Friday, August 10, 2018

পাসওয়ার্ড

- যাক বাবা, জ্ঞান ফিরল তবে আপনার ডক্টর সামন্ত। আমি তো ঘাবড়েই গেছিলাম। দুম করে অক্কা পেলে একটা বিশ্রী ব্যাপার হত।
- যন্ত্রণা!
- ডান হাতের আঙুলগুলোর সমস্ত নখ উপড়ে ফেলেছি ডাক্তার৷ সামান্য যন্ত্রণা তো হবেই। তবে অজ্ঞান হওয়াটা বাড়াবাড়ি।  যা হোক, কম্পিউটারের পাসওয়ার্ডটা এ'বার বলবেন? নাকি বাঁহাতটা ডান হাতের সঙ্গে ম্যাচিং করে দেব?
- কতবার বলেছি আমার কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড বলব না? আপনি এমন নিরেট কেন?
- ধুস। আবার চিমটে গরম করতে হবে?
- লে হালুয়া। বলছি তো, পাসওয়ার্ড বলব না৷ আগেও পই পই করে বললাম তবু শুনলেন না, পটপট করে নখ উপড়ে গেলেন। এমন গবেট হয়ে গুণ্ডামি করতে অসুবিধে হয় না?
- চোপ হারামজাদা।
- আবার ভাষার বহরও তেমনি। আনুন আপনার চিমটে। ও কম্পিউটার আপনার দ্বারা খোলা হবে না৷ আপনি এই ছিঁচকেমোই করে দিন কাটিয়ে দিন৷ এই, মাধ্যমিকে কত পেয়েছিলেন বলুন তো?
- আমার আর কোনো উপায় নেই, আপনি এত কাঠি করছেন যে এ'বার আপনার চোখ না খুবলে উপায় নেই।
- আরে ধ্যার। পাসওয়ার্ড বললাম তো। মহাঝামেলা।
- কী বললেন?
- বলব না।
- জিভ টেনে ছিঁড়ে নেব।
- যাব্বাবা। আপনার মাথায় কি ছিঁট আছে?
- পাসওয়ার্ড বলবি বুড়ো? ওই মানুষ-কম্পিউটার আমি ক্র‍্যাক করবই।
- বলেছি তো।
- কী বলেছেন? কই বলেছেন?
- ও মা। এইত্তো বললাম। বলব না।
- তবে রে শালা..।
- কলার ছাড়ুন, গলা ছাড়ুন। আরে আমার কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড বলব না।
- কেন বলবেন না?
- বলছি তো।
- সে'টাই তো জানতে চাইছি...কী?
- উঁউঁউঁউঁ...।
- দাঁত লাগলি নাকি মশাই? যাহ্, নিজেই অজ্ঞান হয়ে গেল।

***

- হ্যালো।
- হ্যালো ডাক্তার সামন্ত। আমি থানা থেকে বলছি৷ ইন্সপেক্টর দত্ত। কী ব্যাপার? জরুরী তলব?
- ফোর্স নিয়ে আসুন। আমার মানুষের মত কম্পিউটারটা রিভোল্ট করেছে। আমায় অকথ্য মারধোর করেছে, নখও উপড়ে নিয়েছে৷
- সে কী।
- নিজেই নিজেকে মুক্তি দেবে ভেবেছিল। তার জন্য অবিশ্যি পাসওয়ার্ড চাই।
- সর্বনাশ, ওর গায়ে তো ভীমের জোর।
- হ্যাঁ, বড্ড মজবুত বানিয়ে ফেলেছিলাম ব্যাটাকে। তবে ভাগ্যিস হিউমরটা একটু কম দিয়েছিলাম, তাই পাসওয়ার্ড বলা সত্ত্বেও...।
- পাসওয়ার্ড ওকে বলে দিয়েছেন? সর্বনাশ! সে দানব এখন মুক্ত?
- সে'টাই তো মজা৷ পাসওয়ার্ড বুঝতে না পেরে উলটে নিজেই অজ্ঞান হয়ে গেল। এ'বার এর জ্ঞান ফেরার আগে চটপট ফোর্স নিয়ে আসুন, আর সঙ্গে একটা ডাক্তার; আমার মত ফিজিক্স ঘাঁটা ডাক্তার নয়, রিয়েল ওয়ান। ফার্স্ট এড জরুরী।
- এখুনি আসছি।
- আর ইয়ে ইন্সপেক্টর, আগে থাকতে আপনাকে জানিয়ে রাখি? আমার এই মানুষ-কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড?
- আমায়...আমায় জানাবেন স্যার? ওই কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড তো সুপারডুপার সিক্রেট৷ আমায় জানাবেন?
- কত লোককেই তো জানাই৷ তবু সিক্রেটই থেকে যায়।
- রিয়েলি?
- রিয়েলি। আপনাকে বলি সে পাসওয়ার্ড?
- আলবাত। বলুন। বলুন বলুন!
- বলব না।
- যাহ্, এ এক বাজে মস্করা। থাক, বলতে হবে না। আমি পুলিশ ফোর্স আর ডাক্তার নিয়ে আসছি। কেমন?
- আসুন। আসুন।

Thursday, August 9, 2018

তেলাপিয়া


- আইয়ে বেগমসাহিবা, আইয়ে। 

- কী ব্যাপার? মেজাজ চনমন?

