Sunday, September 16, 2018

ঘৌলমন্ডির গোলমাল -১

**ঘৌলমন্ডির গোলমাল**

প্রথম পরিচ্ছেদ - এলেম নতুন দেশে

.......

কানের মধ্যের ঝমঝম আওয়াজটা কমে এসেছে। গা হাত পায়ের অসহ্য ব্যথাটাও দেখছি কম। চোখের দৃষ্টিটা সামান্য ঘোলাটে কিন্তু গোলমেলে অন্ধকারটা ক্রমশ কেটে যাচ্ছে।

বুকের মধ্যের হ্যাঁচড়প্যাঁচড়টাও বেশ কমে এসেছে।  একবার চোখ বুজে আবার খুললাম; ড্যাবড্যাব করে দেখার চেষ্টা করলাম।

সামনের দেওয়ালটা নীল।
আমি একটা সাদা চাদর পাতা বিছানায় শুয়ে। নির্ঘাৎ হাসপাতালের বেড।

দেওয়ালে একটা ঘড়ি, চোখ কুঁচকে সময়টা দেখার চেষ্টা করলাম; ও মা! ঘড়ির দু'টো কাটাই সমান সাইজের। আটটা দশ, একটো চল্লিশ যা কিছু একটা হতে পারে। কী আহাম্মকে ঘড়িরে বাবা। বিরক্ত হয়ে চোখ বুজে ফেললাম।

নিজের পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলাম।

আমি যাচ্ছিলাম উলুবেড়িয়ায় মেজপিসির বাড়ি। অবিশ্যি মেজপিসি আর নেই, এমনকী মেজপিসেও মারা গিয়েছেন বছর সাতেক হল। মেজপিসির মেজছেলে বাপনদাদার সঙ্গে আমার খুব দহরম। মহরমের ছুটি পেয়েছি আর অমনি সকাল বেলা সরভাজার বাক্স নিয়ে বাস ধরে সোজা উলুবেড়ে। গোটাদিন শুধু তাস পেটানো আর বাপনবৌদির হাতের বাটিচচ্চড়ি আর মাছের ঝোল।

আহ..এই আমার এক রোগ। কী ভাবার কথা আর কী ভেবে চলেছি। প্রশ্ন হচ্ছে আমি এই হাসপাতালে এলাম কী করে। সাঁতরাগাছি থেকে বাস ধরে উলুবেড়িয়া যাচ্ছিলাম; দিব্যি।

ওহ্ হো। মনে পড়েছে। ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা, মাঝ রাস্তায়।

যাব্বাবা!

কী কাণ্ড কী কাণ্ড। তাই এই হাসপাতালে। তবে অল্পের ওপর দিয়ে গেছে যা বুঝছি, হাতেপায়ে প্লাস্টার নেই কোনো, সামান্য ব্যান্ডেজও নেই। শুধু পেটের মধ্যে চনমনে খিদে। যাক। সেই কোন সকালে খইদুধের সঙ্গে আমসত্ত্ব মিশিয়ে খেয়ে বেরিয়েছিলাম। তারপরে পেটে পড়েছে বলতে শুধু চার প্যাকেট বাদাম আর একজোড়া ডিমসেদ্ধ, সাঁতরাগাছি বাসস্ট্যান্ডে কেনা।

ফের চোখ খুললাম।

নীল দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত রকমের ফর্সা ভদ্রলোক। ফর্সার চেয়েও বেশি ফ্যাকাসে। মাঝারি হাইট, হাত পা ল্যাকপ্যাকে অথচ দিব্যি একটা টলমল ভুঁড়ি।  মাথার চুল উসকোখুসকো। সবচেয়ে বিটকেল ব্যাপার হল ভদ্রলোকের ডান গাল সাফসুতেরো অথচ বাঁ গালে অন্তত দিন তিনেকের না কামানো দাড়ি। চোখে একটা বিটকেল সবুজ ফ্রেমের চশমা।  আর মুখের হাসিটা যেমন নার্ভাস, তেমনি ছটফটে। গায়ে সাদা কোট আর গলার স্টেথোস্কোপ না থাকলে ঘোরতর সন্দেহ হত যে ভদ্রলোক মানুষ নয়, ভিনগ্রহের প্রাণী।

" কেমন বোধ করছেন মনোজবাবু"? এই ডাক্তারের গলা অবিশ্যি দিব্যি মখমলে।

"ইয়ে, তেমন ব্যথা বেদনা তো কিছু..."।

" না, তেমন আর কী। খান কুড়ি ভাঙা হাড়, লিটার চারেক রক্ত গেছে। ও তেমন কিছু নয়"।

" হাড় ভেঙেছে? কিন্তু...কই...কোনো যন্ত্রণা নেই, প্লাস্টার নেই। রক্ত ঝরল, তবু দুর্বল লাগছে না তো"।

"ও কোনো প্রবলেম নয়। এই একটু প্রেশার মেপে দিচ্ছি, ব্যাস; তা'হলে সমস্ত ব্যথা প্লাস্টার দুর্বলতা ফেরত আসবে"।

এই বলে ঝপাৎ করে আমার বুকে স্টেথোস্কোপ চেপে ধরলেন ডাক্তার।

" এ কী ডাক্তারবাবু! স্টেথোস্কোপে প্রেশার"?

"কী স্কোপ"? ডাক্তার কেমন ঘাবড়ে গেলেন যেন।

" স্টে...স্টেথোস্কোপ"।

ধপাস করে পাশের চেয়ারে বসে পড়লেন সেই অদ্ভুতুড়ে ডাক্তার।

"শরীর খারাপ লাগছে নাকি ডাক্তারবাবু"?

" আরে ধুর, শরীর থাকলে তো খারাপ"। বলেই স্যাট করে ইয়া লম্বা জিভ কাটলেন ভদ্রলোক।

"শরীর নেই মানে"?

তখনই সব গড়বড় হয়ে গেল। ডাক্তার মাথা চুলকে আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বোধ হয় একটু বেশি জোরে চুলকে ফেলেছিলেন। স্টেথোস্কোপ জড়ানো গলার ওপর থেকে মুণ্ডুটা খুলে আমার বেডে এসে পড়ল। সাদা কোট পরা স্কন্ধকাটা দেহটা তখনও চেয়ারে; অসাড়।

" সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সরি মনোজবাবু। আমি এ'ভাবে আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনি। আপনার গা থাকলে ছুঁয়ে বলতাম"। খাটের ফ্যাকাসে-মুখো মুণ্ডুটা একটানা বিড়বিড় করে চলেছে। আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিৎ ছিল, কিন্তু কিছুতেই পারছি না ভির্মি খেতে।

খেয়াল করলাম আমার খাটের পাশের চেয়ারে মাথাকাটা দেহটা ক্রমশ আবছা হতে শুরু করেছে। কিন্তু খাটের মুণ্ডুটার "সরি সরি" বিড়বিড় থামেনি।

"তবে আপনি ঠিক ইয়ে...মানুষ নন, তাই না ডাক্তারবাবু"?

"এককালে ছিলাম মনোজবাবু"।

" আর আমিও বোধ হয়..."।

"মিনিট দশেক আগেও ছিলেন। মানুষ"।

" এখন"?

"ভূত"।

" অ। এ'টা হাসপাতাল নয়"?

"না, এ'টা বাফার জোন"।

" বাফার জোন"?

"ওই, মরার পর দুম করে ঘৌলমন্ডি দেখলে কচিভূতদের কনফিগারেশন গড়বড় হয়ে যায়। তারপর তাদের রিসেট করে রিলঞ্চ করতে হয়৷ তাদের খুলি-ক্লিনিকে পাঠিয়ে হাজার রকমের কন্ডশনিং করিয়ে তারপর নর্মাল করা দরকার৷ বিস্তর হ্যাপা। অনেকে আবার একবার বিগড়ে গেলে আর কিছুতেই বাগে আসতে চায়না। এই যেমন মাধবখুড়ো,  বোমা বাঁধতে গিয়ে চার টুকরো হলেন। অথচ ভূত হয়েছেন জেনে এমন ঘাবড়ে গেলেন যে কিছুতেই ফুল বডি রিকনসাইল করল না। আজও মাধবদার ডান পা আর বাঁ পা মিলে বডি আর মাথার নামে অকথ্য সব নিন্দে রটিয়ে বেড়ায়"।

" আমার না, কেমন গা গুলোচ্ছে"।

" গা নেই মশাই, ঘৌলমন্ডিতে কারুর গা থাকলে তবে তো গা গুলোনোর প্রশ্ন। একটা সুইডিশ ভূতের টীম অবশ্য বছর দুয়েক ধরে চেষ্টা করছে গা না থাকলেও কী'ভাবে সুড়সুড়ি উপভোগ করার উপায় খুঁজে বের করতে। কিন্তু গা গুলোনোটা মনের ভুল মনোজবাবু"।

"ঘো..ঘৌ...ঘৌলমন্ডি...এ'টা কী"?

" ও'দিকটা পৃথিবী, এ'দিকটা ঘৌলমন্ডি। অবশ্য ভিনগ্রহের ভূতজগতগুলোর নামধাম আমার তেমন জানা নেই, আছে কিনা তাও জানিনা। আমাদের দৌড় এই ঘৌলমন্ডি তক"।

"আর..বাফার জোন"?

" মরার পর মড়াদের মধ্যে চমকে ভেবড়ে যাওয়ার একটা টেন্ডেন্সি দেখা দেয়। সে'টা রুখতেই গভর্নমেন্টের তরফ থেকে এই বাফার জোন অফিস তৈরি হয়েছে প্রায় বছর দশেক হল। সমস্ত মড়া এসে আগে এখানে জড়ো হয়। আর আমরা যারা এ'খানে চাকরী করি তারা পৃথিবী গোছের একটা পরিবেশ সিমুলেট করি। যা'তে আপনাদের একটু ধাতস্থ করে নেওয়া যায়। আফটার অল, আপনারা তো জানেন না যে কোয়ালিটি অফ লাইফে পৃথিবী ঘৌলমন্ডির কাছে বারো গোল আর দু'শো বারো রানে হারবে। ক্রমশ জানতে পারবেন"।

"মরেও মুক্তি নেই দেখছি ডাক্তারবাবু। এ'খানেও গভর্নমেন্ট,  এ'খানেও চাকরী। পড়াশোনাও আছে বোধ হয়"?

" রীতিমত। আমি নিজে গ্যাস পাস করেছি। নয়ত সরকারি চাকরী পেতাম না"।

"গ্যাস"?

" ঘোস্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেস"।

"ওহ, তা এই হাসপাতাল বোধ হয় সিমুলেটেড, তাই না"?

"পুরোপুরি"।

" আর তাই বোধ হয় ওই ঘড়িতে গোলমাল, দু'টো কাটাই সেম সাইজের"।

" এহ বাবা, তাই তো। ফের সিমুলেশনে গণ্ডগোল। আমার প্রমোশনটা এ'বারেও গ্যালো"। বলে গজগজ করতে করতে মুণ্ডটা ফের চেয়ারে রাখা দেহের ঘাড়ে গিয়ে বসল; অমনি আবছা দেহটা ফের স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"আপনার নামটা ডাক্তারবাবু"?

" ওহ, আমার আবার ডাক্তার বলা কেন। নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম হাতুড়েনসিক। ডাক নাম হাসি"।

"এ'টা কোনো নাম হল"?

" হ্যাঁ। মনোজ খুবই বদখত নাম। চলুন, সবার আগে গিয়ে আপনার নতুন নাম সংগ্রহ করে আসি"।

"নতুন নাম"?

" নয়ত কি মনোজ নামে ডাকবে নাকি সবাই চিরকাল? ভূতেরা হাসবে যে"।

"ভাই হাসি, আমার মনে কয়েক হাজার প্রশ্ন গিজগিজ করছে"।

"সামনে অনন্তকাল পড়ে ভায়া। ব্যস্ত হওয়ার কিছুই নেই। ইয়ে, একটা রিকুয়েস্ট। নাম রেজিস্ট্রেশনের অফিসে গিয়ে ঘড়ির গলদ আর আমার মুণ্ডু খুলে পড়ার ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো, কেমন? নয়ত এ'বারের প্রমোশনটাও ঝুলে যাবে"।

"বেশ"।

"আর ইয়ে, আরো একটা জিনিস। বাসে আপনা সঙ্গে একটা বাক্স ছিল"।

" আহা রে, তাই তো। পরাশর সুইটসের সরভাজা। বাপনদা সে সরভাজা বলতে অজ্ঞান। ভোগে লাগল না"।

"ও মা। ভোগে লাগবে না কেন"? এরপর গলা একটু নামিয়ে বললেন " ও বাক্স আমি ঘৌলমন্ডিতে উঠিয়ে এনেছি"।

"আনা যায় নাকি"?

" আইন বিরুদ্ধ। তবে সে সরভাজার সুবাসের জন্য হাজার আইনকে জবাই করা যায়। চেপে যাবেন ব্যাপারটা, আপনি ভদ্র সন্তান, বোঝেনই তো; মাঝেমধ্যে আইন না ভাঙলে কন্সটিটিউশনের গালে ব্রণ বেরোয়। ইয়ে, ভাগ পাবেন"।

"খাওয়া যায়? আই মীন ভূতেরা খেতে পারে"?

" খেতে না পারুক, শুঁকতে পারে। এ'খানে ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনার সব আছে। শুধু সে সব খাওয়া হয় না; শুধু শোঁকা। তবে তা'তে সুবিধে আছে; জিরো অম্বল আর নো গলাবুক জ্বালা"।

"তোফা"।

" ওয়েলকাম টু ঘৌলমন্ডি"।

No comments:

বাইশের দুই বিনোদ দত্ত লেন

- কাকে চাই? - ম্যাডাম, এ'টা কি অমলেশ সমাদ্দারের বাড়ি? - ওই ঢাউস নেমপ্লেটটা চোখে পড়েনি? ও'টায় কি অমলেশ সমাদ্দার লেখা আছে?...