Tuesday, April 24, 2018

খুচরো দুই

১- ক্যালামিটি।

অমিত রায়ের হাবেভাবে গায়ে পড়া ঘ্যানঘ্যান না থাকা,

উত্তমের উৎপল-কণ্ঠী ওথেলোতে সুচিত্রার চোখ ছলছল না থাকা,

আজহারের ব্যাটিং স্টান্সে গলার তাবিজের দুলুনি না থাকা,

আনন্দের শায়রির ডায়েরিতে শুকনো ফুলের স্মৃতি-ফসিল না থাকা,

'বুঝলে ভায়া'র আরামে পাহাড়ি সান্যালিস্ট আশ্বাস না থাকা,

আর

রাতের ফ্রীজে ক্ষীরকদম না থাকা।

***

২- সজনে।

সর্ষে পোস্ত দিয়ে জমাটি ভাবে রাঁধা সজনে চিবুতে পারায় রয়েছে স্বর্গসুখ।

রাতে খেতে বসার আগে লেবু সাবানে স্নান করে, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে, ফতুয়া চাপিয়ে তবে সজনের বাটি নিয়ে বসা উচিৎ।

মনে থাকবে মৃদু গুনগুন;
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে,
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে।

জোড়া খুচরো

১- কর্পোরেট কনক্লেভ।

- একটা কর্পোরেট কনক্লেভে আপনাকে ইনভাইট ছিল আপনার জন্য। আমরাই অর্গানাইজ করছি।

- কনক্লেভ? কর্পোরেট?

- হুজ হু অফ ইন্ডাস্ট্রি থাকবে।

- থীমটা কী?

- বিসনেস চ্যালেঞ্জেস ইন দি নিউ...।

- ধুর, লাঞ্চে কী? কন্টিনেন্টাল? ইন্ডিয়ান? চাইনিজ?

***

২- খাবার অর্ডার

- অর্ডার লিখে নিন।
- বলুন।
- মটন কষা এক প্লেট। মটন রোগনজোশ এক প্লেট। আটটা পরোটা। একটা থামস আপ এক লিটার।
- পয়লার বাজার; দেরী করে ফেলেছেন। তবে চিন্তা নেই। চিকেন দোপেঁয়াজা আছে, চিকেন টিক্কা মশলা আছে, চিকেন ভর্তা...।
- রিভিশন।  লিখে নিন। দু'টো ডিম তড়কা। এক্সট্রা ডিম। আটটা রুমালি। একটা ফ্যান্টা, এক লিটার।
- আহ্, চিকেনে আরো আছে। হরিভরি মুর্গ, চিকেন লাবাবদার...।
- পয়লাতে ব্রয়লার খেয়ে চোয়াল ইনজিওর করব, এমন গবেট নই। ক্যুইক স্যর, তড়কা-রুটি-ফ্যান্টা।

হোমওয়ার্ক

- একটা হোমওয়ার্ক দিচ্ছি তোকে।

- এই বয়সে হোমওয়ার্ক দেবে মামা?

- হোয়াই নট?

- শুনি।

- মতপার্থক্য প্রকাশে কোনো সিলিং নেই। এমন কী অমুকের অভিনয় বা তমুকের ব্যাটিং ভালো লাগে না; এমনটাও যত খুশি যতবার খুশি বলতে পারিস। কিন্তু রাগ বা হিউমর ঝাড়তে গিয়ে একটা ব্যক্তিগত খিস্তি দিতে হলে, অন্তত তিনজনের ব্যাপারে মন খুলে সবার সামনে প্রশংসা করতে হবে। ও হ্যাঁ, এমন তিনজনের গুণ গাইবি যাদের ব্যাপারে এর আগে পাবলিকলি তুই যথেষ্ট প্রশংসা করিসনি।  থ্রি ইস টু ওয়ান রেশিও মেন্টেন করতে হবে। অ্যাট অল টাইমস।

