Monday, January 9, 2017

সাইকেলের বেল

সে’সব সন্ধ্যেগুলো।
বাবা ফেরার অপেক্ষায় মশগুল। বাবা সাইকেল চড়ে অফিস যেতেন। পরে অবশ্য মোটরসাইকেল এসেছিল, রাজদূত। কিন্তু হারকিউলিস সাইকেলের বেলের ক্লিংকিং ক্রিংই স্মৃতিতে বেশি স্পষ্ট । বাবা বাড়ির সামনের গলিতে ঢুকে বেল বাজাতেন আর টুং করে সন্ধ্যের রঙ পালটে যেত।

এ’বারে সন্ধেবেলা পড়ার বই নিয়ে বসা থেকে সাময়িক মুলতুবি।
এ’বারে ছাতের বেঁকে যাওয়া অ্যান্টেনা সোজা হয়ে যাবে, টিভির ছবি স্পষ্ট হবে।
এ’বারে শিঙাড়া নিমকি চপ।
এ’বারে মায়ের হাতে মাখা মুড়ি বা চিঁড়েভাজা।
এ’বারে কত গল্পের গলগলিয়ে বেরিয়ে আসা; স্কুলের, সিনেমার, বইয়ের।

এ’বারে ক্রিকেট।
ঘরের মধ্যেই। বসবার ঘরের দরজা বন্ধ করে সে’খানে পাপোষ হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে উইকেট হত । রাবার ডিউজ বল আর তিন নম্বরের কাঠের ব্যাট। পঁচিশ বলে ইনিংস, বল ব্যাটে লাগলেই একরান। ঘরের অন্য প্রান্তে রাখা সোফা পর্যন্ত বল পাঠাতে পারলে চার রান। শর্ট মিড অফ অঞ্চলে রাখা শোকেসের কাঁচে বল লাগলে আউট। ওয়ান বাউন্স ক্যাচ। আমি দু’বার আউট হলে তবে ইনিংস শেষ, বাবার অবশ্য দ্বিতীয় সুযোগ ছিল না। বাবা চা শেষ করলে শুরু হত ম্যাচ। রুদ্ধশ্বাস। টানটান। সাধারণত পর পর দু’টো ম্যাচ হত। কোনও কোনও দিন খেলা গড়াত তৃতীয় ম্যাচে। সে’দিন গুলোয় মায়ের মুখ গোমড়া হয় যেত। কারণ বাবার বাজারে বেরোতে দেরী, আমার পড়তে বসায় ফাঁকি।
হপ্তায় অন্তত দিন দুই ক্রিকেটের বদলে থাকতে ক্যারম। সরল নিয়মে আমি প্রত্যেক চালে দু’বার করে দান পেতাম যাতে লড়াই করতে পারি।

ওই।
আমি দু’বার আউট হলে তবে আউট।
পরপর দু’বার গুটি ফেলতে না পারলে তবে দান শেষ।
ওই।
বাবার বিরক্ত না হওয়া।
বাবার সাইকেল। ক্রিং ক্রিং।
রাজদূত মোটরবাইক।

বাবা রবিবার অফিসে গেলে বেজায় খুশি হতাম। ঝুলে পড়তাম বাবার সাইকেলে বা বাইকের পিছনে। বাবার অফিসে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশ দিয়ে ইউক্যালিপটাস, বাতাস তার নরম সুবাসে হামেশা ভারী হয়ে থাকত। বাবার অফিসের কম্পিউটারে ডস-বেস্‌ড রেসিং গেম। বাবার অফিসের একটা নীল টেলিফোনে জিরো ডায়াল করলে এক অচেনা কণ্ঠ বিড়বিড় করে অনেক কথা বলে যেত।
বাবা।
আমার বাবা। আমার দু’বার আউট আর দু’বার গুটি ফেলার সুযোগ দেওয়া বাবা। গায়ে ছায়াগন্ধ বয়ে বেড়ানো বাবা।
“ঠিক সামলে নেবে” মার্কা বাবা।

রোজ সন্ধেবেলা মনে হয় বাবার জন্য বসে আছি। অফিসে হোক, গাড়ির স্টিয়ারিঙের পিছনে হোক, ভিড়ে হোক, হুল্লোড়ে হোক, গোলমালে হোক। টের পাই বাড়ির সামনের গলিটার টুং শব্দে আলোময় হয়ে যাওয়া।  
আমায় একবারে আউট করা যাবে না। এক দানে গুটি ফেলতে না পারলে পরের দান আছে।
বাবা আছে। বাবা সামলে নেবে।
 এই বিস্বাদ সিলেবাস ছুঁয়ে বসে থাকা দেখনাই মাত্র, বাবা অফিস থেকে ফিরল বলে।

No comments:

অরূপ ঘোষালের শহর

- এক্সকিউজ মি। - আপ মুঝে বুলা রহে হ্যায়? - আরে হ্যাঁ রে বাবা। আপনাকেই বুলা রহে হ্যায়। - আরে, আপনিও বাঙালি যে। - নমস্কার। সঞ্জয় ঘ...