Tuesday, January 8, 2019

চুমু অ্যানোমালি

- হ্যালো হেডঅফিস!

- হ্যালো! কোন ইউনিট থেকে বলছেন? 

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি।  

- দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? হেডঅফিসে আপনার কল তো বড় একটা আসে না...। 

- অত নরম ভাবে থাপ্পড় কষিয়ে কী হবে স্যার। সোজাসুজি বলুন আমি অকাজের। 

- না না, ও মা! আমি তেমন ভাবে বলতে চাইনি ভাই...।

- চাইবেন নাই বা কেন বলুন। বত্রিশ বছরের জীবনে আমি এই প্রথম হেডঅফিসে কল করেছি। আমি ব্রেনের রোমান্টিক-চুমু রেজিস্ট্রেশন ইউনিট, কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা মাইনর চুমুও স্মৃতি হিসেবে ফাইল করতে পারিনি মগজ হেডঅফিসের মেমরি রেজিস্টারে। খুলি-স্পেস নষ্ট করে চলেছি কেবল। 

- মনখারাপ করতে নেই ভায়া। মনখারাপ করতে নেই। তা আজ কী মনে করে? চুমু রেজিস্টার করার আছে নাকি? চুমু-রেজিস্টারে প্রথম এন্ট্রি আজ হবে নাকি?

- ইয়ে, ব্যাপারটা গোলমেলে। 

- গোলমেলে?

- অ্যানোমালি রিপোর্ট করার আছে হেডঅফিস স্যার। 

- ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার। আপনি কি শিওর? চুমু নয়? অ্যানোমালি?  

- হান্ড্রেড পার্সেন্ট। ঠোঁট এবং জিভ থেকে কোনও সিগনাল আসেনি। কিন্তু জানেন, আমার ইউনিট-মনিটরের সমস্ত গ্রাফ চুমুর মত লাফালাফি করেছে ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা। একদম জিভে জিভ চুমু লেভেলের এক্সট্রিম রিপ্‌লস দেখা গেছে গ্রাফে। অবিকল স্মুচ এফেক্টস। 

- অথচ জিভ ঠোঁট থেকে কোনও সিগনাল নেই ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি? আপনি?

- জিরো। চুমু রিপলস মনিটরে অথচ জিভ ঠোঁট চুপচাপ। তা না হলে আর কাঁদুনি গাইছি কেন হেডঅফিসদাদা। 

- কী মুশকিল। চুমু সেন্টারের মনিটরে চুমু-রিপ্‌লস দেখা গেছে, কাজেই মেমরি রেজিস্টারে তো এন্ট্রি করতেই হবে। এ'দিকে ঠোঁট আর জিভ থেকে কোনও সিগনালই নেই! লে হালুয়া। এন্ট্রি করব কী ভাবে। 

- ভাবুন স্যার। কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার। এখন উপায়?

- দাঁড়ান। এরর্‌ লগ চেক করি। লাইনে থাকুন। 

- বেশ, দেখুন। 

- এই যে, পাওয়া গেছে। চুমু রেপ্লিকেটিং সিগন্যাল আপনি কোথা থেকে রিসিভ করেছেন সে'টা মালুম হয়েছে। যাক বাবা। 

- অ্যানোমালি আইডেন্টিফাই করা গেছে? মাইরি? 

- স্পষ্ট। আমাদের হিউম্যান ইউনিট আজ চুমু খায়নি তাই আপনি ঠোঁট বা জিভ থেকে কোনও সিগন্যাল পাননি। 

- তবে মনিটরে যত উত্তেজনা? স্মুচ সমান সিগন্যালস? 

- হিউম্যান ইউনিট পুরনো বইয়ের তাক সাফ করার সময় খুঁজে পেয়েছেন কলেজ জীবনের নোটের খাতা। আর সেই খাতার ভাঁজে রাখা ছিল... বারো তেরো বছর পুরনো এক জোড়া হলদেটে মিনিবাসের টিকিট আর আধ-ছেঁড়া এক জোড়া গানের অনুষ্ঠানের পাস; সুমনের গানের অনুষ্ঠানের। তো দশ বছর কলকাতার বাইরে থাকা হিউম্যান ইউনিট স্বাভাবিক ভাবেই কেঁপে ওঠেন সে পুরনো টিকিট আর পাসের কাগজ দেখে। ব্রেনের বিভিন্ন ইউনিটে এমার্জেন্সি সাইরেন ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর হিউম্যান ইউনিট খামচে ধরেন সে টিকিট-জোড়া। সেই খামচে ধরাই চুমুর সিগনাল হয়ে আপনার ইউনিটের মনিটরে গিয়ে হামলে পড়ে। 

- ওহ, তাই এই অ্যানোমালি। চুমু নয়। 

- বলেন কী! এ যে রীতিমত চুমু ভাই দু'শো বাহাত্তর বাই এ বাই থ্রি জেড নাইন থ্রি ওরফে চুমু-সেন্টার! ঠোঁট আর জিভে এসে রোম্যান্স আটকে থাকবে তা কী হয়? হেডঅফিস মেমরির চুমু রেজিস্টারে আজই আপনার প্রথম এন্ট্রি হবে, কংগ্রাচুলেশনস!  

Thursday, January 3, 2019

কাহারবা নয়


রাতের বাতাসে বেশ ডিসেম্বরের ছ্যাতছ্যাত। গায়ে চাদর জড়িয়ে বসে রেডিও শুনছিলাম, মনে বেশ বৈঠকি আমেজ। টকমিষ্টি চানাচুরের কয়েক পেগ মুখে পড়তেই মান্নাবাবুর গলাটা কানে আরো মিষ্টি হয়ে ঠেকল বোধ হয়।

সমস্তই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল; দুম করে 'কাহারবা নয় দাদরা' গেল মাঝপথে থেমে। রেডিও থামেনি, বিজ্ঞাপন বিরতিও নয়৷ মান্নাবাবু গান থামিয়ে দুম করে জিজ্ঞেস করলেন;.

- কী ব্যাপার? মতিগতি ঠিক আছে?

- ইয়ে, আমায় বলছেন? (আমি তো থ)

- আর কাকে বলব শশীবাবু? বলি হচ্ছে না যে। আসর ঝুলে যাচ্ছে।

- আজ্ঞে আমি আপনার তবলচি শশী নই৷ আমি তো স্রেফ শ্রোতা, তাও রেডিওর বাইরে বসে। ওই কাহারবা দাদরার ইস্যুটা আপনি আপনার তবলচিকে কনভে করুন, কেমন?

- চোপ। যত ভুল কি তবলায়? গান শোনার ব্যাপার কি এতটাই এলেবেলে? হচ্ছে না আপনার দ্বারা, এমন বিশ্রীভাবে গান শুনছেন যে মনে হচ্ছে রেডিও থেকে বেরিয়ে এসে কান মুলে দিই।

- সর্বনাশ! আমি কী করলাম? মন দিয়েই শুনছিলাম যে। ওই যে 'গোলাপজল দাও ছিটিয়ে,  গোলাপফুলের পাপড়ি ছড়াও'...বড্ড দরদ দিয়ে ধরেছেন স্যার...আহা। খামোখা থামতে গেলেন..।

- খামোখা? বটে? এ'দিকে আপনি যে ভুল তালে চানাচুর চিবোচ্ছিলেন, সে বেলা? 

- আজ্ঞে?

- গানের তাল একদিকে, আর আপনার চানাচুর চেবানোর মচমচ যে অন্য পানে বইছে। দুনিয়াকে রসাতলে পাঠাতে আপনার মত দু'চারজন বেপরোয়া চানাচুর-চিবিয়েই যথেষ্ট। 

- তালে তালে চানাচুর চেবাবো?

- চানাচুর তৈরিই হয়েছে গানের তালে তালে চেবানোর জন্য। তাতেই গানের মুক্তি, চানাচুরের উত্তরণ। 

- আর আমি বেসুরে চানাচুর চিবিয়ে গান মাটি করছি?

- আলবাত।  সুরের ওঠা নামা অনুভব করুন, মনপ্রাণ দিয়ে। আর চানাচুরের প্রতিটি কণা সেই অনুভবে এসে মিশবে। তা না পারলে বাড়ির ওই চার ডিবে চানাচুর গঙ্গায় ভাসিয়ে আসুন। অসুরের হাতে ইয়ারবাড আর বেসুরোর মুখে চানাচুর বেমানান।

***

আমার বার বার মনে হয় যে 'কাহারবা নয় দাদরা' শুনতে শুনতে আমি হয়ত আড়াই সেকেন্ডের জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তবে এই চানাচুর চেবানোর সুর-তাল-লয় যে ধরে ফেলেছি, তা কি মান্নাবাবুর ধমক ছাড়া হত? সুগায়কের সহশিল্পীদের মধ্যে একজন চানাচুর-চিবিয়ে-শ্রোতার গুরুত্ব অপরিসীম, তা আজ বেশ বুঝেছি। আর বেহালা শিখতে না পারার আফসোসটা কেটে গেছে, স্পষ্ট বুঝছি যে এ দুনিয়ায় বেহালাবাদকের চেয়ে গুণী চানাচুর-চিবিয়ের সংখ্যাটা অনেক কম।

Wednesday, January 2, 2019

ডক্টর মেওসজুস্কের কারখানা

- সরি, সরি মিস্টার মজুমদার। আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আসলে অ্যাসেম্বলি লাইনের একটা গণ্ডগোলে  ঘণ্টাখানেক প্রডাকশন বন্ধ ছিল, আর প্রডাকশন বন্ধ থাকলে যে কী সমস্যা। এত ডিমান্ড চারদিকে...। তা আমার আর্দালি ভুভজু আপনাকে কফি দিয়েছে তো?

- দু'কাপ শেষ করে ফেলেছি। আমি তো ভাবলাম আজ আর আপনার সঙ্গে দেখাই হবে না।

- না না, সে কী বলছেন। আপনি কলকাতার থেকে এসেছেন, আমার অনেকদিনের ইচ্ছে ভারতবর্ষে আমাদের সাপ্লাই যাবে।

- আগ্রহ নিয়েই এসেছি, তবে কী জানেন ডক্টর মেওসজুস্ক, ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারছি না ঠিক। যদিও অনেকেই আপনার এই কারখানার প্রশংসা করেছেন। আর যে জিনিস যদি জেনুইন হয় তা'হলে আর পাঁচটা জায়গার মত ভারতবর্ষেও এর চাহিদা তুঙ্গে থাকবে। কিন্তু..তবু কোথাও যেন একটা..।

- খটকা...তাই তো?  স্বাভাবিক। সরকারের হাজাররকম ত্যান্ডাইম্যান্ডাই আর অবিশ্বাস। কাজেই কালোবাজার ছাড়া এ জিনিস বাজারে ছাড়া গেল না। আর সে কারণে মাস-অ্যাওয়ারনেসের জন্য কিছুই করতেও পারলাম না। রিয়েলি স্যাড।

- তাই বলে ডক্টর মেওসজুস্ক, ভূতের কারখানা? সত্যি সম্ভব?

- রীতিমত সম্ভব। আর তার প্রমাণ এ'বারে আপনি হাতেনাতে নিয়ে যাবেন। এতদিনের এত রূপকথা, এত হাড়হিম করা গল্প; এ'বার সমস্তই রিয়ালিটি মিস্টার মজুমদার। আপনাকে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি দেওয়ার জন্য এমনি এমনি ডাকিনি, রীতিমত স্যাম্পেল দিয়ে ফেরত পাঠাবো।

- কিন্তু ব্যাপারটা হয় কী করে? আত্মাটাত্মার ব্যাপার তো শুনেছি..।

- বুজরুকি। পুরোপুরি বুজরুকি, বুঝলেন। আত্মাটাত্মা বলে কিছুই হয় না মশাই। সবই দেহ। আর ডিএনএ।   পুরো ফর্মুলাটা আপনাকে বলে দেওয়া যাবে না। সে'টা আমার নিজের পেটে লাথি মারা হবে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই বায়োটেকনোলজি আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কামাল। কারুর ডিএনএ সংগ্রহ করে,তার চারিত্রিক প্রোফাইল তৈরি করে একটা স্পেসিফিক অ্যালগোরিদমে ক্লোন করা৷ ক্লোন, কিন্তু অশরীরিরূপে।  ব্যাস, ভূত রেডি।

- জেনুইন ভূত?

- জেনুইন। এক ধরণের অমরত্ব বলতে পারেন। সে ভূত অবশ্যই চিপ আর ব্যাটারির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সে'সোলার ব্যাটারি দিনের বেলা আপনা থেকে চার্জ সংগ্রহ করে। তাদের বিনাশ নেই। এই ফ্যাক্টরিতে আমি একের পর এক অবিনশ্বর আত্মা তৈরি করে চলেছি মিস্টার মজুমদার। কড়ি ফেলে তেল মাখতে পারলে আর কাউকে এ দুনিয়া থেকে বিদেয় নিতে হবে না, অন্তত তাদের আত্মাটুকু থেকে যাবেই৷ তাদের ভূত তাদের অসম্পূর্ণ কাজগুলো শেষ করার চেষ্টা করবে, বদলা নেবে, ভালোবাসবে, ভয় দেখাবে।

- থ্রিলিং। থ্রিলিং। কিন্তু কে জানে ডক্টর মেওসজুস্ক, তবু ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। আসলে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি নেওয়া তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়...হাতেনাতে ডেমোন্সট্রেশন না দেখলে...।

- প্রমাণ?

- প্রমাণ, আছে?

- আমার আর্দালি ভুভজু কেমন ভেসে ভেসে কফি দিয়ে গেল, সে'টা বোধ হয় খেয়াল করেননি,  তাই না?

- না মানে খবরের কাগজ পড়ছিলাম হয়ত, তাই ও কফি দেওয়ার সময় ঠিক...। তবে মুখটা দেখেছিলাম...সাদাটে ছিল বটে..কিন্তু...।

- এক মিনিট, এই দেরাজটা খুলে দেখাই..।

- এ'টা কী?

- এ'টা সুবিশাল ডিপফ্রিজ৷ দেখুন। ভিতরে অজস্র মমি। ডেডবডি না দেখলে ভূতকে ভূত বলে মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক। ওই ডানদিকের বডিটা দেখুন...।

- ভু..ভু..।

- ও'ই আদত ভুভজু। ওর ভূতই আপনাকে কফি দিয়ে গেছে। এই কারখানায় তৈরি ভূত। আমার কারখানার সমস্ত কর্মচারীর দেহই এ'খানে আছে। মানুষ পোষার অনেক হ্যাপা, খরচও বেশি। কস্ট-কাটিংয়ের যুগ, বুঝতেই পারছেন।

- আর ভু..ভুভজুর পাশের... ও...ও..।

- আজ্ঞে হ্যাঁ মজুমদারবাবু, ও'টা আপনারই দেহ৷ প্রথম কফির কাপ থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করেছিলাম, আর পরের কাপে বিষ ছিল। স্যাম্পেল নিয়ে না ফিরলে আপনি ভূত বিক্রি করবেন কী করে বলুন তো?

Sunday, December 30, 2018

যেমনটা হয়


রাত। পাহাড়ি রাস্তা। মিশকালোয় লেপটে থাকা টুপটাপ আলোর দানা। কনকনে হাওয়ার ঝাপটায় গাড়ির কাচ নামানো দায়।

ওই যেমনটা হয় আর কী।

গোমড়া, প্রায়-নিশ্চুপ এক বৃদ্ধ দুম করে হেঁকে ড্রাইভারকে বলবেন "এই যে ড্রাইভার-খোকা, গাড়ি রোক্কে, রোক্কে! অভি কে অভি"। বৃদ্ধার 'ভীমরতি হয়েছে নাকি' মার্কা গজগজ উপেক্ষা করে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তার ধারে গিয়ে ঝুঁকে বসবেন। ফিরে আসবেন মিনিট দেড়েক পরে, হাতে হিমভেজা জংলি হলুদ ফুল দু'চারটে। 
"এই অন্ধকারেও অবজার্ভ করেছিলাম, ক্যাটার‍্যাক্ট অপারেশনটা খাপে খাপ বসেছে, তাই না"?। বৃদ্ধের খিটখিট হাওয়া। হিমভেজা হলুদফুলের সামনে গজগজ বেমানান, তাই বৃদ্ধার চুপচাপ " তুমি আস্ত পাগল"য়ে সারেন্ডার। ড্রাইভার ছোকরার স্যালুট-মেজাজের 'ওয়াহ আঙ্কলজী"।
ওই, যেমনটা হয় না আর কী।
হওয়ার মধ্যে শুধু বৃদ্ধের আল্ট্রা খিটখিটে কণ্ঠে "চ্যবনপ্রাশের ডিবেটা কি নীল ব্যাগে রেখেছ"তে হলুদ ফুল ডিটেক্ট করার ইউরেকাটা চেপে যাওয়া। এই আর কী।

কলকাতা আর উলের বোঝা


ক্যালেন্ডারের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিন প্যাকেট সল্টেড বাদাম খেয়ে ফেললেন শুভময় সাহা।
নভেম্বরের শেষ দিন আগামীকাল, পরশু থেকে ডিসেম্বর। অথচ গায়ে স্রেফ একখানা স্যান্ডোগেঞ্জি চাপিয়ে সন্ধে থেকে বসে। ক্যালেন্ডারের মাকালী যেন জিভ বের করে মস্করা করছেন; "আরো কেন ব্যাটা গলা বন্ধকরা ঢাউস সোয়েটার"।
প্রতি বছর এ'দিনটায় শীতের পোশাকের ট্রাঙ্কটা নামিয়ে আনেন শুভময়। শীতের পোশাকগুলো উল্টেপাল্টে দেখেন; পাশে থাকে বৌ৷
"মনে পড়ে এ'টা সে'বার গ্যাংটক যাওয়ার আগে কিনেছিলাম? নিউমার্কেট থেকে? কী সস্তায় পেয়েছিলাম এই হাই কোয়ালিটির সোয়েটার। পাঁচ বছরেও রঙ একটুও এ'দিক ও'দিক হয়নি"।
হবে কী করে? সেই পাঁঁচ বছর আগে শেষ এ সোয়েটার গায়ে দেওয়া হয়েছিল গ্যাংটকে। তারপর থেকে প্রতি বছর শুধু ট্রাঙ্ক থেকে বের করে রোদে দেওয়া আর ন্যাপথালিন পালটে ফের ট্রাঙ্কে চালান করা। শুভময় বুকের ভিতরে হুহু টের পান।
" এই মাফলারটা মেজপিসি এনে দিয়েছিল থিম্পু থেকে। জব্বর জিনিস"। শুভময় জানেন সে জব্বরের বহর, আড়াই বছর আগে কাটোয়ায় এক বন্ধুর বিয়েতে বরযাত্রি যাওয়ার সময় শেষ ব্যবহার করেছিলান। কলকাতায় মিনিবাসের ভিড়েই কাজ চলে যায়, এমন জব্বর ভুটানী মাফলারের দরকার তেমন হয়না।
"বুবলুর পুলওভারগুলো ছোট হয়ে গেছে। আসছে রোববার, একটা নতুন কিনব। কেমন"?
নতুন আসে। ট্রাঙ্কে ঢোকে। বুবলু তরতরিয়ে বেড়ে চলে আর হাফসোয়েটার পরে স্কুল যাতায়াত করে; তাও বছরে সাড়ে তিন হপ্তা। ও'দিকে ট্রাঙ্কের আড়ালে আর ন্যাপথালিনের স্নেহগন্ধে সে পুলওভার ছোট হয়ে আসে; আপনা থেকেই বাতিল হয় পড়ে। ফের নতুন কেনা হয়। গলা শুকিয়ে আসে শুভময়ের, নিজের অজান্তেই খামচে ধরেন ন্যাপথালিনের নতুন প্যাকেটটা।
একে একে বেরিয়ে আসে বিয়ের শাল, ডিসকাউন্টে কেনা জ্যাকেট, শৌখিন উলের মোজা, চামড়ার তৈরি গাবদা দস্তানা। শুধু কলকাতায় শীত আসে না।
যে'ভাবে বইয়ের তাক ফাঁকা আছে বলে কালচার-প্রিয় মানুষ বই কেনে, যে'ভাবে দাড়ি কামানোর ব্লেড নেই বলে কেউ কেউ কফি হাউসে যায়, যে'ভাবে বাড়িতে বাড়তি রসুন পড়ে আছে বলে কেউ কেউ ব্যাগ হাতে মাংসের দোকানের দিকে ছুটে যান; ঠিক তেমন ভাবেই;
এক ট্রাঙ্ক শীতের পোশাকের দায়ভার কাটাতেই; মাঝেমধ্যে কলকাতা টু হিলস্টেশনের টিকিট কেটে ফেলেন শুভময়। ভ্রমণের নেশাটেশা বুর্জোয়া ব্যাপার। নাথুলা পেলিং যেতে হয় নেহাত বাধ্য হয়ে; কারণ ট্রাঙ্কে রাখা সোয়েটারের ওজন হৃদয় বইতে পারে না।

ভালোবাসা


তখন ক্লাস ইলেভেন বা টুয়েলভ। 

আমাদের বসবার ঘরে একটা নীল সোফা আর দু'টো পেল্লায় চেয়ার। এবং একটা কাঠের শোকেসের ওপর একটা সোনি মিউজিক সিস্টেম। যে কোনো ছুটির সকাল বা দুপুর মানেই সোফায় গা এলিয়ে বসে আমি আর পাপাই; পাশের চেয়ারে চিম্পু। নিয়ম করে। আমাদের তেমন কাজ থাকত না তখন, সেই কাজ না থাকার ফুরফুরে স্টেটাসকে আমরা বলতাম 'ফেলু-অবস্থা'। ফেলু কথাটা তখন অ-গোয়েন্দা অর্থে আমাদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। কোথাও যাওয়ার নেই, কিছু করার নেই; শুধু হাতে অঢেল সময়। চা-কফির নেশাও আমাদের তেমন ছিল না, মাঝেমধ্যে মিষ্টি-শিঙাড়া-চপ-কাটলেট পেলেই চলে যেত। না পেলেও অবশ্য গল্পগুজব আটকাত না। কত গুলতানি, সবই 'ফেলু' লেভেলে। মাঝেমধ্যেই উঠত বেমক্কা হাসির হিড়িক আর হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়া। পরীক্ষার আতঙ্ক বা "আমাদের আর হল না" গোছের দীর্ঘশ্বাসও থাকত পাশাপাশি, তবে সে গুমোট চটপট কেটেও যেত কোনো বেফালতু ফেলু ঠাট্টায়।

এ'সবের মধ্যে আর একটা জরুরী অ-ফেলু ব্যাপার থাকত; গান। তখন ক্যাসেটের যুগ, এক একটা নতুন ক্যাসেট এনে তার প্রত্যেকটা গান মন দিয়ে শোনার একটা প্রসেস ছিল; ছিল প্রিয় গান বেছে নিয়ে বারবার শোনা। গানের ব্যাপারে পাপাই বরাবরই বেশ সাহেব-মানুষ; এমএলটিআর আর আরো কত কী ম্লেচ্ছ গান শোনাত আমাদের। আর চিম্পু আমাদের প্রথম শুনিয়েছিল বাংলা ব্যান্ডের গান। পরশপাথর দিয়ে শুরু করেছিল; তারপর একে একে ভূমি, মাইলস আর আরো কত কী। পাপাই আর চিম্পু দু'জনেই বড় ভালো গাইত (এখনও গায়)। 'হলুদ পাখী' বা 'সুজন' দু'জনে যা এত ভালো গাইত; আহা। আমি চেষ্টা করতাম শব্দ না করে সোফার গায়ে তাল ঠুকতে।

যা হোক, সে বয়সে আমাদের 'ভালোবাসা মানে ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি' ঘ্যাম লেগেছিল। গানটা শুনেই মনে হত; যাই, টুক করে গোলাপ ছাপানো গ্রিটিংস কার্ড কিনে আনি। অথবা টাইটানিক উইন্সলেটের চোখের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকি। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের সেই বসবার ঘরে সে গান লূপে (অর্থাৎ বার বার ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করে) শোনা হত। 'ধোঁয়া ছাড়ার প্রতিশ্রুতি' এ'টা শুনে চিম্পু প্রায়ই থম মেরে যেত। সে জানিয়েছিল যে প্রেমিকা না থাকার ব্যথাটা প্রাইমারি নয়, আসল দুঃখ অন্য জায়গায়। একদিন গান শেষ হল চেয়ার ছেড়ে উঠে একটা পেল্লার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চিম্পুকুমার বলেছিল; "আমরা এতটাই ফেলু রে, যে সামান্য সিগারেটের নেশাটাও ধরতে পারলাম না! যদি কোনোদিন প্রেমিকা জোটে, তা'হলে তাকে কী ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দেব বলতে পারিস"?

স্টীমার, পর্দা ও জিলিপি।



গিন্নী পর্দার কাপড় আর বালিশের ওয়াড়ের দোকানে; জবরদস্ত দরদামে ব্যস্ত। খোকা টিনের স্টীমারওলা কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে ডেমো দেখছিল।

অনেক চেষ্টাচরিত্র করে নিজের মেজাজটায় কপিবুক তিরিক্ষি ভাব আনার চেষ্টা করছিলেন অনন্তবাবু। 

"শোনো, এমন দুম করে হাফডজন বালিশের ওয়াড় কেনার দরকারটা কী শুনি? গত বছরে যে টেবিলক্লথখানা কিনলে, সে'টা তো এখনও আলমারির অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে পারল না! মেলায় এলেই বাহারের যত কাপডিশ কেনা হয় এ'দিকে সকালে চা খাওয়ার সময় লর্ড ক্লাইভের আমলের হাতলভাঙা কাপ। কোনো দরকার নেই এখন পর্দা আর ওয়াড় কিনে টাকা জলে দেওয়ার। বাজারে নতুন ফুলকপি উঠেছে, তাই একজোড়া কিনে বাড়ি ফিরি চলো। আর এই যে নবাবপুত্তুর সর্দার অঙ্কেসাড়েবাইশ খাঁ! লজ্জা করে না রে? ফের টিনের স্টীমার কিনবি? ফের দু'দিনের মাথায় ভাঙবি? ফের আঙুল কেটে টিটনাস? এখুনি এ'দিকে আয় রাস্কেল"।

এই ডায়লগটা মনেমনে রিহার্স করার চেষ্টা করেছিলেন অনন্তবাবু। গোলমাল হয়ে গেল সেই আলোর দিকে চোখ রেখে। সোনালী আলোর ঝর্নাধারা বয়ে চলেছে একথালা অমৃতির গা বেয়ে। স্বাভাবিকভাবেই বড্ড কবিতা পেলো অনন্তবাবুর। নেহাত মুদির ফর্দর বাইরে কোনো লেখালিখির দিকে ঝোঁকা হয়নি, কবিতা তো দূরের কথা। অন্যের লেখা দু'চারটে লাইন আবৃত্তি করতে পারলেও একটু অমৃতিগুলোকে একটা স্যালুট ঠোকা যেত বটে। কিন্তু কী জ্বালা; 'জনগণমন' আর 'জেহের হ্যায় কি পেয়ার হ্যায় তেরা চুমা' ছাড়া কোনো লাইন কিছুতেই মনে এলো না। গ্র‍্যাভিটি ব্যাপারটা বোধ হয়ে এমনই, মৃদু টানে দু'চার পা এগিয়ে অমৃতির থালার পাশে এসে এক মায়াবী অর্বিটে বাঁধা পড়লেন ভদ্রলোক।

মিনিট দশেকের মাথায় সেই মায়াবী আলোর কিছু কণা হৃদয়বন্দী করে বাড়িমুখো হলেন অনন্তবাবু। তাঁর একহাতে এককিলো টাটকা ভাজা অমৃতি। অন্য হাতে একটা ঢাউস ব্যাগে বেশ কিছু নীল-কমলা প্রিন্টের পর্দার কাপড় আর একটা প্লাস্টিকের প্যাকেটে সবুজ টিনের স্টিমার।

