Thursday, August 6, 2020

ভজা মাস্তানের মনকেমন

- ভজাদা, ও ভজাদা। চুক্কুস করে এক চুমুক হোক না।

- নাহ্। আজ ও'সব গিলতে মন চাইছে না রে মন্টু।

- আজ এত বড় একটা কাজ হাসিল হল৷ আর তুমি মাইরি নিরামিষ থাকবে?

- কাজ হাসিল? তাই বটে।

- ভজাদা, কেসটা কী বলবে?

- নাহ্। তোদের মোচ্ছব চলুক। আমি বরং ছাতে যাই।

- ও, ভজাদা। কী হলো গো। বলো না। ভজাদা গো। বলো না,  বলো।

- কাজটা ভালো হলো রে মন্টে?

- ওই, ক্লাবঘর তৈরির ব্যাপারটা?

- ওই কাজটাই তো আমরা হাসিল করলাম। তার জন্যেই তো কানু দত্ত আমাদের জন্য ঢালাও মদ-মাংসের ব্যবস্থা করে দিল। তাই না? কিন্তু কাজটা কি আদৌ ভালো হল?

- আমরা লোচ্চা লোফার মাস্তান মানুষ৷ কানুদার মত হাড়বজ্জাত নেতাদের হয়ে একে মারি তাকে ঠুকি, তোলা আদায় করি৷ আমাদের কি কাজের ভালো মন্দ নিয়ে ভাবলে চলে ভজাদা? তুমিই তো বলতে, আমাদের কাজ দিনে  ক্যালানো আর রাতে কেলিয়ে পড়া, সাতপাঁচ ভাবার দায়িত্ব আমাদের নয়।

- হ্যাঁ। আমরা গুণ্ডা, নচ্ছার। আমাদের না হয় সাতপাঁচ ভাবতে নেই। ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি দেখে আমরা খ্যাঁক করে হাসবো, সে'টাই হওয়া উচিৎ৷ কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু গুলিয়ে গেল রে মন্টু।

- গুলিয়ে গেল? কী করে ভজাদা?

- টোটাল ঘেঁটে ঘ। হারুর ওই একচিলতে ভাঙাচোরা টিনের বাড়ি। সে'টুকুতে সাত সাতটা মানুষ ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকত। হারুকে এমনিতেও পাড়ার কেউ পাত্তা দিত না। নীচু জাত বলে কথা। ওই পাতি লোকটার উপর চড়াও হলাম আমরা। খেদিয়ে দিলাম৷ আর ওর সেই টিনের বাড়িটুকু গুঁড়িয়ে দিয়ে কানু দত্ত পাড়ার ছেলেদের জন্য ক্লাবঘর বানিয়ে দিলো। 

- বেশি ভাবছ গুরু। এমনিতেও, ও জমি আদৌ হারুর নাকি?

- নয়, না?

- কানু দত্তর কাছে ও জমির কাগজ আছে৷ আমি অবিশ্যি চোখে দেখিনি। তবে শুনেছি আছে।

- হবে হয়ত। আমার কানে শুধু বাজছে ও বাড়ি ভাঙার সময় হারুর বউ আর দুই মেয়ের কান্না। 

- আজ পর্যন্ত তো অনেক বস্তিই আমরা ভেঙেছি গুরু৷ চোখের জল কি সে'খানে পড়েনি?

- তুই ভাবছিস আজ হঠাৎ এই ভজামাস্তান হারুর বউ মেয়ের কান্না নিয়ে ভাবতে বসল কেন? 

- ঠিক তাই ভজাদা। আমি ঠিক সে'টা ভেবেই ভেবড়ে যাচ্ছি। কেসটা কী?

- না না৷ আমি জাত গুণ্ডা, ওদের কান্না পাত্তা দেওয়ার মত নেকু আমি নই। কিন্তু শুধু একটা ব্যাপার আজ আমায় একটু ঘাবড়ে দিল রে মন্টে।

- কী ব্যাপার ভজাদা?

- চিরকাল জেনে এসেছি আমাদের গুণ্ডামিকে আর কানু নেতার নষ্টামিকে ভদ্রলোকেরা ঘেন্না করে। আমাদের ভয় পায় এ'টা ঠিক, এমন কী কানুদাকে সে ভদ্রলোকেরা ভোটও দেয়। কিন্তু মনেপ্রাণে ঘেন্না করে, কানুদাকে, আমাদেরও। অথচ এই হারুর টিনের বাড়িটা গুঁড়িয়ে বড় ক্লাবঘর তোলার ব্যাপারটাকে দেখলাম পাড়া ভদ্রজনেরাও প্রাণ খুলে বাহবা দিচ্ছে৷ যারা এদ্দিন আমাদের দেখলেই সরে পড়ত, আজ দেখলাম তারাই জড়িয়ে ধরছে। পাড়ার যে সুশীল মানুষজন কানু দত্তকে জোচ্চর বলত, তারাই দেখলাম আজ কানুকে মালা পড়িয়ে নতুন ক্লাবঘরে বরণ করে নিল।  

- ভদ্রলোকের ভদ্রলোকামি তোমায় ব্যথা দিচ্ছে ভজাদা?

- তাই হবে হয়ত।

- আমি আর কী জানি বলো। তবে শুনেছি হারুর ওই টিনের ঘরটার জন্য পাড়ার কালচার নষ্ট হচ্ছিল। দেখতেও বিচ্ছিরি। তার তুলনায় এই নতুন ক্লাবঘর টোটাল ঝিনচ্যাক। তাছাড়া রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যে হবে, ক্যারম কম্পিটিশন হবে; প্রচণ্ড কালচার কালচার একটা ব্যাপার হবে ভজাদা।

- তাই হবে হয়ত৷ জানিস মন্টু, কাল রাতের দিকে হারুদের দেখলাম। স্টেশন রোডের কাছের ওই শনিমন্দিরের চাতালে শুয়ে। হারুটাকে দেখে যা মনে হল গাঁজা টেনে উল্টে পড়ে। আর হারুর ছোট ছেলেটার বোধ হয় জ্বর। রবীন্দ্রনাথফাথে ওদের কিস্যু হবে না। ছোটোলোক তো৷  বিদেয় হয়েছে আপদ গেছে। আমি ছাতে যাই রে মন্টে।

- চলো, গুরু। আমিও ছাতেই যাই৷ দাঁড়াও, আগে মাদুরটা নিয়ে আসি গিয়ে। মদ মাংস না হয় আজ থাক।

No comments:

ধপাস

সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। বহুক্ষণ পর আমার পড়া একটা প্রবল 'ধপ...