Wednesday, March 29, 2017

হিজ মাসটার্স

- এই যে। এ'বার সিলিং থেকে নেমে আসুন। দেরী হয়ে যাচ্ছে যে।
- আপনি না গেলে আমি নীচে নামছি না।
- ছেলেমানুষি করলে কি হয় স্যার? আপনার জন্যেই আসা। আপনাকে না নিয়ে যাই কী করে। আর ভেসে বেড়াবেন না। নেমে আসুন।
- মিথ্যে কথা। আমি মরিনি।
- রক্তমাংসের বডি নিয়ে এর আগে কোনওদিন ভাসতে পেরেছেন?
- নিজের অজান্তেই লেভিটেশন শিখে গেছি হয়তো। আপনি আসতে পারেন। আমি ভাসি মরি, নিজেরটা নিজে বুঝে নেব।
- কী মুশকিল। লাশ দেখেও ধন্ধ কাটছে না?
- ও বডি আমার নাও হতে পারে।
- বটে? ইয়ার্কি হচ্ছে? দিব্যি বুকে ছুরি হজম করে অক্কা পেলেন। মেঝেতে জ্বলজ্বল করছে আপনার ভুষো কালী মাখানো বডির রক্তে চপচপ বুক। এখন নিজের বডিকে ডিনাই করছেন?
- বেশ করেছি। আপনি আসুন।
- আত্মা ক্লীয়ার করতে এসে এ কী ঝামেলা। নামবেন না কি আপনাকে আনপ্রসেসড স্টেটে রেখে চলে যাব?
- আপনার আইকার্ড আছে?
- মানে?
- মানে এই যে আত্মা কলেকশনে এসেছেন, আপনার কাছে আইডেন্টিটি কার্ড আছে? বা সুপারিশের চিঠি? যার তার কাছে নিজেকে হ্যান্ডওভার করব কেন? আছে? আইকার্ড?
- আলবাত আছে। আগে নামুন, তারপর দেখাব।
- আগে দেখান তারপরে নামব।
- আগে নামুন।
- আগে দেখান।
- আচ্ছা ঘ্যাঁতা মাইরি আপনি।
- আগে দেখান।
- এই যে। এই দেখুন আইকার্ড। আর এই হল সুপারিশের চিঠি। আর এ'টাও জেনে রাখুন যে আমি ছাড়া আপনার হিল্লে হবে না। কাজেই সুড়সুড় করে নেমে আসুন দেখি!

আইডেন্টিটি কার্ডটা ঘরের আঁধারেও জ্বলজ্বল করছিল।  তা'তে লেখা নামটা সিলিং থেকেও স্পষ্ট পড়তে পারলেন ভাসমান ওথেলোবাবু; "শ্রী উৎপল দত্তের কণ্ঠস্বর"। সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো সুপারিশের চিঠির অমোঘ টানে ছাত থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে এলেন ভদ্রলোক।

বিনু মা ও বাবা

বিনুর মা চিরকালই অ্যানালিটিকাল।
মুখ শুকনো কেন?
নিশ্চই দুপুরে ঠিক করে খাসনি।
নিশ্চই বড্ড চাপ পড়ছে আজকাল।
এক গ্লাস হরলিক্স যদি অন্তত রোজ নিয়ম করে...।
নিজের প্রতি একটু যত্নশীল না হলে চলবে কী করে?

ও'দিকে বিনুর বাবা চিরকালই অ্যাকশন ওরিয়েন্টেড।
মুখ শুকনো কেন?
মামাদের নেকু ধাত পেয়েছে। সবসময় ম্যাদা মেরে আছে, নিনকম্পুপ।

বিনুর মা চিরকালই নরম।
একটু লেবুর সরবত খাবি বাবা? এই গরমে যা দৌড়ঝাঁপ করতে হয় তোকে অফিসে।

বিনুর বাবা চিরকালই মর্মভেদী। বিনুকে দেখলেই হারানো জিনিসের কথা মনে পড়ে।
খেলার পাতাটা কোথায় রে রাস্কেল? আমার চশমার খাপ খুঁজে বের কর। ক্যুইক।

