Saturday, January 21, 2017

ফতুয়া

মোহনবাবু রোজকার অভ্যাস মতই দিব্যি পায়চারি করছিলেন বাড়ির সামনের অন্ধকার গলিটায়। রাতে খাওয়ার পর একটু হাঁটাহাঁটি করলে ডাইজেশন ত্বরান্বিত হয়। এর মাঝে হঠাৎ কেন যে  পকেট থেকে সিগারেটের বাক্সটা বের করে একটা গোল্ডফ্লেক ঠোঁটে ঝোলাতে গেলেন।

ঠোঁটের ঝুলন্ত সিগারেটের ডগা তো আর ফস্‌ করে আপনা থেকে জ্বলে যাবে না। দেশলাই চাই। কিন্তু পকেটে দেশলাই নেই। অবশ্য পকেটে দেশলাই নেই বলে চিন্তা হচ্ছে না। মোহনবাবুর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ অন্য কারণে। সিগারেটের প্যাকেট তাঁর পকেটে এলো কী করে? সিগারেটের ধোঁয়া যে তাঁর অসহ্য লাগে।

সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে শুরু হয়েছিল। তারপর তিন দিন ধরে থেকে অচেনা রুমাল, বোরোলিনের টিউব, নস্যির ডিবে; এমন অসংখ্য খুচরো জিনিসপত্র মোহনবাবুর ফতুয়ার বাঁ পকেটে এসে জমা হওয়া শুরু হল। আচ্ছা ফ্যাসাদ। মোহনবাবুর বুকে সর্বক্ষণ ঢিপঢিপ, এই বুঝি ফের উটকো কিছু তাঁর পকেটে এসে উদয় হলো।

মোহনবাবু ফতুয়া পরা ছেড়েই দিলেন। বলা বাহুল্য, যে ছাড়তে বাধ্য হলেন। দু'টো দশটাকার নোট, ক্যারমের স্ট্রাইকার, হোমিওপাতির শিশি পর্যন্ত ঠিক ছিল। সেদিন দুপুরে ছাতে পায়চারি করার সময় আচমকা ফতুয়ার বাঁ পকেট থেকে বেরোলো একটা পোস্টকার্ড। "প্রাণের মৃন্ময়ী" বলে লেখা। হাতের লেখা গোলমেলে, তবে পড়তে অসুবিধে হয় না। প্রেমিক জানাচ্ছেন যে মৃণ্ময়ীকে না পেলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। মৃণ্ময়ীদেবীর ঠিকানাও লেখাই ছিল কিন্তু পোস্ট করা হয়নি। একবার ভাবলেন এই মৃন্ময়ী সান্যালের বাড়ি পর্যন্ত গিয়ে তদন্ত করে আসবেন। তারপর ভাবলেন "ধুর ছাই কাঁচকলা"। চিঠিটাকে তোষোকের তলায় কবর দিলেন মোহনবাবু। আর সেদিন থেকে ফতুয়া পরা ছাড়লেন। স্রেফ হাফ শার্ট। রাতে শোয়ার সময় স্যান্ডো গেঞ্জি।

কিউরিওসিটি কিল্‌স দ্য ক্যাট। ফতুয়াহীনতার তিন নম্বর দিনে আর কৌতূহল দমন করতে পারলেন না মোহনবাবু। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে অফিসের জামা কাপড় ছেড়েই লুঙ্গির সঙ্গে গায়ে চাপালেন তাঁর পছন্দের নীলে হলুদ ফুল ফুল ছোপের ফতুয়া। গড়িয়াহাটের ফুটপাথ থেকে কেনা। আধ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করতে হল না। বাঁ পকেট থেকে এবার বেরোলো মানিব্যাগ। মানিব্যাগে ভিজিটিং কার্ড আর কোম্পানি আই কার্ড। ভাস্কর সামন্ত। বাড়ি গড়িয়া।

ভাস্করবাবু বেশ ঘাবড়ে গেলেন ফোনটা পেয়ে। কোথাকার কে মোহন দত্ত! সে জানলে কী করে যে তাঁর সিগারেট, নস্যির ডিবে, ক্যারমের স্ট্রাইকার হারিয়ে যাচ্ছে ? হারিয়ে যাওয়া মৃণ্ময়ীকে লেখা চিঠিটাই বা ও পেল কী করে? অবিশ্বাস করার কারণ নেই, পুরো চিঠিটা পাঠ করে শুনিয়েছেন সে ভদ্রলোক।

মোহন দত্তের সঙ্গে দেখা করে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার যেটা হল সে'টা হচ্ছে যে এদ্দিনের ধন্দটা কেটে গেল। গোটা  ব্যাপারটা এখন ভাস্করবাবুর কাছে জলবৎ । যাক্‌। ফতুয়ার ডান পকেটে জিনিস রাখা মাত্রই হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মোটেও ভালো ঠেকছিল না। যা হোক, ব্যাপারটা এইবার সাফ। তবে এই মোহন দত্ত লোকটা বিশেষ সুবিধের নয়। মৃণ্ময়ীকে লেখা চিঠিখানা পুরোটা পড়ার সাহস ও পায় কোথা থেকে?

মাঝেমধ্যেই এই ভূতুড়ে ব্যাপারটা আজকাল ঘটছে। মৃণ্ময়ী বুঝে উঠতে পারছে না এটা কেন হচ্ছে। এটা কি কোনও ব্যামো? কে জানে। তবে দুমদাম করে তার চোখের সামনে দিয়ে খুচরো সব জিনিস মুহূর্তের জন্য ভেসে যাচ্ছে। হুশ্‌ করে উদয় হয়ে ফুস্‌ করে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। অনবরত। কখনও বোরোলিনের টিউব, কখনও সিগারেটের বাক্স, কখনও পোস্টকার্ড। মাঝে দু'তিনদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু আজ আবার মৃণ্ময়ীর চোখের সামনে দিয়ে একটা মানিব্যাগ সাঁইসাঁই করে উড়ে চলে গেল। মানিব্যাগের চামড়ার রঙ আবার ক্যাটক্যাটে খয়েরী। ভাস্করের মানিব্যাগটার কথা মনে পড়ে গেল মৃণ্ময়ীর। ভাস্কর এমন ভাবে চুপ করে গেল কেন? এই তাঁর ভালোবাসা?

মৃন্ময়ী নামটা কিছুতেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলেন না মোহনবাবু।

১০
ভাস্করবাবু জানেন যে তাঁর চোখ তাঁকে ঠকাবে না। কোয়ালিটি রেস্টুরেন্টের কেবিনে যার গায়ে বারবার হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছিলো মৃণ্ময়ী, সে যে ওই মোহন দত্তই, সে'টা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই ভাস্করবাবুর। ছ'টা টেবিল দূরে বসেও ব্যাপারটা তাঁর কাছে দিনের আলোর মত স্পষ্ট।

১১
টিউবলাইটের ফেলে দেওয়া লম্বা নলের মত প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিয়ে একটা ম্যাজিক সুড়ঙ্গ বানিয়েছিল বিট্টু। আর সেই সুড়ঙ্গের এক দিকে চোখ রেখে অদ্ভুত সব জিনিষ পত্রের ছুটে চলা দেখতে পারত সে। কী দারুণ। কোনও দিন নস্যির ডিবে, কোনও দিন ক্যারমের হলুদ স্ট্রাইকার। কোনও দিন পুরনো দশটাকার নোট, এমন কত কী।  সবকিছু বিট্টুর ম্যাজিক নলের মধ্যে ছুটে বেড়াতো। একদিন একটা বেঢপ খয়েরী মানিব্যাগও দেখতে পেয়েছিল সে। এ'টা কাউকে বলেনি বিট্টু, বাবা মাকেও না। ও জানতো ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। শুধু যে'দিন সাপটাকে দেখা গেছিল সেই যাদু সুড়ঙ্গে, সে'দিন সেই টিউবলাইটের কাগুজে প্যাকেট ফেটে সুড়ঙ্গ নষ্ট হয়ে গেছিল। সাপের ছটফটে বোধ হয়।

১৩
মোহনবাবু আর মৃণ্ময়ী দু'জনেরই মারা যাওয়ার কথা ছিল; যন্ত্রণায় বুক ফেটে। কিন্তু বিচিত্র জীবন। যন্ত্রণা বুকে নিয়ে টিকে থাকতে হল দু'জনকেই। এক মাত্র ছেলেটা শেষ পর্যন্ত সাপের কামড়ে মারা গেল? বিট্টুর ঘরে ওই বিষাক্ত কেউটে এলোই বা কী করে?

১৪
কালী সাপুড়ে সুনাম বদনাম দুইই আছে।  ওই কালকেউটেকে ছোঁয়ার সাহস ভাস্করবাবুর হয়নি। কালীই ঢুকিয়ে দিয়েছিল ভাস্করবাবুর ডান পকেটে। আর ম্যাজিকের মত, পকেটে পড়তেই সে সাপ গায়েব।

১৫         
কেউটেটা জলে যাওয়ার খুব আঘাত পেয়েছিলেন ভাস্করবাবু। তিনদিনের মাথায় ফের সেই কেবিনেই ওদের আবার দেখতে পাওয়া। ঢলাঢলি বেড়েছে বই কমেনি। সেদিন রাত্রের ট্রেনেই কলকাতা ছেড়ে হাঁফ ছেড়েছিলেন ভদ্রলোক।  

প্রফেসর চট্টরাজের ক্লাসরুম

বৃদ্ধ ব্ল্যাকবোর্ড মুছতে গিয়েও আজকাল ক্লান্ত হয়ে পড়েন। নিঃশ্বাস দ্রুত হয় ওঠে, বুকের ভিতর অল্পেই ধড়ফড়ানি শুরু হয়। একটানা কথা বলে যেতে রীতিমত কষ্ট হয় বিরানব্বুই বছর বয়সের প্রফেসর চট্টরাজের। সেই কবেকার কথা, আজ থেকে ঠিক বত্রিশ বছর আগের ঘটনা। বত্রিশ বছর, ভাবলেও কেমন লাগে। সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর কলেজে এসেছিলেন কিছু পুরনো পাওনাগণ্ডা বুঝে নিতে। ঠিক বত্রিশ বছর আগে। ক্যাশিয়ার সামন্ত বেশ কাটখোট্টা ভাবেই বলেছিল যে বকেয়া টাকা আদায়ের আবেদনপত্র শেষ হয়ে গেছে, নতুনভাবে ছাপতে করতে ঘণ্টাখানেক লাগবে। তখন খানিকটা সময় কাটানোর তাগিদেই একটা খালি ক্লাসরুম দেখে ঢুকে পড়েছিলেন প্রফেসর চট্টরাজ। সে'দিন ক্লাসরুমে ঢুকে যে কী হয়ে গেছিল মাথার মধ্যে...। সেই যে ঢুকেছিলেন , হাজার চেষ্টাতেও সে ক্লাস রুমের বাইরে টেনে আনা যায়নি তাঁকে। কত অনুরোধ, উপরোধ, গলাবাজি জলে গেছে, প্রফেসর চট্টরাজকে ক্লাসরুম থেকে বের করা যায়নি এই বত্রিশ বছরেও। বছর খানেকের মাথায় অবশ্য অবশেষে কলেজ কর্তৃপক্ষ এক রকম হাল ছেড়ে দিয়েই সে ক্লাসরুমের নাম দিয়েছিলেন চট্টরাজের ক্লাসঘর। সেখানেই মজুত তাঁর জীবন ধারণের সমস্ত সরঞ্জাম। তাঁর অতিথি বলতে শুধু ছাত্রের দল, প্রফেসর বন্ধুরা বা উৎসুক খবরের কাগজের রিপোর্টার। এইভাবেই কেটে গেছে বত্রিশ বছর, বৃদ্ধ প্রফেসর নিজের ক্লাসরুম আলো করে আছেন আজও। সেই ক্লাসরুমের নীল দেওয়াল জুড়ে, চট্টরাজবাবু লাল পেন্টে ড্যাবা ড্যাবা স্টাইলে লিখে রেখেছেন;

Friday, January 20, 2017

সুবিমলবাবু ও সারকাজম

সুবিমলবাবুর ঘেমেনেয়ে একাকার। আড়াই ঘণ্টা ধরে কম্পিউটর স্ক্রিনে চোখ রেখে বসে আছেন। হাতের আঙুলগুলো কীবোর্ডে জুড়ে খলবল করে চলেছে অথচ  ফেসবুকের স্টেটাস মেসেজের বাক্সটা খাঁখাঁ করছে।

আড়াই ঘণ্টা ধরে।

কালো কফি যথেষ্ট তেতো মনে না হওয়ার প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিসের মলাটের কোণটা খানিক চিবিয়ে নিলেন। তাতেও বিশেষ লাভ হল না। অ্যাশট্রে থেকে সিগারেটের পোড়া ফিল্টার তুলে অল্প চুষেও কোনও হেলদোল টের পাওয়া গেলনা। মাথার চুল ছিঁড়েও কিছুতেই একটা অ্যাসিড মাখানো লাইন মাথা থেকে বের করে ফেসবুকে ঠুসে দিতে পারছিলেন না সুবিমল সান্যাল।

কোয়াড্রেটিক ইকুয়েশনে তার ছোটবেলা থেকেই বিরক্তি। কিন্তু খটমট কয়েকটা ইকুয়েশন মনে করেও পর্যাপ্ত ভাবে মেজাজটাকে খিঁচড়ে দিতে না পেরে রীতিমত হাঁফিয়ে উঠলেন সুবিমলবাবু।

যে কোন বিষয়ে একটা সারকাস্টিক কিছু টাইপ করতে পারলেই এই অম্বল আর গলাবুক জ্বালাটা পাশ কাটিয়ে দেওয়া যেত।

উপায় না দেখে "ডিপ্রেসিং নিউজ টুডে" বলে গুগল সার্চ করে মিনিট দশেক কাটালেন। জ্বালাময়ী কিছু তবুও গলা বেয়ে উঠে এলো না, এ এক আচ্ছা জ্বালা হয়েছে।

তারপর ড্রয়ার থেকে খিস্তি অভিধান বের করে কয়েক মিনিট চোখ বুলোলেন। একটু উত্তেজনার সঞ্চার হলো বটে, তবে তাতে সারকাজমের হাঁড়ি গরম হওয়ার কথা নয়।

তখনই মায়ের ডাকে চমকে উঠলেন সুবিমলবাবু।

- এ কী! এত অস্থির কেন খোকা?
- এ কী! তুমি জ্যান্ত কেন মা?
- না না। আমি বেঁচে নেই। ভয় পাস না।
- মরে গেছ বলে ভয় পাব না নাকি মরেও কথা বলছ বলে ভয় পাব না?
- গুলিয়ে গেলো। মোদ্দা কথা ভয় পাস না। এটা জাস্ট স্বপ্ন।
- ওহ। আই সী।
- অমন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে আছে খোকা?
- আসলে...আসলে কিছুতেই...কিছুতেই...।
- কিছুতেই কী?
- কিছুতেই সারকাস্টিক কিছু মাথায় আসছিল না মা।
- বিদ্রূপাত্মক কিছু?
- বিদ্রূপ বললে ব্যাপারটা যথেষ্ট মজবুত হয় না মা। বিদ্রূপ কেমন আলুনি। যেন ফেনাভাতে ঘি পড়েনি। সারকাস্টিক হতে হবে। ফাউল কাটলেটে কাঁটাচামচের মত খচাৎ করে ঢুকে যাবে সে চীজ। বুঝলে মা?
- তোর মাথায় কত চিন্তা রে খোকা।
- প্রেশার মা। সেলস টার্গেটে এত চাপ নেই। বেহালার ভাঙা রাস্তায় রানিং মিনিবাসে উঠতে এত চাপ নেই। দুনিয়ার যত টেনশন শুধু একটাই ভাবনায়; যথেষ্ট সারকাস্টিক হতে পারছি তো? মাঝেমাঝে মনে হয় একটা গাইডবই হলে ভালো হত। সারকাজম মেড ইজি গোছের।
- গাইড বই জানিনা। তবে খোকা, সারকাজম রপ্ত করার জন্য একটা ক্র‍্যাশ কোর্স আছে। করবি?
- মাইরি মা? রিয়েলি?
- নিজের ডায়রেক্ট এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলছি।
- কী কোর্স বলো তো?
- বিয়ে। বিয়ে করে ফেল খোকা। দেখবি জিভে সারকাজমের চাষ হচ্ছে।
- উফফ! মরে ভূত হওয়ার পরেও আমার স্বপ্নে এসে "বিয়ে কর বিয়ে কর" বলে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছ? তুমি মা না পিরামিড?
- দ্যাখ দ্যাখ খোকা, বিয়ের নাম শুনেই কেমন সারকাস্টিক বনে গেলি সহজে। তাই বলছি, এবারে বিয়ে কর।

**

ঝিমুনি ভাবটা কেটে যেতেই ফেসবুক স্টেটাস আপডেট লেখার বাক্সটা বন্ধ করে দিলেন সুবিমলবাবু। আজ হঠাৎ নীলাকে পিং করার ইচ্ছে হল। পার্সোনাল মেসেজ দিয়ে। মেয়েটা বড় ভালো, বড্ড স্নেহের। সারকাজমের কলার টেনে যদি ধরতেই হয়, তাহলে তার মধ্যে অল্পবিস্তর স্নেহ থাকলে মন্দ হয় না।

ভানুপ্রসাদ

- বাবুজী।
- ভানুপ্রসাদ? এসেছো?
- জী।
- এত দেরী হল?
- অন্ধেরার ইন্তেজার করছিলাম বাবুজী।
- খবর সব...?
- বেফিকর থাকুন বাবুজী।
- দু'জনকেই...?
- জী।
- লাশ?
- উয়ো চিন্তা আপকা নহি।
- দু'জনকেই শেষ পর্যন্ত..।
- ভানুপ্রসাদ যব তক হ্যায়, ইস হভেলি কে ইজ্জৎ পর কোই আঁচ আসবে না বাবুজি।
- ভানু...।
- তবিয়ৎ ঠিক হ্যায় বাবুজী? ছোটেলালকে বলব বড়িমা কে বুলাওয়া দিতে?
- না..না..না। আর কেউ নয়। শুধু তুমি থাকো ভানুপ্রসাদ।
- জী বাবুজী।
- ছোটকুমার..ছোটকুমার বড় নরম মনের ছিল।
- জী বাবুজী। আপনার আঁখো কা তারা।
- ভানু, খুব যন্ত্রণা পেতে হয়েছিল ওকে? ছোট খুব ছটফট করেছিল? আর যন্ত্রণা? প্রচণ্ড?
- হভেলি কা ইজ্জৎ সবসে আগে বাবুজী।
- তাই তো। তাই তো। ইজ্জৎ। হভেলির ইজ্জৎ। রায়চৌধুরী বংশের ইজ্জৎ। আচ্ছা ভানুপ্রসাদ, ওদের বিয়ে হয়ে গেছিল, তাই না?
- আজ সে তিন দিন পহলে।
- মেয়েটা...।
- হভেলি বাবুজী। হভেলি কি ইজ্জৎ।
- তুমি..তুমি কেমন আছ ভানু?
- ম্যায় নৌকর আদমি বাবুজী।
- ভানু?
- ছোটকুমার আমার গোদিতে খেলেছে বাবুজী। আমার থেকে তলোয়ার চলানা শিখেছে। বন্দুক চলানা। বাবুজী, ছোটকুমার ছোটলোকের লেড়কিকে শাদি করিয়ে গলতি করলো। পাপ।করলো। লেকিন বাবুজী, ছোটকুমার ওর বুড়ে ভানুকাকাপে একটাও গোলি ছোঁড়েনি। ছাতি পে তিন গোলি লেকে শুধ দু'বার ভানুকাকা বোলকে সো গয়া বেচারা। ছোটেকুমারের সিনা খুন মে লটপট থা অউর আঁখো মে আঁসু।
- তুমি ঠিক আছো ভানু?
- ছোট ঘরের লেড়কি কে সঙ্গ শাদি! রাম্ রাম্! 
ছোটকুমার কো কীমত চুকানা হি থা।
- আগে...আগে কাকে...? ভানু?
- ছোট ঘরের বেওকুফ লেড়কি। পেহলে উসকো...! দো গোলি, মাথে পে বাবুজি।
- পুত্রবধূ...। ছোটর ভালোবাসার বৌ। কেন মেনে নিতে পারলাম না ভানুপ্রসাদ?
- তোউবা তোউবা বাবুজী। হভেলি কি...।
- ইজ্জৎ। ইজ্জৎ। ছোটঘরের মেয়েকে...কী করে...। তাই তো। তাই তো।
- মুঝে ইজাজত দিজিয়ে বাবুজী। ছোটেলাল কো বুলা দেতে হ্যায়।
- যেওনা ভানুপ্রসাদ।
- মেরা জরুরত অউর কহা?  বাবুজী, আপকে নমক পে পলে বড়ে। বস এটা ইয়াদ রাখবেন,  হাভেলিকা ইজ্জৎ পে আঁচ নহি আনে দিয়া আপকা ভানু। যব তক জিন্দা রহা তব তক্।
- ভানুপ্রসাদ যেওনা। আর পারলে আমায় ক্ষমা কোরো।
- ইয়ে ক্যায়সা বাত হুয়া বাবুজী। ম্যায় ঠেহরা ছোটে ঘর কা আদমী। আপকা হুকুম অউর ইজ হভেলি কা ইজ্জৎ, মেরে লিয়ে অউর কিসি চিজ কা কোই মতলব নহি। বেহয়া লেড়কিটার মা নেই বচপন থেকেই। উয়ো বেশরম বদচলম চলি থি জমিন্দার হভেলি কা ইজ্জৎ মিট্টি মে মিলানে।  বহুত রোয়ি বাবুজী। লেকিন ইয়ে বাপ নে সিরফ্ নমক কি সুনি। সিরফ্ নমক কি সুনি। এক গোলি বঁচা হ্যায়। ইজাজত দিজিয়ে বাবুজি। ইয়ে গোলি কো সিনেমে লেকে উসপার যানা হ্যায়। উসপার, যহা ছোটা আদমির ছোটাসা ঘর আলো করে আজ লেড়কি মইকা আসবে, জমাইরাজা কে সাথ। ইজাজত দিজিয়ে বাবুজী।

Wednesday, January 18, 2017

রাজীবের বিপদ

- অনিন্দ্য!
- কী ব্যাপার..এত রাত্রে?
- ফোনটা একরকম বাধ্য হয়ে করলাম। একটা গোলমাল...বেশ বড় একটা গোলমাল...বুঝলি...।
- হয়েছেটা কী?
- এই ধর, গত আধঘণ্টা ধরে...একটা শব্দ...একটানা...।
- শব্দ?
- একটানা। ধুকপুক ধুকপুক। একটানা।
- রাজীব,  ভালো করে ভেবে বল। শব্দটা কি বুকের কাছ থেকে আসছে?
- এগজ্যাক্টলি। তুই কী করে জানলি?
- আমি তোর বাড়ি আসছি। দশ মিনিটে।

- অনিন্দ্য। দিস ইজ রিডিকুলাস।
- জানি। কিন্তু আনফরচুনেটলি...ইট ইজ ট্র‍্যু।
- আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না।
- জানি।
- কতক্ষণ থাকবে এমনটা?
- আমার ক্ষেত্রে আধ ঘণ্টা লাস্ট করেছিল। তখনই জেনেছিলাম ব্যাপারটা। কারুর ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা। কারুর কয়েক দিন বা কয়েক মাস। এক্সট্রিম কেসে...।
- এক্সট্রিম?
- যাবজ্জীবন।
- মাই গুডনেস। গোটা জীবন জুড়ে হার্ট বীট থাকবে?
- মাঝেমধ্যে মানুষ হয়ে পড়তে হয় রাজীব। আমাদের প্রত্যেককে।
- অনিন্দ্য।
- হুঁ?
- যদ্দিন না এই ধুকপুক যাচ্ছে তদ্দিন...।
- তদ্দিন টিভি খবরের কাগজ বাদ। দশের দুঃখে মানুষ মানুষ ভাবটা চাগাড় দেয়।
- চাগাড় দিলে?
- চাগাড় দিলে আর খবরের কাগজ পড়ে নিশ্চিন্তে সোফায় গা এলিয়ে দিতে পারবে না। বুকে অস্বস্তি বাড়বে, মানুষ হয়ে খবর পড়া যথেষ্ট গোলমেলে।
- ওহ। খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল বাদ। বেশ। আর কিছু?
- মিতার কথা বেশি ভাবিস্ না।
- মি...মি...মিতা...। ও তো নেই। ওর না থাকায় তো আমার নিঃস্পৃহ থাকার কথা। সেটাই তো নিয়ম...।
- ভাবিস না ওর কথা। ধুকপুক বাড়বে। চোখে এক রকম নোনতা জল জমা হতে পারে। অবশ্য মানুষ হওয়ায় মূল সমস্যাই হল নিজের ইচ্ছে মত ভাবনাদের কন্ট্রোল করতে পারবি না।
- ড্যাম ইট।
- ভোর হলেই একবার হাসপাতাল যেতে হবে তোকে নিয়ে। এখন ঘুমোতে চেষ্টা কর। অবশ্য ঘুমের ওপর কনট্রোলও তোর যাবে এবার। দিস ইজ অ্যাকচুয়ালি আ গুড টাইম টু ট্রাই সাম্ হিউম্যান মাম্বোজাম্বো।
- ব্ল্যাক ম্যাজিক?
- মানুষের দল যাকে মিউজিক বলে।

ঋণ:
"John. I have this terrible feeling, from time to time, that we might all just be human. Even you" - Sherlock. BBC.

Monday, January 16, 2017

যুক্তি তর্ক বাতেলা


তর্ক মন্দ নয়। তর্কের তবলা পিটুনিতে মগজ সজাগ থাকে, অপ্রয়োজনীয় বন্ধু ছাঁটাই হয়, উপযুক্ত শত্রুর সাহচর্য জোটে। সমাজে ডিবেট জরুরী। কিন্তু সব জরুরীর মাঝে কিছু কাঁকড় গড়িয়ে পড়বেই, আর থাকবে পোকা খাওয়া যুক্তিদাঁতে অনভিপ্রেত ফোঁকর। সেই কাঁকড় ছেঁটে নিতে পারলে অবশ্য ডিবেটের শ্রীবৃদ্ধি হয় এবং সে তর্কের মুনাফা ভাগ হয় যুযুধান দু'পক্ষের মধ্যেই। দু'টো পাথরকুচি তর্কের বাঁশকাঠি চালে মিশে যায় অনবরত। এই কাঁকড় নিজে চিবিয়ে কেঁপে উঠেছি বলেই নয়, অন্যের যুক্তির পোলাওতে তা পরিকল্পিত ভাবে মিশিয়ে অপরাধও করেছি যথেষ্ট। পাথরকুচি ১ - কোনও কিছুকে স্টিরিওটাইপ বলে নস্যাৎ করে সোয়্যাগ অর্জনের যে স্টিরিওটিপকাল প্রসেস্‌, সে প্রসেসে নিজের জান কবুল করা। কেউ কেউ নিশ্চই রয়েছেন যারা ধবধবে সাদা দেয়ালের সামগ্রিক সৌন্দর্যের মধ্যেও দেওয়ালের কোণে লেগে থাকা কালো কালির ছিটেটুকু দেখে নিতে পারেন। সে'টা নিশ্চই সবিশেষ স্কিল। কিন্তু দেশের দশজন লোক সে সাদায় বিহ্বল ব্যাকুল হয়েছে বলেই যদি তা ঘৃণার যোগ্য হয়; তাহলে সবিশেষ অসুবিধে। ডেটা বা ইনফরমেশনের পরিধিতে যতক্ষণ ক্রিটিসিজিম রয়েছে, ততক্ষণ তার তল পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে যেই আরোপিত সোয়্যাগের তাচ্ছিল্য আর মৌরি চেবানো ওপিনিওন অ্যাড হয়, সমস্যা শুরু হয় তখন। "আমি লৌকিকতায় বিশ্বাস করিনা" - এ ডিক্লারেশনে ক্ষতি নেই কিন্তু তার মানে যদি এই হয় যে প্রতিবেশীর বাড়িতে মিষ্টির বাক্স হাতে ঢোকাকে আমি ক্রিমিনাল স্টুপিডিটি হিসেবে ধরে নেব; সে'খানে যে তর্কের উৎপত্তি হয় সে তর্কে ফটোসিন্থেসিস্‌ নেই। মিনিবাসের সাইলেন্সরের ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কেবল। "অমুকের গানে আমার রুচি নেই" - রুচির রকমভেদ বড় জরুরী। দরকারি। কিন্তু অমুকের গান কেউ শুনছে বলেই যদি সাজানো যুক্তি ছাড়া তাঁকে আমরা ঢ্যামনা বলি, তাহলে সেই ঢ্যামনা শব্দটা অদৃশ্য দেওয়ালে রিবাউন্ড খেয়ে যে কখন দড়াম করে এসে নিজের নাকে গোঁত্তা মেরে যায়...। এ’খানে বলে রাখা ভালো; “অমুক খারাপ” কথাটা যুক্তি নয়, ছুঁড়ে দেওয়া ঢিল। অমুক এই এই কারণে উপাদেয় নয়; সে’খানে যুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে। তবে যুক্তি মানেই সম্ভ্রম, এবং যুক্তি মানেই খাটনি। খাটনি খুব গড়বড়ে জিনিষ। "দুনিয়ার লোকে অমুক কাজ করে, আমি করি না" - দুনিয়ার লোকে পকেটমারি করে পুলিশের খাতায় নাম লিখিয়েছে, আমি লেখাইনি। এ’টা ডেটা নির্ভর ব্যাপার এবং স্পষ্ট। “অমুক” যদি পকেটমারি হয় তাহলে ক্ষতি নেই। কিন্তু “দুনিয়ার লোক শীতকালে পিকনিক করে তবে আমার ও'সব পোষায় না” - সে'টা একটা ভোঁতা স্টেটমেন্ট। তাতে কেউ উত্তম বা কেউ সুখেন দাস হয় না। পাথরকুচি ২ - ইংরেজিতে এই কথাটা খুব চলছে আজকাল। "হোয়াটআবাউটারি"। বিশেষত রাজনৈতিক তর্কে এ এক মস্ত বড় সমস্যা। তৃণমূলের ভুল ধরেছেন কি সিপিএমের কুকর্মের লিস্টি হাত ধরিয়ে দেওয়া হবে। সিপিএম করেছে, আর আমার বেলায় দোষ বিচার? তুমি হার্মাদ। বিজেপির ত্রুটি নজরে এসেছে কি কংগ্রেসের ব্যালান্সশিট আপনার হাতে গুঁজে দিয়ে আপনাকে কোরাপ্ট বলা হবে। বড্ড সুবিধে। এক্স ভুলের অ্যানালিসিস না করে ওয়াই কেন হয়েছিল আলোচনায় চলে যাওয়া যায়। রাজনীতির বাইরেও এ ফরম্যাটে দিব্যি ঘোল খাওয়ানো যায়। তর্ক বেফজুল হয়ে পড়ে, কোনও কাজের দিকে গড়ায় না। যুক্তি স্তিমিত হয়ে খিস্তি শুরু হয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সোয়্যাগ জমা হয়, কাল্পনিক টেবিল চাপড়ানিতে নিউক্লিয়ার ফিসন ঘটে যায় হৃদয়ে হৃদয়ে। শুধু কাজের কথাগুলো মিউচুয়াল ঠেলাঠেলির সিলিং ফ্যান থেকে "আমি নির্ভুল"য়ের গামছা গলায় জড়িয়ে ঝুলে পড়ে।

মৃগাঙ্কবাবুর ভবিষ্যতবাণী

জ্যোতিষী হয়ে এই এক সমস্যা হয়েছে। নিজের মৃত্যুটাও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। মৃগাঙ্কবাবুর অবশ্য আর পাঁচটা সাধারণ জ্যোতিষীর সঙ্গে তুলনা চলে না। তিনি নিজের মুখে বলতে চান না তবে এ যুগের নস্ট্রাডামুস লেবেলটা তাঁর ওপর নিশ্চিন্তেই সেঁটে দেওয়া যায়।

রাম শ্যাম যদু থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা ক্রিকেট ক্যাপ্টেন; কারুর ব্যাপারে মৃগাঙ্কবাবুর করা কোনও ভবিষ্যৎবাণীই আজ পর্যন্ত বিফল হয়নি।

শুধু একটাই দুঃখ নিয়ে যাবেন মৃগাঙ্কবাবু, তাঁর এই অদ্ভুত ক্ষমতার কথা কেউ জানল না, কদর করল না। সাউথ ইস্টার্ন রেলের কেরানী হয়েই জীবনটা কেটে গেল তাঁর। অথচ জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি একনিষ্ঠ হতে গিয়ে বিয়েথাও করা হয়ে উঠল না। যাক্ গে, কেউ না জানুক। মৃগাঙ্কবাবু নিজে অন্তত এ'টা জেনে মরবেন যে তার কোনও ভবিষ্যতবাণী এক চুলও এদিকওদিক হয়নি কোনওদিন।

রোজ সকালে উঠে নিজের হাত দেখে দিনটা বুঝে নেন মৃগাঙ্ক হালদার। সকালের দুধ মুড়ি খেয়ে আজও বসেছিলেন বারান্দায়, শীতের রোদে ডান হাতের তালু মেলে। বাড়ির কাজের ছেলে রাজু বেরিয়েছে বাজার করতে, সে ফিরলে এক কাপ চা খেয়ে তারপর অফিসের জন্য রওনা দেবেন। রাজু ব্যাটা বড্ড ফাঁকিবাজ,  চোখে চোখে রাখতে হয়।

সে যাক, নিজের হাত দেখতে গিয়েই বিপত্তিটা টের পেলেন মৃগাঙ্কবাবু। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চট্ করে প্যাড পেন টেনে নিয়ে সামান্য অঙ্ক করে টের পেলেন যে আজ সকাল আটটা বেজে বাহান্ন মিনিট থেকে আটটা বেজে চুয়ান্ন মিনিটের মধ্যে তাঁর মারা যাওয়ার কথা। অর্থাৎ আজ আর অফিস যাওয়াটাও হল না। ছাতে কাপড় মেলতে যাবেন ভেবেছিলেন, তারও আর কোনও মানে হয় না। দেওয়াল ঘড়ি আর নিজের হাতের ঘড়ি মিলিয়ে নিলেন মৃগাঙ্কবাবু। এখন  বাজে আটটা বত্রিশ, মানে আর কুড়ি থেকে বাইশ মিনিটের মধ্যেই ঘটে যাবে ব্যাপারটা। যা হোক্, এখন সময় মত মরতে পারলেই পরম তৃপ্তি নিয়ে ইহলোক ছাড়তে পারেন তিনি।

একশো শতাংশ সঠিক ভবিষ্যতবাণী।  সব কটা নির্ভুল,  নিখুঁত। বেশ নার্ভাস বোধ করছিলেন মৃগাঙ্কবাবু। এমন দুর্দান্ত রেকর্ড অক্ষত রেখে যেতে পারবেন তো? দেখা যাক। তবে মারা যাওয়ার প্রসেসটা অবশ্য কিছুতেই হিসেব কষে বের করতে পারছিলেন না তিনি, হার্ট অ্যাটাক? ভূমিকম্প? কে জানে।

**
আটটা ছাপ্পান্ন বাজার সঙ্গে সঙ্গে মন ভেঙে গেল মৃগাঙ্কবাবুর। ভূমিকম্প নেই, বুকে অসহ্য ধড়ফড় নেই। সব ব্যর্থ। সব মিথ্যে ছিল। সবই তার আকাশকুসুম বিলাসী স্বপ্ন, তিনি আদৌ শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী নন। তিনি সকাল আটটা বেজে চুয়ান্ন মিনিটের পরেও বেঁচে আছেন। জীবনটাই ঝুঠো, নির্মম পরিহাস মাত্র।

সিলিং ফ্যান থেকে মায়ের শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে যখন ঝুলেছিলেন মৃগাঙ্কবাবু, তখন দেওয়াল ঘড়িতে ন'টা বেজে বাইশ মিনিট।

**

দিব্যি ফুর্তির মেজাজে আজ বাজারে বেরিয়েছিলে রাজু। এতটাই আনন্দ ছিল মনে যে মাছ সবজী কেনার সময় দু'চার টাকা এদিক ওদিক করার কথা মনেও এলো না তার।

বেশ জব্দ করা গেছে খিটখিটে ছিটগ্রস্ত বুড়োটাকে। সকাল আটটার আগে বাজারে না এলা মিনুর সঙ্গে দেখা হয় না। মিনুর সঙ্গে দেখা না হলে রাজুর মন ভালো থাকে না। অথচ বুড়ো কিছুতেই তাকে সাড়ে আটটার আগে বাজারমুখো হতে দেবে না।

বাধ্য হয়ে গতকাল মাঝরাত্রে উঠে গোপনে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি আধ ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছিল রাজু। ঘুমোনোর আগে হাতঘড়িটা পড়ার টেবিলে খুলে রেখে যান বাবু, সে'টাও রাজুর সতর্ক নজর এড়ায়নি।

Friday, January 13, 2017

অজিত সেনগুপ্তর খুন

- আচ্ছা বটুবাবু, এমন ম্যাদা মেরে আছেন কেন বলুন তো? কেসটা ফাঁপরে ফেলেছে বেশ?

- ইন্সপেক্টর সাহেব, কেস সলভ করা আপনার দায়। সে নিয়ে দুশ্চিন্তাও আপনার। তবে আমার মন মেজাজ সত্যিই তেমন ভালো নেই। বাহাত্তর নম্বর ফুচকাতেই ঢেঁকুর উঠে গেল আজ বিকেলে। বয়স হচ্ছে বোধ হয়, লোহা হজম করা পেট অল্পেই কেঁপে উঠছে।

- তবে যাই বলুন। সেনগুপ্তার মার্ডারটা ভোগাবে মনে হচ্ছে।

- অবিশ্যি ফুচকা সেশনের আগে এক প্লেট ফিশ ফিঙ্গার খেয়েছিলাম বটে। তবে তাই বলে ফুচকায় হান্ড্রেড হিট করব না, এ'টা বরদাস্ত করা যায়?

