Tuesday, July 17, 2018

ছ'য়ে ছাতু

- বিট্টা! অ্যাই বিট্টা!
- আমায় ডাকছ বাবা?
- ন্যাকাউদ্দিন বুরবক্! এ বাড়িতে ক'টা বিট্টা আছে?
- হয়েছেটা কী?
- তোর লজ্জা করে না জিজ্ঞেস করতে? ব্যাটা রাস্কেল।
- পার্ট ওয়ানে কম নম্বর? সে'টা হঠাৎ মনে পড়ল? তবে মাসখানেক আগে বেরোনো রেজাল্ট নিয়ে এখন আবার...।
- শাট আপ। দ্য গ্রেট হারু ডাকাতের রক্ত রয়েছে আমার  মধ্যে, আমি কি মার্কশিটকে ডরাই?
- বাজারে করে না হয় বাইশ টাকা সরিয়েছি, তার জন্য এই রাতদুপুরে এত তোলপাড়?
- চোপ ব্যাটাচ্ছেলে। বাসমতির কাঁকর তুই। এগরোলের কুমড়ো সস। তোকে দেখলেই গা রিরি করছে। ইশ, তোকে বেদম জুতোলে যদি শান্তি পাই।
- আরে! তোমার ব্যাঙ্কের কাজ আজ করিনি, একটা ভালো বই পড়ছিলাম। কাল করে দেব। এত ঝ্যামেলার কী আছে।
- টাকা রাবড়ি, রাবড়ি টাকা। ব্যাঙ্কফ্যাঙ্ক নিয়ে আমি ভাবিনা। তবে তোর মত এমন হাড়বজ্জাত আমি আগে দেখিনি।
- আরে আমি করেছিটা কী?
- কী করেছিস? এরপরেও জিজ্ঞেস করতে সাহস পাচ্ছিস? কী করেছিস?
- মাইরি, কিছুতেই ধরতে পারছি না।
- তা কী করে ধরতে পারবে; গবেটেন্দ্র গাম্বাট বাহাদুর। আমার কপালেই জুটেছে এমন আপদ।
- বলবে কী হয়েছে?
- আজকের দিনটার কথা খেয়াল আছে?
- আজ? সোমবার!
- তারিখটা কত? সে'টা খেয়াল আছে?
- ষোলোই। জুলাই। তা'তে কী?
- তা'তে কী? মুখ ভেঙে দেব ইডিয়ট।
- ষোলোই...ষোলোই...ওহ হো! আজ তো..আজ তো তোমাদের বিবাহবার্ষিকী! বলা হয়নি তোমায়; কঙ্গ্র‍্যাচুলেশনস পিতা!
- তোর শুভেচ্ছাকে দলা পাকিয়ে থুতু মাখিয়ে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেল।
- আরে...হয়েছেটা কী?
- কুলাঙ্গার!  হয়েছেটা কী? লজ্জা করে না? তোর উচিৎ ছিল না আমায় সময় থাকতে রিমাইন্ড করা?
- আমার উচিৎ ছিল?
- হ্যাঁ হ্যাঁ তোর! বাপের পয়সায় মিতার সঙ্গে বসে মিত্র কেবিনের কবিরাজি সাঁটাতে পারো, আর এটুকু মনে করাতে পারো না?
- মিতা নয়, স্মিতা। আর বিবাহবার্ষিকীর কথা তোমার বুঝি এই মনে পড়ল?
- জাস্ট! সকাল থেকে তোর মায়ের মেজাজটা গোলমেলে ছিল, ঠিক গ্রিপ করতে পারিনি..এই জাস্ট কিছুক্ষণ আগে...।
- কিছুক্ষণ আগে?
- কার্পেট বম্বিং।
- অতএব?
- ড্রয়িং রুমে শুতে যাচ্ছি। ডিনারে ছাতুর সরবত।
- এহহে। তবে মিতা মাকে উইশ করেছে। সকালেই। রিলেশনশিপ বিল্ডিং।
- মিতা? স্মিতা নয়?
- এহহে, মানে ইয়ে...স্লিপ অফ টাং। স্মিতা।
- আমার না হয় ছাতু জুটেছে, তোর কপালে বোধ হয় ফলিডল নাচছে রে।

Saturday, July 14, 2018

থেরাপি



টেবিলের ওপর দুদ্দাড় করে একের পর এক ফাইল এসে পড়ছে; আর অলোক দত্ত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছেন; ফাইলের ঢিপি তরতর করে বড় হচ্ছে। বড়বাবুর পাঠানো ফাইল; প্রত্যেকটার ওপর হলুদ স্লিপ সাঁটা; ড্যাবা ড্যাবা করে লেখা “আর্জেন্ট, প্রসেস্‌ বাই টুডে”। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরবেন ভেবেছিলেন; সেই মত দু’দিন আগে বড়বাবুকে বলেও রেখেছিলেন, বৌ গড়িয়াহাটে আসবে; জরুরী কেনাকাটি।  কিন্তু টেবিলের বোঝা দেখে বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল দত্তবাবুর। ফাইলের ওপরে লেখা ‘আর্জেন্ট’ শব্দটা বারবার বুকে গোঁত্তা খাচ্ছিল, ও’দিকে এই মাত্র বৌয়ের এসএমএস এলো; “চারটের মধ্যে বেরিও, আমায় যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা না করতে হয়”। বুকে মৃদু প্যালপিটেশন টের পাচ্ছিলেন দত্তবাবু। গত মাসে গড়িয়াহাটে যাওয়ার প্ল্যান তিন তিনবার ভেস্তেছে। নার্ভাসনেসটা কাটানোর জন্য পাড়ার হরি-চপওয়ালার টইটুম্বুর কড়াইটার কথা ভাবতে শুরু করলেন তিনি। মেঘলা বিকেল, তেলে টইটুম্বুর কড়াই; টগবগিয়ে রিদ্‌ম তৈরি হচ্ছে। সে মনমোহিনী কড়াইয়ে পাশাপাশি ভাসছে বেগুনি আর আলুর চপ; মন-কেমনের সুবাসে বাতাস ভারি হয়ে রয়েছে। স্যান্ডো গেঞ্জি আর নীল লুঙ্গি পরে নির্ভীক রাজপুতের মত বসে হরি সমাদ্দার, চোখ কড়াইয়ে, কিশোরকুমারের গানের কলি হরদম তার ঠোঁটের ডগায় তিরতির করে নাচে। ঝাঁঝরিতে চপ তোলার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অলোক দত্ত টের পেলেন যে বুকের প্যালপিটেশনটা কমে এসেছে। এই থেরাপিটা বড্ড কাজে দেয়।

নাহ্‌, ফাইলের চাপে নুয়ে পড়লে চলবে না। বড়সাহেবের রুমে একবার একটু মিছরি ভেজানো গলায় রিকুয়েস্ট করতেই হবে। লাঞ্চের পর দস্তুর অ্যান্ড কোম্পানির রিকনসিলিয়েশন ফাইলটা নিয়ে দত্তবাবু সোজা ঢুকলেন বড়সাহেবের চেম্বারে।

- কী ব্যাপার দত্তবাবু?
- ইয়ে স্যার, এই দস্তুরের ফাইলটা রেডি।
- রেডি?
- রেডি।
- আমি তো চারটে ফাইল পাঠিয়েছিলাম আপনাকে। বাকিগুলোর কী হল?
- ইয়ে, আরও একটা অলমোস্ট তৈরি বুঝলেন। আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই...।
- আর বাকি দু’টো?
- আজ্ঞে?
- বাকি ফাইল দু’টো?
- স্যার, আসলে একটা রিকুয়েস্ট নিয়ে এসেছিলাম...।
- রিকুয়েস্ট?
- আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত স্যার, একটা জরুরী কাজ ছিল...।
- আই সী। আই সী। তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত, তাই না? শুধু সে’টুকু কেন। আর কী কী করলে ভালো হত, সে’গুলোও বলে দিন। অফিস দেরী করে আসতে পারলে ভালো হত। লাঞ্চে আধ ঘণ্টার বদলে দেড় ঘণ্টা খেজুরে আড্ডায় নষ্ট করতে পারলে ভালো হত...।
- আজ্ঞে আসলে...।
- গোটা দিন মোবাইলে ক্রিকেট কমেন্ট্রি চেক করে মাস গেলে মোটা মাইনে পেলে ভালো হত। বসের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে অফিসটাকে কফিহাউস বানানো গেলে ভালো হত। আর কী কী করলে ভালো হত দত্তবাবু?

এই। এই শুরু হল বড়সাহেবের দাঁত খিঁচুনি, মানসম্মানের বিরিয়ানিতে কারিপাতা-এলাচ না ঢালা পর্যন্ত তার স্বস্তি হয় না। মাথা নিচু করে অলোক দত্ত শুনে যাচ্ছিলেন, আর বড়সাহেব টেবিল চাপড়ে চোপা করে যাচ্ছিলেন। দত্তবাবু সাধারণত সবার আগে অফিসে ঢোকেন, সাধারণত সবার শেষে অফিস থেকে বেরোন; তবু। শুনে যেতে হচ্ছিল, বড়বাবু বলে কথা। বাল্মীকির সাজেশন উড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু বসের খিস্তি হজম না করলেই গোলমাল। ক্রমশ কান গরম হচ্ছিল, বুকের ঢিপঢিপ বাড়তে শুরু করেছিল, মাথার পিছন দিকে টিপটিপ। ঠিক্ তক্ষুনি অলোকবাবু নিজের মনটাকে থেরাপির দিকে ঠেলে দিলেন; চোখের সামনে ভেসে উঠলো স্টিলের থালায় বাটি বসানো ভাত; দুধের-সর চাল। ভাতের ঢিপি থেকে ধোঁয়া উঠছে, দৃষ্টি আদরে ঝাপসা হয়ে আসছে। থালার পাশে ছোট বাটিতে ইলিশ মাছের কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা দেওয়া ঝোল, সঙ্গে দু’টুকরো বেগুন। রগরগে নয়, কেতদুরুস্ত নয়; অথচ মায়াবী, ভালোবাসার। ডান হাতের মধ্যমা আর তর্জনী দিয়ে ভাতের ঢিপির মাথায় ছোট্ট ডিপ্রেশন তৈরি করে ইলিশের বাটি উপুড় করা। অতটুকু ভাবতেই কান গরমটা কেমন কমে এলো, বুকের ঢিপঢিপ আর মাথার টিপটপ – দুটোই গন্‌। বড়সাহেবের কপালে চিন্তার ভাজগুলো নজরে পড়ল; আহা, ওঁরও তো ওপরওয়ালা আছে; ওঁর মাথায় তো আরও বেশি চাপ। বড়সাহেবের গিন্নীর কোনও একটা কঠিন অসুখ হয়েছে; তার জন্য বিস্তর দৌড়ঝাঁপ খরচাপাতি দুশ্চিন্তা লেগেই আছে। এর ওপর অফিসের হাজার রকমের টার্গেট। আহ্‌, না হয় লোকটা দু’একটা বাড়াবাড়ি রকমের কড়া কথা শুনিয়েছে; তাই বলে কি আর অভিমান করে বসে থাকলে চলে? বেশ একটা হাসি মুখে ‘সরি’ বলে বড়সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত। বেরোবার সময় বড়সাহেব একবার বাঁকা সুরে “যত্তসব” বলেছিলেন; তা সে’টা গায়ে মাখেননি দত্তবাবু।

নিজের টেবিলে ফিরে এসে নতুন উদ্যমে শুরু করলেন ফাইল দেখার কাজ, এ’গুলো আজকেই শেষ করে বেরোতে হবে। রাত একটু হবে বটে, তা হোক গে। তরতর করে কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল। কাজের ফ্লোতে একটু রামপ্রসাদীর সুরও লেগে গেছিল; ছন্দপতন ঘটল সাড়ে তিনটে নাগাদ! বৌকে জানানো হয়নি যে, গড়িয়াহাট প্ল্যান আজ ক্যান্সেল। চটপট ফোন করলেন। বেশ মোলায়েম গলায় একটা “অ্যাই শুনছো” ভাসিয়ে দিলেন। অবশ্য এই এক্সট্রা-মখমলে “অ্যাই শুনছো” অবশ্য বৌ বেশ চেনে;
- কী ব্যাপার? ফোন করেছ কেন? কোনও ধান্দাবাজি নয়। চারটে বাজলেই অফিস থেকে বেরোবে।
- অ্যাই সুমি, ধান্দাবাজি আবার কী ধরণের ভাষা।
- আমায় আজ যদি ফের অপেক্ষা করিয়েছে, তখন দেখবে ভাষার টেম্পারেচার কী খতরনাক হতে পারে। 
- আজ ওয়েট করাব না।
- গুড।
- না গুড না।
- মানে?
- মানে,সমস্ত ব্যবস্থা করা ছিল জানো, বিশ্বাস করো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এতগুলো জরুরী ফাইল চলে এলো যে...।
- তুমি আসছ না?
- আজ নয়, তবে আগামীকাল বেরবোই! শিওর শট। দরকার হয় আমি আজই আগামীকালের হাফ ডে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বেরব।
- তুমি থামো। পাড়ার লোকজনের দরকারে হুট করে ঠিক অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তে পারো। অফিস কল্যিগদের সঙ্গে দীঘায় গিয়ে ফুর্তি করার সময়টুকু ঠিক পেয়ে যাও। শুধু আমার দরকারের ব্যাপারেই যত শয়তানি, তাই না?

ব্যস। অমনি শুরু হল ফর্দ ফায়ার করা। কবে মুকুটমণিপুর ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছে, কবে শাশুড়িকে আনতে হাওড়া স্টেশন যেতে পারেননি, কবে ন নিজের বোকামির জন্য বৌকে তার বান্ধবীদের সামনে অপদস্থ করেছেন; সমস্ত। তাল তাল ইউরেনিয়াম যেন কেউ ড্যালা পাকিয়ে তার মুখে থেবড়ে চলেছে। সুমির ফায়ারিংয়ে কমা, ফুলস্টপ নেই; কাজেই দত্তবাবু কিছু বলতেও পারছেন না। দুম করে ফোন রেখে দিলে থানাপুলিশ হয়ে যেতে পারে। আর তখনই শুরু হল, বুকের ভিতর আনচান, পেটের ভিতর গুড়গুড়। ব্যাপারটা মাথা ঝিমঝিম পর্যন্ত গড়াতেই অলোক দত্ত সোজা গিয়ে ঢুকলেন থেরাপির মধ্যে। ভদ্রলোকের মনের মধ্যে নিমেষে তৈরি হল লোহার চাটু, তার ওপর খুন্তির খনখন। তেলের চড়চড়ে একটা পরোটা মজবুত হয়ে উঠছিল; আর তারপর জোড়া ডিম ফাটিয়ে দু’টো কুসুম ভাসিয়ে দেওয়া হল পরোটার বুকে। এরপর সেই কুসুম-জোড়া খুন্তির সূক্ষ্ম চাপে ঘেঁটে গিয়ে মিশে গেলে পরোটায়। এক মিনিটের মাথায় সেই মাপা হিসেব আর চাপা কবিতা বোঝাই পরোটা নেমে এলো চাটু থেকে। তারপর সৃষ্টি হল পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা লেবু আর বিটনুনের পুর পাকানো রোল।
স্মিত হাসলেন অলোক দত্ত। তাঁদের যখন বিয়ে হয় তখন সুমির বয়স কত অল্প। পড়াশোনায় অলোকবাবুর চেয়ে হাজার-গুণে ভালো; কিন্তু আর পাঁচটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয়। সুমির কোনোদিনও একটা কেরিয়ার হল না, হওয়া উচিৎ ছিল। অবশ্য এ নিয়ে সুমি কোনোদিন অভিযোগ জানায়নি, কিন্তু একটা চিনচিনে অপরাধ-বোধ মাঝেমধ্যেই অলোকবাবুর মাথায় ঘুরপাক খায়। মেয়েটা বড় অল্পে খুশি, গোটাদিন খেটে চলে; চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বটে; তবে মনটা বড় ভালো। কখনো কারুর অমঙ্গল কামনা করে না, লোভ নেই। সুমির তেমন বড় কোন শখ আহ্লাদও নেই; শুধু এই মাঝেমধ্যে বাজারঘাটে যেতে চায়; সে’টুকুও আসলে অলোকবাবুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জন্যেই। বেশ বুঝতে পারেন অলোকবাবু। অথচ বার চারেক প্ল্যান করেও সামান্য গড়িয়াহাট যাওয়া হয়ে উঠছে না। সুমির না রাগাটাই আশ্চর্যের। অলোকবাবু ঠিক করলেন আজ বরং বাড়ি ফেরার সময় সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল কিনে ফিরবেন, হালকা দেখে। একটা বেশ জব্বর সারপ্রাইজ হবে।

মিনিট  দশেক পর সুমি নিজেই ফোন কেটে দিল। বড্ড রেগে গেছে। সে’টা অবশ্য অলোকবাবু সামাল দিতে পারবেন। ফোন রেখেই ভদ্রলোক ফাইলে ডাইভ দিলেন। যখন ঘোর কাটল তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। সমস্ত কমপ্লিট। বড়সাহেব অবশ্য বেরিয়ে গেছিলেন, সেক্রেটারি বললেন কোনও একটা পার্টি অ্যাটেন্ড করার জন্য অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছেন তিনি। অগত্যা ফাইলগুলো বড়সাহেবের টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত।

গৌরহরি জুয়েলার্স থেকে সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল আর মাইতি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে ছ’টা ক্ষীরকদম কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে পৌনে দশটা হয়ে গেল। দরজায় তালা, দরজার সামনের পাপোশের নীচে সুমির চিরকুট।
“মেজদির বাড়ি যাচ্ছি, রাতে ফিরব না। ফোন করতে যেও না, ফোন স্যুইচ অফ রাখব। তোমার সঙ্গে আজ আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। খাবার চাপা দেওয়া আছে; গিলে উদ্ধার কোরো”।   

হাত পা ধুয়ে, জামা কাপড় বদলে ডাইনিং টেবিলে বসলেন অলোকবাবু। বড্ড ক্লান্ত লাগছিল তাঁর, জিভে অরুচি। মাথা ব্যথা। গায়ে সামান্য জ্বর আছে বোধ হয়। কোনোক্রমে খাওয়াদাওয়া সেরে শোওয়ার ঘরে এসে বাতি নিভিয়ে লম্বা হলেন বিছানায়। উত্তরের জানালাটা খোলা, স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো এসে পড়ছে ঘরে। সেই আলোয় দেওয়ালে টাঙানো ছবিতে মায়ের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মা। কী অদ্ভুত, চোখ বুঝতে যেন মায়ের মুখটা আরও স্পষ্ট হল। মা, মাগো। ছোটবেলার গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। শনিবার রাত্রে মা সামান্য বেশি ভাত নিতেন, সেই বাসি ভাত একটা থালায় নিয়ে মা ব্যাটা পরের দিন সকালে একসঙ্গে জলখাবারে বসত। বাসি ভাতের পাশে কুমড়ো ফুলের বড়া আর মৌড়লা বা চুনো মাছ ভাজা। নুন, লেবু, লঙ্কা দিয়ে মা ভাত মাখতেন জম্পেশ করে। তারপর একদলা ছেলের মুখে, আর এক দলা মায়ের। মা অবশ্য মাছভাজা আর কুমড়োফুলের বড়াটুকু বেশির ভাগটাই খোকাকে খাইয়ে দিতেন। হাপুসেহুপুসে অল্প সময়ের মধ্যেই থালা সাফ হয়ে যেত।

