Monday, December 27, 2021

কর্পোরেট লীডারশিপ

কর্পোরেট লীডারশিপের বাংলা তর্জমা হয়না৷ হওয়া উচিৎও নয়৷ এই ব্যাপারটা মূলত দু'রকমের৷ প্রথম ধরণেরটা পাওয়া যায় পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এবং বক্তৃতায়৷ সে'খানে লীডারশিপ ব্যাপারটা ভরপুর বিভিন্ন গা-কাঁপানো শব্দে৷ অবশ্য এ ক্ষেত্রে, শব্দ মানে নিরেট 'সাউন্ড'; যেমন 'এমপ্যাথি' বা 'কমপ্যাশন', 'ইমোশনাল কোশেন্ট' ইত্যাদি৷
এরপর রয়েছে আদত কর্পোরেট লীডারশিপের ফল্গুধারা যার তুলনা স্রেফ সাঁড়াশির সঙ্গে চলতে পারে৷ এ জিনিস অবশ্য পাওয়ারপয়েন্টের বাজারে অচল। এই জবরদস্ত লীডারশিপ দিয়ে নিজের 'পয়েন্ট'গুলো, বোধ- বুদ্ধি-যুক্তি নির্বিশেষে অন্যদের ওপর 'পাওয়ার'ফুলি চাপিয়ে দেওয়ার যায়৷ এ'দিয়ে চিমটিও কাটা যায় আবার টাইটও দেওয়া যায়৷
এ প্রসঙ্গে বলি বলি, টাইট দিতে পারাটা একটি সুবৃহৎ কর্পোরেট 'কোয়ালিটি'৷ হাজার রকমের প্রেজেন্টেশন, পেপটক বা সেমিনার দিয়ে এ পরম সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়৷ প্রসেস স্ট্রিমলাইন করতে চেয়ে সিস্টেম ওলটপালট করতে যাওয়া মানে বিস্তর খাটুনি। তার চেয়ে বরং দু'এক পিস এলেবেলেকে টাইট দেওয়াটা অনেক বেশি সহজ আর উপাদেয়৷
দেখুন, ভবিষ্যতের জন্য কী ভালো, দশের জন্য কোনটা উপকারি, কোন রিস্কগুলো আজ না নিলেই নয়; সে'সব নিয়ে বেশি মাথা ঘামালে রিভিউ মিটিংয়ে অস্বস্তি বাড়বে বই কমবে না৷ এর চেয়ে জমাটি হল টাইট দেওয়া-নেওয়ার গালগল্প৷ এক্সেলেন্সের দাবীর চেয়েও বেশি কাজ দেয় টাইট দেওয়ার হুমকি৷
টাইটেই উত্তরণ।

গীতা দত্ত আর গানের ল্যাজামুড়ো



গানের ল্যাজামুড়ো বোঝা হলো না৷ সে বোঝা না বোঝায় অবশ্য ভালোবাসা আটকে নেই৷ এই যেমন চাষবাস জানা নেই বলে তো আর ঝোল দিয়ে ভাত সাপটে মেখে খাওয়াটা আটকে থাকে না। সুরের ওঠানামা, রাগরাগিণীর ক্যালকুলাস, ক্লাস-বনাম-মাস; অধ্যাবসায়ের অভাবে এ'সব জরুরী কনসেপ্টগুলো সম্বন্ধে সঠিক ধারণা গড়ে তোলা গেল না৷ তবে ভালোবাসাটুকু নিপাট৷
সে ভালোবাসার টানেই ভোররাতে মেসের ঢাউস জানালার ধারে বসে থাকা ছেলেটার বুকের ভিতরে একটা বিদঘুটে ভালোলাগা আর বেঢপ কান্না মেশানো অনুভূতি তৈরি হয়, রেডিওয় সুমনের জাতিস্মর শুনে৷ সে ভালোবাসায় হেমন্তর সুরে ঘুরপাক খেতে খেতে যাবতীয় গোপন যন্ত্রণা মেরামত করে নেওয়া যায়৷
আর সেই ভালোবাসাতেই নতজানু হয়ে একটা সত্যি স্বীকার করে নেওয়াই যায়৷ গীতা দত্তর কণ্ঠ শুনে 'আহা দিব্যি' বা 'কী সাংঘাতিক ভালো' মার্কা সেলুট ঠুকবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়৷ আর পাঁচজনের মত আমিও শুনে আসছি, সেই ছেলেবেলা থেকে৷ স্মার্ট, রোম্যান্টিক, মায়াবী কণ্ঠ৷ কিন্তু সেই ভালো লাগাটুকুই গীতা দত্ত প্রসঙ্গে শেষ কথা নয়৷ আচমকা একদিন সমস্ত চেনা ভালো লাগাগুলোকে হুশ্ করে উড়িয়ে দিয়ে এক অচেনা গীতা দত্ত মনের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সে'টাই নিয়ম বোধ হয়৷
আটপৌরে ভালোলাগায় সে নতুন ভাবে আবিষ্কার করে কণ্ঠের বর্ণনা হয় না৷ নিশির ডাকের যে গা ছমছম, শিউলি সুবাস মাখানো যে স্নেহ আর শীতের রাতে আচমকা ঘুম থেকে উঠে ছলছলে চোখে সাতপুরনো চিঠির উত্তর লিখতে বসার যে আনচান; সে'সমস্ত মিলেমিশে গড়ে ওঠা এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করার জন্যই যেন বহুবছরের অপেক্ষা৷ হাজারবার শোনা, সুপরিচিত গানগুলো নতুন ভাবে কানে এসে ঠেকবে৷ খানিকটা ভূতের ভয়ের মত ঘাড়ে চেপে বসবে সেই গানগুলোর নেশা৷
আজীবন গীতা দত্তর গানের ভক্ত হয়ে থাকাটা নেহাতই সহজ৷ কিন্তু প্রবল পাগলামোর মুহূর্তে, দুম করে এক অন্য গীতা দত্তকে আবিষ্কার করাই বোধ হয় গীতা দত্তর ম্যাজিকের নাগাল পাওয়ার একমাত্র উপায়। গীতা দত্তর সুরের আদত রোম্যান্সকে হয়ত প্রতিটি মানুষই এমনভাবে দু'ধাপে চিনতে পারেন৷ আর একবার সে পাগলাটে ভালোবাসা চিনতে পারলে আর মুক্তি নেই৷ অথবা হয়ত সে'খানেই মুক্তি৷

মনমোহন দত্তর ডিসিপ্লিন



গার্জেনরা লাগাম সামান্য আলগা করলেই ছেলেপিলেরা গোল্লায় যাবে৷ গার্জেনের শাসন সামান্য এ'দিক ও'দিক হলেই ছেলেপিলেদের ফিউচর ডকে উঠবে৷ শক্ত হাতে, পেটাই মেজাজে কচিকাঁচাদের মানুষ করতে হবে৷
এ'টাই নিয়ম!
তেমনটাই হয়ে এসেছে!
চিরকাল!
আর শিক্ষকরা তো গার্জেন পিরামিডের মাথায় বসে, তাদের দায়িত্ব সতেরোগুণ বেশি৷
চিরকাল এ বিশ্বাসই আঁকড়েই কাটিয়েছেন তালডাঙা বয়েজ হাইস্কুলের ভূগোল শিক্ষক মনমোহন দত্ত।
ডিসিপ্লিনে সামান্য গড়বড় দেখলেই দাঁত খিঁচিয়ে ওঠা,
বেয়াদবি দেখলেই হাতের বেত নাচিয়ে গর্জে ওঠা,
ফাঁকি নজরে পড়লেই চোখ থেকে আগুন ঝরিয়ে টেবিল চাপড়ানো;
এ'সব কপিবুক শাসন টেকনিকের ব্যাপারে মনমোহন মাস্টার অতুলনীয়৷ মনমোহনবাবুর "এ'দিকে আয়" শুনলেই ছাত্রদের বুকে এক বিশ্রী কাঁপুনি শুরু হয়৷ হাড়বজ্জাত কোনও ছেলেকে শায়েস্তা করতে চাইলে হেডমাস্টার হরিহর সেন মাঝেমধ্যেই মনমোহন মাস্টারের শরণাপন্ন হন৷ এমনই দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী তিনি৷
ক্লাস রুমে পায়চারি করতে করতে ছাত্রদের নার্ভাস করে দিয়ে মাঝেমধ্যেই হুঙ্কার ছাড়েন তিনি; "সাফার দ্য পেইন অফ ডিসিপ্লিন টুডে অর সাফার দ্য পেইন অফ রিগ্রেট টুমরো"৷ ক্লাসের সব চেয়ে খতরনাক বিচ্ছুটিও মনমোহন মাস্টারের ক্লাসে সবিশেষ ট্যাঁফোঁ করে না।
স্কুল ছুটির পর বিকেলের দিকে বাড়ি ফেরেন মনমোহন দত্ত৷ একলা মানুষের পরিপাটি সংসার৷ হাতপা ধুয়ে চা-মুড়ি খেয়ে দেরাজ থেকে বর্মা কাঠের বাক্সটা বের করে দেখা৷ রোজকার নিয়ম৷ ডিসিপ্লিন। বাবার লেখা বাইশখানা চিঠি সে বাক্সে রাখা৷ এর মধ্যে একটাকে ঠিক চিঠি বলা চলেনা৷ চিরকুট৷ বাবার রেখে যাওয়া শেষ নোট। সে'টাই রোজ পড়ে দেখা।
"মনু,
ভুলে যাস না, ডিসিপ্লিন ছাড়া কোনও কিছুই হওয়ার নয়৷
আর এও মনে রাখিস, যে ডিসিপ্লিনে ভালোবাসা মেশানো নেই, তার সঙ্গে চাবুকের কোনও তফাৎ নেই৷ আর চাবুকের ভাষা মানুষ কোনওদিনও বোঝেনি, বুঝবেও না৷ কেমন?
তোর মধ্যে ভালোবাসা আছে মনু৷ মনে রাখিস৷ ভালোবাসা আছে।
বাবা"।
এরপর একটা ফতুয়া গায়ে চাপিয়ে নিজের হারকিউলিস সাইকেলে চেপে গাঙ্গুলিবাজারের দিকে এগিয়ে যাওয়া৷ মনমোহন দত্তের রোজকার রুটিন৷
গাঙ্গুলিবাজারের উত্তরে রেলের মাঠ৷ সে মাঠের একপাশে ফুচকার ঠেলা নিয়ে বিশু দাঁড়িয়ে থাকে৷ আর রোজ বুকেলে সে'ঠেলা আলো করে অপক্ষা করে থাকে বেশ কিছু ছেলেছোকরা৷ সে'দিক স্কুলে যাদের সবচেয়ে বেশি ধমকেছেন মনমোহন মাস্টার, সে'কজন৷ তালডাঙা বয়েজ হাইস্কুলের প্রতিটা ছাত্র এ নিয়ম জানে৷ মনমোহন মাস্টার যে'দিন যাকে কড়া স্টাইলে 'ডিসিপ্লিন' করবেন, সে'দিন তাদের কপালে অঢেল ফুচকা৷ আর ফুচকার শেষে মাঠে বসে মনোহর মাস্টারের অঢেল মনমাতানো গল্প৷
গল্প ফাঁদতে না পারলে মাস্টারি মিথ্যে৷
মনমোহন মাস্টার সে'টা বিলক্ষণ জানেন৷
গল্পের সুরে বাঁধতে না পারলেই ছেলেপিলেরা গোল্লায় যাবে৷ গল্পের মধ্যে দিয়ে সহজ সত্যিগুলো ধরিয়ে দিতে না পারলেই ছেলেপিলেদের ফিউচর ডকে উঠবে৷ ইতিহাসের গল্প দিয়ে, মানুষের সংগ্রামের গল্প দিয়ে কচিকাঁচাদের মানুষ করতে হবে৷
এ'টাই নিয়ম!
তেমনটাই হয়ে এসেছে!
চিরকাল!

শৈলেনবাবুর নির্বাণ



অফিস থেকে ফিরে সামান্য সুরাপান না করলে শৈলেনবাবুর চলেনা৷ একা মানুষ, কারুর সাতে নেই, পাঁচে নেই৷ সামান্য রসবোধ না থাকলে চলবে কেন? একবাটি ঝাল চানাচুরের সঙ্গে সামান্য দু'গেলাস সস্তা মদ, প্রতি সন্ধের এই সামান্য আয়েসটুকুর প্রতি তাঁর বড় মায়া। অবশ্য মাতলামো ব্যাপারটা তিনি মোটে বরদাস্ত করতে পারেন না৷ মদের কাজ হল মেজাজে পালক বুলিয়ে সরে পড়া, সে'টাই আইডিয়াল৷ নেশা যদি মগজে চড়ে ধেই ধেই নেত্য করে, তা'হলেই কেলেংকারি।
রোজ অফিস থেকে ফিরে আগে স্নান৷ লাক্স সাবান আর কেয়োকার্পিন সহযোগে। এরপর চট করে রান্না চাপানো। শৈলেনবাবুর রাতের খাওয়াদাওয়ায় বেশ বাহুল্যবর্জিত; ভাতেভাত বা ডাল-ভাত-ভাজা বা ঝোল-ভাত৷ একঘণ্টার মধ্যেই রান্নার হ্যাপা চুকে যায়৷ তারপর মদের বোতল, গেলাস, চানাচুরের বয়াম আর বাটি নিয়ে এসে ব্যালকনিতে থেবড়ে বসেন তিনি৷ পাশে রাখা থাকে ছোট্ট একটা স্পীকার, সে'খান সাতপুরনো সমস্ত গান বাজে৷
আসলে শৈলেনবাবুর গান চেনা সমস্তই মায়ের কাছে৷ মাথায় সামান্য ঝিম ধরার পর সে'সব মায়ের চেনানো গান কানে এসে ঠেকলেই মায়ের গন্ধ পান শৈলেনবাবু৷ মা চলে যাওয়ার এতবছর পরেও সে গন্ধ স্পষ্ট৷ একটা মায়াময় বুক ছ্যাঁৎ টের পান তিনি৷ মনে হয় এই বুঝি মা খেতে ডাকবে৷ এই বুঝি মা খবর নেবে অঙ্ক কষা হয়েছে কিনা। এই বুঝি মায়ের মনে হবে খাওয়াদাওয়ার অনিয়মে বেশ খানিকটা রোগা রয়ে পড়েছে তার শৈল৷
এ'রকম ভাবেই সে ভালোলাগাটা দিব্যি চেপে ধরে শৈলেনবাবুকে৷ রোজ সন্ধেয়৷ দু'পেগ শেষ হলে যে'টা পড়ে থাকে সে'টা হল এক বুক গান আর বেশ খানিকটা আরাম৷ সে'টাকে আর যাই হোক মাতলামো বলা যায়না৷ স্রেফ একটা মনভালো করা ফুরফুর৷ গোটা দিনের ক্লান্তি উড়িয়ে দেওয়া ফুরফুর৷ ট্রেনের বিশ্রী ভিড়, অফিসের বড়বাবুর অকারণ খিচিরমিচির, সমস্ত হাপিশ করে দেওয়া ফুরফুর৷
এরপর ভরপেট খেয়ে একটা গল্পের বই নিয়ে বিছানায় লম্বা হওয়া৷ শৈলেনবাবুর স্থির বিশ্বাস এ'টাই নির্বাণ।
**
- তোমার সবেতে বাড়াবাড়ি বউ!
- মরেও তোমার খিটখিটেপনা গেল না।
- আমি খিটখিটে? আর তুমি যে'টা করছ সে'টা ঠিক?
- বেশ করি!
- এ'টা ঠিক নয় বউ!
- দিব্যি ঠিক! চমৎকার!
- খোকা জানলে হুলস্থুল বাঁধবে৷
- শৈল জানবেটা কী করে?
- না জানলেও, তোমার রোজ ফিরে যাওয়া ঠিক নয়৷
- ফিরে তো তুমিও যাও৷ বাপের টানও তো দেখি কম নয়৷
- বাজে তর্ক কোরো না বউ৷ আমি গিয়ে অন্তত রোজ মদের বোতল থেকে হুইস্কি সরিয়ে জল মিশিয়ে আসি না৷ খোকা মদের বদলে ধোঁকা খাচ্ছে যে৷ আমাদের এ'ভাবে ইন্টারফেয়ার করা ঠিক হচ্ছে?
- শৈল গান খোঁজে গো৷ মদ খোঁজে না৷

মিইয়ে যাওয়া মুখে



প্রেমিকাকে লেখা সতেরো পাতার মেগা-রোম্যান্টিক চিঠির উত্তরে একটা হাড় কাঁপানো খটখটে হোয়্যাটস্যাপ-"হুম"পাওয়ার পর,
মৌজ করে স্পেশ্যাল চায়ে চুবিয়ে খেতে গিয়ে তিনটে হর্লিক্স বিস্কুট কাপে হারিয়ে যাওয়ার পর,
বন্ধুকে পাঠানো 'শুয়ার শালা' এমএমএস ভুলে অফিসের ওপরওলার নম্বরে চলে যাওয়ার পর,
এমন মিইয়ে যাওয়া মুখেই বাড়ি ফিরতে হয়।

গদ্দারি

- বড়দা! এই বড়দা!
- কী হল, অত লাফালাফি করছিস কেন।
- শেষ পর্যন্ত তুই এ কাজ করলি?
- দুপুরের অমলেটটা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম বলে রাগ করেছিস ছোট?
- কথা ঘোরাস না। কথা ঘোরাস না! তুই জানিস আমি কী নিয়ে কথা বলছি।
- মাইরি না।
- তুই ক্লাবের ডিবেটে স্টেজে উঠে দেশের নিন্দে করেছিস! পাবলিকলি দেশের নিন্দে করেছিস!
- দেশের নিন্দে?
- নেকু সাজিস না বড়দা। আমি সব শুনেছি।
- আরে কিছু কিছু সিস্টেমিক ফ্ল পয়েন্ট আউট করেছি ...আমাদের সিভিক সেন্সের কিছু অভাব নিয়েও একটু এলাবোরেট করেছি বটে...। কিন্তু...।
- তোর থেকে এমন গদ্দারি আমি এক্সপেক্ট করিনি দাদা।
-গদ্দারি? বটে?
- আলবাত গদ্দারি। কোন দেশটা নিখুঁত শুনি! প্রব্লেম কোথায় নেই। ঝুটঝ্যামেলা কোথায় নেই। তাই বলে আমরা খামোখা রাস্তায় নেমে দেশের নিন্দে করে চেল্লামেল্লি করব? ইনসাল্ট করব? পেট্রিয়টিজমের কি কোনও মূল্যই নেই আজকাল? এই তোর শিক্ষাদীক্ষা? ছিঃ!
- আহ্‌...শোন...।
- আমার কোনও কিছু খারাপ লাগলে কি তুই পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে মাইকে সে'সব ফলাও করে বলবিরে বড়দা?এই তোর লয়্যালটি?
- দ্যাখ ছোট! বড্ড বাতেলাবাজ হয়ে যাচ্ছিস দিনদিন। সমুদ্রে এক চামচে নুন ফেললে সমুদ্রের জাত যাবে না, সমুদ্রের কাছে তুই আর আমি ইনসিগনিফিক্যান্ট। দেশ হল সমুদ্র। তোর আমার মত এলেবেলের জন্য সে ঢেউ আটকে বসে নেই। আর কিছু মনে করিস না, খোঁচালি যখন বলেই দিই। সত্যিই তোর স্টেজে উঠে তোর নিন্দে করতে আমার বাঁধে। এই যে কথায় কথায় হুজ্জুতি করে বেড়ানো, কলার টেনে জ্ঞান দেওয়া, যে'খানে সে'খানে থুতু ফেলা, ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার ফিকির খোঁজা...এ'সব দেখলেই আমার গা জ্বলে।
- না মানে দাদা... আসলে...।
- লায়েক হয়েছিস। গাঁট্টা দেওয়ার বয়স আর নেই। কাজেই তোর প্রতি যে রাগ; সে'টা হজম করে নিয়ে দেশের হয়েই হাহুতাশ করতে হল অগত্যা।
- আহ্‌, কী যে তুই বলিস বড়দা...।
- তোর কথায় কথায় অন্যের গায়ে পড়ে ঝগড়া করার এন্থু আছে, আর আমার কপালে অম্বল আর ডাইজিন। তাই বেশি হুল্লোড় করতে পারি না। তবে শুনে রাখ ছোট, স্টেজে উঠে আমি কিন্তু তোর মত লোককেই গাঁট্টা মারতে চেয়েছি। সে'টা তুই দিব্যি টের পেয়েছিস। টের পেয়েছিস বলেই সেই গাত্রদাহ। এই গাত্রদাহকে খবরদার প্যাট্রিয়টিজমে বলে চালাতে যাস না।
- আরে কী থেকে কী কথা! যাক গে, চায়ের জল বসাচ্ছি। চলবে? এক কাপ?
- তা'তে এক চামচ এক্সট্রা চিনি দিস। আর পারলে ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নটা সময় মত জমা দে। ইডিয়টকুমার বাতেলাসিংহ গপ্পবাজ।

অডিটের দিন

(১৬ নভেম্বর নাকি অডিট দিবস ছিল, সে প্রসঙ্গে এ লেখা)

**

আরে! আজ নাকি অডিট দিবস!
ইয়ে, নিজের মানিব্যাগের অডিট দিয়ে শুরু করলেই অনেক কোম্পানির হালহকিকত খানিকটা আঁচ করা যাবে।
- ইয়ামোটা আধছেঁড়া মানিব্যাগ, কাগজপত্র উপচে পড়ছে। অথচ টাকাকড়ি লবডঙ্কা লেভেলে।
- টাকা নেই, কড়ি নেই। কিন্তু অজস্র খুচরো পয়সা আছে।অসহ্য ওজন অথচ কেউ খুচরো চাইলেই গলা শুকিয়ে আসে।
- কমিউনিস্টের মানিব্যাগ থেকে বেরোতেই পারে কালীঘাটের পুজোর ফুল আর ঘোর ভক্তের মানিব্যাগ থেকে বেরোতেই পারে মার্ক্সের পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
- ড্রাইভিং লাইসেন্স খুঁজতে গিয়ে আগে বেরোবে পাঁচ বছর আগের বাসের টিকিট আর দু'বছর আগে খাওয়া নেমনতন্নের মেনু।
- থাকবে শতসহস্র কার্ড। অফিস নিয়ে পর্যুদস্ত মানুষের কলেজ জীবনের লাইব্রেরি কার্ড যেটা আদৌ কোনওদিন ব্যবহার হয়নি। দিল্লীর মেট্রোয় ঝুলোঝুলি করা দাদাটির মানিব্যাগে হাওড়া কর্ডলাইনে যাতায়াত করার মান্থলি। অকেজো ক্রেডিট কার্ড, শপিং মেম্বারশিপ - হিসেব নেই, যুক্তি নেই; তবু আছে।
মোদ্দা কথা -
কড়া মেজাজ দিয়ে রাজ্যপাট চালানো যায়, নিজের মানিব্যাগ অডিট করা যায় না। "সিস্টেম স্ট্রিমলাইন" করার প্রতি যে তীব্র অনীহা, সে'টুকুই আমাদের খুচরো বিপ্লব। যা কিছু অযৌক্তিক, ভরসা সে'টুকুই।