Thursday, October 22, 2020

দ্য গ্র‍্যান্ড তুকতাক

- কী চাই?

- হুঁ?

- কী চাই? চাকরীতে টপাটপ প্রমোশন বাগানোর মাদুলি? শুগার কন্ট্রোলে রাখার তাবিজ? হাড়বজ্জাত মানুষজনের বদনজর এড়িয়ে চলার জন্য কবচ?

- কই, না তো।

- তা'হলে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা কেন?

- দ্যাখ বুড়ো..।

- আমার সঙ্গে যারাই দেখা করতে আসে তারা আমায় চমৎকারিবাবা বলে ডাকে। আপনি-আজ্ঞে করে নুয়ে পড়ে। 

- তাঁরা তো আর তোর বাপ নয় বুড়ো।

- উফ। আদত তন্ত্রসাধকের বাপ-ঠাকুরদা থাকতে নেই।

- প্রায় এক বছর হতে চলল বাড়ি ছেড়ে এইসব ফোরটুয়েন্টিগিরি শুরু করেছিস।  আর কতদিন!

- ফোরট্যুয়েন্টিগিরি?  আমি রেগে গেলে একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটে যাবে কিন্তু। 

- মানছি আমি একসময় তোর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি৷ পারিবারিক ব্যবসায় ফাঁকি দিচ্ছিস দেখে মেজাজ খিঁচড়ে গেছিল, না হয় ভালোমন্দ চারটে কথা বলেই দিয়েছি। কিন্তু তাই বলে তুই তারাপীঠে এসে পরের মাথায় কাঁঠাল ভাঙার ব্যবসা শুরু করলি রে বুড়ো? 

- আর একটাও আজেবাজে কথা শুনলে এমন বাণ মারব..।

- বাড়ি ফিরে চল বুড়ো। আমি না হয় মায়াদয়াহীন স্ক্র‍্যাপের দালাল। মায়ের কথা ভেবে অন্তত বাড়ি ফের।

- তন্ত্রসাধকের আবার বাড়ি। তন্ত্রসাধকের আবার মা।

- তুই না হয় বাড়িতে গিয়েই একটা এই হোকাসপোকাসের চেম্বার খুলে বসিস বুড়ো। আমি নিজের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেব। নীচের তলার একটা ঘরে সর্ষের তেলের গোডাউন করব ভাবছিলাম। সে'খানে বসেই না হয় তুই  মাদুলি বেচিস।

- সাধনাটাকে ধান্দাবাজি বলে হ্যাটা করাটা রীতিমত অন্যায়৷  শ্মশানের মড়াপোড়া হাওয়া গায়ে না ঠেকলে তন্ত্রসাধনা চলে না। আর তাছাড়া গেরস্থালির গুমোট পরিবেশে আর আমায় বাঁধা সম্ভব নয়৷ 

- সম্ভব নয়?

- কভি নহি।

- কোনও ভাবেই আর তোকে বাড়ি ফেরানো যাবে না?

- শ্মশানকালী প্রাইভেটলি স্বপ্নে এসে রিকুয়েস্ট করলেও নড়ছি না। 

- হ্যাঁ রে বুড়ো, কাল থেকে পুজো। পুজোয় বাড়ি ফিরবি না?

- হুঁ?

- পুজোয় বাড়ি ফিরবি না?

- পুজো? বাড়ি। পুজো। বাড়ি।

- কী হল বুড়ো?

- না মানে...যদিও তন্ত্রসাধনায় পুজো পুজো আদেখলামো থাকতে নেই..।

- কাল থেকে পুজো। বাড়ি ফিরবি না তুই?

- বাবা।  পুজো সত্যিই এসে গেল। তাই না?

- তাই তো। এসেই গেলো।

- আমি বাড়ি যাব বাবা। বাড়ি যাব।

- আলবাত যাবি। পুজোয় বাড়ি না গেলে চলে?

বুড়োকে বাড়ি ফেরানোর তুকতাকটি চমৎকারিবাবার বাপ দিব্যি জানতেন। বাড়ি ফেরার নিশির ডাক - "পুজো"।

Tuesday, October 13, 2020

মামা ও বিরিয়ানি রহস্য


- কী হল মামা! বিরিয়ানিতে কবজি না ডুবিয়ে অমন গুম মেরে বসে রইলে যে?

- ক্যালামিটি!

- সে কী।

- ক্যাটাক্লিজম।

- আরে হয়েছেটা কী?

- রাহাজানি। 

- উফ! বিরিয়ানির খুশবুতে গড়বড়? 

- না। পার্ফেক্ট সৌরভ নাকে বুকে কভারড্রাইভ চালাচ্ছে৷ সমস্যা অন্য জায়গায়৷ 

- কোথায়?

- আমি নিজে দু'প্লেট বিরিয়ানি প্যাক করিয়ে এনেছি ভাগ্নে। নিজের হাতে করে বয়ে এনেছি সেই দু'প্যাকেট।

- তবে?

- তোর প্লেটে পরিমাণ ঠিক আছে৷ কিন্তু আমার প্লেটে..।

- কম? 

- কম।

- কিন্তু আমার চোখে তো..।

- শুধু চোখ দিয়ে বিরিয়ানির তল পাবি নাকি রে রাস্কেল?

- স্পষ্ট দেখছি তো, সেম কোয়ান্টিটি। 

- কাঁচকলা। আমার প্লেটে কম।

- কতটা কম?

- এককণা চাল কম। 

- তুমি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছ মামা?

- ডেড সিরিয়াস। বিরিয়ানি নিয়ে ফচকেমো আমি বরদাস্ত করতে পারিনা।  

- তোমার সামনেই তো প্যাকেট থেকে প্লেটে ঢাললাম। এই দেখো বাক্স। এক কণাও চাল এখানে পড়ে আছে কি? নেই। শেষ কণাটুকু  প্যাকেট থেকে থালায় ট্রান্সফার করেছি। আর টেবিলেও ভালো করে দেখো। এক কণাও কোথাও পড়ে নেই। উফ, আমি এই আজগুবি অভিযোগের উত্তরই বা কেন দিচ্ছি কে জানে।

- একসময় পৃথিবীর রোটেশন আর রিভোলউশন ব্যাপারটাও মানুষ আজগুবি বলে মনে করত। যাকগে। নাহ্, বিরিয়ানি ঢালতে গিয়ে তুই কোনও রকম অযত্ন করিসনি। কিন্তু তবু, একদানা অমৃত চাল যে কোথায় গায়েব হল রে ভাগ্নে...।

- যত্তসব পাগলামো। এক কণা চাল নাকি পাতে কম পড়েছে। তোমার মাথাটা সত্যিই গেছে মাম,  মামী ঠিকই বলে। তুমি বিরিয়ানির প্লেট থেকে হারিয়ে যাওয়া এককণা হারানো চাল নিয়ে শোকসভা বসাওগে যাও৷ আমি বরং  খাওয়া শুরু করছি।

- হাই-ক্লাস বিরিয়ানির থালা থেকে হাপিস হওয়া এক কণা চালের দাম বোঝার বয়স তোর হয়নি ভাগ্নে। হয়নি। 


*****

- এই যে কেষ্টা! পাঞ্চালী কতক্ষণ ধরে টেলিপ্যাথেটিকালি তোমায় ডেকে ডেকে হন্য হচ্ছে৷ আর এতক্ষণে তোমার আসার সময় হল?

- যুধিদা। তোমার সবেতেই টেনশন। কেসটা কী?

