Sunday, August 9, 2020

টাক আর কলপ


- এই যে।

- উঁ।

- আরে ও মশাই।

- কী..কী?

- চোখটা খুলুন না একবার। আরে ও মশাই। আর কত ঘুমোবেন। 

- কে? কে? এই! কে রে ব্যাটা তুই?

 -আমি বরং তুমি করেই বলি। আর তোমায় বরংনাম ধরেই ডাকি, কেমন? শোনো বাবা নিধু, গুরুজনদের তুইতোকারি করতে নেই। 

- এই বিদঘুটে সাজপোশাক পরে ঘোরাঘুরি করার মানেটা কী? আর আমি তো দোকানের দাওয়ায় বসে ঝিমোচ্ছিলাম। এ'টা আবার কোথায়? ঘুটঘুটে অন্ধকার। জঙ্গল। কে রে ব্যাটা তুই? আমায় গুমখুন করার ধান্দা করছিস নাকি?  সাবধান! জমিদার মশাইয়ের যে বাজারসরকার..ওই যে জীবন মল্লিক। সেই জীবন মল্লিকের প্রতিবেশী নিমাই সর্দারের সঙ্গে আমার পিসেমশাইয়ের খুব দহরম। রাতের মধ্যে যদি আমি গাঁয়ে না ফিরি তা'হলে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটবে।

- আরে ধুর রে বাবা। আমি ভালোমানুষের পো৷ কপালফেরে মরে স্বর্গে না গিয়ে ভূত হয়ে ঘুরছি৷ তা বলে আমি গুমখুন করতে যাব কোন দুঃখে?

- ভূ..ভূ...ধেৎ। বহুরূপীর আবার বাতেলা কত।

- মাইরি ভাই নিধু। আমি এক্কেবারে গোটা একখানা ভূত।

- ধেৎ।

- গা ছুঁয়ে বলব?

- থাক থাক। অত মাখামাখিতে কাজ নেই। এ'বার কাজের কথা বলে ফেলো দেখি। বৌ রাতে লুচি ভাজবে। ভেবেই ভিতরটা আনচান করছে। আমার কিন্তু বাজে গল্পের সময় নেই। তা তুমি ভূতই হও আর ডাকাতই হও।

- না না। তোমায় আর আটকে রাখব না ভাই। যা নেওয়ার ছিল তা নিয়ে নিয়েছি।

- এই দ্যাখো। ট্যাঁক থেক পয়সা সরালে নাকি! আচ্ছা জোচ্চোর তো হে তুমি।

- আরে না না। ভূতের আবার পয়সায় কী কাজ৷ আর নিজের জন্য তো আমি কিছুই নিই না। কার কীসে উপকার হয়, সে ভেবেই..।

- ওরে আমার দাতাকর্ণ এলেন হে। এই দ্যাখো, ভালোয় ভালোয় বলে দাও কী সরিয়েছ।

- যা সরিয়েছি তা তোমার কোনও কাজেই লাগবে না নিধু৷ টেকো মানুষের দেরাজ থেকে কলপের শিশি সরানোয় পাপ নেই। 

- এই যে। ভূত বাবাজী। বাড়াবাড়ি ভালো নয়। সিধে ভাবে বলো দেখি কী হাতালে? 

- তোমার গান। 

- ক..কী? 

- গান। অমন মিঠে সুর তোমার গলায়৷ যে শুনবে তাঁর প্রাণ জুড়োবেই, সে স্তব্ধ হয়ে শুনবেই। অথচ মুদীর দোকান তদারকি করতে করতেই ক্ষয়ে গেলে তুমি নিধু। আগে তাও নাইতে গিয়ে গুনগুন করতে। বছরখানেক হল তাও গিয়েছে৷ তোমার গলায় ও গান ফেলে রাখা অন্যায়। দোকানের হিসেবের খাতার বাইরে পা দেওয়ার সাহস তোমার নেই। আর সে সাহসটুকু না থাকলে যে সব মাটি ভাই।

- তুমি কে গো খুড়ো? মনটা বড় হেঁচড়ে দিলে যে। 

- আমি সত্যিই ভূত হে নিধু। আর যে সে ভূত নই৷ রীতিমত ভূতের রাজা। আর আমার কাজই হলো অব্যবহারের জিনিসকে কাজের কাজের জায়গায় রেখে আসা। তোমার সুর আছে অথচ শখ নেই, সাহস নেই। আবার এই মাত্র একজনের খোঁজ পেলাম যে কিনা গানের শখ আর সাহসের গুঁতোয় গাঁছাড়া হয়েছে অথচ গলায় একবিন্দু সুর নেই। ভাবছি, তোমার সুর আমি তাকেই দেব..।

- অ। হুম।

- মনখারাপ? নিধু?

- সামান্য। তবে কী ভূতখুড়ো, ওই যা বললেন আপনি। আমার মাথাভর্তি টাক, কলপের শিশিতে আমার কাজ কী। এই বরং ভালো। 

- বাহ্ বাহ্ নিধু। তোমার সুর আর তোমার রইল না বটে৷ কিন্তু এমন দরাজ মনটুকু হাতানোর ক্ষমতা যে আমারও নেই। আজ আসি বরং। আর একটা কথা বাবা নিধু, এমন কাউকে চেনো যে চমৎকার ঢোল বাজাতে জানে অথচ বহুদিন ঢোল ছুঁয়েও দেখেনি? চেনো এমন কাউকে?

Saturday, August 8, 2020

আলাপ


- কম্পলেক্সে নতুন মনে হচ্ছে?

- ফাইভ-এ-তে এসেছি। গতকালই।

- ওয়েলকাম। আমি সত্যব্রত ধর, ফাইভ-বি। 

- ওহ। তা'হলে তো আমার ইমিডিয়েট নেবার। আমি অমিতাভ সেন। তা আসুন না একদিন। দুই বাঙালির আলাপ কি চা আর টা ছাড়া জমে নাকি।

- কেন? দিব্যি জমে।

- না মানে..।

- অমিতাভবাবু। পাশের ফ্ল্যাটে নতুন কেউ এলেই আমি আলাপ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়ি। কেন জানেন?

- মানুষ তো সামাজিক ইয়ে। আলাপের ইচ্ছেটা তো অস্বাভাবিক নয়। যে কোনও বিপদেআপদে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনের আগে তো পাড়াপড়শিরাই ছুটে আসবে। 

- এই মিসকনসেপশনটাই বড় ভাবায় আমায় জানেন। সে জন্যই আমি নতুন প্রতিবেশীদের লবিতে পাকড়াও করি।। শুনুন, ও'সব সামাজিক ইয়েটিয়ে পুরোপুরি ব্লাফ। মানুষ অত্যন্ত ধান্দাবাজ। আর প্রতিবেশীর সঙ্গে বেশি গা-মাখামাখি মোটে ভালো কথা নয়।

- আমি ঠিক..।

-  এই যে চা আর টা খেতেখেতে আলাপ, এ'সব বড় ভাবায় আমায়।

- ভাবায়? কেন বলুন তো?

- সেই তো আপনার বাড়ির সোফায় বসে চা পকোড়া খেতে খেতে আপনাকেই মনে মনে কঞ্জুস বা বাতেলাবাজ বা অন্যকিছু বলে হ্যাটা করব। আপনিও আমার প্লেটে পকোড়া ঢালতে ঢালতে মনে মনে বলবেন শালা আপদ। 

- ও মা। তা কেন?

- ঠিক তাই৷ চা পকোড়া খেতেখেতে গল্পগুজব যেটুকু যা জমবে তা আদৌ কোনও কোয়ালিটি গল্প নয়,  পুরোটাই সস্তা গুজবের ভিত্তিতে পরনিন্দা। অথবা তার চেয়েও ক্ষতিকারক জিনিস এসে পড়বে আড্ডায়; পলিটিক্স। 

- আপনি কিন্তু মশাই বেশ বিটার।

- সে'টাই বেটার। সুইট হলে আজ চাইতেন চিনি আর পরশু চা-পাতা। না না, আমায় চশমখোর ভাববেন না। চা চিনি ডিম দেওয়ানেওয়াতে আমার অসুবিধে নেই৷ আমার চিন্তা ওই ছিচকে ট্র‍্যান্সক্যাশনগুলোর জন্য যে  প্রাণান্তকর খেজুরে আলাপটুকু সহ্য করতে হয় তা নিয়ে। চার চামচ মিল্কপাউডার নিতে এসে চোদ্দ মিনটের বাজে গল্প। উফ। তবে হ্যাঁ, ওই খেজুরে আলাপ বাদ দিয়ে মনের মতন বই আদানপ্রদান করতে চাইলে এনকারেজ করতে পারি। 

- আমি আসি সত্যব্রতবাবু।

- ও মশাই। চটলেন নাকি? আহা, ভ্যাক্সিনে খোঁচা আছে কিন্তু লংরানে উপকারি। পাশের ফ্ল্যাটে নতুন কেউ এলেই আমি তাকেতাকে থাকি কখন লবিতে তাকে পাকড়াও করব। এক্সপেক্টেশনগুলো গোড়াতেই ক্যালিব্রেট না করলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। 

- বেশ। চায়ের নেমন্তন্ন করে আপনাকে বিব্রত করব না। এখন আসি।

- হেহ্। যাক, আর কোনও কনফিউশন রইল না। ইয়ে, আমি কিন্তু ব্যাড নেবার নই মশাই।  আপনার ফ্ল্যাটে আগুন লাগলে আমি অবশ্যই দমকলে খবর দেব। আর আমার ফ্ল্যাটে আগুন লাগলে আপনি দমকলে খবর দেবেন। ব্যাস, প্রতিবেশীর দায়িত্ব শেষ। টোটাল উইন উইন,তাই না?

Friday, August 7, 2020

রবিবাবুর সমস্যা


- এই যে দাদা, দেশলাই আছে?

- নাহ্।

- আপনার বুঝি সে বদঅভ্যাস নেই?

- বিড়ির? নাহ্। নেই।

- একমিনিট৷ আপনার মুখটা কেমন যেন চেনাচেনা লাগছে..কোথায় দেখেছি বলুন তো?

- বইয়ে। বায়োস্কোপে। দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারে। 

- আরিব্বাস। রবিবাবু যে!

- ছদ্মবেশেও এসেও যে ধরা পড়ে যাব সে'টা ভাবিনি।

- ছদ্মবেশ ধারণ করতে গিয়ে সাধারণত সবাই নকল দাড়ি চাপায়৷ আর আপনাকে অরিজিনাল দাড়ি কামাতে হল। সত্যিই, আপনার ইকুইটির কতটা জুড়ে যে দাড়ি..।

- বললাম তো। দেশলাই নেই। তা সত্ত্বেও আপনি বকবক চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন বলুন তো?

- আসল আগুন তো আপনিই মশাই, দেশলাই তো সে তুলনায় ভিজে জনসন বাডস।

- যতসব থার্ড ক্লাস উপমা।

- তা বেশ তো। নোবেল তো আর আমি পাইনি৷ আপনিই দু'একটা হাইক্লাস জিনিস ছাড়ুন না।

- সে উপায় কী আর আছে ভাই৷ আমি যার স্বপ্নে আছি, তার পাতি ভাঙাচোরা ভাষার বাইরে গিয়ে তো কথা বলতে পারব না৷ ইন্টেলেকচুয়ালিও তার ঘোলাটে ব্রেনের লেভেলেই থাকতে হবে। কাজেই আমায় ঘাঁটানো বন্ধ করুন।

- ও, আই সী। আপনি তো আড্ডা দিতে পছন্দ করেন না।

- রাবিশ। সুকুমারের ব্যাটা কী এক ফালতু থিওরি সবার মাথায় ঢুকিয়ে গেল। তবে হ্যাঁ, এখন মনটন ভালো নেই। তাই গপ্পগুজবে মন দিতে পারছিনা।

- ও মা। আপনার আবার দুঃখ কীসের৷ দিব্যি অন্যের স্বপ্নে এসে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দুনিয়াদারির চিন্তা নেই, লেখালিখির হ্যাপা নেই৷ একটু গা এলিয়ে ফুর্তি করুন দেখি। এ ব্যাটার কখন ঘুম ভেঙে যাবে আর অমনি স্বপ্নের আমি আর আপনি হাওয়া। রিল্যাক্স। তাস খেলবেন? একসেট আছে পকেটে। হবে নাকি একহাত? রংমেলান্তি? 

- না ভায়া। বললাম যে। মনভার। চারদিকে কেমন ফাঁকাফাঁকা ভাব। 

- ও। বুঝেছি। এখানকার হাওয়ার স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। তা'তেই যত গোল।

- ঠিক তাই। স্পষ্ট বুঝছি এ গন্ধ মনখারাপের। অথচ আমি এ মনখারাপের তল পাচ্ছিনে ভাই। 

- তাই বুঝি অমন গোমড়া হয়ে বসে?

- গোমড়া হব না ভায়া? যে মানুষের স্বপ্নের মধ্যে সেঁধিয়েছি, তাঁর ভাষা, ভাবনা সবই অত্যন্ত পানসে। অথচ তার সরল মনখারাপকে কিছুতেই স্পষ্টভাবে ঠাহর করতে পারছিনা। এ যে ক্যালামিটি। আমার গান, কবিতা, গল্পে প্রতিটি বাঙালি আজও নাকি নিজের মনখারাপের উপশম খুঁজে পায়। আর আমি এ স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপটুকু অ্যানালাইজ করে উঠতে পারছি না?

- মেধা। সংবেদনশীলতা। ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা। এ'সব বিষয়ে আপনার নখের যোগ্য এ দুনিয়ায় আর কেউ আছে কি গুরুদেব?

- তুমিও ন্যাকাপনা শুরু করলে ভাই?

- নয়ত যে ক্রিটিসিজমটা হুট করে আপনার গায়ে এসে লাগত। 

- ক্রিটিসিজম?

- এ মনখারাপ আধুনিক। শুধু মেধা, সংবেদনশীলতা আর ভালোবাসা দিয়ে এর তল পাবেন না স্যার। রিল্যাক্স।

- ভারী চ্যাটাংচ্যাটাং কথা তো তোমার। কে হে তুমি? আর তুমি কি জানো এই স্বপ্নদেখিয়ের মনখারাপের আদত কারণটুকু?

- আজ্ঞে, যে ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্নে আমরা আড্ডা দিচ্ছি, আমায় সে প্রচণ্ড ভক্তি করে। আপনি তার হিরো, আপনাকে এ শোকেসে আটকে রাখে। আর আমি তার ইয়ারদোস্ত, আমায় সে বালিশের পাশে রেখে ঘুমোয়। আমার নাম টেনি। আর হ্যাঁ, আমি চিনি এই মনখারাপকে। কিন্তু ওই যে বললাম, ইন্টেলিজেন্স আর সেনসিটিভিটি দিয়ে এ দুঃখ মাপতে পারবেন না রবিবাবু। এ মনখারাপ বুঝতে দরকার গুলবাজের কলজে। সে'টা আপনার নেই, আমার আছে।

- এ মনখারাপ কীসের ভাই টেনি?