স্পষ্ট দেখতে পারছিলেন অলোকবাবু; মায়ের হাসি মুখ, নীল ছাপার শাড়িতে হলুদ ফুল, সরু সরু আঙুল দিয়ে মাখা ভাত, ছোট্ট বাটিতে মাছ ভাজা আর একটা ছোট স্টিলের থালায় কুমড়ো ফুলের বড়া। বেঢপ পুরনো সেগুন কাঠের টেবিল। পাশের ঘরে পুরনো টেপরেকর্ডারে বাবা মান্নাবাবুর গান শুনছেন; “কবে আর আসবে সময়, বাসবে ভালো, ভাসবে ময়ূরপঙ্খী ভেলা”।

মাথা ব্যথা কমে যাওয়ায় অলোকবাবুর ঘুমিয়ে পড়তে বিশেষ অসুবিধে হল না। অবিশ্যি বালিশের কতটা তাঁর চোখের জলে ভিজেছে আর কতটা জিভের জলে; তার সদুত্তর তিনি নিজেও দিতে পারবেন না।

Tuesday, July 10, 2018

কলকাতা ইন্টেলেক্ট বনাম মুম্বই স্পিরিট

ওই। ওই যে। মুম্বই স্পিরিট আর কলকাতা ইন্টেলেক্ট হাতাহাতি শুরু করল বলে। এক্কেবারে রক্তারক্তি কিছু ঘটবেই এ'বার।

মুম্বই জামার হাতা গুটোয় তো কলকাতা পাঞ্জাবির পকেটে ডটপেন গুঁজে হুঙ্কার ঝাড়ে 'আয়ে তোকে মেরে তক্তা করি'।

মুম্বই বলে  'অ্যাইসা প্যাদানি দেব যে চার্নক আর চার্বাক গুলিয়ে যাবে', ও'দিকে কলকাতা টি-শার্ট-চে'র খুনে দৃষ্টিতে দুনিয়া জ্বালিয়ে দেওয়ার উপক্রম করে।

মুম্বই বাইসেপ ট্রাইসেপ বাগিয়ে, বড়াপাও চেবাতে চেবাতে হুড়মুড় করে তেড়ে আসে। আর কলকাতা চটপট চা-বিস্কুট শেষ করে, একটা মামলেটের অর্ডার দিয়ে দৌড়ে এসে চেল্লায় 'ডাকব পার্টির ছেলে? ডাকব'?

অমনি দুম করে নামে বৃষ্টি, ঝমঝমিয়ে।

আর তখন মুম্বইয়ের গলার তেজ মিহি হয়ে আসে "ভায়া, এ'বার ট্রেন ধরতে হবে যে। তবে কাল তোমার ছাড় নেই, এক্কেবারে ইস্তিরি করে ছাড়ব, কেমন"?

কলকাতা মাথা নেড়ে বলে "সেই ভালো। কালকেই বরং তোমার লাশ ফ্লাশ করে দেব'খন। আজ ভাবছি একটা সাতশো আটশো গ্রামের ইলিশ নিয়ে ফিরব। নয়ত এই ডাউনপোরকে জাস্টিফাই করা যাবে না। চলি, অ্যাঁ"?

Sunday, July 8, 2018

হুজুগিস্টস

- কী খবর রে ?
- আর বলিস না ভাই, ব্রাজিল সেমিফাইনালের আগেই হেরে গেল, বিশ্বকাপটাই কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল।
- তুই ফুটবল নিয়ে বড় বড় কথা বলছিস? তুই?
- না না, এ কী। বড় বড় কথা কই, খারাপ লেগেছে তাই বলছিলাম...। আড়াইশো টাকার চকোলেট বোম কিনেছিলাম ভাই..। পরশু মেজদা ফলস দাঁতটা লেগে যাবে, সে'দিনই সেগুলো ফাটাবো না হয়।
- তোদের কথাবার্তা শুনলে গা জ্বলে যায় মাইরি।
- ও মা! কেন? তুই বুঝি বেলজিয়ামের ভক্ত?
- শোন শোন, আমি ফুটবলের ভক্ত। তোদের মত চার বছরে একবার হুজুগ বেচে খাওয়া পাবলিক নই।
- তা বটে, ওয়ার্ল্ড কাপ ছাড়া ফুটবল আর তেমন দেখি কই...তবে...।
- যত দ্যাখনাই ফুটবল কেত। ক'টা প্লেয়ারের নাম জানতিস রে বিশ্বকাপ শুরুর আগে? মেসি মেসি করে দেখলাম সে'দিন ফেসবুকে হাউহাউ করে কাঁদলি। লজ্জা করল না রে? বার্সার ক'টা ম্যাচ দেখেছিস গত বছর?
- আসলে ওয়ার্ল্ডকাপের ম্যাচগুলো খুব মনে দিয়ে দেখি কিন্তু...।
- থাম থাম। প্রেমিয়ার লিগের খবর রাখিস? জাপানিদের ফুটবল সেট-আপ কতটা কম্পিটিটিভ, সে'টা জানিস? খালি আজেবাজে বাতেলা।
- তা বটে রে। তবে বড় ভালো লাগছে খেলাগুলো..।
- তা স্রেফ তুই হাড়হাভাতে বলে..। যত্তসব উজবুকদের হুজুগ।
- যাকগে, গতকাল দেখলি? টিট্যুয়েন্টি সিরিজে ইংল্যান্ড কেমন কামব্যাক করলে?
- এই শুরু হল...।
- কেন? ক্রিকেটে কী দোষ?
- রঞ্জি আর কাউন্টি কতটা ট্র‍্যাক করিস যে তোর থেকে টিট্যুয়েন্টি জ্ঞান শুনতে হবে?
- যাহ শালা, জ্ঞান কোথায় দিলাম?
- ওই হল, সবেতেই বেশি এন্থু। তোদের মত লোককে বিষেন সিং বেদী কী বলে জানিস?
- আহ, থাক। জেনে কাজ নেই। তার চেয়ে বরং চ', ভালো দেখে একটা সিনেমা দেখে আসি। ঘরে বসে গা'টা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে?
- ভালো দেখে একটা সিনেমা? রিয়েলি?
- এ'বার কী হল?
- কী বুঝিস তুই ভালো সিনেমার? একট সিনেমার ভালো খারাপ তুই কী বুঝিস বল দেখি? ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল নিয়ে সামান্য পড়াশোনা করেছিস? ত্রুফোর দোষত্রুটি নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামিয়েছিস? সত্যজিতের পাতি টেম্পলেটে ফেলা চারটে সিনেমা দেখে নিজেকে আঁতেল ভাবিস, তুই চিনবি ভালো সিনেমা?
- চিনব না?
- অবভিয়াসলি না।
- মানে, যদি ভালো লাগে...।
- ভুল ভালো লাগে। তোরা চিরকাল পাতি আর ইরিটেটিংই থেকে যাবি। ডিসগাস্টিং হুজুগেস।
- ইয়ে সিনেমাটা বরং বাদ থাক। মা জব্বর আলুর দম করেছে, এক বাটি নিয়ে আসি, টেস্ট কর।
- কাকীমার রান্না করা? আলুরদম? মেগা-ডেলিশাস তো। ক্যুইক, ট্যু বাটিস প্লীজ।
- অবশ্য, ইয়ে; নাহ্, আলুরদমটা বাদ থাক রে।
- সে কী! হোয়াই?
- আলুরদমের জেনেসিস বা আলুর চাষের টেকনিক, এ'সব কিছুই আমার মা ঠিক জানে না রে। কাজেই, মায়ের রান্না আলুরদম খাওয়াটা ঠিক হবে ভাই?

