Sunday, January 29, 2023

বিশ্বকাপ জয়ী দেশ থেকে বলছি



আমি খেলা দেখি খেলার ভালোমন্দ, ইতিহাস-ভূগোল, টেকনিক-বেটেকনিক বুঝি বলে নয়৷ দেখি, কারণ গ্যালারি (আহ্, টিভির সামনেটাও গ্যালারি) লম্ফঝম্পের সুযোগ করে দেয়। ওই লম্ফঝম্পই আমার জীবনের জিম। 

আর আজ;
পকেটে ওয়ার্ল্ডকাপ৷
রাত্রে বিরিয়ানি৷

ইয়ে, এ'টাই আমার দেখা প্রথম আন্ডারনাইনটিন ফাইনাল (না, এর আগে ছেলেদের আন্ডার নাইনটিন ফাইনালও দেখিনি)। আজ ম্যাচ দেখতে বসে জানলাম যে এই টীমে চুঁচুড়ার মেয়ে আছে। চুঁচুড়া; মানে তো প্রায়-পাড়া।  সেই তিতাস সাধু আজ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড়৷ দু'তিনবার ইন্টারভিউয়ের সময় আলাদা করে টিভিরে এলো; কথাবার্তা কী ঝকঝকে, ভাবনাচিন্তা কী সুস্পষ্ট৷

ম্যাচ শেষে আরও জানলাম; ওই নখ-চেবানো পরিস্থিতিতে জরুরী ইনিংস খেলা তৃষা নাকি ইন্ডয়ানঅয়েলের স্পোর্টস স্কলারশিপ হোল্ডার। 

খেলাধুলোর এই একটা ব্যাপার; বুক বাজিয়ে বলা যায়; ওই দ্যাখো, ও আমার পাড়ার, আমার শহরের, আমার রাজ্যের, ইত্যাদি। ইত্যাদি৷ এইভাবে তাদের ভালোমন্দতে ব্যক্তিগত ইনভেস্টমেন্ট টেনে আনা। 

আর ইনভেস্টমেন্টের ঠাকুর্দা? সুর করে "ইন্ডিয়া ইন্ডিয়া" চেল্লামেল্লি৷ সে প্রসঙ্গে বলি; ক্যাপ্টেন শেফালি (শাফালি বলব?) ভার্মার প্রেজেন্টেশনের ইন্টারভিউ; ও'টাই আমার দেখা সেরা পোস্ট-ম্যাচ ক্যাপ্টেনস ইন্টারভিউ৷ কেন? যাঁরা দেখেননি, তাঁদের দেখতে হবে। ইউটিউবে খোঁজ করুন, ও ব্যাপার বুঝিয়ে বেলার ক্ষমতা আমার নেই।

