সময়কার গাম্বাট খ্যাপাটেপনার কথা ভাবলে এখন গায়ে জ্বর আসে৷ কলেজ স্ট্রিট মোড়, সেন্ট্রাল এভিনিউ মোড়, বড়বাজার পেরিয়ে যাত্রা৷ প্রতিবার চিৎপুর ক্রসিংয়ের সামনে পৌঁছে এক বন্ধুর স্বগতোক্তি শুনতে পেতাম, "ভাই, এই এনার্জি আর ফোকাসের সিকিভাগও যদি পড়াশোনোয় ইনভেস্ট করতে পারতাম, তা'হলে বাপমায়ের দুশ্চিন্তা দূর করে দাঁড়িয়ে যেতাম"৷ বন্ধুটি কিন্তু পড়াশোনায় কামাল করে চাকরী হাঁকিয়ে এখন দিব্যি দাঁড়িয়েছে, যেমনটি দাঁড়ালে সমাজ বলবে, "সাব্বাস ভাইটি"। কিন্তু ভাইটিকে মহালয়ার ভোরে হেঁটে বিশ্বজয় করার ক্ষমতাটুকু হারাতে হয়েছে৷
হাওড়া ব্রিজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ খাজাগল্প চলত৷ মেসের ছেলেরা অ-কলকাতার মানুষ৷ হাওড়া ব্রিজের আমাদের প্রায় সকলেরই 'বাড়ি ফেরার ট্রেন ধরতে ছোটা'র শেষ ল্যাপ। কিন্তু ওই দিনটা অন্যরকম হত, হাওড়া ব্রিজ হয়ে স্টেশনমুখো যাওয়া নেই, তা'তে সেই পেল্লায় ব্রিজটা খানিকটা বেশি আপন মন হত বোধ হয়৷ ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায়, ব্রিজের রেলিং ধরে গঙ্গার দিকে এক মনে তাকিয়ে থেকে বীরেনবাবুর কণ্ঠস্বরের রেসোনেন্স অনুভব করতে পারলে নাকি আয়ুবৃদ্ধি হয়৷ থিওরিটা আমার নয়, ঘোর নাস্তিক এক মেসবন্ধুর৷ ধর্মটর্ম না মানলেও, কলকাতার ক্যাঁচক্যাঁচর, হুগলির মিঠে হাওয়া আর মহালয়া ভোরের আলোর যে ককটেল; তার আস্তিকতা উড়িয়ে দিতে পারত না বোধ হয়৷
এরপর নেমে আসতাম ঘাটের কাছে৷ বড্ড ঘিঞ্জি, জন্মের ভিড়৷ আর অজস্র মানুষ ছাপিয়ে যে'টা প্রকাণ্ড হয়ে উঠত সে'টা হল সম্মিলিত মন্ত্রোচ্চারণ৷ সে এক্কেবারে নেশা ধরানোর মত এক গমগম। সে দৃশ্য আর শব্দ বর্ণনা করার ক্ষমতা থাকলে আমি লারেলাপ্পা ব্লগার না হয়ে নভেলিস্ট হতাম৷ যে'টা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় সে'টা হল প্রতি বছর ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছেই মনে হত, " উফ্ বড্ড হাঁটাহাঁটি গেছে, দুর্দান্ত খিদে পেয়েছে"৷ ঘাটের কাছের দোকান থেকে কিনে স্টিলের প্লেটে কচুরি ছোলারডাল খাওয়া হত৷ অজস্র কচুরি আর বাটি বাটি ডাল নিমেষে গায়েব করে মেসবাড়ির টীম বেরোত বজরাভ্রমণে। অবশ্যই বজরা নয়, সস্তায় পুষ্টিকর টিকিট কেটে চড়া লঞ্চ; তবে বজরা বললে মগনলালেস্ক একটা ঘ্যাম অনুভব করা যায়৷ সাতসকালের গঙ্গার হাওয়া যে এমন মিঠে, তা মহালয়া না এলে জানতেই পারতাম না৷ এরপর থাকত বিস্তর কচুরি-হজম-ঘোরাঘুরি। বাগবাজার, কুমোরটুলি হয়ে প্রিন্সেপ পর্যন্ত৷ পুরোটাই অদরকারী, দরকারী হলে তা নিয়ে এত বছর পর 'আহা উঁহু' করার প্রয়োজন হত না৷
তা এদ্দিন পরেও মহালয়া নিয়ে গল্প ফাঁদতে গেলে সেই চারবছরেই আটকে যেতে হয়৷ আরও ছোটবেলায় মহালয়াতে ঠাকুমা ছিল, আর তার চেয়েও সুগভীরভাবে ছিল একটা রেডিও যে'টাকে মহালয়ার ঠিক আগেই ঝেড়েপুছে নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে মানুষ করা হত। মশারির নীচে আমি আধশোয়া৷ হাফঘুমে ৷ ঠাকুমা পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে আরাম দিত, তা'তে ঘুম ভেঙেও ভাঙতে চাইত না৷ অথচ ঠাকুমার মাঝেমধ্যেই বলে চলত, "এমন সুর ভাই, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে না? উঠে পড়ো"৷
