Sunday, October 26, 2014

বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস

-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   হুঁ?
-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   এই বড়িটার নাম?
-   আমার দেওয়া। লাতিন, প্রাচীন ইজীপ্সিয়, আধ-পুরনো জার্মান আর ইনকা মেশানো নাম।
-   মানে?
-   কাঁচকলা।
-   কাঁচ...?
-   কলা।
-   এ বড়ি খেলে হবে কি ?
-   কাঁচকলা।
-   অর্থাৎ?
-   কিস্যু না। তাই কাঁচকলা।
-   স্বাদ?
-   স্বাদহীন।
-   তবে লোকে এটা খাবে কেন?
-   দুনিয়ায় কত বড়ি- ঘুমের বড়ি, সায়ানাইডের বড়ি,গর্ভ নিরোধক বড়ি, হজমি বড়ি। সব বড়িতেই কিছু না কিছু হয়। এই আমার আবিষ্কৃত বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিসই প্রথম বড়ি যা খেলে কিস্যুটি হয় না। ভালো মন্দ কিস্যু না। এক্কেবারে নিরেট কাঁচকলা। উপকারও নেই, ক্ষতিও নেই। মধ্যম পথ। বুদ্ধ বেঁচে থাকলে নিজে এনডোর্স করতেন। উকিলবাবু,আপনাকে হেল্প করতেই হবে।
-   হেল্প? আমি ? মানে আপনি এই বেলু বড়ি কে পেটেন্ট করাতে চাইছেন ডক্টর সামন্ত?
-   বেলু বড়ি নয় উকিলবাবু। বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস। ট্যাগলাইনও ভেবেছি। বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস- দ্য কাঁচকলা বড়ি।  কেমন দাঁড়িয়েছে? কী?
-   ধুর কাঁচকলা। এ বড়ি কেউ গিলবে কেন?
-   দরকারি নয়, অদরকারিও নয়। এমন জিনিষ দুনিয়ায় কটা আছে উকিলবাবু? উদাহারণ দিন দেখি।
-   ঢের আছে।
-   এনি টু এগজাম্পেলস্‌ প্লীজ।
-   এই যে রাস্তার গাছপালা...
-   কী বলছেন মশাই ? অক্সিজেন দিচ্ছে যে।
-   রাস্তার পাথর?
-   কোনওদিন হোঁচট খাননি?
-   যাক গে। বাদ দিন। ফর্ম এনে দেব কালকে। আপনি ভরে দিয়ে দেবেন। অ্যাপ্লাই করে দেখা যাক।

***

-   ডক্টর সামন্ত।
-   ইয়েস ইওর এক্সেলেন্সি...আই মিন হিজ হাইনেস...আই মিন...
-   প্রাইম মিনিস্টার। পিএম বললেই হবে।
-   ইয়েস জাঁহাপনা। আই মিন ইয়েস। ইয়েস। ইয়েস প্রাইম এক্সেলেন্সি।
-   আপনার বড়ি। ওই বেলুস্পি...স্পি...
-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   ওই পেটেন্ট ভারত সরকার অধিগ্রহণ করতে চায়।
-   পেটেন্ট অধিগ্রহণ?
-   ভারতবর্ষ শুধু নয়, আপনার এই বড়ির চাহিদা বিশ্বজুড়ে আগুনের মত ছড়িয়েছে। নির্গুণ এই বড়ির জন্যে লোকে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনার ওই ডানকুনির ছোট্ট কারখানার ক্যাপাসিটি আর কতদূর ?১০০% নির্গুণ এই বড়ি মুখে দিয়ে মানুষ নিরন্তর সময় কাটাচ্ছে; অটো-বাসের লাইনে, সেলুনে রবিবারের ভিড়ে। সেলফোনে ব্যাটারি না থাকলে বড়ি চুষতে চুষতে অপেক্ষা করছে কখন ফোন চার্জ হওয়া শেষ হবে।এমনকি বৈজ্ঞানিক থেকে মন্ত্রী-আমলা; দৈনিক কর্মব্যস্ততার মাঝে সবার জন্যেই জরুরি হয়ে পড়েছে এই বড়ি মুখে দিয়ে একটু জিরিয়ে নেওয়া। জিভও সচল থাকছে, অথচ স্বাদের ঢেউ গিয়ে মগজকে বিব্রত করছে না। বা অস্বাস্থ্যকর খাদ্যকণাও  কিছু রক্তে গিয়ে মিশছে না।
-   সে তো বুঝলাম কিন্তু আমি...
-   এর ডিমান্ড আর শুধু এ দেশে আটকে নেই ডক্টর সামন্ত । আমেরিকা ইউরোপ অস্ট্রেলিয়া থেকে টন টন বড়ির ডিম্যান্ড আসছে এ দেশে। অথচ পেটেন্ট শুধু আপনার আছে বলে যথেষ্ট পরিমাণে প্রোডাকশন নেই। ফলত অনেক পাইরেটেড বড়ি ফ্যাক্টরি গজিয়ে উঠেছে।
-   বলেন কি স্যার ?
-   রিয়েলি। আমাদের ইন্টেলিজেন্স তাই বলছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিজে আমায় ফোন করে জানিয়েছেন এ বড়ির উৎপাদন সরকারি ছত্রছায়ায় শুরু করতে পারলে খোদ আমেরিকা থেকে প্রতি মাসে তারা টনটন আমদানি করতে রাজি আছে এই বেলু...বেলু...
-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   আম...আমে...আমে...
-   আমেরিকা। ইয়েস।
-   একটু জল স্যার।
-   জল পরে খেলেও হবে। আগে শুনুন। ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় রপ্তানির আধার হতে পারে আপনার এই বড়ি। আপনি এ বড়িকে ওই ডানকুনিতে আটকে রাখবেন না।
-   আমি...? আটকে?
-   শুনুন। এই বেলু...বেলু...
-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   হ্যাঁ এই বড়ি এবার থেকে ভারত সরকার ম্যানুফাকচার করবে। আপনি পাবেন রয়্যালটি। অবিশ্যি তাতেই আপনি কোটিপতি বনে যাবেন মাসখানেকের মধ্যে।
-   ক্রোড়?
-   অফ কোর্স। যাক গে। আমি বেঙ্গল সি-এম’কে বলে দিয়েছি। ও আপনার সঙ্গে কোওরডিনেট করে নেবে। ওকে?

***

ডাক্তার সামন্ত সুইসাইড পয়েন্টে এসে যখন দাঁড়ালেন তখন বিকেল পাঁচটা। উলটো দিকে প্যান্ডিমের চুড়োর গায়ে লালচে গোলাপি মেশানো সন্ধ্যের আভা। পকেট থেকে বেণীমাধবের হাফ পঞ্জিকাটা বের করে কনফার্ম করে নিলেন; আদর্শ সময় বিকেল পাঁচটা বেজে নয় মিনিট।
হু হু করে হিমেল হাওয়া এসে কানে ঠেকছিল। মাফলারটা ভালো করে গলা কান দিয়ে পেঁচিয়ে নিলেন। দীর্ঘশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল তার বুকে। কী কুক্ষণেই না বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস আবিষ্কার করতে গেছিলেন তিনি। কেনই বা পেটেন্ট করে ডানকুনির ফ্যাক্টরিতে বানানো শুরু করলেন। কেনই বা প্রধানমন্ত্রীর কথায় নেচে বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস রপ্তানিতে সম্মত হলেন।কেনই বা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এমন বড়ি রাক্ষুসে পরিমাণে আমদানি করার নির্দেশ দিলেন। নির্গুণ কোন কিছুর ওপর যে মানুষের এমন অপরিসীম মোহ থাকতে পারে তা ভাবতেই পারেননি ডাক্তার সামন্ত। সার বুঝ বুঝেছিলেন সিদ্ধার্থ। আর ঠেকে শিখলেন ডাক্তার সামন্ত।
কিন্তু সব শেষ।মানুষ ভালো খারাপের দ্বন্দ্বে এমন বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল যে নির্গুণ এই বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস কে পেয়ে তারা স্রেফ উন্মাদ হয়ে গেল। পাঁচ বছরের  মাথায় পৃথিবীর সত্তর শতাংশ সম্পদকে ভিড়িয়ে দেওয়া হল বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস উৎপাদনে। একদিকে যেমন উপকার হল যুদ্ধ সরঞ্জামের উৎপাদন কমে গিয়ে, অন্য দিকে মানুষের পাগলামি বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছল যে ক্রমশ জরুরি জিনিষপত্র বাদ দিয়ে শুরু হল বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস উৎপাদন। লোহার কারখানা বন্ধ হয়ে শুরু হল বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস কারখানা, আবাদযোগ্য জমিতে তৈরি হল নতুন বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস কারখানা। দশ হাজার বছরের ভালো-খারাপের ইতিহাসে মানুষ এতটাই বিরক্ত হয়ে পড়েছিল যে নির্গুণ বড়ি বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিসের বাণিজ্যিক আত্মপ্রকাশের পর থেকেই মানুষ এই কাঁচকলা বড়ির জন্য উন্মত্ত হয়ে পড়লো। কিন্তু সমস্ত সম্পদ নির্গুণ উৎপাদনে ঠেলে দেওয়ায় যা হওয়ার তাই হল। যুদ্ধও এক ধরনের ইকনমি, কিন্তু নির্গুণ বড়ি উৎপাদন যে ধ্বংস, তা মানুষ বুঝেও বুঝতে চাইলে না। পাঁচ বছরের মাথায় শুরু হল খাদ্যাভাব। সে অভাব প্রচণ্ড- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়; সমস্ত বিশ্বের ব্যবধান গেল ঘুচে।
গত দেড় বছরে পৃথিবীতে একশো তেরো কোটি লোক আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিসের একটা কারখানাও বন্ধ হয়নি। ইন ফ্যাক্ট আত্মহত্যাকে বরং পৃথিবীর সমস্ত দেশেই সাংবিধানিক মান্যতা দেওয়া হয়েছে। এ আর তেমন তাবড় কিছু নয়। এই ভারতবর্ষেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সরকারি সুইসাইড পয়েন্ট। এবং তার সবকটাই রমরমিয়ে চলেছে। ভারতবর্ষের জনসংখ্যা এখন বাহাত্তর কোটিতে এসে ঠেকেছে।
মানবসভ্যতার এমন ফিচেল আত্মসমর্পণ ভাবা যায় না। আর ডাক্তার সামন্ত জানেন দোষ অনেকটাই তার হুজুগের। ঘড়ির দিকে তাকালেন। পাঁচটা নয় বাজতে আর তিরিশ সেকেন্ড।

***

-   এজেন্ট বিস্প ?
-   হুঁ?
-   এজেন্ট বিস্প? আমাদের কথা শুনতে পারছেন ?
-   আমি ? আমি কোথায়?
-   আপনি এস্‌লনে ফেরত এসেছেন এজেন্ট বিস্প।
-   মিশন ?
-   সম্পূর্ণ সফল। আপনার কি কিছুই মনে নেই?
-   পৃথিবীর মানুষ হয়ে পৃথিবীতে ল্যান্ড করার পর থেকেই আমার মেমরি ওয়াইপ্‌ড আউট ছিল। আমি অটো পাইলটে ছিলাম, জানেনই তো।
-   পৃথিবীতে আপনার লোকাল কোড নেম কী ছিল সেটা মনে আছে এজেন্ট বিস্প?
-   সেটুকু আছে। ডাক্তার সামন্ত, তাই না?
-   ঠিক।
-   মিশন কি অবস্থায় রয়েছে?
-   গণ-আত্মহত্যার যে বহর আপনি সেখানে শুরু করে দিয়ে এসেছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর বুক থেকে মানুষ প্রায় গায়েব হয়ে যাবে। তখন আর আমাদের সকলের সেখানে চলে যাওয়ায় কোন বাধা থাকবে না। সেটা তখন আমাদেরই গ্রহ হবে। পৃথিবীর নাম পাল্টে রাখা হবে এস্‌লন-২।
-   বটে। কাঁচকলার বড়ির কী গুণ। কি নাম যেন দিয়েছিলাম তার? কি বেলা...বেলি...বেলু...বেলুসি...বেলু কি যেন ?
-   বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস।
-   তাই তো। তাই তো। বেলুবিস্লিপুনিকাস্পেনিস। আচ্ছা। আমি ছাড়াও আরও দুজন এজেন্ট এই মিশনের কাজে পৃথিবীতে গেছিল না? এজেন্ট ম্রিল আর এজেন্ট  ইস্পের? তারা সেখানে কি  ভূমিকায় ছিল?
-   ও আপনি তো টের পাননি না। তারা দুজনেও এখন ফিরে এসেছেন। এজেন্ট ম্রিল ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আর এজেন্ট ইস্পের ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায়। আর কথা নয় এজেন্ট বিস্প। আপনার ওপর দিয়ে বিস্তর ধকল গেছে। এখন বিশ্রাম করুন।  





Thursday, October 16, 2014

পাঁচটি মৃদু গল্প

একদিন হয়েছে কি, সল্টেড বাদামের প্যাকেটটা সবে দাঁতে ছিঁড়ে; দু চার পিস বাদাম মুখে ঢেলেছি।  
আচমকা টের পেলাম আমি বাদাম দিয়ে দাঁত চেবাচ্ছি।

**
শুনুন না, আরেকটা ঘটনা। সেদিন মুড়িঘণ্ট দিয়ে আধথালা ভাত গিলে ল্যাজায় কামড় বসাতে যাব-অমনি পেট থেকে আওয়াজ এলো-   "ওরে, আগে পেটিটা পাঠা'।

**
কত মজার ঘটনা আছে। সেবার যেমন পুরী গিয়ে নিয়মিত পুরির গায়ে টমেটো পিউরি মাখিয়ে খাওয়া দাওয়া করা।

**

আর একটা বলি। প্লিজ। শুনুন না। সেদিন হয়েছে কি অফিসে টিফিনে পাউরুটি নিয়ে গেছি এদিকে মাখন লাগাতে গেছি ভুলে।  সোজা বসকে বললাম "দু চামচ ফেরত দিন দেখি"।

**
আরো আছে।কত সব অ্যাডভেঞ্চার। সাহারায় যেবার গেলাম সর্ষে নিয়ে। সঙ্গের উটবাবাজীটিকে রৌদ্রে ভাপা-ক্যাক্টাস খাওয়াতেই সে আমার কেনা ছাগল বনে গেল।

