Sunday, July 5, 2015

সিরিয়াল মার্ডার

-তাহলে এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশন অর্পণ। তুমি আমায় খুন করবেই।
-আমার কী উপায় আছে বল মহুয়া। অ্যাজ আ হাজব্যান্ড এটা আমি কখনও চাইনি করতে। কিন্তু যেহেতু তুমি ডিভোর্স ফাইল করে বসলে আমার আর কোন উপায় নেই। ই নো টু মাচ।
-তোমার কালো বিজনেসের কিছুই আমি ফাঁস করবো না। এই পাগলামি বন্ধ কর। রিভলভারটা সরিয়ে রাখ।
-সরি মহুয়া। তুমি এতটাই জানো যে তোমায় আর বিশ্বাস করা চলে না। তুমি ডিভোর্সের জন্য আর পুশ না করলেও আমি তোমার আর ট্রাস্ট করতে পারি না। সরি মহুয়া।
-প্লীজ অর্পণ।
-সরি মহুয়া।
*দ্রুম দ্রুম*
---
-অর্পণবাবু, তাহলে আপনি বলছেন মহুয়া দেবী অনেকদিন আগেই মারা গেছেন। আর গতকালের গুলি চালানোর কেস্‌টা...।
-আপনার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকলে আমার কিছু করার নেই ইন্সপেক্টর। ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। মহুয়ার আত্মা রোজ রাতে আমায় হন্ট্‌ করতে আসে। আমি মার্ডার করার রোল প্লে না করা পর্যন্ত সে গায়েব হতে চায় না। পাক্কা দু'টো বুলেট খরচ করার পর সে গায়েব হয়। অফ কোর্স আই ট্রাই নট টু এইম অ্যাট হার। কিন্তু তবু, ইট্‌জ ট্রমাটিক।
--
-আপনি জানেন আপনি কী বলছেন মহুয়াদেবী?
-বারবার এক কথা কেন জিজ্ঞেস করেন ইন্সপেক্টর? জানোয়ারটা বিয়ে করে আমার সর্বনাশ করেছে। এখন মরেও আমায় শান্তিতে থাকতে দিতে চায় না। রোজ রাত্রে অর্পণের ভূত আমায় খুন করার ভয় দেখাতে আসে। এবং চেষ্টাও করে মার্ডার করতে। আই জাস্ট হ্যাভ ট প্লে অ্যালং টু মেক হিম বিলিভ যে আমি ভয় পেয়েছি। রোজ একটা ভুতুড়ে রিভলভার বের করে আমায় দু'বার গুলি করে এবং তারপর সে গায়েব হয়। গুলিগুলো ওর মতই হাওয়াবাজ, আমার গায়েও লাগে না। কিন্তু এই ট্রমা আর কতদিন?
--
- ডক্টর, এই খেলনা রিভলভারটা নিয়ে আপনি ওয়ার্ড ভিজিটে যান কেন?
-তুমি এখানে নতুন ডক্টর দীপক, তাই জান না। এই খেলনা রিভলভারটা নিয়ে যাই মেল ওয়ার্ডের চারশো বাইশ নম্বর পেশেন্ট আর ফিমেল ওয়ার্ডের দু'শো বারো নম্বর পেশেন্টের জন্য। ম্যারেড টু ইচ আদার। দাম্পত্য কলহ এমন জায়গায় পৌঁছোয় যে দুজনকেই অ্যাসাইলামে আসতে হয়। একে অপরের প্রতি ঘৃণা এতটাই প্রবল যে একে অপরের অস্তিত্বকে কেউ স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু অ্যাজ আ পার্ট অফ ট্রিটমেন্ট রোজ সন্ধ্যাবেলা দু'জনকে মুখোমুখি আনি ফর আ রোল প্লে। এই রিভলভারটা সে জন্যেই।
-রোল প্লে? ট্রিটমেন্ট?
-ওয়েল। আজ দেখাব তোমায়। ফ্যাক্ট ইজ, ঘৃণার বাঁধন দাম্পত্যকে ভালোবাসার মতই স্ট্রং করতে পারে। ওদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ওদের কনেক্ট ঘৃণার সূত্রে হলেও একে অপরকে দিনে একবার অন্তত না দেখে ওরা থাকতে পারে না; ওদের পাগলামি আরও বেড়ে যায়। কভার্ট ভালোবাসা; যেটার এক্সপ্রেশন পায় নিয়মিত খুন করা আর খুন হওয়ার নাটকে। আর আমায় ওরা কখনও ভাবে ওঝা আর কখনও ইন্সপেক্টর। এভাবেই চলছে। লেট্‌স গো।


---


শাটার আইল্যান্ড সিনেমার কাঁচা অ্যাপ্রিসিয়েশন। 

জানালা

খড়াক!

এই নিয়ে তৃতীয় বার অনিন্দ্যর মাথার কাছের জানালাটা সশব্দে খুলে গেল। প্রত্যেকবারই শশব্যস্ত হয়ে তাকে মশারি ঠেলে উঠতে হয়েছে। একটানা ঝড় বাইরে; জানালাটা তৎক্ষণাৎ বন্ধ না করলে ঠাণ্ডা লেগে ছেলেটার শরীর আরও বিগড়ে যেতে যেতে পারে। জানালার ছিটকানিতে নিশ্চয়ই কোন গণ্ডগোল হয়েছে।
অনিন্দ্যর চার বছরের ছেলে মিলুকে নিয়ে ক’দিন ধরে যমে মানুষে টানাটানি; রক্তে কিছু সাংঘাতিক ইনফেক্‌শন। রিমা মিলুকে বুকে চেপে বিছানায় ঘুমিয়ে।রিমারও কিছুদিন ধরে যা ধকল যাচ্ছে; ছেলে বুকে অসাড় হয়ে ঘুমোচ্ছে সে। সে জন্যেই প্রত্যেকবার অনিন্দ্যকে হুড়মুড় করে উঠতে হচ্ছে জানালা বন্ধ করতে। তৃতীয়বারের জন্য জানলা বন্ধ করে, বিছানার পাশের টেবিলের ওপর থেকে জলের বোতলের ছিপি খুলে দু’ঢোক মুখে নিলে সে। নাইট ল্যাম্পের আবছা আলোতে রিমার ক্লান্তি মাখা ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল অনিন্দ্যর। কী দুশ্চিন্তাতেই না কাটছে এ ক’দিন। মিলু ভালো হয়ে উঠবে তো? কোন চেষ্টারই ত্রুটি রাখা হচ্ছে না অবশ্য। মোবাইলের স্ক্রিন অন করে সময় দেখলে অনিন্দ্য; ঠিক রাত তিনটে বাজে। 

**
ঝড় কমছে না এই একটা সুবিধে। এই নিয়ে চতুর্থ বার জানালা খুলতে জোর লাগাল মিলু। এত আনন্দ হচ্ছে; কতদিন পর তার গায়ে আর জ্বর নেই। কিন্তু মুস্কিলটা অন্য জায়গায়। সেই যে মিলু দু’ঘণ্টা আগে ঘরের বাইরে চলে এলে; এখন আর চাইলেও ঘরের ভিতরে আসতে পারছে না সে। বারবার হুড়মুড় করে ঠেলে জানালা খুলে দেখতে হচ্ছে বিছানায় মা শুয়ে তার ঠাণ্ডা শরীরটা জাপটে। বাবাটা বিচ্ছিরি; এত কষ্ট করে মিলু জানালাটা খুলছে আর অমনি বাবা প্রত্যেকবার ধড়ফড়িয়ে উঠে জানালাটা বন্ধ করে দিচ্ছে। মিলুর হাঁকডাকও বাবা বা মা ; কেউই শুনতে পারছে না। এর কোন মানে হয়?

প্রশ্ন

-বাবা, ঘুমিয়ে পড়েছ?
-না।
-কেন ঘুমোওনি?
-ভাবছি।
-কী ভাবছ?
-তুই এত প্রশ্ন করিস কেন। তাই ভাবছি।
-তাই ভাবছ কেন?
-কারণ উত্তরগুলো আমাকেই দিতে হয়।
-উত্তরগুলো তোমাকেই দিতে হয় কেন?
-কারণ তোর মা ভোঁসভোঁস করে ঘুমিয়ে চলে, এই মেশিনগানের মত প্রশ্নগুলো তাই আমাকেই হ্যান্ডল করতে হয়।
**
-আমি ভোঁসভোঁস করে ঘুমোই?
-কই না তো।
-তবে তুমি ছেলেকে এই মাত্র বললে কেন?
-তুমি ঘুমিয়ে গেছিলে বলে এক্স্যাজারেট করে বলে ফেলেছি।
-এত এক্স্যাজারেট কর কেন কথায় কথায়?
-না মানে। ছেলেটার এত প্রশ্ন করে পদে পদে।
-প্রশ্ন করা কি খারাপ?
-না খারাপ কেন হবে।
-খারাপ যদি না হয় তাহলে তুমি বিরক্ত হচ্ছ কেন?
-আসলে সব কথাতেই যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে...
-তাহলে কী?
-কিছু না। ঘরটা কেমন গুমোট লাগছে। তুমি ছেলেকে নিয়ে ঘুমোও, আমি ভাবছি ড্রয়িং রুমের সোফায় ঘুমিয়ে নেব আজ। প্লীজ।
**
-খোকা তুই সোফায় শুয়ে কেন?
-এমনি মা। ও কিছু না। তুমি আবার উঠে এলে কেন। শুয়ে পড়।
-বৌমার সাথে ঝগড়া হয়েছে?
-না। ঝগড়া হয়নি। আসলে মা ছেলে মিলে এত সওয়াল করে চলেছে একটানা।
-কিরকম সওয়াল?
-সব ফালতু সব প্রশ্ন।
-ফালতু প্রশ্ন বলছিস কেন?
-প্রশ্ন করতে হয় তাই করছে। তাই ফালতু।
-কোন প্রশ্ন করতে হয় বলে করা খোকা?
-ইয়ে মা। সোফায় কেমন অসোয়াস্তি হচ্ছে। ঘুম আর আসছে না। ভাবছি ছাতে একটু পায়চারী করে আসবো। প্লীজ।
**
-চ্যাটার্জি সাহাব আছেন নাকি ওখানে?
-হ্যাঁ। কে কেয়ারটেকার বুঝি!
-জি সাব। আপনি এত রাত্রে ছাদে কেন সাহাব?
-এমনি। হাওয়া খানে কে লিয়ে আয়া হ্যায়।
-ঘর মে এসি খারাব হ্যায় কেয়া সাহাব?
-না।
-ফির ছত পে হাওয়া কে লিয়ে কিউ আয়া সাব?
-আমি ঝাঁপ দেনে কে লিয়ে আয়া হ্যায়। ভাগো হিয়াসে।
-ঝাঁপ দেনে মতলব সাব?
-আউর এক সওয়াল করেগা তো হাম তুমকো মার ডালেগা।
-কিউ সাব। মেরা কেয়া কসুর?
**
-কী রে খোকা, হঠাৎ ছাদ থেকে ঝাঁপ দিলি কেন?
-প্রশ্নের ভয়ে বাবা।
-প্রশ্নের ভয়ে মানে?
-ছেলের প্রশ্নের ভয়ে পাশ ফিরে শুলাম। বৌয়ের প্রশ্নের ভয়ে বেডরুমে ছেড়ে ড্রয়িং রুমে শুতে এলাম। মায়ের প্রশ্নের ভয়ে ছাতে উঠে এলাম।শেষে কেয়ারটেকারের প্রশ্নমালা সহ্য করতে না পেরে ঝাঁপ দিলামl
-তা ঝাঁপ দিয়ে কী লাভ হল?
-অক্কা পেলাম। মন্দের ভালো এই যে তোমার সাথে এদ্দিন পরে দেখা হল।
-অক্কা পেয়ে কী বুঝলি?
-ভূত হয়েও শান্তি নেই। প্রশ্ন থামে না।
-অতএব?
-অতএব, নেক্সট কোশ্চেন প্লীজ।

Saturday, June 27, 2015

খাবার

-কতটা নৃশংস হলে মানুষ কুকুর খেতে পারে গো?

-যতটা নৃশংস হলে ইলিশ বা পাঁঠা কেটে খাওয়া যায়, ততটা হলেই চলবে।

-পাঁঠা কাটা আর কুকুর কাটা এক জিনিষ গো?

-একই তো। প্রোভাইডেড কাটার অবজেক্টিভ যদি একই হয়; তাদের মাংস খাওয়া।

-কুকুরের মাংস তোমার পাতে দিলে খেতে পারবে বুঝি?

-বায়াস্‌ড প্রশ্ন করছ নীলা। যার কাছে কুকুরের মাংস সুস্বাদু, সেও হয়তো পাঁঠার মাংসে ঘেন্না পেতে পারে। অথচ পাঁঠা ভক্ত আর কুকুরের মাংস বিলাসী দু'জনেই মোজার্ট রসিক হতে পারে। দু'জনেই সমান ভাবে সভ্য এবং সমান ভাবে অসভ্য।

-ছিঃ, তুমি আমার বর হয়ে যে কী করে এমন ব্রুটের মত কথা বলতে পারো মাঝে মাঝে। এটা জেনেও যে আমি কুকুর অন্ত প্রাণ। এরপর কবে বলবে আমায় কেটে ফেললেও সেটা মাগুর মাছ কাটার চেয়ে  বড় কোন অপরাধ হবে না।

-প্রোভাইডেড যদি তোমাকেও ঝোলে ফেলে খাওয়ার তাল করি।

-খেতে পারবে নাকি?