- বটুবাবু, সেনগুপ্তার মার্ডার। কেসটা বড় জটিল। একটু ফোকাস করুন প্লীজ। এ বছর খুব এক্সপেক্ট করছিলাম প্রমোশনটা।

- নাকি ডিফেক্ট ফুচকাতেই ছিল? টকটা অপ্টিমাইজ করতে পারেনি বলেই কি এই বিপত্তি?

- সামনের সিজনে জুড়ে প্রতি হপ্তায় অন্তত তিন দিন আপনার বাড়িতে এক কিলোর বেশি সাইজের ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।

- ফার্ন রোডের সেনগুপ্ত পরিবার। বিজনেস টাইকুন। প্রবল প্রতিপত্তি। সে'খানে খুন।

- এইত্তো। আসুন, গোল্ডফ্লেক্।

- নাহ্। আমার নস্যিই ভালো। যা বলছিলাম। ফার্ন রোডের সেনগুপ্ত পরিবার। চারটে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি। তিনটে কলকাতায়, একটা আসানসোলে। সিনিয়র সেনগুপ্ত গত হয়েছেন বছর দশেক হল। ভদ্রলোকের চার ছেলে। অমিত, অনুপ, অজয় ও অজিত। চার জনেই কেমিস্ট্রি নিয়ে রীতিমত পড়াশুনো করে  ব্যবসায় ঢুকেছে। কেউই বিয়েথা করেনি। ব্যবসা, চ্যারিটি আর খাওয়াদাওয়ায় দিন কেটে যায় এদের।

- এবং ব্যবসার ওদের বেস্পতি তুঙ্গে।

- করেক্ট। এ'বার, আচমকা। বলা নেই, কওয়া নেই, সর্বকনিষ্ঠ অজিত খুন হল।

- আর এমন পিকিউলিয়ার ভাবে খুন হলে যে আমাদের নাকে দড়ি। এমন এক কেমিক্যাল যার ট্রেস খুঁজে পেতে কাল ঘাম ছুটে গেল। এখনও ডিকোড করা যায়নি সে অদ্ভুত কেমিক্যালের কম্পোজিশন। শুধু জানা গেছে যে সে কেমিক্যাল ব্লাড স্ট্রিমে একবার ঢুকলে...।

- আধ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু। অবধারিত। কেমিক্যাল টাইকুনদের ফ্যামিলিতে বিষাক্ত কেমিকাল প্রয়োগে খুন, এত সোজাসাপটা কেস্ নিয়ে এত ভাবছেন কেন ইন্সপেক্টর বাবু?

- বেশ। যদি ধরেই নিই যে অজিতবাবুকে খুন করেছেন তারই তিন ভাইয়ের মধ্যে কেউ; অর্থাৎ অমিত, অনুপ বা অজয়। সে ক্ষেত্রে মোটিভ কী?

- টাকা ডেফিনিটলি নয়। যা সম্পত্তি আছে, সে'টা ডিভাইডেড বাই ফোর করলেও প্রচুর। এদিকে চার জনেই ব্যাচেলর। ইনভেস্টিগেশনে যেটুকু জানা যাচ্ছে যে সাংসারিক গোলযোগ বিশেষ ছিল না।

- তবেই বুঝুন, কী জট পাকানো ব্যাপার।

- নিজেদের জবানবন্দীতে তিন দাদাই বলেছে যে অজিতবাবু আজকাল বখে যাচ্ছিলেন। সেদিকটা খতিয়ে দেখেছেন ইন্সপেক্টর সাহেব?

- অবশ্যই। তবে শুনে রাখুন, ভদ্রলোকের তিন দাদাই এটা বলে ইনভেস্টিগেশনকে অকারণ পেঁচিয়েছেন।

- মানে? বখে যাওয়ার খবরটা ভুয়ো?

- তা নয়তো কী? রেসের মাঠ, পাব, রেডলাইট এরিয়া; এমন কোনও জায়গাতেই অজিতবাবুর যাতায়াত ছিল না। প্রেমটেম থেকে শতহস্ত দূরে থাকার মানুষ ছিলেন, সেটাও স্পষ্ট। উলটে রিসেন্টলি বরং ভদ্রলোকের ধর্মে মতি হয়েছিল। দীক্ষাও নিয়েছেন সদ্য। অতএব অনেক ইনভেস্টিগেট করেই বলছি, ওই বখে যাওয়ার গল্পটা ফালতু।

- গাছে উঠলেন, ডালে ঝুলে দোলও খেলেন অথচ হিমসাগর না পেড়েই নেমে পড়লেন ইন্সপেক্টর সাহেব।

- মানে?

- খেটে তদন্ত করলেন, শুধু শেষটুকু পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারলেন না।

- কীরকম?

- বখে যাওয়ার ডেফিনিশনটা সবার কাছে একরকম নয় দারোগাশ্রেষ্ঠ বটব্যালবাবু। অজিতবাবু হয়ত তাঁর দাদাদের হিসেবে সত্যিই বখতে শুরু করেছিলেন।

- হাউ? কইসে? কী'ভাবে?

- দীক্ষা নেওয়ার ফলে একটা গোলমেলে দিকে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি। ভদ্রলোক আমিষ ছেড়ে দিয়েছিলেন।

- নিরামিষ খাওয়াওটা বখে যাওয়া?

- সেনগুপ্ত ফ্যামিলির ডিএনএ'তে আমিষলিপ্সা মিশে আছে। সে'টা ওদের বাবুর্চিদের সঙ্গে সামান্য কথা বললেই জানতে পারতেন। ইন ফ্যাক্ট, ওদের হেড বাবুর্চি বাবুলালকে দু'শো টাকা ঘুষ দিলে আপনাকেও সে সুড়সুড় করে বলে দিত যে কী'ভাবে পরিবারের ট্র‍্যাডিশনের বিরুদ্ধে গিয়ে অজিতবাবুকে গোপনে পনীর সাপ্লাই দিত সে।

- পনীরকে গোপনে খেতে হত?

- অনেককে যেমন গোমাংস ভক্ষণ মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, সেনগুপ্তদের তেমনই পনীরে কাঁপুনি আছে।

- সে জন্যেই বুঝি আপনি সেদিন বলা নেই কওয়া নেই জেরার সময় এক বাটি পনীরের পকোড়া এনে সেনগুপ্তা ব্রাদার্সদের সামনে রেখে দিয়েছিলেন বটুবাবু?

