Sunday, September 16, 2018

অজাতশত্রু

রাজ-ডিনার বলে কথা৷ যে সে রাজা নয়, মগধ সুপ্রিমো বলে কথা। অজাতশত্রুর পাতে অন্তত বাইশ রকমের পদ যে ছিল তা অনুমান করেই নেওয়া যায়। তবু খাওয়ায় তাঁর বিশেষ মন ছিল না, থাকার কথাও নয়। বৃদ্ধ পিতা বিম্বিসারকে সেই কবে জেলে পুরেছেন। বিম্বিসারের খাওয়াদাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছে, তার ওপর সমানে চলছে অকথ্য শারীরিক অত্যাচার। সোজাসুজি গুমখুন করলে ল্যাঠা চুকে যায় বটে কিন্তু তা'তে খেল গড়বড় হয়ে যেতে পারে। মগধবাসী এমনিতেই সে বুড়োর ফেউ। অজাতশত্রুর ভয়ে সবাই থরথর কিন্তু তাঁর কপালে সিংহাসনচ্যুত বিম্বিসারের মত ভালোবাসা জোটেনা। পালটা বিদ্রোহ শুরু হলে সে আর এক ঝামেলা। বন্দীদশায় পচিয়ে মেরে ফেলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

কিন্তু কী ঢ্যাঁটা প্রাণ বুড়োর, হপ্তার পর হপ্তা খেতে পেলে না, পায়ের পাতার চামড়া তুলে পালটা সেলাই করে দেওয়া হল; তবু। মরল না।

সে'সব দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে অজাতশত্রু খেয়ে চলেছেন। পাশে স্ত্রী ও মা। মায়ের মনখারাপ, বিম্বিসারের জন্য; তবে অন্তঃপুরের মনখারাপ নিয়ে পড়ে থাকলে রাজকাজ চালানো যাবে না। এমন সময় অজাতশত্রুর শিশুপুত্র তাঁর কোলে এসে বসল আর হিশি করে ফেলল। ডায়রেক্ট রাজার ভাতের থালায়। রাণী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, খানসামার দল ছোটাছুটি শুরু করে দিল, তুড়ি বাজার আগেই চলে এলো খাবার সাজানো নতুন থালা। কিন্তু অজাতশত্রু অবিচল, তার মুখে হাসি। কোলে বসে রইল রাজপুত্র;  রাজা খাওয়া থামালেন না, থালাও পাল্টালেন না। পাছে খোকার খারাপ লাগে।

তা দেখে রাজার মা বড়রাণীমার চোখে জল।

"খোকা, জানিস! তখন তোর বয়স দুই কি তিন। তোর আঙুলের মাথায় একটা বিশ্রী ফোঁড়া হল। তোর বাবা সে'খানে চুমু খেলেই তোর মনে হত ব্যথা কমে গেছে। তেমন চুমু খাওয়ার সময় একবার সেই ফোঁড়া গেল ফেটে। অমনি সেই আঙুল তিনি নিজের মুখে পুরে ফেলেন। আর যতক্ষণ না সমস্ত পুঁজ-রক্ত ক্ষরণ বন্ধ হয়, ততক্ষণ তিনি মুখ থেকে সে আঙুল বের করেননি। পাছে তুই সে'সব দেখে ভয় পাস"।

সেই মুহূর্তে নাকি অজাতশত্রুর চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে যায়; তিনি ছুটে যান কারাগারের দিকে। তবে আর পাঁচটা গল্প যেমন হয় আর কী; অজাতশত্রু পৌঁছোনোর কয়েক মুহূর্ত আগে মারা যান বিম্বিসার। এরপর দাপটের সঙ্গে বহুদিন রাজপাট সামলাবেন অনুতাপে দগ্ধ সম্রাট। আর যে কোলের শিশুর হাসির জন্য অজাতশত্রু সে রাত্রে অখাদ্য খেতে দ্বিধা করেননি, ভবিষ্যতে তাঁর হাতেই অজাতশত্রু রাজ্য ও প্রাণ খোয়াবেন।

এত কিছুর মধ্যিখানেও ফোঁড়ায় চুমু আর খোকা কোলে বাবার রাতের খাওয়া সেরে নেওয়ার জ্বলজ্বলে মুহূর্তগুলো থাকবে। ইতিহাসের আড়ালে থাকা সে গল্পগুলোর জন্যেই গান, কবিতা আর পিপিএফে টাকা জমানো।

(গুগল পডকাস্টে যে কতরকমের গল্প ছড়িয়ে রয়েছে। অজাতশত্রু আর বিম্বিসারের গল্প বেশ সবিস্তারে শুনলাম কিট প্যাট্রিকের 'হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া' পডকাস্টে)।

No comments:

তিব্বতি মাদুলি

- মনখারাপ? - আজ্ঞে। প্রচণ্ড। টেরিফিক লেভেলে মনখারাপ। - সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন? জয়েন্টে ফেল? মিনিবাসের পকেটমারিতে সত্তর টাকা জল...