Thursday, March 21, 2019

রঙচঙ


ঘোর কাটতে আধঘণ্টা মত  লাগল। তখনও অবশ্য চারপাশে চাপ চাপ অন্ধকার দেখছি। যদিও এখন বেলা দশটা, রোদ ঝলমলে দিন, তবু আমার খোলা জানালা ছাপিয়েও এই অন্ধকার। মাথার মধ্যে ঝিমঝিম ভাব, গা হাত পায়ে টনটন ব্যথা।

খানিকক্ষণ পর চোখের অন্ধকার কমে আসতে টের পেলাম আমি মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে। মুখে বিশ্রী তেতো স্বাদ; রঙের। ওরা রীতিমত অত্যাচার করে গেছে যা মনে হচ্ছে। কপালে চোট লেগেছে; তবে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে না রঙ তা বোঝার উপায় নেই। চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম ঘরের সমস্ত আসবাব ওলটপালট হয়ে পড়ে আছে। মেঝে দেওয়াল  সমস্ত রঙে কাদায় লেপটে আছে। বিশল্যকরণী মেডিকেল স্টোর থেকে পাওয়া বাংলা ক্যালেন্ডারের রবীন্দ্রনাথ ছিঁড়েখুঁড়ে মাটিতে লুটোপুটি। কাচের ফুলদানিটা চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে; পায়ে কাচ ইতিমধ্যেই না ঢুকে থাকলে বাঁচোয়া। কোনোরকমে উঠতে গিয়ে দেখলাম ডান হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা; নির্ঘাত খুব বিশ্রীভাবে গুঁতো লেগেছে। আর লাগবে নাই বা কেন?

যে'ভাবে জনা দশেক পেল্লায় আধগুণ্ডা মানুষজন ঘরের মধ্যে জোর করে ঢুকে পড়লে রঙ মাখানোর অছিলায়। আজকের দিনে নাকি এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক ; এ'টাই রীতি।  কোনো মানে হয়? যাদের আমি আদৌ ভালো করে চিনি না, যাদের সঙ্গে গোটা বছর কোনো যোগাযোগ থাকে না; তারা ঘরে ঢুকে রঙ মাখানোর নামে অত্যাচার করবে আর এ'টাই নাকি রীতি। যত্তসব! ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে লম্বা চওড়া আর বিটকেল; সে আবার ঠণ্ডই খাওয়ানোর নাম করে বিশ্রী একটা কী জোর করে গিলিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত সে'টা চোলাই কারণ গলা বেয়ে বমি উঠে আসছে মনে হচ্ছে। মিনিট কুড়ির চেষ্টায় কোনো রকমে উঠে দাঁড়ানোর পর টের পেলাম গায়ের ফতুয়াটা ছিঁড়ে ফালাফালা অবস্থা।

কান্না পাচ্ছিল খুব। এ'টা তো রীতিমত অন্যায়, অথচ আমার কিছুই করার নেই। টেনেহিঁচড়ে কোনোক্রমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম; নিজেকে চেনা দায়। ক্যাটকেটে সবুজ, কটমটে লাল, কুটকুটে গেরুয়া আর আরো হাজার রকমের বিশ্রী বাঁদুরে রঙে আমার চেহারা ভূতের মত হয়ে গেছে। কপালে আর ঠোঁটে চোট; বাঁদুরে রঙের ওপর তাজা রক্তের স্পষ্ট দাগ।

বুকের ভিতরটা টনটন করে উঠল। জোর করে রঙ মাখাতে আসা লোকগুলোর বিশ্রী হুঙ্কার আমার মাথার মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল;
"গণতন্ত্রবাবু, আজকের দিনে অমন একটু হয়। মাইন্ড করতে নেই। এ দিনটায় অন্তত আমরা পার্টিরা একটু ফুর্তি করব না আপনার সঙ্গে? তা কি হয়? এই একটাই তো দিন। বুরা না মানো গণতন্ত্রবাবু, ইলেকশন হ্যায়"।

Sunday, March 17, 2019

মুকুলবাবু আর প্লেন হাইজ্যাক


২৯ সি। আইল সীট, তাই ঘনঘন বাথরুম-মুখো হওয়াটা অস্বস্তিকর ঠেকলেও মানুষজনকে ডিঙিয়ে টপকে অসুবিধেয় ফেলতে হচ্ছে না; সে'টা একটা বাঁচোয়া। প্লেন কলকাতা থেকে টেকঅফ করেছে প্রায় সোয়া ঘণ্টা হতে চলল; ইতিমধ্যে বার তিনেক উঠতে হয়েছে। নখ চিবিয়ে চিবিয়ে আঙুলের ডগাগুলোর অবস্থাও রীতিমতো বিশ্রী।  পাশের সীটে এক তরুণী বারবার আমার দিকে বাঁকা চোখে দেখছে। কপালে যে'ভাবে ঘাম জমছে আর অপর্যাপ্ত লেগ-স্পেসে যে ভাবে বারবার ছটফট করে চলেছি, মেয়েটির কুঁচকে যাওয়া ভুরু জোড়াকে কিছুতেই দোষ দেওয়া যায় না।

**

- একটা ব্যাপার আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না এজেন্টসাতাত্তরমশাই, হাইজ্যাকের প্ল্যানে আমি ঠিক কী ভাবে রয়েছি। আমায় বন্দুকটন্দুক কিছু দিচ্ছেন না। অবিশ্যি তুবড়িতেও আমার বুক কাঁপে, বন্দুকটন্দুক হাতে দিলেও কিছু করতে পারতাম না।

- মুকুলবাবু, আর কতবার বলব। আপনার কাজ শুধু ফ্লাইট নম্বর ইএল দু'শো বাইশে সময়মত বোর্ড করা। এ'টুকুর জন্যই আপনি এতগুলো টাকা পাচ্ছেন। এ'বার অকারণে মাথা ঘামানোটা বন্ধ করুন। হ্যাঁ, আপনার থেকে আমরা লুকোতে চাইনি যে আমাদের উদ্দেশ্য প্লেনটা হাইজ্যাক করা। তবে অপারেশনের ডিটেলস জেনে আপনার কোনো উপকার হবে না।