-প্র্যাকটিসে কী না হয়। 

-তুমি মানুষ খাওয়ার প্র্যাকটিস করছ?

-তাহলে বলেই দিই। তোমার এত প্রশ্ন আর সহ্য হচ্ছে না। 

-কী বলে দেবে? 

-আমি প্র্যাকটিস শুরু করেছি। তোমার মা যখন মারা গেলেন, তার কয়েক মাস পরে যখন তোমার বাবা মারা গেলেন; তাদের দাহ করার সময় কোন আত্মীয়স্বজনকে কাছে ঘেঁষতে দিইনি কেন জান?

-কেন?

-কারণ তাদের দাহ করিনি আমি নীলা। আমি অভ্যাস করেছি তাদের মাংসে।

-কী পাগলের মত কথা বলছ। গলা থেকে হাত সরাও।

-রিয়েলি নীলা। অভ্রর সঙ্গে তোমার ব্যাপারটা গোড়াতেই নজরে চলে এসেছিল গো আমার। শুধু স্ত্রী হত্যার মত নোংরা পাপটা করতে চাইছিলাম না! কিন্তু খাওয়ার জন্য হত্যা করাটা পাপ নয়। আমরা ইলিশ মারি, ডিম ফাটাই, মুর্গি কাটি; তাতে পাপ নেই। কারণ তাদের আমরা খাই। আমি মানুষ খেতে শিখেছি। সেই তোমার বাপ-মাকে দিয়ে শুরু। গত ছ'মাস ধরে প্রতি শনিবার আমি অফিসের ট্যুরের নাম করে তারাপীঠ গিয়ে রাত কাটাই গো। তুমি যখন অভ্রর সাথে রাত কাটাও, তখন আমি শ্মশানে সময় কাটাই। নতুন মাংসের স্বাদে নিজের জিভটাকে অভ্যস্ত করে তুলি। রিয়েলি। ইট্‌স নট দ্যাট ব্যাড রিয়েলি।

-গলা ছাড়! তুমি উন্মাদ হয়ে গেছ। আ...আহ...প্লীজ...।

-সরি। সরি গো। এখন বুঝতে পারছ তো আজ ডিনারটা কেন স্কিপ করেছিলাম?

Thursday, June 25, 2015

হার চুরির রহস্যভেদ

- বলুন প্রশান্তদা, হারটা কখন চুরি গেছে।
- হার? চু...? মানে...ইয়ে...মানে বটু, আমি তো এই এলাম। তুমি জানলে কী করে যে আমার বাড়ি থেকে হার চুরি গেছে?
- গতকাল নিমাই ময়রার দোকানে ল্যাংচা নেওয়ার সময় আপনার মোবাইলে ফোন আসে। ফোনে আপনি বলেন হার আপনার বাড়িতে ডেলিভারি না দিতে, আপনি নাকি সেটা নিজে কিছুক্ষণ পরেই দোকান থেকে নিয়ে আসবেন।  আমি শুনতে পারি কারণ আমি তখন সেখানে ছিলাম খান ছয়েক গরম রসগোল্লা ট্যাক্‌ল করার জন্য। নয়  বছর আগে ঠিক সাতাশে জুলাই আপনার আর মিঠু বৌঠানের বিয়ের নেমন্তন্ন খেয়েছিলাম। অর্থাৎ আপনার বিবাহ বার্ষিকী পঁচিশে মানে আজকে। তার মানে হারটার ডেলিভারি বাড়িতে না নেওয়ার কারণ সেটা মিঠু বৌদির জন্য সারপ্রাইজ গিফ্‌ট। হ্যাপি অ্যানিভার্সারি বাই দি ওয়ে।
- থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু ভাই বটু, চুরিটা কি করে জানলে?
- কোয়ার্টার এন্ডের মুখে দাঁড়িয়ে। আপনার অফিসের যা চাপ, বিবাহবার্ষিকী বলে ছুটি বাগাতে পারবেন না। এদিকে বেলা সাড়ে নটায় আপনি অফিসমুখো না হয়ে অফিসের পোশাকে বটু গোয়েন্দার বাড়ি। আপনি গুছিয়ে পা ফেলা মানুষ, শান্ত ধীর স্থির। অথচ আপনার জামার পকেটে ছোলার ডালের স্পট্‌। অর্থাৎ ভীষণ উত্তেজনার মধ্যে আপনি জলখাবার শেষ করেছেন। এবং ভীষণ উত্তেজনার মধ্যে অফিস যাওয়ার নাম করে হুড়মুড় করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সোজা এই শর্মার দরবারে এসেছেন। এর মানে কী?
- এর মানে কী বটু?
- এর মানে হল প্রশান্তদা, কিছু একটা এমার্জেন্সি আপনাকে বদার করছে। অথচ সেটা আপনি বৌদির সাথে শেয়ার করতে পারছেন না। তাই মুখ বুজে কচুরি ছোলার  ডাল সাঁটিয়ে অফিস যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরোতে হল। আপনি এমনিতে বেশ মিনমিনে বৌ বলতে অজ্ঞান হাজ্‌ব্যান্ড প্রশান্তদা। প্লীজ ডোন্ট মাইন্ড, কিন্তু গোটা পাড়া সেটা জানে। কাজেই কী এমন এমার্জেন্সি হতে পারে যেটা আপনি বউয়ের সাথে শেয়ার করতে পারলেন না? পুলিশের কাছে যাওয়ারও ধৈর্য নেই, সিধে এলেন আমার কাছে। দুইয়ে দুইয়ে চার করতে হল। কাল আপনি হারের ডেলিভারি নিয়ে বাড়িতে কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন আজ মিঠু বৌদিকে সারপ্রাইজ করবেন বলে। কিন্তু সকালে উঠে দেখেন সেই বিশেষ জায়গাটা থেকে হারটা হাওয়া।  আর আপনার কলজেতে আটশো আশি ভোল্টের শক্‌।
- আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে বটু। বিশ ভরীর হার। এ বাজারে। হেল্প মি বটু। 
- ঘাবড়ে যাবেন না। আমি আছি। ইয়ে একটা কথা প্রশান্তদা। আপনার মেজপিসির বাড়ি চন্দননগরে না? সেখানকার জলভরা অমৃত-সমান। 
- তা নিয়ে ভাবছ কেন বটু। সে তো তুমি এমনি চাইলেই আমি তোমায় এক বাক্স আনিয়ে দিতাম।
- ফেকা হুয়া জলভরা ম্যায় আজ ভি নহি উঠাতা হু প্রশান্তদা।
- কী?
- ইয়ে। নাথিং। মানে। যদি হার পাওয়া যায়। তবে এই। হাজার তিনেক টাকা। আর ছ'মাস ধরে প্রতি মাসে একশো পিস্‌ জলভরার সাপ্লাই।  
- ডান! প্লীজ বটু। হেল্প। 
- ওকে। তাহলে বলুন দেখি। আপনাদের তো আবার বিবাহবার্ষিকীর রাত্রে বাইরে খাওয়ার অভ্যাস। তাই না? পাড়ার কোন কিছু আমার চোখ এড়ায় না।
- বটেই তো। আজও রাত্রে রিজার্ভেশন করা আছে। মিঠু ওটাই প্রেফার করে।
- গুড্‌। বৌদি আজ আপনাকে নিশ্চয়ই অফিস কামাই করতে রিকুয়েস্ট করেননি ?
- প্রতিবারই এমন বায়না করে। তবে আজ করেনি। কিন্তু তুমি কী করে আন্দাজ করলে?
- বটু গোয়েন্দা আন্দাজে খেলে না প্রশান্তদা। বটু জানে তাই বলে। আমি জানি কারণ আপনাদের চাকর মাধবদা আড়াই কিলো মাট্‌ন কিনে এনেছে আজ সকালেই।আপনি জানতেন সেটা? 
- কই, না তো। কিন্তু তাতে কী? 
- আমার পাড়ায় কোন বাড়িতে হপ্তার মাঝে মাটন ঢুকবে আর আমি টের পাব না, এ বরদাস্ত করা যায় না। 
- আরে তার সঙ্গে আমায় অফিস কামাই করানোর জন্য আমার বউয়ের বায়না না করার কী সম্পর্ক? এর সাথে হার চুরির লিঙ্ক কোথায় ভাই বটু?
-বিবাহবার্ষিকীর দিন বউ কখন বরকে অফিস যেতে বারণ করে না প্রশান্তদা?
- কখন? 
- যখন বৌ সিওর থাকে যে বর অফিস যাবে না।
- মানে?
- মানে মিঠু বৌদি জানেন যে আপনি অফিস যাবেন না। আর মাটনের গোপন আয়োজনও সে কারণেই। রোম্যান্টিক অ্যানিভার্সারি লাঞ্চ।
- আমি অফিস যাব না। সেটা মিঠু জানে? হাউ?
- প্রশান্তদা।  হার সরিয়েছেন মিঠু বৌদি নিজে। রিভার্স সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছেন আপনাকে। আর উনি জানেন হার হারিয়েছে জানলে আপনি আর অফিস যেতে পারবেন না। বর কে বিশেষ দিনে কাছে পেতে বউরা সব করতে পারে প্রশান্তদা। বিয়েটা সে জন্যেই অ্যাভয়েড করলাম। আর তাছাড়া, বাড়িতে কোন জিনিষ বউয়ের চোখের আড়ালে আপনি লুকিয়ে রাখতে পারবেন, সেটা ভাবলেন কী করে বটুদা? 
- মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে বটু। আমি তো শিওর ছিলাম...।
- শুনুন। বউ আর বটু গোয়েন্দাকে ফাঁকি দেওয়ার হাস্যকর চেষ্টা করার কোনও মানেই হয় না। যা হোক আপনার শিক্ষা হল। আমি এবার বৌদিকে ফোন করে বলি আপনি আমার কাছে কোন এক হার চুরির কেস নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু এসেই ভীষণ বুক ব্যথায় কাহিল হয়ে পড়েছেন। হসপিটালাইজ্‌ করতে হবে মনে হচ্ছে। হারটা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে। কেমন? আর আজ বরং অফিসটা বাদই থাক। কোয়ার্টার এন্ড বছরে চারবার আসবে। তবে এমন রোম্যান্টিক মেঘলা দিনের দুপুরে মাটন লাঞ্চ বড় রেয়ার। আর ইয়ে। আমার টাকা আর জলভরাটা। মানে। বুঝতেই পারছেন। হে! হে!

**
- হ্যালো! বটু। কী বলে যে তোমায় ইয়ে জানাবো...।
- কেন প্রশান্তদা? ওই যে বললাম। তিন হাজার আর জলভরা। 
- সে তো বটেই। তোমার মিঠু বৌদি তোমার বোনাস হিসেবে এক বাটি মাংস কষা পাঠাচ্ছে মাধবের হাতে। কেমন রেঁধেছে জানিও কিন্তু।
- মিঠু বৌদি আমাদের জগদম্বা। হাতসাফাই টু কষা, সবেতেই সিদ্ধহস্ত। আমার থ্যাঙ্ক ইউটা জানিয়ে দেবেন প্লীজ।   

দেবু মল্লিক স্ট্রীটের হত্যা রহস্য

বিনয় সিগারেট ধরালেন। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের বোটকা গন্ধটা একটু নরম হল মনে হল। পরনের স্যান্ডো গেঞ্জিটা ঘামে ভিজে আছে। ফ্যানটা ফুল-স্পীডে চলেও কোন কাজ হচ্ছে না। ধুর ছাই; ঘরে কী বদ গন্ধ। চার ঘণ্টার মধ্যেই লাশে পচতে শুরু করলো নাকি? অবশ্য যা গরম, জ্যান্ত মানুষের চামড়াই গলে যেতে বসেছে। পিন্টুটা যে কখন আসবে। ভোরের আগে সমস্ত কাজ মিটিয়ে ফেলতে হবে।

**

- শালা পিন্টু, আধ ঘণ্টার মধ্যে আসার কথা তোর...সাড়ে চার ঘণ্টা পর বাবুর আসার সময় হল।
- দা'বাবু সরি। ম্যাটাডোর পেতে এত হ্যাপা। বচা ব্যাটাচ্ছেলে শেষ মুহূর্তে ডোবাল। অনেক কষ্টে সেই শিয়ালদা পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে এক মাতাল ড্রাইভারকে বগল দাবা করে আনতে হল গো। তাইতে দেরী। যাক গে। বৌদির লাশটা কোথায়?
-পিছনের বারান্দায় বস্তায় পুরে রাখা আছে। সাবধানে নিয়ে আয়। বস্তার মুখটা ভালো করে বেঁধে আনিস।