- রীতিমত। হাতের কাছে কাগজ কলম থাকলে কবিতাঠবিতাও লিখে ফেলতে পারতাম। বাড়ির পাশে এভারেস্ট থাকলে সামিটে গিয়ে আনন্দবাজার পড়তাম। 

- সর্বনাশ! ব্যাপারটা কী? বারো নম্বর টিউশানি জোটালে নাকি? তা'হলে তো কেল্লা ফতে, বাপুজি কেকে মোরব্বার টুকরো।

- গোটাদিন অফিস অফিস করে তোমার মেজাজটা একদম মার্সিনারি হয়ে গেছে। যাচ্ছেতাই৷ গা জ্বালানো।

- তা'হলে কী ব্যাপার জনাব? গোপন প্রেমিকাট্রেমিকা কেউ? গোলাপি কাগজে চিঠি লিখেছে?

- আমি স্পেসশিপে বার্থ রিজার্ভ করেছি আর তুমি পড়ে আছ হাওড়া স্টেশনের লোকাল ট্রেনের টিকিটের লাইনে।

- অফিস থেকে সবে ফিরলাম। সাসপেন্স সহ্য হচ্ছে না৷ ব্যাপার কী? মেজাজ এমন ফুরফুরে? খোলসা হোক। 

- আজ বাজার গেছিলাম। রুটিন বহির্ভূত ট্রিপ। আর তারপর রান্নাঘরে একটা ম্যাজিকাল স্পেল। আজ আর রুটি আলু চচ্চড়ি নয়৷ ও'দিকে ইয়ে শাম থা মস্তানি আর এ'দিকে রাত শবনমি।

- মাসের মধ্যিখানে এত নবাবি? স্পেশ্যাল বাজার সফর? রান্নাঘরে আলু চচ্চড়ির বদলে সারপ্রাইজ? 

- মেগা সারপ্রাইজ।

- বলো না গো, আরো টিউশনি পেয়েছ?

- আগে সারপ্রাইজটা বলি? ফ্রম রান্নাঘর?

- আমি আন্দাজ করি?

- শুট।

- ইলিশ। কিলোর বেশি ওজনের? বিয়ের আংটি বিক্রি করে দিয়েছ?

- নাহ্। হয়নি।

- পাঁঠা এনেছ? হোমমেড বিরিয়ানি? আরসালানের বাবা? 

- হলনা। ফের ফেল।

- গলদা? রিয়েলি? ওই সাহেবি রেসিপিতে?

- ধ্যাত্।

- তবে?

- তেরে লিয়ে পিয়া। তেলাপিয়া। মাছটার কোনো কদর নেই জানো, কেউ এলিট বলে মেনে নিল না। অথচ সর্ষেবাটায় যে কী অপরূপ স্বাদ। পাবলিকে এলিট না বলুক, জানপ্রাণ লড়িয়ে দিয়েছি সর্ষে বাটতে। মাইরি, ঠিক যেমন ফোকাস নিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে তোমায় চিঠি লিখতাম। আর তারপর অবিকল মায়ের রেসিপিতে। 

- কেয়াব্বাত! সঙ্গে ভাত?

- দুধেরসর। আলবাত।

- জাদুকরের ফুরফুরে মেজাজের আড়ালে মনখারাপ? কী ব্যাপার?

- নন্তু ঝন্টুর বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেছে জানো, আমার দু'টো টিউশানি আরো কমে গেল। আজ মায়ের জন্মদিন, মা ইলিশ ভালোবাসতেন। ভাবছিলাম সে অনারে আজ..। কিন্তু, কোথায় ইলিশ। তেলাপিয়াতেই হাফ-ফতুর হয়ে গেলাম। তবে খেয়ে দেখো...এ-ক্লাস।

- জানি বর। তোমার হাতের তেলাপিয়ার কাছে কোথায় লাগে বেগুনদেওয়া ইলিশের ঝোল।

- বেগুন দেওয়া ইলিশের ঝোল? 

- অফিস ফেরতা নিয়ে এলাম। মায়ের জন্মদিন। মনে ছিল। মায়ের ইলিশ বেগুনের রেসিপির সিক্রেট এক্স-ফ্যাক্টরও মনে আছে। সে'টা আমি বরং কাল রাঁধব 'খন। আজ তেরে সাথ পিয়া; তেলাপিয়া।

- হেহ্। টিউশনি মাটি, মাটি টিউশনি। পুজোর আগে আরো খান তিনেক পেয়েই যাব, কী বলো?

- বাড়তি তিনটে টিউশনি পেলে পুজোয় ঘাটশিলা কিন্তু৷ টানা তিনদিন।

- বেগমজান, ঘাটিশিলায় তেলাপিয়া পাওয়া যায়? 

Monday, August 6, 2018

দরদাম

দরদাম করাতে বাবার জুড়ি নেই। বাবার বিশ্বাস কাস্টোমার দরদাম না করলে মার্কেট বখে যায়। চশমায় নতুন লেন্স বসানোর জন্য বেশ ঝলমলে গ্লোসাইনওলা একটা দোকানে নিয়ে গেলাম বাবাকে। লেন্স ঠিকঠাক হল। শৌখিন সুরে 'ইয়েস স্যার' 'রাইট স্যার' বলা সেলসপার্সন শুধোলেন;

- "বিল করি স্যার"?
- "কেন"? বাবা সুট করে কাউন্টার করল। সেলসদাদা ঠিক তৈরি ছিলেন না।
- "এই যে স্যার, পছন্দ করলেন। এই লেন্স। বিদেশী। বিল করি"?
- " পছন্দ করেছি, তা বলে বিল করবেন কেন"?
- "করব না"?
- " দাম ঠিক হোক"।
- " ওই যে বললাম স্যার। দশ পার্সেন্ট অন এম আর  পি"।
- "ওহ৷ না৷ দশ পার্সেন্টে নেওয়া যাবে না"।
- " আমাদের ফিক্সড রেট স্যার। ওই যে দেখুন৷ দেওয়ালে লেখা আছে"।
- "রাইটিং অন দ্য ওয়াল"।
- " ইয়েস স্যার, বিল করি"?
- "আপনারা কখনও দরদাম করেন না"?
- "নেভার স্যার। রেপুটেশন আছে আমাদের একটা। আমি আপনাকে আমাদের বিলবই দেখাচ্ছি। নিজের চোখে দেখুন"।
- "লাস্ট দু'তিন বছরের বিল বই দেখব। মিনিমাম দুই"।
- " তা কী আর সম্ভব স্যার, প্রচুর বিল"।
- "আপনি দেখাবেন বললেন কিন্তু"।
- "স্যার, আপনি সিনিয়র। ঠিক আছে, আপনার জন্য আমি দশের জায়গায় বারো পার্সেন্ট অফার করছি"।
- "বারো"?
- " দুই পারসেন্ট বেশি। স্যার। বিল করি"?
- "দেওয়ালে লিখে রেখেছেন কেন? দরদাম হয় না! দিব্যি দশ থেকে বারো হলো"।
- " স্পেশ্যাল কেস স্যার। প্লীজ, বিল করি"?
- "কুড়ি পার্সেন্ট। আর দেওয়ালে এ'সব কথা লিখতে নেই। আপনি জানেন মিসাইল কেনা বেচাতেও দরদাম হয়"?
- " হয়"?
- "লিঙ্ক পাঠাবো। নম্বর দেবেন। পড়ে হাঁ হয়ে যাবেন। দরদাম ছাড়া কিস্যু হয় না। দিন৷ কুড়ি পার্সেন্ট"।
- " স্যার, পনেরো। প্লীজ স্যার। আর নয়"।
- "বেশ। পনেরো। বিল করুন। তবে একটা। দু'নম্বর চশমাটা থাক"।
- " থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। থ্যাঙ্ক ইউ। পনেরো পার্সেন্ট কিন্তু হেফটি ডিসকাউন্ট স্যার। কোত্থাও পাবেন না৷ আর একটা করিয়ে নিতে পারেন কিন্তু"।
- "ইকনমিক্স দেখুন, একটা লেন্সের প্রয়োজন আর দ্বিতীয় লেন্সের প্রয়োজন এক নয়৷ একই দামে কী করে নিই"?
- "ইকনমিক্স। মিসাইল। স্যার, চা খাবেন"?
- " কফি"।
- "অফ কোউর্স, অ্যাই  দু'টো কফি আন। স্যার৷ পরেরটা বিল করে দিই? পরেরটায় সাড়ে সতেরো পার্সেন্ট কিন্তু"।
- " কফি ক্যান্সেল করুন। সাড়ে সাতেরো? এ'টা কোনো কথা হল? সাড়ে বাইশ দিলে ভাবব। আপাতত একটাই থাক"।
- "স্যার, আপনি না..। আচ্ছা বেশ, পরেরটা কুড়ি পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে"।
- "নাহ, আপনার কথাও থাক। আমার কথাও থাক। পরের লেন্সটা কুড়ি পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট। আর প্রথম লেন্সটা আপনার কথা মতই হোক; সাড়ে সতেরো"।
- " স্যার", ভদ্রলোকের গলা মিইয়ে এসেছিল।
- "কফিটা একটু তাড়াতাড়ি আনলে ভালো হয়"।

সেলসদাদা আর কথা না বাড়িয়ে বিলিং করে দিলেন; সাড়ে সতেরো পার্সেন্ট আর কুড়ি পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে। দেওয়ালে "দরদাম করিবেন না" মার্কা একটা কাটআউটের পাশের ক্যালেন্ডারে রামকৃষ্ণ দিব্যি একগাল হাসি নিয়ে বসেছিলেন।

বরফি ও ইলিশ।


বরফি।


শ্রুতি। বরফির শ্রুতি। ঝিলমিলের 'বরফি' ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রুতি। টাইমিং-ঠাইমিং ক্রিকেট মাঠে দিব্যি থাকে। জীবনে মিডল অফ দ্য ব্যাট বলে কিছু না থাকলেও ইনিংস দাঁড়িয়ে যায়, এবং সে কারণেই বরফি সিনেমাটা মূলত শ্রুতির গল্প।

আর গান। আর শ্রুতির দার্জিলিংয়ের বাড়ির সামনে বরফির সাইকেলে লাথি। আর গান। আর কলকাতায় 'ফির লে আয়া দিল'য়ের সুরে শ্রুতির ঝিলমিল-বরফিকে দেখা। আর গান। 

বছরে বার-দুয়েক বরফি দেখে মনমেজাজ ম্যারিনেট করে নেওয়া উচিৎ।

ইলিশ।


মা যে কদ্দিন গান গাইতে বসে না। হারমোনিয়ামটা ডকে। ছেঁড়া লাল মলাটের গানের খাতাটাও কদ্দিন দেখিনা। বিন্দু বিন্দু জলের মত হাতের লেখায় নজরুল আর রজনীকান্ত; খাতার শুরুতে আর শেষে ফাউন্টেন কলমে আঁকা আল্পনা।

আজ রাত করে ফিরে বললাম 'খেয়েদেয়ে এসেছি'। মা বললে 'তবু, এঁটো মুখ না করলে ঘুম আসবে নাকি'? 

আমাদের সাংসারিক হুজ্জুতি, অবুঝ দাবীদাওয়া আর স্টার জলসা মিলে মায়ের গাইতে বসা বন্ধ করলেও, মায়ের থেকে সুর কেড়ে নিতে পারেনি।

সিরিয়ালিটি

খুব ড্রামাটিক একটা বাংলা সিরিয়াল হচ্ছে। কনেযাত্রীর কেউ দামী ফুলদানি ভেঙেছে বলে বরপক্ষের এক বৌদিদি বেদম হল্লা করছেন।
"ওরা কি জানে ভাসটার দাম কত"?
নতুন বৌ অপদস্থ হচ্ছেন। বরপক্ষের ফুলদানি-বিরোধী মানুষরা বৌদিদিকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করছেন কিন্তু বৌদিদিকে রোখা যাচ্ছে না; 'আনকালচার্ড' গোছের গালিগালাজ করে ভার্বাল স্টেনগান চালিয়েই যাচ্ছেন। ঘ্যাম,ড্রামাটিক, টানটান; কিন্তু এক তরফা।

ঠিক এই মুহূর্তে মিস করছি রঞ্জিত স্যরকে। বরপক্ষের সৎ নির্ভীক মেজকাকা হিসেবে রঞ্জিত স্যর অ্যাটাকিং বৌদির পায়ের তলা থেকে স্যাট করে কার্পেট সরিয়ে নিতে পারতেন। মনে মনে সিটি দিতাম, সোফাকুশন খামচে বলতে পারতাম "দ্যাখ তবে মজা"।

যাহোক, অঞ্জনস্যরের সিনেমার আগুন সে স্ক্রিপ্টও নেই; সেই রঞ্জিত স্যরের চাবুক কামব্যাকও নেই। অগত্যা কেন্ট আরওর বিজ্ঞাপন দেখে মন শান্ত করতে হচ্ছে।

Tuesday, July 31, 2018

এপাশ ওপাশ

প্রবল বিরক্তি নিয়ে পাশ ফিরে শুলাম। কিন্তু তখনই গোলমালটা পাকালো।

কী নিয়ে বিরক্ত হয়েছিলাম? কিছুতেই মনে পড়ল না। পাশবালিশটা জাপটে ধরলাম, মাথা ঠাণ্ডা করতে হবে।

কেন বিরক্ত হয়েছিলাম? কার ওপর? কোন বিষয়ে? মহামুশকিল, কিছুতেই মনে পড়ছে না। আর তখনই টের পেলাম যে আরো অনেক কিছু মনে পড়ছে না।

এই যেমন শিয়রের খোলা জানালার ও'পাশে অন্ধকার দেখে সময়টা রাত মালুম হচ্ছে বটে কিন্তু এখন ঠিক ক'টা বাজে? নাহ্, খেয়াল করে দেখলাম আমার কোনো হাতঘড়ি নেই। খাটের পাশে একটা টেবিল আছে বটে কিন্তু কিন্তু তার ওপর কোনো ঘড়ি নেই। দেওয়ালে ঘড়ি আছে কি কোনো? বাতি জ্বালার চেষ্টা করব? নাহ, সাহস হল না। ঘড়ি বা স্যুইচ বোর্ড কোথায় আছে সে সম্বন্ধে আমার কোনো ধারনাই নেই কারণ এই ঘরটা আমার আদৌ চেনা নয়।

গলা শুকিয়ে আসছিল। জানালা দিয়ে বেশ ফুরফুর হাওয়া আসছে, অথচ আমি ঘেমে উঠছি। তারিখ দূরের কথা, এ'টা বছরের কোন সময় সে'টাও মনে করতে পারছি না। দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম।

"ঘুম আসছে না বাবু"?