- কাজটা দেশ এবং সমাজবিরোধী। সে'টা আমি বুঝি এজেন্টসাতাত্তরদা। কিন্তু ছেলেটার অপারেশনের যা খরচ...বড্ড ফাঁপরে পড়েছি জানেন দাদা। মাস দেড়েক ধরে কোমায় পড়ে আছে অমন হিরের টুকরো ছেলে, আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক দেওয়ার কথা। ব্রাইট, মিশুকে, নম্র। নিজের ছেলে বলে বলছি না স্যর, বড্ড ভালো ছেলে ও। ওর অমন নির্জীব দেহ আর কাঁচের মত চোখ দেখে বুক ভেঙেচুরে যায়; বার বার। বিশ্বাস করুন! নয়তো এই বিশ্রী ব্যাপারে কিছুতেই জড়াতাম না..।

- আপনি বড্ড বাজে চিন্তা করেন মুকুলবাবু। বড্ড। পিলু সুস্থ হয়ে উঠবে, আমার অন্তত তেমনটাই মনে হয়।

- ও মা, আপনি দেখছি খোকার ডাকনামটাও জেনে বসে আছেন!   আপনার হোমওয়ার্কে তারিফ না করে উপায় নেই মশাই। আসলে কী জানেন, প্রসেসটা পুরো জানলে একটু কনফিডেন্স পেতাম। আপনাদের এত রাখঢাক, আরে আমার সঙ্গে লুকোচুরি করে লাভটা কী। আমি তো আপনারই টীমে। আমিও তো টেররিস্ট। আমার  সঙ্গে এত কথাবার্তা, এত দহরমমহরম; তবু এদ্দিনেও আপনার মুখ দেখতে পেলাম না। একবার ঝেড়ে কাশুন দেখি, আমি তো আপনারই দলে, নাকি?স্যাটাস্যাট সাধারণ মানুষকে কচুকাটা করার প্ল্যানে ঢুকে পড়েছি, তা বেশ বুঝছি। তবে নিজেকে সঁপে যখন দিয়েইছি, আমাকে নিয়ে আপনার ইয়ের কোনো মানেই হয় না।

- বেশি ভাবনাচিন্তায় কাজ গুবলেট হয়। সময়মত বোর্ড করবেন। বোর্ডিং প্ল্যান আর প্লেন নিয়ে কারুর সঙ্গে আলাপ জমাতে যাবেন না যেন; নিজের মিসেসের সঙ্গেও খেজুর করতে যাবেন না। হিতে বিপরীত হবে। কেষ্টপুরের যে স্পট আপনাকে বলা আছে; সে'খান থেকে আমাদের লোক আপনাকে তুলে নেবে আগামী সতেরো তারিখ। ঠিক সকাল সাড়ে আটটায়।

- আরে মনে আছে। আর কতবার বলবেন। অন্য টার্মিনাল থেকে এ প্লেন ছাড়বে কারণ প্রচুর ভিভিআইপি প্যাসেঞ্জার রয়েছে। আর আমার কাজ চুপচাপ আমার সীটে গিয়ে বসে যাওয়া। ২৯সি।  ইনস্ট্রাকশন আপনা থেকেই আমার কাছে চলে আসবে। আর সময়মত প্লেনটা হাইজ্যাক...।

- করেক্ট।

- শুধু একটাই রিকুয়েস্ট এজেন্টসাতাত্তরদা! একটু কনসিডার করে দেখুন। প্লীজ। ওই সতেরো তারিখই খোকার অপারেশন; ওই দিন এই অলক্ষুণে ব্যাপারটা না ঘটালেই নয়? সে'দিনটা অন্তত খোকার মায়ের পাশে থাকব না? আমি মানত করেছি যে; প্রাণ দিয়ে হলেও খোকাকে বাঁচানোর সমস্ত চেষ্টা আমি করব। আর আমি যদি সে'দিন হাসপাতালেই না থাকি...খোকার মা নিজেকে সামাল দেবে কী করে? প্লীজ..।

- এ'সব প্ল্যান অত মামুলি কারণে পালটানো যায়না মুকুলবাবু। পিলুর মঙ্গল চাইলে সতেরো তারিখ সকালে প্ল্যান মত কাজ করবেন। ফ্লাইট আর সীট নাম্বার খেয়াল থাকে যেন, কেমন? আপনার টিকিট আমার লোকের কাছেই থাকবে।

**

ঘড়িতে এখন সোয়া এগারোটা; ফ্লাইট দিল্লী পৌঁছনোর কথা দুপুর পৌনে একটায়। অবশ্য অদ্দূরের কথা ভাবার সময় এখন নয়। মনে মনে সাইমন স্নুটস হুইস্কার্স আউড়ে খানিকটা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম বটে; কিন্তু ভাঙা হাড়ের যন্ত্রণা কি আর হোমিওপ্যাথিতে কমে? প্রতিটা সেকেন্ড দুর্বিষহ মনে হচ্ছিল।

ঠিক এগারোটা বাইশ নাগাদ ঘটল গোলমেলে ব্যাপারটা। সিটবেল্ট বাঁধা না থাকলে নিশ্চিতভাবেই আমি ছিটকে পড়তাম সোজা প্লেনের মেঝেতে। প্লেনের পিএ সিস্টেমে যে কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল তা চিনতে আমার অসুবিধে হওয়ার কথাই নয়;
এজেন্টসাতাত্তরবাবু। অবাক কাণ্ড, এজেন্টসাতাত্তর আর আমার যে কথাবার্তাটুকু হল; তা'তে আশেপাশের কোনো যাত্রীই বিচলিত বোধ করলেন না; পাত্তাও দিলেন না।

