Thursday, November 21, 2019

ট্যাক্সের হিসেব

- দাঁড়িয়ে কেন? বসো।
- গুড মর্নিং স্যর। ইয়ে…সোফায় বসব? আপনার পাশে? নাকি উল্টো দিকের চেয়ারটায়?
- যেখানে খুশি। মেঝেতেও বসতে পারো।
- নভেম্বর…একটু শীত শীত ভাব পড়ে গেছে কিন্তু, মার্বেলের মেঝে তো…পায়ের তলেই কেমন ছ্যাঁত ছ্যাঁত…। আমি বরং ওই চেয়ারেই…। থ্যাঙ্ক ইউ।
- শশাঙ্ক সাহা, তাই তো?
- আজ্ঞে হ্যাঁ, ফ্রম রসুলপুর। কাল আপনার সেক্রেটারির ফোন পেয়েছিলাম তাই…তাই আজ সিধে ভোর সোয়া পাঁচটার ট্রেনে…।
- দ্যাখো শশাঙ্ক, আমার হাতে সময় বড় কম।
- সময় বাড়তি থাকা মোটেও কাজের কথা নয় দাসগুপ্ত স্যর। হাতে অঢেল সময় থাকলেই চোদ্দ গণ্ডা আজেবাজে চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়; ঘুম কমে আসে, হজমে গোলমাল…।
- আর বাড়তি কথাও ভারী অপছন্দ।
- বাড়তি ব্যাপারটা অবশ্য রিলেটিভ বুঝলেন স্যার। আমার মেজকাকা “অল্প ভাত” বলতে যে পরিমাণ বোঝাতেন তা দিয়ে তিনজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানো যায়। আবার কাটোয়ার পিসেমশায়ের কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার মানে অনলি চারটে লুচি আর হাফবাটি ছোলার ডাল। ভাবতে পারেন?
- হুহ্‌।
- অবিশ্বাস করছেন? চলুন না একদিন কাটোয়া। দেখবেন পিসেমশাই কেমন...।
- শশাঙ্ক…বুড়ো বয়সে এসে ধৈর্যটা একটু কমেছে। আমি বরং সোজা কাজের কথায় আসি।
- বেশ, বেশ। সেই ভালো।
- তুমি জানো আমি তোমায় কেন ডেকেছি?
- ডেমোক্রেসির মধ্যে বাস করে এটুকু জানবো না স্যর? আর না জানলে এদ্দূর ছুটে আসবই বা কেন।
- তবু, তোমার জানার বহরটা একটু জেনে নিই।
- টুয়েন্টি টুয়েন্টিজের অন্ধকারে তো আর আমরা পড়ে নেই দাসগুপ্ত স্যর। সে যুগের চরম অব্যবস্থা এখন আবছা ইতিহাস বললেই চলে। আর তাছাড়া আমাদের গভর্নমেন্টের নতুন আইনে এখন প্রতিটি আয়করদাতা নিজেই ঠিক করে নিতে পারবেন যে তাঁদের দেওয়া আয়কর ঠিক কোন খাতে ব্যবহৃত হবে। হোয়াট আ ব্রেকথ্রু। আইনটা যদিও নতুন, তবে বেশ ইন্ট্রিগিং, তাই না স্যর? আমার কিন্তু দারুণ লেগেছে; এই আইনের জোরেই হয়ত আমি একটা সুযোগ পেয়ে যাব। আহ! কী এক্সাইটিং। আচ্ছা স্যর, টুয়েন্টি টুয়েন্টিজ তো আপনি দেখেছেন। তখন ট্যাক্সপেয়ারদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত, তাই না?
