Tuesday, March 3, 2020

তাই বন্দুক নিলে হাতে


- ডক্টর চ্যাটার্জী, এমন জরুরী তলব! কী ব্যাপার বলুন দেখি। তাও এমন বিটকেল একটা চেম্বারে। ঢুকেই মনে হয় একটা কোয়্যারান্টাইন কামরা। তবে, বেশ একটা হলিউডি গা ছমছম আছে কিন্তু।  

- এ জায়গাটা ভিড়ভাট্টা থেকে বেশ খানিকটা দূরেই বটে।

- এখানে নতুন চেম্বারটেম্বার ফেঁদে বসার তাল করছেন নাকি? ডুবতে হবে, এই বলে রাখলাম। লোকালয় থেকে এত দূরে লোকজন আসবে ভেবেছেন?

- এ চেম্বারটা ঠিক নতুন নয় অনিলবাবু৷ ইনফ্যাক্ট আমার ট্রীটমেন্টের মূলপর্বটা এখানকার জন্যই তোলা থাকে।

- মানে শহরের চেম্বারটা স্রেফ দেখনাই ডক্টর? এই  পাণ্ডববর্জিত অঞ্চলের আস্তানাটাই মূল?

- না না, তা কেন। ডায়াগনোসিসটা আপনার শহরে বসেই ভালোভাবে হয় বটে। আর এই নিরবিলি চেম্বারে হয় ট্রীটমেন্ট; আদত চিকিৎসা।  

- বেশ হেঁয়ালির মেজাজে রয়েছেন দেখছি।

- সমস্ত খোলসা করতেই তো আপনাকে ডাকা।

- তা আপনার ডায়াগনোসিস কী বলছে। আমার মূল সমস্যা কোথায় বলুন তো। 

- ডায়াগোনিস স্পষ্ট। যে সমস্যায় এ শহরের সমস্ত মানুষ জেরবার; আপনার সমস্যাও তাঁদের চেয়ে আলাদা কিছু নয়। সমস্যা একটাই; বেঁচে থাকা। আপনার সমস্যা আপনি বেঁচে আছেন।

- এই শুরু হল, হেঁয়ালি থেকে ফিলোসফিতে। 

- হেঁয়ালি নয়। ফিলোসোফি নয়৷ এমন কী কোনো ঠাট্টাও নয়। আবারও বলি; আপনার অসুস্থতা একটাই অনিলবাবু। আপনার বেঁচে থাকা। ও কী.. উঠে দাঁড়ালেন কেন? 

- দেখুন। আমি রোব্বারের ছুটি নষ্ট করে এতটা পথ ঘঁষটে এলাম আপনার "আর্জেন্ট" ডাক পেয়ে। আমি আশা করেছিলাম আপনি বিচক্ষণ আর সুবিবেচক।  শহরে ঘুরে বেড়ানো আর পাঁচটা হাতুড়ের মত টাকাখেকো অকাজের ঢেঁকি নন৷ কিন্তু ব্যাপারটা আপনি যেহেতু সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না..। 

- অধৈর্য হলে চলবে কেন অনিলবাবু? 

- অধৈর্য হব না? একটা জরুরী সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে এদ্দিন ধরে আসছি৷ অথচ আপনার ডায়াগনোসিস কী? আমার সমস্যার মূলে হল আমার বেঁচে থাকা।  ইস ইট আ জোক?

- নট অ্যাট অল। আচ্ছা, আপনার সমস্যাটা ঠিক কী ছিল? আই মীন, কেন আপনি প্রথম আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?

- নিরানন্দ। অবভিয়াসলি। শহরে আর কোনও রোগ বা সমস্যা তো নেই। 

- গোটা শহরে শুধু একটাই রোগ৷ ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকেনি কখনও?

- মেডিকাল সায়েন্সের এমন দুর্দান্ত প্রগ্রেস৷ সব সমস্যার সমাধানই তো হাতের মুঠোয় প্রায়। নেহাত এই নিরানন্দ ব্যাপারটা মহামারীর আকার ধারণ করেছে তাই আপনার মত ডাক্তাররা টু-পাইস করে খাচ্ছে। 

- রাইট। সেই টু-পাইসের প্রতি সততা যেহেতু আমার আছে, তাই আবারও বলছি, এ দুনিয়ায় বেঁচে থাকাটাই আপনার এই নিরানন্দের মূলে। এবং এর ওষুধ একটাই...।

- ও কী! আপনি কি উন্মাদ হলেন ডাক্তার চ্যাটার্জী? পিস্তলটা নামান৷ প্লীজ! প্লীজ ডাক্তার। 

- এ দুনিয়া না ছাড়লে আপনার মুক্তি নেই অনিলবাবু। আর ডাক্তার হিসেবে রোগীকে ওষুধ না গিলিয়ে আমি ছাড়ি কী করে বলুন। 

- ও...ও'টা বন্দুক ডাক্তার! আ...আমি...আমি আপনার পায়ে পড়ি...আমায় বাঁচতে দিন...।

- এ বেঁচে থাকা মিথ্যে অনিলবাবু...ডাহা মিথ্যে। এ বেঁচে থাকায় যত জড়াবেন, জানবেন নিরানন্দ তত বাড়বে।

- আমি বাঁচতে চাই ডাক্তার। প্লীজ।

- আলবাত বাঁচবেন। তবে এ জগত দেখে বেরিয়ে৷ 

- ভূত হয়ে বাঁচব?

- ভূত হয়েই আপনি বেঁচে আছেন, এ শহরের বাকি মানুষগুলোর মত। এই বন্দুকেই আপনার মুক্তি।

- ভূত হয়ে বেঁচে আছি?

- কারণ এই মিথ্যে শহরে বাঁচতে গিয়ে আপনি আদত বেঁচে থাকা ভুলে গিয়েছেন অনিলবাবু৷ এই মিথ্যে জীবন না ছাড়তে পারলে আপনার মুক্তি নেই। নিরানন্দের শেষ নেই। ইউ হ্যাভ টু ডাই হিয়ার সো দ্যাট ইউ ক্যান লিভ বিয়ন্ড। সুস্থ ভাবে বাঁচতে গেলে এ'খানে আপনাকে মরতে হবে অনিলবাবু। এ জগতে আপনাকে মরতেই হবে। 

- বন্দুকটা সরান। প্লীজ।

- এ বন্দুকের একটা টেকনিকাল নাম আছে অনিলবাবু; ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেশন বাটন। 

Monday, March 2, 2020

লুচিম্যান


১।

দুর্যোধন - ধনসম্পত্তি তো সবই খোয়ালেন দাদাভাই। এখন পরের দান খেলবেন কী বাজি রেখে?

ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির (লুচি বেগুনভাজা মুখে দিয়ে) - তাই তো হে। এ তো মহাসমস্যায় পড়া গেল। বাজি রাখতে না পারলে তো আবার পাশার টেস্টম্যাচ ছেড়ে ছেড়ে টুয়েন্টি-নাইনের টিটুয়েন্টি খেলতে হবে। রোব্বার সক্কাল সক্কাল টুয়েন্টি নাইন ঠিক জমবে না। কী যে বাজি রাখি...।

দুর্যোধন (এক চামচ দুধ-কর্নফ্লেক্স মুখে চালান করে) - আপনার পাতে অতগুলো লুচি বেগুনভাজা পড়ে। ও'গুলোই না হয়ে দাঁওতে রাখুন...।

ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির - মুখ সামলে রে রাস্কেল। নিজের পাতের লুচি দিয়ে জুয়ো খেলব? তার চেয়ে বরং...তার চে'বরং...আমার এই ভাইগুলোকে এক এক করে বাজি রাখি...।

২।

কুন্তী (দরজা খোলার আগেই) - পাঁচ ভাই ভিক্ষেতে যা পেয়েছ তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিও।

যুধিষ্ঠির - এক মিনিট। আজ আমি ভিক্ষেতে লুচি মোহনভোগ পেয়েছি৷ এর ভাগ চাইলে আমি কালই কৌরবদের কোম্পানিতে ক্লার্ক হিসেবে জয়েন করব। এই বলে রাখলাম। 

৩।

কৃষ্ণ - দ্রোণকে না আটকালে সমূহ বিপদ।

যুধিষ্ঠির - হোক গে বিপদ। তাই বলে ধর্মপুত্র হয়ে মিছে কথা বলব? অসম্ভব। 

কৃষ্ণ - বুড়ো যে'ভাবে যুদ্ধ করছে তা'তে আমাদের সব সৈন্য আজকের মধ্যেই সাবাড় হয়ে যাবে যে।

যুধিষ্ঠির - হোক গে। কিন্তু কেশব, অধর্মে মত দিই কী করে বলো...। বাজারে আমার একটা রেপুটেশন আছে..।