- গুড মর্নিং মুকুলবাবু! নার্ভাস লাগছে? সীটে বসেই জবাব দিতে পারেন; আমি দিব্যি শুনতে পাব।
- সে কী মশাই, আপনি ইতিমধ্যে পাইলটকে ঘায়েল করে প্লেনটা হাতিয়ে নিয়েছেন?
- নাহ্, এ প্লেনের পাইলট আমিই।
- আপনিই? এ প্লেন আপনারই হাতে উড়ছে? তা'হলে হাইজ্যাকের ব্যাপারটা?
- হাইজ্যাকটা আপনার হাতে।
- কেমন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আর হেঁয়ালি নেওয়া যাচ্ছেনা এজেন্টসাতাত্তরদা।
- খুলেই বলি। আমি কীসের এজেন্ট, তা ভেবে দেখেননি কোনোদিন?
- বিদেশী কোনো সংস্থার নিশ্চয়ই, তবে আপনার ক্যালকেশিয়ান বাংলার দরাজ প্রশংসা না করলে অন্যায় হয়।
- আমি এ দেশের নই। তবে কোনো দেশই আমার নয় মুকুলবাবু।
- কোনো দেশ..ইয়ে...আপনার নয়?
- আপনার চেনা কোনো দেশ আমার নয়। আমি এজেন্টসাতাত্তর, মৃত্যু উপত্যকার হয়ে আমার কাজ। কলকাতা শহর থেকে মড়াদের নিয়ে আমি এই এইএল দুশোবাইশ বা এক্সিট লাইফ দু'শো বাইশ ফ্লাইটে করে মৃত্যু উপত্যকায় দিয়ে আসি।
- দিল্লী যাওয়াটা ভাঁওতা? আমি মারা গেছি এজেন্টসাতাত্তরবাবু?
- আপনি দিব্যি জ্যান্ত একজন মানুষ মুকুলবাবু। কাজেই এ মড়াদের প্লেনে আপনাকে আনতে আপনাকে একটু ভাঁওতা দিতে হয়েছে।
- রেলের অফিসের ছাপোষা ক্লার্ক আমি। হিসেবের মাথামুণ্ডু কিছু বুঝছি না স্যার।
- এই প্লেনের ২৯সি বরাদ্দ ছিল পিলুর জন্য মুকুলবাবু!
- না! না!
- ওর অপারেশন এখন মধ্যগগনে। অপারেশন শেষে আমার ওকে নিয়ে কলকাতা ছাড়ার কথা। এ'দিকে সীট ফাঁকা রাখলে এ প্লেন ওড়ানো যায়না মুকুলবাবু। আপনার মানতের খবর আমি আগেই পেয়েছি। আপনি ভালোমানুষ, পিলুও আদর্শ ছেলে। আপনার মানত করা ঈশ্বর আছেন কিনা আমি জানিনা, কিন্তু আমি আপনাকে একটা সুযোগ দিতে চেয়েছি। এ ফ্লাইটে আপনাকে ভাঁওতা দিয়ে আনা হয়েছে; আপনি চাইলেই এ ফ্লাইট হাইজ্যাক করে কলকাতায় ফেরত নিয়ে যেতে পারেন। বন্দুকের দরকার আপনার নেই, আপনার ইচ্ছেই যথেষ্ট। আপনি বাঁচবেন,ফিরে যাবেন কলকাতায়। আপনাকে নামিয়ে এ প্লেন ফের উড়বে।
- কিন্তু ২৯সি'র সীটটা কিছুতেই খালি থাকবে না, তাই না এজেন্টসাতাত্তর?
- আপনি বুদ্ধিমান মুকুলবাবু। সমস্তই বুঝছেন। এ'বার বলুন,। হাইজ্যাক করবেন?
- এজেন্টদাদা গো। জানেন, পিলুর বয়স যখন আড়াই কি তিন; তখন ওকে ওর বাবার নাম জিজ্ঞেস করলে বলত মুকু মুকুজি। মুকুল মুকুজ্জ্যে উচ্চারণ করতে পারত না। আপনি বরং আমায় এখন থেকে মুকুবাবু বলেই ডাকবেন এজেন্টসাতাত্তরদা। আর শুনুন মশায়, আপনাদের এয়ার হস্টেসরা বেশ ঢিমেতালে চলে দেখছি। দশ মিনিট আগে কফি চেয়েছি, তার এখনও পাত্তা নেই। একটু ফায়ার করুন দেখি; লম্বা ফ্লাইটে কফিটা টফিটা সময়মত না পেলে কি চলে?

Thursday, March 14, 2019

নবার চাকরী

*এ'দিক*

প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা শালপাতার বাটিটার দিকে আনমনে চেয়েছিল নবা। পাতাটার গায়ে আলুর দম সাপটে খাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। আহা, জিভের ডগাটা টসটস করে উঠল যেন। সেই কাকভোরে দু'টুকরো পাউরুটি আর তিন গেলাস জল খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছল, এখন বিকেল সাড়ে চারটে। ট্রেন আসতে আরো সোয়া ঘণ্টা, বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা ন'টা। খিদের জ্বালা নবা আগে বরদাস্ত করতে পারত না, কিন্তু দেড় বছর আগে সিমেন্ট কারখানার চাকরীটা যাওয়ার পর থেকে পেটের চাবুক টানটা কিছুটা যেন গা-সওয়া হয়ে গেছে। একবেলা ভাত খেলে অন্য বেলা দিব্যি মুড়িমাখাতেই কাজ মিটে যায়। অবশ্য নবার বৌয়ের হাতে যে'কোনো মাখাই উপাদেয়। ন'পিসিমা মাসে অন্তত একবার তাদের বাড়ি ঘুরে যান স্রেফ বৌয়ের হাতের সাবুমাখা খেতে।

তবে আজ এই পাণ্ডুয়া স্টেশনে বসে থাকতে থাকতে কেমন গা'গুলিয়ে উঠছিল যেন। মদনকাকার কথায় বেশ এক দলা আশা বুকের ভিতর পাকিয়ে তুলেছিল নবা; পাণ্ডুয়ার সুতোর মিলে সুপারভাইজরের চাকরী। মিলটা মদনকাকার ভায়রার; মদনকাকা নিজে সুপারিশ করেছিলেন। বৌয়ের সঙ্গে গতরাতে কত কথা হল; টিউবওয়েলটা সারাই না করালেই নয়, আগের সেভিংস অ্যাকাউন্টটা তো গোল্লায় গেছে; নতুন করে একটা খুলতে হবে, সাদার ওপর গোলাপ প্রিন্টের একটা বিছানার চাদর বৌ দেখেছিল গৌরহরি বস্ত্রালয়ে;মাস দুয়েকের মাথায় তেমন একটা কেনা গেলে বেশ হত। কিন্তু মদনকাকার ভায়রা যে আদৌ সুবিধের মানুষ নয় তা আজ টের পেলে নবা। মদনকাকাকে সে মোটেই তেমন তোয়াক্কা করে বলে মনে হল না, তাঁর সুপারিশকে সে পাত্তা দেবেনা সে'টাই স্বাভাবিক।

নবার যত মনখারাপ শুধু বৌয়ের কথা ভেবে। বেচারির বুক ফাটলেও মুখ ফোটেনা; তবে তাঁর কষ্ট দিব্যি আঁচ করতে পারে নবা। সে বড় আশা করেছিল; এ'বারে কিছু একটা হিল্লে হবেই। কিন্তু এ চাকরি পাওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই। জানলে বৌয়ের মনটা হ্যারিকেনের কাচের মত ভেঙে চুরমার হবে। তখন নবার মনে পড়ল; বেশ কিছুদিন ধরে কিনব কিনব করেও হ্যারিকেনের নতুন কাচ কেনা হচ্ছে না।

যাই হোক, বৌয়ের আশাভরসা আজকেই কোতল করা চলবে না। তাকে নবা বলবে যে আশা আছে। অবশ্য নবা এও জানে যে বৌ তার মিছেকথাগুলো দিব্যি ধরতে পারে। আবার এ'টাও জানে যে তার মিথ্যে ধরে ফেলার ব্যাপারটা তার বৌ সহজে তাকে জানতে দেয়না। তবে সেই ভালো, তেমনটাই থাক না। সাতদিন অন্তত টিউবওয়েল সারানোর আলোচনা হবে, নতুন সেভিংস অ্যাকাউন্টের ফন্দি কষা যাবে আর আলোচনায় থাকবে গোলাপ ছাপের বিছানার চাদর।

*ও'দিক*

বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল মিনু।  একটা লাল পিঁপড়ে একটা চিনির দানা নিয়ে শশব্যস্ত। আহা রে, পিঁপড়ের ছটফট দেখে তার বরের কথাটা মনে এলো।  বরটা জানপ্রাণ লড়িয়েও একটা চাকরি জোটাতে পারছে না। মিনুর খুব কান্না পায়; অভাবে নয়, বরের ছটফটে। লোকটা বড় ভালো। বড্ড ভালো; গোটাদিন টইটই করে ঘুরে হন্যে হয়, এর ওর ফাইফরমাশ খাটে, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। সাবুমাখা খাওয়ার অছিলায় ন'পিসিমা মাঝেমধ্যে চালটা ডালটা রেখে যান, তা'তে ক'দিন সোয়াস্তি থাকে বটে; কিন্তু সে'সব ফুরোতেও সময় লাগে না।

মিনু কান্না চেপে রাখতে পারে। শুধু নিজের কান্না চেপে রাখা নয়, দিব্যি নিজের বরটাকেও কথায় ভুলিয়ে রাখতে পারে। এই যেমন সে স্পষ্ট জানে যে মদনকাকা তার বরকে অকারণ হয়রান করছে; দু'চার দিন বেগার খাটানোর জন্য চাকরীর লোভ দেখাচ্ছে তাকে।  মিনু এও জানে যে আজ তার বর মিছে আশায় অকারণ পাণ্ডুয়া গেছে, সে সুতোর মিলের চাকরী তার জুটবে না। তবু কথাটা দড়াম করে বলতে মনে সরেনি মিনুর। গতকাল গোটারাত তারা দু'জনে একে অপরকে জাপটে কতশত গল্প করেছে; চাকরী পেলে কী কী খরচ করবে তার ফিরিস্তি। মিনু জানে যে তার বর আজ বাড়ি ফিরেও স্বীকার করবে না যে সুতোর মিলের চাকরী তার জোটেনি। আবার এ'টাও ঠিক যে তার বর মনে মনে জানবে যে মিনু সব টের পায়। সব। তবু মিনু বরকে জড়িয়ে গল্প ফেঁদে বসবে; টিউবওয়েল সারাইয়ের গল্প, নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার গল্প, গোলাপ ছাপানো বিছানার চাদরের গল্প; আরো কত কী ছাইপাঁশ আকাশকুসুম।

সংসারে চাল নেই, ডাল নেই; গল্পগুলো মরে গেলে মিনু আর মিনুর বর খাবেটা কী?

Saturday, March 2, 2019

প্রমোশন


এই গতকালের ব্যাপার। স্প্রেডশিটের দিকে চোখ রেখে আনমনে আন্দুলের কথা ভাবছিলাম। আন্দুল কেন? তেমন নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। স্কুলের বন্ধু নাড়ু একটা ফ্ল্যাট কিনেছে আন্দুলে, বহুদিন যাব যাব করেও যাওয়া হয়নি। আন্দুলের বদলে জর্জ অরওয়েল নিয়েও ভাবা যেত, ভাবা যেত খৈনি আর গঙ্গার ঘাট নিয়ে। মোদ্দা কথা এ মড়া স্প্রেডশিট থেকে মনকে লেভিটেট করে উঠিয়ে নেওয়াটাই জরুরী।

"তোমার তো পামিস্ট্রিতে বেশ ন্যাক আছে, তাই না নির্মল"?

টেবিলের ও'পাশ থেকে ভেসে আসা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে সামান্য চমকে উঠতে হল। বসের প্রশ্ন। পার্সেন্টেজ আর প্রজেকশন বাদ দিয়ে পামিস্ট্রি? আন্দুলের আলুথালু ভাব থেকে মনটাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে টানটান হয়ে বসতে হলে।

"আগ্রহ। পড়াশোনা। দু'টোই। কিন্তু কী ব্যাপার স্যর? মার্কেট শেয়ারের ট্রেন্ড বুঝতে জ্যোতিষের অ্যাসিস্টেন্স নেওয়ার কথা ভাবছেন নাকি"?

"প্রমোশন এক্সপেক্ট করছি হে নির্মল। হেডঅফিস থেকে হিন্ট একটা এসেছে। রীতিমত পসিটিভ। তাই ভাবছিলাম তোমার জ্যোতিষবিদ্যের দৌড় একবার বাজিয়ে দেখি"।

"হেডঅফিস যখন বলেইছে..."।

" অলমোস্ট শ্যিওর। কালকেই সুখবরটা পাওয়া উচিৎ। তবু। চাপা টেনশন তো থাকবেই। আমার মুখ দেখে কিছু প্রজেক্ট করতে পারছ কি"?