মিস চ্যাটার্জীর চোখে



- এইত্তো! মিস চ্যাটার্জি!
- আরে, মিস চ্যাটার্জি যে৷ সো গুড টু সি ইউ৷ অনেকদিন পর। তাই না?
- অনেক, অনেকদিন পর।
- ঘুমটা তা'হলে ভালোই জমেছে, তাই না?
- ফার্স্টক্লাস৷ আচ্ছা, মিস চ্যাটার্জি, জাস্ট টু কনফার্ম। এ'টা স্বপ্নই তো?
- স্পষ্ট টেবিলের এ'পাশ থেকে এই আমি টেবিলের ও'পাশে বসা আমির সঙ্গে কথা বলছি৷ স্বপ্ন না হয় যায় কোথায়৷
- তাও ঠিক৷ তবু, স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নকে স্বপ্ন বলে টের পাওয়াটা বেশ অস্বস্তিকর।
- হতে পারে। তবে আপনার সঙ্গটা মন্দ লাগেনা৷
- সেম হিয়ার৷ আচ্ছা মিস চ্যাটার্জি, ঠিক কী সিচুয়েশনে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, সে'টা মনে আছে?
- নাহ্৷ তা কী আর ট্রেস করা যায় স্বপ্নের মধ্যে। হয়ত অরিন্দমের কাঁধে মাথা রেখে। বা হয়ত, অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রেনে ঢুলছি। অথবা হয়ত, ছুটির দুপুর৷ অরিন্দম তাসের আড্ডায়৷ আমি..থুড়ি..আমরা..একাই ঘুমিয়ে৷ আসল ব্যাপারটা ঘুম ভাঙলেই টের পাব।
- হুম৷ স্বপ্নের এই একটা সমস্যা৷ কী জানেন মিস চ্যাটার্জি, খুব ইচ্ছে হয় যে স্বপ্নের মধ্যে একদিন হিসেব কষে বের করব যে আমরা ঠিক কী'ভাবে আর কোথায় ঘুমিয়ে আছি৷
- হিসেব? মানে, তদন্ত?
- মন্দ কী মিস চ্যাটার্জি? আপনাকে দেখে তো বেশ স্মার্টই মনে হয়। ঠিক পারবেন এর একটা হিল্লে করতে।
- হা হা..মিস চ্যাটার্জি! আপনার সেন্স অফ হিউমরও বেশ সরেস৷
- তা, আপনার কী মনে হয়? আমরা এখন অরিন্দমের পাশেই শুয়ে? খুব রোমান্টিকালি? বা হয়ত সোফায় ওর পাশে বসে সিনেমা দেখতে দেখতে, ওর কাঁধে মাথা রেখেই..। নাকি ডাউন বর্ধমান লোকালে আজ বসার জায়গা পেয়ে ঝিমুনি চলে এসেছে?
- কোয়াইট পসিবল৷ কোয়াইট৷ কিন্ত..।
- একটা কথা বলি মিস চ্যাটার্জি?
- অবশ্যই বলবেন৷ এই তো একটা স্পেস, যা খুশি, যেমনভাবে খুশি বলা যায়..লেট আস ইউজ ইট!
- আপনার মুখে বহুদিন পর লেশমাত্র ক্লান্তি দেখছি না..। কতদিন কতদিন কতদিন পর..। একদম ঝকঝকে..।
- তাই? আরে তাই তো! আপনার মুখে সত্যিই কোনও ক্লান্তি নেই৷ ওই চাপা অন্ধকারটা একদম গায়েব..। ঠিক যেন ম্যাজিক!
- তা'হলে তো এ ঘুম অফিস ফেরতাও নয়, সংসারের ঘষামাজারও নয়৷
- যাহ্৷ তার বাইরে আর রইলটা কী মিস চ্যাটার্জি?
- মিস চ্যাটার্জি..একটা..একটা জিনিস..।
- হঠাৎ আপনাকে এত নার্ভাস লাগছে কেন? কী হল?
- মিস চ্যাটার্জি, আপনি কি এখনও খেয়াল করেননি?
- কী বলুন তো?
- কাজল! আপনার চোখে৷ আপনি কাজল পরেছেন!
- তাই তো৷ আপনি কাজল পরেছেন মিস চ্যাটার্জি!
- কাজল!
- কাজল তো শুধুই শুধুই...
- বাপ্পার জন্য, তাই না? সেই সে কত বছর আগে শেষ পরা, ওরই জন্য..। ইয়ে, কাজল ব্যাপারটা আপনাকে দিব্যি মানায় কিন্তু..।
- আপনাকে ভীষণ মানায় মিস চ্যাটার্জি! ভীষণ।
- আপনি কোথায় মিস চ্যাটার্জি? আপনি কি মন্দ হলেন? কোথায় আপনি?
- আপনার চোখে কাজল কেন মিস চ্যাটার্জি?
- আপনার চোখে জল কেন মিস চ্যাটার্জি?

পুরীতে পল্টুবাবু



- এই যে, পল্টুবাবু।

- যাহ্‌!

- খামোখা ফাঁকি দিয়ে কোথায় আর যাবেন বলুন।

- ধ্যাচ্ছাই। গেল, সব গেল।

- এই, মদনমোহন খাবেন?

- ধুত্তোর। কী কুক্ষণেই না...।

- ওই যে ছোকরা যাচ্ছে? ওই ও'দিকে দেখুন। ওর নাম শ্রীনিবাস। স্বর্গদ্বারে যারা মিষ্টি বিক্রি করে, তাদের মধ্যে ওর প্রডাক্টই সবচেয়ে বেশি অথেন্টিক।

- আরে ধ্যার্‌ রে বাবা।

- অত বিরক্ত হচ্ছেন কেন পল্টুবাবু?

- আমি মদনমোহন খেতে চাইনা।

- মাছ ভাজা? মনোজ পাত্রের দোকানেই পাবেন ফ্রেশ মাছের গ্যারেন্টি। চলুন, মিনিট দুয়েক হাঁটতে হবে, ওই নীলাচলের দিকটায় মনোজের দোকান। খুব মাইডিয়ার ভদ্রলোক, মাছভাজার উপরি গপ্পআড্ডাও জুটে যাবে।

- আমার বয়ে গেছে মাছভাজা খেতে।

- মদনমোহন নয়। মাছভাজা নয়। বেশ, একটা মাঝামাঝি রফা করা যাক। চলুন, লেবু চা আর শিঙাড়া খাওয়া যাক। এদের শিঙাড়াগুলো চিমসে কিন্তু ভারি মুচমুচে।

- দেখুন গোলকবাবু, আমি এই মুহূর্তে কোনও কিছুই খাওয়ার দরকার দেখছি না।

- বেশ। তাহলে হাওয়া খাওয়াটাই হোক। আপনার পাশেই থাকি না হয় খানিকক্ষণ।

- আমি কি রোমান্টিক নায়িকা? আমার পাশে থাকার কী হল?

- আরে মশাই, পুরীতে দেখা হল। এরপর আমি চা শিঙাড়া পমফ্রেটভাজা সাঁটিয়ে ঘুরব, আর আপনি খিটমিটে মুখ নিয়ে একা বসে থাকবেন। তা কী করে হয়।

- উফ, কথাবার্তায় গা জ্বলে যায়।

- খুব মনখারাপ পল্টুবাবু?

- বিরক্তি। আর বিরক্তিটা টোটালি আপনার ওপর কনসেন্ট্রেটেড।

- আচ্ছা, বেশ। বিরক্তি কাটানোর একটা শিওরশট উপায় আমার জানা আছে। চলুন, এক বোতল হুইস্কি কিনে বাড়ি ফেরা যাক। দু'পাত্তর পেটে পড়লেই দেখবেন বিরক্তি হাওয়া।

- আপনি মদ খান?

- সন্দেশ ব্যাপারটাই ফার্স্ট প্রেফারেন্স যদিও।

- গোলকবাবু। আধঘণ্টা বসি না।

- বসুন না, তাড়া কিন্তু সত্যিই নেই। মদনমোহনের অফারটা কিন্তু জেনুইন ছিল।

- কী'ভাবে জানলেন আমি পুরীতে?

- গতবার কী'ভাবে জেনেছিলাম আপনি দেওঘরে? তার আগেরবার শ্রীরামপুরে? নেটওয়ার্কের গুণে পল্টুবাবু।

- দারোগা হিসেবে আপনার এলেম আছে। কী জানেন, আরও দিন দুয়েক থাকার বড় ইচ্ছে ছিল। পুরী জায়গাটা সত্যিই বড় চার্মিং।

- বেশ তো, পরেরবার ওই দেওঘরটেওঘর না গিয়ে এ'খানেই আসবেন।

- আর অমনি আপনি টপ করে এসে আমায় অ্যারেস্ট করে নিন আর কী।

- এ'বারে দাঁওটা বেশ বড়ই হাঁকিয়েছেন। এক্কেবারে ব্যাঙ্কের লকার!

- দেখুন, এ বয়সে তো আর টাকার লোভে লাইনে নামি না। তবে একটু এক্সারসাইজের মধ্যে না থাকলে ফিটনেস কমে যাবে। যাক গে। পুরী এসে ভেবেছিলাম দিন চারেক গা-ঢাকা দিয়ে, এই সমুদ্র উপভোগ করা যাবে। গোলকদারোগা যে' এ'ভাবে সব মাটি করে দেবে তা ভাবতে পারিনি।

- সরি। কী করি বলুন, আপনার আর্টের প্রতি একটা আলগা রেস্পেক্ট আমার আছে বটে। তবে পুলিশ হয়ে জীবন কেটে গেল তো, অভ্যাস কাটানো সম্ভব নয়।

- বেশ। আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চলুন। তা ট্রেনে ফেরত নিয়ে যাবেন না ভ্যানে পুরে?

