Sunday, June 3, 2018

শশীবাবু কলি



শশীবাবু; বিহারের গ্যাস প্ল্যান্টের শ্রমিক। ট্রাকে গ্যাস সিলিন্ডার লোড আর আনলোড করতেন। ষাটোর্ধ, ছিপছিপে তামাটে দেহ, ধবধবে সাদা চুল, পাকানো গোঁফ। মুখে সবসময় নারকোল সন্দেশের গুঁড়োর মত হাসি লেপ্টে। সিলিন্ডার ওঠানো নামানোর মাঝে যে'টুকু ফাঁকা সময়, সে'টুকু মিহি গল্পগুজবে কাটাতেন। সমস্ত শ্রমিকদের মধ্যে শশীবাবুর উপস্থিতি যেন একটু বেশি উজ্জ্বল; শান্ত। ধর্মপ্রাণ, ধর্মভীরু নন। লোডিং-আনলোডিংয়ের কাজ টাকার দরকারে করতেন তা নয়; তার দুই ছেলে কর্মরত, ঘরে এবং গ্রামে তাঁকে সকলেই বেশ সমীহ করে চলে; ভালোবাসে। ছেলেরা মাঝেমধ্যে সকাতরে অনুরোধ করে বলে 'বাবা, এ'বারে ঘরে জুত করে বসুন। দিনের বেলা পাড়া ঘুরে বেড়ান, সন্ধ্যে হলে রামায়ণের বই খুলে আসরের মধ্যমণি হয়ে উঠুন'। শশীবাবু হেসে বলেন 'আমি ছেলেদের বলে দিয়েছি, আমার রামায়ণ হল সিলিন্ডার লোডিং আর মহাভারত হল সিলিন্ডার আনলোডিং। এ বয়সে ধর্মত্যাগ করতে পারব না রে'।

সেই শশীবাবুর বলা একটা কথা চিরকাল আমার সঙ্গে রয়ে যাবে।
"কলিযুগের ব্যাপারটা জানেন তো বাবু? আমাদের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে ঘেন্না তৈরি হচ্ছে। অনবরত। যে ঘেন্নায় মনে হয় আমি সহজেই আর একজনের টুঁটি ছিঁড়ে ফেলতে পারি। যে ঘেন্নায় মনে হয় অন্যের চামড়ায় পোকা পড়ুক। তেমন ঘেন্না। আর কলির খেল সেখানেই; এই ঘেন্না একটা নেশার মত হয় দাঁড়াবে। জীবনে যথেষ্ট ঘৃণা অনুভূত না হলে আমরা ছটফট করে বেড়াব, হন্যে হয়ে খুঁজব নতুন কারণ; যদি কোনোভাবে পাশে বসা মানুষটার মৃত্যুকামনা করে বুকের জ্বালা জুড়িয়ে নেওয়া যায়"।

শশীবাবুর কলিযুগ থিওরিটা মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে। দিব্যি এগিয়ে চলেছি আমরা সেই দিকে।

রাজনৈতিক মতামত এ'দিক ও'দিক হলে মনে অন্য পক্ষের মানুষগুলো জ্বলেপুড়ে গেলে দেশটা শান্ত হবে।
অন্যের প্রিয় লেখকের লেখা আমার বিশ্রী লাগলে মনে হয় সে ভক্তের চোখে গরম শিক ঢুকিয়ে দিলে সামান্য শান্তি জুটবে।
অন্তত তর্কের সময়টুকু মনে হয়ই; "ব্যাটাচ্ছেলের মরণ হয় না কেন?

একদিকে ভাষার তফাতে দমবন্ধ হয়ে আসে।
ধর্মের তফাতে লাশ ছড়িয়ে দেওয়া তো জলভাত।
অন্য দিকে পর্যাপ্ত জল নেই।
যথেষ্ট ভাত নেই।
বুক ভরে দম নেবার মত বাতাস নেই।

ভাবলে হাড়হিম হয়ে আসে যে আমার খোকার প্রতিও কেউ কোনোদিন এমন রক্তচক্ষু শানাতে পারে, সামান্য যে কোনো তফাতের সূত্র ধরে।

আর মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে এই ভেবে যে নিজের অজান্তেই খোকার মধ্যে এমন কোনো ঘৃণা ইঞ্জেক্ট করে দিচ্ছি না তো যে বিষের প্ররোচনায় খোকা এমন রক্তচক্ষু আয়ত্ত করে নেবে?

No comments:

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...