Skip to main content

মৃগাঙ্কবাবুর ভবিষ্যতবাণী

জ্যোতিষী হয়ে এই এক সমস্যা হয়েছে। নিজের মৃত্যুটাও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। মৃগাঙ্কবাবুর অবশ্য আর পাঁচটা সাধারণ জ্যোতিষীর সঙ্গে তুলনা চলে না। তিনি নিজের মুখে বলতে চান না তবে এ যুগের নস্ট্রাডামুস লেবেলটা তাঁর ওপর নিশ্চিন্তেই সেঁটে দেওয়া যায়।

রাম শ্যাম যদু থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী বা ক্রিকেট ক্যাপ্টেন; কারুর ব্যাপারে মৃগাঙ্কবাবুর করা কোনও ভবিষ্যৎবাণীই আজ পর্যন্ত বিফল হয়নি।

শুধু একটাই দুঃখ নিয়ে যাবেন মৃগাঙ্কবাবু, তাঁর এই অদ্ভুত ক্ষমতার কথা কেউ জানল না, কদর করল না। সাউথ ইস্টার্ন রেলের কেরানী হয়েই জীবনটা কেটে গেল তাঁর। অথচ জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি একনিষ্ঠ হতে গিয়ে বিয়েথাও করা হয়ে উঠল না। যাক্ গে, কেউ না জানুক। মৃগাঙ্কবাবু নিজে অন্তত এ'টা জেনে মরবেন যে তার কোনও ভবিষ্যতবাণী এক চুলও এদিকওদিক হয়নি কোনওদিন।

রোজ সকালে উঠে নিজের হাত দেখে দিনটা বুঝে নেন মৃগাঙ্ক হালদার। সকালের দুধ মুড়ি খেয়ে আজও বসেছিলেন বারান্দায়, শীতের রোদে ডান হাতের তালু মেলে। বাড়ির কাজের ছেলে রাজু বেরিয়েছে বাজার করতে, সে ফিরলে এক কাপ চা খেয়ে তারপর অফিসের জন্য রওনা দেবেন। রাজু ব্যাটা বড্ড ফাঁকিবাজ,  চোখে চোখে রাখতে হয়।

সে যাক, নিজের হাত দেখতে গিয়েই বিপত্তিটা টের পেলেন মৃগাঙ্কবাবু। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চট্ করে প্যাড পেন টেনে নিয়ে সামান্য অঙ্ক করে টের পেলেন যে আজ সকাল আটটা বেজে বাহান্ন মিনিট থেকে আটটা বেজে চুয়ান্ন মিনিটের মধ্যে তাঁর মারা যাওয়ার কথা। অর্থাৎ আজ আর অফিস যাওয়াটাও হল না। ছাতে কাপড় মেলতে যাবেন ভেবেছিলেন, তারও আর কোনও মানে হয় না। দেওয়াল ঘড়ি আর নিজের হাতের ঘড়ি মিলিয়ে নিলেন মৃগাঙ্কবাবু। এখন  বাজে আটটা বত্রিশ, মানে আর কুড়ি থেকে বাইশ মিনিটের মধ্যেই ঘটে যাবে ব্যাপারটা। যা হোক্, এখন সময় মত মরতে পারলেই পরম তৃপ্তি নিয়ে ইহলোক ছাড়তে পারেন তিনি।

একশো শতাংশ সঠিক ভবিষ্যতবাণী।  সব কটা নির্ভুল,  নিখুঁত। বেশ নার্ভাস বোধ করছিলেন মৃগাঙ্কবাবু। এমন দুর্দান্ত রেকর্ড অক্ষত রেখে যেতে পারবেন তো? দেখা যাক। তবে মারা যাওয়ার প্রসেসটা অবশ্য কিছুতেই হিসেব কষে বের করতে পারছিলেন না তিনি, হার্ট অ্যাটাক? ভূমিকম্প? কে জানে।