Thursday, July 5, 2018

অলোকবাবুর ব্যবসা

- আরে, অলোকবাবু! এনেছেন কিছু?
- নয়ত এই ভরদুপুরে দেড় ঘণ্টা মিনিবাস ঠেঙিয়ে আসি? বাপরেবাপ। আজ বোধ হয় আটত্রিশ ডিগ্রি চলছে।
- দামী জিনিস পকেটে নিয়ে মিনিবাসে এলেন?
- দেখুন মিস্টার মিত্র। ট্যাক্সি এক অতি লাটসাহেবি ব্যাপার। আমার গুরুদেব মাঝেমধ্যেই বলেন, ট্যাক্সি ধরার অভ্যাস মানুষকে বখিয়ে দেয়।
- সেই তারাপীঠের ভদ্রলোক?
- সিদ্ধপুরুষ মশাই।
- কই?
- কী কই?
- বের করুন! মালটা।
- ওহ্। এক মিনিট। এই যে।
- এ'টা?
- আজ্ঞে।
- এই নস্যির ডিবেটা?
- এ'টাই।
- এ'তো রূপোর মাল। সস্তা।
- হ্যাঁ, কোনো গবেটের কাছে এর দাম হাজার খানেকের বেশি না। কিন্তু সমঝদারের কাছে, এ জিনিস অমূল্য।
- এই, আপনি ইয়ার্কি করছেন?
- বাইশ বছর এই লাইনে আছি। মিরজাফরের লুঙ্গি টু নেতাজীর চশমার খাপ; কী না যোগাড় করে দিয়েছি। বার্ডোয়ান রোডের সেই শেঠ আমার কাছে চেয়েছিলেন গান্ধীর এক্সকুইসিট কিছু। গান্ধীর তিনবার দাড়ি কামানো ব্লেড আমি তাকে জোগাড় করে দিইনি? আমি ইয়ার্কি-ঠাট্টার লোক হলে এ'সব হত?
- কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নস্যি নিতেন? ধুস, কোথাও পড়িনি..।
- গোপন নেশা। বোলপুরের বেস্ট কেপ্ট সিক্রেট।
- না অলোকবাবু, মন সরছে না। আমার সেক্রেটারি দেবুকে একটু রিসার্চ করতে বলি।

***

মন খারাপ করে মিলেনিয়াম পার্কের বেঞ্চিটায় গোটা বিকেলটা কাটিয়ে দিলেন অলোক চট্টরাজ। মিত্রবাবুর সেক্রেটারি দেবু বিট্রে করলে; নস্যির কৌটের ওপর তিরিশ পার্সেন্ট কমিশন চেয়েছিল, অলোকবাবুর কুড়ির বেশি দিতে চাননি। সেই রাগে দেবু ব্যাটাচ্ছেলে মিত্রবাবুকে রিপোর্ট দিলে যে রবীন্দ্রনাথের নস্যির কেসটা স্রেফ বুজরুকি ।হাজার পঞ্চাশের দাঁও গেল ঝুলে। আগ্রওয়ালের কাছে একবার যেতে হবে, একটা পুরনো মাদুলি হাতে এসেছে; সে'টার যদি কিছু হিল্লে হয়।

এমন সময় বেঞ্চিতে ঝুপ করে এসে নামলেন গুরুদেব। স্ট্রেট ফ্রম তারাপীঠের শ্মশান; বোঝাই যাচ্ছে।