- আরে ফরেস্ট ক্যাম্পের লাঞ্চমেনুতে আজ খিচুরি মামলেট ছিল। খেয়েদেয়ে আয়েস করে সবে লম্বা হওয়ার তাল করছি- এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপাত। দুর্বাসা স্যার হাজির। এক্কেবারে সদলবলে।

- এই সেরেছে। খিটখিট বুড়ো আবার এই ভরদুপুরে জঙ্গলে কেন? দু'দিন আগেই তো তাঁকে দুর্যোধনের বাড়িতে ফুর্তি করতে দেখলাম। 

- ওই রাস্কেল দুর্যোরই কারসাজি এ'টা। খেপচুরিয়াস দুর্বাসাকে অসময়ে এ'খানে লাঞ্চে করতে পাঠিয়েছে যাতে আমরা খাওয়াতে না পেরে অপদস্থ হই। আর তারপর একটা অভিশাপ-টভিশাপ দিলেই চিত্তির। 

- তা দুর্বাসা আর তাঁর দলবল এখন কই?

- নদীতে নাইতে গেছে। তবে ফিরে এলো বলে। এ'দিকে হেঁসেল খালি। পাঞ্চালী গোঁ ধরে বসে আছে - কিছুতেই সে এই অসময়ে গেস্টদেরর জন্য নতুন করে রান্না চাপাতে পারবে না। 

- কেসটা সিরিয়াস। তবে চাপ নিওনা যুধিদা। ম্যায় হুঁ না। খিচুড়ির হাঁড়িটা আমার কাছে  নিয়ে এসো দেখি।

- তা'তে কী হবে? সে হাঁড়ি খালি পড়ে আছে।

- ও একদানা চাল পড়ে থাকলেও হবে।

- ভীম ওই হাঁড়ি থেকে ডাইরেক্টলি খায় কেষ্টা। এককণাও পড়ে থাকার চান্স নেই। হাঁড়িখানা পড়ে আছে তাই বাপের ভাগ্যি।

- আরে আনো না হাঁড়িটা। আমি না হয় মন্ত্রবলে এক কণা চাল সে'খানে নিয়ে আসব'খন। যে সে চালের কণা নয়- এক্কেবারে সুপার ইস্পেশ্যাল ভাতের কণা। সেই এক দানা চাল আমি নিজের মুখে চালান করলেই জগৎসংসারের খিদে গায়েব হবে। দুর্বাসা আর তাঁর চ্যালাচামুণ্ডারাও ঢেঁকুর তুলতে তুলতে কেটে পড়বে, পাতপেড়ে খাওয়ার সাহস আর তাঁদের থাকবে না।

- বাহ্। তুকতাক ভালোই শিখেছ কিন্তু কেষ্টা। তা, এই ইস্পেশাল ভাতের কণাটা আসবে কোথা থেকে?

- বিরিয়ানি নামের একটি পদ থেকে তুলে আনতে হবে যুধিদা। স্ট্রেট ফ্রম দ্য ভবিষ্যৎ। যাও, এ'বার ফাঁকা হাড়িটা নিয়ে এসো দেখি।

Monday, October 5, 2020

অমলকান্তির অফিসে


সকাল সকাল বসের তলব। 

অমলকান্তি তড়িঘড়ি ছুট দিলেন বসের ঘরের দিকে। পৌঁছে দরজায় একটা মোলায়েম টোকা। তারপর গুলকন্দ মেশানো গলায় শুধোলেন
"স্যার, আসব"?

উত্তর এলো টিনের ওপর ইটপাটকেল পড়া বাজখাঁই সুরে।

"আপনাকে নিশ্চয়ই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নজরুলগীতি গাওয়ার জন্য ডাকিনি। ভিতরে এসে উদ্ধার করুন"।

অমলকান্তি বুঝলেন হাওয়া সুবিধের নয়। নিজের গোবেচারা না-ঘরকা-না-ঘাটকা হাসিখানা মুখে সেঁটে ঘরের মধ্যে পা রাখলেন।

"আচ্ছা অমলকান্তিবাবু, আপনি কি আমায় বোকা ভাবেন? ডু ইউ থিঙ্ক আই অ্যাম আ ড্যাম ফুল"?