**

Saturday, October 11, 2014

নিত্যযাত্রী

" কেউ ক্রিকেট খেলেন, কেউ রাইটার্সে ফাইল-বাজি করেন, কেউ গীটার বাজিয়ে আহা-উঁহু করেন, কেউ ভোটে দাঁড়ান, কেউ টিউশনি পড়ান। আমি করি ডেলি-প্যাসেঞ্জারি। ওইটাই হল আমার প্রফেশন বুঝলেন", সন্ধ্যে ছটা দশের আপ বর্ধমান লোকালে সদ্য আলাপ হওয়া দিলীপবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আলাপের শুরু খবরের কাগজ আদান-প্রদান দিয়ে। দিলীপবাবুর কোথায় না হেসে পারলাম না।
- " হাসছেন দাদা ?", পকেটের রুমাল বের করে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন দিলীপবাবু, " আরে মশাই , " আমার তো মনে হয় মেমারি টু হাওড়াতেই জীবন বয়ে যাচ্ছে। সকালে দু বালতি জলে স্নান আর চাট্টি ডাল-ভাত, অফিসে দুটো ফাইল আর ওপরওয়ালার খিস্তি। ওদিকে বাড়ি ফিরে বাচ্চার ঘ্যান-ঘ্যান, গিন্নীর বায়না আর টেলিভিশনে গুলতানি। এ সব তো হুশ করে হাপিশ হয়ে যায়; কিন্তু প্রত্যেক দিন যেটা রয়ে যায় সেটা হচ্ছে সাড়ে দিন ঘণ্টার ট্রেন ঘষটানি। বুঝলেন ?"
- " বুঝলাম", বলতেই হল।
- " নো স্যার। বোঝা অত সহজ নয়। গত তেইশ বছর ধরে; ঝরে-জলে-রোদ্দুরে এই বর্ধমান লোকালের ঠিক এই কামরাটিতেই আমার দৈনিক সাড়ে তিন ঘণ্টা কাটে। এইটে হল আমার ড্রয়িং রুম; খবরের কাগজ পড়বার সোফা হচ্ছে এই কাঠের সিট। ক্লাবও বলতে পারেন- টুয়েন্টি-নাইন টু রামিও এইখানেই চলে। এইখানে আমার সোশ্যালিজম'য়ে হাতেখড়ি। কি ভাবে ? গত পনেরো বছর ধরে আমার ফিক্সড টুয়েন্টি নাইন পার্টনার হচ্ছে পল্টু- গড়িয়াহাটের মাছ-ওয়ালা। আর রামি'র পার্টনার হলে গিয়ে বড়বাজারের লোহার-কারবারি দেবকুমার দেব; হুগলী বর্ধমান মিলে যার একশো বিঘের ওপর জমি রয়েছে। তারপর ধরুন আমার ইয়ার-দোস্ত বলতে যারা সবাই ডেলি-প্যাসেঞ্জার। এই কামরাটাই আমার রক। সাহেব-সুবো'দের মত শরীর চাঙ্গা রাখতে আমায় জিমে ছুটতে হয় না; রোজকার ট্রেন-জার্নিতেই মেদ-টেদ ফস করে উড়ে যায়। আর নিজস্ব রুচি-টুচি গেছে বেদম চটকে"
- " রুচি চটকে গেছে মানে ?", গপ্প শুনতে মন্দ লাগছিলো না।
- " মানে এই ধরুন আলুর দমের থেকে সল্টেড বাদামে বেশি স্বাদ পাই। আমার শালাবাবু আসামের টী-এস্টেটের ম্যানেজার- তাঁর দৌলতে বাড়িতে হামেশাই এস্যাম টী'র ডিবে আসে। কিন্তু ট্রেনে দুলুনি বা মাটির ভাঁড় ছাড়া আমার মুখে চা রোচেনা। তা ছাড়া একটা অতি সাঙ্ঘাতিক অভ্যাসের কবলে পড়েছি মশাই"
- " কেমন সাঙ্ঘাতিক ?"
- " দাঁড়িয়ে ঘুমোবার"
- " মানে ?"
- " মানে হাওড়া যাওয়ার সময় রোজই বিদঘুটে ভিড়। বসার আশা তো দূর একপায়ে দাঁড়াতে পারলে সুবিধে হয়।তা সেই বিদঘুটে সময়টা কাটাতে আমি বিগত কুড়ি বছর ধরে ঘুমিয়ে আসছি; দাঁড়িয়ে। এক হাতে ট্রেনের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে অফিস ব্যাগ আর চোখে ঘুম। ঝক্‌ঝকে আধ ঘণ্টা।
- " বলেন কি ? রোজ?"
- " ইয়েস স্যার। ইভেন অন সানডেইজ"
- " রোববারেও? কিন্তু রবিবার তো ছুটি ?"
- " আরে মশাই, জানি। কিন্তু অভ্যাস ভারি খতরনাক্‌ চিজ। দিনে আধ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে না ঘুমোলে আমার সুগার বেড়ে যায়, গা গুলোতে থাকে, মাথা ঝিম্‌ঝিম্‌ করে। অতএব, রবিবারগুলোতে যাতে কোনও ক্রাইসিস্‌ না হয়, তার জন্যে চিলে কোঠার ঘরের কড়িকাঠ থেকে একটা কাঠের হ্যান্ডেল ঝুলিয়ে নিয়েছি। স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো; অবিকল এই কামরায় যেমন ঝুলন্ত হ্যান্ডেলগুলো দেখছেন; সেরকম। প্রতি রবিবার সকাল আটটা সতেরো হলেই দু বালতি জলে স্নান সেরে অফিসের ব্যাগ হাতে সোজা চলে যাই চিলেকোঠার ঘরে আর তারপর হ্যান্ডেল ধরে আধ-ঘণ্টা বেধড়ক ঘুম। ব্যাস, রবিবারে নেমে আসে অপরূপ প্রশান্তি"

Thursday, October 9, 2014

খুচরো তফাৎ

কলেজ স্ট্রীটে ঘুর-ঘুর করছি সস্তায় পুরনো বই সটকাবার তালে। জুন মাসের বিকেল কিন্তু সদ্য বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় চনমনে হাওয়া বইছে। মেজাজ শরিফ। জলের দরে খান দুই গপ্পের বই ব্যাগস্থ করে ফেলেছি। ভাবলাম বই ঘাঁটাঘাঁটি আলতো থামিয়ে রেখে একটু চা-টা খেয়ে নেওয়া যাক। মেডিক্যাল কলেজের উল্টো দিকে; ফুটপাথের একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে বললাম- 

-“ এক কাপ চা আর একটা ডিম-টোস্ট”। 
আমার পাশে এক মাঝবয়স্ক ভদ্রলোক বসেছিলেন। আমার দিকে চেয়ে ভারি অমায়িক হাসলেন। হাসি ফেরত দিলাম।
ভদ্রলোক ভুরু নাচিয়ে বললেন “ ভায়া, এই যে আপনি ডিম-টোস্ট চাইলেন, আর দোকানি-ব্যাটা ঘাড় নেড়ে বললে ‘দিচ্ছি’, আপনি কিন্তু ঠকে গেলেন”
-“ মানে ?” ঘাবড়ে গেলাম।
-“ মানে  আপনি চাইলেন ডিম-টোস্ট, আপনাকে ও দেবে ডিম-রুটি
-“ তো ? তফাৎটা কি  তাতে ?”
- “ সে কি! তফাৎ নেই ?  ভ্যানিস আর হাপিশ কি এক ? কলকাতা আর ক্যালক্যাটা কি এক ? ইসবগুল আর জেলুসিল এক ?”
-“ না মানে বুঝলাম না ঠিক। ডিম-টোস্ট আর ডিম-রুটি এক নয় ?”
-“ আরে ভায়া ডিম-টোস্টে থাকবে চৌকো তুলতুলে পাউরুটি। আলতো আঁচে রিফাইন্‌ড অয়েলে ভাজা। মখমলে টেক্সচার। সখের পায়রা। টোটাল বুর্জোয়া মেটেরিয়াল। বোন-চায়নার প্লেটে সাজিয়ে; ইকনমিক টাইম্‌স পড়তে পড়তে খাওয়ার চিজ
।  
আর এইখানে আপনি পাবেন ডিম-রুটি। লম্বাটে পাউরুটি, পেছন-মোটা, খড়খড়ে। সেই মালকে সসপ্যানের মধ্যে ফেলে ডিমে-সর্ষের তেলে ভেজে নেওয়া; তারপর তা তোবড়ানো  ষ্টীলের প্লেটে রেখে, বিট-নুন ছড়িয়ে হাভাতের মত মুখে চালান করা। আদর্শ প্রলিটারিয়াট খানা।
এই দুই ব্যাপার কি এক ? যদি বলেন একই ব্যাপার; তবে তো বলতে হয় যে পাটালি আর ঝোলাগুড়ে কোনও ফারাক নেই, ইলিশ আর তেলাপিয়া ভাই-ভাই।”
-“ ইয়ে, তাহলে আমি ওই ডিম-রুটিই চাই, ডিম-টোস্ট বলা আমার ঘাট হয়েছে”
-“ অফ কোর্স ঘাট হয়েছে। আরে বাবা খিচুরি-এঁটো মুখে চিলেকোঠার চুমু আর হোয়াইট-ওয়াইনের গেলাস হাতে ফ্রেঞ্চ কিস কি এক বাত ? ম্যাকডোনাল্ডস’য়ের  ফ্রাইজ আর ঝুরো-আলু ভাজায় ফারাক নেই ?”
-“আমি সরি দাদা। এবার থামুন প্লিজ”
- “মুখে প্লিজ-মনে খিস্তি নয় তো ? সরি না দুঃখিত ?”

ডিম-টোস্ট; থুড়ি...ডিম-রুটি’র মায়া ত্যাগ করে বেঞ্চি ছেড়ে সরে পড়লাম।

পুজোর আট - ২০১৪

-   মহালয়া কি ডাইরেক্ট ক্যাচ করবেন বলে ঠিক করেছেন মিত্রবাবু?
-   কেন ?
-   না মানে অফিস রয়েছে কি না, অত ভোরে উঠলে আবার গোটা দিন গা-ম্যাজম্যাজ...বেলা বাড়লে বরং...আজকাল তো মহালয়ার সিডি পাওয়া যাচ্ছে
-   শুনুন মশাই, বাসি মহালয়া ইজ লাইক চালানি কাতলার ট্যালট্যালে ঝোল অমৃত আমার রুচবে না ভদ্রবাবু কাক ভোরে মেরুদণ্ডে পালক বুলিয়ে দেবেন, তবেই না থ্রিল

-   পুজোয় আমার আবার একটু বেড়িয়ে না আসলে চলে না মনটা আঁকুপাঁকু করে পাহাড়, সমুদ্র বা জঙ্গল নিদেন পক্ষে বোলপুরে গিয়ে চার দিন তা না হলে আমার চলে না, বুঝলেন কী না আপনার বোধ হয় তেমন বাতিক নেই, তাই না?
-   আমি ? পুজোয় আমার সমুদ্দুর বলতে খিচুড়ির বালতি, পাহাড় বলতে দুপুরের জগদ্দল ঘুম আর জঙ্গল বলতে পাড়ার মণ্ডপের ভিড়