কৃষ্ণ - আরে কী মুস্কিল...যুদ্ধে হারলে তোমার রাজ্য যাবে, মানইজ্জত যাবে...।

যুধিষ্ঠির - ধর্ম তো থাকবে ভায়া৷ রিল্যাক্স৷ 

কৃষ্ণ - হারলে সপরিবারে জঙ্গলে ফেরত যেতে হবে ধর্মপুত্তুর। আর জঙ্গলে তো জানোই, রোব্বারের জলখাবারে লুচি-ছোলারডালের বদলে শাঁকালু আর শসা।

যুধিষ্ঠির - আকাশের রং খয়েরী৷ আমার নাম অরবিন্দ কেজরিওয়াল৷ শুয়োরদের আমি পেখম তুলে নাচতে দেখেছি৷ বুলাও দ্রোণকে। দেখাচ্ছি মিথ্যের ফুলঝুরি কাকে বলে। 

৪।

ঈশ্বর - আসুন ধর্মপুত্র৷ আসুন আসুন। কী সৌভাগ্য আমার। কী সৌভাগ্য৷ নশ্বর মানুষ হয়েও পায়ে হেঁটে স্বর্গে এসে পৌঁছলেন, এ কি কম কেরামতির ব্যাপার? ব্রাভো। ব্রাভো। 

যুধিষ্ঠির - হেহ, থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ৷ তা বলছিলাম যে..।

ঈশ্বর - এ যে কী ফ্যান্টাস্টিক ব্যাপার৷ অমন মহীয়সী দ্রৌপদী পাহাড়ের রাস্তায় ফসকে গেল। নকুল সহদেবের মত স্মার্ট দু'জন টেঁসে গেল। বীর অর্জুন ডাহা ফেল করে নিকেশ হয়ে গেল। আর এমন মহাশক্তিমান ভীম, সেও পুজোপ্যান্ডেলহপিং লেভেল হাঁটাহাঁটির চোটে খতম। এক তুমিই নিশ্চিন্তে হেঁটে স্বর্গলাভ করলে...।

যুধিষ্ঠির - সে'সব তো হল কিন্তু...।

ঈশ্বর - তুমি জিনিয়াস...। তুমি ঘ্যাম। 

যুধিষ্ঠির - আরে ধুর সে'সব তো বুঝলাম৷ দেখুন,সোজাসুজি বলছি। আমি স্রেফ টপ-কোয়ালিটি লুচি ভাজার গন্ধ পেয়ে... একটানা হেঁটে...পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে..লুচির সুবাসের উৎসে এসে পৌঁছলাম। আপনার হেঁসেল কে সামলায় বলুন দেখি? ভারী চমৎকার লুচি ভাজে তো। আমায় আগে সেই লুচির কাছে নিয়ে চলুন প্লীজ। এদ্দূর হেঁটে এলাম...আর গড়িমসি সহ্য হচ্ছে না।

ঈশ্বর - তুমি সত্যিই মহাত্মা হে যুধিষ্ঠির। গোটা স্বর্গই যে লুচি ভাজার সুবাসে পরিপূর্ণ। ওয়েলকাম ব্রাদার, ওয়েলকাম।

অন্য বেয়াল্লিশ



- গুরু, খৈনি হবে?
- মাইরি ডগলাস, তোমার মত ফচকে ছোকরা আর দুটো দেখিনি। আমি কি তোমার পাড়ার মোড়ের বেঞ্চিতে বসে আড্ডা দেওয়ার ইয়ারদোস্ত? ব্রহ্মাণ্ড চালাতে হয় আমায়। তোমার মত ছিচকে ভূত নই।
- আরে অত ঘ্যাম নিয়ে কী হবে গুরু। বেশ তো চুনে খৈনিতে ডলছিলে৷ দাও দেখি এক চিমটে।
- সাহেবসুবো মানুষ তুমি। এ'সব বিশ্রী নেশা তোমায় মানায় না।
- ঈশ্বর হয়ে মুখ টোপলা করে দিনরাত বসে আছ গুরু। আমি কৌনসি খেত কা মুলি৷ দাও গুরু। এক চিমটে দাও।
- এসো। 
- আহা, অমৃত। আচ্ছা গুরু, এত জটিল হিসেবকিতেব সামাল দাও কী করে বলো দেখি। যখনই দেখি খৈনি ডলে যাচ্ছ; ঈশ্বর হয়ে দুনিয়া সামাল দাও কখন?
- আমি ক্লার্ক নই ভায়া ডগলাস যে মুখ গুঁজে ফাইল ঘঁষটে যাব। সিস্টেম নিজের মত চলছে, আমি শুধু মাঝে মধ্যে "নাজুক নাজুক" বলে চলকে উঠি বা "তৌবা তৌবা" বলে চুকচুক করি।
- সিস্টেম। নাকি?
- এক্কেবারে ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড।
- সিস্টেমটা একটু খোলসা করো না গুরু৷ তোমারও কাজ নেই, মড়া হয়ে আমিও ফ্যা-ফ্যা করে টহল দিচ্ছি। একটু না হয় ভালো ভালো কথা শুনি।
- এ যে সব প্রশ্নের সেরা প্রশ্ন ভাই ডগলাস।
- উত্তরটা ছাড়ো না। 
- বলি?
- খৈনিদাদা, বলেই ফেলো।
- বেয়াল্লিশেই জবাব।
- বেয়াল্লিশ? লেগপুল করছ গুরু?
- না না, যাকে খৈনির ভাগ দিয়েছি, তার ঠ্যাং টানব কেন। তবে সিস্টেমের সিক্রেটটা বেয়াল্লিশ দিয়ে বোঝালে তুমি বুঝবে ভালো। 
- হেঁয়ালি না করে ঝেড়ে কাশো দেখি গুরু।
- পৃথিবীর কথাই বলি। আজ সক্কাল সক্কাল এক বাড়িতে সুতীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হল। ব্যাপার তেমন গায়ে মাখার মত নয়। যা হয় আর কী; গরীবের সংসার, দানাপানি নেই। খিদের জেরবার খোকাখুকুদের কান্না থামারও নাম নেই। বিশাল সংসারে আয়ের মানুষ দু'জন। সেই খোকাখুকুর বাপ আর তাদের দাদু। ঝগড়া বেঁধেছিল সেই বাপ আর দাদুর মধ্যে; সক্কালসক্কাল।
- ঝগড়া কেন? আর এর সঙ্গে বেয়াল্লিশের কী সম্পর্ক?
- খৈনি চিবোনো আর গল্প শোনার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো সমীচীন নয় ডগলাস৷
- বেশ। বাপ-দাদুর ঝগড়া। কেন?
- দিন আনি দিন খাই সংসার। নাতিনাতনির কান্নার শব্দ সহ্য করতে না পেরে জঞ্জালকুড়িয়ে দাদু চাইছে কাজে বেরোতে। কিন্তু বাপ বলছে ঘরে দানাপানি না থাকলেও কাজে বেরোনো অসম্ভব। সেই নিয়ে ঝগড়া। 
- ও মা! ঘরে খাবারদাবার নেই, এদিকে কাজে বেরোবে না? 
- শহরে দাঙ্গা লেগেছে যে। বিস্তর কাটাকাটি রক্তারক্তি। রাস্তায় প্রাণ হাতে করে বেরোতে হচ্ছে। আর বড়লোকদের না হয় বাতেলায় দিন কেটে যায়। গরীবদের ভয় বেশি। 
- ওহ্।
- কিন্তু বাপ যতই আপত্তি করুক, দাদুটি তো বাপের বাপ। সে কথা শুনবে কেন? খোকাখুকুর দাদু খোকাখুকুর বাপের কথায় পাত্তা না দিয়ে থলে কাঁধে বেরিয়ে পড়ল!
- এতে বেয়াল্লিশ কী? আর সিস্টেমই বা কোথায়?
- ধৈর্য ডগলাস। ধৈর্য। 
- যেয়াজ্ঞে। অতঃপর?
- তা দাঙ্গার চোখরাঙানি অগ্রাহ করে দাদু বেরিয়ে পড়ল কাজে। কারণ সে নিশ্চিত লোকের এ পাগলামি বেশিদিন চলতে পারে না, দাঙ্গা এখন স্তিমিত। কাজকর্ম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকাটা পাপ। খোকাখুকুর খিদের কান্না সহ্য করাটা পাপ। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আর সেই বিশ্বাসের ভরসায় সে বৃদ্ধ কাজে বেরোলেন; দিনের শেষে যদি দু'টো রুটির ব্যবস্থা করে ফেরা যায়।
- তারপর? গুরুদেব?
- সন্ধ্যে হল কিন্তু গেরস্থালীতে রুটি এলো না, ফিরল দাঙ্গার টাটকা শিকার; দাদুর লাশ। তবে অন দ্য প্লাস সাইড; বুঝলে ভায়া ডগলাস, দাদুর লাশ দেখা যন্ত্রণায় নাতি-নাতনিরা একটা রাত্রের জন্য অন্তত খিদের জ্বালাটা ভুলতে পারল। 
- ওহ...কিন্তু গুরু, এ'তে বেয়াল্লিশ কোথায়?
- শহরের দাঙ্গায় সে খোকাখুকুর দাদুই যে বেয়াল্লিশ নম্বর লাশ ভায়া ডগলাস। বেয়াল্লিশের উদাহরণ দিয়ে সিস্টেমের মূলমন্ত্রটা তোমায় বোঝাতে সুবিধে হবে বলে মনে হল। অন্ধকার যতই বেড়ে চলুক, মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে পথে নামবে আর বারবার সে বিশ্বাসভঙ্গ হবে৷ এ'ভাবেই বিশ্বাস আর বিশ্বাসভঙ্গের ইতিহাস চক্রাকারে ঘুরে চলেছে এবং চলবে। যদ্দিন তদ্দিন। ঈশ্বর হয়ে আমারও কিছু করার নেই৷ আর এক রাউন্ড খৈনি ডলি বরং, কী বলো ভাই ডগলাস?
পুনশ্চঃ
১। ধর্মের কথাই যখন হচ্ছে, তখন স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে "অতিরঞ্জন" এ পাতি ব্লগারের ধর্ম৷ তবে বেয়াল্লিশ নম্বর লাশের খবরটা নেহাত ভ্রান্ত নয়। ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০; "দ্য হিন্দু"র প্রথম পাতার খবর - Delhi Violence: 1 killed in fresh attack; toll touches 42।
২। ডগলাস অ্যাডামস সাহবের হিচহাইকারস গাইড টু দ্য গ্যালাক্সি অনেকেই পড়েছেন৷ যারা পড়েননি (এইবেলা পড়ে ফেলুন), তাঁদের জন্য কোট করলামঃ
"The number 42 is, in The Hitchhiker's Guide to the Galaxy by Douglas Adams, "The Answer to the Ultimate Question of Life, the Universe, and Everything", calculated by an enormous supercomputer over a period of 7.5 million years. Unfortunately no one knows what the question is." (এই লেখা সে বইয়ের রিভিউ বা সে বই প্রসঙ্গে আদৌ নয়)

