Friday, May 6, 2016

শাসমলবাবুর কাণ্ড

- ডাক্তার, আমায় নিয়ে এ'সব কী শুরু করেছেন বলুন তো?
- এখনও কিছুই শুরু হয়নি শাসমলবাবু। এ তো কলির সন্ধ্যা। আগামীকাল ইউরোপিয়ান ভাষাবৈজ্ঞানিকদের দল আসছে আপনাকে দেখতে। আপনার সাথে কথা বলতে, আপনাকে স্টাডি করতে। পরশু আসছে জাপানীরা। আমি তো একপ্রকার নিশ্চিত, আমেরিকানরা এ হপ্তার মধ্যেই একটা টিম পাঠাবে। দুনিয়া জুড়ে আপনাকে নিয়ে একটা সেনসেশন তৈরি হয়ে গেছে। শেষ এমন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, আমার যদ্দুর মনে পড়ছে ফর্টি সিক্সে; যে'বার চাঁদে শিমুলগাছের চাষ করলেন জন ফোগার্ট।
- না মানে...সবাই একটু ইয়ে...ওভার রিয়্যাক্ট করছে না? ঘটনাটা কিন্তু অতি সামান্য ডাক্তার...।
- সামান্য? কী বলছেন? গড়িহাটের ভিড় ফুটপাথে এক ভদ্রলোক বেমালুম আপনার পা মাড়িয়ে দিলে আর আপনি তাকে বললেন 'দাদা, আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন'। এ'টা সামান্য ঘটনা?
- সামান্যই তো...উনি পা মাড়িয়ে দিলেন, আমিও তাই বললাম।
- আমেজিং। ইনক্রেডিবল। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, একজন আপনার পা মাড়িয়ে দিল আর তাকে আপনি শুধু বললেন 'আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন'। একটা খিস্তিও না জুড়ে আপনি এই সাংঘাতিক কথাটা কমিউনিকেট করতে পারলেন। চারক্ষর নয়, ইংরজির অমুকহোল তমুকহোল নয়, জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে কিউরিওসিটি নয়, এমনকি কানা-ইয়েও না জুড়ে আপনি দিব্যি নিজের উষ্মা প্রকাশ করে ফেললেন। আর নিজের রাগ শুধু প্রকাশ করতে পেরেছেন তা নয়, পা-মাড়িয়ে ভদ্রলোককে দিয়ে আপনাকে সরিও বলিয়ে নিয়েছেন। কমিউনিকেশনের ইতিহাসে এমন বিপ্লব আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে আগে ঘটেছে কী?
- ঘটেনি?
- নেভার।
- না মানে...ইনফরমেশনটা কমিউনিকেট করতে পারা নিয়ে কথা...।
- সেটাই তো! অভাবনীয়,  অভূতপূর্ব,  অবিশ্বাস্য!  খিস্তি ছাড়া যে ইনফরমেশন বা সেন্টিমেন্ট কনভে করা যায়, গত দুই শতকে এমন কোনও এগজ্যাম্পল নেই যে! বিষেকানন্দকেও শিকাগোতে বললে হয়েছিল "মাই আমেরিকান ঢ্যামনাস অ্যান্ড ঢেমনিস"। মোহন গন্দিকেও মরার আগে আর্তনাদ করতে শোনা গেছিল "হে হারামি"।
সাবাস বসুও সে'বার পাবলিককে মোটিভেট করতে বলেছিলেন "ধুর বাল রক্ত ফক্ত না পেলে কী ছিঁড়ব?"। শাসমলবাবু আপনার একটা কথা "দাদা, আপনি আমার পা মাড়িয়ে দিয়েছেন"; একদিন পৃথিবী পালটে দেবে। দেবেই!

ফার্স্ট কাপ্‌ল

- এ কী! 
- এ কী মানে?
- এ কাদের ধরে এনেছো?
- কেন? যেমনটি বলে এনেছিলেন। 
- যেমনটি বলেছিলাম? ইয়ার্কি হচ্ছে? আটশো বাহাত্তর অলোকবর্ষ দূরের গ্রহ থেকে আমি এদের আনতে বলেছি?
- বিলকুল। ফার্স্ট কাপ্‌ল অফ দ্যাট প্ল্যানেট। 
- এই এরা? এরা ফার্স্ট কাপ্‌ল অফ আর্থ? এই ডিবাকেলের পর আমাদের গ্রহের মানুষজনের নেতা হিসেবে আমার আর সম্মান থাকবে ভেবেছ? অপদার্থ কোথাকার।
- কী মুশকিল! আরে এরাই ওই গ্রহের ফার্স্ট কাপ্‌ল। আমার রিসার্চ টিমই তো অ্যাডভাইস করলে ওয়াশিংটন নামক এলাকা থেকে এদের তুলতে। মিস্টার অ্যান্ড মিসেস্‌ ওবামা। 
- তোমার মাথা। তুমি পাগল আর তোমার রিসার্চ টিম পেট খারাপ। দুম করে দু'জনকে উঠিয়ে নেওয়ার আগে একবার আমায় ভিডিও কল করে কনফার্ম করতে পারলে না?
- এয়ারটেলের ইণ্টার প্ল্যানেটারি ফোর জি বিট্রে করলে। ওই মেয়েটা অ্যাডে যতটা বাতেলা মারে ততটা স্ট্রং নয় কিন্তু ওদের নেটওয়ার্ক। রিয়েলি। বিশ্বাস করুন। 
- ইউসলেস্‌। নাও, এখন ফের ওয়াপিস যাও। সময় নষ্টের গাছ। দেখি তোমার সামনের ইঙ্ক্রিমেন্ট কার বাবা পাইয়ে দেয়।
- আপনি শিওর এই ওয়াশিংটনের ওবামারা ওখানকার ফার্স্ট কাপ্‌ল নয়? 
- অফ কোর্স নয়। 
- তবে কারা ফার্স্ট কাপ্‌ল?
- বলে দিচ্ছি। এবার যেন ভুল না হয়। ওকে?
- ওকে। কিন্তু কারা? ফার্স্ট কাপ্‌ল?
- দাদা বৌদি। ফ্রম ব্যারাকপুর।

বিপ্লববাবুর অসোয়াস্তি

ক্যারমের বেস যায় না। 
রঙের চার তাস হাতে পেয়েও ট্যুয়েন্টি নাইনে খেলা ধরা হয় না।
ক্রসওয়ার্ড পাজ্‌লে মন বসে না। 

বিপ্লববাবু যথেষ্ট বিব্রত বোধ করেন। গতবছর ঠিক এই দিন থেকে এ অসুবিধের শুরু। কিছুতেই মন বসে না। কিছুই ভালো লাগে না। যন্ত্রের মত অফিস গিয়ে ফাইল ঠেলে আসা। ততটাই যান্ত্রিকতায় সন্ধ্যের ক্লাবে গিয়ে গুলতানি। আর তারপর একরাশ মন ভার নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা। মনে অস্বস্তিটা অবশ্য কাউকেই খুলে বলা হয় না; না অফিসের সহকর্মীদের, না ক্লাবের বন্ধুদের। আর এরা ছাড়া তাঁর তিনকুলে আর আছেটা কে? 

একা মানুষের পক্ষে এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো মামুলি ব্যাপার নয়। তিনি যে ঠিক নিজের মধ্যে নেই, সে'টাই কাউকে বলা হয়ে উঠছে না। আর বলবেনই বা কী করে? গতবছরের এই দিনের ঘটনাটা কি সহজে কাউকে বলা যায়? যায় না। কিছুতেই যায়না।

আর এ'টা যেমন তেমন ঘটনা তো নয়। সেই সে'দিন; পাক্কা এক বছর আগে। 
ভোরের দিকের আনন্দবাজারটা চোখের সামনে মেলে ধরতেই বুকের ভিতর একবার ধড়াস করে উঠে সমস্ত চুপচাপ।  নেহাত তাঁর বাড়িটা পাড়ার বেয়াড়া কোণে আর আশেপাশেই কোনও পড়শি নেই; তাই বাঁচোয়া। 

তারপর থেকে অবিশ্যি বাড়িতে আর ঠিক তিনি একা নন। তবে একা না থাকার সঙ্গীটিও তো ঠিক তেমনই অস্বস্তিকর। সে ঠায় চেয়ারে বসে থাকে একবছরের পুরনো কাগজ হাতে; 
অফিসে বেরোবার সময় কী ফেরার সময়,
ক্লাবে যাওয়ার সময় কী রাতে বাড়ি ফিরে,
সর্বক্ষণ সে ঠায় বসে ড্রয়িংরুমের ইজি চেয়ারে। 

এ এক বছরে অবশ্য তাঁর সব গিয়ে শুধু হাড়গোড় পড়ে রয়েছে। তবু বাড়িতে সর্বক্ষণ খবরের কাগজ হাতে নিজের কঙ্কালকে দেখতে কেমন লাগে বিপ্লববাবুর। একটা প্রবল পেট খালি করা অসোয়াস্তি। শুধু সাহস করে কাউকে বলা হয় না। 

সত্যি কথা বলতে কি এমন বিদঘুটে ব্যাপার কাউকে বলা যায় নাকি? 

Wednesday, May 4, 2016

ফ্লাইং কার্পেট

- মামা!
- হুম।
- দেখেছো কাণ্ড!
- কী আর এমন ব্যাপার।
- ফ্লাইং কার্পেট! এমন কিছু ব্যাপার নয়?
- সায়েন্স কী বলে?
- ইম্পসিবল।
- ভুল। পসিবল।
- ফ্লাইং কার্পেটে আামাদের এমন ভাবে উড়ে চলাটা সায়েন্টিফিক।
- অনুভূতিটাটা সায়েন্টিফিক।
- মানে?
- মানে। এটা নিশ্চই স্বপ্ন।
- স্বপ্ন? হতে পারে।
- আকাশের রংটা দেখেছিস?
- ভ্যানিলা আইস্ক্রিমের মত মনে হচ্ছে।
- রাইট। ডেফিনিটলি স্বপ্ন।
- কিন্তু স্বপ্নটা কার মামা?
- তাই তো। আমার না তোর?
- নো ক্লু।
- মহামুশকিল। লাস্ট মেমরি কী আছে?
- ব্ল্যাঙ্ক। রিসেন্ট কোন অ্যাক্টিভিটি মনে পড়ছে না।
- ঝাঁপ দিয়ে দেখবি?
- না মানে...বাই চান্স যদি স্বপ্ন না হয়?
- ধের। আইপিএল দেখে দেখে আইকিউটা কমিয়ে ফেললি। যাক, আমি ঝাঁপ দিচ্ছি। স্বপ্নটার এস্পার ওস্পার হওয়া দরকার।

**
- পিলু।
- হুঁ।
- অ্যাই পিলু।
- হুঁ।
- ওঠ! টেবিল পাওয়া গেছে।
- হুঁ মামা?
- টেবিল পাওয়া গেছে।
- ও। ওহ। এটা তো আরসালান। ওয়েটিং।  বিরয়ানির সুবাস ইনডিউসড ঘুম। এহ হে। মনে পড়ছে। মনে পড়ছে।
- জলদি। টেবল ফর টু। মিল গয়া। জলদি।
- না মানে আমি স্বপ্নে দেখলাম...। স্বপ্নটা মানে...এত খাজা। শুনলে হাসবে..।
- বাজে কথা বাদ দে।ভেতরে চ। বিরিয়ানি চাপ শেষ করেই একবার হসপিটালে ছুটতে হবে।
- হসপিটাল? কেন?
- কনুইটা ছড়েছে। হাঁটু টনটন। ফার্স্ট এড। এক্স রে বললে এক্স রে।
- কী করে?
- ফ্লাইং কার্পেট থেকে কেউ ঝাঁপ দেয়?

