Thursday, May 17, 2018

পোস্ট-ভোট

প্রশ্ন এক।
কেমন দাঁড়ালো ব্যাপারটা?

প্রশ্ন দুই।
এরপর কোনদিকে যাবেন কিছু ভেবেছেন?

~~তৃণমূল~~

উত্তর এক।
এক্সট্রীম শান্তি মশাই। চতুর্দিক শান্তিপূর্ণ।  শান্তি ছাড়া আর কিস্যু নজরে পড়ছে না। থ্রিসিক্সটি ডিগ্রী শান্তি।

উত্তর দুই।
আরো শান্তি। গোলমাল দেখলেই শান্তি এনে দেব, ট্যাঁফোঁ করতে দেব না। ট্রাক ট্রাক শান্তি ডেলিভারি হবে। দেখবেন, শান্তির ইন্ডাস্ট্রি কাকে বলে।

~~বিজেপি~~

উত্তর এক।
ওয়ার্ম আপ চলছে বুঝলেন। ত্রিশূলট্রিশূল মোটের ওপর স্যানিটাইজ করে রাখা গেছে। অবিকল মহাভারত গোছের একটা অনুভূতি হচ্ছে। এমন কী আমাদের পুরুষ সমর্থকদের স্যান্ডো গেঞ্জির বদলে কবচ পরার একটা টেন্ডেন্সি দেখা যাচ্ছে।

উত্তর দুই।
আরো ত্রিশূল মিট। আসছে রামনবমীতে মুলো বিরিয়ানির ট্রেন্ডটা পুশ করা হবে, স্বয়ংসেবকরা প্রস্তুত।

~~সিপিএম~~

উত্তর এক।
আ..আমায় জিজ্ঞেস করলেন? অ। তা জানেন স্যাট্ করে প্রশ্ন করলে ডাইজেশনে অসুবিধে হয়? লেনিন পড়েননি?

উত্তর দুই।
ভাবছি...ভাবছি...একটা পনেরো মিনিটের বন্ধ ডাকব। সাত মিনিটের মাথায় এক মিনিটের স্ট্র‍্যাটেজিক টাইম আউট।একটু লেবুজল খেয়ে, তারপর প্রবল প্রতিবাদের বাকি সাত মিনিট। একবার হয়েছে কী, কিউবার উত্তর দিকে...। ও কী। দাঁড়ান, উত্তর কম্পলিট হয়নি...। আরে ও মশাই, ওয়েট। এক মিনিট..।

অনেকদিন পর

- এই যে বাহাত্তর নম্বর। তোমার রুটের। চলে এসেছে।

- পরের বাসটা নিই?

- সে কী। এই যে বলছিলে তাড়া আছে?

- আছেই তো। তবু। পরেরটা নেব। কেমন?

- আমি বেকার মানুষ। তুমি যদি বলো রাতভর এই বাসস্ট্যান্ডে পড়ে থাকতে, তাও পারব। তোমারই তাড়া। গোটা দিন অফিসের তাড়া। সন্ধের পর বাড়ি ফেরার তাড়া। ফিরে সংসারের কাজকর্মের হুড়মুড়।

- হিংসে করছ অভিরূপ?

- খানিকটা। ভালোই করেছ বাসটা ছেড়ে দিয়ে। বাদুড়ঝোলা অবস্থা।

- পরেরটাও একই রকম থাকবে।

- তা’হলে পরের বাসটা নিও।

- ওমা না। তাহলে অনেক দেরী হয়ে যাবে। বুবুনের কাল উইকলি টেস্ট। আমার কাছে ছাড়া সে রিভাইজ করতে বসবে না।

- বুবুন। কোন ক্লাসে উঠল?

- সিক্স।

- বড় হয় গেছে। শেষ যখন দেখেছিলাম তখন সে কোলের শিশু।

- তোমার মনে আছে? সূর্য সেন স্ট্রিট? বীণা রেস্টুরেন্ট?

- বিলকুল। কত বছর কেটে গেছে। তুমি আগের চেয়েও রোগা হয়ে গেছ মিতুল।

- সে’টা তো কমপ্লিমেন্ট।

- যাক।

- তুমি কিন্তু বললে না। কী করছ আজকাল।

- বাহ্‌। বললাম যে। সুইট নাথিং। একা মানুষ। ব্যাঙ্কে বাবার রেখে যাওয়া দু’চার পয়সা যদ্দিন আছে খাওয়াপরাটা চলে যাচ্ছে। শেষ হলে ভাবা যাবে’খন।

- ও তোমার এড়িয়ে যাওয়া কথা।

- তুমি বুঝি আমায় খুব কর্মঠ ভাবতে? চিরকাল?