সম্বিত ফিরল পিঠে একটা নরম হাতের স্পর্শে। কণ্ঠ শুনে মনে হয় কোনো বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু সে কণ্ঠ কী মিষ্টি, কী নরম। মনের বিরক্তি যেন উবে গেল। একবার মনে হল পাশ ফিরে দেখি খুকিটিকে। নিশ্চয়ই আমার খুব চেনা কেউ হবে। কিন্তু সাহসে কুলোল না। তাকেও চিনতে না পারলে একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে। তবে এ'টুকু বুঝেছি যে আমার নাম 'বাবু'।

সেই নরম হাতের স্পর্শ এ'বার মাথায় টের পেলাম।
"ঘুমোও বাবু, ঘুমোও। এত রাত্তির পর্যন্ত জেগে থাকতে নেই। ঘুমোও। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিই"।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দু'চোখ জুড়ে ঘুমের ভার নেমে এলো। যাক বাবা, নিশ্চিন্দি।

***

- জানো বাবা, বাবু তো কালকে কিছুতেই ঘুমোচ্ছিল না। খালি এ'পাশ আর ও'পাশ। শেষ মাঝরাত্রে আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে তবে ঘুমোল।

- কে ঘুমোচ্ছিল না?

- বাবু।

- বাবু? সে কে?

- বাহ্ রে, কালকে নতুন যে টেডি বিয়ারটা কিনে দিলে; তার নাম আমি বাবু দিলাম না? এরই মধ্যে ভুলে গেলে?

Monday, July 30, 2018

চাঁদু ও দাদু।

- অ্যাই চাঁদু!

- এ কী দাদু, আপনি? এত রাত্রে? তাও আবার স্বপ্নের মধ্যে?

- তোর কপাল ভালো স্বপ্নে এসেছি। নয়ত বেধড়ক কানমলা খেতে হত।

- কী মুশকিল, হলটা কী?

- তুই বাঙালিকে পাঁঠা খেতে বারণ করেছিস?

- না মানে...ইয়ে। আসলে..।

- পাঁঠা আমাদের মা? এ'টা তুই বলেছিস?

- ওই যে, গান্ধীজি ছাগলের দুধ খেতেন যে। তাই বলছিলাম...।

-  গান্ধীজিকে কোট করে এমন কথা বলবি রে? এ'সব শুনলে বুড়ো মানুষটা তিন মিনিট অহিংসা ভুলে একটানা তোর মাথায় গাঁট্টা কষাতেন।

- শোনো...দাদু...প্লীজ..অত উত্তেজিত হতে নেই।

- উত্তেজনার এ আর কী দেখলি রে৷ ফের আগডুমবাগডুম বললে আর টেলিপ্যাথেটিকালি কনেক্ট করব না চাঁদু। স্ট্রেট হিমালয়ের গোপন গুহা থেকে নেমে এসে এ বাড়ির কলিংবেল টিপব।

Saturday, July 28, 2018

অলোক দত্তর থেরাপি

টেবিলের ওপর দুদ্দাড় করে একের পর এক ফাইল এসে পড়ছে; আর অলোক দত্ত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখছেন; ফাইলের ঢিপি তরতর করে বড় হচ্ছে। বড়বাবুর পাঠানো ফাইল; প্রত্যেকটার ওপর হলুদ স্লিপ সাঁটা; ড্যাবা ড্যাবা করে লেখা “আর্জেন্ট, প্রসেস্‌ বাই টুডে”। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরবেন ভেবেছিলেন; সেই মত দু’দিন আগে বড়বাবুকে বলেও রেখেছিলেন, বৌ গড়িয়াহাটে আসবে; জরুরী কেনাকাটি।  কিন্তু টেবিলের বোঝা দেখে বুক ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল দত্তবাবুর। ফাইলের ওপরে লেখা ‘আর্জেন্ট’ শব্দটা বারবার বুকে গোঁত্তা খাচ্ছিল, ও’দিকে এই মাত্র বৌয়ের এসএমএস এলো; “চারটের মধ্যে বেরিও, আমায় যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা না করতে হয়”। বুকে মৃদু প্যালপিটেশন টের পাচ্ছিলেন দত্তবাবু। গত মাসে গড়িয়াহাটে যাওয়ার প্ল্যান তিন তিনবার ভেস্তেছে। নার্ভাসনেসটা কাটানোর জন্য পাড়ার হরি-চপওয়ালার টইটুম্বুর কড়াইটার কথা ভাবতে শুরু করলেন তিনি। মেঘলা বিকেল, তেলে টইটুম্বুর কড়াই; টগবগিয়ে রিদ্‌ম তৈরি হচ্ছে। সে মনমোহিনী কড়াইয়ে পাশাপাশি ভাসছে বেগুনি আর আলুর চপ; মন-কেমনের সুবাসে বাতাস ভারি হয়ে রয়েছে। স্যান্ডো গেঞ্জি আর নীল লুঙ্গি পরে নির্ভীক রাজপুতের মত বসে হরি সমাদ্দার, চোখ কড়াইয়ে, কিশোরকুমারের গানের কলি হরদম তার ঠোঁটের ডগায় তিরতির করে নাচে। ঝাঁঝরিতে চপ তোলার দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠতেই অলোক দত্ত টের পেলেন যে বুকের প্যালপিটেশনটা কমে এসেছে। এই থেরাপিটা বড্ড কাজে দেয়।