- সিগারেট দিবি রে একটা?
- আপনি গোপন বিদ্যা ব্যবহার করে তারাপীঠ টু কলকাতা এলেন সিগারেট চাইতে?
- আছে কি?
- আসুন।
- লাইটার দে।
- দিব্যপুরুষ, লাইটার ছাড়া বিড়ি ধরাতে পারেন না?
- ওরে, তন্ত্র দিয়ে এই গঙ্গার পেটে আলসার গুঁজে দিতে পারি। কিন্তু সিগারেটে লাইটার চাই বাপ। দে দে।
- এই যে দেশলাই। আর এই আপনার নস্যির কৌটো।
- এ কী! মিত্তির কিনলে না?
- ডাহা ঢপের একটা লিমিট থাকে তো?
- আহ্, চটছিস কেন। সুভাষবাবুর এঁটো টুথপিক বেচে দিলি, নস্যিরকৌটোটাও ভেবেছিলাম...।
- কোন দিন মারধোর খাওয়াবেন মাইরি।
- কী যে বলিস্। তা বাবা অলোক, একটা ব্লেন্ডার্স প্রাইড কিনে দিবি? নিপ।
- পারলাম না।
- বড্ড টান পড়েছে রে। আজকাল আর শ্মশানের ছাই বেচে আয় হচ্ছে না। রামদেবদা চ্যবনপ্রাশ বিক্রি শুরু করতেই মার্কেটে এক্সপেকটেশন পালটে গেছে।
- গুরুদেব, আমি তারাপীঠ যাব। সন্ন্যাস ।
- বিজনেস কী হবে?
- এ'খানেও ছাই বেচি। ও'খানেও তাই।
- সাধনা করতে পারবি?
- কেন পারব না?
- তা অবিশ্যি ঠিক। ক্যালক্যাটা সামলে নিলে, তারাপীঠের শ্মশান তো ছেলেখেলা।
- আপনি কি আমায় ওই জাদু দিয়ে হুশ করে এ বেঞ্চি থেকে তারাপীঠ নিয়ে যেতে পারবেন? নাকি আমি ট্রেন ধরব?
- এখনই? উঠলো বাই তো কটক যাই? ব্যাগ গোছাবি না?
- সঞ্জীব বলেছেন সংসার ছাড়তে হলে পুরনো ব্যান্ডেডের মত নিজেকে উপড়ে ফেলতে হবে, স্যাট করে।
- ভেবে দেখ।
- যাবই।

***

মিনিট দুয়েক ঝিম লেগেছিল, জ্ঞান ফিরল ট্রেনের কামরায়৷ সামনে এক শৌখিন দাড়িওয়ালা লোক দামী সিল্কের পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি পরে বসে। গোটা কামরায় আর কেউ নেই। ট্রেনের ভিতরে কেমন মায়াবী নীল  আলো, আর ধুনোর গন্ধ।

- কী? তা'হলে জ্ঞান ফিরল ভায়া? অবিশ্যি প্রথমবার এমন ঝিমুনি হবেই।
- এ'টা কোন ট্রেন?
- তন্ত্রলোকাল। রোজ তারাপীঠ পৌঁছয় সন্ধ্যে সাতটা দশে। রামশঙ্কর তান্ত্রিক তোমায় মিলেনিয়াম পার্ক থেকে আমাদের কামরায় তুলে দিলে। তোমার প্রথম তন্ত্রযাত্রা। সবে বিবাগী হয়েছ নাকি।
- এ কামরায় শুধু আমরা দু'জন, তাই না?
- না, আর একজন আছে। তিনি সামান্য আড়ালে রয়েছেন। ওহ, আমার পরিচয় দিয়ে নিই, আমি মিরজাফর।
-  ওহ্, তাই তো। এ লুঙ্গির কোয়ালিটি আমার চেনা। আর একজন কে আছেন কামরায়?
- রবীন্দ্রনাথ, বাথরুমে লুকিয়ে নস্যি নিচ্ছেন। আমায় যদিও বলেছে ওর নস্যি নেওয়ার অভ্যাস নিয়ে নতুন লোকের সঙ্গে বেশি কথা না বলতে। আমিও কথা দিয়েছিলাম বটে। তবে জানোই তো ভায়া অলোক, বিশ্বাসভঙ্গ করাটা বেশ মজাদারই বটে। কী বলো, হ্যাঁ?

Tuesday, June 26, 2018

নির্মলবাবুর পাগলামো

এ এক বিশ্রী নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মল আমার বন্ধু, কোথায় তাঁর পাগলামি বন্ধ করতে উদ্যত হব, তা নয়; তাঁকে রীতিমত প্রশ্রয় দিয়ে চলেছি। গত তিন মাস ধরে রোজই ভাবছি; আজ আর নয়। আর কিছুতেই নির্মলের বাড়ি যাওয়া চলবে না। অথচ তবু প্রতি অমাবস্যার সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফেরার সময় একবার ইচ্ছে করবেই- "যাই, দেখি আজ তাঁর প্ল্যানচেট কেমন দাঁড়ায়"। অকাল্ট, তন্ত্র, তুকতাক; এ'সবে একসময় একটু আগ্রহ ছিল বটে, হয়ত সেই টানেই এখনও নির্মলের পাগলামিতে সায় দিয়ে ফেলছি। তবে উপকারের বদলে এতে ওর বেশ ক্ষতিই হচ্ছে।

আর ব্যাপারটা গোটাটাই যে ডাহা বুজরুকি; সে'টাও চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাই। সন্ধে সাড়ে সাতটা বাজলেই ঘরের সমস্ত জানালা বন্ধ করে, বাতি নিভিয়ে; নিজের তর্জনীর ডগাটা রাখবে বাহারি সেন্টার টেবিলটা মধ্যিখানে। আর আমায় বলবে;
"আনন্দ, তোর সমস্ত ফোকাস আর এনার্জি এই বিন্দুতে থাকা চাই, কেমন? আর হ্যাঁ; দীপার মুখটা মনে করার চেষ্টা কর। তুই তো তাকে দেখেছিস বার কয়েক। আমার দীপাকে যারা একবার দেখেছে তারা সহজে ভুলবে না। কোঁকড়া চুল, ডাগর চোখ,  ডান গালে একটা তিল, গায়ে ল্যাভেন্ডারের নরম সুবাস। ফোকাস, কেমন"?

এরপর সে 'দীপা, দীপা' বলে বিড়বিড় শুরু করবে। ঘণ্টাখানেক চলবে সেই বিড়বিড়, শেষে ঘেমেনেয়ে প্রচণ্ড অস্থির হয়ে পড়বে সে। অথচ নির্মলের সদ্যমৃতা প্রেমিকার আত্মার কোনো হদিশই মিলবে না। টেবিল নড়ে ওঠার কথা; সে'টা থাকবে স্থির। মাঝখান থেকে ঘণ্টাখানেক কেটে গেলে আমি বিরক্ত হয়ে টেবিলে চাপড় মারব আর ব্যর্থ রাগের বসে টেবিলে একটা লাথি কষাবে নির্মল। আমি ওকে তখন শান্ত করার চেষ্টা করব। এ'টাই নিয়ম। নির্মল আমার ছোটবেলার বন্ধু, আর কেউ না বুঝুক; আমি অন্তত ওকে এ অবস্থায় একা ফেলে যেতে পারব না।

আজকেও তাই হল।

- দীপা আমার সঙ্গে জাস্ট ছেলেখেলা করছে।
- তোর মাথাটা জাস্ট গ্যাছে নির্মল।
- আমি ঠিকই বলছি আনন্দ। শিমলার মনোহর সিংয়ের বাংলোয় আড়াই মাস আমি এমনি এমনি কাটিয়ে আসিনি। দু'জন মানুষের নিশ্ছিদ্র মনসংযোগ আর সঠিক তিথি ও মুহূর্ত; এই দুই মিলে অসাধ্য সাধন করা যেতে পারে; আত্মা টেনে নামানো তো কোন ছাড়। কিন্তু...কিন্তু জানিস আনন্দ; আমি দীপার আত্মার উপস্থিরি রীতিমত টের পাই।
- তোর ওই প্ল্যানচেটের সময়?
- ইয়েস। স্পষ্ট। ওর শরীরের গন্ধ আমার নাকে আসে।
- তোর দরকার একজন থেরাপিস্ট।
- আনন্দ প্লীজ, তুই আমার বন্ধু। তুই আমায় একটু সাপোর্ট করবি না?
- সাপোর্ট না করলে তোর খামখেয়ালিপনা এন্টারটেন করতে প্রতি অমাবস্যায় এখানে আসতাম না।
- আর কিছুদিন আয় ভাই,আমায় বিশ্বাস দীপা একদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলবেই। দীপা আমায় ভালোবাসত রে, মনপ্রাণ দিয়ে। ও আসবে, আসবেই। একার কনসেন্ট্রেশনে প্ল্যানচেট হবে না; প্লীজ ভাই আনন্দ। পরের অমাবস্যায় আসিস।

প্রতিবার রাগের মাথায় নির্মলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি, অথচ পরের অমাবস্যাতেই নির্মলের প্রতি একটা টান অনুভব করি। দীপার অকালমৃত্যুতে বেচারা সত্যিই বড় একা হয়ে পড়েছে। আমি ছাড়া ওর আর কেই বা আছে।

***

- হ্যালো, আনন্দ?
- বলছি। এখন কেমন আছিস তুই নির্মল?
- আগের চেয়ে ভালো। তুই ছ'মাস না এসে ভালোই করেছিস। আমার পাগলামোটা কেটে গেছে ভাই। আমি আর উন্মাদের মত প্ল্যানচেট করে বেড়াই না। দীপার আত্মা নামানোর ভূত এ'বার আমার মাথা থেকে সত্যি গেছে। তুই আসা বন্ধ করার পর আমি শিমলা গেছিলাম, মনোহর সিংয়ের কাছে। আমরা দু'জনে চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। আসলে গোটা ব্যাপারটাই একটা খ্যাপামি ছিল রে, আজ বেশ বুঝতে পারি।
- যাক।
- একদিন দেখা কর প্লীজ। বুঝতে পারছি তুই আমায় এড়িয়ে যাচ্ছিস। কিন্তু আমি খুবই লজ্জিত রে আনন্দ।
- অফিসের কাজে একটু আজকাল ব্যস্ত রয়েছি রে। কিছুদিন পর না হয়...।
- আচ্ছা বেশ, পরেই না হয়।

***

নির্মলকে কী ভাবে বলব যে ওর বাড়ি যাতায়াত আমি এমনি বন্ধ করিনি। আমার আর কোনো উপায় ছিল না। তাছাড়া নির্মলকে বোঝাবই বা কী; এ'টা বলব যে আমাদের প্ল্যানচেট ব্যর্থ হয়নি? ওকে জানাব যে আমার টাক মাথায় দিব্যি কোঁকড়া চুল গজিয়েছে? ডান গালে হঠাৎ করে দেখা দিয়েছে বড় একটা তিল? আর হাজারবার সাবান শ্যাম্পু ঘষে স্নান করেও আমার গা থেকে এই গা কাঁপানো ল্যাভেন্ডারের সুবাস যাচ্ছে না?

