Thursday, October 27, 2016

কুঞ্জবনে

- গুরু!
- ইয়েস বস।
- আরেক টান হবে নাকি?
- নাহ্। এটুকুই। থাক বরং।
- মিইয়ে গেছ দেখছি?
- আমি? মিইয়ে? আরে না না! আর্কিমেডিস এখন আমায় দেখলে ইউরেকা ইউরেকা বলে লাফাতে পারতেন। ফ্লোট করছি কিনা। দুঃখের যতটা ওজন, ততটাই স্ফুর্তির জল ডিস্পলেস করছি। উথাল পাথাল, কিন্তু ডুবে যাওয়ার চান্স নেই।
- দুঃখ? গুরু? আমি থাকতে তোমার দুঃখ?
- আসে, যায়। যায়, আসে। দে। অত জোর করছিস যখন। বামুন মানুষ, দু'টানে তো আর জাত যাবে না। না নিলে বরং তুই খারাপ পাবি।
- এই যে গুরু।
- আহহহহহহহ, বুকের আগুনপানা স্টোভে কেউ জল ছিটিয়ে দিলে রে।
- বল না গুরু। অমন ম্যাদা মেরে কেন রয়েছ!
- ম্যাচোমাস্তানদের ম্যাদা মারতে আছে রে পাগলা?
- বত্রিশ বছর ধরে ট্রাকের খালাসি গুরু। অল ইন্ডিয়া পারমিটের। তার মধ্যে সাড়ে একত্রিশ বছর তোমার পায়ের কাছে বসে "ডাইনে লেও বাঁয়ে লেও" করে গেছি। তুমি হ বলতে আমি হরিদাসের ধাবার ডিম তড়কা বুঝি গুরু। ডবল ঝাল।
-  হ'য়ে হরিদাসের ধাবার তড়কা। আহা। তোর এ জীবনে কবি হওয়ার কথা ছিল রে। ট্রাক ধুয়ে আর মুন্নি বদনামে উজাড় হয়ে গেলি। একটু যদি কেউ তোকে বিভূতিভূষণে ঠেলে দিত। সময়মত। তবে। তবে আমিও তো ঠেলিনি। তোর কোনও দোষ নেই রে। কবিদের কোনও দোষ থাকে না।
- গুরু। কী হয়েছে?
- কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স শুধু নয় রে, ইউনিভার্সিটি কাঁপানো রেজাল্ট।
- জানি গুরু। তুমি কলেজে টপাটপ পাশ দিয়ে ট্রাক চালাতে এসেছো। কিন্তু সে তো বছর পঁয়ত্রিশ আগের কেস! এখন ব্যথা শুরু হল?
- ধুর। ট্রাক আর ন্যাশনাল হাইওয়ে তো আমার হিমালয় রে! শুধু কৌপীনের বদলে লুঙ্গি।
- তবে? গুরু? নেতিয়ে পড়েছ যে বড়?
- জানিস...।
- গুরু!
- "কোয়েলা ডাকল আবার, যমুনায় লাগল জোয়ার; কে তুমি আনিলে জল ভরি মোর দুই নয়নে"!
- আইব্বাস!
- কী?
- তোমার গলায় সুর রয়েছে গুরু!
- গাঁজা। গাঁজা সুর ঢালে। গলায় না। কানে।
- গুরু! গাও না।
- সন্ধ্যের বারান্দা জানিস। বৃষ্টির।  ঝিরঝির দেখা যায় ল্যাম্পপোস্টের বাতির তলে। উঠোনের জুঁইয়ে বাতাস ভার। মা গানের ভালো লাগায় চোখ বুজে ফেলেছেন। আমি ভ্যাবলার মত বসে মায়ের আঁচল চিবুচ্ছি। দু'জনেই অপেক্ষায়। বাবা আসার সময় হয়ে এসেছে। মা গাইছেন। গাইছেন। সেই। গানে জুঁইয়ে ডুবে ভাসছি। সন্ধ্যে মায়ের গান বেয়ে তরতর করে এগিয়ে চলেছে। "আজি মোর শূন্য ডালা, কী দিয়ে গাঁথব মালা? কেন এই নিঠুর খেলা খেলিলে আমার সনে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে, হৃদি মোর উঠল কাঁপি চরণের সেই রণনে"।
- গুরু। আঁখো মে পানি। ম্যাচো মাস্তানা?
- হেহ। শোন। বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছিল। বারান্দার বাইরের সে অন্ধকারে রাস্তার আবছা হলদে আলোর মায়া আর মা মেশানো। বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে মা গুনগুনিয়ে চলেছিল; "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি-ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে, কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে"।
- আহ। গুরু।
- আসেনি।
- হুঁ?
- বাবা। আসেনি। আর কখনও। ট্রাকচাপা পড়ার পর ফিরলে অবশ্য ব্যাপারটা ভয়েরই হত।
- ও।
- সেই শেষ মাকে গাইতে শোনা। জানিস! সেই শেষ। মা আর কথাই বলতে পারতেন না, তো গান। গান ছাড়া মাকে চিনিনি। গান যাওয়াতেই মা চলে গেছিল। তাই গান ছাড়া মাকে ছেড়ে আসতে কোনও কষ্ট হয়নি।
- গুরু। আরেক টান নেবে?
- আজ...আজ নাকে ফের জুঁইয়ের গন্ধ এলো। মাই ডিয়ার খালাসিবাবু, দ্য কুঞ্জবন ইস ডেসার্টেড। বাট দ্য মিউজিক প্লেস অন। আমি এদ্দিন শুধু শুনতে পেতাম না। মাকে পাথর ভেবে পালিয়ে এলাম অথচ সে সুর ডাকাত হয়ে কলার টেনে রাখলে।
- গুরু।
- মা! মাগো। আয়দার লেট দ্য মিউজিক গো অর পুল মি ক্লোজার। ক্লোজার। "হয় তুমি থামাও বাঁশি, নয় আমায় লও হে আসি - ঘরেতে পরবাসী থাকিতে আর পারি নে"।
- জী। গুরু। এ'বার চলো।
- হুঁ। এইবার।

2 comments:

Mohua Roy said...

Ki likhecho Guru!! Puro emossion e mossion choley asslo.

sanbandyo said...

Awnobodyo hoyechhe eta. Khubi bhalo laglo.

তিব্বতি মাদুলি

- মনখারাপ? - আজ্ঞে। প্রচণ্ড। টেরিফিক লেভেলে মনখারাপ। - সে তো বুঝলাম। কিন্তু কেন? জয়েন্টে ফেল? মিনিবাসের পকেটমারিতে সত্তর টাকা জল...