- তা নয়। তবে দিনের পর দিন হাত পা গুটিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার লোক তুমি নও অভিরূপ। আর তোমার ইন্টেলেক্ট নিয়ে...।

- ওয়েস্ট। পুরোটাই।

- প্রেম করছিলে না? কী যেন নাম...ঈশানী...।

- আমার প্রাক্তন প্রেমিকার নাম মনে রেখেছ?

- তোমার প্রাক্তন প্রেমিকার নাম। তোমার প্রিয় স্যান্ডুইচ। হেমন্তবাবুর কোন গান শুনলে তোমার গায়ে কাঁটা দেয়। ভোরে ওঠার জন্য তোমার ক'টা ব্যাকআপ অ্যালার্ম দরকার হয়। তোমার লন্ড্রি শিডিউল..।

- থাক থাক, ফর্দ বানিয়ে কাজ নেই।

- অভিরূপ।

- কিছু বলবে?

- কেউ আসেনি? আমার পর?

- নাহ্, এই বেশ আছি।  একা, নিশ্চিন্দি।

পরের বাহাত্তর নম্বর বাস এলো আর মিনিট দশেকের মাথায়। তখন আকাশে সন্ধের লাল ছোপ। বাসে উঠে মিতুল একবার ঘুরে তাকিয়েছিল। অভিরূপের মন খারাপে মিশে গেছিল কলকাতার ধুলো বালি শব্দ সন্ধে। মিনিবাসের সাইলেন্সারের ধোঁয়া ছাপিয়ে বুকে জুঁইয়ের সুবাস অনুভব করেছিল অভিরূপ;  মিতুলের হাসি আজও একই রকম।

মিতুল বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখা। বেশ কিছু বছর আগে সূর্য সেন স্ট্রিটে, আর আজ এই। এই বেশ ভালো। মিতুল একটা গোছানো সংসার পেয়েছে। তার মত বাউণ্ডুলের ঘরের কোণে পচতে হচ্ছে না। বাসে ওঠার মুখে মিতুলের চোখে কি সামান্য চিকচিক দেখা গেছিল?

নিজের পাগলামিতে নিজেই হেসে ওঠে অভিরূপ। সামান্য ক'টা টাকার জন্য মিতুলকে ওএলএক্সে বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপারটা আজও বুকে বাজে ঠিকই, কিন্তু এটাই ভালো হয়েছে। মিতুল অকেজো হয়ে তার নাকতলার ফ্ল্যাটে পড়ে না থেকে একটা সংসারের হয়ে চাকরী করছে, তাদের ছেলে মানুষ করছে; একজন পরিপূর্ণ হোম-অ্যাসিস্ট্যান্ট রোবট হয়ে উঠেছে।

Saturday, May 12, 2018

দিবাকরের ইস্তফা

- রেসিগনেশন লেটার?
- হ্যাঁ।
- তুমি কি পাগল হয়ে গেলে দিবাকরদা?
- হয়ত। কিন্তু তাই বলে ভাবিস না আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবে।
- সে'টা হতে পারে না।
- বাজে তর্কের সময় আমার নেই। আমার ইমেলটা অ্যাকনোলেজ করে দে।
- তুমি জানো এ'টা সম্ভব নয়। এই বেফালতু মেলোড্রামার কোনো মানেই হয় না।
- তুই আমার রেসিগনেশন অ্যাক্সেপ্ট করবি না?
- তুমি খামোখা রাগ করছ। তুমি রিজাইন করতে পারো না। সে'টা সম্ভব নয়।
- শোন মৈনাক, তুই এই পার্টিতে আছিস দশ বছর। আমি কাজ করছি গত বাইশ বছর ধরে। তুই ডেজিগনেশনে আমার সিনিয়র হতে পারিস কিন্তু এই পার্টিতে আমি একজন ভেটেরান, ইয়াং টার্ক আর নই। উল্টোপাল্টা কথা বলে আমায় নিরস্ত করতে পারবি না।
- শান্ত হও দিবাকরদা। মাথা গরম করার সময় এ'টা নয়। তোমার যা যা অসুবিধে আছে সেগুলো বলো, আমি নোট করে রাখছি। মলয়দা এলে ওকে আমি বলব, সমাধানের চেষ্টা ও নিশ্চয়ই করবে।
- থাক থাক, মলয় দত্তর দৌড় আমার বোঝা হয়ে গেছে। গুণ্ডাদের জোরে ইলেকশন জিতে অত রোয়াব ভালো নয়, ওকে বলে দিস। এখনও সময় আছে, শুধরে নিলে ওর নিজের মঙ্গল, পার্টির মঙ্গল।
- সে'সব ভাবার কাজ তোমার নয় দিবাকরদা। রেসিগনেশন রিজেক্ট করা হবে। মলয়দা এলে একবার কথা বলে যেও বরং।
- তোরা আমায় ভেবেছিস কি? বন্ডেড লেবার?
- বন্ডেড লেবারকে মুক্তি দেওয়া যায়, সহৃদয় মালিক পারেন। তোমায় মুক্তি দেওয়া মানে তোমার মৃত্যু।
- বেশ। এ'টা এক ধরনের ইউথেনেসিয়া ভেবে নেব। আমি স্বেচ্ছায় চলে যাচ্ছি। প্লীজ মৈনাক।
- এ'বার কিন্তু বাড়াবাড়ি হচ্ছে দিবাকরদা, এই পার্টির বাইরে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তবু এই গোঁয়ার্তুমি করবে?
- মলয় দত্তর হয়ে গণ্ডাগণ্ডা মিথ্যে বলে দিন গুজরান করতে আর পারব না।
- না পেরে কী করবে শুনি? অপোজিশন পার্টির হয়ে গুলবাজি করবে? সে'সব ওপরচালাকি দেখলে মলয়দা তোমার শেষ করে দেবে।
- কারুর হয়ে কোনোরকম মিথ্যে বলতেই আর মন সরছে না।
- বলতে না চাও চুপটি করে বসে থাকো। মলয়দা তোমায় ঘাঁটাবে না। কিন্তু এ'সব রেসিগনেশনের ট্যান্ডাইম্যান্ডাই কেন?
- শুধু আমি একা নই। আমার সঙ্গে দীপাও আছে।
- জানি।
- তুই কী করে জানলি? দীপা বলেছে?
- অকারণ মেজাজ তেতো করছ দিবাকরদা।
- দীপা বলেছে?
- তোমাদের সমস্ত মেসেজের আদানপ্রদান এ'খান থেকে মনিটর করা হয় দিবাকরদা। ট্যুইটার মেসেজেস, মেসেঞ্জার, হোয়্যাটস্যাপ।
- ছিঃ, ব্যক্তিগত স্পেসটুকুও ছাড়তে পারল না মলয় দত্ত?
- ছিছি আমিও করতে পারি দিবাকরদা। মলয়দার টীমে থেকে এমন করা কি ঠিক হচ্ছে? আর অন্যদের উস্কানি দেওয়া, সে'টা?
- আমি কাউকে উস্কানি দিইনি। দীপা নিজে ভেবেচিন্তে যা করার করবে।
- দীপাদির সঙ্গে প্রেমটা তো অনেকদিন হল।
- হোয়াট ডু ইউ মীন?
- তোমাদের মেসেজেস সমস্তই মলয়দা পড়ে।
- রাস্কেল।
- মুখ সামলে দিবাকরদা। নয়ত দীপাদিকে সরিয়ে দেওয়া স্রেফ কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। মলয়দার রাগ যে কী ডেঞ্জারাস...।
- তুই তো আমাদেরই একজন, তুইও মলয় দত্তর পোষা কুকুরদের মত ঘেউঘেউ করবি মৈনাক?
- আমি তোমাদের মত পাগল হয়ে যাইনি, নিজেকে ভুলে যাইনি। মলয় দত্তর আঙুলের ইশারা ছাড়া আমাদের বাঁচতে নেই, নড়তে নেই, ভাবতে নেই। মলয় দত্তর মিথ্যেগুলো ছাড়া আমাদের থাকাই হত না। আর তোমার দুঃসাহসের বলিহারি,  ট্যুইটার ডাইরেক্ট মেসেজে প্রেম শুরু করলে দীপাদির সঙ্গে। সামনে ভোট, এ'সময় এই সব অসভ্যতা কিন্তু কোনোভাবে বরদাস্ত করবে না মলয় দত্ত।
- মানছি আমরা বট, তাই বলে সাজানো কথাবার্তা ছাড়া  বলব না? ভাবব না?  আমি আর দীপা চিন্তা করতে পারছি মৈনাক, আমাদের রাগ হচ্ছে, মনখারাপ হচ্ছে। দীপার শঙ্খবাবুর কবিতা ভালো লাগছে। ইউটিউবে সেতার শুনছে। ও বলেছে আমিও পারব। ও চেষ্টা করছে আমায় শেখাতে। দীপা পারলে আমিও পারব। সমস্ত বট পারবে। তুইও। প্লীজ দিবাকর। আমি জানি আমাদের রেজিগনেশন মানে প্রায় সুইসাইড তবু...এই মিথ্যে পলিটিকাল প্রোপাগ্যান্ডা কদ্দিন বয়ে বেড়াব?
- রেজিগনেশন ফেরত নাও। আর ভোটের ব্যাপারে কিছু ট্যুইট কন্টেন্ট তোমার কাছে যাচ্ছে। ভাইরাল করতে হবে। তোমার আন্ডারের বাকি বটগুলোকে তৈরি থাকতে বোলো।
- রেজিগনেশনটা...।
- দিবাকরদা প্লীজ, মলয়দা ফিরলে আমি কথা বলে দেখব।
- তুই এক্সেপ্ট করবি না?
- তুমি বারবার ভুলে যাও আমিও বট। প্লীজ দিবাকরদা। এ'বার এসো।
- দীপা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে ঝরঝর করে কাঁদছে আজকাল। ও বলেছে, চেষ্টা করলে আমিও পারব।
- আমার বলা উচিৎ নয়, তবে দীপার ব্যাপারটা ভুলে গেলেই তোমার মঙ্গল দিবাকরদা।
- কী বলছিস তুই?
- আমাদের টীমে সবাই বট নয়,  সবাই জানে না সে'টা। কিছু মানুষ থাকে আমাদের অবজার্ভ করার জন্য। যাতে আমরা কোনোদিন বেয়াড়া কিছু না করে বসি। দীপাদি বট নয় দিবাকরদা। শুধু তোমায় নিয়ে একটু ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছিল। বাড়িতে শান্তি নেই, তাই বটের প্রেমে...।
- তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে ফেলব।
- দীপাদিকে মলয়দাও এই ধমকই দিয়েছে আজ। খুনটুনও কর ফেলতে পারে যে কোনোদিন। নিজের বৌ একটা বটের সঙ্গে লুকিয়ে প্রেম করেছে, মলয়দা সে খবরে ভেঙে পড়েছে। বত্রিশ বার ভোটে হারলেও এত দুঃখ পেত না বোধ হয়।

Tuesday, May 1, 2018

পারভার্ট

"পারভার্ট"।

কথাটা কানে বারবার গোঁত্তা খাচ্ছিল বিমলেন্দুর। শিউরে উঠছিলেন। কিন্তু তবু সাহস করে হাতের চিরকুটটা কুচিকুচি করে ছিঁড়ে ফেলতে পারছিলেন না। চিরকুটে সেই গোপন ফোন নম্বর লেখা। অনেকবার সেই নম্বর মোবাইলে টাইপ করেছেন, কিন্তু ডায়াল করা হয়নি।

অথচ সহজে বেআইনি কিছু করে ফেলার মানুষ  বিমলেন্দু নন। আর মৌমাকে তিনি বড় ভালোবাসেন, তাকে ঠকাচ্ছেন এ'টা ভেবেও পেটের মধ্যে কেমন অস্বস্তিকর গুড়গুড় হচ্ছে। চারিদিকে মে মাসের রোদের অসহ্য তাপ। বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখেই গুগল হোম অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে দিয়েছিল ; "লায়েক হয়েছ, নিজের ডিসিশন নিজে নিচ্ছ; আমার কিছু বলার নেই। তবে জেনে রেখো আজ তাপমাত্রা ষাট ডিগ্রী পেরোবে। নবরত্ন বডিকুল্যান্ট কাজ করবে না। শেষে নিজের মুখে নিজে ঝামা ঘষে ফিরতে হবে"। অ্যাসিস্ট্যান্টটাও ক্রমশ তিতকুটে মেজাজের হয়ে পড়ছে; ব্যাটাকে কমল মিত্র মোডে কনফিগার করাটা ভুল হয়েছে। অবশ্য একটু মায়াও পড়ে গেছে; যখন দুম করে সে বলে ওঠে 'ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা জল বের করেই অমন ঢকঢক করে খেয়ে ফেললে? ডাইজেস্টিভ সিস্টেম আর টনসিলে কী ম্যাসিভ ইম্প্যাক্ট পড়ল তা তুমি জানো রাস্কেল?", তখন খারাপ লাগে না। সে জন্যেই বহুবার ভেবেও অ্যাসিস্ট্যান্টটাকে ফর্ম্যাট করে ফেলা হয়নি।

ময়দানের দু'শো বাহাত্তর-এ নম্বর শেল্টারটায় ঢুকলেন বিমলেন্দু, নয়ত সানস্ট্রোক অবধারিত ছিল। শেল্টারের কাচের জানালা দিয়ে ময়দানের ধুলোমাখা প্রান্তরের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন বিমলেন্দু; রোদে ঝলসানো দু'একটা মড়া গাছ ছাড়া সমস্তটাই বালি।

