Sunday, April 11, 2021

ওই মেজদাদা


- এই যে, চাঁদু৷ ইদিকে এসো দেখি মাল৷ 

- আমায় ডাকছেন? 

- ওরে আমার নেকুচাঁদ হুশিয়ার রে৷ রাস্তায় এখন আর আছেটা কে। আয় দেখি ইদিকে। 

- কী ব্যাপার দাদা?

- ওরে আমার সোন্টুমনা রে৷ "কী ব্যাপার দাদা"! ভোম্বলমণি আমার৷ তা বাবু, এই ভরদুপুরে এ পাড়ায় ঘুরঘুর করছ কেন? তুমি তো এলাকার ছেলে নও। 

- ইয়ে, আসলে..।

- আসল নকল আবার কী৷ এ পাড়ায় কী মতলবে সোনা?

- না মানে, ওই একটা দরকারে এসেছিলাম..।

- কী দরকারে?

- থাক। তেমন কিছু নয় স্যার৷ এই আমি চলে যাচ্ছি। 

- চলে যাবি?

- এই এখুনি। আসি?

- নাহ্৷ অত তাড়া কীসের৷ দাঁড়া, আগে একটু আপ্যায়ন করি৷ 

- না না। ও'সব পরে কোনওদিন হবে'খন৷ আমি বরং আজ আসি৷ হঠাৎ একটা জরুরী কাজ মনে পড়ে গেছে৷ ভালো থাকবেন, কেমন? আর ওয়েদার চেঞ্জের সময়৷ জামার বোতামগুলো খোলা রাখবেন না প্লীজ, চট করে বুকে ঠাণ্ডা বসে যেতে পারে৷ ঠিক আছে? আজ আসি৷ 

- শোনো ভাই ভিজেবেড়ালকুমার৷ ফের যদি এ পাড়ায় দেখি, তা'হলে একটা ঠ্যাং খুলে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেব রেখে নেব৷ 

- আমি..আমি..আমি..।

- নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি..কথাটা মনে থাকবে? 

- আ..আ..আ..।

- রোজ তুমি দত্তবাড়ির সামনে গিয়ে ঘুরঘুর করবে৷ আর রঞ্জনা বারন্দায় এসে তোমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসবে, সে'টা আমি সহ্য করব না। 

- আর করব না স্যার। 

- শোন শালা। আমি রঞ্জুর মেজদাদা। তোর জন্য দুপুরে রঞ্জুর দুপুরের ঘুম বন্ধ হয়ে গেছে৷ তা'তে ওর স্কিনের গ্লেজ নষ্ট হচ্ছে, জানিস?

- আমি আর ও'মুখো হব  না স্যার, শুধু আমার কলারটা যদি রিলিজ করে দেন..।

- কলার বোন খুলে নিচ্ছি না এই তোর বাপের ভাগ্যি৷ 

- থ্যাঙ্কিউ স্যার৷ থ্যাঙ্কিউ৷ গ্রেটফুল টু ইউ৷ 

- শোন৷ আজ শুধু সাইকেলের চাকার হাওয়া খুলে ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু ফের যদি এ'পাড়ায় দেখি..তবে..।

- ঠ্যাং৷ ঠ্যাং খুলে নিয়ে নেবেন। 

- মনে রাখিস, আমি এ পাড়ার আর্সের প্রেসিডেন্ট৷

- আর্স? আর্স মানে তো..ইয়ে..ওই..আর্স মানে তো পশ্চাদ্দেশ..।

- কী? তবে রে রাস্কেল! দেব তোর পশ্চাদ্দেশে ছাপ মেরে?  আর্স হচ্ছে শর্ট ফর্ম৷ এ আর এস-য়ের৷ অ্যান্টি রোমিও স্কোয়্যাড৷ আমি এ পাড়ার স্কোয়্যাডের প্রেসিডেন্ট। কাজেই আমার সামনে মুখ সামলে। একদম ওপর-চালাকি নয়৷ 

- সরি স্যার৷ আমি জানতাম না৷ এ ভুল আর হবে না৷ 

- একদিন সব্বাই জানবে৷ জানবেই৷ জয় হিন্দ৷ 

- জয় হিন্দ৷ 

- এ'বার এসো চাঁদ৷ এসো।

Sunday, April 4, 2021

খবরটবর


- এ কী! এ'সব কী দেখাচ্ছে মামা?

- খবর পড়ছে। 

- খবর? ও'টা খবর পড়া?

- লেট নাইনটিন এইটিজ তো। তখন এ'টাই ছিল স্টাইল৷

- তুমি শিওর মামা? এ'টা খবরই পড়ছে?

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। একসময় নিজের চোখে দেখেছি এ'সব৷

- নাহ্৷ কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে৷ 

- স্পষ্ট শুনছিস তো৷ রয়েসয়ে খবরাখবর পড়ে জানাচ্ছে। 

- এমন নিরামিষ মোডে?

- সে'সব গোলমেলে সময় ছিল রে ভাগ্নে৷ পাতে তখন আমিষ থাকলে কেউ গাঁইগুঁই করত না, অথচ খবরে টোটাল নিরামিষ। 

- স্ট্রেঞ্জ। রীতিমত অ্যানার্কি তো!

- টোটাল৷ 

- এ'টা কোনও খবর পড়া হল? প্যানেলিস্ট কই?

- নেই৷ শুধু নিউজরীডার।

- লে হালুয়া৷ তা'হলে ঝগড়া-খামচাখামচি করবে কারা?

- ও'সব ছিল না রে ভাগ্নে৷ স্রেফ ম্যাদা মেরে যাওয়া সুরে খবর পড়ে যাওয়া৷ 

- প্যানেলিস্ট না থাকলে, সঞ্চালক চেল্লাবে কার ওপর? চেল্লানো না হলে খবরটা স্মুদলি পরিবেশিত হবে কী করে! আউটরেজাস৷ আর মামা, সঞ্চালক রেগেমেগে কথা বলছে না কেন? 

- কী আর বলব রে, সে'সব প্রিহিস্টোরিক এরা। ম্যাড়মেড়ে খবর পড়াই তখন রীতি৷ আদত ইভোলিউশন হল তো তার পরে৷ মিউমিউ খবরের ঘুমপাড়ানি কাটাতে এলো অ্যাকশন-প্যাকড, ঝগড়ায় ভরপুর- রগরগে মেগাসিরিয়াল। আর সে মেগাসিরিয়ালকে ডেসিবেল-মাত দিয়ে তৈরি হলো আধুনিক নিউজরুম। 

- থ্যাঙ্কগড, দ্য এজ অফ ঘ্যানঘ্যানানি-নিউজ ইজ ওভার! 

- থ্যাঙ্কগড, কলারটানাটানি কালচার ইজ দ্য নিউনর্মাল! 

**

(মূল ছবিটা @IndiaHistoryPic ট্যুইটার হ্যান্ডেল থেকে পাওয়া)।

ইয়ের ইয়ে


সে যাকে বলে এক প্রি-হিস্টোরিক সন্ধ্যে৷
মগজ মাঝেমধ্যে স্মৃতির অ্যালবামে  ব্যাকগ্রাউন্ড-স্কোর জুড়ে দেয়, এ ক্ষেত্রে যেমন জুড়েছে পান্নালালের শীতলপাটি মার্কা গুনগুন - "যেথা আছে শুধু ভালোবাসাবাসি, সেথা যেতে প্রাণ চায় মা"। 

সে'দিন৷ ঘাসের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে, দু'চারজন বন্ধুর সঙ্গে বেশ রগরগে পলিটিকাল আড্ডা জমেছিল। সে ঘাসের গন্ধের সঙ্গে বিকেলের ফিনফিনে হাওয়া আর কাগুজে কাপের কফির সুবাস মিলেমিশে মনের মধ্যে আলসেমির এক প্রকাণ্ড ডাইনোসর তৈরী হয়েছে৷ 

দুম করে, গা-জোয়ারী গল্প-আড্ডা-তর্কাতর্কি থামিয়ে, পাশে বসা এক বন্ধু হঠাৎ বলে উঠেছিল "কলকাতা আমরা নিয়ে যতই গজরগজর করি, শহরটার মধ্যে বেশ আলাদাই একটা ইয়ে  আছে, তাই না রে ভাই"? এদ্দিন পর হঠাৎ সেই ইয়ের উল্লেখ মনে পড়ায় বুকের মধ্যে বেশ একটু মনোরম ইয়ে তৈরি হল। পাশাপাশি মনকেমন৷ 

প্রতিটি শহর, গাঁ, পাড়া, গলি, পার্কের বেঞ্চি, ঘাটের সিঁড়ি বা ছাতের কোণেরই একটা নিজস্ব ইয়ে রয়েছে, সম্ভহবত।  সে ইয়ের নাগাল একবার পেলেই ভালোবাসিয়েরা বর্তে যান, বরফিস্টরা গলে হদ্দ হয়ে বয়ে যান, পাথুরিয়াঘাটা-মুখো মিনিবাস কুসুমুপুরে এসে জিরোয়৷ সে ইয়ে স্পর্শ করতে পারলেই এস্পারওস্পার৷

Monday, March 29, 2021

প্ল্যান-প্রোগ্রাম


- এই যে ভুলোদা৷ দোলের দিন সন্ধ্যেয় একটু আড্ডা-আড্ডা গা করছিল, তাই ভাবলাম তোমার বাড়িতেই হানা দিই..। 

- আরে বিট্টা যে৷ আয় আয় আয়৷ কদ্দিন পর এলি রে ভাই..কদ্দিন পর।

- আছ কেমন?

- ও'সব প্লেস্যান্ট্রি এক্সচেঞ্জ পরে হবে'খন৷ আগে বল কী খাবি...কবজি না ডুবিয়ে নিস্তার পাবি না কিন্তু বিট্টে..এই বলে রাখলাম৷

- হে হে হে হে, সে হবে'খন ভুলোদা৷ অত ব্যস্ত হয়ো না তো..আগে দু'টো সুখদুঃখের গপ্প হোক!

- আরে খাবারদাবার জম্পেশ না হলে আড্ডা জমে নাকি?

- জমে না, তাই না?

- একদমই না৷ তা যদি খাবার অর্ডারই করি বিট্টা, কী প্রেফার করবি - চাইনিজ না মুঘলাই? স্টার্টারে চাইনিজ রেখে যদি মেনকোর্সে ইন্ডিয়ান রাখি..।

- আরে তুমি তো গোড়াতেই শশব্যস্ত হয়ে পড়লে ভুলোদা..শোনো, দুপুরে লাঞ্চটা ভালোই হয়েছে৷ এখনই তেমন খিদে নেই..খানিকক্ষণ গপ্পগুজব করে না হয়...। 

- নো স্যার৷ খাওয়ার ডিসিশিন আগে৷ তারপর আড্ডা৷ তবে লাঞ্চটা যদি তোর ওজনদার হয়ে থাকে,  তা'হলে চাইনিজ আর মুঘলাই-য়ের মিক্সটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে তাই না৷ এমনিতে ভাবছিলাম ড্রাই চিলি প্রন, চিকেন স্প্রিংরোল আর গার্লিক ফিশ স্টার্টারে। তারপর ডিনারে বিরিয়ানি, মাটন রেজালা আর চিকেন চাপ৷ কী চমৎকার হত ব্যাপারটা! তবে খিদে যখন কম, তখন ওভারডোজ ঝেড়ে লাভ নেই৷ চাইনিজটা বাদই থাক৷ অনলি মুঘলাই ম্যাজিক..কী বলিস?

- সেই ভালো ভুলোদা৷

- অবিশ্যি, কাল আবার সোমবার৷ তোর অফিস আছে৷ বিরিয়ানি রেজালা চাপ ব্যাপারটা গুরুপাক হয়ে যেতে পারে৷ 

- গুরুপাক, ইয়ে৷ হ্যাঁ মানে..।

- রোব্বারের লাইট ডিনার আর লম্বাঘুম ইজ এসেনশিয়াল ফর আ চমৎকার মনডে৷ তার চেয়ে বেটার প্ল্যান বলি শোন৷

- আহ ভুলোদা, তুমি বেশিই চিন্তাভাবনা করে ফেলছ৷ 

-  ফ্রিজে ভালো রুই আছে৷ জম্পেশ করে কালিয়া বানিয়ে নিই৷ আর তার সঙ্গে পোলাও৷ রান্নাঘরে রান্না আর আড্ডা দুইই জমে যাবে৷ 

- বাহ্। বাহ্৷ সেই ভালো।

- হিপ হিপ..?

- হুর্...।

- এহ্ হে! 

- ক..কী হল?

- না না৷ একটু ক্যালকুলেশনে ভুল হয়ে গেছে ভাই বিট্টে৷ ফ্রিজে রুই নেই, শিঙি আছে। 

- মরা শিঙি? ফ্রিজে?

- না না৷ রান্না করা শিঙি৷ আলু পটল দেওয়া৷ পার্সোনাল রেসিপি৷ 

- শোনো না ভুলোদা...ডিনারের ব্যাপারটা বরং বাদ থাক, প্লীজ৷ 

- তোর খাওয়াদাওয়া নিয়ে হাজার রকমের বাতিক রয়েই গেল রে বিট্টা৷ খাবার কথা শুনলেই তো গায়ে জ্বর আসে৷ তোর বয়সে আমি কলসি কলসি পোলাও আর হাঁড়ি হাঁড়ি মাটন হাপিশ করে দিচ্ছি৷ আর তুই ডিনারের প্ল্যানেই নার্ভাস৷  বেশ বেশ৷ খাবারদাবারের ব্যাপারে আমি জোর করি না৷ তার চেয়ে বরং শিঙাড়া আর রোল নিয়ে আসি৷ কেমন? সঙ্গে রসগোল্লা৷ 

- আবার এর জন্যে বেরোতে যাবে কেন ভুলোদা৷ 

- আরে, দু'মিনিটে যাব আর আসব৷ তবে..।

- তবে?

- আজ তো দোল৷ রানা কি রোলের দোকানটা খুলবে?

- রানাদার রোলের দোকান? খুলেছে৷ আসার পথেই দেখে এলাম তো৷ 

- উঁহু৷ মন সায় দিচ্ছে না৷ উৎসবপার্বণের দিন৷ কাজেই হাভাতে বাঙালির ডিমান্ড হাই৷  এই দিনটায় খাবারদাবারের দোকনগুলো বাসি জিনিসপত্র চালাবার তাল করে৷ 

- তা..তা হবে হয়ত৷ 

- আলবার তাই৷ এ যুগে আর কাউকেই ভরসা করা যায় না রে ভাই। ডিমে প্লাস্টিকের কুসুম৷ পচা মাংস..উফ ব্যাব্যাগো।

- তা ঠিক৷ ঠিক৷ 

- তুই কি শিঙাড়া ব্যাপারটাকে সেফ ভেবেছিস?

- সেফ নয়?

- বাজারের যত পচা আলু, যেগুলো আমি আর তুই বেছে সরিয়ে রাখি৷ সে'গুলো কোথায় যায় জানিস?

- কোথায়?

- স্ট্রেট টু শিঙাড়াস৷ সাধে কি বাঙালির অম্বল-বুকজ্বালা এমন স্ক্যান্ডালাস ভাবে বেড়ে গেছে। 

- ভুলোদা, খাওয়াদাওয়াটা আজ বাদই থাক না...গল্প হলেই তো হল। 

- কিছুই খেতে চাইছিস না দেখছি৷ আমার আবার কাউকে ভালো করে খাওয়াতে না পারলে মন ভরে না কিছুতেই৷ 

- তুমি বরং কড়া করে এক কাপ কফি খাওয়াও৷ 

- ক্যাফেইন? তার চেয়ে ফলিডল চাইলে পারিস বিট্টা। খেলে খাবি হাই কোয়ালিটির চা৷ আর্ল গ্রে চলবে?

- অফ কোর্স৷

- এক্সলেন্ট চয়েস৷ কিন্তু বিট্টা রে, আমার পছন্দের আর্ল-গ্রে কিছুতেই পাড়ার দোকানটা সাপ্লাই দিতে পারছে না৷ আর চায়ের ব্যাপারে কোনও কম্প্রোমাইজ আমি বরদাস্ত করতে পারিনা৷ 

- ভুলোদা, আমার আচমকা মনে পড়ল৷ একটা জরুরী কাজ আমি ভুলেই মেরে দিয়েছিলাম৷ মাইরি৷ আড্ডাটা বরং না হয় অন্য কোনওদিন..।

- অগত্যা৷ তাই হোক৷ তবে শোন, নেক্সট দিন কিন্তু পাত পেড়ে খেতে হবেই৷ আর সে'দিন তোর কোনও গাঁইগুঁই শুনব না৷ মাটন, দেশী মুর্গি আর অন্তত তিন রকম মাছ৷ প্লাস হাইক্লাস রাবড়ি৷ রিফিউজ করলে গাঁট্টা খাবি৷ 

- বেশ বেশ, তাই হবে'খন৷ আজ আসি?

- যাবি? আয়৷ তবে নির্জলা বেরিয়ে যাবি? এদ্দিন পর এলি বাড়িতে তুই বিট্টা। এদ্দিন পর।

- আচ্ছা, এক গেলাস জলই দাও না হয়৷ 

- অফকোর্স। আচ্ছা শোন বিট্টা, আজ ওয়ান-ডে ম্যাচটা দেখতে গিয়ে খাওয়ার জলটা ভরা হয়নি৷ শোন ভাই, রান্নাঘরে গিয়ে দেখ বাঁদিকের দেওয়ালে ফিল্টার লাগানো আছে৷ আর এই যে দু'টো বোতল৷ চট করে ভরে আন তো দেখি৷ আর রান্নাঘর থেকে আসার সময় একটা গেলাসও নিয়ে আসিস৷ কেমন? জল না খেয়ে খবরদার যাবি না কিন্তু!

Thursday, March 25, 2021

গানের দাওয়াই


- এই যে৷ স্যার! শুনেছেন কী? ওরা গান গাইছে৷

- বাহ্৷ বাহ্৷ কদ্দিন গজল-টজল শুনিনা ভাই সেক্রেটারি৷

- আরে! আপনার এগেইন্সটে গান গাইছে৷ সং অফ প্রটেস্ট!

- তা'তে কী?

- আপনার লেগপুল করে গান গাইছে যে!

- তা'তেই বা কী? 

- আরে! আরে আপনাকে ইনসাল্ট করে গান বেঁধেছে!

- এই সেরেছে! তুমি কি নিশ্চিত সেক্রেটারি?  ও গানে আমায় ইনসাল্ট করা হচ্ছে?

- রীতিমতো জুতো মারা হচ্ছে৷ এর একটা বিহিত না করলে আপনার নাকের ডগায় ফোস্কা পড়বে৷ 

- আরে সামান্য গানই তো গেয়েছে৷ সৈন্যসামন্ত তো জড়ো করেনি৷ তুমি বড় খামোখা চিন্তা করো সেক্রেটারি। 

- দেখুন স্যার৷ বন্দুক চালালে কামান দাগা যায়৷ তর্ক জুড়লে খিস্তি করা যায়৷  কুস্তি করলে লেঙ্গি মারা যায়৷ কিন্তু গান গাইলে মহামুশকিল মাল্টিপ্লাইড বাই কেলোর কীর্তি৷ কলার টেনে মানুষের পিলে চমকানো যায়, সুর ভোলানো মুশকিল৷ 

- গান কী ডেঞ্জারাস ভাই সেক্রেটারি! 

- টোটাল বিষ!

- তবে? উপায়? কানটান মুলেটুলে যদি...?

- এ কী ক্লাস-পালানো ছেলেছোকরা পেয়েছেন? 

- ছেলেপিলে লেলিয়ে ওদের হারমোনিয়াম সরিয়ে নেওয়া যায় যদি? 

- কাঁচকলা হবে৷ একজনের হারমোনিয়াম কাড়লে দশজন বাক্স বাজিয়ে গান জুড়বে৷ শেষে পাড়ার জলসা রুখতে গিয়ে ডোভারলেন বসে যাবে৷ 

- টেরিফিক ক্যালামিটি৷ তা'হলে কী হবে হে? মগজধোলাই যন্ত্র?

- ধ্যাত্তেরি৷ ও'সব মান্ধাতা আমলের জিনিস আপনার গ্রেট-গ্রেট-গেট গ্র‍্যান্ডফাদারের আমলে চলত স্যার৷ ও'সব প্রিহিস্টরিক কন্সেপ্ট শুনে লোকে ফিকফিক করে হাসবে৷  

- তা'হলে কি কোনও উপায়ই নেই ভাই সেক্রেটারি?

- উপায়? উপায় আছে৷ 

- আছে? মাইরি?

- আলবাত আছে৷ ওরা নতুন নতুন গান বাঁধবে, আর আমরা নিত্যনতুন নিউজচ্যানেল খুলব! 

- নিউজচ্যানেল?

- ওদের তৈরি গানের ভাইরাসকে কাবু করার একমাত্র ভ্যাক্সিন - আমাদের তৈরি নিউজ৷ পারমিশন দিন স্যার, একটা নতুন নিউজচ্যানেল আর চারটে নতুন নিউজপোর্টাল শুরু করি৷

- এইত্তো চাই৷ এতেই তো ইকনমিক প্রগ্রেস ভাই সেক্রেটারি! সাবাশ! সাবাশ!

- থ্যাঙ্কিউ স্যার৷ থ্যাঙ্কিউ। 

মনখারাপিস্ট বনাম মামলেটিয়ে


মনখারাপ জমাট বাঁধলে সে এসে পিঠে হাত রেখে বলবে, "যত্ন করে জোড়া ডিমের মামলেট ভেজেছি ভাই৷ এসো, ব্যালকনিতে বসে খাবে"।

আমি মুখভার করে বলব "এই অসময়ে আবার মামলেটের কী দরকার"!

সে বলবে, "অসময়েই তো আমরা গীতবিতান হাতড়ে মরি৷ অসময়েই তো আমরা বাউল শুনে আঁকুপাঁকু করি৷ অসময়েই তো মনের শ্যামল মিত্র ভ্যাক্সিনের প্রয়োজন হয় ভায়া৷ সুসময়ে তো নিউজচ্যানেলকেও রাগসঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা যায়৷ এই ডিমভাজা তো সুসময়ের অমলেট নয়, বরং দুঃসময়ের মামলেট৷ তোমার জন্য সময়টা গোলমেলে বলেই তো এমন যত্ন করে ফার্স্টক্লাস ডিম ভেজে আনলাম"৷

গড়িমসি করে মামলেটের প্লেটখানা হাতে নিয়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে যাব৷ মোড়ায় বসে ইতিউতি চামচ চালিয়ে মামলেটে কাটাকুটি শুরু করব।

মুখে দু'এক টুকরো ডিমভাজা পড়তেই গায়েমুখে মিঠে হাওয়া এসে ঠেকবে৷ তখন সে শুধোবে, " কী ভায়া, কেমন"?

আমি তৃপ্তি চেপেচুপে রেখে দায়সারাভাবে মাথা নাড়ব৷ 

সে বলবে, "এ'বার একটু বিভূতিভূষণ রিসাইট করব"।

আমি মৃদুকণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়ে বলব, "তার আবার কী দরকার"!

সে বলবে, " ভায়া, কলকাতায় বইমেলার কী দরকার? মহাভারতে কেষ্টরই বা কী দরকার ছিল? এ'সব প্রশ্ন করতে নেই হে৷ করতে নেই৷ বিভূতিভূষণের আবার দরকার-অদরকার কী৷ সাপ্লাই যত বাড়বে, মার্জিনাল ইউটিলিটি তত লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরের দিকে যাবে৷ 

তারপর ক্রমশ টের পাব যে মামলেটে-বিভূতিভূষণে মন তরতাজা হয়ে উঠছে৷ মনের ঘোলাটে ভাব কেটে যাচ্ছে৷ বুকের মধ্যে দিব্যি হাতেগরম ভালোলাগা তৈরি হচ্ছে৷ 

দু'চার পাতা আরণ্যক পড়ার পর সে কাছে এসে বলবে, "মন কেমন এখন ভায়া"? ততক্ষণে আমার মুখে দিব্যি আলো-আলো হাসি - মান-অভিমান গায়েব, খিটখিট ভ্যানিশ। 

সে বলবে, "এ'বার তা'হলে আসি ভাই? পরেরবার তোমার মনখারাপের ঘুমের স্বপ্নে এসে লুচি-আলুভাজা খাইয়ে যাব৷ আর বিভূতিভূষণের বদলে পূর্ণেন্দু পত্রী৷ কেমন"?