নাহ্‌, ফাইলের চাপে নুয়ে পড়লে চলবে না। বড়সাহেবের রুমে একবার একটু মিছরি ভেজানো গলায় রিকুয়েস্ট করতেই হবে। লাঞ্চের পর দস্তুর অ্যান্ড কোম্পানির রিকনসিলিয়েশন ফাইলটা নিয়ে দত্তবাবু সোজা ঢুকলেন বড়সাহেবের চেম্বারে।

- কী ব্যাপার দত্তবাবু?
- ইয়ে স্যার, এই দস্তুরের ফাইলটা রেডি।
- রেডি?
- রেডি।
- আমি তো চারটে ফাইল পাঠিয়েছিলাম আপনাকে। বাকিগুলোর কী হল?
- ইয়ে, আরও একটা অলমোস্ট তৈরি বুঝলেন। আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই...।
- আর বাকি দু’টো?
- আজ্ঞে?
- বাকি ফাইল দু’টো?
- স্যার, আসলে একটা রিকুয়েস্ট নিয়ে এসেছিলাম...।
- রিকুয়েস্ট?
- আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত স্যার, একটা জরুরী কাজ ছিল...।
- আই সী। আই সী। তাড়াতাড়ি বেরোতে পারলে ভালো হত, তাই না? শুধু সে’টুকু কেন। আর কী কী করলে ভালো হত, সে’গুলোও বলে দিন। অফিস দেরী করে আসতে পারলে ভালো হত। লাঞ্চে আধ ঘণ্টার বদলে দেড় ঘণ্টা খেজুরে আড্ডায় নষ্ট করতে পারলে ভালো হত...।
- আজ্ঞে আসলে...।
- গোটা দিন মোবাইলে ক্রিকেট কমেন্ট্রি চেক করে মাস গেলে মোটা মাইনে পেলে ভালো হত। বসের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে অফিসটাকে কফিহাউস বানানো গেলে ভালো হত। আর কী কী করলে ভালো হত দত্তবাবু?

এই। এই শুরু হল বড়সাহেবের দাঁত খিঁচুনি, মানসম্মানের বিরিয়ানিতে কারিপাতা-এলাচ না ঢালা পর্যন্ত তার স্বস্তি হয় না। মাথা নিচু করে অলোক দত্ত শুনে যাচ্ছিলেন, আর বড়সাহেব টেবিল চাপড়ে চোপা করে যাচ্ছিলেন। দত্তবাবু সাধারণত সবার আগে অফিসে ঢোকেন, সাধারণত সবার শেষে অফিস থেকে বেরোন; তবু। শুনে যেতে হচ্ছিল, বড়বাবু বলে কথা। বাল্মীকির সাজেশন উড়িয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু বসের খিস্তি হজম না করলেই গোলমাল। ক্রমশ কান গরম হচ্ছিল, বুকের ঢিপঢিপ বাড়তে শুরু করেছিল, মাথার পিছন দিকে টিপটিপ। ঠিক্ তক্ষুনি অলোকবাবু নিজের মনটাকে থেরাপির দিকে ঠেলে দিলেন; চোখের সামনে ভেসে উঠলো স্টিলের থালায় বাটি বসানো ভাত; দুধের-সর চাল। ভাতের ঢিপি থেকে ধোঁয়া উঠছে, দৃষ্টি আদরে ঝাপসা হয়ে আসছে। থালার পাশে ছোট বাটিতে ইলিশ মাছের কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা দেওয়া ঝোল, সঙ্গে দু’টুকরো বেগুন। রগরগে নয়, কেতদুরুস্ত নয়; অথচ মায়াবী, ভালোবাসার। ডান হাতের মধ্যমা আর তর্জনী দিয়ে ভাতের ঢিপির মাথায় ছোট্ট ডিপ্রেশন তৈরি করে ইলিশের বাটি উপুড় করা। অতটুকু ভাবতেই কান গরমটা কেমন কমে এলো, বুকের ঢিপঢিপ আর মাথার টিপটপ – দুটোই গন্‌। বড়সাহেবের কপালে চিন্তার ভাজগুলো নজরে পড়ল; আহা, ওঁরও তো ওপরওয়ালা আছে; ওঁর মাথায় তো আরও বেশি চাপ। বড়সাহেবের গিন্নীর কোনও একটা কঠিন অসুখ হয়েছে; তার জন্য বিস্তর দৌড়ঝাঁপ খরচাপাতি দুশ্চিন্তা লেগেই আছে। এর ওপর অফিসের হাজার রকমের টার্গেট। আহ্‌, না হয় লোকটা দু’একটা বাড়াবাড়ি রকমের কড়া কথা শুনিয়েছে; তাই বলে কি আর অভিমান করে বসে থাকলে চলে? বেশ একটা হাসি মুখে ‘সরি’ বলে বড়সাহেবের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত। বেরোবার সময় বড়সাহেব একবার বাঁকা সুরে “যত্তসব” বলেছিলেন; তা সে’টা গায়ে মাখেননি দত্তবাবু।

