Wednesday, May 25, 2016

ভ্যানিশচন্দ্র

- দর্শকদের বলুন আপনার নাম...।
- আমি...আমি...।
- আমার দিকে তাকিয়ে নয়। দর্শকবন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলুন।
- আমি শশধর মাইতি। বৈদ্যবাটিতে বাড়ি।
- বন্ধুরা, বৈদ্যবাটির শশধর মাইতির জন্য এক রাউন্ড জোর হাততালি হয়ে যাক। শশধরবাবু, এই বাক্সতে আমি আপনাকে ঢুকিয়ে দেব।
- এইটায়?
- আজ্ঞে। এইটায়। আর তারপর...।
- ভ্যানিশ?
- ঠিক ধরেছেন। ভ্যানিশ করে দেব আপনাকে। আপনার ভয় করছে?
- একটু কেমন কেমন লাগছে। এই প্রথম ভ্যানিশ হওয়া তো।
- আসুন এবার বাক্সের ভিতরে।
- যাই?
- আসুন....বন্ধুরা...এই দেখুন...বৈদ্যবাটির শশধর মাইতি এবারে আমার জাদু বাক্সে প্রবেশ করলেন। কী তাই তো?

**

- কই। আসুন।
- আ...আপনি....।
- হ্যাঁ। আমি।
- কিন্তু জাদুকর সাহেব, আপনি তো বাক্সের বাইরে ছিলেন। আমায় বাক্সের ভিতরে পাঠালেন ভ্যানিশ করবেন বলে...।
- ও'টা আমি না। আমার ভ্যানিশ।
- আপনার ভ্যানিশ?
- আজ্ঞে।
- মানে কী?
- মানে বাইরেরটা অরিজিনাল না। ভ্যানিশ করে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছি। ও ম্যাজিক ফ্যাজিক দেখিয়ে বেড়ায়। আমি এই বাক্সে থাকি। ইন অরিজিনাল। দিব্বি। চা খাবেন?
- চা আছে?
- ম্যাজিক বাক্স তো। আমি আর আপনি ছাড়া পুরোটাই ম্যাজিক।
- বুঝুন কাণ্ড। বাইরের আপনি ফলস?
- ফলস না, ভ্যানিশচন্দ্র সরকার। এই নিন। চা। জেনুইন দার্জিলিং।
- আমায় অরিজিনাল বের করবেন তো এ বাক্স থেকে? আহ, বিউটিফুল বানিয়েছে মশাই চা'টা।
- বেরোতে চাইছেন?
- চাইব না?
- শিঙাড়া খাবেন?
- ম্যাজিক শিঙাড়া?
- ফুলকপির।
- আরিব্বাস।
- এবার বলুন। আপনার ভ্যানিশকে ভিতরে রেখে দিয়ে অরিজিনালকে বের করবো?
- লেজার লিখতে লিখতে আঙুলে কড়া পড়ে গেলো মশাই। আর রোজ বাসে ট্রামে বাদুড় ঝোলা। কহাতক সয়?
- ফ্যামিলি?
- ও আমার ভ্যানিশ গিয়ে ম্যানেজ দিয়ে দেবে'খন।
- আপনি থাকবেন শশধরবাবু? ইন অরিজিনাল? এ বাক্সে?  রিয়েলি?
- রিয়েলি। দিব্যি লাগছে কিন্তু। সরভাজা হবে? শিঙাড়ার পর জিভ টানছে।
- অফ কোর্স। এই নিন। সরভাজা।
- থ্যাংক ইউ জাদুকর সাহেব।
- শশধরদা, বাঁচালেন। এই প্রথম কেউ রাজী হলো বাক্সে থেকে যেতে। আরেকটা সরভাজা দিই?
- দিন, এমন ভাবে জোর করলে না করা যায় না।
- যাক, ওদিকে সময় হয়ে এলো। এবার তাহলে আপনার ভ্যানিশকে বাইরে পাঠয়ে দিই?

**

শশধরবাবু সোনামুখ করে নিমবেগুন, টকের ডাল আর মুলো ছেচকি দিয়ে এক থালা ভাত খেয়ে উঠে গেলেন। গিন্নী অবাক। আজ সন্ধ্যেয় ম্যাজিক শো দেখে মিনসে এতটাই মজেছেন যে খাওয়া নিয়ে তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘ্যানঘ্যানটুকু এক্কেবারে ভ্যানিশ।

Tuesday, May 24, 2016

দীপু, দাদু ও নজরুল

শহরে সোঁদা গন্ধ বইয়ের মলাটের মাঝে থাকে। এখানে ছাতের সিমেন্ট-মেঝের শ্যাওলায় বৃষ্টি মিশে যে সুবাস গুঁড়ো হয়ে বাতাসে ওড়ে; তাকে চিনেতে হয়, জাপটে ধরতে হয়।

বৃষ্টিভেজা রাতের গামছায় গা মুছে নেমে আসা ভোরের ছাদে; দীপুকুমার উঠতেন দাদুর হাত ধরে। 
ছাদের উত্তর কোণে  খান চারেক টবে নয়নতারার ভিড়; তাদের পাপড়িতে টুপটুপে জল। ফ্যাকাসে খয়েরী আকাশ টলটল করতো। দাদুর ধবধবে ফতুয়ার ওপর বাটিক ছাপার পাতলা চাদর জড়ানো, ধুতি লুঙ্গির মত করে পরা। দাদুর চোখে নরম হাসি; চিরকালের। মানুষটা বকতে শেখেননি, টেবিল চাপড়াতে শেখেননি। নয়নতারাদের গালে এমনভাবে হাত বুলিয়ে দিতেন; তাদেরও আরাম হত বুঝি। তখনও দীপুবাবু হাফ প্যান্টে, তখনও দীপুবাবুর হাত দাদুর হাতে। 

ভোর ঘাসের মত জড়িয়ে ধরতো তাদের দু'জনকে; ভালোবাসা ঝিরঝির করতো ভোরের বৃষ্টিমাখা মিহি হাওয়ার তালে তালে। দাদু বলতেন এ সময়টা ভৈরবীর, ছাতের পাঁচিলে ঠুকতেন দাদ্‌রা। 
"দাদুভাই, একদিন যখন অনেক বড় হবে তখন দেখবে; নজরুল হিসেবের বাইরে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। এই ধর চায়ের কাপের পাশে বা ভাঁজ করে রাখা গল্পের বইয়ের শিয়রে। সেদিন আর অঙ্ক কষে তাকে পাশে সরিয়ে রাখতে পারবে না। সে'দিন সাবমিশন। বুঝলে দীপুবাবু? সে'দিন ভালোবাসা"। 

দীপু ঠাহর করতে পারতো না। সে অপেক্ষায় রইত। এই বুঝি দাদু গুণগুণ শুরু করবেন; 

"তুমি আমার সকালবেলার সুর
হৃদয় অলস–উদাস–করা অশ্রু ভারাতুর"।

ভোরের নীলচে আলো ঘন হয়ে আসতো। কিচিরমিচির ভেসে আসতো ইতিউতি। দাদু দীপুর হাত ছেড়ে দিয়ে হাত রাখতেন দীপুর কাঁধে। 

নজরুল ভোরের পোস্টকার্ডে ঘষঘষ করে ঠিকানা লিখতে শুরু করতেন। দাদু এগিয়ে যেতেন। 

"ভোরের তারার মত তোমার সজল চাওয়ায়,
ভালোবাসার চেয়ে সে যে কান্না পাওয়ায়
রাত্রি–শেষের চাঁদ তুমি গো বিদায়–বিধুর"।

ভৈরবীর সমঝদার হবে দীপু? তাহলেই হয়েছে। সে বয়েসেই তার বারবার মনে হত এ গান রাতের, দাদু যেন সে গানকে হাত ধরে ভোরের ছাদে টেনে এনেছেন। 

"শিশির–নাওয়া শুভ্র–শুচি পূজারিণীর তুল।
অরুণ তুমি, তরুণ তুমি, করুণ তারও চেয়ে
হাসির দেশে তুমি যেন বিষাদ–লোকের মেয়ে
তুমি ইন্দ্র–সভার মৌন–বীণা নীরব নূপুর"। 

"বিষাদ-লোকের মেয়ে"; দীপুর মনে মনে আউড়ে নেওয়ার চেষ্টা করতো বারবার। দীপু ভোরের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা রাতের গল্পটুকু শুষে নেওয়ার চেষ্টা করতো। বারবার।

দাদুর ভোর নিয়ে চলে গেছেন। দীপু রাতের পরতে পরতে বেড়েছে। চিনেছে। রাতের বৃষ্টির ছলছল ছুঁয়ে দেখেছে। কিন্তু সমস্ত ছাড়িয়ে নজরুল হিসেবের বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক যেমন ভাবে দাদু বলেছিলো। স্নেহে, অতর্কিতে। 
স্কুল পেরিয়ে যেদিন কলেজ-ছোঁয়ানো-চুমু জড়িয়ে ছিলে মেঘলা আকাশ আর ছাদের অন্ধকারে;  কোথা থেকে যেন নজরুল আগলে ধরেছিলেন কিচিকে। কিচির চোখ ভরিয়ে এসেছিলেন নজরুল, দীপুর বুকে ছ্যাঁত ছুঁইয়ে ঝুপ করে নেমে এসেছিলে "বিষাদ-লোকের-মেয়ে"।    

দীপু নয়নতারার পাপড়ি উপচে পড়া টলটলে বৃষ্টি দানা দেখেছিল। দীপু কিচির কাঁপুনিতে সোঁদা গন্ধ খুঁজে পেয়েছিল। 


Sunday, May 22, 2016

ডেট

- অপ্টিমিজম একটা অসুখ।
- ব্যারাম তোমার মাথায় শুভ্র।  উফ।
- কী এমন ভুল বলেছি?
-  অপ্টিমিজম অসুখ? আশাবাদী হওয়া অসুস্থতার লক্ষণ? অপরাধ?
- অপরাধ আমি বলিনি মিতা। ডেলিরিয়াস হওয়াটা অপরাধ নয়।
- শুভ্র। প্লিজ। গো।
- তোমার ডেট এখনও এসে পৌঁছায়নি।  রিল্যাক্স। আর পার্ক স্ট্রিটে যে জ্যাম দেখলাম ওর আসতে মিনিমাম আরও আধ ঘণ্টা।
- অনিকেত তোমায় দেখলে তোমার চোয়াল ফাটিয়ে দেবে।
- এ জন্যেই আমি অবাক হয়ে যাই। তুমি মিলটন ভক্ত। আর তুমি প্রেম করছ এমন একজনের সাথে যার স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেশন অফ প্রটেস্ট হচ্ছে চোয়াল ফাটানো ঘুষি। তবে ইন আ ওয়ে ইউ কনফর্ম টু মাই থিওরি।
- প্রথমত। আমার ফিয়ন্সের ব্যাপারে ননসেন্স শুনতে আমি রাজী নই। দ্বিতীয়ত, কোন থিওরি?
- যে লাইফ হ্যাস নাথিং পসিটিভ টু অফার। জীবন মানেই অন্ধকারে ড্রেনের পাশে বসে মিইয়ে যাওয়া মুড়ি পচা রসগোল্লার রসে মেখে খাওয়া।
- শুভ্র। শাট আপ। ইউ আর ডিসগাস্টিং।
- আমি ডিসগাস্টিং? আমি? তোমায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সত্যিগুলো বলি বলে ডিসগাস্টিং?
- তুমি উঠবে না আমি ওয়েটারকে ডেকে কমপ্লেন করব?
- ওয়েটারকে ডাকতেই হলে আমার জন্য একটা পেগ বলে দাও। ওয়ান ফর দ্য রোড।
- ইউ আর টু মাচ।
- পৃথিবীটা শেমফুলি হোপলেস। সে'টা মানতে তোমার অসুবিধে কোথায়? নিজেকে ঠকাতে এত ভালোবাসো কেন?
- কারণ পৃথিবীতে আশা আছে। ইটস বিউটিফুল।
- টেল মি ওয়ান গুড রিজন।
- বিকজ দেয়ার আর গুড পিপল।
- গুড পিপল? আলাইভ? আর ইউ কিডিং মি??
- অফ কোর্স দেয়ার। আর গুড পিপল।
- উই আর অল থাগস। অনিকেতকে বেঞ্চমার্ক করে কারুর প্রশংসা করতে যেওনা। অন অ্যান অ্যাভারেজ, উই আর হারামি টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। ইনফ্যাক্ট দ্যাট ইজ হাউ ইকনমিজ ওয়র্ক। প্রত্যেকটা মানুষ ধান্দাবাজ, এই বেসিক প্রিন্সিপ্যালে ভর করে অর্থনীতি চলছে।
- একসময় তোমায় পলিটিক্যালি অ্যাওয়ার ভাবতাম। তুমি যে এতটা নচ্ছার...।
- পলিটিক্স? কে আছে? কোন পলিটিকাল ইডিওলজি মাথায় কাঁঠাল না ভেঙে সার্ভাইভ করছে? দেশেই দেখো না। বিজেপি টু কঙ্গ্রেস টু তৃণ টু কম্যুনিস্টস; সবাই ফ্রিঞ্জ বেনেফিটস আর রেটোরিক ছুঁড়ে নিজেদের ল্যাক অফ ফারসাইটকে ঢাকছে।। আদ্দামড়াদের দল; অথচ কারুর গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর সাসটেনেবল পলিসি আছে? সমস্ত ফ্রিঞ্জ ইস্যু নিয়ে লাফালাফি। শেমফুল।
- আর্ট?
- আহ। আর্ট। একটা স্পেশি পলিটিক্যালি সুইসাইড করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ,  তাদের থেকে তুমি আর্ট এক্সপেক্ট করছ? আর্ট দ্যাট উইল ট্র‍্যান্সেড টাইম? অন্তত বাঙালি হয়ে এ সময়ে আর্টের বড়াই করতে এসো না। এক্সেপশন কোট করে ভয়েডকে ডিফেন্ড করতে যেও না।
- তুমি বলছ বাঙালির শিল্প সাহিত্য কিস্যু নেই?
- ছিল। কিন্তু বর্তমান ডায়রেকশনটা সুইসাইডাল, বলছি তো। অবশ্য খোরাক বনে যাওয়ার যুগ, শুধু বাঙালি কেন; কেউই আর পিছিয়ে থাকবে না।
- তাহলে এই বস্তাপচা দুনিয়ায় তুমি বেঁচে আছো কেন শুভ্র?  সুইসাইড করছ না কেন?
- কারণ আমি সুইসাইড করলে দুনিয়ার অ্যাভারেজ আইকিউ সামান্য হলেও কমে যাবে।
- শুভ্র। জাস্ট গো অ্যান্ড ডাই। অনিকেত ঢুকলো বলে। প্লীজ।
- এই। এই হচ্ছে কারণ আমার সুইসাইড না করার, খামোখা দুনিয়ায় অনিকেতদের প্রপোরশন বাড়িয়ে দিয়ে কী লাভ?
- হে ভগবান। আই ফিল লাইক কিলিং মাইসেল্ফ নাও।গশ! শুভ্র! ইউ আর সো ফ্রিকিং নেগেটিভ।
- রিয়েলিস্ট ইজ দ্য ওয়ার্ড। আর এ দুনিয়া এতটা জঞ্জালপূর্ণ যে প্রতেকটা বুদ্ধিমান মানুষেরই মনে হওয়া উচিৎ যে মরে যাওয়াই ভালো। তবে ওই, তুমি সুইসাইড করলেও এ দুনিয়ায় বুদ্ধিমান মানুষদের প্রপোরশন কমে যাবে। তোমার অনিকেতদের পোয়াবারো হবে। ওহ, এটা খেয়াল করে দেখেছো কি যে বোকাদের মনে বাড়তি ফুর্তি থাকে? টেক অনিকেত ফর এগগজ্যাম্পল...।
- উফফফ। মা গো!
- একটা সলিউশন আছে।
- কী সলিউশন শুভ্র? প্লীজ টেল মি।
- দু'জনে মিলে সুইসাইড করি চলো। ঢাকুরিয়ায় আমাদের ফ্ল্যাটের পাশেই রেললাইন। সেখানে একটা ফ্যান্টাসটিক স্পট দেখা আছে আমার। রাত পৌনে বারোটা নাগাদ একটা ট্রেন যায়। এখনও ট্যাক্সি নিলে কচুকাটা হতে অসুবিধে নেই।
- দু'জনেই সুইসাইড করলে দুনিয়ার অ্যাভারেজ আইকিউ কোথায় গিয়ে নামবে ভেবেছো?
- মিতা। যে দুনিয়ায় আমি তুমি  দুজনেই নেই, সে দুনিয়াটা থিওরেটিকালি অ্যাবসার্ড। আমরা দু'জনেই সরে পড়লে জেনো এ দুনিয়ার দুনিয়াত্বও গায়েব হয়ে যাবে। তখন বুদ্ধিমান আর বোকাপাঁঠায় ফারাক থাকবে না।
- অনিকেত টেক্সট করেছে, পাঁচ মিনিটে ঢুকছে।
- বেশ। আমি উঠলাম।
- শুভ্র। সুইসাইড স্পটটা, আজ অ্যাভেলবল আছে?
- হুঁ?
- এখন ট্যাক্সি নিলে, সুইসাইড স্পটে রাত পৌনে বারোটার মধ্যে পৌঁছতে পারবো না, তাই না শুভ্রবাবু?
- একান্তই দেরী হয়ে গেলেও চিন্তা নেই, আমার ফ্ল্যাট খালি পড়ে রয়েছে। আজ রাতটা না হয় জিরিয়ে নেবে'খন। আমি রুটি তড়কা প্যাক করিয়ে আনবো। ডিম তড়কা। মাখন দেওয়া। তাছাড়া ফ্রিজে জলভরা রয়েছে।
- ইউ আর ডিসগাস্টিং শুভ্র।
- সো ইজ দ্য ওয়ার্ল্ড।
- লেটস গো।
- ক্যুইক।

বৃষ্টির তিন

প্রেম

হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।

মন্মথ সিগারেত ছুঁড়ে ফেলে ছাত থেকে হুড়মুড় করে নামতে গেলে। ভিজলে মুশকিল, আগামীকাল এগজ্যামিনেশন। ফিজিক্স।

নয়নতারা চাইলে দুদ্দাড় করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে চাইলে। আগামীকাল ছেলের বাড়ি থেকে আসছে তাকে দেখতে। যদি তারা পছন্দ করে ফেলে? শ্বশুরবাড়ির লোকজন যদি ফের বৃষ্টি ভিজতে না দেয়?

সিঁড়ির বাঁকে একটা জবরদস্ত ধাক্কার প্রোগ্র‍্যাম করা ছিল। দু'টো ইন্ডিপেন্ডেন্ট কার্ভ মিলে মিশে যাবে। কিন্তু খামখেয়াল বড় গোলমেলে চিজ। ঈশ্বর দেখলেন চপের দোকানটা আজ বন্ধ। উঠে গিয়ে বেসিনের আলগা ভাবে লাগানো কলের মাথা কষে ঘুরিয়ে বন্ধ করলেন।

দড়াম বৃষ্টি শুরু না হতেই থেমে যাওয়ায় মন্মথকে দ্বিতীয় সিগারেট ধরাতে হলো। ছাতের দরজার মুখ থেকে ফেরত এলে মনমরা নয়নতারা। কাল দু'জনের এগজ্যামিনেশন। মন্মথ আবার পাশ করতে বদ্ধপরিকর।

যুদ্ধ

সে এক ধুন্ধুমার বৃষ্টির রাত। স্ট্রিট ল্যাম্পের নিভু নিভু হলুদ গুলে যাচ্ছিল সরু গলির অন্ধকারে। বাতাসে অল্প জুঁই আর রামের ভাসা ভাসা সুবাস।

সামান্য অ্যাসবেস্টসের চালার আশ্রয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বৃদ্ধ মহেন্দ্রলাল। আধ ঘণ্টার ওপর হয়ে গেল; বৃষ্টি ধরার নাম নেই।

"দত্তবাবু"! ডাক শুনে অন্ধকার হাতড়ালেন বৃদ্ধ মহেন্দ্র।

"কে?"।

"আপনি? এ পাড়ায়?"।

"কে ওখানে?"।

"আপনাকে এ নষ্ট পাড়ায় দেখবো ভাবিনি"।

"আপনার ভুল হচ্ছে পালবাবু। আমি দত্ত নই"।

" পাল? কে পাল?"।

" দত্ত? কে দত্ত?"।

" ধুর ছাতা"।

"ছাতার মাথা"।

খানিক পরে বৃষ্টির ঝাপটা খানিকটা নরম হয়ে এসেছিল বইকি।

বিচার

- মাই লর্ড, আমায় এইভাবে আটক করার কী মানে?

- অর্ডার অর্ডার।  প্রথমত, এ কোর্টে চিবিয়ে কথা বলা বারণ। দ্বিতীয়ত, দৃষ্টিকটু ভাবে দাড়ি চুলকানোর জন্য আপনাকে বেয়াল্লিশ টাকা জরিমানা করা হলো।

- থামুন। আই মিন, মাই লর্ড! আমার অপরাধটা কী?

- আপনি বৃষ্টি দেখেছেন?

- সে'টা অপরাধ?

- প্রশ্নের সোজা উত্তর দিন।

- দেখেছি।

- বৃষ্টির ছবি এঁকেছেন?

- এঁকেছি। সো?

- সো? বৃষ্টি দেখলেন অথচ বেগুনী না ভেজে ছবি আঁকলেন? ওদিকে অতগুলো দামী মেঘ জাস্ট জলে গেলো। জাস্ট জলে।

রজনীর অফিস দুপুর

- দেশলাই আছে?
- আসুন।
- থ্যাঙ্কস।
- অফিসে নতুন মনে হচ্ছে? ক্যান্টিনেও দেখিনি আগে। স্টোর্সে হরেনবাবুর বদলে এসেছেন?
- অফিস? আমায় ধরে রাখবে তেমন অফিস কোথায়?
- মানে?
- মানে...শুনেছিলাম আপনাদের ক্যান্টিনের বাটা মাছের ঝোলটা বেশ চমৎকার। তাই দিয়ে চাট্টি ভাত খেয়ে গেলাম। আপনাদের ল্যাবের সমাদ্দার আমার চেনা। ওর থ্রুতেই এলাম।
- সোমবারের ব্যস্ততার বাজারে অন্য অফিসের ক্যান্টিনে এলেন বাটার ঝোল খেতে?
- সোমবারকে ডরালে আমার নাম রজনীকান্ত হত না মশাই। সোমবারের গলায় বকলস পরিয়ে ঘুরি আমি।
- বটে?
- অফকোর্স। সকালটা কেটেছে লাইব্রেরিতে। এখন লাঞ্চ হয়ে গেছে। এবার সিগারেট ফুরোলেই সোজা অটো ধরে বাড়ি। সোমবারের দুপুরে আবার আমার ভাতঘুম জমে ভালো। আমার রিল্যাক্সেশন, আর এই আপনাদের ঘানি টানা। মনডে ব্লুজ।
- তা বটে। বাঙালি ক্লার্ক হয়ে জন্মেছি যখন, সোমে হদ্দ না হয়ে উপায় কী?
- করেক্ট।
- এই দেখুন না। এগারোটা নাগাদ অফিসে ঢুকতে হলো আজ।
- এগারোটা?
- ফার্স্ট ডে অফ দ্য উইক। দেরী করার উপায় আছে? এসে সবে আজকের  আনন্দবাজার,  আজকাল আর বর্তমানটা একটু উলটে পালটে দেখছি...এই ধরুন চল্লিশ মিনিটের বেশি হয়নি। অমনি গুপ্ত এসে ইলেকশনের এমন গল্প ফেঁদে বসলে যে কনসেন্ট্রেশন গেল চটকে। বিশুকে একটা চা দিতে বলে ফোকাস করলাম গুপ্তর লজিক খণ্ডনের দিকে। আজকাল ছেলে ছোকরা, চারটে এডিটোরিয়াল পড়ে ভাবে যে ইলেকশনের ট্রেন্ড তার হাতের মুঠোয়। একটু কড়কে দিলাম আর কী। একটা নাগাদ মল্লিক অ্যান্ড সনসের ফাইলটা খুলে একটু  নাড়াচাড়া করতেই লাঞ্চ টাইম হয়ে গেলো। যাক রজনীবাবু, আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগলো। আমি বিপিন দত্ত। আমার তো আবার আপনার মত কপাল নয় যে মন্ডে দুপুরে ভাত ঘুম দেবো, যাই টেবিলে ফেরত।
- ওহ। আপনার তো আবার সে ফাইলটা রয়েছে...।
- ফাইল? কোন ফাইল?
- ওই যে বললেন। মল্লিক অ্যান্ড সন্সয়ের ফাইল।
- ওহ হো। ব্যাপারটা কী জানেন? সেকেন্ড হাফে নতুন কাজে হাত দেওয়ার কোন মানে হয় না। বুঝতেই পারছেন। একে সোমবারের প্রেশার, অন্যদিকে আজ আবার একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরোব ভাবছি। একটু নিউমার্কেট যাওয়ার আছে সাড়ে চারটে নাগাদ। গিন্নীর শপিং আর আমার মনডে স্ট্রেস বাস্টিং। আপনি বরং আসুন, ইউ লাকি ম্যান। আমি যাই অফিসে ফেরত।  গুপ্ত ভোট শেয়ার নিয়ে কিছু একটা বাতেলা ঝেড়েছিল। শায়েস্তা করতে হবে। চলি, কেমন?
- বেশ।

রজনীবাবুর জিভ থেকে বাটা মাছের টানটান ঝোলের স্বাদ উবে গিয়ে একটা তিতকুটে ভাব আসতে শুরু করেছিলো। পেটের ভিতর একটা বেমক্কা খালি খালি ভাব ঘুরপাক খাচ্ছিল।

বিপিন দত্তর অফিস থেকে বেরিয়েই সোজা একটা পত্রিকার স্টলে ঢুকে এক কপি কর্মক্ষেত্র কিনলেন রজনীকান্ত।

ঘট

টাকা জমানোর সেই জমকালো ঘটখানা বড় প্রিয় তাঁর। হাটবাজার থেকে কেনা দুপাঁচ টাকার সস্তা মাটির ঘট নয়, এ ঘট রীতিমত সোনা দিয়ে বাঁধানো। গায়ে নিঁখুত কাজ। হীরে, চুনি,  পান্না; কত কী বসানো। সর্বক্ষণ ঝলমল করছে।

তিনি মাঝেমাঝেই নিজের লুঙ্গি টেনে পালিশ করে নেন ঘটখানা। ঘটের ঝিলিক এসে পরে তাঁর হাসিতে। শুধু দুঃখ একটাই; টাকা জমানো আর বড় একটা হয়ে ওঠে না। শয়ে শয়ে বড় নোট ঘটে গুঁজে রোয়াব দেখানোর দিন গিয়েছে। আজকাল কখনও কোনদিন নসীব হলে ঘটে পড়ে আট আনা। গোটা টাকার নোট বা কয়েন প্রায় পড়েই না, পড়লেও মাসে একটা কী দু'টো।

ঘটের ভিতরটা খাঁখাঁ করে।

অল্প কিছু টাকার মৃদু ছনছনটুকুই আয়েশ করে শুনে নেন তিনি। সে আয়েসেই মাঝেমধ্যে ঘটের গায়ে নিজের মেজাজি হাত বুলিয়ে নেন আলিমুদ্দিনবাবু।

সন্ধ্যেবেলার

বিকেলের শেষ নরম রোদের কণাটা যখন নরম পায়ে দিনের চৌকাঠ পেরিয়ে গায়েব হয়ে যায়, মাধবীলতার উঠোন নিকোনো ঠিক তখনই শেষ হয়। প্রতিদিন।

সদ্য নেমে আসা অন্ধকারে গা ভাসিয়ে মাধবীলতা বাড়ির পিছনের পুকুরে গিয়ে গা ধুয়ে আসে। এসে নতুন কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাধামাধবের সামনে প্রদীপ আর ধুনো জ্বেলে দুদণ্ড বসা তার। নরম মিহি সুরে কোনওদিন হয়তো গেয়ে ওঠে "শ্রী রামচন্দ্র কৃপালু ভজ মন"। কোনদিন বা গলায় থাকে সামান্য কাঁপুনি; "বাপরে নিমাই আমার, যাইও না যাইও না"। মাধবীলতার শাঁখের শব্দে তার অন্ধ প্রতিবেশিনী বৃদ্ধা সৌদামিনীর আঙুল মন্ত্রমুগ্ধতার নিয়মে কপালে এসে ঠেকে; বৃদ্ধা অসময়ে শিউলির গন্ধ পান। নিয়মিত।

সন্ধ্যার শেষ প্রান্তে প্রদীপ হাতে যখন  উঠোনের দিকে হেঁটে যায় মাধবীলতা; তখন তার পায়ের আলতা ভেজা-ঘাস-মাটির সুবাসে আরও স্বপ্নালু হয়ে ওঠে হয়তো।

তুলসী মঞ্চের কাছে এসে এক মুহূর্তের জন্য  তারার হিসেব বুঝে নেওয়ার ভঙ্গিতে  আকাশের দিকে চেয়ে থাকে সে। প্রতিদিন। সন্ধ্যা তখন সমাহিত। পরমুহূর্তেই ব্লাউজের ভিতর থেকে বের করে আনা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে প্রদীপের আলোয় জ্বেলে নেয় মাধবীলতা। অপেক্ষার ধোঁয়া উড়িয়ে তুলসী মঞ্চে হেলান দিয়ে তার দাঁড়িয়ে থাকা আর ভাবা; "ভালোবাসায় এত অপেক্ষা কেন?"।

গ্রামের অন্য কোন প্রান্তের ট্রান্সিস্টরে; বিবিধভারতীর ফ্রিকুয়েন্সি তখন হয়তো জানান দিচ্ছে;  "চুরা লিয়ে হ্যায় তুমনে যো দিল কো"।

Thursday, May 19, 2016

ডাক্তার দত্তর হিপনোটিজম

- ধরো, একটা সবুজে সবুজ ঢেউ খেলানো প্রান্তর। 
- সবুজে সবুজ ডাক্তার?
- এক্সপ্রেশনে বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে?
- সবুজে সবুজ ব্যাপারটা এগজ্যাক্টলি কী? 
- মানে পোয়েটিকালি স্পিকিং আর কী। ওই। সবুজে সবুজ তুমি নীলিমায় নীল। 
- ওহ। আই সি। বেশ বলে যাও। 
- হ্যাঁ। সবুজে সবুজ ঢেউ খেলানো প্রান্তরটা হেলান দিয়ে রয়েছে চুইয়ে নামা নীলে। সবুজে নীলে মিলে একটা অপরূপ প্রাণবন্ত ক্যানভাস তৈরি করেছে। অমিয়, তুমি এ মুহূর্তে সেই ক্যানভাসটা দেখতে পাচ্ছ। 
- দেখার চেষ্টা করছি কিন্তু মা তারা ফার্মেসির ক্যালেন্ডারটা চোখের সামনে এমন খচর খচর করে নড়ছে, যে সবুজ নীলের কল্পনাটাকে ঠিক জার্মিনেট করানো যাচ্ছে না।
- ক্যালেন্ডার। সে কী! চোখ বুজে কল্পনা করতে হবে। এলিমেন্টারি। 
- প্রিলিমিনারি ইন্সট্রাকশনে তেমনটাই ছিল?
- অফ কোর্স। চিৎ হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করবে। তারপর নিজের ভাবনার ঘোড়ার রাশ আমার হাতে ছেড়ে দেব। 
- হ্যাঁ। হ্যাঁ। মনে পড়েছে। কিন্তু ডাক্তার...। 
- ফের কী হল?
- একটা মাইনর প্রশ্ন। আমার ভাবনা যদি ঘোড়ার মত না হয়ে একটা টুকরো এলেবেলে মেঘের মত হয়? অথবা শাড়ির আঁচলের মত ফস্‌ফসে?
- ঘোড়া পোষ্য। কিন্তু মেঘ? না। আর শাড়ির আঁচল? কভি নহি। আমি সাইকিয়াট্রিস্ট যখন, তখন অন্যের মন ও তার মধ্যেকার চিন্তাভাবনাগুলোকে পোষ না মানাতে পারলে যে আমার মুসিব্বত।
- আচ্ছা বেশ বেশ! এই চোখ বুজলাম। সবুজ ঢেউ খেলানো প্রান্তর গিয়ে মিশছে ঘন নীল আকাশে। বেশ। 
- দেখতে পারছ?
- ঘাসের গন্ধ এসে ঠেকছে নাকে ডাক্তার। 
- ভালো করে দেখো। ভালো করে। বাতাসে মিহি শীত ছড়িয়ে রয়েছে। জামার ওপরের খোলা বোতামটা এই বারে আটকে নেওয়ার সময়।
- হ্যাঁ। বেশ মনোরম। সুদিং।
- খেয়াল করে দেখ অমিয়, ওই উত্তরের দিকে...।
- রাইট। টুওয়ার্ডস নর্থ।  
- ও'দিকটা আচমকা ঢলে পড়েছে নদীতে। 
- খরস্রোতা। স্পার্ক্ললিং ওয়াটার। 
- ঠিক। নদীর উচ্ছলতা কান পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে অমিয়?
- কানের মধ্যে...কানের মধ্যে...।
- কানের মধ্যে কী? অমিয়?
- নদীর কুলকুল...না ঠিক কুলকুল নয় ডাক্তার...ছলছলিয়ে বয়ে চলা নদী...কান বেয়ে তুলতুল করে চলে যায়। পাখির ডাক। আহা!
- কেমন লাগছে অমিয়?
- বিউটিফুল ডাক্তার। বিউটিফুল। শেষ এতটা ফ্রেশ এয়ার ব্রিদ করেছিলাম হিমাচলে। 
- নদীর কাছে যদি এগিয়ে যাও...।
- দাঁড়াও। আগে জুতো মোজা খুলি, প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিই ডাক্তার। 
- পাহাড়ি  নদীর ব্যাপারে তোমার উইকনেসটা পুরনো অমিয়। 
- ডাক্তার...তুমি আসবে না? 
- নদীর দিকে? চলো। ইয়ে, অমিয়। 
- কী?
- ওদিকে দেখো।
- কোথায়?
- ওই, বড় পাথরটার পাশে। ওই, পশ্চিমে। 
- দু'জনে দেখি দিব্যি আড্ডা জমিয়েছে। ওঁরা কারা? আরে, সাথে দেখছি...। 
- স্কচ। মন্দ কী আর। বিকেলে বেলাটা বেশ সেপিয়া হয়ে পড়ছে। তোমার ভালো লাগছে তো অমিয়?

**
- অন দ্য রক্‌স ব্যাপারটা এখানে কত সাবলাইম লেভেলে আছে ভাবো ডাক্তার। 
- নদী ঘেঁষা পাথরে বসে স্কচ পান; অন দ্য রকস। দিজ মাই ব্রাদার, ইজ লাইফ। 
- বাতাসে একটা ভালো লাগা ছড়িয়ে আছে, জানো ডাক্তার?
- জানি। 
- ডাক্তার? অপর্ণাকে বলেছো?
- অপর্ণাকে?
- ওকে বলেছো?
- কী?
- যে তুমি ওকে ভালোবাসো?
- তোমার কি মাথা খারাপ হল অমিয়? হ্যাভ আনাদার ড্রিঙ্ক।
- আই অ্যাম শিওর দিজ ইজ জাস্ট নট আবাউট লাস্ট। সপ্তাহে একবার লুকিয়ে চুরিয়ে শোয়ার জন্য এত কিছু রিস্ক করার লোক তুমি নও। অপর্ণাও নয়। 
- শাট আপ। সাধে তুমি একটা টেরিব্‌ল সিজোফ্রেনিক কেস? আমি তোমার থেরাপিস্ট। আর বন্ধু। তুমি আমায় সন্দেহ করো? নিজের বৌকে সন্দেহ কর?
- এ জন্যেই আমার তোমাকে ঘেন্না হয় ডাক্তার। এই শেষ বিন্দু পর্যন্ত অভিনয়টাকে সত্যি প্রতিপন্ন করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। ঘেন্না করি তোমায় ডাক্তার। 
- শাট আপ। 
- ইউ শাট আপ। লেচার কোথাকার। স্কাউন্ড্রেল। 
- ও কী! ওই পাথর ছুঁড়ে মারবে নাকি? তুমি কী পাগল হলে অমিয়?

**
- অপর্ণা দেবী। 
- বলুন ইন্সপেক্টর। 
- আপনার সন্দেহ অমূলক। আপনার স্বামী খুনি নন। হ্যাঁ এটা ঠিক যে খুন হওয়ার সময় একমাত্র উনিই ছিলেন ডাক্তার দত্তর চেম্বারে। কিন্তু সে সময় উনি ছিলেন অজ্ঞান অবস্থায়। সম্ভবত  হিপনোটাইজ্‌ড। 
তাছাড়া ভারী কিছু ছুঁড়ে মারা হয় ডাক্তার দত্তর মাথা লক্ষ্য করে। তাতেই ইন্টারনাল হেমোরেজ ও মৃত্যু। অথচ ওর চেম্বারে বা আশেপাশে তেমন কোন ভারী বস্তু খুঁজে পাওয়া যাইনি। 
- তবে ডাক্তার দত্ত কি কোন ভোজবাজীতে মারা গেলেন ইন্সপেক্টর? আই নো মাই হাসব্যান্ড। ও একটা শেয়াল। ও সব পারে...।
- কিন্তু এ খুন উনি করেননি অপর্ণা দেবী। করতে পারেন না। 
- তাহলে কে...?
- আই অ্যাম সরি বাট দিস ইজ গোয়িং টু রিমেন অ্যাজ আ মিস্ট্রি। এ ফাইল আমরা ক্লোজ করছি। 

**

ঝাড়া দু'মাস হিমাচলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চষে ফেলতে হয়েছিল অমিয়বাবুকে। শেষে লাহুল-স্পীতির এ অঞ্চলটায় এসে ঠাহর হল; এই সেই জায়গা। সবুজে সবুজই বটে, নীলিমায় নীল। ছলছলে বয়ে চলা নদী। ওই পশ্চিমের দিকে বড় পাথর, দিব্যি দু'জনে মিলে তার ওপর বসে গপ্পগুজব করা যায়।  

সে পাথরের আশেপাশে গিয়ে খানিক খুঁজতেই পাওয়া গেল হাতঘড়িটা। সত্তর কি বাহাত্তরের এইচএমটি। অমিয়বাবুর বড় প্রিয়। ব্যান্ডটা ক্ষয়ে গেছিল, তাই পাথরটা তুলে ছুঁড়ে মারার সময় হাত থেকে খুলে পড়ে গেছিল।

প্রিয় ঘড়িটা খুঁজে পেয়ে অনেক নিশ্চিন্ত বোধ করলেন তিনি। বুকের ঢিপঢিপটাও গায়েব। 

আহ! আর বাতাসে বেশ একটা বেশ মনোরম ভালো লাগা ছড়িয়ে রয়েছে।