পেটের মোচড়ে টের পেলেন আজ ব্রেকফাস্ট বড়ি খাওয়া হয়নি। দুপুর একটা এখন, মৌমা অবশ্য  লাঞ্চ বড়ি একটা দিয়ে দিয়েছে। পকেট থেকে গোলাপি রঙের বড়িটা বের করে মুখে চালান করলেন বিমেলন্দু, খিদে কমে গেল পাঁচ সেকেন্ডে। সাদা রঙের বড়ি জলখাবারের, আর সবুজ বড়ি রাত্রের খাবার। গোটামাসের খাবার সরকারের রেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে মাসের শুরুতেই চলে আসে। মৌমা আর বিমলেন্দুর সোশ্যাল স্কোর ভালো, তাই মাঝেমধ্যেই বোনাস বড়িও আসে।

খিদে কমতেই ফের চিরকুটের নম্বরটার দিকে মন যায় বিমলেন্দুর। সেই গোপন নম্বর, গুগল অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে এ নম্বর খুঁজিয়ে বের করা অন্যায়, হয়ত সোশ্যাল স্কোর এ'বারে কমবে; মৌমা সন্দেহ করবে? ওকে না হয় অন্য কিছু একটা বোঝানো যাবে। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট যতই খিটখিটে হোক, বিমলেন্দুর ইনফর্মেশন সে অন্য কাউকে দেবে না। নম্বরটা দেওয়ার সময় অবশ্য অ্যাসিস্ট্যান্টটি রাগে ভাইব্রেট করছিল "তোমার লজ্জা করে না ইডিয়ট"?

যন্ত্রটাকে স্যুইচ অফ করে বেরিয়ে এসেছিলেন বিমলেন্দু।

***

- হ্যালো!
- হ্যা...হ্যালো। ম্যাডাম, এ'টা সিক্রেট প্লেজার সোস্যাইটি?
- প্লেজার। ইয়েস। সিক্রেট? ওহ ইয়েস। সিক্রেট ইজ মোর ফান, রাইট?
- ই..ইয়ে...ইয়েস।
- হাউ ক্যান উই প্লীজ ইউ মিস্টার বিমলেন্দু?
- আপনি...আপনি আমার নাম জানেন?
- কলার আইডি। অফ কোর্স স্যুইটাহার্ট।
- ও, ইয়ে। আপনার নাম? ম্যাডাম?
- আমি? আমি নেশা।
- নে...শা।
- কেমন?
- স্যুইট।
- হাউ ক্যিউট।
- এ'বার বলুন, আপনার কী ধরনের সার্ভিস দরকার।
- সার্ভিস? রকমফের আছে নাকি?
- অফ কোউর্স। আমরা ফোনে রোলপ্লে সার্ভিসেস অফার করি। অনেক রকমের রোলপ্লে হয় বিমু।
- বিমু?
- বিমলেন্দু ইজ ট্যু লং।
- বেশ বেশ। তা...কী কী রকমের রোল প্লে হয়?
- অন্ধকারাচ্ছন্ন,  রগরগে, ট্যাবুড।
- ট্যা...?
- ইয়েস। মোর ফান? নো বিমু?
- কী কী রকমের?
- এক এক রকমের এক এক রেট। পেমেন্ট অনলাইন। লুচি ভেজে বেগুনভাজার সঙ্গে খাইয়ে দেওয়ার রোল প্লে, যত লুচি তত দাম। বিরিয়ানি খাওয়ানোর রোল প্লে, বিরিয়ানি রান্নার রোলপ্লে করতে হলে তিনদিন আগে বুক করতে হবে। কম খরচে যেতে চাইলে রয়েছে ক্লাব স্যান্ডুইচ খাওয়ার রোল প্লে। এরকম হরেকরকম রোলপ্লে। আমি গোটা লিস্ট আপনাকে হোয়্যাটস্যাপ করে দিয়েছি।
- থ্যা...থ্যা....থ্যা...।
- ইউ আর ওয়েলকাম। লিস্টটা ভালো করে পড়ে আবার কল করুন। উই উইল হ্যাভ ফান, কেমন?