- পল্টুবাবু।

- ট্রেন না ভ্যান?

- সে'টা এখনও ঠিক করিনি। ভাবছি তাড়াহুড়ো করব না।

- মতিগতি ভালো বুঝছি না আপনার। চোরছ্যাঁচড় মানুষকে আশা করি এনকাউন্টারে উড়িয়ে দেবেন না। অবশ্য আপনার যেমন আলাভোলা মাস্টারমশাই টাইপ পার্সোনালিটি, ও'সব আপনার ধর্মে সইবে না।

- পল্টুবাবু। ইয়ে, একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা। একটা বিশ্রী অসুখের পাল্লায় পড়া গেছে।

- কত বিশ্রী?

- কী রোগ জিজ্ঞেস করবেন না?

- আমি তো আপনার শ্যালক নই। ইয়ারদোস্তও নই।

- তা বটে।

- কত বিশ্রী? গোলকবাবু?

- কপাল ভালো হলে মাস দশেক। কপাল মন্দ হলে...।

- এই সেরেছে। এর মধ্যে আপনি চোর ধরতে বেরোলেন?

- হেহ্‌। ওই যে। আপনি আমার শালা নন, বন্ধুও নন। অথচ আমাদের পরিচয় কদ্দিনের। আমার আশা, আপনি অন্তত হা-হা করে উঠবেন না। সে ভরসাতেই আপনাকে খুঁজে বের করা। কদ্দিন এমন কাউকে পাইনা যে আমার সিচুয়েশনটা পাত্তা না দিয়ে আমার সঙ্গে গল্প করতে পারে। সে'টাই অবশ্য তাঁদের ভালোবাসা। কিন্তু কী জানেন পল্টুবাবু...।

- ভালোবাসা-টালোবাসা তো অনেক হল। এ সময়ে তার চেয়েও বেশি দরকার হল মদনমোহন, শিঙাড়া আর মাছভাজা ভাগ করে নেওয়ার পার্টনার। তাই তো?

- হে হে হে। তবে ইয়ে, অ্যারেস্টটা কিন্তু করতেই হবে। প্রফেশনাল কমিটমেন্ট বলে কথা। তবে অ্যারেস্টের ব্যাপারটা কাল দুপুর নাগাদ সারলেও হবে।

- বেশ। সে হবে'খন। দেখুন, আপনি কিন্তু ভাববেন না যে আমার বিরক্তি কমে গেছে। নেহাত পড়ে পাওয়া পুরীতে একটা এক্সট্রা বেলাকে সম্পূর্ণ উপভোগ করতে চাইছি।

- এই তো বাঘের বাচ্চার মত কথা পল্টুবাবু।

- কাল দুপুরে হাতকড়া পরাবেন। বেশ। ঠিক হ্যায়। মানে বড়জোর ওই আঠেরো ঘণ্টা মত সময় আছে। চালিয়ে খেলতে হবে দেখছি। তা, চট করে আপনার ওই মদনমোহনওলা কে ডাকুন দেখি। তারপর আপনাকে একটা সুঁড়িখানায় নিয়ে যাই।

- মদ খেয়ে আউট হব পল্টুবাবু?

- এ সুঁড়িখানার নাম কাকাতুয়া মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দু'পাত্তর রাবড়ি, নীট। দেখবেন হাইক্লাস ঝিমঝিম কাকে বলে।

রোলের আমি



রোল বিষয়ক শুচিবাই এককালে ছিল৷ এখন আর তেমন নেই৷ বিভিন্ন রকমের রোলের বিভিন্ন ধরণের আবেদন৷ মোটা পরোটায় সঠিক পরিমাণে পেঁয়াজকুচি আর লেবু-লঙ্কা ইঞ্জেক্ট করলেই যেমন ম্যাজিক ঘটে যায়, শসা-সস দেওয়া পাতলা রুটির রোলেরও প্রয়োজন আছে৷ চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় হাঁটতে বেরোলে অনেক গজিয়ে ওঠা রোলের দোকান জুটে যায়; অনেক ক্ষেত্রে সে'সব 'ঠেলা' সামলান এমন মানুষজন যারা রোল ভাজায় তেমন পটু নন। অন্যদিনগুলোয় হয়ত তাদের জীবিকা আলাদা, পুজোর ক'দিন নেহাতই সুযোগ বুঝে ভিড়ের মাঝে চাটু আর স্টোভ নিয়ে বসে পড়েছেন৷ পাড়াগাঁ বা মফস্বলি মেলাতেও তাঁদের দেখা পাওয়াই যায়৷ সেই ব্যাপারটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না; মোটা দাগে কাটা স্যালাড আর সস্তা কুমড়ো সসের আশীর্বাদধন্য সে এগরোলেও ঘ্যাম আছে। সে ঘ্যাম আস্বাদন করতে জানতে হবে৷
পাটনায় দিব্যি ভালো রোল পেয়েছি৷ এমন কি বেগুসরাই কটিহার কিষনগঞ্জের মত বিহারি মফস্বলেও রকমারি স্বাদের রোল পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করেছি। বম্বের ফ্র্যাঙ্কি না কী এক ঝোল দেওয়া রোলকেও ধৈর্য ধরে অ্যাপ্রিসশিয়েট করার চেষ্টা করেছি৷
আবার দিল্লী-নয়ডার বেশ কয়েক জায়গায় ডিম পরোটার ভিতর পাঁচমেশালি স্যালাডভাজা আর রকমারি সস-চাটনি দেওয়া রোলকে "ধুর শালা" বলে দূরে না ঠেলে, হঠাৎ কানে আসা অচেনা সুরের মতই ধৈর্য ধরে সে স্বাদকে মনের মধ্যে জার্মিনেট করতে দিয়েছি৷ আহা, ও'ও তো রোল, ওরও তো একটা মান-ইজ্জত আছে৷
আসলে এই রোল ব্যাপারটার মধ্যে যে অসীম সারল্য, তাকে অস্বীকার করলে চলবে কেন? পরোটার টুকরো ছিঁড়ে, তা'তে একখণ্ড মামলেট আর পেঁয়াজ-লঙ্কা কুচি দিয়ে মুখে চালান করে বুঝেছি যে ও জিনিসের স্বাদ রোলের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। অথচ কী ম্যাজিক দেখুন, পরোটার ওপর ডিম ছড়িয়ে ভাজা, তার মধ্যে পেঁয়াজ-লঙ্কাকুচি;- ইনপুট একই, শুধু পারমুটেশন আলাদা। তা'তেই কেল্লা ফতে। এ' ম্যাজিককে অবহেলা করব, অমন তালেবর যেন কোনওদিনই না হতে পারি৷
খোকাও এগরোলের ব্যাপারে লিবারাল হবে, তেমনটাই আশা৷ সে আশায় ভর দিয়েই আমরা রকমারি এগরোলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ি৷ এ'টা কী, ও'টা কেন; এমন বহুবিধ মামুলি অথচ হাইক্লাস আলোচনা শুরু হয়৷ এরপর হাতে আসে এগরোল৷ এগরোল হাতে এলেই মুখে হাসি আসে; এই ফর্মুলা পালটায় না৷ পাল্টাবে না। আমাদের বিশ্বাস সে'টাই।

অচ্ছা সিলা

বন্ধুরা জানালে "অচ্ছা সিলা দিয়া তুনে মেরে পেয়ার কা" গানটার রিমেক হয়েছে। ভালো কথা। তবে এই ধরণের গানের রিমেক খুব ভালো হলেও এড়িয়ে থাকব, তেমনটাই ইচ্ছে। এই ধরা যাক "মেরা দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়"; ওটার রিমেকও করতেই পারে কেউ। সে'টা দুর্দান্ত হলেও হতে পারে। আমি শুনব না। গুরুদেবের বারণ আছে। "অচ্ছা সিলা"ও খানিকটা সে পর্যায় পড়ে। কাজেই বন্ধুদের পাঠানো গানের ইউটিউব লিঙ্ক ক্লিক করলাম না।
এতক্ষণ পর্যন্ত ঠিকঠাক ছিল। এরপর বন্ধুরা জানালে যে "অচ্ছা সিলা দিয়া তুনে"-তে আইটেম নাচ ঢোকানো হয়েছে। এই ইনফরমেনশনটা পেয়ে কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গেছি। সোনু নিগম কাঁদাচ্ছেন, কৃষ্ণকুমার কেঁদে ভাসাচ্ছেন, স্কুল-প্রেমে লেংচে চলা বুক ফেটে চৌচির হচ্ছে। আমার কাছে এই হচ্ছে গানটার আর্কিটেকচার। এ'বার এই ট্র্যাজিক ত্রিভুজের মাঝে আইটেম ডান্স ঢোকানো চাট্টিখানি কথা নয়।
এ গানের রিমেক শোনার ইচ্ছে নেই, অথচ এই মিস্ট্রিটাও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা যাচ্ছেনা। সাংঘাতিক সমস্যা।