বিনুর মা অবশ্য চিরকালই বিনুর বাবার ছাদফাটানো গর্জনে অভ্যস্ত।
শুধু মাঝেমধ্যে সে কণ্ঠ ভিজে তুলোর মত হয়ে আসে;
"গতকাল থেকে বিনুর বোধ হয় মন কেমন! খোঁজ নাও। ও চিরকালই মা ন্যাওটা, আর হ্যাঁ...." ভিজেতুলো থেকে সেই গলা চট করে কামানের গোলা লেভেলে উঠে যায়, "ব্যাটাচ্ছেলেকে ফাইনাল ওয়ার্নিং দিয়ে দিও। ফের যদি স্পোর্টস সেকশন হাতে বাথরুমে যেতে দেখি, তাহলে ওকে আমি কমোডে কবর দেব"।

Tuesday, March 28, 2017

বুর্জোয়া গরীব

দেখুন। পয়সাকড়ির বড় অভাব। বেশ কিছুদিন ধরে নিজেকে ক্রমশ গরীব গরীব মনে হচ্ছে। আর এই মনে হওয়াটা উত্তরোত্তর বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। দিস এভার গ্রোয়িং সেন্স অফ পকেটখালিনেস্‌, বুঝলেন, মাঝেমধ্যেই পেট খালি করে দিচ্ছে।
আহ্‌। পয়সার অভাবে না খেয়ে আছি তা নয়। মাঝেমধ্যেই চপকাটলেট জুটছে। হাটারির চাউমিন। আরসালানের বিরিয়ানি। কিন্তু অভাবের ডেফিনিশনটা এইবেলা ফ্লেক্সিবল না করলে চলছে না। এ যুগে দাঁড়িয়ে বুর্জোয়া-অভাবকে অস্বীকার করার কোনও মানে হয় না। স্যালারি, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস, মিউচুয়াল ফান্ড; সব চটকেও হচ্ছে না। অনটন প্রতিনিয়ত টনটন করে চলেছে।  
ফ্লুরিজ্‌কে নাক সিঁটকে “ওভারপ্রাইসড” না বলে কোনও উপায় থাকছে না। তিনশো টাকার ওমলেট। প্লাস ট্যাক্স বোধ হয়। শেষ সেই দু’হাজার তেরোয় খেয়েছিলাম। এখন ট্র্যাডিশনের ভাঁওতা দিয়ে লোকজনকে বসন্ত কেবিনে ডাকতে হয়। বুর্জোয়াগরীবদের বন্ধুরাও বুর্জোয়াগরীবই হয়। অতএব কেউ আমায় বড় একটা ফ্লুরিজে খাওয়াতে ডাকে না। ফ্লুরিজে গিয়ে ডাচ করতে হলেও চুঁচুড়া হয়ে যেতে হবে। এইসব খুচখাচ দুঃখ বড় প্রবল হয়ে দাঁড়াচ্ছে আজকাল।
তারপর ধরুন কোনও পেল্লায় শপিং মলের লিকার শপে ঢুকলাম। সমস্ত ঝকমকে ব্র্যান্ড। সিঙ্গল মল্ট। দামী ওয়াইন। ইত্যাদি। আমার দৌড় ওই ওল্ডমঙ্ক। বুর্জোয়াগরীব। ইউজার ম্যানুয়ালে ভাঙার ইন্সট্রাকশন আছে কিন্তু মচকানোর কোনও রেফারেন্স নেই। অতএব ওল্ডমঙ্কটুকুও গিলতে হবে “ট্র্যাডিশন আর ঐতিহ্য” বলে বুক বাজিয়ে। পকেটের সঙ্গে গলা কাটলেও সিঙ্গল মল্টের বোতল ছুঁয়ে দেখার ধক্‌ নেই। আর ধক্‌ দেখাতে গেলে একটানা দেড়মাস রাতে মাছ ভাতের বদলে এক ছিপি সিঙ্গল মল্টে চারটে রুটি চুবিয়ে চুবিয়ে খেতে হবে।
টরেন্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুনে আমার বুক ফেটে যায় আমি এত গরীব। রিয়েলি। বিশ্বাস করুন।
ইলিশের সিজন এলে ভয় লাগে। ফেসবুকে স্বাদে ভেসে যাওয়ার কথা লিখতেই হবে, পীয়ার প্রেশার। অথচ এ’দিকে হপ্তায় দু’দিন এক কিলো সাইজের আসল পদ্মার ইলিশ কিনতে হলে সিটিসির অর্ধেক মাছের বাজারে হরির লুঠ হিসেবে ফেলে আসতে হবে। অতএব পাতে স্রেফ ডায়মন্ড হারবারের বিস্বাদ খোকা ইলিশ, আর ফেসবুকে বাতেলা; ইলিশ ইজ লাভ (লাল রঙের হার্টসাইন সহ)।
টাকা নেই স্যার। অরিজিনাল স্ক্রিনগার্ড বা ফোনকভার কিনবো, সে দুঃসাহস আমার নেই। আমাদের মত বুর্জোয়া-গরীবদের সে বারফাট্টাই থাকতে নেই। গড়িয়াহাটের ফুটপাথ ছিল তাই ফোনের জামাকাপড় জুটছে। টাকা নেই।
“এয়ারইন্ডিয়া বাপের জন্মে টাইমে থাকে না” বলে যে সামান্য দুঃখ করব তার উপায় নেই। ছ’মাসে ন’মাসে কখনও হয়তো অফিসের ঘাড় ভেঙে ফ্লাইটে চড়ার সুযোগ আসে। এবং একবার প্লেনে উড়তে পারলে আগামী দেড় বছর সুটকেস থেকে এয়ারলাইনের ট্যাগ ছেঁড়া হয়ে ওঠে না। “বম্বে মেল কত নম্বরে” খোঁজ করেই কেত শেষ হবে। এর বেশি আর স্টেপআউট এই মাইনেতে হয় না।
তাছাড়া আমি নিশ্চিত ইউরোপ অপূর্ব জায়গা। একবার ঘুরে আসতে পারলে ধন্য হয়ে যাব। অথচ দাড়ি চুলকে লোকজনকে বলতে হয় “ক্যাশ্মের টু কন্যাকুমারী, কী নেই আমাদের দেশে”? ব্যাঙ্কে ছড়ানোর মত পয়সা থাকলে লোলেগাঁও ছেড়ে সুইজারল্যান্ড যাবো, বিশ্বাস করুন। খুব যেতে চাই। যদ্দিন টাকা না আসে তদ্দিন অবশ্য পুরুলিয়াতে বসে জিওর ফোরজি কনেকশনে মাসাইমারার ভিডিও দেখা ছাড়া বিশেষ উপায় নেই।
সবচেয়ে বড় কথা। বুর্জোয়াগরীব না হলে সঞ্জীব সঞ্জীব হাওয়া তুলে ছাতে গিয়ে প্রেম করতে হত না। এস্পারওস্পার হত ফাইন ডাইনিঙে। দামী পারফিউমে। গেঞ্জি পাজামা পরে বাড়ি কাঁপিয়ে ঘোষণা করতে হত না “তোমার বার্থডে স্পেশ্যাল চিকেনটা যা কষিয়েছি না! জিভে লেগে থাকবে টু থাউজ্যান্ড নাইনটিন পর্যন্ত। আর ইয়ে, গিফটে কথোপকথনের সেটটা পছন্দ হয়েছে তো? পূর্ণেন্দুবাবু তোমারই জন্য লিখে গেছিলেন বোধ হয়”। পূর্ণেন্দুবাবুর থেকে বাইশ ক্যারাটের রেফারেন্স দেওয়াটা বেশি অভিপ্রেত। বিশ্বাস করুন। কিন্তু ওই। বুর্জোয়াগরীব মানুষ, সাহিত্যপ্রেমের বাব্‌লর‍্যাপে নিজেকে মুড়ে না রেখে উপায় আছে?  

Sunday, March 26, 2017

ফেসবুক, জিন্দেগী ও ভ্যারেণ্ডা

আদত জীবন ফেসবুকের মত হলে সুবিধে হত।

স্ক্রোল করতে পারাটা খুব দরকারি। কেউ মিউচুয়াল ফান্ড বা পলিটিক্স নিয়ে ভালো ভালো কথা বললে স্ক্রল করে এগিয়ে যাওয়া যেত।

"আর খবরটবর বলুন"বলিয়েদের আনফলো করে রাখলে তাঁদের সঙ্গে মোলাকাতের আর সুযোগ থাকত না।

বৌ গুম থাকলে নিশ্চিন্তে জিজ্ঞেস করে ফেলতাম "হোয়াট ইজ অন ইওর মাইন্ড"?

বর্ষাকালে প্রকাশিত পুজোবার্ষিকী দেখলেই নির্দ্বিধায় স্প্যাম বলে রিপোর্ট করতাম।

বাজারে প্রথম হিমসাগর দেখলেই টুপ করে একটা চকচকে হার্ট শেপের বুদবুদ আমার সামনে ভেসে উঠত।

স্যান্ডো গেঞ্জি ঢলা পাজামায় মোড়া আলো করে বসে শ্যামাসঙ্গীত গাইব, প্রাইভেট পোস্টে। ক্লোজ ফ্রেন্ডস অনলি।
পাবলিক পোস্টে চিবিয়ে চিবিয়ে পলিটিকাল জ্ঞান ঝেড়ে দু'চারজনকে মোরন বলবো।

সো অন অ্যান্ড সো ফোর্থ।

হিমালয় ডাকেগা তো লগ অফ করেগা। নয়তো ভ্যারেণ্ডা ভাজতা রহেগা।

লিপির মনের ভিতরে

- হ্যালো।
- হ্যালো! লিপি!
- উঁ। বলো। কী ব্যাপার, এত রাত্রে?
- জানি এত রাত্রে তোমায় ফোন করাটা ঠিক নয়..তবে ইয়ে...খুব আর্জেন্ট একটা কথা ছিল।
- কাল বললে হয় না অতনু? লাঞ্চে অফিস থেকে কল করে নেব।
- কিন্তু লিপি...ব্যাপারটা খুব ক্রিটিকাল। এখুনি না জানালে...।
- বলো। শুনি।
- একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে গেছে লিপি। সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড।
- কী ব্যাপার? কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড?
- খুব ঠাণ্ডা মাথায় শোন! কেমন?
- আরে ব্যাপারটা কী বলবে তো! রাতদুপুরে এত ধানাইপানাই  ভালো লাগে না।
- তুমি বুঝতে পারছ না। খবরটা জানার পর তোমার মাথা ঠাণ্ডা রাখাটা খুব জরুরী।
- কী খবর অতনু?
- খবরটা হল। আসলে...মানে যাকে বলে...ইয়ে...।
- কী ইয়ে?
- ব্যাপারটা হল গিয়ে..তুমি আসলে আমার প্রেমে পড়ে গেছ।
- হোয়াট?
- তুমি। লিপি দত্ত। আমায়। অর্থাৎ অতনু ঘোষকে। ভালোবাসো।
- হোয়াট?
- স্পষ্ট। জলের মত। তবে ঘাবড়ে যেও না। মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।
- আমি তোমায় ভালোবাসি?
- আমি জানি তুমি অবাক হচ্ছ। আসলে তুমি বুঝতে পারছ না যে তুমি আমায় ভালোবাসো। কিন্তু মনের গভীরে...অল্প গভীরে নয়...একদম তলার দিকে...তোমার মনে আমার জন্য কিলো কিলো প্রেম জমে রয়েছে।
- ইয়ার্কি হচ্ছে? তুমি তিন বার প্রপোজ করার বাঁদরামো করেছ আগে। সহ্য করেছি। কিন্তু এ'সব কী হচ্ছে?
- সাবকনশাস লিপি। সব সাবকনশাসের খেল। খুব জটিল ব্যাপার।
- শোনো। আমি তোমায় ভালোবাসি না।
- অত হুড়মুড় করে ফেলো না...সিচুয়েশনটা বোঝো...। এই যে আমার প্রতি ভালোবাসা তোমার অন্তরে ফল্গুধারের মত বয়ে চলেছে...।
- শাট আপ অতনু। শাট। আপ। আমি অরিজিৎকে ভালোবাসি। আগামী সপ্তাহে আমাদের বিয়ের পাকাকথা।  আর আদতে তুমি জ্বলেপুড়ে পাগল হয়ে যাচ্ছ...।
- জেলাস? আমি? তুমি জানো রীতা আমায় নিয়মিত ঢলঢলে মেল করছে? সুনন্দা আমায় হার্টসাইন দিয়ে রোজ ভোরে হোয়্যাটস্যাপে পিং করে? সেই আমি জেলাস হব? প্রেমট্রেম আমি নিজেই অ্যাভয়েড করি। আমার ব্যস্ততার মধ্যে রোম্যান্সের সময় কই? তোমার প্রপোজ করেছি বটে আগে। তবে সে'টা এক ধরণের সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট বলতে পারো।
- তুমি একটা অসহ্য মানুষ অতনু। এই রাত্রে এত বাজে কথা শুনতে ভালো লাগছে না। ফোন কাটছি।
- প্লীজ না। আই মীন, তোমার কষ্ট হবে এমন দুম করে কথা বন্ধ করলে। ভালোবাসার নেচারটাই এ'রকম! তোমার কিছু করার নেই লিপি।
- উফ! বাবা গো!
- ব্যাপারটা অনেকদিন ধরে পুষে রেখেছিলে। বলা ভালো, বুকে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিলে। ভালো হলো আজ খোলতাই আলোচনা হয়ে গেল। তোমার মনের ভার খানিকটা লাঘব হলো।
- আমি। আমি তোমায় ভালোবাসি? তোমার মত একটা ঘ্যানঘ্যানে ছেলেকে?
- অবাক লাগছে,  তাই না? জানতে পেরে আমি নিজেই অবাক হয়েছি। যাক গে, এখন যখন জানাজানি হয়েই গেছে তখন আর আলোচনায় দ্বিধা কেন। তবে আমি আবার দুম করে 'আমিও ভালোবাসি' বলে ফেলত পারব না, কেমন? প্রেমট্রেম এখনই তেমন ভেবে উঠতে পারিনি। তাছাড়া আমি বরাবরের লাজুক। কাজেই এখনই তোমায় হলফ করে বলতে পারছি না যে আমরা মিউচুয়ালি প্রেম করবই। তবে চান্স যে নেই তা নয়। আর চান্স যেহেতু আছে, সেহেতু তুমি তোমার ওই সাজানো প্রেমিক অরিজিৎকে বলে দিত পারো যে বিয়েটা আপাতত ক্যান্সেল।
- অরিজিৎ সাজানো? হোয়াট ননসেন্স?
- ও মা! এই সহজ ডিফেন্স মেকানিজমটা ধরতে পারোনি? তুমি আমার প্রেমে পাগল অথচ বলতে পারছ না। একটা প্রেশার রিলীজ ভাল্ভ দরকার তো। অরিজিৎ হচ্ছে তাই। ও'সব নিয়ে ভেবো না।
- তুমি উন্মাদ! আমি তোমায় ভালোবাসি না।
- আহ্হা! আ ক্লাসিক কেস অফ সেল্ফ ডিনায়াল!
- অসহ্য। তা তুমি কী করে জানলে? যে আমি মনে মনে তোমায় ভালোবাসি?
- জলের মত সহজ তো। আমায় পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তোমার এতটাই যে পোষা হুলোর নাম দিলে সিলি।
- তো?
- সিলিকে যখন বাড়ি এনেছিলে তখন আমি নর্থ বেঙ্গলে ছিলাম। অফিসের ট্যুরে শিলিগুড়িতে। তখনও তোমার অবচেতনে ছিলাম আমি আর মন জুড়ে ছিল শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ির শিলি নিয়েই তুমি সিলি নাম ভেবেছ। সাবকনশাসলি।
- উফফ! মাগো!
- তারপর এই অরিজিৎ।
- অরিজিৎ কী করল?
- ওই নামের ছেলেই কেন পছন্দ করলে জানো? কারণ তোমার অন্তর আমায় পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছিল। মনে মনে তুমি আমার কাছে হেরে যাচ্ছিলে। তুমি ভাবছিলে যে আমি তোমায় ভালোবাসায় হারিয়ে দিলাম। তুমি হারের স্বীকারোক্তি হিসেবে আমায় গোপন মেসেজ দিতে চাইলে; অতনুরই জিত। অর্থাৎ অ'রই জিত। তাই অরিজিৎকে বেছে নিলে।
- হোয়াই ডোন্ট ইউ ডাই?
- তোমায় এমন অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে? ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি তোমায় সহজে ছেড়ে দেব না লিপি। হ্যালো? হ্যালো? এ কী! যাহ্। লাইন কেটে গেল যে।