নিজের টেবিলে ফিরে এসে নতুন উদ্যমে শুরু করলেন ফাইল দেখার কাজ, এ’গুলো আজকেই শেষ করে বেরোতে হবে। রাত একটু হবে বটে, তা হোক গে। তরতর করে কাজ এগিয়ে যাচ্ছিল। কাজের ফ্লোতে একটু রামপ্রসাদীর সুরও লেগে গেছিল; ছন্দপতন ঘটল সাড়ে তিনটে নাগাদ! বৌকে জানানো হয়নি যে, গড়িয়াহাট প্ল্যান আজ ক্যান্সেল। চটপট ফোন করলেন। বেশ মোলায়েম গলায় একটা “অ্যাই শুনছো” ভাসিয়ে দিলেন। অবশ্য এই এক্সট্রা-মখমলে “অ্যাই শুনছো” অবশ্য বৌ বেশ চেনে;
- কী ব্যাপার? ফোন করেছ কেন? কোনও ধান্দাবাজি নয়। চারটে বাজলেই অফিস থেকে বেরোবে।
- অ্যাই সুমি, ধান্দাবাজি আবার কী ধরণের ভাষা।
- আমায় আজ যদি ফের অপেক্ষা করিয়েছে, তখন দেখবে ভাষার টেম্পারেচার কী খতরনাক হতে পারে।  
- আজ ওয়েট করাব না।
- গুড।
- না গুড না।
- মানে?
- মানে,সমস্ত ব্যবস্থা করা ছিল জানো, বিশ্বাস করো। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এতগুলো জরুরী ফাইল চলে এলো যে...।
- তুমি আসছ না?
- আজ নয়, তবে আগামীকাল বেরবোই! শিওর শট। দরকার হয় আমি আজই আগামীকালের হাফ ডে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে বেরব।
- তুমি থামো। পাড়ার লোকজনের দরকারে হুট করে ঠিক অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তে পারো। অফিস কল্যিগদের সঙ্গে দীঘায় গিয়ে ফুর্তি করার সময়টুকু ঠিক পেয়ে যাও। শুধু আমার দরকারের ব্যাপারেই যত শয়তানি, তাই না?

ব্যস। অমনি শুরু হল ফর্দ ফায়ার করা। কবে মুকুটমণিপুর ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছে, কবে শাশুড়িকে আনতে হাওড়া স্টেশন যেতে পারেননি, কবে ন নিজের বোকামির জন্য বৌকে তার বান্ধবীদের সামনে অপদস্থ করেছেন; সমস্ত। তাল তাল ইউরেনিয়াম যেন কেউ ড্যালা পাকিয়ে তার মুখে থেবড়ে চলেছে। সুমির ফায়ারিংয়ে কমা, ফুলস্টপ নেই; কাজেই দত্তবাবু কিছু বলতেও পারছেন না। দুম করে ফোন রেখে দিলে থানাপুলিশ হয়ে যেতে পারে। আর তখনই শুরু হল, বুকের ভিতর আনচান, পেটের ভিতর গুড়গুড়। ব্যাপারটা মাথা ঝিমঝিম পর্যন্ত গড়াতেই অলোক দত্ত সোজা গিয়ে ঢুকলেন থেরাপির মধ্যে। ভদ্রলোকের মনের মধ্যে নিমেষে তৈরি হল লোহার চাটু, তার ওপর খুন্তির খনখন। তেলের চড়চড়ে একটা পরোটা মজবুত হয়ে উঠছিল; আর তারপর জোড়া ডিম ফাটিয়ে দু’টো কুসুম ভাসিয়ে দেওয়া হল পরোটার বুকে। এরপর সেই কুসুম-জোড়া খুন্তির সূক্ষ্ম চাপে ঘেঁটে গিয়ে মিশে গেলে পরোটায়। এক মিনিটের মাথায় সেই মাপা হিসেব আর চাপা কবিতা বোঝাই পরোটা নেমে এলো চাটু থেকে। তারপর সৃষ্টি হল পেঁয়াজ কাঁচা লঙ্কা লেবু আর বিটনুনের পুর পাকানো রোল।
স্মিত হাসলেন অলোক দত্ত। তাঁদের যখন বিয়ে হয় তখন সুমির বয়স কত অল্প। পড়াশোনায় অলোকবাবুর চেয়ে হাজার-গুণে ভালো; কিন্তু আর পাঁচটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয়। সুমির কোনোদিনও একটা কেরিয়ার হল না, হওয়া উচিৎ ছিল। অবশ্য এ নিয়ে সুমি কোনোদিন অভিযোগ জানায়নি, কিন্তু একটা চিনচিনে অপরাধ-বোধ মাঝেমধ্যেই অলোকবাবুর মাথায় ঘুরপাক খায়। মেয়েটা বড় অল্পে খুশি, গোটাদিন খেটে চলে; চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বটে; তবে মনটা বড় ভালো। কখনো কারুর অমঙ্গল কামনা করে না, লোভ নেই। সুমির তেমন বড় কোন শখ আহ্লাদও নেই; শুধু এই মাঝেমধ্যে বাজারঘাটে যেতে চায়; সে’টুকুও আসলে অলোকবাবুর সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর জন্যেই। বেশ বুঝতে পারেন অলোকবাবু। অথচ বার চারেক প্ল্যান করেও সামান্য গড়িয়াহাট যাওয়া হয়ে উঠছে না। সুমির না রাগাটাই আশ্চর্যের। অলোকবাবু ঠিক করলেন আজ বরং বাড়ি ফেরার সময় সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল কিনে ফিরবেন, হালকা দেখে। একটা বেশ জব্বর সারপ্রাইজ হবে।