প্রেমে বাজারে



- প্রেমে পড়ে একসঙ্গে বাজার করতে যাওয়াটাকে নর্মালাইজ করা দরকার।
- সে কী মামা৷ প্রেমে পড়ে বাজার করতে বেরোব?
- একদম৷ সকাল সকাল৷ একজনের হাতে আমিষ আইটেম নেওয়ার নাইলনের ব্যাগ, অন্যজনের হাতে সবজির বওয়ার ঢাউস কাপড়ের থলে। হেলেদুলে বাজার করবি, দরদাম করবি, কানকো তুলে মাছ-বিচার করবি। সবই একসঙ্গে। আহা, ভাবতে ভাবতে আমার প্রাণেই গান বাজছে৷ "এ মন আমার হারিয়ে যায় কোনখানে, কেউ জানে না শুধুই আমার মন জানে..আজকে আমার হারিয়ে যাওয়ার দিইইইইইন"।
- কী সাংঘাতিক৷ ও'দিকে ছোটকা বলে প্রেমে পড়ে ময়দানে হাঁটবি, দেলখোশার টেবিলে প্রেমিকার আঙুলের ডগায় লেগে থাকা কাসুন্দির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবি৷ বাবুঘাটের জেটিতে একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে দিয়ে বাদাম খাবি৷ এমন কত কী।
- তোর ছোটকা একটা গাছ-বলদ৷ শোন, ও'সব সাহিত্যের ফর্মুলায় প্রেম ন্যাতপ্যাতে হয়৷ সম্পর্কে স্ট্রেন্থ বিল্ড আপ করতে চাইলে দু'জনে মিলে সকালবেলা বাজার করতে যেতে হবে৷ একসঙ্গে, নিয়মিত৷
- আরে! বাজারের ধ্বস্তাধস্তিতে প্রেম হয় নাকি?
- প্রেম হল রিভার্স স্যুইং চাঁদু৷ বলের একটা দিক এবড়োখেবড়ো না করলেই নয়৷ আর তার জন্য সামান্য ধ্বস্তাধস্তি নেসেসারি৷
- কী'রকম? স্টেপ বাই স্টেপ শুনি।
- প্রথমত। হুশ করে বাজারে ঢুকে গেলেই তো হল না৷ আগে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে, ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে ছক কষতে হবে৷ ফর্দ ঝালিয়ে নিতে হবে৷ লিভ টুগেদার সিচুয়েশন না হলে তো বাজার দু'বাড়িতে যাবে, দু'টো সেপারেট হেঁসেল। সে ক্ষেত্রে আরও এলাবোরেট প্ল্যানিং দরকার। কাজেই চা-বিস্কুট ব্রেনস্টর্মিংটা নেসেসারি।
- তারপর?
- তারপর স্যাট করে আমিষ বাজারে৷ সবার আগে মাছ৷ সে'টা কম্পলিকেটেড প্রসেস। খুবই পার্সোনাল একটা ব্যাপার; লাইক রিলিজিয়ন। আর প্রেমিক প্রেমিকা যদি মাছ কেনার প্রসেস রিকনসাইল করে নিতে পারে, তবে জানবি যদিদং হৃদয়ং ফিদয়ং চুকেবুকেই গেছে। ওই মাছ কেনাকাটার প্রসেসে মিলমিশ হয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে আলটিমেট হোলি ওয়েডলক। তার ওপরে আর কিছু নেই। মাছের পর মাংসের দোকানটা পেশেন্সের খেলা। ভালো মাংসের দোকানে ভিড় থাকবেই৷ কিন্তু সেই ভিড় তো প্রেমের ঠেলায় নলবনের লাভার্স স্যাংচুয়ারি বলে মনে হবে। জানবি, মাটন কেনার ব্যাপারে ওই ধৈর্যটাই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরী এলিমেন্ট।
