Thursday, January 22, 2015

চোখের ধুলো

- ওই আওয়াজটা কীসের রে বাবু?
- কোন আওয়াজ?কোনও আওয়াজ নেই তো। তুমি ঘুমোও এবার। রাত অনেক হয়েছে।
- মন দিয়ে শোন, ওই যে। খটখট করে হচ্ছে। 
- বলছি তো। কিচ্ছু না। ঘুমোও এবার। জ্বালিও না।
- একটু উঠে দেখ না বাবা। বারান্দায় বেড়াল ঢুকলো নাকি! পাখিগুলো রয়েছে যে। নেহাত আমি অন্ধ, নয়তো আমিই...
- বেড়ালের আওয়াজ নয়। আমি কিছু কাজ করছি। ঘুমোও। এত রাত্রে ঘ্যানঘ্যান শুনতে ভালো লাগছে না।
- তুই তো শুয়ে পড়েছিলি মশারি টাঙিয়ে, আবার কী এমন কাজ মনে পড়লো।
- আরে আমার সব কাজের কৈফিয়ত সর্বক্ষণ তোমায় দিতে হবে নাকি। কী গেরো। 
- তুই খুব খিটখিটে হয়ে যাচ্ছিস বাবু। 
- ঘুমোলে এবার?
- যা খুশি কর। শুলাম আমি। বারান্দায় বেড়াল এসে যদি পাখিগুলোকে... 
- সে দায়িত্ব আমার। কানের মাথা না খেয়ে এবার ঘুমোও।

*** 

বাঁ হাতটা অয়েলিং হয়ে গেছিলো বাবুর। এবার ডান হাতটা অয়েলিং করার জন্যে স্ক্রুগুলো খুলছিল। এই সামান্য খটখট শব্দগুলোও বাবার কানে যাবে আর গোলমাল পাকবে। অবশ্য নিজের বাবা নয়। বাবার আদত ছেলে অর্থাৎ আদত বাবু তো কবেই মরে গেছে; এ বাবু তো বৃদ্ধ বাপের চোখে ধুলো মাত্র। ছেলে বড় বৈজ্ঞানিক ছিল, বাপেরই মত তাবড় বা হয়তো বাপের চেয়েও ধারালো। ছেলে যখন বুঝতে পারলো যে রক্তের ক্যানসারের কোন উত্তর তার হাতে নেই, তখন বৃদ্ধ বাপকে পুত্রশোকের খপ্পর থেকে বাঁচাতে অবিকল নিজের মত মানুষ রোবট তৈরি করে ফেললে দুরন্ত এ জিনিষ- গায়ের চামড়া থেকে হাবভাব থেকে কথাবার্তা থেকে বিচার বুদ্ধি; সব সেই আসলি বাবুর মতই। এমনকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বাড়ার সমস্ত চিহ্নও তার কৃত্রিম মানব দেহে দেখা দেবে। বাবু মারা গেলেও বৃদ্ধ পিতা টের পেলেন না। রোবটকেই বাবু ভেবে বেঁচে রইলেন, রোবটও বাবু হয়ে তার সাথে টিকে রইলো। 

*** 

বৃদ্ধ বাপ নিজের ছেলের কথায় বিরক্ত হয়ে শুয়ে পড়লেন। অবশ্য বৃদ্ধ জানেন যে তিনি নিজে বাবুর আসলি বাপ নন। বাবুর যখন বারো বছর বয়স তখনই তার ক্যানসার ধরা পরে, থার্ড স্টেজ। বাবুর মা আগেই মারা গেছিল। বাপ হয়ে বুঝতে বাকি ছিলো না যে এ বয়েসে বাপকেও হারালে বাবু ভেসে যাবে। নিজে বৈজ্ঞানিক ছিলেন পিতাটি। অবিকল নিজের মত এক রোবট বানালেন; সে প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে মানুষ, গায়ের চামড়া থেকে হাবভাব থেকে কথাবার্তা থেকে তার বিচার-বুদ্ধি, সবই তার নিজের মত। যন্ত্র হলেও তার পিতৃ-স্নেহ সক্ষম ভাবেই বহন করতে পারবে এই রোবট। এমনকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স বাড়ার সমস্ত চিহ্নও তার কৃত্রিম মানব দেহে দেখা দেবে। নেহাত বয়সের সঙ্গে বাবা-রোবটের ইন্টারনাল সার্কিটের একটা অংশ খারাপ হয়ে যাওয়ায় দৃষ্টিশক্তিটা কমে যাওয়ার বদলে একেবারে গায়েব। বাবুর বাবা তো সেই কবেই মারা গেছেন, কিন্তু এমন ভাবে সরেছেন যে পৃথিবীর কেউ টের পাননি। বাবুও নয়, সে জানে তার বাবা বেঁচে আছে, সে জানে তার বাবা তাকে আগলে রেখেছে।  বাবু রোবটের পিতৃস্নেহেই বড় হয়ে উঠেছে। 

Monday, January 19, 2015

ফেলুদার আশি



ফেলুদা আশিতে এসে কী করতেন?

-   লালমোহনবাবু চলে যাওয়ার পর সবুজ অ্যাম্বাস্যাডারটা নিজের বাড়ির গ্যারেজে এনে রেখেছিলেন। গাড়ির গায়ে সামান্য হাত বুলিয়ে আসতেন। আফটার অল, ভদ্রলোক তো আর শিঙ্গাড়ার ঠোঙা নিয়ে দুম করে উদয় হবেন না।

-   মগনলালের নম্বর জোগাড় করে একবার ডায়াল করতেন। বৃদ্ধ বেনারসির গোলার মত কণ্ঠস্বর খড়খড়ে হয়ে কোনক্রমে পড়ে আছে জেনে সামান্য অবাক হতেন। এবং বলতেন “নো হার্ড ফিলিংস মগনলালজি, ইউ হ্যাভ বিন আ ট্রু কম্পিটিটর অ্যান্ড কাইন্ড অফ আ ফ্রেন্ড। আ ভেরি স্পেশাল কাইন্ড ইফ আই মে অ্যাড। আপনার বজরাতে করে গঙ্গা ভ্রমণের অফারটা কী এখনও বহাল রয়েছে?”

-   নিজের পুরনো ডায়েরিগুলো ঘেঁটে দেখতেন আরেকবার। শেষ পাতার হিজিবিজিগুলোর মর্ম তোপসেও পারেনি কোনদিন উদ্ধার করতে। আসলে ফেলুদার সঙ্গে প্রেম কানেক্ট করতে কারুর কী ভালো লাগতো? কে জানে। নরম ইমেজ নিয়ে ক্রিমিনালদের পিছনে ধাওয়া করা যায় না।

-   তোপসে রাত্রেই ফোন করেছিল। ব্যবসা সূত্রে দিল্লীতে সে আছে বছর কুড়ি হল, কিন্তু এই দিনটা সে ভোলে না। জন্মদিনের উপহারও পাঠিয়েছে সে, খান কয়েক বই। আর এক প্যাকেট স্পেশাল ডালমুট। হগ মার্কেটের ডালমুটের সে টেস্ট অবিশ্যি এখন নেই। তাছাড়া এ জিনিষ দিল্লীর। তবু, তোপসের পাঠানো তো। 

Sunday, January 18, 2015

রাম


রাম সেবার অনেক তপস্যা-টপস্যা করে মহাদেবকে প্রসন্ন করলেন।
মহাদেব আবির্ভূত হয়ে বললেন - "কনে আমার কাছে নেই। তবে বর চাইলে দিতে পারি। খিক খিক"।

রাম অবাক - "আজ্ঞে?"

মহাদেব - "আরে বাজে ঠাট্টা। ফ্যাশনে আসবে। একদিন আসবে। যাক গে। বর চাও ভাই"। 

রাম বললেন - "আমি আপনার শক্তির সাথে নিজের ভক্তি মিলিয়ে কিছু করতে চাই "।

মহাদেব - "বেশ। তাই হবে। আমরা দু'জনে মিলে একদিন হর্ষবর্ধন আর গোবর্ধনের গপ্প লিখবো"।

Saturday, January 17, 2015

চামচ-অমনিবাস

মারা যাওয়ার পরেই কোথাও একটা যাওয়া দরকার। লাশটা ক্যালক্যাটাতে পড়লেও নিধুবাবু প্রথমে ভাবলেন বৈঁচিতে যাবেন। বাপ-কাকার ভিটের পাশে দিব্যি বাঁশবন, সেখানে কাটাবেন কিছুদিন। তারপর ভাবলেন মধ্যমগ্রাম গেলে কেমন হয়?  মেজোপিসির শ্বশুরবাড়ি সেখানে। সেই ছেলেবেলার পর আর সেখানে যাওয়া হয়নি, পিসেমশায়দের বিশ বিঘে জমির ওপরের আম বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যাবে। তারপর মনে হল পান্ডুয়া ব্যান্ডেল করে তো জীবনটাই কেটে গেল। ভূত হয়ে যদি সামান্য ঘোরাঘুরিই না হল তবে তেমন মারা যাওয়ার মূল্য কোথায়।

তাই তিনি সোজা চলে এলেন প্যারিসে। প্যারিসে আইফেল টাওয়ার আছে সে কথা তিনি জানতেন। ফরাসীদের কেতার জবাব নেই; তা সে খাওয়া-দাওয়া, গান-বাজনা, প্রেম-চুমু, সাহিত্য; যে ব্যাপারই হোক না কেন। এটাও অবিশ্যি তার শোনা। তাছাড়া চন্দননগরটাও তো ওদেরই হাতে গড়া শহর। জায়গাটা নিশ্চয়ই মধ্যমগ্রামের চেয়ে কম যাবে না। পছন্দমত গাছপালা ও প্রতিবেশী জুটলে সেখানে কিছুদিন থাকবেন, নয়তো হাতের পাঁচ বৈঁচি তো রইলই।

প্যারিসের ঝাঁ চকচকে একটা রাস্তার ওপর নামতেই অঘোরের সঙ্গে দেখা। অঘোর দে,  বারাসাত পোস্টঅফিসে তার সহকেরানী ছিলেন। গত পৌষের আগের পৌষে মারা যান। বাতাসে ভাসছিলেন অঘোর, সেই নিধুবাবুকে প্রথম চিনতে পারলে।

-“আরে নিধু যে, কী ব্যাপার। কবে টাসলে?”।

Friday, January 16, 2015

দুই ভাগ

"হাওড়া ব্রিজের চুড়োয় উঠুন নীচে তাকান, ঊর্ধ্বে চান - দুটোই মাত্র সম্প্রদায় নির্বোধ আর বুদ্ধিমান।" -শঙ্খ ঘোষ


পৃথিবীতে মানুষকে দুই ভাবে ভাগ করা যায়।

এক, যাদের পকেটে কলম রয়ে যায় আর কলমের ঢাকনাটা হারিয়ে যায়। দুই। যাদের কাছে কলমের ঢাকনারা রয়ে যায় আর কলমটা হারিয়ে যায়।

এক, যারা হঠাৎ বৃষ্টি ভালবাসেন আর দুই, যারা হঠাৎ বৃষ্টিকে ভালো না বাসার ভান করেন।

এক, যারা অঙ্কে ভালো আর দুই, যাদের অঙ্ককে ভালো করে চিনিয়ে দেওয়া হয়নি, স্রেফ শেখানো হয়েছে।

Thursday, January 15, 2015

চক্র

১।
-হ্যালো, কী ব্যাপার...।
-হ্যালো...সেন সাহেব...সেন সাহেব...।
-কী ব্যাপার সামন্ত, তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
-আগুন সেন সাহেব...আগুন...।
-আগুন? কোথায়?
-ফ্যাক্টরি জুড়ে...।
-কী বলছো...সামন্ত...কী বলছো...ফিনিশ্‌ড স্টক? নতুন মেশিনারি?
-সব শেষ সেন সাহেব। সব শেষ। এত কিছু করেও পারলাম না স্যার...পারলাম না...।
-কখন লাগলো? দমকল?
-আধ ঘণ্টা আগে, কিন্তু এতটাই ছড়িয়ে গেছে যে...আর দমকলের এখনও দেখা নেই!
-কী শুনলাম সামন্ত। আমি যে পথে বসে গেলাম। আমার সব শেষ হয়ে গেল...।

২।
-বোসবাবু। হ্যালো। আমি সামন্ত।

Tuesday, January 13, 2015

কলকাতার মার্ফি


সবচেয়ে ছোট আলুর টুকরোটি পড়বে আপনার পাতের বিরিয়ানিতে।

তাড়াহুড়োর মাথায় নেওয়া ট্যাক্সিটা গোটা রাস্তা থমকে চলবে ট্রামের পিছনে।

কফি হাউসে আপনার টেবিল বাদে সমস্ত টেবিলে ওয়েটারদের নিয়মিত আনাগোনা।

গড়িয়াহাট ভরপুর টাটকা ইলিশে। খড়ের গাদা থেকে বেছে নেওয়া ছুঁচের খোঁচার মত বিস্বাদ কোল্ডস্টোরেজের পুরনো মালটি আপনার থলিতে।

Monday, January 12, 2015

জন্মদিনের কলরব


- ভাই নরেন, তোমাকে হ্যাপি বার্থডে বলতে ভুলে গেছি বলে কিছু মনে করলে?

- ধুর। আরে ও দুনিয়ার জন্মদিনের কী এই জগতে কোন মূল্য আছে ? ও নিয়ে ভেবো না।
- না মানে আমি মুখ্যুসুখ্যু চোর ছ্যাঁচোড় মানুষ ছিলাম। তুমি সাধু। ও পারে থাকলে তো তোমার ধারে কাছেই ঘেঁষতে পারতাম না। এ দুনিয়ায় এসে তুমি যে আমায় বন্ধু বানিয়েছি তাতে আমার যে কী ইয়ে...তবু তোমার জন্মদিনটা যে কী করে ভুলে মেরে দিলাম...
- ছাড়ো দেখি ওসব কথা। তামাক সেজেছি। খাবে?
- জানো তো ভাই নরেন। বেঁচে থাকতে তামাক, আফিং কিছুই বাদ দিই নি। কিন্তু এ পারে এসে ঠিক করেছি ওসব আসক্তিতে আর কাজ নেই।
- আমি কিন্তু ভাই ঢেঁকি, স্বর্গে এসেও স্বভাব পাল্টাতে পারিনি।
- ভাই নরেন, একটা কথা বল দেখি! তোমার চেহারায় একটা বেশ চকমকি ভাব দেখতে পারছি আজ। একশো তিপ্পান্ন গুনে গুনে মৌজ করছো বুঝি? অ্যাঁ?
- চকমকটা ঠিক ধরেছ গুরু। মর্ত্যের জন্মদিন উপলক্ষে আজ একটু ফুর্তি করতে ইচ্ছে হওয়ায় একটা নিয়ম ভেঙেছি। বলতে পারো, একটা বদমায়েশি করে ফেলেছি। তাই আমোদ নিচ্ছি আর কী। 
- এ-লোকের নিয়ম ভেঙ্গেছ?
- ঠিক।
- তুমি ভেঙ্গেছ?
- না হলে বলছি কেন। 
- তুমি যে দেবতুল্য নরেন! বরপুত্র। তুমি তো বাপু আমাদের মত অকালকুষ্মাণ্ড আত্মা নয়। তোমার তো একটা ইয়ে আছে গো। কী করেছ শুনি! ওয়ার্ডেন জানতে পারলে আবার গণ্ডগোল না পাকায়।