Saturday, June 16, 2018

মেসি ও মামা

- মামা গো!
- এই অসময়ে ফোন করেছিস কেন?
- অসময়? রাত পৌনে ন'টা। এখন তো তুমি সবে মশলা মুড়ি খেয়ে অ্যাপেটাইট বিল্ড করছ।
- নাহ্‌। আজ আর সে'সব করছি না।
- সে কী! শনিবার রাত তো তোমার পাঁঠার কোর্মা আর হাতরুটির রাত। প্লাস ছানার পায়েস। তা, অ্যাপেটাইট বিল্ড না করলে চলবে?
- আজ রাতে ঝিঙের তরকারি আর সয়াবিন।
- সে কী!
- বাজে কথা বলার সময় আমার নেই।
- তা খেলা দেখলে?
- হ্যাঁ। ইংল্যান্ড খুব ভালো ব্যাট করেছে।
- সে কী! মেসি মাঠে নামলে আর তুমি ক্রিকেটের রেফারেন্স দিচ্ছ মামা?
- বড্ড পেকেছিস তুই। সেদিনের ছোকরা, বড়দের লেগপুল করছিস?
- যাব্বাবা! খেলা দেখছ কিনা জিজ্ঞেস করলাম, এ'তে আবার লেগপুলের কী হল।
- শোন, এককালে ডিস্ট্রিক্ট খেলেছি। লেফট উইং। বুঝলি? তোদের মত ইএ স্পোর্টসে লম্ফঝম্প করে জ্ঞান ঝাড়ি না।
- মন খারাপ মামা? মেসির পেনাল্টি মিসে?
- মনখারাপের কী? শোন, মারাদোনা আর মেসির পর আমার মোস্ট ফেভারিট আর্জেন্টাইন চে'কে টিশার্টে নয়, বুকে রাখি। বিপ্লব কখনও পেনাল্টি মিস করে সন্ন্যাস নেয় না। আইসল্যান্ডের সঙ্গে আইসব্রেকিংয়ে সমস্যা হয়েছে, দাঁড়া আর দু'দিন। ওই নন-ন্যাড়া রোনাল্ডোর কান মুলে যদি মেসি না এগিয়েছে...।
- কিন্তু যাই বলো মামা। তেকাঠিতে প্রায় বল রাখতেই পারল না। পেনাল্টিতে অবশ্য রেখেছিল, তবে ইয়ে। গোলকিপারটা বেরসিক।
- ইনজুরিতে আজিনোমোটো ছড়াচ্ছিস? সেই জন্যেই তো ফোন করেছিস, তাই না?
- মামা, খামোখা চটছ মাইরি।
- সব বুঝি। যাক গে। এ'টা আমি জানতাম।
- জানতে?
- বাপনদা বলছিল, গ্রহের পজিশন নাকি বিট্রে করতে পারে।
- বাপনমামা? তোমার সেই তান্ত্রিক কাম জ্যোতিষ বন্ধু?
- হুঁ।
- গ্রহের পজিশনের পেনাল্টি মিস?
- মেসি একটু ভেবড়ে গেছিল তাই। মেসি একটা মাদুলি ধারণ পারলে ভালো হত। কিন্তু যাকগে। অল্টারনেট উপায় একটা পাওয়া গেছে।
- কী উপায়?
- সামনের মঙ্গলবার নিরামিষ খেয়ে মেসির নামে কালীঘাটে একটা পুজো দিতে হবে। বাপনই সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে।
- বলো কী!
- গ্রহের ইন্টারফারেন্স কাটলেই; কচাতকচাত করে সব কচুকাটা হবে।
- মামা, তুমি মঙ্গলে নিরামিষ খাচ্ছ?
- উপায় নেই রে। উপায় নেই।
- যাব্ববা। এ তো বেশ মুশকিল হল।
- কীসের মুশকিল?
- মঙ্গলে জামাই ষষ্ঠী না? এ'বার তোমার শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাকেনি? জামাইআদরের শেলফ লাইফ শেষ?
- সর্বনাশ! মঙ্গলে তো জামাই ষষ্ঠী। একদম ভুলে মেরে দিয়েছিলাম। এ'দিকে পুজোটা মঙ্গলেই করতে হবে। পরের মঙ্গল হলে ইট উইল বি টু লেট।
- যাক, তা'হলে কী আর করা যাবে। এ যাত্রা নিরামিষ খেয়েই কাটিয়ে দাও জামাইষষ্ঠীতে। শ্বশুরবাড়িতে জানিয়ে দাও। দুপুরে ভাত, ঝিঙে আলুর ঝোল, আর মুলো দেওয়া ডাল থাকলেই চলবে।
- খামোশ। ভামোস নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। আর রিয়েল খেলা তো ক্রিকেট রে; যে'খানে লাঞ্চ টী ড্রিঙ্কস সমস্ত আছে। ফুটবল তো ধ্বস্তাধস্তি। একটা আদ্দির পাঞ্জাবি কিনতে হবে। বেরোব ভাবছি। দেখা করবি নাকি? পাঞ্জাবি কেনা আর নন্দী হোটেলের মেটে চচ্চড়ি আর ডিম তড়কা। কী?
- তুমি অন্তর্যামী মামা। মোড়ের মাথায় দেখা করি তা'হলে? আধঘণ্টার মাথায়?
- তাই আয়। আমি একটু মশলা মুড়ি মুখে দিয়েই বেরোচ্ছি।
(ছবিঃ Pulse)

বিক্রম বেতাল


- দাদা।
- বিক্রম? আয়।
- কাজ হয়ে গেছে।
- লাশ?
- অ্যাসিড। তারপরে নদী।
- আশেপাশে?
- কেউ ছিল না। ডবল শিওর।
- গুড।
- দাদা।
- আবার কী। টাকা পাসনি?
- পুরোটাই অ্যাডভান্সে।
- তবে?
- না মানে...।
- আর কী?
- এক পেগ, হবে? আসলে এ'সব কাজের পর কেমন...।
- নার্ভাস?
- ছিঃছিঃ, তা না। তবে ওই, কেমন একটা।
- সোডা?
- শুধু জল।
- নে।
- আহ্। বাঁচালে।
- তাড়াহুড়ো কেন?
- না...এমনি।
- তাই বলে বটমস আপ?
- প্যালপিটেশন হচ্ছিল যেন। ইয়ে, হবে? আর এক পেগ?
- হবে।
- থ্যাঙ্কস।
- বিক্রম। এরপর কিন্তু আর এক পেগও নয়। কাল আবার নতুন করে কাজে নামতে হবে।
- কাল? আবার?
- উপায় নেই। থামার উপায় নেই বিক্রম।
- দাদা, আমার আর ভালো লাগছে না।
- সে কথা আগে ভাবা উচিৎ ছিল।
- তোমার দমবন্ধ হয়ে আসে না? এই বিশ্রী খেলা খেলতে?
- বিশ্রী? 
- রোজ একটা করে নতুন দেহ খুঁজে বের করে ভর করো, রোজ আমি সেই মানুষ খুঁজে খুন করি আর তারপর তুমি এখানে এসে গা এলিয়ে বসে অপেক্ষা করো আগামীকালের। নতুন দেহের।
- গা এলিয়ে বসি, নাকি? আত্মার গা?
- সরি, মানে...ওই আর কী। কিন্তু রোজ তোমায় খুন করে নতুন নতুন লাশ গায়েব করা আর তারপর এই ভূতের আস্তানায় এসে অপেক্ষা করা; কখন নতুন বডি ধরবে; কাহাতক সহ্য হবে?
- টাকা নিয়েছিস। কোনো ওপরচালাকি নয়।
- বেতালদাদা, প্লীজ। আমি আর পারছি না। আমার আর টাকার দরকার নেই।
- বেশ, শেষ খুনটা করে দে।
- তারপর?
- মুক্তি?

ছটফট করে ওঠে বিক্রম, নিজের নতুন দেহের মধ্যে তখন বেতালদাদার আত্মার পাক খাওয়া দিব্যি টের পায়। 
ফের নিজের বুকে ছুরি বেঁধানো। ফের নিজের লাশ গায়েব করা। ফের একটা মড়া বয়ে এই অন্ধকারে ফিরে আসা। রোজ রোজ নতুন শেষ খুন জমা হয়।

টাকাগুলোয় অবশ্য পরিবারটা বেঁচেছে। কিন্তু এ দুর্ভেদ্য অন্ধকার বড় অসহ্য লাগে বিক্রম গোয়েন্দার। মামুলি সিরিয়াল কিলিংয়ের কেস ভেবে বেতালের পিছনে পড়াটা মোটেও উচিৎ হয়নি।

সাহেব আর বিশ্বকাপ


বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে আমার লেভেলের ফুটবল বোদ্ধার যা প্রথমেই করা উচিৎ; তা হল
ফের "সাহেব" দেখা।

সাহেব গোলকীপার; কীপিংয়ের ট্র‍্যাজেডি সিনেমার ডায়লগেই আছে। কিন্তু ইঞ্জুরি টাইমে গোল দিয়ে এ সিনেমাকে এগিয়ে দিয়েছেন উৎপলবাবু।
মনমেজাজ বেশ গোলমেলে জিনিস, মাঝেমধ্যেই মনে হয় "সবে জলে, সব নষ্ট হয়ে গেছে। তিব্বত-লেভেলের হৃদয় নিয়ে শেয়ালদার ভীড় ট্রেনে পেষাই হয়েই এ জীবন কেটে যাবে"। তখন প্রয়োজন পড়ে আত্মার সর্বিট্রেট, মেজাজের জিভের তলায় তৎক্ষণাৎ তা না রাখলেই সমূহ বিপদ। প্যাকেজড দুঃখের ব্র‍্যান্ডিতে মন চাঙ্গা করার বেশ কিছু ফর্মুলা রয়েছে; যেমন 'ইতি তোমার মা'য়ের শেষ চিঠি বা 'সাহেব' সিনেমার এই দৃশ্যের উৎপলবাবু।
এক সৎ পিতা তাঁর পুত্রকে প্রণাম করতে চেয়েছিলেন। যে সুগভীর যন্ত্রণা আর আকাশ-ছোঁয়া গর্ব মিশে সে ইচ্ছে তৈরি হয়, তা বোধ হয় শুধু এক পিতৃহৃদয়ই ধারণ করতে পারে।

এ'দিক আর ও'দিক


ক্লাসরুমের এক কোণে বসে কেউ মন দিয়ে বুকক্রিকেটে ভেঙ্কটেশ প্রসাদকে দিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করাচ্ছে, আর অন্যদিকে ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক স্যার এলিয়েনদের ভাষায় আঁকিবুঁকি কেটে চলেছেন।
অফিসের গোলমালে একজন বসের ইগোর জুতোয় বুক নিঙড়ানো চেরিব্লসম ডলে চলেছেন আর অন্যপ্রান্তে বসে একজন জান লড়িয়ে দিয়েছেন ফাইলের ভিড় সাফ করতে।
একদিকে কেউ খবরের কাগজ আর নিউজ চ্যানেলের পাল্লায় পড়ে তিতকুটে মেজাজের পুকুরে ডুবসাঁতার দিচ্ছেন আর ও'দিকে পাশের ঘরেই অন্য একজন জয় গোস্বামীর হোকাসপোকাস ব্যবহার করে নিজের পাশবালিশ কে লেভিটেট করাচ্ছেন।
আর...
ভরা গড়িয়াহাটে।
রাস্তার ও'পাশে দাস কেবিন।
এ'পাশে প্রেশার আর ওজন মাপার কাউন্টার।
মাইরি।

অক্টোবর


সাতপুরনো পুজোবার্ষিকী একসময় প্রচুর কিনেছি। একটা শুকতারার (সম্ভবত যে'টায় ভাগ্যলক্ষ্মী লটারি গল্পটা ছিল) হলদেটে পাতার এক কোণে; কালো ফাউন্টেন পেন আর কমলা স্কেচপেনে কেউ একটা শিউলিফুল এঁকে রেখেছিল। বড় যত্নে আঁকা। স্পষ্ট, জীর্ণ পাতাতেও জ্বলজ্বল করত। বইটা হারিয়ে ফেলেছি, সেই শিউলিটা রয়ে গেছে। গানের কথা গুলিয়ে গেলেও; সুরের গুনগুনে যেমন কিছু গান থেকে যায়।

আর এই 'অক্টোবর'। শীতলপাটির গায়ে ইয়ারবাডের মাথা ছোঁয়ালে যে শব্দ হবে, এ সিনেমায় তার চেয়েও কম noiseয়ে তৈরি। ঠিক যতটুকুতে ভোরের হাওয়ায় শিউলির ঝরে পড়া, ততটুকু। ততটুকুই।

তার পাশে ড্যান। ঘাসে থুতনি ডুবিয়ে শিউলি চেনা ড্যান।
Dan. Dawn. যাই হোক। গোটা ক্যালেন্ডারটাই অক্টোবর নয়। সব শিউলি 'ড্যান কোথায়?' প্রশ্নে এসে মেশে না। সমস্ত ড্যান শিউলির অপেক্ষায় শরৎ হয়ে ওঠে না।

সঠিক


চিরকাল সঠিক মানুষরা পাশে থেকেছেন। যেমন কলকাতার মেসের আন্টি।
বছরের এই সময়টা মেসে রাত্তিরে খাওয়ার পাতে একটা করে আম থাকত। সবাইকে দেওয়া হত একটা গোটা আম তিনটে লম্বা ফালি করে; খোসা-সহ।
কিন্তু আন্টি আমার 'সেনসিটিভিটি' বুঝতেন, স্নেহ করতেন। আমার পাতের পাশে স্টিলের প্লেটে থাকতো খোসা ছাড়ানো কুচোনো আম (আঁটির বাহুল্য বাদ দিয়ে); সঙ্গে ফ্রুট-ফর্ক। 
"আমাদের তন্ময়ের খোসা ছাড়িয়ে খেতে অসুবিধে হয়"
বা
"পেটির মাছ ছাড়া তন্ময় ঠিক খেতে পারে না"
বা
"আজ মাছের তেল অল্প ছিল, তেলবেগুনের চচ্চড়ি তাই শুধু তন্ময়কে দিয়েছি। ও বেচারি ঝোলটোল তেমন ভালো খায় না"।

স্নেহ ব্যাপারটা সামান্য অন্ধ না হলে চলে না। আর স্নেহে নিখুঁত অবজেক্টিভিটি হচ্ছে প্যারামাউন্টের ডাব সরবতে চোনার মত।
কপাল করে মেস-মেটদের জুটিয়েছিলাম; আমার প্রতি আন্টির বাড়তি স্নেহে কারুর কোনোদিন চোখ টাটায়নি।

Thursday, June 7, 2018

খুচরো-রবিনহুড

- খুচরো চাই?
- খুচরো?
- চাই? আছে প্রচুর।
- জানা নেই শোনা নেই। আপনি আমায় খুচরো দেবেন কেন?
- বাহ্, আধ ঘণ্টা ধরে বাসে পাশাপাশি বসে আছি। বাস ঢাকুরিয়া থেকে আলিপুর চলে এলো। আপনার খোকার নাম বিট্টা, হাফ ইয়ার্লিতে অঙ্কে কম নম্বর পেয়েছে। কতটা জানি বলুন।
- আপনি কান পেতে আমার ফোনে বলা কথা শুনছিলেন?
- হ্যাঁ। বৌদির গা ম্যাজম্যাজ। আর আজ আপনার বড়ি কিনে বাড়ি ফেরার কথা, ওই কোন সাউয়ের দোকানের বড়ি।
- এই, আপনি তো ডেঞ্জারাস লোক মশাই।
- আরে! এমপ্যাথিতে আবার ডেঞ্জার কোথায়?
- রাখুন। এমপ্যাথি। গায়ে পড়ে খুচরো দেওয়া। এই আপনার মতলবটা কী বলুন তো।
- মতলব ছাড়া কিছু করতে নেই বুঝি? কন্ডাক্টরকে পয়সা দেওয়ার সময়ই দেখলাম তো। মানিব্যাগ থেকে শেষ দশ টাকার নোটটা অফার করলেন। এখন পড়ে সব ড্যাবা ড্যাবা নোট। বড়ি কিনতে গিয়ে বড় রকমের ঝামেলায় পড়বেন তো। দিন, দু'টো পাঁচশো দিন। পাঁচটা একশো, আটটা পঞ্চাশ, পাঁচটা কুড়ি আর দশটা দশ দিচ্ছি। কড়কড়ে নোট। মাইরি।
- ধেত্তেরি। কী গায়ে পড়া লোক মাইরি। বললাম তো, খুচরো চাই না।
- সন্দেহ করছেন? জাল নোট গছিয়ে দেব?
- ট্যুয়েন্টি সেভেন্টিতে বাস করছি মশায়। মার্সেও পিকপকেট হচ্ছে। এ'দিকে আমি ফট করে মিনিবাসে এক উটকো খুচরো-যুধিষ্ঠিরকে বিশ্বাস করে ডুবি আর কী।
- কী বাতিকগ্রস্ত বলুন দেখি আপনি। হাতের খুচরো পায়ে ঠেলছেন। বাজে তর্ক না করে দিন দু'টো পাঁচশো। ভাঙিয়ে দিই, সামনেই আমি নামব।
- খবরদার। খবরদার খুচরো খুচরো করে জোর করবেন না। নয়ত কন্ডাক্টরকে কম্পলেইন করতে বাধ্য হব।
- কন্ডাক্টর কি হেডমাস্টার?
- আপনি কি ডাকাত?
- না। তবে মাইল্ড বিপদে পড়েছি স্যার। আমার খুচরো গোটা করে দিন প্লীজ। আমি জেনুইন। আমার আধার কার্ডের কপি রাখতে পারেন।
- কিন্তু বিপদটা কীসের?
- অটো যাতায়াতের জন্য সাড়ে ছয় কেজি খুচরো জমিয়েছিলাম। এই দু'হাজার সত্তর সালের মধ্যেই বেহালা মেট্রো চালু হয়ে যাবে ভাবিনি। এলিয়েনরা কী সব টেকনোলোজি নিয়ে এমন  ইন্টারভিন করল যে আমার অটো-খুচরোর স্টক এখন লায়াবিলিটি। সে কারণেই আমি এখন খুচরো-রবিনহুড স্যার। তিলে তিলে স্টক ক্লীয়ার করছি।
- বেহালা মেট্রো চালু হচ্ছে। মনখারাপ হয়ে যায় ভাবলেই। অমন ঐতিহাসিক আলসে পিলারগুলোর গায়ে কত চাপ পড়বে। নাহ, এমপাথাইজ করতেই হবে। দিন দেখি যা খুচরো আছে।

মধুময়ের হিল্লে

মধুময় জানে না ব্যাপারটা কী ভাবে ঘটে।
জানার কথাও না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হয়।
মধুময়ের গান পায়, শুধু গান পায় তাই নয়; গলা বেয়ে গান আপনা থেকেই বেরিয়েও আসে। মধুময় জানে না ব্যাপারটা কী ভাবে ঘটে।
জানার কথাও না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হয়।

মধুময়ের গান পায়, শুধু গান পায় তাই নয়; গলা বেয়ে গান আপনা থেকেই বেরিয়েও আসে।

সুরগুলো মধুময়ের চেনা নয়। সবচেয়ে বড় কথা; গানের ভাষাটাই মধুময় জানে না। তবু অচেনা ভাষায় নতুন নতুন সুরে নতুন নতুন গান মাঝেমধ্যে মধুময়ের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে। আর যখন আসে তখন সেই সুরের তোড় কিছুতেই রোখা যায় না; মধুময় গেয়ে উঠবেই। অমূল্য দাসের মুদীর দোকানে কাজ করে, হঠাৎ হঠাৎ গান পেলে বড় অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে সে। অমূল্য দাস বা খদ্দেররাও প্রথম প্রথম ভেবড়ে যেত আর অদ্ভুত ভাষার গান শুনে, কিন্তু মধুময়ের গলায় দিব্যি সুর এসে গেছিল। ক্রমশ ব্যাপারটা গা-সওয়া হয়ে এসেছে। এখন আর তার গানে কেউ চমকে ওঠে না, এমনিতেও 'পাগলছাগল' বলে তাকে বিশেষ কেউ ঘাটায় না।

কিন্তু গান এলেই আরো একটা ব্যাপার হয়, সে'টা মধুময় ছাড়া অন্য কেউ টের পায় না। কানের মধ্যে কারুর মিঠে খিলিখিল হাসির শব্দ ভেসে আসে। কোনো ছোট্টমেয়ে, নিশ্চিত। মাঝেমধ্যে আসে হাততালির শব্দ, কখনো ছোট্ট মেয়েটা কথায় বলে ওঠে, গেয়েও ওঠে; কিন্তু সেই উদ্ভট অজানা ভাষায়। ব্যাপারটা আরো গোলমেলে অন্য কারণে, মধুময় কালা। কানে কিস্যুটি শুনতে পায় না। সাত বছর বয়সে একটা বিশ্রী অসুখে কান দু'টোই গেছিল। খুকির গলা কী ভাবে শুনতে পায় মধুময়? খুকিটি কে? কোথায় থাকে?

বেশি চিন্তা করে লাভ নেই। খুকির প্রতি সামান্য মায়া পড়ে গেছে। খুকি কি তার গান ভালোবাসে?