- বেশ। তা'হলে শোনো। বিমল জ্যাঠা চমৎকার রিদমে খৈনি ডলেন, ট্রীট ফর দ্য আইজ অ্যান্ড ইয়ার্স। মেজপিসি পনীর কুচিয়ে ভেজে তাতে পাঁপড় মিশিয়ে একটা ঝাল ঝাল রান্না করে, টেরিফিক। অখাদ্যকে উপাদেয় করে তুলতে মেজপিসিই পারে। পাশের পাড়ার গণেশ মাতাল গোপনে গান লেখে, বেশ জুতসই। এই গেল তিনটে প্রশংসা। আর এই তুমি, তোমার ভীমরতি হয়েছে। বুঝেছ মামা? ভীমরতি।

ইন্টারনেট আর মহাভারত



- মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের জয় হোক!
- আর ভাই সঞ্জয়! জয়ফয় বলে লেগপুল কোরো না। কুরুসেনা যে হারে প্যাঁদানি খাচ্ছে..।
- সবে তো শুরু মহারাজ। অত ইম্পেশেন্ট হলে চলবে কেন? গুড নিউজ আছে। কুরুক্ষেত্রে ট্রেন্ড পাল্টাচ্ছে।
- বটে? কী'রকম?
- শেষ খবর অবশ্য দু'ঘণ্টা আগে পেয়েছি মহারাজ। আজ পিতামহ মোমেন্টাম ঘুরিয়ে দিয়েছেন। পাণ্ডব সৈন্য পালাবার পথ পাচ্ছে না। অর্জুন নিজে ভি-তে না খেলে বাধ্যে হয়ে দিলস্কুপ গোছের এলোপাথাড়ি তীর ছুঁড়ছে, তা'তেও লাভ হচ্ছে না। কৃষ্ণ রাগে ফেটে পড়ছে।
- পিজে টাইম, কৃষ্ণ রাগে ফেটে পড়লে কি ওকে ফাটাকেষ্ট বলে ডাকা যাবে?
- এল ও এল। এল ইউ এল জেড।
- যাক গে, দু'ঘণ্টা আগের খবর কেন? যুদ্ধ তো এখনও চলছে। স্ট্র‍্যাটেজিক টাইম আউট নিয়েছে একটা বড় জোর। লেটেস্ট স্টেটাস কী?
- ক্ষমা করুন মহারাজ। ব্যাসদেবের ব্রডব্যান্ড কনেকশন ডাউন চলছে। 
- সর্বনাশ কাণ্ড। বলো কী? ইন্টারনেট ডাউন? রাউটারে থাবড়া মেরে রিস্টার্ট করে দেখেছ?
- লাভ হয়নি। কাস্টোমার কেয়ারে কম্পলেন করেছি, কিন্তু এখনও সুরাহা হয়নি।
- ব্যাসের যত বাতেলা। এত ডাউনলোড স্পীড রে, হ্যান রে, ত্যান রে। ধ্যার।
- স্যাড স্মাইলি ইনসার্ট করতাম চ্যাট উইন্ডো হলে।
- যাক গে। ব্রেইল পাশার সেট তৈরি হয়েছে কি? জলদি করো, ওই খেলা শুরু করতেই হবে। নয়ত একদিকে গান্ধারীর পলিটিকাল করেক্টনেসের স্টেনগান আর অন্যদিকে ওই বিদুরের চিকেন স্যুপ ফর সোল মার্কা লেকচার; আর নেওয়া যাচ্ছে না।

মিস্টার স্মিথ



বড় হওয়ার প্রসেসে একটা জব্বর 'বাগ' রয়েছে। মাঝেমধ্যেই মনে হয় 'অ্যাই যে, এইবারে বেশ দাঁড়িয়ে গেছি। দেওয়াল ঘড়ির ব্যাটারি পাল্টাবো। চালানি কাতলা চিনে ফেলে নাক সিঁটকবো। খোকাটি পেয়ে শুকনো বাঁধাকপি গছিয়ে দেবে, তেমন বান্দা আর কেউ থাকবে না চারপাশে'। তখন মনে হয় বুড়োদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলি; 'আরে আমি থাকতে তোমার সাতপাঁচ ভাবার আছেটা কী'? 