Friday, March 24, 2017

অনির্বাণ আর কলিংবেল

কলিং বেলের স্যুইচটার দিকে বড় মায়া নিয়ে তাকিয়েছিল অনির্বাণ। বছর সাতেক আগে স্যুইচটা ছিল ধবধবে সাদা, বুকে লাল রঙের ঘণ্টি আঁকা। নতুন ফ্ল্যাটের সমস্ত ইলেক্ট্রিকাল জিনিসপত্র চাঁদনির বাজার থেকে কিনেছিল অনির্বাণ, মিতার সঙ্গে। এর টিংটং কর্কশ নয় একদমই, বরং বেড়ালের মত আদুরে।  এখন সে কলিং বেল হলেদেটে, তার বুকের ঘণ্টি আবছা। তবে টিংটংটা আগের মতই পশমি নরম।

সেই কলিং বেলটা। গত তিন বছর ধরে রাতের ঠিক এ সময়টা এসে বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করে অনির্বাণ। এই, রাত তিনটে নাগাদ। মিনিট দুয়েকের মাথায় মিতা উঠে আসে। এলোমেলো আঁচল আর কপালে উড়ে আসা চুল। মিতা, জুঁই গন্ধের মিতা। কলেজ পালানো দুপুরের মিতা। রেজিস্ট্রি বিয়ের দুপুর আলো করা হাসির মিতা। ঘাসে গা এলিয়ে দেওয়া আলস্যের মিতা। সে রোজ এসে দরজা খোলে।

অনির্বাণ বুঝতে পারে যে মিতা তাঁর উপস্থিতি টের পায়, অনুভব করতে পারে। অথচ মিতার চোখে আজও ভয় দেখেনি অনির্বাণ,  এই তিন বছরে একবারও না। রাত আদরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলে, ক্রমশ মিতার চোখের ছলছলে অনির্বাণের অস্থিরতা কাটে। রাতের বাতাসে মিলিয়ে যেতে মিনিট তিনেক সময় নেয় অনির্বাণ, সেই মিলিয়ে যাওয়াও ছুঁতে পারে বোধ হয় মিতা।

শুধু আজকেই কেমন সমস্ত গুলিয়ে গেল। অনির্বাণ মিলিয়ে যেতে পারছিল না। মিনিট দশেক হয়ে গেল, সে নিজে যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল রাতের আবছায়ায়। কী হল? মিতা কি এখনও অনুভব করতে পারছে তাকে?

পরক্ষণেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো অনির্বাণের। টের পেল যে প্রথমবার মিতা সোজা তার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে। ওর নীল সাদা ছাপার শাড়ি মেঘ মেঘ হয়ে অন্ধকারে মিশে, ওর কোমর ছাপানো চুল বাতাস নিয়ে ছেলেখেলা করছে।

এক পশলা বৃষ্টির মত রাতের বাতাসে শীত ছড়িয়ে ঝরে পড়ার আগে অনির্বাণ খেয়াল করল যে কলিং বেল বাজানোর পর মিতা যথারীতি বাইরে বেরিয়ে এলেও, সদর দরজাটা খোলা হয়নি আদৌ।

টিভির রিমোট

টিভির রিমোট বড় সংবেদনশীল বস্তু।

এ জিনিস যার হাতেই থাক তাকে ফেরেব্বাজ বলে মনে হয়। সামনে চলন্ত টিভি থাকলেই পাশে বসা রিমোট হাতে মানুষটার প্রতি অবিশ্বাস দৃঢ় হয়। হবেই। এই বুঝি চ্যানেল পালটে দিলো, এই বুঝি চ্যানেল পালটে দিল। রিমোট হারানোর সঙ্গে সঙ্গে জীবনে নেমে আসে একটা হাত কামড়ানো অস্বস্তি।

হয়তো আপনার মনে হল নিউজচ্যানেল ট্যু নিউজচ্যানের খেউর শুনে মন ভালো করবেন, অথচ রিমোটওলা মন দিয়ে ডিসকভারিতে পোলারবিয়ারের গ্যাস অম্বলের ধাত নিয়ে একটা অনুষ্ঠান দেখে চলেছেন। আপনাদের ইতিউতি কথা হচ্ছে বটে কিন্তু রিমোটওলার মন রয়েছে টিভিতে আর আপনার মনে ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে স্লোগান "রিমোটওলা হাড়বজ্জাতের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও"।

একটা ঘরে যদি বুদ্ধ (গৌতম), গান্ধী (মোহনদাস), একটা কেবল-সহ টেলিভিশন, একটা রিমোট আর একটা বন্দুক রেখে দেওয়া হয়, তাহলে বাহাত্তর ঘণ্টার মাথায় একটা লাশ পাওয়া যাবে। যাবেই। কেউ মন দিয়ে গবেষণা করলে জানতে পারবেন যে টেলিভিশন রিমোট আবিষ্কারের সঙ্গে গোটা বিশ্বে ডিভোর্সের সংখ্যা হুড়মুড় করে বেড়ে গেছে।

এই টেলিভিশনের রিমোটের জন্যই ছোটমামাও প্রায় তেত্রিশ বার ডিভোর্সের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছিলেন। ইন ফ্যাক্ট গত শনিবার মামাকে নিখিল তান্ত্রিকের ডেরা থেকে বেরোনোর সময় পাকড়াও করে জানাতে পারলাম যে নিখিল নাকি মামাকে আশ্বাস দিয়েছে যে গোপনে মামীর রিমোট ছাড়ানোর টোটকা তার জানা আছে। এ'দিকে মামীকে যে আমিই প্রতি বিস্যুদবার বিকেলে নিখিলের কাছে নিয়ে আসি সে গোপন খবরের আঁচ মামা পায়নি দেখলাম। নিখিলের ব্যবসায় টার্নওভারের প্রতি কমিটমেন্ট দেখেও ভালো লাগলো।

আমার বহুদিনের শখ ছিল একটা এলইডির। নিখিলেরই কল্যাণে ছোটমামার এলইডি আমার একলার সংসারের শোওয়ার ঘরে প্রতিষ্ঠিত হল অস্ট্রেলিয়া সিরিজের সেকেন্ড টেস্টের আগেই।

ইউটিউব এসে মামাবাড়ির সম্পর্কের একটা ঠ্যাং কফিন থেকে হিঁচড়ে বের করতে পেরেছে। আর হায়ার সেকেন্ডারি ফেল নিখিলের পকেটে টু পাইস যাওয়াটা একটা বাড়তি তৃপ্তির কারণ তো বটেই।

Wednesday, March 22, 2017

এফ আই আর

এফআইআর দিব্যি স্বাস্থ্যকর জিনিস। এ'তে চাপাতি নেই। গায়ে অ্যাসিড ছোঁড়া নেই। গুণ্ডা লাগিয়ে বেধড়ক পিটুনি নেই। এফআইআর হচ্ছে যা'কে বলে ইম্প্রুভমেন্ট।

আমাদের উচিৎ এফআইআরের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।

অমুকে আমার বই থেকে আমায় না বলে পেজমার্ক সরিয়ে নিয়েছে। এফআইআর।
তমুকে প্যারামাউন্টের ডাব সরবতের গেলাস 'নাপসন্দ' বলেছে। এফআইআর।
ইস্টবেঙ্গল পেনাল্টি পেলে মোহনবাগানের এফআইআর।
বিরিয়ানির আলুর সাইজ ছোট পেলে এফআইআর।

এটিএমের মত হাফ মাইল অন্তর এফআইআর সংগ্রহ কাউন্টার থাকবে। রাগ হলেই সুট্ করে সে'খানে ঢুকে পড়ে এফআই আর করে দেব। রাগ নরম হয়ে আসবে। বেগুনী খেতে ইচ্ছে করবে।

এফআইআরের নেশা ছড়িয়ে দেওয়া হোক। এফআইআর করলে জিও সিম ফ্রী দেওয়া হোক।
সরকার বাহাদুর বছরের সেরা এফআইআর করিয়েকে
এফআইআরভূষণে সম্মানিত করুক।
মোড়ে মোড়ে মাইকে গজল বাজুক "FIR লে আয়া দিল.."।

এ'সব করে যদি চাপাতি বোমা ঠুসে দেওয়া হুজ্জুতিটা সামান্য কমে, সে'টাই হবে এ পুওরর ম্যান'স জায়ান্ট লীপ।