ফার্স্ট পার্সন


ঋতুপর্ণবাবুর মুখে ও কলমে বাংলাভাষা জ্বলজ্বল করে ওঠে। আমি ভাষার দুরূহ টেকনিকালিটি তেমন বুঝি না, কিন্তু আর পাঁচটা ধান্দাবাজ মানুষের মত নিজের আত্মার আরামটুকু দিব্যি টের পাই। ঋতুপর্ণবাবুর কথায় ও ভাষায় সাজানো ওঁর ভাবনাচিন্তা আর গল্পগুলো মনের মধ্যে সত্যিই আরাম বয়ে আনে। অগাধ পড়াশোনার মধ্যে বহুমানুষই থাকেন, ইন্টেলেক্টের ব্যাপারেও যে ঋতুপর্ণ শেষ কথা; সে নিয়ে কথা বলার যোগ্যতাও আমার নেই। তবে সিনেমাটিনেমা যদি বাদও দিই, কথাবার্তায় ওর সততা, সারল্য, যুক্তিনিষ্ঠা এবং সর্বোপরি ওর ভাষার যে 'সুমিষ্ট স্মার্টনেস'; সে'সব মিলে আধুনিক বাঙালি ঋতুপর্ণর ভক্ত না হয়ে যাবে কোথায়? (এটা অতিশয়োক্তি হল কিনা জানিনা, তবে আমি নিজে যেহেতু ঋতুপর্ণর "ভক্ত্", সে'সব নিয়ে "কেয়ার" করা আমার সাজে না)। তবে এই সততা, সারল্য, যুক্তিনিষ্ঠা আর ভাষার স্মার্টনেসের বাইরে গিয়ে দু'টো ব্যাপার ঋতুপর্ণকে অনন্য করে তোলে;
এক, ওঁর "এমপ্যাথি"।  
দুই, যে মধ্যবিত্ত আটপৌরে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে ভদ্রলোক পৃথিবীর ইয়াব্বড় ব্যাপারস্যাপারগুলো দেখতে ও অনুভব করতে পারতেন৷

দে'জ থেকে প্রকাশিত ঋতুপর্ণর " ফার্স্ট পার্সন" বইজোড়ার পাতায় পাতায় সেই স্নেহ মাখানো মানুষটা৷ এদ্দিন কেন পড়িনি কে জানে, না পড়ে অন্যায় করেছি৷ যা হোক, গতকাল আমি প্রথম খণ্ডটা পড়ে শেষ করলাম৷ 
গত বছর দুয়েকে বেশ কিছু বায়োগ্রাফি পড়েছি আর অবশ্যই ঋতুপর্ণর এই বই কোনও মতেই জীবনী নয়,বরং পূর্ব প্রকাশিত গদ্যের সংকলন৷ অথচ এই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লেখাগুলোর মাধ্যমে কী চমৎকার ভাবে একটা নন-লিনিয়ার জীবনী তৈরি হয়েছে। বায়োগ্রাফি যদি স্রেফ "হিসেব সর্বস্ব" হয় তবে তা বেশ একঘেয়ে ঠেকতে পারে; "আমি এই করলাম, তারপরে ওই হল, তারপর আমি অমুক সাফল্য পেলাম আর শেষে গিয়ে তমুক হল"। এই "হিসেব সর্বস্বতা" র জন্যেই মাস্টারব্লাস্টার শচীনের জীবনীর চেয়ে মঞ্জরেকারের জীবনী অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। অমুকবাবুর জীবনীতে আমি স্রেফ উইকিপিডিয়া গোছের 'এন্ট্রি' গড়গড় করে পড়ে যেতে চাইনা, বরং আমি চাই অমুকের চোখ দিয়ে অমুকের পৃথিবীটাকে চিনতে। যে কোনও জীবনীতে আমি ইনফর্মেশন নয়, গল্প (আষাঢ়ে নয়) খুঁজে বেড়াই। আর সে'খানেই "ফার্স্ট পার্সন" য়ের প্রথম খণ্ডটা পড়ে মনে হল, কী চমৎকারভাবে ঋতুপর্ণবাবুর জীবনটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। অঙ্ক মেনে ছকে, জার্নাল লেজার ঘষেমেজে লেখা জীবনীর চেয়ে এ'টা একদিক থেকে ঢের বেশি ভালো। 
চাকরী সূত্রে আমার গত আটবছর কেটেছে যোধপুর পার্ক, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড অঞ্চল ধরে; কলকাতার এই পরিচিত এলাকাগুলো ঋতুপর্ণর ছোটবেলার চোখ দিয়ে দেখতে পাওয়াটা একটা বাড়তি পাওনা। 
প্রথম খণ্ডের একজায়াগায় ঋতুপর্ণ নিজের মায়ের চলে যাওয়ার কথা লিখছেন৷ পাশাপাশি তুলে ধরছেন বৃদ্ধ অসহার পিতার একাকিত্ব। ও অংশটায় আমি বার পাঁচেক ঘুরপাক খেয়েছি। এবং তারপর থেকে সে অংশটুকু আমার মনের মধ্যে ক্রমাগত ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছে। নিজের সেই একঘেহে সঞ্জীব-ঘ্যানঘ্যানানিতে ফিরে গিয়ে বলি; ঋতুপর্ণ সঞ্জীবের গল্পের রূপকথা-মার্কা চরিত্রদের মত করে ভালোবাসতে পারতেন বলেই আমার মনে হয়৷

বাঘবন্দীর খেলা


- অভ্র, শুনলাম তুই মিছিলে যোগ দিবিনা বলেছিস..।
- ঠিকই শুনেছ।
- লাইটার আছে? আমারটা কে যে ঝেড়ে দিলো।
- এই যে।
- একটা সিগারেট না ধরালেই নয়..থ্যাঙ্কস। 
- মনোজদা, ও মিছিলে আমি বেরোব না।
- ভেবে বলছিস তো?
- তুমি তো জানো, আমি চিরকালই এক কথার মানুষ।
- তোর এই ট্রেটটা আমার বরাবরই ভালো লাগে। তুই ইউনিভার্সিটিতে থাকতেই তোকে মার্ক করেছিলাম কি সাধে? তোর মধ্যে একটা ডিসাইসিভ ব্যাপার আছে, তোর ফোকাস আছে,জেদ আছে, অধ্যাবসায় আছে৷ পলিটিক্সে এই ব্যাপারগুলো খুবই জরুরী৷ 
- এ'টা মিছিল নয় মনোজদা...পরিকল্পিত হামলা৷ 
- তুই লম্বা রেসের ঘোড়া৷ পার্টিতে তোর একটা ব্রাইট ফিউচার আছে৷ হাইকম্যান্ড তোর এনার্জি আর ইন্টেলিজেন্সকে যথেষ্ট সমীহ করে। কিন্তু এখন তোকে যদি সহজপাঠ ধরে পড়াতে হয়....দ্যাট ইজ আনফরচুনেট। দ্যাখ অভ্র, প্রতিটা মিছিলই পরিকল্পিত আক্রমণ৷ সে আক্রমণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে, পচাগলা সিস্টেমের বিরুদ্ধে। 
- কিন্তু তোমাদের আজকের এই পরিকল্পিত আক্রমণ অন্যায় বা পচা সিস্টেমের বিরুদ্ধে তো নয়। 
- আমাদের? এ পার্টি তোর নয়? 
- কিছু অসহায় মানুষকে মারধোর করে, তাদের দোকানপাট জ্বালিয়ে তোমরা নিজেদের পলিটিকাল ক্যাপিটাল জড়ো করছ৷ এ কাজ করতে তো আমি পার্টিতে আসিনি মনোজদা...।
- এ'সব ফাঁপা বুলি আউড়ে...।
- কোনো লাভ নেই জানি৷ তবে আমায় ডেকেও কোনও লাভ হবে না মনোজদা। 
- বেশ। তবে তোর লাইটারটা বরং আমার কাছেই থাক...। মিছিলে তো আর স্লোগান থামিয়ে অন্যের কাছে দেশলাই চাওয়া যায় না...কী বলিস? আসি৷ মিছিলে না যাস, কাল অফিসে আসিস। একটা ভালো বই পড়াব। কেমন?
- বেশ। 
***
- অভ্রকে আনতে পারলে না তো মনোজদা?
- বড্ড জেদ। আজ ছেলেটা এলোই না রে পটা। 
- বড্ড রোয়াব মালটার। পার্টির স্বার্থে নিজের আইডিয়াল কিছুতেই ছাড়তে রাজী নয়...এদিকে আমরাই হলাম কুলিমজুর মানুষ...মিছিলের পতাকা হোক বা পেট্রোল বোমা; সে বোঝা আমাদেরই বইতে হবে। 
- আইডিয়াল নাকি? হেহ্।
- হাসছ যে বড়?
- পলিটিক্স শুধু রাজনৈতিক ঝাণ্ডা বাগিয়েই হয় রে? পার্টির লাইন মত দু'চারটে মানুষ প্যাঁদানোই দলের একজন হয়ে ওঠার একমাত্র উপায় ভেবেছিস? 
- অত র‍্যালার কথা আমার মাথায় ঢুকলে আজ রাস্তায় নেমে দাঙ্গা না বাঁধিয়ে পার্টি অফিসে বসে টিভি চ্যানেলদের ইন্টারভিউ দিতাম গো মনোজদা।
- শাটাপ রাস্কেল! কতবার বলেছি মিছিলকে মিছিল বলবি। দাঙ্গাটাঙ্গা আবার কী ছোটলোকের মত ভাষা! বল প্রতিরোধ! বল সংগ্রাম!
- ওই হল। ক্যালানি দেওয়ার আগে কত যে ঢ্যামনামো মারাতে হয়। যাক গে, ঝাণ্ডা না বাগিয়ে রাজনীতি কীভাবে করা যায় মনোজদা?
- ধরিমাছনাছুঁইপানিবাজ আইডিয়ালিস্টদের চিনতে পারা; ওটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ক্ষমতা। সে ক্ষমতা আছে বলেই আজ আমি নেতা আর তুই স্রেফ কর্মী। 
- ধ...ধরিমাছ...ধরিমাছ...।
- ধরিমাছনাছুঁইপানিবাজ আইডিয়ালিস্ট। এই যেমন অভ্র। এই আইডিয়ালিসম বেচে ও একদিন বড় কলেজের প্রফেসর হবে, টেড-টক দেনেওলা ইন্টেলেকচুয়ালও হতে পারে। অথচ দ্যাখ, আমি আগুন লাগাতে বেরোচ্ছি জেনেও ও কেমন নিশ্চিন্ত মনে আমায় নিজের লাইটার ধার দিল৷ আইডিয়াল নিয়ে ও আছে; থাকুক। কিন্তু এই টোকেনিজমটুকুকে ত্যাগ করতে পারলে না যখন, ওর মুক্তি নেই রে।
- মুক্তি নেই? 
- আজ অভ্রর লাইটার মিছিলে বেরোবে, তা দিয়ে দু'চারটে দোকানপাট জ্বালাব। কাল অভ্র নিজের বেরোবে মশাল হাতে হারেরেরেরে সুরে। আর এই অভ্রদের সাইলেন্স চিনতে পারি বলেই আমি নেতা...কী বুঝলি? 
- তোমার কাছে বিড়ি আছে গুরু?

ট্রাম্পদার মগজে


- হেইয্যো...ট্রাম্পদা...হেইয্যো...। 
- হু আর ইউ?
- ওহ হো, ইংরেজিতে কথা বলতে হবে তো। আজ্ঞে, আই অ্যাম তাপস সাহা। 
- ট্যাপাস?
- স্যাহা। যেয়াজ্ঞে। 
- হ্যাভ ইউ কিডন্যাপড মি?
- সে কী কথা! নো নো স্যার। হাউ ডু আই কিডন্যাপ? ইউ নাউ ইন ডীপ ঘুম...যাকে বলে ইজ ন্যাপিং লাইক আ কিড । আই অ্যাম অ্যাকসেসিং ইওর ব্রেন থ্রু তন্ত্র। 
- ইউ আর অ্যাকসেসিং হোয়াট?
- ইওর ব্রেন স্যার। লোকেট করা ওয়াজ ভেরি টাফ। বাট ফাইনালি আই কুড এস্টাবলিশ কনেকশন। তিন দিন ধরে সিগনাল পাঠাচ্ছি আর সিগনাল গোঁত্তা খেয়ে ওয়াপস আসছে। গেটিং নাগাল অফ ইওর ব্রেন ইজ ভেরি ভেরি টাফ। বাট ফাইনালি...।
- অ্যান্ড ইউ আর অ্যাকসেসিং মাই ব্রেন থ্রু...?
- আজ্ঞে, তন্ত্রযোগে।
- ট্যান্ট্রা ইয়োগা?
- ওই হল।
- ইজ দ্যাট সাম কাইন্ড অফ হোকাস পোকাস?
- হোকাস পোকাস ফর ইউ ডিয়ার পোটাস। টোটাল সাধনা ফর মি। ফাইভ ইয়ার্স স্পেন্ট অ্যাট তারাপীঠ শ্মশান স্যার। সাবসিকুয়েন্টলি থ্রি ইয়ার্স অ্যাট দ্য জঙ্গল ইনসাইড নেপাল। ভেরি ডীপ সাধনা; ইয়ে...ইংরেজিতে...স্যাঢ্যানা বোধ হয়...ইউ নো...। 
- ইউ আর আ ক্রেজি ফেলো...। 
- টু প্র্যাক্টিস তন্ত্র, অল্পস্বল্প ক্রেজিনেস ইস নেসেসারি স্যার। 
- সো ইফ আই আন্ডারস্ট্যান্ড করেক্টলি, ইউ আর ইনসাইড মাই হেড?
- হোয়াইল ইউ আর অ্যাস্লিপ; ইনসাইড এয়ারফোর্স ওয়ান- ফ্লাইং টু আমেরিকা, ফ্রম ইন্ডিয়া। 
- সো দিস ইজ আ ড্রীম?
- ড্রীম বলতে পারেন...ইউ ক্যান সে ড্রীম। বাট দিস ইজ সলিডার দ্যান ড্রীম। 
- হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? ইউ ক্যান্ট হার্ট মী...আই হ্যাভ দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস আর্মি ইন দ্য হোল ওয়ার্ল্ড...। 
- দ্যাখো কাণ্ড। বলেন কী স্যার। আই উইল হার্ট? আই ডু নট ইভেন টাচ মসকিউটোস স্যর, আনলেস দে ডু রামত্যাঁদড়ামো। তা যা বলার জন্য এত কাঠখড় পোড়ানো...। 
- ইংলিশ প্লীজ...। 
- ওহ সরি। ইয়ে...হোয়াই আই বার্ন্ট সো মাচ উড অ্যান্ড স্ট্র টু রীচ ইওর ব্রেন...। 
- ইউ সিলি ইন্ডিয়ান...স্পীক ইন আ ল্যাঙ্গুয়েজ দ্যাট আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড...। 
- ক্লাস নাইন ফেল স্যার। দিস ইজ মাই হাইয়েস্ট ইংলিশ। 
- হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? 
- ওই...ওয়ান্টিং টু এস্টাব্লিশ কমিউনিকেশন উইথ ইয়োর ব্রেন স্যার...। 
- বাট হোয়াই? 
- টু কমিউনিকেট সামথিং প্রচণ্ড ক্রিটিকাল স্যার।
- কাম ক্লিন ট্যাপাস। আই অ্যাম দ্য প্রেসিডেন্ট, আই ডু নট হ্যাভ টাইম ফর অল দিস ট্যান্ট্রা ননসেন্স। 
- অত বাতেলা ভালো নয় সাহেব। অল দ্যাট বিগ বিগ টক ইজ নট গুড। যাক গে, অন বিহাফ অফ ইন্ডিয়ান সিভিলাইজেশন; আই হ্যাভ আ জরুরি ক্ল্যারিফিকেশন টু মেক। 
- ক্ল্যারিফিকেশন? 
- ইউ সী তাজ মহল? গুড। ইউ সী বস্তি ঢেকে দেওয়া দেওয়াল...আই মীন...ইয়ে...পুওর পিপল হাইডিং ওয়াল? ভেরি ভেরি গুড। ইউ কোকা কোলা, উই কোকা কোলা উইথ ইউ। কিন্তু সাহেব...ভেরি ভেরি বিগ স্ক্যান্ডাল হ্যাপেনড ট্রাম্পদাদা...। 
- স্ক্যান্ডাল ?
- শিঙাড়া বলে যেটা খেলেন সেটা কচু শিঙাড়া। আই মীন...দ্যাট সামোসা ইউ হ্যাড...দ্যাট ইজ ফেক সামোসা।
- আই হ্যাড ফেক সামোসা?
- ঘোর কলি ব্রো, ঘোর কলি। তাই ব্রোকলি দেওয়া সামোসা ইউ হ্যাড। 
- দ্যাট ইজ রাইট... আই হ্যাড সামোসা উইথ ব্রোকলি...। 
- দ্যাখো কাণ্ড, দ্যাখো। তাজ মহলকে তেজো মহালয়া বলুন নো প্রবলেম। কিন্তু এ কী অনাসৃষ্টি। আই মীন, হোয়াট ক্যালামিটি ইজ দিস। ইউ সি; ব্রোকলি ইন সামোসা ইস ঘোর সমস্যা; লাইক আমলকী ইন বার্গার স্যার বা ধরুন লাইক ব্রেনোলিয়া ইন কোকাকোলা বা লাইক নিম-বেগুন ইন কেএফসি বা...।
- আই ওয়াজ ফেড ফেক সামোসা?
- ঘোর কলি ব্রো, ঘোর কলি। তাও ভালো...আই মীন...থ্যাঙ্ক মা তারা দ্যাট ইউ ডিড নট ঈট ব্রকোলি বিরয়ানি...। দ্যাট উড হ্যাভ বিন আ মেগা ক্যালামিটি স্যার...। 
- সাম ডে আই উইল হ্যাভ আ প্রপার সামোসা ট্যাপাস! ইউ উইল সী। আই উইল মেক শিঙাড়া গ্রেট এগেইন।
- স্বপ্নে তো আর ফুলকপির শিঙাড়া খাওয়ানো যায়না স্যার। নয়ত নিজের হাতে খাওয়াতাম। কলিফ্লাওয়ার সামোসা আই মীন; অমন পবিত্র সুবাস নাকে গেলে নিজে নিজেকে ইম্পীচ করে দিতেন। বিশ্বাস করুন!

কৈলাসের পিসেমশাই


(নীচের ছবি সম্বন্ধে
সূত্রঃ শুকতারা শারদ সংখ্যা ১৯৯১, 
মূল কবিতার নামঃ "কৈলাসপতির কলকাতা দর্শন",
কবিঃ ভবানীপ্রসাদ মজুমদার)

***
- নন্দে, ফটোশপ ব্যাপারটা কী রে?
- সে জিনিসে আপনার আবার কী দরকার গুরু?
- আরে বল না। 
- ও'সব মর্ত্যলোকের জিনিস। তা দিয়ে হবেটা কী।
- আরে ধ্যার রে বাবা খালি ফালতু কথা। প্রশ্ন করলে মাথা নুইয়ে উত্তর দিবি, অত চ্যাটাংচ্যাটাং পাল্টা প্রশ্ন আবার কেন রে নন্দে? ফটোশপ কী তা আদৌ জানিস কি?
- জানি না আবার। কাতুদা তো ওই দিয়েই নিজের গোঁফে অমন জেল্লা জুড়ে মর্ত্যে নিজের ইমেজ বানিয়েছে। এমনিতে তো দিনে বাইশবার দাড়ি কামিয়েও গোঁফ পুরুষ্টু হল না।
- বটে?
- আজ্ঞে। চুঁচড়োয় সে'বার দেখলেন না, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে কাতুদার ইয়াব্বড় পাকানো গোঁফ।
- ছেলেটা এখনও জ্যামিতিটা ভালো করে শিখলনা অথচ বাহারে মেজাজ রপ্ত করেছে সাড়ে ষোলআনা। যাকগে, ওই ফটোশপ ব্যাপারটা একটু হাত কর দেখি নন্দে।
- কিন্তু ফটোশপে আমাদের কাজ কী?
- সিক্স প্যাক না জুড়লে কেউ পাত্তা দিচ্ছে না রে। এই দ্যাখ না সে'দিন, আমার এক পুরনো ভক্তকে স্বপ্ন দিয়ে বললাম পাড়ার শিব মন্দিরের ত্রিশূলটায় মরচে পড়েছে, একটা নতুন কিনে দিতে৷ ও মা, নাদুসনুদুস চেহারা দেখেই ভাবল বোধ হয় মাই ডিয়ার পিসেমশাই গোছের কেউ৷ ব্যাটাচ্ছেলে সামান্য ত্রিশূল রিপ্লেস করার জন্য অফিসে প্রমোশনের বর আদায় করে ছাড়লে। কোথায় থরহরি কম্প হয়ে হুকুম তামিল করবে তা না! ব্যাটা স্বপ্নের মধ্যে নেগোশিয়েশন শুরু করলে! ভাবতে পারিস?
- অ। তা ফটোশপে আপনার ফুলকো বাইসেপ আর ঘ্যাম সিক্সপ্যাক দেখলে ভক্তরা নিঃস্বার্থ সেবা করবেন ভেবেছেন? সে গুড়ে বালি, কী জিনিস মর্ত্যলোকে ছেড়েছেন গুরু। সব এক একটি চীজ।
- এ আবার কী ভাষা নন্দে। চীজ?
- ও ছোটখাটো ব্যাপার আপনি বুঝবেন না৷ দাঁড়ান, আমি বরং একটা কল্কে সেজে দিই।
- থাম। কথায় কথায় খালি আমায় কল্কে গছিয়ে প্রসাদ পাওয়ার ধান্দা। পার্বতী ঠিকই বলে, তোদের জন্যেই আমি এই মেদ ব্যাপারটা কন্ট্রোল করতে পারছি না। আমার দরকার ডিসিপ্লিন।
- ডিসিপ্লিন গুরু?
- আলবাত। বাড়তি মেদ না ঝরলে...।
- মেদ? আপনার আবার মেদ কোথায় গুরু? ওটা তো বিউটি ফ্যাট।
- বলছিস?
- কী জেল্লা দিচ্ছে। বিষ্ণু স্যরের গ্লেজ আছে বটে, তবে আপনার ন্যাচুরাল গ্লোর ধারে কাছে লাগতে পারবে না। খামোখা আপনি মেদটেদ নিয়ে পড়লেন..। বিষ্ণু স্যর পারত হলাহলকে অমন ব্লু লেগুনের মত স্যাটাস্যাট সাফ করে দিতে?
- পারত না, তাই না?
- এক্কেবারে ছড়িয়ে একাকার করে দিত। যাক গে, কল্কেটা সাজি?
- তা সাজ। তবে ইয়ে নন্দে, কাতুকে বলে ওই ফটোশপটার একটা ব্যবস্থা কর বাবা। বিউটি ফ্যাট নিয়ে কৈলাসে বসে থাকি ক্ষতি নেই, কিন্তু মর্ত্যে একটু ইমেজ মেকওভারের দরকার আছে। নয়ত স্বপ্নাদেশ দিতে গেলেই ভক্তগুলো অকারণ গপ্প জুড়ে দেয়, যেন গুপ্তিপাড়ার পিসেমশাই এসেছে মাখাসন্দেশের হাঁড়ি হাতে। 
- তা নিয়ে আর চিন্তা কীসের। সিক্স প্যাক ঠ্যাক জুড়ে এখুনি আপনাকে ক্যাপ্টেন আমেরিকা করে দিচ্ছি।
- ক্যাপ...ক্যাপ্টেন আ...আমেরিকা? সে'টা আবার কী? ধ্যেত্তোরি, ও'সব বাড়াবাড়ি ভালো নয় নন্দে। 
- যেয়াজ্ঞা। ভাববেন না, কাজ হয়ে যাবে।
- ইউ আর আ গুড বয় নন্দে। এ কাজ করতে পারলে তোকে আমি নিজের হাতে লুচি ভেজে হালুয়ার সঙ্গে খাওয়াবো।
- কে বলবে আপনি গুপ্তিপাড়ার ন'পিসে নন।
- কী বললি রে ব্যাটাচ্ছেলে?
- ও কিছু নয়। এই নিন কল্কে, প্রসাদ দিয়ে ধন্য করুন।

আ ক্লিয়ার ব্লু স্কাই



জনি বেয়ারস্টোর বায়োগ্রাফিতে আর যাই থাক, ওয়ার্নের জীবনীতে বর্ণিত সেই ক্রিকেটীয় থ্রিল নেই৷ কিন্তু এ বই পড়ার জন্য সে অর্থে ক্রিকেট ভক্ত না হলেও চলে। কালপুরুষ ছবির শেষে সমুদ্র ঘেঁষে পিতা-পুত্রের হেঁটে যাওয়া যারা দেখেছেন, নিশ্চিত ভাবেই সেই সিনেমার ভবঘুরে বাঁশিওয়ালার সুর ভোলেননি। আমি ভুলিনি। আর গোটা বই জুড়ে সেই সুর ঘুরে ফিরে আসে।
স্পয়লার নয় (জীবন থেকে তুলে আনা এমন তরতাজা গল্পের স্পয়লার হয় না), শুধু বইয়ের পটভূমিটা দু'লাইনে বলা যায়৷ জনির বয়স যখন সাত তখন ওর মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তার কিছুদিনের মাথায় জনির বাবা ডেভিড বেয়ারস্টো (যিনি নিজেও একজন ক্রিকেটার, ইয়র্কশায়ারের এক প্রাক্তন মহারথী বলা চলে) আত্মহত্যা করেন। সে'খান থেকে জনি যে হারিয়ে যাননি তার প্রমাণ তাঁর ক্রিকেট কেরিয়ার। বলাই বাহুল্য যে সেই উত্থান নিয়ে একটা রূপকথার মত গল্প বলা যেতেই পারে। কিন্তু এ বইয়ে ঠিক রূপকথার মেজাজ নেই। 


এক খোকা পথ হাঁটছে আর অনবরত নিজের বাবার না-থাকা-টুকুকে পেরিয়ে আবছা কিছু স্মৃতি আঁকড়ে নিজের বাপের গন্ধ খুঁজে নিচ্ছে৷ সিনিয়র বেয়ারস্টোও উইকেট কীপার ছিলেন, তাঁর দুম করে চলে যাওয়ার গুমোটে আটকে না থেকে জুনিয়র বেয়ারস্টো উইকেটকীপিং গ্লাভস হাতে তুলে নিচ্ছেন; ব্যাপারটা যেমন যন্ত্রণাদায়ক তেমনি সুন্দর। এই বই না পড়লে অবশ্য সেই দোলাচলটা টের পাওয়া যাবে না। মতি নন্দীর উপন্যাস হতে পারত এ বই; সহজেই। 
এ বইয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিষাদ। অথচ এ বইয়ের নাম "আ ক্লীয়ার ব্লু স্কাই" কী অপূর্ব ভাবে সার্থক। ক্রিকেটার জনি বেয়ারস্টোর আত্মজীবনী পড়তে বসেছিলাম৷ বই শেষ করে টের পেলাম যে বেয়ারস্টোর আত্মজীবনীই বটে; তবে পুত্র জনির নয়, পিতা ডেভিডের।
নিজের বাপের বিষাদকে এমন ভাবে ভালোবাসায় মুড়ে রাখতে খুব বেশি মানুষ পারেননি। জোনাথন মার্ক বেয়ারস্টো পেরেছেন আর এক মন ভালো করা গল্পের মাধ্যমে নিজের বাপকে মৃত্যুঞ্জয় করে তুলতে পেরেছেন। 
এ বই না পড়লেই নয়।

জেটবাহাদুর মশাবাহিনী

গুডনাইট অলআউট এইসব বিশ্রী বিষাক্ত যন্ত্রপাতির যুগে হাইকোয়ালিটি মশাদের প্রভাব প্রতিপত্তি আগের চেয়ে বেশ খানিকটা কম। ব্যায়াম করা চাবুক চেহারার মশাদের দল আজকাল আর অত সহজে দেখাও যায়না; অন্তত ঘরে বা অফিসে তো নয়ই। কলেজে পড়ার সময় যে ভাগ্যবান বন্ধুরা নন্দন চত্ত্বরে বসে প্রেম করেছে, তাদের মুখে শুনেছি পালোয়ান মশাদের জেটবাহাদুর গল্প; চুমুর চক-চকাম নাকি সহজেই ঢাকা পড়ে যেত সেই মশাশ্রেষ্ঠদের মঁ-মঁ-মঁ-মঁ গুঞ্জনে। 
আজকাল যে'সব মশা নজরে পড়ে তাদের আর যাই হোক; সুগঠিত সুঠাম সুদৃঢ় বলা চলেনা। বেশির ভাগই কুচিকুচি সাইজের; তাদের কামড়ে ধার নেই। বাকিরা বেঢপ থ্যাবড়া, তাদের বেয়াল্লিশ মাসে বছর; গায়ে বসে সামান্য এক কামড় দিয়েই আর নড়তেচড়তে পারেনা। তাদের থাবড়ে মারতেও মায়া হয়; আলতো ফুঃ দিয়ে "সোনা বাবা" করে উড়িয়ে দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। মোদ্দা কথা হল এই অস্থির সময়ে মশা ম্যানেজমেন্টের চ্যালেঞ্জটাই নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। 
সামগ্রিকভাবে মেট্রো মশাদের ফিজিকাল ফিটনেস আর প্রত্যুতপন্নমতিত্ব তলানিতে এসে ঠেকেছে। আগে তারা দলবদ্ধ হয়ে ডাকাতে মেজাজে হা-রে-রে-রে সুরে আক্রমণ করত; এখন টুকটাক সিঁদ কাটে বা পকেটে ব্লেড চালানো লেভেলের মিনমিনে কলজে নিয়ে ঘুরঘুর করে। অচিরেই ক্যালক্যাটার মসকিউটোরা মাস স্কেলে কুইট করবে; এ দুশ্চিন্তা মনের মধ্যে মাঝেমধ্যেই ঘুরপাক খায়। 
তবে দমবন্ধ করা অন্ধকার ভেদ করে সামান্য আশার আলো আজ দেখতে পেলাম। কলকাতা বিমানবন্দরের তেইশ এফ গেটের সামনে বসে ফ্লাইটের অপেক্ষা করতে করতে টের পেলাম পালোয়ান মশাদের একটা চমৎকার অভয়ারণ্য এখানে গড়ে তোলা গেছে। অসংখ্য মশামহারথী বিভিন্ন ফর্মেশনে আক্রমণ করছে আর এলোপাথাড়ি চড় থাপ্পড়কে অবলীলায় ডজ করে সরে পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা; তারা কামড় দেওয়ার পরেই লেতকে চামড়ার ওপর পড়ে থাকছে না, স্যাট করে উড়ে যাচ্ছে৷ ভোর রাত্রে চোখে সামান্য ঘুম ছিল বটে কিন্তু এমন টীম-পারফর্মেন্স শেষ কবে দেখেছি মনে নেই, কাজেই ওদের হাতে ঘুম ফর্দাফাই হলেও ওদের বোঝাপড়ার তারিফ না করে থাকা গেল না। গালের মশাকে যেই আক্রমণ করতে যাব অমনি আরও তিনটে মশা বাঁ হাতের মধ্যমায় এসে বসেছে; সে'দিকে মন দিতেই ডান হাতের থাপ্পড় গেল ভড়কে আর গালের মশা এক হোমিওপাতি শিশি রক্ত চুষে গায়েব। ভুল দেখেছি কিনা জানিনা তবে ঘুমচোখে একবার যেন মনে হলো এই মশারা বোধহয় হাইফাইভ দিতেও শিখে গেছে।  
এ মশারা প্রত্যেকে হাইলি স্কিলড। তাদের কামড়ে ঝাল নেই, মাইনর কুটুশ আছে; তবে যে'টা মোক্ষমভাবে আছে সে'টা হলা কামড়ানোর কয়েক সেকেন্ড পর ছড়িয়ে পড়া জ্বালা। 

কলকাতা বিমানবন্দর কতৃপক্ষকে আন্তরিক অভিনন্দন কলকাতার মেট্রো-জীবনের বিষণ্ণতার আস্তরণ ভেদ করে এমন হাই কোয়ালিটি মশাদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। এইমাত্র বোর্ডিং শুরু হয়েছে। জেটবাহাদুর মশাবাহিনীকে "ব্রাভো" বলে এগোলাম৷ এই অকুতোভয় সৈনিকদের আধলিটার রক্তদান করতে পেরে গর্বিত বোধ করছি।

Sunday, March 1, 2020

ফ্যাসিজমঃ আ ওয়ার্নিং


ফ্যাসিবাদ শব্দটা নিয়ে এখন চারদিকে বেশ কফিহাউস লেভেলে কপচানি চলছে। এটাও মেনে নিতে অসুবিধে নেই যে মতের অমিল হলেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের গায়ে ফ্যাসিস্টের তকমা এঁটে দেওয়ার মধ্যে পপকর্ন-মুচমুচ থাকলেও, ব্যাপারটা সম্পূর্ণভাবে যুক্তিযুক্ত নাও হতে পারে। 
আর পাঁচটা নেটিজেনের মতই আমার ধৈর্য কম। দুম করে ওপিনিওন ঝেড়ে দিয়ে আমি তৃপ্তিলাভ করি আর রাজনৈতিক তর্কে নির্বিচারে 'ফ্যাসিস্ট" গোছের শব্দ জুড়ে দিয়ে আমি টেবিল চাপড়ে থাকি। সস্তা থ্রিল আমার মন্দ লাগে এমন কথা বললে বেশ 
অন্যায়ই হবে বটে। তবে ইদানীং মনে হচ্ছিল এই ফ্যাসিজম সম্বন্ধে সামান্য পড়াশোনা করলে নেহাত মন্দ হয়না৷ একদিকে বেশ ভজকট ব্যাপারে জানার ইচ্ছে আর অন্যদিকে শখের-প্রাণ-গড়েরমাঠ সিন্ড্রোম; কঠিন কন্সেপ্ট বুঝতে চাওয়া সহজ গল্প শোনার স্টাইলে। কাঠখোট্টা পাথুরে ভাষায় আরসালান বিরিয়ানির রিভিউ পড়লেও তা বাসি-পাউরুটি-মার্কা নিরস ঠেকতে পারে। সবচেয়ে ভালো হত যদি ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে সঞ্জীব বা পূর্ণেন্দু পত্রী কোনও প্রামাণ্য বই লিখতেন; তা নিশ্চিত ভাবেই আমার মত "কিশোর সমগ্র"-প্রাণ মানুষের জন্য সুখপাঠ্য হত। কিন্তু তেমন সরেস বইয়ের অপেক্ষায় থাকলেই হয়েছে আর কী। 

খানিকটা খোঁজখবর নিয়ে পড়া (শোনা, অডিওবুক) শুরু করলাম ম্যাডেলিন অলব্রাইটের "ফ্যাসিজমঃ আ ওয়ার্নিং"। সে অর্থে, ম্যাডেলিন ম্যাডাম যে নারায়ণ দেবনাথ-সুলভ সরল ভাষায় এ বই লেখেননি তা বলাই বাহুল্য। তবে দিব্যি তরতর করে এগিয়ে যাওয়া যায়। অলব্রাইট হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সেক্রেটারি অফ স্টেট; কাজেই তার লেখায় অবধারিত ভাবে প্রাধান্য পেয়েছে ডেমোক্র‍্যাট আমেরিকান পয়েন্ট অফ ভ্যিউ; কিন্তু তা'তে এ বইয়ে ধরা ইতিহাস তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলেই আমার মনে হয়৷ 
বাঁধাধরা ফর্মুলা বা ডেফিনিশনে ফ্যাসিবাদকে বোঝা সম্ভব না হলেও, ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলোকে বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ম্যাডেলিন অলব্রাইট। ফ্যাসিবাদ সম্বন্ধে আমাদের বেশির ভাগ ধারণাই সম্ভবত হিটলার এবং মুসোলিনি কেন্দ্রিক অথচ ফ্যাসিবাদ কোনো ছকে বাঁধা অঙ্ক নয় যে জার্মানির দুই যোগ দুই আর পাকিস্তানের দুই যোগ দুইতে কোনো ফারাক থাকবে না। বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে ফ্যাসিবাদী মনোভাব। সবচেয়ে বড় কথা সময়ের সঙ্গে ফ্যাসিবাদ এক জটিল বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গেছে। উনিশশো তিরিশের দশকে ফ্যাসিবাদের যে চেহারা ছিল তার সঙ্গে আধুনিক ফ্যাসিবাদি হিসেবকিতেব সম্পূর্ণ খাপেখাপ নাও মিলতে পারে। 
এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও অলব্রাইট যে'টা সফল ভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন সে'টা হল একটা সরকার বা নেতার ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা। এই প্রক্রিয়াটাকে মোটের ওপর বুঝতে পারলেই হয়ত যে কোনো আধুনিক নাগরিক চিনে নিতে পারবেন অশুভ শক্তিগুলোকে। ব্যাপারটা টুক করে লিখে দেওয়াটা সহজ কিন্তু আত্মস্থ করা কঠিন; আরও কঠিন হল বোঝানো। 
যে কোনো সরকারি হঠকারিতাই কি ফ্যাসিস্ট কাজকারবারের সঙ্গে তুলনীয়? একনায়কতন্ত্র আর ফ্যাসিবাদে কি প্রায় একই ব্যাপার? এমন অনেক জটিল প্রশ্ন অত্যন্ত সহজভাবে আলোচনা করেছেন ম্যাডাম অলব্রাইট। আর বইজুড়ে যাবতীয় আলোচনার মূলে রয়েছে ইতিহাস। ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে শুধু জার্মানি আর ইতালিতে আটকে না থেকে লেখিকা চমৎকার ভাবে তুলে ধরেছেন উত্তর কোরিয়া, তুরস্ক, পোল্যান্ড, হাঙ্গারি, রাশিয়া, মিশর, ভেনেজুয়েলাএবং আরও অনেক দেশের ফ্যাসিবাদী ইতিহাস। ফ্যাসিবাদের পলিটিকাল ইতিহাসের একটা চমৎকার প্রাইমার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন লেখিকা, আর সেটা তৈরি করেছেন এমন ভাষায় যা সাধারণ পাঠকের জন্য সহজ ও মূল্যবান। মার্কিন।সেক্রেটারি অফ স্টেট হিসেবে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ভর দিয়ে যেভাবে পুতিন,শ্যাভেজ, কিম, ট্রাম্পের (এবং অন্য অনেক দেশনেতার) চরিত্রের বিশ্লেষণ করেছেন লেখিকা; তা অত্যন্ত মনোগ্রাহী। মোদ্দা কথা; ১৯৩০ দশক থেকে এই সময়; ফ্যাসিবাদের ইতিহাসকে বেশ 'কমপ্যাক্ট' ভাবে এই বইতে তুলে ধরেছেন ম্যাডেলিন অলব্রাইট। 
সবচেয়ে বড় কথা, ম্যাডেলিন চেষ্টা করেছেন ফ্যাসিজমের আগাম চিহ্নগুলোর দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। নাগরিকরা ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে লড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী। কিন্তু আধুনিক নাগরিকের ওপর রয়েছে বাড়তি দায়িত্ব; তাঁকে ইতিহাস জানতে হবে এবং সেই জানার ভিত্তিতে সতর্ক হতে হবে যাতে আজকের সাদামাটা জনদরদী সরকার আগামীকালের ফ্যাসিস্ট না হয়ে ওঠে। আগামীকাল যে ফ্যাসিবাদ ধেয়ে আসছে, তার আগাম চিহ্ন আজকেই প্রকট হবে; নাগরিকদের তাই সতর্ক ও সচেতন না হয়ে কোনো উপায় নেই। 
সেই ক্লিশেটা এখানে বসিয়ে দেওয়াটা আমার কর্তব্য; রোমের মতই, হিটলারও একদিনে তৈরি হয়নি।

দ্য বুক থীফ


প্রতি বছর বইমেলার আগে মনে হয় এইবারে অন্তত নার্ভ ধরে রাখতে পারব। মনে হয় এবারে অন্তত বাৎসরিক হুজুগের পাল্লায় পড়ে তাকের না পড়া বইয়ের বোঝা আরও খানিকটা বাড়িয়ে ফেলব না। এবারেও তেমনই একটা কিছু ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু শেষে ওই যা হওয়ার তাই হল। পাঠকের চেয়ে কনজিউমারের মেজাজে ধার বেশি; কাজেই শেষে পর্যন্ত পিঠের ব্যাগ বোঝাই করে বাড়ি ফেরা। নিশ্চিত জানি যে এই নতুন বইগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বই হয়ত আগামী একবছরেও পড়া হবে না এবং পরের বইমেলার সময় এই বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বারবার শিউরে উঠতে হবে। 
এবারের বইমেলার দিন কয়েক আগে শেষ করেছি মার্কাস জুসাকের “দ্য বুক থীফ”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জার্মানী আর সেই সময়ের নিবিড় অন্ধকার হাতড়ে বেড়ানো কিছু মানুষের গল্প বলেছেন লেখক। কাহিনীর মূলে রয়েছে লিজেল মেমিঙ্গার নামের এক কিশোরী। হিটলারের জার্মানির আর সেই বিষিয়ে যাওয়া সময়ে আটকে থাকা মানুষের অপরিসীম যন্ত্রণা নিয়ে আলোচনা আগেও হয়েছে আর ভবিষ্যতেও হবে। সেই যন্ত্রণাকেই প্রায় সহজবোধ্য কবিতার ভাষায় এ বইতে তুলে ধরেছেন লেখক। 
গল্পের মূলে রয়েছে বইচোর লিজেল; পাঠক লিজেল। বই পড়বার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা বয়ে বেড়িয়েছে মেয়েটা, নিজের জীবনের প্রতিটি ট্র্যাজেডির সঙ্গে বইপড়া কে জুড়ে দিতে শিখেছে সে। বইকে ক্রমাগত লিজেল যন্ত্রণার মলমের মত ব্যবহার করেছে; একদল মানুষ যখন অসহায় ভাবে বেসমেন্টে লুকিয়ে থেকেছে বোমারু বিমানের আক্রমণের ভয়ে, লিজেলের পাঠ করা বই তখন উপশম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিটি আতঙ্কিত মানুষের বুকে। সমস্যা হল; লিজেলের তাক ভর্তি না-পড়া-বই ছিল না। তার কেনার সামর্থ্যও ছিল না। লিজেলের কোনও বইই ছিল না।
কাজেই বইচুরি ছাড়া লিজেলের আর কোনও উপায় ছিল না। বইয়ের জঁর, লেখনী, বিষয়, মতাদর্শ, অর্থ; এসব নিয়ে ভাববার বিলাস লিজেলের কপালে ছিল না, যে কোনও একটা বই হলেই হল। 
বই; যার মলাটে হাত বুলনো যায়, প্রতিটা পাতায় ছাপা প্রতিটি শব্দের ওজন মাপা যায়, এক লাইন থেকে পরের লাইনে যাওয়ার ব্যস্ততায় বারুদের গন্ধ পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়…। লিজেলের চোখ দিয়ে বই পড়ার আরাম আর স্নেহটুকু ছুঁয়ে দেখা যায়; সে ছুঁয়ে দেখাটুকুর মূল্য বইমেলা সমস্ত বইয়ের চেয়ে বেশি। লিজেলের বইচুরি আর বই পড়ার আবডালে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য ট্র্যাজেডি আর অজস্র ভালোবাসার মুহূর্ত। এ বইকে শুধু নাৎসি জার্মানারি বীভৎসতার হিসেবকিতেবে বেঁধে ফেলা অসম্ভব।
লিজেল বেড়ে ওঠা হান্স আর রোজা হুবারম্যানের সংসারে। হান্স একজন ভীতু সৈনিক অথচ দুঃসাহসী নাগরিক; আমি বড় হয়ে হান্স হতে চাই। ব্যাপারটা সহজ নয়, তবে চাইতে তো ক্ষতি নেই। আর তার পাশাপাশি রোজা হুবারম্যান। কাটখোট্টা, পাথুরে রোজা হুবারম্যানের অ্যাকোর্ডিয়ন আঁকড়ে বসে থাকা ভালোবাসা; তা কন্টেক্সট-সহ লিখে বোঝানোর ক্ষমতা (এবং ভাষার জোর) আমার নেই। 
দুটো কথা না বলেই নয়। 
এক, এ কাহিনীর অন্যতম চরিত্র মৃত্যু। মৃত্যুর জবানিতেই আমরা লিজেলকে চিনেছি, গোটা উপন্যাস গড়ে উঠেছে মৃত্যুরই ন্যারেশনে। পিওভিটা যেমন ডার্ক ও ধারালো , তেমনই সুন্দর ও স্নেহের। সাধে কি বলেছি যে এই গদ্যে সহজ কবিতার সারল্য মিশে আছে? 
দুই, লেখকের স্টাইলে যে কী অবধারিত ভাবে যে শৈলেন ঘোষ মিশে রয়েছেন। পরতে পরতে শৈলেনের স্পর্শ লেগে আছে জুসাকের গল্প বলায়। অবশ্যই এ উপন্যাসে অনেক বেশি মাত্রায় ট্র্যাজেডির স্পর্শ লেগে আছে, রয়েছে অনেকটা বাড়তি হতাশা। কিন্তু কোথাও কীভাবে যেন শৈলেনের রূপকথার উপাদান এই গল্পে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন জুসাক।

রোজ ডে-র লেখা


রোজ ডে। 
এ দিনে মান্নাবাবুর কথা মনে পড়বে সে’টাই স্বাভাবিক। 
গোলাপের উল্লেখ মান্নাবাবুর বেশ কিছু গানে রয়েছে। এই যেমন “ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ” গানটায় রাজার ভূত স্মৃতি হাতড়ে বলছেন “ইন্ দ্য গুড ওল্ড ডেজ, প্রেমিকাকে তাক করে ইরানি গোলাপ ছুঁড়ে মারতাম”। 
অথবা উত্তমবাবুর দেওয়া লিপের সেই গান 
“মানুষ খুন করলে পরে, মানুষই তার বিচার করে, নেই তো খুনির মাফ, তবে কেন পায় না বিচার নিহত গোলাপ”। এমন এক্সট্রিম-ভেগান প্রেমের গান শুধু বাংলায় কেন, পৃথিবীর সঙ্গীত ইতিহাসে বিরল। 

তবে মান্নাবাবুর গোলাপের রেফারেন্সওলা গানগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠটি হল;
“লাল মেহেন্দির নক্সা হাতে, 
তুললে যখন গোলাপ কুঁড়ি ই ই ই ই ই ই, 
বেশ মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল মিষ্টি
একটা আওয়াজ হল...
বাজল ক’টা কাচের চুড়ি 
বলো না 
তোমার নামটা কী গো...
বলো সখী...
তোমার নামটা কী গো...
বলো না...
তোমার নামটা কী গো...। 

খানিক ভেবে দেখেছি, গায়ক নিশ্চয়ই মিষ্টি আওয়াজ বলতে গোলাপ ছেঁড়ার কথা বলছেন না, আওয়াজটা হল কাচের চুড়ির। তবে এতবার “নামটা কী গো...বলো না...বলো সখী” বলে ঘ্যানরঘ্যানর করা চাট্টিখানি কথা নয়। বুলডোজার এমন মোলায়েম ঘ্যানঘ্যানে টেম্পোতে গাইতে পারলে আর্থার ডেন্টও নিশ্চিতভাবেই কোনো ঝ্যামেলা না করে সামনে থেকে সরে যেতেন।

এয়ারপোর্টের সামোসা


এয়ারপোর্টের বাইরে অপেক্ষা করতে করতে ভদ্রলোকের চোখে পড়ল একটা সাজানো-গোছানো খাবারদাবারের দোকান। বার্গারটার্গার, প্যাটিসট্যাটিসের পাশাপাশি রয়েছে মরা সামোসা। ভদ্রলোক কাচের শোকেসের কাছে গিয়ে মন দিয়ে দেখলেন; সামোসাই, শিঙাড়ার লাবণ্য সেগুলির মধ্যে আদৌ নেই।
অনেকক্ষণ ধরে পেটের মধ্যে একটা বিশ্রী খিদে খলবল করে বেড়াচ্ছিল বটে। কিন্তু বেঢপ সামোসার ঠাণ্ডা লাশ চিবুতেও তেমন প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। শেষে খিদে যখন পেটের মধ্যে সিঁদ কাটতে শুরু করলে তখন বাধ্য হয়ে সেই কাচের শোকেসের সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। 
- কী চাই স্যর?
- সমস্যা, থুড়ি, সমোসা। হেহ হেহ। পিজে। 
- ক'পিস দেব?
- ওই একটি ম্যানেজ করতে পারলেই পদ্মশ্রী। 
- হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ। 
- পার পিস?
- হ্যাঁ স্যর। 
- মিনিমান তিনশো হওয়া উচিৎ। পার পিস!
- এক্সকিউজ মি স্যর?
- চলুন আড়াইশোয় রফা করছি। কিন্তু তার কম এক পয়সাও নয়। 
- আমি ঠিক বুঝতে পারছি না স্যর।
- উফ আপনি বড় হার্ড বার্গেন করেন মশাই৷ বেশ, সোয়া'দুশোই সই। আর টানাহ্যাঁচড়া করবেন না প্লীজ।
- কিন্তু এর দাম তো দেড়শো টাকা। 
- স্যার, এই ব্রয়লার সামোসার লাশ গেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়। নিন, আমায় দুশো টাকা দিন, আমি না হয় একটা চোখনাককান বুজে খেয়েই নিচ্ছি। তবে ক্যাশে দেবেন ভাইটি।
- আমি আপনাকে টাকা দেব? আপনি আমার দোকান থেকে সামোসা খাবেন আর আমি আপনাকে টাকা দেব? মাইরি, ইয়ার্কি পেয়েছেন?
- ও সমোসা খেলে কপালে নিউক্লিয়ার অম্বল নাচছে যে, নির্ঘাৎ। বে অফ জেলুসিলে স্কুবা ডাইভিং করলেও রক্ষে নেই। আপনার এমন দামী শোকেস থেকে ওই লাশ সরানোর জন্য অন্তত দু'শো টাকা দেবেন না? মার্ডার আর ডাকাতি একসঙ্গে করবেন স্যর?
***
ভদ্রলোক সামোসা পাননি৷ আর দোকানিদাদার সেই গোটা বেলাটাপ্রবল অস্বস্তিতে কেটেছিল।

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...