Thursday, December 15, 2016

মোহর


এক পিস্‌ জয়নগরের মোয়া হাতে বারান্দার ইজিচেয়ারটায় বসেছিলেন বিপ্লববাবু।
মরশুমের প্রথম। অফিসের আশুতোষ সমাজপতি অফার করেছিলেন লাঞ্চে। রাত্রে বাতাসে ঠাণ্ডা বাড়বে, তখন মোয়ায় কামড় বেশি আরামদায়ক। তাই লাঞ্চ টেবিলে তৎক্ষণাৎ মুখে না দিয়ে, মোয়াখানা টিফিন বাক্সে ঢুকিয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছিলেন বিপ্লববাবু।
ডাল, পেঁয়াজকলি ভাজা আর ডিমের অমলেট দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে গায়ে শাল জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। হাতে টিফিন বাক্স থেকে বের করে আনা মোয়া।
মোয়াটার দিকে অনেকক্ষণ একমনে তাকিয়ে ছিলেন বিপ্লববাবু। কেমন একটা ভালোলাগা ভর করছিল যেন তাঁর মনে। যেমন নিটোল চেহারা মোয়াটার, তেমনই সুবাস। আহা। কামড় বসাতে মন বসলো না বিপ্লববাবুর। কামড় বড় জান্তব একটা ব্যাপার। উগ্র। ঝাপটাঝাপটি।
রাতের ফুরফুরে হাওয়ায় পৌষের ধার রয়েছে বেশ। আহা। এই তো সময় মোয়ায় স্বাদে ভেসে যাওয়ার। মরশুমের প্রথম মোয়া। আহা। এ জয়নগরের মোয়াটি বড় নরম। বড় কমনীয়। আদুরে। চুমুর আশ্রয়ে নিলেন আশুতোষ, আগ্রাসন বলতে শুধু আলতো জিভের ডগা। ***
পরের দিন অফিসে কিছুতেই মন বসছিল না বিপ্লববাবুর। মোয়াটা খাওয়া হয়নি গতকাল। আর হয়ত খেতে পারবেনও না। মোয়াটা আর পাঁচটা মোয়ার মত নয়। ও মোয়ায় মায়া আছে। একবাক্স মোয়া আজ কিনে ফিরবেন অবশ্য, খাওয়ার জন্য। কিন্তু মোহরকে তিনি খেতে পারবেন না। গতকালের ওই জয়নগরের মোয়ায় স্পন্দন টের পেয়েছেন বিপ্লববাবু, মোহর নামটাও নিজের অজান্তেই দিয়ে ফেলেছেন। একটা চুমুর জন্য ছটফট করছিলেন তিনি। বিয়েথা সংসার আজ পর্যন্ত করা হয়ে উঠল না, বাড়ি ফেরার আগ্রহও বিশেষ থাকে না। অফিসের পর ক্লাবে রামি খেলে রাত করে বাড়ি ফেরাটাই তার কাছে নিয়ম। কিন্তু আজ মোহরের টানেই বোধ হয়, অফিস থেকে হাফ সিএল নিয়ে লাঞ্চের পরেই বেরিয়ে পড়লেন বিপ্লববাবু।
*** সাত দিন কেটে গেছে। মোহরের চেহারার জৌলুস খুব একটা কমেনি। সকালে একটা চুমু, অফিস থেকে ফিরে একটা চুমু। নিয়ম করে। মোহরটা বড় আদুরে , বড় নরম, বড় তুলতুলে। বড্ড সাবধানে রাখতে হয় ওকে। গত তিনদিন অফিস কামাই করেছেন বিপ্লববাবু। *** মোহরের গায়ে গন্ধ জমতে শুরু করেছে। কিন্তু এত সহজে পচন ধরা তো উচিৎ নয়। একটানা ফ্রীজে রাখা থাকে। বিপ্লববাবুর ঘুমখাওয়া নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। মোহরের কিছু হবে না তো? মোহর যদি না থাকে? মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে বিপ্লববাবুর। ***
"স্যার, ইন্সপেক্টর হালদার বলছি! বডি নামিয়েছি। সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলেছিল গামছার প্যাঁচে। এই গতকাল ভোর চারটে নাগাদ। আজ্ঞে হ্যাঁ। ছবিটবি তুলে নিয়েছি। ফোরেনসিকও কাজে লেগে গেছে। চিঠি? সুইসাইড নোট? নাহ্‌, তেমন কিস্যু পাওয়া যায়নি স্যার। ক্লু? তেমন প্রামাণ্য কিছু নয়, তবে ইয়ে; ওই মানে- যে ফতুয়া ভদ্রলোকে পরে ছিলেন, তার বুক পকেটে একটা পচা জয়নগরের মোয়া পাওয়া গেছে। থ্যাবড়ানো, গায়ে কালচে ছোপ আর রীতিমত দুর্গন্ধযুক্ত; এতটাই পচা। অমন রামপচা মোয়া বুকে ভদ্রলোক কী করছিলেন, সে'টা একটা মিস্ট্রি।

3 comments:

Shromana Chatterjee said...

a to sanghatik prem moshai.. :-o
apnar vabnake salute.. :-D

piyal saha said...

শরদিন্দুর ভুতের গল্পগুলোর কথা মনে করো। কোনো গল্পে কিছু জোনাকি, কোনো গল্পে চিরুনিতে আটকে থাকা এক গাছা চুল কি একটা ফুল যে প্রকৃতির নিয়মেই ঝরে পরেছে, তাদের নিয়ে কি অপূর্ব অশরীরী ব্যঞ্জনা তৈরী করেছিলেন তিনি। আমি তার কপি করতে বলছি না। কিন্তু ভাবনাটা নিয়ে ওই সাধারণ মোয়াতে বহুরকম অসাধারণত্ব আরোপ করে এক অলৌকিক কাহিনীও সৃষ্টি করা যেতে পারে।কিন্তু তোমার তো তা উদ্দেশ্য নয়। তুমি একাকীত্বর চরম প্রকাশকেই দেখাতে চেয়েছে। তবে আমার মতে এই লেখন শৈলী আসাধারন ।

piyal saha said...

শরদিন্দুর ভুতের গল্পগুলোর কথা মনে করো। কোনো গল্পে কিছু জোনাকি, কোনো গল্পে চিরুনিতে আটকে থাকা এক গাছা চুল কি একটা ফুল যে প্রকৃতির নিয়মেই ঝরে পরেছে, তাদের নিয়ে কি অপূর্ব অশরীরী ব্যঞ্জনা তৈরী করেছিলেন তিনি। আমি তার কপি করতে বলছি না। কিন্তু ভাবনাটা নিয়ে ওই সাধারণ মোয়াতে বহুরকম অসাধারণত্ব আরোপ করে এক অলৌকিক কাহিনীও সৃষ্টি করা যেতে পারে।কিন্তু তোমার তো তা উদ্দেশ্য নয়। তুমি একাকীত্বর চরম প্রকাশকেই দেখাতে চেয়েছে। তবে আমার মতে এই লেখন শৈলী আসাধারন ।