**

শিয়াঙের বন্ধুবান্ধব নেই, কথা বলতে না পারলে যা হয় আর কী। তবে শিয়াঙ সমস্ত কথা শুনতে পারে। সে আপন মনে খেলে বেড়ায়। মাঠে, ছাদে, উঠোনে, বাগানে আর মাঝেমধ্যে চিলেকোঠার ঘরে।
চিলেকোঠার ঘরটা শিয়াঙের বড় প্রিয়। কত সাতপুরনো আসবাবপত্র সে'খানে পড়ে। ছোট্ট শিয়াঙ সবচেয়ে ভালোবাসে পুরনো ভাঙাচোরা ট্রাঞ্জিস্টরটা। সবাই অবশ্য সে'টাকে অচল বলে, অথচ শিয়াঙ সে'টার নব ঘোরালেই একই কণ্ঠে খালি গলায় বিভিন্ন গান শুনতে পায়। সে কথা অবশ্য কেউ বিশ্বাস করে না। এক ভারতীয় বিজ্ঞানী কিছুদিন শিয়াঙের বাবার অতিথি হয়ে ছিলেন, শিয়াঙের সঙ্গে বড্ড ভাব জমে গেছিল তার। যাওয়ার আগে এই ভাঙা ট্রান্সিস্টর শিয়াঙকে উপহার দিয়ে গেছিলেন।

বাড়ির সক্কলে অবাক, এমন ভাঙা ট্রান্সিস্টর কেউ কাউকে দেয় নাকি? তবে বৈজ্ঞানিকরা অমন খ্যাপাটে হয় বটে, আর উপহার যখন; তা ফেলেও দেওয়া যায় না। কাজেই তার স্থান হয়েছিল চিলেকোঠায়। 

কিন্তু উপহারটা যে কতটা ভালো তা শুধু শিয়াঙ টের পায়। রেডিওর নব ঘোরালেই একটা অচেনা পুরুষ কণ্ঠ অদ্ভুত উচ্চারণে এবং অপূর্ব সুরে গাইতে শুরু করে। কী আনন্দ হয় শিয়াঙের। খিলিখিলিয়ে হেসে ওঠে সে, হাততালি দেয় আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার; সেই গান শোনার সময় রীতিমত কথা বলতে পারে ছোট্ট শিয়াং। কেউ বিশ্বাস করে না, তা'তে শিয়াঙের ভারি বয়েই গেছে! সে গান শুনে শিয়াঙ কথা বলতে পারে; এমন কী গাইতেও পারে। 

শিয়াঙ বড্ড ভালোবাসে রেডিওর কণ্ঠস্বরটাকে।

**

- প্রহ্লাদ রে, আছিস কোথায়?
- যাক, চীনদেশ থেকে ফিরলেন শেষে। আমি ভাবলাম আর ফিরবেন না। ল্যাবোরেটরির মায়া ত্যাগ করে মানস সরোবরের আশেপাশে সাধুটাধু হয়ে ঘুরে বেড়াবেন বোধ হয়।
- ল্যাবরেটরি সাফ রেখেছিস?
- ঝকঝকে তকতকে আজ্ঞে।
- তোর জন্য একটা ভালো খবর আছে।
- সন্ন্যাসটা নিচ্ছেন? আমায় এ বাড়ি উইল করে দিচ্ছেন। ল্যাবরেটরিতে কিন্তু আমি ঠাকুরঘর করব বলে রাখলাম।
- উফফ। এ ব্যাটাকে স্নাফ গানে শায়েস্তা না করলে চলছে না। যাক গে, তোর পিসতুতো ভাই মধুময়ের কথা বলেছিলিস না? তার বড় দুঃখ সে কানে শুনতে পায় না? হিয়ারিং এডেও কাজ হয়নি? 
- নবদ্বীপে বাস। ন্যালাখ্যাপা হতে পারে, কিন্তু বড় ভালো ছেলে। আহা, কী দুঃখ তার! 
- তার একটা হিল্লে করে এলাম।
- মধুময়ের?
- নয়তো আর বলছি কী। 
- চীনদেশে গেছিলেন না নবদ্বীপ?
- চীন। অপূর্ব দেশ, ছ'মাস ধরে চষে বেড়ালাম। 
- তা'তে মধুময়ের কী লাভ? সে যে নবদ্বীপে!
- এক ঢিলে দুই পাখি। তোর মাথায় ঢুকবে না। তা হ্যাঁ রে  প্রহ্লাদ,  নিউটনকে দেখছি না যে। তার কি অভিমান হয়েছে?