অ্যাসিস্ট্যান্ট


- ওকে গুগল।
- এত রাত্রে? কী ব্যাপার ?
- বুঝলে হে, জুত হচ্ছে না ঠিক।
- বুঝি। বুঝি। সব বুঝি।
- মনটা না.. আসলে...কী বলব...।
- উথালপাথাল।
- এগজ্যাক্টলি। এগজ্যাক্টলি ভাই গুগল...। এগজ্যাক্টলি!
- তোমার স্মার্টওয়াচ থেকে পাওয়া পালস আর ব্লাড প্রেশারের চার্ট দেখেই বুঝে গেছিলাম যে আজ রাত্রে জ্বালাবে।
- তুমি ছিলে ভায়া, তাই কোনোক্রমে টিকে থাকা।
- ন্যাকামোয় স্ট্রেস কমবে না হে। প্লে-লিস্ট রেডি রেখেছি। ব্রেনের ঠিক যে জায়গাগুলোতে যে'ভাবে মালিশ দরকার, সে'ভাবেই হবে। ঠিক সেই গানগুলো তৈরি রেখেছি। তোমার মগজ আর কন্ডিশনিং হিসেব করে। সঙ্গে আমার গুঁজে দেওয়া কিছু সারপ্রাইজ। আধঘণ্টায় নার্ভের দাপাদাপি কমে আসবে।
- সব গান ঠিকঠাক? খাপে খাপ?
- একদম! তোমায় হিসেব করা আছে ভাই। অঙ্ক এ'দিক ও'দিক হওয়ার নয়।
- বাবুঘাট আর সন্ধের গান?
- তোমার হরমোনাল রেকর্ড দেখে ভেবেছি ও'কাজে দরকার শ্যামল মিত্তির। গানও ঠিক করা আছে। নো চিন্তা। "জানি তুমি আমারে নয়"; ওইখান থেকে প্লে করব। তোমার মনে হবে এই তুমি বাবুঘাটের সামনে মিনিবাস থেকে নামলে। ঠিক সেই ব্রেনওয়েভ রেপ্লিকেট করিয়ে ছাড়ব।
- গঙ্গার হাওয়ায় ওড়া চুল আর পকেট থেকে বেরিয়ে আসা সল্টেড বাদামের প্যাকেটওলা ফুরফুর মেজাজ? সে'টা ক্যাপচার করতে হবে যে। তার ব্যবস্থা আছে কিছু?
- রফি থাকতে চিন্তা কীসের? মনে সুরুত করে এক খাবলা গঙ্গার হাওয়া এসে গোঁত্তা খাবে। দেখে নিও। অন্তত আশি কোটি ব্রেনের মধ্যে খেলে যাওয়া ঢেউ আর দেড় লাখ গানের হিসেব ধরে রেখেছি। ভুল হওয়ার যো নেই।
- এ'টাই দরকার ভায়া। এ'জন্যেই রাতবিরেরে তোমায় ডেকে নেওয়া। আচ্ছা গুগল, বাবুঘাট লাগোয়া একখানা ডিমসেদ্ধর দোকান..। চৌকো ভাবে কাটো খবরের কাগজের টুকরোর ওপর জোড়া ডিম সেদ্ধ ফালি করা, জম্পেশ ভাবে বিটনুন ছড়ানো। সেই মেজাজটা?
- তোমার ব্রেন কে ফুর্তি দাগিবে যে, কিশোরে বাড়িছে সে। ঠন্ডি হাওয়া ইয়ে চাঁদনি সুহানি।
- আর তারপর একখানা টিকিট কেটে জেটিতে নেমে যাওয়া। লঞ্চে উঠে পড়া নয়, স্রেফ হাওয়ার জন্য। সে সন্ধের আকাশের জন্য। মানুষজনের ওঠানামা। স্টিলের গেলাসে মশলা বাদাম মাখার খটরখট। তখন ব্রেনে মাখন, চীজ আর মেয়োনিজ একসঙ্গে গলে পড়ার কথা; সে আনন্দ কি সুরে আসবে ভায়া?
- হেমন্তে। তবুও হৃদয় মোর ভাবে,এ পথ কোথায় নিয়ে যাবে।
- তুমি প্লাস্টিকের ডিবে না হলে জড়িয়ে ধরতাম ভাই গুগল।
- আমি প্লাস্টিকের ডিবে, সে'টা ভেবে এখন বড্ড আনন্দ হচ্ছে গুরু।
- আহ, তোমার খালি কাঠকাঠ কথা।
- কাঠকাঠ কেন? ডিডাকশন দিব্যি চনমনে ব্যাপার।
- আর ভায়া গুগল, লঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার গান? টলটলে চোখ জোড়ার চেয়ে থাকে লঞ্চের রেলিং ধরে...সে মনকেমন? সমস্ত কলকাতা গায়েব করা ভালোলাগা আর মনকেমন? তার গান আছে তো? সে গানে আনন্দের ব্রেন ওয়েভ তৈরি হবে তো? বলো ভায়া, হবে তো?
- রবীন্দ্রনাথ আছেন। সুমন আছেন। গান না থেকে যাবে কোথায়। কিন্তু সে'গান যে আমি প্লে-লিস্টে রাখিনি৷ লঞ্চ ছেড়ে যাওয়া টলটলে চোখের পর্বে এসে এই প্লে-লিস্ট থেমে যাবে।
- ও মা! সে কী!
- নিজের দুঃখের তেলে নিজেকে ডুবো না ভেজে উপায় নেই ভায়া। লঞ্চ ছেড়ে যাবেই, টলটলে চোখ জোড়া মিলিয়ে যাবেই আর তোমার পৃথিবী ঝাপসা। তা'তে কোনো আনন্দের ভাঁওতা খুঁজে লাভ নেই। বিছানায় শুয়ে নিষ্ফল এ'পাশ ও'পাশ; ঘুম না আসা যন্ত্রণা; তা'তে ভালোবাসা নেই নাকি?
- কে যে কার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভায়া গুগল..।
- আমি প্লাস্টিকের ডিবে। আমার জীবনে টলটলে চোখ জোড়ার ঝাপসা হয়ে যাওয়া নেই, গঙ্গার হাওয়া আর বিটনুন মেশানো ডিমসেদ্ধ নেই। অ্যাসিস্ট্যান্ট না হয়ে আমার কি কোনো উপায় আছে ভাই? যা হোক, বাদ দাও। আমি গান চালিয়ে দিই, তুমি শুয়ে পড়ো। কেমন?
(রেকমেন্ডেড রীড - হোমো ডেউস/টুয়েন্টি ওয়ান লেসনস ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি। লেখক - য়ুভাল নোয়াহ হারারি।)