- স্বপ্নদেখিয়ে ভদ্রলোকের ওয়াইফাই ডাউন আর মোবাইলেও সিগনাল নেই। কাজেই ট্যুইটারের তর্ক আর ফেসবুকের ঝগড়া দু'টোই আপাতত থেমে রয়েছে৷ হাজার খানেক অমিত-লাবণ্য  মিলেও এ মনখারাপ ট্যাকেল করতে পারবে না স্যার। কাজেই আপনি চাপ নেবেন না। কেমন?

Thursday, August 6, 2020

ভজা মাস্তানের মনকেমন

- ভজাদা, ও ভজাদা। চুক্কুস করে এক চুমুক হোক না।

- নাহ্। আজ ও'সব গিলতে মন চাইছে না রে মন্টু।

- আজ এত বড় একটা কাজ হাসিল হল৷ আর তুমি মাইরি নিরামিষ থাকবে?

- কাজ হাসিল? তাই বটে।

- ভজাদা, কেসটা কী বলবে?

- নাহ্। তোদের মোচ্ছব চলুক। আমি বরং ছাতে যাই।

- ও, ভজাদা। কী হলো গো। বলো না। ভজাদা গো। বলো না,  বলো।

- কাজটা ভালো হলো রে মন্টে?

- ওই, ক্লাবঘর তৈরির ব্যাপারটা?

- ওই কাজটাই তো আমরা হাসিল করলাম। তার জন্যেই তো কানু দত্ত আমাদের জন্য ঢালাও মদ-মাংসের ব্যবস্থা করে দিল। তাই না? কিন্তু কাজটা কি আদৌ ভালো হল?

- আমরা লোচ্চা লোফার মাস্তান মানুষ৷ কানুদার মত হাড়বজ্জাত নেতাদের হয়ে একে মারি তাকে ঠুকি, তোলা আদায় করি৷ আমাদের কি কাজের ভালো মন্দ নিয়ে ভাবলে চলে ভজাদা? তুমিই তো বলতে, আমাদের কাজ দিনে  ক্যালানো আর রাতে কেলিয়ে পড়া, সাতপাঁচ ভাবার দায়িত্ব আমাদের নয়।

- হ্যাঁ। আমরা গুণ্ডা, নচ্ছার। আমাদের না হয় সাতপাঁচ ভাবতে নেই। ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি দেখে আমরা খ্যাঁক করে হাসবো, সে'টাই হওয়া উচিৎ৷ কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু গুলিয়ে গেল রে মন্টু।

- গুলিয়ে গেল? কী করে ভজাদা?

- টোটাল ঘেঁটে ঘ। হারুর ওই একচিলতে ভাঙাচোরা টিনের বাড়ি। সে'টুকুতে সাত সাতটা মানুষ ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকত। হারুকে এমনিতেও পাড়ার কেউ পাত্তা দিত না। নীচু জাত বলে কথা। ওই পাতি লোকটার উপর চড়াও হলাম আমরা। খেদিয়ে দিলাম৷ আর ওর সেই টিনের বাড়িটুকু গুঁড়িয়ে দিয়ে কানু দত্ত পাড়ার ছেলেদের জন্য ক্লাবঘর বানিয়ে দিলো। 

- বেশি ভাবছ গুরু। এমনিতেও, ও জমি আদৌ হারুর নাকি?

- নয়, না?

- কানু দত্তর কাছে ও জমির কাগজ আছে৷ আমি অবিশ্যি চোখে দেখিনি। তবে শুনেছি আছে।

- হবে হয়ত। আমার কানে শুধু বাজছে ও বাড়ি ভাঙার সময় হারুর বউ আর দুই মেয়ের কান্না। 

- আজ পর্যন্ত তো অনেক বস্তিই আমরা ভেঙেছি গুরু৷ চোখের জল কি সে'খানে পড়েনি?

- তুই ভাবছিস আজ হঠাৎ এই ভজামাস্তান হারুর বউ মেয়ের কান্না নিয়ে ভাবতে বসল কেন? 

- ঠিক তাই ভজাদা। আমি ঠিক সে'টা ভেবেই ভেবড়ে যাচ্ছি। কেসটা কী?

- না না৷ আমি জাত গুণ্ডা, ওদের কান্না পাত্তা দেওয়ার মত নেকু আমি নই। কিন্তু শুধু একটা ব্যাপার আজ আমায় একটু ঘাবড়ে দিল রে মন্টে।

- কী ব্যাপার ভজাদা?

- চিরকাল জেনে এসেছি আমাদের গুণ্ডামিকে আর কানু নেতার নষ্টামিকে ভদ্রলোকেরা ঘেন্না করে। আমাদের ভয় পায় এ'টা ঠিক, এমন কী কানুদাকে সে ভদ্রলোকেরা ভোটও দেয়। কিন্তু মনেপ্রাণে ঘেন্না করে, কানুদাকে, আমাদেরও। অথচ এই হারুর টিনের বাড়িটা গুঁড়িয়ে বড় ক্লাবঘর তোলার ব্যাপারটাকে দেখলাম পাড়া ভদ্রজনেরাও প্রাণ খুলে বাহবা দিচ্ছে৷ যারা এদ্দিন আমাদের দেখলেই সরে পড়ত, আজ দেখলাম তারাই জড়িয়ে ধরছে। পাড়ার যে সুশীল মানুষজন কানু দত্তকে জোচ্চর বলত, তারাই দেখলাম আজ কানুকে মালা পড়িয়ে নতুন ক্লাবঘরে বরণ করে নিল।  

- ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি তোমায় ব্যথা দিচ্ছে ভজাদা?

- তাই হবে হয়ত।

- আমি আর কী জানি বলো। তবে শুনেছি হারুর ওই টিনের ঘরটার জন্য পাড়ার কালচার নষ্ট হচ্ছিল। দেখতেও বিচ্ছিরি। তার তুলনায় এই নতুন ক্লাবঘর টোটাল ঝিনচ্যাক। তাছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যে হবে, ক্যারম কম্পিটিশন হবে; প্রচণ্ড কালচার কালচার একটা ব্যাপার হবে ভজাদা।

- তাই হবে হয়ত৷ জানিস মন্টু, কাল রাতের দিকে হারুদের দেখলাম। স্টেশন রোডের কাছের ওই শনিমন্দিরের চাতালে শুয়ে। হারুটাকে দেখে যা মনে হল গাঁজা টেনে উল্টে পড়ে। আর হারুর ছোট ছেলেটার বোধ হয় জ্বর। রবীন্দ্রনাথফাথে ওদের কিস্যু হবে না। ছোটোলোক তো৷  বিদেয় হয়েছে আপদ গেছে। আমি ছাতে যাই রে মন্টে।

- চলো, গুরু। আমিও ছাতেই যাই৷ দাঁড়াও, আগে মাদুরটা নিয়ে আসি গিয়ে। মদ মাংস না হয় আজ থাক।

Wednesday, August 5, 2020

দত্তবাবুর রিপোর্ট


- এ'টা কী দত্ত?

- কেন স্যার?এ'বারের মান্থএন্ড রিপোর্ট। 

- মান্থএন্ড রিপোর্ট দিয়ে আমার লাইফ এন্ড করার তাল করছ ভাই দত্ত?

- ক..কেন স্যার?

- রিপোর্টটা সাবমিট করার আগে নিজে পড়ে দেখেছ?

- অবশ্যই। তিন তিনবার।

- পড়ে কী মনে হল? 

- নিজের বানানো রিপোর্ট সম্বন্ধে নিজে আর কী বলব বলুন স্যার। ওই, হিউমিলিটিতে আটকে যাই।

- তবু, কষ্টেসৃষ্টে বিনয় চেপে কিছু বলো।

- তা, এক কথায় চমৎকার। ক্যালিব্রি ফন্টটা আমার খুব প্রিয়, আর এই রিপোর্টে মানিয়েওছে ভালো৷ এরপর লাইন স্পেসিং বাড়িয়ে দেওয়ায় হলো কী; রিপোর্টটা সুদিং টু দ্যি আইজ হওয়ার পাশাপাশি আড়াই পাতার বদলে গিয়ে দাঁড়ালো সাড়ে পাঁচ পাতায়। অল্প কথা লম্বা প্রিন্ট আউটে প্রকাশ করতে পারায় যে কী অপরিসীম তৃপ্তি স্যার।

- বিনয় সত্যিই তোমায় বেঁধে রাখতে পারেনি বিনয়।

- পুরো সাড়ে পাঁচ পাতাই জাস্টিফাইড। বুলেটে সাজানো। জারগনগুলো বোল্ডে দেওয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামারলিতে ফেলে ভাষাটুকু হাইক্লাস লেভেলে ঝালিয়ে নিয়েছি স্যার। আহা, এ রিপোর্ট পড়েও আরাম।

- রিপোর্টে ক্যালিব্রি, স্পেসিং, গ্রামারলি, বুলেট সবই তো আছে হে দত্ত৷ কিন্তু জুলাই মাসের হিসেবের বদলে জুনের ফিরিস্তি দিয়েছ যে।

- ওহ। জু..জুনের হিসেবই রয়ে গেছে কি? আসলে কপি পেস্ট এ'দিক ও'দিক করতে গিয়ে ওই মাইনর ইয়েটা...ইয়েটা..হয়ে গেছে বোধ হয়।

- মাইনর ইয়ে?

- ওই। বাহান্নর বদলে তিপ্পান্ন। তবে, লকডাউনের মরসুম।  সেলস,মার্কেট শেয়ার সবই ওই জুনে ডকে আর জুলাইয়ে গোল্লায়। ও নিয়ে আপনি ভাববেন না স্যার।

- আর এই রিপোর্ট তুমি সোজা বড়সাহেবকেও পাঠিয়ে দিলে? দত্ত?

- তা'তে কী স্যার? বড়সাহেব রিপোর্ট পড়বেন ভেবেছেন? তার হাতে কি এতই বাজে সময়? 

- বড়সাহেব রিপোর্ট পড়বেন না?

- বড়সাহেবরা রিপোর্টে চোখ বুলোবেন। ফন্টে তৃপ্ত হবেন, বুলেটে ঘায়েল। প্রথম প্যারার ভারিক্কি ইংরেজি পড়ে মাথা দোলাবেন, শেষ পাতার শেষ লাইনের অপটিমিজমে স্মিত হাসবেন। যে কোম্পানির বড়সাহেবরা এর বাইরে গিয়ে রিপোর্ট মন দিয়ে পড়া শুরু করেছেন, জানবেন সে কোম্পানির অবস্থা মোটে সুবিধের নয়।

- বটে? অতি-ব্যুরোক্রেসিই তবে আদত এফিশিয়েন্সি?

- এর উত্তর সোজাসুজি দেওয়াটা ঠিক হবে না স্যার।

- কেন দত্ত? হঠাৎ এই বাড়তি বিনয়?

- অভয় দিলে দু'টো কথা বলি। স্যার।

- বলে ফেলো হে ফন্টসম্রাট বুলেটরাজা, বলে ফেলো।

- সিনিয়র হয়ে আপনি আমার রিপোর্ট  এত খুঁটিয়ে পড়ছেন৷ নট আ ভেরি গুড সাইন স্যার। এরপর অফিসের আনাচেকানাচে গুজুরগুজুরফুসুরফুসুর শুরু হবে যে আপনার হাতে অঢেল সময়। গরীবের কথা বাসি হতে দেবেন না প্লীজ। জানবেন, অফিসের সিনিয়ররা সর্বক্ষণ শশব্যস্ত হয়ে ঘোরাঘুরি না করলে যে সমূহ ক্ষতি। 

- ভাগ্যিস তুমি ছিলে দত্ত। ভাগ্যিস তুমি ছিলে।

- আমি নগন্য ক্লার্ক স্যার। আপনারা রেখেছেন তাই আছি। না রাখলে বেমক্কা ভেসে যাওয়া। এ'টুকুই তো।

Tuesday, August 4, 2020

আসলি ওস্তাদ


- মুক্তিপণের টাকাটা পাওয়া গেল না মিস্টার শাসমল।

- বলেছিলাম তো নাটুবাবু। ব্যবসার যা অবস্থা, ব্যাঙ্কে অত টাকা থাকারও কথা নয়।

- কালোটাকাও কিছু নেই বলছেন?

- সে'খানেই কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন আপনি। আমার পরিবারের কাউকে সরিয়ে ফেলে আমার কাছে র‍্যানসম ডিমান্ড করলে আমি কিছু একটা ব্যবস্থা করলেও করতে পারতাম। আমার কালো টাকার হদিস তো অন্য কারুর জানার কথা নয়। 

- কাজটা যে কাঁচা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে তার মাশুল আপনাকেই গুনতে হবে।

- খুন করে লাশ পুঁতে ফেলবেন? ইয়ে, ইন দ্যাট কেস আই উড প্রেফার সায়নাইড ওভার বুলেট। তবে বন্দুক আপনার, মুলুক আপনার। তাই ডিসিশনও আপনার। আমি শুধুই রিকুয়েস্ট করতে পারি।

- খুন না করে উপায় কী বলুন।  যে লাইনে যা দস্তুর৷ মুক্তিপণ না পেয়েও যদি আপনাকে জ্যান্ত ফিরিয়ে দিই, নাটুগুণ্ডার ইজ্জৎ থাকবে ভেবেছেন? আর কোনও ব্যবসায়ী ভয়টয় পাবে? দরদাম করে মুক্তিপণ কমানোরও উপায় নেই, আমার ব্র‍্যান্ড ইকুইটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কী আর বলব মিস্টার শাসমল, কিডন্যাপিংয়ের জগতটায় আজকাল বড্ড কাটথ্রোট কম্পিটিশন। 

- কাটথ্রোট? হেহ্। ভারী চমৎকার বললেন কিন্তু।

- তবে আপনার জন্য সায়নাইডের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বুলেট হজম করতে হবেনা।

- ভেরি কাইন্ড অফ ইউ নাটুবাবু। তবে ইয়ে..।

- বলুন না, নিশ্চিন্তে বলুন। খুন, কিডন্যাপিংটা আমার ব্যবসা হতে পারে। কিন্তু তাই বলে ইমোশনে খামতি নেই। 

- সায়নাইডটা সার্ভ করবেন কী করে?

