Sunday, April 3, 2022

হুতোমবাবু ও দাদা

- দাদা, হয়ে গেছে।
- হয়ে গেছে হুতোম?
- ঘরদোর সাফসুতরো। বাসনপত্র মেজে রেখেছি৷ বাথরুমের চারটে বালতিতে জল ভরে রাখা আছে৷ তোমার ওষুধের স্টক রিফিলিড৷ ডিনারে আলু পটলের তরকারি আর মাগুরের ঝোল৷ ফ্রিজে রাখা আছে৷
- তুই প্রতিবারই বড্ড বেশি পরিমাণে রেঁধে যাস৷ শেষে দু'বেলা ধরে খেতে হয়৷
- এমন হাইক্লাস রেঁধেছি দাদা, কম পড়লে হাত কামড়াতে।
- তোর তুলনা নেই হুতোম। তুই মার্ভেলাস।
- দাদা, এ'বার আমি আসি?
- বেরোবি?
- বেরোব না? সাতাটা বাজে৷ ট্যাক্সি নিলেও ফিরতে ফিরতে সেই রাত ন'টা৷ টিভি সিরিয়াল মিস হয়ে যাবে দাদা।
- শোন না হুতোম, আজ থেকেই যা না৷
- থেকে যাব? তা হয়না৷
- অদ্ভত গোঁয়ার গোবিন্দ তুই৷
- এ'টা গোঁয়ার্তুমি? যে বাড়ি থেকে বাবা আমায় তাড়িয়ে দিয়েছে, সে বাড়িতে আমি রাত্রিবাস করব? নেভার৷ দ্যাখো দাদা, আমি আসি তোমার টানে৷ একা মানুষ, অসুস্থ৷ মায়ের পেটের ভাই না দেখলে আর দেখবেটা কে৷ কিন্তু তুমি আমায় রাত্রিবাস করতে বলবে না৷ খবরদার।
- বাবা বুড়ো বয়সে অভিমানে কী না কী বলেছে, তার জন্য ভিটেমাটি ছেড়ে দিবি?
- বুড়ো সাংঘাতিক ধান্দাবাজ ছিল৷ সবে হিসেব করে বলেছে৷ আমায় স্ক্যান্ডালকুমার আর গবেটগ্যাম্বলার বলে খোঁটা দেওয়া? না হয় নিজের মাইনের দু'পয়সা জুয়ায় উড়িয়েছি৷ তার জন্য একটা দামড়া লোককে মাঝরাতে বাড়িছাড়া করবে?
- বাবা একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিল বটে৷ কিন্তু যে বেঁচে নেই, তার ওপর রাগ পুষে রাখবি রে?
- দাদা, আসি৷ আর এ'বার আয়া চেঞ্জ করো দেখি৷ এত কামাই করে। রোজ রোজ তো আর এদ্দূর ছুটে আসা সম্ভব হয়না৷
**
হুতোমবাবু সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে সামনের পানদোকান থেকে একটা খয়ের ছাড়া সাদা পান কিনে মুখে দিলেন৷
দাদাকে দেখতে এসে প্রতিবারই রান্নাঘরে ঢোকেন তিনি৷ নিজের হাতে দাদাকে রেঁধে খাওয়ানোর যে আনন্দ৷ আহা৷ বাবার কথা মনে পড়ে৷ হুতোমের হাতের রান্না পেলে বাবা রেস্তোরাঁর খাবারদাবারও পাশে সরিয়ে রাখতেন৷ কতবার মাকে ঠেস দিয়ে বাবা বলেছেন, "তোমার ছোটছেলের থেকে রান্নার টিপস নিলে পারো তো"৷ মা মিচকি হাসতেন; বড় নরম মানুষ ছিল মা৷ বড় মায়ার৷
প্রত্যেকবার বাড়ি ফিরে দাদার জন্য মনপ্রাণ দিয়ে রান্না করেন হুতোম। প্রতিবার দুটো মানুষের জন্য রান্না করেন। কতবার মনে হয় "আজ থেকেই যাব। দুই ভাই মিলে এঁটো হাতে গপ্প জুড়ব"। কোনওবারই থাকা হয়না।
তবে হুতোমবাবু নিশ্চিত, একদিন ঠিক তিনি টিভি সিরিয়ালের টানে হুড়মুড় করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন না। দু'জনের জন্য করা রান্না দাদাকে দু'বেলা জুড়ে একলা খেতে হবে না।

No comments:

পুরনো লেখা