**
আটটা ছাপ্পান্ন বাজার সঙ্গে সঙ্গে মন ভেঙে গেল মৃগাঙ্কবাবুর। ভূমিকম্প নেই, বুকে অসহ্য ধড়ফড় নেই। সব ব্যর্থ। সব মিথ্যে ছিল। সবই তার আকাশকুসুম বিলাসী স্বপ্ন, তিনি আদৌ শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী নন। তিনি সকাল আটটা বেজে চুয়ান্ন মিনিটের পরেও বেঁচে আছেন। জীবনটাই ঝুঠো, নির্মম পরিহাস মাত্র।

সিলিং ফ্যান থেকে মায়ের শাড়ির ফাঁস লাগিয়ে যখন ঝুলেছিলেন মৃগাঙ্কবাবু, তখন দেওয়াল ঘড়িতে ন'টা বেজে বাইশ মিনিট।

**

দিব্যি ফুর্তির মেজাজে আজ বাজারে বেরিয়েছিলে রাজু। এতটাই আনন্দ ছিল মনে যে মাছ সবজী কেনার সময় দু'চার টাকা এদিক ওদিক করার কথা মনেও এলো না তার।

বেশ জব্দ করা গেছে খিটখিটে ছিটগ্রস্ত বুড়োটাকে। সকাল আটটার আগে বাজারে না এলা মিনুর সঙ্গে দেখা হয় না। মিনুর সঙ্গে দেখা না হলে রাজুর মন ভালো থাকে না। অথচ বুড়ো কিছুতেই তাকে সাড়ে আটটার আগে বাজারমুখো হতে দেবে না।

বাধ্য হয়ে গতকাল মাঝরাত্রে উঠে গোপনে বাড়ির সমস্ত ঘড়ি আধ ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছিল রাজু। ঘুমোনোর আগে হাতঘড়িটা পড়ার টেবিলে খুলে রেখে যান বাবু, সে'টাও রাজুর সতর্ক নজর এড়ায়নি।

Comments

Anari Minds said…
Majhe majhe ekta prosno jage apnar lekha pore. Apni roj eto sundor plot bhaben ki kore! Normally dekhechhi jara roj lekhen, tara gotanugotik jibonjatra ba ghatona niye likhte pachhondo koren.. kintu apni moshai gurudev.. fan hoye jachhi kromoso apnar..

amra koekjon uthti lekhok mile kichhu lekhar chesta kori.. onuprerona pai apnar lekha gulo pore.. apnar theke aro tips pele badhito habo.

Popular posts from this blog

গোয়েন্দা গল্প

- কিছু মনে করবেন না মিস্টার দত্ত...আপনার কথাবার্তাগুলো আর কিছুতেই সিরিয়াসলি নেওয়া যাচ্ছে না।  - কেন? কেন বলুন তো ইন্সপেক্টর? - ভোররাতে এই থানা থেকে একশো ফুট দূরত্বে ফুটপাথে আপনাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়।  - আপনার কনস্টেবল নিজের চোখে দেখেছে তো।  - না না, সে'টাকে আমি কোশ্চেন করছি না। আমি শুধু সামারাইজ করছি। আপনার গায়ে দামী চিকনের পাঞ্জাবী, ঘড়িটার ডায়ালও সোনার হলে অবাক হব না। এ'রকম কাউকে বড় একটা ফুটপাথে পড়ে থাকতে দেখা যায় না। যা হোক। হরিমোহন কনস্টেবলের কাঁধে ভর দিয়ে আপনি থানায় এলেন। জলটল খেয়ে সামান্য সুস্থ বোধ করলেন। অল ইজ ওয়েল। নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের সামান্যতম ট্রেসও নেই। শরীরে নেই কোনও চোট আঘাত।  - আমার কথা আমায় বলে কী লাভ হচ্ছে? আমি যে জরুরী ব্যাপারটা জানাতে মাঝরাতে ছুটে এসেছিলাম...সেই ব্যাপারটা দেখুন...। ব্যাপারটা আর্জেন্ট ইন্সপেক্টর মিশ্র।  - আর্জেন্সিতে পরে আসছি। রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ আপনি থানায় ছুটে এসেছিলেন। ওয়েল অ্যান্ড গুড। কিন্তু...ফুটপাথে পড়ে রইলেন কেন...।  - এ'টাই, এ'টাই আমি ঠিক নিশ্চিত নই। মাথাটাথা ঘুরে গেছিল হয়ত। আফটার অল বা

পকেটমার রবীন্দ্রনাথ

১ । চাপা উত্তেজনায় রবীন্দ্রনাথের ভিতরটা এক্কেবারে ছটফট করছিল । তার হাতে ঝোলানো কালো পলিথিনের প্যাকেটে যে ' টা আছে , সে ' টা ভেবেই নোলা ছুকছাক আর বুক ধড়ফড় । এমনিতে আলুথালু গতিতে সে হেঁটে অভ্যস্ত । তাড়াহুড়ো তার ধাতে সয় না মোটে । কিন্তু আজ ব্যাপারটা আলাদা । সে মাংস নিয়ে ফিরছে । হোক না মোটে আড়াই ' শ গ্রাম , তবু , কচি পাঁঠা বলে কথা । সহৃদয় আলম মিয়াঁ উপরি এক টুকরো মেটেও দিয়ে দিয়েছে । তোফা ! নিজের লম্বা দাড়ি দুলিয়ে ডবল গতিতে পা চালিয়ে সে এগোচ্ছিল ।   গলির মোড়ের দিকে এসে পৌঁছতে রবীন্দ্রনাথের কেমন যেন একটু সন্দেহ হল । ঠিক যেন কেউ পিছু নিয়েছে । দু ' একবার ঘাড় ঘুরিয়েও অবশ্য কাউকে দেখা গেলনা । ভাবনা ঝেড়ে ফেলে মাংসের পাকেটটায় মন ফিরিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ । বৌ নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে আজ । খোকাটাকে যে কদ্দিন মাংসের ঝোল খাওয়ানো হয়নি ।   খাসির রান্নার গন্ধ ভেবে বড় গান পাচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের । সে বাধ্য হয়েই একটা কুমার শানুর গাওয়া আশিকি সিনেমার গান ধরলে ।

চ্যাটার্জীবাবুর শেষ ইচ্ছে

- মিস্টার চ্যাটার্জী...। - কে? - আমার নাম বিনোদ। - আমি তো আপনাকে ঠিক...। - আমায় বস পাঠিয়েছেন। - ওহ, মিস্টার চৌধুরী আপনাকে...। - বসের নামটাম নেওয়ার তো কোনও দরকার নেই। কাজ নিয়ে এসেছি। কাজ করে চলে যাব। - আসুন, ভিতরে আসুন। - আমি ভিতরে গিয়ে কী করব বলুন। সৌজন্যের তো আর তেমন প্রয়োজন নেই। আপনি চলুন আমার সঙ্গে। চটপট কাজ মিটে গেলে পৌনে এগারোটার লোকালটা পেয়ে যাব। আমায় আবার সেই সোনারপুর ফিরতে হবে। - যা করার তা কি এ'খানেই সেরে ফেলা যায়না? - এমন কনজেস্টেড এলাকায় ও'সব কাজ করা চলেনা। চুপচাপ ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। - প্লীজ দু'মিনিটের জন্য ভিতরে আসুন বিনোদবাবু। জামাটা অন্তত পালটে নিই। - কী দরকার বলুন জামা পালটে। - দরকার তেমন নেই। তবু। ওই, লাস্ট উইশ ধরে নিন। - ক্যুইক প্লীজ। ট্রেন ধরার তাড়াটা ভুলে যাবেন না। আর ইয়ে, পিছন দিক দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে লাভ নেই। বসের লোকজন চারপাশে ছড়িয়ে আছে। - ও মা, ছি ছি। তা নয়। আসলে মিতুলের দেওয়া একটা জামা এখনও ভাঙা হয়নি। বাটিক প্রিন্টের হাফশার্ট। একটু ব্রাইট কালার কিন্তু বেশ একটা ইয়ে আছে। ও চলে যাওয়ার পর ও জামার ভাজ ভাঙতে ইচ্ছে হয়নি। কিন্তু...আজ না হয়...। - মিতু