Tuesday, May 3, 2016

শ্যামবাজারের খুন, খুনি আর লাশ

সন্ধ্যা।
বাথরুম। 
অ্যাসবেস্টসের ছাদ।
কোণে শ্যাওলা পড়া চৌবাচ্চা।
চৌবাচ্চার ডানপাশের দেওয়ালে তাক।
তাকে নীল প্লাস্টিকের বাক্সে মার্গো সাবান।

মার্গো সাবানের বাক্সের পাশে প্যারাশুট তেলের শিশি, সাবান মাখার খোসা, দাড়ি কামানোর ছোট স্টিলের বাক্স, ক্লিনিক অল ক্লিয়ার শ্যাম্পুর শিশি আর প্লাস্টিকের টুথব্রাশ হোল্ডার।

চৌবাচ্চার বাঁ পাশের মেঝেতে চিত হয়ে শুয়ে কমল দত্তর শীর্ণ দেহ। ফর্সা রুগ্ন হাড় জিরজিরে খালি গা, কোমরের ভেজা গামছা এলোমেলো। চোখ দু'টো ড্যাবড্যাবিয়ে অ্যাসেবস্টসের ছাতের ফোঁকর দিয়ে ঝিরঝিরে বৃষ্টি দেখছে। চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বের ঘোলাটে আবরণ ভেদ করতে পারলে তবে বোঝা যায় কমলবাবুর চোখের মণি স্থির। ঠাণ্ডা। তাঁর মাথার চুল বেশির ভাগই পাকা, বাহান্ন বছর বয়সে অতটা না পাক ধরলেও পারত। অবশ্য বয়সেও বয়স ততটা বাড়েনা যতটা অতিরিক্ত ব্লাড শুগারে বাড়ে। তাঁর মুখটা সামান্য খোলা। 

ওহ্‌। বলা হয়নি। তাকের দাড়ি কামানোর বাক্সটার ঢাকনা খোলা। তাতে অবশ্য আর সবই রয়েছে, নেই শুধু ক্ষুরটা। তবে ক্ষুরটা খুঁজে পেতে বিশেষ মেহনত করার দরকার নেই। দিব্যি বসানো রয়েছে কমল দত্তর গলায়। বাথরুমের মেঝেয় এবং কমলবাবুর বুকে জলের চেয়ে বেশি রক্ত। রক্ত তখনও উষ্ণ। 

**
- কাল সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা নাগাদ, মানে মোটামুটি যে সময় আপনার বাবা বাথরুমে ঢোকেন, আপনি সে সময় গড়িয়াহাটে ক্যারম খেলছিলেন। তাই তো?
- আর কতবার বলতে হবে এক কথা?
- ক্ষুরে যেহেতু আপনার ফিঙ্গার প্রিন্ট রয়েছে, বাড়তি এক্সপ্ল্যানেশনের দায় আপনার থেকেই যায় অভীকবাবু।
- অন্তত দশজন লোক এমন আছে যারা আপনাকে বলে দেবে যে ওই সময় আমি গড়িয়াহাটেই ছিলাম।
- দশজন একজোট হয়ে মিথ্যে কথা বলছে, ঘটনাটা কি পৃথিবীর ইতিহাসে খুব বিরল অভীকবাবু?

**

- টাকাটা তুমি দেবে না?
- প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে আমি তোমায় শেয়ার মার্কেটে খেলা করতে পাঠাবো, সে আশা তুমি করো কী করে?
- এটা কোনও খেলা নয় বাবা, ইনভেস্টমেন্ট। 
- নিজে একটা চাকরী করে ,সঞ্চয় করে যদি ইনভেস্টমেন্টের কথা বলতে, তবে সে'টা সুশ্রাব্য হতো।
- শেয়ার কেনাবেচা একটা প্রফিটেব্‌ল প্রফেশন। 
- তোমার বাজে বকুনি শোনার সময় আমার নেই। অফিসের দেরী হচ্ছে। চলি। 
- অন্তত লাখ দুয়েক টাকা যদি...। 
- তোমায় দু'টাকা দেওয়ার থেকে একটা দু'টাকার কয়েনকে কুয়োয় ফেলে দেওয়া বেশি কাজের। সরো সামনে থেকে। 