- ওই যে, একটা পুরিয়া। তা'তেই থাকবে ওই বিষ। সরবিট্রেটের মত মুখে পুরতেই..ফিনিশ।

- মুখে যদি পুরতেই হয় নাটুবাবু, তা'হলে আর সরবিট্রেট কেন। একটা ক্ষীরকদমে যদি..।

- বেশ তা'হলে পুরিয়াটা ক্ষীরকদমে পুরে..।

- আর তার সঙ্গে..।

- চাহিদা বেড়ে চলছে কিন্তু।

- বেশি নয় কিন্তু..মাইনর একটা ব্যাপার।

- বেশ। শুনি।

- ক্ষীরকদকম মুখে পোরার সময় ব্যাকগ্রাউন্ডে কিশোরকুমারের ওই গানটা..ওই যে..ফুলো কী রং সে। ওইটা চালিয়ে দেবেন প্লীজ। প্লীজ।

***

- আর তারপর শাসমলদা?

- তারপর আবার কী। নাটুগুণ্ডা এনে দিলে ক্ষীরকদম। তার মধ্যে মিশিয়ে দিলে ইয়াব্বড় সায়নাইডের বড়ি। আর একটা ব্লুটুথ স্পীকারে চালিয়ে দিলে কিশোরবাবুর ওই গান; ফুলো কী রং সে, দিল কী কলম সে, লা লাললা লা লা লা। 

- আর আপনি সেই সায়নাইড মেশানো ক্ষীরকদম খেলেন?

- চারপিস ভায়া। চারপিস। নাটুর তো চক্ষু চড়কগাছ।

- সায়নাইড মেশানো ক্ষীরকদম?  চারপিস? তবু মরলেন না?

- পাঁচনম্বর চাইতেই তো নাটুগুণ্ডা আমার পা জড়িয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলে। বললে; "ওস্তাদ, ক্ষমা করো। তোমায় চিনতে পারিনি"। তারপর যত্ন করে নিজের মারুতি ভ্যানে চাপিয়ে নাটু আমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল। ইনফ্যাক্ট সে'দিন থেকে সে নিয়মিত আমার বাজার করে দিয়ে যায়।

- নাটুগুণ্ডা আপনার বাজার করে? 

- নয়তো আর তোমায় বলবো কেন বলো। বাজার করে শুধু তাই নয়। সন্ধ্যেবেলা বৃষ্টি পড়লেই নাটু হাজির হবে এক ঠোঙা চপ আর দু'বাক্স ক্ষীরকদম নিয়ে। কত বলি আরে এ'সবের দরকার নেই রে নাটু৷ কিন্তু কে শোনে কার কথা। শাসমল ওস্তাদ বলতে নাটু এক্কেবারে অজ্ঞান৷ সে পাগলা বলে কী জানো? "আপনার থেকে যদি কেউ টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে গড়িমসি করে ওস্তাদ, তবে তার চামড়া তুলে গায়ে বিছুটি ঘষব"। বড় বেয়াড়া মেজাজ আমার নাটুর।

- আহ শাসমলদা, আমায় আবার নাটুর ভয় দেখানোর কী দরকার। আপনার ধারের টাকা সুদ সমেত সময়ের আগেই পেয়ে যাবেন। কথার নড়চড় হবে না।

- এই দ্যাখো কাণ্ড। তুমি কি ভাবলে আমি থ্রেট করছি? না হে। আমি পাতি ব্যবসায়ী। মাসে একবার তারাপীঠ যাই হে।  তোমার দরকারে না হয় দু'পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছি, তা নিয়ে তো আর আমার ঘুম নষ্ট হচ্ছে না। ওই, নাটুই শুধু মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নেয়, কোথাও টাকা বাকি পড়ল কিনা। এই আর কী। ও'সব টাকাপয়সার মায়া আমার নেই হে। নেই।

- ইয়ে, শাসমলদা। অতগুলো সায়নাইড ক্ষীরকদম আপনি হজম করলেন কী করে?

- গোপন কথাটা বলেই দিই। শোনো হে, প্রাণে কিশোরকণ্ঠ গ্রহন করতে পারলে সায়নাইড বিকল হয়ে যায় যে।

- কী?

- ওই যে। নাটুর ব্লুটুথ স্পীকারে কিশোরের 'ফুলো কী রং সে' শুনতে শুনতে ক্ষীরকদমে কামড় দিচ্ছিলাম! ব্যাস, গুরুর কণ্ঠ কান বেয়ে প্রাণে নামতেই জিভের সায়নাইড বাবাজী হয়ে গেল গ্লুকোজের গুঁড়ো। বুঝলে হে,আসলি ওস্তাদ একজনই; কিশোর!

- এ তো রীতিমতো গুল!

- আমি গুলবাজ? আমার থেকে এতগুলো টাকা ধার নিয়ে আমায় গুলবাজ বলা? আমি নরম মানুষ, আমি না হয় চেপে যাব। কিন্তু নাটু এ'সব গুলতানি সহ্য করেনা কিন্তু দিবাকর।

- চটবেন না শাসমলদা। চটবেন না।

- টাকা ফেরত দেওয়ায় গড়িমসি আর কিশোরে সন্দেহ, মোটে ভালো কথা নয়। কেমন?

Monday, August 3, 2020

প্ল্যানপ্ল্যানানি


- গত পুজোয় আমরা হিমাচল যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম৷ তাই না বউ?

