Sunday, March 19, 2017

নয়নতারা ও খোকা


আমি ভালো ফটোগ্রাফ তুলতে পারি না। ফোকাস বুঝি না। কাছে ঘেঁষলে ঝাপসা হয়ে যায়। দূরে দাঁড়ালে ফ্রেম এলোমেলো হয়ে পড়ে। আলো ঠাহর করতে পারি না। কোন রঙের ঘাড়ে কোন রঙ চাপালে দৃষ্টিনন্দন হবে, সে বোধও তেমন নেই।

আমি ভালো ছবি তুলতে পারলে বোঝাতে পারতাম এই নয়নতারাগুলো কী সুন্দর। আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদে অন্য কারুর রাখা টব আলো করে আছে। ছাদ আলো করে আছে। বিকেল আলো করে আছে। গোলাপি রঙের নয়নতারা আকছার দেখা যায়, তবে এই রঙটা বড় একটা দেখি না। যদি আর একটু স্থির ভাবে মোবাইল ক্যামেরাটা ধরতে পারতাম তাহলে নয়নতারার পাপড়িগুলো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ত।
তবু।

আরও বছর তিরিশ পর গুগল ইমেজেস স্ক্রোল করতে করতে এই ছবিটাই দেখে বিকেলের গন্ধ পাব। নয়নতারাগুলোকে স্পষ্ট মনে পড়বে।

নয়নতারা, আলো আলো একটা মেয়ে। ফিক্‌ হাসির মেয়ে। বিকেলের মেয়ে। অল্পবিস্তর সিজোফ্রেনিয়ার ওজন কি সকলেই বয়ে চলে না? এই মেয়েটার সঙ্গে আমার বেশ কিছুদিনের আলাপ। খানিক ভালোবাসাবাসিও আছে। আমার আস্তিনে ওর আঙুলের টান আছে। এমনকি আমার মেসবাড়ির পুরনো গন্ধ মিশে আছে খানিকটা। আমার পরিচিত কলকাতার গন্ধ। টিউশনি সন্ধ্যের আঁচ। দিল্লীর শীতের রাতের ধোঁয়া ওঠা পরোটার ওম। বিহারের রাত্রির ঝকঝকে তারা মাখানো আকাশের গল্প। সমস্ত মিলে আমি নয়নতারাকে চিনি। তার সঙ্গে অল্পস্বল্প কথাবার্তাও হয়। নয়নতারা আমার ভুল, বেঠিক, বিদঘুটে সমস্ত কিছু দেখতে পারে। কিন্তু ঠেলে সরিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায় না। সে মেয়ে জ্বরের খাটে এসে চুপটি করে বসে থাকে।
একরত্তি মেয়ে হলে কী হবে, নয়নতারা কান্না দেখতে পায়। সমস্ত লেখা পড়তে পারে। ছাতের আবডালে হুমড়ি খেয়ে সামনে এসে পড়ে। অবিশ্যি খুকির সামনে নতজানু হতে নেই।

যা হোক। একদিকে নয়নতারা। অন্যদিকে আকাশ ভরা টলটলে মেঘ। বাপ আর ব্যাটা রাস্তায় বেমক্কা ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। তক্ষুনি, দু’চার ফোঁটা। আর তার মধ্যে থেকে খান দুই ফোঁটা খোকার গায়ে।

প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা। আরও কত অজস্র ভিজে সপসপ মুহূর্ত পড়ে আছে। কাকভিজে হয়ে ফুটবল নিয় হুড়োহুড়ি করবে, মনের মধ্যে একরাশ আকুলিবিকুলি নিয়ে কোনও একদিন ইচ্ছে করে এন্তার ভিজবে হাতের ছাতা না খুলে, বৃষ্টির রাতে জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে প্রথম অতুলপ্রসাদ আবিষ্কার করবে, অফিসের মুখে ঝমঝম বৃষ্টি পেয়ে বিরক্তিতে পায়চারি করবে, ভালবাসবে, চিঠি লিখবে।

কিন্তু ভায়া বালিশেন্দ্র, প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে নামার সময় বাবা সঙ্গে ছিল। ভুলে, বেঠিকে, বিদঘুটেমোতে ঠাসা সেই ভদ্রলোক যে ভালো ছবি তুলতে পারে না। ফোকাস বোঝে না, আলো ঠাহর করতে পারে না।

তবু। মুহূর্তটার গন্ধ কি এ ছবিতে থাকবে না? অনেক বছর পরে? যখন ভুল, বেঠিক, বিদঘুটে সমস্ত উবে যাবে? নয়নতারার ছবিটার মত আলো আলো হয়ে থেকে যাবে না?     

No comments: