Tuesday, March 31, 2015

#MyChoice



ঠা ঠা রোদ। প্যাঁচালো লম্বা দুর্দান্ত লাইন; ভোট দেওয়ার। সেই লাইনে দ্রাবিড়ের ফোকাস নিয়ে দাঁড়িয়ে অমু। ডান হাতে ছাতা, বাঁ হাতে শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের একটা বই মেলে ধরা। ঝড়ের গতিতে শীর্ষেন্দুর ভূত, ডাকাতের অ্যাডভেঞ্চার পেরিয়ে যখন বইটা খতম করলে অমু, তখন সে ইভিএম মেশিনের সামনে। হঠাৎ কী মনে হল। অমু বইটা বগল দাবা করে ঝপ করে বুথ ছেড়ে চলে এলে ভোটটা না দিয়ে। মনে মনে ভাবলে “ #MyChoice”; মুচকি হাসলে অমু। 

**
অপু। নিজের উপন্যাসের খসড়া ছিঁড়েখুঁড়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। দ্যাট মাই ফ্রেন্ড ওয়াজ হিজ চয়েস, এ ডেয়ারিং মোস্ট চয়েস। 

**
- তুমি আমার বাপির দেওয়া চাকরীটা নেবে না?
- না।
- কেন?
- ক্লার্কের কাজ আমার পোষাবে না।
- টিউশানি পোষায় আর কর্পোরেটে চাকরি পোষাবে না। তোমার কী আমায় বিয়ে করার ইচ্ছে নেই?
- তোমার বিয়ে করতে চাই। তোমার বাবার মাতব্বরিকে না।
- তুমি চাকরিটা নেবে না? তুমি ভালো করেই জানো চাকরিটা না নিলে আমাদের বিয়ে সম্ভব নয়। আমার সাথে এতদিন প্রেম করে এখন বিয়ে করতে চাইছ না? তোমার পেটে পেটে এত শয়তানী?
- আমার পেটে শয়তানী আছে কী না জানিনা। তোমার মগজে লজিকের থলিতে লিক আছে। ও চাকরি আমি নেবো না। দ্যাট ইজ মাই চয়েস। টিউশানি করা ছেলেকে বিয়ে করবে কী না, সেটা তোমার চয়েস।

**
অনিলবাবুর সঙ্গে খবরের কাগজের যোগাযোগ শুধু ক্রস-ওয়ার্ড পাজ্‌লটি পর্যন্ত। টেলিভিশনের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে শুধু হপ্তায় তিনটে কার্টুন শো। অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে শুধু নিজের টেবিল আর তার ওপর জমা ফাইলগুলো পর্যন্ত। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ বলতে নিজের বাড়ির ছাতের উত্তর কোণটি পর্যন্ত। মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে মানিব্যাগের ময়লা সাদা কালো ছবিটা পর্যন্ত। প্রেমের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে শরৎচন্দ্রের নভেল পর্যন্ত। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে আপিসে বস, বাসে কন্ডাক্টর আর বাড়িতে আয়না পর্যন্ত। অনিলবাবুর জীবনের চয়েসগুলোকে পাবলিক হুল্লোড়ের সামনে রেসের মাঠে দৌড়তে হয় না। 

**
রোববার। চৈত্র সেলে যাওয়ার কথা দীপুর। বৌকে নিয়ে। 
এমন সময় হঠাৎ দীপুর কাতর স্বীকারোক্তি; 
- “হ্যাঁ গো শুনছো...”
- “আবার কী হল?”, মিসেস দীপু ‘আবার কী হল’ বলে নাক কুঁচকোতে পছন্দ করেন।
- “বসের ফোন এসেছিল। অফিসে ক্রিটিকাল ব্যাপার। আমায় যেতেই হবে”।
- “হোয়াট ননসেন্স। রবিবারেও অফিস? আর এদিকে শপিঙয়ের প্ল্যান হয়ে আছে। গড়িয়াহাটে রীনারা ওয়েট করে থাকবে। হাউ এম্ব্যারেসিং।“
- “প্লীজ সোনা। প্লীজ। ইয়ার এন্ডের সময় কী না। ভারী চাপ। প্লীজ”। 
কোণ রকমে মান বাঁচিয়ে অফিস আসে দীপু। সুনসান অফিসঘর। চেয়ারে হেলান দিয়ে টেবিলের ওপর পা লম্বা করে দেয় সে। প্রথমে টেলিফোনে পিৎজার অর্ডার দেয়। তারপর গা এলিয়ে দিয়ে মুখের সামনে মেলে ধরে অফিসের গোপন দেরাজ থেকে বের করে আনা “বাঁটুল দ্য গ্রেট অমনিবাস”। 
এটাও কী এক ধরনের অ্যাডালটারি? ক্ষণিকের চিন্তা উদয় হয় দীপুর মনে। পরমুহুর্তেই মনে হয়, “ধুর শালা, মাই চয়েস”। 


Wednesday, March 11, 2015

নেতাজী

ভুলে গেলে চলবে না আমরা নেতাজীর দেশের লোক।
সেই মত আমাদের নিজেদের ভেঙ্গেচুরে নতুন ভাবে সাজিয়ে নিতে হবে।
নব আদর্শে, ইস্পাত কঠিন শৌর্যে নিজেদের প্রকাশ করতে হবে।
হাতের মুঠো আর চোয়াল শক্ত করতে হবে।
ভুলে গেলে চলবে না আমরা নেতাজীর দেশের লোক।

বিপদকে এড়িয়ে নয়, বিপদকে পরাস্ত করে আমাদের আগুয়ান হতে হবে।
বৃহত্তর মঙ্গলের স্বার্থে বন্ধুত্বের বাছবিচার আমাদের সাজে না।
প্রয়োজনে আমাদের আগুনে ডিগবাজি খেতে হবে আর সমুদ্রে পায়চারী করতে হবে।
দুষ্ট দমনে বেশী থিওরি কপচালে হবে না।
দ্রাবিড় হয়ে থাকলে চলবে না, ভুললে চলবে না -আমরা নেতাজীর দেশের লোক।

দেশের মাটি চ্যবনপ্রাশের মত, সেটা অন্তত আমাদের ভুলে যাওয়া সাজে না।
দেশের পোশাক আমাদের পোশাক, দেশের ভালো আমাদের ভালো, দেশের যতকিছু-সেটুকুও তো আমাদেরই।

আফটার অল, আমরা নেতাজী মুলায়ম সিং যাদবের দেশের লোক।

Monday, March 2, 2015

নর্মাল-লার্জ-এক্সট্রা লার্জ



নর্মাল সাইজের প্রেমে – চিঠি ও শেষের কবিতার টুসকি।

লার্জ সাইজের প্রেমে – পাশাপাশি বেহিসাবি হন্টন। ‘তুই’য়ের ভোল্টেজ পরিবর্তন। হঠাৎ ছাদের কোনে কব্জির মোচড়।

এক্সট্রা লার্জ সাইজের প্রেমে – চোখের কাছে চোখের আত্মসমর্পণ। সেই শেষ।

**

নর্মাল সাইজের নার্ভাসনেসে – আমি তোমার বলতে চাইছিলাম যে তুমি আমায় ভালোবাসো।

লার্জ সাইজের নার্ভাসনেসে – আমি তোমায় বলছিলাম যে আমি ভালোবাসাকে তুমি করি।
   
এক্সট্রা লার্জ সাইজের নার্ভাসনেসে – ভালোবাসা ? হোয়াট দ্য হেল ইজ দ্যাট ?

**

নর্মাল সাইজের দুঃখ – তাহলে তুমি আমায় রিজেক্ট করছো? সেটাই ধরে নেব তো?

লার্জ সাইজের দুঃখ – শক্তি আমায় শক্তি দেবে। আমার কথা ভেবো না। তুমি ভালো থেকো।

এক্সট্রা লার্জ সাইজের দুঃখ – আরে এটা কোন ব্যাপারই না। কাল বিকেলে নীলা ডেকেছিলো। ভাবছি যাব।

**

নর্মাল সাইজের অভিমান – কাল এলে না কেন?

লার্জ সাইজের অভিমান – কাল এলে না, তোমায় ছাড়া ফুচকা খেতে মন চাইল না।

এক্সট্রা লার্জ সাইজের অভিমান – এত দেরী করে এলে...সেই গতকাল থেকে আমি ঠায় দাঁড়িয়ে এখানে!

**

নর্মাল সাইজের আব্দার – একটা চুমু...প্লীজ...

লার্জ সাইজের আব্দার – দীঘা যাবে? সামনের শনিবার?

এক্সট্রা লার্জ সাইজের আব্দার – আমার এগরোলটা শেষ হয়ে গেল জলদি। তোমার রোলের শেষ কামড়টা আমার জন্য রেখে দেবে প্লীজ?


Sunday, March 1, 2015

শনিবার রাতের মেহফিল


গেটিং দ্য বেস্ট আউট অফ শনিবার রাত। বংপেন নির্বাচিত সেরা দশ এলিমেন্ট  ঃ  

১। দ্য রাত অফ শনিবার। হাতের সুরাপাত্রে কফি। সঞ্জীবের মামা-সিরিজের শবাব। 

লেট দ্য মেহফিল বিগিন।

২। কফি কাপে একটু চুমুক। 

কিশোরের "উয়ো শাম আজিব থি"র সুরে একটু হিক্‌। 

মেহফিল অফ শনিবার।

৩। বিছানার বালিশ সোফায়। শাহজাদা সেলিমের পিঠ আমার ফতুয়ায় ঢেকে সে বালিশে ঢলানো হেলান। কিশোর তখন রয়েছেন "ঝুকি ঝুকি নিগাহ মে"তে। 
শনিবার রাত। 

৪। টিভি বন্ধ। বই ভাঁজ করা। অসময়ে মুড়ি চানাচুরের বাটি কফি কাপের পাশে আধ-ভরপুর। 

ইয়ে শনিবার কি রাত অভি জওয়ান হ্যায়।

৫। গান পাল্টে কিশোর থেকে হেমন্তর "বসে আছি পথ চেয়ে ফাগুনের গান গেয়ে"।
কফি পেগ শেষে অল্প মোরব্বায় নেশা বদল। 

শনিবার রাত রাইজেস...

৬। নেশা ভারী করে দেয় মন কে। হৃদয় দোস্ত খুঁজে বেড়ায়।হাত আঁকড়ে ধরে বাঁটুল দ্য গ্রেটের পুরনো মলাট ছেঁড়া পাতলা বইটাকে।
শনিবার তাগত পায়।

৭। আগুন ছাড়া সভ্যতা হয় না। মাতলামি ছাড়া শনিবার রাত হয় না।
অতএব প্রতুল মুখুজ্জের লাল ফৌজের গানে নিজেকে সাবমিট করে রাত বিরেতে ফৌজি পায়চারি।

৮। ভালোবাসা ছাড়া শনিবার রাতের উত্তরণ নেই। 
মাখো মাখো ভালোবাসা। ঠোঁট ছোঁয়ান আবেগ। 

তাই ফ্রিজ থেকে আলুপোস্ত বের করে গরম করে নেওয়া অসময়ের লাস্যময়তা।

৯। শনিবার রাত বিরহের সাবস্ট্যান্স কে দেবে? কে দেবে প্যাথোসের ডেনসিটি? শনিবারকে?

"তুই ফেলে এসেছিস কারে মন রে আমার"। মার গানের স্মৃতি।

১০। শনিবারের রাত যখন গনগনে আঁচে ঝলসে উঠবে।দুরন্ত ভাবে জমে উঠবে বেপরোয়া রাত জাগা। 
তখন।
সমস্ত ফাঁকি দিয়ে পাশবালিশ কোলে সবকিছু ছেড়ে সরে পড়বো।

Saturday, February 28, 2015

ধর্ম

ধর্ম অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। অনেকক্ষণ ধরে। একটা চাপ ধরা অস্বস্তি। একটা দমবন্ধ করা বুক চিন্‌চিন্‌ তার পিছু ছাড়ছিল না।ঘামতে শুরু করায় পরনের টিশার্টটা খুলে রেখেছিল। নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল ধর্মর। মনে হচ্ছিল যেন একটু তাজা হাওয়া গায়ে লাগলে ভালো লাগতো। কিন্তু মন চাইলেও জানলা খোলার উপায় ছিল না। হাজার হাজার ফ্যানের চোখ, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ-বাল্ব তার ঘরের দিকে অনবরত তাক করা আছে। সেলিব্রেটি হয়ে থাকার মাশুল যে কী সাঙ্ঘাতিক। চরসের রসও আজ শরীরকে তাজা করতে পারছিল না। ধর্মর চোখ ছলছলে হয়ে আসছিল বার বার। আবছায়া ঘরেও কালো চশমায় চোখ ঢেকে বসেছিল সে; পাছে আচমকা আয়নায় নিজের চোখ দেখে ফেলতে হয়। 

সাহস হয় না আজকাল নিজের চোখের দিকে তাকাতে। 

কান ফাটানো শব্দে ঘরের মোবাইলটা বেজে উঠলো। ধর্ম টের পেল যে তিন নম্বর ম্যানেজারের ফোন। এই ম্যানেজারদের কাঁধে ভর দিয়েই চলার অভ্যাস করে ফেলেছিল ধর্ম; সেলিব্রেটিদের তেমন ভাবেই কাটাতে হয় জীবন। ধর্ম যে ভাবে পা ফেলবে, হাসবে, কথা বলবে, আদর করবে; পাবলিকে সেটাই আঁকড়ে ধরবে। কাজেই প্রত্যেকটা পা ফেলা, প্রত্যেকটা হাসি ধর্মকে সাহস অত্যন্ত হিসেব করে ফেলতে হয় এবং সে হিসেবটুকু কষে দেয় তার ম্যানেজারেরা। কারণ ধর্ম বোঝে যে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত রেভিন্যুর উর্বর উৎস। 
সমস্তই ঠিকঠাক চলছিল। দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছিল। ধর্মর প্রত্যেকটা সৃষ্টি তার ভক্তদের মধ্যে আগুনের মত ছড়িয়ে পরে, ভালো খারাপের বিচারে আর আটকে থাকে না ধর্মের সৃষ্টি। সে এখন হট-সেলিং। তার নাম লেখা টিশার্ট, টুপি কোকাকোলার মতই পপুলার। ধর্ম জানে যে তার ম্যানেজাররা শুধু তার ডিজিটাল অটোগ্রাফ বেঁচেই অগুনতি টাকা আয় করে। বেশ কাটছিল জীবন ম্যানেজারদের সাথে। হঠাৎ আজকে ম্যানেজারদের ফোন আর নিতে ইচ্ছে করছিল না ধর্মর। ধর্মর ইচ্ছে করছিল পরমার সাথে কথা বলতে। পরমা কী এখনও দূরেই থাকতে চায় ?  
পথ চলার শুরুর দিনগুলো ধর্মের মনে আবছা হতে শুরু করেছিল। সেই সময়টা তার মনে অস্পষ্ট হতে শুরু করেছিল যখন সে সাইকেলে ঘুরতো। পরনে আকাশী ফতুয়া। পিঠের ব্যাগে কবিতার খাতা। ঘাসে সাইকেল শুইয়ে রেখে পরমার কোলে মাথা রেখে ঘাসের ডগা চিবুতে চিবুতে কবিতা আউরে চলা।  ধর্ম কবি হতে চেয়েছিল, কিন্তু কি ভাবে যেন কারখানা হয়ে পড়লো। কী ভীষণভাবে ব্যবসার গ্রাসে পড়ে গেল ধর্মের কবিতা। “বড্ড টাকা মা, বড্ড টাকা, বড্ড কষ্ট”। ককিয়ে উঠছিল আজ ধর্ম। মাদক ভরা সিগারেটে একের পর এক জ্বালিয়েও জ্বালা জুড়চ্ছিল না। ধর্মের ইচ্ছে হচ্ছিল মাথার চুল খামচে ধরতে। 

শেষ সিগারেটটা দু’টান দিয়েই ছুঁড়ে ফেলে দিল ধর্ম। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলে সে। 
- হ্যালো, পরমা...
- ধর্ম, কতবার বলেছি তোমায় যে তুমি আর আমায় ফোন করবে না!  
- পরমা প্লীজ...
- তোমার সাথে কথা বলতে আমার এতদিন বিরক্ত লাগতো। কাল থেকে ঘেন্না হচ্ছে ধর্ম। স্টপ কলিং মি আপ। 
- পরমা আমার কথা শোন...
- একটা নির্মম খুনির কথা শুনতে হবে আমায়? আমি বার বার শিউরে উঠছি এই ভেবে যে কোন একদিন আমি তোমার হাত ধরার স্বপ্ন দেখেছিলাম...
- পরমা কালকের খুনটা আমি করিনি...কোনও খুনই আমি করিনি...প্লিজ...
- নিজের মিথ্যেকে সত্যি বলে বিশ্বাস করার অভ্যাসটা বেশ আয়ত্ত করে ফেলেছ, তাই না ধর্ম?
- পরমা তুমি জানো খুন আমি করিনি।
- একের পর এক ক্রিটিককে তুমি খুন করেছ ধর্ম। তোমার কাজের নিন্দে যেই করেছে, তাকেই থেঁতলে দিতে চেয়েছ তুমি। আর দিয়েওছো কতজনকে। থেঁতলে। যেমন ওই নির্ভীক মানুষটাকে তুমি কুপিয়ে খুন করালে কালকে। সে তোমার শিল্পকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার সৎ সাহস রেখেছিল  বলে।
- স্টপ ইট পরমা। আমি খুন করিনি। আমার কোন এক উন্মাদ ফ্যান এই সব...
- উন্মাদ? ওই উন্মাদদের কাঁধে চেপেই তোমার ব্যবসা চলে ধর্ম। মুনাফাটা চেটে নিয়ে নিজেকে আলাদা করে সাধু সেজে আর কতদিন ধর্ম? আর কতগুলো প্রাণ? আর কতগুলো পাপ তুমি তোমার পাগলাটে ফ্যান বা বাজে ম্যানেজারের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজে পাশ কাটিয়ে যাবে ধর্ম? ছিঃ। তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে আমার ঘেন্না লাগে। আর পারলে আমার এই ঘেন্নার কথা তুমি তোমার ভক্তদের জানিয়ে দাও, আজ দিনের শেষে আমার লাশটাও গিফ্‌ট র‍্যাপ হয়ে তোমার কাছে পৌঁছে দেবে তোমার ভক্তরা। 

**

ধর্ম বুঝতে পারছিল সমস্তটাই গোলমাল হয়ে গেছে। সমস্তটাই। সাফল্য গলার টুঁটি টিপে ধরেছে, আর ফেরার পথ নেই। পরমা ভীষণ দূরে চলে গেছে। আর কোনদিন হয়তো প্রেমের ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারবে না ধর্ম। 
হাড়িকাঠে কাটা পাঁঠার মত ছটফট করছিল ধর্ম। বড্ড দেরী হয়ে গেল। বড্ড দেরী। 

ড্রয়ার থেকে রিভলভারটা বের করে নিজের মুখে গুঁজে দিলে ধর্ম।         


**

Monday, February 23, 2015

মেয়েটা



তখন আমি বেশ ছোট। প্রেম করা ব্যাপারটা তখনও ডেঁপোমি বলেই জানি। বিকেলে হন্যে হয়ে ক্যাম্বিস বলে ক্রিকেট খেলি। জ্যামিতিকে ভয় পাই। নন্টেকে ফন্টের চেয়ে বেশী ভালোবাসি। সদ্য সাইকেল চালানো শিখে মনে হয় ডানার আনন্দ বুঝি। তিনটে সিঁড়ি না টপকে পা ফেলতে পারি না। ফুল প্যান্ট পরি শুধু বিয়েবাড়ি যেতে হলে। আঁকাতে ভালোবাসি আর আঁকার মাস্টারকে ভালোবাসি না। ফড়িং ধরতে পারি, আর তার লেজে সুতো বেঁধে ঘুড়ির মত ওড়াতে পারি। গদা আর তীর-ধনুক, দু’টোতেই সমান পারদর্শী। স্কুল ফেরতা দুপুরে মাকে জড়িয়ে না ধরলে ঘুম আসে না। রবিবারে বাবার পাশে গুটিসুটি হেঁটে মাছের বাজার যাই, এই মাছ নাও-ওই মাছ নিও না বলে কাদা জলে ছপছপ করি।  সন্ধেবেলা মাঠ থেকে বাড়ি ফিরে হাত পা ধুয়ে দুধ মুড়ি খেতে বসি। অকারণে বন্ধুদের সাথে পেট ফাটিয়ে হাসতে পারি, একে অপরের টিফিন কেড়ে খেতে পারি।


সেই সময়।

কোন এক বিকেলে। কোন এক বৃষ্টির বিকেলে। কালচে মেঘলা বিকেলে। লোডশেডিং হব হব করেও হয়নি এমন বিকেলে। বাড়িতে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছোট একটা টিভি। তাতে একটা চ্যানেল। দূরদর্শন। তা রাতে বন্ধ। দিল্লী কলকাতা বাংলা হিন্দি মিলে বাকি সময়টুকু। সেই সময়।
টিভিতে একটা সিনেমা চলছিল। নজর সিনেমায় ছিল না। নজর ছিল আকাশের দিকে। বৃষ্টি কি থামবে না? আজ কী খেলা হবে না? বন্ধুরা কি ডাকতে আসবে না?


হঠাৎ। সিনেমার ফাঁকে। এক আকাশ মেঘ ভারী কলকাতা। কালচে অন্ধকারে কলকাতার সিলুহ্যেট। এমন একটা কণ্ঠস্বরের ভেসে আসা যা যেন নিশ্চিত ভাবেই মেঘে থেকে চুইয়ে পড়া, কিছুতেই তা টিভি থেকে আসা নয়। মিষ্টি অথচ গম্ভীর। নরম, ঠাণ্ডা অথচ ধারালো। অভিমানী কিন্তু সজল নয়। তিনি গাইছেন।


“এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে”। 
তখনও রবীন্দ্রনাথকে ঘাঁটাবার বয়স নয়। কিন্তু শিহরণ আর হেমন্তর সম্ভবত বয়স থাকেনা। অমন ভাবে কেউ কখনও ডাকেনি। আদুরে ভাবে গমগমে অথচ জাপটে ধরা সুর।

“বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছ অন্তরে”। 
অন্তর শব্দে আটকানোর বয়স সেটা নয়। তবে উসকোখুসকো চেহারার একটা ডানপিটে মেয়ে তখন স্ক্রিনে। আচমকা নেমে আসা বৃষ্টিতে ভালোবেসে অসহায়। ওর চুলে দানা দনা বৃষ্টি, ওর হাসি উপচে পড়ছে কিন্তু হই হই করছে না। সে হাসি ঘাসে এমন ভাবে পা ফেলে যাতে ঘাসের ডগাটিরও ব্যথা না লাগে। বৃষ্টি গাড় হয়ে আসে, রিমঝিমে মেজাজে গানটা গুটিগুটি এগিয়ে যায়;

“স্বপন দুয়ার খুলে এসো, অরুণ আলোকে এসো মুগ্ধ এ চোখে, ক্ষণকালের আভাস হতে চিরকালের তরে এসো আমার ঘরে”।

শব্দের খোসা ছাড়াবার বয়স সেটা নয়, তবে সুরে ভেসে যাওয়ার বয়স নেই। আর সেই ছায়ামূর্তিটা, অন্ধকার আর বৃষ্টিতে ক্রমশ আবছা আর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পাশের হেঁটে যাওয়া লোকটা, সাইকেলটা, টেনে নিয়ে যাওয়া রিক্সাটা তার গোচর হয় না আর। পৃথিবীটা ফাঁকা হতে হতে মিষ্টি কালচে ক্যানভাস হয়ে ওঠে, শুধু সে, বৃষ্টি আর গম্ভীর নিরস কয়েকটা বাড়ি। মেয়েটার গা বেয়ে গানটা বেড়ে ওঠে : 
“দুঃখ সুখের দোলে এসো, প্রাণেরও হিল্লোলে এসো,ছিলে আশার অরূপ বানী ফাগুন বাতাসে, বনের আকুল নিঃশ্বাসে-- এবার ফুলের প্রফুল্ল রূপ এসো বুকের পরে”। 
মেয়েটা ভীষণ ভিজতে চাইছে কিন্তু ঝমঝমে বৃষ্টিও তাকে যথেষ্ট উপচে ফেলতে পারছে না।