- তাই তো। ট্রেনে দিল্লী। দিল্লী থেকে বাসে চেপে শিমলা।

- আর তারপর একটা প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে দু'হপ্তার ভ্রমণ। শিমলা, মানালি, রোটাং, কাজা, চিতকুল। আহা।

- তোমার ফ্যাক্টরির হইহইরইরই নেই৷ আমার স্কুলের গোলমাল নেই৷ অ্যাই, ওয়েলিংটন থেকে দু'টো জ্যাকেট এনেছিলে তুমি, মনে আছে? কত ভাবলাম হিমাচলের কনকনে শীতে ওই জ্যাকেট দু'টো কাজে লাগবে৷ 

- সে জ্যাকেট-জোড়ার কথা মনে থাকবে না আবার? বেশ ভালো দরে বাগিয়েছিলাম কিন্তু। আর টপ কোয়ালিটি।

- স্পিতি নদীর ধারে বসে ডিমসেদ্ধ আর ম্যাগি খাবো ভেবেছিলাম। তাই না গো বর?

- আর কাজা নামের ওই গ্রামটায় দিন-তিনেক গা এলিয়ে কাটিয়ে দেওয়া? সকালে হাঁটাহাঁটি? দুপুরে আমার গান শোনা আর তোমার বইয়ে মুখ গুঁজে বসে থাকা?

- আর সন্ধ্যেবেলা জমিয়ে গল্প আর তাস। তাই না গো?

- টাকাপয়সার সামান্য ইয়ের জন্য হিমাচল যাওয়া হল না বটে। কিন্তু যাই বলো, অমন জব্বর প্ল্যান ছকেও আরাম।

- বটেই তো৷ কেন, তার আগের পুজোয় সেই যে আন্দামান যাব ভাবলাম? সে'টা মনে নেই?

- মনে নেই আবার। সে তো গ্র‍্যান্ড প্ল্যান ছিল। তাই না গো বউ? প্লেনে পোর্ট ব্লেয়ার৷ সাতদিন লাটিয়ে জাহাজের ঘ্যামে ওয়াপিস কলকাতা।

- উফ। ভাবলেই থ্রিল। গায়ে কাঁটা।

- ট্র‍্যাভেল ম্যাগাজিনের সেই ছবিগুলো এখনও চোখে ভাসে জানো। আন্দামানের সেই নীল সমুদ্দুর...। আহা। দীঘার সমুদ্র সে নীলের কাছে পাতি চৌবাচ্চা।

- রাধানগর বীচ, হ্যাভলক, ভাইপার, নীল...।

- আহা। পোয়েট্রি। পোয়েট্রি। রাতের পর রাত আমরা গুগল ঘেঁটেছি। তাই না গো?

- রাতের পর রাত। আহা। সত্যিই। 

- সে'টাও তো গেল ভেস্তে। মাঝেমধ্যে মনে হয় বছরে একটা করে যদি লটারি পাওয়া যেত..।

- বছরে একটা বঙ্গলক্ষ্মী বাম্পার? বরকুমার, তা'হলে তার আগের পুজোয় লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনাটাও ভেস্তে যেত না গো। 

- আর তার আগের পুজোর রাজস্থান ট্রিপটাও...বানচাল হত না।

- আর তার আগের পুজোয়? তাত আগের পুজোয় কোথায় যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল করেছি আমরা?

- নাহ্। সে'পুজোর প্ল্যান ভোগে যায়নি গো৷ তখন তো আমাদের নন্দনে দেখা হচ্ছে প্রতি সন্ধ্যেয়।  অথবা মিলেনিয়াম পার্ক৷ 

- ও হ্যাঁ। সে বছর তো সদ্য আলাপ। আর চটজলদি হুজুগে পুজোয় বিয়ের প্ল্যান।

- ভাগ্যিস রেজিস্ট্রি বিয়েতে ট্রেনের টিকিট বা হোটেল বুকিংয়ের খরচটুকু ছিলনা। সেই পুজোর প্ল্যানটা তাই ভেসে যায়নি। কী বলো?

- হেহ্। এ'বার পুজোয় অবিশ্যি প্ল্যান ছকেও লাভ নেই। করোনা সে'সমস্ত ভাসিয়ে নিয়েছে।

- করোনা না থাকলেও যেতে পারতাম কই? একজোড়া সেল্ফিশ জায়্যান্টের মত দেশভ্রমণে বেরোলে, তোমার মায়ের ট্রিটমেন্ট আমার বোনের কোর্সফীর খরচ কে দিত?

- উম। তা ঠিক। কাজেই পুজোর ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যানটুকু অন্তত না করার কোনও মানেই হয়না। তাই না গো?

- শাবাশ ওয়াটসন! শাবাশ!

টাক আর কলপ

- এই যে। - উঁ। - আরে ও মশাই। - কী..কী? - চোখটা খুলুন না একবার। আরে ও মশাই। আর কত ঘুমোবেন।  - কে? কে? এই! কে রে ব্যাটা তুই?  -আমি...