Sunday, July 18, 2021

হোয়্যাটস্যাপিস্টস



পেল্লায় হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপগুলো দাঁড়িয়ে আছে দু'ধরণের মানুষের কাঁধে ভর দিয়ে৷ 

প্রথম দল সর্বক্ষণ 'মডারেট' করে চলেছে৷ 'ডিসিপ্লিন' নিয়ে তারা সর্বক্ষণ শশব্যস্ত৷ তাদের ধারালো দৃষ্টি এড়িয়ে গ্রুপে হাওয়াও বইতে পারেনা। রাজ্যশাসনের ভার তাদের হাতে৷ কড়া ধমক, শ্লেষ, বিরক্তি আর নিয়মকানুন বানানোর হুজুগ; এ'সব মিলিয়েমিশিয়ে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখছে তারা৷ তারা নিয়মিত চাবুক কষাচ্ছে;

"দেখুন মিস্টার দত্ত, ফরওয়ার্ড মেসেজ পাঠাতে হলে অন্য গ্রুপে যান৷ এই গ্রুপ একটা সিরিয়াস পারপাস নিয়ে তৈরি হয়েছে, এ'সব ছেলেমানুষি যেন এ'খানে না দেখি"৷ 
মিস্টার দত্ত চোরাই সোনার বিস্কুট সমেত ধরা পড়লেও বোধ হয় এত ভেবড়ে যেতেন না। 

"এই যে, সাহাবাবু! আপনাকে কতবার বলেছি গুড মর্নিং মেসেজ পাঠাবেন না৷ গ্রুপ মেম্বারদের মোবাইলে স্পেস নষ্ট হচ্ছে৷ আপনাকে অনুরোধ করা হচ্ছে গ্রুপ কন্সটিটিউশনটা আর একবার পড়ে দেখতে"।
সাহাবাবু আজ পর্যন্ত খবরের কাগজের প্রথম পাতাখানা ছাড়া কিছু পড়ে দেখেননি৷ গ্রুপের কন্সটিটিউশন যে আছে তাই তিনি জানেন না, জানবেনও না৷ হোয়্যাটস্যাপের কড়া মেমোটিও তিনি পড়বেন না৷ পরের দিন ফের সকাল সাড়ে ছ'টায় টুং শব্দে গ্রুপ মডারেটরের ঘুম ভাঙাবেন ভদ্রলোক; গোলাপের ছবির ওপর লেখা থাকবে "শুভ সকাল বন্ধুরা"৷ 

"বঙ্কুবাবু আর অমিয়বাবু৷ আপনাদের ভাষা এ গ্রুপের পরিবেশ নষ্ট করছে৷ ঝগড়া করতে হলে পাড়ার মোড়ে দেখা করুন। অথবা নিজেদের মধ্যে ডায়রেক্ট মেসেজ চালাচালি করে খেউড় চালিয়ে যান৷ নয়ত আমর বাধ্য হব আপনাদের গ্রুপ থেকে এস্কপেল করতে"। 
ইন্টারনেট ঝগড়ার বড় হাইভোল্টেজ ব্যাপার, সে মায়া কাটানো অসম্ভব৷ মাঝেমধ্যেই শক্তির কবিতার লাইন শেয়ার করা বঙ্কুবাবু মডারেটরের কাছা খুলবেন; "গ্রুপটা তোর বাপের সম্পত্তি নাকি রে শালা"? অমিয়বাবু এক ধাপ ওপরে গিয়ে, "এমন ফোঁপরদালালের গ্রুপে আমি ইয়ে করি" বলে স্যাট করে গ্রুপত্যাগ করবেন৷ 

আর একদল মানুষ হল হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপের আদত লক্ষ্মী।  মডারেটর আর গ্রুপ-জ্যাঠাদের ডিফেন্স হেলায় উড়িয়ে তারা শুধু ফরওয়ার্ড খেলে যায়৷ এই পাঠালো মাজার বোতলে এবোলার গল্প, পরক্ষণেই চীনের প্লাস্টিক ডিমের কারখানার ওপর ডকুমেন্টারি, তারপরেই পলিটিকাল মীম বা এমন খবর যার গাঁজাখুরিত্ব পাঁচ বছরের খোকাও ধরে ফেলবে- এ'ভাবে একটানা অক্লান্ত ভাবে তারা গ্রুপ গুলজার করে রাখে৷ মডারেটর ধমক, সৎ মেম্বারের শুধরে দেওয়ার প্রচেষ্টা, ভূমিকম্প,  ঝড়,; কোনও কিছুই এদের রুখতে পারেনা৷ মাঝেমধ্যে 'সরি'ও বলে ফেলে এরাঃ

"ওহ হো, ফরওয়ার্ডটা আমি পাঠাইনি৷ আমার ভাইপোর হাতে ফোন ছিল তো, সেই ব্যাটা...(জিভ বের করা স্মাইলি-সহ)"৷ অবশ্যই পরের দিন ফের ফরওয়ার্ড চালু করবেন। 

"তাই কি? এ খবরটা গুজব? ওহ, আমি বুঝতে পারিনি৷ ক্ল্যারিফাই করে দেওয়ার জন্য থ্যাঙ্কিউ"৷ বলেই গুজব ব্রডকাস্টার অন্যান্য গ্রুপে সে গুজবই ফরওয়ার্ড করবে৷ 

এই হলো এ যুগের সবচেয়ে ধারালো ইডিওলজিকাল যুদ্ধ৷ ডিসিপ্লিনবাজরা কমল মিত্তিরের মত পাথুরে এবং হিমশীতল। অন্যদিকে ফরোয়ার্ডিস্টরা মাতাল কবি; অনিল চ্যাটুজ্জ্যে ঘরানায়৷ কবিতা এবং যশ চোপড়ার মহব্বতের নিয়ম মেনেই ডিসিপ্লিনকে মাথা নীচু করে সরে পড়তে হবে৷ প্রতিটা সৎ  হোয়্যাটস্যাপ গ্রুপ হিজবিজ মেসেজের সমুদ্রে ভেসে যাবে আর নিয়মকাকুকাকীমারা যন্ত্রণায় ছটফট করে হদ্দ হয়েও বিপ্লবের স্বপ্ন ত্যাগ করবেনা; এই ভিসিয়াস সাইকেল থেকে বেরোনো অসম্ভব৷

No comments:

পুরনো লেখা