- ব্যাপারটা মন্দ নয় দেখছি।
- তুই আমার একমাত্র ভাগ্নে৷ তোকে মন্দ সাজেশন দিয়ে দিদিকে বিট্রে করতে যাব কেন? ছেলেবেলায় দিদি ঠাকুমার বয়াম থেকে আচার চুরি করে রোজ দুপুরে আমায় খাইয়েছে। সে ঋণ এ বান্দা কোনওদিনও ভুলবে না৷
- তা মাংস কেনার পর?
- তারপর প্রেমিক-প্রেমিকা যাবে সবুজের সন্ধানে। সবজি কিনবি। ময়দানের ঘাস-গাছপালার চেয়ে সেই সবুজ এক্সপোজার অনেক বেশি হাইকোয়ালিটির৷ তার সঙ্গে জুড়ে যাবে সবজি-দাদাদিদিদের সঙ্গে মাইডিয়ার লেনদেন। ভুলে যাসনা, ভালোবাসাটা একটা সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট৷ সোসাইটি বাদ দিলেই প্রেম রিডিউস হয়ে যাবে ইন্টুপিন্টুতে। আর সে'টা মোটেও ডেজায়রেবল নয়।
- তাও ঠিক। নাহ্, বাজারে সঙ্গে প্রেমের একটা ভালোই যোগাযোগ আছে দেখছি।
- আলবার আছে। তাও তো এখনও ফাইনাল গদগদ লেভেলটা বলিইনি।
- আরও আছে?
- ও মা! আসল জিনিসটাই তো বাকি!
- সে'টা কী?
- বাজার ফেরতা মিষ্টির দোকানে কচুরি পিটস্টপ! কাঠের টেবিলে আলো করা এক স্টিলের প্লেটে ফুলকো কচুরি, একবাটি ডাল, আর শালপাতার বাটিতে চমচম। ও'দিকে মচমচে চেয়ার আলো করে গা ঘেঁষে বসা কপোত-কপোতী৷ তাদের পায়ের কাছে রাখা প্রেমের বাজার-ফসল। মুখে হাসি, প্রাণে 'এই পথ যদি না শেষ হয়'।
- তোফা! তোফা মামা! তোফা! এমন রোম্যান্টিক মেজাজ নিয়েও যে তুমি কী'ভাবে আজীবন ব্যাচেলর রয়ে গেলে।
- ট্যালেন্টের অভাব ছিল না বটে। তবে বেশির ভাগ ট্যালেন্টেড বাঙালির ক্ষেত্রেই যে'টা হয় আর কী। আলিস্যি। পিওর আলিস্যি৷ আলিস্যিতেই আটকে গেলাম৷ যাকগে। তুই তো অলস নোস। সে জন্যই মুনমুনের মত অমন ব্রিলিয়ান্ট মেয়ে তোকে পাত্তা দিচ্ছে।
- আহ মামা। যত্তসব।
- আরে শোন না৷ মামার কাছে লজ্জা করে লাভ নেই৷ শোন, এই আমি বলছি৷ মুনমুনকে ফোন কর, এখুনি কর। আর চট করে দেখা করতে বেরো। ক্যুইক৷ আর ইয়ে, বেরোনোর আগে রান্নাঘর থেকে বাজারের থলেগুলো নিয়ে বেরোস। প্রেমটাকে মজবুত করতে হবে তো!
- তোমার পেটে পেটে এই ছিল মামা?
- প্লীজ ভাগনে৷ হপ্তাখানেক হল আলস্য আর শীতের চোটে বাজার যাওয়া হচ্ছে না৷ এখন তুই আর তোর প্রেমই ভরসা। প্লীজ, যা একটু প্রেম করে আয়। নইলে আমার মত ব্যাচেলর হয়েই দিন কাটবে, এই বলে রাখলাম কিন্তু!

