Friday, February 11, 2022

পুলিন আর সমুদ্র



পুলিন ছিলেন মেজমামার ভক্ত৷ ছেলেবেলায় মামার সঙ্গে কতবার সমুদ্রের ধারে ছুটি কাটাতে গেছেন৷ পুরীর পড়ন্ত বিকেলে মেজমামা সৈকতে এসে দাঁড়াতেন হাঁটু পর্যন্ত পাজামা গুটিয়ে। সমুদ্রের দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়তেন৷ ঢেউয়ের আরামদায়ক আসা-যাওয়ায় গোড়ালি ভিজত বারাবার, নরম হয়ে আসত মন৷ গপ্পিয়ে মানুষটা নিশ্চুপ হয়ে আসতেন, মুখে লেগে থাকত ভালোবাসাবাসির হাসি৷ হাওয়ার ঝাপটার পাশাপাশি ঢেউ ভাঙার শব্দ, ভেজা বালির গন্ধ আর সন্ধ্যের আকাশের রঙ সমস্তটুকুই মেজমামা নিজের মধ্যে শুষে নিতেন৷ সে নাকি এক তপস্যার মত ব্যাপার৷ চল্লিশ বছর আগে পরীক্ষায় বসে কষতে না পারা অঙ্কের সলিউশন মনের মধ্যে উঁকি দেয় সে সময়৷ সতেরো বছর আগে হারিয়ে ফেলা ফাউন্টেন পেনটা আদতে কোথায় ফেলে এসেছিলেন তা ঠিক মনে পড়ে যায়। রীতিমত ম্যাজিক! 

পুলিন নিজে অবশ্য সে ম্যাজিকের তল পেতেন না৷ মেজমামা চলে যাওয়ার পরেও তাঁর স্মৃতির টানে বারবার সমুদ্রের দিকে ঘুরতে গেছেন পুলিন৷  ট্রাউজার গুটিয়ে দাঁড়িয়েছেন সমুদ্রে, পা ভিজিয়েছেন ঢেউয়ে৷ কিন্তু মেজমামার সেই সমুদ্র-নির্বাণ আয়ত্ত করা যায়নি৷ বারবার নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হয়েছে, মানুষ দিনদিন ক্ষুদ্র হয়ে পড়ছে; মনের ফ্লেক্সিবিলিটি কমে আসছে, আত্মার কোয়ালিটি গাম্বাট হয়ে পড়ছে৷ তার আর মেজমামার মত তপস্বী হওয়া হল না৷ মেজমামার মামা নিশ্চয়ই সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে লেভিটেট করতে পারতেন৷ তাই হবে হয়ত।  ধান্দাবাজি বাড়ছে আর মানুষের মানুষেমি কমে আসছে৷ এই থাম্বরুলটাই নিজেকে বারবার বোঝাতেন পুলিন৷

কিন্তু সেই ভুল ভাঙলো আলিসাহেবের এই আড়ম্বরহীন মাংস-রুটি-কাবাবের দোকানটির খোঁজ পেয়ে৷ প্রতি শনিবার এ দোকানের সামনে বেঞ্চিতে বসে মাংস রুটি আর অল্প কাবাব খেয়ে রাতের খাওয়া সারেন পুলিন৷ কিন্তু এ দোকানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শনিবার রাতের মাখোমাখো রোম্যান্সের চেয়েও অনেক বেশি নিবিড়৷ চাকরীর টানে এই দূর-শহরে ঠাঁই খুঁজে পাওয়ার পর থেকেই আলিসাহেব তার বন্ধু৷ আলি সাহেব কবিতা আর ইতিহাস ভালোবাসা মানুষ, কাবাব-মাংসরুটিতে তাকে বাঁধা যাবে না৷ পুলিনের পেট তেমন মজবুত নয়, হপ্তায় একদিনের বেশি মোগলাই খানা তার সয়না৷ কিন্তু হপ্তায় বার-তিনেক; সন্ধ্যের পর আলিসাহেবকে সেলাম না ঠুকলে তাঁর চলেনা৷ এক কাপ চা খেতে খেতে আলিসাহেবের শায়েরি আর গল্প শোনা। গপ্প সেরে আলিসাহেব ফিরে যান খদ্দের সামলাতে৷ 

ঠিক তারপর, কিছুটা দূরে সরে গিয়ে খানিকক্ষণের জন্য পুলিন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন আলিসাহেবের মাংসের কড়াইয়ের দিকে৷ আলিসাহেবের আত্মমগ্নতা, খদ্দেরদের হইহই, মোগলাই ঝোলের সুবাস, উনুনের তাপ; এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে যে অ্যালকেমি, সে'টা পুলিনকে জাপটে ধরে৷ সে মুহূর্তে পুলিন টের পান বুকের মধ্যে যেন অজস্র জানালা খুলছে, বিভিন্ন মনকাড়া সুর তৈরি হচ্ছে৷ মনকেমন করা সব অচেনা সুর৷ অথচ বাথরুমের আবডালেও পুলিনের গলা দিয়ে গান বেরোয় না৷ আস্তে আস্তে মাথায় ঝিম লাগে পুলিনের, টের পান পায়ে ঢেউ এসে ঠেকছে, পায়ের নীচে ফুটপাথের বদলে নরম বালি৷ মনে পড়ে মেজমামার গায়ে লেগে থাকা পরিচিত গন্ধটা; খবরের কাগজ আর সিগারেট মেশানো৷ মনের পড়ে মা দুপুরবেলা উপুড় হয়ে বই পড়ছে, আর বছর পাঁচেকের একটা চঞ্চল ছেলে মায়ের শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে মাথায় পাগড়ি বাঁধার চেষ্টা করছে৷ 

এমনই এক সন্ধ্যেয় ব্যাপারটা হুশ করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল পুলিনের কাছে৷ আরে, মেজমামার সমুদ্র-ম্যাজিকের তল পাওয়া গেছে যে৷ সবার সমুদ্দুর তো বে অফ বেঙ্গলে পড়ে নেই৷ নিজের সমুদ্র নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। আর সে খোঁজ একবার পেলেই কেল্লা ফতে!

No comments:

পুরনো লেখা