Sunday, March 4, 2018

এ'বারের পুরী

১।

ভিড় মিনিবাসের হঠাৎ জানালা পাওয়ার যে শিউলি সুবাস,
ঘাটের নিরিবিলিতে আঙুলে আঙুল আড্ডার শেষে টিউশনি পড়তে গিয়ে ফতুয়ার বুক পকেটে পড়ে পাওয়া দু'টো খোসা ছাড়ানো বাদামের যে স্বাদ,
কপালে ঠেকে থাকা রিভলভারের ইস্পাত শীতল নল আচমকা সরে যাওয়ার যে স্বস্তি,
ঘি, তেল, শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে মাখা আলুসেদ্ধর গা বেয়ে ওঠা মুসুরির ডালের ঢেউয়ে যে ওম,
কয়েক হাজার অফিসের বকলসি ফোন-কলেরর ফাঁকে টুক করে সেঁধিয়ে যাওয়া "শালা বেঁচে আছিস না ফোটফ্রেমে দোল খাচ্ছিস" মার্কা ক্রিংক্রিংক্রিংয়ের যে আশ্বাস,
সাতপুরনো সঞ্জীব উপন্যাস সমগ্রের মধ্যে পোস্ট না করা গোপন প্রাগৈতিহাসিক পোস্টপকার্ডের যে হাড়হিম করা উঁকি, 
ছোটবেলার পড়ার ফাঁকে বাবার অফিস ফেরতা স্কুটারি ঘর্ঘর শুনতে পাওয়ার যে লজেন্স-নিমকি মার্কা উচ্ছ্বাস;

সেই সমস্ত "আরিব্বাস"য়ের টুকরো মিলেমিশে পুরী এক্সপ্রেসের সাইড আপারে টিকিট কনফার্ম হয়। অমনি পাতি মানুষের কলজের কয়েক টুকরো ফানুষ হয়ে উড়ে যায়, সে উড়ে যাওয়াগুলো প্রেমিকাদের ছাড়া কারুর চোখে পড়তে নেই।

২। 

নিজেকে কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ মনে করলেই মন্টুবাবুর যাবতীয় মনভার লাঘব হয়ে যায়। পরিবারের যে কোন থেকে সার্ভিস রিকুয়েস্ট এলেই "আপকা কল হামারে লিয়ে মহত্ত্বপপূর্ণ হ্যায়" মোডে চলে যান ভদ্রলোক। কোনও গণ্ডগোল পাকালেই মন্টুবাবুর গলায় নেমে আসে "আপ কি অসুবিধা কে লিয়ে হম সমা চাহতে হ্যায়"য়ের গন্ধরাজ লেবু মার্কা সুবাস। আর অভিমান জমলেই নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি, তার চারপাশে তখন "হমারে কাস্টমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ কিসি দুসরে কল মে ব্যস্ত হ্যায়। কৃপয়া লাইন পে বনে রহে ইয়া কুছ দের মে দোবারা কল কিজিয়ে" গোছের অদৃশ্য খোলস।

গোটা বছরের কাস্টোমার সার্ভিসিং শেষে এক তিতিবিরক্ত মন্টুবাবু প্রতি ডিসেম্বরে একবার পুরী আসেন। 

একা। এক হপ্তা থাকার জন্য টিকিট কেটে। ওই ক'দিন কাস্টোমার সার্ভিসের অফিস বন্ধ। ওই ক'দিন মন্টুবাবু শুধু নিজের জন্য বরাদ্দ রাখেন। দিনের বেলা প্রচুর হাঁটেন সমুদ্রের ধার দিয়ে, একা! বুকে আরাম জমা হয়। মন্টুবাবু বলেন ডিটক্স। সমুদ্রে স্নানটান অবশ্য করেন না, "আফটার অল বে অফ বেঙ্গল তো আর বাথরুমের চৌবাচ্চা নয়"।

বিকেলের দিকে স্বর্গদ্বারের বীচে এসে বসেন। ঢেউয়ের মত সব ট্যুরিস্ট এসে সমুদ্র ভিজিয়ে চলে যায়, মন্টুবাবু তৃপ্ত হয়ে দেখেন। আচমকা মন্টুবাবু দেখতে পান এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভ পাজামা গুটিয়ে ঢেউয়ে লপড়ঝপড় করে চলেছে। তাঁর এক হাতে এক জোড়া সাদা নীল হাওয়াই চটি, অন্য হাতে আর এক কাস্টোমার সার্ভিস এক্সেকিউটিভের নীল শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরা। নীল শাড়ির কোলে খুকি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের খিলখিল হাসি। তিন কাস্টোমার এক্সেকিউটিভ মিলে স্বর্গদ্বার আলো করে রেখেছে। নীল শাড়ি কাস্টোমার এক্সেকিউটিভের একটানা গুনগুন; "তোমাদের দু'জনেরই সর্দির ধাত, ফেরত চলো। চলো বলছি", সাদা পাজামার "আর দশটা মিনিট। 

ঠিক এমনটাই প্রতিবার চোখে পড়ে। প্রতিবার। পুরী আসার দিন দুয়েকের মাথায়। প্রতিবার মনভার মুছে গিয়ে মনকেমন এসে পড়ে। চোখে চিকচিক, মনে চিনচিন।

"বাড়ির সবাইকে কদ্দিন দেখি না"। 
প্রতিবার সাত দিনের প্ল্যান দু'দিনের মাথায় জেনারেল টিকিটে হাওড়া ফেরায় খতম হয়।

No comments:

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...