Saturday, June 16, 2018

মেসি ও মামা

- মামা গো!
- এই অসময়ে ফোন করেছিস কেন?
- অসময়? রাত পৌনে ন'টা। এখন তো তুমি সবে মশলা মুড়ি খেয়ে অ্যাপেটাইট বিল্ড করছ।
- নাহ্‌। আজ আর সে'সব করছি না।
- সে কী! শনিবার রাত তো তোমার পাঁঠার কোর্মা আর হাতরুটির রাত। প্লাস ছানার পায়েস। তা, অ্যাপেটাইট বিল্ড না করলে চলবে?
- আজ রাতে ঝিঙের তরকারি আর সয়াবিন।
- সে কী!
- বাজে কথা বলার সময় আমার নেই।
- তা খেলা দেখলে?
- হ্যাঁ। ইংল্যান্ড খুব ভালো ব্যাট করেছে।
- সে কী! মেসি মাঠে নামলে আর তুমি ক্রিকেটের রেফারেন্স দিচ্ছ মামা?
- বড্ড পেকেছিস তুই। সেদিনের ছোকরা, বড়দের লেগপুল করছিস?
- যাব্বাবা! খেলা দেখছ কিনা জিজ্ঞেস করলাম, এ'তে আবার লেগপুলের কী হল।
- শোন, এককালে ডিস্ট্রিক্ট খেলেছি। লেফট উইং। বুঝলি? তোদের মত ইএ স্পোর্টসে লম্ফঝম্প করে জ্ঞান ঝাড়ি না।
- মন খারাপ মামা? মেসির পেনাল্টি মিসে?
- মনখারাপের কী? শোন, মারাদোনা আর মেসির পর আমার মোস্ট ফেভারিট আর্জেন্টাইন চে'কে টিশার্টে নয়, বুকে রাখি। বিপ্লব কখনও পেনাল্টি মিস করে সন্ন্যাস নেয় না। আইসল্যান্ডের সঙ্গে আইসব্রেকিংয়ে সমস্যা হয়েছে, দাঁড়া আর দু'দিন। ওই নন-ন্যাড়া রোনাল্ডোর কান মুলে যদি মেসি না এগিয়েছে...।
- কিন্তু যাই বলো মামা। তেকাঠিতে প্রায় বল রাখতেই পারল না। পেনাল্টিতে অবশ্য রেখেছিল, তবে ইয়ে। গোলকিপারটা বেরসিক।
- ইনজুরিতে আজিনোমোটো ছড়াচ্ছিস? সেই জন্যেই তো ফোন করেছিস, তাই না?
- মামা, খামোখা চটছ মাইরি।
- সব বুঝি। যাক গে। এ'টা আমি জানতাম।
- জানতে?
- বাপনদা বলছিল, গ্রহের পজিশন নাকি বিট্রে করতে পারে।
- বাপনমামা? তোমার সেই তান্ত্রিক কাম জ্যোতিষ বন্ধু?
- হুঁ।
- গ্রহের পজিশনের পেনাল্টি মিস?
- মেসি একটু ভেবড়ে গেছিল তাই। মেসি একটা মাদুলি ধারণ পারলে ভালো হত। কিন্তু যাকগে। অল্টারনেট উপায় একটা পাওয়া গেছে।
- কী উপায়?
- সামনের মঙ্গলবার নিরামিষ খেয়ে মেসির নামে কালীঘাটে একটা পুজো দিতে হবে। বাপনই সমস্ত ব্যবস্থা করে দেবে।
- বলো কী!
- গ্রহের ইন্টারফারেন্স কাটলেই; কচাতকচাত করে সব কচুকাটা হবে।
- মামা, তুমি মঙ্গলে নিরামিষ খাচ্ছ?
- উপায় নেই রে। উপায় নেই।
- যাব্ববা। এ তো বেশ মুশকিল হল।
- কীসের মুশকিল?
- মঙ্গলে জামাই ষষ্ঠী না? এ'বার তোমার শ্বশুরবাড়ি থেকে ডাকেনি? জামাইআদরের শেলফ লাইফ শেষ?
- সর্বনাশ! মঙ্গলে তো জামাই ষষ্ঠী। একদম ভুলে মেরে দিয়েছিলাম। এ'দিকে পুজোটা মঙ্গলেই করতে হবে। পরের মঙ্গল হলে ইট উইল বি টু লেট।
- যাক, তা'হলে কী আর করা যাবে। এ যাত্রা নিরামিষ খেয়েই কাটিয়ে দাও জামাইষষ্ঠীতে। শ্বশুরবাড়িতে জানিয়ে দাও। দুপুরে ভাত, ঝিঙে আলুর ঝোল, আর মুলো দেওয়া ডাল থাকলেই চলবে।
- খামোশ। ভামোস নিয়ে পরে ভাবলেও চলবে। আর রিয়েল খেলা তো ক্রিকেট রে; যে'খানে লাঞ্চ টী ড্রিঙ্কস সমস্ত আছে। ফুটবল তো ধ্বস্তাধস্তি। একটা আদ্দির পাঞ্জাবি কিনতে হবে। বেরোব ভাবছি। দেখা করবি নাকি? পাঞ্জাবি কেনা আর নন্দী হোটেলের মেটে চচ্চড়ি আর ডিম তড়কা। কী?
- তুমি অন্তর্যামী মামা। মোড়ের মাথায় দেখা করি তা'হলে? আধঘণ্টার মাথায়?
- তাই আয়। আমি একটু মশলা মুড়ি মুখে দিয়েই বেরোচ্ছি।
(ছবিঃ Pulse)

বিক্রম বেতাল


- দাদা।
- বিক্রম? আয়।
- কাজ হয়ে গেছে।
- লাশ?
- অ্যাসিড। তারপরে নদী।
- আশেপাশে?
- কেউ ছিল না। ডবল শিওর।
- গুড।
- দাদা।
- আবার কী। টাকা পাসনি?
- পুরোটাই অ্যাডভান্সে।
- তবে?
- না মানে...।
- আর কী?
- এক পেগ, হবে? আসলে এ'সব কাজের পর কেমন...।
- নার্ভাস?
- ছিঃছিঃ, তা না। তবে ওই, কেমন একটা।
- সোডা?
- শুধু জল।
- নে।
- আহ্। বাঁচালে।
- তাড়াহুড়ো কেন?
- না...এমনি।
- তাই বলে বটমস আপ?
- প্যালপিটেশন হচ্ছিল যেন। ইয়ে, হবে? আর এক পেগ?
- হবে।
- থ্যাঙ্কস।
- বিক্রম। এরপর কিন্তু আর এক পেগও নয়। কাল আবার নতুন করে কাজে নামতে হবে।
- কাল? আবার?
- উপায় নেই। থামার উপায় নেই বিক্রম।
- দাদা, আমার আর ভালো লাগছে না।
- সে কথা আগে ভাবা উচিৎ ছিল।
- তোমার দমবন্ধ হয়ে আসে না? এই বিশ্রী খেলা খেলতে?
- বিশ্রী? 
- রোজ একটা করে নতুন দেহ খুঁজে বের করে ভর করো, রোজ আমি সেই মানুষ খুঁজে খুন করি আর তারপর তুমি এখানে এসে গা এলিয়ে বসে অপেক্ষা করো আগামীকালের। নতুন দেহের।
- গা এলিয়ে বসি, নাকি? আত্মার গা?
- সরি, মানে...ওই আর কী। কিন্তু রোজ তোমায় খুন করে নতুন নতুন লাশ গায়েব করা আর তারপর এই ভূতের আস্তানায় এসে অপেক্ষা করা; কখন নতুন বডি ধরবে; কাহাতক সহ্য হবে?
- টাকা নিয়েছিস। কোনো ওপরচালাকি নয়।
- বেতালদাদা, প্লীজ। আমি আর পারছি না। আমার আর টাকার দরকার নেই।
- বেশ, শেষ খুনটা করে দে।
- তারপর?
- মুক্তি?

ছটফট করে ওঠে বিক্রম, নিজের নতুন দেহের মধ্যে তখন বেতালদাদার আত্মার পাক খাওয়া দিব্যি টের পায়। 
ফের নিজের বুকে ছুরি বেঁধানো। ফের নিজের লাশ গায়েব করা। ফের একটা মড়া বয়ে এই অন্ধকারে ফিরে আসা। রোজ রোজ নতুন শেষ খুন জমা হয়।

টাকাগুলোয় অবশ্য পরিবারটা বেঁচেছে। কিন্তু এ দুর্ভেদ্য অন্ধকার বড় অসহ্য লাগে বিক্রম গোয়েন্দার। মামুলি সিরিয়াল কিলিংয়ের কেস ভেবে বেতালের পিছনে পড়াটা মোটেও উচিৎ হয়নি।