আমার মহালয়া শুধুই বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বর আর রেডিওয় নেই৷ ভোরের হাওড়া ব্রিজ, কচুরির সুবাস, গঙ্গার হাওয়া, আর মাথায় বোলানো ঠাকুমার হাত; এই সব মিলিয়েমিশিয়ে একদলা স্মৃতি মনের মধ্যে মহালয়া হয়ে রয়ে গেছে। ইউটিউবের জগতের খোকাখুকুদের মহালয়া যে আমাদের মত দরকচা মারা বুড়োধাড়িদের স্মৃতির সঙ্গে খাপ খাবে না, সে'টাই স্বাভাবিক৷ তাদের মহালয়াতে বীরেনবাবু কতটা থাকবেন, বুকে 'পুজো এসে গ্যালো' মার্কা ছ্যাঁত কতটা থাকবে, সে হিসেব করার দায় তাদের নেই৷ সে আনন্দ তাদের গছিয়ে দেওয়ার দায় স্রেফ আমাদের৷ বীরেনবাবুর 'ইয়া দেবী' বহু প্রজন্মকে পুজোর গন্ধ চিনিয়েছে, এখনও তা অমলিন৷ তবে যে বুড়োচে মানুষরা মাঝেমধ্যেই মাতব্বরি সুরে বলেন, 'আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো মহালয়ার কিস্যু বোঝে না, মহালয়ার আমেজ ছিল আমাদের সময়...', তাদের মাথায় কয়েকটা কাল্পনিক গাঁট্টা মেরে ফেলুন, চটপট!

Monday, October 4, 2021

লক্ষ্মণের শক্তিসেল



আমাজনে সেল৷ ফ্লিপকার্টে সেল৷
ত্রাহিত্রাহি অবস্থা৷
মাঝেমধ্যেই একের পর এক আইটেম দেখে চলেছি৷ রিভিউ পড়ে চলেছি৷ গড়িয়াহাট ফুটপাথে ঘোরাঘুরির কন্ডিশনিং বয়ে বেড়াচ্ছি, ইয়াব্বড় ডিসকাউন্ট ট্যাগ দেখলেই মনে হয় জলের দরে কেউ হীরাজহরত বিলিয়ে দিচ্ছে৷ একটা ডিজিটাল কলমদানি দেখলাম, সে'খানে কলম রাখা যায়, তার গায়ে মোবাইল হেলান দিয়ে রাখা যায়, এমন কি তাতে ইনবিল্ট ব্লুটুথ স্পিকারও আছে। কপিল ক্রিকেট ছাড়ার পর ভারতবর্ষ এমন অলরাউন্ডার আর দেখেছে বলে মনে হয়না৷ অবশ্য এ'সব জিনিস এমনিতে পাত্তা দিই না৷ কিন্তু বেয়াল্লিশ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট শুনলেই বুকের ভিতর একটা রোম্যান্টিক আনচান টের পাই৷
পেল্লায় সব মোবাইল ফোন পেল্লায়তর ডিসকাউন্টে রয়েছে, তার ওপর এক্সচেঞ্জ বোনাস৷ নিজের হাতের সুস্থ ও মজবুত মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে মেজাজ খিঁচড়ে যায়। পোড়ামুখো কই মাছের আয়ু নিয়ে এসেছে, এদিকে ধামাকা সব সেলস অফার হাত ফস্কে বেরিয়ে যাচ্ছে৷ যখন ইন্টারনেট এমন খোলামকুচির মত ছিল না, যখন হাফ জিবি ডেটা কিনতে গিয়ে সোনার আঙটি বন্ধক রাখার কথা ভাবতে হত; তখন ভাবতাম কোনওদিন ডেটা কাঙাল হওয়ার চিন্তা না করে ইউটিউব দেখার সুযোগ পেলে প্রচুর ভালো ভালো ভিডিও দেখে নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলব। বিজ্ঞান, ইতিহাস, জেনারেল নলেজ; এ'সব দেখেটেখে পৌঁছে যাব ঘ্যাম লেভেলে৷ এখন ইউটউব ব্ল্যাকহোলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেঁধিয়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোনের রিভিউ দেখে৷ অমুক ফোনের হাওড়া ব্রিজের সাইজের র্যাম, তমুক ফোনের ক্যামেরা দিয়ে জুপিটার গ্রহের গায়ের ব্রণটিও দেখা যায়৷ সেই সব মারকাটারি ফোনের ওপর মারকাটারি ডিসকাউন্ট অথচ আমার ফোন কেনার কোনও প্রয়োজনই নেই৷
