Thursday, January 28, 2016

অনুভব দাসগুপ্তর স্বপ্ন

- ডাক্তারবাবু, একটা ছোট ব্যাপার। 
- হ্যাঁ বলুন। 
- না বলছিলাম। আপনার সেক্রেটারি স্লিপে আমার নাম লিখেছে অনুভব দাসগুপ্ত। 
- আপনি তো অনুভব দাসগুপ্তই অনুভববাবু। 
- না মানে, একটা স্পেস আছে। দাস আর গুপ্তের মাঝে। দাস স্পেস গুপ্ত আর দাসগুপ্ত টেকনিক্যালি ঠিক এক বলা যায় না...। 
- আচ্ছা পিয়াকে বলে দেব পরের বার ঠিক করে লিখতে। 
- না মানে। এবারে ঠিক করা যায় না?
- এটা তো মিনিংলেস্‌ একটা স্লিপ...। এইত্তো। আপনি চলে গেলে এটা ফেলে দেওয়া হবে। 
- তবু। ডাস্টবিনে সামান্য ভুল পড়ে থাকার চেয়ে না হয় ঠিক কিছু পড়ে থাকবে। 
- অ। এই যে। এই নিন স্লিপ। ঠিক করে নিন। 
-  কেটে ঠিক করব?
- অবভিয়াসলি। 
- বলছিলাম ডাক্তারবাবু, আপনার পেনটা কি কালো কালির? 
- কেন?
- না মানে, আমার পেনটা নীল। আর আপনার সেক্রেটারি কালো কালিতে এই স্লিপে লিখেছিলেন। 
- এই যে কালো পেন। 
- থ্যাংকস। এই নিন। স্লিপটা ঠিক করে দিয়েছি। 
- আর ইউ অ্যাট ইজ্‌ নাউ মিস্টার দাস স্পেস গুপ্তা?
- ইজ্‌? ইজেই তো নেই। সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা। 
- রাইট। ঠিক। বেশ। বলুন তাহলে। শুরু থেকে বলুন। অসুবিধেটা কী, কেন আপনি ট্রাব্‌লড হচ্ছেন। মন খুলে বলুন। উই হ্যাভ অল দ্য টাইম দাসগুপ্তবাবু। 
- আসলে ব্যাপারটা একটু জটিল। 
- সেটা আমায় ঠিক করতে দিন। 
- আচ্ছা বেশ। 
- বলুন। 
- শুরু থেকে বলব?
- শুরু থেকে। 
- শুরুটা গত পরশু সকাল থেকে। 
- পরশু সকাল?
- হ্যাঁ। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই। 
- কীরকম প্রবলেম ফিল করতে পারলেন ?
- ফিল করতে পারলাম মানে। ঘুম ভাঙল বটে। কিন্তু আড়মোড়া ভাঙার সময় স্পষ্ট মনে হল ঘুমটা ভাঙেনি। 
- ঘুম ভাঙার পর মনে হল ঘুম ভাঙেনি?
- এগজ্যাক্টলি। 
- কেন এটা মনে হল? 
- বেড শিটটা দেখে প্রথম সন্দেহ হল। 
- কীরকম?
- লখনৌ থেকে চিকন কাজের বেডশিট কিনেছিলাম এইট নাইনে। শৌখিন চাদর কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারিনি। নষ্ট হয়ে গেছিল। কিন্তু পরশু উঠে দেখলাম সেই চাদর পাতা, যেন দু'দিন আগে কেনা। চেকনাইটাই আলাদা। 
- ইন্টারেস্টিং। 
- তারপর ধরুন খানিক পরেই সুতপা চা নিয়ে এলো। 
- সুতপা?
- আমার মিসেস্‌। ইয়ে, এক্স মিসেস্‌। নাইনটি ওয়ানে ডিভোর্স হয়। ডিভোর্স দেয়। 
- ডিভোর্স দেওয়া বৌ আপনার ঘুম ভাঙার পর চা নিয়ে ঘরে ঢুকলে?
- এগজ্যাক্টলি। এমন ভাবে যেন কিস্যুটি হয়নি। 
- এক্সট্রিমলি ইন্টারেস্টিং। উনি চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন এমন ভাবে যেন আপনাদের সেপারেশন হয়নি। যেন আপনারা এক সাথেই আছেন, তাই তো?
- কারেক্ট।  
- তারপর?
- বাপ্পা। 
- বাপ্পা? সে'টা কে?
- একটা বারো বছরের ছেলে। 
- আপনার ছেলে?
- সে তো সে ক্লেমই করছে। সুতপাও অবভিয়াসলি তাল দিচ্ছে। 
- কিন্তু আপনার ধারণা সে আপনার ছেলে নয়। তাই তো?
- সুতপার সাথে সেপারেশনের আগে আমাদের কোন ইস্যুই হয়নি। তো পরশু থেকে সেই উড়ে এসে জুড়ে বসা চিজ আমায় কন্সট্যান্ট বলে চলেছে 'বাবা বইমেলা নিয়ে চলো, বইমেলা নিয়ে চলো'। বুঝুন ঠ্যালা। 
- সাঙ্ঘাতিক। তা, স্বপ্নের সিম্পটম আর কী কী দেখছেন?  
- মা। 
- আপনার?
- অবভিয়াসলি। 
- তা উনি কী...। 
- দিব্যি আমার সামনে ঘুরঘুর করছে। পাটিসাপটা অফার করছে। অথচ নাইনটি ফোরে নিজের হাতে নিমতলায় পুড়িয়ে এসেছি মাকে। 
- ওহ্‌। টেরিব্‌ল ব্যাপার। 
- টেরিব্‌ল বলে টেরিব্‌ল ডাক্তারবাবু? মায়ের স্নেহটেহ এক জিনিষ। কিন্তু ভূত ইজ ভূত। ডিফারেন্ট লেভেলের ব্যাপার তো। 
- ঘটনা। তা, আর কোন সিম্পটম?
- আছে। 
- যেমন?
- কলকাতা। 
- কলকাতা?
- মা মারা যাওয়ার পরের বছরই তো আমি কটিহারে চলে গেলাম। তখন থেকে তো সেখানেই। এক কামরার ভাড়া বাড়ি আর এক দেহাতি চাকর। দ্যাট ইজ অল। অথচ দেখুন। ঘুম ভেঙ্গে উঠলাম কলকাতায়। আপনার চেম্বারে এলাম, সেটা আমহার্স্ট স্ট্রিটে। 
- সাঙ্ঘাতিক। আর কোনও সিম্পটম আছে?
- পিয়া। আপনি। 
- সে কী। কী রকম?
- পিয়া, মানে আপনার সেক্রেটারির চেহারা অবিকল মিতার মত। 
- মিতাটা আবার কে?
- আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আমার একটু ব্যথা ছিল। ম্যাটেরিয়ালাইজ করেনি। 
- আচ্ছা। তাহলে আপনি বলছেন নতুন আলাপের চেহারাগুলোও আপনার চেনা চেহারা ধার করে তৈরি হচ্ছে। 
- ক্লিয়ারলি। 
- আর আমায় কার মত দেখতে লাগছে?
- আপনার মুখটাও স্বাভাবিক ভাবেই বেশ চেনা লাগছে। তবে ঠিক ধরতে পারছি না বুঝলেন। পাড়াতেই কোথাও দেখেছি। সে মনে পড়ে যাবে। তবে অত্যন্ত চেনা চেহারা।  
- হুম। তাহলে গোটাটাই যখন স্বপ্ন, তখন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এলেন কেন দাসগুপ্তবাবু?
- দু'দিন অপেক্ষা করলাম স্বপ্ন ভাঙার। কিস্যুতে কিস্যু হল না। মায়ের শুচিবাইয়ের বাতিকে জান কয়লা করে দিচ্ছে। সুতপার হাজার বাই। আর বাপ্পা নামের ইম্পস্টারটাকে গতকাল বইমেলা নিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছি। 
- কিন্তু আমিও যদি আপনার স্বপ্নে থাকি, তাহলে আপনার কী উপকার আমি করতে পারব মিস্টার দাসগুপ্ত?
- না মানে। সব কিছু সত্ত্বেও যদি ব্যামো আমারই হয়ে থাকে? ওয়ান পার্সেন্ট চান্স। তবু। তাই ভাবলাম...আর কী।  