**
- কমল দত্ত? শ্যামবাজারের কমল দত্ত?
- আর ক'জন কমল দত্তকে আপনি চেনেন মিস্টার দাস?
- চিনি বলতে, ব্যবসার ব্যাপারে সামান্য যোগাযোগ ছিল একসময়। 
- উনি আপনার উলুবেড়িয়ার কোল্ডস্টোরেজের স্লিপিং পার্টনার হয়ে কিছু টাকা খাটিয়েছিলেন। বেশ কিছু টাকা খাটিয়েছিলেন। সে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি আপনি। কমলবাবুর বহু আকুতিতেও চিড়ে গলেনি। 
- মিথ্যে কথা। কমল দত্তকে কম খলিফা ভেবেছেন? স্লিপিং পার্টনার আবার কী মশাই? ব্ল্যাক ইন ব্ল্যাক আউট করেছেন তিনি, অ্যাট আ প্রফিট। ওর মত ধান্দাবাজ লোক টাকা ফেরত পেয়ে অ্যাকনোলেজ করবে ভেবেছেন?  দু'বছরে থার্টি পারসেন্ট পার অ্যানাম রিটার্ন দিয়েছি। মজা নাকি? আর সমস্তটা ক্যাশে।
- তাই যদি হবে, তবে গত পরশু রাত্রে ওনার শ্যামবাজারের বাড়িতে গিয়ে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করেছিলেন কেন?
- কারণ গত মাস খানেক ধরে ও ফল্‌স ক্লেম করছিল। এই টাকা পাই, সেই টাকা পাই করে। অল বোগাস ক্লেম্‌স। 
- সেই জন্যে আপনি গিয়ে ওকে থ্রেট করে আসেন যে এসবের ফল ভালো হবে না, তাই তো?
- ও'সব কথার কথা। 
- কথার কথা! আর সে কথার কথার পিঠে খুন হলেন কমল দত্ত। 
- খুন?
- ওই, আপনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসার মিনিট পনেরোর মাথায়।
- ওহ মাই গড!
- সারপ্রাইজ্‌ড?
- ওহ! ওহ্‌হ্‌! 
- ব্যাপারটা যে ভালো মত ঘোট পাকিয়েছে সে'টা বুঝতে পারছেন আশা করি মিস্টার দাস। 
- প্লিজ। প্লিজ। বিশ্বাস করুন এ খুন আমি করিনি। করিনি এ খুন আমি। 
- পুলিশকে কনভিন্স করতে পারবেন? 
- লুক হিয়ার ডিটেক্টিভ। আমার একমাত্র ছেলে অজয়। হি ইজ অনলি টুয়েল্ভ। কোন একটা অজানা জ্বরে ভুগে গত একদিনের মধ্যেই মরতে বসেছে। ওকে নিয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। জানি না বাঁচাতে পারব কী না। গোটা শরীর নীল হয়ে গেছে একদিনের মধ্যে। আমায় আপনি কয়েকটা দিন অন্তত রেহাই দিন। প্লিজ আমায় পুলিশের হাতে ভিড়িয়ে দেবেন না, অন্তত নেক্সট কয়েকটা দিন ।পায়ে পড়ছি আমি আপনার। মাই ফ্যামিলি নিড্‌স মি রাইট নাউ। বিশ্বাস করুন এ খুন আমি করিনি। 
- আপনার ছেলে ক্রিটিকালি ইল্‌?
- বিশ্বাস হচ্ছে না? দেখবেন সে বেচারিকে? দেখবেন?
- দেখব। 
- আপনি মানুষ?
- না। গোয়েন্দা। 