- আশা করি আপনার মনে আছে যে সে পনীর পকোড়ার বাটি দেখে তিন সেনগুপ্তর মুখই কেমন শুকিয়ে গেছিল।

- একদম!

- আচ্ছা, অজিতবাবু যে রাত্রে খুন হন, পরের দিন সকালে ওর ঘর জরীপ করার সময় ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে দু'টো প্রমাণ সাইজের পাঁঠার পাঁজরা আবিষ্কার হয়। সে'টা দেখে আপনার খটকা লাগেনি?

- উনি রাতের খাওয়া নিজের ঘরে এনে খান। তার আগের রাত্রে বিরিয়ানি হয়েছিল। সহজ ব্যাপার।

- বিরিয়ানি ভক্ত কেউ পাঁঠার পাঁজরা ফেলে দেয়? অমন রসালো!

- নিরামিষ খাওয়া মানুষ, মাটন রিজেক্ট করতেই পারেন।

- তাহলে তাঁকে দেওয়া হবে কেন মটন বিরিয়ানি?

- কারণ...কারণ...নিশ্চই অজিতবাবু নিজের দাদাদের থেকে লুকোতে চাইতেন যে উনি পাঁঠা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

- বাহ্, এইত্তো চমৎকার ভাবে প্রমোশনের দিকে এগিয়ে গেলেন অনেকটা। অর্থাৎ বাড়ির লোক তার নিরামিষ খাওয়া নিয়ে প্রবলভাবে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আর তিনি সেই অসন্তোষকে ডজ করে পাশ কাটানোর চেষ্টা করতেন।

- বেশ। কিন্তু খুনটা হল কেন? কী করে?

- মারা যাওয়ার রাত্রে যে প্লেট থেকে অজিতবাবু ডিনার করেছিলেন, সেই থালা পরদিন ভোর পর্যন্ত এঁটোই পড়েছিল। সে'টা পরীক্ষা করেছিলেন?

- তাতে বিষ ছিল না। এমনকি রান্নাঘরের প্রতিটা পদ থেকে প্রতিটা ইনগ্রেডিয়েন্ট আমরা টেস্ট করিয়েছি ল্যাবে। অজিতবাবুর রক্তে যে বিষ পাওয়া গেছে তার ট্রেস কোথাও পাওয়া যায়নি।

- বিষ খুঁজে হন্যে হলেন। অথচ ওই থালা শুঁকলেই ব্যাপারটা জলবৎ হয়ে যেত দারোগাবাবু।

- কে...কেন?

- ও থালায় বিরিয়ানির রেশের সঙ্গে পনীরের বদগন্ধ মিশে ছিল।

- মটন বিরিয়ানিতে পনীর?

- ইদানীং বিরিয়ানিতে থেকে মটনের টুকরো বেছে ফেলে দিয়ে তাতে বাবুলালের গোপনে সাপ্লাই করা পনীর মিশিয়ে খাওয়া শুরু করেছিলেন অজিতবাবু।

- মাই গুডনেস।

- আর অজিতবাবুর খাওয়াদাওয়ার গোপনীয়তা নিয়ে ক্রমশ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ছিলেন তাঁর তিন দাদা, বিশেষ করে বড়দা অমিতবাবু। বাবুলালকে তিনি মাঝেমাঝেই চাপ দিতেন অজিতবাবুর খাওয়াদাওয়ার খবর সবিশেষ জানতে চেয়ে। কিন্তু বাবুলালের বাঁ হাতে আয়ের নেশাকে ভালোই কাল্টিভেট করছিলেন অজিতবাবু, বাবুলালকে টলানো যায়নি। উপায়ন্তর না দেখে অজিতবাবুর খুনের দিন দুয়েক আগে এক ডিবে স্পেশ্যাল বিরিয়ানি মশলা বাবুলালকে দেন তিনি। সে ডিবে নাকি খোদ আরব দেশ থেকে আনানো। সে মশলায় তৈরি বিরিয়ানি খাওয়ার প্রথম রাতেই মারা যান সদ্য নিরামিষাশী বনে যাওয়া অজিত সেনগুপ্ত।

- অসম্ভব। রান্নাঘরের সব আইটেমের সঙ্গে ওই বিরিয়ানি মশলার ডিবের স্যাম্পলেও টেস্ট করানো হয়েছে। কোনও বিষ পাওয়া যায়নি।  আর তাছাড়া বাড়ির বাকি তিনজনও সে বিরিয়ানিই খেয়েছিল, তাঁরা তো বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

- পুলিশ অফিসার এত সরল হলে মানায়? এমন ভাবে চললে আপনার প্রমোশন ডকে উঠবে।

- প্লীজ খোলসা করে বলুন।

- ইলিশের প্রতিশ্রুতি ভুলবেন না যেন স্যার।

- ভদ্রলোকের এক কথা। প্লীজ বটুবাবু।

- এ খুনি ছুরি গুলি চালানো গাম্বাট নয় ইন্সপেক্টর সাহেব। ও বিরিয়ানি মশলা এমনিতে সাদামাঠা, চিবিয়ে খেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু পনীর আর মানুষের স্যালাইভা মিশে গেলেই ও মশলা খুনে বিষ। ও বাক্স থেকে সামান্য স্যাম্পেল আমি সরিয়েছিলাম। আমার বায়োকেমিস্ট বন্ধু বিধুশেখর নিজে পরীক্ষা করে আমার সন্দেহ কনফার্ম করেছে।

- ইনক্রেডিবল। তাহলে আর অপেক্ষা কেন? চট্ করে গিয়ে অমিতবাবুকে হেপাজতে নিয়ে নিই! ভদ্রলোকের আবার যা ইনফ্লুয়েন্স,  পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবেন না তো?

- নিজের আদরের ভাইয়ের এমন অধঃপতনে একটা আঘাত পেয়েইছিলেন ভদ্রলোক, আর রাগের মাথায় এমন বীভৎস একটা কাণ্ড ঘটিয়ে এখন রীতিমত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক, সে'টা স্পষ্ট। আমার বিশ্বাস সামান্য চাপ দিলেই উনি সব স্বীকার করে নেবেন। তবে হে ইন্সপেক্টর শিরোমণি,  প্রমোশন পেয়ে আমার ইলিশ সাপ্লাইটা ভুলে যাবেন না তো?