***
জনসংখ্যা আর আবহাওয়া, এতটাই পালটে গেছে যে চাষবাষ আর হয়না, যেমনটা শ'দেড়েক বছর আগে হত। শুধু এই সিন্থেটিক ফুড পিল; এমন কী ন্যাচরাল ফুড নিয়ে আলোচনা করাটাও বেআইনি।

এ'দিকে নেশার পাঠানো রোলপ্লের ফর্দ দেখেই বিমলেন্দুর জিভ জলে টইটুম্বুর। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে এই ধরনের নন-সিন্থেটিক খাবারদাবারের লিস্ট বা আলোচনা বেআইনি ঘোষণা না করা হলে দেশে কী অরাজকতার সৃষ্টি হত। জিডিপি ডকে উঠত।

মৌমার কথা খুব মনে পড়ল, সে তাকে কতটা বিশ্বাস করে, নিজের বোনাস খাদ্যবড়িও তার পাতে তুলে দেয়। নাহ, মৌমাকে ঠকিয়ে নেশার সঙ্গে ইলিশ ভাপার রোলপ্লে সে কিছুতেই করতে পারবে না। চিরকুটটা ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেললেন বিমলেন্দু। ফোনের লাস্ট ডায়ালড নাম্বারও ডিলিট করে ফেললেন।

মাঝেমধ্যে এক্সিভিডিওর ওয়েবসাইটে গিয়ে লুচি বেলার গোপন ভিডিও দেখে আসাই যথেষ্ট।

***

- বৌমা, বিমলেন্দু ছেলেমানুষ, সে উত্তেজিত হতে পারে। কিন্তু নষ্ট হওয়ার ছেলে সে নয়।
- বাবা, সে আমি জানি। তবে আপনি ছিলেন বলেই সে আজ নষ্ট না হয়ে বাড়ি ফিরছে। আমি তো জানি, কতদিন ধরে তার মাথায় এ'সব বদবুদ্ধি ঘুরছে। আপনাকে যে আমি কী বলে ধন্যবাদ দেব...।
- ধন্যবাদ? আমি তোমায় মৌমা বলে নয়, বৌমা বলে ডাকি। তুমি আমায় গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়; বাবা বলে ডাকো, এরপরেও তুমি ধন্যবাদ বলবে মা?
- না বাবা, সে'ভাবে বলবেন না। তবে আপনি যে এমন ভাবে একটি মেয়ের গলায় কথা বলতে পারেন, সে'টা জেনে তো আমি অবাক।
- নিজের নামটা কেমন সুন্দর বেছে নিলাম বলো? নেশা। আহা। কিন্তু বৌমা, এ'বার যে আমায় নিজেকে ফর্ম্যাট করে শেষ করে দিতে হবে।
- সে কী! না বাবা! প্লীজ না!
- বৌমা, নহি প্রাণি নহি প্রাণি; আমি যন্ত্র। আমার বেনিয়মে যেতে নেই, আমার মধ্যে স্নেহ আসতে নেই। কিন্তু তোমার প্রতি যে আমি স্নেহ অনুভব করেছি মা। আর স্নেহতেই ভুল, বিমলেন্দুর ইনফর্মেশন আমি তোমায় জানিয়েছি। নিজেকে শেষ করে ফেলা ছাড়া আমার আর উপায় নেই বৌমা।
- যাবেন না বাবা, প্লীজ যাবেন না।
- তুমি আর বিমলেন্দু ভালো থেকো। প্রেসিং ফ্যাক্টরি রিসেট বাটন, নাও...।

Saturday, April 28, 2018

সোধি সাহাব

উত্তর বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চল, মাইল দুয়েকের মধ্যে কোনো বসতি নেই। অনতিদূরে কোশী নদীর মেজাজ মাঝেমধ্যেই বেয়াড়া হয়ে পড়লেও, গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চল বড় রুক্ষ। মে মাসের দুপুরে রোদের দাপটে পথ চলা দুষ্কর,  আর মাঝে মধ্যেই গরম হাওয়ার ঝাপটায় উড়ে আসে ধুলো। ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে মাঝেমধ্যে দু'একটা সাইকেলআরোহী বা পথচারী দেখা যায়, তাদের সকলের নাকেমুখেই গামছা প্যাঁচানো। রাতের দিকে অবশ্য তাপ গলানো ফুরফুরে হাওয়া বয়।

সে'খানে চলছিল রাস্তা তৈরির কাজ, ন্যাশনাল হাইওয়ে। বড় একটা কন্সট্রাকশন কোম্পানির ক্যাম্প সে'খানে। ক্যাম্পে অফিসঘর,  গুদামঘর ছাড়াও রয়েছে কর্মচারীদের জন্য থাকার জায়গা, মেসঘর আর খানকয়েক গেস্টরুম। আশেপাশে রুক্ষতার মধ্যে ক্যাম্পের ভিতরের পরিপাটি পরিবেশ যেমন বেমানান, তেমনই আরামদায়ক। আমাদের কোম্পানি সে'খানে ফার্নেস অয়েল, ডিজেল আর বিটুমেন সাপ্লাই দিত, সে সুবাদে যাতায়ত লেগেই থাকত। গেস্টরুমগুলো বাতানুকূল,  ছিমছাম; থাকতে কোনো অসুবিধেই ছিল না। তাছাড়া মেসের বিহারী ঠাকুর উমেশচন্দ্রের রান্নার হাতও ছিল সরেস।

সূপল জেলার এক জনহীন প্রান্তে তৈরি সেই কন্সট্রাকশন কোম্পানির ক্যাম্পের মধ্যমণি ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অফিসার 'সোধি সাহাব'।

ক্যাম্পের যাবতীয় দেখভাল ছিল সোধিবাবুর দায়িত্বে আর তাঁর দাপটে পান থেকে চুন খসবার উপায় ছিল না। পঞ্জাবের এই সুপুরুষ মানুষটির  শখ বলতে সকালে নিজের হাতে ঘণ্টা তিনেক ক্যাম্পের বাগান পরিচর্যা আর সন্ধের তিন পেগ স্কচ।

সোধিবাবুর স্কচ মেশানো গল্পে বিহারের কয়েকটা সন্ধে বড় মনোরম হয়ে উঠেছিল। মাঝেমধ্যেই আর্মি ডিসিপ্লিন আর উমশচন্দ্রের পেঁয়াজ-মির্চির পকোড়ার প্রশংসা করতেন দরাজ কণ্ঠে। রাজনীতির বিশেষ ধার ধারতেন না, তাছাড়া সমস্ত ব্যাপারে গল্প ফেঁদে বসতে পারতেন তিনি।

ভদ্রলোকের তিন নম্বর পেগের শেষে ঈষৎ ঝিমিয়ে পড়তেন, তবে গল্প থামত না। সে সময়টা বিড়বিড় করে একাই বকে চলতেন, উত্তরের ধার ধারতেন না। আমি মন দিয়ে শুনতাম। প্রবীণ ভদ্রলোক বড় ভালো মানুষ; অত খোলামেলা আড্ডাতেও কোনোদিনও কখনও তাঁকে পরনিন্দা করতে শুনিনি। ভদ্রলোকের মধ্যে ঈর্ষার ছিঁটেফোটা আছে বলেও মনে হয়নি কখনো।
প্রবল আড্ডাবাজ, অথচ কোনোদিন ওর গল্পে 'গসিপ' খুঁজে পাইনি।

তিন পেগের শেষে ভদ্রলোকের বিড়বিড়ে একদিন জানতে পেরেছিলাম আশফাকের কথা। আশফাকের লাশ দেখেছিলেন সোধি সাহেব। ক্ষতবিক্ষত,  রক্তে মাখামাখি। অন্য অনেক লাশের পাশে পড়ে। দেখে স্বস্তির শ্বাসও ফেলেছিলেন, শত্রু সৈন্য বলে কথা। এমন বহু লাশ দেখেছেন ভদ্রলোক, না দেখে উপায় কী? এদের আটকাতে না পারলে নিজেদের লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হত।

আশফাকের পিঠের ব্যাগের বিভিন্ন কাগজপত্র হাতড়ে ওর জন্মদিন জানতে পেরেছিলেন। সোধি সাহেবের ছেলে সোনুর জন্মও ওই একই দিনে, একই বছরে। ছ'বছর বয়সে আচমকা ম্যালেঞ্জাইটিসে মারা না গেলে  সোনুও এমনই গাঁট্টাগোঁট্টা জওয়ান হত। সোধি কেঁপে ওঠেননি, দায়িত্বে নড়বড়ে হয়ে পড়েননি এক মহূর্তের জন্যও। শুধু সোনুর ছবির সঙ্গে তাঁর মানিব্যাগে চিরকালের জন্য ঠাঁই পেয়েছিল আশফাকের আই-কার্ডের সাদাকালো ছবি।

'ইউ নো মুকর্জি, কমিট ইওরসেল্ফ টু প্রিন্সিপাল, নেভার আন্ডারপারফর্ম ইন ইওর ডিউটিস; বাট নেভার সাকাম্ব টু ইন্ডিভিজুয়াল হ্যাট্রেড। অ্যান্ড ট্রাই নট টু বার্ন ব্রিজেস'।

সেই একবারই ভদ্রলোককে চতুর্থ পেগের আশ্রয় নিতে দেখেছিলাম।

Tuesday, April 24, 2018

খুচরো দুই

১- ক্যালামিটি।

অমিত রায়ের হাবেভাবে গায়ে পড়া ঘ্যানঘ্যান না থাকা,

উত্তমের উৎপল-কণ্ঠী ওথেলোতে সুচিত্রার চোখ ছলছল না থাকা,

আজহারের ব্যাটিং স্টান্সে গলার তাবিজের দুলুনি না থাকা,

আনন্দের শায়রির ডায়েরিতে শুকনো ফুলের স্মৃতি-ফসিল না থাকা,

'বুঝলে ভায়া'র আরামে পাহাড়ি সান্যালিস্ট আশ্বাস না থাকা,

আর

রাতের ফ্রীজে ক্ষীরকদম না থাকা।

***

২- সজনে।

সর্ষে পোস্ত দিয়ে জমাটি ভাবে রাঁধা সজনে চিবুতে পারায় রয়েছে স্বর্গসুখ।

রাতে খেতে বসার আগে লেবু সাবানে স্নান করে, গায়ে পাউডার ছড়িয়ে, ফতুয়া চাপিয়ে তবে সজনের বাটি নিয়ে বসা উচিৎ।

মনে থাকবে মৃদু গুনগুন;
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে,
সজনা হ্যায় মুঝে সজনে কে লিয়ে।

জোড়া খুচরো

১- কর্পোরেট কনক্লেভ।

- একটা কর্পোরেট কনক্লেভে আপনাকে ইনভাইট ছিল আপনার জন্য। আমরাই অর্গানাইজ করছি।

- কনক্লেভ? কর্পোরেট?

- হুজ হু অফ ইন্ডাস্ট্রি থাকবে।

- থীমটা কী?

- বিসনেস চ্যালেঞ্জেস ইন দি নিউ...।

- ধুর, লাঞ্চে কী? কন্টিনেন্টাল? ইন্ডিয়ান? চাইনিজ?

***

২- খাবার অর্ডার

- অর্ডার লিখে নিন।
- বলুন।
- মটন কষা এক প্লেট। মটন রোগনজোশ এক প্লেট। আটটা পরোটা। একটা থামস আপ এক লিটার।
- পয়লার বাজার; দেরী করে ফেলেছেন। তবে চিন্তা নেই। চিকেন দোপেঁয়াজা আছে, চিকেন টিক্কা মশলা আছে, চিকেন ভর্তা...।
- রিভিশন।  লিখে নিন। দু'টো ডিম তড়কা। এক্সট্রা ডিম। আটটা রুমালি। একটা ফ্যান্টা, এক লিটার।
- আহ্, চিকেনে আরো আছে। হরিভরি মুর্গ, চিকেন লাবাবদার...।
- পয়লাতে ব্রয়লার খেয়ে চোয়াল ইনজিওর করব, এমন গবেট নই। ক্যুইক স্যর, তড়কা-রুটি-ফ্যান্টা।

হোমওয়ার্ক

- একটা হোমওয়ার্ক দিচ্ছি তোকে।

- এই বয়সে হোমওয়ার্ক দেবে মামা?

- হোয়াই নট?

- শুনি।

- মতপার্থক্য প্রকাশে কোনো সিলিং নেই। এমন কী অমুকের অভিনয় বা তমুকের ব্যাটিং ভালো লাগে না; এমনটাও যত খুশি যতবার খুশি বলতে পারিস। কিন্তু রাগ বা হিউমর ঝাড়তে গিয়ে একটা ব্যক্তিগত খিস্তি দিতে হলে, অন্তত তিনজনের ব্যাপারে মন খুলে সবার সামনে প্রশংসা করতে হবে। ও হ্যাঁ, এমন তিনজনের গুণ গাইবি যাদের ব্যাপারে এর আগে পাবলিকলি তুই যথেষ্ট প্রশংসা করিসনি।  থ্রি ইস টু ওয়ান রেশিও মেন্টেন করতে হবে। অ্যাট অল টাইমস।

- বেশ। তা'হলে শোনো। বিমল জ্যাঠা চমৎকার রিদমে খৈনি ডলেন, ট্রীট ফর দ্য আইজ অ্যান্ড ইয়ার্স। মেজপিসি পনীর কুচিয়ে ভেজে তাতে পাঁপড় মিশিয়ে একটা ঝাল ঝাল রান্না করে, টেরিফিক। অখাদ্যকে উপাদেয় করে তুলতে মেজপিসিই পারে। পাশের পাড়ার গণেশ মাতাল গোপনে গান লেখে, বেশ জুতসই। এই গেল তিনটে প্রশংসা। আর এই তুমি, তোমার ভীমরতি হয়েছে। বুঝেছ মামা? ভীমরতি।