ঠিক তখুনি দুম করে একটা 'ভুল' ঢুকে পড়বে; আর সমস্ত গুবলেট, গোটা ইকুইলিব্রিয়াম জলে। পায়ের তলার মাটি ঝুরঝুরে হয়ে পড়বে, চেনা মানুষগুলোর গা থেকে পাওয়া যাবে অন্য গ্যালাক্সির গন্ধ। কিছু হাত নরম 'আছি তো'র সুরে পিঠে নেমে আসে, কিন্তু তবু ধুকপুকানি বাড়তে থাকে। সমস্ত মাটি করে ফেলার অপরাধবোধ গলা টিপে ধরে।

তখন এই দামড়ামোর খোলস ছেড়ে বেরোনো জন্য যে কী প্রাণান্তকর আইঢাই। আর এই দুর্বিষহ বয়স আর পাপ ঝেড়ে ফেলার একটাই জায়গা আছে বোধ হয়; মা-বাবা। ভুল স্বীকারের এমন নিশ্চিন্ত আশ্রয় আর নেই। কাঁধে বাপের হাতের মত সৎসাহস আর হয় না। 

র‍্যান্ডি পশ্ বলেছিলে সরি বলার তিনটে ভাগ আছে;
- দুঃখপ্রকাশ।
- দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া।
- দোষগুলো শুধরে নেওয়ার জন্য সমস্ত কিছু করতে চাওয়া।

স্মিথের 'সরি' সে অর্থে 'কপিবুক'। আর সবচেয়ে বড় কথা;  স্মিথ ভেঙে পড়েছিলেন বুড়ো বাপের জন্য; লজ্জায়, দুঃখে, অনুশোচনায়। খোকার পাশে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা; যদ্দিন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তদ্দিন ঈশ্বরেরও ক্ষমতা নেই খোকার শৈশব কেড়ে নেওয়ার।

তবু। কোথাও কারুর হত মনে হবে গিমিক, সাজানো। জানি না। তবে আত্মসমর্পণের অন্ধকারে খোকার পাশে আলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাবা, আমার বাবা-বিশ্বাসী চোখে সে'টুকুই আশ্বাস। 
শাস্তিটুকু থাক, আর শাস্তির ও'পাশে থাকুক ভালোবাসায় মজবুত খোকা। 

ফিরে আসুন স্টিভ। ফর ইওর ওল্ড ম্যান। আমরা অপেক্ষায়।

গরম্য

এপ্রিল পেরোনোর আগেই কলকাতা তন্দুর সেঁকা হয়ে পড়বে। এ ভ্যাপসা গরম এমন বিটকেল যে প্রতিদিন নিয়ম করে শরীরের সমস্ত ঘ্যাম ঘামে শুষে নেয়।

হাতের পাঁচ বলতে মাঝেমধ্যে আইআরসিটিসিতে লগ ইন করে শেয়ালদা টু নিউজলপাইগুড়ির টিকিট দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রাণ ঠাণ্ডা করা। গরম বাড়াবাড়ি রকমের দিকে গেলে অবশ্য উইকিপিডিয়ায় লাদাখের গল্প না পড়ে উপায় থাকে না। গুগল ইমেজেস আর ইউটিউবও যথেষ্ট কার্যকরী। গতবার আধঘণ্টা ধরে বরফে মোড়া কানাডায় ছবি ও ভিডিও দেখে সর্দি লেগে গেছিল।

অবস্থা আরো সঙ্কটজনক হলে অবশ্য দু'চার পেগ গেলা ছাড়া উপায় থাকেনা; বরফলেবুজলের পাতিয়ালা পেগ যে কত চিড়বিড়ে দুঃখকে চাবকে সোজা করার ক্ষমতা রাখে।

মূল সমস্যাটা শুরু হয় মে-মাসের মাঝামাঝি গিয়ে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের চোটে যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, ট্রাম্পবাবু আর বছর খানেক মন দিয়ে চেষ্টা করলেই নর্থ পোলের কোনো এক মোড়ে দাঁড়িয়ে দিব্যি ফতুয়া গায়ে ঘুগনি-ডিমসেদ্ধ খাওয়া যাবে। তা গতবছর বৌ বলল এই সময় ফ্লুইড ইনটেক না বাড়ালে সমস্যা হতে পারে। আমি মাথা নেড়ে সাজেশন দিয়েছিলাম এই হরেন্ডাস গরমের নিজেদের হাইড্রেটেড রাখতে কিছুদিন আমাদের উচিৎ এক বাটি মাংস প্রতি মিনিমাম দু'বাটি করে ঝোল খাওয়া। সম্পর্কে সেই থেকে একটা বিশ্রী চাপা অবিশ্বাস ঢুকে গেল।

বিনোদবাবুর অম্বল

- শুনুন।
- আমায় ডাকছেন?
- র‍্যান্ডম ফায়ার করেছিলাম। আপনি ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইলেন। তা'হলে আপনাকেই ডেকেছি।
- ভিড় প্ল্যাটফর্মে ইয়ার্কি পেয়েছেন?
- এই দমবন্ধ করা ভিড় আর ভ্যাপসা গরমে ইয়ার্কি? প্রাণে অত ফুর্তি থাকলে কবি হতাম যে মশাই।
- মাফ করবেন, আপনি কবিদের চেনেন না। তারা দিব্যি নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতে পারে, দিনের পর দিন।
- আপনি কবি?
- পাগল নাকি! যাক গে, ডাকলেন কেন?
- তিন নম্বরের দিকে যাচ্ছেন?
- আপ কাটোয়া লোকাল তিনে দিয়েছে। অ্যানাউন্স করল তো। আপনার কি ওই লাইনেই?
- আমি? না। আমি কুদঘাট টু হাওড়া, হাওড়া থেকে ওয়াপস।
- হাওড়া? কুদঘাট থেকে? রেলের অফিসে চাকরী নাকি?
- না না, আমি রোজ স্টেশনে ঘুরতে আসি।
- স্টেশনে রোজ ঘুরতে আসেন?
- রোজ। সব প্ল্যাটফর্মে ঘুরি। বড় ঘড়ির তলায় দাঁড়াই। মাঝেমধ্যে পুরিভাজির দোকানের ব্যস্ততা দেখি। ঘণ্টা তিনেক পর ফের মিনিবাসে করে ওয়াপস।
- রোজ?
- অবভিয়াসলি রোববারে নয়। ওইদিনটা রেস্ট।
- আপনি তো নোবেলটোবেল পেয়ে যাবেন যে কোনো দিন।
- সারকাজম রয়েসয়ে ব্যবহার করতে হয়।
- গুল দিচ্ছেন না তো?
- গা ছুঁয়ে প্রমিস করব?
- অত বাড়াবাড়ির দরকার নেই।
- আমি অবশ্য চাইলেও গা ছুঁতে পারতাম না।
- মানে?
- আমার নাম রাধাকান্ত হাজরা। নিবাস, কুদঘাট। আগেই বলেছি। তা, আপনার নাম?
- বিনোদ দাস। বৈদ্যবাটি। ইয়ে চোরডাকাত নন তো? চেহারা দেখে তো তেমন মনে হয় না। তবে গা ছুঁতে পারবেন না কেন বলুন দেখি?
- আমার শরীর তো হাওয়া।
- ভূত?
- ধ্যাত্তেরি। সবেতেই বাঙালির ভূত ভূত বাতিক। হাওয়ার শরীর মানেই ভূত?
- যাব্বাবা, অশরীরী! ভূত নয়?
- আপনি কি ভূত? বিনোদবাবু?
- যাচ্চলে, আমি কি অশরীরী?
- আলবাত।
- ইয়ার্কি হচ্ছে?
- আপনার মূল দেহ আর আত্মা দু'টোই এখন কাটোয়া লোকালের হ্যান্ডেল ধরে হাফঘুমে ঢুলছে।
- আমার মাথা কেমন ঘোরাচ্ছে, নিজের গা হাত পা কেমন ছায়ার মত তিরতির করে কাঁপছে। আমি কি ভূত?
- ধুত্তোরিছাই। বললাম তো, আই রিপীট; আপনার আত্মা নিশ্চিন্তে আপনার দেহের মধ্যে রয়েছে। আপনার দেহ আপ কাটোয়া লোকালের চার নম্বর কামরায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢুলছে।
- সর্বনাশ, তা'হলে আমি কে রাধাকান্তবাবু?
- আপনি আদতে বিনোদবাবু পুরোটা নন। আপনি বৈদ্যবাটির বিনোদবাবুর পুষে রাখা দাঁতকিড়মিড়। এই যেমন আমি ঠিক রাধাকান্ত নই। আমি রাধাকান্তের পোষ্য অপরাধ বোধ।
- কেমন গা গুলোচ্ছে রাধাকান্তবাবু।
- গা থাকলে তবে তো গোলাবে।
- তা ঠিক! কিন্তু কেসটা কী?
- আজ থেকে দেড় বছর আগে, আমি যাচ্ছিলাম কাটোয়া, পিসিমার বাড়িতে নেমন্তন্ন ছিল। এই কাটোয়া লোকালে উঠে জানালার লোভে আমি আপনাকে ঠেলে ফেলে আপনার পা মাড়িয়ে গিয়ে জানালা দখল করি। লজ্জার সঙ্গে আজ স্বীকার করছি সে জানালা আপনার প্রাপ্য ছিল। অথচ আপনি প্রতিবাদ করতেই আপনাকে বাপ তুলে খিস্তি করি। আপনি ঘাবড়ে চুপ করে যান। জানালার আনন্দ অবশ্য তেমন ভোগ করতে পারিনি। অপরাধ বোধে দগ্ধ হতে থাকি। সেই থেকে আমার অপরাধ বোধ রোজ কুদঘাট থেকে হাওড়া এসে আপনার মনের সেই পুরনো ব্যথা আর দাঁতকিড়মিড়ের খোঁজ করতে থাকে। কত  আর্তি নিয়ে ডাকি; "শুনুন"। এদ্দিন পর আজ সাড়া পেলাম। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে ছুটে যাওয়ার সময় আপনি  আমার হাঁক শুনতে পান। ব্যস,  শুনতে পেয়েই আপনার অন্তরের পোষা সেই আমি-ঘটিত ব্যথা-আর-দাঁতকিড়মিড় বেরিয়ে আসে। বহুদিন আপনার খোঁজ করেছি স্যর, রোজ, হপ্তায় ছ'দিন। আমায় এ'বার মাফ করুন। বিনোদবাবু প্লীজ। আমি জানোয়ারের মত কাজ করেছিলাম।
- আমি যে কী বলব রাধাকান্তবাবু, আমি অভিভূত।  আর রাগ রইল না।
- গা ছুঁয়ে প্রমিস?
- হে হে হে।
- হে হে হে।
- ও কী, আপনি আবছা হয়ে পড়ছেন যে!
- স্বাভাবিক,  এ'বার আপনারও আর থাকার দরকার নেই; আপনিও গায়েব হচ্ছেন। সে'টা টের পাচ্ছেন কি?