কিছুই কেনার নেই। তবু কোনও কাজে মন বসছে না৷ মাঝেমধ্যেই শপিং সাইটে ঢুঁ মারছি আর কার্টে অদরকারী কিন্তু ডিসকাউন্টে ভরপুর সব জিনিসপত্র অ্যাড করছি। এ'দিকে পুজোর মাস৷ পকেটে বারোখানা গড়ের মাঠ ঢুকে যাবে, সাইত্রিশখানা মনুমেন্টসহ৷ অথচ আইপিএলের প্রতিটি ওভারের মাঝখানে, গল্পের বইয়ের তিন পাতা অন্তর বা বাসন মাজতে মাজতেও শপিং কার্টের দৈর্ঘ্য বেড়েই চলেছে৷
এক এক সময় মনে হয় শপিং বাউল হয়ে যাই৷ সাতপাঁচ ভেবে কী হবে৷ ডিসকাউন্টের লক্ষ্মীকে পায়ে না ঠেলে কিনেই ফেলি একটা ব্লুটুথ স্পীকার বা তিরিশ প্যাকেট কোরিয়ান নুডলস৷ কী আর হবে ইন্সুরেন্সের প্রিমিয়াম দিয়ে।
নেহাৎ মনের মধ্যে গা এলিয়ে থাকা গেরস্থ ভদ্রলোক মাঝেমধ্যে কড়া ধমক লাগায়, তাই বাঁচোয়া৷ সে ধমকে টনক নড়ে, মেডিক্লেমের কথা মনে পড়ে, শপিং কার্ট ফাঁকা হয়ে আসে৷ যন্ত্রণা কাটে মাছের বাজারের থলি হাতে দুলকি চালে বেরিয়ে পড়ার প্রাণায়ামে৷

ফেসবুকের ফুডগ্রুপ



ফেসবুকে বেশ কিছু ফুড অ্যান্ড রেসিপি মার্কা গ্রুপের মেম্বার আমি৷ বলা ভালো স্লীপিং মেম্বার৷ নিজে কন্ট্রিবিউট করিনা কিন্তু মন দিয়ে বিভিন্ন খাবারদাবারের ছবি দেখি। সে'সব দেখতে আমার বড় ভালো লাগে৷ খাওয়াদাওয়া ব্যাপারটার সঙ্গে মানুষের এত ভালোবাসা জড়িয়ে আছে, তা ভেবেও কী চমৎকার লাগে৷
এ'সব গ্রুপের আপডেট থেকে জানতে পারি কেউ নিজের বৃদ্ধ বাবার জন্মদিনে যত্ন করে পাঁচ পদ রান্না করেছেন, কেউ মানিব্যাগের টানটান অবস্থা মধ্যে কোথাও সস্তায় পুষ্টিকর রেস্তোরাঁ খুঁজে পেয়ে উল্লসিত, কেউ অফিস ফেরত ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে বাড়িতে এগরোল বানিয়ে ফেলেছেন৷ এমন কতশত খাবারের গল্প নিয়মিত টাইমলাইনে দেখতে পাই, উপভোগ করি, "বাহ্" বলে মাথা নাড়ি, আবার কখনও স্রেফ হেসে ফেলি৷
খাওয়ার ছবি শেয়ার করতে গিয়ে বা সে প্রসঙ্গে দু'লাইন লিখতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা ছেলেমানুষি আবেগ বেরিয়ে আসে৷ আমি সেই আবেগের ভক্ত৷ খাবার নিয়ে সিরিয়াস লেখালিখি পড়তে অবশ্য ভালোই লাগে, ইউটিউবে নামীদামী ফুডব্লগারদের বিশ্লেষণ শুনতেও চমৎকারই ঠেকে৷ কিন্তু খাবারের ব্যাপারে আমজনতার হুজুগে শিশুসুলভ ভালোবাসাটুকু সত্যিই লাজওয়াব৷
খাবারদাবারের গল্পের কোয়ালিটি শুধুই ইতিহাস, রেসিপির খুঁটিনাটি, রান্নাবান্নার টেকনিকালিটি, ছবির কোয়ালিটি বা ভাষার গুণ দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়৷ এই ধরা যাক, কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে, শেয়ালদার কাছাকাছি অন্নপূর্ণা রেস্টুরেন্টে বসে মটন টিকিয়ার সঙ্গে রুমালি রুটি খাচ্ছি৷ টিকিয়ার গায়ে চোট পড়ার আগে স্রেফ ঝোল মাখিয়ে চার খানা রুমালি হাওয়া৷ ওয়েটারদাদা আর দু'টো রুমালি পাতে দিয়ে বিরক্ত মুখে জানতে চাইলেন, "টিকিয়াটাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে পুষবে নাকি ভাইটি"? এ গল্পে খাবারের অ্যানালিসিস নেই বটে, কিন্তু এই ফিচেল স্মৃতির দাম তো কম নয়৷
