Wednesday, September 21, 2016

সেনাপতির বিকেল

সেনাপতি ভালো-না-লাগার বালি খুঁড়ে চোখের জল টেনে আনছিলেন বারবার। তাঁবুর জানলা দিয়ে বিকেলের নরম রোদ এসে গোটা গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে। হাওয়ায় ধুলো আর শীত মেশানো শিরশির। সেনাপতির ঠোঁট এবং গালের চামড়া ফেটে একাকার! যুদ্ধের চোট আঘাতে অবশ্য গাল ঠোঁটের চামড়া ফাটার হিসেব রাখাটা হাস্যকর।

সেনাপতির ঘাম শুকিয়ে গেছিল। শ্বাসের অস্বাভাবিক দ্রুততাও শান্ত হয়ে এসেছিল। কনুইয়ের আঘাতের যন্ত্রণাটা বৈদ্যের লাগিয়ে দেওয়া প্রলেপে ক্রমশ নুইয়ে আসছিল। সেনাপতির তাঁবুটা শিবিরের একদম শেষপ্রান্তে। যুদ্ধব্যস্ততার শব্দগুলো খুব একটা আসে না এ'দিকে। বেশ খানিকটা নিরিবিলি,যুদ্ধক্ষেত্রের খুনোখুনি হুড়মুড় ছাড়িয়ে এসে এমন নিরিবিলি বড় আরামদায়ক।

একটু তন্দ্রাভাব এসেছিল বোধ হয়, সে'টা কাটতেই সেনাপতি টের পেলেন যে আকাশে সন্ধ্যের আবছায়ার রঙ লাগতে শুরু করেছে। 

আজকের যুদ্ধে বড় আঘাত হানা গেছে, দুশমনের কবজি মুচড়ে দেওয়া গেছে খানিক। এমন নিশ্চিন্দির বিকেলে মদের পেয়ালা নিয়ে গা এলিয়ে দেওয়াটাই রীতি। কিন্তু আজ কিছুতেই শিয়রের কাছে রাখা সুরাপাত্রের দিকে সেনাপতির মন এগোচ্ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এখনও পোশাক পালটানো হয়নি, গায়ে ধুলো,বালি, মাটি আর রক্ত। স্নানের দরকার,কিন্তু শরীরকে অস্বাভাবিক ভারি মনে হচ্ছে। তাঁবুর বিছানায় অবশ হয়ে এলিয়ে রইলেন সেনাপতি,  তাঁর চোখ জুড়ে শুধু  সন্ধ্যে আকাশের নীলচে কালো আভা।
অথচ এ মুহূর্তটা আদতে ছিল মহারাজের শিবিরে গিয়ে অভিবাদন গ্রহনের। এ সন্ধ্যেটা আনন্দোৎসবের, যুদ্ধের দৌড়ে আজ তার সেনাবাহিনী এক ধাক্কায় অনেকটা এগিয়ে গেছে।গত দু'দিনের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি দু'পক্ষেরই যথেষ্ট হয়েছে, কিন্তু বাজি যে এখন তাঁর সৈন্যদলের পক্ষেই, এ কথা স্পষ্ট ঠাহর করতে পারছেন তিনি।
 
স্পষ্টতই এ যুদ্ধ অনিবার্য ছিল; আর যাই হোক, অকারণ রক্তব্যবসায়ি তাঁর মহারাজ নন। তাঁরা শোষকের জাত নন। কিন্তু এই শয়তানদের দলকে যুদ্ধের আশ্রয় না নিয়ে রোখা সম্ভব ছিল না, এবং এ যুদ্ধ চন্দ্রমল্লিকার গায়ে হাত বুলোনোর মত সহজও ছিল না কোনও মতেই। মজবুত প্রতিপক্ষ যখন শয়তানির আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে, তখন তাদের বশে আনা চাট্টিখানি কথা নয়।

কিন্তু আজকের দিন সমস্ত ঘুরিয়ে দিয়েছে। শয়তানের দলকে প্রায় সাঁড়াশি দিয়ে চেপে ধরা গেছে। রাজা শুধু প্রভু নন, সেনাপতি তাঁর বন্ধুস্থানীয়ও বটে। রাজার বাৎসল্যে জান কবুল করা যায়, আজ বিকেলটা তো রাজশিবিরেই কাটানোর কথা সেনাপতির। মদের ফোয়ারা বইবে, এন্তার বাহবা কুড়োবেন সেনাপতি ; আজকের নায়ক যে তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্কই।

কিন্তু আজ কনুইয়ের চোট পেরিয়ে যে যন্ত্রণার চোরাস্রোত সেনাপতির বুক বেয়ে গলায় উঠে এসে ধাক্কা মারছে, তা কিছুতেই এড়িয়ে যেতে পারছেন না সহস্র যুদ্ধের অবিসংবাদী নেতা।

এমন বিষণ্ণতা এর আগে কোনওদিন অনুভূত হয়নি। যুদ্ধজয়ের শেষ চালটুকুর হিসেবনিকেশ আজ করে নেওয়ার কথা। সেনাপতির অভিজ্ঞতার দিব্যদৃষ্টিতে আজ শেষ কামড়ের পরিকল্পনা করে নেওয়ার কথা। কিন্তু আজ সেনাপতির চোখ ও মন জুড়ে শুধু আকাশের সাঁঝবর্ণ অবসাদ।
সেনাপতি ভালো-না-লাগার বালি খুঁড়ে চোখের জল টেনে আনছিলেন বারবার।


"মহারাজ নিজের শিবিরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন সেনাপতি"।

দূতের কণ্ঠস্বর তাঁর মনে বিশেষ দাগ কাটল না। সে বোধ হয় ভাবল সেনাপতি অসুস্থ, তাই নিঃশব্দে বিদায় নিলে।

আকাশ ততক্ষণে রাত্রির কালোয় নিকষ। 
সেনাপতির চোখ জুড়ে সে অন্ধকারটুকুই শুধু, বুকের ভিতর মন কেমন। চোখের পাতা ভারি হয়ে আসতেই আকাশের অন্ধকার ছিঁড়ে সেনাপতির চোখে ভেসে উঠলো সর্ষে ক্ষেত লাগোয়া ছোট্ট কুঁড়ে। সেখানে নিকোনো দাওয়ায় পাতা চারপাইতে বাবা। বাবা আফিঙে আলুথালু। রান্নাঘর থেকে মায়ের সুবাস মাখানো গরম ডাল রুটির 'আয় বাবা আয়'; সেনাপতির মনে হচ্ছিল এ সমস্তই যেন ছোঁয়া যায়।

যেন আর শত্রুজয় নেই, উনুনের ধোঁয়া আছে।
যেন আর দায়িত্বে মশগুল ক্ষত্রিয়বোধ নেই, স্রেফ একটা গেঁয়ো সন্ধ্যে আছে।
যেন তরবারির আবশ্যক প্রতিঘাতটুকু নেই, শীতের রাতে উঠোনে জ্বালানো প্রাণজুড়নো আগুনটুকু আছে।
যেন রাজ্যরক্ষা নেই, অন্যমনস্কতায় আঙুলের ফাঁকে গাঁদাফুলের পাপড়ি ঘষা লালচে হলুদ দাগ আছে।
ব্যূহরচনা নেই, বাড়ির বিছানায় লেপের ওম আছে।
সত্যের জয়গাথা লেখার দায়িত্ব নেই কিন্তু খড়ের চালার ফোঁকর দিয়ে গড়িয়ে নামা চাঁদের আলো আছে।

দেশপ্রেমের জোয়ার নেই, কিন্তু ফুলিয়ার মিঠে দু'চোখে 'কব ওয়াপিস আওগে?'র আকুতি আছে।
দেশ, রাজা, রাজ্য, সম্মান, আদর্শ; সব নরম হয়ে মিলেমিশে যাচ্ছিল সেনাপতির চোখে বুকের ঘোলাটে অন্ধকারে। চোখের ছলছলে অনভ্যস্ত সেনাপতি। অথচ ফুলিয়ার কান্না-চাপা দেওয়া ঠোঁট কামড়ানো যন্ত্রণার ছবিটুকু বারবার সেনাপতির মনে ভেসে উঠছিলো।

ফুলিয়া। গোলাপি শাড়ি, হলুদ স্বপ্নের ফুলিয়া। ঠিক ভুল অঙ্কের বাইরের ফুলিয়া। আঁকার খাতার ফুলিয়া। দুপুর রোদের কুয়োপাড়ে পা ছড়িয়ে গল্প ফাঁদা বাচাল ফুলিয়া।

আহ। ফুলিয়া।

সত্য, দেশ, যুদ্ধ। সব পড়ে রইলো এক দিকে। আর ফুলিয়ার কান্না রইলো অন্যদিলে। সমস্ত ভাসিয়ে দিলে।ফুলিয়া।

যুদ্ধের ঠিকটুকুই শেষ কথা হয়ে থাকবে? ফুলিয়ার হয়ে ভুল করে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে কে? 

ফুলিয়া। "ফিরে এসো"র ফুলিয়া। "রাত্রে আটটা রুটির কম যদি খেয়েছ তো আমি মরব"র ফুলিয়া। "তুমি না ফিরলে আমি থাকবা না"র ফুলিয়া। ফুলিয়া।


কাপুরুষতা? হোক। এ যুদ্ধ তাঁর নয়, ফুলিয়া তাঁর।  সাহসীর রূপকথা যে ইতিহাসের শেষ কথা, সে ইতিহাস তাঁর নয়। একটা তলোয়ারের ঝনাৎহীন বিকেলের জন্য সর্বস্বান্ত হতে চাইছিলেন সেনাপতি।  সে গল্পে মহাভারত লেখা হবে না। কিন্তু। ফুলিয়ার গায়ে গা ঠেকিয়ে সাদামাটা সংসারের চালডালতেলনুন হিসেব করে আরও বছর তিরিশেক বেঁচে থাকা যাবে'খন।
**
যুদ্ধে প্রাণ দিতে সাহস লাগে। দুনিয়া সে সাহসকে সেলাম করে। স্মৃতিসৌধ তৈরি করে, নতজানু হয় সে শহিদদের স্মৃতির প্রতি। মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর হয়ে আজীবন জানকবুল করে প্রতিবাদ করে যাওয়ার সাহস আরও দুর্বার। তা নিয়ে অমরত্বের কবিতা লেখে মানুষ ও ইতিহাস।

কিন্তু কাপুরুষত্বের কলঙ্কে ডুব দিয়ে সাধারণ হতে চাওয়ায় যে অন্ধকার, তার ভার ঈশ্বর সৃষ্ট দুনিয়া কোনও মতেই বইতে পারে না।


"ফুলিয়া, আমি ফিরে এসেছি! দরজা খোল! খোল দরজা"।

আচমকা সেই দুপুরের নিরবিলির ভাঙা মুহূর্তে সেনাপতির কণ্ঠস্বর শুনে হুড়মুড়ে বিহ্বলতায় গুঁড়োগুঁড়ো হয়েছিল ফুলিয়া। 

সেই ডাক শুনে সদর দরজার দিকে ছুটে যাওয়ার সময়ও ফুলিয়া খবর পায়নি যে তাদের গাঁ থেকে দেড়শো ক্রোশ দূরে রাজ্যের যুদ্ধশিবিরে; কাপুরুষ বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি বীরেন্দ্র নারায়ণকে সে সকালেই সত্যের উপাসক রাজার হুকুমে ফাঁসিতে লটকানো হয়েছে।

No comments:

অনুরাগের লুডো

অনুরাগবাবু আমার অত্যন্ত প্রিয়৷ তার মূলে রয়েছে "বরফি"। লোকমুখে ও বিভিন্ন রিভিউয়ের মাধ্যমে জেনেছি যে বরফিতে ভুলভ্রান্তি ...