"মুখ দেখে ভাগ্য বিচার? সে'সব বিজ্ঞাপনি বুজরুকিতে আমি নেই। আপনার রাশিটা কী স্যর? বাংলা মতে"?

" বলে রাখি; আমার এ'সবে আদৌ তেমন ফেথ নেই। জাস্ট একটা কিউরিওসিটি মাত্র। আমার রাশি...ইয়ে...মেষ.."।

"মেষ..? হুঁ। হুমমম"।  জ্যোতিষ আমার নেশা এবং অধ্যাবসায়ের ক্ষেত্র; মগজ ও হৃদয় দুইই চট করে চনমনে হয়ে উঠল। চোখের সামনে গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল নক্সা ছড়িয়ে পড়ল নিমেষের মধ্যে।

" কী ব্যাপার নির্মল? জটিল ক্যালকুলেশন শুরু করলে মনে হচ্ছে"?

"জটিল বটে। তবে স্পষ্ট। প্ল্যানেটারি মুভমেন্ট যা দেখছি স্যর; ইয়ে..."।

" ইয়ে মানে কী"?

"হবে না। আপনার প্রমোশন এ'বারে কিছুতেই হবে না"।

" হোয়াট"?

"হেডঅফিস গাঁজা ছেলেভুলোনো খবর পাস করেছে। আপনার প্রমোশন হতে হলে বেস্পতির অর্বিট চেঞ্জ করতে হয়। সে'টা ইম্পসিবল"। গলার মধ্যে থেকে আত্মবিশ্বাস ও দিব্যদৃষ্টি মেশানো একতাল ইস্পাত উঠে এলো যেন৷

আর তখনই বসের মুখের অন্ধকার আর আচমকা শক্ত হওয়া চোয়ালে ঘরের তাপমাত্রা একধাক্কায় চার ডিগ্রী নেমে গেলো।

" যত্তসব ইডিয়টিক মাম্বোজাম্বো। প্ল্যানেটারি মোশনস না কাঁচকলা। আর তোমার আধঘণ্টাতেও রিপোর্ট শেষ হয়নি নির্মল? আর কতক্ষণ "?

***

আজ চারপাশটা কেমন ঘোলাটে ঠেকছে। হেডঅফিস থেকে খবর এসেছে, বসের প্রমোশনটা হয়নি। 'লাস্ট মোমেন্ট এমার্জেন্সি'র অজুহাতে আটকে গেছে। খবরটা পাওয়ার পর থেকেই ভদ্রলোক আমার ওপর অকারণ খ্যাঁচম্যাচ করে চলেছেন।

এইমাত্র মনে পড়ল এ'বছর আমারও প্রমোশনটা হওয়ার কথা, খবর আসবে সামনের সপ্তাহে। মোটের ওপর নিশ্চিন্তই ছিলাম; সদ্য ধারণ করা গোমেদটা যে কাজ করবেই তা নিয়ে কোনো সন্দেহ গতকাল পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু আজ বসের মেজাজ দেখে নিজের জ্যোতিষবিদ্যের ওপর কনফিডেন্সটা বেশ নড়ে গেছে। বসকে চ্যাটাং সুরে কথা বলার প্রভাব সম্ভবত গ্রহ-নক্ষত্রকে বিশ্রীভাবে ভড়কে দিচ্ছে। এখন টেনশন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে।

ভাবছি আগামীকাল হাফছুটি নিয়ে আন্দুলে নাড়ুর ফ্ল্যাট থেকে একটু ঘুরে আসব। নাড়ু বরাবর বলে বেস্পতির মুভমেন্টের চেয়ে সিঙ্গল মল্টের কোয়ালিটি হৃদয়ে বেশি প্রভাব ফেলে; আজ আমার খুব নাড়ুকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে।

Thursday, February 28, 2019

চিলেকোঠা কনভেনশন


- তুই পারলি কী করে রে বিলু? তোর পিসির ছাদে রাখা বয়াম থেকে চালতার আচার চুরি করতে গিয়ে নন্তু ধরা পড়ল। তুইই পাকড়াও করলি। তা বেশ করেছিস, গীতায় বলেছে ছাদের আচার রক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুদের শায়েস্তা করা যেতেই পারে। নিজের পিসির আচার প্রটেক্ট করেছিস, আপত্তির কিছু নয়। সে অধিকার তোর আছে। কিন্তু তাই বলে যে'টুকু আচার নন্তু হাতে খাবলে নিয়েছিল, সে'টাও ওকে ফেরত দিতে বাধ্য করলি? আচার আক্রমণ করতে গিয়ে বন্দী হয়েছে, তাই বলে এমন ইনসাল্ট? আর তার চেয়েও বড় কথা..সে খবরটা তুই নন্তুর মেজকার কানে তুলতে গেলি রে?

- আমার কোনো উপায় ছিল না পুলুদা। পিসি এমন কড়া সুরে বললে...।

- শাট আপ! অক্টোবরে চিলেকোঠা কনভেনশনে স্পষ্ট বলা আছে আচার এবং আম চুরি অভিযানে কেউ বন্দী হলে তাকে অকুস্থল থেকে বের করে দেওয়া হবে ঠিকই কিন্তু তার হাত থেকে আচার বা আম কেড়ে নেওয়া কিছুতেই চলবে না। আর গার্জেনের কাছে কম্পলেইন তো নৈবচ। চিলেকোঠা কনভেনশনের কাগজে পাড়ার আরো চুয়ান্নটা ছেলের সঙ্গে তুই সই করিসনি? সেই চিলেকোঠা কনভেনশনের ডেক্লারেশনের প্রিয়াম্বেলে কি স্পষ্ট ভাবে লেখা ছিল না যে পাড়ার সীমানার মধ্যে কেউ সেই ডেক্লারেশনের বেয়াল্লিশটা ক্লজের খেলাপ করবে না? ক্লজ নম্বর তিনের সাবসেকশন ছয় বেমালুম ভুলে মেরে দিলি রে ব্যাটা কুইসলিং?