***

বেলুড় আসার পর লোকের ওঠা নামার ধাক্কায় হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকা হাফ ঘুমন্ত বিনোদ দাসের তন্দ্রা গেল চটকে।

আর ঠিক তখনি; একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন ভদ্রলোক। এদ্দিনের চাপা অম্বল আর বুকজ্বালা ভাবটা  দুম করে গায়েব। খানিক আগেও ছিল, এখন নেই। নতুন হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারটার এলেম নাকি?

Monday, April 23, 2018

রবি আর আলো

- মোমবাতিটা কোথায় রেখেছ পটাদা?
- ড্রয়ারে। পড়ার টেবিলের।
- নেই। ভালো করে মনে করো দেখি।
- তোমার সেই চার ব্যাটারির টর্চটা কী হল?
- ফেলে এসেছি। তাসের আড্ডায়।
- ভেবে কী হবে আর ভাই রবি। বাথরুমের রাস্তাটুকু মাপা। আর খানিক পরেই ভোর হল বলে। লোডশেডিংকে লাই দিয়ে মাথায় তুলতে নেই। শুয়ে পড়।
- আলোর সোর্স হাতের কাছে নেই ভাবলে বড় অস্বস্তি হয় পটাদা। ঘুম আসতে চায়না।
- মেসে নতুন তো, আর দু'চারমাসে আলোর বদ অভ্যাস কেটে যাবে।
- মোমবাতিটা নিশ্চয়ই কোথাও..।
- খুব ভয় লাগলে বোলো, সিগারেট ধরিয়ে নেব। লাইটার আমার বালিশের নীচেই আছে। লাইটারের ফস আর তারপর বেশ একদানা আলো বিউটি স্পটের মত ঘরের অন্ধকারে মিনিট তিনেক জ্বলবে। শুয়ে পড়ো, নতুন চাকরী; উঠতে দেরী হলে কেলেঙ্কারি হবে। সকালের বাথরুমের লাইন কেমন পড়ে তা তো দেখেইছ। আর চ্যাটার্জী মশাই একবার ঢুকলে হয়ে গেল। দশটার আগে শেয়ালদা পৌঁছতে পারবে না।
- তোমার এই মেসে অনেকদিন হল, তাই না?
- থার্ড ইয়ার থেকে। তারপর মাস্টার্স। তিন বছর চাকরী।  মেস ছেড়ে লম্বা ছুটিতে বের হলে বেশ হোমসিক ফীল করি।
- পটাদা, লাইটারটা দেবে একবার?
- আলোর জন্য? ভয়টয় পেলে নাকি হে?
- না। এমনি। আচ্ছা থাক।
- এই নাও, লাইটার।
- না না, থাক।
- রাখো রাখো।
- থ্যাঙ্ক ইউ। আমি বারান্দা থেকে আসছি। কেমন?
- গোপনে সিগারেট খেতে চাইছ? সে কী!
- না না। এমনি।
- মাঝরাতের বারান্দাটা দেখছি তোমার এক বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

**

- আমি ভাবলাম আজ আর আসবে না...।
- আরে ধুস, ব্রীজের আড্ডায় টর্চটা ফেলে এসেছি। এ'দিকে মোমবাতিগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। লাইটার দিয়ে ইন্টার গ্যালাক্টিক সিগনাল তৈরি করা কি চাট্টিখানি কথা?
- এই পাগলামি আর কদ্দিন রবি?
- যদ্দিন। তদ্দিন। ইলেয়া, এমন ভাবে জিজ্ঞেস করছ কেন?
- আমাদের গ্রহে টেকনোলজি আছে তাই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছি। তোমায় শেখাতে পেরেছি আলোর ব্যবহারে সিগনাল ট্রান্সমিশন। তবুও, ব্যাপারটা আমার জন্য বেআইনি। আর, তাছাড়া...।
- সবই জানি, তবু...। ইলেয়া, প্লীজ।
- আমার আর তোমার সময় সম্পূর্ণ আলাদা। এক অন্য সময়ের আমার সঙ্গে এক অন্য সময়ের তোমার এই যোগাযোগ। প্রেম। ভালোবাসা। স্নেহ। সমস্তই আলোর যাত্রাপথের ভাঁওতা।
- কিন্তু ইলেয়া...।
- সময়ের একই বিন্দুতে দাঁড়ালে তোমার জগতে আমি মৃত। আমার জগতে তুমি সুদূর ভবিষ্যৎ।
- যোগাযোগ বন্ধ কোরো না ইলেয়া, প্লীজ।
- যোগাযোগ? এ'টা একধরনের প্ল্যানচেট রবি! প্ল্যানচেট।
- যেওনা। প্লীজ।
- যেতে যে আমায় হবেই। সে'টা বলতেই তোমায় ডাকা।

**

খানিক হলেও অপরাধবোধ কিছুটা লাঘব হল পটা ওরফে পটলকুমার দত্তর। ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রলোকুইজমের আর্ট এ দেশে প্রায় মরতে বসেছে। নিয়ার-ভেন্ট্রলোকুইজমের মত পুতুলের ডামিকে কথা বলানো নয়, ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রোলোকুইজমে মনে হয় শব্দের উৎস দূরে কোথাও; পটলবাবুর নিজেরই নিজের পালটানো কণ্ঠস্বর দূর থেকে ভেসে আসছে ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। সত্যি কথা বলতে  পটলবাবুর মত ডিস্ট্যান্ট ভেন্ট্রোলোকুইস্ট ভূভারতে আর দু'টো নেই। তবে এই শিল্পকে অবশ্য বাণিজ্যিক ভাবে কোনোদিনও ব্যবহার করতে চাননি তিনি, শুধু মেসের নতুন বান্দাদের গোপনে একটু হয়রান করেই সামান্য তৃপ্তি লাভ হয়।

তবে এই রবি ছোকরা একটু সহজেই ভেসে যাওয়ার উপক্রম করেছিল। কাজেই মানেমানে ইলেয়াকে বিদেয় দেওয়া ছাড়া পটল দত্তর আর কোনো উপায় ছিল না।