Monday, January 22, 2018

সিলভার লাইনিং


- এই যে মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস! ডেটা তৈরি? 
- ইয়েস ম্যাডাম। স্প্রেডশিট আর সামারি তৈরি।
- শুনি। হাইলাইটস।
- আপনার পায়ের কাছে এ বছর যা যা বই ডিপোজিট হয়েছে সে'টা অ্যানালিসিস করে একটা ব্যাপার স্পষ্ট। ট্রেন্ড এ বছরেও পাল্টায়নি। বাহান্ন শতাংশ বই অঙ্কের।
- ধুস। অঙ্ক ভুল ভাবে শিখিয়ে শিখিয়ে আমরা একের পর এক ভিতু জেনারেশন তৈরি করছি। এ আর পাল্টানোর নয়। 
- স্পেশ্যাল ট্রিভিয়া ম্যাডাম। জমা পড়া অঙ্কের বইয়ের মধ্যে বত্রিশ শতাংশ বই হচ্ছে গাইড বই আর সাজেশনের খাতা। যা কিনা গত বছরের তুলনায় সাড়ে ছয় শতাংশ বেশি। 
- এর মানে খবরের কাগজে জ্যোতিষ আর তুকতাকের বিজ্ঞাপন বেড়েছে, তাই না মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস? 
- ইনক্রেডিবল। জ্যোতিষ চর্চার বিজ্ঞাপন ঠিক সাড়ে ছয় শতাংশ বেড়েছে। ইয়ার অন ইয়ার।
- কনেকশনটা স্পষ্ট ভাই প্ল্যাটিরিঙ্কোস। এত হিন্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। সব জলে। সবাই কুল খাওয়ার ডুজ অ্যান্ড ডোন্টস নিয়ে পড়ে আছে। নাহ্, এ'সব ডেটা নিয়ে পড়ে থেকে লাভ নেই। ও স্প্রেডশিট আমার ডেস্কটপে এক কপি সেভ করে দিও। খামোখা প্রিন্টট্রিন্ট নিয়ে ফাইল মোটা করতে যেও না। সিলিভার লাইনিং কিস্যু নেই কোথাও।
- ইয়ে।
- কী ইয়ে?
- একটা মাইনর অ্যানোমালি আছে ম্যাডাম। 
- মাইনর? কী?
- না মানে, এ'টা সিলভার লাইনিং কিনা জানিনা। আপনার পায়ের কাছে জমা পড়া সমস্ত কেতাব দস্তাবেজের মধ্যে খান তিরিশেক ইয়ে...পাওয়া গেছে।
- আবার ইয়ে?
- কয়েকটা মেনুকার্ড। তিনটে আরাসালান, পাঁচটা সিরাজ, দু'টো আমিনিয়া এট সেটেরা...। আর কয়েকটা ট্র‍্যাভেল ব্রশার...কুণ্ডু ট্র‍্যাভেলস টাইপের। ব্যাপারটা কী ভাবে যে ইন্টারপ্রেট করব ম্যাডাম...!
- ফাদার অফ সিলভার লাইনিং মিস্টার প্ল্যাটিরিঙ্কোস! আশা আছে, ডেফিনিটলি আছে।


ভেবেটেবে

অনেক ভেবেটেবে দেখলাম।

ভালোলাগা গানের শেষের ফুড়ুৎ করে বেরোনো 'আহা',
হুড়মুড়ের মধ্যিখানে ফোনের ও'পাশে মায়ের 'খেয়েছিস?',
পুজো আসছের মন ফুরফুরে 'এইব্বারে জমবে',
জমাটি শীতের রাতে মনপসন্দ বইয়ের শেষে পাতায় পৌঁছনো 'আইব্বাস',
পুরী যাওয়ার ওয়েটলিস্ট টিকিট কনফার্ম হওয়ার 'ইউরেকা',
হাজারবার প্ল্যান করেও জমানো চিঠি ছিঁড়ে কুচিকুচি না করতে পারার 'ধ্যাত্তেরি',
ছোটবেলার ইয়ারদোস্তের গায়ে পড়া 'আরে বল না বে কী হয়েছে',

এ'গুলো কিছুতেই যাওয়ার নয়।

অতএব,
'সিটিসি'র পায়ে দড়ি পরিয়ে 'ছোটিসি আশা'র বাঁশের খুঁটিতে বাঁধতে পারলেই নিশ্চিন্দি।

(ইয়ে, 'বাঁশ'য়ের খুঁটির রেফারেন্স দিলাম কেন কে জানে)।

Sunday, January 21, 2018

সুবিমলবাবু

- সুবিমলকে একটু ডেকে দেবেন?
- কে?
- আমি মনোময় দত্ত। ও আমার সঙ্গে অক্রুর দত্ত লেনের মেসবাড়িতে টানা অনেকদিন ছিল।
- না না, আপনি কাকে খুঁজছেন বললেন?
- সুবিমল। সুবিমল মৈত্র। ডেকে দিতে পারবেন কি?
- এ'খানে ওই নামে কেউ থাকেন না।
- ওহ। ডাকতে পারবেন না তা'হলে।
- থাকেনই না কেউ ওই নামে।
- আমিও তো তাই বললাম। সুবিমল তা'হলে এখন নেই।
- আরে! বলছি সুবিমল নামে কেউ এ বাড়িতে থাকেই না।
- আমি কি আপত্তি করেছি?
- তাহলে বলছেন কেন যে সুবিমলকে আমি ডেকে দিতে পারব না।
- পারবেন কি? ডেকে দিতে? এখন?
- ইয়ার্কি হচ্ছে! ওই নামে কেউ কস্মিনকালেও এ'খানে থাকেনি।
- অত ঘুরিয়ে বলছেন কেন? জানতে চাইলাম সুবিমলকে ডেকে দিতে পারবেন কিনা। পারবেন না, ল্যাঠা চুকে গেল!
- পারার প্রশ্নটা আসছে কোথা থেকে? যে এ'খানে নেই তাকে ডাকবই বা কী করে?
- মহামুশকিল। সে যদি এখানেই থাকবে, তা'হলে তাকে খামোখা ডাকতে বলবই বা কেন? এখানে নেই, তাই বলেই তো জিজ্ঞেস করলাম যে সুবিমলকে ডেকে দিতে পারবেন কিনা।
- না মানে, কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে।
- স্বাভাবিক। আমি এক প্রশ্ন করছি অথচ আপনি কী সব আগডুমবাগডুম উত্তর দিয়ে চলেছেন। পারবেন কি সুবমিলকে ডেকে দিতে?
- সুবিমল? আপনার মেসের বন্ধু?
- এই তো। দিব্যি চেনেন। পারবেন ডেকে দিতে?
- আমি তো সুবিমল বলে কাউকে চিনি না। মাইরি। আমার নাম হরিহর দত্ত। আমার বাপ দিবাকর গত হয়েছেন বছর দশেক। আমি এক ছেলে, বিয়েথা করিনি। একাই থাকি।
- ফের অদ্ভুত যুক্তি। আপনার বাপের নাম দিবাকর বলে আপনি সুবিমলকে ডাকবেন না? উইলে লিখে গেছিলেন নাকি আপনার বাবা?
- আমার কেমন গোলমাল ঠেকছে মনোময়বাবু।
- ঠেকছে না? আপনার কথাবার্তায় আমারও তেমনই মনে হচ্ছে হরিহরবাবু।
- আচ্ছা, ডেকে দেখব? সুবিমলকে?
- ক্ষতি তো নেই। থ্যাঙ্ক ইউ।
- কিছুই বলা যায় না, বলুন?
- পয়েন্ট।
- তা'হলে ডাকি? সুবিমলবাবুকে?

**

"সুবমিলবাবু" বলে বার চারেক হাঁক পাড়তেই পুঁটিরাম সুট করে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে মনোময় দত্তর কোলে উঠে বসল। মনোময় শুকনো থ্যাঙ্ক ইউ বলে বেরিয়ে গেলেন।

মাস ছয়েকের পরিচয়েই পুঁটিরামকে বড় আপন করে নিয়েছিলেন হরিহরবাবু। কিন্তু আজ স্পষ্ট বোঝা গেল যে পুঁটিরাম হরিহরবাবুকে আদৌ নিজের ভাবতে পারেনি। যাকগে, একা থাকার কপাল হরিহরবাবুর,  তাঁর ভাগ্যে অমন আদুরে বেড়ালের সঙ্গ-সুখ সইবে কেন?

Saturday, January 20, 2018

আয়

"তোর বোধ হয় দেরী হচ্ছে, তাই না"?

"হুঁ"?

"তোর জরুরী কাজ আছে, তাই না? এখুনি যেতে হবে"?

