Thursday, September 15, 2016

রাইটার্স ব্লক

দিবাকর ক্রমাগত খারাপ লিখে চলেছিলেন।
সিগারেট বাড়ছিল।
বাড়ছিল প্রকাশকের বিরক্তি।

কিন্তু চেনা অস্বস্তি আর রাগ ছাপিয়ে দিবাকর রাত চিনতে শুরু করেছিলেন। স্তুপাকার ছেঁড়া কাগজে বিছানা ভার হয়ে যেত শেষের রাতে। ভোরের আগের সে অন্ধকারের ওজনই আলাদা, সে অন্ধকারকে আকাশ সহজে ধরে রাখতে পারে না। চুইয়ে নামে কালো, আকাশ থেকে জানালার শিক বেয়ে বিছানা বালিশে মিশে একাকার হয়ে যায়।

খারাপ লেখা দিবাকরকে রাতের টনটনে  দিকটায় টেনে নিয়ে  যেতে শুরু করেছিল।


**

সুতপার চিন্তা বাড়তে থাকে। চোখের সামনে দিবাকর ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে। দিবাকর অফিস যাওয়া বন্ধ করেছে আজ মাস চারেক হলো। দিনরাত হিজিবিজি লিখে চলেছে, পাতা ছিঁড়ে খাট মেঝেময় ছড়িয়ে চলেছে।  

রাতে ঘুম নেই।

জিজ্ঞেস করলেই শুধু একটাই কথা;
"পাবলিশারের তাগাদা আসছে। এবারে আমি একটা জুতসই উপন্যাস না দিলে ওদের কাটতি থাকবে ভেবেছো গো"?

**

আসলে দিবাকর বুঝতে পারে একটানা লিখে যাওয়াটাই তার জন্য এক মাত্র থেরাপি। আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে সুতপার প্রবলেমটা টের পাওয়া যায়। অনেক কিছু গুলিয়ে যায় ওর। ওর মনে থাকে না যে দিবাকর একজন লেখক। সুতপার মনে থাকে না যে ও সুইসাইড করেছে বছর দুয়েক আগেই। সে ভুলে যায় যে সে দিবাকরের জ্যান্ত বৌ নয়। দিবাকর মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। যে নেই তার মুখের ওপর তুমি নেই বলার মত খারাপ কাজ হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ভূতকে তো আর সাইকিলোজিকাল থেরাপিতে পাঠানো যায় না।

** 

"কে বলেছে তোমায় যে ভূতের মনোবিদ হয় না"?
মনোজিতের কথায় একটু ভরসা পেল দিবাকর। মনোজিতের সাথে আলাপটা নতুন। কিন্তু ভদ্রলোক এত অল্প সময়ে এত কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে; ভাবতেই বড় ভালো লাগে দিবাকরের। অমায়িক,  সপ্রতিভ। 

"আছে? তুমি ঠিক জানো মনোজিত"?

"না জানলে আর বলছি কেন? সামনের সপ্তাহে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করি। কেমন"?

"বাঁচালে ভাই। আসলে সুতপা মেয়েটা এত ভালো...ওকে এমন ভাবে সাফার করতে দেখলে বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে"।

"চিন্তা কোরো না। সে হয়ে যাবে। তোমার লেখালিখির খবর বলো বরং"।

"ওই। ব্লকটা কাটতে চাইছে না। তবে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। পাব্লিশাররা যে ভাবে চাপ দিচ্ছে, একটা কিছু না দাঁড় করাতে পারলেই নয়"। 

**

" দিবাকরকে কেমন দেখলে এবার মনোজিত"?

"ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে, ওর সেই ধারণাগুলো আমার হাজার কাউন্সেলিঙেও কাটছে নানা, বরং বদ্ধমূল হচ্ছে। তোমায় শক্ত হতে হবে সুতপা। তোমার সাপোর্টের ওপর সমস্তটা নির্ভর করছে"।

"আমার সাপোর্ট? মনোবিদ তো তুমি"।

"ইউ আর দ্য কী"।

"আমরাই ওর এ অবস্থার জন্য দায়ী। বিশেষত আমি"।

"নিজেকে অকারণে দোষ দিচ্ছ"।

"অকারণে? আমি দিবাকরের স্ত্রী, তাও তোমায় ভালোবেসেছি"।

" ভালোবাসা সিনেমার ডেফিনিশনে লিনিয়ার নয় সুতপা। আমিও ভালোবেসেছি তোমায়। কিন্তু দিবাকরের কথা ভেবে আমরা এক পাও এগোইনি কোনওদিন। ওর জানতে পারাটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট"।

"হি লাভড মি মনোজিত। পাগলের মত। আর ওই জানতে পারাটাই ব্রোক হিম। তুমি জানো সে জন্যেই দিবাকর আজ..."।

"ও'টা একটা দুর্ঘটনা ছিল সুতপা"।

**

জ্বরে দিবাকরের কপাল পুড়ে যাচ্ছিল, গোঙাচ্ছিল সে। যন্ত্রণায়। জলপট্টির শেষে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সুতপা। 

**

দিবাকরের অবাক লাগে। রাতের অন্ধকার উপচে ঘরের ভিতরটা কেমন নরম হয়ে এসেছে। আবেশে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, কথার জড়িয়ে যাওয়াটায় রাত, লেখা আর স্নেহ খুঁজে পেলে সে।

কপালে সুতপার হাত কী ভালোই যে লাগছিল। ছোটবেলার বিকেল যেমন। শুধু সুতপার আঙুলগুলো বরফ শীতল। ও তো বেঁচে নেই, তাই অমনটা।

সুতপার জন্য বড় কষ্ট হয় দিবাকরের; আহা, মেয়েটা বড় ভালো। ভোর রাতের আবছায়ার মত স্নেহ। সুতপার এটুকু থাকাই বা কম কী?

উপন্যাস নয়, দিবাকর জানে যে এ রাইটার্স ব্লক কাটবে কবিতায়। তবে দিবাকর এও জানে যে কোনও লেখকই বাজারের চাহিদার হিসেবের ওপরে নয়। 

2 comments:

Panchali Kar said...

Goosebumps!

Soutrik said...

বড্ড কম পরিমাণ খাবার পাচ্ছি আজকাল আপনার থেকে। খিদে বাড়িয়ে দিয়ে এভাবে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন কেন?

ধপাস

সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। সাঁইসাঁই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। পড়ছি তো পড়ছিই। বহুক্ষণ পর আমার পড়া একটা প্রবল 'ধপ...