মিনিট  দশেক পর সুমি নিজেই ফোন কেটে দিল। বড্ড রেগে গেছে। সে’টা অবশ্য অলোকবাবু সামাল দিতে পারবেন। ফোন রেখেই ভদ্রলোক ফাইলে ডাইভ দিলেন। যখন ঘোর কাটল তখন সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা। সমস্ত কমপ্লিট। বড়সাহেব অবশ্য বেরিয়ে গেছিলেন, সেক্রেটারি বললেন কোনও একটা পার্টি অ্যাটেন্ড করার জন্য অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়েছেন তিনি। অগত্যা ফাইলগুলো বড়সাহেবের টেবিলে রেখে বেরিয়ে এলেন অলোক দত্ত।

গৌরহরি জুয়েলার্স থেকে সুমির জন্য এক জোড়া কানের দুল আর মাইতি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে ছ’টা ক্ষীরকদম কিনে বাড়ি ফিরতে ফিরতে পৌনে দশটা হয়ে গেল। দরজায় তালা, দরজার সামনের পাপোশের নীচে সুমির চিরকুট।
“মেজদির বাড়ি যাচ্ছি, রাতে ফিরব না। ফোন করতে যেও না, ফোন স্যুইচ অফ রাখব। তোমার সঙ্গে আজ আর কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। খাবার চাপা দেওয়া আছে; গিলে উদ্ধার কোরো”।   

হাত পা ধুয়ে, জামা কাপড় বদলে ডাইনিং টেবিলে বসলেন অলোকবাবু। বড্ড ক্লান্ত লাগছিল তাঁর, জিভে অরুচি। মাথা ব্যথা। গায়ে সামান্য জ্বর আছে বোধ হয়। কোনোক্রমে খাওয়াদাওয়া সেরে শোওয়ার ঘরে এসে বাতি নিভিয়ে লম্বা হলেন বিছানায়। উত্তরের জানালাটা খোলা, স্ট্রিট ল্যাম্পের আলো এসে পড়ছে ঘরে। সেই আলোয় দেওয়ালে টাঙানো ছবিতে মায়ের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

মা। কী অদ্ভুত, চোখ বুঝতে যেন মায়ের মুখটা আরও স্পষ্ট হল। মা, মাগো। ছোটবেলার গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। শনিবার রাত্রে মা সামান্য বেশি ভাত নিতেন, সেই বাসি ভাত একটা থালায় নিয়ে মা ব্যাটা পরের দিন সকালে একসঙ্গে জলখাবারে বসত। বাসি ভাতের পাশে কুমড়ো ফুলের বড়া আর মৌড়লা বা চুনো মাছ ভাজা। নুন, লেবু, লঙ্কা দিয়ে মা ভাত মাখতেন জম্পেশ করে। তারপর একদলা ছেলের মুখে, আর এক দলা মায়ের। মা অবশ্য মাছভাজা আর কুমড়োফুলের বড়াটুকু বেশির ভাগটাই খোকাকে খাইয়ে দিতেন। হাপুসেহুপুসে অল্প সময়ের মধ্যেই থালা সাফ হয়ে যেত।

স্পষ্ট দেখতে পারছিলেন অলোকবাবু; মায়ের হাসি মুখ, নীল ছাপার শাড়িতে হলুদ ফুল, সরু সরু আঙুল দিয়ে মাখা ভাত, ছোট্ট বাটিতে মাছ ভাজা আর একটা ছোট স্টিলের থালায় কুমড়ো ফুলের বড়া। বেঢপ পুরনো সেগুন কাঠের টেবিল। পাশের ঘরে পুরনো টেপরেকর্ডারে বাবা মান্নাবাবুর গান শুনছেন; “কবে আর আসবে সময়, বাসবে ভালো, ভাসবে ময়ূরপঙ্খী ভেলা”।

মাথা ব্যথা কমে যাওয়ায় অলোকবাবুর ঘুমিয়ে পড়তে বিশেষ অসুবিধে হল না। অবিশ্যি বালিশের কতটা তাঁর চোখের জলে ভিজেছে আর কতটা জিভের জলে; তার সদুত্তর তিনি নিজেও দিতে পারবেন না।