***ছ'মাস পরে***

- নমস্কার মিস্টার দাসগুপ্ত।
- নমস্কার প্রেসিডেন্ট স্যার। বড় বিড়ম্বনা হয়ে যাচ্ছে। আমায় এমন আটকে রাখার মানে কী?
- মানেটা সহজ। ভীষণ সহজ। একটা গোটা দুনিয়া আপনার স্বপ্নে গড়ে উঠেছে। সে দুনিয়ায় অর্থনীতি, বিজ্ঞান সমস্তই আছে। আমার মত রাষ্ট্রনেতারা আছে। কিন্তু আপনার স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলে দুনিয়াটা ভেসে যাবে। আমরা কেউই থাকব না। শহর, গ্রাম, জিডিপি সমস্ত মিথ্যে হয়ে যাবে। 
- তাই বলে আমায় বেঁধে রাখা?
- আপনার স্বপ্নকে ভাঙতে না দেওয়ার আর কোন উপায় ছিল না। চলি...।
- প্রেসিডেন্ট সাহেব...! 

***

- কী গো! অমন ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেঙ্গে উঠলে কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছ?
- হ্যাঁ মানে...। 
- এত ঘামছ কেন! উরিব্বাবা! কী অবস্থা। কী স্বপ্ন দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম...স্বপ্নে দেখলাম...। 
- কী দেখলে গো?
- স্বপ্নে দেখলাম আমি ডাক্তারের কাছে গেছি। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। 
- নিজে সাইকিয়াট্রিস্ট হয়ে তুমি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেছ?
- অন্য নয়। অন্য নয়। আমি নিজে নিজেরই কাছে পেশেন্ট হয়ে গেছি। 
- কী সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড। কেন গেছিলে...?
- এ কী! এ কী সুতপা!
- কী হল? কী হয়েছে?
- সুতপা! এই চিকনের বেডশিটটা আবার কোত্থেকে এলো? এটা তো নষ্ট হয়ে গেছিল অনেক বছর আগেই! এটা এখানে এলো কী করে?
- তোমার হয়েছেটা কী বল তো? গত হপ্তাতেই তুমি লখনৌ থেকে এই চাদর কিনে নিয়ে এলে! কী যে বলছ। যাক ভোর হয়েছে। আমি বরং তোমার জন্য এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি। আর শোন, আগামীকাল কিন্তু তোমায় বাপ্পাকে একবার বইমেলা থেকে ঘুরিয়ে আনতেই হবে। ছেলেটা বড্ড আবদার করছে। কেমন?  

5 comments:

disha ray said...

Wonderful

Mohua Roy said...

Jahtah.ekebarey psychiatric poribesh

Kanad said...

bravo. ami ekta erom golpo likhechi recently. kintu seta ekta mag e publish er jonyo ache bole blog e dite parini

Nabanita Dutta said...

Haahaahaa ...darun!

antara ray said...

DARUUN...