ফেসবুকের ফুড গ্রুপগুলোয় এমনই ভালোবাসার কবজি ডোবানো ছবি নিয়মিত দেখি আর আনন্দে মন মজবুত হয়ে ওঠে৷

ফেলে আসা সেলুনদাদা



বই পড়া টিভি দেখা গান শোনার মত আমি নিয়মিত নিজের ফোনে গুগল ফটোস দেখি৷ আমার হাতের লেখা আর ছবি তোলার হাত; দু'টোই শোচনীয়। কিন্তু গুগল ফটোস উপভোগ করার জন্য ফটোগ্রাফি চ্যাম্পিয়ন না হলেও দিব্যি চলে যায়৷ শুধু যখন তখন খুচুরখুচুর ছবি তোলার বদ অভ্যাস থাকলেই হল৷ আজ যে'সব ছবি অদরকারী, বিটকেল, 'ওয়েস্ট অফ মোবাইল স্টোরেজ'; আজ থেকে বছরখানেক পর সেগুলোই জমজমাট মনে হবে৷ পুরনো গন্ধ, দৃশ্য, শব্দ ফেরত আসবে, ব্রেনে সুড়সুড়ি দেবে৷ বয়সের গাছপাথর থাকছে না ভেবে অল্প নার্ভাসও হতে হবে অবশ্য৷ সে যাক গে৷
এই যেমন কলকাতায় ফেলে আসা অফিস যাতায়াতের রাস্তাঘাট নিয়ে মনের মধ্যে কম বিরক্তি জমে নেই৷ কিন্তু আজ হঠাৎ সেই অফিসমুখো রাস্তার ধারে পরিচিত সেলুনের সেলুনের সুপরিচিত বেঞ্চি দেখে মনের মধ্যে সুগভীর 'আহা রে' টের পেলাম। অফিস যাওয়ার মুখে নির্ঘাৎ বিচ্ছিরি জ্যামে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অকারণ খিটমিটে মেজাজে তোলা এই ছবি৷ কেন তুলেছিলাম জানি না, তবে ছবি জমানোটা আমার বাতিক৷
দোকান তখনও 'বউনি' করেনি। সেলুনদাদা নিশ্চয়ই ভিতরে ঝাড়পোঁছে ব্যস্ত ছিলেন৷ মনে পড়ল, ওই চেয়ারে বসে আমি বিস্তর চুল কাটিয়েছি৷ সেলুনদাদার চুল ছাঁটাইয়ের ব্যাপারে শখ-শৌখিনতার ধার ধারতেন না৷ ওঁর কাছে চুল কাটার তিনটেই ফর্ম্যাট ছিল; 'সেট' করে দেওয়া, মাঝারি আর বাটি ছাঁট৷ আমি যে ক'বার এ'খানে ঢুঁ মেরেছি, "মাঝারি" বলে নিশ্চিন্তে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছি।
তবে সেই সেলুনে আমি চুলের বাহারের জন্য যেতাম না। যেতাম চুল কাটানোর আরামের জন্য৷ সেলুনদাদা টুকটুক করে, অসীম ধৈর্য নিয়ে, ধীরেসুস্থে চুল কাটতেন৷ কাঁচি খচরখচর করে চুলের মধ্যে চলত না, বরং কাটুরকুটুর মিহি শব্দ আর টুকটাক ছোঁয়ায় চলত কাটাকুটি৷ ওই আধুনিক সব ট্রিমার গোছের যন্ত্র ব্যবহার করে ঘসঘসিয়েও চুল উড়িয়ে দিতেন না৷ কাঁচির ওই টিকিটাকা মুভমেন্টেই কামাল হত, জম্পেশ ঘুম চলে আসত চোখে৷ আমি তো চেয়ারে বসে সেই যে চোখ বুজতাম, চুল কাটার পর নবরত্ন তেল মালিশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে দেখতে ইচ্ছে হত না৷ সেলুনদাদা গপ্পিয়ে মানুষ, তবে খুচরক 'হুঁ, হাঁ, তাই তো''র বেশি সঙ্গত দিতে হত না৷ বরং কাঁচির কচকচের সঙ্গে তাঁর অনর্গল কমেন্ট্রি মিলেনিশে বেশ মনোরোম একটা রিল্যাক্সিং অডিও ককটেল তৈরি হত৷
আজ গুগল ফটোস ঘাঁটতে গিয়ে বেমক্কা এই ছবিটায় চোখ পড়ল। নজরে এলো সেলুনের সেই নীল চেয়ার৷ অমনি শুনতে পেলাম সেলুনদাদার খোশগল্প। কানের পাশেও যেন কাঁচির ডগার মোলায়েম সুড়সুড় টের পেলাম। আর, নাকে এলো ওল্ড স্পাইস আফটারশেভ লোশন আর নবরত্ন-কুল হেয়ার অয়েল মেশানো গন্ধ৷ গুগল ফটোসের সত্যিই জবাব নেই৷

শশধর



- মাফ করবেন অনিকেতবাবু৷ এত রাত্রে আপনার ঘুম ভাঙালাম, আই অ্যাম রিয়েলি সরি৷
- আপনিই এই হোটেলের ম্যানেজার তো? চেক ইন করার সময় আপনিই কাউন্টারে ছিলেন না?
- হ্যাঁ। আমিই শশধর বাগচি, রিসেপশনিস্ট কাম ম্যানেজার, অর্কিড হোটেল৷
- এত রাত্রে হঠাৎ.. আগুন-টাগুন লেগেছে নাকি?
- না না৷ আসলে একা রাত্রে চেক ইন করলেন৷ তাই ভাবলাম একটু খোঁজখবর নিয়ে যাই৷
- রাত পৌনে দু'টোর সময় ঘুম ভাঙিয়ে আপনি খোঁজখবর নিতে এসেছেন? হোয়াট ননসেন্স!
- আসলে আপনি চেকইন করার সময় জিজ্ঞেস করা হয়নি..তাই ভাবলাম এখন একবার নক করে জেনে যাই৷
- কী ব্যাপার?
- বলছিলাম, আপনার ভূতের ভয় নেই তো?
- হোয়াট? আপনি কি উন্মাদ?
- আসলে আমাদের হোটেলটা একটু পুরনো তো৷ সামান্য ভাঙাচোরাও বটে৷ আর এলাকাটা এত নিরিবিলি৷ অনেকে হন্টেড হাউস বলে গুজব রটায়৷ তাই ভাবলাম একটু আশ্বাস দিয়ে যাই৷
- ফাজলামো পেয়েছেন? আপনার মতলবটা কী বলুন তো? আমায় ভয় পাইয়ে এক্সট্রা টাকা বাগাতে চাইছেন?
- ও মা৷ আমি তো অভয় দিতে এলাম৷ আরে ও'সব ভূতটূত বোগাস ব্যাপার৷ আপনি একজন স্মার্ট মানুষ, এ'সব ছিঁচকে ব্যাপার জাস্ট পাত্তা দেবেন না।
- আমায় এ'সব বলে আপনি নার্ভাস করতে চাইছেন?
- কম্পলিটলি উল্টো৷ বরং বলি রাতবিরেতে কোনও বিটিকেল চিৎকার মানেই ভূত নয়৷ বেড়ালের মড়াকান্না হতে পারে। অথবা কোনও আননোন সোর্স৷ বা ধরুন জানালার বাইরে দেখলেন সাদা শাড়ি পরা কেউ গাছের ডালে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে৷ নিশ্চিত জানবেন চোখের ভুল। নিশ্চিত৷ বা ধরুন ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস, স্রেফ মনের গোলমাল৷ আরে ভূতফুত বিশ্বাস করলে চলে এ যুগে? আপনি ঘাবড়াবেন না৷ আমাদের হোটেলে যে দু'একটা মিস্টিরিয়াস ডেথ ঘটেছে সেগুলো আর যাই হোক, ভূতের অ্যাটাক নয়। অবিশ্যি নিজে ভূত বিশ্বাসী না হলেও, কাস্টোমার কনফিডেন্স এনহ্যান্স করতে পুরো বাড়িটা আমি মাসে একবার ভগা তান্ত্রিককে দিয়ে ঝাড়ফুঁক করিয়ে নিই৷ মাইনর একটা সমস্যা আছে বটে৷ মাস চারেক হল ভগা আউট অফ স্টেশন৷ গোরখপুরের দিকে কোনও শ্মশানে বসে একটা স্পেশ্যাল কোনও তপস্যা করছে নাকি৷
- আমি চেক আউট করব৷ আর আপনাকে পুলিশে দেব৷
- এত রাত্রে, বাইরে যাবেন? রিস্কি হবে না তো?
- আ..আপনি এমন অসভ্য কেন?
- ভূত বলে আদৌ কিছু নেই, সে কথাটা বুক বাজিয়ে বলছি! সে'টা অসভ্যতা?
- দেখুন, এই আমি রিকুয়েস্ট করছি৷ আমায় আর ডিস্টার্ব করবেন না৷ আমি কাল ভোর ভোরই চেকআউট করে বেরিয়ে যাব৷ এই গোলমেলে হোটেলে আর এক একদিনও নয়৷
- আচ্ছা লোক তো মশাই আপনি! সাত দিনের বুকিং আপনার৷ কাল বেরোবো বললেই বেরোনো যায়? গেল বছর অনিন্দ্য সান্যাল নামে এক মালদার এক বিজনেসম্যান এই তাল করছিলেন৷ ভারি অমায়িক মানুষ, শুধু শুধু অকারণ নার্ভাস হওয়ার ধাত৷ অকারণ ভয়ে কাঠ হয়ে রইলেন, তারপর ভোরের দিকে হুট করে সুইসাইড করে বসলেন৷ সেই সুইসাইডকে কারা যে আবার ভূতের গলা টেপা কেস বলে চালালো, ডিসগাস্টিং৷ আরে বাবা গলায় সাসপিশাস দাগ দেখলেই হল? পুলিশ পোস্টমর্টেম করে ভূতের কেরদানির কোনও প্রমাণ পেল না কেন? আপনিই বলুন, এ'সব করা মানে জাস্ট হোটেলকে বদনাম করা নয়?
- আ..আমি..আমি পায়ে পড়ছি শশধরবাবু। আমি পুরো সাতদিনের হোটেল ভাড়া দিয়েই আমি যাব৷ আজ রাতটা শুধু যাতে কোনও..।
- বললাম তো...ভূতটূত সবই বদ লোকের ফাঁদা গপ্প আর খাজা গুজব৷ আপনি ঘুমোন৷ টাইগার আপনার উত্তরের জানালা পাহাড়া দিচ্ছে৷ এক্কেবারে বাঘের বাচ্চা। আর এ'দিকে আমি তো রইলামই৷ অ্যাট ইওর সার্ভিস৷
- ট..টাইগার? কুকুর বুঝি?
- না না৷ ও বেড়াল৷ মিশমিশে কালো, বুঝলেন৷ এক চোখ কানা হলেও ফেরোশাস৷
- আপনি প্লীজ আসুন৷
- সেই ভালো৷ দরজাটা জানালা প্লীজ বন্ধ করে রাখবেন ভালো করে৷ গুড নাইট অনিকেতবাবু৷ স্যুইট ড্রীমস৷
**
- বিনু।
- শশধরদা। কিছু বলবে?
- বদ লোকটাকে টাইট দিয়ে এসেছি৷
- সে কী! ঝামেলা করেছ কোনও? কাস্টোমারের সঙ্গে গোলমাল বাঁধালে? মারধোর করোনি তো?
- তার চেয়ে বেশি কাজ যাতে হয় সে ব্যবস্থা করে এসেছি৷ রুমসার্ভিসে গিয়ে তোকে এই অসভ্যতা ফেস করতে হবে আমি ভাবিনি রে৷ রিয়েলি সরি রে বিনু৷
- তোমার তো আর কোনও দোষ নেই৷ আর তাছাড়া আমার হাত থেকে ওর ব্যাগটা পড়ে গেল, তাতে নাকি দামী জিনিসপত্র ছিল৷ বড়লোক মানুষ, রাগের মাথায় না হয় একটা চড় কষিয়েই দিয়েছে৷ যাক গে৷ ও আমি কিছু মনে করিনি৷ তুমি খামোখাই এত...।
- এ'সব মানুষদের একটু কাঁপিয়ে দেওয়া দরকার৷ এমন বিটকেল বদলোকদের কান না মললেই নয়৷
- কিন্তু সাতদিনের বুকিং..কাল চলে গেলে তোমার হোটেলের লস হবে না?
- টাকাটাই তো সব নয়৷ তবে চাইলে সে ব্যাটা চোদ্দদিনের টাকা দিতেও রাজি এখন৷ কিন্তু ওই যে বললাম! অমন বদমাইসদের একটু গাঁট্টা না দিলেই নয়৷ যা, তুই শুয়ে পড় গিয়ে৷ আমি রিসেপশনে আছি৷

হ্যারিস থেকে কেপি



জর্জ হ্যারিস সাহেব ১৮৯০ থেকে ১৮৯৫ পর্যন্ত বম্বে প্রেসিডেন্সির গভর্নর ছিলেন। তার আগে ছিলেন ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন। এ দেশে ক্রিকেটকে দাঁড় করানোর ব্যাপারে হ্যারিস সাহেবের নাকি বিস্তর অবদান৷ কিন্তু সেই অবদানের গল্পগাছাগুলো রামচন্দ্র গুহ তাঁর 'আ কর্নার অফ আ ফরেন ফিল্ড' বইতে সুচারুভাবে খণ্ডন করেছেন৷ সাহেব নেহাতই বিদেশবিভুঁইয়ে এসে নিজেকে 'এন্টারটেনড'রেখেছিলেন দামী মদে আর ক্রিকেটে, তার খানিকটা প্রসাদ বড়জোর প্রজারা লাভ করেছিল। প্রজাদের ভালোমন্দ নিয়ে হ্যারিস সাহেবের তেমন মাথাব্যথা ছিল, এ বদনামও তাকে দেওয়া চলে না। তবে রাম গুহর বইটা নিয়ে লিখতে বসিনি, সে বই সবে পড়া শুরু করেছি।
এই হ্যারিস সাহেবের আত্মজীবনী ছাপা হয় ১৯২১ সালে, সে বইয়ের একটা অধ্যায় জুড়ে রয়েছে তাঁর বম্বে অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক কারণেই, রাজ্যশাসনের অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারস্যাপার নিয়ে নাকি সাহেব তেমন কালি-কাগজ খরচ করেননি, বরং সেই চ্যাপ্টার জুড়ে রয়েছে ক্রিকেট। সে'খানে সাহেব বলেছেন, "গাদাগুচ্ছের নেটিভ ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছে বটে, কিন্তু ব্যাটাদের ধৈর্যের বড়ই অভাব। কাজেই গোটা দেশ মিলে চেষ্টা করলেও এরা কোনওদিন আমাদের কোনও কাউন্টি দলের সমকক্ষ হতে পারবে না" (অনুবাদটা রসালো করতে গিয়ে সামান্য রঙ জুড়তে হলো বটে, তবে সাহেবের মূল বক্তব্য এ'টাই ছিল)।
ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইতে হল। আসল প্রসঙ্গে আসি। হ্যারিস সাহেবের আত্মজীবনী প্রকাশের তিরানব্বুই বছর পর আর এক ইংরেজ ক্রিকেট ক্যাপ্টেনের আত্মজীবনী ছেপে বেরোয়। কেভিন পিটারসেনের 'কে পিঃ দ্য অটোবায়োগ্রাফি'। তিরানব্বুই বছরের তফাতে থাকা দু'জন মানুষ বা দু'টো দেশের তুলনা টানা বাড়াবাড়ি, তবে বাড়াবাড়ি এড়িয়ে চলতে হলে এক্সেলে হিসেব কষতাম, ব্লগে বা ফেসবুকে পোস্ট লিখতাম না। কেপির বইজুড়ে জীবনটীবনের মত পাতি-বিলাসিতা নিয়ে তেমন খোলতাই কিছু নেই। গোটাটাই বিতর্কের গরমমশলায় ঠাসা। সঞ্জয় দত্তের জীবনী পড়েও এত গসিপের নাগাল পাইনি যতটা কেপির লেখা পড়ে পেয়েছি।
এমনিতেই যে লেখায় কোদালকে কোদাল বলা হয়, সে লেখা পড়ে বড় আরাম। কেপি মাঝেমধ্যে কোদালকে ডাবল ডেকার বাস বলেছেন, কাজেই এ বই এক্কেবারে যাকে বলে পপকর্ন-সম্মৃদ্ধ। যা হোক, কেপির বইয়ের যাবতীয় বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ 'ট্রিগার' হল আইপিএলের প্রতি পিটারসেনের নিখাদ ভক্তি ও ভালোবাসা। পিটারসেন বলছেন 'আইপিএল খেলেগা', আর ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেট সমাজ চেঁচিয়ে চলেছে 'অমন আদেখলাপনা ভালো নয় ভাইটি'। এ নিয়ে যে কত চুলোচুলি আর কত খামচাখামচি! তবে, আমার মনে হয় এই সমস্ত মশলা পেরিয়ে, আইপিএলের গুরুত্ব খানিকটা ঠাহর করার জন্য অন্তত এ বই পড়াই যায়। হ্যারিস আর পিটারসেনের মধ্যে যে ক'সমুদ্র জল যে গঙ্গা আর থেমস দিয়ে বয়ে গেছে, তা ভাবলেও কেমন লাগে যেন।
এ বই ঠিক সে অর্থে আইকনিক বায়োগ্রাফি হয়ে না উঠলেও আমার পড়তে বেশ লেগেছে। প্রায় প্রতি পাতায় রিভার্স স্যুইপ চালিয়ে গেছেন ভদ্রলোক। কুক, স্ট্রস, ভন; কাউকে তেমন তোয়াক্কা করেননি। আর অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার আর ম্যাট প্রায়্যোরকে প্রায় 'তুই খারাপ, তোর গুষ্টি খারাপ' লেভেলে গিয়ে তুলোধোনা করেছেন। তবে, আমার অন্তত পড়ে মনে হয়েছে কেভিন হিসেব কষে নিজের হয়ে ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেননি। মারকুটে মেজাজে প্রাণ খুলে নিজের কথা বলেছেন, পাঠকের সে'টা মন্দ লাগার কথা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ইংল্যান্ড ক্রিকেটের একটা বেশ গোলমেলে অধ্যায় সম্পর্কে বেশ কিছুটা খবর এ বই থেকে আদায় করা যায়। আর পাঠকের যদি কেপির প্রতিটি 'বোমা' পড়ার পাশাপাশি সেই ঘটনার ব্যাপারে সামান্য গুগল করে নেওয়ার ধৈর্য থাকে, তা'হলে 'রীডিং এক্সপিরিয়েন্স' আরও জমাটি হবেই।
আর একটা কথা। আমার ধারণা, নিজের জীবনীতে সৌরভও যদি কেপির মত এমন ফ্রন্টফুটে খেলতে পারতেন, তা'হলে সে বই অনেক বেশি সুখপাঠ্য হত।

পুজোর ছুটির দরখাস্ত



**সেপ্টেম্বর ১৮**

- স্যার৷
- বলে ফেলো ভাইটি।
- বিশ্বকর্মা পুজো ওভার৷
- বাঁচা গেছে৷ ফ্যাক্টরি শপফ্লোরে ওই হইহল্লা সহ্য করা দায়৷
- সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলল৷
- করেক্ট। কোয়ার্টার এন্ড৷ মারমার কাটকাট সিচুয়েশন৷ প্রডাকশনে জান লড়িয়ে দিতে হবে৷
- তা তো বটেই৷ অফ কোর্স। জানটান লড়িয়েটড়িয়ে দেব'খন৷
- দ্যাটস দ্য স্পিরিট ভাইটি। জীবনের দু'টো সত্য, বুঝলে। পারলে নোটবুকে লিখে রাখো৷ নাম্বার ওয়ান, জন্মিলে মরিতে হবে৷ নোট করছ তো? গুড৷ নাম্বার ট্যু, প্রডাকশন টার্গেট মিট না করলে কেস খেতে হবে।
- পোয়েট্রি স্যর৷ পোয়েট্রি৷
- গুড। এ'বার তা'হলে এসো৷
- আসি৷ ইয়ে, তবে তার আগে৷ স্যার আসল কথাটাই বলা হয়নি৷
- বলে ফেলো।
- না মানে, সামনে পুজো।
- সামনে কোয়ার্টার এন্ড৷ তারপর ক্যালেন্ডার ইয়ার এন্ড৷ তারপর ফিনান্সিয়াল ইয়ার এন্ড৷
- স্যার, দিন চারেকের ছুটির বড় দরকার৷ সপ্তমী টু একাদশী৷ মাঝে বিজয়াটা অটোমেটিকালি ছুটি৷
- সর্বনাশ৷ ভাই, পারলে শরীর থেকে দু'চার পিস হাড়গোড় খুলে দিয়ে দিতে পারি, ডাংগুলি খেলো৷ কিন্তু ছুটি চেওনা৷
- ওকে স্যার৷ পুজোটো তা'হলে জলে গেল৷
- ব্রাভো৷ ইউ আর আ সোলজার ভাইটি৷ সেল্যুট।
**
**অক্টোবর ৩**
- এই যে ভাইটি৷ তুমি বাড়ি ফেরার টিকিট কবে কেটেছ?
- বাড়ি ফেরার টিকিট?
- ওই যে৷ সপ্তমী টু একাদশী৷
- আপনি ছুটি রিফিউজ করলেন তো৷
- এই নেদু বুদ্ধি নিয়ে তুমি ফ্যাক্টরি শপফ্লোর সামলাচ্ছো কী করে ব্রাদার?
- মানে?
- আমি বস! তুমি জুনিয়র৷ আমার কাজ তোমায় টাইট দেওয়া৷ টাইট না দিলে টীম গোল্লায় যাবে৷ ডিসিপ্লিন ঘেঁটে যাবে৷ প্রডাকশন লাটে উঠবে৷ এ তো কমনসেন্স৷ আর ছুটি চাইলেই যদি হরির লুটের মত বিলিয়ে দিই, তা'হলে তো তোমার মত জুনিয়ররা মাথায় উঠে নাচবে হে৷
- আমি ঠিক বুঝছি না স্যার৷
- তোমার কাজ প্রয়োজনে ছুটি চাওয়া৷ মাইন্ড ইউ, অপ্রোয়োজনে নয়৷ প্রয়োজনে ছুটি চাইবে৷ আমার কাজ সেই হকের ছুটি রিফিউজ করা৷ ক্লীয়ার?
- জলের মত৷
- তারপর তোমার কাজ সে রিফিউজালে আটকে না পড়ে ছুটি ম্যানেজ হবেই ধরে নিয়ে সমস্ত প্ল্যান প্রগ্রাম সেরে ফেলা। আরে! বাপ ধমকে জিওগ্রাফি পড়তে বসাচ্ছে বলে লুকিয়ে কমিক্স পড়বে না?
- কমিক্সটা পড়াই উচিৎ বোধ হয়৷ তাই না?
- হান্ড্রেড পার্সেন্ট৷ তারপর শেষ মুহূর্তে দেখবে ছুটি ঠিক ম্যানেজ হয়ে গেছে৷ ওই যে বললাম৷ কমনসেন্স৷
- হেহ্৷ মানে কী বলে যে আপনাকে স্যার...থ্যাঙ্কিউ৷ আসলে পুজোয় বাড়ি ফিরতে না পারলে মনটা কেমন..। বুঝতেই পারছেন৷ বলছি স্যার, আপনার বাড়িও তো এখানে নয়৷ আপনি পুজোয় বাড়ি ফিরবেন না?
- ভাইটু৷ হেড অফ ফ্যামিলি হওয়ার যে কী জ্বালা। এ ফ্যাক্টরিতে আমার উপরে কেউ নেই, আমার ছুটি রিজেক্টও তাই কেউ করে না৷ আর যে ছুটির আবেদন নাকচ করার কেউ নেই, সে ছুটি আদায় করা যে বড় মুশকিল ভাই৷ তোমরা ক'জন বাড়ি যাও৷ ঘুরে এসো, আই উইল হোল্ড দ্য ফোর্ট৷ কিন্তু মনে রেখো, ছুটি থেকে ফিরে এসে কিন্তু তুমি প্রডাকশনের জন্য বলি প্রদত্ত। মনে থাকবে?