Friday, January 21, 2022

ভূত নামানোর ব্যবসা



- এ কী৷ আবার এসেছেন?

- চিন্তা নেই৷ এ'বারে আর ভূত দেখতে আসিনি৷ 

- তাই বলে ফিজ না দিয়ে যেতে পারবেন না কিন্তু৷ আমার সময়ের দাম আছে৷ 

- রাখুন আপনার সময়ের দাম৷ বাইরে তো কেউই বসে নেই৷ ভূত নামানোর বাজার ডাউন যাচ্ছে? 

- আসলে দু'দিন আগেই পূর্ণিমা গেল তো৷ এ'সময়টায় ঠিক তেনারা অদরকারে ঘুরঘুর করতে পছন্দ করেননা৷ তাই এ'কদিন বিজনেস একটু ওই...যাকে বলে..।

- অত কথায় কাজ নেই৷ আপনার ফিজ একশো বত্রিশ টাকা তো? দেব। ইয়ে, আমায় মনে আছে আশা করি।

- ভাস্কর তান্ত্রিক একবার কাউকে দেখলে সহজে ভোলে না৷ আর আপনি মাইরি ভুলবার মত লোকও নন৷ গত হপ্তায় কী কাণ্ডটাই না ঘটালেন..। আপনি তো ব্যারাকপুরের প্রবীর দত্তগুপ্ত৷ তাই তো? দিব্যি, দিব্যি মনে আছে।  

- দেখুন ভাস্করবাবু..।

- ও কী! আমি আপনার অফিস কল্যিগ নই৷ বাবা বলুন, গুরুজীও চলতে পারে৷ 

- যাকগে৷ অকারণ খেজুর করতে আমি আসিনি। গতবার আপনাকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলাম৷ গোটা পরিস্থিতিটাই কেমন গোলমাল হয়ে গেছিল৷ তাই ভাবলাম..।

- আপনি কিন্তু আমায় সত্যিই ভেবড়ে দিয়েছিলেন প্রবীরবাবু৷ নিজের বাবার আত্মার সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চেয়ে আমার কাছে এলেন৷ ভালো কথা। অথচ আমি তেনাকে ডাক দেওয়ার আগেই এমন বিশ্রীভাবে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন..৷ আরে বাপের নামটাও বলতে পারলেন না কান্নার চোটে৷ তারপর তো প্রায় ছুটে পালালেন..। আমি তো হতবাক। 

- জানি৷ ব্যাপারটা নেহাতই ছেলেমানুষির পর্যায়ে চলে গেছিল আর কী৷ তাই পরে মনে হয়েছে ব্যাপারটা আপনার কাছে একটু খোলসা করে যাওয়া দরকার৷ যদিও আপনার এ ব্যবসাটাকে আমি ঠিক সৎ বলে মনে করিনা, তবু ভাবলাম...।

- ব্যবসা? ব্যবসা? শুনুন মশাই৷ এ'টা হলো সাধনা৷ বুঝেছেন? সাধনা৷ ফিজটা নিই শুধু এস্টাবলিশমেন্ট মেন্টেনেন্স কস্ট হিসেবে। 

- যাক গে। ভাস্করবাবু..থুড়ি..শ্রী শ্রী ভাস্করতান্ত্রিক..যে'টা বলতে ব্যারাকপুর থেকে হালিশহর ছুটে আসা৷ আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম আমার মৃত বাবার আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে৷ কারণ..কারণ আমি পাগল হয়ে গেছিলাম৷ জানেন ভাস্করবাবু, আমার বাবার নাম অবনী দত্তগুপ্ত। পেশায় স্কুল মাস্টার ছিলেন৷ অতি সৎ একজন মানুষ ছিলেন৷ বহু সহায়সম্বলহীন ছেলেমেয়েকে পড়িয়ে গেছেন মারা যাওয়ার দিন পর্যন্ত৷ ছাত্রছাত্রীরাও বাবাকে বড় ভালোবাসতো৷ আর বাবা তাদেরকে একটা শিক্ষাই দিতেন, সমস্ত ঝুটো বিশ্বাস আর কুসংস্কার উড়িয়ে দিয়ে সৎপথে থাকার শিক্ষা৷ বাবার গর্ব ছিল, যে তাঁর ছাত্ররা প্রত্যেকেই বিজ্ঞান-মনস্ক। অথচ আমিও তো বাবারই ছাত্র৷ বিশ্বাস করুন, বাবার বাকি স্টুডেন্টদের মত আমার মধ্যেও কুসংস্কার নেই৷ শুধু বাবা মারা যাওয়ার পর ক্ষণিকের জন্য মনটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল৷ বুকের মধ্যে একটানা একটা বিশ্রী হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড়। আর তাই ব্যারাকপুর স্টেশনের ল্যাম্পোস্টে সাঁটা আপনার ওই ভূত নামানোর বিজ্ঞাপন দেখে হঠাৎ যেন জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলেছিলাম৷ কিন্তু আপনার কাছে এসে বসার পর সম্বিৎ ফিরে পেলাম। আর তারপর একটা বিশ্রি লজ্জা আমার প্রায় গলা টিপে ধরেছিল। অবনী মাস্টারের ছেলে হয়ে তাঁর শিক্ষাকে এমন হেলায় ভাসিয়ে দিয়েছি ভেবে আমার বড় কষ্ট হয়েছিল ভাস্করবাবু৷ তাই আপনার সামনে থেকে অমন দৃষ্টিকটু ভাবে ছুটে পালিয়েছিলাম। কিন্তু পরে মনে হল, ব্যাপারটা আপনাকে জানানো দরকার..।

- আপনি আজ আসুন প্রবীরবাবু।

- আমার কথাগুলো একটু কটু শোনাচ্ছে বোধ হয়৷ মাফ করবেন কিন্তু আপনাকে না জানালে...।

- আপনি আসুন। আসুন।  

**

- আরে এতবার কলিংবেল! কে? ওহ! আপ..আপনি?

- কী,  চিনতে অসুবিধে হচ্ছে না তো প্রবীরবাবু? 

- গেরুয়া লুঙ্গি আর খালি গায়ের বদলে হাফশার্ট আর ট্রাউজারে আপনাকে দেখতে হবে সে'টা কোনওদিনও ভাবিনি ভাস্করবাবু৷ আর আপনার মতলবটা কী বলুন তো? আমায় ফলো করছেন নাকি? হালিশহর ছেড়ে হঠাৎ ব্যারাকপুরে?

- ভিতরে আসা যায়?

- আমি ঠিক নিশ্চিত নই৷ বললাম তো। আপনার মতলবটা জানা দরকার৷ 

- আগের দিন মনে হল, অন্ধবিশ্বাসের টানে একবার আমার ডেরায় এসে পড়ার পর থেকে আপনি খুবই মনকষ্টে আছেন৷ তাই ভাবলাম..।

- মতলবটা কী আপনার?

- মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে আসব, তার জন্য আবার মতলবের দরকার হবে কেন?

- মাস্টারমশাই? আপনি কি বাবাকে..।

- চিনতাম। সাতাশির উচ্চমাধ্যমিক ব্যাচ৷ তখন অবিশ্যি আপনি নিতান্তই শিশু৷ সে'জন্যই আমি প্রথমদিন ঠিক আপনাকে চিনতে পারিনি৷ পরের দিন গিয়ে যখন অবনী স্যারের নাম করলেন, বুকের ভিতরটায় কেমন ছ্যাঁকা লাগল যেন৷ তবে মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতি রোমন্থন করতে আমি এদ্দূর আসিনি প্রবীরবাবু৷ আমি শুধু বলতে এসেছি একটা সহজ কথা জানাতে৷ শুনুন, ভূত নামানোর টানে আমার ডেরায় গিয়ে আপনি মাস্টারমশাইয়ের স্মৃতির অপমান করেননি৷ আপনি কুসংস্কারের টানে আদৌ ছুটে যাননি৷ আপনি গেছিলেন ভালোবাসার টানে, প্রবল মনকেমন বুকে নিয়ে৷ বাপের চলে যাওয়া যে ছোটখাটো ব্যাপার নয় প্রবীরবাবু৷ একটু পাগলামো চলতেই পারে৷ 

- ভাস্করবাবু..আমি যে কী বলব..।

- আপনি হয়ত আমায় দেখে ভাবছেন, মাস্টারমশাইয়ের ছাত্র শেষে ভূত নামানোর ব্যবসায় ঢুকলে? তবে কি মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষায় ফাঁক ছিল? অভয় দিয়ে বলি, আপনার মতই আমিও অবনীবাবুর একনিষ্ঠ ছাত্র৷ কুসংস্কার আমায় সহজে ঘায়েল করতে পারবে না৷ তবে আপনার মতই, বাপের মৃত্যুটা আমাকে বিশ্রীভাবে ঘায়েল করেছিল বটে৷ আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্য৷ ইয়াব্বড় সংসার ফেলে বাবা দুম করে সরে পড়লেন৷ টের পেলাম; পেটের দায় বড় দায়৷ ভালোবাসাও মিইয়ে যায়৷ পড়াশোনা ছাড়তে হল, মাস্টারমশাইয়ের শাসন এবং স্নেহও বাদ পড়ল কারণ বাড়ির খরচ চালাতে গেলে অঙ্ক টিউশনিতে পড়ে থাকা চলবে না৷ চাকরী না থাক, বিজনেস খুঁজে নিতে হবে।  হিপনোটিজম আয়ত্ত করে তাই চলে এলাম ভূত নামানোর ব্যবসায়, নেহাতই দায়ে পড়ে। শুনুন, মাস্টারমশাইয়ের শিক্ষা জলে যায়নি প্রবীরবাবু৷ যেতে পারে না৷ কেমন? মনে থাকবে? এ'টুকু বলার জন্যই ছুটে আসা৷ আজ আসি।

- ভাস্করদা৷ চা না খাইয়ে তো আপনাকে ছাড়া যাবে না৷ আর বাবার কাছে অঙ্ক পড়েছেন যখন, মায়ের হাতের ডিমের কচুরির স্বাদও নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়৷ সে'স্বাদও না হয় আর একবার ঝালিয়ে নেবেন৷ আপনাকে ভিতরে আসতেই হবে৷ 

No comments:

পুরনো লেখা