ভেবড়ে গেলেন অমলকান্তি। এই ধরণের প্রশ্নের সামনে অধোমুখ নেকুসম্রাট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকেনা৷ কিন্তু সকাল সকাল এই রাফায়েল-বোফর্স মেশানো আক্রমণের কারণটা ধরতে পারলেন না৷ 
শর্মা অ্যান্ড শর্মার ফাইলটা জমা হয়ে গেছে৷ 
গতকাল সন্ধ্যেয় ঘণ্টা দুই বাড়তি বসে গতমাসের স্টেটমেন্টখানাও রিকনসাইল করা হয়ে গেছে। 

তবে? 

সেই 'তবে'র তল আর পেলেন অমলকান্তি। কী একটা অতি-খুচরো প্রসঙ্গ তুলে উত্তমমধ্যম শুরু করলেন বস। মিউমিউ করে দু'চারটে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন বটে কিন্তু সেই মিউমিউ বসের মেজাজের আগুনে কেরোসিন হয়ে  ঝরে পড়ল। ঝাড়া মিনিট দশেক কথায় কথায় খড়মপেটা করে তবে অমলকান্তিকে মুক্তি দিলেন বস। 

ইস্তিরি করা পরিপাটি শার্ট প্যান্টের আড়ালে ভাঙচুর হয়ে যাওয়া মনটাকে লুকিয়ে কোনওক্রমে নিজের চেয়ারে এসে গা এলিয়ে দিলেন অমলকান্তি। কড়া করে এক কাপ ব্ল্যাক কফি না পেলেই নয়। সোজা হাঁক পাড়লেন;

- অ্যাই শিবু!

- এই যে অমলদা।

- কথা কি কানে যায় না? অফিসে আসিস কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোতে? মাইনেটা কি কোম্পানি মাগনা দেয়?

- সে কী অমলদা। সাড়া দিলাম তো।

- চোদ্দবার ডাকার পর।

- কই...আমি তো প্রথম ডাক শুনেই..।

- আমি কি মিথ্যে বলছি? অ্যাঁ? ইয়ার্কি হচ্ছে?

- ছি ছি। আপনি মিথ্যে বলবেন কেন।

- তুই কি আমায় বোকা ভাবিস? ডু ইউ থিঙ্ক আই অ্যাম আ ড্যাম ফুল?

- না না..সে কী!

- দ্যাখ শিবু, বাজে কথায় নষ্ট করার মত সময় আমার নেই। সামান্য এক কাপ কফির জন্য যদি এত কথা বলতে হয়, তা'হলে কাজ হয়েছে আর কী।

- আমি এখুনি কড়া করে এক কাপ ব্ল্যাক কফি নিয়ে আসছি অমলদা।

- কে চেয়েছে কড়া করে কফি? কে চায় ব্ল্যাক?

- ইয়ে..আপনি তো ওই কড়া ব্ল্যাক কফিই পছন্দ করেন..।

-  যত আজেবাজে কথা! ব্ল্যাককফি নাকি আমার পছন্দ। ইডিয়ট। বেশি দুধ বাড়তি চিনি দিয়ে এক কাপ নিয়ে আয় এখুনি। চট করে। ক্যুইক। আমার অত সময় নেই। বড়সাহেব একটা জরুরী কাজ দিয়েছেন।

শিবু কফি আনতে যেতেই খানিকটা শান্ত বোধ করলেন অমলকান্তি। 

ও'দিকে ওভেনে কফির সসপ্যানটা চাপাতেই শিবুর পকেটের ফোনটা বেজে উঠল। 
বাবা।

- হ্যালো।

- শিবু, শোন একটা জরুরী কথা ছিল..।

- কতবার বলেছি, অফিসে আমায় ফোন করবে না! হাজার রকমের দায়িত্ব আমার কাঁধে। অমলদা একটা জরুরী কাজ দিয়েছে। এখন ফোনে খেজুর করার সময় আমার নেই।

বলে ফোনটা খটাস্ করে কেটে দিলো শিবু।

চাউমিনার


রাস্তা ঘেঁষা চাউমিনের স্টলগুলোর সবচেয়ে বড় 'প্লাস পয়েন্ট' হলো চাউমিন রান্নাটা আগাগোড়া দেখা যায় এবং উপভোগ করা যায়। বড় রেস্তোরাঁর (বা জোম্যাটোর মাধ্যমে আনানো) চাউমিন প্রথমেই দেখা যায় প্লেটে। চাউমিনের গায়ে কী'ভাবে রং ধরল, সে'টুকু 'অবজার্ভ' করতে না পারলে তৃপ্তি হয়না৷ 

সামান্য পেঁয়াজকুচি আর অনেকটা কুচনো বাঁধাকপি (কিছু ক্ষেত্রে সামান্য রুখাশুখা গাজর কুচিও থাকে) ফায়্যার হবে চাটুর গরম তেলে। মনে রাখা দরকার- 'রাস্তার' চাউমিনে বিনস, বেলপেপার গোছের বাড়তি শখ-শৌখিনতা অদরকারি,সে'খানে চাই মারকাটারি অ্যাকশন । 

চাউমিনের চাটুর ওপর খনখনাখন্ খুন্তি নাড়ার শব্দ, আহা; এর তুলনা শুধু অমলেট বানানোর আগে স্টিলের গেলাসে চামচ দিয়ে ডিম ফেটানোর খটখটর মিঠে শব্দের তুলনা চলতে পারে৷ যা হোক৷ কথা হচ্ছিল চাউমিন নিয়ে। ভাজা পেঁয়াজ আর বাঁধাকপির মধ্যে পড়বে চাউমিন, বাড়বে চাউমিন-ভাজিয়ের ব্যস্ততা৷ পড়বে নুন, মশলা আর (যতই খুঁতখুঁত করুন না কেন) আজিনামোটোর গুঁড়ো। বাতাসে ভেসে বেড়াবে সুবাস। আর সে সুবাসে চড়চড়ে বিদ্যুৎ যোগ হবে ভিনিগার ছড়িয়ে দেওয়া মাত্র। জিভের মধ্যে সুড়ুৎ খেলে যাবে জল। এরপর যেই চাউমিন-ভাজিয়ে সোয়্যাসসের বোতলে হাত দেবেন, আমি হাঁ হাঁ করে উঠব "অল্প, একদম অল্প, কয়েক ফোঁটা মাত্র। কেমন"?

চাউমিন তখন প্রায় তৈরি। চাটুর একপাশে সে চাউমিন সরিয়ে রেখে চাটুর খালি জায়গায় ফের খানিকটা তেল ছড়িয়ে তার ওপর ফেলে দেওয়া হবে ফেটানো জোড়া-ডিম। খুন্তি দিয়ে নির্দয়ভাবে কচুকাটা করা হবে সে ডিমভাজা। বাবলর‍্যাপ ফাটানোর মতই এই চাটুর ওপর ভাজা ডিম ক্ষতবিক্ষত করাটাও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক কাজ। যা হোক, তারপর সেই চাউমিন আর ভাজাডিম মিলে মিশে একাকার।

চাটু থেকে সে চাউমিন নামানোর আগে চাউমিন-ভাজিয়ের প্রতি নম্র আব্দার ভাসিয়ে দেওয়াটাও রুটিন; "চাউমিনের ওপর দিয়ে লঙ্কাকুচি আর সামান্য কাঁচা পেঁয়াজ ছড়িয়ে দেবেন প্লীজ৷ আর হ্যাঁ, স্যস-ট্যস দেবেন না, কেমন"?

 বুকের মধ্যে তখন কয়েক হাজার জয় গোস্বামী একসঙ্গে মন্ত্রপাঠ করে চলেছেন  
"পাগলী, তোমার সঙ্গে এগচাউমিন কাটাব জীবন"।

পুরানি দিল্লী


২০০৭। দিল্লী।

একটা প্রেম দাঁড় করানোর কিঞ্চিৎ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রোজকার ক্লাস শেষ হতেই ছুট; সোজা গিয়ে ছ'শো একুশ নম্বর বাস ধরে কনট প্লেস। দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারটা বেশিরভাগ দিন ও'খানেই সারা হত। তারপর ইনার সার্কেল আর আউটার সার্কেল জুড়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা। 