সেই আশ্বাস দিয়ে, স্বপ্নের সেই  অমায়িক ডিম-ভাজিয়ে আমিটি কেটে পড়বে৷  মনখারাপ-কেটে বেরিয়ে আসা যে আমি পড়ে থাকব, তার মনের মধ্যে "মন্দ কী আর৷ ভেসে যাইনি তো এখনও"-মার্কা সুবাতাস।  

Saturday, March 20, 2021

গোলেমালে

চারপাশের সমস্ত কিছু কেমন যেন স্বপ্নের মত ঠেকছিল। কেমন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ কল্পলোক না কী যেন বলে? তেমনই কিছু একটা যেন৷ উপযুক্ত ইমোজির অভাবে নিজের মনের অস্থির অবস্থাটা সঠিকভাবে কাউকে বুঝিয়ে উঠতেও পারছিলাম না৷ 

চারপাশটা মন দিয়ে দেখেশুনে স্তম্ভিত হতেই হলো - এ যে কোয়াড এইচ-ডি ডিস্প্লেকেও হার মানাচ্ছে৷ সবকিছুই কী  স্পষ্ট, যেন চাইলেই ছুঁতে পারব৷ ওই দেখো, সত্যিই ছুঁতে পারছিলামও৷ বালিশের ওয়াড়, বিছানার চাদর, খাটের পাশের টেবিলের ওপর ওপরে সাজানো ফুলদানি - হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে৷ ও মা, সে ফুলদানিতে আবার রজনীগন্ধা- রীতমত ছোঁয়া যায়, সে মিষ্টি সুবাসও নাকে আসছে বইকি। কিন্তু ছুঁলে কোন কাঁচকলাটা হবে? ফুলদানি বা রজনীগন্ধা কোনওটাই তো পিঞ্চ-টু-জুম করা যাচ্ছিল না। অস্বস্তিটা ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছিল৷ 

এমন সময় পাশের ঘর থেকে খোকা দুদ্দাড় করে ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরল৷ আমার আদরের খোকা, দেখেই বড় সাধ করল লাভ্ রিয়্যাকশন দিতে। ও মা, সে উপায়ও নেই৷ বাধ্য হয়ে রসকষহীন একখানা চুমু বসিয়ে দিতে হল খোকার গালে৷ এরপর গজরগজর করতে করতে ঘরে এসে ঢুকলো বউ। সে আবার আর এক সমস্যা- চারপাশ হাতড়েও মিউট করার কোনও বোতাম খুঁজে পেলাম না৷ অগত্যা ওর দিকে তাকিয়ে দু'টো কথা বলতে হলো৷ পিং-য়ের বদলে 'ওগো হ্যাঁগো' - এক্কেবারে ক্যালামিটি যাকে বলে৷ ওর দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আবার অস্বস্তিটা দ্বিগুণ হল, টের পেলাম যে ইন্সট্যা-ফিল্টার ছাড়া একে-অপরের মুখ আমরা বহুদিন পর দেখছি। গোড়ার দিকে তো বলতে যাচ্ছিলাম "নাইস ডিপি, কখন চেঞ্জ করলে"? কিন্তু শেষ মুহূর্তে সামলে নিলাম! 

ক্রমশ কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠছিল৷ খানিকক্ষণ লগ আউট বোতাম খুঁজলাম কিন্তু তারপর মাথায় এলো অ-স্ক্রিন দুনিয়ার এই এক বিশ্রী সমস্যা - লগঅফ সাইনআউটের কোনও সুযোগ নেই৷ দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম৷ চেনা পৃথিবীটা ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল৷ ওই ভাবে আর আধঘণ্টা থাকতে হলেই নিজেকে ফর্ম্যাট করে ফেলতে হত। তবে বিশ্রী কোনও গোলমাল ঘটার আগেই ডাউন হওয়া হোয়্যাটস্যাপ, ফেসবুক আর ইন্সট্যাগ্রাম সচল হল৷ জটিল ভাষায় বলতে গেলে - ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল৷ সহজভাবে বললে - ফিলিং রিলীভড উইথ বৌ, খোকা অ্যান্ড আ বিলিয়ন আদার্স৷

ওই মেজদাদা

- এই যে, চাঁদু৷ ইদিকে এসো দেখি মাল৷  - আমায় ডাকছেন?  - ওরে আমার নেকুচাঁদ হুশিয়ার রে৷ রাস্তায় এখন আর আছেটা কে। আয় দেখি ইদিকে।  - ...