সে মেয়েটিকে যে কী ভীষণ ভাবে ভালোবেসে ফেলা যায়। আমি হতবাক হয়ে সেটা বুঝেছিলাম। বুঝেছিলাম অনেকদিন আগের কোন এক বৃষ্টির বিকেলে আমার মা অমন ভালোবাসায় টাপুর টুপুর হয়ে ভিজেছিলো, অমন নরম হেসে জল ঠেলে হেঁটে চলেছিল দিক না চিনে। আমার মা। গান ছাড়া আমার মা হয়ই না। আমার মা। অমন ভালোবাসায় মজে বৃষ্টিতে হেঁটেছিল। আমার মা।  




Wednesday, February 18, 2015

প্ল্যানচেট

ফতুয়ার ওপরের বোতামটা খুললেন  অনিমেষ। হাওয়াই চটি জোড়া খুলে হাতে নিলেন। পাজামাটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে নিলেন। ভেজা বালির ওপর দিয়ে হেঁটে গেলেন ছপাতছপ ঢেউয়ের দিকে। গোড়ালি ডোবা জলে এসে দাঁড়ালেন। ঢেউয়ের ঝটপট আর বুকে মুখে ঝড়ো হাওয়া এসে মনটা ঠাণ্ডা করে গেল। আজ অমাবস্যা। আকাশে হয়তো মেঘও রয়েছে, একটাও তারা নেই। এ অঞ্চলটা মূল শহরতলির ভিড় থেকে বেশি কিছুটা দূরে। কাছের রাস্তাতে লোকজন কেউই নেই। অনিমেষের হোটেলও অন্তত আধ কিলোমিটার দূরে, মাঝে পুরোটাই ফাঁকা। রাত্রের কালোতে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের বুকের সাদা ফেনাটুকু দেখা যায়। পায়ের তলায় বালি সরে যাওয়ার ভালো লাগা শিরশিরানি। সব মিলে ভালো না লাগার কোন উপায় নেই। পাহাড়ের গুণ হল সে শ্রোতা। কিন্তু সমুদ্র আগ বাড়িয়ে দু’টো কথা নিজে বলে যায়। অন্ধকার আজ এতটাই নিকষ যে ঘড়ি দেখতে পারলেন না। মোবাইল ফোন জ্বেলে সময় দেখলেন অনিমেষ, রাত পৌনে দু’টো। এপ্রিলের রাত্রি হলেও, গভীর রাতের সমুদ্রের ধারালো হাওয়া সত্তর বছরের চামড়ায় বিঁধতে বাধ্য। কিন্তু আজ কোন কিছুই পরোয়া করার সময় নয়। অনিমেষের ভীষণ ভালো লাগতে আরম্ভ করেছিল। ভীষণ। কতদিন পর সে গোপালপুর এলে। শেষ এসেছিল বছর দশেক আগে। তখনও অপলা সাথে ছিল।

Wednesday, February 11, 2015

গান

“এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে”, গাইছিলেন অনন্তবাবু, “বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে”। আজ অফিস থেকে একটু বেশিই আগে বেরিয়ে পড়েছিলেন। সামান্য ফাঁকি আর কি! অনন্তবাবু তো কবিতা লিখতে পারেন না, তাই হিসেব লেখার কেরানীগিরির কাজে আলতো ফাঁকি দেওয়াটাই তার কাছে কবিতা লেখার মত আরামের।ব্যাচেলর হওয়ায় জীবনটায় একটা দরদী জেল্লা আছে। বাজারপত্তর নেই, বউয়ের ব্লাউজ কেনার বা বাপের বাড়ি যাওয়ার বায়না নেই, ছেলে-মেয়ের এটা দাও সেটা দাও নেই।  বিকেল পাঁচটার মধ্যে বাড়িতে ঢুকে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ঝুল বারান্দায় বসে পড়া। কাঠের চেয়ারে হেলান আর বেঁটে বেতের মোড়ার উপর পা। খাসা। হাতে এক কাপ লেবু চা, নিজের বানানো। এক বাটি মুড়ি মধ্যে এক পিস্‌ বেগুনী, অফিস ফেরতা নিধুর চপের দোকান থেকে আনা। আগে আনতেন দু’পিস্‌ করে। মাগ্যির বাজারে একটা বেগুনীই যথেষ্ট, তাছাড়া বয়স বাড়ছে- দু’খানা বেগুনী হজম করার দিন আর নেই।