Friday, April 15, 2022

১৫২৯



- শুভ নববর্ষ ভায়া৷ 

- উফ, এই তুমি পিলে চমকে দেওয়া বন্ধ কর মাইরি৷ আরে বাবা আত্মা বলে কি নক করতে নেই? মিনিমাম ভদ্রতা না জানলে চলবে কেন? দুম করে শোওয়ার ঘরের ইজিচেয়ারে এসে বসাটা জাস্ট অসভ্যতা নয়?

- তুমি ভাই জ্ঞান দেওয়া বন্ধ করো৷ মড়াটি হয়েও দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছ, নলিহাড় চিবিয়ে ছাতু করছ, হপ্তায় তিনদিন রেস্টুরেন্ট ঘুরে ঘুরে প্রেম করছ; আর আমায় দ্যাখো৷ পয়লা বোশেখের দিনে ফ্যাফ্যা করে এ'দিক সে'দিক উড়ে বেড়াচ্ছি৷

- শরীর বয়ে বেড়ানোর ঝামেলা তো পোয়াতে হচ্ছেনা তোমায়৷ সংসার রোজগারের টেনশনও নেই৷ ফুড়ফুড়ুৎ করে উড়ে বেড়াও, গান গাও আর আমার কানের কাছে এসে টিপ্পনী ঝাড়ো। তোমারই তো সুখ ভাই৷

- আর কদ্দিন আমায় বাইরে ফেলে রাখবে বলো৷ তুমি তো আর অক্কা পাওনি৷ খামোখা আমায় সাইড করে এমন জম্বি হয়ে ঘুরে বেড়িয়ে কী লাভ৷ 

- এই শুরু হলো৷ বলি জ্ঞান দেওয়া শেষ হলে মানে মানে কেটে পড়ো৷ আমি লুচি তরকারি খাবো৷ শেষপাতে ক্ষীরকদম৷ 

- আমায় ফিরিয়ে নাও ভাই৷ আত্মা-লেস হয়ে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো৷ খাওয়াদাওয়া, মাইনে, দশ রকমের বারফাট্টাই; এ'সব করে আর কদ্দিন? ফ্রি উইল তো নেই৷ তুমি তো বাঁধা পড়ে আছো৷ কন্ট্রোলড বট! আমায় ফিরিয়ে নাও৷ বছরটা সত্যিই শুভ হোক।

- গেট আউট।

- তোমার চোখে আমি লোভ দেখতে পারছি ভাই৷ আত্মাকে আত্মস্থ করার লোভ৷ আমায় ফিরিয়ে নেওয়ার লোভ৷ প্রাণ খুলে গান গাওয়ার লোভ৷ গলা হেঁচড়ে প্রতিবাদ করার লোভ৷ ফিরিয়ে নাও না ভাই!

- নিকলো ইহা সে৷ ব্যাটাচ্ছেলে রাস্কেল! বেরোও!

**

- কী ব্যাপার হৃদয়হরণ? এমন হন্তদন্ত হয়ে..কিছু হয়েছে?

- আজ্ঞে, সবার আগে বলি নেতাবাবু ; শুভ নববর্ষ।  

- গোটা বছরটাই শুভ হে৷ দেশজুড়ে অপার শান্তি৷ দেশের প্রতিটা মানুষ আমাদের সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ সবাই সর্বক্ষণ গদগদ হয়ে আমার কথা ভেবে আমায় এবং সরকারের অন্য নেতানেত্রীদের কথা ভেবে মনে স্যালুট ঠুকে চলেছে৷ এমন সোনার সংসার, এমন হাইক্লাস ফাংশনাল ডেমোক্রেসি; শুভ না হয়ে উপায় কী বলো৷ 

- আজ্ঞে, সে তো বটেই৷ শুধু এই সোনার সংসারে একটা সামান্য খোঁচা৷ 

- সে কী! কার এত দুঃসাহস? 

- আজ্ঞে, কলকাতার সাত নম্বর মদন মল্লিক স্ট্রিটের ভবেশ দত্ত৷ 

- পাতি লোকের খবরে আমার কী কাজ ভাই হৃদয়হরণ?

- লোকটা পাতি৷ তবে তাঁর আত্মাটা মহাছ্যাঁচড়া৷ মাঝেমধ্যেই ভবেশ দত্তর আত্মা ওর বডিটকে এসে উস্কে যাচ্ছে৷ আজ  পয়লা দেখে সকাল সকাল এসে হানা দিয়েছিলে৷ আত্মা বডিতে ঢুকতে চাইছে৷  ভবেশ দত্তর বডিও রেস্পন্ড করতে শুরু করেছে৷ 

- আত্মা বডিতে ঢুকতে চাইছে? বডি নরম হয়ে আসছে? কী সর্বনাশ! তা'হলে সরকারকে দিনে বাহাত্তরবার স্যালুট ঠুকবে কে? আজ এক ভবেশ দত্তর আত্মা বিট্রে করছে৷ কাল গোটা কলকাতা৷ পরশু গোটা দেশ৷ সমস্ত বডি তারপর আত্মা ফিরে পেয়ে নাচুক আর কী! তারপর ফের রাস্তায় প্রতিবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ায় হইহই৷ সরকার ডকে তুলতে চাও হৃদয়হরণ? 

- আজ্ঞে, সে'টা রিপোর্ট করতেই আসা। তা'হল কী..।

- ভবেশ দত্তর আত্মা যাতে ফেরার জন্য বডি না পায় সে ব্যবস্থাই করো হে৷ পলিটিকাল প্রটেস্টের মামদোবাজি আর সহ্য হবে না৷

- যো হুকুম ভাগ্যবিধাতা। যো হুকুম৷ ভবেশ দত্তের পাকাপাকি ব্যবস্থা করে ফেলছি৷ তবে ইয়ে..।

- আবার কী..।

- নববর্ষের দিনে৷ যদি অভয় দেন, একটা আর্জি ছিল..।

- আর্জি? 

- আজ্ঞে, আত্মা হিসেবে আমি তো আর ভবেশ দত্তর আত্মার মত বেআক্কেলে নই। তবে একটা বিশ্রী শখ..।

- শুনি৷

- কদ্দিন শরীরের মধ্যে সেঁধিয়ে পৃথিবীটাকে দেখিনা৷ আমিও তো, আপনারই মধ্যে ছিলাম। অন্তত যদ্দিন না আপনি সরকারের মাথায় এসে বসেছেন৷ তদ্দিন তো..। আত্মা হিসেবেও আমি ক্ষয়ে গেছি৷ আমার দ্বারা প্রতিবাদটাদ আর হবে না৷ তাই, আজকের দিনটা কি আপনার মধ্যে ঢুকে যাব? একটু কবিতাটবিতাই পড়ব না হয়। ছোট ছেলেমেয়েদের দেখলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেব। সন্ধ্যেবেলা ছাতে বসে চা-মুড়ি খাব। শুধু এই নববর্ষের দিনটা! সুযোগ দেবেন? আমি তো আর অন্য কেউ নই৷

- তোমার ওপর আমার মায়া একটু আছে হৃদয়হরণ! একটু আছে৷ 

- চান্স দেবেন তা'হলে?

- তুমি এ'খানে একটু দাঁড়াও৷ আমি ভিতরের ঘর থেকে একটা জরুরী কাজ সেরে আসি৷ তারপর তোমার একটা হিল্লে করা যাবে। কেমন?

- যেয়াজ্ঞে৷ 

**

বহুক্ষণ অপেক্ষার পরেও যখন নেতা ঘরের বাইরে বেরোলেন না, আত্মা হৃদয়হরণ উশখুশ করে উঠলেন৷ বেলা বয়ে যাচ্ছে, অনেক কাজ পড়ে৷ দু'একবার হাঁক দিয়েও কোনও সাড়া পেলেন না৷ তবে আত্মাদের বেজায় সুবিধে, দরজা-টরজার মত ঠুনকো বাধায় আটকে যেতে হয়না৷ একরাশ হাওয়া হয়ে হুশ করে নেতার ঘরে ঢুকে পড়লেন হৃদয়হরণ।  দেখলেন, নিজের সুপরিচিত দেহটা সিলিংফ্যান থেকে ঝুলছে৷

No comments:

পুরনো লেখা