Monday, January 16, 2017

যুক্তি তর্ক বাতেলা


তর্ক মন্দ নয়। তর্কের তবলা পিটুনিতে মগজ সজাগ থাকে, অপ্রয়োজনীয় বন্ধু ছাঁটাই হয়, উপযুক্ত শত্রুর সাহচর্য জোটে। সমাজে ডিবেট জরুরী। কিন্তু সব জরুরীর মাঝে কিছু কাঁকড় গড়িয়ে পড়বেই, আর থাকবে পোকা খাওয়া যুক্তিদাঁতে অনভিপ্রেত ফোঁকর। সেই কাঁকড় ছেঁটে নিতে পারলে অবশ্য ডিবেটের শ্রীবৃদ্ধি হয় এবং সে তর্কের মুনাফা ভাগ হয় যুযুধান দু'পক্ষের মধ্যেই। দু'টো পাথরকুচি তর্কের বাঁশকাঠি চালে মিশে যায় অনবরত। এই কাঁকড় নিজে চিবিয়ে কেঁপে উঠেছি বলেই নয়, অন্যের যুক্তির পোলাওতে তা পরিকল্পিত ভাবে মিশিয়ে অপরাধও করেছি যথেষ্ট। পাথরকুচি ১ - কোনও কিছুকে স্টিরিওটাইপ বলে নস্যাৎ করে সোয়্যাগ অর্জনের যে স্টিরিওটিপকাল প্রসেস্‌, সে প্রসেসে নিজের জান কবুল করা। কেউ কেউ নিশ্চই রয়েছেন যারা ধবধবে সাদা দেয়ালের সামগ্রিক সৌন্দর্যের মধ্যেও দেওয়ালের কোণে লেগে থাকা কালো কালির ছিটেটুকু দেখে নিতে পারেন। সে'টা নিশ্চই সবিশেষ স্কিল। কিন্তু দেশের দশজন লোক সে সাদায় বিহ্বল ব্যাকুল হয়েছে বলেই যদি তা ঘৃণার যোগ্য হয়; তাহলে সবিশেষ অসুবিধে। ডেটা বা ইনফরমেশনের পরিধিতে যতক্ষণ ক্রিটিসিজিম রয়েছে, ততক্ষণ তার তল পাওয়া যায়। কিন্তু তাতে যেই আরোপিত সোয়্যাগের তাচ্ছিল্য আর মৌরি চেবানো ওপিনিওন অ্যাড হয়, সমস্যা শুরু হয় তখন। "আমি লৌকিকতায় বিশ্বাস করিনা" - এ ডিক্লারেশনে ক্ষতি নেই কিন্তু তার মানে যদি এই হয় যে প্রতিবেশীর বাড়িতে মিষ্টির বাক্স হাতে ঢোকাকে আমি ক্রিমিনাল স্টুপিডিটি হিসেবে ধরে নেব; সে'খানে যে তর্কের উৎপত্তি হয় সে তর্কে ফটোসিন্থেসিস্‌ নেই। মিনিবাসের সাইলেন্সরের ধোঁয়ায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কেবল। "অমুকের গানে আমার রুচি নেই" - রুচির রকমভেদ বড় জরুরী। দরকারি। কিন্তু অমুকের গান কেউ শুনছে বলেই যদি সাজানো যুক্তি ছাড়া তাঁকে আমরা ঢ্যামনা বলি, তাহলে সেই ঢ্যামনা শব্দটা অদৃশ্য দেওয়ালে রিবাউন্ড খেয়ে যে কখন দড়াম করে এসে নিজের নাকে গোঁত্তা মেরে যায়...। এ’খানে বলে রাখা ভালো; “অমুক খারাপ” কথাটা যুক্তি নয়, ছুঁড়ে দেওয়া ঢিল। অমুক এই এই কারণে উপাদেয় নয়; সে’খানে যুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটে। তবে যুক্তি মানেই সম্ভ্রম, এবং যুক্তি মানেই খাটনি। খাটনি খুব গড়বড়ে জিনিষ। "দুনিয়ার লোকে অমুক কাজ করে, আমি করি না" - দুনিয়ার লোকে পকেটমারি করে পুলিশের খাতায় নাম লিখিয়েছে, আমি লেখাইনি। এ’টা ডেটা নির্ভর ব্যাপার এবং স্পষ্ট। “অমুক” যদি পকেটমারি হয় তাহলে ক্ষতি নেই। কিন্তু “দুনিয়ার লোক শীতকালে পিকনিক করে তবে আমার ও'সব পোষায় না” - সে'টা একটা ভোঁতা স্টেটমেন্ট। তাতে কেউ উত্তম বা কেউ সুখেন দাস হয় না। পাথরকুচি ২ - ইংরেজিতে এই কথাটা খুব চলছে আজকাল। "হোয়াটআবাউটারি"। বিশেষত রাজনৈতিক তর্কে এ এক মস্ত বড় সমস্যা। তৃণমূলের ভুল ধরেছেন কি সিপিএমের কুকর্মের লিস্টি হাত ধরিয়ে দেওয়া হবে। সিপিএম করেছে, আর আমার বেলায় দোষ বিচার? তুমি হার্মাদ। বিজেপির ত্রুটি নজরে এসেছে কি কংগ্রেসের ব্যালান্সশিট আপনার হাতে গুঁজে দিয়ে আপনাকে কোরাপ্ট বলা হবে। বড্ড সুবিধে। এক্স ভুলের অ্যানালিসিস না করে ওয়াই কেন হয়েছিল আলোচনায় চলে যাওয়া যায়। রাজনীতির বাইরেও এ ফরম্যাটে দিব্যি ঘোল খাওয়ানো যায়। তর্ক বেফজুল হয়ে পড়ে, কোনও কাজের দিকে গড়ায় না। যুক্তি স্তিমিত হয়ে খিস্তি শুরু হয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সোয়্যাগ জমা হয়, কাল্পনিক টেবিল চাপড়ানিতে নিউক্লিয়ার ফিসন ঘটে যায় হৃদয়ে হৃদয়ে। শুধু কাজের কথাগুলো মিউচুয়াল ঠেলাঠেলির সিলিং ফ্যান থেকে "আমি নির্ভুল"য়ের গামছা গলায় জড়িয়ে ঝুলে পড়ে।

No comments: