Monday, January 24, 2022

কাজের মত কাজ



কর্মব্যস্ত এবং তৃপ্ত মানুষের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকতে কী ভালোই না লাগে৷ হাজারখানা 'ইন্সপিরেশনাল' সেল্ফ-হেল্প বই পড়ার চেয়ে অমন একজন হাসিখুশি শশব্যস্ত মানুষের দিকে মিনিট দুয়েক তাকিয়ে থাকাটা বেশি কাজের বোধ হয়৷ 

অফিসে যখন দেখি কেউ কাঠশুকনো কোনও রিপোর্টও এক গাল হাসি আর ম্যাক্সিমাম ফোকাস নিয়ে লিখছে, মন ভরে যায়৷ সে রিপোর্ট তিনি ধীরেসুস্থে পড়বেন। রিপোর্টের প্রতিটি শব্দকে কড়াভাবে ঝালিয়ে নেবেন; যেমনভাবে কোনও কবি নিজের সদ্যলেখা কবিতাকে পালিশ করে থাকেন৷ এলেবেলে ভুল চোখে পড়লে এমনভাবে চমকে উঠবেন যেন পোলাও চিবুতে গিয়ে দাঁতে পাথরকুচি পড়েছে৷ শুধু তাই নয়, খসখসে রিপোর্টকে তিনি মখমলে করে তুলবেন নিজের একনিষ্ঠ রিসার্চে। এ'সব মানুষ সুযোগ পেলে এমন মনপ্রাণ ঢেলে মাটি কোপাবেন যে মরুভূমিতেও বাসমতি ফলিয়ে ছাড়বেন। 

রিপোর্ট যত এগোবে, তাদের মুখের হাসিও ততটাই চওড়া হবে৷ মাঝেমধ্যে হয়ত টাইপিং থামিয়ে টেবিল ঠুকে তাল দেবেন, সামান্য গুনগুন না করলে যে খেটে-কামাল-করা কাজের মজাটাই মাটি৷ রিপোর্টের জটিলতম অংশটা নিখুঁতভাবে নামিয়েই হয়ত তিনি হাঁক পাড়বেন এক কাপ চায়ের জন্য, আদা দেওয়া৷ নিজেকে মাঝেমধ্যে বখশিশ না দিলে চলবে কেন?

রিপোর্ট শেষ হয়েও শেষ হবে না৷ কাজের অমোঘ মায়াটুকু তিনি হেলাফেলায় এড়িয়ে যেতে পারবেন না৷ ফন্ট কী হবে, স্পেসিং কেমন হবে, মার্জিন কতটা থাকবে, জটিল টেবিলগুলো কী টেম্পলেটে বসবে; এমন হাজারো বিষয় নিয়ে তাঁর মনের মধ্যে তোলপাড় চলবে৷ বহুরকম এ'দিক-ও'দিক, ওপর-নীচ, ডায়ে-বাঁয়ে করে তবে তিনি থামবেন৷ তারপর কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বুদ্ধের হাসি হেসে মত মাথা দোলাবেন, "এইবারে মনের মতন, এতক্ষণে রিপোর্ট বাবাজীকে বাগে আনা গেছে। এইবারে৷ এতক্ষণে"।

যদি সে রিপোর্টের প্রিন্ট নেওয়া জরুরী হয়, তা'হলে সে কাগজের গায়ে খানিকক্ষণ হাত বুলোবেন তিনি৷  লোকে পাত্তা দিক না দিক, নিজের কাজকে যে নিজেই বুকে করে আগলে রাখতে হয়, সে সত্যটা তিনি বিলক্ষণ জানেন৷ নিজের সেই রিপোয় বা সাধারণ মেমোটি পড়তে পড়তে হয়ত তিনি কল্পনায় শুনবেন এক স্টেডিয়াম " বাহ্, বাহ্"। তিনি চেষ্টা করবেন যাতে স্টেপলারের খটাসটুকুও জ্যামিতি মেনেই সে কাগজের গায়ে নেমে আসে৷ ময়লা ফোল্ডার দেখলে তিনি শিউরে উঠবেন৷ নিজে গিয়ে স্টোররুম ঘেঁটে বের করে আনবেন উজ্জ্বল একটা ফোল্ডার, যার মধ্যে সেই রিপোর্টকে আদুরে হাতে শুইয়ে রেখে তবে তার নিশ্চিন্দি৷ হয়ত একটু গজল বা দু'লাইন শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে নিয়ে তিনি সে রিপোর্ট পর্বে ইতি টানবেন৷ 

পেটের টানেই দুনিয়াদারী, কাজ বেছে নেওয়ার বিলাসিতা সবার তো জোটেনা৷ কিন্তু সবার কপালে যেন কর্মব্যস্ততাটুকু জুটে যায়৷ আর ইয়ে, সে কর্মব্যস্ততা যেন খিটখিটে-মেজাজের চৌবাচ্চায় চুবনি না খাওয়ায়৷ প্রতিটি কাজ-পাগল মানুষ যেন তৃপ্তির সমুদ্দুরে গা ভাসিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিরে পারে। 

এ'টুকুই, দু'দিন বইতো নয়।

No comments:

পুরনো লেখা