- মানছি ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু সে'টা পিসির চাপে বাধ্য হয়ে। তুমি আমার পিসিকে চেনো না পুলুদা! আমার বাবা অমন জাঁদরেল উকিল, কিন্তু পিসি একবার 'ভোম্বল' বলে ডাকলেই বাবা লেবুজল ভেজানো গলায় মিউমিউ করেন।

- চাপ সবারই থাকে চাঁদু। নন্তুর চাপ নেই? নন্তুর ওই মেগা-অসুর মার্কা মেজকার কাছে জ্যামিতি শেখে; রোজ এক ঘণ্টা করে। সেই এক এক ঘণ্টা এক একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মত। কিন্তু তাই বলে চিলেকোঠা কনভেনশনকে কাঁচকলা দেখাবে সে? আর আমি সে'টা হতে দেব ভেবেছিস? আমাকে কি সাধে কেউ কেউ ইউএন-দাদা বলে ডাকে রে? আমার দায়িত্বজ্ঞান নেই?

- তুমি ইউএন? ছাই! তুমি নিজের ধান্দায় থাকো, যে তোমায় তেল দেবে তুমি তারই দলে।  নন্তু নিশ্চয়ই তোমায় হাত করেছে।

- শাট আপ বিলু! শাট আপ! কনভেনশন ডকে তুলে আবার গলাবাজি? তুই জানিস কনভেনশনের অ্যানেক্সচার থেকে সতেরো নম্বর ক্লজ ইনভোক করে আমি তোকে আগামী এক মাসের জন্য পাড়ার ক্রিকেট টীম থেকে বের করে দিতে পারি? সে'সব স্যাংশন ঘাড়ে চাপলে তোর কী দশা হবে ভেবেছিস?

- পুলুদা! পুলুদা গো। এ'বারের মত ম্যানেজ করে দাও প্লীজ। প্লীজ। সবে ব্যাট হাতে একটু ফর্মে এসেছি। ম্যানেজ দাও, প্লীজ।

- ম্যানেজ করব? বাহ্, সে'টাই করি আর কী; ম্যানেজ। আজ তুই এ'টা করলি, কাল কেউ চিলেকোঠা কনভেনশনের বাইশ নম্বর ক্লজ লঙ্ঘন করে অন্যের প্রেমিকাকে গোপন চিঠি দেবে। পরশু কেউ উনচল্লিশ নম্বর ক্লজকে পাশ কাটিয়ে পাশের পাড়ার ছেলেদের পিকনিকে চাঁদা দিয়ে মাংস ভাত খেতে যাবে হ্যাংলাচন্দ্র হয়ে। গোটা পাড়া গোল্লায় যাক আর এ'দিকে আমি বসে ম্যানেজ করি। তাই না?

- পুলুদা! গত ম্যাচেই হাফ সেঞ্চুরি করেছি, এমতাবস্থায় আমায় বাদ দেবে? তাও ওই নন্তুর জন্য? নন্তু যে তোমার নামে কেচ্ছা রটায় পুলুদা। সেদিনের ম্যাচে তুমি ক্যাচ ফেলার পর কী বলছিল জানো ব্যাটা নন্তু? বলে পুলুদার নাম ইউএন কেন? কারণ সে ইউজলেস নিনকমপুপ। আর তাই শুনে সবার সে কী অট্টহাসি। আমি শুধু মুখ গোমড়া করে এককোণে বসেছিলাম। মা কালী বলছি।

- চিলেকোঠা কনভেনশনের  বেয়াল্লিশ নম্বর ক্লজটা নন্তু ভুলে গেছে বোধ হয়। পুলু মল্লিকের কথাই শেষ কথা।  তোকে একটা চান্স আমি দেবো! কিন্তু একটা শর্তে। তোর পিসির চালতার আচার দু'শো গ্রাম আমার চাই। পারবি?

- খুব পারব।

- বেশ তা'হলে স্যাংশন মাফ। কিন্তু আচার ট্রান্সফার ঘটবে গোপনে। মিডিয়ায় বাইট দিয়ে ব্যাপারটা ছড়িয়ে ফেলো না যেন বিলুকুমার। যাক গে! আমি যাই এখন, নন্তুর মেজকার কাছে গোপনে নন্তুর বিড়ি খাওয়া নিয়ে একটা গুজব ট্রান্সফার করতে হবে।

Tuesday, February 26, 2019

যুদ্ধটুদ্ধ


কিছু বই শুরু করে ফাঁপরে পড়তে হয়। এই যেমন উইলিয়াম শিরার সাহেবের লেখা দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ থার্ড রাইখ; আ হিস্ট্রি অফ নাজি জার্মানি। এ মলাট থেকে ও মলাটের মধ্যে অর্ধেক রাশিয়া ঢুকে যায়; এমন সাইজ সে বইয়ের। বইয়ের এক-চতুর্থাংশই পড়া হয়েছে, কাজেই এ বই সম্বন্ধে বিশদভাবে লেখা মুশকিল। শিরার সাহেবের একটা গোলমেলে দিক হচ্ছে তিনি বেশ সোজাসুজি ভাবে হোমোসেক্সুয়ালিটির বিরুদ্ধে; তাঁর লেখায় সে বায়াসের আভাস মাঝেমধ্যে ফুটে উঠেছে। তবে বইয়ের গুরুত্ব অন্য জায়গায়, নাৎসি জার্মানীর শুরুর দিনগুলো থেকে  দুর্দান্ত ডিটেলে লেখা হয়েছে, কোট করা হয়েছে প্রচুর জরুরী দলিল দস্তাবেজ এবং কাগজপত্র। আগ্রহীদের জন্য এ বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।

যতটুকু পড়েছি, তা'তে দু'টো ব্যাপার বেশ ইন্টারেস্টিং।

এক নম্বর।
যুদ্ধ থেকে যেনতেন প্রকারেণ গা বাঁচাতে গিয়ে অনেক সময় অনেক দেশ এবং নেতা আরো ভয়াবহ বিপদ এবং খুনোখুনির অন্ধকার ডেকে এনেছেন। ভার্সেই চুক্তিকে হেলায় পাশ কাটিয়ে যখন নাৎসিবাহিনী রাইনল্যান্ডে ঢুকে পড়ে, তখন নাকি জার্মানি কিছুতেই পালটা আঘাত হজম করার পরিস্থিতিতে ছিল না। কিন্তু যুদ্ধবিগ্রহের ঝামেলা থেকে গা বাঁচাতে চুপটি করে বসে রইল ফ্রান্স। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিনও স্পীকটি নট। সে'ভাবেই বেদখল হল অস্ট্রিয়া। এরপর হিটলারের দুঃসাহস আরো মজবুত হল, নজর গিয়ে পড়ল চেকোস্লোভাকিয়ার ওপর। গায়ে পড়া ভালোমানুষির নেশায় চেম্বারলিন সাহেব উঠেপড়ে লাগলেন হিটলারকে তোয়াজ করে যুদ্ধ আটকাতে। প্রায় নিজেই মধ্যস্ততা করে অসহায় চেকোস্লোভাকিয়াকে হিটলারের শ্রীচরণে নিবেদন করলেন, ফের চুপ থাকলে ফ্রান্স। ইতিহাস বলছে তখনও যদি হিটলারকে সম্মুখসমরে আটকানো হত; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দিব্যি রুখে দেওয়া যেত। কাজেই  যুদ্ধের কথা শুনলেই কানে তুলো গুঁজতে হলে মুশকিল; চেম্বারলিন সাহেব তা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন।

দু'নম্বর।
যুদ্ধ ভয়াবহই। আত্মরক্ষার খাতিরে যুদ্ধের প্রয়োজন পড়ে, তেমনই দেশের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন দেশের এবং দশের সমর্থন; নয়ত তারা প্রাণপণ লড়বেন কী'ভাবে? কিন্তু এই প্রয়োজনের খাতিরে যুদ্ধ ও তার সমর্থন যাতে যুদ্ধ-যুদ্ধ নেশার উদ্রেক না করে, সে ব্যাপারে সচেতন হওয়াও জরুরী।  সামরিক প্রয়োজন অতি সহজে সামরিক জিগিরে পরিণত হতে পারে; ইতিহাসে তার অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। সে জিগির যে কী খতরনাক হতে পারে তা টের পেয়েছিল জার্মানরা। প্রয়োজনের যুদ্ধ অচিরেই পরিণত হয়েছিল খুনে আগ্রাসী হুঙ্কারে।  প্রসঙ্গত,  মহাভারতে কৃষ্ণ বলেছেন প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেই হবে। কিন্তু যুদ্ধ যে ফুর্তি আর সেলিব্রেশনের ব্যাপার; তেমন কোনো হিন্ট তিনি সম্ভবত ড্রপ করেননি।

যা হোক, এ বইটা শেষ করা দরকার। যে গতিতে পড়ছি (শুনছি), মার্চের আগে শেষ করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।

Saturday, February 23, 2019

বটু গোয়েন্দার বিশ্বাসঘাতকতা


- কী ব্যাপার? আপনি জেল পর্যন্ত ছুটে এলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে? এখন বোধ হয় কাটা ঘায়ে নুন ছড়াতে এসেছেন। তাই না বটুবাবু?

- না সামন্তবাবু।

- আমি আপনার সঙ্গে আর দেখা করতে চাইনা। আপনি আসুন।

- আমাদের আরো মিনিট পাঁচেক সময় আছে। থাকুন না, তারপর না হয়ে সেলে যাবেন। দু'টো কথা ছিল। দারোগাবাবুকে অনেক রিকুয়েস্ট করে আপনার সঙ্গে দেখা করতে হয়েছে।

- আপনি একজন অপদার্থ বটু গোয়েন্দা! আপনি একটা কাগুজে বাঘ। আপনাকে ভরসা করে যে আমি কী ভুল করেছি...।

- আই অ্যাম সরি মিস্টার সামন্ত।

- সরি? সরি বলে কী হবে? দেখুন, এই যে। আমার হাতে হাতকড়া।  আমি নিজের ছেলের খুনের দায়ে জেলে এসেছি। নিজের অসহায় হুইলচেয়ারে আটক ছেলেটা চোখের সামনে  মরে গেল, ট্রাকটা ওকে পিষে দিল...আর সবাই ভাবল আমিই...। ছিঃ! জেলে পচতে কষ্ট নেই, কিন্তু এ ভার নিয়ে বাঁচব কী করে বটুবাবু? আর আমার দুরাশা দেখুন। আমি আপনার ওপর ভরসা করেছিলাম।

- আমি জানি যারা আপনাকে হুইলচেয়ারকে ট্রাকের সামনে ঠেলতে দেখেছিল তাঁরা ভুল বলছিল। আমি জানি সামন্তবাবু।

- থামুন! আপনার জানায় আমার লাভটা কী হল? প্রমাণ করতে পারলেন না। অথচ আপনি নাকি ধন্বন্তরি! আপনি একটা ভণ্ড বাতেলাবাজ শুধু।

- আমি সত্যিই দুঃখিত সামন্তবাবু। ঘটনার তিনজন সাক্ষী বলেছে যে তাঁরা দেখেছে যে আপনি আপনার ছেলের হুইলচেয়ার চলন্ত  ট্রাকের চাকার সামনে ঠেলে দিচ্ছেন। অথচ আপনি আদতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়ে রিফ্লেক্সে বাবলুর হুইলচেয়ার ধরতে গিয়ে তা হাত ফস্কে তা ঠেলে দেন, দূর থেকে দেখে যাই মনে হোক; তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত।

- এ'টা আমি জানি। আর কেউ তা জানে না। তারা শুধু জানে আমি আমার পঙ্গু ছেলের দায়ভার থেকে মুক্তি পেতে চাওয়া একজন জানোয়ার। আপনার কাজ ছিল সে'টা ভুল প্রমাণ করার। সে'দিন আমি রাস্তার শ্যাওলায় পিছলে গেছিলাম...। বার বার বলেছি।

- অথচ আপনার সে'দিন পরা জুতোর সোলে শ্যাওলার সামান্য দাগটুকুও নেই।

- আর কতবার বলব আমি জানিনা তা কেন নেই...। তাই তো আমি আপনাকে এনগেজ করেছিলাম বটুবাবু! আমি ভুল করেছিলাম...আমি বুঝিনি যে আপনি পারবে না!

- এ'টুকু অন্তত বুঝেছি যে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা পরিষ্কার করে সে জুতো ফের রাস্তায় ঘষে নেওয়া হয়েছিল। প্রমাণ এ'দিক ও'দিক করে আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে।

- মানে? হোয়াট ডু ইউ মীন? এ'সব এখন কী বলছেন?

- আপনার জুতো থেকে শ্যাওলার দাগ তুলে ফেলে রাস্তার পিচে ফের ঘষে নিয়েছেন কেউ। দুর্ঘটনা ঘটে বিনোদ দত্ত স্ট্রিটে; সেখানে সদ্য সারাইয়ের কাজ হয়েছে, সে রাস্তার বিটুমেন এখনও সামান্য তাজা। দুর্ঘটনার পর সেই স্পট থেকেই আপনি সোজা অ্যাম্বুলেন্সে করে আপনার বাড়ির বাঁধানো উঠোনে এসে নামেন। ফেরার পর থেকে আর সে জুতো পরেননি। অথচ আপনার জুতো সোলে শ্যাওলার দাগ তো নেই বরং বিনোদ দত্ত স্ট্রিটের তাজা বিটুমেনের ওপর বহু পুরনো বিটুমেনের ছোঁয়া। অর্থাৎ কেউ সাবধানে আপনার জুতোর তল থেকে শ্যাওলা সাফ করে তা রাস্তায় ঘষে নিয়েছে, যাতে মনে হয় আপনি শ্যাওলায় পা ফেলেননি আদৌ।

- মাই গড বটুবাবু! এ'সব আপনি এখন কেন বলছেন? আপনি জানেন কে এমন করেছে? আমার এমন সর্বনাশ কে চাইতে পারে?

- সামন্তবাবু, বাবলুর রক্তাক্ত দেহটা আপনি তার মায়ের কোলে তুলে দিয়েছিলেন। বাবলুর রক্ত মাখা সে শাড়ি মিসেস সামন্ত যত্নে তুলে রেখেছেন। কিন্তু সে শাড়ি আপাতত কিছুদিন আমি নিজের হেপাজতে রেখেছি।

- আপনি কী পাগলের প্রলাপ বকছেন আমি কিছুই...।

- সে শাড়ির পরিষ্কার দিক দিয়েই দিয়েই মিসেস সামন্ত আপনার জুতোর সোল থেকে শ্যাওলা মুছেছেন। সে দাগ আমার নজরে পড়েছে, আর পুলিশ যাতে সে শাড়ি নিয়ে গবেষণা শুরু না করে তার জন্যই তা আমি সরিয়ে নিজের কাছে রেখেছি কিছুদিন। জুতোর তলার বিটুমেন আর ধুলো দিয়েও আমি প্রমাণ করে দিতে পারতাম মিসেস সামন্তর অপরাধ।

- মিনু! শেষ পর্যন্ত মিনু...।

- সরি সামন্তবাবু, মক্কেলের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে না পারা আমার কাছে যন্ত্রণার। কিন্তু বাবলুকে আপনি ট্রাকের তলে ঠেলে না দিলেও খুন আপনি করেছেন। আপনার শাস্তিটা দরকারি ছিল, অন্তত মিসেস সামন্ত তা'তে খানিকটা শান্তি পাবেন।

- এ'সব কী? কেন? মিনু এমন কেন করতে গেল?

- আমেরিকায় বারো বছর কাটিয়ে ফিরেছিলেন আপনি মিস্টার সামন্ত। সে'খানেই আপনি ভিড়ে যান অ্যান্টি-ভ্যাক্স ব্রিগেডে। মিসেস সামন্তর কাকুতিমিনতি সত্ত্বেও আপনি বাবলুকে পোলিওর টীকা নিতে দেননি। বাবলুর তো সে'দিন হুইলচেয়ারে থাকারই কথা নয় মিস্টার সামন্ত। তাকে ঠেলে ট্রাকের তলে আপনি পাঠাননি, কিন্তু বাবলুর খুনের দায় যে আপনাকে নিতেই হবে মিস্টার সামন্ত। আই অ্যাম সরি, কিন্তু এ'টা আমায় করতেই হত।

- বটুবাবু...প্লীজ...।

- আমি আজ আসি।

অস্ত্র


- মহারাজ!

- সঙের মত দাঁড়িয়ে না থেকে খবরটা বলো!

- ওদের অ্যান্টিডোট...।

- তা'তে কী? সে অ্যান্টিডোটে কী হয়েছে মন্ত্রী?

- আমাদের যন্তরমন্তর ঘরের জাদুর প্রভাব কাটিয়ে দেওয়া যাচ্ছে তা'তে!

- বটে?

- আজ্ঞে!

- এ তোমার মনের ভুল নয়ত?

- হাজার হাজার শ্রমিক চাষি গরীব প্রজা জটলা পাকাচ্ছে মহারাজ। এক দু'দিনের মধ্যেই হয়ত কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাবে...। সেনাবাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ।  কাজেই...।

- বৈজ্ঞানিক কী বলছে?

- সে পালিয়েছে!

- তার ব্যবস্থা আমি করব। তার চামড়া তুলে গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে ভাজাভাজা না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। কিন্তু তার আগে বজ্জাত প্রজাগুলোর একটা ব্যবস্থা করতেই হয়।

- যন্তরমন্তর ঘরই যখন বিকল তখন আর উপায় কী!

- থামো! যত ন্যাকাচন্দ্রের দল জুটেছে মন্ত্রীসভায়। প্রজাদের ওপর আদত অস্ত্র প্রয়োগ করার সময় এসেছে।

- আজ্ঞে?

- নেকু সেজে থেকো না। আদত অস্ত্র। যার কাছে যন্তরমন্তর ফিকে।

- আদত অস্ত্র!

- বুঝেছ তা'হলে।

- মহারাজ! এ যে যন্তরমন্তরের চেয়েও পাশবিক।  মহারাজ, একটিবার ভেবে দেখুন...।

- তুমি চাও আমি তোমায় কোতল করি?

- মাফ করুন রাজন, কিন্তু..।

- কোনো কিন্তু নেই...কালেই দেশের সমস্ত ঘরে টেলিভিশনে পৌঁছে দাও, পৌঁছে দাও আমাদের নিউজচ্যানেল; আমাদের আদত অস্ত্র!