**

- বটুবাবু, ফের কামাল করলেন মশাই। ক্যালক্যাটা পুলিশ যদি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড হয়, তাহলে আপনি তো হোম্‌স মশাই।
- হে হে হে, কী যে বলেন ইন্সপেক্টর দাস। সিগারেট আছে? বিড়ি ধরাতে মন চাইছে না।
- আছে বইকি। এই যে। দাঁড়ান ধরিয়ে দিই। ইয়ে, বটুবাবু, বাইশ নম্বর দেবু মল্লিক স্ট্রীটে খুন হয়েছে আপনি খবর পেলেন কী করে? আফটার অল আপনার বাড়ি তো সেখান থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে। 
-চোখ কান নোলা খোলা রাখতে হয় মশাই।
-নোলা খোলা রাখা?
-বিনয়বাবুর বৌকে আজ সকালে দেখি মাছের বাজারে। ভদ্রমহিলা দেড় কিলো ওজনের ইলিশ নিলেন। বারোশো টাকা কিলো মশাই। শুনলাম বাড়ি গিয়ে ভাপাবেন। কোন বাড়ির ইলিশ রান্নার কোয়ালিটি কেমন সে বিষয়ে রিসার্চ করা আমার একটা পার্সোনাল নেশা। যে বাড়িতে ইলিশ রান্না হয়েছে তার আশেপাশে ঘুরঘুর করলেই ইলিশ ঝোলের গন্ধ আমার নাকে হুড়হুড় করে ঢুকে পড়ে আর আমি অ্যাসেস্‌ করে নিতে পারি সে বাড়ির হেঁসেলের ইলিশ ম্যানেজ করার দম কতটুকু। বিনয়বাবুরা ও পাড়ায় নতুন, অতএব তাদের বাড়িতে ইলিশ রান্না কোয়ালিটি কেমন সে বিষয়ে আমার একটা আগ্রহ হবেই। ব্যাস। রাত আটটা নাগাদ চলে গেলাম বিনয়বাবুর বাড়ির পাশে। অনেকক্ষণ ঘুরঘুর করেও যখন রান্না ইলিশের গন্ধ পেলাম না ঘোর সন্দেহ হল। বাঙালি বাড়িতে ইলিশ এনে রান্না না করে ফ্রিজে রেখে দেবে? বাঙ্গালির ক্যারেক্টারের সঙ্গে সেই উইল পাওয়ার খাপ খায় না মশাই। এক্সট্রিম কিছু একটা বাড়ির ভিতর ঘটেছে আঁচ করে নিলাম। ব্যাস্‌! সামান্য ইনভেস্টিগেট করতেই পুরো কেস মালুম হয়ে গেল। ম্যাটাডোরের ড্রাইভার সেজে খুনি আর তার স্যাঙ্গাৎকে সোজা পুলিশ স্টেশনে নিয়ে আসাটা তো আমার বাঁ হাতের খেল। হে: হে:। 
-ইলিশ ফলো করতে গিয়ে আপনি খুনি ধরলেন বটুবাবু? 
-শুধু খুন নয় ইন্সপেক্টর দাস। একটা চুরির ঘটনাও সামিল হয়েছে। 
- চুরি? কী চুরি ? কে করলে?
- সরি ইন্সপেক্টর সাহেব। খুনি ধরে দিয়েছি, কিন্তু তাই বলে চোর কে ধরে দিতে বলবেন না।
- বেশ তো। কিন্তু অন্তত বলুন তো কী চুরি হয়েছে?
- ইলিশ। বিনয়বাবুর ফ্রিজ থেকে। ইলিশ রান্না কেন হয়নি সে ব্যাপারে ইনভেস্টিগেট করতে রান্নাঘরের পিছনের জানালা ব্রীচ্‌ করে সে বাড়িতে আমি ঢুকি। লাশ আবিষ্কার করে খুনি ধরার প্ল্যান কষে ফেলি। ভেরি ইজি আর কী। আর ইয়ে, বেরোবার আগে ফ্রিজ থেকে বিনয়বাবুর বৌয়ের কেনা দেড় কিলো ইলিশটা সরিয়ে নিই। কী করব বলুন। জেনুইন পদ্মার প্রোডাক্টের যা প্রাইস আজকাল মশাই, বাজারে ছুঁতে ভয় লাগে। আর আমার কপালে শাঁসালো মক্কেল আর ক'টা জোটে। অগত্যা। কিছু মাইন্ড করেননি তো? 
- হে হে। না না। ওয়েল ডান বটু গোয়েন্দা। ব্রাভো।


**

বাজে লম্বা জোক্‌স শুধু হোয়াট্‌সঅ্যাপেই পড়তে হবে, তার কী মানে।

Tuesday, June 16, 2015

ফিবোনাচিকেতা

-   তুমি অঙ্কে কেমন ছিলে গো? কেমন একটা হুট্‌ করে প্রেম করে ফেললাম ভালো করে খোঁজ খবর না নিয়ে। আমার ভারী ইচ্ছে ছিল কিন্তু, যে আমার বর অঙ্কে চাবুক হবে।
-   অঙ্কে অতি ধুরন্ধর আমি।
-   মাধ্যমিকে কত?
-   সাতচল্লিশ।
-   ধুস্‌। এই ভালো তুমি অঙ্কে?
-   মার্ক্‌স দিয়ে অঙ্কের জ্ঞান মাপিস তুই?
-   ঠিক তা নয়। তবে তাই বলে মাধ্যমিকে সাতচল্লিশ?
-   সিট পড়েছিল গ্রামের দিকের একটা হাইস্কুলে। তিন তলায়, জানলার পাশে। জানালার ওপারে গঙ্গা। একটা পেল্লায় নিম গাছ। লাল শান বাঁধানো ঘাট।স্ট্যাটিসটিকালি আমার প্রফিট ছিল জানালার ওপারে কন্সেন্ট্রেট করায়।
-   প্রফিট?
-   হৃদয়ের পুষ্টি। অমন তিরিতিরে কালচে গভীর নদী। অমন দুপুরের মিহি হাওয়া। সেদিকে নজর না দিয়ে এক মনে ফুলস্কেপ পাতায় জ্যামিতি করে যাব? সেটা একটা স্ট্যাটিসটিকাল ব্লান্ডার হত না?
-   যতসব গাঁজাখুরি। প্রফিট না ছাই। অঙ্কে তুমি কাঁচা ছিলে সে আমি বেশ বুঝেছি। অঙ্কে ভালো হলে হায়ার-সেকেন্ডারিতে সায়েন্স নিয়ে পড়তে। তারপর জয়েন্ট আইআইটি। এদ্দিনে বড় কোন সফ্‌টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে। বিয়ের পর আমি থাকতাম মেলবোর্নে। ফেসবুকে ঝকঝকে সব ফটো আপলোড করতাম।
-   এই তো মুস্কিল বাঙালিদের নিয়ে। এগ্‌জ্যামে নম্বর আর থ্যাবড়া চাকরির বাইরে ভাবতেই পারে না। পরীক্ষার খাতায় ফর্মুলা উগড়ে অঙ্ক করে গান্ডেপিন্ডে নম্বর বাগানো; তারপর ধ্যাপস চাকরি। তাহলেই কেউ অঙ্কে ভালো হয়ে যায় নাকি? এদিকে আমি ক্যামন ক্যালকুলেট করে অঙ্কের হিসেবে জীবনটাকে সাজিয়ে নিচ্ছি বল দেখি?
-   বটে? তুমি জীবনকে অঙ্কের হিসেবে সাজিয়ে নিচ্ছ?
-   আলবাত। উইথ ম্যাথেম্যাটিকাল প্রিসিশন্‌।
-   বোঝাও।
-   তুই বুঝবি না।
-   তুমি বুঝে যদি গালভরা গপ্প ঝাড়তে পারো তাহলে আমিও পারবো। তুমিও লিটারেচার, আমিও।
-   ভুলে যাস না তুই স্টুডেন্ট আমি টিচার।
-   প্রাইভেট টিউটর। আর প্রেমিক। প্রেমিক নিজের জীবন কী ভাবে গুছিয়ে নিচ্ছে সেটা প্রেমিকা জানবে না তা কী করে হয়? এবার শুনি কী ভাবে তুমি অঙ্কের সাহায্য নিয়ে লাইফ ম্যানেজ করছ।
-   ফিবোনাচি সিকুয়েন্স শুনেছিস?
-   সেটা কী?
-   নম্বরের সিকুয়েন্স। যেখানে প্রতিটি তৃতীয় সংখ্যা সিকুয়েন্সের আগের দু’টো সংখ্যার যোগফল। যেমন শূন্য আর এক জুড়ে এক। এক আর এক জুড়ে দুই। এক আর দুই জুড়ে তিন। এমনি ভাবে সিকুয়েন্স চলে শূন্য, এক, এক, দুই, তিন, পাঁচ...
-   আট, তেরো...উম্‌...একুশ...তারপর...চৌত্রিশ...এমনি করে?
-   বাহঃ। গুড গার্ল। এবার এই সিকুয়েন্সের সংখ্যাগুলোর মাপে যদি বর্গক্ষেত্র এঁকে চলি একের পর এক, প্রত্যেকটা বর্গক্ষেত্র খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ হয়ে এঁটে যাবে। আর সেই স্কোয়ারগুলোর পেটে বরাবর সুন্দর একটা স্পাইরাল বয়ে যাবে। কী বুঝলি?
-   কাঁচকলা। 
-   খাতাকলম দে।
-   ভিক্টোরিয়ার বাগানে বসে খাতা কলম?
-   তুই আমার অঙ্ক প্রেম কে ইন্‌সাল্ট করেছিস। অপমানিত হলে আমি প্রেম-ট্রেম পাত্তা দিই না। খাতা দে।
-   নাও।
-   এই দ্যাখ। এবার বুঝলি ? ফিবোনাচির স্পাইরাল?

-   কিন্তু এর সাথে তোমার জীবন সাজানোর কী সম্পর্ক?
-   বুড়ি, মাথা ঠাণ্ডা করে শুনে যা। ফিবোনাচি স্পাইরালে যা কিছু বয়ে চলে, তা আপনা থেকেই সুন্দর হয়ে যায়।
-   মানে?
-   বলছি। ফিবো্নাচি সিকুয়েন্সের যে কোন পর পর দু’টো সংখ্যার অনুপাত এক দশমিক এক ছয় আটের দিকে ধেয়ে চলে। সংখ্যা গুলো যত বাড়ে, অনুপাত তত ওয়ান পয়েন্ট সিক্স ওয়ান এইটের দিকে এগিয়ে আসে। কারণ পারফেকশন সেখানেই। সে ভাবেই উদ্ভিদের সৌন্দর্য লিপ্সা এগিয়ে চলে। সেভাবেই সুর্যমুখীর বুকের বীজেরা নিজেদের সাজিয়ে নেয়। সেই জন্যেই এই এক দশমিক ছয় এক আটয়ের অনুপাত কে গোল্ডেন রেশিও বলা হয়।
-   মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে গো মাধ্যমিকে সাতচল্লিশ পাওয়া রামানুজমের খপ্পরে পড়ে।
-   ইউ পেটি বেঙ্গলি। সেই মাধ্যমিক জড়িয়ে থেকে গেলি। শোন। জীবন সাজিয়ে নেওয়ার জন্য গোল্ডেন রেশিওর চেয়ে বড় প্যারামিটার আর হতে পারে না।
-   বেশ। তো তুমি এই গোল্ডেন প্যারামিটারে নিজের জীবন অঙ্কের নিখুঁত প্যাটার্নে সাজিয়ে নিচ্ছ, তাই তো?
-   এগজ্যাক্ট্‌লি।
-   কিন্তু কী করে?
-   আমার জন্মদিন কবে?
-   তেইশে নভেম্বর।
-   স্যুইট, এই যে তোর সিলি ব্যাপারগুলো মনে রাখার দিকে ঝোঁক। এবার তারিখটা ভালো করে ভাব। নভেম্বর তেইশ। নভেম্বর এগারো নম্বর মাস। তেইশ তারিখ।
-   নভেম্বর এগারো, তারিখ তেইশএক, এক, দুই, তিন। ফিবোনাচি!
-   এই জন্যেই তোকে এত ভালোবাসি রে বুড়ি। থেকে থেকে তোর মাথাটা চাবুকের মত খেলে যায়। ইন ফ্যাক্ট নভেম্বর তেইশকে ফিবো্নাচি ডে সেই জন্যেই বলা হয়। সেই যে সিকুয়েন্সে শুরু করেছি, সেটাকেই খেলিয়ে যাচ্ছি। লক্ষ গোল্ডেন রেশিওতে থাকা। তাই নিজের অঙ্কের ঝালটা দুনিয়াকে টের পেতে দিলাম না।
-   তুমি পার বটে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কথা বলতে।
-   আদৌ না। সবটাই অ্যানালিসিসের কঠিন জমিতে দাঁড়িয়ে বলা। তোরা পাড়ায় এলি যখন আমি ক্লাস নাইনে।
-   আমি সবে সেভেন।
-   করেক্ট। তখন থেকেই আমার তোকে ভালো লাগতো বুড়ি। প্রেম-ট্রেম রিয়ালাইজ করিনি। তবে ভালো লাগতো। পরে অবশ্য বুঝেছি ভালো লাগার চোরা কারণটা।
-   কী কারণ গো?
-   ওই যে। ফাইবোনচি। গোল্ডেন রেশিও।
-   সে কী! কী ভাবে?
-   তোর জন্মদিন কবে?
-   এগারোই ফেব্রুয়ারি। দাঁড়াও দাঁড়াও। এগারো। মানে এক এক, ফেব্রুয়ারী মানে দুই। এক এক দুই। ফিবোনাচি! হে হে! এসব ঢপ তুমি এইমাত্র ভেবে ভেবে দিচ্ছ বল? নিজেকে অঙ্কে বীরপুরুষ বলে প্রমাণ করতে?
-   কর তুই অবিশ্বাস। আচ্ছা, তোদের বাড়ির অ্যাড্রেসটা?
-   পঞ্চান্ন নম্বর নিধুরাম মল্লিক লেন।
-   হুম। বাড়ির সংখ্যা উননব্বইয়ের এ। পঞ্চান্ন আর উননব্বুই। গোল্ডেন রেশিওতে আছে। ফাইবোনচি শুন্য, এক থেকে শুরু হলে যথাক্রমে সিকুয়েন্সের দশ আর এগারো নম্বর সংখ্যা হবে পঞ্চান্ন আর উননব্বুই। এরপরও বলছিস তুই আমি গোল্ডেন স্পাইরালে নেই?
-   বাপ রে বাপ। তোমার মাথায় অঙ্ক আছে কী না জানি না, ছিঁট তো আছেই।
-   শোন বুড়ি। সেই থেকে তোকে ভালো লাগত। আর এদিকে তোর পুলিশ বাপের ভয়ে কাছে ঘেঁষার সাহস হত না। তখন থেকেই ভেবেছিলাম, তোর কাছে আসার এক মাত্র রাস্তা হচ্ছে তোকে টিউশানি পড়ানো।
-   কী ধান্দাবাজ ছেলে গো তুমি।
-   ধান্দাটাও অঙ্ক মেপে করি। আমি যদি অঙ্কে গাদাগাদা নম্বর নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে কোডিং করতাম, তাহলে কী আর তোকে লিটারেচার পড়াতে আসতে পারতাম? এমন ভিক্টোরিয়ার বসে প্রেম করতে পারতাম?
-   পয়েন্ট। বুঝলাম। যে তুমি আমার প্রেমে নিজের দাপুটে ইঞ্জিনিয়ারিং কেরিয়ার জলে ভাসিয়েছ।
-   প্রিসাইস্‌লি বুড়ি। ইট্‌স ট্রু।
-   আরো আছে?
-   কী?
-   এই ফিবোনাচি স্পাইরাল। আমাদের মধ্যে?
-   প্রপোজ তো ফিবনচি মেনে এমন দিনে করেছি যে তোর না বলার উপায়ই ছিল না। গোল্ডেন রেশিওর গুণেই তুই চট করে আমার মত একটা এলেবেলের প্রেমে পড়ে গেলি।
-   ফিবো্নাচি মেনে প্রপোজ করেছিলে?
-   আলবাত। ডেট্‌টা মনে কর।
-   তুমি আমায় প্রপোজ করেছিলে মিনিবাসে। কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে। পাঁচই অগস্ট।
-   বছরটা মনে কর।
-   দু’হাজার তেরোতে।
-   রাইট। পাঁচই অগস্ট তেরো শালের। পাঁচ আট তেরো।
-   ফিবোনাচি!!! এবার তোমার গাঁজাখুরিতেও হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে।
-   সে তুই যাই ভাব। ফিবো্নাচি স্পাইরালে ভালোবাসছি রে। স্বর্গ তৈরি করছি। শুধু একটা জায়গায় স্পাইরালটা এসে আটকে আছে।
-   কোথায়?
-   চুমুতে।
-   চুমুতে ফিবোনাচি?
-   দেখ বুড়ি। আজ পর্যন্ত আমি দু’শো বত্রিশটা চুমু ইনিশিয়েট করেছি। তুই একশো চুয়াল্লিশটা। টোটাল তিনশো ছিয়াত্তর। অর্থাৎ ট্যালি হচ্ছে টু থার্টি টু, হান্ড্রেড ফর্টিফোর, থ্রি হান্ড্রেড সেভেন্‌টি সিক্স।
-   উঃ ম্যাগো। এসব হিসেব রাখো নাকি তুমি?
-   সাধে কী আর তোকে আমার পকেট নোটবুক দেখতে দিই না?
-   ছিঃ, এসব কেউ হিসেব রাখে? যাক্‌। আর তাছাড়া এই নম্বরে তো ফাইবোনচি নেই। তাহলে বলছো কেন।
-   সেদিন মনে আছে তোকে বলেছিলাম পৃথিবীর সেরা চুমুটা তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে? তুই চাস না, সেই সেরা চুমুটা?
-   এই, ওসব কথা থাক। লজ্জার ব্যাপার। কী বলতে যে কী বলে দিই আমি। তাছাড়া সেরা চুমুটা এতদিন দাওনি কেন যদি দেওয়ার ক্ষমতাই ছিলই তো?
-   দিইনি। ফিবো্নাচি মুহূর্তের অপেক্ষা করছিলাম।
-   মানে?
-   মানে আমি আর একটা চুমু ইনিশিয়েট করলে চুমু ট্যালি দাঁড়াবে; তুই একশো চুয়াল্লিশ, আমি দু’শো তেত্রিশ, টোট্যাল তিনশো সাতাত্তর। পারফেক্ট ফিবোনাচি সিকুয়েন্সে। গোল্ডেন রেশিওতে মাখামাখি বুড়ি। এখন না বলিস না।
-   তাই বলে ভিক্টোরিয়ার বাগানে? ছিঃ! একদম না। পরে কোনদিন বাড়িতে...।
-   বুড়ি। লগ্ন বয়ে যাবে যে।
-   ফিবো্নাচি চুমুর লগ্ন?
-   এখন চারটে সতেরো। এক মিনিটের মাথায় চারটে আঠেরো বাজবে রে। সিক্সটিন হান্ড্রেড এইটিন হাওয়ার্স। এক ছয় এক আটের মুহূর্ত। গোল্ডেন রেশিয়োও অর্থাৎ এক দশমিক ছয় এক আটের মুহূর্ত। গোল্ডেন রেশিওকে পায়ে ঠেলিস না বুড়ি।
-   বিকেল চারটে আঠেরো তো কালকেও বাজবে গো।
-   কিন্তু বুড়ি। আজ যদি তুই সোনার মুহূর্ত পায়ে ঠেলিস, কাল যদি সোনা বিট্রে করে? সিকুয়েন্স বিগড়ে যায়?
-   হায় ভগবান, সামান্য একটা চুমুর জন্য তুমি এত হিসেব কষে গুল দিয়ে গেলে?
-   চুমু সামান্য নয়। ভিক্টোরিয়ার বাগানে চুমু রেখে যাওয়াটা একটা পবিত্র ট্র্যাডিশন। আর প্রেম, অঙ্ক আর কবিতা সামান্য গুলে গুলজারের দাবী রাখে বইকি। চারটে আঠেরো বুড়ি।
-   পাগল কোথাকার!  

