Wednesday, July 1, 2020

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই?

- ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি?

- ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?

- এইচ দত্ত। ওহ, সরি। সরি। আসলে..।

- বাড়ির নম্বর কিছু আছে?

- বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন।

- গুলিয়েছেন।

- গুলিয়েছি?

- এক্কেবারে।

- আসলে গুগল ম্যাপ ধরে..।

- ম্যাপকানা হয়ে অলিগলিতে ঢুকলে ওই হয়। ঝাড়া আড়াইশো মিটার পিছিয়ে গিয়ে শনিমন্দির পড়বে। সে'টার বাঁদিকের গলিতে ঢুকে ডান হাতের চার নম্বর বাড়ি।

- থ্যাঙ্কিউ।

- ও মা! কড়াইয়ের মাছ পোড়া লাগল বোধ হয়...।

**

ঘাটে এসে গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করল নির্মলের। শেষ বিকেলের রোদ্দুর নরম হয়ে এসেছে। ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে পছন্দসই একটা জায়গা দেখে জলে গোড়ালি ডুবিয়ে বসল সে। প্যান্টে শ্যাওলার দাগ বসে যাবে, যাক গে। আজ গায়ে বুকে বড় নিবিড় ভালোলাগা লেগে আছে। 

পকেট থেকে বাদামের প্যাকেটটা বের করে ডান হাতের মুঠোয় কয়েকটা নুনমাখানো বাদাম ঢেলে নিয়ে সামান্য গুনগুন শুরু করল নির্মল। 

বুকের ভিতরটা কেমন তিরতির করছিল, ওই ভালোলাগায়। সুমির সংসার; সে এক জমকালো ব্যাপার।
সুমির রান্নাঘরের কড়াইতে মাছ।
সুমির কোমরে গোঁজা শাড়ির আঁচল।
সুমির থুতনিতে ঘামের দানা।

দেখে প্রাণ ভরবে না কেন?  আর কেউ না জানুক, নির্মল তো জানে; তাঁর বুকে হিংসের একটা ফোঁটাও নেই৷ মাকালীর দিব্যি কেটে সে বলতে পারে। 

কী বিচ্ছিরি পাগলামি যে আজ হঠাৎ মাথায় চেপে বসল! যাক, সে পাগলামীর বশে এদ্দিন পর দেখা তো হল। ক্ষণিকের কথাবার্তা, এ দাড়িগোঁফে ঢাকা বাউণ্ডুলে চেহারা সুমি চিনতে পারবেনা; এ'টুকু ভরসা ছিল। নাহ্, সুমিকে কোনওভাবেই বিরক্ত করা চলবে না।

সুমি যে কী ভালো। কী ভালো। এই যে গায়ে মুখে লাগা শেষ বিকেলের আলো আর পা ভেজানো নদীর জলের মিঠে শিরশির; আর দু'টো মিলেমিশে এই যে মনঅবশ করা ভালোলাগা - সুমি তার চেয়েও ভালো। 

চারদিকে কতশত মনকেমন করা ভালো; সঞ্জীবের বইতে রাখা ভোরের শিউলি ভালো, জলপটিতে মায়ের হাতের ওমটুকু ভালো, খিদেপেটে গরম ভাতের গন্ধ ভালো ।  আর সে'সমস্ত ভালো মিশলে যে কান্না; সুমি সে'খানে।

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; নির্মলের অল্প হাসি পায়। 

**

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন; যত্তসব!

সাজানো ঠিকানার অছিলায় দেখা করতে আসায় দোষ নেই, আর কড়াইতে মাছের মিথ্যেটুকুতেই যত পাপ? মোটেই না। সুমি জানে, পাপ নেই তাতে। 

এদ্দিন পর যে লুকিয়ে দেখা করতে আসে, তার সামনে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলা যায় নাকি? সুমি জানে, যায় না।

নির্মলের সাহস না থাক, এক ফোঁটা হিংসুটেপনাও কি থাকতে নেই? 

**

(পুনশ্চঃ হটস্টারে "আরিয়া" ওয়েবসিরিজটি দেখলাম। এ লেখার সঙ্গে অবশ্য সে সিরিজের কোনও যোগাযোগ নেই। তবে 'বড়ে অচ্ছে লগতে হ্যায়' গানটা মনের মধ্যে নতুন করে দাগ কেটে গেল। এই আর কী)

খুনখারাপি আর মামলেট


 - ব্রাদার, একটু অপেক্ষা করা যায় না?

- চোপ শালা। বন্দুকের ছ'টা গুলিই গেঁথে দেব মুণ্ডুতে..।

- অপচয় করবে কেন? একটা গুলিতে যদি খেলখতম করা যায়, তা'হলে বাকি পাঁচটা নষ্ট করার কোনও মানে হয়?

- এই! মাইরি! বলছি...।

- ভাতের দানা হোক কি বুলেট। অপচয় দেখলেই বুকে বড় বাজে।

- কপালে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে রেখেছি, তারপরেও এত ফটরফটর? আচ্ছা ত্যাঁদড় মাল মাইরি।

-  আমার বাপ, আমার অঙ্কের মাস্টার, আমার মায়া। সবার মুখেই আজীবন ওই এক কথা শুনেছি। আমি নাকি রাম-ত্যাঁদড়। তা ও'টাকে আমি কম্পলিমেন্ট হিসেবেই ট্রীট করি বুঝলে হে। কোনও কিছু একটু না বাজিয়ে আমি এক্সেপ্ট করতে পারিনি কোনওদিনই। 

- মায়া কে?

- আমার স্ত্রী। ওই যে..।

- কে? কে? কে ওখানে?

- আরে ধুর ধুর। এই কলজে নিয়ে মার্ডার করতে নেমেছ? লাশ নামানো কি অতই সস্তা? ও'দিকে কেউ নেই হে। ওই দেওয়ালের ছবিটা দ্যাখো। ওই যে। মায়ার ছবি। সে ফাঁকি দিয়ে সুট্ করে সরে পড়েছে অনেক আগে। মায়ার মত মেয়ে হয় না গো ব্রাদার। এই যে তুমি অসময়ে এলে, শুকনো মুখে তোমার সে কিছুতেই বসে থাকতে দিত না। ঘরে আর কিছু না থাকলে দু'টো ডিম অন্তত চট করে ভেজে দিত। আর কফি। আহা, মায়ার হাতের কফি ভায়া..প্রতি চুমুকে ইউরেকা। 

- ধুত্তোরি। তখন থেকে ভ্যাজরভ্যাজর। 

- তুমিই তো চান্স দিচ্ছ ব্রাদার। বন্দুক বাগিয়ে ঢুকেছ৷ সোজা ঠাই ঠাই চালিয়ে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। তা না করে যেই না ওই বাতেলা ঝাড়া শুরু করেছ তখনই বুঝেছি...স্কিলে খামতি আছে। তা এতক্ষণ যখন গালগল্প হলই, আর মিনিট দশেক দেবে নাকি? ব্রাদার?

- কোনও চালাকি নয় কিন্তু...খুব সাবধান।

- চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য ইয়ে হয়না। শোনোনি নাকি?

- দু'মিনিট দেব। তার বেশি নয়।

- পাঁচে রফা কর ভায়া। উইন উইন।

- আমি ঘড়ি দেখছি,  পাঁচ মিনিট পরেই কিন্তু..।

- ঢিশুম। জাস্ট ফাইভ মিনিটস।

- কী হবে পাঁচ মিনিটে?

- পেঁয়াজ কুচোতে গেলে দেরী হয়ে যাবে। মামলেটের বদলে বরং পোচ করে আনি। আর ফ্লাস্কের কফি। 

- খাওয়ার শখ?

- আরে আমার জন্য না। ওই যে বললাম। মায়া নেই বলে তুমি শুকনো মুখে কেটে পড়বে। সে'টি হচ্ছে না। মায়ার খারাপ লাগবে। সে মরে গেছে বটে, কিন্তু উবে তো যায়নি। 

- দত্তবাবু। আমায় আর নার্ভাস করবেন না প্লীজ। আপনাকে খুন করাটা অত্যন্ত জরুরী।

- হাজরা পাঠিয়েছে? 

- আজ্ঞে। সোয়া লাখ পাবো। টাকাটার বড্ড দরকার।

- এ জন্যেই হাজরার মত বিজনেস রাইভাল আমার দু'চোখের বিষ। আর খুন করাবি করা, আমাদের ব্যবসার লাইনে এ'সব একটু না করলে চলবে কী করে৷ কিন্তু তাই বলে আমায় খুন করার রেমুনারেশন সোয়া লাখ? তুমিই বলো ব্রাদার, আমি কি অতই মামুলি?

- আজ্ঞে?

- হাজরা কী ভেবেছে। শুধু বিজনেস টার্নওভারে মেপে নিমাই দত্তের তল পাবে? হাজরা জানে যে নারায়ণ দেবনাথের কমিস্কের ব্যাপারে আমার চেয়ে বড় এক্সপার্ট গোটা দেশে নেই? জানে ও? ও জানে যে যে সতেরোটা ডায়েরী বোঝাই হয়ে আছে আমার লেখা গান? সে গানে সুরও নিজে বসাই আমি? ও জানে? রোজ রাত্রে হারমোনিয়াম নিয়ে ছাতে উঠে আমি নিমাইসঙ্গীত গাই! ব্যবসার খাতিরে খুন করছিস কর, তাই বলে সোয়া লাখের বিনিময়ে আমায় নিকেশ করবে? আটকালচারড ব্রুট কোথাকার। 

- আজ্ঞে দত্তবাবু, আমি ছাপোষা খুনি। ও'সবের আমি কী বুঝি বলুন। 

- ও মা। নারায়ণ দেবনাথ না বুঝলে চলবে কেন?

- খুনটা আমায় করতেই হবে।

- তাই বলে দেড় লাখে? না না। সে অন্যায় বরদাস্ত করা যায় না ব্রাদার।

- পাঁচ মিনিট কিন্তু শেষ হতে চলল।

- যাহ্। একটু ম্যানেজ করো ভাই। ডিমটা ভেজে না দিলে মায়া কষ্ট পাবে। 

- আচ্ছা। ইয়ে, দত্তবাবু। আমি পেঁয়াজ কুচিয়ে দেব? মামলেটই হোক বরং। পোচের বদলে। নিজের জন্যেও না হয় একটা ভেজে নেবেন।

- এই অসময়ে? আমিও খাব একটা? কড়া ভাজা অমলেট? জিভটা যে সুড়সুড় করছে না তা নয়...কিন্তু অম্বলটম্বল হলে..।

- কিছু মনে করবেন না। খুনটা কিন্তু আমায় করতেই হবে দত্তবাবু।

- তাই তো। তা'হলে আর অম্বলের ভয় কীসের বলো ব্রাদার। আচ্ছা, হাঁসের ডিমের অমলেট চলবে? ফ্রিজে এখনও বেশ কয়েকটা আছে।

- তাই হোক। তা..রান্নাঘরটা কোন দিকে? 

- কিচেন এ'দিকে। কিন্তু তুমি গেস্ট হয়ে পেঁয়াজ কুচোবে?

- আমি সুপার ফাইন পেঁয়াজ কুচোতে পারি দত্তবাবু। আমার বৌ হাতে ধরে শিখিয়েছিল। মামলেটের জন্য একেবারে নিখুঁত।

- বটে? 

- আজ্ঞে। ইয়ে..তার নামও ছিল..মায়া।

- ছিল? ব্রাদার?

- সেও এখন ফটো। আমাদের শোওয়ার ঘরের পশ্চিম দিকের দেওয়ালে, তারামা হার্ডওয়্যার স্টোরের ক্যালেন্ডারটার পাশে ঝোলানল। রোজ ঘুমোনোর আগে খোকা সেই ফটোফ্রেমের দিকে তাকিয়ে আমার কাছে গল্প শুনবে। শুনবেই। ওর মায়ের গল্প। মায়ার গল্প। 

- অ।

- আসলে..টাকাটা আমার বড় দরকার দত্তবাবু। খোকার একটা অপারেশন না করালেই নয়। 

- অ। খোকার জন্য। এ সোয়া লাখ তো সোয়া লাখ নয় ভায়া। সোয়া'শো কোটির সমান। শোনো, এখন ডিম ভাজি। তারপর আর দেরী নয়। 

- আমায় ক্ষমা করতে পারবেন দত্তবাবু?

- মায়ার কাছেই যাওয়া তো। আমার বরং একটা হিল্লে হয়ে গেল। একা একা রোজ নিমাইসঙ্গীত গাইতে বসে বুক ফেটে যায় ভায়া, সবটুকুই তো মায়ারই জন্য। কিন্তু তোমার খোকার গল্পগুলো শোনাটা জরুরী৷ আমি তোমায় বাড়তি টাকা দিতেই পারতাম, আমি তো আর ওই হাজরার মত চশমখোর নই৷ কিন্তু এ কাজে ফাঁকি দিলে হাজরা তোমার ছড়বে না হে।

- দত্তবাবু..। হাজরার দলের বাকি লোকেরা বাইরে দাঁড়িয়ে। কাজ হলে লাশ আর প্রমাণ লোপাট করবে বলে। বিশ্বাস করুন আমি যদি খুন নাও করি ওরা আপনাকে..।

- কেঁদো না ভায়া। মাঝেমধ্যেই মায়াকে বলি, আসছি গো। তোমার কাছে আসছি। শুধু সাহসের অভাবে এদ্দিন..। যাক, এই ভালো। তোমার খোকার জন্য আমার হারমোনিয়ামটা দিয়ে গেলাম। বসার ঘরেই রাখা আছে। নিয়ে যেও। আর শোনো, খোকাকে ওর মায়ের গল্পে রেখো, কেমন? দেখো একদিন সে মস্ত বড় মানুষ হবে।

- দত্তবাবু...।

- আর দেরী নয়। পেঁয়াজ কুচোও ব্রাদার। ওমলেটের ব্যাপারটা কুইকলি সেরে ফেলা যাক। নয়ত তোমার স্যাঙাৎরা এসে রসভঙ্গ করবে।

Sunday, June 21, 2020

কচুরীয়


১। বারো কি বাহাত্তর বছর আগের ব্যাপার।

২। গল যোদ্ধা লেভেলের অদম্য বয়সের দু'জন মানুষ।

৩। ময়দান ঘেঁষা হাঁটাহাঁটি আর পার্ক স্ট্রীটের রেস্টুরেন্ট রোমাঞ্চ বাদ দিয়ে তারা দেখা করেছিল দক্ষিণেশ্বরে। 

৪। সে ডেট-য়ে তাদের টেনে নিয়ে গেছিল হিংয়ের কচুরী। 

৫। এটাসেটামিক্স গোছের কচুরী দাদার হাত থেকে ভক্তিভরে তারা গ্রহণ করেছিল কচুরীর প্লেট আর ডালের বাটি। 

৬। একজন অপরের ডালের বাটিতে নিজের কচুরীর টুকরোটি ডুবিয়ে নেওয়ায়র মনোমালিন্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল কল্পতরু কচুরীদাদার আশ্বাস; "ডাল যত চাইবে পাবে, চিন্তা কীসের গো"। 

৭। সে হিংয়ের কচুরীর সুবাসে "আবার কবে দেখা হবে" ছিল; পরের প্রতিটি 'আবার কবে দেখা হবে"তে সে সুবাস ঘুরে ফিরে এসেছে। 

৮। প্রেমে হাবুডুবুফিকেশনের জন্য কি উত্তম-সুচিত্রা মাখানো 'এই পথ যদি না শেষ হয়' গোছের সুর জরুরী?  আদৌ নয়৷ কোয়ালিটি হিংয়ের কচুরীর স্পর্শ পেলে "সকলই তোমারই ইচ্ছে'তেই এস্পারওস্পার সম্ভব। মাইরি, সম্ভব; সেই দু'জন মানুষ প্রসেসটা টের পেয়েছিল; ওই বারো কি বাহাত্তর বছর আগে।

Thursday, June 18, 2020

ভিক্টোরিয়ার স্বপ্ন

- ভিক্টোরিয়া?

- ভিক্টোরিয়া। স্বপ্নে একেবারে জ্বলজ্বল করছিল।

- একে করোনায় গৃহবন্দী মনমেজাজ খারাপ। সবই বুঝি। কিন্তু তাই বলে স্বপ্নেও ক্লীশে ঘষবে গো?

- দ্যাখো বউ, হতে পারে ক্লীশে। তবু স্বপ্নটি জেনুইন৷

- জেনুইন?

- ছোটবেলার সুবাস নাকে এলো৷ এক্কেবারে মনকাড়া অ্যাফেয়ার।

- স্বপ্নে? সুবাস?

- তবে আর বলছি কেন। সে সুবাস রীতিমতো নাকের ভিতর সুড়সুড় করে গেল।

- তা সেই সুবাসের নেচারটা ঠিক কীরকম?

- ওই যে। বাগানের বেঞ্চিতে বসে  স্টিলের টিফিন বাক্স খুলে লুচি আলুভাজা বের করার যে মনমাতানো গন্ধ? সেইটা।

- হবে না।

- ও মা। কী হবে না?

- এ'সব স্বপ্নের বাহার আমি বুঝি না ভেবেছ? রাতে চিকেন স্টু আর ভাত। গিলতে হয় গেলো, নয়ত ভিক্টোরিয়ার বেঞ্চিতে গিয়ে ছেলেবেলার কথা মনে করে বাতাস পকোড়া খাওগে।

- অমন কড়া সুরে বলতে নেই বউ৷ আলু আমি ভাজব। ময়দাও আমিই মাখব৷ তুমি শুধু বেলে দিও। গতজন্মে কী ভয়ানক পাপই না করে এসেছি; আমার হাতে বেলা লুচি কিছুতেই ছাই ফুলতে চায় না। সে এক ট্র‍্যাভেস্টি। 

- উফফ। যত্তসব। একে লকডাউন তার ওপর যত আজেবাজে নেকু স্বপ্ন। প্রাণ ওষ্ঠাগত। 

- শোনো বউ, রিয়েল এস্টেট যে'ভাবে ক্র‍্যাশ করছে তা'তে  চার হাজার টাকা পার স্কোয়্যার ফিট দরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের এক চিলতে বারান্দা বিক্রি হলে আশ্চর্য হব না। আর সে সু্যোগ এলেই পিএফ ভেঙে তোমার জন্য ভিক্টোরিয়ার আড়াইশো স্কোয়্যার ফিট বারান্দা কিনে নেব। প্রতি রোব্বার বিকেলে আমরা সে'খানে বসে মুড়িমাখা খেতে খেতে তাস খেলব। 

- শোনো..তুমি ময়দা মাখো গিয়ে। আমি বেলে দেব।

- অহো বউ, তোমারেই করিয়াছি জীবনের ভিক্টোরিয়া।

গর্বোদ্ধত

কলকাতা ও বাংলা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। আমাদের সংস্কৃতি,  আমাদের ঐতিহ্য ইত্যাদি। আবার আমাদের খবরের চ্যানেলগুলোকে চীনের আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে শহরের চায়না টাউনে ছুটে যেতে হয় সে'খানকার চীনে রেস্তোরাঁর মালিকদের প্রশ্ন করতে;
"চীনের আক্রমণ সম্বন্ধে আপনারা কী ভাবছেন"?

আমাদেরই সহনাগরিকরা যে বিদেশী আক্রমণ বরদাস্ত করছেন না; সে'টাও খবর। সে খবর আমরা কনজিউম করি। সে আশ্বাস টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে ভেসে না এলে আমরা স্বস্তি পাইনা। 

আমাদের গর্বের শেষ নেই।

Wednesday, June 17, 2020

যুদ্ধযাত্রা


- সরাইখানায় নতুন বলে মালুম হচ্ছে?

- হুঁ।

- আমার নাম কার্লোস। বসি এ'খানে?

- আমি আন্দ্রে।

- বয়সে তো তুমি আমার খুড়োর বয়সী গো। তা, একটু না হয় আবদার নিয়েই বলি। এক গেলাস বিয়ার খাওয়াও না।

- বেশ তো..।

- বাঁচালে কার্লোস খুড়ো৷ গলা এক্কেবারে শুকিয়ে কাঠ। এই যে ভায়া, দু'টো বিয়ার এই টেবিলে।

- একটাই বলো না হয়।

- ও মা। তুমি খাবে না নাকি? 

- নাহ্।

- তা'হলে তাই হোক। তবে দু'টো বিয়ার আসছে যখন আসুক না। আমি না হয় দু'টোই...। কিন্তু ইয়ে খুড়ো...তাই বলে আমার পানপাত্রটি খালি হওয়ার আগে কেটে পড়ো না যেন। সন্ধ্যের মেজাজটি তা'তে নষ্ট হবে। 

- বেশ।

- খুড়ো, তুমি বড় অল্প কথার মানুষ দেখছি। 

- তুমি একাই তো দিব্যি আড্ডা জমিয়েছ। আমার আর বেশি কথায় কাজ কী বলো।

- শোনো খুড়ো, চুপ করে বসে থাকলে কিন্তু কিছু হবেনা। এ'বার গর্জে না উঠলেই নয়।

- গর্জন?

- গর্জন। এক্কেবারে হালুম। দেশের ঘাড়ে যুদ্ধ এসে পড়েছে আর আমরা মিউমিউ করব; এ'টা তো মেনে নেওয়া যায়না খুড়ো। 

- তা তো বটেই।

- যাক, বিয়ার এসেছে। 

- গলা শুকিয়ে গেছে বলছিলে। চুমুক দাও।

- চিয়ার্স। আহ্। বুঝলে খুড়ো, এ'বার কিন্তু আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

- ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? কাদের ওপর?

- ও মা! হাড়হারামি দেশ সিলডাভিয়া আমাদের আক্রমণ করে বসল। এ'বার আমাদের প্রত্যেককে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। পড়তে হবেই। কুত্তার বাচ্চা সিলিডাভিয়ানদের দেখলেই কচুকাটা করতে হবে।

- দেশের হয়ে বুক চিতিয়ে লড়তে পারে, এমন নাগরিকই তো  দরকার।

- দেশের ওপর এমন আক্রমণ হচ্ছে ভাবলেই চোখ ভিজে আসে গো খুড়ো। এই আমার চোখের দিকে চেয়ে দ্যাখো! দ্যাখো। বুঝছ দুঃখটা?

- আহা আন্দ্রে। সত্যিই কেঁদে ফেলবে নাকি?

- কাঁদব না কেন খুড়ো? কেঁদে ভাসাব না কেন? দেশের ওপর এমন অন্যায় আঘাত হানার আগে শুয়োরের বাচ্চা সিলডাভিয়ানগুলো আমায় গুলি করে মেরে ফেললো না কেন।

- গুলি? খেতে চাইছ?

- মরতে ভয় পাই ভেবেছ খুড়ো? দেশের জন্য অমন কয়েক হাজার গুলি খাওয়ার যন্ত্রণা আমি হেসে হজম করতে পারব। 

- বাহ্।

- বুঝলে খুড়ো। দেশের চেয়ে বড় কিছু হয়না। কবিরা কি সাধে বলেছেন যে দেশ আদতে যে নিজের মায়েরই মত। তার ওপর এমন অশ্লীল আক্রমণ..আমি সন্তান হয়ে মেনে নেব কী করে?.

- হ্যাঁ। যুদ্ধের অবস্থা বেশ ভয়াবহ।

- কিন্তু তুমি দেখো খুড়ো, আমরা জিতবই। প্রয়োজনে আমার এই লাঠিটা নিয়ে সীমানায় গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেব। সিলডাভিয়ানদের তলোয়ারের ঘায়ে প্রাণ দিতে হলে দেব। দেশের জন্য দেব।

- দেবে বৈকি।

- জানো আমি কী চাই খুড়ো?

- কী চাও আন্দ্রে?

- আমি চাই আমাদের সৈন্যরা সীমান্তে আটক না।থেকে সিলডাভিয়ায় ঢুকে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিক। তা'হলেই হারামজাদারা বুঝুবে কত ধানে কত চাল..।

- ও'দের বোঝানো দরকার,তাই না?

- আলবাত দরকার। আর এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিৎ রাজামশাইয়ের কাছে আবেদন করা যাতে সিলডাভিয়াকে এইবেলা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

- যুদ্ধ তো সিলডাভিয়াও করবে।

- আমরা কি যুদ্ধকে ডরাই ভেবেছ খুড়ো? আমার রক্ত টগবগ করে ফুটছে...টগবগ করে!

- যাবে? যুদ্ধে?

- আমায় কিছু বললে নাকি খুড়ো? বড় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম...ঠিক শুনতে পাইনি।

- যুদ্ধে যাবে?

- যুদ্ধে? সীমান্তে?

- কাল সকালেই আমায় সীমান্তের দিকে যেতে হবে। সে'খানকার সেনাছাউনিতে একটা জরুরী কাজ আছে। তোমার মত জোয়ান ছোকরাকে সহজেই সেনাবাহিনীতে ভর্তি করিয়ে নেবে কিন্তু আন্দ্রে। যাবে আমার সঙ্গে?

- ইয়ে, যাওয়ার তো বড় ইচ্ছে। বড় ইচ্ছে। কিন্তু..।

- কিন্তু?

- আমার একটা মুদীর দোকান আছে হে খুড়ো৷ দেশের জন্য যতই বুক ফেটে যাক; দোকানটা বন্ধ রাখা একদমই উচিৎ হবে না। তাছাড়া সবাই ড্যাংড্যাং করে যুদ্ধ করতে গেলেই তো হবে না, অর্থনীতির ব্যাপারটাও তো দেখতে হবে।

- এই অসময়ে, তোমার মত গুণী মানুষরা যদি সীমানায় গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় আন্দ্রে...তবেই তো দেশের ও দশের সাহস বাড়বে।

- বটেই তো বটেই তো। তবে ইয়ে খুড়ো, আমার না আবার ছোটবেলা থেকেই একটু সর্দির ধাত আছে৷ খোলা হাওয়া বুকে লাগলেই কফ বসে সে এক একাকার কাণ্ড৷ তাছাড়া মা আচার শুকোতে দিচ্ছে রোজ দুপুরে, সেই আচারের পাত্রগুলো বিকেলবেলার দিকে ঘরে ঢোকানোর দায়িত্বও আমার। বাড়িছাড়া হলে মা যা বকুনি দেবে না খুড়ো...এক্কেবারে খতরনাক মহিলা।

- বেশ।

- তা খুড়ো, সেনাছাউনিতে আবার তোমার কী কাজ?

- আমার একমাত্র পুত্র আলেকজান্ডার। সে গতকাল আমাদের সেনাবাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যায়। খোকার দেহটাকে নিয়ে বাড়ি ফেরা দরকার, তার মা পথ চেয়ে বসে রয়েছে যে।

Tuesday, June 16, 2020

সারকাজমে বঙ্কিম


- বুঝলে দাদা, বড় মুশকিলে পড়েছি।

- মুশকিল? সিরিয়াস কিছু?

- রীতিমতো। 

- কী'রকম?

- আমি সারকাজমে বঙ্কিম; এ ধারণা নিয়ে এতদিন দিব্যি সুখে ছিলাম।

- এই কনফিডেন্সিটাই তো চাই ভায়া। এ'টাই তো চাই।

- কিন্তু কনফিডেন্সটায় সামান্য খোঁচা লাগল যে।

-  সে কী! কনফিডেন্সে খোঁচা? হাউ?

-  এইত্তো। গতকাল ভোরের দিকের স্বপ্নে খোশমেজাজে অন্যের নিন্দেমন্দ করছিলাম। এমন সময় স্বপ্নের ফ্লো নষ্ট করে বঙ্কিমবাবু এসে বলললেন; আমার সারকাজম বাকি কীবোর্ডের মাধ্যমে অনবরত ইটপাটকেল ছোঁড়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।

- এ'কথা বঙ্কিম বললে?

- নিজের কানে শুনেছি। আর মাইন্ড ইউ, স্বপ্নটা কিন্তু ভোরের..।

- বঙ্কিমটা একটা ইডিয়ট।

- আস্ত ইডিয়ট, তাই না? তাই হবে। ঠিক বলেছ৷

Monday, June 15, 2020

ভ্যাক্সিন

- ভাই হবস। বুকের ভিতরটা কেমন...।

- কেমন?

- হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড়।

- অ।

- কেমন যেন..অস্বস্তি।

- মনখারাপ ভাই ক্যালভিন?

- ঠিক তা নয়।

- মনকেমন?

- হবে হয়ত।

- বলো স্পেসম্যান স্পিফ। বলো।

-  তুমি আছো তাই বাঁচোয়া।

- আমি তো শুধু শুনি। কিছুই তো করিনা।

- সেটুকুই তো ভ্যাক্সিন। 

Sunday, June 14, 2020

স্যুপ


- নুনের ডিবেটা এগিয়ে দেবেন প্লীজ?

- হুঁ।

- থ্যাঙ্ক ইউ। এ'খানে খাবারদাবার এত ব্ল্যান্ড..।

- হুঁ।

- অবশ্য, হসপিটালের ক্যাফেটেরিয়াতে এর চেয়ে বেশি কিছু আর আশা করিই বা কী করে বলুন।

- হুঁ।

- ইয়ে, আপনার স্যুপটা কিন্তু ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে..।

- হুঁ।

- শুনুন...এই যে...শুনছেন?

- হুঁ? আমায় বলছেন?

- অবভিয়াসলি।  বলছি, আপনার স্যুপটা সেই তখন থেকে নিয়ে বসে আছেন কিন্তু এক চামচও মুখে তোলেননি। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে তো।

- ও। না, ঠিক আছে।

- সে কী। ঠিক আছে মানেটা কী। স্যুপের স্বাদের অর্ধেক তো টেম্পারেচারে। 

- ইচ্ছে নেই। থাক।

- তা'হলে নিলেন কেন? এ'দের ক্যাফেটেরিয়ায় জিনিসপত্রের যা দামটাম, দামী কফিশপকে হার মানায়।

- প্লীজ। আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তবু বলছি। ডোন্ট মাইন্ড, আমার মনমেজাজটা ভালো নেই। কথাবার্তা বলতে চাইছিনা।

- আপনার পেশেন্টের সিচুয়েশন বুঝি..।

- আমি বরং পাশের টেবিলে গিয়ে বসছি।

- প্লীজ না, তারপর স্যুপের বাটি ফেলে একটা একাকার কাণ্ড হোক আর কী। 

- দেখুন মিস্টার...।

- দত্ত। অমিত দত্ত। আর আপনি?

- দেবজ্যোতি সিনহা। অমিতবাবু, প্লীজ স্পেয়ার মী।

- শিওর। শিওর।

- থ্যাঙ্ক ইউ।

- স্যুপটা?

- ওকে। খাচ্ছি। 

- নুনের ডিবেটা। এই যে। একটু ছড়িয়ে নিতে পারেন। যদি দরকার মনে হয় আর কী।

- না।

- আপনার ফ্যামিলির কেউ? ভর্তি? 

- বাবা। ক্রিটিকাল।

- আপনি..এক ছেলে?

- দাদা ক্যালিফোর্নিয়ায়। আসতে পারবে বলে মনে হয়না।

- স্যুপটা?

- খাচ্ছি তো।

- না মানে, মাইন্ড করবেন না। অমন মুখ ভেটকে খাচ্ছেন। গায়ে লাগবে বলে মনে হয়না।

- দিন নুনের ডিবেটা। সত্যিই বড্ড ব্ল্যান্ড।

- একটা স্যান্ডউইচ বলি? না না, এ বাবা। আমি কিন্তু ইন্ট্রুড করতে চাইনি।

- আসলে, ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছি। বাবা আমাদের দুই ভাইকে যে কী'ভাবে আগলে বড় করেছেন...। ওকে এইভাবে কষ্ট পেতে দেখে খুব..। 

- উনি কি...আইসিইউতে?

- হ্যাঁ। ডাক্তাররাও তেমন ভরসা দিতে পারছেন না..।

- আপনার স্যুপটা ঠাণ্ডাই হয়ে গেছে। একটা স্যান্ডউইচ হলে বরং..।

- স্যান্ডউইচ আমার গলা দিয়ে নামবে না। স্যুপটাই খেয়ে নিচ্ছি বরং।

- আচ্ছা।

- দাদাটা থাকলে অন্তত..। ওকে এত মিস করছি...।

- স্যান্ডউইচটা? বলি? আমি শেয়ার করে নেব না হয় একটু। ডোন্ট মাইন্ড, গায়ে পড়াটা আমার স্বভাব। আপনি স্যুপটাকে জাস্টিফাই করতে পারছেন না।

- আপনি নিননা স্যান্ডউইচ। 

- বয়স হয়েছে তো। ইচ্ছে থাকলেও এ'দের ডাবল ডেকার নিজে পুরোটা ম্যানেজ করতে পারব বলে মনে হয় না। আপনি যদি একটা স্লাইস অন্তত..।

- আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। আমায় তুমি বলতে পারেন। আর স্যান্ডউইচ বলুন না। আমি নেব না হয় এক স্লাইস। তবে..আমি পে করব।

- সে তো ভালো কথা।

- আপনার পেশেন্ট?

- আইসিইউতে নেই।

- যাক। আপনার বাড়ির কেউ?

- আমার পেশেন্ট তুমি।

- এক্সকিউজ মী?

- সকালে হসপিটালের বাইরে চায়ের দোকানে তোমায় দেখলাম চা টোস্ট নিলে। খেলে না। লাঞ্চের সময় দেখলাম এ'খানে এসে রুটি সবজি নিলে এবং নষ্ট করলে। নিশ্চিত ছিলাম সন্ধ্যের ভিজিটিং আওয়ার শুরু হওয়ার আগে ফের আসবে এ'খানে। যাক, স্যুপখুনটা অন্তত রুখতে পারলাম।

- আপনি আমায় ফলো করছেন?

- রোজই করি। কাউকে না কাউকে। আমার সংসারে কেউ নেই। রিটায়ার করেছি। এখন হাসপাতাল টু হাসপাতাল ঘুরে রোজ তোমার মত কারুর পিছনে পড়ে যাই। তাকে খাইয়ে তবে স্বস্তি। স্যুপটা খেয়ে খানিকটা নিশ্চিন্ত করেছ। স্যান্ডউইচের একটা স্লাইস নিলে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হই। আরে! পেশেন্টের হয়ে হাসপাতালে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে স্ট্রেন্থ লাগে তো। না খেলে চলবে কেন!

- আপনি কি পাগল?

- পাগল? হতে পারি। নিজের সন্তানকে এক সময় এই হাসপাতালেরই আইসিইউতে দেখেছি। সেই সন্তানের শোকে পাথর হয়ে পড়া স্ত্রীকে খাওয়াদাওয়া ছেড়ে শেষ হয়ে যেতে দেখেছি। নিজেকে সুস্থ বলে আর কী'ভাবে দাবী করতে পারি বলো। তবে এই হাসপাতালের সামনের চায়ের দোকান বা এই ক্যান্টিনে এসে মাঝেমধ্যে বিমর্ষ মানুষের মুখে দু'এক গ্রাস খাবার তুলে দিতে পারি বইকি। কেউ নরম সুরে বললে শোনে, কাউকে ধমক দিতে হয় আর তোমার মত টেঁটিয়াকে মহাভারত শুনিয়ে পথে আনতে হয়। যত অন্ধকারই হোক, কান ধরে খাইয়ে দেওয়া গার্জেনের দরকার সবারই পড়ে। আমারও পড়বে কোনওদিন। সে'দিন আমি কোনও পাগলের দেখা পাব কিনা কে জানে।

- দু'টো স্যান্ডউইচ বলি বরং। একটা নিয়ে ভাগাভাগি করে খাওয়ার কোনও মানে হয়না।

Friday, June 12, 2020

গোল্লায়

- আমায় ডেকেছিলেন স্যার?

- এসো শ্যামল। এসো। বসো।

- জরুরী কিছু কী?

- ব্যাপারটা সিরিয়াস।

- বিট্টু স্কুলে কোনও গোলমাল করেছে?

- না। স্কুলে বা ক্লাসে কোনওরকমের গোলমাল করার ছেলে সে একেবারেই নয়। হি ইজ ভেরি ওয়েল বিহেভড। কথাবার্তায় নম্র। ইন ফ্যাক্ট, ওকে দেখে আমার তোমার কথা মনে পড়ে। ক্লাসে তুমিও ততটাই শান্তশিষ্টই ছিলে। সে'দিক থেকে স্বভাবগুলো সেও বাপের মতই পেয়েছে।

- তা'হলে কী ব্যাপার স্যার। আপনাকে দেখে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে।

- ব্যাপারটা দুশ্চিন্তার তো বটেই শ্যামল।

- নেশাটেশা কিছু করছে নাকি বিট্টু? বিড়ি খেতে গিয়ে ধরা পড়েছে স্কুলে? ক্লাস ইলেভেনে উঠে শেষ পর্যন্ত এইসব শুরু করেছে?

- দু'টো বিড়ি ফুঁকলে লাংসের ক্ষতিটতি হয় বটে। বিড়ির চেয়ে ভালো কোয়ালিটির চানাচুরের নেশা বরং অনেক বেশি প্রগ্রেসিভ। কিন্তু না হে শ্যামল, সে'সব লঘু ব্যাপারে আমি গার্জেন কল করিনা। 

- তবে স্যার? একটু খুলে বলুন প্লীজ। ওই একটি মাত্র ছেলে। যা যুগ পড়েছে, আমি আর ওর মা মাঝেমধ্যেই নার্ভাস হয়ে পড়ি৷ গোল্লায় যাওয়ার এত কল চারদিকে..।

- এখনই সামাল না দিলে সে গোল্লায় যেতে পারে বটে। ব্যাপারটা খুব ক্রিটিকাল জায়গায় পৌঁছে গেছে দেখছি।

- ক্রিটিকাল?

- খুলেই বলি। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে আমার নাতনী ঝিমলিও তোমার ছেলের সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ে। ঝিমিলির মা আজ সকালে এই চিঠিগুলো ওর স্কুলের ব্যাগ থেকে উদ্ধার করেছে।

- চিঠি?

- তোমার পুত্রের লেখা। 

- ঝিমলিকে লিখেছে?

- প্রেমপত্র। 

- রাস্কেল বিট্টে। স্কাউন্ড্রেল কোথাকার। মা ঠাকুমার আদরে একটা আস্ত বাঁদর তৈরী হয়েছে। ওকে যদি আমি চাবকে সিধে না করি তা'হলে আমার নাম শ্যামল চ্যাটার্জী নয়। ক্যালকুলাস প্র‍্যাক্টিস না করে ইডিয়টটা প্রেম শুরু করেছে? তাও আপনার নাতনীর সঙ্গে? ওর কান কেটে যদি মাদুলি করে ওর গলায় আজ না ঝুলিয়ে দিয়েছি..।

- শ্যামল, তোমার কান কেটে নেওয়া উচিৎ। 

- আজ্ঞে?  স্যার?

- প্রেমের চিঠি লিখেছে বেশ করেছে। 

- না মানে...ক্লাস ইলেভেনে...।

- ক্লাস ইলেভেনে ও প্রেমের চিঠি লিখবে না তো কি এই বয়সে আমি লিখব? এই তোমার শিক্ষা? প্রেম করছে বলে পেটাবে? তোমার শিক্ষক হিসেবে আমার আধঘণ্টা কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা উচিৎ। 

- না মানে আমি তা বলতে চাইনি স্যার। কিন্তু এই যে আপনি বললেন ব্যাপারটা সিরিয়াস। বিট্টু গোল্লায় যেতে বসেছে..।

- গোল্লায় যেতে পারে। তবে আটকানোর সময় আছে। ছেলেটা যেহেতু প্রেমে সিনসিয়ার, ওকে পথে আনা সহজ।

- ব্যাপারটা যদি..স্যার...একটু খোলতাই করে...।

- ঝিমলিকে তোমার ছেলে বারোটা চিঠি লিখেছে। টোটাল সাতাশটা বানান ভুল, পার চিঠি ট্যু পয়েন্ট টু ফাইভ। গ্রামারে ভুলচুক আরও খান সতেরো। সবচেয়ে বড় কথা, গদগদ সব লাইন কোট করবি কর; তাই বলে ইলিয়ট আর টেনিসন গুলিয়ে ফেলবি? তোমার এবং তোমার ছেলের ইংরেজি মাস্টার হিসেবে বলছি; ছেলেকে সামলাও, ও ছেলে ভেসে যেতে পারে। তবে হ্যাঁ, পুরো দায়িত্ব তোমার কাঁধেই বা চাপাই কী করে। আমি যেহেতু ওকে পড়াই, এ লজ্জা আমারই সবচেয়ে বেশি। সে অর্থে ওর প্রেমপত্রের প্রতিটি ভুলের জন্য আমারও তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।

- ছিঃ ছিঃ স্যার। এ আপনি কী বলছেন...।

- শোনো শ্যামল, আবারও বলি। প্রেমটা যেহেতু সিনসিয়ারলি করছে, ভাষার ভালোবাসাটা ও বুঝবে। 

- আজ্ঞে।

- যাক। এ'বার তুমি এসো। আর তোমার ছেলেকে একবার আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। স্কুলে নয়, বাড়িতেই যেন আলাদা করে দেখা করে যায়।

- হ্যাঁ, সেই ভালো। আপনিই না হয় বিট্টুকে একটু ধমকেটমকে দেবেন'খন।

- ধমকানোর কাজটা আমি স্কুলেই সেরে নেব। ওকে বাড়িতে ডাকছি তোমার ব্যাপারে ওয়ার্ন করতে। যেমন তোমায় ডেকে আমি ওর ব্যাপারে সাবাধনা করে দিলাম।

- আমার ব্যাপারে ওকে...?

- সাবধান করে দেব। প্রেমের মত একটা জরুরী ব্যাপার সম্বন্ধে ওর বাপের ধ্যানধারণা কতটা রিগ্রেসিভ সে'টা ওর জানা দরকার। তবে কোনওদিন তোমার লেখায় বানান বা ব্যাকরণে ভুল দেখিনি। কবিতার লাইনও কোনওদিন ভুল কোট করেছ বলে মনে নেই। ভাষার প্রতি যেহেতু তোমার সিনসিয়ারিটি আছে, প্রেম ব্যাপারটাও একদিন তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে। তবে এইবেলা তোমার ছেলেকে  সাবধান করে দিতেই হবে; যাতে প্রেমট্রেম না বুঝে তুমি গোল্লায় না যাও।

Thursday, June 11, 2020

মিস্টার সেনের থেরাপিস্ট


- এক্সকিউজ মী?

- বিলীভ মী। বানিয়ে বলছি না।

- আমি আপনার থেরাপিস্ট। ডেফিনিটলি আপনাকে অবিশ্বাস করছি না মিস্টার সেন। তবে...।

- তবে? ডাক্তার?

- না মানে...ব্যাপারটা বিষম খাওয়ার মতই।

- শুনেই আপনাকে বিষম খেতে হচ্ছে৷ তাহলে আমার কী অবস্থা সে'টা ভাবুন।

- আর একবার আমায় নিশ্চিত হতে দিন মিস্টার সেন৷ আপনি বলছেন আপনি আজ রাত্রে ঘুমোতে গেলেন। কিন্তু যেই সকালে আপনার ঘুম ভাঙবে সে'টা আগামীকালের সকাল নয়, গতকালের।

- এগজ্যাক্টলি। সঠিক বুঝেছেন। 

- আর এমনটা হচ্ছে গত মাসখানেক ধরে?

- রাইট ডাক্তার। আমি রোজ একদিন করে পিছিয়ে চলেছি। আমি আজ থেকে গতকালে পিছিয়ে যাচ্ছি। রোজ।

- কী সাংঘাতিক।

- আজ জুন মাসের নয় তারিখ, তাই তো? একমাস আগে আমি জুলাইয়ের নয়ে ছিলাম।

- অ।

- আপনি অবিশ্বাস করতে পারেন। আমি মাইন্ড করব না।

- বিপুলা এ পৃথিবী। এটসেটেরা এটসেটেরা। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দায় আমার নয়। 

- আজকে ইন্ডিয়া জিম্বাবুয়ের ওয়েনডে হচ্ছে তো? 

- হচ্ছে।

- মোবাইলে লাইভ স্কোর চেক করুন দেখি ডাক্তার।

- গোটা সেশনের টাকা দিয়েছেন। যা বলবেন শুনব। যা করতে বলবে করব। এই যে...টসে জিতে ইন্ডিয়া ব্যাট করছে। বাইশ নম্বর ওভারে একশো বেয়াল্লিশ এক উইকেটে। কোহলি চালিয়ে খেলছে।

- বাইশ নম্বর ওভার তো। তেইশ নম্বর ওভারের প্রথম বল। একটা বিমার কোহলির কনুইয়ে লাগবে। রিটায়ার্ড হার্ট। 

- বলেন কী।

*মিনিট পাঁচেক পর*

- তুকতাক নাকি মিস্টার সেন? কোহলি বোধ হয় গোটা সিরিজের জন্য গেল।

- কোহলিকে নিয়ে ভাববেন না ডাক্তার। হালকা চোট। হাড় ভাঙেনি। পরের ম্যাচ খেলবে। সেঞ্চুরিও করবে।

- একটা খটকা লাগছে মিস্টার সেন। জুন মাসের নয় তারিখ তো আপনি ইতিমধ্যেই দেখেশুনে ফেলেছেন। এ চেম্বারের ঘটনাটাও তো..।

- ইয়েস। এ দিনটাও আমার দেখা।

- মিস্টার সেন। আপনাকে কাউন্সেল করা আমার কম্ম নয় যা বুঝছি।

- হাল ছাড়ছেন ডাক্তার?

- একটা কাজ করা যাক। আগামীকাল সকালে বরং আমি আপনাকে একটা ফোন করি। বা দেখাও করতে পারি। ব্যাপারটা ভীষণ ইন্ট্রিগিং। 

- আপনার আগামীকাল ডাক্তার? অর্থাৎ দশই জুন?

- ইয়েস।

- হ্যাঁ। দেখা করতেই পারেন। কিন্তু আপনি আজ ঘুমিয়ে কাল সকালবেলা দশই জুনে পৌঁছবেন অথচ আমি ফিরে যাব ন'তারিখে। অতএব  আপনার সঙ্গে আমার কথা হবে ভবিষ্যতের আমির সঙ্গে। দশই জুন আমার দেখা ও চাখা হয়ে গেছে। আমাদের দেখা হবে ওয়াইজ আউল কফি শপে।

- ওহ। সে'টাও আপনার জানা?

- ইয়েস ডাক্তার। আর এ'টাও জানা যে আপনার সঙ্গে আমার আগামী পরশু,  তরশু এবং তারপর একটানা প্রায় রোজ দেখা হবে। ওই একই কফিশপে।

- আপনি নিশ্চিত? আমাদের দেখা হবে?

- ডাক্তার ডাকটা বিরক্তিকর লাগছে। অনুপমা বলেই ডাকি?

- অ্যাস ইউ উইশ মিস্টার সেন।

- আমরা তুমিতে শিফট করব ঠিক সাত দিন পরে।

- হোয়াট?

- তুমিতে শিফট করব। ষোলোই জুন।

- মিস্টার সেন, ব্যাপারটা অস্বস্তিকর জায়গায় যাচ্ছে।

- প্রেম নিবেদনটা আমিই করব। বাইশে জুন। হুট করে বিয়ের জেদটা অবশ্য আপনার দিক থেকেই আসবে অনুপমা। 

- বাড়াবাড়ি হচ্ছে নাকি?

- আমার সিচুয়েশনটা আজ আপনার গোলমেলে ঠেকছে৷ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝবেন কী গভীর সমস্যার আমি রয়েছি তেইশে জুন আপনি আমার হাত টেনে নিজের মুঠোর মধ্যে নেবেন অনুপমা। ওই, ওয়াইজ আউল কফি শপেই।

- মিস্টার সেন...!

- ষোলোই জুন থেকে তুমি বলার পাশাপাশি আমার নাম ধরে ডাকাও শুরু করবেন আপনি। মিস্টার সেনের বদলে অভিরূপ। 

- ব্যাপারটা পাগলামোর পাশাপাশি খুব আপত্তির জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে মিস্টার সেন। 

- অনুপমা। কোহলির ওই চোটের মতই হয়ত আমাদের সম্পর্কটাও ঠেকানো যাবেনা। জানি৷ তবু, ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে একটা শেষ চেষ্টা করতে এলাম, যদি আপনাকে ঠেকানো যায়। আমি আপনাকে সত্যিই ভালোবেসেছি অনুপমা। আর সেই ভালোবাসার জন্যই বলতে এলাম, আমার সঙ্গে আর দেখা করবেন না। প্লীজ না। জানি না এই ভাবে আমাদের তেসরা জুলাইয়ের হুটহাট করে সেরে ফেলা বিয়েটা আটকানো যাবে কিনা। কিন্তু নয়ই জুলাইয়ের পর থেকে আমি আর এগিয়ে দশই জুলাইয়ে যেতে পারিনি; এ'টা ভেবে একটা প্রবল অস্বস্তি হচ্ছে৷ ব্যাপারটা সুবিধের ঠেকছে না। অনুপমা, প্লীজ অ্যাভয়েড মী। প্লীজ।

- দেখুন মিস্টার সেন। আমি আপনার থেরাপিস্ট না হলে এখুনি আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতাম। কিন্তু আপনার কথাগুলো মন দিয়ে শোনা আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে, তা যতই গোলমেলে হোক না কেন। আর হ্যাঁ, আগামীকাল আমি আপনার সঙ্গে দেখা করব এবং সে'টা করব পিওরলি অ্যাকাডেমিক ইন্টারেস্টে। না হয় সেই ওয়াইজ আউলের কফি শপেই দেখা করব কারণ আপনার বিটকেল ডিলিউসনগুলো ধুয়েমুছে সাফ করার দরকার আছে।

- ভুল করছেন অনুপমা। একটা বিরাট ভুল করছেন।

- কাল সন্ধ্যে সাতটায়।  ওয়াইজ আউল কফি শপ। আর এখন আপনি আসতে পারেন৷ আপনার সঙ্গে এখন আর বাড়তি কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

***

- অনুপমা।

- ইয়েস ডক্টর মিত্র? অভিরূপ কেমন আছে...?

- সরি। চেষ্টা করেও কিছু করতে পারলাম না। ইট ওয়াজ আ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক।  ইওর হাসব্যান্ড ইজ নো মোর।

- আজ জুলাইয়ের দশ তারিখ। অভিরূপ ঠিক এই ভয়টাই পেয়েছিল ডাক্তার। আমায় সাবধানও করেছিল। কিন্তু আমিই...।

- আর ইউ ওকে অনুপমা? আমি জানি এ'টা কত বড় একটা শক...।

- অভিরূপ আমায় সাবধান করেছিল। বারবার। অথচ ওকে বিশ্বাস করতে চেয়েও পারিনি। আই ফেল ইন লাভ ডক্টর, আমি ভালোবেসেছিলাম।

Wednesday, June 10, 2020

দিবাকর মুন্সীর ফর্মুলা


*
ব্যাপারটা তেমন কঠিন নয়৷ হোমিওপ্যাথির চারটে বড়ি এক  গেলাস জলে মিশিয়ে দেওয়া। ব্যাস, কাজ শেষ। কাচের গেলাসটা শৌখিন কাঠের টেবিলের ওপর রাখা থাকবে, সকালের দিকটায় এ' ঘরে কেউ থাকবেও না। গেলাসের জলে সে বড়ি মিশিয়েই মনোহরের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার কথা। ঘরটা আদতে স্বনামধন্য লেখক অমল চৌধুরীর অফিসঘর। মনোহর বেরিয়ে যাওয়ার আধঘণ্টা পর অমলবাবু  সেই ঘরে ঢুকবেন, নিজের টেবিলে বসবেন আর কিছুক্ষণের মাথায় নিশ্চয়ই সেই গেলাসে চুমুক দেবেন৷ 

সেক্রেটারি হিসেবে কাজটা করতে একদমই মন সরছিল না মনোহরের। কিন্তু এই সামান্য কাজের জন্য দিবাকর মুন্সীর আড়াই লাখটাকার অফারটা ফিরিয়ে দেওয়া গেলনা। অমল চৌধুরীর সেক্রেটারি হিসেবে দেড় বছর চাকরী করেও এত টাকা আয় করতে পারেনি সে। দিবাকর মুন্সী প্রকাশক, অমলবাবুর বেশির ভাগ বই উনিই ছাপেন। সম্প্রতি কী একটা ব্যাপার নিয়ে দু'জনের মধ্যে মন কষাকষি শুরু হয়েছিল বটে। কিন্তু দিবাকরবাবু যে আড়ালে ডেকে এমন একটা অফার দিয়ে বসবেন, সে'টা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি মনোহর।

অবশ্য অমলবাবু মানুষ হিসেবে তেমন সুবিধের নন, পয়সাকড়ির ব্যাপারে বেশ চশমখোরই বলা চলে। কিন্তু তবু এমন গোলমেলে একটা কাজ করতে যে সে রাজী হবে সে'টা মনোহর আগে ভাবেনি। নিজের মধ্যে যে এত লোভ জমে আছে, সে'টা সে এর আগে টের পায়নি। দিবাকর মুন্সী অবশ্য বারবার আশ্বাস দিয়েছে যে অমল চৌধুরীকে প্রাণে মারবার কোনও ইচ্ছে তার নেই। তাছাড়া এই অমলবাবুর সেক্রেটারির চাকরীটাও দিবাকর মুন্সীই পাইয়ে দিয়েছিলেন।  তাছাড়া দিবাকরবাবু ঘোর ব্যবসায়ী মানুষ, তাঁর কথায় বিশ্বাস করারও কোনও কারণ নেই৷ তবে আগাম হাতে পাওয়া আড়াই লাখটাকার জন্য এ সামান্য কাজটুকু না করার মানে হয়।


**

- হ্যালো।

- হ্যালো। দিবাকর? নাহ্ হে। ক'দিন ধরে অনেক ঝগড়াঝাটি করলাম বটে তোমার সঙ্গে। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে তোমার কথাই ঠিক৷ আমি আর প্রেমের গল্প লিখব না। বড্ড বেশি রিপিটেটিভ হয়ে যাচ্ছিল। এ'বারে পুজোয় আমি বরং একটা ভৌতিক উপন্যাস জমা দেব। প্রেমের দু'টো লেখা পড়েছিল। নিজেই সে লেখায় চোখ বুলিয়ে দেখে বুঝলাম; সেই একঘেয়ে বিরক্তিকর খাড়া বড়ি থোড। ফর্মুলায় পেয়ে বসলে যা হয় আর কী। কিন্তু আমার ঘোর কেটেছে৷ পাণ্ডুলিপি দু'টো পুড়িয়ে ফেলেছি। ভূতের উপন্যাসের একটা প্লটও মাথায় দানা বেঁধেছে। আজই লেখা শুরু করব।

- অমলদা, যখনই আপনি নতুন স্টাইল ধরেছেন, ফাটিয়ে দিয়েছেন। এ'বারেও তাই হবে। আমি নিশ্চিত।

- কিন্তু তোমার একটা সাহায্য লাগবে যে দিবাকর।

- এনিথিং ফর ইউ অমলদা। বলুন না।

- কোনও সেক্রেটারিই আমার অফিসে বছর দেড়েকের বেশি টিকছে না হে। আর সেক্রেটারি ছাড়া যে আমি অচল।

- সে কী, ওই যে ছেলেটি। কী নাম যেন.. মনোহর। বেশ চটপটে করিৎকর্মা ছোকরা বলে মনে হয়েছিল তো। সেও কেটে পড়েছে নাকি?

- এই নিয়ে টানা সাত নম্বর সেক্রেটারি না বলে কয়ে ডুব দিল হে। স্ট্রেঞ্জ ব্যাপারস্যাপার।  আর তুমি ছাড়া তো আমার গতি নেই। দাও দেখি একটা নতুন কাউকে খুঁজেপেতে।  

- ও নিয়ে আপনি ভাববেন না অমলদা। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

***

- এসো দিবাকর। এসো। 

- কেমন আছ ডাক্তার?

- যেমন দেখছ৷ দিব্যি।

- তোমার জন্য নিয়ে এলাম। এই দ্যাখো।

- নতুন পাণ্ডুলিপি? 

- অমল চৌধুরীর নতুন নভেল। পুজোর আগেই ছেপে বেরোবে। এই প্রথম ভদ্রলোল ভৌতিক প্লট নিয়ে লিখল। পড়ে দ্যাখো ডাক্তার, এক্কেবারে হাইক্লাস। কে বলবে কয়েকমাস আগেই গেঁজে যাওয়া প্রেমের প্লটে দিস্তে দিস্তে লিখে পাঠকের হাড় জ্বালাচ্ছিল। 

- বেশ পড়ে দেখব। তবে সেই তো ভিশিয়াস সাইকেল। এই ভূতের নভেল বেস্টসেলার হবে। তারপর একটানা যাই লিখবে শুধু ভূত। ততক্ষণ লিখে যাবে যতক্ষণ না পাঠক বমি করতে শুরু করেছে৷ 

- তা আর বলতে। গোয়েন্দা গল্প পাঠক খেলো মানে একটানা শুধু ডিটেকটিভ নভেল চালাবে। ঐতিহাসিক শুরু হলো তো বছরখানেক শুধু ঐতিহাসিক।  একবার প্রেমের প্লটে আটকা পড়ল তো শুধু গদগদ। আবার নামী লেখকের ইগোর ওজনও কম নয়৷ বিন্দুমাত্র নেগেটিভ ফীডব্যাক পেলেই বাবুর গোঁসা হয়ে যায়। 

- ফর্মুলা যে সাহিত্যের কী ক্ষতি করে। অথচ ফর্মুলা ফর্মুলা করেই অমলবাবুরা নষ্ট হয়ে যান, আর পাঠকদের প্রতিও অবিচার করেন।

- অগত্যা। ফর্মুলা ভাঙার দায় নিতে হয় আমার মত প্রকাশকদের৷ নেহাত তোমার ওই সাহিত্য ফর্মুলা ভাঙার জাদুবড়ি ছিল ডাক্তার। ওটির গুণেই তো বারবার এই অমল চৌধুরীকে খাদের ধার থেকে টেনে আনতে পারি। তবে যাদের দিয়ে অমলদাকে এ বড়ি গেলানো, সেই সেক্রেটারিগুলোর খাই বড় বেড়ে গেছে আজকাল।

- স্টাইলভাঙা লেখকের বই বেচে মুনাফাও তো কম হয়না তোমার দিবাকর। না হয় মাঝেমধ্যে অভাবী ছেলেমেয়েগুলোকে কিছু কিছু দিলে। যাকগে, শোনো। অমল চৌধুরী আগামী কিছুদিন ভূতের গল্প নিয়েই থাক। পরের বছর ওর স্টাইল ভাঙার জন্য নতুন বড়ি তৈরি করছি, এ'বার ওঁর ভাঁড়ার থেকে রম্যরচনা টেনে বের করব ভাবছি। 

- ব্রাভো ডাক্তার। ব্রাভো। এমনিতে অমলদার ভাষার জোর আছে৷ শুধু তোমার ওই স্টাইলভাঙার সাহস দেওয়া বড়ির সাপ্লাই থাকলেই, ভদ্রলোক অসাধ্যসাধন করতে পারবেন। 

-  আমার কমিশনটা ভুলো না যেন দিবাকর। 

Tuesday, June 9, 2020

নন্দর তন্ত্রসাধনা

ব্যাপারটা যে আগাগোড়াই গোলমেলে তা নিয়ে আর নন্দর কোনও সন্দেহ রইলনা। বারুইপুর স্টেশনের কাছে চটিবইয়ের দোকান থেকে বাইশ টাকায় ১০১ তন্ত্র টোটকার মেডইজি গাইডবইটা কিনেছিল সে; নেহাত শখেরই বশে। এমন শিক্ষামূলক বইপত্র সে মাঝেমধ্যেই কিনে থাকে। ম্যাজিকের সহজপাঠ, জার্মান পদ্ধতিতে বাঙালি মাংস রান্না অথবা চটজলদি হোমিওপ্যাথি; এমন চিত্তাকর্ষক বই সে মাঝেমধ্যেই কিনে আনে। আর সে'সব বই পড়ে পড়েই তো পাড়ার ক্লাবের সান্ধ্য আড্ডায় নন্দর সবসময় একটা দাপুটে উপস্থিতি থাকে। 

পোস্টঅফিসের ক্লার্কের চাকরীটায় থিতু হওয়া সত্ত্বেও এখনও বিয়েটা সেরে ফেলা হল না। আজ নন্দর বাপ-মা বেঁচে থাকলে হয়ত একটা সম্বন্ধ দেখেশুনে একটা হিল্লে করে ফেলতেন; বত্রিশ বছর বয়সে তাঁকে এমন একা থাকতে হত না৷ 

যা হোক, একা থাকায় বিস্তর সুবিধেও আছে৷ এই যেমন তন্ত্রসাধনার বইয়ের খানচারেক পাতা পড়ার পরেই কেমন একটা নেশা ধরে গেল। গত তিনদিন সিকলীভ নিয়ে বাড়িতে বসে দিব্যি এ বই থেকে বিভিন্ন মন্ত্রতন্ত্র প্র‍্যাক্টিস করে যাচ্ছে সে। মনের মধ্যে বেশ কেমন একটা চনমনে ভাবও তৈরি হচ্ছে৷ একশো বারো পাতার বই, প্রথম দিন ঝড়ের গতিতে পড়ে শেষ করে ফেলেছিল সে। তারপর থেকে প্রতিটি শব্দ ধরে ধরে পড়ছে, জটিল জায়গাগুলো বারবার আবৃত্তি করছে। বাড়িতে গেরুয়া বসন বলতে তেমন কিছু ছিলনা তাই একটা পুরনো গেরুয়া গামছা জড়িয়েই তন্ত্র অধ্যয়ন চালিয়ে যাচ্ছে নন্দ; টিশার্ট আর বার্মুডা পরে এমন গভীর কেতাব আত্মস্থ করা যায়না৷  

দিব্যি চলছিল সবকিছু।  রাতের কোন সময়ে সধবা মড়ার সিঁথি থেকে সিঁদুর নিয়ে তা'তে বাদুড়ের রক্ত আর জবাফুল পোড়ানো ছাই মিশিয়ে পুরিয়া বানিয়ে খেলে আড়াই বছর আয়ুবৃদ্ধি হবে, অমাবস্যার রাতে শ্মশানের মাটিতে গজানো কলমিশাক তুলে কুচনো বেগুন দিয়ে কীভাবে রান্না করে খেলে অন্তরাত্মার তেজ বাড়বে; এমন সব রসালো টোটকা তো ছিলই। পাশাপাশি ছিল বেশ কিছু ঘরোয়া টোটকার হদিশও। ঝাঁটা, কাটারি, কড়ি, হরতকি, সৈন্ধবলবণ, শাড়ির আঁচল থেকে কেটে নেওয়া টুকরো আর এমন শ'খানেক ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়ে যে কী অসাধ্যসাধন করা যায়; তন্ত্রের গভীরে না ঢুকলে তা বোঝা সম্ভব নয়।

বিভিন্ন গূঢ় মন্ত্রটন্ত্র আউড়ে বেশ চমৎকার দু'টো দিন কেটেছিল নন্দর। এত সহজে যে তন্ত্রশক্তি আয়ত্ত্ব করা যায় তা সে ভাবতেও পারেনি। তন্ত্রবলে দিব্যি ঘর ঝাড় দেওয়া, ঘর মোছা বা রান্নাবান্নার কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। এমন মহামূল্যবান সব বই কেন যে অমন সস্তা চটিবইয়ের দোকানে পড়ে থাকে। এই বইয়ের থেকেই এক দু'টো মন্ত্র আউড়ে নন্দ মনে এমন বল পেলো যে দিব্যিদৃষ্টিতে স্পষ্ট দেখতে পেল যে দক্ষিণপাড়ার সলিল দত্তর ছোটমেয়ে নির্মলার সঙ্গেই তাঁর বিয়ে হবে৷ তন্ত্রের সত্যকে তো আর মিথ্যে হতে দেওয়া যায়না, তাই নন্দ স্থির করলে যে সে নিজেই নিজের সম্বন্ধ নিয়ে সলিল দত্তর বাড়িতে হাজির হবে। তন্ত্রে পাওয়া আশ্বাস তো আর মিথ্যে হতে পারেনা৷ কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল সংসারে বাঁধা পড়ে আর কী হবে। তন্ত্রের স্বাদ একবার যে পেয়েছে, তাঁর মুক্তি তো শ্মশানে স্তব্ধতা আর অমাবস্যার অন্ধকারে। নির্মম গেরস্থালীতে আটকা পড়লে তাঁর চলবে কেন?

কিন্তু এই সাতপাঁচ ভাবনার মধ্যেই ঘটল সেই বিশ্রী গোলমেলে ব্যাপারটা। ঘরের কোণে পড়ে থাকা ঝাঁটাটা উড়ে এসে নন্দকে পেটাতে আরম্ভ করল। পেটাতে শুরু করল অথচ থামার নাম নেই।  এ'দিকে সে বইতে উড়ন্ত ঝাঁটার পিটুনি আটকানোর কোনও টোটকাও বাতলে দেওয়া নেই৷ 

আধঘণ্টা এক তরফা উড়ন্ত ঝাঁটার হাতে বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার পর  রাগের চোটে নন্দ সেই তন্ত্র টোটকার বইটাকে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে ফেলে দিল। ব্যাস, অমনি ঝাঁটা বাবাজীও ঠাণ্ডা। কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড। 

নাহ্, নন্দ ঠিক করলে যে তান্ত্রিক হওয়ার ব্যাপারটা আপাতত মুলতবি রাখতে হবে। যত্তসব বিটকেল ব্যাপার। তার চেয়ে বরং দক্ষিণপাড়ার দত্তবাড়ির ছোটমেয়েটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে বিয়েথার ব্যাপারটা সেরে ফেললে একটা কাজের কাজ হবে৷ 

***

- গিন্নী, ছেলেটাকে এ'বার ছাড়ো। 

- সে আহাম্মককে একলা ছাড়ার উপায় আছে? নিজের কোনও ব্যাপার তাঁর বিন্দুমাত্র খেয়াল থাকে?

- আদরে যেমন বাঁদর করেছ, তেমনটাই তো ভুগতে হবে। 

- নন্দ তোমার ছেলে নয় যেন?

- আমি ওর বাপ। ওকে আলবাত ভালোবাসি। কিন্তু তা'বলে মরার পরেও চটিবইয়ের ভূত হয়ে ওর দেখভাল করাটা বাড়াবাড়ি।  অন্যান্য ভূতেরাও এ'সব বাড়াবাড়ি শুনলে ছি ছি করবে।

- বাড়াবাড়ি এ'টা?

- বাড়াবাড়ি নয়? নন্দর মনখারাপ হলে ম্যাজিকের চটি বই সেজে ওর পিছু নেওয়া। শরীর খারাপ হলে হোমিওপ্যাথির বই হয়ে ওকে টোটকা বাতলে দেওয়া। তন্ত্রের বইয়ের চেপে ওর বাড়ির কাজ করে দেওয়া, এগুলো বাড়াবাড়ি নয়?

- নন্দটা যে বড় একা গো। মা হয়ে আমি কী করে...।

- এ'বার অন্তর ওকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাও গিন্নী।

- সে ব্যবস্থাই তো করে এলাম এ'বারে। দত্তবাড়ির ছোটমেয়েটা বড় মিষ্টি। আর ও মনে মনে নন্দকে বেশ পছন্দও করে। নেহাত নন্দটা হাবলা তাই এদ্দিন টের পাইনি। ওই তন্ত্রের অছিলায় সে বুদ্ধি নন্দর মাথায় রেখে এসেছি।

- সে তো বুঝলাম, কিন্তু ওকে হঠাৎ ঝেঁটাপেটা করতে গেলে কেন?

- গবেট ছেলে ভাবছিল সংসার ছেড়ে তান্ত্রিক হবে৷ আমি দেখলাম এ তো উল্টোবুঝলিরাম। ব্যাস, ঝ্যাঁটা তুলে দিলাম আচ্ছা করে। ঘা-কতক পিঠে পড়তেই সব পাগলামি ঠাণ্ডা আর কী।

Saturday, May 30, 2020

"দ্য লোল্যান্ড" প্রসঙ্গে


যিনি "দ্য লোল্যান্ড" রেকমেন্ড করেছিলেন তিনি এককথায় এ উপন্যাস সম্বন্ধে বলেছিলেন; "বিষাদসিন্ধু"।

বিষাদসিন্ধুতে যে মিঠে রোদ্দুর এসে মিশেছে, সে'টা টের পেতে হল বইটা পুরো পড়ে। ঝুম্পা লাহিড়ীর লেখা আমি সদ্য পড়েছি। কিছুদিন আগে পড়েছিলাম 'নেমসেক' আর দু'তিনদিন আগে শেষ করলাম নেমসেক। সে বই সম্বন্ধে চারটে মনের কথা।

১।

কলকাতা সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে ক্লিশেয় মাখামাখি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মনে রাখতে হবে যে লাহিড়ীর পাঠক আন্তর্জাতিক; তাঁদের কাছে যে ধরণের কলকাতা বিষয়ক ডিটেলিং চমৎকার  ঠেকবে, বাংলার (এবং কলকাতার) বাঙালির কাছে সেই ডিটেলিংই ক্লিশে ভারে ক্লিষ্ট মনে হতে পারে৷ কিন্তু লাহিড়ীর গুণ সে'খানেই। তাঁর বর্ণনা প্রায় নিখুঁত, বাহুল্যবর্জিত আর তাঁর ভাষা প্রাণবন্ত।  কলকাতার যে'টুকু তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে, সে'টুকু পড়লে আজীবন কলকাতায় বন্দী কোনও মানুষেরও দিব্যি ভালো লাগবে বলে আমার মনে হয়। অফিস যাওয়ার পথে রোজ টালিগঞ্জ পেরিয়ে যাই, এ বইতে টালিগঞ্জ একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক'দিন ধরে যখনই টালিগঞ্জ পেরোতে হয়, 'দ্য লোল্যান্ড'য়ের সুভাষ, উদয়ন আর গৌরীর কথা মনে পড়ে। বেলা নামের এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে যার টালিগঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ মাত্র কয়েকদিনের। আর হ্যাঁ, নেমসেকের কলকাতার তুলনায় লোল্যান্ডের কলকাতার ব্যপ্তি অনেকটা বেশি। 

 ২। 

বিষাদে মিঠে রোদ্দুরের ব্যাপারটা সামান্য খোলসা না করলেই নয়। লোল্যান্ডে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র গৌরী। সে আদর্শ বলে নয়। বরং তাঁর ভুলভ্রান্তিগুলোই এ উপন্যাসের মূল রসদ। সত্যি কথা বলতে কী উপন্যাসের মূলে রয়েছে একটা অস্থির সময় আর ক্যাটালিস্ট হয়ে উঠেছে গৌরীর অন্ধকারটুকু। কত মানুষের ঘেন্না, রাগ আর বিরক্তি সামাল দিয়ে গৌরী পথ হেঁটেছেন। একদিকে যেমন ভালোবেসেছেন, অন্যদিকে প্রকাণ্ড সব ভুলও করেছেন৷  হলফ করে বলতে পারি যে একসময় পাঠকের সমস্ত রাগ এসে পড়বে গৌরীর ওপর। কিন্তু সেই উপন্যাসের এই কাল্পনিক চরিত্রটি যেন ভালো থাকে, যেন সামান্য স্বস্তি খুঁজে পায়; এ আশাটুকুও পাঠকের বুকের মধ্যে আনচান তৈরি করবেই। লাহিড়ীর লেখায় যে অসাধারণ 'এমপ্যাথি' রয়েছে, তার মাধ্যমেই গৌরীকে ভালোওবাসবেন কিছু (বা বেশিরভাগ) পাঠক। 

৩। 

বাপ-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে কত লেখা পড়ি। বাপ মেয়ের ভালোবাসাটুকুর ওম অনুভব করার জন্য এ বই হয়ত আবার পড়ব। সুভাষের বেলাকে আঁকড়ে রাখা আর বেলার ভেসে যেতে চেয়েও ভেসে না যাওয়া, এ'সবটুকুর মধ্যেই সুভাষের ভালোবাসা। হেঁয়ালি বা স্পয়লার নয়; তবু বলি যে সুভাষ সে অর্থে বেলার বাবা নন৷ আবার সুভাষ যে ভাবে বেলার পিতা হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাপ-মা দু'জনের ভালোবাসা জুড়লেও বোধ হয় সুভাষের স্নেহের গভীরতার সঙ্গে তুলনা চলেনা।  হয়ত এমন একটা সময় আসে যখন বৃদ্ধ বাপ-মা সন্তানের স্নেহের মধ্যে আশ্রয় খোঁজেন৷ সুভাষকে সে আশ্রয় দিয়ে নিজের বুকে টেনে নিয়েছিল বেলা, মায়ের মতই। বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে সে বাপ কা বেটি আর কী। 

৪। 

গল্পের পরিসর চল্লিশের দশকের কলকাতা থেকে ইন্টারনেট সমৃদ্ধ আধুনিক দুনিয়া। এসেছে নক্সাল আন্দোলন প্রসঙ্গ৷ এসেছেন উদয়ন নামের এক উজ্জ্বল তরুণ, হারিয়েও গেছেন৷ খুন হন উদয়ন, নিজের বাবা মা ও স্ত্রীর চোখের সামনে। সে মৃত্যুর মেঘ আবছায়ায় ভরে দিয়েছে গোটা উপন্যাস। সে মৃত্যুর যন্ত্রণা বয়ে বেড়িয়েছেন উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র। উদয়নকে ভালোবাসা প্রতিটি মানুষ সে যন্ত্রণায় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে রইলেন অথচ একে অপরের হাত ধরতে পারলেন না। সেই পাহাড়প্রমাণ মনখারাপের মধ্যেই এই ভালোবাসার উপন্যাস। বার বার ফিরে এসেছে উদয়নের মৃত্যু, উপন্যাস শেষও হয়েছে সেই মৃত্যু আর একটা ব্যর্থ আন্দোলনের যন্ত্রণায়৷ কিন্তু মৃত্যু আর যাবতীয় ব্যর্থতা পেরিয়ে এ উপন্যাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ভালোবাসা আর কলকাতার গল্প৷

Sunday, May 24, 2020

দাদার লাইব্রেরি

- দাদা।


- কী ব্যাপার পিলু? এত রাত্রে?


- মনে হল তুই হয়ত এখনও ঘুমোসনি। তাই ভাবলাম যাই একবার...।


- আয়। বস।


- কী পড়ছিস?


-  ইংরেজি নভেল পড়ে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। ভাবলাম একটু শরদিন্দু ঝালিয়ে নিই। তোর ডিনার হয়েছে রে পিলু?


- দাদা। রাত ক'টা বাজে সে খেয়াল আছে? পৌনে একটা৷ আর নীলাকে তো জানোই, রাত ন'টার মধ্যে খাওয়াদাওয়া না করলেই এক্কেবারে হুলুস্থুল শুরু করবে।


- নীলার শাসনে আছিস তাই কোলেস্টেরলে পিষে মারা যাসনি এখনও। 


- ছেলেবেলায় মায়ের শাসন। আর এখন বৌয়ের। তোর তো আর সে বালাই নেই, বেশ আছিস।


- বৌ না থাক। বই তো আছে। আর বইও শাসন করে, সোহাগও করে। এই লাইব্রেরি কত সাধ করে বানানো বল দেখি।


- তা বটে। টিকলিকে তো আমি বারবার বলি, জ্যেঠুর লাইব্রেরিতে যা৷ দু'টো বই উল্টেপাল্টে দেখ৷ তোর মত ভোরেশাস রীডার না হোক, মাঝেমধ্যে দু'একটা বই তো পড়তেই পারে বলো। কিন্তু না। সে দিনরাত শুধু ওই মোবাইলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে। 


- দিনকাল পাল্টেছে। বইটাই তো আজকাল একমাত্র রিসোর্স নয়। তুই বরং ওকে জোর করিস না। 


- জোর করলেও সে মেয়ে পাত্তা দেবে নাকি৷ ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগ। তার ওপরে সদ্য কলেজে যাওয়া শুরু করেছে, তা'তে বাড়তি আর এক জোড়া ডানা গজিয়েছে। 


- পিলু। বুড়োদের মত খিটখিট করিসনা। নতুনদের সব খারাপ আর আমাদের সব ভালো, এ'সব ন্যাকাপনা আমার অসহ্য লাগে। বাড়িতে এত বড় লাইব্রেরি, তুইই বা ক'টা বই পড়েছিস গত দু'বছরে?


- ব্যবসাপত্তর সামলে আর পড়ার সময় কোথায় বল৷ আমার ওই ইকনমিক টাইমসই ভালো। তা দাদা, আর কতক্ষণ পড়বি? এত রাত হল...।


- পড়ার জন্য এই রাতটাই ভালো সময় বুঝলি। দিনের গোলমালে বরং ফোকাস নষ্ট হয়। তা হ্যাঁ রে পিলু, তোর চেহারাটা এত শুকনো লাগছে কেন?


- ও তেমন কিছু না।


- তুই আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট পিলু। কাস্টোমারদের ফাঁকি দিয়ে বাড়তি দু'পয়সা কামিয়ে নিচ্ছিস নে, আমার চোখ ফাঁকি দিতে পারবি না। 


- বাজারের যা অবস্থা। ডিপ্রেশন,  মিসগভার্নেন্স, শেয়ারমার্কেট রক্তারক্তি। তার ওপর কোরাপশন; গত বছরখানেক ধরে ব্যবসাটা যে কী'ভাবে চালাচ্ছি তা আমিই জানি। 


- পিলু, আমি দেখি তো তোর ব্যস্ততা।  আর কেউ না জানুক, আমি তো জানি তুই উদয়াস্ত কী পরিশ্রম করিস। শোন, আমি তোর দাদা। এক বাড়িতে আমরা থাকি। আমি একতলায় তুই দোতলায়, অথচ দিনের পর দিন আমাদের দেখা হয়না৷ এই যে তুই আজ মাঝরাত্রে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলি, কী ভালোই যে লাগল। রোজ আসিস না কেন? নীলা বারণ করে? 


- সে'সব কথা থাক দাদা।


- যাকগে, ব্যবসার সমস্যা কথা কিছু বলছিলিস। 


- দাদা, বাড়তি কিছু টাকা ঢালতে না পারলে ব্যবসাটা ভেসে যাবে। টিকলি আর নীলাকে নিয়ে যে কী বিপদে পড়তে হবে আমায়..। আর দুম করে টাকাটা আমি কী করে জোগাড় করব বল।


- পিলু। তুই কি ফের বাড়ি বিক্রির কথা বলতে এসেছিস?


- গোটা বাড়িটা আমরা বিক্রি কেন করব দাদা? তুই কী ভাবিস, এ বাড়ির প্রতি আমার টান নেই? তোকে তো আগেও বলেছি কতবার; শুধু একতলার এই উত্তরের দিকটা বেচে দেব। লীগাল দিকটা অলরেডি দেখে নিয়েছি৷ আর দ্যাখ, এত বড় বাড়ি মেন্টেন করা এমনিতেও আমার পক্ষে..। তাছাড়া লাহাদের অফারটা লুক্রেটিভ। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর খুলতে চায়। পোজিশন ভালো, মার্কেট রেটের আড়াইগুণ অফার করেছে। 


- পিলু..।


- প্লীজ দাদা..আমার কথাটা ভাব একবার...।  শুধু তো এই একতলার উত্তর দিকটা..।


- কিন্তু এই সে'খানেই তো আমার এই লাইব্রেরি পিলু...এই লাইব্রেরি ভাঙলে আমি কোথায় যাব...। এই বইগুলো ছাড়া তো আমার আর কিছুই নেই। 


- প্লীজ। আমার জন্য একটু ভেবে দেখবি?


- কথাটা তুই তো আগেও বলেছিস। বহুবার। আমার উত্তরও তো তুই জানিস। এ লাইব্রেরি আমি ছাড়তে পারব না। আর আমার জোর করিস না, ফল ভালো হবে না।


- তুই আমার কথাটা একবারও ভাববি না দাদা?


- আমি তোর চোখের দিকে তাকিয়ে তোর মনের কথা টের পাই পিলু। আজও আমি সে'টা পারি। এ লাইব্রেরি নষ্ট করতে তুইও চাস না, তা আমি বেশ বুঝি। আর শোন, নীলাকে বলে দিস। এ লাইব্রেরি আমি কিছুতেই ছাড়ব না।


- আমি আসি দাদা। অনেক রাত হল।


- পিলু।


- কিছু বলবি?


- তোকে সত্যিই বড় শুকনো দেখাচ্ছে রে। শরীরের অযত্ন এ'বার একটু কম কর। আর...আর মাঝেমধ্যে আসিস  আমার ঘরে, কেমন? না হয় রাত্রের দিকেই আসিস, নীলারা ঘুমোলে। কোনও বাড়ি বেচার মতলব ছাড়া আসিস কখনও। দুই ভাই মিলে না হয় একটু খোশগল্প করা যাবে। আসবি পিলু?


- গুডনাইট দাদা। 


***


- নাহ্। দাদার সেই একই গোঁ। লাইব্রেরি সে ছাড়বে না। 


- যত বাজে কথা। এ সব তোমারই বদমায়েশ।


- কী যাতা বলছ নীলা?


- আমি ঠিকই বলেছি। তুমিই ওই লাইব্রেরির মায়া ত্যাগ করতে না পেরে লাহাদের অফার রিফিউজ করছ। আর সে'টা চালাচ্ছ দাদার নামে।


- কতবার বলব, আমি দাদার লাইব্রেরি সহ বাড়ির ওই অংশটা বেচে দিতে চাই। কিন্তু দাদা অ্যালাউ না করলে..।এইতো, আজও দাদা বললে, লাইব্রেরি হাতছাড়া হলে তার ফল ভালো হবে না। 


-  যত্তসব বাজে কথা। 


- বাজে কথা?


- বাজে কথা নয়? দু'বছর আগে যে মানুষটা মারা গেছে তাকে নাকি তুমি শুধু দেখতে পাও। আর চাইলেই তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করে আসো। আর সে নাকি বাড়ি বিক্রি আটকাচ্ছে...। আমার মেজদা বললে হালিশহর থেকে ওঝা নিয়ে এসে হিল্লে করে দেবে। তা'তেও তোমার আপত্তি...তোমারই কোনও মতলব আছে..।


- শোনো নীলা। দাদা আজীবনের কমিউনিস্ট।  ধান্দাবাজ পলিটিকাল ফায়দা লোটা লোক নয়, মনেপ্রাণে কমিউনিস্ট।  মরার আগে উকিল ডেকে এমন লিখিত ব্যবস্থা করে গেছিল যাতে কেউ ধর্মমতে ওঁর শ্রাদ্ধ না করে। সেই কম্যুইনস্ট দাদার আত্মাকে আমি ওঝা লাগিয়ে বাড়িছাড়া করব গো নীলা? ধর্মে সইবে?

Tuesday, May 19, 2020

বংঈটসের বিরিয়ানি রান্না প্রসঙ্গে

এই অসময়ে মনখারাপ হলেই সর্বকালের অন্যতম সেরা (এবং জরুরী) ভিডিও অর্থাৎ  বংঈটসের কলকাতা বিরিয়ানির রেসিপিটা লূপে চালিয়ে দিয়ে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকছি আর "মার্তণ্ড মার্তণ্ড মার্তণ্ড" রিদমে "বিরিয়ানি বিরিয়ানি বিরিয়ানি" বিড়বিড় করছি।

এই রেসিপি ভিডিও সম্বন্ধে কয়েকটা মনের কথা না বললেই নয়। 

১। ভিডিওর গোড়াতে বিরিয়ানির হলদে আলু নরম সুরে ভাজা হচ্ছে, তারপর পেঁয়াজের 'বিরিস্তা'। মনে তখন শ্যামল মিত্তিরে ফুরফুর। 

২। তারপর বিরিয়ানি মশলা তৈরি। সে কী থ্রিল!  আর্কিমিডিস চৌবাচ্চা-স্নান যেন নিজের চোখের সামনে দেখতে পারছি। সামান্য তুকতাকে যে কী ঘ্যামগোত্রের বিগব্যাং ঘটতে পারে..আহা।

৩। এরপর পাঁয়তারা পক্ষের শেষ, অ্যাকশন পক্ষের শুরু। মাংসের ম্যারিনেশন। দই,মশলাপাতি দিয়ে মাংসমাখা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল এইবেলা গভর্নমেন্টের উচিৎ আইন করা; যাতে নজরুলগীতি বা বাউল না গেয়ে কেউ যেন ম্যারিনেশনের মাংস না মাখে। 

৪। সরু লম্বা চালের ভাত দেখলে এমনিতেই মনে হয় পৃথিবীতে আজও কতটা গভীর রোম্যান্স জমে আছে। আর যে চাল বিরিয়ানিতে গিয়ে ঠেকবে, তা সেদ্ধ হতে দেখা তো মেডিটেশনের ঠাকুরদা। ভিডিওর এ জায়গায় আমি বুকে পাশবালিশ টেনে নিই।

৫। যথাযথ ম্যারিনেশন শেষে কষা হয় মাংস, বুকে নামেন কবীর সুমন আর উথাল-পাতাল প্লাস ভাবনা নেশায় চিন্তামাতাল। 

৬। বিরিয়ানি দমে বসানোর আগে মশলাপাতি, আতর, কেওড়ার জল, গোলাপজল, কেশর, ঘি মাখন, খোয়া ইত্যাদি নিয়ে যে জটিল অ্যালকেমিটা ঘটে, তা দেখে ভরসা পাই। নাহ্, রক্তচোষা শয়তানি বা নিরেট ধান্দাবাজিটুকুই মানুষের শেষ পরিচয় হয়ে থাকবে না। যারা বিরিয়ানি বানাতে পারে, তারা নেহাৎ ফেলনা নয়; ভালোবাসা তাদের মজ্জায়। 

৭। জাদুকর দর্শকের চোখের সামনে পর্দা টানবেনই৷ অথবা হয়ত কাউকে পুরে ফেলবেন একটা ঢাউস আলমারিতে। সেই আড়ালটাই ম্যাজিকের আত্মা৷ ঢাকা পাত্রের আড়ালে ভাত মাংসের অঙ্কমাপা মিলনে জেগে উঠবেন মহানায়ক। সবার অগোচরে বিরিয়ানি-অরিন্দম বলে উঠবেন "আই উইল গো টু দ্য টপ, টু দ্য টপ, টু দ্য টপ"! 

ভিডিওটা দেখে মনের মধ্যে থেকে স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে। মাংস ভাত মিলিয়েমিশিয়ে যা নয় তাই পোলাও গোছের কিছু করে আর বলার চেষ্টা করব না " আজ বাড়িতে বিরিয়ানি বানিয়েছি"। 
সাধনায় শর্টকাট আর কবিতায় গাইডবই; চলে না৷ 

মনখারাপ যতই জমাট হোক, এ ভিডিও একটানা বার দশেক দেখলেই মনে হয় কোনও পাহাড়ি গ্রামের ঝকঝকে রাত্রির আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আছি। 

সাবাশ বংঈটস। 

আরসালানে সিরাজে বা আমিনিয়ায় যারা মেগাস্কেলে নিয়মিত এ ম্যাজিক হাঁকাচ্ছেন; তাঁদের সেলাম।

***

ভিডিওটা নতুন নয়। প্রায় বেশিরভাগ মানুষই আশা করি বহুবার দেখেছেন।  তবু লিঙ্কটা দিয়ে রাখলামঃ

https://youtu.be/SbWGXcZTYzg

Sunday, May 17, 2020

বসের প্ল্যান

- বস!

- বলে ফেলো দত্ত।

- বলছি, সেলসটীম খুব রেস্টলেস হয়ে উঠছে, মেমোটা এবার ইস্যু না করলেই নয়। 

- কীসের মেমো?

- ওই যে। সামনের কোয়ার্টারের সেলস টীমের টার্গেট। ছেলেরা হপ্তাখানেক ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে কিনা...। 

- সেলসের ছেলেপিলে; প্রয়োজনে লোহাকুচির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত মেখে খাবে, মনুমেন্টের মাথায় মশারি টাঙ্গাবে, জিরাফের গলায় নেকটাই পরাবে। মেমোটেমোর মত নেকু জিনিসে তাদের কাজ কী। 

-  বস, যাই বলুন। এত হাই টার্গেট সেট করা হচ্ছে আজকাল। আগাম টার্গেট মেমোটা পেলে ছেলেমেয়েগুলো একটু আগেভাগে প্ল্যান করে নিতে পারত। একটু প্রস্তুত হতে পারত। তাছাড়া এই মেমোতে শুধু যে টার্গেট আছে তা তো নয়। ইনসেন্টিভ পাল্টে যাচ্ছে। অনেকের চাকরীবাকরী নিয়েও টানাটানি হতে পারে, অন্তত মেমোর ড্রাফট পড়ে আমি তেমনই বুঝছি। 

- দত্ত, তোমার চাকরী নিয়ে তো টানাটানি পড়বে না। তুমি খামোখা অত মাথা ঘামাতে যাচ্ছ কেন?

- কিন্তু এই লুকোছাপাতে সেলসটীমের মনবল একটু...একটু...।

- সেলসটীমের মনোবল দিয়ে কোন কাঁচকলাটা হবে দত্ত? ইয়ার এন্ড রিভিউতে বাহাত্তর খানা স্লাইড জুড়ে দলের মনোবলের বাহার দেখাব? 

- বস। আপনি গুরু, আমিই গরু। তবে পারমিশন দিলে সামান্য হাম্বা করি। 

- বলে ফেলো। 

- সেলস টীমের মনোবল ইস ডাইরেক্টলি প্রপোরশনাল টু সেলস নাম্বার, তাই না?

- উইথ ডিউ রেস্পেক্ট টু ইয়োর হাম্বা, মাই ডিয়ার দত্ত। মনোবল মানেই পার্ফরমেন্স; ওই টেম্পারামেন্ট নিয়ে এইচআরে গিয়ে বাতেলা ঝাড়ো গিয়ে। সেলসটীম সামলানো তোমার কর্ম নয়। 

- মনোবলের সঙ্গে পার্ফরমেন্সের যোগাযোগ নেই বস ? 

- মনোবল দিয়ে টেডটক হয়, লাল নীল হাবিজাবি পোস্টার হয়। পার্ফরমেন্সের জন্য দরকারি হল ভয়। 

- ভয়?

- ইয়েস দত্ত। ফিয়ার জেনারেটস ফায়্যার। আর ওই আগুনটুকু না থাকলে সেলসটীম মাধুকরী করে বেড়াবে, বেচতে পারবে না। 

-  কথামৃত লেভেল বস। কিন্তু তবু... একটিবার ভেবে দেখুন...আগামীকাল থেকে নতুন কোয়ার্টার শুরু...এখনও যদি মেমোটা রিলিজ না করা হয়...।

- আগামীকাল। আগামীকাল শুরু হবে রাত বারোটার পর। আর আজ এখন সবে বেলা আড়াইটে। এখনও সাড়ে নয় ঘণ্টা হাতে। 

- হ্যাঁ...মানে ইয়ে...বস...মেমোটা তো তৈরি...। 

- তাতে কী হয়েছে? তৈরি হলেই বিলি করতে হবে? দাঁড়াও। আগে ব্যাটাচ্ছেলেদের তড়পাও সামান্য। পারফর্মেন্সের জন্য দরকার ভয়, ভয়ের জন্য কী দরকার?

- কী বস?

- মিস্ট্রি। অন্ধকার। ওরা যত অন্ধকারে থাকবে, তত ভয়ে ছটফট করবে। আর তত সহজে ওদের নাচানো যাবে। এবং ছটফটের অনুপাতে বাড়বে পারফর্মেন্স। শোনো দত্ত...ওই মেমো যেন রাত আটটার আগে সেলসটীমের কাছে না পৌঁছয়।

- কিন্তু মেমো এক্কেবারে তৈরি, আপনিও অ্যাপ্রুভ করেছেন। টীমের ছেলেমেয়েদের যে কী বলি...। 

- ওদের বলে দাও মেমো নিয়ে এখনও ম্যানেজমেন্ট ধন্দে আছে।  বিকেলবেলা ডিরেক্টররা মিটিং-য়ে বসবে। রাত আটটা নাগাদ ওই মেমো রিলিজ করে দিলেই হল। অকারণ  প্ল্যানিংয়ে অনেক সমস্যা হে। তাছাড়া আজকালকার ছেলেছোকরাদের প্রশ্নের আর শেষ নেই । সব কথাতেই এটা কে'ন, ও'টা কেন; অসহ্য। শেষ মুহূর্তে মেমো পাবে, আজেবাজে প্রশ্নের সময় সুযোগ কোনোটাই থাকবে না। এ মেমো দিব্যি বেরিয়ে যাবে। হেহ হেহ। 

- তা আপনি বলছেন যখন...কিন্তু বস...মেমো পড়ে যা বুঝেছি, অনেকের চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়তে পারে। 

- সে জন্যেই তো সাস্পেন্সটা খুব কাজের জিনিস ভাই দত্ত। বাবাবাছা বলে কি কাউকে ডারউইন শেখানো যায়? ও মহামন্ত্র ঠেকে না শিখে উপায় নেই। 

- বেশ। তা'হলে রাত আটটা নাগাদই না হয় মেমোটা সেলস টীমের কাছে পাঠাব। 

- গুডবয়। আর দত্ত, আমার হয়ে একটা মনোবলে সুড়সুড়ি দেওয়া মেসেজ তৈরি করো দেখি। এমন একটা কিছু যা পড়েই মনে হবে যাই এখুনি আড়াই কিলোমিটার দৌড়ে আসি। তোমার মেমোর সঙ্গে না হয় সেই মোটিভেশনাল মেসেজটাও বিলি করে দিও? উইথ লাভ ফ্রম ডিয়ার বস বলে? কেমন?

- ইয়েস বস।

Wednesday, May 13, 2020

ট্যুইটস অফ আইসোলেশন ১৩


ফের একদিন। 

ভীড়। ধরুন, ওই চৈত্র সেলে গড়িয়াহাট মার্কা ভীড়।

আর ভীড়ে হাঁসফাঁস অবস্থায় কেউ আমার পা মাড়িয়ে ফেলবেন। এবং তারপরেই চেনা স্ক্রিপ্ট ভেস্তে দিয়ে মারকাটারি মিরাকেল।  

"অন্ধ নাকি শালা" বলে আমি চিৎকার করে উঠব না।
"ভীড় ফুটপাথে অমন ট্যালার মত ল্যাম্পপোস্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে অথচ সামান্য টোকা লাগলে ন্যাকাপনা। আচ্ছা গবেট মাল" মার্কা পাল্টা উত্তর ভেসে আসবে না। 

বরং পা মাড়িয়ে যাওয়া মানুষটি ঘুরে হন্তদন্ত হয়ে কাছে আসবেন। জিভ কেটে বলবেন; "ছিঃ ছিঃ,অমন ইস্টুপিডের মত কেউ হেঁটে যায়? আমি একটা অখাদ্য। বলি, পায়ে কি খুব লেগেছে দাদা"?

আমি তৎক্ষণাৎ লাজুক সুরে জানাব " আরে না না, ভীড়ের মধ্যে অমন অল্পস্বল্প হয়েই থাকে। আরে পা মাড়িয়েছেন, বুলডোজার তো আর চালাননি। আমিই বরং অকারণে থমকে দাঁড়িয়ে গেছিলাম। কোনও মানে হয়? হাতে অতগুলো ভারী ব্যাগ নিয়ে ছুটছেন আপনি, পায়ে পা লাগতেই পারে। ধুস, ও নিয়ে ভাববেন না"।

দু'টো দিলখোলা হাসির আদানপ্রদান হবে। পা মাড়িয়ে দেওয়ার ব্যথা বা পা মাড়িয়ে দেওয়ার লজ্জা;তিরিশ সেকেন্ডে গায়েব কিন্তু সে হাসির ওম তিরিশ দিন মন চনমনে রাখবে। 

হাল ছাড়িনি। এই করনো-ধ্যাষ্টামোর শেষে ভীড় ফিরে আসবে। সেই ফিরে আসা ভীড়ে আমাদের হাঁসফাঁসটুকুও দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকবে। কিন্তু সেই নতুন ভীড়ের পুরনো মানুষগুলো আগের চেয়ে সামান্য নরম হবে। হবেই। হতেই হবে।

Tuesday, May 12, 2020

ব্যালেন্স

- সুমিতদা! 

- হাঁপাচ্ছিস কেন?

- মিস্টার লাহিড়ীর ব্যাপারটা শুনেছেন?

- বস আগে। এক গেলাস জল খা। তারপর না হয়...।

- সুমিতদা...বসার সময় কোথায়? লাহিড়ীর কেসটা তো অনন্তপুর থানার আন্ডারে।  এখন বেরোলেও পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। আপনার ড্রাইভার আজ এসেছে নাকি ট্যাক্সি ডাকব?

- অরিন্দম। বড্ড উত্তেজিত হয়ে আছিস। নিমাইদাকে বলেছি দু'টো চা দিতে৷ লাঞ্চ করেছিস তো?

- লাঞ্চের আর সময় পেলাম কই৷ অনলাইনে খবরটা ফ্ল্যাশ হতেই ছুট দিলাম..।

- আমারও লাঞ্চ করা হয়নি। চা'টা খেয়ে নে। তারপর নিমাইদাকে বলছি ছুটে গিয়ে দু'টো রোল নিয়ে আসবে।

- সুমিতদা..আমাদের হাতে অত সময় নেই...আপনি খবরটা শুনেছেন তো?

- পুলিশ লাহিড়ীর এগেন্সটে কেস নিয়েছে৷ বিভিন্ন পলিটিকাল কাঠি নেড়েও মাফিয়া লাহিড়ী পুলিশকে ঠুঁটোজগন্নাথ করে রাখতে পারেনি। আর হ্যাঁ, এই বয়সেও অবিনাশ মিত্তিরের পার্সিভারেন্সের জবাব নেই। ওই একটা সাতপুরনো আধভাঙা বাড়ি আঁকড়ে থেকে বুড়ো যা ফাইট দিল..ব্রাভো। থ্রেট, ইন্টিমিডেশনে থেমে না থেকে, নিজের গুণ্ডাও লেলিয়েছিল লাহিড়ী৷ কিন্তু তবুও বুড়োকে টলিয়ে বাড়িটা খালি করাতে পারল না।  ওই গুণ্ডাবাহিনীর জোরে লাহিড়ী তো কম পুকুর বোজালো না, অথচ এই অবিনাশ মিত্তির ব্যাটাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ল।

- খবরটা তা'হলে ঠিকঠাকই পৌঁছেছে আপনার কাছে৷ সুমিতদা... অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে গত বছর চারেক তো আপনি নিরন্তর ওই লাহিড়ীর মত জমিখেকো মাফিয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছেন৷ সুরজমল, মনোহর সিং, অজয় সান্যালদের মুখোশ খুলে ফেলার পিছনে আপনার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সে'টা গোটা শহর জানে। মিডিয়া বলুন, পুলিশ বলুন; আপনাকে সবাই যা ভক্তিশ্রদ্ধা করে...। লাহিড়ীর আগের কুকীর্তিগুলো সম্বন্ধে আপনার কাছে যা তথ্যপ্রমাণ, তা যদি এই সময় পুলিশের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তা'হলে...।

- তা'হলে কী হবে অরিন্দম?

- বৃদ্ধ অবিনাশবাবুর অন্তত একটু উপকার হয়৷ তাছাড়া লাহিড়ী পুলিশের জাল থেকে বেরোনোর আপ্রাণ চেষ্টাটুকু তো করবেই। কিন্তু আপনার মত একজন অ্যাকটিভিস্ট যদি..। সুমিতদা, আমাদের কিন্তু আর দেরী না করে..।

- কিছুক্ষণ আগেই লাহিড়ী আমায় ফোন করেছিল।

- লাহিড়ী? আপনাকে?

- নিজের সব দোষ মোটামুটি স্বীকার করেছে। 

- আরিব্বাস। স্বীকার করেছে?

- সব। এও আশ্বাস দিয়েছে যে অবিনাশ মিত্রের বাড়ির ওপর ওর আর কোনও লোভ নেই। আমিও সে সুযোগে দু'টো কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছি। ওর এই গুণ্ডাদলের দৌরাত্ম্য যে সুস্থসমাজে অচল, সে'টা ওর মুখের ওপর বলাটা জরুরী ছিল। 

- স্বীকার যখন করেইছে তখন তো আর চিন্তার কিছুই নেই। এ'বার সোজা পুলিশের কাছে গিয়ে...।

- অরিন্দম। আমি লাহিড়ীকে কথা দিয়েছি, এ ব্যাপারে আমি আর পুলিশের কাছে যাব না। আর ব্যাপারটা তো মিটেই গেছে।

- কথা দিয়েছেন সুমিতদা? লাহিড়ীকে?

- এই অবিনাশ মিত্তির ভদ্রলোকও খুব একটা সুবিধের নয় রে অরিন্দম। টাকাপয়সার ব্যাপারে ভদ্রলোক তেমন বিশ্বাসযোগ্য বোধ হয় নন। নেহাত বৃদ্ধ, একলা মানুষ...তাই সিমপ্যাথি ব্যাপারটা চলে আসছে..।

- সুমিতদা! অবিনাশ মিত্তিরের যতই দোষ থাক। লাহিড়ীর অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।  গুণ্ডা লেলিয়ে যে মানুষ প্রমোটারি চালায়..।

- সে অপরাধের শাস্তি পাওয়া অবশ্যই উচিৎ।  কিন্তু অরিন্দম, আমি পুলিশও নই, গভর্নমেন্টও নই। শহরের সমস্ত বজ্জাত প্রমোটারকে শাস্তি দেওয়ার দায় শুধু আমি একা বয়ে বেড়াব, এর কোনও মানে নেই।

- সমস্ত জেনে হাত গুটিয়ে বসে থাকা মানে তো ওর গুণ্ডার দলেই নাম লেখানো সুমিতদা। আপনার থেকে তো এই শিক্ষা পাইনি।

- অবিনাশ মিত্তির দিব্যি প্রপার্টি বগলে ড্যাংড্যাং করে বেরিয়ে যাবে। আর আমি খামোখা লাহিড়ীর গুণ্ডাদের হাতে হ্যারাসড হব কেন বলতে পারিস? সমস্ত লড়াই ব্যক্তিগত হয়ে পড়লে মুশকিল। সততার ইগোই শেষ কথা নয়, মাঝেমধ্যে ব্যালেন্স খুঁজে নিতে হয় অরিন্দম। 

- ইগো? আইডিয়াল বলুন। 

- আমি আর তর্ক করতে চাইনা। তুই চাইলে যেতে পারিস।

- প্রয়োজনে তাই যাব সুমিতদা৷ কিন্তু আমার যাওয়া আর আপনার যাওয়ার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। 

- আমাদের মধ্যে এই যে আকাশপাতাল ফারক, সে'টা শুধু বয়সের তফাৎ নয় অরিন্দম। ওই যে বললাম, আমার মধ্যে সততার ইগো নেই তাই আমি এদ্দূর আসতে পেরেছি। তাই লাহিড়ীর মত একটা রাস্কেলও আমায় ফোন করে কান্নাকাটি করে; কারণ ও জানে যে সুমিত দত্তর মতামতের একটা ওজন আছে। সুমিত দত্ত কিছু বললে সে'টা পুলিশ বা মিডিয়া সমীহ করবে। আইডিয়াল এক জিনিস, কিন্তু তা নিয়ে গোয়ার্তুমি আমি বরদাস্ত করতে পারিনা। নিজের এই ইগো ঝেড়ে ফেলতে যদি না পারিস, তা'হলে আমার মত কারুর সেক্রেটারি হয়েই জীবন কাটাতে হবে। যাকগে। আবারও বলছি, নিজেথানায় যেতে চাইলে যেতে পারিস।  তবে সে'খানে গেলে আর আমার অফিসে ফিরে আসবার কোনও প্রয়োজন নেই। কথাটা মনে রাখিস। 

****

- গুম মেরে আর কতক্ষণ বসে থাকবি অরিন্দম? চা'টা যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আর থানায় যেতে হলে বেরো এখন, দেরী করে লাভ কী। 

- নিমাইদাকে বরং রোলের বদলে চাউমিন আর চিলি চিকেন আনতে বলো সুমিতদা। সেই কোন সকালে দু'টো রুটি খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, খিদেয় পেটের নাড়িভুঁড়ি দলা পাকিয়ে যেতে বসেছে। 

Sunday, May 10, 2020

মা, এক নির্ভীক সৈনিক


"ভালোবাসার ছোট্ট হরিণ" আমার পড়া প্রথম শৈলেন ঘোষের লেখা, আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীতে৷ সে গল্প খুব ভালো লেগেছিল শুনে পাশের বাড়ির এক সহৃদয় কাকু আমায় পড়িয়েছিলেন "মা এক নির্ভীক সৈনিক"। ধার করা পূজাবার্ষিকীতে পড়েছিলাম, তাই পড়ার পর বুকে পাথর রেখে সে বই ফেরত দিতে হয়েছিল। অত ছোটবেলায় যে'টা সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল সে'টা হল 'স্তেপস'য়ের হিংস্র যাযাবর উপজাতিদের দৈনন্দিন জীবন। 'সাইথিয়ান' শব্দটা উল্লেখ উপন্যাসের শুরুর দিকেই ছিল আর আমার মনে মধ্যে শব্দটা গেঁথে গিয়েছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটা কারণে। সাঁইথিয়া নামে একটা রেলস্টেশন এ বাংলায় আছে, এই অকারণ মিল খুঁজে পেয়ে থ্রিলড হয়েছিলাম। বহুবছর পর ইন্টারনেট ঘেঁটে পড়েছিলাম সাইথিয়ানদের সম্বন্ধে;  আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ইউরেশীয় অঞ্চলের স্তেপস দাপিয়ে বেড়াত এই যাযাবর উপজাতিরা। শৈলেনবাবু লিখেছিলেন সাইথিয়ান (Scythian)-দের মধ্যে বিভিন্ন জাত; তার একটি হলো আসগুজাই। উইকিপিডিয়া বলছে সাইথিয়ানদের বিভিন্ন নামে ডাকা হত যেমন সাকা, ইসকুজাই, ইত্যাদি। 

গল্পের মূলে রয়েছে আসগুজাই দলের সেনাপতি স্তানের পুত্র কোহেন এবং কোহেনের মা আনাতুরি। তবে যে নামটা মনের মধ্যে আজও সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে আছে সে'টা হল আসগুজাই দলের নির্মম রাজা বুমবুজাং৷ বুমবুজাং নামটা বিড়বিড় করে খানতিরিশবার বললেই মনে হয় " এখুনি যুদ্ধে যাব"। শৈলেনবাবু এত সুন্দর সব নাম বাছতেন তাঁর রূপকথার গল্পের চরিত্রদের জন্য; আহা, তাতেই কেল্লা ফতেহ হয়ে যেত। আলা-ইজা, শিজুমন; এক একটা লাখটাকার নাম। 

আসগুজাইদের রক্তলোলুপতায় হাড়হিম করা বর্ণনা রয়েছে এই গল্পে। নির্মম হিমশীতল স্তেপসে ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়ানো মানুষ তাঁরা, গেরস্তবাড়ির নরম তাঁদের স্পর্শ করেনি কোনওদিন। এই দলের সঙ্গে ওই দলের খুনোখুনি সে'খানে নিত্যদিনের ব্যাপার। শত্রুর গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে গায়ের চাদর বানানো বা শত্রুর খুলি দিয়ে পানপাত্র তৈরি করাটাই তাঁদের একমাত্র ফ্যাশন। রক্তপাত ব্যাপারটা তাঁদের কাছে ছিনিমিনি৷ তা সেই খুনে শয়তান রাজা বুমবুজাংয়ের নেকনজর থেকে পড়ে যেতেই সেনাপতি স্তানকে নিকেশ হতে হয় খোদ রাজার হাতে৷ বুমবুজাং পারলে সে'দিনই খতম করে দিত শিশু কোহেন ও তাঁর মাকে। কিন্তু আনাতুরি কোনওক্রমে সেই কোলের শিশুকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচেন, আশ্রয় পান শত্রু শিবিরে। 

আনাতুরি কোহেনকে বড় করেন একটাই স্বপ্ন নিয়ে, কোহেন আর পাঁচটা খুনে যাযাবরদের মত রক্তলোলুপ হবেনা৷ কোহেন ভালোবাসতে শিখবে৷ মা কোহনেকে সর্বক্ষণ আগলে রাখেন; কোহেনকে বুঝতেই হবে এ রক্তারক্তি কতটা অর্থহীন। কিন্তু আনাতুরির স্নেহ কাটিয়ে একসময় কোহেন বেরিয়ে পড়ে রক্তের নেশায়, খুনখারাপির টানে৷ মায়ের কান্না,আদর ও শাসন; সমস্ত হেলায় ভাসিয়ে দেয় সে, কোহেনকে পেয়ে বসে যুদ্ধের নেশায়।

তরুণ কোহেনের হিংস্র হুঙ্কার আনাতুরিকে ভেঙেচুরে ফেলে কিন্তু নিজের দায়িত্বটা দিব্যি টের পায় সে। লতায় পাতায় এগোতে এগোতে এই অপূর্ব রূপকথায় একসময় হিংস্র সন্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান মা নিজে; মায়ের হাতে তখন অস্ত্র৷ মা তখন এক সৈনিক। মায়ের যুদ্ধ ভালোবাসার জন্য, খোকার যুদ্ধে খুনির দাপট। খোকা নির্মম, মা নির্ভীক। 

ছেলেবেলায় ধার করা পূজাবার্ষিকীতে পড়া এই উপন্যাস। তারপর ঘটনাচক্রে সেই পূজাবার্ষিকীটা বহুদিন কিছুতেই জোটাতে পারিনি।  কলেজের সম্ভবত সেকেন্ড ইয়ারে, ক্যালক্যাটা ইউনিভার্সিটির লাগোয়া ফুটপাথের পুরনো বইয়ের দোকান থেকে খুঁজে পেয়েছিলাম সেই পুরনো পূজাবার্ষিকীটা। হাতে পেয়েই ফের পড়ে শেষ করেছিলাম "মা এক নির্ভীক সৈনিক"। ছেলেবেলায় ভালো লাগা অনেক উপন্যাস এখন পড়লে মনে হয়;  আগে যেমন ভালো লেগেছিল বটে, এখন যেন তেমনটা মনে হল না। কিন্তু শৈলেনবাবুর বেশির ভাগ উপন্যাসের ক্ষেত্রেই এ দুশ্চিন্তা খাটেনা৷ আর "মা এক নির্ভীক সৈনিক" আমার পরে পড়ে যেন আরও বেশি ভালো লেগেছিল। এই ধেড়ে বয়সেও গল্পটা যখনই পড়ি, মনে হয় যেন আরও একটু বেশি ভালো লাগল। "জল নয়, আগুন"; এ কথা যেন এ উপন্যাসের ক্ষেত্রে আরও বেশি করে খাটে। 

শৈলেনবাবুকে আমরা যথেষ্ট সমাদর করতে পেরেছি কি? সে হিসেব করার যোগ্যটা আমার নেই। তবে যে রূপকথাগুলো উনি রেখে গেছেন, বয়স নির্বিশেষে বাঙালি পাঠকের জন্য সে'গুলো অত্যন্ত জরুরী।

আর হ্যাঁ, যদি এই গল্পটা আপনাদের বইয়ের তাকের কোনও কোণায় পড়ে থাকে; তবে আজকে পড়ে ফেলতে পারেন৷ আমি সোফায় মায়ের পাশে বসে একবার পড়ে ফেললাম; কোহেন ও তার মায়ের গল্প। 

হ্যাপি মাদার্স ডে।

Saturday, May 9, 2020

পঁচিশে বৈশাখ আর নৈবেদ্য


আজ সারাদিন ফেসবুক ও ট্যুইটার রবিপ্রণামে ভরপুর। আঁকা, পাঠ, গান, নাচ থেকে কার্টুন পর্যন্ত; যোগ দিয়েছেন সব বয়সের মানুষ৷ আর এ'সব কিছু আমার যে কী ভালো লাগল। কত চেনা মানুষ হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে বসেছেন বা খালি গলায় গান ধরছেন, কত খোকাখুকু কী অপূর্ব ভাবে কবিতা আবৃত্তি করছে, ঘরের মধ্যে বা ছাতের ওপর হয়ত কেউ নেচেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে। 

এক সময় মনে হত; আমাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথকে গেলানোর একটা প্রবণতা আছে। হয়তো আছেও বা৷ কিন্তু এখন মনে হয় এই যে এত মানুষ সাহস করে গান গেয়ে উঠছেন, কবিতা পড়ছেন, ছবি আঁকছেন; সে সাহসের মূল্য অসীম। এবং সেই গাওয়া গান বা পাঠ করা কবিতা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া; সে সাহস খানিকটা যুগিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে কেউ দড়াম করে গাইতে বললে অনেকেরই অস্বস্তি হয়; দুম করে ওই ভাবে গাওয়া যায় না নাচা যায়? কিন্তু এই স্মার্টফোন আর ফেসবুক/ট্যুইটার গোছের প্ল্যাটফর্ম মিলেমিশে; ব্যাক্তিগত স্পেস আর এক্সপোজার ব্যালেন্স করে একটা চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে।  

ফেসবুক জমানার আগে জানতাম পাড়ার স্টেজে বসে হারমোনিয়াম বাজাতে যে পারবে না তাঁর গান পাতে দেওয়া চলে না; রবিস্যারের গান হলে তো নয়ই। এখন সে ব্যাপারটা আমি একটু অন্যরকম ভাবে বুঝি। আমি ছাই গানবাজনার কিছুই তো বুঝি না। কিন্তু এ'টুকু বেশ টের পাই যে একজন মানুষ ভালোবেসে গান গাইছেন; এই গোটা ব্যাপারটা চাক্ষুষ করার মধ্যেও রয়েছে একটা দুর্দান্ত থ্রিল। নাচের ন'টুকুও  বুঝি না, কিন্তু এক ছোট্টখুকি তাঁর দিদিমার সঙ্গে ফুলে ফুলে ঢলে চলেছে; তার সৌন্দর্য বর্ণনা করার ক্ষমতা থাকলে আমি নভেলিস্ট হতাম।   এ দিনটা ফেসবুকে এমনভাবে ডালপালা বিস্তার না করলে জানতেই পারতাম না পাড়ার খিটখিটে জ্যেঠু হারমোনিয়ামের সামনে বসলে পান্তুয়া মেজাজের সলজ্জ মিঠে হাসি আবিষ্কার করে ফেলেন। 

মোদ্দা কথা হল, আজ গোটদিন ফেসবুক দারুণভাবে সরগরম ছিল। পরনিন্দায় নয়, গায়ে ফোস্কা ফেলা সারকাজমে নয়, 'তুমি রাস্কেল তোমার গুষ্ঠি রাস্কেল' গোছের ভার্চুয়াল কলারটানা ঝগড়ায় নয়; সে সরগরম নাচে, গানে আর কবিতায়। শিল্পীদের অনেকেই তুরীয়, তাঁদের তাক করে আমার মত নন-সমঝদারের ছুঁড়ে দেওয়া 'কেয়াবাত'টুকু প্রায় ধৃষ্টতা। কিন্তু এমন অনেকে আছেন যাদের হয়ত পাড়ার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় স্টেজে ওঠা হয়নি কিন্তু গান, কবিতা বা নাচের প্রতি তাঁদের অপত্য ভালোবাসাটুকু আছে। আর আছেন রবীন্দ্রনাথ৷ রবিস্যারের লেখা কতটা গুলে খেলে তাঁকে চেনা যায়? আমি রবীন্দ্রনাথ এতটাই কম পড়েছি যে সে ফর্মুলা নিয়ে দু'কথা বলার সাহস আমার নেই। তবে বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে যে মানুষটা রবিস্যারের গান আনমনে গুনগুন করতে গিয়ে বুকে আরামবোধ করেন; রবীন্দ্রনাথের ওপর তাঁর অধিকার কোনও কালচারজ্যেঠুর চেয়ে কম হওয়া উচিৎ নয়।

যে'টা আগেও বলেছি। সোশ্যাল মিডিয়ে মানুষকে প্রাইভেট স্পেস আর এক্সপোজার মিলিয়ে একটা চমৎকার 'আউটলেট' তৈরি করে দিয়েছে তা অনস্বীকার্য ( নয়ত আমার মত দড়কচা মারা মানুষ এতগুলো লাইন লেখার সাহস পেত কী করে)। আবার সেই সাহসে ভর দিয়েই কত পরিচিত আর অপরিচিত মানুষের গান, নাচ ও আবৃত্তি আজ আমার টাইমলাইনে ভেসে আসছে। এবং আমি বারবার মুগ্ধ হচ্ছি, স্যালুট করছি রবীন্দ্রনাথকে। আমার টাইমলাইনে যারা রবীন্দ্র-প্রণাম ভাসিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ;  চারদিকে এত মনখারাপ আর অন্ধকার সত্ত্বেও আপনারা আজ আমায় ভালো রেখেছেন।

Friday, May 8, 2020

মগজে নতুন চুটকি

কোনও জোক বা চুটকি যখন প্রথম মাথার মধ্যে এসে দাঁড়ায় তখন তাকে মনে হয় উত্তমকুমার। স্যুটবুট পরে, শর্মিলা ঝলসানো হাসি হেসে; সে কলম ঝাঁকিয়ে অটোগ্রাফ দেবে। অথবা মোটরবাইকে-সুচিত্রা-বইতে-পারা কনিফেডেন্স নিয়ে বিশ্বজয় করবে। মনে হয়; 
বাহ্, এই চুটকিটার জন্যই তো এদ্দিন বসেছিলাম। এই তো সেই জোক যা ইন্টেলেক্টে অঞ্জনবাবুর দাড়ি চুলকে দেবে,
অথচ শিব্রাম মার্কা ইম্প্যাক্টে চুটকি শুননে-ওয়ালারা হেসে গড়াগড়ি যাবে। এই তো সেই জোক যা শুনে একদিকে পাড়ার ফক্কর বন্ধু নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে প্রেমিকাকে পারফিউম কিনে না দিয়ে আমায় ওল্ডমঙ্কের বোতল উপহার দেবে আর অন্যদিকে বাবা বাহবা জানিয়ে  বলবে "বারো ঘণ্টা পর যখন আমার হাসি থামবে, তখন বেরোব তোর জন্য মাটন আনতে"। সে চুটকি অ্যাইসা ভাইরাল হবে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকোকে বিবেকামুণ্ডম গোছের কিছু ধমক দেওয়ার আগে সে চুটকি 'ক্র‍্যাক' করবেন। আবার সে ঠাট্টা এতটাই লিটলম্যাগিও গভীর হবে যে তা নিয়ে ঝাড়া আড়াইমাস কফিহাউস সরগরম থাকবে। 

মোদ্দা কথা হল কোনও নতুন চুটকিটা যতক্ষণ নিজের মাথার ভিতর থাকে, মনে হয় " কেয়াবাত, গালিবদা! কেয়াবাত"।

কিন্তু মগজের মধ্য থেকে সে চুটকি যেই গুটিগুটি পায় বেরিয়ে আসে অমনি ফুলকো লুচির পেটে জলকামান। 

বুক হিম হয়ে আসে যখন বুঝতে পারি মাথার ভিতরে যে চুটকি উত্তমকুমারিও ঘ্যাম নিয়ে ঘুরছিল, আসরে নামার পর সে আদতে ঢ্যাঁড়সশ্রী। ইন্টেলেকচুয়ালরা সে চুটকি শুনলে মোগলাই পরোটায় ব্রকোলি মার্কা ওয়াক তুলবেন। আর সে চুটকি শুনে অনেকেই ফলিডল ফ্লেভারের লস্যি খুঁজে হন্যে হবেন; শিব্রামাইজড হাসি তো দূরের কথা। 

চুটকিটা বলার পর টের পাওয়া যায় মাখাসন্দেশ নামাতে গিয়ে ঝুলি থেকে এক ঠোঙা আরডিএক্স বের করে ফেলেছি; চারদিকে হাহাকার। বন্ধুরা সে জোক শুনলে যে ত্যাজ্যবন্ধু করতে পারে, সেই সম্ভাবনা জোকটা মুখ ফসকে বলে ফেলার পরেই মাথায় আসে, আগে নয়। আর সে চুটকি বাপের কানে উঠলে নিজের পিঠের চামড়া দিয়ে তৈরি ফোলিওব্যাগে নিজের প্রায়-ফেল-করা মার্কশিটগুলো ফাইল করে রাখতে হবে। 

মাথার ভিতরে উদয় হওয়া নতুন চুটকির হম্বিতম্বিতে সহজে বিশ্বাস করবেন না। জনসমক্ষে সে চুটকি আপনার নাকের কিমা-চচ্চড়ি তৈরি করবে না; এমন গ্যারেন্টি স্বয়ং ঈশ্বর কেন, গভর্নমেন্টও দিতে পারবেন না।

Monday, May 4, 2020

ভাড়া

- আরে শিবু নাকি?

- আজ্ঞে।

- আরে থাক থাক থাক, রাস্তাঘাটে আবার প্রণাম করা কেন।

- না করবেন নায়েবমশাই। না করবেন না। পায়ের ধুলোটুকু অন্তত নিতে দিন। আপনাকে যে আমি কী বলে...।

- আহা, আমায় কিছু বলতে যাবেই বা কেন। চলো, বেলা বাড়ছে। স্টীমারে উঠি চলো গিয়ে।

- নায়েবমশাই, আপনি আমাদের উদ্ধার না করলে আমরা ভেসে যেতাম। এই অসময়ে আপনি দেবদূতের মত আমাদের পাশে এসে না দাঁড়ালে...।

- দ্যাখো শিবু। আমি তো মাইনে করা চাকর মাত্র। তবে হ্যাঁ, পেন্নাম যদি ঠুকতেই হয়; তবে ঠোকো জমিদার মশাইয়ের নামে।

- জমিদারমশাইয়ের জন্য জান কবুল নায়েবমশাই। এদ্দিন আমরা ভাবতাম মানুষটা বড় কঠিন..কিন্তু তাঁর মধ্যে যে এত মায়া..।

- নারকেল দেখেছ তো শিবু? নারকেল? তার বাইরেটা কেমন।বিশ্রী  ছিবড়ে?  আমাদের জমিদারমশাইও ঠিক তেমনি। বাইরেটা যতই শুকনো হোক, তাকে একটু বাজিয়ে দেখলেই জলের নড়াচড়া টের পাবে। 

-  তা তো বটেই। নইলে গরীবমানুষের জন্য এতটা কেউ করে?

- যবে থেকে জমিদারবাবুর কানে উঠেছে যে নদীর ও'পারে হরিহরপুর গাঁয়ে মড়ক লেগেছে; অমনি তাঁর ঘুম হাওয়া। বারবার শুধু পায়চারি করছেন আর শুধোচ্ছেন "নায়েব, আমার ফুলপুর গাঁয়ের অনেক মানুষ ওই হরিহরপুরের ইটভাটায় কাজ করে না? সে গায়ে মড়ক লেগেছে, এই অসময়ে আমি উদ্ধার না করলে তাঁদের দেখবে কে বলো"।

- দেবতা, সাক্ষাৎ দেবতা।

- আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম; "জমিদারমশাই, আপনার দুশ্চিন্তা অমূলক নয়। কিন্তু এ গাঁয়ের অন্তত শ'খানেক লোক সে ইটভাটায় খাটে৷ এই ভরা বর্ষায়, ছোটখাটো ডিঙিনৌকার ভরসায় এতগুলো মানুষকে নদী পারাপার করাবেন কী করে"? তা শুনে জমিদার মশাই আমায় চোপা কী করে বললেন জান?

- কী বললেন তিনি আজ্ঞে?

- বললেন, "শোনো নায়েব, এ গাঁয়ের প্রতিটি মানুষ আমার সন্তান। আমার অতগুলো জোয়ান ছেলেপিলে ভীনগাঁয়ের মড়কে উজার হয়ে যাবে আর আমি হাত গুটিয়ে বসে থাকব? রাধামাধব আমায় ক্ষমা করবেন তা'হলে? তুমি শোনো, তুমি এখুনি স্টীমারের ব্যবস্থা করো। আমি তাদের স্টীমারে করে গাঁয়ে ফেরত আনব"।

- মাটির মানুষ আমাদের জমিদারবাবু। 

- কিন্তু আমি যে সেরেস্তার হিসেবকিতেব নিয়ে থাকা কেঠো মানুষ, ফের বুঝিয়ে বললাম; "আপনারএস্টেটের খান দুয়েক স্টিমার আছে বটে। কিন্তু তা দিয়ে রোজ জুটমিলে সাপ্লাই যায়। সে স্টিমার দিয়ে একটা গোটা দিন মানুষ বওয়ালে যে প্রচুর টাকা নষ্ট"৷ কিন্তু ওই, কে শোনে কার কথা। আমায় কী হুকুম করলেন জানো শিবু?

- কী বললেন তিনি কত্তা। 

- বললেন " নায়েব, আমার সন্তানরা কষ্টে আছে। এ সময় আমি জুটমিলের সাপ্লাই নিয়ে ভাবব? রাধামাধব রাধামাধব! শোনো, তুমি কাল ভোরে নিজে স্টিমার নিয়ে গিয়ে হরিহরপুরের ঘাটে গিয়ে দাঁড়াবে। আর হরিহরপুরের ইটভাটায় এ গাঁয়ের যত লোক কাজ করে, তাদের সব্বাইকে স্টিমারে তুলে, তবে ফিরবে"। 

- আর ক'দিন থাকলেই মড়ক আমাদেরও ছুঁয়ে ফেলত নায়েবমশাই। জমিদারমশাইয়ের অসীম কৃপা যে এ অসময়ে স্টিমার পাঠিয়ে আমাদের প্রাণ বাঁচালেন। নয়ত আমাদের পরিবারগুলো নয়ত সবই ভেসে যেত৷ আমরা তো গাঁয়ে ফেরার জন্য কম চেষ্টা করিনি, কিন্তু  মড়কের গাঁয়ে আমাদের বাস বলে কোনও ফেরিনৌকাই আমাদের নিতে চায়না। আপনার মধুকে মনে পড়ে নায়েবমশাই?

- মধু...যার বাপ ঘরামী ছিল?

- আজ্ঞে। তা সে বেচারা দুশ্চিন্তায় পাগল হয়ে ভরা নদী সাঁতরে পেরোনোর তাল করলে। এই গেল হপ্তায়। যা হওয়ার হল,বেলা ফুরোনোর আগেই তাঁর দেহ ভেসে উঠল এই ঘাটের কাছেই।

- ইশ। দ্যাখো দেখি, গণ্ডমূর্খ আর কাকে বলে। জমিদারমশাই শুনলে ভারী ব্যথা পাবেন যে। যা হোক। যার যেমন কপাল। 

- তা ঠিকই বলেছেন নায়েব মশাই। আচ্ছা, স্টিমার বিকেলের মধ্যে ফুলপুর ঘাট পৌঁছে যাবে। তাই না?

- তা যাবে। কেন বল দেখি?

- আজ হাটবার, না? সন্ধ্যের আগে পৌঁছলে ঘাটের হাট থেকে খোকার জন্য দু'টো জামা কিনতাম। আর বৌটার জন্য হাঁড়ি খুন্তিও যদি..। 

- রস আর রসদ, তোমার দুইই আছে দেখছি শিবু

- হেহহে, ওই আর কী। আধপেটা খেয়ে টাকা জমাই, যাতে গাঁয়ে ফিরে চালডাল ছাড়াও সামান্য কিছু..। ছেলেবৌকে তো কিছুই তেমন দিতে পারিনা নায়েবমশাই। তবে হাতে ওই এ'বারে সতেরো টাকা মত জমেছে। হাট থেকে তাই..। আর তাছাড়া, একটা জরুরী ওষুধও এ'বারে নিয়ে নেব ভাবছি। ওই ঘাটের কাছের রস সাহেব ডিসপেনসারি থেকে এ'বার কিনে নেব'খন।

- ওষুধ?

- ওই, বেশ কিছুদিন হল আমার মাঝেমধ্যে শ্বাস আটকে আসে, চোখে অন্ধকার দেখি। আর বুকে সারাক্ষণ একটা বিচ্ছিরি জ্বালা জ্বালা ভাব। জ্বালাটা অম্বলের নয় তাও বুঝি, আরও গোলমেলে কিছু যেন। তা ছ'মাস আগে গঞ্জের এক ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়েছিলেন, যে ওষুধ মাস তিনেক খেলেই নাকি ও'সব অসুবিধে কেটে যাবে। 

- তা এদ্দিন সে ওষুধ খাওনি কেন?

- আজ্ঞে, এ ইটভাটা সর্বস্ব পাড়াগাঁয়ে রস সাহেবের ডিসপেনসারি কোথায় পাই বলুন। আর সে'সব যে দামী ওষুধ।  যখন দেখলাম টাকা কিছুটা জমেছে তখন থেকে আর ফুলপুরে ফেরাও হয়নি। তাই ভাবছি সুযোগ যখন পেয়েছি তখন হাটের থেকে কেনাকাটা করে চলে যাব রস সাহেবের ডিসপেনসারিতে।  সে'খান থেকে ওষুধ নিয়ে তারপর বাড়ি।

- বাহ্, মড়কে বাস করেও বাবুর শখে জং পড়েনি।

- হেহহেহহে।

- আর দেরী নয়, স্টীমারে উঠে একটু আয়েশ করে বসো তো দেখি শিবু।

- যেয়াজ্ঞে।

- আর শিবু, শোনো। ভাড়াটা আমায় দিয়ে তারপর স্টীমারে উঠো, কেমন?

- আজ্ঞে?

- ফ্যালফ্যাল করে দেখছ কী৷ ভাড়া! ভাড়া! ভাড়াটা আমায় দিয়ে তারপর স্টীমারে উঠো।

- কিন্তু নায়েবমশাই..ভাড়া? ভাড়া লাগবে?

- দ্যাখো কাণ্ড,ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য তুমিও ওই মধু পাগলার মত সাঁতরে ফেরার তাল করছ না তো? হা হা হা হা হা।

- কত?

- ভাড়া? ও সামান্যই। পাঁচ টাকা মাত্র।

- পাঁচ টাকা? কী বলছেন কী নায়েবমশাই৷ ফেরিনৌকা নেয় চার আনা।

- তা'হলে তুমি।ফেরিনৌকাই খুঁজে নিও শিবু৷ খামোখা স্টীমারে ওঠার শখ হয়েছে কেন? 

- পাঁচ টাকা ভাড়া দেব আমরা? অত টাকা দেওয়ার মুরোদ কি আমাদের আছে নায়েবমশাই?

- হাটে ঘুরে কেনাকাটি করার শখ আছে৷ জমিদারের স্টীমারে গা এলিয়ে নদীর হাওয়া খাওয়ার ধক আছে। কিন্তু সামান্য পাঁচ টাকা ভাড়ার কথা শুনলেই বাবুদের গলা শুকিয়ে কাঠ। বলি, জমিদারমশাই কি স্টীমারখামা মাগনা খাটাবেন? একদিন জুটমিলের সাপ্লাই বন্ধ মানে কতটাকার লোকসান জানো? তিনশো টাকা। চোখে দেখেছ অত টাকা কোনওদিন? দেখোনি। কিন্তু জমিদারমশাই সে'সব লোকসান গায়ে না মেখে স্টীমার পাঠিয়েছেন তোমাদের দুঃসময়ে উপকার করতে৷ আর এই তার প্রতিদান? ভাড়া দেওয়ার বেলায় গায়ে ফোস্কা?

- কিন্তু অতগুলো টাকা...।

- খোকার জন্য জোড়া জামা, বৌয়ের জন্য নতুন হাঁড়ি-কড়াই; বাহা। বাহ্ বাহ্ বাহ্। এ'দিকে জমিদারের বাড়িতে সিঁদ কাটার ইচ্ছে। তোমার লজ্জা করে না শিবু? কই, তোমার আগে এতজন যে স্টীমারে এসে বসলে; তাঁরা তো অকারণ চেল্লামেল্লি করেনি। বাজে কথায় নষ্ট করার মত সময় আমার নেই৷ স্টীমার ছাড়ার সময় হল৷ ভাড়া দিতে না চাইলে ওই মড়কের গাঁয়ে ফেরত যাওগে, আমার মাথা খেওনা।

***

- হ্যাঁ গো..।

- ঘুমোওনি বৌ?

- তুমিও তো ঘুমোওনি।

- কিছু বলবে?

- খোকার জন্য দু'টো জামা আনলে। আমার জন্য নতুন হাঁড়ি, হাতা,খুন্তি৷ আর এতগুলো চুড়ি। কত খরচ হল বলো..।

- ধুস, ইটভাটায় পয়সা উড়ছে গো বৌ৷ পয়সা উড়ছে। হাতে বেশ ক'পয়সা জমেছিল। তাই ভাবলাম...তা, খোকার বেশ মনে ধরেছে জামা দু'টো, তাই না?

- খুব। সেই যে দু'টো জামা একসঙ্গে গায়ে চাপালো, ঘুমের মধ্যেও খুলতে দিচ্ছে না। পাগল।

- চুড়িগুলো তোমার পছন্দ হয়েছে বৌ?

- খুউব। হ্যাঁগো, এত খরচ করলে...তোমার সেই ওষুধ আনলে না?

- ওষুধ?

- ওই যে গো..তুমি বলতে না। হঠাৎ করে শ্বাস আটকে আসে, বুক জ্বালা, চোখে অন্ধকার...। গঞ্জের হাসপাতালের ডাক্তার তোমার বুকে যন্তর দিয়ে দেখেশুনে কী'সব দামী ওষুধ লিখে দিলে। তুমি বললে টাকা জমলেই সে'সব ওষুধ কিনে আনবে...।

- ওহ হো, বাবাজীর ব্যাপারটা তোমায় বলাই হয়নি, তাই না?

- বাবাজী? কী ব্যাপার?

- হপ্তাখানেক আগের ঘটনা বুঝলে। আমাদের হরিহরপুরের ইটভাটার আস্তানায় এক বাবাজী এসে হাজির হলেন; এক্কেবারে সোজা হিমালয় থেকে পায়ে হেঁটে হরিহরপুর।

- সোজা হিমালয় থেকে?

- তবে আর বলছি কী বৌ। চেহারায় যেমন তেজ, চোখে তেমনি মায়া। তা সে বাবাজী তো একরাত আমার ঝুপড়িতেই কাটালেন। আমার বানানো রুটি আর ডাল খেয়ে খুব খুশি হলেন। রাতে গল্পের ছলে তাঁকে আমার অসুখের কথাটা বললাম৷ বাবাজী শুনেই নিজের ঝুলি থেকে কী একটা শিকড় বের করে বললেন সে'টাকে তুলসীপাতা সঙ্গে বেটে খেয়ে নিতে। 

- তারপর?

- আমি বাবাজীর কথা মত খেয়ে নিলাম। সত্যিই ধন্বন্তরি৷ ওই এক দাগেই আমার বুক জ্বালা, শ্বাসের কষ্ট এক্কেবারে গায়েব।

- এক্কেবারে? আমার গা ছুঁয়ে বলো।

- গা ছুঁয়েই তো আছি। তোমায় কি আমি কোনওদিন মিছে কথা বলেছি গো বৌ?

আ গোল্ডেন এজঃ রেহানার মুক্তি ও যুদ্ধ

থার্ড রাইখের ওপর শিরার সাহেবের পাহাড়প্রমাণ (এবং গুরুত্বপূর্ণ) বইটা পড়ার বেশ কিছুদিন পর পড়েছিলাম 'দ্য বুক থীফ'। প্রথম বইটা জরুরী ঐতিহাসিক দলিল। পরেরটা সে ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা কাল্পনিক উপন্যাস; এক বইচোর খুকির গল্প। ইতিহাস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘোরে মূলত তারিখে,  সংখ্যায়, স্মৃতিফলকে এবং রাজনৈতিক মতবাদের হাওয়ায়। এ'টা ইতিহাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয় মোটেও; তথ্য ও যুক্তিনির্ভর না হয়ে ইতিহাসের উপায় নেই৷ কিন্তু মানুষের গল্প শুধু তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বাঁধা অসম্ভব। মানুষের খিদের গল্প শুধু মন্বন্তরে মৃতের সংখ্যা বা শাসকের শয়তানি বা প্রতিবাদি জনতার প্রতিঘাতের খবর জানিয়ে শেষ হয়ে যায়না। তবে সেই পুরো গল্পটা বলার দায় ইতিহাসের নয়, সম্ভবও নয়। নিজের পাতের খাবার পাশের বাড়ির অভুক্ত শিশুর জন্য সরিয়ে রাখা গৃহিণীর গল্প জমিয়ে রাখার পরিসর ইতিহাসের বইতে নেই৷ পকেটে পিস্তল নিয়ে ঘোরা কোনও অকুতোভয় তরুণ বিপ্লবী যখন  পুরনো চিঠির গন্ধ শুঁকে বারুদের গন্ধ ভুলতে চেষ্টা করে, সে ব্যাপারটা কোনও দস্তাবেজে লিখে রাখা চলেনা। গৃহযুদ্ধে বাপ হারানো ছোট্ট খোকার ফ্যালফ্যালে চোখে শরতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার গল্প নিয়ে পড়ে থাকলে ইতিহাসের এগোতে পারে না। 

আর সে'খানেই প্রয়োজন সেই ইতিহাসের পটভূমিতে লেখা গল্প-উপন্যাসের। এমন গল্প যা ঐতিহাসিক সত্যের গণ্ডির মধ্যে দাঁড়িয়ে, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর 'হেডকাউন্ট' ছাপিয়ে; গেরস্তের হেঁশেল থেকে ভেসে আসা ভাতেভাতের গন্ধ খুঁজে নেবে। লেখকের হিসেব-কষা কল্পনায় সেই গেরস্থালীর হিসেবকিতেব বোঝাটাও বোধ সামগ্রিকভাবে ইতিহাসকে চেনার জন্য জরুরী। 

আর সে'খানেই তাহমিমা আনমের লেখা "দ্য গোল্ডেন এজ" বইটা আমার মনে ধরেছে। লেখিকার একটা সাক্ষাৎকারে শুনলাম যে'খানে তিনি বলছেন যে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিজের রিসার্চের ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা প্রামাণ্য বই লেখার; অথচ লিখতে লিখতে সে বইয়ের মূল বিষয় হয়ে উঠল মুক্তিযুদ্ধের আবহে লালিত হওয়া কিছু মানুষ ও তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসার সম্পর্কগুলো। অথচ ইতিহাসের নিরিখে এ বইয়ের মোটেও গুরুত্বহীন নয়। 

উপন্যাসের শুরু সদ্য স্বাধীন হওয়া পূর্ব পাকিস্তানে, শেষ ১৯৭১য়ের ডিসেম্বরে; বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ দিয়ে। আর গোটা উপন্যাস দাঁড়িয়ে রেহানা হকের  পয়েন্ট অফ ভ্যিউতে৷ বাংলা ভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তান; এ দু'টোই রেহানা পেয়েছেন (এবং ক্রমশ জড়িয়ে ধরেছেন) বিয়ের সূত্রে। জন্মসূত্রে রেহানা উর্দুভাষী এবং কলকাতার মানুষ; কাজেই তাঁর বাংলাদেশকে জড়িয়ে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধে সামিল হওয়ার গল্পটা শুধু জন্মগতভাবে পাওয়া ইডিওলজি আউড়ে নয়। এবং সে'কারণেই; রেহানার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে মুক্তিযুদ্ধে সামিল হওয়ার গল্প শোনাটা পাঠকের কাছে একটা অনন্য অভিজ্ঞতা। 

স্বামীহারা রেহানার যাবতীয় মুক্তি ও যুদ্ধ তাঁর দুই সন্তানকে ঘিরে। তাঁদের আঁকড়ে ধরেই নিজেকে চিনেছেন রেহানা। প্রয়োজনে নিজেকে ভেঙেছেন, তারপরে আবার নতুন ভাবে উঠে দাঁড়িয়েছেন তিনি; সবটুকুই তাঁর ছেলে সোহেল ও মেয়ে মায়াকে ঘিরে। নিজের দেশ কী ও কোথায়, এ প্রশ্নের উত্তরটুকুও রেহানা খুঁজে নিয়েছেন সোহেল ও মায়ার মধ্যে দিয়ে। "দেশ বা ভাষা মানেই মা আর সে মায়ের জন্য প্রাণপাত করা যায়"; এই চিরকালীন ফর্মুলাকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ার করে এক অন্য ভালোবাসার গল্প বুনেছেন রেহানা। সন্তানের জন্য প্রাণপাত করা মা হিসেবে বাংলাদেশকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন তিনি; সে'টাই তাঁর মুক্তিযুদ্ধ৷ এবং রেহানার মত মানুষের ভালোবাসা যে দেশের জন্য কত জরুরী, সে'টাও এ উপন্যাসে বেশ টের পাওয়া যায়।  রেহানাদের আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার গল্প ইতিহাসের বইতে আঁটবে কেন? ঐতিহাসিক উপন্যাস ছাড়া গতি নেই।

আর একটা জায়গায় লেখিকার রিসার্চ এ বইকে সমৃদ্ধ করেছে; সে সময়ের ঢাকা ও সে শহরের বর্ণগন্ধকে সুন্দরভাবে নিজের লেখায় ধরেছেন তিনি। আমি ঢাকায় যাইনি কোনওদিন। তবে ধানমণ্ডি বা গুলশন গোছের নামগুলো মাঝেসাঝে পড়েছি বা শুনেছি। কিন্তু এই উপন্যাস পড়ে যেন মনে হচ্ছে যে জায়গাগুলো একবার ঘুরে না এলেই না। না না, ভৌগোলিক ডিটেলিং তেমন নেই এ লেখায়; তবে ওই জায়গাগুলোকে কেন্দ্র করে বহু ছোটছোট ঘটনার এমন সুন্দর করে গোটা বইতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে বইটা শেষ করার পর মনে হচ্ছে যেন জায়গাগুলো যেন আর পাঁচটা চেনা শহুরে পাড়ার মতই। তাছাড়া জবাকুসুম তেলের সুবাস থেকে  বিরিয়ানি হয়ে ইলিশ বা ডাল-বেগুনভাজার চনমন ও পাড়ার আড্ডার অত্যন্ত সুরসিক বর্ণনা এ বইতে রয়েছে। ডিটেলিংয়ে কিছু খুচরো খুঁত যে নেই তা হলফ করে বলতে পারি না৷ তবে পড়তে গিয়ে সুর কাটবে, তেমন কিছু গলদ আমার অন্তত নজরে পড়েনি।  

দু'টো কথা বলে শেষ করি। 

এক।
আমি এ বই অডিওবুক হিসেবে শুনলাম। মধুর জাফরির কণ্ঠে রেহানার গল্প শুনতে চমৎকার লাগল। বিশেষত এ উপন্যাসে এ'দিক ও'দিক ছড়িয়ে থাকা বাংলা শব্দগুলো দিব্যি উচ্চারণ করেছেন তিনি।

দুই।
কোনও গল্পের বই পড়ে ভালো লাগলে তা নিয়ে দু'চার কথা চট করে লিখে ফেলবার পিছমে একটা গুরুতর কারণ আছে। সে লেখা পড়ে দু'একজন যেমন সে বই উল্টেপাল্টে দেখতে চাইতে পারেন, তেমনই সহৃদয় কেউ সে লেখার সূত্র ধরেই হয়ত আমায় অন্য ভালো বইয়ের খবর দেবেন। ওই হল গিয়ে আমার আখেরে লাভ৷ 'নেমসেক' নিয়ে দু'দিন আগে সাহস করে দু'চার কথা লিখেছিলাম। সে'টা পড়ে এক দাদা বললেন "তাহমিমা আনমের দ্য গোল্ডেন এজ বইটা পড়েছ ভায়া"? 
পড়া ছিল না, পড়ে নিলাম; একেই বলে মুনাফা। 

পুনশ্চ: এই বইটি একটা ট্রিলোজির প্রথম অংশ।

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...