একটানা অকারণ হাঁটা, অর্ধেক দুপুর আর পুরোটা বিকেল জুড়ে। অকারণ; কারণ ওই বয়সের প্রেম-প্রেম হাহুতাশকে লজিকের ফ্রেমে ধরতে যাওয়াটা বাড়াবাড়ি। 

কনট প্লেসের বেশিরভাগ দোকানপাট আর রেস্তোরাঁই কলেজপড়ুয়াদের পকেটের পক্ষে অস্বাস্থ্যকর৷ সে বয়সে কেএফসির মত রেস্তোরাঁতে ঢুঁ মারার কনফিডেন্সও ছিলনা৷ ওয়েঙ্গার্সের স্যান্ডউইচ বা কেভেন্টার্সের শেকও বড্ড দামী মনে হত। আমাদের ভরসা ছিল মূলত ফুটপাতের খাবার বিক্রেতারা৷  শিঙাড়া, বাদামভাজা, আলুচাট, চিপস, 'স্লাশ', বরফগোলা; এই'সব।  বুকে 'অষ্টমীতে প্রথম দেখা' মার্কা হুহু থাকলে আলুচাটের থেকেও চিকেনরোলের সুবাস পাওয়া যায়। দিব্যি উতরে যেত সেই দুপুর আর বিকেলগুলো।

শুধু কোনও কোনও দিন হাঁটাহাঁটির মধ্যে পেত প্রবল খিদে। প্রবল। সুতীব্র। সে বয়সে খিদেপেটে মনে হত; পারলে মরিচ ছড়িয়ে, মাখন মাখিয়ে চেয়ার টেবিল বা এনসাইক্লোপিডিয়াও চিবিয়ে খেতে পারি বোধ হয়। সেই হাইক্লাস খিদে যে আলুচাট বা বাদামভাজায় বধ হবে না, সে'টাই স্বাভাবিক।  

আমরা গোটা এলাকা চষে ফেলে এমন একটা রেস্তোরাঁ খুঁজে বের করতে পেরেছিলাম যে'খানে দশ-পনেরো দিনে একবার লাঞ্চ করলে পথে বসতে হবেনা। আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট। সে'খানকার বোলচাল বেশি নয় আর রান্নাবান্না বেশ মশলাদার। আমাদের অবশ্য বেশি এক্সপেরিমেন্ট করবার ক্ষমতা ছিল না। একটা প্রবল ভাবে অ-চৈনিক চিলি চিকেন বানাতো তারা৷ তার সঙ্গে রুমালি রুটি দিব্যি জমে যেত। যে'দিন তেমন মেগা-খিদের খপ্পরে পড়তাম, সে'দিন আমরা গিয়ে বসতাম ন্যাশনাল রেস্টুরেন্টে। এক প্লেট চিলি চিকেনের দাম ওই একশোটাকা মত ছিল, দশ পিস পাওয়া যেত। ছ'পিস আমার প্লেটে, চার পিস তার। রুমালি রুটিও বেশ সস্তাই ছিল।  ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট না থাকলে আমাদের মাঝেমধ্যে অমন আয়েস করে বসে গল্প করা হত না, হেঁটেই হদ্দ হতে হত। 

এক প্লেট চিলি চিকেন আর খান ছয়েক রুটি অর্ডার দিয়ে রহিসি মেজাজে গল্প শুরু হত। দশ মিনিটের মাথায় খাবার সার্ভ হয়ে যেত টেবিলে; সঙ্গে বোনাস - পুদীনার চাটনি আর কুচোনো পেঁয়াজ। ছ'টা রুটির চারটে আমার থালায়। 