- প্রতিনিয়ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন জ্বলত এই সামান্য বিষয়টা নিয়ে। অমুকে নিজের দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় রাস্তা মেরামত করতে চায় তো তমুকে তা দিয়ে তাজমহল রং করাতে চায়। কেউ রসগোল্লায় সাবসিডি চায় তো কেউ সাবসিডি চায় অক্সিজেন সিলিন্ডারে। আর সেই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লাঠালাঠি। রাস্তাঘাটেও যে রক্তপাত ঘটত না তা নয়।
- শুনে মনে হচ্ছে রীতিমত রুল অফ জাঙ্গল। যাক, সে দুঃসময় তাহলে কেটেছে বলুন। এখন প্রতিটি ট্যাক্সপেয়ার ঠিক করে নিতে পারবে তাঁর দেওয়া ট্যাক্স দিয়ে সে তাজমহল রং করাবে না সস্তায় রসগোল্লা বিলি করবে। ব্রিলিয়ান্ট। হোয়াট আ টাইম টু বি অ্যালাইভ স্যার।
- কাজেই বুঝতেই পারছ আমি তোমায় কেন ডেকেছি।
- বুঝিনি আবার? নিশ্চয়ই বুঝেছি স্যর। দেশের সেরা চারটে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছি আমি, অবশ্য এন্ট্রান্স পরীক্ষা যা দিয়েছিলাম; সুযোগ না পাওয়াটাই আশ্চর্যের ব্যাপার হত। কিন্তু সুযোগ পেয়ে সমস্যা। বাড়ির যা অবস্থা, তাতে নিজেদের বিক্রি করেও অত দামী ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে আমি পারব না। তবে আপনি বিশাল অঙ্কের ট্যাক্স জমা করেন, তার সামান্য অংশ পেলেই…।
- পেলেই?
- পেলেই? একটা অন্য জীবন দাশগুপ্ত স্যর। বাস স্ট্যান্ডে চা বিক্রি করে আর জিন্দেগি গুজরান করতে হবে না। কদিন পর একটা ভালো চাকরী, বাপ মায়ের চিন্তা তাতে অনেকটা দূর হবে। আর আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি স্যর, আপনার দেওয়া সুযোগের মান আমি রাখব। আমি যখন চাকরী পাব; আমার ট্যাক্সের টাকায় অন্তত তিনজনকে সহায় সম্বলহীন ছাত্রকে পড়াব। কথা দিচ্ছি স্যর। এইভাবে এক থেকে তিন, তিন থেকে নয়…।
- রিল্যাক্স শশাঙ্ক, রিল্যাক্স।
- ওই একটু…।
- এক্সাইটেড হয়ে গেছিলে আর কী। তবে অস্বাভাবিক নয়। দীপঙ্করও হয়েছিল; এভাবেই সেও উত্তেজিত হয়েছিল। সেও তোমার মত দেশের সেরা চারটে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছিল কিনা।
- ওহ, তাহলে তো আপনি আমায় আরো ভালো ভাবে বুঝবেন স্যর।
- সত্যিই বুঝি।
- তা আপনার ছেলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল?
- একটাতেও না।
- ও মা, এই যে বললেন সেও ভীষণ খুশি হয়েছিল এ সুযোগ পেয়ে। আর আপনার তো…আপনার তো…।
- না, টাকাপয়সার অভাব আমার নেই। তখনও ছিল না। কিন্তু তাকে ভর্তি হতে দিইনি।
- দেননি?
- ও ইতিহাস নিয়ে পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম ও ফিজিক্স নিয়ে পড়ুক। মেধা ওঁর কিন্তু পড়বার খরচটা যেহেতু আমার যোগানোর কথা; তাই আমার নিদান অমান্য করার উপায় তার ছিল না।
- কিন্তু তাই বলে…।
- আমার অনুতাপ হয় শশাঙ্ক। অনুতাপ হয়। আমি অমন ভাবে গোঁ না ধরলে দীপঙ্করের এ দশা হত না।
- আমি…আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না স্যর।
- দীপঙ্কর আমার কথার অমান্য করতে পারেনি। হি ওয়াজ আ গুড বয় আফটার অল। একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে প্রচুর টাকা দিয়ে আমি ওকে ফিজিক্স স্ট্রিমে ভর্তি করি। টাকা বেশি দিতে হয় কারণ ফিজিক্সের এন্ট্র্যান্স ক্লিয়ার করার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। বছরখানেক সে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেছিল…কিন্তু…।
- কিন্তু? কিন্তু কী?
- কমপ্লিট মেন্টাল ব্রেকডাউন। সাইনগুলো ধরার মত সেনসিটিভিটি বা সময় আমার ছিলনা তখন শশাঙ্ক। দীপঙ্কর সাসটেন করতে পারল না। আমার মা-মরা ছেলেটা এখন পাগল। সম্পূর্ণ পাগল। আর সে জন্য দায়ী শুধু আমি…।
- আমি সত্যিই দুঃখিত স্যর। আমি শুধু এটাই বলতে চাই, আপনি যে আপনার দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় আমার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন; তা আমি কোনোদিনও ভুলব না। জানপ্রাণ দিয়ে পড়াশোনা করব, শুধু কেরিয়ারের কথা ভেবে নয়, শুধু আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নয়; দীপঙ্করের কথা ভেবে।
- থ্যাঙ্ক ইউ শশাঙ্ক। আমি চাই তুমি দীপঙ্করের কথা ভাবো। সে কারণেই আমার তোমায় ডাকা। ট্যাক্স খরচের কথা ভেবেই তোমায় আমি ডেকেছি। তবে শশাঙ্ক, তোমায় ইউনিভার্সিটিতে পড়াবার অভিপ্রায় আমার নেই।
- আমি ঠিক বুঝলাম না স্যর।
- দীপঙ্করের প্রতি আমি যে অন্যায় করেছি, স্রেফ কয়েকজন ছাত্রের পড়ার ব্যবস্থা করে সে পাপস্খলনের সম্ভাবনাই নেই।
- দাসগুপ্ত স্যর, তাহলে আপনি আমায় ডেকেছেন কেন?
- আমার ভুল যাতে অন্য কেউ না করে, আর একটা দীপঙ্করও যাতে নষ্ট না হয়; তার জন্য গোটা দেশে বার্তা পৌঁছে দেওয়া দরকার। প্রতিটা মানুষের মধ্যে ইন্সপিরেশন পৌঁছে দিতে হবে, বুঝেছ? টু ঈচ অ্যান্ড এভ্রি পার্সন। আর সামান্য কিছু ছাত্রের পড়ার ব্যবস্থা করে সেই ইন্সপিরেশন তৈরি করে অসম্ভব।
- কীসে আসবে ইন্সপিরেশন? আদৌ আসবে কী?
- অবশ্যই আসবে। আমি আনব সেই ইন্সপিরেশন। আমি আমার ট্যাক্সের টাকায় একটা বিশাল মূর্তি তৈরী করব…।
- মূ…মূর্তি?
- বিশাল…বিশাল…যার পাশে মনুমেন্টকেও পোস্টবাক্সের মত মনে হবে, যার রোয়াবের পাশে দেশপ্রিয় পার্কের পুজোর প্যান্ডেলও ফিকে পান দোকানের মত দেখাবে। অমন মূর্তি ছাড়া এ দেশে এমন তাবড় ইন্সপিরেশন আসবে না হে শশাঙ্ক। আসবে না আসতে পারে না।
- কিন্তু…কিন্তু কার মূর্তি গড়াবেন?
- তোমার শশাঙ্ক। তোমার মূর্তি। একজন সুযোগ্য ছাত্র যে স্রেফ সুযোগের অভাবে উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে; স্রেফ সিস্টেমে পেষাই হয়ে যার সমস্ত কোয়ালিটি দুমড়েমুচড়ে গেছে; তার করুণ মুখ সবার চেনা উচিৎ। প্রতিটি করদাতা তোমার সেই এভারেস্ট লেভেল মূর্তির কথা ভেবে নিজের ট্যাক্সের টাকা এগিয়ে দেবে শিক্ষার দিকে। তুমি শশাঙ্ক, ইউ উইল ব্রিং দ্য চেঞ্জ। আই মীন, ইয়োর স্ট্যাচু উইল ব্রিং দ্য চেঞ্জ। ম্যামথ, গ্র্যান্ড, ইনক্রেডিবল স্ট্যাচু অফ শশাঙ্ক সাহা।
-ও কী! আপনার হাতে পিস্তল কেন? আপনি কি পাগল হলেন নাকি?
- অন দ্য কন্ট্রারি, আমি ভীষণ ভাবে সুস্থ শশাঙ্ক। এ প্ল্যানও নিখুঁত। জ্যান্ত মানুষের গায়ে ঠিক শহিদ গন্ধ সেঁটে দেওয়া যায় না হে। যায় না। আর শহিদ না হলে ওই মূর্তিটা গ্র্যান্ড হয়ে উঠবে কী করে বলতে পারো?

No comments: