Wednesday, January 19, 2022

চলো অঞ্জন!



অঞ্জন দত্তর গান নিয়ে কোনও গুরুগম্ভীর আলাপ-আলোচনাকে কোনওদিনই পাত্তা দিইনি৷ নিন্দে তো নয়ই, অন্যের প্রশংসার সঙ্গে তাল মেলানোরও প্রয়োজন বোধ করিনি৷ অঞ্জনবাবুর গান একটা অভ্যাসের মত জুড়ে গেছিল৷ তার ভালোমন্দ হয়না, ডিসেকশন হয়না৷ ভালো লাগা থাকে। আর গানের ক্ষেত্রে, সেই ভালোলাগাটুকুই বোধহয় একমাত্র ডিসিপ্লিন, অন্তত আমার মত অতিপাতি মানুষের জন্য৷ 

প্রথমবার অঞ্জনবাবুর গান ক্যাসেট ধার করে শোনা৷ স্কুলবয়সে৷ সে'সব গান প্রথমবার শুনেই লাফিয়ে ওঠার নয়৷ 'ওয়াহ তাজ' বলে সেলাম ঠোকার নয়৷ কিন্তু৷ অঞ্জনবাবুর গানগুলোয় রয়েছে বার বার ফিরে যাওয়ার সুর৷ আর স্কেল-বসানো সোজাসাপটা সরলসিধে কথা৷ প্রথম শোনায় যে ক্যাসেট 'ঠিকই আছে' মনে হয়েছে, বাহাত্তর নম্বর শুনানির সময় সেই ক্যাসেটই ইয়ারদোস্ত৷ 

ভদ্রলোকের বেশ কিছু গোবেচারা গান রয়েছে৷ একসময় তারা মাঝেমধ্যেই টেপরেকর্ডারে বাজছে৷ বিরক্ত করছে না, আবার মনে ইয়াব্বড় দাগও কাটছে না৷ কিন্তু আচমকা একদিন খেলা ওলটপালট৷ হয়ত কেমিস্ট্রির খাতার পিছনে মন দিয়ে বুক ক্রিকেটের স্কোর লিখছি৷ তখন দুম করে টের পেলাম - আরে! "শুনতে কি চাও তুমি"র সুরে কী দারুণ মায়া৷ কী অপূর্ব স্নেহ৷ আর কী, অমনি সে গানের সঙ্গে দোস্তি হয়ে গেল৷ 

ব্যাপারটা ঠিক কীরকম? ধরুন আপনি সন্ধ্যে ছ'টা বেয়াল্লিশের ব্যান্ডেল লোকালের ডেলিপ্যাসেঞ্জার। ইঞ্জিনের দিক থেকে তিন নম্বর কামরাটি আপনার নিয়মিত অফিস-ফেরতা ঠাঁই। সেই কামরায় এক মুখচোরা মিষ্টি স্বভাবের ভদ্রলোকের সঙ্গে রোজই দেখা হয়, চোখাচোখির আলাপ৷ 'সব ভালো তো' গোছের ইশারা রোজই আদানপ্রদান হয়,থাকে মাথা নাড়া প্রত্যুত্তর৷ আচমকা একদিন, হঠাৎ সেই মুখচোরা মানুষটি যেচে এসে আলাপ জমাবেন৷ তখন জানা যাবে আপনাদের দু'জনেরই ওলসেদ্ধ দিয়ে ভাত মেখে খেতে ভালো লাগে, আর ভালো লাগে দীঘা, আর শীর্ষেন্দু, আর আশাপূর্ণাদেবীর লেখা৷ ব্যাস, জমে গেল বন্ধুত্ব৷ তেমনই, অঞ্জনবাবুর সবচেয়ে প্রিয় গানগুলোও একদিন অতর্কিতে এসে আলাপ জমিয়েছে, এবং তল্পিতল্পা সমেত থেকে যায়৷ 

আর থেকে যাওয়া মানে থেকে যাওয়া? এক্কেবারে জাঁকিয়ে বসেছে৷ কাজেই চৌধুরীদের  একুশতলার নির্লজ্জ ঝগড়াঝাটি এখন আমার সুপরিচিত৷ বাবা-মায়ের সিনেমা ফেরত রোলটা ডাবল এগ ডাবল চিকেন, আমার অন্তত সে'টাই বিশ্বাস; আর খোকার ডিনারের ট্যালট্যালে ঝোলের হলদেটে বিস্বাদ রংটাও আমি দিব্যি চিনি; অঞ্জনবাবুর সুরের মধ্যে দিয়ে৷ আমি মাঝেমধ্যেই গুগলম্যাপে বেনিয়াপুকুর আর বেহালা যাওয়ার রুট দেখি৷ কমলা এজেন্সির ছোট্ট অফিসের কোণে অর্ণবের কাগজ বোঝাই টেবিলটা আমি ভীষণ চেনা, সেই টেবিলের পিছনের দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটাও আমি চিনে রেখেছি; ডাল লেকের ওপর শিকারা। আর বৃষ্টিতে চটি ছিঁড়ে যাওয়ার মধ্য যে চিনচিনে সুরটা মিশে থাকে, সে'টা আমি দিব্যি চিনি। 

এমন কত হাজার চেনাজানা, পরিচিতি, স্নেহ-মায়া সুট করে গছিয়ে দিয়েছেন অঞ্জন৷ তার গানগুলো আমাদের এই এলেবেলে জীবনের লাগসই ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, এ নিয়ে আমার কিন্তু কোনও সন্দেহই নেই৷ 

1 comment:

Arya Biswas said...

খুব সুন্দর লেখা। লেখাটা পড়তে পড়তেই অঞ্জন বাবুর গান চালালাম। আবার ছোট বেলার চিলে কোঠাযর বারান্দায় পৌছেগেলাম। আবার কখনো পার্কস্টিট হয়ে সোজা দার্জিলিং!!!
অনেক ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।

পুরনো লেখা