Sunday, April 3, 2022

নাগরদোলা



হুড়মুড়, হইহল্লা, আলো ঝলমল; মেলার সন্ধ্যে যেমনটা হয় আর কী৷ অঙ্ক টিউশনের গুমোট কাটিয়ে একদল ছেলেমেয়ে সেই মফস্বলি মেলা চষে বেড়াচ্ছে৷ ঢাউস খানতিনেক চপের দোকান, সে'খানে সবচেয়ে সস্তা এবং হাই-সেলিং আইটেম হল আলুর চপ৷ ছাত্রসমাজে আলুর চপের ভূমিকা নিয়ে রীতিমত এস্যে লিখতে পারে অনি৷ কিন্তু ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রেদের সে'সব জরুরী বিষয়ে ভাবতে শেখায়না সিলেবাস৷
হাওয়াই মিঠাইয়ের চিনিগোলা ব্যাপারটা অনির তেমন পছন্দ নয়, কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে হাওয়াই মিঠাই হাতে খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি না করলে মেলা আলুনি হয়ে পড়ে৷ সে ব্যাপারটা প্রায় ডিসিপ্লিনের পর্যায় পড়ে৷ এ'ছাড়া রয়েছে বন্দুকবাজি, বেলুন ওড়ানোর হুল্লোড়৷ সস্তা মনকাড়া জিনিসপাতির দোকানও অজস্র, সে'গুলো ঘুরে দেখাটাও গুরুদায়িত্ব৷ তবে আলুর চপ আর বন্দুকে উজাড় হয়ে যাওয়ার পর আর টিউশনফেরত ছেলেমেয়েদের তেমন কিছু কেনাকাটির দম থাকে না৷ বড়জোর দু'একটা পোস্টার, সস্তা ম্যাজিকের রসদ৷ আর সামান্য কিছুটাকা বাঁচিয়ে না রাখলেই নয়; মেলার স্লগওভারঃ নাগরদোলা৷
টিউশনির ব্যাচের সকলেই নাগরদোলায় চড়বে৷ ঢাউস একখানা চাকায় খানকয়েক টিনের আলখাল্লা বাক্স ঝোলানো। দোলা ঘুরবে, বাক্সগুলো মচমচ করে দুলবে৷ চলন্ত বাসের জানালায় কনুই রেখে বাপ-মায়ের ধমক খাওয়া ছেলেমেয়েরা এই খতরনাক চাকায় ঘুরপাক খেয়ে ফুর্তি করে৷ তবে অনির ব্যাপারটা আলাদা। ট্রেনের আপার বার্থে উঠতে গেলে তার বুক কাঁপে, রেলিং ছাড়া সিঁড়ি দেখলে গলা শুকিয়ে আসে৷ কাজেই নাগরদোলা অনির ধাতে সয়না৷
কিন্তু সে'দিনকার ব্যাপারটা আলাদা। সস্তা রেক্সিনের মানিব্যাগে রাখা শেষ দশটাকার নোটখানা বের করে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেছিল অনি। কারণ তেমনটাই কথা ছিল।
- অনি! তুই এমন কাঠ হয়ে বসে আছিস কেন?
- কাঠ? ক..কই না তো দিব্যি তো। রি..রিল্যাক্স করছি।
- তোর ভয় করছে।
- ধ..ধুস। আসলে..এ'ভাবে বসলে ইকুলিব্রিয়ামটা নষ্ট হবে না। তাই।
- তোর গলা কাঁপছে।
- ন..না রে ঝুমি। খুব হাওয়া তো। খুব। প্লাস এই মুভমেন্টটা..সব মিলে তোর কানের মধ্যে যে ভাইব্রেশন হচ্ছে..।
- আর এই যে...তোর হাত বরফের মত ঠাণ্ডা..।
- হা..হাত?
- বরফের মত।
- ও। ও আমার বডি টেম্পারেচার একটু..একটু..কমের দিকে। থার্মোমিটারে নিরানব্বুই মানে..মানে আমার ধুম জ্বর।
- তুই ভালো করে চোখ খুলতে পারছিস না অনি।
- ম..মিঠে..মিঠে হাওয়া..আরামে চোখ বুজে আসছে..।
- তোর মুখ শুকিয়ে গেছে। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ঠিক করে তাকাতে পারছিস না। থামাতে বলব? চিৎকার করলেই হবে।
- ধ..ধুর..আমি তো ভাবছিলাম..আরও বার চারেক ঘুরব।
- এত ভয় যখন নাগরদোলায় উঠতে গেলি কেন?
- ভয়? ছোহ্! আমি..আমি দাবা খেলতে পারি এ'খানে বসে..ই..ইজি।
- তুই এত বড় গাধা কেন রে?
**
"অনি। কেমন আছিস?"
এই ফোনটা ছ'মাসে ন'মাসে একবার আসে অনির মোবাইলে। অফিস মিটিং, ডাক্তারের চেম্বার, বাজারঘাট; যে'খানেই থাক সে ফোন অনি ধরবেই। অবশ্য কথা বেশি দূর এগোয় না৷ কিন্তু বছর কুড়ি আগের সেই পাড়ার মেলার গন্ধ নাকে এসে ঠেকে; হাওয়াই মিঠাই, আলুর চপ মেশানো।
এই ফোনটা এলেই নাগরদোলায় বসা ধুকপুক ফেরত আসে। অনি টের পায় নিজের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।
তবে ভয়ের চোটে ঝুমির হাত টেনে ধরা আর নেই।
আছে শুধু অনির গলা-বুক শুকিয়ে যাওয়াটা।
আর আছে অনির তলপেট ফাঁকা হয়ে কথা বন্ধ হয়ে যাওয়াটা।
আরও একটা ব্যাপার উবে যায়নি। ফোন রাখার আগে ও'পাশ থেকে ভেসে আসা চাপা ধমকঃ "তুই এত বড় গাধা কেন রে"?
**
- অনি, আজ টিউশনির পর সবাই মিলে মেলায় যাব। তুই যাবি তো?
- সদাগোপান রমেশের পোস্টার পাওয়া যাচ্ছে মেলায়। রেয়ার। কলেক্ট করতে হচ্ছে।
- আমরা নাগরদোলায় চড়ব, কেমন? ওই ঢাউসটায়। একসঙ্গে। পাশাপাশি।
- নাগরদোলায়?
- হ্যাঁ। সবার সামনে তোকে আলাদা করব বলতে পারব না। চুপচাপ পাশে এসে বসবি।
- নাগরদোলাফাগরদোলা আমার পোষায় না।
- তুই ভয় পাস?
- ভয়? কী যে বলিস তুই ঝুমি। ব্যাপারটা অত্যন্ত জুভেনাইল। হাস্যকর।
- তুই এত বড় গাধা কেন রে?

No comments:

পুরনো লেখা