Tuesday, July 13, 2021

ক্রিকেটের তুকতাক




নিজের মুখে নিজের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো প্রসঙ্গে ফলাও করে কিছু বলতে চাই না, তাই বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে৷ তবে তার আগে একটা মিথকে ধ্বংস করা দরকার৷ অনেক প্রাচীনপন্থী কূপমণ্ডূক ক্রিকেট ভক্তদের ধারণা যে ক্রিকেটের যাবতীয় হিসেবনিকেশ তৈরি হয় বাইশ গজ বা তার আশেপাশে; ব্যাট, বল অথবা জিঙ্ক অক্সাইড সহযোগে৷ ব্যাপারটা যে আদৌ সে'রকম কিছু নয়৷ ক্রিকেটে তন্ত্রমন্ত্র এবং তুকতাকের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে৷ না না, আমি খেলোয়াড়দের মাদুলি বিশ্বাসকে পাত্তা দিচ্ছি না, ব্যাট আর বল ছাড়া সত্যিই তাদের কোনও অস্তিত্ব নেই৷ কিন্তু সমর্থকদের তুকতাক যে যে কোনও ম্যাচের ভোল পালটে দিতে পারে; এ অমোঘ সত্য যে অস্বীকার করে তার মাথায় পড়ুক বাজ, বিরিয়ানিতে পড়ুক নকুলদানা, ইত্যাদি৷ কেউ এক চেয়ারে সাড়ে চার'ঘণ্টা ঠায় বসে থেকে প্রিয় দলের ফলো-অন আটকান, কেউ একটানা পেনিসিল চিবিয়ে উইকেট ফেলে দেন, কেউ টিভির সামনে থেকে উঠে গিয়ে নিজেকে শহিদ করেন রিকোয়্যারড রান রেট সামাল দিতে, কেউ আবার নিজের প্রিয় ব্যাটার অপয়া সংখ্যক রানে পৌঁছলে "সরি লেনিনদা" বলে গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করে থাকেন ফাঁড়া কাটানোর জন্য৷ আর আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ'সব তুকতাকেই আদত এস্পারওস্পার ঘটে; মাঠের খেলোয়াড়রা স্রেফ দাবার ঘুঁটি৷

এক একজনের তুকতাকের অস্ত্র এক এক রকম৷ অর্জুন গাণ্ডিব দিয়ে মাঠ কাঁপালে ভীমের পছন্দ গদা৷ আর ক্রিকেট সমর্থক হিসেবে আমি চিরকাল ব্যবহার করে এসেছি Pessimism বা নৈরাশ্যবাদ। ভারী কাজের জিনিস, যেমন ধারালো তেমনি, তেমনি কাব্যিক৷ ফিলোসোফিটা বেশ সোজাসাপটা,  ভবিতব্যের কাছে এমন নাকিকান্না জুড়তে হবে যে ভবিতব্য নিজেই ঘাবড়ে গিয়ে ভুলচুক করে ফেলবে৷ ক্রিকেটিয় নৈরাশ্যবাদ নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলকে আমি বহু যুদ্ধে উতরে দিয়েছি৷ তার জন্য কোনও রকম অমরত্ব বা খ্যাতির প্রত্যাশা বা দাবিদাওয়া আমার নেই৷ একজন ক্রিকেট সৈনিক হিসেবে আমার কাজ শুধু লড়ে যাওয়া, মাঠের এগারোজনকে জেতাতে পারলেই আমি তৃপ্ত৷ আপনার প্রশ্ন করতেই পারেন, পেসিমিজমের যদি অতই তেজ হবে, তা'হলে ভারতীয় ক্রিকেট সব ম্যাচে জিততে পারে না কেন? উত্তরটা একটু ঘুরিয়ে দিতে হবে, শচীন তেন্ডুলকার সব ম্যাচে সেঞ্চুরি করতে পারেনি বলে তো তাঁর স্কিলসেটকে উড়িয়ে দেওয়া যায়না৷ 

নৈরাশ্যবাদ ব্যাপারটা ঠিক কেমন ভাবে ক্রিকেট তুকতাকে সাহায্য করে? বুঝিয়ে বলতে হলে ২০০২ সালের ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের অভিজ্ঞতাটা ঝালিতে নিতে হয়৷ ম্যাচ শুরুর আগে থেকেই প্রবল নাকিকান্নায় দুনিয়া ভাসিয়ে দেওয়ার উপক্রম করেছিলাম। "ইন্ডিয়া ফাইনালে বরাবর হারে, ইংল্যান্ডের হোম-অ্যাডভান্টেজ, আমার বাঁ হাতের কনুইতে একটা সুড়সুড়ে অস্বস্তি, খেলা শুরুর আগেই আমি পান্তুয়া খেয়ে ফেলেছি আর আমি পান্তুয়া খেলেই ইন্ডিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে", ইত্যাদি ইত্যাদি৷ প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড যখন কয়েক হাজার রান (ওই তেমনই কিছু একটা মনে হয়েছিল) তখন অবশ্য নাকিকান্নার নেকুপনা ঝেড়ে ফেলে বুক বাজিয়ে হাহাকার করতে পেরেছিলাম; "এরা খেলতে যায় কেন? ইংল্যান্ডে না গিয়ে কিনিয়ায় গেলেই পারত! ভাগ্যিস ওয়ানডেতে ইনিংস ডিফীটের গল্প নেই৷ আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি ভারত দু'শোর কমে বান্ডিল হবে" ইত্যাদি ইত্যাদি। 

ওই হাহাকারের জেরে যে'টা হল সে'টা হল ভারত ব্যাট করতে নেমে দিব্যি শুরু করল৷ সৌরভ দিব্যি স্টেপআউট করছে, আর কনেক্ট করছে৷ ব্যাস, আমি ধুন্ধুমার চালু করে দিলাম; "এ বাবা, ক্যাপ্টেন হিসেবে কোনও সেন্স নেই? এমন আনতাবড়ি চালাচ্ছে? আর এমন ল্যালল্যাল করে চালাচ্ছে কেন? আমি চ্যালেঞ্জ করব বলতে পারি এখুনি আউট হবে"।    শেওয়াগও ফুরফুরে মেজাজে খেলতে শুরু করেছে৷ দশটি ওভার পার, ছয়ের ওপর রানরেট৷ আমি ডোজ বাড়িয়ে দিলাম; "শেওয়াগের কোনও গেমসেন্স আছে নাকি? ধুর ধুর৷ এই ডোবালো, আমি লিখে দিচ্ছি"৷ চোদ্দ ওভার নাগাদ একশো উঠে এলো৷ ব্যাট সৌরভ-শেওয়াগের হাতে কিন্তু চালিয়ে খেলতে হচ্ছে আমাকেই৷ সাধ্যমত চেষ্টাও করছিলাম, গলা চড়িয়ে বললাম "গেমপ্ল্যানের অভাব। স্পষ্ট দেখতে পারছি"। কিন্তু এত করেও গোলমালটা রোখা গেল না৷ 

সৌরভ আউট হল দলের ১০৬ রানে। ১১৪য় শেওয়াগ। ১২৬য়ে দীনেশ মোঙ্গিয়া৷ আমি হাঁ, মাথা ফাঁকা৷ দ্রাবিড় আর শচীনকে খেলাতে হলে পেসিমিজমের বন্যা বইয়ে দিতে হবে, কিন্তু কোমর বেঁধে 'সব জলে গেল, ডকে উঠল, অক্কা পেল' বলে কাঁদুনি গাওয়ার আগেই দু'টো খতরনাক থাপ্পড়; ১৩২য়ে দ্রাবিড় গায়েব আর ১৪৬য়ে শচীন হাওয়া৷ কে এক পাড়ার পুজোর চাঁদা তোলা ছোকরা রনি ইরানি আর  জাইলস মিলে সব গুলিয়ে দিল। 

বুক ভেঙে চুরমার৷ সামনে টিভি চলছে, বাবা হতাশায় পায়চারি করছে, মা বলে চলেছে " নতুন ছেলে দুটো কী সুন্দর খেলছে, দ্যাখ"৷ আমার সব কিছুতেই বিরক্ত লাগছে৷ ঘরের পর্দার খয়েরী রঙ দেখে বিরক্তি, বাবার পায়চারীতে বিরক্তি, মায়ের একের পর এক প্রশ্নে বিরক্তি (যুবরাজ বোধ হয় আমাদের বাপতুর বয়সী হবে, তাই না? কাইফকে দেখেই মনে হয় খুব শান্তশিষ্ট,  তাই না? লর্ডসেই সৌরভ প্রথম সেঞ্চুরিটা করেছিল না)। পরে বুঝেছিলাম, আমার যেমন নৈরাশ্যবাদ, মায়ের ক্রিকেট তুকতাকের অস্ত্র হল লাখ লাখ কোটি কোটি প্রশ্ন৷ আর বাবার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট হয় পায়চারিতে। তা মায়ের প্রশ্নের স্টেনগান আর বাবার সতেরোশো মাইল হাঁটাহাঁটির ফলে ভারত ২০০ পেরিয়ে গেল৷ যুবরাজ আর কাইফ সেট। 

আমি নড়েচড়ে বসলাম৷ বুকে সামান্য আশার আগুন জেগে উঠেছিল, তড়িঘড়ি সে আগুনের ওপর গ্যালন গ্যালন পেসিমিজমের জল না ঢাললেই নয়৷ 
"আরে ধুর ধুর, শচীন দ্রাবিড় গেল তল, যুবরাজ কাইফ বলে কত জল"।
" বড়জোর আড়াইশো করবে৷ গোহারান হারটা রুখে দেবে। লজ্জাটা একটু কম হবে৷ এ'টাই যা"।
"যুবরাজের ডিফেন্সে প্রচুর ফাঁকফোকর৷ আর কাইফের হাতে বড় শট আছে বলে মনে হচ্ছে না"। 

একসময় যুবরাজের হাফসেঞ্চুরি হল, ভারতের জিততে একশো'র কম রান দরকার৷ " জলে জলে, সব জলে"; আমার ফেভারিট ডায়লগ। এক কথায় সব উড়িয়ে দেওয়া যায়৷ 

আড়াইশো পেরোল। কাইফের পঞ্চাশও হল৷ "ধুর ধুর, এই গেল বলে৷ এ'সব সিচুয়শনে নাসের হুসেন ম্যাচের রাশ আলগা হতে দেবে ভেবেছ? এই ফাইনাল হুসেনের পকেটে রাখা মানিব্যাগে- পুজোর ফুল, ট্রেনের মান্থলি আর অফিসের আইকার্ডের পাশেই রাখা আছে৷ 

যা হওয়ার তাই হল৷ মাখনে ছুরি চালাতে চালাতে আচমকা সে ছুরি বুকে উঠে এলো; যুবরাজ আউট, কলিংউডের খুচরো বোলিংয়ে৷ 

"কফিনে শেষ পেরেক", ডিক্লেয়ার করলাম। বাবা ফের সোফা ছেড়ে উঠল৷ মা প্রশ্নে ফিরে গেল, " যুবরাজ সত্যিই আউট হয়ে গেল রে? যুবরাজ কি কাঁদছে"? 

এরপর গোটা ব্যাপারটাই একটা ঝড়ের মত ঘটে গেল৷ উত্তেজনা যত বাড়ছে, আমি তত পেসিমিজমের গুঁতোগুঁতি চালিয়ে যাচ্ছি৷ 

কাইফের ওভারবাউন্ডারি৷ ঘ্যাম কভার ড্রাইভ৷ গফ ঘেঁটে ঘ৷ জিততে হলে পঞ্চাশেরও কম দরকার। আমি বলে চলেছি, "এর চেয়ে কোনও মেগা সিরিয়াল দেখলে ভালো হত"। 

কাইফ চালিয়ে খেলছে৷ লোয়ার অর্ডারে হরভজনও টুকটাক চমকে দিচ্ছে৷ আমি দূর্গ আগলে রেখেছে, "আচ্ছা ডোবালে দেখছি এরা"৷ 

স্যাটাস্যাট হরভজন আর কুম্বলে আউট৷ হাতে হারাধনের দু'উইকেট৷ তবে রানও বেশি নয়, খান বারো৷ কাইফ ততক্ষণে বলের বদলে চালকুমড়ো দেখছে৷ কিন্তু আসল দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে; পেসিমিজমের স্লগওভার। 
"তিনশো করেছে এই অনেক"। "জাহির আবার ব্যাট ধরতে শিখলো কবে"। "আর দেখে হবেটা কী৷ চ্যানেল ঘোরাও বাবা, নিউজ দেখা যাক"। 

ওই যে বললাম। হাইক্লাস নাকিকান্নায় ভবিতব্যকে দিব্যি টলানো সম্ভব৷ ওভারথ্রোয়ে শেষ রান তুলে নেওয়ার আড়াই সেকেন্ড আগে পর্যন্ত বলে গেলাম, " ইম্পসিবল। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি হারছি৷ বন্ড পেপারে লিখে দিতে পারি দরকার হলে"৷

ভালো পার্ফর্মেন্সের মূলে রয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন মনসসংযোগ ; ক্রিকেট তুকতাকও একটা পার্ফর্ম্যান্স। সৌরভ যখন জামা খুলছে তখনও আমি বিড়বিড় করে বলে চলেছি, "স্কোরবোর্ডটা ঠিকঠাক চলছে কিনা কে জানে৷ বলা তো যায় না, যদি কিছু ভুলচুক হয়ে থাকে"৷ আর মায়ের প্রশ্ন সিরজিও তখনও থামেনি, "এহ হে, খালি গায়ে ও'ভাবে হাওয়া লাগাচ্ছে?  বুকে ঠাণ্ডা বসে যাবে না তো"?

1 comment:

শান্তনিক বসাক said...

সেদিনের যুবরাজ আর কাইফের মতই আজও চালিয়ে খলেন থুড়ি লেখেন আপনি..... মোটামুটি প্রতিটাই ওভার বাউন্ডারি, মাঝে সাঝে দুএকটা বাউন্ডারি হয় ....

পুরনো লেখা