**
- বটুবাবু।
- আজ্ঞে।
- কেন এ'সবের পিছনে সময় নষ্ট করছেন?
- আপনি খুন হলেন। আমার মেসোমশাইয়ের শালির পাড়ার লোক আপনি। আমার একটা রেস্পন্সিবিলিটি নেই?
- কী হবে? আই অ্যাম ডেড। আমার কোন অভিযোগ নেই।
- অভিযোগ না থাকাটাই জাস্টিস নয়।
- বিচার কে চায়? আমার পুত্রটি বিচার চায়নি কোনদিন, টাকা চেয়েছে। আর উলুবেড়িয়ার সে ব্যাটা নির্মল দাস চেয়েছিল টাকা ফেরত দেওয়ার দায় থেকে মুক্তি। 
- আপনি চান না বিচার?
- না। 
- ওয়েল ওয়েল ওয়েল। ইট ইজ টু লেট ফর দ্যাট।
- কেন? কেল্লা ফতে করে ফেলেছেন?
- গড়িয়াহাট ওভারব্রিজের নিচে ক্যারম আপনার ছেলে খেলেছিল বটে সেদিন। তবে সে'টা আপনার খুন হওয়ার ঘণ্টা তিন চারেক আগে। সাক্ষীটাক্ষী সব সাজানো ব্যাপার। অবভিয়াসলি। 
- তাতে কী প্রমাণ হয়? রেজারের গায়ে যে ফিঙ্গার প্রিন্ট পেয়েছেন সে'টা পুরনোও হতে পারে। বাবু সেদিন দুপুরেই সে রেজারে দাড়ি কেটেছে।
- ফিঙ্গার প্রিন্ট আঁকড়ে কেস লড়ার বান্দা বটু গোয়েন্দা নয়। সুগন্ধে বধ হয়েছেন ভদ্রলোক, মানে আপনার গুণধর পুত্রটি। 
- সুগন্ধে?
- আপনাকে নিকেশ করার প্ল্যানটা ঠাণ্ডা মাথাতেই কষা। নয়তো বাথরুমের অন্ধকারে আগে থেকে ক্ষুর হাতে থেকে লুকিয়ে বসা যায় না। তবে উঠোনের ও পাশে বাথরুম হওয়ায় ওর কাজটা অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছিল। বাথরুমের ছাতের অ্যাসবেস্টস সরিয়ে আপনার সুপুত্রের গোপন এন্ট্রি আপনার বৌ মেয়ে কেউই টের পাননি।  
- আপনি কী করে টের পেলেন?
- ওই যে। সুগন্ধ। 
- মানে? 
- গড়িয়াহাট থেকে ফেরার পথে ওনার খিদে পেয়েছিল সবিশেষ। খুনের প্ল্যান তো আর সহজ কথা নয়। ভেরি ট্যাক্সিং। ভেরি। 
- তাতে কী?
- মার্গো স্নান আর প্যারাসুট নারকোল তেল মর্দিত চুলের ঝিমঝিম করানো  সৌরভ ভেদ করে সেদিনকার বাথরুম মেতেছিল অন্য সুবাসে। সে সুবাস আরও উগ্র ভাবে মিশেছিল সে খুরের হাতলে।
- সুবাস?
- দাস কেবিনের চিকেন কবিরাজি। দোকানের ম্যানেজার কনফার্ম করেছে, এই চেনামুখ সেদিন দোকানে এসেছিল। বিকেল চারটে নাগাদ। সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সোজা বাড়ি এসে পাঁচিল বেয়ে বাথরুমের আলগা অ্যাসবেস্টস সরিয়ে বাথরুমে প্রবেশ। অতঃপর বাক্স থেকে ক্ষুর বের করে সুবিধেমত অন্ধকার খুঁজে ওনার বসে থাকা আপনার ঢোকার অপেক্ষায়। আপনার চোখের ছানিকেও অবশ্য উনি বিশ্বাস করেছিলেন। গড়িয়াহাটের নিজের সুযোগ্য বন্ধুদের বুঝিয়েসুঝিয়ে ভালোই রাজী করিয়েছিলেন তিনি; নিজের অ্যালিবাই তৈরি করতে। শুধু তিনি ভুলে গেছিলেন যে শাক দিয়ে আর যাই হোক; দাস কেবিনের চিকেন কবিরাজির স্পর্শ ঢাকা যায় না। 
- ওহ্‌! ওহ্‌। বটুবাবু প্লীজ।
- প্লীজ? কিসের প্লীজ? 
- বাবুকে আপনি ছেড়ে দিন। এই আমি নিজে বলছি, আমার খুন হয়ে কোন দুঃখ নেই। আসলে ছেলেটা বেকার তো, বড় দুঃখ ওর। আর ক্ষোভ। ওকে আমি ক্ষমা করেছি বটুবাবু। প্লিজ ওকে আপনি ছেড়ে দিন।
- খুনির রেকমেন্ডেশন যে আমি শুনি না কমলবাবু। 
- খুনি? বটুবাবু, আমার ছেলে না হয় তার বাপকে খুন করেছে। কিন্তু আমি খুনি নই। নই। 
- রিয়েলি?  
- এ আপনি কী বলছেন?
- আপনি খুন করার চেষ্টা করছেন না কমলবাবু?
- কী যাতা বলছেন বটুবাবু। 
- মিস্টার দাস, আপনার পুরনো বিজনেস পার্টনারের বারো বছর বয়সের ছেলে অজয়। গণ্ডগোল হয়েছে আপনার আর তার বাপের মধ্যে! আর সে শাস্তি আপনি ওই বাচ্চা ছেলেটাকে দিচ্ছেন? তাও ভূত হয়ে নিজের ঘৃণ্য ক্ষমতাকে ব্যবহার করে? ছিঃ কমলবাবু ছিঃ, ভূত বলে নিজের মনুষ্যত্বকে এত সহজে ভুলে গেলেন? একটা অসহায় বাচ্চাকে খুন করতে চাইছেন নিজের প্রতিশোধ স্পৃহাকে চরিতার্থ করতে?
- কিন্তু...কিন্তু... আপনার কাছে কী প্রমাণ আছে বটুবাবু?
- ভূতে হয়ে নতুন বদমায়েশি শিখেছেন কিন্তু পুরনো ঢিট-গিরি ছাড়তে পারেননি। প্রমাণ চাইছেন? নিজে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে চলেছেন আর এখন তার প্রমাণ চাই? শুনুন। পাপ ছাড়েনা বাপকে আর দাস কেবিনের কবিরাজির সুবাস একবার ভূতের গায়ে সেঁটে গেলে, ভূতকেও সহজে ছাড়তে চায় না। দাসবাবুর ছেলের ঠাণ্ডা নিঃশ্বাসে আমি সে কবিরাজির গন্ধ পেয়েছি, যা আপনার গলার বসানোর ক্ষুরের হাতলে ছিলো। আর ঠিক সেই গন্ধই এখনও রয়েছে প্ল্যানচেটের টেবিলটা জুড়ে। শুনুন। আপনার অন্ধ পিতৃস্নেহকে স্যালুট করে আপনার ছেলেকে ছাড় দেওয়ার কথা আমি ভাবতে পারতাম। কিন্তু যে একটা নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে খতম করার কথা ভাবতে পারে, তাঁকে রেহাই দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আপনার ছেলে যাতে ফাঁসিকাঠে ঝোলে সে ব্যবস্থা আমিই করব। 
- দোহাই বটুবাবু। দোহাই। আমার ছেলেটাও গেলে আমার বৌ মেয়ে পথে বসবে। ভূত না হলে আমি আপনার পায়ে পড়তাম। প্লিজ বটুবাবু। বাবুকে আপনি পুলিশে ধরিয়ে দেবেন না। প্লিজ। দাসের ছেলেকে আমি ছেড়ে দেব। ও বেঁচে যাবে। 
- কথা দিচ্ছেন?
- ভদ্রভূতের এক কথা। প্লিজ।
- কথার নড়নচড়ন হলে আপনার ছেলের গ্যারেন্টি আমি নিতে পারব না। 
- থ্যাঙ্ক ইউ বটুবাবু। থ্যাঙ্ক ইউ। অজয়ের কিছু হবে না। আমি কথা দিলাম। 

**
- হ্যালো। 
- হ্যালো, মিস্টার দাস? আমি বটু। বটু গোয়েন্দা।
- বলুন মিস্টার বটু। 
- সকাল সকাল ফোন করে একটু ডিস্টার্ব করলাম। আচ্ছা, আপনার ছেলে কেমন আছে?
- অদ্ভুত ব্যাপার। কাল রাত থেকে ওর জ্বর আচমকাই ছেড়ে গিয়েছে। গায়ের নীলচে ভাবটাও গায়েব। এতটাই নর্মাল এখন যে মনেই হচ্ছে না যে এক বেলা আগেও সে প্রায় মরতে বসেছিল। মিরাকেল বটুবাবু, মিরাকেল। 
- ওদিকে একটা খুনের এনকোয়ারি এখনও শেষ হয়নি, সে খেয়াল আছে?
- বটুবাবু, বিশ্বাস করুন এ খুন আমি করিনি বা করাইনি। বিজনেসে অনেক কিছু করতে হয় কিন্তু আমি মার্ডারার নই। 
- পুলিশ কি আর সে কথা সহজে মানবে দাসবাবু? আপনি সে সন্ধ্যায় কমলবাবুর বাড়ি গিয়ে যে'সব গোলমেলে কথা বলে এসেছেন সে'সব সমস্তই প্রতিবেশীদের কান পর্যন্ত পৌঁছেছে। 
- প্লিজ বটুবাবু। বিশ্বাস করুন। 
- আমি বিশ্বাস করতে পারি। 
- আজ্ঞে?
- আমি বিশ্বাস করতে পারি আপনাকে। এমনকি পুলিশকেও কনভিন্স করতে পারি যাতে তারা আপনাকে হ্যারাস না করে। পুলিশের ওপর এ'টুকু হোল্ড বটু গোয়েন্দার আছে। 
- আপনি পারেন বটুবাবু? প্লিজ। প্লিজ হেল্প মি। যত টাকা লাগে আমি দেব। যত টাকা লাগে। 
- দেবেন? যত টাকা লাগে।
- অ্যামাউন্ট শুধু বলে দেখুন। প্লিজ। প্লিজ হেল্প মি। 
- মিস্টার দাস। কমলবাবুর প্রাপ্য টাকাটা ওর ফ্যামিলিকে ফেরত দেবেন প্লিজ? খুব উপকার হয় ওদের ওই টাকাটা পেলে। ওর ছেলে বেকার, তার একটা হিল্লেও হয়ে যেতে পারে। মেয়েটার পড়াশোনাতেও তাহলে ব্যাঘাত ঘটবে না। দেবেন? টাকাটা ফেরত। বটু গোয়েন্দা আপনাকে কথা দিচ্ছে, পুলিশকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার। প্লিজ এ'টুকু করতে পারবেন?
- কাল বিকেলের মধ্যে পুরো টাকা কমলবাবুর ওয়াইফের কাছে পৌঁছে যাবে বটুবাবু। অ্যালং উইথ সাম কম্পেন্সেশন ফর দ্য ডিলে। কথা দিলাম। 
- বেশ, তাহলে সে কথাই রইলো। কেমন?

**

- বটুবাবু। 
- ইয়েস কমলবাবু।
- আচ্ছা। ভূতেদের জন্য পারফিউম তেমন নেই বোধ হয় না?
- আমি যেহেতু নিজে ভূত নই, সেহেতু নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না। তবে মাছের আঁশ-টাশ ট্রাই করে দেখতে পারেন। 
- কিচ্ছুতে কিচ্ছু হচ্ছে না মশাই। 
- কী হচ্ছে না?
- খুন হয়েছি দেড় মাস হলো। তবুও গা থেকে চিকেন কবিরাজির গন্ধ  গেল না।
- এ তো অমরত্ব লাভ কমলবাবু। চিন্তা কীসের?

Monday, May 2, 2016

কাকাবাবুর শখ

-   কাকাবাবু।

-   কে? অসীম নাকি?

-   আজ্ঞে।

-   জরুরী কিছু?

- নাহ মানে! এত রাত্রে তো এদিকে কেউ সচরাচর আসে না।

-   আসলে গোপালপুর এলেই একবার অন্তত এখানে আসি। এই সৌধের পাশে মিনিট দশেক কাটিয়ে যাই। গত দশ বছরের অভ্যাস।

-   কর্নেল কল্লোল স্টেফান মিন্‌জ, ব্যাপারটা রিয়েলি স্যাড।

-   ডেয়ারডেভিল বলতে যা বোঝায়, এ ভদ্রলোক ঠিক তেমনই ছিলেন। অ্যান্ড আ গুড ফ্রেন্ড। নিজের প্রাণ দিয়ে আমার সে’বার বাঁচিয়েছিল আফগানিস্তানে।

-   সে ঘটনা আমার শোনা।

-   জানো অসীম, ভদ্রলোক কবিতা ভালোবাসতেন, কিন্তু লিখতে পারতেন না। অবিশ্যি এই যে তাঁর উইলে রেখে যাওয়া ইচ্ছে; যে তাকে যেন সমুদ্রের ধারেই গোর দেওয়া হয়, সে’টা কি কম পোয়েটিক?

-   আর্মির কেউকেটারা পুশ না করলে কিন্তু এখানে এমন শ্বেতপাথরে বাঁধানো স্মৃতি সৌধ বানানো পসিব্‌ল হত না। অবিশ্যি যে লেভেলে গিয়ে স্যাক্রিফাইস করেছেন কর্নেল মিন্‌জ, এটুকু তাঁর প্রাপ্যই ছিল।

-   অফ কোর্স ছিল।

-   কাকাবাবু, অনেক রাত হল। এবার ফেরা দরকার।

-   হ্যাঁ। চলো। জানো অসীম, কবিতা ব্যাপারটা অদ্ভুত। কত লোকের কাব্যি করার ক্ষমতা নেই, কিন্তু কবিতার প্রতি নিবিড় ভালোবাসা রয়েছে। যেমন এই কল্লোল মিন্‌জ। যেমন আমি। যেমন আমার কলকাতার মর্নিং ওয়াকের সঙ্গী।

-   আমি তো ভাবতাম মর্নিং ওয়াক ব্যাপারটা আপনি একাই সারতে ভালোবাসেন।

-   কিছুটা তাই। তার মূল কারণ হচ্ছে আমি ক্রাচ বগলে নিজের গতিতে হাঁটতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করি। কিন্তু এ ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকে ব্যাপারটা মন্দ লাগছে না। হাসিখুশি। ভালোমানুষ। মজার। মেদবহুল তাই আমার চেয়ে সবিশেষ জোরে হাঁটতে পারেন না। ওদিকে ভদ্রলোক বাংলার শিক্ষক, কিন্তু কবিতা লেখার আর্টটা আজ পর্যন্ত গ্রিপ করতে পারেননি। তাই বলে চেষ্টার ত্রুটি রেখেছেন তেমন নয় কিন্তু।

-   ইন্টারেস্টিং।

-   কোয়াইট সো। কাজেই রোজ সকালে আমাদের এক ঘণ্টা হাঁটার রুটিনের সঙ্গে যোগ হয়েছে দুই কবিতা গবেটের কাব্যালোচনা।

-   রিয়েলি?

-   রীতিমত। ইনফ্যাক্ট ওর ইন্সপিরেশনেই আজকাল মুখে মুখে দু’একটা কবিতা ভেঁজে ফেলার চেষ্টা করে মাঝে মাঝে। তবু সেগুলো শুনে সন্তু যেভাবে তাকায়, বুঝতে পারি সেগুলো ভদ্রলোকের পাতে দেওয়া চলে না। এই যেমন ধরো কিছুক্ষণ আগে তুমি যখন ডাক দিলে, তখনই মাথায় দু’টো লাইন খেলে গেলো। এখন অপেক্ষা, কবে কলকাতা ফিরব আর কবে আমার সঙ্গীটিকে লাইন দু’টো শোনাব।

-   তা আমায় শোনানো যায় না কাকাবাবু?

-   শোনানো তো যায়, যদি তুমি কথা দাও যে ভির্মি খাবে না।

-   কথা দিলাম না হয়।

-   ‘অসীমের ডাক শুনি কল্লোল মর্মরে, এক পায়ে খাড়া থাকি একা বালুচরে’। কী? দাঁড়িয়েছে?

Sunday, May 1, 2016

অন্য পুকুর

- রজনীদা।
- সুমনবাবু, এই এতক্ষণে আসবার সময় হল?
- না মানে, এত জ্যাম!
- রোববারে জ্যাম?
- না মানে, প্রথমে বালিশ টপকানো, তারপরে পাশবালিশ টপকানো, তারপরে  সোফা ডিঙিয়ে...।
- এত গড়িমসি নিয়ে সাংবাদিকতা করেন কী করে বলুন তো? আপনার জন্য এদিকে মেজর একটা ইভেন্ট পিছিয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া কভার না করলে আমি কামালটা করি কী করে?
- কামাল?
- অ্যামেজিং। স্টুপিফাইং। 
- রিয়েলি?
- কালকের ফ্রন্ট পেজ। দেখবেন, ভোটের বাজার বলে আবার ভিতরের পাতায় ঠেকে দেবেন না যেন। 
- ব্যাপারটা কী রজনীবাবু?
- সামনে কী দেখছেন?
- বিশাল গর্ত। বিশাল। 
- করেক্ট। এবারে এটাকে আমি পুকুরে কনভার্ট করব। 
- এই হল কামাল?
- ইয়েস। 
- মাটি কুপিয়ে তাতে জল ভরে পুকুর করবেন, আর সে'টা কামাল ? আর এর জন্য আমায় ডেকে এনেছেন রোব্বারে? জানেন আজ বাড়িতে রেজালা হচ্ছে? 
- আরে এ পুকুর যে সে পুকুরে নয়।
- নয়?
- এ পুকুরে কি আমি কর্পোরেশনের জল হোসপাইপে দিয়ে ভরব ভেবেছেন?
- তবে? 
- প্রথম চোখের জলে তৈরি পুকুর হবে এ'টা।
- চোখের জলে? পুকুর ভরবেন?
- ইয়েস। চোখের জলে। এই যে সরু পাইপ জোড়া দেখছেন, এই দু'টো চোখে লাগাবো। পাইপের একদিক আমার চোখে, অন্যদিকে গর্তে। এক ঘণ্টার কম সময়ে পুকুর ভরে দেব। 
- ইম্পসিব্‌ল। 
- আমি রজনীকান্ত। 
- হতে পারেন। হাইজাম্প দিয়ে চাঁদে যাওয়া বিশ্বাস করতে পারি। কিন্তু চোখের জলে গর্ত ভরে পুকুর ক্রিয়েট করা? নামুমকিন। 
- এই আপনাদের স্কেপ্টিসিজ্‌মের জন্যেই তো ডেকে নেওয়া। আপনার চোখের সামনে আমার চোখের জলের কেরামতি ডেমোন্সট্রেট করে দিচ্ছি। দাঁড়ান পাইপটা ফিট করি। 
- বেশ। 
- পাইপ ফিট। ওকে?
- ওকে। নিন, কান্না শুরু করুন দেখি। 
- দাঁড়ান মশাই। নর্মাল কান্নায় পুকুর ভরবে? পাম্প চালাতে হবে।
- চোখের জলের পাম্প?
- অফ কোর্স। পাম্প চালাতেই জলের রিয়েল ফ্লো চালু হবে। পুকুর রেডি হয়ে যাবে আধ ঘণ্টার মধ্যে। ম্যাক্সিমাম চল্লিশ মিনিট, তার বেশি নয়। এক ঘণ্টা পাম্প চালিয়ে কাঁদলে ক্যালক্যাটা হাঁটু জলে নেমে যাবে।
- ধেত।
- পলিটিকাল নেতারা যখন আগডুম বাগডুম ঝাড়ে  তখন তো কোনদিন ধেত বলতে শুনিনি! সায়েন্স আর টেকনোলজির ব্যাপারেই যত বাগড়া। 
- নিন, জলদি করুন। পাম্প চালান। রোদ বাড়লে আবার অসুবিধে, ছাতা ক্যারি করছি না। 
- ওই দিকে দেখুন, ওই দিকে। পাম্প রাখা আছে। চালিয়ে দিন। আমি কান্নায় কনসেন্ট্রেট করছি। 
- পাম্প কই?
- ওই তো। 
- ও'টা তো টেপ রেকর্ডার। 
- ও'টাই পাম্প। হাজার এইচ পির।
- হাজার হর্স পাওয়ার?
- হাজার হাউহাউ পাওয়ার। নিন, চালিয়ে দিন।
- ওটাই পাম্প? আপনি শিওর?
- নয়তো আর বলছি কেন? ক্যুইক ক্যুইক! চালিয়ে দিন। পুকুর ভরে ফেলি চোখের জলে। 

সুমনবাবু টেপরেকর্ডার চালিয়ে দিতেই ভেসে এলো মান্না দের কালজয়ী বিরহের গান, একের পর এক। 

আধ ঘণ্টার মাথায় চোখ থেকে পাইপ খুলে সর্ষের তেলের বাটি আর গামছা হাতে পুকুর পাড়ে গিয়ে থেবড়ে বসলেন রজনীকান্ত।  

Friday, April 29, 2016

ট্রেনি

- তাহলে কী ঠিক করলেন চ্যাটার্জিবাবু?
- আমি রাজী স্যার। 
- ভালো করে ভেবে নিয়েছেন তো? 
- আসলে চাকরীটার খুব দরকার আমার। খুব।
- তিন মাস ট্রেনি হয়ে কাজ করতে হবে। সব ঠিকঠাক চললে, তার পরে কনফার্মেশন।
- রাজী। 
- তাছাড়া স্টার্টিংয়ে যে বেসিকটা পাচ্ছেন, সে'টা কিন্তু নেহাত ফেলনা নয়। 
- সে জন্যই তো...। 
- কাজটা খুব সেনসিটিভ।
- জানি। খুন বলে কথা। সেনসিটিভ তো বটেই।
- তবে মাসে যেহেতু শুধু একটা করে খুন, ওয়ার্ক প্রেশারে নুয়ে পড়তে হবে না আশা করি। 
- চারদিক দেখে শুনে এগোতে হবে। 
- ও সার্টেনলি। ধরা না পড়াটা প্রায়োরিটি। তিন মাসে তিনটে খুন ঠিকঠাক নামিয়ে দিন। কনফার্মেশন লেটার পেয়ে যাবেন। 
- জানি। শুধু প্রথম ক্যান্ডিডেটটা যদি একটু রিকনসিডার করতেন...।
- শুনুন। শহরকে টেররাইজ করার জন্য খুন হওয়ার লিস্ট প্রি-কনফার্মড। সোজা হিসেব, আপনি খুন করে লাশ কসবার ডেরায় পৌঁছে দেবেন, আমাদের অন্য লোক সে লাশ হাপিশ করে দেবে। ওয়ান আফটার আনাদার। জলের মত। ইট ইজ আ উইয়ার্ড কোইন্সিডেন্স যে খুন হওয়ার লিস্টে প্রথম নামটা আপনার প্রাক্তন প্রেমিকার। তবে লিস্টে হেরফেরের উপায় নেই। 
- আসলে ব্রেক আপটা এত ঝামেলার মধ্যে হয়েছিল...এত ঝগড়া...এত কান্নাকাটি...। এখন মানে...দেখাই করতে চায় না। সর্বক্ষণ অ্যাভয়েড করছে। দেখা না হলে খুন করার যে কী অসুবিধে।
- ব্রেকআপটা হল কেন?
- আসলে ও খুব বিয়ে করব বিয়ে করব বলে ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছিল। এদিকে আমার কাজকর্ম নেই, ও'সব মরাকান্না কহাতক ভালো লাগে? দু'চারটে বেফাঁস কথা বলে দিলাম, অমনি তেলে বেগুন। সব গেল ভেস্তে। এদ্দিনে বোধ হয় তার জন্য ভালো ভালো সম্বন্ধও আসতে আরম্ভ করেছে। 
- তাহলে তো ব্যাপারটা সিম্পল। চাকরী তো পেয়েই গেছেন, সে খবর জানিয়ে ফোন করুন। 
- চাকরী পেয়েছি শুনলেই ফের ঘ্যানঘ্যান করবে 'বিয়ে করো' 'বিয়ে করো'। 
- আরে সে বলার আগেই আপনি অফার দিন। বিয়ের নাম করে দেখা করতে বলুন। তারপর কাজ ফিনিশ। সিম্পল। 
- সে'টা অবশ্য করা যেতে পারে। ফোন করব তাহলে ওকে?
- অফ কোর্স। 
- রাগের মাথায় ওর সব চিঠি পত্র জ্বালিয়ে ফেলে দিয়েছিলাম মাইরি। টেলিফোন ডায়েরি থেকে ওদের টেলিফোন নম্বর লেখা পাতাটাও উপড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। এখন ওই নম্বর আগে খুঁজে বার করতে হবে। 
- সে ফোন নাম্বার আমাদের কাছে আছে। আপনি কথা মত প্ল্যান করে নিন। 
- নম্বর আছে? বলুন। টুকে নিচ্ছি। 
- লিখুন। টু ফোর ফোর ওয়ান ওয়ান থ্রি নাইন।