"হ্যাঁ! মানে, একটা জরুরী মিটিং। কোয়ার্টার এন্ড প্রেশার! বুঝতেই পারছিস"।

"আয়, আমি কিছুক্ষণ এ'দিকটায় হাঁটাহাঁটি করে ফিরে যাব'খন"।

"আসি"।

"আয়"।

"সাবধানে ফিরিস"।

"আয়"।

"আসি"?

"আয়"।

চ্যাটার্জিবাবুর মিটিংয়ে ফেরার তাড়া বিশেষ ছিল না। গলা বুক জ্বালাটা বোধ হয় অসময়ে চা-ফুচকার। অথবা না বলা দলা পাকানো "ধ্যাত, যাব না"র।

ইস্তিরি

গুপ্তিপাড়ার পুটুপিসির আনা সম্বন্ধটা বেশ মনে ধরেছিল মন্টুবাবুর। ফটোতেও কমলার হাসিটা কী উজ্জ্বল, মন ভালো করা। পিসি একপ্রকার ধাঁতানি দিয়েই বলেছিলেন "মেঘে মেঘে বেলা তো কম হল না। কলকাতায় একা একা বাউণ্ডুলে হয়ে আর কদ্দিন পড়ে থাকবি? চাকরীবাকরী করছিস, এ'বার বিয়ে করতেই হবে"।

মন্টুবাবু গাঁইগুঁই যে'টুকু করেছিলেন সে'টুকু স্রেফ লজ্জায়। আদতে ভদ্রলোকের বড় শখ ছিল একটা বিয়ের। আয়নায় সাঁটানো টিপ, কাচে তুলে নেওয়া টিপের ফেলে আসা আঠার ছাপ। আলনায় রংচঙ। আলমারির ছোট লকারে দু'টো হার, কয়েক গাছা চুরি, চার জোড়া দুল। বাথরুম থেকে ভেজা পায়ে বেরোলে মুখ ঝামটা, যার ঝাঁজ ডাইলুট হয়ে যাবে চুরির খনরখনে। ড্রেসিংটেবিলে চোদ্দ রকমের ক্রীম আর লোশন, ঘরময় ফুরফুরে পন্ডসিও সুবাতাস। শীতে চেসমী গ্লিসারিন সাবান, বাকি সময় মোতি স্যান্ডালউড। হপ্তায় একবারের বেশি দু'বার 'মাংস খাবো' গোছের হাভাতে স্লোগান তুললেই ভুঁড়ির খোঁটা খাওয়া। চটপট একটা এলআইসি আর খান কয়েক মিউচুয়াল ফান্ডের কথা ভাবতে হত। মেডিক্লেমটা আর একটু পোক্ত করতে হত। বছরে একবার রাজস্থান বা দার্জিলিং।

আর ছুটির দিনগুলোয় বৌয়ের একবার পরা শাড়িগুলো নিয়ে বসতে হত ইস্তিরি করতে। মেঝেতে শতরঞ্চি পেতে গুছিয়ে বসে। অপার মনোযোগ দিয়ে ছাপার থেকে তাঁতে, এ রঙ থেকে ও রঙের ওপর ইস্তিরি বোলানো। রান্নাঘর থেকে ডালে ফোঁড়ন দেওয়ার মনমোহিনী গন্ধ ভেসে আসবে। শাড়িগুলোকে পরিপাটি করে বাধ্য গরুদের মত গুনে গুনে আলমারির গোয়ালে চালান করা, আহা। মাংস কষানোটা আবার পুরুষের হাতেই ভালো হয়, মন্টুবাবু সে দায়িত্ব নিজের কাঁধেই রাখতে চান।

কিন্তু স্বপ্ন থাকলেই তো সবসময় স্বপ্নপূরণের পথে পা বাড়ানো সম্ভব হয় না। শত ইচ্ছে থাকলেও মন্টুবাবুকে শেষ পর্যন্ত গুপ্তিপাড়ার ঠিকানায় কমলার ছবিটা ফেরত পাঠাতে হল। মেয়েটার চোখ দেখে বোঝা যায় ওর মনটা কতটা ভালো, কী ভীষণ নিষ্পাপ। অফিসের মানুষজন, পাড়ার কিছু মানুষ আর ছ'মাসে ন'মাসে দেখা হওয়া পুটুপিসিকে ঠকানো যায়। কিন্তু কমলাকে বিয়ে করে অমন দাগা মন্টুবাবু কিছুতেই দিতে পারবেন না।
পাড়া অফিসের লোক আর পিসি আঁচ করতে না পারলেও, ঘরের বৌ কি টের পাবে না? যে বছর দুয়েকে আগের সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষদের যে লিস্টিখবর কাগজে বেরিয়েছিল তাতে মন্টুবাবুরও নাম ছিল? বৌ কি টের পাবে না যে মন্টুবাবু হপ্তায় একবার মর্গের সেই ঘরটায় ফেরত যান যে'খানে দু'বছর আগে নিজের বডিটা ফেলে আসতে হয়েছিল?

Friday, January 19, 2018

খাতা

বড় সাধ করে একটা দামী চামড়ায় বাঁধানো খাতা কিনেছিলেন আইনস্টাইনবাবু। খয়েরী মলাটে সোনালী আলপনা।  মোটা হলদেটে সব পাতা, সে খসখসে হাত দিলেই মন নরম হয়ে আসে।

ভেবেছিলেন কবিতা লিখবেন। কিন্তু ভাবলেই তো আর দাঁতের ফোকর থেকে মাংসের রোঁয়া বের করে আনা যায় না, খেলিয়ে খেলিয়ে দাঁতখড়কেকে তুলির মত চালিয়ে তবে তাকে তুলে আনা যায়। কবিতাও তেমনই গোলমেলে চীজ। দশ দিন দশ রাত তপস্যা করে একটা শব্দও কলমের ডগা থেকে বেরোলো না। সে কী মনখারাপ। শীতের রাতের কড়াইশুঁটির কচুরিও বিস্বাদ ঠেকতে লাগল। ডায়েরিটাকে ধোপার হিসেব লিখেই কোতল করবেন, তা একরকম মনস্থ করেই ফেলেছিলেন তিনি।

হঠাৎ তার রত্নাকরের কথা মনে এলো। মড়া মড়া বলতে বলতে যদি টেন্ডস টু রামের দিকে মুভ্ করা যায়।

যেমন ভাবনা তেমনি কাজ।

রাত জেগে কবিতার খাতায় অঙ্কে-ভুল প্র‍্যাক্টিস করা শুরু করলেন আইনস্টাইনবাবু।

বিভূতি

বিভূতি এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায় কী প্রচণ্ড ভিড়। প্রতিদিনই থাকে, কিন্তু আজ যেন অস্বাভাবিক রকম বেশি। এক দাড়িয়াল ভদ্রলোকের নির্মম থুতনি কাঁধে বিশ্রি ভাবে ঠুসে পড়ছিল বারবার। ভদ্রলোকের অবশ্য কিছু করার নেই, আমার কাঁধ বেয়ে মাঝেমধ্যে উঠে না এলে অক্সিজেনের সাপ্লাইয়ে টান পড়তে পারে। পায়ের ওপর পা আর পায়ের পাতার টনটন মাথা পেতে নেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। আমার জুতোর তলে খান তিনেক পায়ের পাতা থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, আবার জুতোর ওপরে খান দুই ওজনদার পা।

এক চা-ওলা বদ সাহসে ভর দিয়ে ট্রেনে উঠেছিল, এখন ভিড়ে জব্দ হয়ে অপেক্ষা করছে কেটলি উঁচিয়ে, বর্ধমান এলেই নেমে হাঁপ ছাড়বে। এই ভিড়ে চায়ের কাপ সামলানো দূরের কথা, সল্টেড বাদামের প্যাকেট ছেঁড়াও অসম্ভব।

আর এই ভিড় বাঁচিয়ে বাঙ্কে এক বাপ তার বছর দুই বয়সের খোকাকে নিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসেছে। বসেছে বটে, তবে খোকার ধড়ফড়ানিতে সোয়াস্তিতে বসার যো নেই। খোকার কথা স্পষ্ট ফোটেনি, কিন্তু মুখে হিজিবিজির ফুলঝুরি। তবে বাপের মুখে অবিরাম হ্যা-হ্যা ভাব সেঁটে আছে, খোকার শত ঘ্যানঘ্যানেও সে হাসি পরাস্ত হওয়ার নয়। খানিক পর বাপ একটা সবুজ প্লাস্টিকের টিফিন বাক্স খুলে রুটি সবজি বের করে খোকাকে খাওয়াতে শুরু করলে, সঙ্গে আগডুম বাগডুম গল্প। খোকা রুটি খায় কম, গল্প গেলে বেশি।

দেহাতি ভাষায় সে বাঘভল্লুকের গল্প বেশ জমে উঠেছিল। মিনিট তিনেক গল্প শুনলে খোকা এক গেরাস মুখে নেয়। বাপের মুখ থেকে হ্যা-হ্যা'র দাপট এক ইঞ্চিও এ'দিক ও'দিক হয় না। ভিড়ের চাপা গমগম ছাপিয়ে কার মোবাইল স্পীকারে তখন কিশোরকুমারের গান বাজছিল; "এক বার ইয়ু মিলি, মাসুম সি কলি..."।

টের পেলাম ভদ্রলোক নিজের বাপসুলভ হ্যা-হ্যা দিয়ে নিজের চোখের মা-মা ভাব ঢেকে রেখেছে। এ'দিকে পায়ের টনটন বেশ কমে আসছে। ইচ্ছে করছে গন্তব্যে না নেমে আরও দু'চার স্টেশন যাই বাপ-ছেলের সঙ্গে। খোকা ঘুমোনোর সময় বাপে গান গাইবে না?

Monday, January 15, 2018

বসত করে কয়'জনা


ব্যালকনিতে কনকনে হাওয়া। গায়ে মাথায় শাল জড়িয়েও ঠকঠক করে কাঁপতে হচ্ছে। মনোহরবাবু সিগারেট ধরিয়ে মোড়াটা টেনে বসলেন। তবে দু'টানের মাথাতেই টের পেলেন যে এই ঠাণ্ডায় বসে থাকা যাবে  না। বাধ্য হয়ে উঠতে হল।


ঘুম না এলে বিছানায় এ পাশ ও পাশ করাটা বেশ অস্বস্তিকর। তাছাড়া বিধাতা ব্যালকনি সৃষ্টিই করেছেন নির্ঘুম রাত্রিগুলোর জন্য। বালিশের পাশে রাখা গোল্ডফ্লেকের প্যাকেট আর দেশলাই পকেটে নিয়ে উঠলেন মনোহরবাবু। বারান্দায় যাওয়ার আগে গায়ে শালটা ভালোভাবে পেঁচিয়ে নিতে হল, এ'বছর ঠাণ্ডাটা মোক্ষম পড়েছে।


শোওয়ার ঘরের উত্তরে ব্যালকনির দরজা। সে'খানেই মুখোমুখি ধাক্কা। কী মুশকিল। ঘরে একা থেকেও ঝামেলার শেষ নেই। মাঝেমধ্যেই ঝুটঝামেলা। এই যেমন এই মাত্র বারান্দা থেকে উঠে আসা মনোহরবাবুর সঙ্গে শোওয়ার ঘর থেকে ব্যালকনির দিকে যেতে চাওয়া মনোহরবাবুর মুখোমুখি ধাক্কা। ব্যালকনি মুখো মনোহরবাবু গজরগজর করতে করতে ব্যালকনির মোড়ায় এসে বসলেন।


ব্যালকনি ফেরতা মনোহরবাবু তিতিবিরক্ত মেজাজে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। ঘুম না আসার সমস্যা অতি বিশ্রী। বাথরুমের সামনে গিয়ে তিনি দেখলেন বাথরুমের দরজা বন্ধ, ভিতরে আলো জ্বলছে। আর বাইরে একজন ইতিমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল মনোহরবাবুর, তিনি বলেই ফেললেন "এত রাত্রেও বাথরুমের সামনে লাইন, পাবলিক ইউরিনালের মত অবস্থা হল দেখছি"।


বাথরুমের দরজা বন্ধ, ভিতরে বলাই বাহুল্য কেউ আছে। মনোহরবাবু বাথরুমের দরজায় দু'বার নক্ করে বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময় পিছন দিক থেকে আওয়াজ এলো "এত রাত্রেও বাথরুমের সামনে লাইন, পাবলিক ইউরিনালের মত অবস্থা হল দেখছি"।


মনোহরবাবুর রাতের ঘুম না আসার সমস্যাটা নতুন নয়। আর বাথরুমের দিকেও মাঝেমধ্যেই ছুটতে হয়। কিন্তু তাতেও কি সোয়াস্তি আছে? বাথরুমে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দরজায় টোকা আর বাইরে থেকে আওয়াজ। অসহ্য।