খাবার আসা মাত্রই পেটের খিদে চারগুণ, চোখের সামনের জলজ্যান্ত প্রেমিকাটি আবছা হয়ে আসত। জীবনে পড়ে রইত শুধু ওই ছ'পিস চিলি চিকেন আর ছ'টা রুমালি রুটি। স্রেফ চিলি চিকেনের ঝোল ছুঁইয়ে চারটে রুমালি উড়ে যেত, তখনও চিকেনের টুকরোগুলো অক্ষত।  আরও দু'টো রুমালি চেয়ে নেওয়া হত। সাত নম্বর রুমালি শেষ হলে চোখের সামনে প্রেমিকার অবয়ব ফের স্পষ্ট হয়ে উঠত। সে তখনও দু'নম্বর রুমালি রুটি নিয়ে টুকুরটুকুর চালিয়ে যাচ্ছে। আট নম্বর রুমালিতে গিয়ে সামান্য ঝুঁকে ভাসিয়ে দিতাম সেই 'একবার বলো উত্তমকুমার' লেভেলের আর্তি;
"তোমার থেকে হাফ-পিস চিলিচিকেন পাওয়া যাবে"?

ও'দিক থেকে হাফ-পিসের বদলে একটা গোটা পিসই উঠে আসত আমার পাতে। সে কী সহাস্য আস্কারা।  

মুখে বলতাম " আহা, এতটা আবার কেন"? অথচ মনের মধ্যে তখন চিত্রহার, রঙ্গোলী আর সুপারহিট মুকাবলা  একসঙ্গে ফায়্যার হচ্ছে।

**

বহুদিন পর গতকাল আবার গেছিলাম কনট প্লেসের ও'দিকে৷ এক জোড়া রুমালিতে ঘায়েল হওয়া সেই মানুষটাই ডেকে দেখাল; ন্যাশনাল রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডের রংটা এখনও পাল্টায়নি।

টপ ১০ মহালয়া এলিমেন্টস ফ্রম দ্য নাইনটিজ



১। ঢাউস একখানা অ্যালার্ম ঘড়ি। যে ঘড়ির দিকে তাকালেই ঘুমটুম উড়ে যায়। যে ঘড়ি মাথার কাছে রেখে চোখ বুজলেই বুকে ঢিপঢিপ; এই বুঝি বোমা ফাটল। যে ঘড়ির অ্যালার্ম শ্যামবাজারে বাজলে গোলপার্কের ঝিমোনো মানুষজন চমকে ওঠে। 

২। ব্যাকআপ অ্যালার্ম; "দিদা, বাই চান্স অ্যালার্মটা ফেলে করলে একটু ডেকে দিও"। কম্যুনিস্ট দাদারাও এ'দিনটায় মার্ক্স ত্যাগ করে কালচারের তাড়নায় দিদিমাদের দিকে ঘেঁষতেন।

৩। রেডিও। বোনাসঃ আগের দিন সন্ধ্যেয় কাটলেট সহযোগে ফ্রিকুয়েন্সি টেস্টিং।
 
৪। ব্যাকআপ ট্রানজিস্টার। ব্যারাকপুরের মেসো বারবার বলতেন, পলিটিশিয়ান আর যন্ত্রপাতিদের চোখ বুজে ভরসা করতে নেই।

৫। চানাচুর। ভোরবেলা ঝাল চানাচুর হল চাউমিনে পোস্তর সমান। দরকার হল টকমিষ্টি চানাচুর। বাটি অপ্রোয়জন,  বয়াম থেকে ডাইরেক্ট মুঠো করে তুলে নেওয়াটাই ট্র‍্যাডিশন।  তারপর দুলে দুলে বীরেন্দেবাবুর সুরে তাল দিয়ে চেবানো। 

৬। চা। কাপে হবে না। সাপ্লাইলাইন দাঁত খিঁচোবে৷ ফ্লাস্কে ভরে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বসাটাই যুক্তিযুক্ত। 

৭। প্রথম দু'মিনিট শোনার পর। গলায় উত্তেজনা! "ভদ্রবাবুর ভয়েসে যে কী ম্যাজিক! দ্যাখ দ্যাখ। এই দ্যাখ। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে"।

৮। দশ মিনিট শোনার পর। মোলায়েম আবেগ এসে চেপে ধরবে, "মা আসছেন"।

৯। পনেরো মিনিট শোনার পর। "এ কী রে মেজদা। ঘুমোলি নাকি? আদত ইয়েটা তো সবে ইন্টেন্সিফাই হচ্ছে"।

১০। কুড়ি মিনিট পর - "চোখটা না..লেগে আসছে৷ তাছাড়া এইচএমভির ক্যাসেটজোড়া তো আছেই। বেলার দিকে লুচি বেগুনভাজা খেতেখেতেই না হয়.."।

আই লাভ ইউ


- তুমি আমায় আই লাভ ইউ টাভ ইউ বিশেষ বলো না কিন্তু।

- ন্যাকাপনা। 

- শেষ যখন বলেছিলে তখন কেন্দ্রে কংগ্রেস,  রাজ্যে সিপিএম। 

- গা জ্বলে যায়।

- ডাইভার্ট করে দিও না সুমি। ডাইভার্ট করে দিও না। 

- হঠাৎ এ'সবের শখ হলো কেন?

- শখ? রাইট বলো। অধিকার অফ আ স্পাউস।

- গাম্বাটদের অধিকার থাকতে নেই।

- আমি গাম্বাট?

- আলবাত।

- আই লাভ ইউ দাবী করেছি বলে আমি গাম্বাট? 

- আই লাভ ইউতে আই লাভ ইউ খুঁজে হদ্দ হচ্ছ বলে।

- এই এক ঝামেলা। যে কোনও তর্কে দিব্যি কেমন ঘুরপাক খাইয়ে গুলিয়ে পেঁচিয়ে দাও।

- সাধে কি বলি? গাম্বাট। উইথ আ ক্যাপিটাল জি।

- আই লাভ ইউতে আই লাভ ইউ খুঁজে হদ্দ হওয়ার কেসটা কী সুমি?

- আই লাভ ইউ বলতে গেলে "আই লাভ ইউ"ই বলতে হবে, এ'সব গোদা আইডিয়াগুলো এ'বার ত্যাগ করো। মনে রেখো, গদা দিয়ে ইয়ারবাডের কাজ চালানো যায়না।

- তুমি আমায় বলো কখনও? আই লাভ ইউ? 

- বলি। তবে হাইক্লাস ট্রান্সলেশনে।

- কী'রকম?

- এই যেমন গতকাল দুপুরে যে বললাম। "তোমার বানানো বিরিয়ানি আরসালানকে টক্কর দেবে"। 

- ও'টা আই লাভ ইউ?

- টপমোস্ট ক্যাটগরির। রীতিমত ব্লাইন্ড।

- আই সী। তা'ছাড়া?

- গত হপ্তায় আদতে বললাম আই লাভ ইউ। কিন্তু শব্দগুলো যখন তোমার কানে পৌঁছল, তুমি শুনলে "আজ কলেজ স্ট্রিট গেছিলাম তোমার জন্য খানকয়েক পুরনো পুজোসংখ্যা জোগাড় করতে"।

- তা বটে। ছেলেবেলার হারিয়ে যাওয়া সমস্ত পুজোসংখ্যা,  প্রাইসলেস।

- তারপর ওই যে সে'দিন। তুমি বললে মনখারাপ৷ আমি বললাম "এসো, নবরত্ন তেল দিয়ে মাথা মালিশ করে দিই"। এর চেয়ে হাইকোয়ালিটির আই লাভ ইউ হয়?

- তাই তো। আই উইথড্র মাই অ্যালিগেশন৷ আর ইয়ে, আই কিন্তু লাভ ইউ। মাইরি।

- চলো, দু'জনে মিলে মুড়ি মাখি বরং।

দ্য গ্র‍্যান্ড তুকতাক

- কী চাই? - হুঁ? - কী চাই? চাকরীতে টপাটপ প্রমোশন বাগানোর মাদুলি? শুগার কন্ট্রোলে রাখার তাবিজ? হাড়বজ্জাত মানুষজনের বদনজর এড়িয়ে চল...