আসছে শতাব্দীতে



"আসছে শতাব্দীতে"। সন্ধ্যার কণ্ঠ আর সুমনের কথা, সুর; এ'রা নেহাতই সহশিল্পীর দলে। মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে একজন অগোছালো কিশোর। যার কণ্ঠে সুর নেই, কবিতায় দখল নেই; কিন্তু গানের প্রতি ভালোবাসা আছে৷
সে কিশোর শ্রোতা, অথচ সমস্ত লাইমলাইট তারই ওপরে৷ কারণ সেই একমাত্র শ্রোতা, মায়েস্ট্রো সেই। সুমন আর সন্ধ্যায় ভর দিয়ে একশো বছর তফাতে থাকা একজন কেউ সেই ভ্যাবলাটে কিশোরের কাছে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। না না, গানের কথাটুকু ক্যামোফ্লাজ, সেই অন্য-সময় থেকে পাঠানো মেসেজ কোড করে রাখা আছে সুরে৷ সন্ধ্যা-সুমন আপ্রাণ চেষ্টা করছেন সে সুর সেই কিশোরের মনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, পারলে রক্তে চালান করে দিতে।
কিশোরের ছটফট বেড়ে চলে৷
মনের ভিতর সে কী বিশ্রী অথচ ভালোলাগা আনচান৷
এ সুর এত চেনা কেন?
এত ভালোবাসা কেন এই গানে?
কে ডাকছে?
সে ডাক এত মায়ার কেন?
আহ, সে যে কী অপার্থিব স্নেহ। কী টান।
***
- বুঝুলে ভাই আওদব্দভ্বহ৷ আশা একটা আছে৷
- আশা আছে বলছ আবাভ্ব ?
- আছে।
- গোটা ভ্যাকিওসমসে কেউ যদি পারে তুমিই পারবে৷ কিন্তু উপায়টা কি? কত হাজার বছর ধরে চেষ্টা করেও তো আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি৷ আজ হঠাৎ কী ফন্দি আঁটলে?
- গ্রহটা তো আর পাশের পাড়াতেই নেই৷ ঢের দূরে৷ তাছাড়া তাদের রকমসকমও আমাদের ধারার নয়৷ কাজেই সময় লাগাটা স্বাভাবিক৷ তবে এদ্দিনে সত্যিই একটা সলিউশন পেয়েছে আওদব্দভ্বহ।
- ইয়াইয়াজ ওয়েভের মাধ্যমে কিছু?
- খানিকট তাই। তবে সে গ্রহের বাসিন্দারা ইয়াইয়াজ সোজাসুজি আঁচ করতে পারবে না। অন্যপথে তাদের কাছে পৌঁছতে হবে৷
- তবে? কোন পথে?
- তাদের ররকমসকম আমাদের চেয়ে একদমই আলাদা৷ যোগাযোগের প্রসেসটা তাই এত খটমটে। তবে একটা মোক্ষম মিল পাওয়া গেছে।
- কী মিল?
- ও'খানেও সুরের ব্যবহার চলে।
- বটে? ওরা সুরের ব্যবহার যানে?
- জানে। তবে আমাদের মত সুর দিয়ে যন্ত্রপাতি চালাতে পারেনা তার৷ সুর ব্যাপারটা তাদের কাছে শৌখিন ব্যাপার৷ এ'বার আমাদের পাঠানো ওয়েভ তাদের কোনও একটা সুরে মিশিয়ে দিতে পারলেই কেল্লাফতে।
- বলো কী আবাভ্ব! সে'টা সম্ভব?
- নয়ত আর বলছি কেন? অলরেডি একটা ট্রায়াল ওয়েভ ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু সমস্যা একটাই৷ হিসেব কষে দেখলাম, আমার পাঠানো ওয়েভ সে গ্রহের হিসেবে একশো বছর পর তাদের কোনও সুরে গিয়ে মিশবে।
- সে'টা আমাদের হিসেবে কতক্ষণ?
- আমাদের গ্রহের একবেলা৷ বড়জোর৷
- তবে আর কী৷ খিচুড়ি ডিমভাজা চাপিয়ে দিয়ে অপেক্ষা শুরু করি। দেখা যাক তোমার ওয়েভ তাদের সুরের আড়াল পেরিয়ে সে গ্রহের কাউকে ঘায়েল করতে পারে কিনা৷ কিছু ইন্টারগ্যালাক্টিক প্রতিবেশী না পেলে আর সত্যিই চলছে না।