Wednesday, June 10, 2015

মেঝে

নিশীথবাবু মেঝের দিকে তাকিয়েছিলেন। মোজায়েক মেঝে। পুরনো। জায়গায় জায়গায় যেন চলকা উঠে গিয়েছে। অমসৃণ বড়। বড় ধুলো পড়ে। এত মানুষ হাঁটাহাঁটি করেছে কিনা। সবাই আজ ঘরে চটি জুতো পরে ঢুকে পড়েছে। ধুলোর সাথে বোধ হয় অল্প কাদা। মেঝেটা বেশ নোংরা দেখাচ্ছে। 

নিশীথবাবু মেঝের দিকে তাকিয়েছিলেন। চোখের দৃষ্টিকে আশেপাশে খেলাতে মন চাইছিল না তার। মা তো নেই; যে এদিক ওদিক চাইলে মাকে দেখতে পাবেন। বড় লোক চারিদিকে। মা তো নেই। মায়ের গাওয়া হারমোনিয়ামে পল্লীগীতি তো আর নেই; সে তো কবেই চলে গিয়েছে। চারপাশের কলরবে কান পাততে মন চাইছিল না নিশীথবাবুর।

দৃষ্টির গোচরে মেঝের আবছায়া সাদা কালো মোজায়েক ছাড়াও এসে পড়ছিল নিশীথবাবুর জামার পকেট। জামাটা খয়েরী, এক রঙের, দু’বছর পুরনো। তার পাকা চুল আর শিথিল চামড়ার সাথে বেশ মানানসই; জামাটা। জামার পকেট থেকে উঁকি মারছে ডট পেন। নীল ঢাকনা, দশ টাকার রেনল্ড্‌স পেনের ঢাকনা। আর রয়েছে ভাঁজ করা সার্টিফিকেট; এই কিছুক্ষণ আগে পাওয়া। নিশীথবাবু আসলে মেঝের দিকে তাকিয়েছিলেন।

বলা ভালো, মেঝের এক কোণের দিকে তাকিয়েছিলেন। যে কোণে কোন ফুলের পাপড়ি এসে পড়েনি। সাদা ফুলের পাপড়ি এসে পড়েনি। চোখ সরাতে ভয় পাচ্ছিলেন নিশীথবাবু। পাছে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে মিশে যায় তুলির বডির সাথে। তুলি চলে যাচ্ছে। তুলি ওই মেঝেরই অন্য কোনে শুয়ে। ডেডবডি পড়ে থাকে, শুয়ে থাকে না। তুলি শুয়ে আছে। নিশীথবাবুর ভিতরের বাবাটা মরে গেল, অকালে। সাতাশ বছরের বাবা হয়ে থাকাটা মরে গেল। প্রভিডেন্ড ফান্ড, কোম্পানি লোণ, হাহাকার, যন্ত্রণা, ভালোবাসায় সন্তান মৃত্যু টলে না। নিশীথবাবুর আজ তুলির চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল মায়ের জন্য। মা গো। মায়ে ডুব দিয়ে মরে যেতে পারলে কী ভালো হত। নিশীথবাবু শুকনো চোখে মেঝের দিকে তাকিয়েছিলেন। 

**
বাবা তাকাচ্ছিল না একবারের জন্যেও। এখুনি নিয়ে যাবে আমায়। এখুনি। বার বার তো মরা যায় না। না মরলে বুঝতে পারতাম না হৃৎপিণ্ড থেমে যাওয়ার পরেও মগজটা এমন সজাগ থাকে। কোন বইতে এমনটা লেখা ছিল না। থাকবে কী করে? কেউ কী মরে ফিরে এসেছে? জাতিস্মর হয়ে ফিরলে হবে না। এই আমি তুলি। আমি যদি মরে আবার তুলি হয়েই বেঁচে ফিরতাম তবে সবাইকে বলে দিতাম; মরে যাওয়ার পরেও মগজটা দিব্যি চলে। অন্তত গত আধ ঘণ্টা চলেছে। একটু আবছা হচ্ছে দৃষ্টি, কানের আওয়াজগুলোও। একটু পরে হয়তো সমস্ত মিলিয়ে যাবে। তবু। এটুকু সময়। আমি মরেও বেঁচে। কে যে চোখটা বুজিয়ে দিল অর্ধেক। তাই দেখতে অসুবিধে হচ্ছে। আমি কি না মরে গেছি, তাই চোখের পাতাটুকুও নাড়াতে পারছি না। তবে অর্ধেক চোখ খোলা এই বাঁচোয়া। বাবাটা যে কী! তখন থেকে শুধু মেঝের দিকে তাকিয়ে, একটি বারও আমার দিকে দেখছে না। 

আমার দিকে দেখ না বাবা প্লীজ! আমায় নিয়ে যাবে বাবা। দেখ না বাবা। ওদিকের মেঝেতে কিস্যু নেই। এদিকে আমি শুয়ে। আমি তোমার দেখতে পাব না আর বাবা। এদিকে দেখ না প্লীজ। প্লীজ। ভাগ্যিস আমার ঘাড়টা তোমার দিকেই, তাই তোমায় প্রাণ ভরে দেখে নিচ্ছি। এদিকে মা নেই, তাই দেখতে পাচ্ছি না। বাবা গো। বাবা গো। দেখ না বাবা। আমার দিকে। আমি ভূত না। কাদম্বিনী না। আমি মরেছি কিন্তু মরিনি। একটু পরে হয়তো পুরোটা মরে যাব। তার আগে আমার চোখে একটি বার চোখ রাখো। রাখো প্লীজ। 
যা:, কে যেন চোখে তুলসী দিলে। আর তোমায় দেখতে পারিনা বাবা। বাবা। বাবা। আবছা হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। কষ্ট হচ্ছে, শরীরে নয়, মনে। মনের শেষ কষ্ট।

বাবা গো। মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকো না।